Sunday, February 22, 2026

ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান ও তা প্রতিরোধে করণীয়

 বর্তমানে চাঁদাবাজি আমাদের সমাজের একটি মারাত্নক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ এই চাঁদাবাজি। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং ফৌজদারি অপরাধ যা নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকী স্বরুপ। ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অরাজকতা ও দুর্নীতি—সবকিছুর নেপথ্যে চাঁদাবাজির প্রভাব স্পষ্ট। দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, নির্মাণ খাত—সবখানেই চাঁদাবাজির মহোৎসব। দেশীয় আইনে চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলাম অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। পবিত্র আল-কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির মতো অন্যায় ও জুলুমের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির বিধান। এই জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জাগরণ এখন সময়ের দাবি।
▪️চাঁদাবাজির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:
চাঁদাবাজি বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক জোরপূর্বক, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের নিকট থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায় করা।
এটি সরাসরি একটি জুলুম ও অপরাধ।
চাঁদাবাজি অনেক সময় ব্যক্তি পর্যায়ে, আবার কখনো কখনো রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের মাধ্যমেও সংঘটিত হয়ে থাকে।
▪️চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকসমূহ:
চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকগুলো অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর প্রভাব ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
যেমন—
– ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সচ্ছলতা বিনষ্ট করে।
– চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কে থাকে।
– শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানির ভয় থাকে।
– ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
– শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
– পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হয়ে মূল্য বৃদ্ধি পায়।
– দুর্নীতিবাজ আমলাদের কারণে রাষ্ট্রের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়।
– আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাঁদাবাজির ফলে অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়‌।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান:
ইসলামের শাসনব্যবস্থায় মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইন বিদ্যমান। ইসলামের নীতিমালায় সরকার, প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষে ব্যক্তির ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। প্রশাসনের কেউ যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সে আমানতের খেয়ানত করছে।
রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রক্ষক এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
[সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
এই হাদিস প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা চাঁদাবাজিকে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ প্রমাণ করেছে।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির পরিণতি:
ইসলামে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এতে আল্লাহর অভিশাপ ও গজব নেমে আসে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
وَضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًۭا قَرْيَةًۭ كَانَتْ ءَامِنَةًۭ مُّطْمَئِنَّةًۭ يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًۭا مِّن كُلِّ مَكَانٍۢ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ ٱللَّهِ فَأَذَاقَهَا ٱللَّهُ لِبَاسَ ٱلْجُوعِ وَٱلْخَوْفِ بِمَا كَانُوا۟ يَصْنَعُونَ
“আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দেন, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত; তার কাছে চারদিক থেকে প্রচুর রিজিক আসত। কিন্তু তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। ফলে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন।” [সুরা বাকারা: ১৮৮]
চাঁদাবাজি যেহেতু জুলুম তাই এটি আল্লাহর গজব ডেকে আনে।
কুরআন ও হাদিসে এসেছে, অন্যায়ভাবে উপার্জিত সম্পদ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।
▪️কুরআনে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ وَتُدْلُوا۟ بِهَآ إِلَى ٱلْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا۟ فَرِيقًۭا مِّنْ أَمْوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিও না, যাতে জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের একটি অংশ পাপের মাধ্যমে ভোগ করতে পারো।”
[সূরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَـٰرَةً عَن تَرَاضٍۢ مِّنكُمْ﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে তা বৈধ।” [সুরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿إِنَّمَا ٱلسَّبِيلُ عَلَى ٱلَّذِينَ يَظْلِمُونَ ٱلنَّاسَ وَيَبْغُونَ فِى ٱلْأَرْضِ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ﴾
“দোষারোপ তো তাদের ওপরই, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সুরা শুরা: ৪২]
এসব আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, চাঁদাবাজি একটি প্রকাশ্য জুলুম ও সীমালঙ্ঘন।
▪️হাদিসে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
«مَنِ ٱقْتَطَعَ حَقَّ ٱمْرِئٍۢ مُسْلِمٍۢ بِیَمِينِهِ فَقَدْ أَوْجَبَ ٱللَّهُ لَهُ ٱلنَّارَ»
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করে, সে কেয়ামতের দিন আগুন বহন করে আসবে।”
[সহিহ বুখারি: ৬৫৩৮]
তিনি আরো বলেন,
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
“যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১৮৩৩[
চাঁদাবাজরা সাধারণত প্রতারণা, হুমকি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে টাকা আদায় করে, যা এই হাদিসের আওতায় পড়ে।
▪️আধুনিক সমাজ ও চাঁদাবাজি:
বর্তমান যুগে চাঁদাবাজি নানা রূপে বিস্তার লাভ করেছে। যেমন—
– ট্রান্সপোর্ট চাঁদা
– দোকানপাট থেকে মাসিক চাঁদা
– বিভিন্ন দলের নামে চাঁদা
– পুলিশের নামে চাঁদা
ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে হারাম ও অন্যায় বলেছে।
▪️চাঁদাবাজি প্রতিরোধে করণীয়:
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে প্রয়োজন—
– সামাজিক জনসচেতনতা বৃদ্ধি
– ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার প্রচার
– আইনের কঠোর প্রয়োগ
– রাজনৈতিক প্রশ্রয় বন্ধ
– সুশাসন ও জবাবদিহিতা
– দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন
– ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা
– প্রযুক্তিনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
– জেলখানায় নৈতিক শিক্ষা
– দলমত নির্বিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ
▪️চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যাংকখাতের করণীয়:
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ—
– বেকারদের কর্মসংস্থানে সহজ শর্তে বিনিয়োগ করতে পারে
– উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে পারে
– সিএসআর কার্যক্রমে কর্মমুখী প্রকল্প নিতে পারে
– চাঁদাবাজি হারাম—এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে পারে
– অবৈধ লেনদেন সনাক্তে নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।
বর্তমানে চাঁদাবাজি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এক ভয়ানক ব্যাধি, যা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার ভিত্তিমূলকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইসলামে এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির নিন্দা ও এর পরিণতির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে ইসলাম একটি শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কতটা গুরুত্ব দেয়। তাই ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। ইসলামের দেখানো পথে, যেখানে কারো ওপর কোনো ধরনের জুলুম বা অন্যায় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, এমন একটি চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনই সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

লেখক: মোঃ খায়রুল হাসান।

সিএসএএ ব্যাংকার এবং সার্টিফায়েড শরিআহ অ্যাডভাইজার অ্যান্ড অডিটর।

গ্ৰন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

উৎস: বানিজ্য প্রতিদিন (banijjoprotidin)

সিয়ামের ১২টি অমূল্য ফজিলত ও মর্যাদা

 মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ সোপান হল পবিত্র রমজান মাস। এটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির তরে নিজের প্রবৃত্তি ও চাহিদাকে বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য ইবাদত। হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই মাসের অসংখ্য ফজিলত ও সিয়াম পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।

সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ তাআলা পরকালে যেমন সম্মানিত করবেন তেমনি দুনিয়াতেও তাকে গুনাহ মুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা দান করেছেন।
নিম্নে সন্নাহর আলোকে রমজানের ১২ এর ১২টি বিশেষ ফজিলত তুলে ধরা হল:
✪ ১. রোজার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজে দেবেন:
আল্লাহ তাআলা রোজাকে নিজের জন্য খাস করেছেন এবং এর প্রতিদান তিনি নিজেই দেবেন।
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ»
“আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, শুধু রোজা ছাড়া। কারণ রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ২. পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা:
রমজানের রোজা গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী সকল (সগিরা বা ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ৩. রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর নিকট প্রিয়:
রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে অতি পছন্দনীয়। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ»
“সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের ঘ্রাণ অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধিময়।” [সহিহ বুখারী]
✪ ৪. এক রমজান থেকে অন্য রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মিটিয়ে দেয়:
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ»
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে অন্য জুমা এবং এক রমজান থেকে অন্য রমজান—এদের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।” [সহিহ মুসলিম]
✪ ৫. রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ:
জান্নাতে প্রবেশের জন্য রোজাদারদের জন্য স্বতন্ত্র ভিআইপি গেট থাকবে। তারা সেখান দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
প্রখ্যাত সাহাবি সহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ، يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، يُقَالُ: أَيْنَ الصَّائِمُونَ؟ فَيَقُومُونَ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ»
“জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন কেবল রোজাদাররাই সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে—রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে, ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে ঢুকতে পারবে না।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৬. জাহান্নাম থেকে মুক্তি:
রমজানে প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ لِلَّهِ عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وَذَلِكَ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ»
“নিশ্চয় ইফতারের সময় আল্লাহর নিকট অনেক জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা থাকে। আর এমনটি (রমজানের) প্রতি রাতেই ঘটে থাকে।” [ইবনে মাজাহ; আল্লামা আলবানি একে সহিহ বলেছেন]
✪ ৭. দ্বিগুণ আনন্দ:
রোজাদারের জন্য দুটি বিশেষ মুহূর্ত অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَلِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ بِفِطْرِهِ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ»
“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে যা তাকে আনন্দিত করে: যখন সে ইফতার করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দিত হয়, আর যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার রোজার কারণে আনন্দিত হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৮. দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা:
ইফতারের সময় রোজাদারের দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ…»
“তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মজলুমের (অত্যাচারিতের) দোয়া। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়া মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেন..।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান এবং আল্লামা আলবানি সহিহ বলেছেন]
✪ ৯. হাশরের ময়দানে সুপারিশ:
রোজা ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ، مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، قَالَ: فَيُشَفَّعَانِ»
“রোজা এবং কুরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে: হে আমার রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতে ঘুমানো থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” [আহমদ; মুহাক্কিকগণ একে সহিহ বলেছেন]
✪ ১০. ঢাল স্বরূপ সুরক্ষা:
রোজা দুনিয়াতে গুনাহ থেকে এবং আখেরাতে আগুন থেকে রক্ষা করে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ»
“আর রোজা হল (জাহান্নামের আগুন ও গুনাহ থেকে বাঁচার) ঢাল।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ১১. জাহান্নাম থেকে ৭০ বছরের দূরত্ব:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُومُ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا بَاعَدَ اللَّهُ بِذَلِكَ الْيَوْمِ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا»
“যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিন রোজা রাখবে আল্লাহ সেই একদিনের বিনিময়ে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেবেন।” [সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]
✪ ১২. রোজাদার এবং জাহান্নামের মাঝে আসমান ও জমিনের দূরত্ব সমান খন্দক তৈরি করা হবে:
প্রখ্যাত সাহাবি আবু উমামা আল বাহিলি (রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ خَنْدَقًا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় (সন্তুষ্টির জন্য) একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝখানে আসমান ও জমিনের দূরত্বের সমান একটি পরিখা তৈরি করে দেবেন।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান সহিহ এবং আল্লামা আলবানি হাসান সহিহ বলেছেন]
রমজানের এই রহমত ও মাগফিরাতের বসন্তকে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে সিয়াম পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
وَصَلَّىٰ اللهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَىٰ نبينا مُحَمَّد، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أجمعين، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
জুবইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা

 ভূমিকা: আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর—যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” [সূরা নিসা: ৫৯]
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা সে সময় আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতের পরিণাম গোমরাহি বা ভ্রষ্টতা।” [আবু দাউদ, তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ]। কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসের অনুরূপ অর্থে আরও অনেক আয়াত ও সহিহ হাদিস রয়েছে, যার তাৎপর্য হচ্ছে মুসলমানদের উপর আবশ্যক হচ্ছে তারা ফরজ, সুন্নাত ও নফলসহ সকল প্রকার এবাদত আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের নির্দেশিত তরিকা অনুযায়ী সম্পাদন করবে এবং তাতে সকল প্রকার বিদআত থেকে বিরত থাকবে। রমজান মাসে তারাবির নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবাদত। তাই আমাদেরকে এক্ষেত্রেও সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে তারাবির নামাজের রাকাতের ক্ষেত্রে। আসুন আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামাজের সঠিক রাকাত সংখ্যা জেনে নেই।

◈ তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা:
রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল তথা তারাবির নামাজের সঠিক রাকাত সংখ্যা হচ্ছে বিতরসহ ১১। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বদা রাতের নামাজ বা তারাবির নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। উম্মুল মুমেনীন আয়েশা (রা.) থেকে ১১ রাকাত পড়ার কথাই বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁকে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রাতের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন:
مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا
“রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি প্রথমে (দু রাকাত দু রাকাত করে) চার রাকাত পড়তেন। তুমি তার দীর্ঘ কিয়াম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। তিনি পুনরায় চার রাকাত (দুই রাকাত দুই রাকাত করে) পড়তেন। তুমি তার দীর্ঘ কিয়াম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি ৩ রাকাত বিতর পড়তেন।” [বুখারি ও মুসলিম]। সায়েব বিন ইয়াজিদ (রা.) বলেন:
أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً
“উমর বিন খাত্তাব (রা.) উবাই বিন কাব এবং তামীম দারীকে এগার রাকাত তারাবির নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।” [মুআত্তা ইমাম মালিক]
এটিই আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের দাবী। এটিই ছিল অধিকাংশ সাহাবি, তাবেঈ এবং ইমামদের আমল। তারা এগার রাকাতের বেশি তারাবির নামাজ পড়তেন না।

◆ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ:) তারাবির নামাজের রাকাতের ব্যাপারে সকল মত এক স্থানে একত্রিত করেছেন:
১) তিন রাকাত বিতরসহ ১১ রাকাত।
২) তিন রাকাত বিতরসহ ১৩ রাকাত।
৩) তিন রাকাত বিতরসহ ২১ রাকাত।
৪) তিন রাকাত বিতরসহ ২৩ রাকাত।
৫) তিন রাকাত বিতরসহ ৩৯ রাকাত।
৬) তিন রাকাত বিতরসহ ৪১ রাকাত।
৭) তিন রাকাত বিতরসহ ৪৯ রাকাত।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি উপরের সবগুলো মত উল্লেখ করার পর বলেন: “তবে তারাবির নামাজের রাকাতের ব্যাপারে আয়েশা (রা.) এর হাদিস ব্যতীত অন্য কোন হাদিস সহিহ সনদে প্রমাণিত হয়নি। আর তা হচ্ছে তাঁর কথা: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি আরও বলেন:
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ২০ রাকাত তারাবিহ পড়ার হাদিসের সনদ দুর্বল এবং বুখারি ও মুসলিম শরিফে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসের বিরোধী। আর বাকি বর্ণনাগুলো সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাদের পরবর্তী যুগের আলেমগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তারা যদি কিরাত দীর্ঘ করতেন তাহলে রাকাত সংখ্যা কম করতেন। আর সংক্ষিপ্ত কিরাত পাঠ করলে রাকাত সংখ্যা বাড়াতেন।

সার সংক্ষেপ:
সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উত্তম হচ্ছে, কিরাত দীর্ঘ করে বিতরসহ ১১ রাকাত তারাবির নামাজ পড়া। তবে কতিপয় আলেম বলেছেন, তারাবির নামাজ ১১ রাকাতের চেয়ে বেশি পড়তে চাইলে কোন অসুবিধা নেই। লেখক: আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানি।

❑ শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী (রাহ.) এর সংযোজন:
মূলতঃ ১১ রাকাত বা ২০ রাকাত বলে কথা নয়। যে কোন সংখ্যায় মানুষ রাতের নফল নামাজ পড়তে পারে। যেটা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাওলি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু যদি নির্ধারণ করা হয় যে ৮ রাকাত পড়া সুন্নত। তাহলে দলিল দরকার। এক্ষেত্রে আমরা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ফে’লী হাদিস পাই, যাতে প্রমাণ হয় তিনি ৮ রাকাতই পড়েছেন। সুতরাং ৮ রাকাতই সুন্নাত। কিন্তু বেশি পড়তে চাইলে তার অনুমতি আছে। তাকে বাধা দেয়া যাবে না। এই কারণেই মক্কা-মদিনায় ২০ রাকাত পড়া হয় এবং শেষ দশকে ৩৩ রাকাত পড়া হয়। (অবশ্য বর্তমানে মক্কা-মদিনায় রমজানের ১ম রাতেই তিন রাকাত বিতর সহ ১৩ রাকাত করে পড়া হয়-সম্পাদক)। কিন্তু কথা হচ্ছে যদি বলা হয় ২০ রাকাতই সুন্নাত- ৮ রাকাত নয়, তাহলে ২০ রাকাত সুন্নাত বলার পক্ষে সহিহ দলিল দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো নয়ই, সাহাবায়ে কেরাম থেকেও কোন সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। ওমার (রা.) এর ব্যাপারে যে বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা হয় তা জঈফ। দলিলের অনুপযুক্ত। বরং ওমর (রা.) থেকে মুআত্তা মালেকে ৮ রাকাতের পক্ষেই সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায়।
ওমার (রা.) থেকে তারাবির বিষয়ে ৩ রকমের বর্ণনা পাওয়া যায়:
◈ ১) ৩৬ রাকাত। কিন্তু বর্ণনাটি জঈফ। এটি রয়েছে কিয়ামুল্লায়ল মারওয়াযীতে।
◈ ২) ২৩ রাকাত। এ বর্ণনাটিও জঈফ। এটি মুআত্তায় আছে। কারণ যার বরাতে বর্ণনাটি এসেছে তিনি ওমার (রা.) এর যুগে জন্ম গ্রহণই করেননি।
◈ ৩) ১১ রাকাত। এটি মুআত্তা মালেকে বর্ণিত হয়েছে। এটি সহিহ বর্ণনা। যেমন আলবানি সাহেব তা সহিহ বলেছেন।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে মারফূ সূত্রে ২০ রাকাতের পক্ষে যে হাদিস উল্লেখ করা হয় তা খুবই দুর্বল বা জাল। বর্ণনাটি বাইহাকি, তবারানি ও ইবনে আবি শায়বায় উল্লেখ হয়েছে। সে সম্পর্কে বাইহাকি নিজেই বলেন উহা জঈফ। তাছাড়া হানাফি মাজহাবের আলেমগণও হাদিসটি জঈফ হওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। যেমন: আল্লামা যাইলাঈ নসবুর রায়া গ্রন্থে, মোল্লা আলী কারী, বদরুদ্দিন আইনি, আনোয়ার শাহ কাশমিরি (রহ:) প্রমূখগণ উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দিন আইনি বলেন, তবারানি ও ইবনে আবি শায়বা বর্ণিত হাদিসটি জঈফ হওয়ার সাথে সাথে বুখারি ও মুসলিমের বর্ণিত আয়েশা (রা.) এর হাদিসের বিরোধী হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। [উমদাতুল কারী-বদরুদ্দীন আইনী]।আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানি হাদিসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

❑ একটি সংশয় ও তার অবসান: তারাবিহ এবং তাহাজ্জুদের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?

প্রশ্ন: সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান মুফতী সম্মানিত শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (র:)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারাবিহ, কিয়ামুল লাইল এবং তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: সম্মানিত শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (র:) বলেন:
الصلاة في الليل تسمى تهجداً، وتسمى قيام الليل، كما قال الله سبحانه: {وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ} الآية، وقال سبحانه: {يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ * قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا}، وقال سبحانه في وصف عباده الأبرار: {كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجعُونَ}. أما التراويح فهي تطلق عند العلماء على قيام الليل في رمضان أول الليل، مع التخفيف وعدم الإطالة، ويجوز أن تسمى تهجداً، وأن تسمى قياماً لليل، ولا مشاحة في ذلك.
“রাতের নামাজকে তাহাজ্জুদ বলা হয়। একে কিয়ামও বলা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ
‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়, ওটা তোমার জন্য নফল।’ [সূরা বনী ইসরাঈল: ৭৯]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
‘ওহে চাদরে আবৃত (ব্যক্তি), রাতে নামাজে দাড়াও, রাতের কিছু অংশ বাদে।’ [সূরা মুজাম্মেল: ১-২]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
آخِذِينَ مَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُحْسِنِينَ كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجعُونَ
‘তাদের প্রতিপালক যা তাদেরকে দিবেন, তা তারা ভোগ করবে, কারণ তারা পূর্বে (দুনিয়ার জীবনে) ছিল সৎ কর্মশীল। তারা রাত্রিকালে খুব কমই শয়ন করত।’ [সূরা যারিয়াত: ১৬-১৭]
আর মানুষের উপর সহজ করে এবং বেশি দীর্ঘ না করে রমজান মাসে রাতের প্রথম ভাগে কিয়ামুল লাইল করাকে আলেমদের পরিভাষায় তারাবিহ হিসেবে নামকরণ করা হয়। একে তাহাজ্জুদ এবং কিয়ামুল লাইল হিসেবে নামকরণ করাও জায়েজ আছে। এতে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহই তাওফিক দাতা।”

❑ উপরাক্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ:
✪ রাকাত সংখ্যা: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজানে বা রমজানের বাইরে সর্বদা বিতরসহ ১১ রাকাত নামাজ পড়তেন, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
✪ উমর (রা.)-এর আমল: উমর (রা.) উবাই বিন কাব (রা.)-কে যখন জামাতে নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দেন, তখন রাকাত সংখ্যা ছিল ১১ রাকাত (মুআত্তা ইমাম মালিক)।
✪ রাকাতের ভিন্নতা: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মতে, ২০ রাকাত বা তার বেশি পড়ার যেসব বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো সনদের দিক থেকে দুর্বল অথবা সহিহ হাদিসের পরিপন্থী। মূলত সাহাবি ও তাবেইগণ কিরাত দীর্ঘ করলে রাকাত কম পড়তেন এবং কিরাত সংক্ষিপ্ত করলে রাকাত বাড়িয়ে নিতেন।
✪ তারাবিহর জন্য সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উত্তম পদ্ধতি হলো, কিরাত দীর্ঘ করে ১১ রাকাত পড়া। তবে কেউ চাইলে এর চেয়ে বেশিও পড়তে পারেন। এতে কোনো বাধা নেই।
✪ নামকরণ: রাতের নামাজকে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল (রাতের নফল সালাত) বলা হয়। রমজান মাসে রাতের প্রথম ভাগে কিছুটা সহজভাবে এই নামাজ পড়া হয় বলে একে ‘তারাবিহ’ বলা হয়। মূলত তাহাজ্জুদ ও তারাবিহ একই নামাজ।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

গ্রন্থনা ও সম্পাদনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

আল্লাহ আল্লাহ ও হু হু জিকির

 ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ ও ‘হু-হু’ জিকির: বিদআতি পীর ও ভ্রান্ত সুফিদের মনগড়া জিকির:

– শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুল মুহসিন আল বদর (হাফিযাহুল্লাহ)
“এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, বিভ্রান্ত কিছু পীর ও তাদের অনুসারীরা জিকিরের ফজিলতকে নিজেদের মনগড়াভাবে তিন ভাগে ভাগ করে থাকে:
✪ ১. সাধারণ মানুষের জিকির (ذكر العامة): তাদের মতে এটি হলো “لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ” (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা।
✪ ২. খাস বা বিশিষ্টদের জিকির (ذكر الخاصة): যা হলো শুধু “اللهُ، اللهُ” (আল্লাহ, আল্লাহ) বলা।
✪ ৩. খাসুল খাস বা অতি বিশিষ্টদের জিকির (ذكر خاصة الخاصة): যা হলো শুধু “هُوَ، هُوَ” (হু-হু) বলা।
ভ্রান্ত সুফিদের কিতাবগুলোতে এই মনগড়া নিয়মগুলো পাওয়া যায়। তারা মনে করে, আল্লাহর নাম “الله” (আল্লাহ) বা সর্বনাম “هُوَ” (হু) শব্দগুলো শত শত বার আওড়ানোই হলো শ্রেষ্ঠ জিকির। এমনকি তারা গোল হয়ে বসে বিকট শব্দে চিৎকার করে সমস্বরে এই জিকির করে।
হেদায়েতপ্রাপ্ত এক তওবাকারী ব্যক্তি—আল্লাহ তাকে রহম করুন—তার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেন: “আমরা এক বাগানে জড়ো হতাম এবং সবাই মিলে চিৎকার করে ‘হু, হু’ শব্দে জিকির করতাম। আল্লাহর কসম! আপনি যদি দেয়ালের ওপাশে থাকতেন, তবে আমাদের সেই আওয়াজ শুনে ভাবতেই পারতেন না যে এগুলো মানুষের কণ্ঠ! অথচ আমরা তখন মনে করতাম, আমরাই পৃথিবীর সেরা জিকিরকারী।”
❑ শরয়ি জিকির কেমন হওয়া উচিত?
পীরপন্থীদের এই পদ্ধতি স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা। এর প্রতিবাদে একটি মৌলিক কথা হলো: শরিয়তসম্মত জিকির হতে হলে তাকে অবশ্যই একটি পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবোধক বাক্য হতে হবে।
কুরআন ও সুন্নাহর জিকিরগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, সেগুলো সব পূর্ণাঙ্গ বাক্য এবং তার একেকটি চমৎকার অর্থ আছে:
سُبْحَانَ اللهِ
“আল্লাহ অতি পবিত্র।”
الْحَمْدُ للهِ
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।”
اللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
أَسْتَغْفِرُ اللهَ
“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
এখন প্রশ্ন হলো, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বা “হু, হু” বললে কী অর্থ প্রকাশ পায়? কোনো অমুসলিম যদি সারা দিনে হাজার বারও শুধু “আল্লাহ” শব্দটি বলে, সে কি মুসলমান হতে পারবে? কখনোই না। তাকে অবশ্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নামক পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি বলতে হবে। ঠিক একইভাবে জিকিরের ক্ষেত্রেও শুধু নাম নয় বরং পূর্ণ বাক্য বলা জরুরি।
❑ একক নামে জিকির যে বাতিল তার প্রমাণ:
একক নামে জিকির করাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা একটি চরম মূর্খতা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়:
১. তিনি বলেছেন,
أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللهِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।” [সহীহ মুসলিম]
২. তিনি আরও বলেছেন,
لأَنْ أَقُولَ سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ
“সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলা আমার কাছে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।” [সহীহ মুসলিম]
মোটকথা, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বলে জিকির করা শরিয়তসম্মত কোনো পদ্ধতি নয়। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ কথা বা বাক্যই নয়। কারণ এর দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ পায় না। এই পদ্ধতিতে না আছে কোনো প্রশংসা, না আছে কোনো সওয়াব।
সুতরাং আল্লাহর শেখানো ও রাসূলের দেখানো পদ্ধতি ছেড়ে পীরদের আবিষ্কৃত এই বিদআতি জিকির কখনোই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।” (সমাপ্ত)
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কেন আমাদের দুআ কবুল হয় না বা দুআ কবুলের প্রধান অন্তরায়গুলো কী

 আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে দুআ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে অনেক সময় আমাদের কিছু ভুল বা অসতর্কতার কারণে সেই দুআ প্রত্যাখ্যাত হয়।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দুআ কবুলের প্রধান বাধাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
▪️১. হারাম উপার্জন ও খাদ্যাভ্যাস:
দুআ কবুল না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে জীবনধারণ করা।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত, যার চুলগুলো এলোমেলো এবং দেহ ধূলিমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব!’ বলে ডাকছে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়েছে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“তবে তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে?” [সহীহ মুসলিম: ১০১৫]
▪️২. দুআর মধ্যে তাড়াহুড়ো করা:
অনেকে দুআ করার পর দ্রুত ফল চান এবং না পেলে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেন। এটি দুআ কবুলের অন্তরায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
“তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে; (তাড়াহুড়ো হলো) সে বলে যে, আমি দুআ করলাম কিন্তু আমার দুআ তো কবুল হলো না।” [সহিহ বুখারি: ৬৩৪০, সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৩. পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করা:
যদি কেউ অন্যায় কোনো কাজের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য দুআ করে তবে সেই দুআ কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ
“বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে কোনো পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করে।” [সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৪. উদাসীন মনে দুআ করা:
আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা না রেখে বা অমনোযোগী হয়ে দুআ করলে তা কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالإِجَابَةِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لاَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لاَهٍ
“তোমরা কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো এবং জেনে রেখো—নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দুআ কবুল করেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৯, সহিহ]
▪️৫. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ত্যাগ করা:
সমাজে যখন মানুষ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা ছেড়ে দেয় তখন তাদের দুআ কবুল হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلاَ يُسْتَجَابُ لَكُمْ
“অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে; নতুবা আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন তখন তোমরা তাঁর কাছে দুআ করবে কিন্তু তিনি তোমাদের দুআ কবুল করবেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ২১৬৯, হাসান]
▪️৬. নিরন্তর গুনাহ ও অবাধ্যতা:
গুনাহে লিপ্ত থাকা এবং তওবা না করা দুআর পথে বড় বাধা। যখন অন্তর পাপে আচ্ছন্ন থাকে তখন তা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়।
▪️৭. আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস বা সন্দেহ:
দুআ করার সময় যদি মনে সন্দেহ থাকে যে “আল্লাহ কবুল করবেন কি না” তবে সেই দুআর কার্যকারিতা কমে যায়। দৃঢ় বিশ্বাস দুআ কবুলের অন্যতম শর্ত। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
▪️৮. সময় ও অবস্থার প্রতি অজ্ঞতা:
কিছু বিশেষ সময় আছে যখন দুআ বেশি কবুল হয়—যেমন সিজদার সময়, রাতের শেষ প্রহর, জুমার দিন আসর নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, রোজা অবস্থায়, বিশেষভাবে ইফতারের মুহূর্ত, সফর অবস্থায়, বৃষ্টি বর্ষণের সময় ইত্যাদি। এসব মোক্ষম সময়কে অবহেলা করা মানে সুযোগ হারানো।
▪️৯. আল্লাহর হিকমত ও প্রজ্ঞা:
কখনো আল্লাহ আমাদের চাওয়া মতো দুআ কবুল না করে তার বদলে আমাদের জন্য যা উত্তম তা দান করেন। অথবা সেই দুআর বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করেন কিংবা তা আখিরাতের জন্য জমা রাখেন।
মোটকথা, আল্লাহর দরবারে দুআ হলো ইবাদতের মূল। তাই দুআ কবুলের জন্য প্রধান শর্ত হলো—নিজের উপার্জন হালাল রাখা, দুআর আদব রক্ষা করা এবং পূর্ণ একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আল্লাহর কাছে চাই তবে তিনি অবশ্যই আমাদের ডাক শুনবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate