November 28, 2021

কিয়ামতের দিন আল্লাহর নবীর শাফায়াত লাভের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ আমল

 হাদিসের আলোকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নবীর শাফয়াত লাভের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হল:

◈ ১) একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর ইবাদত করা ও তাওহিদ বাস্তবায়ন করা:

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
« أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ »
”কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত লাভে সেই ব্যক্তি সৌভাগ্য মণ্ডিত হবে, যে আন্তরিকভাবে বলবে: `লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তথা আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই।”(সহীহ বুখারী, অনুচ্ছেদ,হাদীসের প্রতি আগ্রহ,হাদীস নং ৯৯,শামেলা)

◈ ২) কুরআন পাঠ করা:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
“তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা,কুরআন কিয়ামতের দিন তার পাঠকদের জন্য সুপারিশ কারী হবে।” (সহীহ মুসলিম)

◈ ৩) রোযা রাখা:

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই হওয়া সাল্লাম বলেছেন:
« الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَىْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِى فِيهِ. وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِى فِيهِ. قَالَ فَيُشَفَّعَانِ
”রোযা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, হে প্রভু, আমি তাকে দিনের বেলায় খাদ্য ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে বাধা দিয়েছিলাম। অত:এব আপনি তার ব্যাপারে আমার শাফায়ত কবুল করুন। আর কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুম থেকে বাধা দিয়েছিলাম। অতএব,তার ব্যাপারে আমার শাফায়ত কবুল করুন। অত:পর তাদের শাফায়াত কবুল করা হবে।” (মুসনাদ আহমদ, মুসনাদ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর হাদীস নং ৬৭৮৫, শামেলা, সনদ সহীহ)

◈ ৪) আযানের দুয়া পাঠ করা:

আলী ইবনু আইয়াশ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আজান শোনার পর এ দোয়া পড়বে:
«اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلاَةِ الْقَائِمَةِ،آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِى وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
“হে আল্লাহ,এ পরিপূর্ণ আহবান এবং প্রতিষ্ঠিত সালাত এর প্রতিপালক, মুহাম্মদ কে ওসিলা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান কর। প্রতিষ্ঠিত কর তাকে মাকামে মাহমুদে, যার ওয়াদা তাঁকে তুমি দিয়েছ।”
কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত অনিবার্য হয়ে যাবে।
এ হাদিসটি হামযা ইবনু আবদুল্লাহ তার পিতা থেকে,তিনি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন) (সহীহ বুখারি (ইফা),অধ্যায়: ৫২/ তাফসীর, হাদীস নাম্বার: 4360)

◈ ৫) মদীনা মুনাওয়ারার কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা ও সেখানে মৃত্যু বরণ করা:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِى سَعِيدٍ مَوْلَى الْمَهْرِىِّ أَنَّهُ جَاءَ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِىَّ لَيَالِىَ الْحَرَّةِ فَاسْتَشَارَهُ فِى الْجَلاَءِ مِنَ الْمَدِينَةِ وَشَكَا إِلَيْهِ أَسْعَارَهَا وَكَثْرَةَ عِيَالِهِ وَأَخْبَرَهُ أَنْ لاَ صَبْرَ لَهُ عَلَى جَهْدِ الْمَدِينَةِ وَلأْوَائِهَا. فَقَالَ لَهُ وَيْحَكَ لاَ آمُرُكَ بِذَلِكَ إِنِّى سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « لاَ يَصْبِرُ أَحَدٌ عَلَى لأْوَائِهَا فَيَمُوتَ إِلاَّ كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا أَوْ شَهِيدًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا كَانَ مُسْلِمًا ».
ঐতিহাসিক হাররার ঘটনার সময় আবু সাঈদ মাওলা আল মাহরী আবু সাঈদ খুদরীর রা. এর নিকট এসে মদীনা থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ চাইলেন। তিনি অভিযোগ করলেন, মদীনার আসবাব-পত্র ও পণ্যের দাম বেশি এবং তার সন্তান-সন্ততির সংখ্যাও প্রচুর। এও বললেন, মদীনার এই দু:খ ও কষ্টে ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই। আবু সাঈদ খুদরী তাকে বললেন,আফসোস! তোমাকে এ পরামর্শ দিতে পারি না। কারণ, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি:
“যে ব্যক্তি মদীনার দু:খ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে এবং সেখানেই মৃত্যু বরণ করে কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য শুপারিশকারী বা সাক্ষী হব যদি সে মুসলিম হয়।”
(সহীহ মুসলিম,অনুচ্ছেদ: মদীনায় বসবাস করা ও সেখানকার দু:খ কষ্টে ধৈর্য ধারণ করার ব্যাপারে উৎসাহ দান,হাদীস নং ৩৪০৫,শামেলা)

◈ ৬) অধিক পরিমাণে সেজদা দেয়া তথা নফল সালাত আদায় করা:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِمَّا يَقُولُ لِلْخَادِمِ : أَلَكَ حَاجَةٌ ؟ قَالَ : حَتَّى كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، حَاجَتِي قَالَ : وَمَا حَاجَتُكَ ؟ قَالَ : حَاجَتِي أَنْ تَشْفَعَ لِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، قَالَ : وَمَنْ دَلَّكَ عَلَى هَذَا ؟ قَالَ : رَبِّي قَالَ : إِمَّا لاَ ، فَأَعِنِّي بِكَثْرَةِ السُّجُودِ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খাদেমকে লক্ষ্য করে যে সব কথা বলতেন সেগুলোর মধ্যে একটি কথা হল, “তোমার কি কোন দরকার আছে?”
একদিন তিনি তার খাদেমকে এ কথাটি বললে-
খাদেম: হে আল্লাহর রাসূল,আমার একটি জিনিস দরকার।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: “তোমার কী জিনিস দরকার?”
খাদেম: আপনি কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: “কে তোমাকে এ বিষয়টির সন্ধান দিলো?”
খাদেম: আমার প্রতিপালক।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: “এটাই যদি তোমার চাওয়া হয় তবে অধিক পরিমাণ সেজদা করা তথা বেশি বেশি নফল সালাত আদায়ের মাধ্যমে আমাকে (এ ব্যাপারে) সাহায্য করো।” (মুসনাদ আহমদ,হাদীস নং ১৬৫০২,শামেলা)

এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদীস:
عَنْ رَبِيعَةَ بْنِ كَعْبٍ الْأَسْلَمِيِّ -رضي الله عنه- قَالَ: كُنْتُ أَبِيتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- فَأَتَيْتُهُ بِوَضُوئِهِ وَحَاجَتِهِ فَقَالَ لِي: (سَلْ) فَقُلْتُ: أَسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ فِي الْجَنَّةِ، قَالَ: (أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ؟) قُلْتُ: هُوَ ذَاكَ، قَالَ: (فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ)
রাবীয়া বিন কা’ব আসলামী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (খেদমতের উদ্দেশ্যে) তাঁর সাথেই রাতে থাকতাম। (একদিন) আমি তার জন্য ওযুর পানি ও তার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে তার নিকট হাজির হলে তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন: চাও।
আমি: আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: এটা ছাড়া অন্য কিছু?
আমি: এটাই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: “তোমার এ বিষয়ে আমাকে সাহায্য করো অধিক পরিমাণে সেজদা করার মাধ্যমে অর্থাৎ বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করার মাধ্যমে।
(সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ: সেজদা করার মর্যাদা ও তাতে উদ্বুদ্ধ করণ, হাদীস নং ১১২২)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কিয়ামতের দিন প্রিয় নবীর শাফাআত লাভে ধন্য করুন। আমিন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

আশুরার শোক উদযাপন বিদআত কেন?

 মুহররম মাসের দশ তারিখ আশুরার দিন হিসেবে পরিচিত। ৬১ হিজরির ১০ মুহররম তারিখে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হুসাইন রা. কে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা অনেক উন্নীত করেছেন। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা. এর ব্যাপারে এ শুভ সংবাদ প্রদান করে গেছেন যে, তারা হবেন জান্নাতের যুবকদের নেতা।

আর এ কথা চির সত্য, যে যত বড় মর্যাদা লাভ করে তাকে তত বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল, মানব জাতির মধ্যে কে সব চেয়ে বেশি পরীক্ষা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি বললেন, নবীগণ, তারপর আল্লাহর নেককার বান্দাগণ।
তারপর অন্যদের মধ্যে যারা যে পরিমাণ ঈমান ও পরহেযগারিতার অধিকারী তারা সে পরিমাণ পরীক্ষা সম্মুখীন হয়েছেন। মানুষ তার দীনদারি অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। কেউ যদি মজবুত দ্বীনের অধিকারী হয় তবে সে বেশি পরিমাণ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আর কারো দ্বীনদারিতে কমতি থাকলে তার বিপদাপদ কম আসে এবং পরীক্ষাও কম হয়। মুমিন বান্দা যতদিন পৃথিবীতে চলা ফেরা করে ততদিন তার উপর বিপদাপদ পতিত হতে থাকে এবং এভাবে তার আর কোন গুনাহ বাকী থাকে না।” (মুসনাদ আহমদ ও তিরমিযী, সনদ হাসান)

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের এই মর্যাদা পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতই বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছেন। ইসলামের মর্যাদা নিয়েই তারা দুনিয়াতে আগমন করেছেন এবং ইসলাম প্রদত্ত মর্যাদা সহকারে তারা প্রতিপালিত হয়েছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংস্পর্শ, স্নেহ-মমতা, আদর ও ভালবাসা পেয়ে তাদের জীবন সৌভাগ্য মণ্ডিত হয়েছে। যার কারণে মুসলমানগণ তাদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন।
রাসূল যখন ইহজগৎ ত্যাগ করেন তখন তাঁরা ভাল-মন্দ বুঝার বয়সে উপনীত হন নি।

আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন নিয়ামত দিয়েছেন যার মাধ্যমে তারা তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে গিয়ে মিলিত হতে পারে। কারণ, তাদের চেয়ে যিনি বেশি মর্যাদার অধিকারী তথা তাদের পিতা আলী রা. ও শহীদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন।

হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনায় জনমানুষের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদের বিস্তার ঘটে। যেমন উসমান রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনা বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। যার কারণে আজ পর্যন্ত মুসলিম জাতি বিভক্ত।

❖ হুসাইন রা. এর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড:

খারেজী সম্প্রদায়ের আব্দুর রহমান বিন মুলজিম আলী রা. কে হত্যা করার পর সাহাবীদের একাংশ হাসান রা. এর হাতে বাইআত নিলেন। তার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমার এই ছেলে মুসলমানদের দুটি বড় বড় বিবদমান দলের মধ্যে সমাধান করবেন।” তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। এর মাধ্যমে মুয়াবিয়া এবং হাসান রা. এর সমর্থক দু দলের মধ্যে সমাধান হল। অতঃপর তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করলেন। এরপর বেশ কিছু মানুষ হুসাইন রা. এর নিকট চিঠির পর চিঠি লেখা শুরু করল। তারা বলল, যদি হুসাইন রা. ক্ষমতা গ্রহণ করেন তবে তাঁকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করবে। অথচ তারা এ কাজের যোগ্য ছিল না।

অতঃপর হুসাইন রা. যখন তাদের নিকট তার চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকীল ইব্‌ন আবু তালিবকে পাঠালেন তখন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তার দুশমনকে তাকে প্রতিহত করতে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করল।
এদিকে বিচক্ষণ সাহাবীগণ এবং হুসাইন রা. হিতাকাংখীগণ যেমন ইবনে আব্বাস, ইব্‌ন উমর প্রমুখ তারা সবাই হুসাইন রা. কে ঐ সকল লোকদের ডাকে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। তারা বললেন: হুসাইন রা. সেখানে যাওয়াতে কোন লাভ নেই। এতে কোন কল্যাণ বয়ে আসবে না। পরে ঘটনা যা ঘটার তাই ঘটল। আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হল।

হুসাইন রা. বিজ্ঞ সাহাবীগণের পরামর্শ উপেক্ষা করে যখন বের হলেন তখন দেখলেন, অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি তাদের নিকট আবেদন করলেন, তাকে ছেড়ে দেয়া হোক তিনি যেন তিনি ফিরে যেতে পারেন অথবা কোন সীমান্ত প্রহরায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন। অথবা তাকে যেন তার চাচাত ভাই ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাত করতে দেয়া হয়। কিন্তু তারা তার কোন প্রস্তাব গ্রহণ করল না। বরং তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে যুদ্ধ করতে বাধ্য করল। তিনি এবং তার সঙ্গীগণ যুদ্ধ করে পরিশেষে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।

এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করলেন এবং তাঁর অন্যান্য পূত-পবিত্র পরিবার বর্গের সাথে মিলিত করলেন এবং তাঁর উপর যারা এহেন নিষ্ঠুর আচরণ করল তাদেরকে লাঞ্ছিত করলেন।

ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড জনমানুষের মধ্যে অত্যন্ত খারাপ প্রভাব ফেলল। মানুষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এ নিয়ে অনেক মানুষ মুনাফেকি, মূর্খতা এবং গোমরাহির মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। একদল মানুষ এই আশুরার দিন কে মাতম, আহাজারি, কান্নাকাটি এবং শোক দিবস হিসেবে গ্রহণ করল। তারা সেদিন জাহেলি জামানার বিভিন্ন আচরণ প্রদর্শনী শুরু করল। তারা সে দিন, শোক র‍্যালী, কালো পতাকা মিছিল, নিজের শরীরে চাবুক তলোয়ার ইত্যাদি ধারাল অস্ত্র দ্বারা দিয়ে জখম, নিজেদের গালে আঘাত, শরীরের কাপড় ছেড়া, জামার পকেট ছেড়া, চুল ছেড়া ইত্যাদি বিভিন্ন জাহেলী প্রথা অনুযায়ী শোক দিবস পালন করে থাকে। যা আজ পর্যন্ত পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর আশুরার দিন তারা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ বিপরীত এহেন কার্যকলাপ করে থাকে। তারা মনে করে এ সব কাজ করার মাধ্যমে তারা হুসাইন রা. এর আহলে বাইত তথা পরিবার বর্গের প্রতি ভালবাসা এবং সমবেদনা প্রকাশ করে!!

❖ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেনঃ

“হুসাইন রা. এর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শয়তান মানুষের মধ্যে দুটি বিদআত আবিষ্কার করল। একটি হল, আশুরার দিন শোক ও কান্নাকাটি করার বিদআত। যে দিন শরীরে আঘাত করা, চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, পিপাষার্ত থাকা, মর্সিয়া পালন ইত্যাদি কার্যক্রম করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয় বরং এ দিন পূর্ব পুরুষদেরকে গালাগালি করা হয়, তাদের উপর অভিশাপ দেয়া হয় এবং এমন সব লোকদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় যারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধী নয় এবং হুসাইন রা. এর মৃত্যু সংক্রান্ত এমন সব কাহিনী বয়ান করা হয় যেগুলো অধিকাংশই মিথ্যা এবং বানোয়াট।

যারা এসবের সূচনা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফেতনা-ফ্যাসাদের দরজা উন্মুক্ত করা এবং মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা। এসব কাজ তো মুসলমানদের ঐকমত্যে ওয়াজিব নয় মুসতাহাবও নয় বরং এতে শুধু অতীতের বিপদাপদকে কেন্দ্র করে ধৈর্য হীনতা এবং কান্নাকাটি নতুন করে করা হয়। অথচ তা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল কর্তৃক শক্তভাবে নিষিদ্ধ জিনিস।”

ধৈর্য হীনতা প্রকাশ করা বা চিৎকার-কান্নাকাটি করা ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী। বিপদে-মসিবতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ হল, ধৈর্যের পরিচয় দেয়া, ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্নালিল্লাইহি রাজিঊন পাঠ করার পাশাপাশি আত্ম সমালোচনা করা। যেমন:
▪আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَبَشِّرِالصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّـهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ولَـٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“আর ধৈর্য ধারণকারীদেরকে শুভ সংবাদ দাও। যারা বিপদ এলে বলে: “ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্নালিল্লাইহি রাজিঊন। এদের উপরই আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও করুণা বর্ষিত হয় এবং এরাই সুপথে প্রতিষ্ঠিত।” (সূরা বাকারা: ১৫৫)

▪সহীহ বুখারীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
لَيْسَ مِنّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعا بِدَعْوى الْجاهِلِيَّةِ
যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে, পকেট ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মত আহবান করে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (মজমু ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ২৫/৩০২, ৩০৭)

▪নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
أَنا بَرِيءٌ مِمَّنْ بَرئَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَرِئَ مِنَ الصَّالِقَةِ وَالْحالِقَةِ وَالشَّاقَّةِ
“যে মহিলা (বিপদ-মুসিবতে) চিৎকার করে, মাথা মুণ্ডন করে, কাপড় ছিঁড়ে তার থেকে আমি সম্পর্ক মুক্ত।” (সহীহ মুসলিম)

▪নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:
النَّائِحَةُ إذا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِها، تُقامُ يَومَ القِيامَةِ وعليها سِرْبالٌ مِن قَطِرانٍ، ودِرْعٌ مِن جَرَبٍ
“বিলাপকারীনী মহিলা যদি তওবা করার আগে মৃত্যু বরণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন আলকাতরা মাখানো পায়জামা আর ঘা বিশিষ্ট বর্ম পরিহিত অবস্থায় উঠবে।” (সহীহ মুসলিম, জানাইয অধ্যায়)

▪সহীহ বুখারীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما مِن عبدٍ تُصيبُه مُصيبةٌ، فيقولُ: إنَّا لله وإنَّا إليه راجعونَ، اللهُمَّ أْجُرْني في مُصِيبتِي، وأَخْلِفْ لي خيرًا منها، إلَّا أَجَرَه اللهُ في مُصِيبته، وأَخْلَفَ له خيرًا منها
“যে আল্লাহর বান্দা বিপদে আপতিত হলে বলে: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাইহি রাজিঊন, “আল্লাহুম্মা আজিরনী ফী মুসীবাতী ওয়াখলুফ লাহু খাইরান মিনহা” অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং এর থেকে উত্তম বিকল্প দান কর।”

তাকে আল্লাহ তাকে তার বিপদে উত্তম প্রতিদান দিবেন এবং তারচেয়ে ভালো বিকল্প ব্যবস্থা করবেন।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয)

▪ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
أَرْبَعٌ في أُمَّتي مِن أمْرِ الجاهِلِيَّةِ، لا يَتْرُكُونَهُنَّ: الفَخْرُ في الأحْسابِ، والطَّعْنُ في الأنْسابِ، والاسْتِسْقاءُ بالنُّجُومِ، والنِّياحَةُ
“আমার উম্মতের মধ্যে চারটি জিনিস জাহেলিয়াতের কাজ যেগুলো তারা ছাড়বে না। বংশ আভিজাত্য দিয়ে গর্ব করা, অন্যের বংশকে দোষারোপ করা, তারকার সাহায্যে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং মানুষের মৃত্যুতে বিলাপ করা। (সহীহ মুসলিম, বিতাবুল জানাইয)

সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনায় অন্য মুমিনদের প্রতি জুলুম করে, তাদেরকে গালাগালি করে বা তাদের উপর অভিশাপ দেয় এবং দ্বীনের দুশমন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কাজে সাহায্য করা সহ অসংখ্য অন্যায় কাজে জড়িত হয় তাদের পরিণতি কী হতে পারে?

শয়তান গোমরাহ লোকদের জন্যে আশুরার দিনকে শোক ও মাতম প্রকাশের দিন হিসেবে সুসজ্জিত ভাবে তুলে ধরেছে। যার কারণে এ সব লোক আশুরা আসলে কান্নাকাটি, দুঃখের কাওয়ালী গাওয়া, বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু করে দেয়। এতে কি কিছু লাভ হয়? যা হয় তা হল, মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ এবং গোঁড়ামির বিষ বাষ্প ছড়ানো, মুসলমানদের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদ জাগ্রত করা এবং অতীত মানুষদের গালাগালি করা। এভাবে দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য ফেতনা ছড়ানো হয় এবং মিথ্যার পরিচর্যা করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে এত ফেতনা-ফ্যাসাদ, দ্বীনের নামে মিথ্যাচার এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে এ শিয়া সম্প্রদায়টির চেয়ে অগ্রগণ্য আর কোন মানুষ দেখা য়ায় নি। (সমাপ্ত)

উৎস: শাইখ আব্দুল আযীয বিন আহমদ আত তুওয়াইজিরী কর্তৃক রচিত
‘আল বিদা আল হাওলিয়া’ (মাস্টার্স এর থিসিস)।
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

হুসাইন রা. এর শাহাদাত এবং আশুরার শোক পালন প্রসঙ্গে এক ঝলক

 ▐ ▌ মুহাররম মাসের দশ তারিখ আশুরার দিন হিসেবে পরিচিত। ৬১ হিজরির ১০ মুহররম তারিখে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হুসাইন রা. কে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা অনেক উন্নীত করেছেন। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা. এর ব্যাপারে এ শুভ সংবাদ প্রদান করে গেছেন যে, তারা হবেন জান্নাতের যুবকদের নেতা। আর এ কথা চির সত্য, যে যত বড় মর্যাদা লাভ করে তাকে তত বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।

عَنْ سَعْد بن أبي وقاص رضي الله عنه قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ , أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلاءً ؟ قَالَ : الأَنْبِيَاءُ , ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ , فَيُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ , فَإِنْ كَانَ دِينُهُ صُلْبًا اشْتَدَّ بَلاؤُهُ , وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَّةٌ ابْتُلِيَ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ , فَمَا يَبْرَحُ الْبَلاءُ بِالْعَبْدِ حَتَّى يَتْرُكَهُ يَمْشِي عَلَى الأَرْضِ مَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ . صححه الألباني في السلسلة الصحيحة (143) .
সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, মানব জাতির মধ্যে কে সব চেয়ে বেশি পরীক্ষা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন?
তিনি বললেন, নবীগণ, তারপর আল্লাহর নেককার বান্দাগণ। তারপর অন্যদের মধ্যে যারা যে পরিমাণ ঈমান ও পরহেযগারিতার অধিকারী তারা সে পরিমাণ পরীক্ষা সম্মুখীন হয়েছেন। মানুষ তার দীনদারী অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। কেউ যদি মজবুত দ্বীনের অধিকারী হয় তবে সে বেশি পরিমাণ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আর কারো দ্বীনদারীতে কমতি থাকলে তার বিপদাপদ কম আসে এবং পরীক্ষাও কম হয়। মুমিন বান্দা যতদিন পৃথিবীতে চলা ফেরা করে ততদিন তার উপর বিপদাপদ পতিত হতে থাকে এবং এভাবে তার আর কোন গুনাহ বাকী থাকে না।” (মুসনাদ আহমদ ও তিরমিযী হা/২৩৯৮, হাসান। সিলসিলা সহিহা, হা/১৪৩)

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের এই মর্যাদা পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতই বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছেন। ইসলামের মর্যাদা নিয়েই তারা দুনিয়াতে আগমন করেছেন এবং ইসলাম প্রদত্ত মর্যাদা সহকারে তারা প্রতিপালিত হয়েছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংস্পর্শ, স্নেহ-মমতা, আদর ও ভালবাসা পেয়ে তাদের জীবন সৌভাগ্য মণ্ডিত হয়েছে। যার কারণে মুসলমানগণ তাদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন।
রাসূল যখন ইহজগৎ ত্যাগ করেন তখন তাঁরা ভাল-মন্দ বুঝার বয়সে উপনীত হননি।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন নিয়ামত দিয়েছেন যার মাধ্যমে তারা তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে গিয়ে মিলিত হতে পারে। কারণ, তাদের চেয়ে যিনি বেশি মর্যাদার অধিকারী তথা তাদের পিতা আলী রা. ও শহীদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন।
হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনায় জনমানুষের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদের বিস্তার ঘটে। যেমন উসমান রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনা বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। যার কারণে আজ পর্যন্ত মুসলিম জাতি বিভক্ত।
▐ ▌
খারেজী সম্প্রদায়ের আব্দুর রহমান বিন মুলজিম আলী রা. কে হত্যা করার পর সাহাবীদের একাংশ হাসান রা. এর হাতে বাইআত নিলেন। তার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমার এই ছেলে মুসলমানদের দুটি বড় বড় বিবদমান দলের মধ্যে সমাধান করবেন।” তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। এর মাধ্যমে মুয়াবিয়া রা. এবং হাসান রা. এর সমর্থক দু দলের মধ্যে সমাধান হল। অতঃপর তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করলেন। এরপর বেশ কিছু মানুষ হুসাইন রা. এর নিকট চিঠির পর চিঠি লেখা শুরু করল। তারা বলল, যদি হুসাইন রা. ক্ষমতা গ্রহণ করেন তবে তাঁকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করবে। অথচ তারা এ কাজের যোগ্য ছিল না।
▐ ▌
অতঃপর হুসাইন রা. যখন তাদের নিকট তার চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকীল ইবনে আবু তালিবকে পাঠালেন তখন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তার দুশমনকে তাকে প্রতিহত করতে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করল।
এদিকে বিচক্ষণ সাহাবীগণ এবং হুসাইন রা. এর হিতাকাঙ্খী যেমন ইবনে আব্বাস রা., ইবনে উমর রা. প্রমুখ তারা সবাই হুসাইন রা. কে ঐ সকল লোকদের ডাকে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। তারা বললেন: হুসাইন রা. সেখানে যাওয়াতে কোন লাভ নেই। এতে কোন কল্যাণ বয়ে আসবে না। পরে ঘটনা যা ঘটার তাই ঘটল। আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হল।
▐ ▌
হুসাইন রা. বিজ্ঞ সাহাবীগণের পরামর্শ উপেক্ষা করে যখন বের হলেন তখন দেখলেন, অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি তাদের নিকট আবেদন করলেন, তাকে ছেড়ে দেয়া হোক তিনি যেন তিনি ফিরে যেতে পারেন অথবা কোন সীমান্ত প্রহরায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন। অথবা তাকে যেন তার চাচাত ভাই ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাত করতে দেয়া হয়। কিন্তু তারা তার কোন প্রস্তাব গ্রহণ করল না। বরং তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে যুদ্ধ করতে বাধ্য করল। তিনি এবং তার সঙ্গীগণ যুদ্ধ করে পরিশেষে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।
এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করলেন এবং তাঁর অন্যান্য পূত-পবিত্র পরিবার বর্গের সাথে মিলিত করলেন এবং তাঁর উপর যারা এহেন নিষ্ঠুর আচরণ করল তাদেরকে লাঞ্ছিত করলেন।
ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড জনমানুষের মধ্যে অত্যন্ত খারাপ প্রভাব ফেলল। মানুষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এ নিয়ে অনেক মানুষ মুনাফেফী, মূর্খতা এবং গোমরাহির মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। একদল মানুষ এই আশুরার দিন কে মাতম, আহাজারি, কান্নাকাটি এবং শোক দিবস হিসেবে গ্রহণ করল। তারা সেদিন জাহেলী যামানার বিভিন্ন আচরণ প্রদর্শনী শুরু করল। তারা সে দিন, শোক র‍্যালি, কালো পতাকা মিছিল, নিজের শরীরে চাবুক, তলোয়ার ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র দ্বারা দিয়ে জখম, নিজেদের গালে আঘাত, শরীরের কাপড় ছেড়া, জামার পকেট ছেড়া, চুল ছেড়া ইত্যাদি বিভিন্ন জাহেলী প্রথা অনুযায়ী শোক দিবস পালন করে থাকে। যা আজ পর্যন্ত পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর আশুরার দিন তারা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ বিপরীত এহেন কার্যকলাপ করে থাকে। তারা মনে করে এ সব কাজ করার মাধ্যমে তারা হুসাইন রা. এর আহলে বাইত তথা পরিবার বর্গের প্রতি ভালবাসা এবং সমবেদনা প্রকাশ করে!!
▐ ▌
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন:
হুসাইন রা. এর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শয়তান মানুষের মধ্যে দুটি বিদআত আবিষ্কার করল। একটি হল, আশুরার দিন শোক ও কান্নাকাটি করার বিদআত। যে দিন শরীরে আঘাত করা, চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, পিপাষার্ত থাকা, মর্সিয়া পালন ইত্যাদি কার্যক্রম করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয় বরং এ দিন পূর্বপুরুষদেরকে গালাগালি করা হয়, তাদের উপর অভিশাপ দেয়া হয় এবং এমন সব লোকদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় যারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধী নয় এবং হুসাইন রা. এর মৃত্যু সংক্রান্ত এমন সব কাহিনী বয়ান করা হয় যেগুলো অধিকাংশই মিথ্যা এবং বানোয়াট।
যারা এসবের সূচনা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফেতনা-ফ্যাসাদের দরজা উন্মুক্ত করা এবং মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা। এসব কাজ তো মুসলামানদের ঐকমত্যে ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাবও নয় বরং এতে শুধু অতীতের বিপদাপদকে কেন্দ্র করে ধৈর্যহীনতা এবং কান্নাকাটি নতুন করে করা হয়। অথচ তা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল কর্তৃক শক্তভাবে নিষিদ্ধ জিনিস।”
ধৈর্য হীনতা প্রকাশ করা বা চিৎকার-কান্নাকাটি করা ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী। বিপদে-মসিবতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ হল, ধৈর্যের পরিচয় দেয়া, ‘ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন’ পাঠ করার পাশাপাশি আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশা করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: “…আর ধৈর্য ধারণকারীদেরকে শুভ সংবাদ দাও। যারা বিপদ এলে বলে: “ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্নালিল্লাইহি রাজিঊন। এদের উপরই আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও করুণা বর্ষিত হয় এবং এরাই সুপথে প্রতিষ্ঠিত।” (সূরা বাকারা: ১৫৫)
সহীহ বুখারীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে, পকেট ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মত আহবান করে আমাদের দলভূক্ত নয়।” (মজমু ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ২৫/৩০২, ৩০৭)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে মহিলা (বিপদ-মুসিবতে) চিৎকার করে, মাথা মুণ্ডন করে, কাপড় ছিঁড়ে তার থেকে আমি সম্পর্ক মুক্ত।” (সহীহ মুসলিম)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন: বিলাপকারীনী মহিলা যদি তওবা করার আগে মৃত্যু বরণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন আলকাতরা মাখানো পায়জামা আর ঘা বিশিষ্ট বর্ম পরিহিত অবস্থায় উঠবে।” (সহীহ মুসলিম, জানাইয অধ্যায়)
সহীহ বুখারীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: যে মুসলিম বিপদ আপতিত হলে বলে: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাইহি রাজিঊন, আল্লাহুম্মা আজিরনী ফী মুসীবাতী ওয়াখলুফ লাহু খাইরান মিনহা। অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং এর থেকে উত্তম বিকল্প দান কর।” তাকে আল্লাহ তাকে তার বিপদে উত্তম প্রতিদান দিবেন এবং তদাপেক্ষা ভালো বিকল্প ব্যবস্থা করবেন।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমার উম্মতের মধ্যে চারটি জিনিস জাহেলিয়াতের কাজ যেগুলো তারা ছাড়বে না। বংশ আভিজাত্য দিয়ে গর্ব করা, অন্যের বংশকে দোষারোপ করা, তারকার সাহায্যে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং মানুষের মৃত্যুতে বিলাপ করা। (সহীহ মুসলিম, বিতাবুল জানাইয)
সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি হুসাইন রা. এর নিহত হওয়ার ঘটনায় অন্য মুমিনদের প্রতি জুলুম করে, তাদেরকে গালাগালি করে বা তাদের উপর অভিশাপ দেয় এবং দ্বীনের দুশমন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কাজে সাহায্য করা সহ অসংখ্য অন্যায় কাজে জড়িত হয় তাদের পরিণতি কী হতে পারে?
শয়তান গোমরাহ লোকদের জন্যে আশুরার দিনকে শোক ও মাতম প্রকাশের দিন হিসেবে সুসজ্জিত ভাবে তুলে ধরেছে। যার কারণে এ সব লোক আশুরা আসলে কান্নাকাটি, দুঃখের কাওয়ালী গাওয়া, বানোয়াট কেচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু করে দেয়। এতে কি কিছু লাভ হয়? যা হয় তা হল, মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ এবং গোঁড়ামির বিষবাষ্প ছড়ানো, মুসলামানদের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদ জাগ্রত করা এবং অতীত মানুষদের গালাগালি করা। এভাবে দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য ফেতনা ছড়ানো হয় এবং মিথ্যার পরিচর্চা করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে এত ফেতনা-ফ্যাসাদ, দ্বীনের নামে মিথ্যাচার এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে এ শিয়া সম্প্রদায়দায়টির চেয়ে অগ্রগণ্য আর কোন মানুষ দেখা যায় নি।…
●●●●●●●●●●●●
উৎস: শাইখ আব্দুল আযীয বিন আহমদ আত তুওয়াইজিরী কর্তৃক রচিত
‘আল বিদা আল হাওলিয়া’ (মাস্টার্স এর থিসিস)।
সংক্ষেপায়ন ও অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

পানাহারের শুরুতে, মাঝে ও শেষে পঠিতব্য ১০টি দুআ

 পানাহারের শুরুতে, মাঝে ও শেষে পঠিতব্য ১০টি দুআ

(আরবি টেক্সট, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ সহ)
▬▬▬▬◐◯◑▬▬▬▬▬
দয়াময় আল্লাহ আমাদের জন্য নানা রঙবেরঙের এবং হরেক সাধের খাদ্য ও পানীয় দান করেছেন! প্রতিনিয়ত আমরা সেগুলো গ্রহণ করে জীবন ধারণ করি, সুস্থ থাকি এবং আমাদের রসনা তৃপ্ত করি। এখানেই শেষ নয়, আমরা যে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করি তা আমাদের শরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর এর নির্যাস ও প্রয়োজনীয় উপাদানটুকু থেকে যায় আর বাকি উচ্ছিট অংশটুকু পেশাব ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যায়। এই মেশিনারিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন মহান আল্লাহ। খাবার ভিতরে প্রবেশ করার পর যদি তা বের না হত তাহলে আমরা আমাদের সারা জীবনের সঞ্চিত সব কিছু দিয়ে হলেও তা বের করার জন্য পাগল হয়ে যেতাম। সুবহানাল্লাহ! তাহলে কি এ জন্য সেই মহান স্রষ্টা ও অতি দয়ালু আল্লাহর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ নয়?
এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সর্বনিম্ন উপায় হচ্ছে, খাওয়ার শুরুতে আল্লাহর নাম নেয়া এবং খাবার শেষ তার প্রশংসা করা। কৃতজ্ঞতা আদায় করা সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। তাই আসুন, আমরা এ বিষয়ে হাদিসের আলোক সংক্ষিপ্ত দিকনির্দেশনা জেনে নি।
◈◈ পানাহারের শুরুতে পঠিতব্য দুআ:
পানাহারের শুরুতে আল্লাহর নাম নেয়া তথা ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নত। যেমন: হাদিসে এসেছে, মা আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ طَعَاماً فَلْيَقُلْ بِسْمِ اللَّهِ، فَإِنْ نَسِيَ فِي أَوَّلِهِ فَلْيَقُلْ بسمِ اللَّهِ فِي أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ
“তোমাদের কেউ যখন খাওয়া শুরু করে সে যেন বলে, বিসমিল্লাহ (অর্থ: নামে শুরু করছি) আর যদি, শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে যায় তাহলে সে যেন বলে: “বিসমিল্লাহি ফি আওয়ালিহি ওয়া আখিরিহি” (অর্থ: শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নামে) [সুনানে আবু দাউদ-হিসনুল মুসলিম]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
بسم الله أَوَّلَه وآخرَه
বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু (অর্থ: শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নামে)।
◯ এ ক্ষেত্রে ৩টি সতর্কতা:
● ক. খাবার শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নত;পূরা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ নয়। কারণ এ ব্যাপারে যতগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে সবগুলোতে কেবল এতটুকুই এসেছে। তাই হাদিসের বাইরে এর অতিরিক্ত পাঠ না করাই ভালো।
● খ. আমাদের দেশে নিম্নোক্ত দুআটি খাওয়ার শুরুতে আওয়াজের সাথে পড়ার কথা বলা হয় বা কোন কোন দুআ শিক্ষার বইয়েও লেখা আছে:
بسم آلله وعلى بركة آلله
“বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারাকাতিল্লাহ।” (আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর বরকতের উপর খাওয়া শুরু করলাম)। এই দুআর মধ্যে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠের কথা বিভিন্ন সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু ২য় অংশ (আলা বারাকাতিল্লাহ) কোন হাদিসে আসে নি। সুতরাং খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ এর সাথে অতিরিক্ত এ শব্দটুকু যুক্ত করা বিদআত।
● গ. কোন কোন দুআ শিক্ষার বইয়ে খাবার সামনে এলে নিম্নোক্ত দুআটি পড়ার কথা বলা হয়:
اللهم بارك لنا فيما رزقتنا وقنا عذاب النار
“আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফী-মা রাযাক্বতানা ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার” (হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে যে রিজিক দান করেছো তাতে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে) কিন্তু মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে এ হাদিসটি সহিহ নয়। তারা বলেছেন, এর বর্ণনা সূত্রে মুহাম্মদ বিন আবিয যুআইযাআহ (محمد بن أبي الزعيزعة) নামক যে বর্ণনাকারী আছে সে অত্যধিক দুর্বল (ًضعيف جدا)। সুতরাং এ হাদিসটি আমল যোগ্য নয়।
◈◈ পানাহারের মাঝে দুআ:
পানাহারের প্রথমে ও শেষে দুআ পাঠের ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হলেও মাঝখানে বিশেষ কোন দুআ পড়ার কথা হাদিসে আসে নি। তাই খাওয়ার মাঝখানে কোন ধরণের দুআ পড়ার সুন্নত নয়।
◈◈ পানাহার শেষে পঠিতব্য দশটি দুআ:
পানাহার শেষে আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁর প্রশংসা করা সুন্নত এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উপায়। যেমন হাদিসে এসেছে, আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إنَّ اللهَ ليرْضَى عَنِ العبْدِ أنْ يأكلَ الأكلَةَ فيحمَدَه عليها، أو يَشْربَ الشَّرْبَةَ فيحمَدَه عليها»
“নিশ্চয় আল্লাহ ঐ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হন যে ব্যক্তি খাবারের পর আল্লাহর প্রশংসা করে (আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করে)। অনুরূপ পান করার পর আল্লাহর প্রশংসা করে (আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করে)। [সহিহ মুসলিম]
মুহাদ্দিসগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
الأَكْلَةَ، وهِيَ المرَّةُ الواحدَةُ مِنَ الأَكْلِ كالغَداءِ والعَشاءِ،
হাদিসের শব্দ الأَكْلَةَ অর্থ: একবার খাওয়া। যেমন: দুপুর বা রাতের খাবার।
অর্থাৎ সকাল, দুপুর বা রাতের একবার খাওয়া শেষ করার পর আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করাই যথেষ্ট। প্রতি লোকমা খাওয়ার পর অথবা প্রতিবার পানি পান করার পর আল হামদুলিল্লাহ বলতে হবে (যেমন: কিছু মানুষ করে থাকে) হাদিসের তা উদ্দেশ্য নয়।
যাহোক, নিম্নে পানাহার শেষ করার পর পঠিতব্য দশটি দুআ (আরবি টেক্সট, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ সহ) উপস্থাপন করা হল:
❖ ১) খাওয়ার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করার সুন্নত। এর সর্বনিম্ন স্তর হল, আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) বলা। পূর্বোক্ত হাদিসটির আলোকে মুহাদ্দিসগণ এ কথা বলেছেন।
❖ ২) মুআয ইবনে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« مَنْ أكَلَ طَعَامَاً، فَقَالَ: الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أطْعَمَنِي هَذَا، وَرَزَقنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
رواه أَبُو داود والترمذي، وقال: «حديث حسن »
“যে ব্যক্তি আহার শেষে এই দোয়া পড়বে:
الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أطْعَمَنِي هَذَا، وَرَزَقنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী আত্ব্আমানী হা-যা অরাযাক্বানীহি মিন গাইরি হাওলিম মিন্নী অলা ক্বুউওয়াহ।
অর্থ: সেই আল্লাহর যাবতীয় প্রশংসা যিনি আমাকে এ খাওয়ালেন এবং জীবিকা দান করলেন, আমার কোন চেষ্টা ও সামর্থ্য ছাড়াই) সে ব্যক্তির পূর্বের সমস্ত (ছোট) পাপ মোচন করে দেওয়া হবে।’’ [আবু দাউদ ৪২০৩, দারেমি ২৬৯০, শাইখ আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছে]
❖ ৩) আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাওয়া শেষে যখন তার সামনে থেকে খাবারের খাঞ্চা তুলে নেওয়া হত তখন তিনি বলতেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِىْ كَفَانَا وَأَرْوَانَا، غَيْرَ مَكْفِىٍّ، وَلاَ مَكْفُوْرٍ
উচ্চারণ: আল হামদুলিল্লা হিল্লাযী কাফানা ওয়া আরওয়ানা, গাইরা মাকফিয়্যিন ও লা মাকফূর।”
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে যথেষ্ট খাইয়েছেন, আমাদেরকে পরিতৃপ্ত করেছেন, না এর থেকে বেশী প্রয়োজন আছে, না অকৃতজ্ঞতার কোন কারণ আছে।” (সহিহ বুখারি হা/৫৪৫৯)
❖ ৪) খাওয়া শেষ তিনি কখনো বলতেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّنَا، غَيْرَ مَكْفِىٍّ، وَلاَ مُوَدَّعٍ، وَلاَ مُسْتَغْنًى رَبَّنَا
উচ্চারণ: আল হামদুলিহি রাব্বিনা, গাইরা মাকফিয়্যিন ওয়ালা মুওয়াদ্দিয়িন ওয়ালা মুসতাগনান রাব্বানা।
“সকল প্রশংসা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। এর থেকে না বেশী প্রয়োজন, না এ (খাদ্য-পানীয়) পরিত্যাগ যোগ্য, না এর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা যায়- হে আমাদের রব।”
(সহিহ বুখারি হা/৫৪৫৯)
❖ ৫) আবু উমামা রা. কর্তৃক বর্ণিত উক্ত হাদিসটি (৪ নং দুআ) সহিহ বুখারিতে এভাবেও বর্ণিত হয়েছে,
الْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ غَيْرَ مَكْفِيٍّ وَلَا مُوَدَّعٍ وَلَا مُسْتَغْنًى عَنْهُ رَبَّنَا
উচ্চারণ: “আল হামদুলিল্লাহি কাসীরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফীহী গাইরা মাকফিয়্যিন ওয়ালা মুওয়াদ্দিয়িন ওয়ালা মুসতাগনান আনহু রাব্বানা।”
“আল্লাহর জন্য অনেক পবিত্র ও বরকতময় সকল প্রশংসা….।” (বুখারি, হা/৫৪৫৮)
❖ ৬) আবু আইয়ুব আল আনসারি (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কিছু খেতেন বা পান করতেন, তখন এ দুআ পড়তেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَ وَسَقَى ، وَسَوَّغَهُ ، وَجَعَلَ لَهُ مَخْرَجًا
‘‘আলহামদুলিল্লা-হিল্লাযী আত্ব‘আমা ওয়াসাকা- ওয়াসাও্ ওয়াগাহূ ওয়াজা‘আলা লাহূ মাখরাজা-’’ (সমস্ত প্রশংসা সে আল্লাহর জন্য যিনি খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন, অতি সহজে তা উদরস্থ করিয়েছেন এবং [মলদ্বার দিয়ে অপ্রয়োজনীয় অংশ] বের হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। (সুনান আবু দাউদ, শাইখ আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন, সিলসিলা সহিহা, হা/২০৬১।
❖ ৭) ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إذا أكل أحدُكم طعامًا فلْيَقُل: اللهمَّ بارِكْ لنا فيه وأطعِمْنا خيرًا منه، وإذا سُقِيَ لبنًا فلْيَقُل: اللهمَّ بارك لنا فيه وزِدْنا منه،
“তোমাদের কেউ খাবার খেলে সে যেন এ দু‘আ পড়ে:
اللهمَّ بارِكْ لنا فيه وأطعِمْنا خيرًا منه
“আল্ল-হুম্মা, বারিক লানা ফীহি, ওয়া আত্ব’য়িমনা খাইরান মিনহু”
অর্থ: “হে আল্লাহ, এতে আমাদের জন্য বরকত দান কর এবং আমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম খাবার দাও।”
আর যাকে আল্লাহ দুধ পান করান সে যেন এ দুআ পড়ে:
اللّهُمَّ بَاركْ لنَا فيهِ وَزِدْنَا مِنهُ
“আল্ল-হুম্মা বারিক লানা ফীহি ওয়া যিদনা মিনহু”
অর্থ: “হে আল্লাহ, এতে আমাদের জন্য বরকত দাও এবং তা আরও বেশি করে দাও।”(সহিহ আবু দাউদ, হা/৩৭৩০)
❖ ৮) “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট খাবার পেশ করা হলে তিনি বলতেন, বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে) আর খাওয়া শেষ করে বলতেন,
اللهمَّ إنك أطعمتَ و سقيتَ ، و أغنَيتَ و أقنَيْتَ ، هدَيتَ و اجتبَيت ، اللهم فلك الحمدُ على ما أعطيتَ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আত্ব’আমতা, ওয়া সাক্বাইতা, ওয়া আগনাইতা ও আক্বনাইতা, ওয়া হাদাইতা। আল্লাহুম্মা ফালাকাল হামদু ‘আলা মা আ’ত্বাইতা।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, তুমি পানাহার করিয়েছো, অভাব দূর করেছো, দরকারের চেয়েও বেশি প্রস্তুত করেছো, পথ দেখিয়েছ এবং সুব্যবস্থা করেছো।”
অত:এব হে আল্লাহ, তুমি যা দান করেছো তার জন্য যাবতীয় প্রশংসা তোমার।” [মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ, সহিহুল জামে, হা/৪৭৬৮]
অন্য বর্ণনায়, و اجتبَيت এর পরিবর্তে وأحييتَ (ওয়া আহইয়াইাত: অর্থ: তুমি জীবিত রেখেছ) এসেছে। [আল কালিমুত ত্বাইয়েব, ১৯০-সহিহ]
❖ ৯) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা যখন কোন নিয়ামত গ্রহণ করার জন্য হাত বাড়াবে, তখন بِسْمِ اللَّهِ বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে শুরু) বলবে। তারপর তৃপ্তি নিয়ে খাবার শেষ করার পরে বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هُوَ أَشْبَعَنَا ، وَأَنْعَمَ عَلَيْنَا وَأَفْضَلَ
উচ্চারণ: “আল হামদু লিল্লাহিল্লাযি হুয়া আশবা’আনা ওয়া আন’আমা ‘আলাইনা ফা আফদ্বালা।”
অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে পরিতৃপ্ত করেছেন এবং আমাদেরকে নিয়ামত দান করেছেন যা অনেক উত্তম।” [সহিহ ইবনে হিব্বান, হা/৫২১৬, তবে এ হাদিসটিকে শাইখ আলবানি জঈফ বলেছেন-যঈফুত তারগিব, হা/১৩০৩। তিনি ছাড়াও অনেক মুহাদ্দিস এটিকে মুরসাল হিসেবে যঈফ এর মধ্যে গণ্য করেছেন]
❖ ১০) খাওয়ার পরে ব্যাপকভাবে প্রচলিত নিম্নোক্ত দুআটি সহিহ/হাসান কিংবা জঈফ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতবিরোধ লক্ষ করা যায়। আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানাহার শেষে বলতেন,
‏ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مُسْلِمِينَ‏
“সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহ জন্য, যিনি আমাদেরকে পানাহার করিয়েছেন এবং আমাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন।”
[ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, এ হাদিসের সনদ হাসান, দ্রষ্টব্য: আল ফুতুহাতুর রাব্বানিয়াহ ৫/২২৯, পক্ষান্তরে শাইখ আলাবানি জঈফ বলেছেন। দ্রষ্টব্য: জঈফ ইবনে মাজাহ, হা/৩২৮৩।
যাহোক, উক্ত হাদিসটি জঈফ/দুর্বল ধরে নিলেও যেহেতু তার অর্থটা সঠিক সেহেতু তা মাঝে-মধ্যে পাঠ করতে অসুবিধা নেই। তবে যেহেতু অন্যান্য একাধিক দুআ সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে সেহেতু সেগুলো পড়া নি:সন্দেহে অধিক উত্তম। ৯ নং দুআর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য]
➧ সংক্ষেপ কথা হল, পানাহারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’, বলতে ভুলে গেলে যখন খাবার মাঝে স্বরণ হবে তখন “বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু” এবং খাবার শেষে আল হামদুলিল্লাহ বা এ বিষয়ে যে কোন একটি দুআ পাঠ করা হাদিস সম্মত। এর মাঝখানে বিশেষ কোন দুআ হাদিস সম্মত নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর দেয়া রিজিক ও নিয়ামত ভোগ করার আগে তার নাম স্বরণ করার এবং শেষে তার প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করার পাশাপাশি সারা জীবন যেন আমরা সুস্থ ও সবল অবস্থায় কেবল তাঁর দাসত্ব করতে পারি সে তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬ ◐◯◑ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

ধর্ষণ: বর্তমান সমাজ চিত্র, কারণ ও প্রতিকার

 ভূমিকা: আমাদের সমাজে অসংখ্য অন্যায়-অপকর্মের স্রোত-তরঙ্গের মাঝে ধর্ষণ বর্তমানে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত আসছে ধর্ষণের নানা খবর। মানুষ গড়ার আঙ্গিনায় অমানুষদের হিংস্র থাবায় আমার বোন আজ ক্ষত-বিক্ষত। স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ। বাসের ড্রাইভার আর হেল্পার মিলে জন্তু-জানোয়ারের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে অসহায় নারীর উপর। প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না পেয়ে জনসম্মুখে কুপিয়ে হত্যা কিংবা শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার মত ঘটনা দেখে জাতি স্তম্ভিত। এমনকি প্রেম প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রতিশোধ নিতে কয়েকজন ধর্ষক গণ ধর্ষণ করার পর ফেসবুক লাইভে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠে। বাদ যায় না প্রতিবন্ধী কিংবা ছয় বছরের শিশুও৷

এই হল, আমাদের বর্তমান সমাজের নির্মম হাল-চিত্র। (আল্লাহ এ জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।)
যাহোক, এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে নিম্নে ধর্ষণ সংক্রান্ত জরুরি কিছু তথ্য, ধর্ষণের প্রকারভেদ, কারণ ও ইসলামে ধর্ষণ রোধে গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ তুলে ধরা হল:
❐ বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্ষণের সংজ্ঞা:
বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলক ভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।” [বাংলাদেশ সংবিধান: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০]
অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন: কোনও অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনও ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। ধর্ষণ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে কখনো কখনো ‘যৌন আক্রমণ’ শব্দ গুচ্ছটিও ব্যবহৃত হয়। (উইকিপিডিয়া)
ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং আঘাত পরবর্তী চাপ বৈকল্যে আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ ও যৌন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির পাশাপাশি গুরুতর ভাবে আহত হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ধর্ষকের দ্বারা এবং কোনও কোনও সমাজে ভুক্তভোগীর নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়।
❐ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, এর ৯ ধারা মতে সাজাসমুহ:
(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷
ব্যাখ্যা৷- যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত [ষোল বৎসরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলক ভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা [ষোল বৎসরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন৷
(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷
(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷
(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-
(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন;
(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷
(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্ত রূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷ [নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ source: https://bit.ly/3kWfFOO]
❐ ধর্ষণের প্রকারভেদ: (১০ প্রকার)
ধর্ষণের নানা প্রকারভেদ রয়েছে। এগুলো থেকে নিম্নোক্ত প্রকার সমূহ সমধিক সংঘটিত হয়। যেমন:
১) ডেট ধর্ষণ
২) গণ ধর্ষণ
৩) শিশু ধর্ষণ
৪) কারাগারে ধর্ষণ
৫) ধারাবাহিক ধর্ষণ (serial rape)
৬) প্রলোভন ও প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণ
৭) হেফাজত কালীন ধর্ষণ। (যেমন: হাসপাতাল কর্মী, পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তা ইত্যাদি কর্তৃক ধর্ষণ)।
৮) আন্তর্জাতিক সংঘাত বা যুদ্ধ কালীন নিয়মতান্ত্রিকভাবে ও ব্যাপক হারে ধর্ষণ।
৯) চৌর্যবৃত্তিমুলক ধর্ষণ: নারী অথবা পুরুষকে অপহরণ করে এ ধর্ষণ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের যৌন দাসত্বে অথবা দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়।
১০) বিকৃত মস্তিষ্ক নিকটাত্মীয় কর্তৃক ধর্ষণ। যেমন: বাবা, চাচা, ভাই, দাদা ইত্যাদি রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয় কর্তৃক এ ঘৃণ্য কাজটি করা হলে তাকে বলা হয় অজাচার।
❐ ধর্ষণে শীর্ষস্থানে থাকা ১০ দেশ:
ধর্ষণ অপরাধে গোটা বিশ্বে এক নম্বরে যে দেশটি অবস্থান করছে তার নাম হল, কথিত ‘সভ্য’ দেশ আমেরিকা/যুক্তরাষ্ট্র। আর ধর্ষণে শীর্ষস্থানে থাকা দশটি দেশের সবগুলোই অমুসলিম দেশ। যদিও এ সব দেশে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ আছে, নারীদের ইচ্ছামত পোশাক পরার স্বাধীনতা আছে, সর্বক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে কাজের অনুমতি আছে এবং সেখানে নারী-পুরুষের মাঝে কোন ভেদাভেদ করা হয় না।
● ১. আমেরিকা : আমেরিকার ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিস্টিক অনুযায়ী আমেরিকায় ধর্ষণের শিকার নারীর পরিসংখ্যান ৯১% এবং ৮% পুরুষ।
ন্যাশনাল ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইম্যানের সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার প্রতি ৬ জন মহিলার মধ্যে ১ জন ধর্ষণের শিকার।
পুরুষদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা ৩৩ জনে ১ জন ধর্ষণের শিকার। এই দেশে ১৪ বছর বয়স থেকেই ধর্ষণের মত অপরাধের প্রবণতা তৈরি হয় শিশু মননে।
● ২. দক্ষিণ আফ্রিকা: সন্তান এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গোটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। এই দেশে একজন ধর্ষকের শাস্তি মাত্র ২ বছরের কারাবাস। দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় ‘রেপ ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।
● ৩. সুইডেন : ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সুইডেনেই সবথেকে বেশি ধর্ষণ হয়। প্রতি বছরই প্রায় ৫৮% হারে যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়ে সুইডেনে।
● ৪. ভারত : ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো অনুযায়ী ২০১২ সালে ভারতের মত উন্নতশীল দেশে ধর্ষণের অভিযোগ জমা হয়েছে ২৪ হাজার ৯২৩টি। ভারতে ধর্ষণের শিকার হওয়া ১০০ জন নারীর মধ্যে ৯৮ জনই আত্মহত্যা করেন। প্রতি ২২ মিনিটে ভারতে একটি করে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়।
● ৫. ব্রিটেন : ৪ লাখ মানুষ প্রতিবছর ধর্ষণের মত ঘটনার শিকার হন ব্রিটেনে। প্রতি ৫ জন মহিলার (১৬-৫৯ বছর বয়সী) মধ্যে একজন করে ধর্ষণের শিকার হন।
● ৬. জার্মানি : এখনও পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়ে ২ লাখ ৪০ হাজার নারীর মৃত্যু হয়েছে জার্মানিতে। প্রতি বছর জার্মানিতে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয় ৬৫ লাখ ৭ হাজার, ৩৯৪।
● ৭. ফ্রান্স : ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের মত ঘটনা ফ্রান্সে অপরাধ বলেই মানা হত না। ফ্রান্সের সরকারী গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি বছরে এই দেশে ধর্ষণের শিকার হন অন্তত ৭৫ হাজার নারী।
● ৮. কানাডা : এই দেশে এখনও পর্যন্ত লিখিত অভিযোগের (ধর্ষণ) সংখ্যা ২৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১৮টি (এই সময় পর্যন্ত)। প্রতি ১৭ জন মহিলার মধ্যে ১ জন করে মহিলা এই দেশে ধর্ষিতা হন। যাদের মধ্যে ৬২% শারীরিকভাবে আহত হন।
● ৯. শ্রীলঙ্কা : এই দেশে অপরাধের শতাংশের বিচারে ১৪.৫ শতাংশ অপরাধ সংগঠিত হয় ধর্ষণে। ধর্ষণে অভিযুক্তদের ৬৫.৮% ধর্ষণের মত নারকীয় কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকেও কোনও প্রকার অনুশোচনা তাদের মধ্যে হয় না।
● ১০. ইথিওপিয়া : এই দেশের ৬০% নারী ধর্ষণের শিকার।
(সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ)
❐ বাংলাদেশে পরিসংখ্যান:
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৮ হাজার ৬৬৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৪ শতাংশ আসামির সাজা হয়। বাকিদের অধিকাংশই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ মাসে ৬ শতাধিক ধর্ষণ। ৩৭ জন হত্যা। (চ্যানেল ২৪)
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,”চলতি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট এই ৮ মাসে দেশে অন্তত ৮৯২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ সকল ধর্ষিতা নারীদের মধ্যে অন্তত ৪১ জন আহত অবস্থায় মারা গেছেন এবং অপর ৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। এতে আরও বলা হয় এ সময়কালে ১৯২ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল।” (ভয়েস অফ আমেরিকা/voabangla ডট কম)
❐ ধর্ষণ বৃদ্ধির ১৬ কারণ:
নানা কারণে ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়। তাই বিশেষ একটি কারণকে এ জন্য দায়ী বলা যাবে না। আমাদের সমাজে ধর্ষণ বৃদ্ধির জন্য যে সব মৌলিক কারণকে দায়ী করা যায় সেগুলো নিম্নরূপ:
১) আল্লাহর দীন থেকে দুরে সরে যাওয়া, মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহ ভীতি উঠে যাওয়া এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।
২) জিনা-ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত আল্লাহর বিধানকে অবমূল্যায়ন।
৩) অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। যৌন আবেদন মূলক সিনেমা, নাটক, কনসার্ট, চলচ্চিত্রে ধর্ষণের দৃশ্য উপস্থাপন, দেয়ালে দেয়ালে অশ্লীল পোস্টার, কাছে আসার গল্প মার্কা অনুষ্ঠান, অশ্লীল ম্যাগাজিন, পাঠ্য বইয়ে যৌন শিক্ষার সুড়সুড়ি, বিদেশী টিভি চ্যানেল, পর্ণ ওয়েব সাইট, ইউটিউব, ফেসবুক সহ সর্বত্র উন্মুক্ত অশ্লীলতা।
৪) পর্দা হীনতা, অশালীন পোশাক, বেপরোয়া চলাফেরা‌ এবং লাজ-লজ্জাকে নির্বাসন।
৫) আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা বা বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা।
৬) বর্তমান যুবসমাজের অসুস্থ ও নোংরা মানসিকতা।
৭) স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে সহশিক্ষা চালু থাকা।
৮) কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
৯) পারিবারিক সুশিক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার উদাসীনতা।
১০) যুবক-যুবতীদের উপর সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব ও ধর্ষকদেরকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ না থাকা।
১১) মদ ও নেশার ছড়াছড়ি।
১২) বেকারত্ব।
১৩) অবৈধ প্রেম—বয় ফ্রেন্ড/গার্ল ফ্রেন্ড নামক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন।
১৪) শত্রুতা এবং ক্রোধ বশত প্রতিপক্ষের নারীকে ধর্ষণ।
১৫) রাজনৈতিক কারণে ধর্ষণ।
১৬) নারীবাদী ও সেক্যুলারদের পক্ষ যুবক-যুবতীদেরকে বিয়েতে বিলম্ব করতে উৎসাহিত করণ।
❐ ধর্ষণ ঠেকাতে শুধু মানসিকতা পরিবর্তনই কি যথেষ্ট না কি আরও কিছু করণীয় রয়েছে?
নারী ধর্ষণের জন্য মানসিকতাও দায়ী এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নাই। কোন আলেম কখনোই বলেন নি যে, মানসিক পরিবর্তনের দরকার নাই। কিন্তু দ্বিমত হল, যখন আপনি বলবেন, নারীর পোশাক কোনভাবেই দায়ী নয়! সে যা মনে চায় তাই পরবে। অথবা আপনি যখন ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য নারীকে হিজাব থেকে বের করে কেবল পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তনের ওয়াজ করবেন।
একজন যুবতী মেয়ে যখন খােলামেলা পোশাক পরে, সাজগোজ করে, পারফিউম করে কোন পর পুরুষের কাছে যায় তখন সে পুরুষ যদি সুস্থ হয়ে থাকে তাহলে তার ভিতরে তোলপাড় শুরু করবে- যতই সে তার মানসিক অবস্থা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করুক না কেন। ক্রমান্বয়ে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) সে নিজের প্রবৃত্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। আস্তে আস্তে সে ‘মানসিক পরিবর্তন করার ওয়াজ’ ভুলতে শুরু করে। এটিই স্বতঃ:সিদ্ধ বাস্তবতা-যদিও দ্বিমুখী নীতির লোকেরা মুখে ভিন্ন কথা বলার চেষ্টা করুক না কেন।
এবার আসুন, দেখা যাক, নারীর ধর্ষণ ঠেকাতে ইসলাম কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
❐ ধর্ষণ, ইভ টিজিং ও অবৈধ যৌন অপরাধ ঠেকাতে ইসলামের গৃহীত ১০টি পদক্ষেপ:
➊ ইসলাম আমাদেরকে যেমন মানসিক পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছে ঠিক তেমনটি মহিলাদেরকে হিজাবের নির্দেশ দিয়েছে।
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলে দাও,
তারা যেন তাদের চাদরের একাংশ নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়।” (সূরা আহযাব : আয়াত নং ৫৯)
➋ ধর্ষণ এড়াতে ইসলাম মহিলাদেরকে পরপুরুষের সাথে নির্জন স্থানে বা লোকচক্ষুর আড়ালে যেতে নিষেধ করেছে।
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ قَالَ ‏”‏ الْحَمْوُ الْمَوْتُ ‏
عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
➌ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সকলকে পর পুরুষ/নারীর দিকে চোখ পড়লে তৎক্ষণাৎ চোখ নিচু করতে নির্দেশ দিয়েছে।
➍ মহিলাদেরকে স্বামী, বাবা, দাদা, ভাই, ভাগিনা ইত্যাদি মাহরাম পুরুষ ছাড়া দূরের সফরে যেতে নিষেধ করেছে।
➎ মহিলাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে যে, প্রয়োজনে পরপুরুষের সাথে কথার বলার সময় যেন কোমল কণ্ঠ পরিহার করে।
يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِىِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍۢ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ ۚ إِنِ ٱتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِٱلْقَوْلِ فَيَطْمَعَ ٱلَّذِى فِى قَلْبِهِۦ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
➏ জরুরি দরকারে বাইরে যাওয়ার সময় মহিলাদেরকে পারফিউম/সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে।
( أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا مِنْ رِيحِهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ ) رواه الإمام أحمد (19212) والنسائي (5126) وحسنه الألباني في صحيح الجامع .
➐ ইসলাম আরও বলেছে, কারো বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে যেন অনুমতি নেয়া হয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। অনুমতি না পেলে ফিরে যেতে হবে।
حَدَّثَنَا رَجُلٌ مَنْ بَنِي عَامِرٍ أَنَّهُ اسْتَأْذَنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي بَيْتٍ فَقَالَ : أَلِجُ ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِخَادِمِهِ : اخْرُجْ إِلَى هَذَا فَعَلِّمْهُ الِاسْتِئْذَانَ فَقُلْ لَهُ : قُلْ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ ؟ فَسَمِعَهُ الرَّجُلُ فَقَالَ : السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ ؟ فَأَذِنَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ .
➑ হাদিসে বিয়েতে সামর্থ্যবান যুবক-যুবতীদেরকে বিয়ে বিয়ে করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বিয়েকে সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
➒ সর্বোপরি এতগুলো ইসলামি আইন ও বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোন বিবাহিত ব্যক্তি যদি কোন নারীকে ধর্ষণ করে তাহলে ধর্ষককে কোর্টের মাধ্যমে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ফৌজদারি দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা হবে। আর অবিবাহিত ব্যক্তি ধর্ষণ করলে তাকে ১০০ বেত্রাঘাত করা হবে এবং মতান্তরে তৎসঙ্গে এক বছর দেশান্তর (বর্তমানে জেল) প্রদান করা হবে।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وقيل إن المرأة لا تُغرّب بل تُجلَد فحسب.
➓ অবৈধভাবে দুজনের সম্মতিতে হলেও উপরোক্ত বিধান কার্যকর করা হবে।
বর্তমান সমাজে আল্লাহ প্রদত্ত উপরোক্ত ইসলামী বিধানগুলোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের কারণে চতুর্দিকে ইভ টিজিং এবং নারী-ধর্ষণের ছড়াছড়ি। ঘটছে অসংখ্য অবৈধ গর্ভপাত। নিষ্পাপ নবজাতকের লাশ ডাস্টবিনে কুকুর-বেড়ালের খাবার হচ্ছে। ঘটছে নানা হত্যাকাণ্ড। বাড়ছে অপরাধ।
সুতরাং ধর্ষণ ধর্ষণ করে চিৎকার না করে ধর্ষণ রোধের জন্য ইসলামি অনুশাসন বাস্তবায়ন করতে হবে, ইসলামি ও সু শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে, আমাদের সন্তানদেরকে নারীদের প্রতি সম্মান জনক আচরণ শেখানো ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ইত্যাদিতে সহশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ অবাধ মেলামেশা সহ জিনা-ব্যভিচারের সকল রাস্তা বন্ধ করতে হবে, নারীদেরকে সাজসজ্জা সহ আতর-সুগন্ধি মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে কিংবা অশালীন পোশাক পরে খোলামেলা চলাফেরা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে, দূর দূরান্তে বা রাত-বিরেতে স্বামী বা মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে হারাম) পুরুষদের ছাড়া নারীদের চলাফেরা করা যাবে না।
পাশাপাশী নারীদেরকে রক্ষার জন্য এজন্য প্রত্যেক সচেতন অভিভাবক, সচেতন শিক্ষক মণ্ডলী, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবী মানুষ, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতা-নেতৃ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, আলেম-উলামা, দাঈ, বক্তা, লেখক, গবেষক, মিডিয়া কর্মী, সোশ্যাল এক্টিভিস্ট সহ সর্বস্তরের মানুষকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে এবং গণ সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সর্বপরি, ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সর্বপ্রকার অনিষ্ট, অন্যায়-অপকর্ম, পাপাচার ও ধ্বংসাত্মক বিষয়াদি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬◐◯◑▬▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate