Tuesday, May 12, 2026

এক নজরে তাওহিদ

 ❑ তাওহিদ কী?

তাওহিদ হলো, আল্লাহকে তাঁর রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলুহিয়্যাত (ইবাদত-বন্দেগি) এবং নাম ও গুণাবলিতে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করা।
❑ তাওহিদের গুরুত্ব:
আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনকে কেবল তাওহিদ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬]
এটি দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং সকল নবি ও রসুলদের দাওয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“(হে নবি) তোমার পূর্বে আমি যে রসুলই পাঠিয়েছি তাকে এই মর্মে প্রত্যাদেশ করেছি যে, আমি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।”
[সূরা আম্বিয়া: ২৫]
❑ তাওহিদের প্রকারভেদ:
তাওহিদ তিন প্রকার। যথা:
◈ ১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত (توحيد الربوبية):
আল্লাহকে একমাত্র রব অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা, রিজিক দাতা, জীবন-মৃত্যু দাতা এবং মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক হিসেবে বিশ্বাস করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাদের একমাত্র অন্নদাতা। একমাত্র তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি দান করেন এবং জমিন থেকে ফসল উদ্গত করেন। একমাত্র তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা কেবল তাঁর হাতেই রয়েছে…ইত্যাদি।
◈ ২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত (توحيد الألوهية):
বাহ্যিক ভাবে এবং গোপনে তথা চিন্তা-চেতনা এবং মন ও মননে ছোট-বড় সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহর জন্যই নামাজ, রোজা, দুআ, মানত, কুরবানি, সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদি সম্পাদন করা। অনুরূপভাবে মনের সবটুকু আকুতি ও আরাধনা, ভয় ও ভরসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি কেবল তাঁর নিকট সমর্পণ করা।
◈ ৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء و الصفات):
কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলিকে কোনও প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার, অপব্যাখ্যা কিংবা সৃষ্টির সাথে তুলনা, সাদৃশ্য বা উপমা বর্ণনা ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
উদাহরণ:
আল্লাহ সর্বশ্রোতা (السَّمِيعُ), সর্বদ্রষ্টা (الْبَصِيرُ) ও পরম দয়ালু (الرحمن), ইত্যাদি গুণবাচক সকল সুন্দর নাম একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলার সত্তাগতভাবে সৃষ্টি জগতের সর্ব ঊর্ধ্বে অবস্থান, নিচের আসমানে অবতরণ, কথা বলা, আনন্দিত হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, তাঁর তার চেহারা, হাত, চোখ ইত্যাদি সিফত বা গুণ-বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা যেভাবে তাঁর সুমহান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এগুলোকে অস্বীকার, বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, রূপক অর্থে গ্রহণ থেকে বা সৃষ্টি জগতের কোনও কিছুর সাথে সাদৃশ্য ও উপমা বর্ণনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
[সূরা শূরা: ১১]
❑ তাওহিদের রোকন বা স্তম্ভ দুটি:
◈ ১. নাফি (النفي—অস্বীকার করা): ইবাদত-বন্দেগি, সার্বভৌমত্ব, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কোনও মখলুক বা সৃষ্টির অংশীদারিত্বকে মনে-প্রাণে অস্বীকার করা।
◈ ২. ইসবাত (الإثبات—সাব্যস্ত করা): আল্লাহ নিজের জন্য যে সব কর্ম, নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রসুল যা বর্ণনা করেছেন সেগুলো কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করা।
তাওহিদের দুটি রোকন রয়েছে, কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মধ্যে। যেমন:
১) ‘লা ইলাহা’ (নেই কোনও সত্য উপাস্য) এটি হল, নাফি বা অস্বীকৃতি।
২) ‘ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া)। এটি হল, ইসবাত বা সাব্যস্ত করণ।
❑ তাওহিদ বিনষ্টকারী বিষয়: শিরক
◈ ১. শিরকে আকবর বা বড় শিরক: এটি মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়।
– উদাহরণ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা, মাজারে মানত করা বা কাউকে আল্লাহর মতো ভয় করা বা ভালোবাসা, অলি-আউলিয়া বা নেককার কবর বাসীদের নিকট সন্তান চাওয়া, রোগ-ব্যাধি ও বিপদ মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা কিংবা তাদের নিকট মনের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা পূরণের জন্য মানত করা, পশু জবাই করা বা দুআ-আরাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া অথবা তাদেরকে ওসিলা বা মাধ্যম মনে করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: এর মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। তওবা ছাড়া মৃত্যু হলে আখিরাতে চিরতরে জান্নাত হারাম হয়ে যায় এবং চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। কেননা তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক।
◈ ২. শিরকে আসগর বা ছোট শিরক:
এটি ইসলাম থেকে বের করে না দিলেও তাওহিদকে ক্ষুণ্ণ করে এবং এটি কবিরা গুনাহের থেকেও ভয়াবহ।
– উদাহরণ: মানুষের প্রশংসা বা সুনাম ও সুখ্যাতির মোহে ইবাদত করা (এটাকে রিয়া বলা হয়)।
অথবা ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করা, আল্লাহর ওপর ভরসার পরিবর্তে কেবল বৈষয়িক উপকরণের ওপর নির্ভর করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা, তাবিজ-কবজ ব্যবহার করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: যে আমলের মধ্যে এ ধরণের শিরক থাকে সে আমলটি বরবাদ হয়ে যায়। অর্থাৎ এর সওয়াব বাতিল হয়ে যায়।
আখেরাতে এর পরিণতি জাহান্নাম। তবে তা বড় শিরকের মত ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না, সকল আমলকে বরবাদ করে না এবং স্থায়ীভাবে জাহান্নামকে অবধারিত করে না।
এ বিষয়ে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকা আবশ্যক।
❑ তাওহিদের উপকারিতা (فوائد التوحيد):
১. তাওহিদের ওপর অটল থাকলে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হয়।
২. আখেরাতে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভে ধন্য হওয়া যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হবে সেই, যে ব্যক্তি অন্তরের অন্তরস্থল থেকে একনিষ্ঠভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) বলবে।”
[সহিহ বুখারি: ৯৯]
৩. তাওহিদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই চির শান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়।
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে সে জানত ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
[সহীহ মুসলিম: ২৬]
৪. তাওহিদ বাস্তবায়ন করলে মানব জীবনের সকল পাপরাশি মোচন করা হয় তার পরিমাণ যাই হোক না কেন।
এক কথায় তাওহিদের বাস্তবায়নই, দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে একনিষ্ঠ ভাবে তাওহিদ বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং তাওহিদ পরিপন্থী সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ভালবাসায় শিরক

 ভালবাসায় শিরক


[হাফিজ ইবনুল কায়্যিমের (রহ.) লেখা অবলম্বনে লিখেছেন শায়খ এনামুল হক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ICD]
বড় (প্রধান) শিরক-কে চার ভাগে ভাগ করা যায়:
প্রথম প্রকার হচেছ “কামনা-প্রার্থনায় শিরক”,
তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আল্লাহ ব্যতীত
অন্য কারও নিকট প্রার্থনা করা ৷ গায়রুল্লাহকে
আনুকূল্য লাভের মাধ্যম, রোগমুক্তির অবলম্বন বা
দুঃসময়ে ত্রাণকর্তা রূপে গণ্য করা ৷
দ্বিতীয় প্রকার হল “নিয়তের ক্ষেত্রে শিরক”,
অর্থাৎ যে কার্যাবলী আদতে দূষণীয় নয়, তথাপি
বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হওয়াতে
একান্তভাবে পার্থিব স্বার্থমগ্নতায় দূষণীয় ৷
তৃতীয় প্রকার হল “ভালবাসার ক্ষেত্রে শিরক” –
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতি সমতুল্য বা সমধিক
ভালবাসা পোষণ করা ৷ আল্লাহ বলেন:
“আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা
অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে…” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৬৫) কোন কোন লোক আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, প্রতিপালক জেনেও গায়রুল্লাহকে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভালবাসে ৷ কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহর চেয়ে অর্থকে বেশি ভালবাসে আর এ কারণেই এরা যাকাত আদায়ে বিরত
থাকে বা অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জন করে ৷ তারা
দিরহাম বা দিনারের দাস বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে
ডলারের খরিদকৃত গোলাম ৷
চতুর্থ প্রকার হল “আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক”,
যেমন মানব রচিত আইনকে বৈধ বলে মনে করা
যেখানে অনৈতিক বিষয়কে নৈতিক রূপ দান করা হয় ৷
এখানে আমরা তৃতীয় প্রকারের অংশীবাদ নিয়ে
আলোচনা করবো ৷
রাসূল (সা.) বলেন:
“যে দিনার বা দিরহামের দাসত্ব করবে সে
ক্ষতিগ্রস্ত ও ধবংস হবে…” (বুখারী শরীফে
উদ্ধৃত হাদীসের অংশ বিশেষ) কিছু লোক স্বীয়
প্রবৃত্তির তাড়নাকে তাদের রবের চেয়ে অধিক
ভালবাসে ৷ প্রবৃত্তির তাড়নায় গড্ডালিকা প্রবাহে গা
ভাসিয়ে দেয়ার পরিণতিতে আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতায়
লিপ্ত হয় ৷ – “তুমি কি তাকে দেখেছ যে তার
প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গণ্য করেছে?” (সূরা আল
ফুরক্বান, ২৫:৪৩)
সুতরাং আল্লহ এবং তাঁর রাসূলকে সর্বাধিক ভালবাসা হল
ঈমানের মাধুর্য আস্বাদনের পূর্বশর্ত ৷ রাসূলের
(সা.) একটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে, “তিনটি
গুণাবলী যার ভেতরে থাকবে সে ঈমানের
তৃপ্তি লাভ করবে: আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি
সর্বাধিক ভালবাসা পোষণ করা, শুধুমাত্র আল্লাহর
জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং ঈমান লাভে ধন্য হওয়ার
পর কুফরে প্রত্যাবর্তনকে ঠিক সেভাবে ঘৃণা
করা যেভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে
অপছন্দ করে” (আল বুখারী) ৷ আল্লহ্ দুই
প্রক্রিয়ায় যাচাই করেন তাঁর প্রতি বান্দার ভালবাসা অন্য
সবকিছু অপেক্ষা অধিক কিনা ৷ প্রথম প্রকার হল
রাসূলের (সা.) সুন্নাহর অনুবর্তী হওয়া ৷ আল্লাহ
বলেন,
“(হে মুহাম্মদ) আপনি বলুন, যদি তোমরা
আল্লাহকে ভালবাসো তবে আমার অনুসরণ কর,
তবে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং
তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন ৷” (সূরা
আলে ইমরান, ৩:৩১)
অতএব, আমাদের জীবনে সকল ক্ষেত্রে
রাসূলের (সা.) সুন্নাহর অনুসরণ করা একান্ত
বাঞ্ছনীয় ৷
আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালবাসা যাচাইয়ের দ্বিতীয়
প্রকরণ হল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ৷ –
“বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা,
তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই,
তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র,
তোমাদের অর্জিত ধন সম্পদ, তোমাদের
ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কর এবং
তোমাদের বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর,
তা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা
থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর
আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত আর আল্লাহ ফাসেক
সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না ৷” (সূরা
আত তাওবাহ, ৯:২৪)
চার ধরনের ভালবাসা:
এ প্রসঙ্গে ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
চার প্রকারের স্বতন্ত্র ভালবাসা রয়েছে ৷ অনেক
মানুষই ভালবাসার স্বতন্ত্র রূপ সম্পর্কে অবগত না
হওয়ায় সহসাই বিপথগামী হয় ৷ –
প্রথমত: আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ৷ কিন্তু শুধু এই
ভালবাসা তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ ও রবের সন্তুষ্টি
বিধানের জন্য যথেষ্ট নয় ৷ কারণ মুশরিক, খৃষ্টান,
ইহুদী এবং অন্যান্য ধর্মের সকলেই আল্লাহকে
ভালবাসে ৷
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ যা কিছু ভালবাসেন, তা ভালবাসা ৷
এই ভালবাসা ব্যক্তিকে কুফরের গন্ডী থেকে
বের করে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে ৷
যে ব্যক্তি এই দ্বিতীয় প্রকার ভালবাসার ক্ষেত্রে
সর্বাধিক সত্যাশ্রয়ী, সঠিক ও অনুগত সেই আল্লাহর
সবচেয়ে অধিক প্রিয়ভাজন ৷
তৃতীয়ত: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তেই
কোনকিছুকে ভালবাসা ৷ এটা মূলত আল্লাহ যা
ভালবাসেন তা ভালবাসারও একটা অপরিহার্য শর্ত ৷
আল্লাহ যা ভালবাসেন তাই স্বীয় ভালবাসা রূপে গণ্য
করা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে না,
যতক্ষণ বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তা না
করা হবে ৷
চতুর্থত: আল্লাহ ছাড়াও অন্য কিছু সমান্তরালভাবে
ভালবাসা এবং এই ভালবাসা অনেকক্ষেত্রে
শিরকের সাথে সংশ্লিষ্ট ৷ আল্লাহর সন্তুষ্টি
ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা
তাঁর প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করানোর সমতুল্য ৷ এই
ধরনের ভালবাসা মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য ৷
আরও একপ্রকার ভালবাসা রয়েছে যা আলোচনার
বিষয়বস্তু বহির্ভূত ৷ তা হচ্ছে প্রাকৃতিক ভালবাসা –
প্রাকৃতিক স্বাচছন্দ্যের প্রতি ব্যক্তির সহজাত স্বাভাবিক
ঝোঁক-প্রবণতা ৷ উদাহরণ: তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির পানির
প্রতি, ক্ষুৎপীড়িতের খাদ্যের প্রতি টান অনুভব কিংবা
স্বতঃর্স্ফূত নিদ্রার প্রবণতা বা আপন স্ত্রী-সন্তানের
প্রতি ভালবাসা ৷ এই ভালবাসা ততক্ষণ পর্যন্ত নিষ্কলুষ,
যতক্ষণ ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি স্মরণ ও ভালবাসা হতে
বিচ্যুত না হয় ৷ আল্লাহ বলেন,
“মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি
যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে
গাফেল না করে…”। (সূরা আল মুনাফিকুন, ৬৩:৯)
“এমন লোকেরা যাদেরকে ব্যবসা- বাণিজ্য ও
ক্রয়- বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায
কায়েম করা থেকে এবং যাকাত আদায় করা
থেকে বিরত রাখে না…” (সূরা আন-নূর, ২৪:৩৭)
ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসা এবং আল্লাহ ছাড়াও
অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা – এই দু’টোর মধ্যে
পার্থক্য বেশ স্পষ্ট ও গুরম্নত্বপূর্ণ ৷
প্রত্যেকেই এই পার্থক্য নিরূপণে দায়বদ্ধ,
একান্তভাবে বাধ্য ৷ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে
ভালবাসা ঈমানের পূর্ণাঙ্গতার পরিচায়ক, অন্যথায় যুগপৎ
ভালবাসা শিরকের উদ্ভাবক ৷
উক্ত দ্বিবিধ ভালবাসার মাঝে পার্থক্য হল আল্লাহর
সন্তুষ্টির নিমিত্তে ভালবাসা আল্লাহর প্রতি ভালবাসার
সাথে নিবিড় ভাবে সম্পর্কযুক্ত ৷ আল্লাহর প্রতি
ভালবাসা হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হলে তা
তাকে উদ্বুদ্ধ ও চালিত করবে আল্লাহ যা ভালবাসেন
তা ভালবাসতে – তখন এই ভালবাসাই হয় আল্লাহর
সন্তুষ্টি বিধানকারী ভালবাসা ৷ এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি
ভালবাসে নবী, রাসূল, ফেরেশতা ও নিকটবর্তী
সৎকমশীলদের, যেহেতু আল্লাহ তাঁদের
ভালবাসেন ৷ আর ঘৃণা করে ঐ সব ব্যক্তিদের যারা
নবী, রাসূল ও সৎকর্মশীলদের ঘৃণা/অবজ্ঞা
করে, যেহেতু আল্লাহ ঐ সকল ব্যক্তিদের
ভালবাসেন না ৷ আল্লাহর জন্য ভালবাসা এবং ঘৃণার একটা
নিদর্শন হচ্ছে আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন [যেমন
কোন অবিশ্বাসী] সে মুমিন ব্যক্তির প্রতি সদ্ভাব
প্রকাশ বা সামান্য উপকার বা কিছু প্রয়োজন পূরণ
করলেই, তার প্রতি মুমিন ব্যক্তির ঘৃণাভাব তিরোহিত
হয়ে ভালবাসায় রূপান্তরিত হবে না ৷ তদ্রূপ আল্লাহ
যাকে ভালবাসেন [যেমন কোন মু’মিন], সে যদি
অজ্ঞাতসারে ভুলবশত বা সবিস্তারে তাকে বিব্রত বা
আহত করে, সেক্ষেত্রেও ঐ ব্যক্তির প্রতি তার
ভালবাসা চট করে ঘৃণায় বদলে যাবে না ৷ হতে পারে
যে, সে তা আনুগত্যে ও কর্তব্যজ্ঞানে
করেছে বা অন্য কোন কারণে হয়ে থাকবে ৷
অধিকন্তু সেই কাজকে ভুল বা অনৈতিক বলে গণ্য
করে ভবিষ্যতে সে হয়তো অনুতপ্ত হয়ে ফিরে
আসবে ৷
পুরো ধর্ম চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে
আবর্তিত: ভালবাসা, ঘৃণা এবং এতদুভয় হতে উদ্ভূত
কর্ম সম্পাদন ও পরিহার ৷ যে ব্যক্তির উপরোক্ত
চারটি বিষয় – ভালবাসা, ঘৃণা, কর্ম সম্পাদন ও পরিহার
আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হয়, সে ঈমানের
পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ৷ অর্থাৎ তখন সে তাই ভালবাসে
যা আল্লাহ ভালবাসেন, আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তাই সে
ঘৃণা করে এবং আল্লাহ নির্দেশ মোতাবেক কর্ম
সম্পাদন ও পরিত্যাগের সীমা মেনে চলে ৷
উপরোক্ত চারটি ক্ষেত্রে যার যতখানি ঘাটতি দেখা
যাবে তার ঈমান ও ধর্মের প্রতি সংশ্লিষ্টতা ততই লঘু
বলে পরিগণিত হবে ৷
আল্লাহ ছাড়াও অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা
দু’ধরনের, তন্মধ্যে একপ্রকার তাওহীদের
মূলনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত তথা শিরক ৷ অন্য প্রকার
ব্যক্তিকে ইসলাম হতে খারিজ করে দেয় না তবে
তা কতর্ব্যনিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পূর্ণাঙ্গতা অর্জনের
পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ৷
প্রথম প্রকারের উদাহরণ হল দেবতা ও মূর্তির প্রতি
মুশরিকদের ভালবাসা ৷ আল্লাহ বলেন,
“আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা
অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ গণ্য করে এবং
তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে,
যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে…” (সূরা
আল বাক্বারাহ, ২:১৬৫)
মুশরিকেরা আল্লাহর পাশাপাশি দেবদেবী ও
মূর্তিদের সমপরিমাণ ভালবাসে ৷ এই ভালবাসা এবং
শ্রদ্ধার সাথে যোগ হয় ভয়, আশা, উপাসনা এবং
প্রার্থনা ৷ এ ধরনের ভালবাসা স্পষ্টত শিরক যা
আল্লাহর নিকট ক্ষমার অযোগ্য ৷ কোন ব্যক্তির
ঈমান পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ সে এই মূর্তিগুলোকে
শত্রুজ্ঞান করে তীব্র ঘৃণাবোধ না করবে এবং
মূর্তি উপাসকদের উপাসনাকে ঘৃণাকরত তাদের
সংশোধনের চেষ্টায় নিয়োজিত না হবে ৷ এই বাণী
প্রচারের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ সকল নবীদের
প্রেরণ করেছিলেন ৷ তাদের উপরে সকল
আসমানী কিতাব নাযিল করেছিলেন ৷ মুশরিকদের
জন্য আল্লাহ জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন – যারা
তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করায় ৷ আর জান্নাত তাদের জন্য
নির্ধারিত, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে মুশরিকদের
শত্রুজ্ঞান করে তাদের বিরুদ্ধে চেষ্টা-সংগ্রাম
অব্যাহত রাখে ৷ কেউ যদি আরশ হতে নিয়ে
পৃথিবীর গহীন অভ্যন্তরে আল্লাহ ব্যতীত
কোন কিছুকে সাহায্যকারী রূপে গণ্য করে
উপাসনা করে, তবে চরম প্রয়োজন মুহূর্ত শেষ
বিচার দিবসে সে তার কল্পিত উপাস্য দ্বারা প্রত্যাখ্যাত,
অস্বীকৃত হবে ৷
দ্বিতীয় প্রকারের ভালবাসা যা আল্লাহ মানুষের নিকট
আকর্ষণীয় করেছেন যেমন স্ত্রী, সন্তান,
স্বর্ণ, রৌপ্য, চিহ্নিত সুদৃশ্য অশ্ব [এখনকার দিনে
দামী গাড়ী], গৃহপালিত পশু এবং উর্বর কর্ষিত জমি –
এ সবের প্রতি মানুষের ভালবাসা আকাংঙ্খাতুল্য যেমন
খাবারের প্রতি ক্ষুধার্তের এবং পানির প্রতি
তৃষ্ণার্তের আকাংঙ্খা ৷ এই ভালবাসাকে আবার তিনভাবে
বিশ্লেষণ করা যায় ৷
কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যতে আনুগত্য
স্বরূপ উপরোক্ত ভালবাসা পোষণ করে, তবে তা
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের মাধ্যমে পরিণত
হয় এবং এর বিনিময়ে সে উত্তম প্রতিদান লাভ করবে
যদিও সে স্বাচছন্দ্যের উপকরণের মাঝে
উপভোগ খুঁজে পায় ৷ এ কারণেই আমরা দেখতে
পাই যে, সৃষ্টির সেরা রাসূল (সা.)-এঁর নিকট স্ত্রী ও
সুগন্ধী পার্থিব জীবনে প্রিয় ছিল, এ ভালবাসা
তাঁকে আল্লাহকে অধিক ভালবাসতে এবং তাঁর বাণী
প্রচারে ও আদেশ পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করতে
সহায়তা করে ৷
যদি কোন ব্যক্তি প্রকৃতি ও আকাংঙ্খা হেতু উপর্যুক্ত
বিষয় সমূহ ভালবাসে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের
উপরে অগ্রাধিকার না দিয়ে, কেবল ঝোঁক-
প্রবণতার বশবর্তী হয় – সেক্ষেত্রে তার জন্য
ব্যাপারটা বৈধ হবে, শাস্তিযোগ্য হবে না ৷ তবে
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালবাসা অর্জনে কিছুটা ঘাটতি
রয়ে যাবে ৷
আর উপরোক্ত পার্থিব সুখ স্বাচছন্দ্য অর্জনই যদি
জীবনের মূল উপজীব্য হয় এবং তা আল্লাহর
ভালবাসার উপরে তা স্থান পায়, তবে সে অবশ্যই
গুনাহে লিপ্ত হয়, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করার
মাধ্যমে ৷
পার্থিব উপকরণের প্রতি ভালবাসা পোষণকারীদের
ভেতর উপরোক্ত প্রথম দল হচেছ আল সাবিকুন
(ইসলামে আনুগত্যে সর্বপ্রথম ), দ্বিতীয় দল
আল-মুক্বতাসিদুন (যারা গড়পড়তায় মধ্যম), তৃতীয় দল
আল-জালিমুন (গুনাহগার)৷

Friday, May 1, 2026

বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমা কতটুকু

 বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমা কতটুকু? [আল্লামা শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল উসাইমিন (রাহ.)]

প্রশ্ন: বিবাহের প্রস্তাবের পর পাত্রী দেখার শরিয়তসম্মত সীমা কী? তার চুল, মুখ ও হাত দেখা কি জায়েজ?
উত্তর: পাত্রী দেখা জায়েজ। তবে কিছু শর্ত আছে। যেমন:
◈ প্রথম শর্ত: বিয়ের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে প্রস্তাব করতে হবে।
◈ দ্বিতীয় শর্ত: মনে প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে প্রস্তাব গৃহীত হবে।
◈ তৃতীয় শর্ত: কোনো যৌন আকাঙ্ক্ষার বশে দেখা যাবে না।
◈ চতুর্থ শর্ত: নির্জনে একা দেখা যাবে না।
এই শর্তগুলোর যেকোনো একটি না মানলে দেখা হারাম বলে গণ্য হবে। (আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)।
পাত্রের জন্য পাত্রীর যতটুকু দেখা বিয়ের আগ্রহ জাগায় ততটুকু দেখা জায়েজ — যেমন: মুখ, চুল, গলা, দুই হাত ও পা। কারণ এগুলো দেখে পাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
❑ প্রশ্ন: ফোনে কথা বলা কি জায়েজ?
উত্তর: না। অনেক পাত্র বিয়ের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর প্রতি রাতে বিয়ের আগেই ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে — এটা হারাম। কারণ এই ধরনের কথোপকথনে যৌন অনুভূতি জেগে ওঠা অনিবার্য। কেউ কেউ বলে, “আমি তার মেধা ও কথা বলার ধরন বোঝার জন্য কথা বলি” — কিন্তু এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিয়ের আগে বাগদত্তা মেয়েটি শরিয়তের দৃষ্টিতে পুরোপুরি একজন পরনারী।
❑ প্রশ্ন: পাত্রের সামনে পাত্রী কি মেকআপ করে আসতে পারবে?
উত্তর: না, জায়েজ নেই। কারণ এখনো সে তার স্ত্রী হয়নি। তা ছাড়া মেকআপ করে আসলে পাত্র যদি পরবর্তীতে আসল চেহারা দেখে হতাশ হয় তাহলে সে বলবে “এই মেয়ে ধোঁকা দিয়েছে।” তাই স্বাভাবিক চেহারায় আসাই উচিত।
❑ প্রশ্ন: সুন্দর পোশাক পরে আসা কি জায়েজ?
উত্তর: না। সে এখনো তার স্ত্রী নয়। তাই সাধারণ পোশাকে আসবে ━ কোনো সাজসজ্জা ছাড়া।
❑ প্রশ্ন: সুগন্ধি ব্যবহার করে আসা কি জায়েজ?
উত্তর: না। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সে এখনো পরনারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কুরআন ও সুন্নাহ নাকি আহলে বাইত কোনটি অনুসরণীয়

 কুরআন ও সুন্নাহ নাকি আহলে বাইত (নবী পরিবার)-কোনটি অনুসরণীয়? বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সচেতন হোন!!

প্রশ্ন: আমি জানি, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম, মুসলিম শরিফের হাদিসে বলা আছে, পবিত্র কুরআন ও আহলে বায়তকে অনুসরণ করতে। তাহলে সুন্নাহ নাকি আহলে বায়েতকে অনুসরণ করব? বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্ত । দয়া করে আমাকে সঠিক বিষয়টি জানাবেন। জাযাকাল্লাহ খাইরান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনেক হাদিসে আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার আদেশ করেছেন। আর সহিহ মুসলিমের উক্ত হাদিসে আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়ার পর আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের অধিকার ও তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তাদেরকে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি দেখুন:
انطَلَقتُ أَنَا وَحُصَيْنُ بْنُ سَبْرَةَ وَعُمَرُ بْنُ مُسْلِمٍ إِلَى زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، فَلَمَّا جَلَسْنَا إِلَيْهِ قَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا؛ رَأَيْتَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَسَمِعْتَ حَدِيثَهُ، وَغَزَوْتَ مَعَهُ، وَصَلَّيْتَ خَلْفَهُ، لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا! حَدِّثْنَا يَا زَيْدُ مَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: يَا ابْنَ أَخِي، وَاللهِ لَقَدْ كَبِرَتْ سِنِّي، وَقَدُمَ عَهْدِي، وَنَسِيتُ بَعْضَ الَّذِي كُنْتُ أَعِي مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَا حَدَّثْتُكُمْ فَاقْبَلُوا، وَمَا لَا فَلَا تُكَلِّفُونِيهِ.
ثُمَّ قَالَ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فِينَا خَطِيبًا بِمَاءٍ يُدْعَى خُمًّا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ، فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَوَعَظَ وَذَكَّرَ، ثُمَّ قَالَ: “أَمَّا بَعْدُ، أَلَا أَيُّهَا النَّاسُ؛ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ رَسُولُ رَبِّي فَأُجِيبَ، وَأَنَا تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ: أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللهِ، فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ، فَخُذُوا بِكِتَابِ اللهِ، وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ”، فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللهِ وَرَغَّبَ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ: “وَأَهْلُ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي”.
فَقَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: وَمَنْ أَهْلُ بَيْتِهِ يَا زَيْدُ؟ أَلَيْسَ نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ؟ قَالَ: نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَكِنْ أَهْلُ بَيْتِهِ مَنْ حُرِمَ الصَّدَقَةَ بَعْدَهُ، قَالَ: وَمَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمْ آلُ عَلِيٍّ، وَآلُ عَقِيلٍ، وَآلُ جَعْفَرٍ، وَآلُ عَبَّاسٍ، قَالَ: كُلُّ هَؤُلَاءِ حُرِمَ الصَّدَقَةَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
“হুসাইন ইবনে সাবরা, উমর ইবনে মুসলিম এবং আমি (ইয়াজিদ ইবনে হাইয়ান) একদা জায়েদ ইবনে আরকাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলাম। আমরা যখন তাঁর পাশে বসলাম‌তখন হুসাইন তাঁকে বললেন,
‘হে জায়েদ! আপনি তো অনেক কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখেছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। হে জায়েদ! আপনি সত্যিই অনেক সৌভাগ্যের অধিকারী। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে আপনি যা শুনেছেন, আমাদের কাছে তা বর্ণনা করুন।’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আল্লাহর কসম, আমার বয়স হয়েছে, সেই সময়টাও অনেক আগে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যা আমি মুখস্থ রেখেছিলাম, তার কিছু অংশ ভুলেও গেছি। অতএব আমি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করি তা গ্রহণ করো আর যা বর্ণনা না করি সে বিষয়ে আমাকে বাধ্য করো না।’ এরপর তিনি বললেন, ‘একদিন মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি ‘খুম’ নামক স্থানে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সামনে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন এবং নসিহত ও উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন: “হে লোকসকল! সাবধান! আমি একজন মানুষ মাত্র। অচিরেই আমার রবের পক্ষ থেকে পাঠানো দূত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আসবে আর আমিও তাতে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু (মূল্যবান সম্পদ) রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হলো, আল্লাহর কিতাব, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরো এবং তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো।’ তিনি আল্লাহর কিতাবের প্রতি অত্যন্ত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বললেন, ‘আর (দ্বিতীয়টি হলো) আমার আহলে বাইত (পরিবারবর্গ)। আমি আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি (অর্থাৎ তাদের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় আল্লাহর ভয় দেখাব)।’ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে জায়েদ! তাঁর আহলে বাইত কারা? তাঁর স্ত্রীগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘তাঁর স্ত্রীগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তবে (মূলত) আহলে বাইত তারা, যাদের ওপর নবীজির ওফাতের পর সদকা গ্রহণ করা হারাম।” হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কারা?’ তিনি বললেন, ‘তারা হলো আলি-্এর পরিবার, আকিলের পরিবার, জাফরের পরিবার এবং আব্বাসের পরিবার।’ হুসাইন আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এদের সবার জন্যই কি সদকা হারাম?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’।” [সহিহ মুসলিম: ২৪০৮] আরও বর্ণিত হয়েছে, মুসনাদে ইমাম আহমদ (১৯২৬৫), আবু আওয়ানা (১০৬৭৭) এবং তাবারানি (৫/১৮৩, হাদিস নং ৫০২৮)
❑ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের নিকট আহলে বাইত বা নবী পরিবারের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেন:
وَيُحِبُّونَ أَهْلَ بَيْتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ، وَيَتَوَلَّوْنَهُمْ، وَيَحْفَظُونَ فِيهِمْ وَصِيَّةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم: حَيْثُ قَالَ يَوْمَ غَدِيرِ خُمٍّ: “أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي” وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمِّه وَقَدِ اشْتَكَى إِلَيْهِ أَنَّ بَعْضَ قُرَيْشٍ يَجْفُو بَنِي هَاشِمٍ- فَقَالَ: “وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ؛ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ؛ للهِ وَلِقَرَابَتِي وَقَالَ: “إِنَّ اللهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ”
“আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের লোকগণ নবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ অসিয়তকে হেফাজত করে, যা তিনি গাদিরে খুমের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি’।” [মাজমু ফাতাওয়া ৩/১৫৪]
তাঁর চাচা আব্বাস (রা.) যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন, কুরাইশদের কিছু লোক বনি হাশেমদের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন, “সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে।” রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের থেকে বনী ইসমাইলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাইলের সন্তানদের থেকে বনী কেনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনী কেনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনী হাশেমকে। আর হাশেমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে।” [সহীহ মুসলিম, ৪২২১]
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারকে নিঃশর্ত অনুসরণে ব্যাপারে কোনও সহিহ হাদিস নেই:
বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে এমন কিছু হাদিস পাওয়া যায় যেগুলোতে বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর কিতাব এবং আহলে বাইতকে অনুসরণ করো তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু এ মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলো সবগুলোই দুর্বল।
──────────
❑ নিম্নে এমন কয়েকটি জইফ (দুর্বল) হাদিস উপাস্থাপন করা হলো:
✪ ১ম:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ مَا إِنْ تَمَسَّكْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا بعدي أَحَدُهُمَا أَعْظَمُ مِنَ الآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَلَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الحَوْضَ فَانْظُرُوا كَيْفَ تَخْلُفُونِي فِيهِمَا”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। এর একটি অন্যটির চেয়ে বড় আল্লাহর কিতাব যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত এক রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আমার কাছে না আসা পর্যন্ত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। সুতরাং দেখো, আমার অবর্তমানে তোমরা তাদের সাথে কেমন আচরণ করো।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এই সূত্রে হাবিব বিন আবি সাবিত রয়েছেন, যিনি একজন ‘মুদাল্লিস’ (বর্ণনাকারীর নাম গোপনকারী)। ইমাম আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন, ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রা.) ছাড়া অন্য কোনো সাহাবীর থেকে তাঁর সরাসরি হাদিস শোনা প্রমাণিত নয়। এছাড়া বর্ণনাকারী আ’মাশও একজন মুদাল্লিস। [জামেউত তাহসিল, ১১৭]
✪ ২য়:
“أَيُّهَا النَّاسُ، إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا إِنِ اتَّبَعْتُمُوهُمَا، وَهُمَا كِتَابُ اللَّهِ، وَأَهْلُ بَيْتِي عِتْرَتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা তা অনুসরণ করো তবে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)।” [মুস্তাডরাকে হাকেম ৪৫৭৭]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ ওয়াহি (অত্যন্ত দুর্বল)। এর সূত্রে মুহাম্মদ বিন সালামাহ বিন কুহাইল রয়েছেন। ইমাম জুযজানি তাঁকে ‘যাহিবুল হাদিস’ (পরিত্যক্ত) বলেছেন। ইবনে আদি তাঁকে কুফার কট্টর শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।[আহওয়ালুর রিজাল, পৃষ্ঠা ৮৬; আল কামিল, ৭/৪৪৫]
✪ ৩য়:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ كِتَابَ اللهِ، وَأَهْلَ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। তারা হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [তাবারানি ৫/১৬৯]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এই সূত্রটি মুনকার (অগ্রহণযোগ্য)। এর সূত্রে হাসান বিন উবাইদুল্লাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর বর্ণনাগুলো ‘মুদতারিব’ (বিশৃঙ্খল), তাই তিনি তাঁর হাদিস গ্রহণ করেননি। [তাহজিবুত তাহজিব, ২/২৯২]
✪ ৪র্থ:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ، أَحَدُهُمَا أَكْبَرُ مِنَ الْآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَفْتَرِقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, যার একটি অন্যটির চেয়ে বড়। আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত একে অপর থেকে পৃথক হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ১১১০৪]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এর বর্ণনাকারী আতিয়্যাহ আল আউফি সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল বলে বিবেচিত।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এই হাদিসটিকে কুফাবাসীদের বর্ণনাকৃত ‘মুনকার’ হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। [দিওয়ানুয যুয়াফা, ২৮৪৩; আল মুন্তাখাব মিনাল ইলাল, ১১৭]
✪ ৫ম:
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللهِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৬]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ অত্যন্ত দুর্বল (ضعيف جدا)। এর সূত্রে যায়েদ বিন হাসান আলআনমাতি রয়েছেন। ইমাম আবু হাতিম তাঁকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৫৬০]
✪ ৬ষ্ঠ:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ خَلِيفَتَيْنِ كِتَابُ اللهِ، حَبْلٌ مَمْدُودٌ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، أَوْ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুজন প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ ও জমিনের মাঝে বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ২১৫৭৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত::
এটি সহিহ নয়। এর বর্ণনাকারী কাসিম বিন হাসান সম্পর্কে ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর হাদিস ‘মুনকার’ এবং তিনি অপরিচিত। [মিজানুল ইতিদাল, ৩/৩৬৯]
✪ ৭ম:
“إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللَّهِ سَبَبُهُ بِيَدِ اللَّهِ، وَسَبَبُهُ بِأَيْدِيكُمْ، وَأَهْلَ بَيْتِي”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা গ্রহণ করলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব—যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে এবং অন্য প্রান্ত তোমাদের হাতে এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে ইবনে আবি আসিম ১৫৫৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ ‘لا يصح (সহিহ নয়)। এর প্রথম সূত্রে মুহাম্মদ বিন উমর ‘মাজহুল’ (অপরিচিত) এবং কাসির বিন যায়েদ ‘দুর্বল’। দ্বিতীয় সূত্রে হারিস আলআওয়ার রয়েছেন, যাকে ইমাম শাবি ও অন্যরা ‘মিথ্যাবাদী’ (কাযযাব) হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৭৯]
◯ এর বিপরীতে বিভিন্ন হাদিসে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের নির্দেশনা এসেছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হাদিস হল,
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَدًا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গিয়েছি যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।” [মুস্তাদরাকে হাকেম: ৩১৮]
এই বর্ণনার ইসনাদ সহিহ। এই হাদিসটি ইসমাইল বিন আবি উওয়াইস তাঁর পিতার সূত্রে এবং মুহাম্মদ বিন ইসহাক যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। যদিও মুয়াত্তায় এটি সরাসরি (بلاغاً) এসেছে তবে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এই সূত্রটি শক্তিশালী। এছাড়া বিদায় হজের অন্যান্য ভাষণের সাথে এর অর্থের মিল রয়েছে। ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) বলেছেন, এই হাদিসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত পরিচিত ও প্রসিদ্ধ, যা এর বর্ণনাসূত্রের প্রয়োজনীয়তাকেও ছাপিয়ে যায় [আত তামহিদ: ২৪/৩৩১]। মুহাদ্দিস শাইখ আলবানি (রহ.) এই হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন [সহিহুল জামে: ২৯৩৭]।
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারের অনুসরণ: মূলনীতি ও শর্তাবলী:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরবর্তীতে যুগ পরম্পরায় নবী পরিবারের সকল সদস্য নিঃশর্তভাবে অনুসরণীয় নন। তাঁদের অনুসরণের বিষয়টি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল:
◈ ১. আহলে বাইতের সদস্যগণের মধ্যে শুধুমাত্র তাঁরাই অনুসরণীয়, যাঁরা নিজেদের জীবন আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর ছাঁচে গড়েছেন। কারণ দ্বীনের মানদণ্ড হলো ওহি। কোনো বিশেষ বংশীয় পরিচয় নয়।
◈ ২. ইসলামি আকিদা অনুযায়ী একমাত্র নবী-রসুলগণই ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ। আহলে বাইতের সদস্যগণ সম্মানীত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। তাই তাঁদের কোনো কথা বা কাজ যদি কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে বংশীয় সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তা গ্রহণ করা যাবে না।
◈ ৩. তাঁদের মধ্যে যাঁরা হক্কানী আলেম, মুত্তাকি এবং দ্বীনদার উম্মত কেবল তাঁদেরই অনুসরণ করবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতে, ‘আহলে বাইত’ এবং ‘আল্লাহর কিতাব’ কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না—এই কথার অর্থ হলো, কিয়ামত পর্যন্ত নবী পরিবারের একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। উম্মতের দায়িত্ব হলো সেই হকপন্থীদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের আদর্শ গ্রহণ করা।
◈ ৪. আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব (নিঃশর্ত ভালোবাসা)। তবে আমল ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ কেবল তাঁদেরই করা হবে, যাঁরা ইলমে দ্বীন ও সুন্নাহর ওপর সুদৃঢ় (শর্তযুক্ত অনুসরণ)।
মোটকথা, আহলে বাইতের মধ্যে যাঁরা আল্লাহওয়ালা, পরহেজগার এবং সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী তাঁরাই আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক। তাঁদের বংশীয় আভিজাত্য যখন ইলম ও তাকওয়ার সাথে মিলিত হয় তখন তা আমাদের জন্য ‘নূরুন আলা নূর’ বা আলোর ওপর আলো হিসেবে কাজ করে। আহলে বাইতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাঁদের সুন্নাহপন্থী সদস্যদের অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
❑ উপসংহার ও সারাংশ:
পরিশেষে বলব, পরকালীন মুক্তি এবং সফলতার জন্য মুসলিম উম্মাহর ওপর প্রধান ও অপরিহার্য কর্তব্য হলো—একমাত্র আল্লাহর কিতাব এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ করা। দ্বীনের এই দুটি মজবুত স্তম্ভই হচ্ছে হেদায়েতের মূল উৎস। এর পাশাপাশি, আহলে বাইত বা নবী পরিবারের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তাঁদের বিশেষ মর্যাদা বজায় রাখা আমাদের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহর অনুসারী, দ্বীনদার এবং পরহেজগার কেবল তাঁদেরকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সেই সাথে আমাদের অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে সেই সব স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যাপারে, যারা আহলে বাইতের প্রতি অতি-ভক্তি বা ভালোবাসার আড়ালে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। বিশেষ করে যারা জাল ও অত্যন্ত দুর্বল হাদিসের আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায় এবং উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করে, তাদের আসল পরিচয় ও মতবাদ সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরণের ফিতনা, বিভ্রান্তি ও গোমরাহি থেকে হেফাজত করুন এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অবিচল রাখুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate