November 30, 2021

ব্যবসা-বাণিজ্য: করনীয় ও বর্জনীয়

 1. ভূমিকা

2. ব্যবসা-বাণিজ্য
3. ব্যবসায়ীদের দুই ধরনের লাভ
4. ইসলামে ব্যবসার মূলনীতি
5. ১. ব্যবসায় কারো ক্ষতি করা যাবে না
6. ২. ধোঁকা, প্রতারণা ও ফাঁকিবাজি করা যাবে না
7. ৩. মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে না
8. ৪. ওজনে নিজ স্বার্থরক্ষায় কমবেশি করা যাবে না
9. ৫. পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা শপথ করা যাবে না
10. ৬. নিজে ঠকা যাবে না এবং অপরকেও ঠকানো যাবে না
11. ৭. ব্যবসার সাথে সুদকে মেশানো যাবে না
12. ৮. অনুমান ভিত্তিক ব্যবসা করা হতে বিরত থাকা
13. ৯. অপরের মাল হনন করার চেষ্টা করা যাবে না
14. ব্যবসায়ী ভাইদের করণীয়
15. ১. যাকাত দেওয়া
16. ২. লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করা
17. ৩. খাদ্যে ভেজাল মেশানো থেকে বিরত থাকা
18. ৪. উপকার করার মানসিকতা পোষণ করা
19. ৫. মানব সেবার কাজে মনোযোগ দেওয়া

ভূমিকা

ব্যবসা-বাণিজ্য:
হালাল রিযিক আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে মানুষের জন্য বিভিন্নভাবে ব্যবস্থা করে থাকেন। হালাল রিযিক উপার্জন করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিকে আল্লাহ তা‘আলা স্বীকৃতি দিয়েছেন। হালাল জীবিকা উপার্জনের যত পদ্ধতি আছে, ব্যবসা-বাণিজ্যই এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যবসাই উপার্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রাধান্যের অন্তর্নিহিত রহস্য সবচেয়ে বেশি ব্যবসা-বাণিজ্যে। এ অঙ্গনে যে জাতি যত বেশি মনোযোগী হয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারাই তত বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব এবং ব্যাপক উৎসাহ দিয়েছে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ ٢٩﴾ [النساء : ٢٩]
“তোমরা একে অপরের ধনসম্পদ অবৈধ উপায়ে আত্মসাৎ করো না। পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করো”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯]
একজন মানুষের জন্য তার অপর ভাইয়ের সম্পদ কখনোই বৈধ হয় না। বৈধ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো, বিনিময় বা ব্যবসা। উভয়ের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তাতে একে অপরের সম্পদকে নিজের জন্য হালাল করে নিতে পারে এবং অপরের সম্পদের মালিকানা অর্জন করতে পারে। একেই বলা হয় ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করা বা হালাল রুজী উপার্জন করা।
এ ধরনের উপার্জনকে হাদীসে উত্তম উপার্জন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«أفضل الكسب عمل الرجل بيده، وكل بيع مبرور».
“উত্তম কামাই হলো, একজন মানুষের তার নিজের হাতের কামাই এবং সব ধরনের মাবরুর ব্যবসা-বাণিজ্যের কামাই”।[1]
মাবরুর ব্যবসা হলো, যে বেচা-কেনাতে কোনো প্রকার ধোঁকা, খিয়ানত, মিথ্যা ও প্রতারণা থাকে না। পক্ষান্তরে যে ব্যবসার সাথে মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকা ও খিয়ানতের সংমিশ্রণ ঘটে তাকে মাবরুর বলা যাবে না। এ ধরনের ব্যবসায়ীকে সত্যিকার ব্যবসায়ী বলা যাবে না। কিয়ামতের দিন ফাজের (অপরাধী) লোকদের সাথে হাশরের মাঠে তাদের পূণরুত্থান হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ فُجَّارًا، إِلَّا مَنْ اتَّقَى اللَّهَ، وَبَرَّ، وَصَدَقَ» هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ».
“অবশ্যই ব্যবসায়ীদের কিয়ামতের দিন ফাজের হিসেবেই উপস্থিত করা হবে। তবে যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, সৎ কর্ম করে ও সত্য কথা বলে, তাকে ছাড়া”।[2]
মুমিন ব্যবসায়ীদের গুণাগুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿رِجَالٞ لَّا تُلۡهِيهِمۡ تِجَٰرَةٞ وَلَا بَيۡعٌ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَإِقَامِ ٱلصَّلَوٰةِ وَإِيتَآءِ ٱلزَّكَوٰةِ يَخَافُونَ يَوۡمٗا تَتَقَلَّبُ فِيهِ ٱلۡقُلُوبُ وَٱلۡأَبۡصَٰرُ ٣٧ لِيَجۡزِيَهُمُ ٱللَّهُ أَحۡسَنَ مَا عَمِلُواْ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ يَرۡزُقُ مَن يَشَآءُ بِغَيۡرِ حِسَابٖ ٣٨﴾ [النور : ٣٧، ٣٨]
“এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, সালাত কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেদিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে, যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৭-৩৮]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ، وَالصِّدِّيقِينَ، وَالشُّهَدَاءِ».
“সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীগণ হাশরের দিন নবী, শহীদ ও সত্যবাদীদের সঙ্গে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করবে”।[3]

ব্যবসায়ীদের দুই ধরনের লাভ:
ব্যবসা ব্যবসায়ীদের জন্য দুই ধরণের লাভ বয়ে আনবে। যথা-
এক- দুনিয়াতে ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দ্বারা সুন্দর জীবন যাপন করার সুযোগ লাভ। দুনিয়ার জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلۡمَالُ وَٱلۡبَنُونَ زِينَةُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ ٤٦﴾ [الكهف: ٤٦]
“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা”। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ৪৬]
অর্থ-কড়ি দুনিয়ার জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থ ছাড়া মানুষ দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنۡيَاۖ ٧٧ ﴾ [القصص: ٧٧]
“তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না”। [সূরা ¬আল-কাসাস, আয়াত: ৭৭] যদিও কেউ কেউ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দুই- আখিরাতে উত্তম পুরস্কার। ব্যবসা আল্লাহর রাস্তায় আত্মসমর্পণের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্যবসা তাকওয়া অনুশীলনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। হারাম হালাল মেনে ব্যবসা করা, সুদ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে ব্যবসা করা তাকওয়ার অনুশীলন বৈ আর কি হতে পারে। সালাতের আযান দেওয়ার সাথে সাথে সব ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে মসজিদে গমন আখিরাতের পুণ্য হাসিলের অনন্য মাধ্যম। সালাত যেমন একটি বিশেষ উপলক্ষ্য, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের অতীত কর্মকাণ্ডের পোস্টমর্টেম করি, আনুগত্যের নবায়ন করি, আল্লাহর খাটি বান্দা হওয়ার জন্য বেচে থাকার আশা করি, তাকওয়ার প্রার্থনা করি এবং সাহায্য চাই। অন্যদিকে হালাল ব্যবসা করাও আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের কার্যক্রমের অংশ এবং ব্যাপক ও বিস্তৃত অর্থে অনুরূপ ইবাদাতের শামিল। যদি আমরা আমাদের ব্যবসায়িক কাজ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী করতে পারি।

ইসলামে ব্যবসার মূলনীতি

ইসলাম মানুষকে কোনো ক্ষেত্রেই বল্গাহীন স্বাধীনতা দেয় নি। সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নির্দিষ্ট নীতিমালা। আয়-উপার্জন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটে নি। এ ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ইসলামের দু’টি মূলনীতি রয়েছে।
এক- ব্যবসায়িক পণ্য, উপাদান ও কায়কারবারগুলো বৈধ হতে হবে। অবৈধ পণ্যের ব্যবসা ও অবৈধ কায়কারবারকে ইসলাম বৈধতা দেয় না। যেমন, মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ ইত্যাদির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়া ইসলামে অনুমোদন নেই। কারণ, এসব বিষয়কে ইসলামে মৌলিকভাবেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং আপনার ব্যবসার সাথে এসবের সংমিশ্রণ আপনার ব্যবসাকে কলুষিত করে।
দুই- ব্যবসা-বাণিজ্য সকল অবস্থায় বৈধ পন্থায় হতে হবে। অর্থাৎ সেখানে কোনো ধরনের ধোঁকাবাজি, ভেজাল ও ফাঁক-ফোকর থাকতে পারবে না। কোনো ধরনের মিথ্যার আশ্রয় থাকতে পারবে না। এ বিষয়ে ইসলামের কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি আমরা নিম্নে আলোচনা করছি-

১. ব্যবসায় কারো ক্ষতি করা যাবে না:
ব্যবসা দ্বারা মানুষের উপকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। কারো ক্ষতি যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দেন যে,
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَضَى أَنْ لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ».
“নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অন্যের ক্ষতি করা কোনোটিই উচিত নয়”।[4]
ব্যবসা করে গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা শুধু লাভ করছি তা নয়; বরং আমরা তাদের জিনিস ও সেবা প্রদান করছি। যদি আমরা যৌক্তিক লাভ করে থাকি এবং মনোপলি না করি তবে সমাজের জন্য এটি একটি বড় সহায়তা। ভালো জিনিস যৌক্তিক দামে প্রদান করায় সমাজের মানুষ সন্তুষ্ট হবে, তাতে আল্লাহ তা‘আলাও আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন।
যখন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয় পক্ষ অনুভব করবে আমরা উপকৃত হয়েছি তখন সেখানে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে। যা একটি সুগঠিত সমাজের জন্য প্রয়োজন। এতে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সাওয়াব পাবেন।

২. ধোঁকা, প্রতারণা ও ফাঁকিবাজি করা যাবে না:
এ ধরনের অপকর্ম ইসলামে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত। মন্দ জিনিস ভালো বলে চালিয়ে দেওয়া, ভালোর সঙ্গে মন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ধোঁকা দেওয়া ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيهَا، فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلًا فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ؟» قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: «أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ، مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي».
“একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তিনি খাদ্যের ভিতরে হাত প্রবেশ করে দেখলেন ভিতরের খাদ্যগুলো ভিজা বা নিম্নমান। এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে খাবারের পন্যের মালিক এটা কী? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সেটাকে খাবারের উপরে রাখলে না কেন; যাতে লোকেরা দেখতে পেত? “যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়”।[5]

৩. মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না:
মিথ্যা অবশ্যই একটি নিন্দনীয় ও বড় ধরনের অপরাধ। ব্যবসার সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ আরও বেশি মারাত্মক ও ক্ষতিকর। কোনো মুসলিম সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ করতে পারে না। সত্যকে গোপন করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَا تَلۡبِسُواْ ٱلۡحَقَّ بِٱلۡبَٰطِلِ وَتَكۡتُمُواْ ٱلۡحَقَّ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٤٢﴾ [البقرة: ٤٢]
“তোমরা সত্যের সঙ্গে অসত্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। জেনেশুনে সত্য গোপন করো না”।[6]
একজন মুমিনের দোষ-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক, যা মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু একজন মুমিনের মধ্যে মিথ্যা ও খিয়ানতের দোষ থাকাকে কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো,
«أيكون المؤمن جبانًا؟ قال: نعم. قيل: أيكون بخيلاً؟ قال: نعم. قيل: أيكون كذابًا؟ قال: لا».
“একজন মুমিন দুর্বল হওয়া কি স্বাভাবিক? তিনি বললেন, হ্যাঁ- হতে পারে। আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি কৃপণ হতে পারে? বললেন, হ্যাঁ। তারপর জিজ্ঞাসা করা হলো, একজন মুমিন মিথ্যুক হতে পারে? বললেন, “না”।[7]
হাদীসে একজন মুমিনের অন্যান্য দুর্বলতা বা দোষের কথা স্বাভাবিক বলা হলেও মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেওয়া হয় নি।
এ কারণেই তুমি দেখতে পাবে, যে ব্যবসায়ী সত্যবাদী, আমানতদার-মিথ্যা কথা বলে না, খিয়ানত করে না- তার দিকে মানুষ ঝুঁকে পড়ে। তার ব্যবসা দৈনন্দিন উন্নত হতে থাকে। তার দোকানে গ্রাহকের ভিড় বাড়তে থাকে। তার কাছে মানুষ আমানত রাখে, তার সাথে মানুষ লেন-দেন বাড়াতে থাকে। ফলে দেখা যায় সে এক সময় বড় একজন ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে যে মিথ্যা কথা বলে, মানুষ তার কাছে ভিড়তে চায় না, তার থেকে পলায়ন করে। একে অপরকে বলতে থাকে, তার সাথে তোমরা কোনো ধরনের লেন-দেন করবে না। তার মো‘আমালা সঠিক নয়। ফলে দেখা যায়, ধীরে ধীরে তার ব্যবসা লাভের পরিবর্তে লসের দিকে যায়। মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বিলুপ্ত হতে থাকে। মান-সম্মান সব ধুলায় মিশে যায়। তার রিযিকের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«أربع إذا كن فيك فلا عليك مما فات من الدنيا: حفظ أمانة، وصدق حديث، وحسن خليقة، وعفة في طعمة»[8].
“চারটি গুণ যখন তোমার মধ্যে থাকবে, তখন দুনিয়াদারী সব খুঁয়ে গেলেও তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমানত সংরক্ষণ, কথায় সততা, উত্তম চরিত্র, হালাল খাদ্য”।
এ চারটি গুণ এমন, যেগুলো কোনো ব্যবসায়ীর মধ্যে বিদ্যমান থাকলে, অবশ্যই তার ব্যবসার উন্নতি হবে, আল্লাহ তা‘আলা তার ব্যবসা বাণিজ্যে বরকত দেবেন এবং এ ধরনের ব্যবসায়ী মানুষের নিকট প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হবে। দুনিয়াতেও তার সম্মান বৃদ্ধি পাবে, আখেরাতে তো বটেই; কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, আমরা আমাদের পণ্যগুলো বিক্রির জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ, যা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না। সাময়িক লাভবান হলেও পরিণতি খুবই করুণ।

৪- ওজনে নিজ স্বার্থরক্ষায় কমবেশি করা যাবে না:
অন্যকে দেওয়ার সময় ওজনে কম দেওয়া আর নেওয়ার সময় বেশি করে নেওয়া জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَيۡلٞ لِّلۡمُطَفِّفِينَ ١ ٱلَّذِينَ إِذَا ٱكۡتَالُواْ عَلَى ٱلنَّاسِ يَسۡتَوۡفُونَ ٢ وَإِذَا كَالُوهُمۡ أَو وَّزَنُوهُمۡ يُخۡسِرُونَ ٣﴾ [المطففين: ١، ٣]
“ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়”। [সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১-৩]
সুতরাং তুমি যখন কাউকে দেবে তখন কম দেবে না। তুমি যে কাজটি তোমার নিজের জন্য পছন্দ করো না, তা অন্যের জন্য কীভাবে পছন্দ কর। তুমি যখন নিজের জন্য নাও তখনতো তোমাকে মাপে কম দিলে তুমি রাজি হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ».
“তুমি তোমার নিজের জন্য যা ভালোবাসো তা অন্যের জন্যও ভালোবাসার আগ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না”।[9]
শু‘আইব আলাইহিস সালাম যে নীতি বর্ণনা করেন, কুরআন তা তুলে ধরছেন এভাবে:
﴿وَإِلَىٰ مَدۡيَنَ أَخَاهُمۡ شُعَيۡبٗاۚ قَالَ يَٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُۥۖ وَلَا تَنقُصُواْ ٱلۡمِكۡيَالَ وَٱلۡمِيزَانَۖ ٨٤﴾ [هود: ٨٤]
“হে আমার কাওম! আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো মা‘বুদ নাই। আর পরিমাপে ও ওজনে কম দিও না”। [সূরা সূরা হূদ, আয়াত: ৮৪]
﴿وَيَٰقَوۡمِ أَوۡفُواْ ٱلۡمِكۡيَالَ وَٱلۡمِيزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا تَبۡخَسُواْ ٱلنَّاسَ أَشۡيَآءَهُمۡ وَلَا تَعۡثَوۡاْ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُفۡسِدِينَ ٨٥﴾ [هود: ٨٥]
“আর হে আমার জাতি! ন্যায় নিষ্ঠার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও এবং লোকদের জিনিসপত্রে কোনোরূপ ক্ষতি করো না”। [সূরা হূদ, আয়াত: ৮৫]
অন্য জায়গায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَأَوۡفُواْ ٱلۡكَيۡلَ إِذَا كِلۡتُمۡ وَزِنُواْ بِٱلۡقِسۡطَاسِ ٱلۡمُسۡتَقِيمِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلٗا ٣٥﴾ [الاسراء: ٣٥]
“মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ”। [সূরা বনী ঈসরাইল, আয়াত: ৩৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “…যখন কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা ওজনে বা মাপে কম দেয়, তখন শাস্তিস্বরূপ তাদের খাদ্য-শস্য উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে”।[10]
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, “…যে জাতি মাপে ও ওজনে কম দেয়, তাদের রিযিক উঠিয়ে নেওয়া হয়…”।[11]
মনে রাখতে হবে, সালাত, সাওম ইত্যাদি নেক আমলে ত্রুটি হলে আল্লাহ তা‘আলা হয়তো তা তার নিজের অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন; কিন্তু মানুষকে সামান্য অণু পরিমাণ ঠকানো হলে বা অণু পরিমাণ মানুষের হক নষ্ট করলে, এ দায়ভার কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা নিবেন না। কিয়ামতের দিন প্রতারিত ক্রেতাকে ডেকে আল্লাহ তা‘আলা ওই প্রতারকের আমলনামা থেকে সমপরিমাণ সাওয়াব তাকে দিয়ে দেবেন। প্রতারকের সাওয়াব যদি শেষ হয়ে যায় বা কোন সাওয়াব না থাকে, তবে প্রতারিতদের গোনাহ তাঁর কাঁধের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে যদি শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে রক্তও প্রবাহিত হতে থাকে, তাতেও কোন কাজ হবে না। সেদিন এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা কোনক্রমেই ক্ষমা করবে না, যদি প্রতারিত ব্যক্তি তাকে ক্ষমা না করেন।

৫-পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা শপথ করা যাবে না:
মিথ্যা মানবতাবোধকে লোপ করে, নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর অভিশাপ। মিথ্যা বলে বা মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: الْمَنَّانُ الَّذِي لَا يُعْطِي شَيْئًا إِلَّا مَنَّهُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْفَاجِرِ، وَالْمُسْبِلُ إِزَارَهُ».
“কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সাথে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন- যে তার ব্যবসায়িক পণ্যকে মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে”।[12]
অপর একটি হাদীসে এ দৃষ্টান্ত এভাবে তুলে ধরা হয়েছে-
«رجل حلف على سلعة بعد العصر، لقد أعطي بها كذا، وكذا، فصدقه المشتري وهو كاذب».
“এক ব্যক্তি আসরের পর তার পণ্য সম্পর্কে কসম খেয়ে বলে, তাকে পণ্যটি এত এত মূল্যে দেওয়া হয়েছে। তার কথা ক্রেতা বিশ্বাস করল, অথচ সে মিথ্যুক”।[13]
এ ধরনের ব্যবসায়ীর জন্য উল্লিখিত হাদীসে অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

৬- নিজে ঠকা যাবে না এবং অপরকেও ঠকানো যাবে না:
এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করল, যে সে বেচা-কেনাতে প্রতারিত হয় বা ঠকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«إِذَا أَنْتَ بَايَعْتَ، فَقُلْ: لَا خِلَابَةَ، ثُمَّ أَنْتَ فِي كُلِّ سِلْعَةٍ ابْتَعْتَهَا بِالْخِيَارِ ثَلَاثَ لَيَالٍ».
“যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে, তখন তুমি বলে দিবে যে কোনো প্রতারণা বা ঠকানোর দায়িত্ব আমি নেব না। তোমার জন্য তিনদিন পর্যন্ত পণ্য ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে”।[14]

৮-ব্যবসার সাথে সুদকে মেশানো যাবে না:
সুদ একটি মারাত্মক অপরাধ। সুদ থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। ব্যবসার নামে কোন প্রকার সুদ চালু করা যাবে না। সুদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ٱلَّذِينَ يَأۡكُلُونَ ٱلرِّبَوٰاْ لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ ٱلَّذِي يَتَخَبَّطُهُ ٱلشَّيۡطَٰنُ مِنَ ٱلۡمَسِّۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ قَالُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡبَيۡعُ مِثۡلُ ٱلرِّبَوٰاْۗ وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْۚ ٢٧٥﴾ [البقرة: ٢٧٥]
“যারা সুদ খায় তারা কিয়ামতের দিন দণ্ডায়মান হবে শয়তানের আসরে মোহাবিষ্টদের মতো। কারণ, তারা বলে ক্রয়-বিক্রয় (ব্যবসা) ওতো সুদের মতো, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿يَمۡحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰاْ وَيُرۡبِي ٱلصَّدَقَٰتِۗ ٢٧٦﴾ [البقرة: ٢٧٦]
“আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খায়রাতকে বর্ধিত করেন”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৬]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَا أَحَدٌ أَكْثَرَ مِنَ الرِّبَا، إِلَّا كَانَ عَاقِبَةُ أَمْرِهِ إِلَى قِلَّةٍ».
“সুদ যদিও বৃদ্ধি পায় কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা”।[15]
লেনদেন যদি সুদ সংক্রান্ত হয় তবে হাদীসে এসেছে, জাবের ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন যে,
«لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ» ، وَقَالَ: «هُمْ سَوَاءٌ».
“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, হিসাবকারী এবং সাক্ষী সকলের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন এবং তিনি বলেন তারা সকলেই সমান”।[16]

৯-অনুমান ভিত্তিক ব্যবসা করা হতে বিরত থাকা:
বৃক্ষস্থিত ফলকে বৃক্ষ হতে আহরিত ফলের বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে মুযাবানা বলে। বিভিন্ন ধরণের মুযাবানা বর্তমানেও প্রচলিত আছে। ক্ষেতে অকীর্তিত খাদ্য শস্য যথা গম, বুট ইত্যাদিকে শুকনা পরিষ্কার করা খাদ্য যথা, গম, বুট ইত্যাদির বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে মুহাকালা বলে। সুদের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকেও সুদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন।[17]

১০-অপরের মাল হনন করার চেষ্টা করা যাবে না:
ব্যবসার জটিল মারপ্যাঁচে অন্যের মাল হরণ করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ ٢٩﴾ [النساء : ٢٩]
“হে ঈমানদারগন তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯]
হাদীসে এসেছে একটি ব্যবসায়িক লেনদেনে উভয় পক্ষই খুঁতসহ পণ্যেও সঠিক বর্ণনা দিতে হবে। ইসলামের বিজনেস কন্ডাক্ট সম্পর্কে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু এভাবে বর্ণনা করেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى».
“আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুক যে বিক্রির সময়, ক্রয়ের সময় এবং অভিযোগের সময় সদয় থাকে”।[18]

ব্যবসায়ী ভাইদের করনীয়

১. যাকাত দেওয়া:
যখন আমাদের ব্যবসার লাভের কারণে নিসাব পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হব, তখন ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি যাকাতের আমল আমাদের দ্বারা পালন হবে। এর মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন হবে। ধনী ও গরীবের মাঝে সেতু বন্ধন রচনা হবে। যাকাত সম্পদের ময়লা-আবর্জনা। যাকাত দিয়ে সম্পদকে ময়লা আবর্জনা থেকে পরিষ্কার করতে হয়। যাকাত কখনো সম্পদ কমায় না। যাকাত সম্পদ বাড়ায়। যাকাত দেওয়া দ্বারা ব্যবসায়ী তার সম্পদকে কলুষমুক্ত করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَآ ءَاتَيۡتُم مِّن رِّبٗا لِّيَرۡبُوَاْ فِيٓ أَمۡوَٰلِ ٱلنَّاسِ فَلَا يَرۡبُواْ عِندَ ٱللَّهِۖ وَمَآ ءَاتَيۡتُم مِّن زَكَوٰةٖ تُرِيدُونَ وَجۡهَ ٱللَّهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُضۡعِفُونَ ٣٩﴾ [الروم: ٣٩]
“আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদপ্রাপ্ত”। [সূরা রূম, আয়াত: ৩৯]
আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, যাকাত দ্বারাই সম্পদ বৃদ্ধি পায় সুদ নয়। সুদের পরিণতি খুবই করুণ। সুদ পরিহার করা ও তা থেকে দূরে থাকার জন্য আমাদের সর্বাত্মক সতর্ক থাকতে হবে।

২. লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করা:
ব্যবসায়িক যে কোনো লেনদেন ও কারবারের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيۡنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٖ مُّسَمّٗى فَٱكۡتُبُوهُۚ وَلۡيَكۡتُب بَّيۡنَكُمۡ كَاتِبُۢ بِٱلۡعَدۡلِۚ﴾ [البقرة: ٢٨٢]
“হে মুমিনগণ যখন তোমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের আদান প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দিবে; …দু’জন সাক্ষী কর,…। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮২]

৩. খাদ্যে ভেজাল মেশানো থেকে বিরত থাকা:
খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারী লোকদের সমাজের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। তাদের বিশ্বাস করে না, অন্তর থেকে সম্মান করে না। দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও ব্যর্থতা নিজের চোখেই দেখতে পারে। পরকালের কঠিন শাস্তি তো তাদের ভোগ করতে হবেই। ইদানীং শুধু ভেজাল নয়, বিভিন্ন আধুনিক নামের বিষও মেশানো হয়। এমনকি ভেজাল ওষুধেরও বাজারে ছড়াছড়ি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَا تَتَبَدَّلُواْ ٱلۡخَبِيثَ بِٱلطَّيِّبِۖ ٢﴾ [النساء : ٢]
“এবং তোমরা অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তু দ্বারা পরিবর্তন করো না”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২]

৪. উপকার করার মানসিকতা পোষণ করা:
যখন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয় পক্ষ অনুভব করবে আমরা উপকৃত হয়েছি তখন সেখানে একটি হৃদ্যতা পূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে। যা একটি সুগঠিত সমাজের জন্য প্রয়োজন। এতে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সওয়াব পাবেন।

৫. মানব সেবার কাজে মনোযোগ দেওয়া:
ব্যবসা করে গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা শুধু লাভ করছি তা নয়; বরং আমরা তাদের জিনিস ও সেবা প্রদান করছি। এটি নবীদের সামাজিক কর্মসূচীর মতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ، وَالصِّدِّيقِينَ، وَالشُّهَدَاءِ».
“সত্যবাদী ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ীগণ বিচার দিবসে নবী, ওলী ও শহীদগণের সাথে অবস্থান করবে”।[19]
ব্যবসায়ীদের খুশি হওয়া উচিৎ যে, তারা অন্যের জন্য চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি করেন। একজনের চাকুরী হওয়ার অর্থ হচ্ছে একটি বেকারত্ব কমল, একজনের হালাল আয়ের পথ প্রশস্ত হলো, রাষ্ট্রের মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটল -এ সবই ইসলামের নির্দেশ।
মোটকথা, ব্যবসা শুধু আয়-রোজগারে একটি ব্যবস্থার নাম নয়। ব্যবসার সাথে যেমনিভাবে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক, অনুরূপভাবে রয়েছে সামাজিক, মানবিক ও ইসলামী আদর্শ সহ বিভিন্ন কর্মসূচী ও বাস্তব-ধর্মী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সত্যিকার ব্যবসায়ী হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন

[1] মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৭২৬৫
[2] তিরমিযী, হাদীস নং ১২১০। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন।
[3] তিরমিযী, হাদীস নং ১২০৯
[4] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৩৪১
[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০২
[6] সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪২
[7] বাইহাকী শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং ৪৮১২। হাদীসটি সহীহ।
[8] মুসনাদে আহমাদ (৬৬৫২) ও ত্বাবরানী, হাসান সনদে।
[9] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩
[10] আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ৭৮৫
[11] মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং ৫৩৭০
[12] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬
[13] আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪৭৪; নাসায়ী, হাদীস নং ৪৪৬২
[14] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৬৪
[15] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২২৭৯
[16] সহীহ মুসলিম নং ১৫৯৮
[17] ইবন কাসীর
[18] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০৭৬
[19] তিরমিযী, হাদীস নং ১২০৯
________________________________
লেখক: জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের
সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
উৎস: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব।।

মুহররম ও আশূরার ফযিলত নিয়ে একটি ত্বাত্তিক বিশ্লেষণ!

 মুহররম, একটি মহান বরকতময় মাস। হিজরী সনের প্রথম মাস। এটি ‘আশহুরে হুরুম’ তথা হারামকৃত মাস চতুষ্টয়ের অন্যতম। আশহুরে হুরুম সম্পর্কে আমাদের রব মহান আল্লাহ বলেন —-

اِنَّ عِدَّۃَ الشُّہُوۡرِ عِنۡدَ اللّٰہِ اثۡنَا عَشَرَ شَہۡرًا فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ یَوۡمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ مِنۡہَاۤ اَرۡبَعَۃٌ حُرُمٌ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ۬ۙ فَلَا تَظۡلِمُوۡا فِیۡہِنَّ اَنۡفُسَکُمۡ وَ قَاتِلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ کَآفَّۃً کَمَا یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ کَآفَّۃً ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۳۶﴾

নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন। — [ সূরাহ আত-তাওবাহ: আয়াত : ৩৬ ]
.

প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন —

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ، حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، عَنِ ابْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِي بَكْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ الزَّمَانُ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ ‏”‏‏.‏

আল্লাহ যে দিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সে দিন হতে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যুল-কা’দাহ, যূল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হলো রজব-ই-মুযারা ।
— [ স্বহীহ বুখারী : ৩১৯৭ ]
.

মুহররমকে মুহররম বলে অভিহিত করা হয়েছে কারণ এটি অতি সম্মানিত। মহান আল্লাহ এ মাসে মর্যাদা সম্পর্কে বলেন — “তোমরা এতে নিজেদের উপর কোনো জুলুম করো না ” অর্থাৎ, এই সম্মানিত মাস সমূহে তোমরা কোনো অন্যায় করো না। কারণ এ সময়ে সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধের পাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি মারাত্মক।
.

▪মুহররম মাসের নফল সিয়ামের ফজিলত :

আবু হুরায়রাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন –

أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي بِشْرٍ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ هُوَ ابْنُ عَوْفٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ، وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ»

“রমযান মাসের পর সর্বোত্তম সাওম হল মুহররম মাসের সাওম (আশুরার সাওম) এবং ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাত্রের সালাত।”
— [ সুনানে আন-নাসায়ী : ১৬১৩ ]
.

উল্লেখ্য যে, প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রমাদান ব্যতীত আর কোনো মাসে পূর্ণ মাস সওম রাখেননি – এটি প্রমাণিত। তাই উপরিউক্ত হাদিসে এমাসে বেশি পরিমাণে সিয়াম রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে বলে ধরা হবে।

শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -অধিক সওম রেখেছেন বলে একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। হতে পারে মুহররম মাসের ফজিলত সম্বন্ধে তাঁকে একেবারে জীবনের শেষ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে আর তিনি তা বাস্তবায়ন করে যাবার সময় পাননি।
— [ইমাম নববী, শারহু স্বহীহ মুসলিম ব্যাখ্যা দ্রস্টব্য ]
.

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা স্থান ও কাল যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দিয়ে থাকেন, আল্লামাহ ইজ্জ বিন আব্দুস সালাম [ রাহিমাহুল্লাহ ] বলেন, স্থান ও কালের একের উপর অপরের মর্যাদা দান দুই প্রকার :
এক. পার্থিব।
দুই. দ্বীনী, যা আল্লাহর দয়া ও করুণার উপর নির্ভরশীল।
তিনি সেসব স্থান বা কালে ইবাদত সম্পন্নকারীদের সাওয়াব বৃদ্ধি করে দিয়ে তাদের উপর করুণা করেন। যেমন, অন্যান্য মাসের রোজার তুলনায় রমাদান মাসের সওমের মর্যাদা অনুরূপ আশূরার দিন। এগুলোর মর্যাদা আল্লাহর দান ও ইহসানের উপর নির্ভরশীল।
—– [ কাওয়ায়েদুল আহকাম : ১/৩৮ ]
.

▪আশূরার ইতিহাস :

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস [ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

يَعْقُوْبُ بْنُ إِبْرَاهِيْمَ حَدَّثَنَا رَوْحٌ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ حَدَّثَنَا أَبُوْ بِشْرٍ عَنْ سَعِيْدِ بْنِ جُبَيْرٍ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ لَمَّا قَدِمَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمَدِيْنَةَ وَالْيَهُوْدُ تَصُوْمُ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ فَسَأَلَهُمْ فَقَالُوْا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِيْ ظَهَرَ فِيْهِ مُوْسَى عَلَى فِرْعَوْنَ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم نَحْنُ أَوْلَى بِمُوْسَى مِنْهُمْ فَصُوْمُوْهُ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন ইয়াহুদীরা আশূরার দিন সওম পালন করছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের কাছে সওমের কারণ জানতে চাইলেন। তাঁরা বলল, এটি একটি ভাল দিন। এ দিনে
মুসা [ আলাইহিস সালাম ] ফির’আউনের উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। তাই মুসা [আলাইহিস সালাম ] রোজা পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, মূসাকে অনুসরণের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে অধিক হক্বদার। অত:পর তিনি সিয়াম রেখেছেন এবং সিয়াম রাখার নির্দেশ ( মুসলিমদেরকে) দিয়েছেন।”
—- [ স্বহীহ বুখারী : ১৮৬৫ ]

স্বহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সাহাবীদের নির্দেশ দিয়ে বললেন, মুসা (আলাইহিস সালাম )-কে অনুসরণের ক্ষেত্রে তোমরা তাদের (ইয়াহুদী) চেয়ে অধিক হক্বদার। সুতরাং তোমরা সিয়াম রাখ।”
.

আশূরার সিয়াম পূর্ব হতেই প্রসিদ্ধ ছিল, এমনকি
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর নবুয়্যাত প্রাপ্তির পূর্বে জাহেলী যুগেও আরব সমাজে তার প্রচলন ছিল। একটি বিশুদ্ধ হাদিসে আম্মাজান আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন , “জাহেলী যুগের লোকেরা আশূরাতে সিয়াম রাখত।”

ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন – কুরাইশ-রা আশূরার সিয়াম প্রসঙ্গে সম্ভবত বিগত শরীয়াত যেমন ইবরাহীম [ আলাইহিস সালাম ]-এর উপর নির্ভর করত। যেহেতু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই মক্কাতে আশূরার সিয়াম রাখতেন। হিজরতের পর দেখতে পেলেন মদিনার ইয়াহুদীরা এ-দিনকে উদযাপন করছে। তিনি কারণ সম্বন্ধে তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা উপরোল্লেখিত উত্তর দিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবাদেরকে ঈদ-উৎসব উদযাপন প্রসঙ্গে ইয়াহুদীদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিলেন। যেমন আবু মুসা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, আশূরার দিনকে ইয়াহুদীরা ঈদ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। স্বহীহ মুসলিমের রেওয়ায়াতে এসেছে, ‘খায়বর অধিবাসীরা (ইয়াহুদীরা) আশূরার দিনকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। তারা এদিন নিজ স্ত্রীদেরকে নিজস্ব অলঙ্কারাদি ও ব্যাজ পরিধান করাত।’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবাদেরকে এদিনে সিয়াম রাখার নির্দেশ দানের আপাত কারণ হচ্ছে, ইয়াহুদীদের বিরোধিতা করা। যেদিন তারা ঈদ উদযাপন করে ইফতার করবে সেদিন মুসলমানগণ সওম রাখবে। কারণ ঈদের দিন সওম রাখা হয় না।
— [ সার-সংক্ষেপ, ফাতহুল বারী, শারহুল বুখারী, ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (রাহঃ) ]
.

▪আশূরার সিয়ামের ফজিলত :

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -কে সওম রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি, যতটা দেখেছি এই আশুরার দিন এবং এই মাস অর্থাৎ রমজান মাসের সওমের প্রতি।” — [ স্বহীহ বুখারী :১৮৬৭ ]
.

আবূ কাত্বাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন —

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، وَأَحْمَدُ بْنُ عَبْدَةَ الضَّبِّيُّ، قَالاَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ غَيْلاَنَ بْنِ جَرِيرٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَعْبَدٍ الزِّمَّانِيِّ، عَنْ أَبِي قَتَادَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ ‏”‏ ‏.‏ وَفِي الْبَابِ عَنْ عَلِيٍّ وَمُحَمَّدِ بْنِ صَيْفِيٍّ وَسَلَمَةَ بْنِ الأَكْوَعِ وَهِنْدِ بْنِ أَسْمَاءَ وَابْنِ عَبَّاسٍ وَالرُّبَيِّعِ بِنْتِ مُعَوِّذِ بْنِ عَفْرَاءَ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَلَمَةَ الْخُزَاعِيِّ عَنْ عَمِّهِ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ ذَكَرُوا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ حَثَّ عَلَى صِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى لاَ نَعْلَمُ فِي شَيْءٍ مِنَ الرِّوَايَاتِ أَنَّهُ قَالَ ‏”‏ صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ كَفَّارَةُ سَنَةٍ ‏”‏ ‏.‏ إِلاَّ فِي حَدِيثِ أَبِي قَتَادَةَ ‏.‏ وَبِحَدِيثِ أَبِي قَتَادَةَ يَقُولُ أَحْمَدُ وَإِسْحَاقُ ‏.‏

“আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট আমি আশাপোষণ করি যে, তিনি আশূরার রোযার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের (গুনাহ্‌) ক্ষমা করে দিবেন।”—- [ তিরমিজী : ৭৫২ ]

এটি আমাদের প্রতি মহান আল্লাহর অপার করুণা। তিনি একটি মাত্র দিনের সিয়ামের মাধ্যমে পূর্ণ এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সত্যই মহান আল্লাহ পরম দাতা।
.

▪বছরের কোন দিনটি আশূরার দিন :

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ ) বলেন, তাসুআ, আশূরা দু’টি মদ্দযুক্ত নাম। অভিধানের গ্রন্থাবলীতে এটিই প্রসিদ্ধ। আমাদের সাথীরা বলেছেন, আশূরা হচ্ছে মুহররম মাসের দশম দিন। আর তাসুআ সে মাসের নবম দিন। জমহুর উলামারাও তা-ই বলেছেন। হাদিসের আপাতরূপ ও শব্দের প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক চাহিদাও তাই। ভাষাবিদদের নিকট এটিই প্রসিদ্ধ।
— [ আল-মজমূ দ্রস্টব্য ]

এটি একটি ইসলামী নাম, জাহেলী যুগে পরিচিত ছিল না। — [ কাশ্শাফুল কান্না’ ২য় খন্ড, সওমুল মুহররম ]
.

ইবনু খুদামাহ [ রাহিমাহুল্লাহ ] বলেন, আশূরা মুহররম মাসের দশম দিন। এটি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব ও ইমাম হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ)-র মত। কারণ আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,
“রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আশূরা-মুহররমের দশম দিনে সিয়াম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।” — [ তিরমিযী ]
.

▪আশূরার সাথে তাসুআর সিয়ামও মুস্তাহাব :

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,

حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ الْمَهْرِيُّ، حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، أَنَّ إِسْمَاعِيلَ بْنَ أُمَيَّةَ الْقُرَشِيَّ، حَدَّثَهُ أَنَّهُ، سَمِعَ أَبَا غَطَفَانَ، يَقُولُ سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ، يَقُولُ حِينَ صَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَنَا بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ صُمْنَا يَوْمَ التَّاسِعِ ‏”‏ ‏.‏ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏

‘‘যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে আশূরার রোজা রাখলেন এবং (আমাদেরকেও) রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন,
তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আগামী বছর এলে আমরা নবম দিনও সওম পালন করবো ( ইনশা আল্লাহ) । কিন্ত আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃত্যুবরণ করেন।
— [ সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৫ ]
.

ইমাম শাফেয়ী ও তাঁর সাথীবৃন্দ, ইমাম আহমাদ, ইমাম ইসহাক [ রাহিমাহুমুল্লাহ ] প্রমুখ বলেছেন, আশূরার সিয়ামের ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের সিয়াম-ই মুস্তাহাব। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দশ তারিখ সওম রেখেছেন এবং নয় তারিখ সিয়াম রাখার নিয়ত করেছেন। এরই উপর ভিত্তি করে বলা যায়, আশূরার সওমের কয়েকটি স্তর রয়েছে: সর্ব নিম্ন হচ্ছে কেবল দশ তারিখের সিয়াম রাখা। এরচেয়ে উচ্চ পর্যায় হচ্ছে তার সাথে নয় তারিখের সিয়াম রাখা। এমনিভাবে মুহররম মাসে সিয়ামের সংখ্যা যত বেশি হবে মর্যাদা ও ফজিলতও ততই বাড়তে থাকবে।
.

▪তাসুআর সিয়াম মুস্তাহাব হবার হিক্বমাত :

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তাসুআ তথা মুহররমের নয় তারিখ সিয়াম (রোযা) মুস্তাহাব হবার হিক্বমাত ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন।

এক. এর উদ্দেশ্য হল, ইয়াহুদীদের বিরোধিতা করা। কারণ তারা কেবল একটি অর্থাৎ দশ তারিখ রোযা রাখত।

দুই. আশূরার দিনে কেবলমাত্র একটি রোজা পালনের অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে তার সাথে অন্য একটি রোজার মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি করা। যেমনি করে এককভাবে জুমুআর দিন রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি আল্লামাহ খাত্ত্বাবী ও অন্যান্যদের মত।

তিন. দশ তারিখের রোজার ক্ষেত্রে চন্দ্র গণনায় ত্রুটি হয়ে ভুলে পতিত হবার আশংকা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে। হতে পারে গণনায় নয় তারিখ কিন্তু বাস্তবে তা দশ তারিখ।

এর মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী তাৎপর্য হচ্ছে, আহলে কিতাবের বিরোধিতা করা। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর বহু হাদিসে আহলে কিতাবদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আশুরা প্রসঙ্গে
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই নয় তারিখ রোজা রাখব।”— [ আল-ফতোয়াল ক্বুবরা, খন্ড: ৬ ]
.

ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) –
‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই নয় তারিখ রোজা রাখব’ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
“রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নয় তারিখে রোযা রাখার সংকল্প ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য কিন্তু এই নয় যে, তিনি কেবল নয় তারিখে রোযার রাখার সংকল্প করেছেন বরং তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে, দশ তারিখের রোযার সাথে নয় তারিখের রোজাকে সংযুক্ত করা। এটা সাবধানতা বশত: কিংবা ইয়াহুদী – খ্রিষ্টানদের বিরোধিতার জন্য।”
এটিই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মত এবং স্বহীহ মুসলিমের কতিপয় বর্ণনা এদিকেই ইংগিত করে।
—- [ফাতহুল বারী : ৪/২৪৫ ]
.

▪ আশূরায় উদযাপিত কিছু বিদ’আত:

আশূরার দিন লোকেরা সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, মুসাফাহা করা, খিচুড়ি রান্না করা, আনন্দ উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে, এ সম্বন্ধে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হল, এর কোনো ভিত্তি আছে কি না?

জবাবে তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, এসব অনুষ্ঠানাদি উদযাপন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে স্বহীহ কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি এবং সাহাবাদের থেকেও না। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি। কোনো মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবাদের থেকে কোনো স্বহীহ কিংবা দ্বইফ হাদিসও বর্ণনা করেননি। তাবেঈনদের থেকেও কোনো আছার পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী যুগে কেউ কেউ কিছু বানোয়াট ও জাল হাদিস বর্ণনা করেছে যেমন — ‘যে ব্যক্তি আশূরার দিন সুরমা লাগাবে সে ব্যক্তি সে বছর থেকে চক্ষুপ্রদাহ রোগে আক্রান্ত হবে না’। ‘ যে ব্যক্তি আশূরার দিন গোসল করবে সে সেই বছর থেকে আর রোগাক্রান্ত হবে না।” এরূপ অনেক হাদিস। এরই ধারাবাহিকতায় তারা একটি মওজু হাদিস বর্ণনা করেছে। যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর প্রতি মিথ্যারোপ ব্যতীত আর কিছুই নয়। হাদিসটি হচ্ছে, “যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ পরিবারের উপর উদার হাতে খরচ করবে আল্লাহ তাআলা সারা বছরের জন্য তাকে সচ্ছলতা দান করবেন।”

এ ধরণের সবগুলো বর্ণনা মিথ্যা ও জাল।

অত:পর ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ( রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন যার সার সংক্ষেপ হচ্ছে — “এ উম্মতের অগ্রজদের উপর যখন সর্ব প্রথম ফিতনা আপতিত হল ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু’র) শাহাদাত সংঘঠিত হল। এর কারণে বিভিন্ন দলের লোকেরা জালেম ও যাহিলদের দলে রাপান্তরিত হল। হয়ত মুনাফিক বেদ্বীন নয়ত বিভ্রান্ত বিপথগামী। তাঁর বন্ধুত্ব ও আহলে বাইতের বন্ধুত্ব প্রকাশ করতে লাগল।

আশূরার দিনকে রোলবিল, কান্নাকাটি ও শোক দিবস হিসাবে গ্রহণ করল। তাতে তারা বুক ও চেহারা চাপড়ানো, আস্তিন ছেড়াসহ জাহেলী যুগের বিভিন্ন প্রথা প্রকাশ করতে লাগল। বিভিন্ন শোকগাঁথা যার অধিকাংশই বানোয়াট ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ ও গীত আবৃত্তি করতে লাগল। এর ভেতর সত্যের কিছুই নেই আছে শুধু স্বজনপ্রীতি ও মনোকষ্টের নবায়ন। মুসলমানদের পরস্পরে যুদ্ধ ও দুশমনি সৃষ্টির পায়তাঁরা। পূর্ববর্তী পূন্যাত্মা সাহাবীদের গালমন্দ করার উপাদান। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের অনিষ্টি ও ক্ষতির পরিসংখ্যান কেউ লিখে শেষ করতে পারবে না। তাদের মোকাবেলা করেছে হয়ত আহলে বাইত ও হোসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) -এর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত নাসেবী সম্প্রদায় অথবা একদল যাহিল সম্প্রদায়। যারা ফ্যাসাদের মোকাবেলা করেছে ফ্যাসাদ দিয়ে, মিথ্যার মোকাবেলা করেছে মিথ্যার মাধ্যমে, খারাপের জবাব দিয়েছে খারাপ দিয়ে এবং বিদ’আতের জবাব দিয়েছে বিদ’আতের মাধ্যমে।”

ইমাম ইবনুল হাজ্জ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আশূরার বিদ’আতের আরো একটি হচ্ছে, তাতে যাকাত আদায় করা। বিলম্বিত কিংবা অগ্রীম। মুরগি জবাইর জন্য একে নির্ধারণ করা। নারীদের মেহেদি ব্যবহার করা।
—- [ আল-মাদখাল, ১ম খন্ড, ইয়াওমু আশূরা ]

.

পরিশেষে দো’আ করি – আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা আশূরাসহ যাবতীয় কর্মে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর আদর্শের পূর্ণ অনুবর্তনের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন।
.

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : [ উক্ত নিবন্ধ রচনায় আশূরার ফযিলত নিয়ে লিখিত আলিমদের বইপত্রের সাহারা নেয়া হয়েছে ]।

.

আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী,
আখতার বিন আমীর।।

মহিলাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার শার‘ঈ নীতিমালা

 আলজেরিয়ার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, ড. মুহাম্মাদ ‘আলী ফারকূস (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৭৪ হি./১৯৫৪ খ্রি.] প্রদত্ত ফতোয়া—

প্রশ্ন: “বাজারে যাওয়ার সময় মহিলার সাথে কি মাহরাম থাকা শর্ত? জাযাকুমুল্লাহু খাইরা।”

উত্তর: ❝যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ’র জন্য। দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর ওপর, যাঁকে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ, এবং দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর পরিবার পরিজন, সঙ্গিবর্গ ও কেয়ামত অবধি আসতে থাকা তাঁর ভ্রাতৃমণ্ডলীর ওপর। অতঃপর:

যদি মহিলার এমন কোনো প্রয়োজন থাকে, যার ফলে তার বাড়ির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়—যেমন: চিকিৎসা নেওয়া, বাজারসদাই করা, মসজিদে যাওয়া প্রভৃতি—তাহলে তার দ্বীন পালনের স্বার্থে ও স্বাস্থ্য রক্ষার্থে বাড়ির বাইরে বের হওয়া জায়েজ। কেননা নাবী ﷺ সাওদাহ বিনতে যাম‘আহর উদ্দেশে বলেছেন, قَدْ أَذِنَ اللهُ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَوَائِجِكُنَّ “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।” [সাহীহ বুখারী, হা/৫২৩৭; সাহীহ মুসলিম, হা/২১৭০]

তবে প্রয়োজনের কারণে বৈধভাবে বাইরে যেতে হলে অবশ্যই তা শরিয়তের একগুচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে পরিবেষ্টিত হতে হবে। নিম্নে মহিলাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার শার‘ঈ নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে আলোকপাত করা হলো।

প্রথমত, মহিলাকে তার অভিভাবক কিংবা তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে বের হতে হবে, এবং তার বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে স্বামীর সন্তুষ্টি থাকতে হবে। মূলত উক্ত শর্ত যাবতীয় ভালোকাজে স্বামীর আনুগত্য করার আওতাভুক্ত। যাতে করে তাদের দাম্পত্যজীবন হয় সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ও কলহমুক্ত। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ “পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে ওই বিষয়ের হেফাজত করে, যা আল্লাহ হেফাজত করেছেন।” [সূরাহ নিসা: ৩৪]

নাবী ﷺ বলেছেন, إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا؛ قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الجَنَّةِ شِئْتِ “যদি কোনো মহিলা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, তাহলে তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে খুশি সে দরজা দিয়ে তাতে প্রবেশ করো।” [মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬৬১; সাহীহুল জামি‘, হা/৬৬১; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

নাবী ﷺ আরও বলেছেন, إِذَا اسْتَأْذَنَكُمْ نِسَاؤُكُمْ بِاللَّيْلِ إِلَى المَسْجِدِ فَأْذَنُوا لَهُنَّ “তোমাদের স্ত্রীগণ রাত্রিবেলায় তোমাদের কাছে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তোমরা তাদের অনুমতি দাও।” [সাহীহুল বুখারী, হা/৮৬৫; সাহীহ মুসলিম, হা/৪৪২]

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মসজিদে যাওয়ার জন্যই যদি অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাহলে বাজারসদাই করা বা অন্যান্য কাজের জন্য বাইরে যেতে হলে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আরও বেশি, আরও উপযোগী।

দ্বিতীয়ত, মহিলা তার স্বামী বা অভিভাবকের সম্পদ থেকে কেবল ততটুকু নিবে, যতটুকু নেওয়ার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়েছে। স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতি ও পরামর্শ না নিয়ে সে সম্পদ খরচে স্বেচ্ছাচারিতা করবে না; এমনকি মহিলা তার নিজের সম্পদ খরচেও স্বেচ্ছাচারিতা করবে না। যাতে করে মহিলার ওপর তার স্বামীর পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় থাকে। কেননা নাবী ﷺ বলেছেন, وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَنْتَهِكَ شَيْئًا مِنْ مَالِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا “কোনো মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত তার নিজের সম্পদ নষ্ট করবে।” [ত্বাবারানী, মু‘জামুল কাবীর, ২২/৮৩; সাহীহুল জামি‘, হা/৫৪২৪; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

তৃতীয়ত, যদিও সফর ব্যতীত অন্যক্ষেত্রে মহিলার জন্য মাহরাম থাকা ওয়াজিব নয়, তথাপি সে কোনো বিশ্বস্ত সখীর সাথে বাইরে বেরোবে। যাতে তার ইজ্জত-আবরু ও দ্বীন-ধর্ম নিরাপদে থাকে। কেননা নাবী ﷺ বলেছেন, لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا “আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, এমন মহিলার জন্য বিনা মাহরামে একদিন ও একরাতের পথ সফর করা জায়েজ নয়।” [সাহীহ বুখারী, হা/১০৮৮; সাহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৯]

নতুবা একাকী বাজারে বের হলে সে ফেতনা, ফাসাদ ও অনিষ্ট ডেকে আনে—এমন বিষয়ের সম্মুখীন হতে পারে। কেননা নাবী ﷺ বলেছেন, خَيْرُ البِقَاعِ المَسَاجِدُ، وَشَرُّ البِقَاعِ الأَسْوَاقُ “সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদ। আর সর্বনিকৃষ্ট স্থান হলো বাজার।” [ত্বাবারানী, মু‘জামুল কাবীর, হা/১৩৭৯৮, হাকেম, মুস্তাদরাক, হা/৩০৬; সাহীহুল জামি‘, হা/৫৪২৪; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

চতুর্থত, মহিলা বাজারের পানে বাড়ি থেকে বের হলে, নিজের সম্পূর্ণ শরীর পর্দা দিয়ে আবৃত করবে। তার জন্য সৌন্দর্য প্রকাশ করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে, নানাবিধ অলঙ্কার দ্বারা সুশোভিত হয়ে, সৌন্দর্যবর্ধক পাউডার ব্যবহার করে, অর্ধনগ্ন পোশাক পরিধান করে, অহংকারী হয়ে, নিজের দেহসৌষ্ঠব ও রূপের ব্যাপারে আত্মগর্বিতা হয়ে, পুরুষদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে বাইরে বের হওয়া না-জায়েজ। তাই পোশাক ও লজ্জার ভূষণে নিজেকে আবৃত করা তার জন্য আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ “আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাক-জাহেলি যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।” [সূরাহ আহযাব: ৩৩]

মহান আল্লাহ আরও বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا “হে নাবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরাহ আহযাব: ৫৯]

নাবী ﷺ বলেছেন, وأَيُّمَا امْرَأَةٍ وَضَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا فَقَدْ هَتَكَتْ سِتْرَ مَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللهِ “যে নারী তার স্বামীর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও তার কাপড় খোলে, সে আল্লাহ ও তার মধ্যকার পর্দা ছিঁড়ে ফেলে।” [সুনানে তিরমিযী, হা/২৮০৩; সাহীহুল জামি‘, হা/২৭১০; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

নাবী ﷺ আরও বলেছেন, ثَلَاثَةٌ لَا تَسْأَلْ عَنْهُمْ، وفيه: وَامْرَأَةٌ غَابَ عَنْهَا زَوْجُهَا قَدْ كَفَاهَا مُؤْنَةَ الدُّنْيَا فَتَبَرَّجَتْ بَعْدَهُ “তিন ব্যক্তিকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না (সরাসরি জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে)। তার মধ্যে রয়েছে ওই নারী, যার স্বামী বাইরে গিয়েছে, তার দুনিয়ার খোরপোশের জোগান দিতে, অথচ সে (স্বামীর অনুপস্থিতিতে) তার সৌন্দর্য প্রকাশ করেছে।” [মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৯৪৩, আদাবুল মুফরাদ, হা/৫৯০; সিলসিলাহ সাহীহাহ, হা/৫৪২; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

নাবী ﷺ অন্যত্র বলেছেন, وَشَرُّ نِسَائِكُمُ المُتَبَرِّجَاتُ المُتَخَيِّلَاتُ وَهُنَّ المُنَافِقَاتُ، لَا يَدْخُلُ الجَنَّةَ مِنْهُنَّ إِلَّا مِثْلُ الْغُرَابِ الأَعْصَمِ “তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নারী তারাই, যারা সৌন্দর্য প্রকাশ করে, আর অহংকার করে। তারা তো মুনাফেক রমনী। ওই নারীদের মধ্য থেকে ‘সাদা পা-বিশিষ্ট কাকের মতো’ অতীব বিরল সংখ্যক নারী জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [বাইহাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/১৩৪৭৮; সিলসিলাহ সাহীহাহ, হা/১৮৪৯; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

নাবী ﷺ বলেছেন, أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا مِنْ رِيحِهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ “কোনো নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, আর সম্প্রদায়ের লোকেরা তার ঘ্রাণ পায়, তাহলে সে একজন ব্যভিচারিণী।” [সুনানে নাসায়ী, হা/৫১২৬; সাহীহুল জামি‘, হা/২৭০১; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

নাবী ﷺ আরও বলেছেন, صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا، وذَكَر: وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ، رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ المَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا “দুই শ্রেণির জাহান্নামীকে আমি কখনো দেখিনি। তার মধ্যে এক শ্রেণি হলো—ওই সমস্ত নারী, যারা কাপড় পরিধান করেও উলঙ্গ। তারা পুরুষদের আকর্ষণ করবে এবং নিজেরাও তাদের দিকে আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা হবে উটের পিঠের কুঁজোর মতো। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত এত দূর থেকে পাওয়া যায়।” [সাহীহ মুসলিম, হা/২১২৮; ‘পোশাক-পরিচ্ছদ ও প্রসাধনী’ অধ্যায়]

পঞ্চমত, সে যখন বাজারে বা অন্য কোথাও যাবে, তখন সে তার স্বামী অথবা অভিভাবকের আমানত রক্ষা করবে। সে কোনোভাবেই তার স্বামী বা অভিভাবকের সাথে খেয়ানত করবে না। তাই সে কোনো পরপুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না, এমনকি ইতস্তত দৃষ্টিতেও পরপুরুষকে দেখবে না। সে পরপুরুষের সাথে সম্মোহনকারী প্রলোভিত কথা বলবে না এবং নিষিদ্ধ অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হবে না। সে স্বামী বা অভিভাককে ধোঁকা দিয়ে পরপুরুষের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে না এবং পাপাচারমূলক সাক্ষাতে লিপ্ত হবে না। বস্তুত এগুলো এমন সব কাজ, যা তার দ্বীন-ধর্ম ও ইজ্জত-আবরুকে কদর্য করে দেয়। সুতরাং স্বীয় চোখের চাহনি অবনমিত করা, গলার আওয়াজ নিচু করা এবং স্বীয় জবান ও হাতকে অন্যায়, অশ্লীলতা ও কদর্যতা থেকে হেফাজত করা তার জন্য অপরিহার্য—ওয়াজিব।

কেননা মহান আল্লাহ বলেছেন, فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ “পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে ওই বিষয়ের হেফাজত করে, যা আল্লাহ হেফাজত করেছেন।” [সূরাহ নিসা: ৩৪]

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, وَقُل لِّلْمُؤْمِنَٰتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَٰرِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَاۖ “আপনি মুমিন নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।” [সূরাহ নূর: ৩১]

মহান আল্লাহ বলেছেন, يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِىِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ ٱلنِّسَآءِۚ إِنِ ٱتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِٱلْقَوْلِ فَيَطْمَعَ ٱلَّذِى فِى قَلْبِهِۦ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا “হে নাবীপত্নীরা, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাক, তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বল না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। বরং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে।” [সূরাহ আহযাব: ৩২]

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, لَّا يُحِبُّ ٱللَّهُ ٱلْجَهْرَ بِٱلسُّوٓءِ مِنَ ٱلْقَوْلِ إِلَّا مَن ظُلِمَۚ وَكَانَ ٱللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا “আল্লাহ কোনো মন্দকথার প্রচারণা ভালোবাসেন না, তবে কেউ অত্যাচারিত হয়ে থাকলে তার কথা স্বতন্ত্র; বস্তুত আল্লাহ শ্রবণকারী মহাজ্ঞানী।” [সূরাহ নিসা: ১৪৮]

ষষ্ঠত, মহিলার জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় পরপুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হওয়া জায়েজ নয়। যেমনভাবে তার জন্য বৈধ নয়—কোনো পরপুরুষের ব্যবসাকেন্দ্রে বা অন্য কোনো জায়গায় একাকী সেই পরপুরুষের কাছে প্রবেশ করে তার সাথে হারাম নির্জনতা অবলম্বন করা। ফিতনার রাস্তা রুদ্ধ করার জন্যই তা বৈধ নয়। যেহেতু সে কুনজর, কুকথা ও কুকর্মের বেষ্টন থেকে নিরাপদ নয়। কেননা অন্তর যে কাজের প্রতি প্ররোচিত করে, আর শয়তান যে কাজ করার কুমন্ত্রণা দেয়, সে কাজের পুরো পরিণামই কেবল ক্ষতি আর ক্ষতি, নিন্দা আর নিন্দা! তাইতো নাবী ﷺ বলেছেন, أَلَا لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ “কোনো মহিলা পরপুরুষের সাথে একাকী মিলিত হলেই, তাদের তৃতীয়জন হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয় শয়তান।” [সুনানে তিরমিযী, হা/২১৬৫; সাহীহুল জামি‘, হা/২৫৪৬; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]

সপ্তম ও সর্বশেষ মূলনীতি হলো—মহিলা যদি তার দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনে বাইরে বেরও হয়, তথাপি তার স্কন্ধে যে আমানত অর্পিত হয়েছে, তার দাবি অনুযায়ী তার জন্য স্বেচ্ছাচারিতা করে এমন কাজ করা জায়েজ নয়, যা আল্লাহ’র কাছে পছন্দনীয় নয়। তাই সে এমন জায়গায় যাবে না, যেখানে অসার ক্রিয়াকলাপ ও পাপাচার সংঘটিত হয়। সে এমন জায়গায় যাবে না, যেসব জায়গা অশ্লীল কর্মকাণ্ডে ভরপুর, অথবা যেসব জায়গায় মন্দ ও অকল্যাণ ছড়ানো হয়; সাধারণত যে জায়গাগুলোতে অসভ্য ও ইতর শ্রেণির লোকেরাই যেয়ে থাকে। কেননা সন্দেহাতীতভাবে এ ধরনের স্বেচ্ছাচারমূলক পদচারণা আমানতের খেয়ানত, নিজের বিনাশ এবং ধ্বংস ও দুর্যোগে নিপাতিত হওয়ার অসিলা।

বস্তুত প্রকৃত ‘ইলম আল্লাহ’র নিকট রয়েছে। সর্বোপরি যাবতীয় প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের জন্য। হে আল্লাহ, আমাদের নাবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার পরিজন, সাহাবীবর্গ ও কেয়ামত অবধি আসতে থাকা তাঁর ভ্রাতৃবর্গের ওপর আপনি দয়া ও শান্তি বর্ষণ করুন।❞

·
তথ্যসূত্র:

https://ferkous.com/home/?q=fatwa-451।

·
অনুবাদক: ‘আব্দুর রাহমান মৃধা’

মসজিদে ভিক্ষা চাওয়ার বিধান

 সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফতোয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি (আল-লাজনাতুদ দা’ইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) প্রদত্ত ফতোয়া—

السؤال: يجلس كثير من المشوهين والسائلين في الحرم الشريف بمكة المكرمة يمدون أيديهم للحجاج والزوار والمعتمرين، ولا سيما في الطريق ما بين الصفا والمروة، وقد سمعت مرة أنه لا يجوز التصدق في المساجد، والسؤال هنا: هل يجوز إعطاء هؤلاء من الصدقات وهم في داخل الحرم، وهل تجوز الصدقة في الحرمين الشريفين خاصة وفي المساجد عامة؟ أفتونا جزاكم الله خيرا.
الجواب: أجاب شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله عن حكم السؤال في المسجد بما نصه: (أصل السؤال محرم في المسجد وخارج المسجد إلا لضرورة، فإن كان به ضرورة وسأل في المسجد ولم يؤذ أحدا؛ بتخطيه رقاب الناس، ولا غير تخطيه، ولم يكذب فيما يرويه ويذكر من حاله، ولم يجهر جهرا يضر الناس مثل أن يسأل والخطيب يخطب، أو وهم يستمعون علما يشغلهم به ونحو ذلك جاز والله أعلم).
أما الصدقة في المسجد فلا بأس بها، روى مسلم في صحيحه عن جرير قال: «كنا عند رسول الله صلى الله عليه وسلم في صدر النهار، قال: فجاءه قوم حفاة عراة مجتابي النمار أو العباء، متقلدي السيوف، عامتهم من مضر، بل كلهم من مضر، فتمعر وجه رسول الله صلى الله عليه وسلم لما رأى بهم من الفاقة، فدخل ثم خرج فأمر بلالا فأذن وأقام فصلى ثم خطب فقال: (يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ…َ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا)، والآية التي في الحشر: (اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ)، تصدق رجل من ديناره، من درهمه، من ثوبه، من صاع بره، من صاع تمرة. حتى قال: ولو بشق تمرة، قال: فجاء رجل من الأنصار بصرة كادت كفه تعجز عنها، بل قد عجزت، قال: ثم تتابع الناس حتى رأيت كومين من طعام وثياب، حتى رأيت وجه رسول الله صلى الله عليه وسلم يتهلل كأنه مذهبة ، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من سن في الإسلام سنة حسنة، فله أجرها وأجر من عمل بها بعده من غير أن ينقص من أجورهم شيء، ومن سن في الإسلام سنة سيئة كان عليه وزرها ووزر من عمل بها من بعده من غير أن ينقص من أوزارهم شيء». وبالله التوفيق وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم.

প্রশ্ন: “অনেক বিকলাঙ্গ ও ভিখারী মক্কা মুকাররমায় হেরেম শরীফের মধ্যে হাজি, জেয়ারতকারী ও ওমরাকারীদের কাছে হাত পাতে। বিশেষ করে সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী রাস্তায় তারা হাত প্রসারিত করে। আমি একবার এরকম কথা শুনেছি যে, মাসজিদের মধ্যে দান-খয়রাত করা না-জায়েজ। প্রশ্ন হলো—হেরেমের মধ্যে তাদেরকে দান করা কি জায়েজ? বিশেষত দুই হেরেম শরীফে এবং আমভাবে সকল মাসজিদে দান-খয়রাত করা কি জায়েজ? আমাদেরকে বিষয়টি অবহিত করুন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরা।”

উত্তর: “মাসজিদে ভিক্ষা চাওয়ার বিধান প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) যে উত্তর দিয়েছেন, তা হলো—“মাসজিদের ভিতরে হোক, চাই বাহিরে হোক, মৌলিকভাবে জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ভিক্ষা চাওয়া হারাম। যদি তার প্রয়োজন থাকে, আর সে মাসজিদে ভিক্ষা চায়, মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে যেয়ে অথবা অন্য কোনোভাবে মানুষকে কষ্ট দেয় না, সে যা বর্ণনা করে এবং নিজের যে অবস্থা ব্যক্ত করে—সে ব্যাপারে মিথ্যার আশ্রয় নেয় না, এত জোরে কথা বলে না, যার কারণে লোকেরা কষ্ট পায়—যেমন: খুতবা চলাকালীন সময়ে ভিক্ষা চাওয়া, অথবা লোকেরা মনোযোগ দিয়ে ‘ইলমী আলোচনা শুনছে, সেখানে সে লোকদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে প্রভৃতি—তাহলে তার জন্য ভিক্ষা চাওয়া জায়েজ আছে। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।”

পক্ষান্তরে মাসজিদের অভ্যন্তরে দান-খয়রাত করায় কোনো সমস্যা নেই। ইমাম মুসলিম তাঁর ‘সাহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, জারীর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, “আমরা ভোরের দিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় তাঁর কাছে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, গলায় চামড়ার আবা পরিহিত ও নিজেদের তরবারি ঝুলন্ত অবস্থায় একদল লোক আসল। এদের অধিকাংশ কিংবা সকলেই মুদ্বার গোত্রের লোক ছিল। অভাব অনটনে তাদের এ করুণ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মুখমণ্ডল পরিবর্তিত ও বিষণ্ন হয়ে গেল। তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন, অতঃপর বেরিয়ে আসলেন। তিনি বিলাল (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) কে আজান দিতে নির্দেশ দিলেন। বিলাল (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) আজান ও ইকামাত দিলেন। নামাজ শেষ করে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং এ আয়াত পাঠ করলেন: “হে মানবজাতি, তোমরা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। … নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (সূরাহ নিসা: ১) অতঃপর তিনি সূরা হাশরের এ আয়াত পাঠ করলেন: “হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভবিষ্যতের জন্য নিজে কী সঞ্চয় করেছে, সেদিকে লক্ষ করে।” (সূরাহ হাশর: ১৮)

অতঃপর উপস্থিত লোকদের কেউ তার দিনার, কেউ দিরহাম, কেউ কাপড়, কেউ এক সা‘ আটা ও কেউ এক সা‘ খেজুর দান করল। অবশেষে তিনি বললেন, “এক টুকরা খেজুর হলেও নিয়ে আসো।” বর্ণনাকারী বলেন, আনসার সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি একটি বিরাট থলি নিয়ে আসলেন। এর ভারে তার হাত অপারগ হয়ে যাচ্ছিল কিংবা অপারগ হয়ে গেল। অতঃপর লোকেরা সারিবদ্ধভাবে একের পর এক দান করতে থাকল। ফলে খাদ্য ও কাপড়ের দুটি স্তুপ হয়ে গেল। এ দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারা মুবারক খাঁটি সোনার ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে হাসতে লাগল।

তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো উত্তম প্রথা বা কাজের প্রচলন করে, সে তার উক্ত কাজের সওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা তার এ কাজ দেখে তা করবে, সে এর বিনিময়েও সওয়াব পাবে। তবে এতে তাদের সওয়াব কোনো অংশে হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো খারাপ প্রথা বা কাজের প্রচলন করবে, তাকে তার এ কাজের পাপ বহন করতে হবে। তারপর যারা তাকে অনুসরণ করে এ কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ পাপও তাকে বইতে হবে। তবে এতে তাদের পাপ কোনো অংশেই হ্রাস করা হবে না।” (সাহীহ মুসলিম, হা/১০১৭; ‘জাকাত’ অধ্যায়; অধ্যায় নং: ১৩ পরিচ্ছেদ: ২০)

আর আল্লাহই তৌফিকদাতা। হে আল্লাহ, আমাদের নাবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার পরিজন ও সাহাবীগণের ওপর আপনি দয়া ও শান্তি বর্ষণ করুন।”

ফতোয়া প্রদান করেছেন—
চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)।
ডেপুটি চেয়ারম্যান: শাইখ ‘আব্দুর রাযযাক্ব ‘আফীফী (রাহিমাহুল্লাহ)।
মেম্বার: শাইখ ‘আব্দুল্লাহ বিন গুদাইয়্যান (রাহিমাহুল্লাহ)। [১]

·
সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] প্রদত্ত ফতোয়া—

السؤال: أنا إمام مسجد وأواجه كثيرًا من المتسولين بعد الصلاة، فهل يجوز لي أن أمنع المتسول من الكلام وآمرهم بالذهاب إلى جوار الباب، أم لا؟
الجواب: لا أعلم دليلاً شرعيًا يوجب منع الفقير من السؤال في المسجد، إلا إذا علم أنه كذاب وليس بفقير فإنه يمنع من ذلك، وفق الله الجميع.

প্রশ্ন: “আমি একটি মাসজিদের ইমাম। নামাজের পর আমি অনেক ভিক্ষুকের মুখোমুখি হই। আমার জন্য ভিক্ষুকদেরকে কথা বলা থেকে বারণ করা এবং তাদেরকে মাসজিদের গেটের পাশে চলে যেতে বলা কি জায়েজ হবে, না কি না-জায়েজ হবে?”

উত্তর: “আমি এমন কোনো শার‘ঈ দলিল জানি না, যা মাসজিদের মধ্যে ভিক্ষা চাওয়া থেকে অভাবী ব্যক্তিকে বাধা দেওয়া আবশ্যক গণ্য করে। তবে যদি জানা যায় যে, সে একজন মিথ্যুক, সে আসলে অভাবী নয়, তাহলে তাকে এই কাজে বাধা দিতে হবে। আল্লাহ সবাইকে উত্তম কাজের তৌফিক দিন।” [২]

·
পাদটীকা:
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂

[১]. ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৯০; ফতোয়া নং: ৬৬৫১; প্রশ্ন নং: ৪; ফতোয়ার আরবি টেক্সট আল-আইম্মাহ (alaemmah) ডট কম থেকে সংগৃহীত।

[২]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ৩০; পৃষ্ঠা: ১৭২; গৃহীত: binbaz.org.sa।

·
অনুবাদক: মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ মৃধা
www.facebook.com/SunniSalafiAthari

কেন শিরক সবচেয়ে বড় গোনাহ হিসাবে বিবেচিত?

 🔸এক,

এতে ‘ইলাহ’- এর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যে খালেক তথা সৃষ্টিকর্তার সাথে মাখলুক তথা সৃষ্ট বস্তুর তুলনা করা হয়। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলো, সে প্রকারান্তরে তাকে আল্লাহর অনুরূপ ও সমকক্ষ বলে স্থির করলো। মহান আল্লাহতাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়।’ — [সূরা লুক্বমান, আয়াত : ১৩]

জুলুম বলা হয় কোন বস্তুকে তার আসল জায়গা থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় রাখা। সুতরাং যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে, সে মূলত: ইবাদাতকে তার আসল স্থানে না রেখে ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত নয় এমন কারো উদ্দেশ্যে তা নিবেদন করে। আর এটা হল সবচেয়ে বড় জুলুম এবং অন্যায়।
.

🔸দুই,

আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিয়েছেন, শিরক করার পর যে ব্যক্তি তা থেকে তওবা করবেনা, তিনি তাকে ক্ষমা করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহর তাঁর সাথে শরীক করার পাপ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ তিনি ক্ষমা করেন, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন।’— [সূরা নিসা, আয়াত : ৪৮]
.

🔸তিন,

আল্লাহ এও বলেন যে, তিনি মুশরিকদের জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন এবং তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে।
মহান আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।’ — [সুরা মায়িদা, আয়াত :৭২]
.

🔸চার,

শিরক সকল আমলকে নষ্ট ও নিষ্ফল করে দেয়।
মহান আল্লাহতাআলা বলেন: ‘যদি তারা শিরক করত, তবে তাদের কাজকর্ম নিষ্ফল হয়ে যেত।’
— [ সূরা আন আম, আয়াত : ৮৮ ]

মহান আল্লাহ আরো বলেন: ‘আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী প্রেরণ করা হয়েছে যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।’
— [সূরা যুমার, আয়াত : ৬৫]
.

🔸পাঁচ,

কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে শিরক সবচেয়ে বড় গোনাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহের সংবাদ দিব না? আমরা বললাম- জ্বী, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল ! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতা- মাতার অবাধ্য হওয়া।’
— [বুখারী, মুসলিম]

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই শিরক একটি বড় জুলুম। — ’[সুরা লুকমান, আয়াত : ১৩]
.

অতএব শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম এবং তাওহীদ হচ্ছে সর্বোত্তম আদল ও ইনসাফ। আর যা বিশ্ব সৃষ্টির এই উদ্দেশ্যের সবচেয়ে বেশী পরিপন্থী, তাই সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ। এ ব্যাপারে ইবনুল কাইয়েম আরো বলেন: যখন শিরকই হলো এই উদ্দেশ্যের পরিপন্থী, তাই সর্বতোভাবে এটাই সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ। আল্লাহ প্রত্যেক মুশরিকের উপর জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন এবং তার জান-মাল ও পরিবার- পরিজনকে তাওহীদ পন্থীদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। তদুপরি তাদেরকে দাস হিসাবে গ্রহণ করার ও অনুমতি দিয়েছেন, কেননা তারা আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্বের কাজ আদায় করা থেকে বিরত থেকেছে। আল্লাহ মুশরিক ব্যক্তির কোন কাজ কবুল করতে, আখিরাতে তার ব্যাপারে কোন সুপারিশ গ্রহণ করতে ও তার কোন দোয়া কবুল করতে এবং তার কোন আশা বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মুশরিক ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে অজ্ঞ। কেননা সে সৃষ্টির কাইকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করে। অথচ এ হল চূড়ান্ত অজ্ঞতা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের জুলুম। যদিও বস্তবিকভাবে মুশরিক ব্যক্তি তার রব আল্লাহ তাআলার উপর জুলুম করেনা। বরং সে নিজের উপরই জুলুম করে থাকে।
.

সর্বশেষ, শিরক হলো এমন ত্রুটি ও দোষ যা থেকে আল্লাহ তাআলা নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করলো, সে আল্লাহর জন্য ওটাই সাব্যস্ত করলো যা থেকে তিনি নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর তাই শিরক হলো আল্লাহর পরিপূর্ণ নাফরমানী, চূড়ান্ত হঠকারিতা ও তাঁকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

Translate