প্রশ্ন: “আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল কাজ হলো, তালাক।” হাদিসটি কি সহিহ এবং এর ব্যাখ্যা কী?
উত্তর: ইসলামি জীবনদর্শনে পরিবার হলো সমাজের হৃদপিণ্ড। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। তবে মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে অনেক সময় বিচ্ছেদের প্রশ্ন সামনে আসে। তাই তালাক বা বিচ্ছেদ সম্পর্কে শরিয়তের মূল দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর প্রায়োগিক দিকগুলো বোঝা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের জন্য জরুরি।
যাইহোক, প্রশ্নে উল্লেখিত উপরোক্ত হাদিসটি আমাদের সমাজে আলেম-ওলামা, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট প্রসিদ্ধ। কিন্তু মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম বিচারে উক্ত হাদিসটি সহিহ নয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
“আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল কাজ হলো তালাক।” [সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদিস গ্রন্থ]
উক্ত হাদিসটিকে ইমাম হাকেম সহিহ বললেও অধিকাংশ মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) একে ‘মুরসাল’ (বিচ্ছিন্ন) হিসেবে গণ্য করেছেন।
قَالَ الْخَطَّابِيُّ وَتَبِعَهُ الْمُنْذِرِيُّ فِي مُخْتَصَرِ السُّنَنِ: وَالْمَشْهُورُ فِيهِ الْمُرْسَلُ
“ইমাম খাত্তাবি এবং তাঁর অনুসরণে ইমাম মুনযিরী ‘মুখতাসারুস সুনান’-এ বলেছেন: এই হাদিসটির ক্ষেত্রে এটি মুরসাল হওয়াই প্রসিদ্ধ”।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا ـ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ» ـ رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ، وَابْنُ مَاجَهْ، وَصَحَّحَهُ الْحَاكِمُ، وَرَجَّحَ أَبُو حَاتِمٍ إِرْسَالَهُ وَكَذَا الدَّارَقُطْنِيُّ، وَالْبَيْهَقِيُّ رَجَّحَا الْإِرْسَالِ.
“ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল কাজ হলো, তালাক।’
এটি আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং হাকেম একে সহিহ বলেছেন। তবে আবু হাতিম, দারাকুতনি এবং বায়হাকি একে মুরসাল হওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।”
ما أحل الله شيئا أبغض إليه من الطلاق
‘আল্লাহ তাআলা তালাকের চেয়ে অধিক অপ্রিয় কোনো বস্তুকে হালাল করেননি’।
এই মর্মে আরও কিছু শব্দ বর্ণিত হয়েছে। তবে এর সনদ (বর্ণনাসূত্র) অত্যন্ত দুর্বল (যয়িফ জিদান), যা দলিল হিসেবে পেশ করার যোগ্য নয়।” [সুনানে দারাকুতনী: ৪/৩৫; আল কামিল লি ইবনে আদি: ২/৬৯৪]
ইমাম সানআনি হাদিসটির সনদগত মান সম্পর্কে আলোচনা করার পরে এ বিষয়ে আরো বলেন, “এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, হালাল জিনিসের মধ্যেও এমন কিছু আছে যা আল্লাহ তাআলার কাছে অপছন্দনীয়। আর তার মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক। এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যার মানে হলো, এতে কোনো সওয়াব নেই এবং এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম নয়। কিছু আলেম হালালের মধ্যে অপছন্দনীয় বিষয়ের উদাহরণ দিতে গিয়ে কোনো ওজর বা কারণ ছাড়া মসজিদ ব্যতীত অন্য স্থানে ফরজ নামাজ আদায় করার কথা উল্লেখ করেছেন। আর এই হাদিসটি দলিল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তালাক ব্যতিরেকে অন্য কোনো উপায় বা বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া যায় ততক্ষণ তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকাটাই উত্তম।” [সুবুলুস সালাম]
যদিও হাদিসটি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। তবে এর মর্মার্থ বা অর্থ সঠিক।
يُرْوَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: (أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ) وَهَذَا الْحَدِيثُ لَيْسَ بِصَحِيحٍ، لَكِنَّ مَعْنَاهُ صَحِيحٌ، أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَكْرَهُ الطَّلَاقَ، وَلَكِنَّهُ لَمْ يُحَرِّمْهُ عَلَى عِبَادِهِ لِلتَّوْسِعَةِ لَهُمْ.
“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হয় যে তিনি বলেছেন: ‘আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল হলো তালাক।’ এই হাদিসটি সহিহ নয়। কিন্তু এর অর্থ সঠিক। আল্লাহ তাআলা তালাককে অপছন্দ করেন। তবে বান্দাদের জন্য সুযোগ রাখার খাতিরে তিনি একে হারাম করেননি”। তিনি আরও বিস্তারিত বলেন,
فإذا كان هناك سبب شرعي أو عادي للطلاق صار ذلك جائزاً ، وعلى حسب ما يؤدي إليه إبقاء المرأة ، إن كان إبقاء المرأة يؤدي إلى محظور شرعي لا يتمكن رفعه إلا بطلاقها فإنه يطلقها ، كما لو كانت المرأة ناقصة الدين ، أو ناقصة العفة ، وعجز عن إصلاحها ، فهنا نقول : الأفضل أن تطلق ، أما بدون سبب شرعي ، أو سبب عادي ، فإن الأفضل ألا يطلق ، بل إن الطلاق حينئذٍ مكروه ” انتهى.
“যদি তালাকের পেছনে কোনো শরয়ি বা স্বাভাবিক কারণ থাকে তবে তা জায়েজ। যদি স্ত্রীকে রাখার মাধ্যমে কোনো শরয়ি ক্ষতি হয় যা তালাক ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়—যেমন দ্বীনদারী বা সতীত্বের অভাব থাকে এবং তাকে সংশোধন করা না যায়—তবে তালাক দেওয়াই উত্তম। কিন্তু কোনো শরয়ি বা স্বাভাবিক কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া অপছন্দনীয় (মাকরুহ)”। [লেকাসাতুল বাবিল মাফতুহ, ৫৪/৩] মোটকথা, উক্ত হাদিসটি সনদগতভাবে মুরসাল (যা জয়িফ/দুর্বল হিসেবে পরিগণিত) তবে এর মর্মার্থ সঠিক। অর্থাৎ শরিয়ত সম্মত কারণে তালাক দেওয়া হালাল। অন্যথায় তা আল্লাহর নিকটে ঘৃণিত বিষয়।
আমাদের বর্তমান সমাজে ধৈর্য ও সহনশীলতার অভাব প্রকট। সামান্য কথা কাটাকাটি বা মতের অমিল হলেই তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা হয়। অথচ শরিয়তের মূল লক্ষ্য হলো:
تَجَنُّبُ إِيْقَاعِ الطَّلَاقِ مَا وَجَدَ عَنْهُ مَنْدُوحَةً
“যতক্ষণ পর্যন্ত বিকল্প পথ খোলা থাকে, ততক্ষণ তালাক এড়িয়ে চলাই উত্তম।” আমাদের সমাজে কিছু মানুষের আচরণ হল, সামান্য মনোমালিন্য বা ঝগড়াঝাঁটি হলে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বসে। কিছু স্ত্রীও তুচ্ছ কারণেই স্বামীর নিকট তালাক চেয়ে বসে। তালাককে তারা খুব সহজ মনে করে। অথচ তালাক বা বিচ্ছেদের বিধানটি মূলত একটি ‘একজিট ডোর’ বা জরুরি নির্গমন পথ। যা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। কারণ—এর দ্বারা সাধারণত উভয়পক্ষই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় সন্তান-সন্ততিগণ। তাই এই প্রবণতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ধৈর্য্য, ক্ষমা ও সহনশীলতার মাধ্যমে সংসার জীবন টিকিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। একান্ত প্রয়োজন না হলে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা উচিত। পরিশেষে বলবো, দাম্পত্য সম্পর্ক একটি ইবাদত। একে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা সওয়াবের কাজ। তালাককে আমাদের জীবনের প্রথম সমাধান নয়, বরং একে সর্বশেষ ‘তেতো ঔষধ’ হিসেবে দেখা উচিত। পরিবারের বন্ধন অটুট রাখার মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং একটি সুন্দর প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment