অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
ভালোবাসি ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শান্তির ধর্ম
Friday, March 27, 2026
একজন সাহাবি থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে রাসুলুল্লাহ সালাতে তাকবিরের সাথে হাত তুলতেন না
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোনো একজন সাহাবি থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি সালাতে তাকবিরের সাথে হাত তুলতেন না:
প্রশ্ন: খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে কি এমন কোনো বর্ণনা এসেছে যে, তাঁরা সালাতে তাকবিরের সময় হাত তুলতেন না?
❑ প্রথমত: নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে এটি প্রমাণিত যে, তিনি সালাতের চারটি স্থানে তাকবিরের সাথে হাত তুলতেন (রফে ইয়াদাইন করতেন):
১. তাকবিরে তাহরিমার সময়,
২. রুকুতে যাওয়ার সময়,
৩. রুকু থেকে মাথা তোলার সময় এবং
৪. দুই রাকাত শেষ করে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময়।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সালাত শুরু করতেন তখন তাকবির দিতেন ও হাত তুলতেন, যখন রুকু করতেন তখন হাত তুলতেন, যখন ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখন হাত তুলতেন এবং যখন দুই রাকাত শেষ করে (তৃতীয় রাকাতের জন্য) দাঁড়াতেন তখন হাত তুলতেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭৩৯]
ইমাম বুখারি রহ. বলেন,
علي بن المديني – وكان أعلم أهل زمانه : “حق على المسلمين أن يرفعوا أيديهم لهذا الحديث” انتهى
‘আলি ইবনুল মাদিনি—যিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন—বলেছেন: “এই হাদিসের কারণে মুসলমানদের ওপর কর্তব্য হলো (সালাতে) হাত তোলা।”
সালাতে হাত তোলার এই হাদিসগুলো সাহাবিদের একটি বড় দল বর্ণনা করেছেন, যাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ জন। তাঁদের মধ্যে সাহাবি আবু হুমাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দশজন সাহাবির উপস্থিতিতে এটি বর্ণনা করেছেন (যাদের মধ্যে আবু কাতাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও ছিলেন)। তাঁরা সবাই এটি সত্যায়ন করেছেন এবং বলেছেন: “রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।” এছাড়া সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, ওয়ায়েল ইবনে হুজর, মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস, আনাস, আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সহ আরও অনেকে এটি বর্ণনা করেছেন। ফলে এই হাদিসটি ‘মুতাওয়াতির’ (অকাট্যভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাহাবিগণ নিজেরা এটি আমল করতেন এবং যারা আমল করত না তাদের প্রতি আপত্তি জানাতেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন দেখতেন কেউ হাত তুলছে না তখন তিনি তাকে ছোট পাথর ছুড়ে মারতেন এবং হাত তোলার নির্দেশ দিতেন। [ইমাম বুখারি তাঁর ‘রাফউল ইয়াদাইন’ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নববী রহ. একে সহিহ বলেছেন]
হাত না তোলার হাদিস সনদগতভাবে জয়িফ বা দুর্বল:
হানাফি মাজহাব মতে, তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্য কোথাও হাত তোলা সুন্নাত নয়। তারা এর বিপরীতে সাহাবি বারা ইবনে আযেব ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত দুটি হাদিস পেশ করেন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণের মতে, এই দুটি হাদিসের কোনটিই সহিহ নয়। সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনা, শাফেয়ি, আহমাদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ও বুখারি রহ. সহ বড় বড় ইমামগণ বারা ইবনে আযেব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন। একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আহমাদ, বুখারি ও দারা কুতনী রহ. সহ অনেকেই ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন।
❑ দ্বিতীয়ত: খোলাফায়ে রাশেদিন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)গণের পক্ষ থেকে সালাতে হাত তোলার (রফউল ইয়াদাইন) বিষয়টি বর্ণনার ক্ষেত্রে বলা যায়— ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব এবং আলি ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) উভয়েই নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে হাত তোলার হাদিসসমূহ বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁরা উভয়েই হাত তুলতেন এবং তাঁদের ব্যাপারে এর বিপরীত কিছু ধারণা করা জায়েজ নয়। এই কারণেই উলামায়ে কেরাম তাঁদেরকে ঐসব সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাঁরা সালাতে হাত তুলতেন। আর আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর ব্যাপারেও এমন বর্ণনা পাওয়া যায় যা এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করে। ইবনুল মুনযির তার ‘আল আওসাত’ গ্রন্থে (৩/৩০৪) ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস সানআনি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
أَخَذَ أَهْلُ مَكَّةَ رَفْعَ الْيَدَيْنِ فِي الصَّلَاةِ فِي الِافْتِتَاحْ وَالرُّكُوعِ ، وَرَفْعِ الرَّأْسِ مِنَ الرُّكُوعِ عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ ، وَأَخَذَهُ ابْنُ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ ، وَأَخَذَهُ عَطَاءٌ عَنِ ابْنِ الزُّبَيْرِ، وَأَخَذَهُ ابْنُ الزُّبَيْرِ عَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ ، وأخذه أبو بكر الصديق عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“মক্কাবাসীরা সালাত শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত তোলার পদ্ধতি ইবনে জুরাইজ থেকে গ্রহণ করেছেন। ইবনে জুরাইজ এটি আতা থেকে গ্রহণ করেছেন, আতা এটি ইবনুয যুবাইর থেকে গ্রহণ করেছেন, ইবনুয যুবাইর এটি আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে গ্রহণ করেছেন এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এটি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে গ্রহণ করেছেন।” [আল আওসাত লি ইবনিল মুনযির: ৩/৩০৪]
ইমাম বায়হাকি (২৫৩৫) কয়েকজন সাহাবি থেকে হাত তোলার বিষয়টি বর্ণনা করার পর বলেন:
وروينا عن أبي بكر الصديق ، وعمر بن الخطاب ، وعلي بن أبي طالب ، وجابر بن عبد الله ، وعقبة بن عامر ، وعبد الله بن جابر البياضي رضي الله عنهم
“আমরা আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, উকবাহ ইবনে আমের এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জাবির আল বায়াদী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এটি বর্ণনা করেছি।” [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২৫৩৫]। কিছু মানুষ আবু বকর, উমর এবং আলি ((রাদিয়াল্লাহু আনহু)ম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা সালাতে হাত তুলতেন না। কিন্তু তাঁদের থেকে বর্ণিত এই কথাটি সঠিক নয়।
ইমাম শাফেয়ি (রাহ.) বলেন:
ولا يثبت عن علي وابن مسعود ، يعني : ما روي عنهما أنهما كانا لا يرفعان أيديهما من غير تكبيرة الإحرام
“আলি এবং ইবনে মাসউদ থেকে তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্য কোথাও হাত না তোলার যে বর্ণনা দেওয়া হয়, তা প্রমাণিত নয়।” [আল মাজমু’ শরহুল মুহাযযাব: ৩/৩৬৮]
বরং ইমাম বুখারি (রাহ.) বলেছেন:
لم يثبت عن أحد من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه لم يرفع يديه
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোনো একজন সাহাবি থেকেও এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি হাত তুলতেন না।” [জুযউ রফইল ইয়াদাইন]
হাসান বসরি (রাহ.) বলেন:
رأيت أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم يرفعون أيديهم إذا كبروا وإذا ركعوا وإذا رفعوا رؤوسهم
“আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবিদের দেখেছি, তাঁরা যখন তাকবির দিতেন, রুকুতে যেতেন এবং রুকু থেকে মাথা তুলতেন, তখন হাত তুলতেন।”
ইমাম বুখারি বলেন:
فلم يستثن أحدا من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم
“তিনি (হাসান বসরি) রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবিদের মধ্যে কাউকে এর ব্যতিক্রম করেননি।” [জুযউ রফইল ইয়াদাইন]
কয়েকজন ইমাম খোলাফায়ে রাশেদিনের পক্ষ থেকে হাত তোলা বা রফউল ইয়াদাইন সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। ইমাম বায়হাকি এই বিষয়ের আলোচনা সমাপ্ত করেছেন ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক আল ফকিহ এর একটি উক্তি দিয়ে তিনি বলেন:
قد صح رفع اليدين عن النبي صلى الله عليه وسلم ثم عن الخلفاء الراشدين ، ثم عن الصحابة والتابعين
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে (এই স্থানগুলোতে) হাত তোলা সহিহভাবে প্রমাণিত, অতঃপর খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে, এরপর সাহাবি ও তাবেয়িগণের থেকেও তা প্রমাণিত।” [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২/৭৭] [আল আওসাত: ৩/২৯৯ ৩০৮, আল মাজমু’: ৩/৩৬৭ ৩৭৬, আল মুগনী: ২/১৭১ ১৭৪] আল্লাহই ভালো জানেন।
[সোর্স: islamqa, প্রশ্ন নং ২২৪৬৩৫]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
জানাজা বহনের সময় উচ্চস্বরে জিকির করার বিধান
জানাজা বহনের সময় উচ্চস্বরে জিকির করার বিধান। [সৌদি আরবের সাবেক মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)]
প্রশ্ন: সিরিয়ার জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছেন যে, আমাদের এলাকায় জানাজা নিয়ে কবরস্থানে যাওয়ার সময় মানুষ উচ্চস্বরে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” পাঠ করে। এটি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, নাকি এটি একটি নিষিদ্ধ বিদআত?
উত্তর: এটি একটি বিদআত-যার কোনো ভিত্তি নেই। সালাফে সালেহীন (পূর্বসূরিগণ) যখন জানাজার সাথে যেতেন, তখন তারা নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখতেন। তারা তখন মৃত্যু এবং মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও নসিহত গ্রহণ করতেন। জানাজার সাথে এভাবে উচ্চস্বরে জিকির করার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
তবে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা শেষ হলে তার জন্য দোয়া করা শরিয়তসম্মত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত ব্যক্তির দাফন শেষ করতেন তখন কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন:
استغفروا لأخيكم، وسلوا له التثبيت، فإنه الآن يُسأل
“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার দৃঢ়তার (সওয়াল-জওয়াবের সময় অটল থাকার) জন্য দোয়া করো। কারণ এখনই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
তাই সুন্নাহ হলো, দাফনের পর দোয়া করা—”হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তাকে দৃঢ় রাখুন, তাকে জান্নাত দান করুন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন।” দাফনের পর এভাবে ক্ষমা ও দৃঢ়তার দোয়া করা অত্যন্ত উত্তম কাজ। কিন্তু জানাজা নিয়ে যাওয়ার সময় বা দাফনের সময় বিশেষ পদ্ধতিতে উচ্চস্বরে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” বলা ভিত্তিহীন।
◈ এই প্রসঙ্গে ইসলাম ওয়েব-এ লেখা হয়েছে:
জিকির করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত-এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জানাজার পেছনে দলবদ্ধভাবে জোরে জোরে জিকির করা একটি নতুন প্রথা (বিদআত)। এই কাজ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর সাহাবি বা শ্রেষ্ঠ যুগের বুজুর্গদের কেউ করেননি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সব ধরনের নতুন উদ্ভাবিত দ্বীনি প্রথা বা বিদআত থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করল যা তার অংশ নয়, তবে তা বাতিল।”
অন্য এক বর্ণনায় আছে:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عليهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করল যার স্বপক্ষে আমাদের কোনো নির্দেশ নেই, তবে তা বর্জনীয়।” [সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] (সংক্ষেপিত)
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
মৃত ব্যক্তির খাটিয়া বহনের সময় নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর কাঁধ পরিবর্তনের বিধান
প্রশ্ন: আমাদের সমাজে একটি প্রথা প্রচলিত আছে যে, বাসা থেকে জানাজার খাটিয়া বের করার পর ৪০ কদম পর্যন্ত প্রতি ১০ কদম পর পর বহনকারীরা কাঁধ পরিবর্তন করেন। ইসলামি শরিয়তে কি এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট বিধান বা নিয়ম রয়েছে?
উত্তর: না, শরিয়তে এমন কোনো বিধান নেই। এটি একটি মনগড়া প্রথা এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে বিদআত (নতুন প্রবর্তিত আমল) হিসেবে গণ্য করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনা হলো, বাসা থেকে লাশ বের করার পর তা দ্রুত নিয়ে যাওয়া। নির্দিষ্ট করে ৪০ কদম গোনা বা প্রতি ১০ কদম পর কাঁধ পরিবর্তন করার শরিয়তসম্মত কোনো প্রয়োজন বা ভিত্তি নেই।
তবে বিবেচ্য বিষয়:
বহনকারীরা যদি বাস্তব প্রয়োজনে (যেমন: ক্লান্ত হয়ে গেলে বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য) কাঁধ পরিবর্তন করেন তবে তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এটিকে শরিয়তের অংশ বা সওয়াবের কাজ মনে করে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা দূরত্বের সাথে শর্তযুক্ত করার সুযোগ নেই।
উত্তর প্রদানে: ডক্টর শাইখ সাইফুল্লাহ মাদানি (সোর্স: NTV BD)
হাদিসটি হল, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
“مَنْ حَمَلَ جَوَانِبَ السَّرِيرِ الْأَرْبَعِ، كَفَّرَ اللَّهُ عَنْهُ أَرْبَعِينَ كَبِيرَةً”
“যে ব্যক্তি খাটিয়ার চার কোণ (পর্যায়ক্রমে) বহন করবে, আল্লাহ তাআলা তার চল্লিশটি কবিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।”
মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ ও হাদিসের মান:
মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল (যয়িফ) বা পরিত্যক্ত (মুনকার)।
এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিশিষ্ট ইমামগণের মতামত নিচে দেওয়া হলো:
– ইমাম আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে ‘মুনকার’ (প্রত্যাখ্যাত) এবং ‘যয়িফ জিদান’ (অত্যন্ত দুর্বল) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [দ্রষ্টব্য: সিলসিলাতুদ দায়িফাহ: ১৮৯১, যয়িফ আল জামি: ৫৫৬৬]
– ইমাম হাইসামি (রহ.) বলেন, এই হাদিসের বর্ণনাকারীসূত্রে ‘আলী বিন আবি সারা’ নামের একজন রাবী আছেন, যিনি অত্যন্ত দুর্বল। [দ্রষ্টব্য: মাজমাউয যাওয়াইদ: ৩/২৯]
মোটকথা, জানাজার খাটিয়া বহন করা নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্টভাবে ‘৪০ কদম’ হাঁটা বা এর বিনিময়ে ‘৪০টি কবিরা গুনাহ মাফ’ হওয়ার বিষয়টি কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। যদিও কতিপয় ফকিহ একে মুস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তা নির্ভরযোগ্য হাদিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি
ইসলাম পৃথিবীতে দাস-দাসী প্রথা সৃষ্টি করেনি বরং আরবে এবং তৎকালীন বিশ্বে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও সামাজিক প্রথা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। ইসলাম একে সরাসরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এমন এক বৈপ্লবিক সংস্কার ও মুক্তির পথ উন্মোচন করেছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এই প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।
ইসলাম কেন একতরফাভাবে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেনি। তার মূল কারণ ছিল, এটি একটি আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক (Reciprocal) বিষয়। এর সাথে সামরিক ও কৌশলগত বিষয় জড়িয়ে আছে। কেননা তৎকালীন যুদ্ধনীতি অনুযায়ী, কাফেররা যুদ্ধে জয়ী হয়ে মুসলিম সৈন্যদের দাস হিসেবে গ্রহণ করত। যদি মুসলিমরা একতরফাভাবে এই প্রথা নিষিদ্ধ করত। তবে শত্রুরা মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের দাস বানিয়ে শ্রম ও শক্তিতে বলীয়ান হতো।
কিন্তু মুসলিমরা সেই কৌশলগত সুবিধা হারাত। এতে প্রকারান্তরে পরাজয়ের চাবিকাঠি শত্রুদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
তবে হ্যাঁ, ইসলামের মূলনীতি হলো—শত্রুপক্ষ যদি যুদ্ধে জয়ী হয়ে কাউকে দাস না বানানোর বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয় তবে মুসলিমদের জন্যও সেই চুক্তি মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ (চুক্তি) পূর্ণ করো।” [সূরা মায়িদাহ: ১]
তিনি আরো বলেছেন:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
“আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে।” [সূরাইসরা: ৩৪]
ক. ইসলাম দাস মুক্তিকে কেবল একটি মানবিক কাজ নয় বরং মহান ইবাদত এবং পরকালীন মুক্তির মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে।
মহান আল্লাহ বলেন,
فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ – وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ – فَكُّ رَقَبَةٍ
“অতঃপর সে ধর্মের দুর্গম ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি কি জানেন সেই দুর্গম ঘাঁটি কী? তা হলো কোনো দাসকে মুক্ত করা।” [সূরা বালাদ: ১১-১৩]
খ. দাসমুক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ:
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন,
“مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُؤْمِنَةً، أَعْتَقَ اللَّهُ بِكُلِّ إِرْبٍ مِنْهَا إِرْبًا مِنْهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি কোনো মুমিন দাসকে মুক্ত করবে, আল্লাহ তার (দাসের) প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে এই ব্যক্তির প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন।” [সহীহ বুখারী: ৬৭১৫, সহীহ মুসলিম: ১৫০৯]
ইসলাম আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্তির বহুমুখী পথ তৈরি করেছে:
ক. মুকাতাবা (চুক্তিভিত্তিক মুক্তি):
কোনো দাস স্বাধীন হতে চাইলে মালিকের সাথে আর্থিক চুক্তির আইনি অধিকার পাবে।
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا
“তোমাদের মালিকানাধীন দাসদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে চুক্তি করো যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ দেখতে পাও।” [সূরা নূর: ৩৩]
খ. উম্মে ওয়ালাদ (সন্তানবতী দাসীর মর্যাদা):
যদি কোনো দাসীর গর্ভে তার মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে তাকে ‘উম্মে ওয়ালাদ’ বলা হয়। তাকে আর বিক্রি করা যায় না এবং মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যায়।
গ. কাফফারার মাধ্যমে মুক্তি:
কসম ভঙ্গ, ভুলবশত মানুষহত্যা বা রমজান মাসে দিনের বেলা স্ত্রী সহবাসের মতো ভুলের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ইসলাম দাস মুক্তিকে বাধ্যতামূলক করেছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ
“অতঃপর একজন মুমিন দাস মুক্ত করা আবশ্যক।” [সূরা নিসা: ৯২]
ঘ. পবিত্র কুরআনে জাকাতের আটটি খাতের একটি নির্ধারণ করা হয়েছে দাস মুক্তির জন্য। [সূরা তাওবা: ৬০]
যতক্ষণ কেউ অধীনস্থ থাকত তার অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
ক. প্রখ্যাত সাহাবি আবু যার (রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন,
“إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ”
“তারা (অধীনস্থরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। অতএব যার ভাই তার অধীনে থাকে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাকে তাই পরায় যা সে নিজে পরে। আর তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের সাধ্যের বাইরে; যদি এমন কাজ দাও তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।” [সহীহ বুখারী: ৩০, সহীহ মুসলিম: ১৬৬১] (মান: সহিহ)
খ. ক্ষমা ও সহনশীলতা:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ نَعْفُو عَنِ الْخَادِمِ فَصَمَتَ ثُمَّ أَعَادَ عَلَيْهِ الْكَلاَمَ فَصَمَتَ فَلَمَّا كَانَ فِي الثَّالِثَةِ قَالَ: “اعْفُوا عَنْهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً”
“আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! আমরা অধীনস্থকে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন: প্রতিদিন তাকে সত্তরবার ক্ষমা করবে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৫১৬৪, মান: হাসান সহিহ]
গ. আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ”
“অধীনস্থ ব্যক্তির জন্য রয়েছে তার খাদ্য ও পোশাক। আর তাকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।” [সহীহ মুসলিম: ১৬৬২] (মান: সহিহ)
বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের সেই ‘দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নীতি’ অনুযায়ী, যেহেতু এখন বিশ্বব্যাপী কোনো জাতিই যুদ্ধবন্দীকে দাস বানায় না, তাই এই চুক্তি মেনে চলা ইসলামের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।
– Slavery Convention (1926): বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুসমর্থন জানিয়ে দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
– সংবিধানের বিধান:
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম বা দাসত্ব আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
ইসলামে দাসপ্রথা কোনো স্থায়ী বিধান ছিল না বরং তা ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত ব্যবস্থা। ইসলাম একদিকে যেমন দাসদের মানবিক অধিকার ও ভ্রাতৃত্বের মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে বহুমুখী আইনি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রথা বিলুপ্ত হওয়া ইসলামের সেই উদার ও মানবিক লক্ষ্যকেই পূর্ণতা দান করেছে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
রমজানের সিয়ামের পর শাওয়াল মাসে মাত্র ৬টি সিয়াম রাখলেই সারা বছর সিয়াম পালনের সওয়াব হয়
প্রশ্ন: রমজানের সিয়ামের পর শাওয়াল মাসে মাত্র ৬টি সিয়াম রাখলেই সারা বছর সিয়াম পালনের সওয়াব হয়। তা কীভাবে?
উত্তর: প্রথমে আমরা শাওয়াল মাসে ৬টি রোজা রাখার ফজিলতে হাদিসে কী বলা হয়েছে তা জেনে নেই।
প্রখ্যাত সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি রা. হতে বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
من صامَ رَمَضانَ، ثم أتبَعَه ستًّا من شوَّال، كان كصيامِ الدَّهرِ
“যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে অত:পর শাওয়ালে ছয়টি রোজা রাখবে, সে যেন (পূর্ণ) এক বছর রোজা রাখল।“ [সহিহ মুসলিম]
এর সমার্থবোধক আরও একাধিক হাদিস রয়েছে।
➧ ৬টি রোজার মাধ্যমে কীভাবে পূর্ণ এক বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়?
৬টি রোজার মাধ্যমে কীভাবে এক বছরের রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায় তার ব্যাখ্যা স্বয়ং আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিয়েছেন নিম্নোক্ত হাদিসে:
◈ সাওবান রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
صيامُ شَهرِ رَمَضانَ بِعَشرةِ أشهُرٍ، وسِتَّةُ أيَّامٍ بَعْدهُنَّ بِشَهرينِ، فذلك تمامُ سَنَةٍ
“রমজানের এক মাসের রোজার বিনিময়ে দশ মাস এবং সেগুলোর পরে ছয় রোজার বিনিময়ে দু মাস—এভাবে এক বছরের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।” [মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ ইত্যাদি। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দ্রষ্টব্য: সহিহুল জামে, হা/৩৮৫১]
এ অর্থবোধক আরও একাধিক হাদিস রয়েছে।
অনুরূপভাবে কেউ যদি মাসে তিনটি নফল রোজা রাখে তাহলে আল্লাহ তাআলা দশগুণ বৃদ্ধি করে তাকে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখার সওয়াব দান করবেন। এভাবে প্রতি মাসে ৩টি করে রোজা রাখার মাধ্যমে সারা বছর রোজা রাখা সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।
◈ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,
«وَإِنَّ بِحَسْبِكَ أَنْ تَصُومَ كُلَّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، فَإِنَّ لَكَ بِكُلِّ حَسَنَةٍ عَشْرَ أَمْثَالِهَا، فَإِنَّ ذَلِكَ صِيَامُ الدَّهْرِ كُلِّهِ »
“… প্রত্যেক মাসে তিনটি সিয়াম রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। কারণ প্রত্যেক নেকির বিনিময়ে তুমি দশটি নেকি পাবে। আর এটাই পূর্ণ বছরের সিয়াম”। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৫৯]
উপরোক্ত হাদিস সমূহের সমর্থনে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি প্রযোজ্য:
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
“যে একটি নেকির কাজ করবে, সে তার অনুরূপ দশগুণ পাবে।” [সূরা আনআম: ১৬০]
সুবহানাল্লাহ! এভাবেই দয়াময় আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অল্প পরিশ্রমে প্রচুর নেকি অর্জনের সুযোগ দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
অতএব আমাদের উচিত যথাসম্ভব এই সুযোগগুলো কাজে লাগানো। আল্লাহ সকলকে তৌফিক দান করুন আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।
Subscribe to:
Comments (Atom)