Saturday, March 14, 2026

 চিরদিনের নাইওর গেলো, 

আমার.... পরানের সজনী............, 

‘দারুন আগুন জ্বলছে বুকে, এখন দিন রজনী’।।ও

 “আমি তারে দিলাম হৃদয়, দিলাম আমার মন..... 

প্রাণ সজনী হইলো তবু ,নিদয়া এমন”।।

 ”আমার ঘরে আইলো হায়রে”।। 

সর্বনাশা শনি....... 

দারুন আগুন জ্বলছে বুকে, এখন দিন রজনী।।ও

লাইলাতুল ক্বদর কি বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাতে সংঘটিত হয় এবং একজন মানুষের পক্ষে কি একই বছরে দুটি লাইলাতুল ক্বদরপাওয়া সম্ভব

 প্রশ্ন: লাইলাতুল ক্বদর কি বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাতে সংঘটিত হয়? আর একজন মানুষের পক্ষে কি একই বছরে দুটি লাইলাতুল ক্বদর পাওয়া সম্ভব?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:
▪️প্রথমত: লাইলাতুল ক্বদর কি দেশভেদে ভিন্ন হয়?
এ নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা যায়। বাস্তবে বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখার পার্থক্যের কারণে রমযান শুরু হওয়ার সময় ভিন্ন হতে পারে, ফলে তারিখেও কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে লাইলাতুল ক্বদর মূলত একই রাত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সময়ের ব্যবধান থাকার কারণে যখন যে স্থানে রাত নেমে আসে, তখনই সেখানে লাইলাতুল ক্বদর সংঘটিত হয়। এ ধরনের গায়েবি বিষয়কে মানুষের সীমিত হিসাবের মধ্যে নির্ধারণ করা সঠিক নয়। কারণ মানুষের দৃষ্টি, শ্রবণ ও চিন্তাশক্তি—সবকিছুরই একটি সীমা আছে; কিন্তু গায়েবের বিষয়গুলো সেই সীমার বাইরে। এগুলো মহান আল্লাহ তাআলাই তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী পরিচালনা করেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে রমযানের শেষ দশকে বিশেষ করে বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো তারিখ বলে যাননি যে, ঠিক কোন রাতটি লাইলাতুল ক্বদর হবে। বরং তিনি একাধিক হাদীসে বলেছেন,”তোমরা রমযানের শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাত্রিতে ক্বদর রাত্রি তালাশ করো”(সহীহ বুখারী, হা/২০১৭) অতএব, আপনি আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি বা থাকুন, বিশুদ্ধ নিয়তসহ রমযানের শেষ দশক বিশেষ করে বেজোড় রাত্রিগুলো অর্থাৎ আরাবী মাসের হিসাব যেহেতু রাত আগে আসে সে হিসাবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রাতগুলোতে যথাসাধ্য আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকুন। তবে বছরের ভিন্নতায় শেষ দশকের বিভিন্ন রাতে তা হতে পারে। এতে আশা করা যায় যে, মাহরুম হবেন না। কিন্তু সারা পৃথিবীতে একসাথে কেমন করে ক্বদর হবে? লাইলাতুল ক্বদর তো একটাই, এক দেশে রাত থাকা অবস্থায় তা হয়ে গেলে অন্যস্থানে কিভাবে হবে, এরকম অনর্থক চিন্তা ভাবনা করে সময় পার করে দিলে মাহরুম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং আসুন সবাই মিলে যুক্তি তর্ক না করে কুরআন সুন্নার আলোকে সালফে সালেহীনের মানহাজ অনুসরণ করি।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:
حَدِيث أُبَيّ بْن كَعْب أَنَّهُ كَانَ يَحْلِف أَنَّهَا لَيْلَة سَبْع وَعِشْرِينَ , وَهَذَا أَحَد الْمَذَاهِب فِيهَا , وَأَكْثَر الْعُلَمَاء عَلَى أَنَّهَا لَيْلَة مُبْهَمَة مِنْ الْعَشْر الْأَوَاخِر مِنْ رَمَضَان , وَأَرْجَاهَا أَوْتَارُهَا , وَأَرْجَاهَا لَيْلَة سَبْع وَعِشْرِينَ وَثَلَاث وَعِشْرِينَ وَإِحْدَى وَعِشْرِينَ , وَأَكْثَرهمْ أَنَّهَا لَيْلَة مُعَيَّنَة لَا تَنْتَقِل ، وَقَالَ الْمُحَقِّقُونَ : إِنَّهَا تَنْتَقِل فَتَكُون فِي سَنَة : لَيْلَة سَبْع وَعِشْرِينَ , وَفِي سَنَة : لَيْلَة ثَلَاث , وَسَنَة : لَيْلَة إِحْدَى , وَلَيْلَة أُخْرَى وَهَذَا أَظْهَر ، وَفِيهِ جَمْع بَيْن الْأَحَادِيث الْمُخْتَلِفَة فِيهَا “
“উবাই বিন কাব (রাঃ) এর হাদিসে এসেছে যে, তিনি হলফ করে বলতেন: লাইলাতুল ক্বদর হচ্ছে— সাতাশে রমযান”। এ মাসয়ালার অনেক অভিমতের মধ্যে এটিও একটি। তবে, অধিকাংশ আলেমের অভিমত হচ্ছে— এটি রমযানের শেষ দশরাতের অজ্ঞাত কোন এক রাত। এ দশরাতের মধ্যে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক হচ্ছে— বেজোড় রাতগুলো। বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে অধিক আশাব্যঞ্জক হচ্ছে— ২৭ রমযান, ২৩ রমযান ও ২১ রমযান। অধিকাংশ আলেমের মতে, এটি নির্দিষ্ট কোন একটি রাত; আবর্তিত হয় না। কিন্তু, সুক্ষ্মদর্শী আলেমদের মতে, লাইলাতুল ক্বদর আবর্তিত হয়। কোন বছর ২৭ শে রমযান, কোন বছর ২৩ রমযান এবং কোন বছর ২১ শে রমযান কিংবা অন্য কোন রাত। এ মতটির মাধ্যমে বিপরীতমুখী সবগুলো হাদিসের মাঝে সমন্বয় করা যায়।”(ইমাম নববীর ‘শারহু সহিহ মুসলিম’ খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৫)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: লাইলাতুল ক্বদর কি প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একই রাত্রি? নাকি দেশভেদে এটি আলাদা আলাদা হতে পারে?
জবাবে তিনি বলেছেন,
تكون ليلة واحدة ولو اختلف دخولها بالنسبة للبلدان،فتدخل في البلاد العربية عند غروب شمس نهارهم وتدخل عند البلاد الإفريقية أيضا عند غروب شمس نهارهم وغيرها من البلاد، فكلما غربت عند قوم دخلت عندهم ولو استغرق ذلك أكثر من 20 ساعة فتحسب لهؤلاء ليلتهم،ولهؤلاء ليلتهم،ولا مانع من أن تنزل الملائكة عند هؤلاء ، وهؤلاء أيضا.
“লাইলাতুল ক্বদরের রাত একটিই। যদিও দেশভেদে এটি প্রবেশের সময় ফারাক (ভিন্ন) হতে পারে। যেমন আরব দেশগুলোতে এটি প্রবেশ করবে তাদের দেশের দিনের বেলার সূর্য ডোবার মাধ্যমে। আফ্রিকার দেশ ও অন্যান্য দেশগুলোতে প্রবেশ করবে তাদের দেশের দিনের বেলার সূর্য ডোবার মাধ্যমে।তাই যেই দেশে সূর্য ডুবেছে সেই দেশে লাইলাতুল ক্বদর প্রবেশ করেছে; এমনকি সেটা যদি ২০ ঘন্টার চেয়ে বেশি সময় লাগে তবুও। এ সকল ব্যক্তিদের জন্য তাদের রাতকে হিসাব করা হবে। ঐ সকল ব্যক্তিদের জন্য তাদের রাতকে হিসাব কর হবে।এতেও কোন বাধা নেই যে, ফেরেশতারা এদের নিকটেও অবতীর্ণ হবে এবং ওদের নিকটেও অবতীর্ণ হবে। আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ১২৯৬৮৮)
.
▪️দ্বিতীয়ত: একজন মানুষের পক্ষে কি একই বছরে দুটি লাইলাতুল কদর পাওয়া সম্ভব?
.
যদি বিভিন্ন দেশে রমযান মাস শুরু হওয়ার সময় ভিন্ন হয়, তাহলে কোনো দেশে যে রাতটি বেজোড়, অন্য দেশে তা জোড় হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে লাইলাতুল কদর দুটি রাত—যাতে কেউ নিজের দেশে একটি পেয়ে আবার অন্য দেশে ভ্রমণ করে আরেকটি লাভ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে লাইলাতুল কদর একটিমাত্র রাত।উদাহরণস্বরূপ, যদি লাইলাতুল কদর রমজানের ২৭ তারিখে হয়, তাহলে মাস শুরু হওয়ার ভিন্নতার কারণে কোনো দেশে সেই ২৭ তারিখ মঙ্গলবার হতে পারে এবং অন্য দেশে বুধবার। কিন্তু বাস্তবে লাইলাতুল কদর এই দুই রাতের মধ্যে একটিই হবে। যদি তা মঙ্গলবার হয়, তবে বুধবার নয়; আর যদি বুধবার হয়, তবে মঙ্গলবার নয়।এমনও হতে পারে যে কোনো অঞ্চলের মানুষের কাছে সেই রাতটি ২৭ তারিখ, আর অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে ২৬ তারিখ। এখান থেকেই বোঝা যায়—জোড় রাতগুলোকে অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ কোনো অঞ্চলে সেটি জোড় হলেও অন্য অঞ্চলের জন্য তা বেজোড় হতে পারে, বিশেষত যখন রমজানের শুরু নির্ধারণে পার্থক্য থাকে।তবে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কেউ একই রাতের কিছু অংশ দুবার পেতে পারে। যেমন—যদি লাইলাতুল কদর মঙ্গলবার রাতে হয়, কেউ সেই রাতের একটি অংশ নিজের দেশে কাটানোর পর পশ্চিম দিকে সফর করলে সময়ের পার্থক্যের কারণে আবারও সেই রাতের অবশিষ্ট অংশ পেতে পারে। কারণ পৃথিবীতে রাত পূর্ব দিক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়।
.
শাইখ সুলেমান বিন ওয়াইল আল-তাওয়িজরি (হাফিজাহুল্লাহ) [জন্ম:১৩৬৭ হি:]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:রাসূল (ﷺ) লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে বলেছেন যে, এটি রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে অনুসন্ধান করতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিভিন্ন ইসলামী দেশে রমযান মাসের সূচনায় পার্থক্য থাকে। ফলে এক দেশে যে রাত বেজোড় হিসেবে গণ্য হয়, অন্য দেশে তা জোড় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোনো বছরে মিশর এবং সৌদি আরব এর মধ্যে রমযানের শুরুতে পার্থক্য দেখা যায়। এ কারণে মিশরে যে রাতগুলো বেজোড় হিসেবে ধরা হয়, সেগুলো সৌদি আরবে বেজোড় নাও হতে পারে। এ অবস্থায় লাইলাতুল ক্বদর নির্ধারণের ব্যাপারে কীভাবে বিষয়টি বোঝা উচিত? আর লাইলাতুল ক্বদর কি প্রকৃতপক্ষে একটি নির্দিষ্ট রাতই, নাকি দেশভেদে তা ভিন্ন হতে পারে? আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন এবং এই উত্তরের সওয়াব আপনাদের আমলনামায় যুক্ত করুন।” উত্তরে শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
الذي يظهر لي أنها لا تتكرر، وإنما هي ليلة واحدة في السنة، والنبي صلى الله عليه وسلم قال: “التمسوها في العشر الأواخر في الوتر” [رواه البخاري (2016)، ومسلم (1167) من حديث أبي سعيد الخدري رضي الله عنه]، فكل العشر محل لأن تقع فيها ليلة القدر من وتر وغيره، وهو لما قال: “في الوتر”، لم يلغ الالتماس في غير الوتر، كما أنه قال: “التمسوها ليلة سبع وعشرين” [انظر ما رواه مسلم (762) من حديث أُبي بن كعب رضي الله عنه]، أو: “أرى رؤياكم قد تواطأت في السبع الأواخر فمن كان متحريها فليتحرها في السبع الأواخر” [رواه البخاري (2015)، ومسلم (1165) من حديث ابن عمر رضي الله عنهما]، وقال: “التمسوها في سبع يمضين، أو سبع يبقين” [انظر ما رواه البخاري (2021)، وهذا اللفظ عند أحمد (2539)، من حديث ابن عباس رضي الله عنهما]، وهذا يختلف من الشهر كونه تسع وعشرين أو ثلاثين، وعلى هذا فهي ليلة واحدة، فإذا كانت مثلا ليلة السبع وعشرين في السعودية فهي ليلة ثمان وعشرين في مصر، أو إذا كانت ليلة سبع وعشرين في مصر فهي ليلة ست وعشرين في السعودية بالنسبة لرمضان هذه السنة، والإنسان مطلوب منه أن يجتهد في العشر كلها، وهي ليلة خفية لم يعلم ما هي بالتحديد، ولهذا كان عليه الصلاة والسلام يعتكف في العشر الأواخر؛ طلباً لثوابها وإدراكها، وهو على حال يكون فيها أحسن ما يكون من التقرب إلى الله تعالى وحسن المناجاة له. والله ولي التوفيق. سليمان بن وائل التويجري
“যা আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো লাইলাতুল ক্বদর পুনরাবৃত্তি হয় না; বরং এটি বছরে একটি রাতই। নবী ﷺ বলেছেন: এটি রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে খুঁজে দেখো” [সহীহ বুখারী হা/২০১৬, সহীহ মুসলিম হা/১১৬৭ আবু সাঈদ আল-খুদরীর রাওয়ায়াত]। সুতরাং শেষ দশকের প্রতিটি রাতই সম্ভাব্য লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে, বেজোড় হোক বা অন্য কোনো রাত। কারণ নবী (সঃ)বেজোড়ে খুঁজে দেখো বললেও এটি অন্য রাতগুলোতে খোঁজা বাতিল করে না। এছাড়াও তিনি বলেছেন: এটি ২৭ তারিখের রাতেই খুঁজো।[সহীহ মুসলিম হা/৭৬২), উবাই ইবন কাবের রাওয়ায়াত] অথবা: আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্ন শেষ সাত রাতে মিলেছে, যারা খুঁজতে চায় তারা শেষ সাত রাতে খুঁজুক। [সহীহ বুখারী (২০২৫), মুসলিম হা/১১৬৫), ইবন উমারের রাওয়ায়াত]। তিনি আরও বলেছেন: এটি শেষ সাত দিনের মধ্যেই খুঁজো, আগের সাত বা বাকি সাত দিন।[সহীহ বুখারী হা/২০২১), এই উক্তি আহমদের হাদিসে হা/২৫৩৯) ইবনু আব্বাসের রাওয়ায়াত]।মাসটি ২৯ বা ৩০ দিন হতে পারে, তাই অবস্থান অনুযায়ী রাতগুলো ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি লাইলাতুল ক্বদর সৌদি আরবে ২৭ তারিখ হয়, তবে মিশরে এটি ২৮ তারিখ হতে পারে; অথবা মিশরে ২৭ হলে সৌদি আরবে ২৬ তারিখ হতে পারে। মানুষের জন্য প্রয়োজন, শেষ দশক জুড়ে চেষ্টা করা, কারণ লাইলাতুল ক্বদর একটি গোপন রাত; কোনটা তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন, লাইলাতুল ক্বদরের সওয়াব লাভ এবং আল্লাহর নিকট সেরা উপায়ে নিকটতা অর্জনের জন্য। আল্লাহ আমাদের সহায় হোক। (শাইখ সুলেমান বিন ওয়াইল আল-তাওয়িজরি।)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: অনুগ্রহ করে আমাদের লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে কিছু বলুন। এটি কি সব মানুষের জন্যই একরকম, নাকি প্রতিজন ব্যক্তির জন্য আলাদা? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান।
.
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
:ليلة القدر ليلة عظيمة، بين الله شرفها سبحانه في كتابه العظيم، حيث قال : لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ [القدر:3]، وقال سبحانه في سورة الدخان: إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ۝ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ [الدخان:3-4] هي ليلة عظيمة، وأخبر النبي ﷺ أنها تكون في العشر الأواخر من رمضان، وكان يعتني بها ﷺ وكان يقوم العشر الأواخر من رمضان، يتحرى هذه الليلة، ويقول: التمسوها في العشر الأواخر، والتمسوها في كل وتر يعني الأوتار أرجى وأحرى، إحدى وعشرين، ثلاث وعشرين، خمس وعشرين، سبع وعشرين، تسع وعشرين، مع أنها تلتمس في الليالي كلها، لكنها في الأوتار أحرى، وأحراها ليلة سبع وعشرين.
والسنة للمسلمين رجالًا ونساء أن يتحروها في العشر كلها، وأن يجتهدوا في قيام هذه الليالي بالصلاة، والقراءة، والدعاء؛ تأسيًا بالنبي -عليه الصلاة والسلام- وطلبًا لهذه الليلة، والله يقول فيها سبحانه: لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ [القدر:3] يعني العمل فيها، والاجتهاد فيها بالأعمال الصالحات أفضل من العمل في ألف شهر مما سواها، وهذا فضل عظيم، نعم.
المقدم: جزاكم الله خيرًا، وأحسن إليكم، هل هي للناس كلهم أم لأشخاص دون أشخاص؟
الشيخ: للناس كلهم من تقبل الله منه، ووفقه للعمل فيها؛ حصل له هذا الأجر، سواء كان عربيًا، أو عجميًا، حضريًا، أو بدويًا، رجلًا، أو امرأة في أي مكان من الأرض، إذا اجتهد في هذه الليالي، وهو مسلم، ويرغب في الخير، اجتهد، وعمل الصالحات، فالله يعطيه أجره، سبحانه وتعالى، نعم.
المقدم: جزاكم الله خيرًا، كيف يعرف المرء أنه أصاب ليلة القدر؟
الشيخ: أخبر النبي ﷺ أنها تطلع الشمس في صباحها لا شعاع لها، وكان أبي بن كعب  الصحابي الجليل قد راقب ذلك سنوات كثيرة، فرآها تطلع صباح يوم سبع وعشرين، ليس لها شعاع، وكان يحلف على أنها ليلة سبع وعشرين بسبب هذه العلامة.
ولكن الصواب أنها قد تكون في غيرها، قد تكون عدة سنوات في ليلة سبع وعشرين، وقد تكون في سنوات أخرى في إحدى وعشرين، أو في ثلاث وعشرين، أو في خمس وعشرين أو في غيرها، فالاحتياط، والحزم، الاجتهاد في الليالي كلها، نعم.
المقدم: جزاكم الله خيرًا، وأحسن إليكم.
“লাইলাতুল ক্বদর একটি মহান রাত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহৎ কিতাবে এর মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন: লাইলাতুল ক্বদর এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।[সূরা আল-কদর: ৩] এবং সূরা দুখানেও বলেন: আমরা এটি একটি বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আমরা সতর্কীকরণকারী ছিলাম। সেই রাতে প্রতিটি বিচক্ষণ বিষয় নির্ধারিত হয় [সূরা দুখান: ৩–৪]এটি সত্যিই একটি মহান রাত। নবী (ﷺ) জানিয়েছেন যে এটি রমযানের শেষ দশকে ঘটে। তিনি এই রাতের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতেন এবং শেষ দশকের রাতগুলো জেগে ইবাদত করতেন। তিনি বলেন: এটি খুঁজে দেখো শেষ দশকের রাতগুলোতে, বিশেষ করে বেজোড় রাতে।অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯। যদিও এটি শেষ দশকের সব রাতে খুঁজে পাওয়া যায়, তবে বেজোড় রাতগুলোই সবচেয়ে সম্ভাব্য, আর সবচেয়ে সম্ভাব্য রাত হলো ২৭ তারিখ। ইসলামে মুসলিমদের জন্য পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই সুন্নত হলো শেষ দশকের সব রাতেই লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করা এবং এই রাতগুলোতে বিশেষ প্রচেষ্টা করা। অর্থাৎ সালাত আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া করা, সব কিছুতে জ্ঞান ও ত্যাগের সঙ্গে চেষ্টা করা। এটি নবী (ﷺ)-এর অনুকরণে এবং লাইলাতুল কদরের বরকত লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়।আল্লাহ এই রাতের মর্যাদা বলেছেন: লাইলাতুল ক্বদর এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।[সূরা আল-কদর: ৩] অর্থাৎ এই রাতে যে কোনো কাজ বা ইবাদত করা এবং সৎকর্মে পরিশ্রম করা, তা অন্য যে কোনো সময় এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এটি একটি বিশাল বরকতের বিষয়।
প্রশ্নকর্তা: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। এটি কি সকল মানুষের জন্য, নাকি কেবল কিছু ব্যক্তির জন্য?
শায়েখ: এটি সকল মানুষের জন্য, যারা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ও সক্ষম হয় এই রাতে ইবাদত করার জন্য। যে কেউ এই রাতগুলোতে চেষ্টা করে, তার জন্য সওয়াব আছে,চাই সে আরব হোক বা অনারব, শহুরে হোক বা মরুভূমির বাসিন্দা,পুরুষ হোক বা নারী, পৃথিবীর যে কোনো স্থানে থাকুক। যদি সে মুসলিম হয়, ভালোর আকাঙ্ক্ষা রাখে, চেষ্টা করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে তার প্রতিদান দান করবেন।
প্রশ্নকর্তা: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। মানুষ কীভাবে জানতে পারে যে সে লাইলাতুল ক্বদর পেয়েছে?
শায়েখ: নবী (ﷺ) জানিয়েছেন যে সেই সকালে সূর্য উঠবে, কিন্তু তার কোনো রশ্মি থাকবে না। সম্মানিত সাহাবি উবাই ইবন কাব অনেক বছর এই রাতটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, ২৭ তারিখের সকালে সূর্য ওঠে, কিন্তু কোনো রশ্মি নেই। এই লক্ষণ দেখে তিনি দৃঢ়ভাবে শপথ করতেন যে লাইলাতুল কদর ২৭ তারিখের রাতই। কিন্তু সঠিক হলো, এটি অন্য রাতেও হতে পারে। কিছু বছরে লাইলাতুল ক্বদর ২৭ তারিখে হতে পারে, আবার অন্য বছরে এটি ২১, ২৩, ২৫ বা অন্য কোনো রাতে হতে পারে। তাই সবচেয়ে নিরাপদ হলো শেষ দশকের সব রাতেই চেষ্টা ও পরিশ্রম করা।
প্রশ্নকর্তা: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনাকে ভালো রাখুক।”(শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৫৪৬৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানোর ইসলামী বিধান

 প্রশ্ন: ইসলামী শরী‘আতে কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানোর বিধান কি? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ইসলামি শরিয়তের মৌলিক নীতিমালা এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আগন্তুকের সম্মানে দাঁড়ানোর বিষয়টি মূলত তিন প্রকারে বিভক্ত। প্রত্যেক প্রকারের পক্ষে শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল বিদ্যমান রয়েছে এবং আহলুস সুন্নাহর প্রসিদ্ধ আলেমগণ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপটের ভিন্নতার কারণে এসব প্রকারের বিধানও ভিন্ন ভিন্ন। কেননা এ বিষয়ে রাসূল (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিভিন্ন ধরনের হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা এই পার্থক্যকে নির্দেশ করে। তাই নিম্নে আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি প্রকার সম্পর্কে রাসূল ﷺ-এর হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আসার এবং পরবর্তী যুগের প্রসিদ্ধ আলেমদের বক্তব্য উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।
.
আলেমগণ বলেছেন দাঁড়ানো তিন প্রকার:
.
▪️প্রথম প্রকার: কোনো ব্যক্তি বসে থাকে আর অন্যরা তাকে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে থাকে—যেমন অমুসলিম জাতিগুলো তাদের রাজা-বাদশাহ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। ইসলামে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শন জায়েজ নয়। নবী (ﷺ) এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবী জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাদিসে এসেছে, একবার রাসূল (ﷺ) বসা অবস্থায় সাহাবীদের নিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি সাহাবীদেরও তাঁর সাথে বসে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেন। কিন্তু যখন তারা দাঁড়িয়ে পড়লেন, তখন তিনি তাদের সতর্ক করে বললেন:إِنْ كِدْتُمْ آنِفًِا لَتَفْعَلُونَ فِعْلَ فَارِسَ وَالرُّومِ يَقُومُونَ عَلَى مُلُوكِهِمْ وَهُمْ قُعُودٌ فَلاَ تَفْعَلُوا”তোমরা পারস্য ও রোমের (সাম্রাজ্যের) লোকদের মতোই করতে যাচ্ছিলে। তাদের বাদশাহ বসে থাকে আর তারা দাঁড়িয়ে থাকে। তোমরা কখনো এমন করো না।”(সহীহ মুসলিম হা/৮১৪)। তাছাড়া অনেক অহংকারী মানুষ নিজে থেকেই চায় যে, তার জন্য দাঁড়ানো হোক। যদি এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো হয় যে, অহংকারবশত চায় যে তাকে দেখলে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকুক এটি নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:”من سره أن يتمثل له الرجال قياما فليتبوأ مقعده من النار”যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে মানুষ তার সম্মানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”(সুনানে তিরমিজি: ২৭৫৫) হাদিসটি প্রমান করে যে, কোনো ব্যক্তি যদি মনে মনে কামনা করে যে মানুষ তাকে দেখে সম্মানার্থে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক, তবে তার এই অহংকারী মানসিকতা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতবর্ষে হাদীসশাস্ত্রের আরেক দিকপাল, মিশকাতুল মাসাবীহ’র বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ’র সম্মানিত মুসান্নিফ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, ইমাম ‘উবাইদুল্লাহ বিন ‘আব্দুস সালাম মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪১৪ হি./১৯৯৪ খ্রি.] বলেছেন:وقيام المتعلم للمعلم مستحب غير مكروه , وقال البيهقي : هذا القيام يكون على وجه البر والإكرام ، كما كان قيام الأنصار لسعد ، وقيام طلحة لكعب بن مالك ، ولا ينبغي للذي يقام له أن يريد ذلك من صاحبه ، حتى إن لم يفعل حقد عليه أو شكاه أو عاتبه “শিক্ষকের সম্মানে শিক্ষার্থীর উঠে দাঁড়ানো মুস্তাহাব (প্রশংসনীয়), এটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয়। ইমাম বায়হাকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: এই উঠে দাঁড়ানোটা হতে হবে কেবল শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে; যেভাবে আনসার সাহাবীগণ সা’দ (রা.)-এর সম্মানে এবং তালহা (রা.) কাব বিন মালিক (রা.)-এর খুশিতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে, যাঁর সম্মানে দাঁড়ানো হচ্ছে, তাঁর মনে এমন আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত নয় যে লোকে তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াবে। এমনকি যদি কেউ তার জন্য দাঁড়ায় না, তবে সে যেন তার উপর রাগ না করে, অভিযোগ না করে বা ভর্ৎসনা না করে।”(মির‘আতুল মাফাতীহ; মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ; খণ্ড: ৭ হা/২৯৭৪)
.
ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ)-কে এমন এক নারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে তার স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে; যেমন—স্বামী (বাড়ি ফিরলে) তার সাথে দেখা করতে এগিয়ে যায়, তার গায়ের কাপড় ও জুতো খুলে দেয় এবং স্বামী বসা পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে থাকে। ​জবাবে ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:أَمَّا تَلَقِّيهَا ونزعها ثيابه ونعليه فَلَا بأس، وَأَمَّا قيامها حَتَّىٰ يجلس فلا، وهذا مِنْ فعل الْجَبَابِرَةِ“তার এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানানো এবং স্বামীর গায়ের কাপড় ও জুতো খুলে দেওয়ার মধ্যে কোনো অসুবিধা নেই। তবে স্বামী বসা পর্যন্ত তার দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না; কারণ এটি স্বৈরাচারী ও অহংকারী শাসকদের সংস্কৃতি।”(ইবনু হাজার; ফতহুল বারী; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ৫১)
.
কখনও এমন হয় যে, মানুষ কারও (আগমনের) অপেক্ষায় থাকে এবং সে আসা মাত্রই তারা দাঁড়িয়ে যায়—এটিও ইসলামের রীতিনীতি নয়। বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ) খলিফা হওয়ার পর প্রথমবার যখন মানুষের সামনে বের হলেন, তখন তারা (তাঁকে দেখে) দাঁড়িয়ে গেল। তিনি এটি অপছন্দ করলেন এবং বললেন:إن تقوموا نقم وإن تقعدوا نقعد، وإنما يقوم الناس لرب العالمين”আপনারা যদি দাঁড়ান তবে আমরাও দাঁড়াব, আর আপনারা বসলে আমরাও বসব। মানুষ কেবল রব্বুল আলামীনের জন্যই (ইবাদতে) দণ্ডায়মান হবে।'”
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন: “بلغني أن كثيراً من المدرسين يأمرون الطلبة بالقيام لهم إذا دخلوا عليهم الفصل ولا شك أن هذا مخالف للسنة الصحيحة .فقد ثبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال : ( من أحب أن يمثل له الرجال قياماً فليتبوأ مقعده من النار) أخرجه الإمام أحمد وأبو داود والترمذي عن معاوية رضي الله عنه بإسناد صحيح ، وروى الإمام أحمد والترمذي بإسناد صحيح عن أنس رضي الله عنه قال : ” لم يكن شخص أحب إليهم – يعني الصحابة رضوان الله عليهم – من رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وكانوا لا يقومون له إذا دخل عليهم لما يعلمون من كراهيته لذلك ” .فالسنة ، عدم القيام للمدرسين إذا دخلوا على الطلبة في الفصول عملاً بهذين الحدثين الشريفين . وما جاء في معناهما .ولا يجوز للمدرس أن يأمرهم بالقيام ، لما في حديث معاوية من الوعيد في ذلك ، ويكره للطلبة أن يقوموا عملاً بحديث أنس المذكور ، ولا يخفى أن الخير كله في اتباع سنة الرسول صلى الله عليه وسلم والتأسي به وأصحابه رضي الله عنهم ، جعلنا الله وإياكم من أتباعهم بإحسان ، ووفقنا للفقه في دينه ، والثبات عليه” “আমার কাছে খবর এসেছে যে অনেক শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করলে ছাত্রদেরকে তাদের জন্য দাঁড়াতে নির্দেশ দেন। নিঃসন্দেহে এটি সহীহ সুন্নাহর বিরোধী। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে যে তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে লোকেরা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার আসন প্রস্তুত করে।” এটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ ও তিরমিযী, মুআবিয়া (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে। আর ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী সহীহ সনদে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন: সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে প্রিয় কেউ ছিল না। তবুও তিনি যখন তাদের কাছে প্রবেশ করতেন, তারা দাঁড়াতেন না‌ কারণ তারা জানতেন তিনি এটি অপছন্দ করতেন। অতএব সুন্নাহ হলো, শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করবেন তখন ছাত্রদের তার জন্য দাঁড়িয়ে না যাওয়া, এই দুইটি সম্মানিত হাদিসের উপর আমল করার জন্য এবং এ ধরনের অন্যান্য বর্ণনার আলোকে। শিক্ষকের জন্য ছাত্রদের দাঁড়াতে আদেশ করা বৈধ নয়। কারণ মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। আর ছাত্রদের জন্য দাঁড়ানো মাকরূহ, উপরোক্ত আনাস (রাঃ)-এর হাদিস অনুযায়ী।এ কথা গোপন নয় যে, সমস্ত কল্যাণই রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের (রাঃ) আদর্শ অনুসরণ করার মধ্যে।আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদেরকে তাদের উত্তম অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন ও তার উপর দৃঢ়ভাবে অবিচল রাখুন।”(মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ৩৪৭)
.
অপর ফাতওয়ায় তিনি (শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:قيام البنات للمُدرسة والبنين للمُدرس أمر لا ينبغي ، وأقل ما فيه الكراهة الشديدة ، لقول أنس رضي الله عنه : (ولم يكن أحد أحب إليهم – يعني الصحابة رضي الله عنهم – من رسول الله صلى الله عليه وسلم ، ولم يكونوا يقومون له إذا دخل عليهم ، لما يعلمون من كراهته لذلك) ، وقول النبي صلى الله عليه وسلم : (من أحب أن يمثل له الرجال قياماً فليتبوأ مقعده من النار) .وحكم النساء حكم الرجال في هذا الأمر ، وفق الله الجميع لما يرضيه وجنبنا جميعاً مساخطه ، ومنح الجميع العلم النافع والعمل به ، إنه جواد كريم”মেয়েদের তাদের শিক্ষিকার জন্য দাঁড়ানো এবং ছেলেদের তাদের শিক্ষকের জন্য দাঁড়ানো উচিত নয়। এর অন্ততপক্ষে হুকুম হলো কঠোরভাবে মাকরূহ। কারণ আনাস (রাঃ) বলেন: সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে প্রিয় আর কেউ ছিল না। তবুও তিনি যখন তাদের কাছে প্রবেশ করতেন, তারা দাঁড়াতেন না কারণ তারা জানতেন তিনি এটি অপছন্দ করতেন। নবী সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে লোকেরা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার আসন প্রস্তুত করে। এই বিষয়ে নারীদের হুকুমও পুরুষদের মতোই।আল্লাহ সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির কাজ করার তাওফিক দিন, আমাদের সবাইকে তাঁর অসন্তোষের কাজ থেকে রক্ষা করুন এবং সবাইকে উপকারী জ্ঞান ও তার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। নিঃসন্দেহে তিনি দয়ালু ও দানশীল।”(ফাতাওয়া উলামাউল বালাদিল হারাম; পৃষ্ঠা: ৩৯০)
.
▪️দ্বিতীয় প্রকার: কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোন স্থানে প্রবেশ করলে বা সেখান থেকে বের হয়ে গেলে তার সাথে মুসাফাহা বা সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্য ছাড়াই কেবল তাকে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো। এ ধরনের দাঁড়ানোর সর্বনিম্ন বিধান হলো—এটি মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। কারণ সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) যখনই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হতেন কিংবা তিনি তাদের কাছে আগমন করতেন, তখন তাঁরা সৃষ্টির সর্বোত্তম ও সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তির জন্যও দাঁড়াতেন না। কেননা তাঁরা ভালোভাবেই জানতেন যে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ধরনের আচরণ পছন্দ করতেন না। যেমন-প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:مَا كَانَ شَخْصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ رُؤْيَةً مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ، لِمَا يَعْلَمُونَ مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لِذَلِكَ”.সাহাবীগণের নিকট নবী (ﷺ)-এর দর্শন যতো প্রিয় ছিল, আর কারো দর্শন তাদের নিকট এতো প্রিয় ছিলো না। অথচ তারা তাঁকে (আসতে) দেখে তাঁর (সম্মানার্থে) কখনো উঠে দাঁড়াতেন না। কেননা তারা জানতেন যে, তা তাঁর অপছন্দীয়।”(ইমাম বুখারী, আদাবুল মুফরাদ হা/৯৫৪; মুসনাদে আহমেদ হা/১২৩৪৫; সুনানে তিরমিজি হা/২৭৫৪; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সহীহ বলেছেন। দেখুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন; তবুও তারা তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকতেন না।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.]- কে কারও আগমনের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি? এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) একটি বিস্তারিত উত্তর প্রদান করেছেন, শরীয়াহর দলীলের উপর ভিত্তি করে, তাঁর এ মতামত উল্লেখ করা হলঃ
قال رحمه الله تعالى ‏:‏ ‏(‏ لم تكن عادة السلف على عهد النبي صلى الله عليه وسلم وخلفائه الراشدين أن يعتادوا القيام كلما يرونه عليه السلام ، كما يفعله كثير من الناس ، بل قال أنس بن مالك‏ :‏ ‏(‏ لم يكن شخص أحب إليهم من النبي صلى الله عليه وسلم وكانوا إذا رأوه لم يقوموا له لما يعلمون من كراهته لذلك ) . رواه الترمذي (2754) وصححه الألباني في صحيح الترمذي . ولكن ربما قاموا للقادم من مغيبه تلقيا له ، كما روي عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قام لعكرمة. وقال للأنصار لما قدم سعد بن معاذ ‏:‏ “قوموا إلى سيدكم” رواه البخاري (3043) ومسلم (1768) . وكان قد قدم ليحكم في بني قريظة ؛ لأنهم نزلوا على حكمه .والذي ينبغي للناس أن يعتادوا اتباع السلف على ما كانوا عليه على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم فإنهم خير القرون، وخير الكلام كلام الله ، وخير الهدي هدي محمد صلى الله عليه وسلم، فلا يعدل أحد عن هدي خير الورى وهدي خير القرون إلى ما هو دونه‏ .‏ وينبغي للمطاع أن لا يقر ذلك مع أصحابه بحيث إذا رأوه لم يقوموا له إلا في اللقاء المعتاد ‏.‏وأما القيام لمن يقدم من سفر ونحو ذلك تلقيا له فحسن ، وإذا كان من عادة الناس إكرام الجائي بالقيام ، ولو ترك لاعتقد أن ذلك لترك حقه أو قصد خفضه ولم يعلم العادة الموافقة للسنة فالأصلح أن يقام له ؛ لأن ذلك أصلح لذات البين وإزالة التباغض والشحناء، وأما من عرف عادة القوم الموافقة للسنة فليس في ترك ذلك إيذاء له، وليس هذا القيام المذكور في قوله صلى الله عليه وسلم‏ :‏ ( من سره أن يتمثل له الرجال قياما فليتبوأ مقعده من النار ) . رواه الترمذي (2755) وصححه الألباني في صحيح الترمذي . فإن ذلك أن يقوموا له وهو قاعد ، ليس هو أن يقوموا له لمجيئه إذا جاء ، ولهذا فرقوا بين أن يقال قمت إليه وقمت له ، والقائم للقادم ساواه في القيام بخلاف القائم للقاعد‏ .‏وقد ثبت في ‏صحيح مسلم‏ أن النبي صلى الله عليه وسلم لما صلى بهم قاعدا من مرضه وصلوا قياما أمرهم بالقعود ، وقال ‏:‏ ( لا تعظموني كما يعظم الأعاجم بعضها بعضا ) وقد نهاهم عن القيام في الصلاة وهو قاعد لئلا يتشبه بالأعاجم الذين يقومون لعظمائهم وهم قعود وجماع ذلك كله الذي يصلح ، اتباع عادات السلف وأخلاقهم والاجتهاد عليه بحسب الإمكان ‏.‏فمن لم يعتقد ذلك ولم يعرف أنه العادة وكان في ترك معاملته بما اعتاد من الناس من الاحترام مفسدة راجحة فإنه يدفع أعظم الفسادين بالتزام أدناهما ، كما يجب فعل أعظم الصلاحين بتفويت أدناهما ‏)‏‏.‏ انتهى كلام شيخ الإسلام .
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা খোলাফায়ে রাশেদীনের সমকালীন সালাফগণের কারোরই এই রীতি বা অভ্যাস ছিল না যে তাঁরা প্রতিবার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে) দেখামাত্রই উঠে দাঁড়িয়ে যেতেন, যেটা অনেক মানুষ করে থাকে। বরং আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “সাহাবায়ে কিরামের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা কোন ব্যক্তিই অধিক প্রিয় ছিলো না। অথচ তাঁরা যখন তাঁকে দেখিতেন তখন দাঁড়াতেন না। কেননা তাঁরা জানতেন যে তিনি ইহা পছন্দ করেন না।” [তিরমিযি ২৭৫৪, সহীহ তিরমিযিতে হাদীসটি আলবানী কর্তৃক সহীহ] কিন্তু তাঁরা তাঁর জন্যে দাঁড়াতে পারতেন যে বাইরে থেকে ফিরত, তাকে স্বাগত জানানোর জন্যে, যেমন বর্ণিত হয়েছে যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইকরিমা’র জন্য উঠে দাঁড়ান, এবং তিনি আনসারগণকে বলেছিলেন যখন সা’দ বিন মুয়াজ এসেছিলেন, “তোমরা তোমাদের সর্দারের জন্য উঠে দাঁড়াও।” [বুখারী ৩০৪৩, মুসলিম ১৭৬৮]। আর এই ঘটনাটি ছিল যখন তিনি বনু কুরাইজার ব্যাপারে বিচারের রায় প্রদান করতে এসেছিলেন কারণ তারা বলেছিল যে তাঁর রায় তারা গ্রহণ করবে। মানুষের যা করা উচিত তা হল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমকালীন সালাফগণের রীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করা, কারণ তারা হলেন সর্বোত্তম প্রজন্ম এবং সর্বোত্তম বাণী হল আল্লাহর বাণী, এবং সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পথ নির্দেশনা। কেউ যেন মানব জাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির পথ নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়, কিংবা শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের পথ নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এর থেকে নিকৃষ্ট কিছু অনুসরণ করে। এবং নেতা কিংবা প্রধানগণ যেন সাধারণের মাঝে এমন কোন কিছুর অনুমোদন প্রদান না করেন যে তাকে দেখামাত্রই সাধারণ লোকদের উঠে দাঁড়াতে হবে, বরং মানুষের উচিত হল সহজ-সাধারণ আচরণের দ্বারা তাকে স্বাগত জানানো।আর দূর থেকে ভ্রমণ করে ফিরে এসেছে এমন লোকের ব্যাপারে উঠে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য যদি হয় তাকে স্বাগত জানানো তাহলে তা সুন্দর আচরণ। আর জনসাধারণের রীতিনীতি যদি এমন হয় যে, উঠে দাঁড়ানোর মাধ্যমে আগত ব্যক্তিকে সম্মান দেখানো হয় এবং যদি তারা উঠে না দাঁড়ায় তাহলে সে ব্যক্তি অপমানিত বোধ করে কিংবা সে ব্যক্তি সুন্নাহ অনুসারে আচরণ জানে না, সেক্ষেত্রে আগত ব্যক্তির জন্যে উঠে দাঁড়ানোই অপেক্ষাকৃত ভালো আচরণ, কারণ এর দ্বারা তাদের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হতে পারে এবং তাদের অন্তর থেকে ঘৃণা ও বিদ্বেষ দূর করে দিবে। কিন্তু লোকটি যদি সুন্নাহ অনুসারে আচরণ সম্পর্কে অভ্যস্ত থাকে তাহলে উঠে না দাঁড়ানো তাকে অপমানিত করবে না।নবাগত ব্যক্তির জন্যে উঠে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সেই কথা বলা হয়নি যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইহাতে আনন্দ পায় যে, লোকজন তাহার জন্য দাঁড়ানো অবস্থায় স্থির হয়ে থাকুক, তবে সে যেন নিজের জন্য জাহান্নামে বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।” (আবু দাউদ, তিরমিযি ২৭৫৫, আলবানী কর্তৃক সহীহ তিরমিযি)। এর মানে হল (একথা বলা হয়েছে সেই ব্যক্তির জন্যে) কারও জন্য উঠে দাঁড়ানো হল অথচ সেই ব্যক্তি নিজে বসে আছে, নবাগত ব্যক্তিকে স্বাগত জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ানোর ব্যাপারে এই কথা বলা হয়নি। একারণেই উলামাগণ এই দুই ধরণের উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে পৃথকীকরণ করেছে্‌ন, কারণ যারা নবাগত ব্যক্তিকে স্বাগত জানানোর জন্যে উঠে দাঁড়ায় তারা তার সাথে একইভাবে (দাঁড়ানো) অবস্থায় আছে কিন্তু কোন ব্যক্তি নিজে বসে আছে অথচ লোকেরা তার জন্যে উঠে দাঁড়ায় উভয় ঘটনা এক নয়।সহীহ মুসলিমে প্রমাণিত আছে, “যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থতার দরুণ বসা অবস্থায় সালাতের ইমামতি করলেন, তাঁরা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন, তিনি তাঁদের বসতে বললেন এবং বললেন, “পারসিরা যেভাবে একে অপরকে সম্মান দেখায় সেভাবে আমাকে সম্মান প্রদর্শন করো না।” আর তিনি নিজে বসা অবস্থায় তাদেরকে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে নিষেধ করলেন, যেন সাহাবাগণের সাথে এতটুকু সাদৃশ্যও না থাকে যেভাবে পারস্য দেশের লোকেরা তাদের নেতাদের জন্য দাঁড়িয়ে অথচ তাদের নেতারা বসে থাকে।পরিশেষে, যত বেশি সম্ভব সালাফগণের আচরণ ও রীতিনীতি অনুসরণ করাই হল সর্বোত্তম আচরণ।যদি কোন ব্যক্তি এতে বিশ্বাস স্থাপন না করে এবং এই ধরণের আচরণে অভ্যস্ত না হয়, এবং যেভাবে (প্রচলিত পদ্ধতিতে) লোকেরা তাকে সম্মান দেখায় সেভাবে সম্মান প্রদর্শন না করাতে যদি সে আরও মন্দ কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যায় তবে সেক্ষেত্রে আমরা কম ক্ষতির কাজটি করে বেশি ক্ষতির থেকে নিজেদের রক্ষা করব এবং তাই করব যা ছোট উপকারের চেয়ে বড় উপকার করে থাকে ”।– ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ’র উক্তি সমাপ্ত।)
.
▪️তৃতীয় প্রকার: বাহির থেকে আগত ব্যক্তিকে সম্মান জানানো বা তাকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তার সামনে এগিয়ে যাওয়া—যেমন তার সাথে মুসাফাহা করা, হাত ধরে সঠিক স্থানে বসাতে সাহায্য করা, অথবা নিজের জায়গা ছেড়ে তাকে বসতে সাহায্য করা—বিশেষ করে যদি তিনি বাড়ির মালিক বা কোনো মর্যাদাশালী ব্যক্তি হন, এতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং এটি সুন্নতের অংশ এবং উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের পরিচায়ক। যেমন আবু দাউদে বর্ণিত আছে:রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কন্যা ফাতিমার ঘরে প্রবেশ করলেন তিনি তাঁর জন্যে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর হাত ধরলেন এবং তার নিজের বসার স্থানে তাকে বসালেন। এবং যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আনহা আসতেন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত ধরতেন এবং তাঁর নিজের বসার স্থানে তাকে বসাতেন।”(আবু দাউদ হা/৫২১৭;এটি তিরমিযিতে সহীহ রূপে চিহ্নিত) এছাড়া সাহাবীগণও নবীর নির্দেশ অনুযায়ী একইভাবে সম্মান প্রদর্শন করতেন। উদাহরণস্বরূপ:সা‘দ ইবন মু‘আয রাঃ যখন বনি কুরাইযার ইহুদিদের সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর কাছে আসেন,তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং একটি শিরায় আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি বাহনের ওপর বসে ছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের নির্দেশ দিলেন, “তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও”। এর প্রতিক্রিয়ায় সাহাবীগণ তার সম্মানে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।(সহিহ বুখারি: ৩৮০৪) অনুরূপভাবে, কাব মালিক (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার পর তিনি যখন রাসূল (ﷺ)-এর কাছে মসজিদে আসলেন তখন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে থেকে উঠে গিয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহা করেন এবং অভিনন্দন জানান। এরপর বসেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ঘটনাকে প্রত্যাখান করেননি। এই ঘটনা নির্দেশ করে যে, আগত ব্যক্তির জন্যে উঠে দাঁড়ানো, তার সাথে হাত মিলানো এবং স্বাগত জানানো অনুমোদিত। এছাড়াও এই সমস্ত ঘটনা আমাদেরকে শেখায় যে, এগুলো সচ্চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এ বিষয়টি প্রশস্ত কেননা শিষ্টাচার, সৌজন্য ও উত্তম চরিত্র প্রদর্শন করা ইসলামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, এবং এ বিষয়ে বিস্তৃত প্রমাণ রয়েছে।
.
ইবনুল মুলাক্কিন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قوله: «قوموا إلى سيدكم» ظاهر في القيام لأهل الدِّين والعلماء على وجه الإكرام والاحترام، وقد قام طلحة بن عبيد الله لكعب بن مالك لما تِيب عليه فكان كعب يراها له.قال السهيلي: وقام رسول الله -صلى الله عليه وسلم- لصفوان بن أمية ولعدي بن حاتم حين قدما عليه، وقام لمولاه زيد بن حارثة ولغيره أيضًا، وكان يقوم لابنته فاطمة إذا دخلت عليه، وتقوم له إذا قدم عليها، وقام لجعفر ابن عمه، وليس هذا معارض لحديث معاوية: «من سره أن يتمثل ‌له ‌الرجال ‌قيامًا فليتبوَّأ مقعده من النار»؛ لأن هذا الوعيد إنما يوجَّه للمتكبرين وإلى مَن يغضب أو يسخط ألا يُقام له.”নবী (ﷺ)-এর বাণী: ‘তোমরা তোমাদের নেতার অভিমুখে (তাঁকে এগিয়ে নিতে) উঠে দাঁড়াও’—এই নির্দেশটি দ্বীনদার ব্যক্তি ও আলেম-উলামাদের সম্মান ও শ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ানোর বৈধতা প্রকাশ করে। কেননা, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) (সাহাবী) কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর তাওবা কবুল হওয়ার পর (তাঁকে অভিনন্দন জানাতে) উঠে দাঁড়িয়েছিলেন;আর কাব (রাঃ) এই ঘটনাটি সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতেন।ইমাম সুহাইলি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও আদি ইবনে হাতিম যখন তাঁর কাছে আসেন, তখন তাঁদের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর মুক্তদাস যায়েদ ইবনে হারিসা এবং অন্যদের জন্যও দাঁড়িয়েছিলেন।এছাড়া তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তখন তিনি তার জন্য দাঁড়াতেন। আর তিনি (ফাতিমা) যখন তাঁর কাছে যেতেন, তখন তিনিও নবী সা.-এর জন্য দাঁড়াতেন। তিনি তাঁর চাচাতো ভাই জাফর (রাঃ)-এর জন্যও দাঁড়িয়েছিলেন। আর এই ঘটনাগুলো মুয়াবিয়া (রা.) বর্ণিত সেই হাদীসের বিরোধী নয় যেখানে বলা হয়েছে—’যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে মানুষ তার সামনে (মূর্তির মতো) দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ কারণ, এই কঠোর সতর্কবাণী কেবল সেই অহংকারীদের জন্য, যারা চায় মানুষ তাদের সম্মান করুক অথবা যারা তাদের জন্য কেউ না দাঁড়ালে রাগান্বিত বা অসন্তুষ্ট হয়।”(ইবনুল মুলাক্কিনও ‘আত্‌-তাওযিহ’; খন্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৫)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) তাঁর সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা গ্রন্থে বলেন,قال مُحَمَّدُ بنُ أَحْمَدَ بنِ أَبِي المُثَنَّى يَحْيَى التَّمِيْمِيُّ : خَرَجَ أَحْمَدُ بنُ حَنْبَلٍ يَوْماً، فَقُمْتُ، فَقَالَ:أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ النَّبِيَّ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- قَالَ: (مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَتَمَثَّلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَاماً فَلْيَتَبَوَّأ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ .فَقُلْتُ: إِنَّمَا قُمْتُ إِلَيْكَ، وَلَمْ أَقُمْ لَكَ، فَاسْتَحْسَنَ ذَلِكَ.”মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবনু আবি আল-মুছান্না ইয়াহইয়া আত-তামীমী বলেন:একদিন ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল বের হলেন। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি বললেন: তুমি কি জানো না, নবী (ﷺ) বলেছেন,যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, সে যেন জাহান্নামে তার আসন প্রস্তুত করে নেয়। তখন আমি বললাম:আমি তো আপনার জন্য দাঁড়াইনি; বরং আপনার দিকে (আপনাকে অভ্যর্থনা করার জন্য) দাঁড়িয়েছি। এ কথা শুনে ইমাম আহমদ এটিকে ভালো মনে করলেন।”(সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৪০)
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: إنما المكروه القيام للمرء وهو جالس. وتأول بعض أصحابنا (الشافعية): «قوموا إلى سيدكم» على أن ذَلِكَ مخصوص بسعد، وقال بعضهم: أمرهم بالقيام؛ لينزلوه عن الحمار لمرضه. .”নিশ্চয়ই মাকরূহ হচ্ছে সেই দাঁড়ানো, যা এমন ব্যক্তির সম্মানার্থে করা হয় যিনি (নিজে) বসে আছেন। আর আমাদের (শাফিঈ মাযহাবের) কোনো কোনো আলেম ‘তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও’ হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এটি বিশেষভাবে সা‘দ (রাঃ)-এর জন্যই প্রযোজ্য ছিল। আবার কেউ কেউ বলেছেন, নবী (ﷺ) তাদের দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তারা তাকে (সা‘দকে) অসুস্থতার কারণে গাধা থেকে নামাতে সাহায্য করে।”
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:
لا يلزم القيام للقادم، وإنما هو من مكارم الأخلاق، من قام إليه ليصافحه ويأخذ بيده، ولا سيما صاحب البيت والأعيان، فهذا من مكارم الأخلاق، وقد قام النبي صلى الله عليه وسلم لفاطمة، وقامت له رضي الله عنها، وقام الصحابة رضي الله عنهم بأمره لسعد بن معاذ رضي الله عنه لما قدم ليحكم في بني قريظة، وقام طلحة بن عبيد الله رضي الله عنه من بين يدي النبي صلى الله عليه وسلم لما جاء كعب بن مالك رضي الله عنه حين تاب الله عليه فصافحه وهنأه ثم جلس، وهذا من باب مكارم الأخلاق والأمر فيه واسع، وإنما المنكر أن يقوم واقفا للتعظيم، أما كونه يقوم ليقابل الضيف لإكرامه أو مصافحته أو تحيته فهذا أمر مشروع، وأما كونه يقف والناس جلوس للتعظيم، أو يقف عند الدخول من دون مقابلة أو مصافحة، فهذا ما لا ينبغي، وأشد من ذلك الوقوف تعظيما له وهو قاعد لا من أجل الحراسة بل من أجل التعظيم فقط. اهـ.
“আগন্তুকের জন্য দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক কিছু নয় তবে এটি উত্তম শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আগন্তুকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করতে কিংবা তাকে এগিয়ে নিতে দাঁড়ায়—বিশেষ করে ঘরের মালিক বা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে—তবে তা সচ্চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা.) এর জন্য দাঁড়িয়েছেন এবং ফাতেমা (রা.)ও নবীজির জন্য দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া বনু কুরাইজা গোত্রের বিচার করার জন্য যখন সাদ বিন মুয়াজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশে সাহাবিগণ তাঁর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। আবার কাব মালিক (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার পর তিনি যখন আসলেন তখন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে থেকে উঠে গিয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহা করেন এবং অভিনন্দন জানান। এরপর বসেন।এটি সচ্চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এ বিষয়টি প্রশস্ত।তবে কেবল কারো তাজিমের উদ্দেশ্যে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে মেহমানকে সম্মান জানাতে, তার সাথে মুসাফাহা করতে বা তাকে বরণ করতে উঠে দাঁড়ানো শরিয়তসম্মত কাজ। কিন্তু মানুষজন বসা থাকা অবস্থায় কেবল কারো শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা মুসাফাহা বা অভ্যর্থনা ছাড়া শুধু দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। আর এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো—কেউ বসে আছে আর অন্যরা স্রেফ তাকে মহান হিসেবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা,যেখানে পাহারাদারি বা নিরাপত্তার কোনো উদ্দেশ্য নেই, বরং উদ্দেশ্য কেবলই অতিভক্তি বা তাজিম প্রদর্শন।”(ইমাম বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৯৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন;لا بأس بالقيام إلى الرجل لمصافتحه وتهنئته بما يسُره، والقيام إلى الرجل لا باس به، قد جاءت به السُّنة، وكذلك القيام للرجل وأنت باقٍ في مكانك لا تتحرك إليه، فهذا أيضًا لا بأس به إذا اعتاده الناس؛ لأنه لم يرد النهي عنه؛ وإنما النهي والتحذير من الذي يقام له، لا من القائم، فإن من يُقام له قال فيه النبي -عليه الصلاة والسلام-: «من أحب أن يتمثل ‌له ‌الرجال ‌قيامًا فليتبوأ مقعده من النار» قال أهل العلم: والقيام ثلاثة أقسام: الأول: قيام إلى الرجل.الثاني: قيام للرجل.والثالث: قيام على الرجل.فالقيام إلى الرجل: لا باس به، وقد جاءت به السنة أمرًا وإقرارًا وفعلًا أيضًا. .”কোনো ব্যক্তির সাথে মুসাফাহা করার জন্য বা তাকে কোনো খুশির সংবাদে অভিনন্দন জানানোর জন্য তার দিকে এগিয়ে যাওয়াতে কোনো দোষ নেই। কারো আগমনে (তাকে এগিয়ে নিতে) দাঁড়ানো বৈধ এবং এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। একইভাবে কোনো ব্যক্তির সম্মানে নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা—তার দিকে এগিয়ে না গিয়ে—এটিও বৈধ যদি মানুষের মধ্যে এমন প্রথা প্রচলিত থাকে; কারণ এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি।মূলত নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কবাণী এসেছে ওই ব্যক্তির জন্য যার জন্য দাঁড়ানো হয় (অর্থাৎ যে নিজের জন্য অন্যের দাঁড়িয়ে থাকাকে পছন্দ করে)। কারণ নবী (ﷺ) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি এটি পছন্দ করে যে মানুষ তার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার আবাস নিশ্চিত করে নেয়।’ ওলামায়ে কেরাম বলেন, দাঁড়ানো তিন প্রকার: ১. কারো দিকে (এগিয়ে) যাওয়া। ২. কারো (সম্মানে) দাঁড়ানো। ৩. কারো সামনে (সে বসে থাকা অবস্থায়) দাঁড়িয়ে থাকা। এর মধ্যে প্রথমটি অর্থাৎ কারো দিকে এগিয়ে যাওয়া বৈধ, যা সুন্নাহর নির্দেশ, সমর্থন এবং আমল দ্বারা প্রমাণিত।”
.
উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে একটি হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। যেমন— “তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও” এই হাদিসটি দ্বারা অনেকেই আগত ব্যক্তির সম্মানার্থে দাঁড়ানো বৈধ বলে প্রমাণ পেশ করেন। এ বিষয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ, ফাদীলাতুশ শাইখ ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশকী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]–কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: প্রশ্ন: তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও” — এই হাদিস দ্বারা কি আগত ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো বৈধ হওয়ার প্রমাণ গ্রহণ করা যায়?
উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন;
الأخ عن حديث ” قوموا لسيدكم ” حديث قوموا لسيدكم يُخطئ فيه جماهير الناس من حيث روايته وبالتالي من حيث دلالته فالحديث هو بلفظ ( قوموا إلى سيدكم ) وليس بلفظ ” قوموا لسيدكم ” ولذلك لما انحرف الحديث على الجماهير انحرف بهم الفقه ف” قوموا لسيدكم ” يمكن يُفسر قوموا من أجل إكرامه لاحترامه أما ( قوموا إلى سيدكم ) فلا يمكن تفسيره بهذا لأن معنى ( قوموا إلى سيدكم ) أي قوموا فاذهبوا إليه وهذا الحديث يحتمل جلسة خاصة للتعليق عليه وبيان أنه لا صلة له بالقيام المكروه شرعا ولكن باختصار وهناك فنقول أنه هناك رواية كما يُقال اليوم تضع النقاط على الحروف وتزيل الإشكال ( قوموا إلى سيدكم فأنزلوه ) فإذًا الأمر هنا ليس من أجل هذا القيام وإنما من أجل مساعدة هذا الرجل الفاضل وهو سعد بن معاذ لأنه كان جريحا فأمر أتباعه وأصحابه أن ينهضوا إليه ويساعدوه على النزول من دابته فانظروا كم يخطئ الناس حينما أولا يحرفون نص البخاري الذي هو فيه ( قوموا إلى سيدكم ) يحرفون إلى ” قوموا لسيدكم ” ثم انظروا كم يفعل من الجهل بطرق الأحاديث وألفاظها التي تساعد على فهم الحديث فهما صحيحا فالزيادة التي ذكرناها ( فأنزلوه ) هي في مسند الإمام أحمد بسند قوي كما يقول الحافظ بن حجر في فتح الباري .
ভাই প্রশ্ন করেছেন (তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও) হাদিস সম্পর্কে। আসলে অধিকাংশ মানুষ এই হাদিসটি বর্ণনার ক্ষেত্রেও ভুল করে এবং এর অর্থ বোঝার ক্ষেত্রেও ভুল করে। কারণ হাদিসটির সঠিক শব্দ হলো। “তোমরা তোমাদের নেতার দিকে উঠে দাঁড়াও।” কিন্তু মানুষ এটিকে বলে: “তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও।” এই ভুলের কারণে ফিকহ বোঝাতেও ভুল হয়েছে। কারণ “তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও” বললে এটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, তার সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য দাঁড়াও। কিন্তু “তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও” এর অর্থ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর অর্থ হলো: তোমরা উঠে তার দিকে যাও। এই হাদিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করলে আলাদা একটি দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন। সেখানে পরিষ্কার করা যায় যে এটি শরীয়তে অপছন্দনীয় দাঁড়ানোর সাথে সম্পর্কিত নয়। সংক্ষেপে বললে আরেকটি বর্ণনায় এমন শব্দ এসেছে যা বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার করে দেয়। সেখানে বলা হয়েছে: “তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও এবং তাকে নামিয়ে দাও।” অর্থাৎ এখানে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য সম্মান প্রদর্শন নয়, বরং তাকে সাহায্য করা। কারণ সেই সম্মানিত ব্যক্তি সা‘দ ইবনে মু‘আয (রাঃ) তখন আহত ছিলেন। তাই নবী (ﷺ) তাঁর সাথীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তারা উঠে তার কাছে যায় এবং তাকে তার বাহন (উট/গাধা) থেকে নামতে সাহায্য করে। দেখুন, মানুষ কত বড় ভুল করে। প্রথমত: তারা বুখারির হাদিসের শব্দ পরিবর্তন করে। সেখানে আছে কিন্তু তারা বলে দ্বিতীয়ত, হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা ও শব্দ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সঠিক অর্থ বোঝা থেকে বঞ্চিত হয়।আমরা যে অতিরিক্ত শব্দ উল্লেখ করেছি (তাকে নামিয়ে দাও) এটি ইমাম আহমাদের মুসনাদে এসেছে। হাফিজ ইবনে হাজার (রাহি.) “ফাতহুল বারী” গ্রন্থে বলেছেন যে এর সনদ শক্তিশালী।”(সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ২৩৫ নং অডিয়ো ক্লিপ) মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে এর সঠিক অনুসরণের তৌফিক দান করুন। (তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

দুইজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত শুরু করার পর যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা চতুর্থ রাকাতে আরও একজন বা দুইজন মুসল্লি যোগ দেয়

 প্রশ্ন: দুইজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত শুরু করার পর যদি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ রাকাতে আরও একজন বা দুইজন মুসল্লি যোগ দেয় তাহলে তারা ইমামের পেছনে কীভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর যখন ইমামের সঙ্গে একই কাতারে তাঁর ডান পাশে একজন মুক্তাদী দাঁড়িয়ে জামাতে সালাত আদায় করছেন, এরপর দ্বিতীয় কোনো মুসল্লী এসে শরিক হলে করণীয় হলো—যদি ইমামের পেছনে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে, তবে ইমামের সাথে সালাতরত প্রথম মুক্তাদী সামান্য পেছনে সরে গিয়ে নবাগত (যিনি পরে যোগ দিয়েছেন) ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ইমামের পেছনে একটি পূর্ণ কাতার গঠন করবেন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় মুক্তাদী (যিনি পরে যোগ দিয়েছেন) তার জন্য উত্তম ও শালীন পদ্ধতি হলো—তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলার পূর্বেই তার সঙ্গীর শরীরে হালকা স্পর্শে বা মৃদু সতর্কবার্তার মাধ্যমে অবহিত করবেন। এরপর উভয়ে একসাথে পেছনে সরে সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবদ্ধ হবেন। এতে সতর্ক করা ও স্থান পরিবর্তনের কাজটি নামাজে প্রবেশের পূর্বেই সম্পন্ন হবে এবং সালাতের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া এড়িয়ে একাগ্রতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। পক্ষান্তরে যদি ইমামের পেছনে পর্যাপ্ত স্থান না থাকে, তাহলে ইমাম নিজেই সামান্য সামনে এগিয়ে যাবেন, যাতে তাঁর পেছনে দুইজনের জন্য একটি স্বতন্ত্র কাতার গঠিত হতে পারে। তবে যদি ইমামের সামনে এগোনোরও সুযোগ না থাকে এবং মুত্তাদীর পিছনেও পর্যাপ্ত জায়গা না থাকে তাহলে নবাগত (যিনি পরে এসেছেন) ব্যক্তি ইমামের বাম পাশে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে তিনজনই একই কাতারে সালাত আদায় করবেন।কেননা প্রয়োজনবশত একই কাতারে ইমামসহ একাধিক মুসল্লী দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলে তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো অসুবিধা নেই।পাশাপাশি জেনে রাখা ভাল যে,পিছনে জায়গা থাকা সত্ত্বেও নবাগত ব্যক্তি যদি অজ্ঞতার কারণে ইমামের পাশেই দাঁড়িয়ে যায়, তবে ইমাম উভয়কে পিছনে ঠেলে দিবেন।
.
হাদিসে এসেছে, প্রখ্যাত সাহাবী জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে আমরা আবার রওয়ানা হলাম, সন্ধ্যা হলে আমরা আরবের এক কূপের কাছাকাছি পৌঁছলাম।..তারপর তিনি হাওযের কাছে এসে ওযূ করলেন, পরে আমিও উঠে গিয়ে রাসূল (ﷺ)-এর ওযূর স্থান হতে পানি নিয়ে ওযূ করলাম। অতঃপর রাসূল (ﷺ) ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন। আমিও এসে রাসূল (ﷺ)-এর বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে আমাকে তাঁর ডান পাশে দাঁড় করলেন। অতঃপর জাব্বার ইবনু সাখর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এসে ওযূ করলেন এবং রাসূল (ﷺ)-এর বাম পাশে দাঁড়ালেন। তখন রাসূল (ﷺ) আমাদের দু’জনের হাত ধরে আমাদেরকে পশ্চাৎদিকে সরিয়ে দিলেন এবং আমাদেরকে তাঁর পেছনে দাঁড় করালেন …’(সহীহ মুসলিম, হা/৩০১০; মিশকাত হা/১১০৭)। উক্ত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, জামাতে সালাতে যদি একজন মুক্তাদি থাকে, তবে সে ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। আর যদি দুইজন বা তার বেশি মুক্তাদি থাকে, তাহলে তারা ইমামের পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। উলামায়ে কেরাম আরও উল্লেখ করেছেন— যদি এমন হয় যে ইমামের সামনে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে কিন্তু মুক্তাদিদের পেছনে জায়গা নেই, তাহলে ইমাম সামান্য সামনে এগিয়ে যাবেন। আর যদি মুক্তাদিদের পেছনে জায়গা থাকে কিন্তু ইমামের সামনে জায়গা না থাকে, তাহলে মুক্তাদিরাই পেছনের দিকে সরে গিয়ে কাতার ঠিক করবে। তবে যদি ইমামের সামনে এবং মুক্তাদিদের পেছনে—উভয় দিকেই পর্যাপ্ত জায়গা থাকে, তাহলে মুক্তাদিরাই পেছনের দিকে সরে যাবে; ইমাম সামনে এগোবেন না। কারণ ইমাম হলেন অনুসরণীয় ব্যক্তি, আর মুক্তাদিরা তার অনুসারী। তাই স্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইমামের পরিবর্তে মুক্তাদিদের নড়াচড়া করাই অধিক উপযুক্ত।এছাড়া সাধারণত ইমাম তার সামনে দেয়াল, খুঁটি বা অনুরূপ কোনো সুতরা রেখে সালাত আদায় করেন। তাই ইমামের অবস্থান অপরিবর্তিত রাখা অধিক শোভন ও উপযুক্ত।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:
إذا حضر إمام ومأمومان تقدم الإمام واصطفا خلفه سواء كانا رجلين أو صبيين أو رجلا وصبيا .. ثم إن كان قدام الإمام سعة وليس وراء المأمومين سعة تقدم أو تأخرا وأيهما أفضل فيه وجهان الصحيح الذي قطع به الشيخ أبو حامد والأكثرون تأخرهما لأن الإمام متبوع فلا ينتقل .. هذا إذا جاء المأموم الثاني في القيام فإن جاء في التشهد والسجود فلا تقدم ولا تأخر حتى يقوموا ولا خلاف أن التقدم والتأخر لا يكون إلا بعد إحرام المأموم الثاني كما ذكرناه . والله أعلم
“যখন একজন ইমাম ও দুইজন মুক্তাদি উপস্থিত থাকেন, তখন ইমাম সামনে দাঁড়াবেন এবং মুক্তাদিরা তাঁর পেছনে কাতারবদ্ধ হবেন—চাই তারা দুইজন পুরুষ হোক, দুইজন শিশু হোক অথবা একজন পুরুষ ও একজন শিশু হোক। এরপর (সালাত শুরু হওয়ার পর) যদি ইমামের সামনে জায়গা থাকে কিন্তু মুক্তাদিদের পেছনে জায়গা না থাকে, তবে ইমাম সামনে যাবেন নাকি মুক্তাদিরা পেছনে সরবেন—এ বিষয়ে দুটি অভিমত রয়েছে। শায়খ আবু হামিদ ও অধিকাংশ ফকীহের মতে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য মত হলো—মুক্তাদিরাই পেছনে সরে যাবে। কারণ ইমাম হলেন অনুসরণীয় নেতা; তাই তিনি নিজের স্থান থেকে সরে যাবেন না। তবে এই সামনে-পেছনে সরে দাঁড়ানোর বিধান তখনই প্রযোজ্য, যখন দ্বিতীয় মুক্তাদি কিয়াম (দাঁড়ানো) অবস্থায় জামাতে যোগ দেয়। কিন্তু যদি সে তাশাহহুদ বা সেজদা অবস্থায় এসে যোগ দেয়, তাহলে সবাই দাঁড়িয়ে কিয়ামে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো নড়াচড়া করা যাবে না। এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই যে, দ্বিতীয় মুক্তাদি প্রথমে তাকবীরে তাহরিমা বলে নামাজে প্রবেশ করবে; তারপরই এই সামনে-পেছনে সরে দাঁড়ানোর আমলটি সম্পন্ন করা হবে।”(ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড: ৪, পৃ. ২৯২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
إذا جاء ثالث فمن الناس من يشكل عليه هل يدفع الإمام ويؤخر المأموم أو يكبر أولاً؟ فنقول: أخر المأموم، ثم إذا استوى في مكانه كبر أنت، أو نقول: قدم الإمام فإذا استويت مع المأموم كبر؛ لأنه أحياناً يكون تقديم الإمام أسهل كما لو كان المكان الذي أمامه واسعاً، وأحياناً يكون تأخير المأموم أسهل كما لو كان المكان الذي أمامهم ضيقاً، والذي خلفهم واسعاً، المهم لا فرق بين أن يقدم الإمام أو يؤخر المأموم، لكن لا يكبر قبل ذلك، لئلا يلزم من ذلك حركة في الصلاة لا حاجة إليها “
“যখন দু’জন জামাতে সালাত পড়ছে, এরপর তৃতীয় ব্যক্তি এসে যোগ দেয়, তখন কিছু মানুষের কাছে বিষয়টি জটিল মনে হয়: ইমাম কি সামনে এগোবেন, নাকি মুক্তাদী (যে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে) পিছিয়ে যাবে? অথবা আগে তাকবীর দেবে?আমরা বলি: মুক্তাদীকে পিছিয়ে দাও, তারপর যখন সে তার জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়াবে, তখন তুমি (ইমাম) তাকবীর দাও।অথবা আমরা বলি: ইমাম সামনে এগিয়ে যান, তারপর যখন তুমি মুক্তাদীর সঙ্গে সমান্তরালভাবে দাঁড়াবে, তখন তাকবীর দাও। কারণ কখনও ইমামের সামনে এগোনো সহজ হয়, যেমন যখন তার সামনে জায়গা প্রশস্ত থাকে। আবার কখনও মুক্তাদীর পিছিয়ে যাওয়া সহজ হয়, যেমন যখন তাদের সামনে জায়গা সংকীর্ণ, কিন্তু পেছনে প্রশস্ত।মূল কথা হলো, ইমাম সামনে এগোনো আর মুক্তাদী পিছিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে এর আগে তাকবীর দেওয়া যাবে না; যাতে সালাতের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া করতে না হয়।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৬/১১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: দুইজন জামাআতে সালাত পড়ছিল, তারপর তৃতীয় ব্যক্তি এলে, ইমাম সামনে এগোবেন, নাকি মুক্তাদী পিছিয়ে যাবে? প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
শাইখ: জি।
প্রশ্নকারী: এই প্রশ্নটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশ হলো, যদি প্রথমে একজন ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে নামাজ পড়ে, তারপর পরে দ্বিতীয় ব্যক্তি আসে, তাহলে তারা কী করবে? ইমাম কি সামনে এগোবে, নাকি প্রথম যে ব্যক্তি ছিল তাকে টেনে পেছনে নেওয়া হবে?
শাইখ: ইমামকে সামনে এগিয়ে দেবে এভাবে বলা সঠিক নয়। কারণ ইমাম তো ইমামই; তাকে আদেশ দেওয়া হয় না। বরং আদেশ দেওয়া হয় সেই ব্যক্তিকে, যে ইমামের অনুসরণ করে। এটি ‘ইমামকে সামনে এগিয়ে দেওয়া’ কথাটির উপর একটি মন্তব্য।তবে সঠিক উত্তর হলো,যেমনটি জাবির (রাযি.)-এর হাদীসে এসেছে: তাঁর এক সাথী নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ইকতিদা করে তাঁর ডান পাশে দাঁড়ালেন। এরপর আরেকজন এসে তাঁর বাম পাশে দাঁড়ালেন। তখন তিনি তাদের দু’জনকে পিছনে নিয়ে গেলেন এবং তাঁদেরকে নিজের পেছনে একটি কাতার বানালেন। অতএব, একজন ব্যক্তি হলে সে ইমামের ডান পাশে সমান্তরালভাবে দাঁড়াবে। আর ইমাম থেকে সামান্য পিছিয়ে দাঁড়াবে যেমন কিছু পরবর্তী ফকিহ বলেছেন এ সামান্য পিছিয়ে দাঁড়ানোর কোনো ভিত্তি সুন্নাহতে নেই। বরং এটি সেই বর্ণনার বিরোধী, যা উমর আল-ফারুক (রাযি.) থেকে এসেছে। এমনকি সহীহ বুখারীর হাদীসে আছে।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিয়ামুল লাইলের নামাজে ইবনু আব্বাস (রাযি.)-কে নিজের ঠিক সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছিলেন। এভাবেই রাসূল (ﷺ) ও ইবনু আব্বাসের ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, এবং উমর (রাযি.)-এর ক্ষেত্রেও তাঁর পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তির ব্যাপারে একইভাবে এসেছে।
প্রশ্নকারী: হাদীসে আছে যে তিনি সামান্য এক কদম পিছিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তিনি যেন তাকে তিরস্কার করেছিলেন,সহীহ বুখারীতে এমনিভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাইখ: আমরা তা জানি না।
প্রশ্নকারী: (ইবনু আব্বাস বলেছিলেন:)
আমি রাসূলুল্লাহর সমান্তরালে দাঁড়াতে চাইনি।
শাইখ: এটি কোন ঘটনার কথা? আবু বকর (রাযি.)-এর ঘটনা?
প্রশ্নকারী: না, ইবনু আব্বাস (রাযি.)-এর ঘটনা, যখন তিনি রাতে তাঁর সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন।
শাইখ: হ্যাঁ, সম্ভবত সেটিই। তিনি তাকে নিজের সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছিলেন।
প্রশ্নকারী: জি, কিন্তু তিনি সামান্য এক কদম পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বললেন: আমি কি তোমাকে আমার সমান্তরালে রাখিনি?তখন ইবনু আব্বাস বললেন: আপনার সমান্তরালে দাঁড়ানো আমার জন্য শোভন ছিল না।
শাইখ: কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যখন তাঁর সমান্তরালে দাঁড়ালেন, এ কথাটি ইবনু আব্বাসের নিজের ব্যাখ্যা, এবং এটি ছিল তাঁর আদব। তবে সুন্নাহ হলো, তিনি তাকে নিজের সমান্তরালেই দাঁড় করিয়েছিলেন।
প্রশ্নকারী: শাইখ, মনে হয় ইমাম বুখারী এ হাদীসের উপর অধ্যায় শিরোনাম দিয়েছেন,শাইখ: হ্যাঁ।
অন্য প্রশ্নকারী: “অধ্যায়: সালাতে একজন ব্যক্তি আরেকজনের সমান্তরালে দাঁড়াবে।”
শাইখ: ঠিক তাই।
অন্য প্রশ্নকারী: একই প্রশ্ন।
শাইখ: হ্যাঁ। আমি যা বলতে চাই তা হলো, একজন ব্যক্তি ইমামের ডান পাশে এবং তাঁর সমান্তরালে দাঁড়াবে। এরপর যদি আরেকজন আসে এবং স্বাভাবিকভাবেই সে হুকুম জানে না, তাই ইমামের বাম পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ইমাম এখানে রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করবেন এবং দু’জনকেই নিজের পেছনে নিয়ে গিয়ে একটি কাতার বানাবেন। কিন্তু যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি ফকিহ হয় এবং জানে যে দু’জনের হুকুম হলো ইমামের পেছনে কাতার করে দাঁড়ানো, তাহলে সে ইমামের পেছনে দাঁড়াবে এবং ডান পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে নম্রভাবে টেনে নিজের সঙ্গে পেছনে নিয়ে আসবে। আর ইমাম নিজের স্থানে স্থির থাকবেন; তাকে সামনে এগোতে বলা হবে না। হ্যাঁ।
প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
শাইখ: আপনাকেও।
প্রশ্নকারী: প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর আপনি আপনার বক্তব্যের মধ্যেই দিয়ে দিয়েছেন। কারণ আমরা বলেছিলাম, দ্বিতীয় অংশ ছিল: যদি দু’জন থাকে, তারপর তৃতীয় ব্যক্তি আসে এবং তাদের একজন ইমাম হয়, কিছু সমসাময়িক আলেম, যাদের অনুসরণ করা হয়, তাদের কারো বক্তব্যে আমি পড়েছি,তারা বলেন: একজনকে ইমামের ডান পাশে এবং অন্যজনকে বাম পাশে দাঁড় করানো হবে। শাইখ: এটি ইবনু মাসঊদ (রাযি.)-এর মত ছিল কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু যে সুন্নাহর উপর বিষয়টি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হলো আমরা যা উল্লেখ করেছি। এ কথা জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আল-আনসারী (রাযি.)-এর হাদীস থেকেও প্রমাণিত।হ্যাঁ।”(সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ৮১২ নং অডিয়ো ক্লিপ)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আগন্তুককে স্বাগতম জানাতে দাঁড়ানোর বিধান

 প্রশ্ন: কাউকে সম্মান দেখানোর জন্য উঠে দাঁড়ানো কি জায়েজ? অথবা আমি যদি বসা থাকি এবং কেউ রুমে প্রবেশ করেন তবে কি আমি বসা অবস্থাতেই তাকে সালাম দেব? নাকি তাকে সম্মান জানিয়ে সালাম দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ানো জায়েজ হবে?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাহাবিদের ওপর। অতঃপর এতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং এটি উত্তম চরিত্রের অংশ যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার উদ্দেশ্য হয় আগন্তুকের প্রতি সৌজন্য, সদাচরণ এবং সম্মান প্রদর্শন করা।
এ বিষয়ে শায়খ ইবনে বাজ (রহ.) বলেছেন:
لا يلزم القيام للقادم، وإنما هو من مكارم الأخلاق، من قام إليه ليصافحه ويأخذ بيده، ولا سيما صاحب البيت والأعيان، فهذا من مكارم الأخلاق، وقد قام النبي صلى الله عليه وسلم لفاطمة، وقامت له رضي الله عنها، وقام الصحابة رضي الله عنهم بأمره لسعد بن معاذ رضي الله عنه لما قدم ليحكم في بني قريظة، وقام طلحة بن عبيد الله رضي الله عنه من بين يدي النبي صلى الله عليه وسلم لما جاء كعب بن مالك رضي الله عنه حين تاب الله عليه فصافحه وهنأه ثم جلس، وهذا من باب مكارم الأخلاق والأمر فيه واسع، وإنما المنكر أن يقوم واقفا للتعظيم، أما كونه يقوم ليقابل الضيف لإكرامه أو مصافحته أو تحيته فهذا أمر مشروع، وأما كونه يقف والناس جلوس للتعظيم، أو يقف عند الدخول من دون مقابلة أو مصافحة، فهذا ما لا ينبغي، وأشد من ذلك الوقوف تعظيما له وهو قاعد لا من أجل الحراسة بل من أجل التعظيم فقط. اهـ.
“আগন্তুকের জন্য দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক কিছু নয় তবে এটি উত্তম শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আগন্তুকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করতে কিংবা তাকে এগিয়ে নিতে দাঁড়ায়—বিশেষ করে ঘরের মালিক বা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে—তবে তা সচ্চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা.) এর জন্য দাঁড়িয়েছেন এবং ফাতেমা (রা.)ও নবীজির জন্য দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া বনু কুরাইজা গোত্রের বিচার করার জন্য যখন সাদ বিন মুয়াজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশে সাহাবিগণ তাঁর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। আবার কাব বিন মালিক (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার পর তিনি যখন আসলেন তখন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা.) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে থেকে উঠে গিয়ে তাঁর সাথে মুসাফাহা করেন এবং অভিনন্দন জানান। এরপর বসেন। এটি সচ্চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এ বিষয়টি প্রশস্ত। তবে কেবল কারো তাজিমের উদ্দেশ্যে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে মেহমানকে সম্মান জানাতে, তার সাথে মুসাফাহা করতে বা তাকে বরণ করতে উঠে দাঁড়ানো শরিয়তসম্মত কাজ। কিন্তু মানুষজন বসা থাকা অবস্থায় কেবল কারো শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা মুসাফাহা বা অভ্যর্থনা ছাড়া শুধু দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। আর এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো—কেউ বসে আছে আর অন্যরা স্রেফ তাকে মহান হিসেবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে (নিরাপত্তা বা পাহারার উদ্দেশ্য ছাড়া) তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।”
🔸আগন্তুকের জন্য দাঁড়ানো:
কখন নিষিদ্ধ, কখন অপছন্দনীয় এবং কখন বৈধ?
আলেমগণ আগন্তুকের জন্য দাঁড়ানোকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
▪️১. নিষিদ্ধ (হারাম):
যদি এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো হয় যে, অহংকারবশত চায় যে তাকে দেখলে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকুক।
এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“من سره أن يتمثل له الرجال قياما فليتبوأ مقعده من النار”
“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে মানুষ তার সম্মানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।” [সুনানে তিরমিজি: ২৭৫৫]
▪️২. অপছন্দনীয় (মাকরূহ):
যদি আগন্তুক ব্যক্তি অহংকারী নাও হয় কিন্তু ভয় থাকে যে, এভাবে বারবার দাঁড়ালে তার মনে অহংকার চলে আসতে পারে। এছাড়া এটি অনেক সময় স্বৈরাচারী শাসক বা জবরদস্তিকারীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়।
▪️৩. জায়েজ ও সুন্নত:
যদি আগন্তুকের সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করতে তাকে হাত ধরে নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় বসিয়ে দিতে বা তাকে এগিয়ে নিতে দাঁড়ানো হয় তবে এতে কোনো দোষ নেই। বরং এটি সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আবু দাউদে বর্ণিত আছে:
“أن النبي صلى الله عليه وسلم قام لفاطمة وقامت له”
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতেমা (রা.)-এর জন্য দাঁড়িয়েছেন এবং ফাতেমা (রা.)ও তাঁর জন্য দাঁড়িয়েছেন।” [আবু দাউদ: ৫২১৭]
এছাড়া বনু কুরাইজার বিচারের সময় সাদ বিন মুয়াজ (রা.) আসলে নবীজি সাহাবিদের দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। [সহিহ বুখারি: ৩৮০৪]
মোটকথা, আগন্তুক ব্যক্তির সাথে মুসাফাহা করা বা হাসিমুখে বরণ করার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো জায়েজ, এমনকি এটি সুন্নত ও উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু কেবল তার প্রতি তাজিম প্রকাশ বা তাকে মহান হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো জায়েজ নেই। আল্লাহই ভালো জানেন। [সোর্স: ইসলাম ওয়েব]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ এবং গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদি বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate