ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)-এর অনুবাদে ‘সমুন্নত’ শব্দটি কেন আমরা এড়িয়ে চলি—বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে প্রথমে ‘উলূ’ (عُلُوّ) ও ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)—এই দুটি সিফাত সম্পর্কে জানা জরুরি। আমরা জানি, আল্লাহর সত্তা ও তাঁর কর্মের সঙ্গে সম্পর্কের দিক বিবেচনায় তাঁর সাব্যস্ত সিফাতসমূহকে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—সিফাতে যাতিয়্যাহ (صفات ذاتية) সত্তাগত গুন এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (صفات فعلية) কর্মগত গুন।
ভালোবাসি ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শান্তির ধর্ম
Saturday, September 12, 2026
আল্লাহ আরশের ওপর সমুন্নত কেন আমরা এই অনুবাদটি এড়িয়ে চলি
.
সত্তাগত গুণাবলি হলো:যে গুণে আল্লাহ পূর্বে গুণান্বিত ছিলেন এখনও গুণান্বিত আছেন এবং ভবিষ্যতেও গুণান্বিত থাকবেন, সেগুলোকে সত্তাগত বা সার্বক্ষণিক কিংবা চিরন্তন গুণাবলি বলা হয়।যেমন জীবন,জ্ঞান,কুদরত, শ্রবণ, দর্শন, হিকমত, সর্বোচ্চতা,ক্ষমতা প্রভৃতি।এগুলোকে সত্তাগত গুণরাজিও (الصفات الذاتية) বলা হয়ে থাকে।মহান আল্লাহর সত্তাগত গুণ চেনার মূলনীতি হল: وضابط الصفة الذاتية: أنه لم يزل ولا يزال متصفا بها “যে গুণে তিনি পূর্বে গুণান্বিত ছিলেন এবং এখনও গুণান্বিত আছেন”।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন “الصفات الذاتية: هي صفات المعاني الثابتة لله أزلاً وأبدا، مثل الحياة، والعلم، والقدرة، والسمع، والبصر، والعزة، والحكمة، إلى غير ذلك وهي كثيرة فهذه نسميها صفات ذاتية؛ لأنه متصف بها أزلا وأبدا ولا تفارق ذاته” “সত্তাগত গুণাবলী: যে ভাবগুলো আল্লাহ্র জন্য অনাদি ও অনন্তকাল ব্যাপী সাব্যস্ত; যেমন- জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, পরাক্রমশালিতা ও প্রজ্ঞা ইত্যাদি অনেক গুণ। এ গুণগুলোকে আমরা সত্তাগত গুণ বলে থাকি। যেহেতু তিনি এসব গুণে অনাদি ও অনন্তকাল ব্যাপী গুণান্বিত। এগুলো তাঁর সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।”(শারহুস সাফ্যারিনিয়্যাহ পৃষ্ঠা: ১৫৫)
.
.
যেসব গুণ আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তা কার্যকর করেন, আবার ইচ্ছা করলে তা কার্যকর করেন না। যেমন:আরশের ওপর উঠা এবং দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করা। এগুলোকে কর্মর্গত গুণাবলি (الصفات الفعلية) বলা হয়ে থাকে।আল্লাহ্র কর্মগত গুণের কিছু উদাহরণ হচ্ছে— উপরে উঠা, আগমন করা,ধরা,পাকড়াও করা ইত্যাদি অগণিত আরও অনেক গুণ। যেমনটি আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন: ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ﴾—“পরম করুণাময় আরশের ওপর উঠেছেন” [সূরা ত্ব-হা, ২০:৫) তিনি আরও বলেন:”নিশ্চয় আপনার প্রভুর পাকড়াও কঠোর।”[সূরা বুরুজ,আয়াত: ১২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا»”আমাদের রব প্রতিদিনই নিম্নাকাশে নেমে আসেন”।(সহীহ বুখারী হা/১১৪৫)
.
বিগত শতাব্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম,ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) কর্মগত সিফাত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
الصفات الفعلية: هي التي تتعلق بمشيئته، إن شاء فعلها، وإن شاء لم يفعلها، مثل الاستواء على العرش، والنزول إلى السماء الدنيا، والمجيء للفصل بين العباد، والفرح بتوبة التائب، والضحك إلى رجلين يقتل أحدهما الآخر كلاهما يدخل الجنة، والغضب على الكافرين، والرضا للمؤمنين، وغيرها، فهذه نسميها صفات فعلية؛ لأنها من فعله، وفعله يتعلق بمشيئته.
لكن هذا القسم من صفات الله آحاده حادثة، تحدث شيئا فشيئا، وأما جنس الفعل فإنه أزلي أبدي، فجنس كون الله فعالا – أي جنس الفعل في الله عز وجل – أزلي، فلم يزل ولا يزال فعالا، لم يأت وقت من الأوقات يكون الله تعالى معطلا فيه عن الفعل، فإن الله لم يزل ولا يزال فعالا لما يريد سبحانه وتعالى.لكن نوع الفعل أو آحاده هي التي تكون حادثة.مثلا: الاستواء على العرش نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد خلق العرش، كذلك النزول إلى السماء الدنيا: نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد خلق العرش، كذلك النزول إلى السماء الدنيا نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد أن خلق السماء الدنيا، كذلك الرضا والغضب نوع من أنواع الفعل، وهو حادث لأنه إذا فعل العبد فعلا يقتضي الرضا، رضي الله عنه، وإذا فعل فعلا يقتضي الغضب، غضب الله عليه”
“আর কর্মগত গুণাবলী (صفات فعلية) হলো যেগুলো আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তিনি চাইলে তা করেন, না চাইলে করেন না। যেমন: আরশে আরোহন (ইস্তিওয়া), প্রথম আকাশে অবতরণ, বান্দাদের মাঝে ফয়সালা করতে আগমন, তওবাকারীর তওবায় আনন্দিত হওয়া, দুইজন লোকের প্রতি হাসি যাদের একজন অপরজনকে হত্যা করে অথচ উভয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে, কাফেরদের প্রতি রাগ, মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্টি, ইত্যাদি। এগুলোকে কর্মগত বা কার্যগত গুণ বলা হয় কারণ এগুলো আল্লাহর কাজের অন্তর্ভুক্ত, আর আল্লাহর কাজ তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পর্কযুক্ত।তবে এই শ্রেণির গুণাবলীর পৃথক ঘটনাসমূহ নতুনভাবে সংঘটিত হয়। অর্থাৎ, একের পর এক ঘটে। কিন্তু গুণের গোত্র বা শ্রেণি হিসেবে তা চিরন্তন। অর্থাৎ, আল্লাহর ‘কর্মশীলতা’ চিরন্তন; তিনি সবসময় কর্মরত ছিলেন ও থাকবেন। এমন কখনোই হয়নি যে আল্লাহ কোনো কাজে নিস্ক্রিয় ছিলেন। তিনি চিরকাল এবং সর্বদা যা ইচ্ছা করেন তাই করেন এটা তাঁর গুণ।তবে কাজের ধরণ বা তার একক ঘটনা এইগুলোই নতুনভাবে সংঘটিত হয়।উদাহরণস্বরূপ: আরশে আরোহন হলো এক ধরণের কাজ এটি নতুনভাবে সংঘটিত, কারণ এটি আরশ সৃষ্টি হওয়ার পর ঘটেছে। একইভাবে প্রথম আকাশে অবতরণ এক ধরণের কাজ এটিও নতুনভাবে ঘটে, কারণ এটি প্রথম আকাশ সৃষ্টির পরে হয়েছে। তেমনই, সন্তুষ্টি ও রাগও এক ধরণের কাজ এগুলোও নতুন, কারণ বান্দার এমন কাজের প্রতিক্রিয়ায় ঘটে, যা সন্তুষ্টি বা রাগের উপযুক্ত হয়।”(শরহুস-সাফারিনিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৫৫; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: পৃষ্ঠা ২৪১)
.
জেনে রাখা ভাল যে, একটি সিফাতকে ভিন্ন দুই দিক থেকে বিবেচনা করলে তা একই সঙ্গে সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত সিফাত) এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (কর্মগত সিফাত)—উভয়টিই হতে পারে। এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো কালাম (কথা বলা)।মূল বা সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে কালাম আল্লাহর একটি সত্তাগত সিফাত। কারণ, মহান আল্লাহ অনাদিকাল থেকেই কালাম তথা কথা বলার গুণে গুণান্বিত এবং ভবিষ্যতেও এই গুণে গুণান্বিত থাকবেন। অর্থাৎ, আল্লাহ কখনোই কথা বলার গুণ থেকে বঞ্চিত ছিলেন না এবং হবেনও না।অন্যদিকে, কথার একক ও অংশের বিবেচনায়, অর্থাৎ মহান আল্লাহ ক্রমান্বয়ে (একটির পর একটি) কথা বলে থাকেন, সেই বিবেচনায় এটি একটি কর্মগত সিফাত। কেননা ‘কথা বলা’ আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।কারণ, আল্লাহ তা‘আলা যখন যা ইচ্ছা করেন, তখন তা বলেন; তাঁর কালাম তাঁর ইচ্ছা ও মাশিয়্যাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ইচ্ছা করলে কোনো বিষয় সম্পর্কে কথা বলেন এবং ইচ্ছা করলে কথা বলেন না। অর্থাৎ,কালামের মূল বৈশিষ্ট্যটি সত্তাগত, আর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কথা বলা কর্মগত।এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيًۡٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ﴾“নিশ্চয়ই তাঁর ব্যাপার হলো—তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাকে শুধু বলেন, ‘হও’; ফলে তা হয়ে যায়।”—সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২) এখানে ‘যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন’—এই কথাটি প্রমাণ করে যে, নির্দিষ্ট কোনো কথা বলা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত।আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন:﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمٗا﴾“আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”—সূরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩০)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.] “আল-কাওয়াইদুল মুসলা”-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
” ومن الصفات ما يصدق عليها أنها ذاتية فعلية باعتبارين، مثل: الكلام، والخلق، والرَّزق؛ فهذه باعتبار أن الله لم يزل موصوفًا بها، فتقول: الله لم يزل فعالًا لما يريد، ولم يزل خالقًا، ولم يزل غفورًا، ولم يزل رحيمًا، فهذه صفات ذاتية.وباعتبار أفراد أو آحاد هذه الأفعال هي تابعة للمشيئة، فهو يرحم من شاء إذا شاء، ويرزق من شاء إذا شاء، ويتكلم إذا شاء.فالكلام قديم النوع، حادث الآحاد، فالكلام صفة ذاتية فعلية، والخلق صفة ذاتية فعلية، والمغفرة وكونه – تعالى – غفورا، صفة ذاتية فعلية، وما أشبه ذلك” انتهى.
“কিছু সিফাত এমন রয়েছে, যেগুলোকে দুটি ভিন্ন বিবেচনায় সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত সিফাত) এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (কর্মগত সিফাত)—উভয়ই বলা যায়। যেমন: কালাম (কথা বলা), খালক (সৃষ্টি করা) এবং রিযিক প্রদান। একটি বিবেচনায়, আল্লাহ তা‘আলা অনাদিকাল থেকেই এসব সিফাতে গুণান্বিত। তাই বলা যায়: ‘আল্লাহ অনাদিকাল থেকেই যা ইচ্ছা তা কার্যকরকারী’; ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই সৃষ্টিকর্তা’; ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই ক্ষমাশীল’; এবং ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই পরম দয়ালু।’ এই বিবেচনায় এগুলো সিফাতে যাতিয়্যাহ অন্যদিকে, এসব কর্মের পৃথক পৃথক সংঘটন ও একেকটি বাস্তবায়নের বিবেচনায় এগুলো আল্লাহর মাশিয়াত (ইচ্ছা)-এর অধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, তার প্রতি দয়া করেন; যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, রিযিক প্রদান করেন; এবং তিনি যখন ইচ্ছা কথা বলেন।
সুতরাং, কালাম (কথা বলা) প্রকারের দিক থেকে চিরন্তন (قديم النوع), আর পৃথক পৃথক কথনসমূহের দিক থেকে নতুনভাবে সংঘটিত (حادث الآحاد)। অতএব, কালাম এমন একটি সিফাত, যা এক বিবেচনায় যাতিয়্যাহ এবং অন্য বিবেচনায় ফি‘লিয়্যাহ। একইভাবে, খালক (সৃষ্টি করাও) এমন একটি সিফাত, যা যাতিয়্যাহ ও ফি‘লিয়্যাহ—উভয় বিবেচনাতেই প্রযোজ্য। আর মাগফিরাত (ক্ষমা করা) এবং আল্লাহ তা‘আলার ‘গফূর’ (ক্ষমাশীল) হওয়াও এমন একটি সিফাত, যা যাতিয়্যাহ ও ফি‘লিয়্যাহ—উভয় বিবেচনায় প্রযোজ্য। এ ধরনের আরও অনুরূপ সিফাত রয়েছে।”—(শারহুল-কাওয়াইদিল মুসলা, পৃ. ৭৮)
.
.
বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমে ‘উলূ’ (عُلُوّ) ও ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)—এই দুটি সিফাতের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। উভয়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতার একটি সাধারণ দিক থাকলেও আকীদার পরিভাষায় এগুলো একে অপরের সমার্থক নয়। ‘উলূ’ (عُلُوّ) অর্থ—মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ঊর্ধ্বে এবং সকল সৃষ্টির উপরে রয়েছেন। এটি তাঁর সত্তাগত (ذاتي) সিফাত। অর্থাৎ যে সিফাত আল্লাহর সত্তার সঙ্গে চিরকাল বিদ্যমান এবং তাঁর সত্তা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না, তাকে সত্তাগত সিফাত বলা হয়। মহান আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে—এই বৈশিষ্ট্যও তাঁর সত্তা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না; তিনি অনাদিকাল থেকেই এই গুণে গুণান্বিত, বর্তমানে আছেন এবং অনন্তকাল থাকবেন। যেমন তিনি অনাদিকাল থেকেই বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও ক্ষমতার গুণে গুণান্বিত এবং চিরকাল এসব গুণে গুণান্বিত থাকবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ﴾—“আর তিনিই সর্বোচ্চ (সবকিছুর ওপরে) এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান।”(সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫)এবং সুন্নাহ থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নবী ﷺ বলেছেন: «رَبَّنَا اللَّهُ الَّذِي فِي السَّمَاءِ»—“আমাদের রব হলেন সেই আল্লাহ, যিনি আসমানের ওপরে রয়েছেন।”(আবু দাউদ হা/৩৮৯২)
.
পক্ষান্তরে ইস্তিওয়া এর কয়েকটি অর্থ থাকলেও ইস্তেওয়া’ শব্দটি যখন على বা إلى যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন এর মশহুর তাফসির:ঊর্ধ্বে উঠা ও উপরে উঠার অর্থই সর্বজন স্বীকৃত।এটি আল্লাহর কর্মগত (فعلي) সিফাত, যা তাঁর ইচ্ছা ও মাশিয়্যাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।আরশের ওপর আল্লাহর আরোহণ একটি সুনির্দিষ্ট সিফাত।এই সিফাত আরশের সাথে সম্পর্কিত। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চাইলে ইস্তাওয়া করেন আর না চাইলে করেন না। তবে তিনি নিজের সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন যে,তিনি আরশের ওপর উঠেছেন।অন্য কোনো সৃষ্টির ওপর তিনি উঠেছেন কিনা তা জানাননি। তাই আমারা সে বিষয়ে আক বাড়িয়ে কিছু বলি না। আল্লাহর কর্মগত সিফাতের দলিল আল্লাহর বানী: ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ﴾—“পরম করুণাময় আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন বা উঠেছেন”[সূরা ত্ব-হা, ২০:৫]।পূর্বোক্ত আয়াতটি ছাড়াও কুরআনে মোট ছয়টি আয়াতে বলা হয়েছে-মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পরে আরশের ওপর ওঠেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন:ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.”এরপর তিনি আরশের ওপর আরোহণ করেছেন।”(সুরা আরাফ ৭: ৫৪, সুরা ইউনুস ১০: ৩, সুরা রাদ ১৩: ২, সুরা ফুরকান ২৫: ৫৯) এখানে ‘ইস্তিওয়া’ এটি কর্মগত সিফাত যা কুরআন সুন্নাহ এবং সালাফদের ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপর উঠা তাঁর সবকিছুর উপরে থাকার অতিরিক্ত আরেকটি গুণ। কারণ সবকিছুর উপরে থাকা তাঁর সত্ত্বাগত গুণ; যা মানব মনের স্বাভাবিক নীতি, বিবেক, সকল জাতির ঐকমত্য দ্বারা সাব্যস্ত। কিন্তু আরশের উপর উঠার বিষয়টি তিনি বা তাঁর রাসূল না জানালে আমাদের জানার কোনো সুযোগ নেই।
.
শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:মহান আল্লাহর আরশের ওপর উঠা কি তাঁর কর্মগত গুণ (সিফাতে ফে’লিয়্যাহ), নাকি সত্তাগত গুণ (সিফাতে যাতিয়্যাহ)?
জবাবে শাইখ বলেন:أنه من الصفات الفعلية؛ لأنه يتعلق بمشيئته, وكل صفة تتعلق بمشيئته؛ فهي من الصفات الفعلية.
“এটি তাঁর কর্মগত গুণ; কারণ এটি তাঁর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। আর যে গুণই আল্লাহর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত হয়, সেটিই কর্মগত গুণ হিসেবে গণ্য।” (শারহুল আকীদাতিল ওয়াসিত্বিয়্যাহ,খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৬)
.
এছাড়া আমরা জানি যে, আল্লাহর (علو) উলু মানে ঊর্ধ্বে থাকা বা সমুচ্চ হওয়া।এই গুণটি সিফাত যাতিয়্যাহ, আর (استوى) ইস্তিওয়া মানে ঊর্ধ্বে উঠা ও উপরে উঠা। এই গুণটি সিফাত ফি’লিয়্যাহ। (علو) উলু গুণটি দ্বারা ব্যাপকভাবে উপরে থাকা বুঝায়, আর استوى গুণটি দ্বারা বিশেষভাবে উপরে থাকা বুঝায়।এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর একটি কর্ম বুঝায়।আমরা আরও জানি যে,সালাফদের মানহাজ হচ্ছে, আল্লাহর علو বা উপরে থাকার মধ্যে তিনটি অর্থ রয়েছে যথা:(১). সত্তাগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর সৃষ্টিকুলের ওপরে রয়েছেন।(২). মর্যাদাগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ আল্লাহ সুমহান মর্যাদার অধিকারী,তাঁর কোনো সৃষ্টিই মর্যাদার ক্ষেত্রে তাঁর সমপর্যায়ে যেতে পারে না।আর আল্লাহর মর্যাদায় কোনো ত্রুটিও আপতিত হয় না। (৩). প্রতাপগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ মহান আল্লাহ সকল সৃষ্টির ওপর বিজয়ী হয়েছেন।আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই তাঁর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের হতে পারে না। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত আল্লাহর علو বা উপরে থাকার উপরোক্ত তিনটি অর্থই সাব্যস্ত করে পক্ষান্তরে জাহামিয়ারা এবং কালামী তথা আশআরী ও মাতুরিদিয়ারা সত্তাগতভাবে উপরে থাকা সাব্যস্ত করে না। বাকী দুটি তথা মর্যাদাগত ঊর্ধ্বতা, এবং প্রতাপগত ঊর্ধ্বতা, তারা সাব্যস্ত করে। আমরা আরও জানি যে, করা, উঠা,এরকম অনুবাদ না হলে ফে’লে মাযী মূতা’আদ্দী এর অনুবাদ সঠিক হয় না।
.
সুতরাং, সূরা ত্ব-হা-এর ৫ নম্বর আয়াত ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ ‘আল্লাহ আরশে সমুন্নত’ অনুবাদ করা আমাদের কাছে অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ মনে হয় না। কারণ এতে ‘ইস্তিওয়া’ ক্রিয়াটির স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশিত না হয়ে সাধারণ ‘ঊর্ধ্বতা’ বা ‘সমুন্নত থাকা’-এর অর্থ বোঝার সম্ভাবনা থাকে। অথচ ‘উলূ’ (العلو) আল্লাহর সত্তাগত সিফাত [صفة ذاتية], আর ‘ইস্তিওয়া’ (الاستواء) তাঁর কর্মগত সিফাত [صفة فعلية]—দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। এখন সত্তাগত সিফাতের ন্যায় কর্মগত তথা ক্রিয়ার অর্থও যদি শুধু ‘সমুন্নত’ করেন তবে বিশেষণ ও ক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করলেন কোথায়? আল্লাহ দুটি সিফাতের ক্ষেত্রে দুই ধরনের শব্দ উল্লেখ করে পার্থক্য করলেন অথচ আমরা পার্থক্য করি না। যদি দুটোর অর্থ একই রকম হতো তবে আল্লাহ শুধু বিশেষণ অথবা শুধু ক্রিয়ার যেকোনো একটি উল্লেখ করতেন—দুটো উল্লেখ করতেন না। তাই ‘রহমান আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন বা উঠেছেন’—এভাবে অনুবাদ করলে আয়াতের ক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এবং ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’র পার্থক্যও পাঠকের কাছে পরিষ্কার থাকে।আর এই কারণেই ﴿اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ﴾-এর অনুবাদে ‘আল্লাহ আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন’ বা উঠেছেন বলা অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ; কেননা এখানে উপরে ওঠা কর্মগত সিফাত সাব্যস্ত হচ্ছে, আর আয়াতের উদ্দেশ্যে এটিই।পক্ষান্তরে বাংলার ‘সমুন্নত’ শব্দটি বিশেষণ পদ। এটি কখনো সাধারণ উচ্চতা বা ঊর্ধ্বতা বোঝায়, আবার কখনো দূরবর্তী অর্থ হিসেবে ‘উপরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া’র অর্থেও ব্যবহৃত হয়—ফলে শব্দটির মাধ্যমে সরাসরি ক্রিয়া প্রকাশ পায় না। যার কারনে ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’র স্বাতন্ত্র্য অস্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বিদআতপন্থীরা এ অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
.
পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো সালাফি আলেম অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘সমুন্নত’ শব্দ ব্যবহার করলে শুধু এই একটি শব্দের ভিত্তিতে তাঁকে ভুল আকীদার অনুসারী বা গোমরাহ বলে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা ন্যায়সংগত নয়। কারণ অনুবাদে শব্দচয়ন কখনো ভাষাগত রীতি, পাঠকের বোধগম্যতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ভিন্ন হতে পারে। মূল বিষয় হলো—তিনি ‘ইস্তিওয়া’ (الاستواء)-কে আল্লাহর একটি স্বতন্ত্র কর্মগত সিফাত হিসেবে স্বীকার করেন কি না এবং এর শরঈ অর্থ যথাযথভাবে গ্রহণ করেন কি না। তাই কোনো আলেমের অনুবাদে ‘সমুন্নত’ শব্দ পাওয়া গেলে কেবল সেই শব্দের ওপর ভিত্তি করে তাঁর আকীদা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁর অন্যান্য বক্তব্য ও ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোথাও ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকলে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে বরং সঠিক বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো আলেমের সমালোচনা করা নয়; বরং আল্লাহর সিফাতের বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’-এর পার্থক্য পরিষ্কার থাকে এবং সাধারণ পাঠক জাহামিয়াদের বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকেন। এ দিক থেকে ‘আল্লাহ আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন’—এ ধরনের অনুবাদ আমাদের কাছে অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ মনে হয়; কারণ এতে আয়াতের মূল শব্দ ‘ইস্তিওয়া’ এর সঠিক অর্থ অবিকৃত থাকে এবং এটিকে আল্লাহর কর্মগত সিফাত হিসেবে বোঝার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে কোনো আলেম ‘সমুন্নত’ শব্দ ব্যবহার করলে তাঁর উদ্দেশ্য ও আকীদা যাচাই না করে তাঁর বিরুদ্ধে মন্তব্য করা উচিত নয়; বরং ব্যক্তিকে নয়, বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্যকে যাচাই করাই ন্যায়সংগত ও ইলমি পদ্ধতি। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
নিচের মাতাফে তাওয়াফ করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে পুনরায় ইহরামের পোশাক পরিধান করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর চেষ্টা করা জায়েয নয়
প্রশ্ন: বর্তমান হারামাইন কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী ইহরামের কাপড় ছাড়া তথা ওমরাহকারী ছাড়া অন্য কেউ মাতাফে নেমে তওয়াফ করতে পারবে না। তাদেরকে কেবল উপরের তলাগুলো দিয়ে তওয়াফ করতে হবে। সেকারণে অনেক ওমরাহকারী ওমরাহ শেষ হওয়ার পরও কৌশল করে ইহরামের কাপড় পরে নীচে তওয়াফ করছেন। এরূপ করা সঠিক হবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি।অতঃপর,একজন উমরাহকারী তার উমরাহর যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর চাইলে একাধিকবার নফল তাওয়াফ করতে পারেন। কেননা, নফল তাওয়াফের জন্য শরী‘আতে নির্দিষ্ট কোনো সময় বা সংখ্যা নির্ধারিত নেই। এটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি ইবাদত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে তাওয়াফের ব্যাপক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে দশটি নেকী লেখা, দশটি গুনাহ মুছে দেওয়া এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করার কথা বর্ণিত হয়েছে। (মুসনাদু আহমাদ, হা/৪৪৬২; তিরমিযী, হা/৯৫৯; মিশকাত, হা/২৫৮০)
.
তবে জেনে রাখুন, কোনো ইবাদত করার আগ্রহ থাকলেই তা আদায়ের জন্য বৈধ প্রশাসনিক বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করা যাবে না। সৌদি আরবের হারামাইন শরীফাইনের কর্তৃপক্ষ হাজী, উমরাহকারী ও অন্যান্য মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইবাদতকারীদের জন্য তাওয়াফের ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল রাখার উদ্দেশ্যে মাতাফের নিচের অংশে প্রবেশ ও তাওয়াফের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। বিশেষ করে ওমরাহকারীদের তাওয়াফ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অ-ওমরাহকারীদের ওপরের তলায় তাওয়াফের নির্দেশ দেওয়া হলে তা জনস্বার্থ ও শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত একটি বৈধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হবে।সুতরাং, ওমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর শুধু নিচের মাতাফে নফল তাওয়াফ করার সুযোগ পাওয়ার জন্য পুনরায় ইহরামের পোশাক পরিধান করে নিজেকে ইহরামরত ওমরাহকারী হিসেবে উপস্থাপন করা এবং এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়া জায়েজ নয়। কারণ, শুধু ইহরামের কাপড় পরিধান করলেই কেউ শরী‘আতের দৃষ্টিতে মুহরিম হয়ে যায় না; বরং ইহরাম একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের নিয়ত ও সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি এভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশনা অমান্য করা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের বিভ্রান্ত করার আশ্রয় নেওয়া হয়।
.
আর মূলনীতি হলো—”জনপ্রশাসন সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন প্রতিটি নাগরিকের জন্য মান্য করা আবশ্যক-যতক্ষণ না তা শরিয়া বিরোধী হয়।” তুহফাতুল মুহতাজ আলা শারহিল মিনহাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—تجب طاعة الإمام في أمره ونهيه ما لم يخالف الشرع أي بأن لم يأمر بمبمحرم “ইমাম বা শাসকের নির্দেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তিনি শরীয়তের খেলাফ করেন, অর্থাৎ কোনো হারাম কাজের নির্দেশ না দেন।”(তুহফাতুল মুহতাজ আলা শারহিল মিনহাজ’;৩/৭১) দলিল হচ্ছে,আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ﴾—“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করো” (সূরা আন-নিসা, ৪/৫৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,أن القوانين إذا كانت لا تخالف الشرع فلا بأس بها، النظم تسمى بالقوانين وتسمى بالنظم، فكل قانون ونظام ينفع المسلمين ولا يخالف شريعة الله لا بأس به، من المرور أو في القضاء أو في أي الدوائر الحكومية أو في أي مكان. “আইন-কানুন যদি শরিয়ত বিরোধী না হয় তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নাই। শৃঙ্খলাকে আইন বলা হয়। সুতরাং (রাষ্ট্রের) যে সকল আইন-শৃঙ্খলা মুসলিমদের উপকার করে ও আল্লাহর আইন লঙ্ঘন করে না তাতে কোনও সমস্যা নাই। যেমন: ট্রাফিক, বিচার বিভাগ, সরকারি অফিস বা অন্য যে কোন স্থানে হোক না কেন।”(বিন বায, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১০১৭)
.
ইয়েমেনের সালাফি আলেম ও ফকীহ, শায়খ আবু মালিক তাওফীক বিন মুহাম্মাদ আল-বাদ‘আনী [জন্ম: ১৯৭২ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আমি কি ইহরামের পোশাক পরিধান করে কাবা শরীফের তাওয়াফ করার জন্য صحن المطاف (তাওয়াফের চত্বর)-এ প্রবেশ করতে পারি? কারণ, সেখানে সাধারণ পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না; বরং শুধু ওমরাহর জন্য ইহরামকারী ব্যক্তিদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।”
উত্তরে শাইখ বলেন:لا يجوز لك فعل ذلك؛ لأنه مخالفة لأمر ولي الأمر ومزاحمة ومضايقة للمحرمين؛ وحيلة للوصول إلى الممنوع من قبل ولي الأمر فاكتفي بالطواف من خارج الصحن وعذرك معك في عدم الطواف في الصحن حتى تحرم بعمرة.“আপনার জন্য এমনটি করা জায়েয নয়। কেননা, এটি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নির্দেশের লঙ্ঘন; ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ভিড় ও তাদের চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করা; এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিষিদ্ধ করা স্থানে প্রবেশের জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করা। অতএব, আপনি তাওয়াফের চত্বরের বাইরে থেকেই তাওয়াফ করুন। আর ওমরাহর জন্য ইহরাম না করা পর্যন্ত তাওয়াফের চত্বরে তাওয়াফ করতে না পারার ব্যাপারে আপনার ওজর গ্রহণযোগ্য।”(https://www.sheikh-tawfik.net/show_fatawa.php?id=2228
অনুরূপ বক্তব্য সৌদি আরবের আলেমদের থেকেও রয়েছে।
.
সুতরাং যে সকল আইন-কানুন জনমানুষের কল্যাণ এবং বিশৃঙ্খলা রোধের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। কোনও নাগরিকের জন্য এ সকল আইন লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। অন্যথায় গুনাহগার হতে হবে। কেননা, এ সব আইন অনুসরণ না করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জান-মালের ক্ষতি এবং নানা দুর্ভোগে পতিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর মানুষের নিরাপত্তা, কল্যাণ সাধন এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া কেউ যদি এসব আইন লঙ্ঘন করে তাহলে সে নিজেকে নানা বিপদাপদ, শাস্তি ও লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করবে-যা ইসলামে নিষেধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا ينبغِي للمؤمنِ أن يُذلّ نفسهُ قالوا : وكيف يُذلّ نفسهُ ؟ قال : يتعرّضُ من البلاءِ لمَا لا يطيقُ- رواه الترمذي، وصححه الألباني. “কোনও ইমানদারের জন্য নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিৎ নয়। তারা (সাহাবিগণ) প্রশ্ন করলেন, মানুষ কিভাবে নিজেকে লাঞ্ছিত করে? তিনি বললেন, সে নিজেকে এমন বিপদের মুখোমুখি করে যা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে।” [তিরমিযি,হা/২৫৫৪;শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন-সাহাবি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান থেকে বর্ণিত।]
.
পরিশেষে, ওমরাহ সম্পন্ন করার পর নফল তাওয়াফ করতে চাইলে হারামাইন শরিফাইনের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম-কানুন মেনে ওপরের তলাগুলোতেই তাওয়াফ করা উচিত। শুধু নিচের মাতাফে তাওয়াফ করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে পুনরায় ইহরামের পোশাক পরিধান করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর চেষ্টা করা জায়েয নয়। কেননা, এতে একদিকে জনস্বার্থ, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রণীত বৈধ নির্দেশ অমান্য করা হয়, অন্যদিকে নিরাপত্তাকর্মীদের বিভ্রান্ত করে একটি অনুচিত কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّيْ ‘যে প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়”(সহীহ মুসলিম, হা/১০২)। অতএব একজন মুমিনের উচিত—ইবাদতের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি তার পদ্ধতিতেও আল্লাহর আনুগত্য, সততা, শৃঙ্খলা ও অন্য মুসল্লিদের অধিকার রক্ষার প্রতি যত্নশীল হওয়া। তাই নিচের মাতাফে তাওয়াফ করার সাময়িক সুবিধার জন্য নিয়ম ভঙ্গ না করে, কিছুটা কষ্ট ও দূরত্ব হলেও নির্ধারিত স্থানেই নফল তাওয়াফ করা উচিত। এটাই তাকওয়া, আমানতদারি এবং আল্লাহর আনুগত্যের অধিক উপযোগী পন্থা।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সাদকাহ করে দেওয়া কোনো সম্পদ পরবর্তীতে নিজেই পুনরায় ক্রয় করতে পারবে কি
প্রশ্ন: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সাদকাহ করে দেওয়া কোনো সম্পদ পরবর্তীতে নিজেই পুনরায় ক্রয় করতে পারবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি তাঁর বান্দাদের ইবাদত, দান-সাদকাহ ও নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের পথ দেখিয়েছেন। অসংখ্য দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি, যিনি উম্মতকে দান-সদকার আদব, বিধান ও সীমারেখা শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলামে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো সম্পদ সাদকাহ করে দেওয়া নিঃসন্দেহে মহান ইবাদত। তবে কোনো সম্পদ শরিয়তসম্মতভাবে সাদকাহ করে দেওয়ার পর তা পুনরায় নিজের মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়া বা নিজেই তা ক্রয় করে নেওয়ার বিধান কী—এ বিষয়ে শরিয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর দলিল ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো ব্যক্তি নিজে যে সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাদকাহ করে দিয়েছে, পরবর্তীতে তা সরাসরি ক্রয় করে নিজের মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়া জায়েয নয়। এর সুস্পষ্ট দলিল হলো,ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আল্লাহর পথে একটি ঘোড়া দান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দেখলেন, যার কাছে ঘোড়াটি ছিল সে যথাযথভাবে তার যত্ন নিচ্ছে না এবং সে আর্থিকভাবেও অসচ্ছল। তাই উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ঘোড়াটি পুনরায় কিনে নেওয়ার ইচ্ছা করলেন। তিনি বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জানালে তিনি বললেন:لا تشتره ، وإن أعطيته بدرهم ، فإن مثل العائد في صدقته كمثل الكلب يعود في قيئه “তুমি তা কিনো না, যদিও সে তোমাকে মাত্র এক দিরহামের বিনিময়েও দিতে চায়। কেননা যে ব্যক্তি নিজের সাদকাহ ফিরিয়ে নেয়, তার দৃষ্টান্ত সেই কুকুরের মতো, যে নিজের বমি পুনরায় খায়।”(সহীহ বুখারি হা/২৬২৩ ও ইমাম মুসলিম হা/১৬২০) লক্ষণীয় বিষয় হল, এখানে রাসূল (ﷺ) যথার্থ কারণ থাকা সত্ত্বেও উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে টাকার বিনিময়েও স্বীয় দানকৃত ঘোড়া ক্রয় করতে নিষেধ করেছেন।হাদিসের আলোকে ইবনুল মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ থেকে বোঝা যায় যে, সাদকাহকারী পরবর্তীতে নিজের সাদকাহকৃত বস্তু পুনরায় ক্রয় করা থেকে বিরত থাকবে কেননা তা হারাম; যদিও অধিকাংশ আলেম এটিকে মাকরূহে তানযীহী—অর্থাৎ অপছন্দনীয় বলে মত দিয়েছেন। হাফিয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”সাদকাহকৃত পশু কম মূল্যে হলেও পুনরায় ক্রয় করাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ সদাকাহ থেকে ফিরে আসার সঙ্গে তুলনা করেছেন; কারণ সাদকাহ করার উদ্দেশ্য ছিল আখিরাতের সাওয়াব অর্জন, অথচ পুনরায় তা ক্রয় করা যেন দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার সদৃশ। নিজের সাদকাহ পুনরায় কিনে নেওয়া হারাম—এ মতটি ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাজহাবেরও মত। আর উল্লেখিত হাদিসের কারণে এই মতটিই অধিক শক্তিশালী।
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,
ثقوله: (حملت على فرس عتيق في سبيل الله) : معناه تصدقت به ووهبته لمن يقاتل عليه في سبيل الله، والعتيق الفرس النفيس الجواد السابق. قوله: ( فأضاعه صاحبه ) أي قصر في القيام بعلفه أو مؤنته. قوله صلى الله عليه و سلم: (لا تبتعه ولا تعد في صدقتك ) هذا نهي تنزيه لا تحريم، فيكره لمن تصدق بشيء، أو أخرجه في زكاة أو كفارة أو نذر، ونحو ذلك من القربات : أن يشتريه ممن دفعه هو إليه ، أو يتهبه ، أو يتملكه باختياره منه. فأما إذا ورثه منه : فلا كراهة فيه ، وقد سبق بيانه في كتاب الزكاة . وكذا لو انتقل إلى ثالث ، ثم اشتراه منه المتصدق : فلا كراهة. هذا مذهبنا ومذهب الجمهور. وقال جماعة من العلماء: النهي عن شراء صدقته : للتحريم، والله أعلم “
“আমি আল্লাহর পথে একটি উৎকৃষ্ট ঘোড়া দান করেছিলাম”—এর অর্থ হলো, তিনি ঘোড়াটি এমন ব্যক্তিকে দান করেছিলেন, যে আল্লাহর পথে যুদ্ধের কাজে তা ব্যবহার করবে। ‘আতীক’ বলতে মূল্যবান, উৎকৃষ্ট ও দ্রুতগামী ঘোড়াকে বোঝায়। আর “তার মালিক সেটির প্রতি অবহেলা করেছিল”—এর অর্থ হলো, সে ঘোড়াটির খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের ক্ষেত্রে ত্রুটি করেছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী, “তুমি তা কিনে নিয়ো না এবং তোমার সাদকাহর মধ্যে ফিরে যেয়ো না”—এটি নিষেধসূচক হলেও হারাম নয়; বরং মাকরূহ। অতএব, যে ব্যক্তি কোনো বস্তু সাদকাহ করেছে, অথবা যাকাত, কাফফারা, মানত কিংবা এ ধরনের কোনো নেক আমলের উদ্দেশ্যে তা প্রদান করেছে, তার জন্য সে বস্তুটি যাকে প্রদান করেছিল, তার কাছ থেকে পুনরায় কিনে নেওয়া, তার কাছ থেকে হিবা হিসেবে গ্রহণ করা, অথবা তার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে পুনরায় নিজের মালিকানায় নিয়ে নেওয়া মাকরূহ।তবে যদি তা উত্তরাধিকার সূত্রে তার মালিকানায় আসে, তাহলে এতে কোনো কেরাহাত নেই; এর আলোচনা পূর্বে কিতাবুয যাকাতে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে, বস্তুটি যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মালিকানায় চলে যায় এবং এরপর দানকারী সেই তৃতীয় ব্যক্তির কাছ থেকে তা ক্রয় করে, তাহলেও এতে কোনো কেরাহাত নেই। এটি আমাদের (শাফেয়ি) মাজহাব ও অধিকাংশ আলেমের মত। আর একদল আলেমের মতে, নিজের সাদকাহ পুনরায় ক্রয় করার ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা হারামের অর্থে; আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।” (ইমাম নববী, শারহু সহীহ মুসলিম, ১১ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬২)
.
হাম্বলী মাযহাবের বিখ্যাত আলেম ইমাম বুহূতী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ‘কাশশাফুল ক্বিনা’ গ্রন্থে বলেন;
والمذهب أيضا : أنه يحرم ، ولا يصح شراؤه زكاته ولا صدقته ) ؛ لما روي عن عمر قال: حملت على فرس في سبيل الله ، فأضاعه الذي كان عنده، وأردت أن أشتريه ، وظننت أنه يبيعه برخص ، فسألت النبي صلى الله عليه وسلم ، فقال : لا تشتره ولا تعد في صدقتك ، وإن أعطاكه بدرهم ، فإن العائد في صدقته كالعائد في قيئه. متفق عليه .ولأن شراءها وسيلة إلى استرجاع شيء منها ، لأنه يستحيي أن يماكسه في ثمنها ، وربما سامحه طمعا منه بمثلها ، أو خوفا منه إذا لم يبعها أن لا يعود يعطيه في المستقبل، وكل هذه مفاسد ؛ فوجب حسم المادة…( وإن رجعت إليه ) زكاته أو صدقته ( بإرث ) : طابت له ، بلا كراهة ؛ لحديث بريدة أنه صلى الله عليه وسلم أتته امرأة ، فقالت : إني تصدقت على أمي بجارية ، وإنها ماتت فقال النبي صلى الله عليه وسلم : وجب أجرك وردها عليك الميراث . رواه الجماعة إلا البخاري والنسائي .( أو ) عادت إليه بـ ( هبة أو وصية أو أخذها من دينه ) : طابت له ، لأن ذلك كالإرث .( أو ردّها ) أي الزكاة ( له الإمام ، بعد قبضه منه ، لكونه ) ـ أي المالك ـ ( من أهلها ) ، أي الزكاة جاز له أخذها ، ( كما يأتي ) في الباب ؛ لأنها عادت إليه بسبب آخر ، فهو كما لو عادت إليه بميراث” ا
“হাম্বলী মাযহাবের মত হলো, কোনো ব্যক্তি যে সম্পদ যাকাত বা সাদকাহ হিসেবে দান করেছে, তা পুনরায় কিনে নেওয়া হারাম এবং এভাবে ক্রয় করলেও তা সহিহ হবে না। এর দলিল হলো উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিস। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর পথে একটি ঘোড়া দান করেছিলাম। যার কাছে ঘোড়াটি ছিল, সে সেটির যথাযথ যত্ন নেয়নি। পরে আমি সেটি কিনে নেওয়ার ইচ্ছা করলাম এবং ধারণা করলাম, সে হয়তো কম দামে তা বিক্রি করবে। তাই আমি নবী ﷺ-এর কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি তা কিনো না এবং তোমার সদকায় ফিরে যেয়ো না; যদিও সে তোমাকে তা এক দিরহামের বিনিময়েও দেয়। কেননা যে ব্যক্তি নিজের সাদকাহ ফিরিয়ে নেয়, সে ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে নিজের বমি পুনরায় ভক্ষণ করে।’”—হাদিসটি মুত্তাফাকুন আলাইহি। নিজের সদকা বা যাকাতের সম্পদ ক্রয় করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো,এটি সাদকাহর কিছু অংশ পুনরায় নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হয়ে যায়। কেননা দানকারী সাধারণত গ্রহীতার সঙ্গে এর মূল্য নিয়ে দর-কষাকষি করতে সংকোচবোধ করে; আবার গ্রহীতা হয়তো তার কাছ থেকে অনুরূপ দান পাওয়ার আশায় তাকে কম মূল্যে তা দিয়ে দিতে পারে, অথবা সে যদি তা বিক্রি না করে, তাহলে ভবিষ্যতে দানকারী তাকে আর দান করবে না—এই আশঙ্কায়ও বিক্রি করতে পারে।এসবের মধ্যে নানা ধরনের অনিষ্ট ও ফাসাদের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এসবের পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা জরুরি।তবে তার যাকাত বা সাদকাহর সম্পদ যদি উত্তরাধিকার সূত্রে তার কাছে ফিরে আসে, তাহলে তা তার জন্য হালাল হবে; এতে কোনো কারাহাত নেই। এর দলিল বুরাইদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিস—এক নারী নবী ﷺ-এর কাছে এসে বলল, “আমি আমার মায়ের কাছে একটি দাসী সাদকাহ করেছিলাম; এখন আমার মা মারা গেছেন।” নবী ﷺ বললেন, “তোমার সাদকাহর সওয়াব তোমার জন্য অবধারিত হয়েছে এবং সেটি উত্তরাধিকার হিসেবে তোমার কাছে ফিরে এসেছে।” অনুরূপভাবে, তা যদি হিবা (উপহার), ওসিয়ত অথবা নিজের পাওনা ঋণের বিনিময়ে তার কাছে ফিরে আসে, তাহলেও তা তার জন্য হালাল;কারণ এগুলো উত্তরাধিকারের মতোই অন্য একটি বৈধ পদ্ধতিতে তার কাছে ফিরে এসেছে যা উত্তরাধিকারের অনুরূপ।পাশাপাশি ইমাম/শাসক যদি তার কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করার পর পুনরায় তাকে তা ফিরিয়ে দেন, কারণ সে নিজেই যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত, তাহলেও সে তা গ্রহণ করতে পারবে। কারণ এখানে যাকাতটি অন্য একটি কারণে তার কাছে ফিরে এসেছে; সুতরাং এটি এমনই, যেমন তা উত্তরাধিকারসূত্রে তার কাছে ফিরে এসেছে।”(কাশশাফুল কিনা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:“যদি কেউ প্রশ্ন করে: যে ব্যক্তিকে কোনো হিবা (উপহার) দেওয়া হয়েছে, তার কাছ থেকে সেই উপহার কিনে নেওয়া কি জায়েয?
উত্তর হলো:لا يجوز؛ لأن الغالب أنك إذا اشتريت الهبة فسوف يخفض لك السعر ، ويستحي أن يماكسك، فلو وهبت له ما يساوي مائة ، ثم أردت أن تشتريه منه، فإنك لو قلت له: بثمانين، سوف يقول لك: خذها، ويخجل أن يقول: لا، إلا بمائة، وحينئذ تكون قد رجعت في بعض الهبة، لكن بطريق غير مباشر .ولهذا لما حمل أمير المؤمنين عمر ـ رضي الله عنه ـ على فرس له في سبيل الله، فأضاعه الذي حمله عليه، وظن عمر أنه يبيعه برخص، استأذن من النبي صلى الله عليه وسلم أن يشتريه فقال له: لا تشتره ولو باعكه بدرهم، العائد في هبته كالكلب يقيء ثم يعود في قيئه. أما إذا اشترى صدقته : فإنه أشنع؛ لأنه يتضمن شيئين: الرجوع في الهبة، والرجوع فيما أخرجه لله، وما أخرجه لله لا يجوز فيه الرجوع ، حتى البلد إذا هاجر الإنسان منها لله ، لا يجوز أن يرجع ويسكن فيها؛ لأنه تركها لله ، وما ترك لله فإنه لا يرجع فيه
“জায়েয নয়। কারণ, সাধারণত আপনি যখন নিজের দেওয়া উপহারটি তার কাছ থেকে কিনতে চাইবেন, তখন সে আপনার প্রতি সম্মানবশত মূল্যের ক্ষেত্রে ছাড় দেবে এবং আপনার সঙ্গে দরদাম করতে সংকোচবোধ করবে। যেমন, আপনি যদি তাকে এমন কোনো জিনিস উপহার দেন যার মূল্য একশত, অতঃপর সেটি তার কাছ থেকে পুনরায় কিনতে চান এবং তাকে বলেন, ‘আমি এটি আশি দিয়ে কিনব’; তখন সে হয়তো বলবে, ‘ঠিক আছে, নিয়ে নিন।’ কারন সে লজ্জার কারণে হয়তো বলবে না যে, ‘না, ১০০-এর কমে দেব না।’এভাবে আপনি সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষভাবে আপনার দেওয়া হিবার কিছু অংশ নিজের কাছে ফিরিয়ে নিলেন। এ কারণেই আমিরুল মুমিনীন উমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) যখন আল্লাহর পথে একটি ঘোড়া দান করেছিলেন এবং যার কাছে ঘোড়াটি ছিল সে সেটির দেখাশোনায় অবহেলা করল, তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) ধারণা করলেন যে, সে হয়তো ঘোড়াটি কম দামে বিক্রি করবে। তাই তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সেটি কিনে নেওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন: ‘তুমি সেটি ক্রয় করো না, যদিও সে তোমার কাছে মাত্র এক দিরহামের বিনিময়ে তা বিক্রি করে।’ কারণ, ‘যে ব্যক্তি তার হিবা (দান) ফিরিয়ে নেয়, সে ওই কুকুরের মতো, যে বমি করে আবার নিজের বমির দিকে ফিরে যায়।’ আর যদি কেউ নিজের সাদকাহ করা সম্পদ ক্রয় করে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কেননা, এতে দুটি বিষয় একত্রিত হয়—প্রথমত: নিজের হিবা ফিরিয়ে নেওয়া; দ্বিতীয়ত: আল্লাহর জন্য যে সম্পদ ব্যয় করে দেওয়া হয়েছে, তা পুনরায় নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া। আর আল্লাহর জন্য যে জিনিস ত্যাগ করা হয়েছে, তা পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া জায়েয নয়। এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর জন্য কোনো দেশ থেকে হিজরত করে,তাহলে সে আবার সেখানে ফিরে গিয়ে বসবাস করবে না; কারণ সে আল্লাহর জন্য সেই দেশ ত্যাগ করেছে। আর যে জিনিস আল্লাহর জন্য ত্যাগ করা হয়, তা পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয়।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি‘ খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৮৯)।
.
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো সম্পদ সাদকাহ করে দেওয়ার পর তা পুনরায় নিজের মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। বিশেষত যে ব্যক্তিকে নিজে সাদকাহ করা হয়েছে, তার কাছ থেকেই সেই সম্পদ পুনরায় ক্রয় করা থেকে বিরত থাকা উচিত; বরং হাদিসের বাহ্যিক অর্থ এবং একদল আলেমের মত অনুযায়ী তা হারাম, আর অধিক সতর্ক ও শক্তিশালী মত হিসেবে এ থেকে বিরত থাকাই কর্তব্য। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে বা স্বতন্ত্র কোনো বৈধ কারণে সম্পদটি পরবর্তীতে নিজের কাছে ফিরে এলে তার বিধান ভিন্ন। আর প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে, প্রত্যেকে নিজের সাদকাহ করা সামগ্রী নিজে ক্রয় না করে অন্য বোনের সাদকাহ করা সামগ্রী ক্রয় করতে পারেন—এতে ইনশাআল্লাহ নিষিদ্ধ পন্থা থেকে বেঁচে গিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যও পূরণ হবে। অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—আল্লাহর জন্য যে সম্পদ ত্যাগ করেছেন, তা পুনরায় নিজের স্বার্থে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা দানকে যথাসম্ভব নিষ্কলুষ রাখা। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
ওযুর সময় দাড়ি খিলাল করার হুকুম
প্রশ্ন: ওযুর সময় দাড়ি খিলাল করার হুকুম কী? এ ব্যাপারে আলেমদের অগ্রগণ্য মত কোনটি?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ওযুর সময় দাড়ি খিলাল করার হুকুম দাড়ির ঘনত্বের ওপর নির্ভরশীল।দাড়ি যদি পাতলা হয়—অর্থাৎ তার নিচের চামড়া দৃশ্যমান থাকে—তাহলে দাড়ির ভেতরে পানি পৌঁছানো এবং তা ধৌত করা ওয়াজিব; কারণ এ অবস্থায় দাড়ির নিচের অংশ চেহারার সীমানার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়। পক্ষান্তরে, দাড়ি যদি ঘন ও নিবিড় হয়, যার কারণে তার নিচের চামড়া দৃশ্যমান না হয়, তাহলে দাড়ির ভেতরের অংশ ধৌত করা ওয়াজিব নয়; তবে ওযুর সময় আঙুল দিয়ে দাড়ি খিলাল করা মুস্তাহাব। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত এবং দলিলের আলোকে এটিই অধিকতর শক্তিশালী ও অগ্রগণ্য অভিমত।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:
اللحية إن كانت خفيفة تصف البشرة وجب غسل باطنها. وإن كانت كثيفة لم يجب غسل ما تحتها، ويستحب تخليلها.
وقال إسحاق: إذا ترك تخليل لحيته عامدا أعاد، لأن النبي صلى الله عليه وسلم (كان يخلل لحيته) رواه عنه عثمان بن عفان. قال الترمذي: هذا حديث حسن صحيح. وقال البخاري: هذا أصح حديث في الباب. وروى أبو داود عن أنس أن النبي صلى الله عليه وسلم كان إذا توضأ أخذ كفا من ماء فأدخله تحت حنكه. وقال: هكذا أمرني ربي عز وجل. وعن ابن عمر قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا توضأ عرك عارضيه بعض العرك، ثم شبك لحيته بأصابعه من تحتها رواه ابن ماجه. وقال عطاء وأبو ثور: يجب غسل باطن شعور الوجه وإن كان كثيفا كما يجب في الجنابة؛ لأنه مأمور بغسل الوجه في الوضوء كما أمر بغسله في الجنابة، فما وجب في أحدهما وجب في الآخر مثله.
ومذهب أكثر أهل العلم أن ذلك لا يجب، ولا يجب التخليل؛ وممن رخص في ترك التخليل ابن عمر، والحسن بن علي، وطاوس، والنخعي، والشعبي، وأبو العالية، ومجاهد، وأبو القاسم، ومحمد بن علي، وسعيد بن عبد العزيز وابن المنذر؛ لأن الله تعالى أمر بالغسل، ولم يذكر التخليل، وأكثر من حكى وضوء رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يحكه. ولو كان واجبا لما أخل به في وضوء، ولو فعله في كل وضوء لنقله كل من حكى وضوءه أو أكثرهم، وتركه لذلك يدل على أن غسل ما تحت الشعر الكثيف ليس بواجب؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم كان كثيف اللحية فلا يبلغ الماء ما تحت شعرها بدون التخليل والمبالغة، وفعله للتخليل في بعض أحيانه يدل على استحباب ذلك، والله أعلم.
“দাড়ি যদি পাতলা হয় যার ফলে ত্বক প্রকাশ পায়, তাহলে ভেতরের অংশ ধোয়া ওয়াজিব হবে। আর যদি ঘন হয় তাহলে ভেতরের অংশ ধৌত করা ওয়াজিব নয়। বরং খিলাল করা মুস্তাহাব। ইসহাক বলেন: যদি সে ইচ্ছাকৃত দাড়ি খিলাল করা ছেড়ে দেয়, তাহলে পুনরায় ওযু করতে হবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাড়ি খিলাল করতেন, যেমনটি উসমান ইবনে আফ্ফান তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বলেন: এটি ‘হাসান সহীহ’ হাদীস। বুখারী বলেন: এটি উক্ত পরিচ্ছেদের সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদীস। আবু দাউদ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করার পর অঞ্জলি ভরে পানি নিয়ে চিবুকের নিচে ঢুকিয়ে দিতেন। তিনি বলতেন: “আমার মহান রব আমাকে এভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।” ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করার সময় তার চেহারার দুই পাশে ঘষতেন। তারপর তিনি তার আঙুল দিয়ে নিচের দিক থেকে তার দাড়ি খিলাল করতেন।[হাদীসটি ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন] আত্বা ও ইবনে সাওর বলেন: চেহারায় থাকা চুল ঘন হলেও এর ভেতর পর্যন্ত ধৌত করা ওয়াজিব যেমনটি জানাবতের গোসলের ক্ষেত্রে ওয়াজিব। কারণ জানাবতের গোসলে যেমন তিনি চেহারা ধোয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট, তেমনিভাবে অযুতেও তিনি চেহারা ধোয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট। একটির ক্ষেত্রে যা আবশ্যক হয়, অনুরূপ অন্যটির ক্ষেত্রেও তা আবশ্যক। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি (জানাবতের সময়) আবশ্যক নয়। তাই খিলাল করাও আবশ্যক নয়। খিলাল পরিত্যাগের ক্ষেত্রে যারা ছাড় দিয়েছেন তাদের মাঝে রয়েছেন: ইবনে উমর, হাসান ইবনে আলী, ত্বাউস, নখয়ী, শা’বী, আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, আবুল কাসেম, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, সাঈদ ইবনে আব্দুল আযীয ও ইবনুল মুনযির। কারণ আল্লাহ তায়ালা ধৌত করার নির্দেশ দিয়েছেন; তিনি খিলাল করার কথা উল্লেখ করেননি। যে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওযুর বিবরণ দিয়েছেন তাদের অধিকাংশই খিলাল করার কথা বর্ণনা করেননি। যদি এটি ওয়াজিব হত তাহলো কোনো ওযুতে তিনি এটি ছাড়তেন না। প্রত্যেক অযুতেই যদি তিনি দাড়ি খিলাল করতেন তাহলে যারা তার ওযুর বিবরণ দিয়েছেন তারা সবাই বা তাদের অধিকাংশই এটি বর্ণনা করত। তিনি কখনও খিলাল না করা প্রমাণ করে যে ঘন চুলের নিচে যা আছে সেটি ধৌত করা ওয়াজিব নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাড়ি ঘন ছিল। খিলাল করা ও প্রকৃষ্টভাবে খিলাল করা ছাড়া এই দাড়ির নিচে পানি পৌঁছায় না। তিনি কখনো কখনো খিলাল করা থেকে এটি মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”(ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৭৪)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:” اللحية الكثيفة يجب غسل ظاهرها بلا خلاف ولا يجب غسل باطنها ولا البشرة تحته، هذا هو المذهب الصحيح المشهور، الذي نص عليه الشافعي رحمه الله وقطع به جمهور الأصحاب، وهو مذهب مالك وأبي حنيفة وأحمد وجماهير العلماء من الصحابة والتابعين وغيرهم.وحكى الرافعي قولا ووجها أنه يجب غسل البشرة وهو مذهب المزني وأبي ثور “ঘন দাড়ির উপরিভাগ ধোয়া ওয়াজিব; এতে কোনো মতানৈক্য নেই। এর ভেতরের দিক ও নিচের ত্বক ধৌত করা ওয়াজিব নয়। এটাই বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত। ইমাম শাফি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এ মতটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন এবং মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এটিকে অকাট্য মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটি ইমাম মালিক, আবু হানীফা ও আহমদ (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর মত এবং সাহাবী, তাবেঈন ও তাঁদের পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের মতও এটাই। তবে ইমাম রাফি‘ঈ এমন একটি মত ও একটি দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছেন যে, (ঘন দাড়ির নিচে থাকা) ত্বকও ধৌত করা ওয়াজিব। এটি ইমাম মুযানী ও আবু সাওর (রাহিমাহুমাল্লাহ)-এর মত।”(নববী আল-মাজমূ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০৮)
.
ঘন দাড়ি খিলাল করা ওয়াজিব নয় এবং ঘন দাড়ির ভেতরের অংশ ধোয়া আবশ্যক নয়; এর পক্ষে জমহুর আলেমদের অন্যতম দলীল হলো বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীস, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন:أَنَّهُ تَوَضَّأَ فَغَسَلَ وَجْهَهُ، أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ، فَمَضْمَضَ بِهَا وَاسْتَنْشَقَ، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ فَجَعَلَ بِهَا هَكَذَا، أَضَافَهَا إِلَى يَدِهِ الْأُخْرَى، فَغَسَلَ بِهِمَا وَجْهَهُ… ثُمَّ قَالَ: هَكَذَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَوَضَّأُ.“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করা শুরু করলেন। এজন্য চেহারা ধৌত করলেন। তিনি এক কোষ পানি নিয়ে তা দিয়ে কুলি করলেনও নাকে পানি দিলেন। তারপর এক কোষ পানি নিয়ে তা দিয়ে এমনটি করলেন। তিনি তার অন্য হাতের সাথে একত্রিত করে উভয়টি দিয়ে চেহারা ধৌত করলেন। … তারপর বলেন: আমি রাসূল (ﷺ)-কে এভাবেই ওযু করতে দেখেছি।”(সহীহ বুখারী হা/১৪০) হাদীসটি থেকে দলীল প্রদানের দিকটি হলো: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘন দাড়ি ছিল। এক অঞ্জলি পানি চেহারা ধৌত করা এবং দাড়ির নিচের ত্বক ধোয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ না। সুতরাং বোঝা গেল যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এর উপরিভাগ ধৌত করার মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।(আরো দেখুন: নববী আল-মাজমূ (১/৪০৮), শাওকানী, নাইলুল আওত্বার (১/১৯০)
.
দ্বিতীয়ত: যারা দাড়ি খিলাল করা ওয়াজিব মনে করেন, তাদে প্রদত্ত দলীল হলো আবু দাউদে বর্ণিত হাদীস, আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযু করার সময় এক অঞ্জলি পানি নিয়ে সেটি চোয়ালের নিম্নদেশে (থুতনির নিচে) লাগিয়ে দাড়ি খিলাল করতেন এবং বলতেন: “আমার মহান রব আমাকে এমনটি করার নির্দেশ দিয়েছেন।”(আবু দাউদ হা/১৪৫) এই হাদীসটি মতভেদপূর্ণ। হাফেয ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আনাসের হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেন। এর সনদে রয়েছেন আল-ওয়ালীদ ইবনে যারওয়ান। তার অবস্থা অজ্ঞাত।…আনাস থেকে এর অন্য বেশ কিছু সনদ রয়েছে যেগুলো দুর্বল।”[আত-তালখীসুল হাবীর (১/৮৬) থেকে সংক্ষেপে সমাপ্ত] হাদীসটিকে ইবনুল কাইয়িম তার ‘তাহযীবুস সুনান’ বইয়ে এবং আলবানী তার ‘সহীহ আবু দাউদ’ গ্রন্থে সহিহ বলেছেন। তবে হাদীসটি সহিহ হিসেবে ধরে নিলেও অন্যান্য দলীলের সাথে সমন্বয় করতে গিয়ে উক্ত হাদীসের নির্দেশকে মুস্তাহাব অর্থে গ্রহণ করতে হবে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওযু বর্ণনাকারীদের অধিকাংশ দাড়ি খিলাল করার বিষয়টি উল্লেখ করেননি। যদি এটি ওয়াজিব হত, তাহলে তিনি কোনো ওযুতেই তা বাদ দিতেন না। আর যদি প্রত্যেক ওযুতে তিনি সেটা করতেন, তাহলে যারা তাঁর অযু বর্ণনা করেছেন তাদের সবাই বা অধিকাংশই এটি বর্ণনা করতেন।
.
তৃতীয়ত: লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ঘন দাড়ির উপরিভাগ লম্বা হলেও তা ধোয়া ওয়াজিব; কেননা এটি চেহারার সীমানাভুক্ত। তাই্ এর বাহ্যিক দিক ধোয়া আবশ্যক।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:من سنن الوضوء: تخليل اللحية الكثيفة، واللحية إما خفيفة، وإما كثيفة.فالخفيفة هي التي لا تستر البشرة، وهذه يجب غسلها وما تحتها؛ لأن ما تحتها لما كان باديا كان داخلا في الوجه الذي تكون به المواجهة، والكثيفة: ما تستر البشرة، وهذه لا يجب إلا غسل ظاهرها فقط، وعلى المشهور من المذهب يجب غسل المسترسل منها.وقيل: لا يجب، كما لا يجب مسح ما استرسل من الرأس، والأقرب في ذلك الوجوب، والفرق بينها وبين الرأس: أن اللحية وإن طالت تحصل بها المواجهة؛ فهي داخلة في حد الوجه، أما المسترسل من الرأس فلا يدخل في الرأس، لأنه مأخوذ من الترؤس وهو العلو، وما نزل عن حد الشعر، فليس بمترئس.”ওযুর অন্যতম সুন্নত হলো: ঘন দাড়ি খিলাল করা। দাড়ি পাতলাও হতে পারে, আবার ঘনও হতে পারে। পাতলা দাড়ি হলো এমন দাড়ি যা ত্বক ঢেকে রাখে না। এমন দাড়ি এবং এর অভ্যন্তরের ত্বক ধোয়া আবশ্যক। কারণ এর ভেতরের অংশ প্রকাশমান থাকা অবস্থায় চেহারার গণ্ডিভুক্ত যা দিয়ে ব্যক্তিরা একে অন্যের সম্মুখীন হয়। আর ঘন দাড়ি হলো এমন দাড়ি যা ত্বক ঢেকে রাখে। এর উপরিভাগই কেবল ধোয়া ওয়াজিব। মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুসারে এমন দাড়ি লম্বা হলেও তা ধোয়া ওয়াজিব। অন্য মত অনুসারে, এমন দাড়ি লম্বা হলে সেটি ধোয়া ওয়াজিব নয় যেমনিভাবে চুল লম্বা হলে তা মাসেহ করা ওয়াজিব নয়। যদিও ওয়াজিব হওয়ার মতটিই সঠিক হওয়ার অধিক নিকটবর্তী।দাড়ির সাথে চুলের পার্থক্য হলো: দাড়ি যত লম্বাই্ হোক তা দিয়ে মানুষের মুখোমুখি হওয়া যায়। সুতরাং দাড়ি চেহারার সীমানাভুক্ত। আর মাথার লম্বা চুল মাথার অন্তর্ভুক্ত না।কারণ رأس (মাথা) শব্দটি গৃহীত হয়েছে তারাউস থেকে যার অর্থ উর্ধ্বত্ব। আর মাথার সীমানা ছাড়িয়ে যা নিচে নেমে গিয়েছে, তা উর্ধ্বে নয়।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১০৬)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে কথা পরিষ্কার যে,ওযুর সময় দাড়ি খিলাল করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অগ্রগণ্য মত হলো—ঘন দাড়ি খিলাল করা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব। ঘন দাড়ির ক্ষেত্রে দাড়ির বাহ্যিক অংশ ধৌত করাই ওয়াজিব; আর দাড়ি পাতলা হলে এবং এর নিচের ত্বক দৃশ্যমান থাকলে সেই ত্বকসহ দাড়ির অংশ ধৌত করা ওয়াজিব। নবী ﷺ থেকে দাড়ি খিলাল করার আমল সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়ায় ঘন দাড়ি খিলাল করা উত্তম; তবে খিলাল না করলে ওযু সহিহ হবে এবং গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ। গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৮৫০৩১)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
ওযু শুরু করার সময় উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করার বিধান
প্রশ্ন: ওযু শুরু করার সময় উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করার বিধান কী? জনৈক আলেম দাবি করেছেন যে, ওযুর শুরুতে কব্জি পর্যন্ত হাত ধৌত করা ওযুর অংশ নয়—তাঁর এ বক্তব্যের শরঈ ভিত্তি ও সঠিকতা কতটুকু?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর উক্ত আলেমের “ওযুর অংশ নয়”—এ বক্তব্য দ্বারা তিনি ঠিক কী উদ্দেশ্য করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। যদি তাঁর উদ্দেশ্য হয় যে, ওযুর শুরুতে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা ওযুর ফরজ বা অপরিহার্য কোনো অঙ্গ নয়, তাহলে এ অর্থে তাঁর কথা সঠিক। কিন্তু যদি তিনি বোঝাতে চান যে, ওযুর শুরুতে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা ওযুর কোনো ফরজ বা সুন্নত কোনোটাই নয়, তাহলে তাঁর এ বক্তব্য সঠিক নয়; কেননা ওযুর শুরুতে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা সর্বসম্মতভাবে সুন্নাত। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত ও তাঁর নিয়মিত আমল; সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উসমান, আলী ও আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওযুর পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে তা উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া ওযুর অন্যান্য অঙ্গ ধৌত করার পূর্বে হাত দুটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নেওয়ার জন্যও শুরুতেই কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়া হয়। সুতরাং ওযুর শুরুতে দুই হাত কবজি পর্যন্ত ধৌত করা সুন্নাত ও প্রশংসনীয় আমল। এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে।
❖ প্রথম দলিল: আমর ইবনু আবূ হাসান (রহ.) বলেন, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অজু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি এক পাত্র পানি আনলেন এবং তাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওযুর পদ্ধতি দেখানোর জন্য অজু করলেন। তিনি পাত্র থেকে দুই হাতে পানি ঢেলে তিনবার দুই হাত ধৌত করলেন। فَأَكْفَأَ عَلَى يَدِهِ مِنَ التَّوْرِ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ ثَلاَثًا “তিনি পাত্র থেকে তাঁর দুই হাতে পানি ঢেলে উভয় হাত তিনবার ধৌত করলেন।”(সহিহ বুখারি, হা/১৮৬)
.
❖ দ্বিতীয় দলিল: হুমরান (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি উসমান ইবনু আফফান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ওযুর জন্য পানি আনতে দেখেছেন। তিনি পাত্র থেকে দুই হাতের ওপর পানি ঢেলে তিনবার হাত ধৌত করেন। এরপর ডান হাত পানির পাত্রে প্রবেশ করিয়ে কুলি করেন ও নাকে পানি দেন। তারপর মুখমণ্ডল তিনবার এবং উভয় হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধৌত করেন, মাথা মাসেহ করেন এবং উভয় পা ধৌত করেন। অতঃপর তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—“যে ব্যক্তি আমার এই ওযুর মতো ওযু করবে এবং এরপর এমনভাবে দুই রাকাত সালাত আদায় করবে যে, তার অন্তরে অন্য কোনো চিন্তার উদয় হবে না, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”(সহিহ মুসলিম, হা/৪২৭)
.
❖ তৃতীয় দলিল: আবদু খাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফজরের সালাত আদায় করার পর ‘রাহবা’য় গেলেন। সেখানে তিনি পানি চাইলে একটি বালক তাঁর জন্য এক পাত্র পানি ও একটি তশতরি নিয়ে এলো। তিনি পাত্রটি ডান হাতে নিয়ে বাম হাতে পানি ঢাললেন এবং উভয় হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করলেন। এরপর ডান হাত পানির পাত্রে প্রবেশ করিয়ে তিনবার কুলি ও নাকে পানি দিলেন। তারপর ওযুর অন্যান্য অঙ্গ ধৌত করেন এবং মাথা সামনে ও পেছনে একবার মাসেহ করেন।”(সুনানে আবু দাউদ, হা/১১২)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ-তে উল্লেখ করা হয়েছে:
اتفق الفقهاء على مشروعية غسل الكفين إلى الكوعين في أول الوضوء لفعل النبي صلى الله عليه وسلم ذلك، فقد روى عثمان بن عفان رضي الله عنه وصف وضوء النبي صلى الله عليه وسلم فقال: دعا بإناء فأفرغ على كفيه ثلاث مرار فغسلهما ثم أدخل يمينه في الإناء ولكنهم اختلفوا في حكم الغسل عند القيام من النوم وذلك بعدما اتفقوا على أن غسلهما من سنن الوضوء لغير القائم من النوم. فذهب الحنفية والمالكية والشافعية وهو رواية عن أحمد إلى أن غسل الكفين سنة من سنن الوضوء سواء قام المتوضئ من نوم أو لم يقم من نوم، وسواء كان هذا النوم من نوم الليل أو من نوم النهار، لأن آية الوضوء لم تذكر غسل الكفين من بين الفروض والواجبات، ولأن الحديث يدل على الاستحباب لتعليله بما يقتضي ذلك وهو قوله صلى الله عليه وسلم: “إذا استيقظ أحدكم من نومه فلا يغمس يده في الإناء حتى يغسلها ثلاثا فإنه لا يدري أين باتت يده”، حيث إن طروء الشك على اليقين لا يؤثر فيه”
“ফকিহগণ একমত যে, ওযুর শুরুতে কবজি পর্যন্ত উভয় হাত ধৌত করা মুস্তাহাব। এর প্রমাণ হলো নবী ﷺ-এর আমল। উসমান ইবনু আফফান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নবী ﷺ-এর অজুর পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: ‘তিনি একটি পাত্র আনতে বললেন। অতঃপর তিনি তাঁর উভয় হাতের ওপর তিনবার পানি ঢেলে সেগুলো ধৌত করলেন। এরপর তিনি তাঁর ডান হাত পাত্রের মধ্যে প্রবেশ করালেন…। তবে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর হাত ধোয়ার বিধান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়নি, তার ওযুর শুরুতে হাত ধোয়া মুস্তাহাব—এ বিষয়ে তারা একমত। এর ভিত্তিতে হানাফি, মালেকি ও শাফিঈ মাজহাবের ফকিহগণ এবং ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত একটি মতের বক্তব্য হলো: ওযুকারী ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হোক বা না হোক, রাতের ঘুম হোক কিংবা দিনের ঘুম—সর্বাবস্থায় ওযুর সুন্নতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে কবজি পর্যন্ত উভয় হাত ধোয়া মুস্তাহাব।কারণ, ওযুর ফরজসমূহের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়ার কথা উল্লেখ করেননি। আর হাদিসটিও হাত ধোয়ার মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে; কেননা এতে এর কারণ (ইল্লত) উল্লেখ করা হয়েছে। নবী ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হয়, তখন সে যেন হাত না ধুয়ে পাত্রে হাত না ঢোকায়; কারণ সে জানে না, তার হাত কোথায় রাত কাটিয়েছে।’আর মূলনীতি হলো—নিশ্চিত বিষয়কে কেবল সন্দেহের কারণে পরিত্যাগ করা যায় না।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, খন্ড: ৩৫; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ডের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] ওযুর পরিপূর্ণ সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
«سنن الوضوء هي: السواك، ومحله عند المضمضة؛ ليحصل به والمضمضة تنظيف الفم لاستقبال العبادة والتهيؤ لتلاوة القرآن ومناجاة الله عز وجل، وغسل الكفين ثلاثًا في أول الوضوء قبل غسل الوجه؛ لورود الأحاديث به، ولأن اليدين آلة نقل الماء إلى الأعضاء؛ ففي غسلهما احتياط لجميع الوضوء، والبداءة بالمضمضة والاستنشاق قبل غسل الوجه؛ لورود البداءة بهما في الأحاديث، ويبالغ فيها إن كان غير صائم. ومعنى المبالغة في المضمضة: إدارة الماء في جميع فمه، وفي الاستنشاق: جذب الماء إلى أقصى أنفه، وتخليل اللحية الكثيفة بالماء حتى يبلغ داخلها، وتخليل أصابع اليدين والرجلين، والتيامن، وهو البدء باليمنى من اليدين والرجلين قبل اليسرى، والزيادة على الغسلة الواحدة إلى ثلاث غسلات في غسل الوجه واليدين والرجلين»
ওযুর সুন্নতসমূহ হলো:
১) মেসওয়াক করা। এর স্থান হচ্ছে- গড়গড়ার সময়। যাতে করে মেসওয়াক ও গড়গড়ার মাধ্যমে মুখ পরিস্কার করা যায়; যার ফলে ইবাদত, তেলাওয়াত ও আল্লাহ্র সাথে গোপন আলাপের জন্য নিজেকে তৈরী করে নেয়া যায়।
২) ওযুর শুরুতে চেহারা ধৌত করার আগে হাতের কব্জিদ্বয় তিনবার ধৌত করা। এ বিষয়টি হাদিসে উদ্ধৃত হওয়ার কারণে এবং যেহেতু হস্তদ্বয় হচ্ছে- ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পানি ব্যবহার করার মাধ্যম। তাই এ দুটোকে ধৌত করার মাঝে সমস্ত ওযুর জন্য সতর্কতা অবলম্বন পাওয়া যায়।
৩) চেহারা ধৌত করার আগে গড়গড়া কুলি ও নাকে পানি দেয়া; অনেক হাদিসে এ দুটো দিয়ে শুরু করার কথা উদ্ধৃত হওয়ার কারণে। রোযাদার না হলে প্রকৃষ্টভাবে এ দুটো আদায় করবে। গড়গড়া কুলি প্রকৃষ্টভাবে আদায় করার অর্থ হল: গোটা মুখের ভেতরে পানি ঘুরানো। প্রকৃষ্টভাবে নাকে পানি দেয়ার অর্থ হচ্ছে: পানি টেনে একেবারে নাকের উপরে তুলে নেয়া।
৪) পানি দিয়ে ঘন দাঁড়ি খিলাল করা; যাতে করে ভেতরে পানি ঢুকে। দুই হাত ও দুই পায়ের আঙ্গুলগুলো খিলাল করা।
৫) ডান হাত ও ডান পা দিয়ে শুরু করা।
৬) মুখমণ্ডল, হস্তদ্বয় ও পা-যুগল ধৌত করার ক্ষেত্রে একবারের অধিক তিনবার ধৌত করা।[আল-মুলাখ্খাস আল-ফিকহি; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৫) থেকে সমাপ্ত]
.
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জেনে রাখা ভাল আর তা হচ্ছে: ওযুর শুরুতে কবজি পর্যন্ত উভয় হাত ধৌত করা সুন্নাত। তবে এই প্রাথমিক হাত ধোয়া পরবর্তীতে কনুইসহ দুই হাত ধোয়ার ফরজ আদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়—কারণ,অধিকাংশ মাযহাবের আলেমগণ মনে করেন ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। সূরা মায়েদার ৬ নং আয়াতে বর্ণিত ধারাবাহিকতা অনুযায়ী অঙ্গসমূহ ধৌত করতে হবে: প্রথমে মুখমন্ডল ধোয়া, তারপর দুই হাত ধোয়া, তারপর মাথা মাসেহ করা এবং শেষে পা ধোয়া। সুতরাং ওযুর শুরুতে দুই হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করলে সেটা পরবর্তীতে হাতের সাথে কব্জিদ্বয় ধোয়ার পরিবর্তে যথেষ্ট হবে না। কারণ এতে করে বিন্যাস নষ্ট হয়ে যাবে। দুই হাত ধোয়ার মাঝখানে মুখ ধোয়াকে প্রবেশ করানোর কারণে। ওয়াজিব হল মুখ ধোয়ার পরে পুরো দুই হাত ধৌত করা। সারকথা হল: কেউ যদি ওযুতে প্রথমে হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করে, তারপর কুলি করে ও নাকে পানি দেয় এবং মুখমণ্ডল ধৌত করে, এরপর কব্জির জয়েন্ট থেকে কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করে; তাহলে অধিকাংশ মাযহাবের আলেমদের মতে তার ওযু সঠিক হয়নি।
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়: ‘ওযুর শুরুতে হাতের কব্জিদ্বয় ধোয়াকে যথেষ্ট মনে করে যে ব্যক্তি হাতের কব্জি না ধুয়ে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করে তার হুকুম কী? তাকে কি পুনরায় ওযু করতে হবে?’
তিনি উত্তর দেন:
“لا يجوز في الوضوء الاقتصار على غسل الذراع فقط دون الكف بل متى فرغ من غسل الوجه بدأ بغسل اليدين ، فيغسل كل يد من رؤوس الأصابع إلى المرافق ، ولو كان قد غسل الكفين قبل الوجه ، فإن غسلهما الأول سنة ، وبعد الوجه فرض ، فمن اقتصر في غسل اليدين من الرسغ إلى المرفق فما أكمل الفرض المطلوب ، فعليه إعادة الوضوء بعد التمام ، أو عليه غسل ما تركه إن كان قريبا ، فيغسل الكفين وما بعدهما “
“ওযুতে হাতের কব্জি না ধুয়ে শুধু বাহু ধোয়ার মাঝে সীমিত থাকা নাজায়েয। বরং মুখ ধোয়া শেষ হলে দুই হাত ধোয়া শুরু করবে। আঙুলগুলোর ডগা থেকে কনুই পর্যন্ত গোটা হাত ধৌত করবে। যদিও মুখ ধোয়ার আগে হাতের কব্জিদ্বয় ধুয়ে থাকুক না কেন। যেহেতু কব্জিদ্বয় ওযুর প্রথমে ধোয়া সুন্নত; আর মুখ ধোয়ার পরে ধোয়া ফরয। তাই কেউ যদি হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত ধোয়ার মধ্যে সীমিত থাকে সে আদিষ্ট ফরয পূর্ণ করল না। তাকে ওযু শেষ করার পর পুনরায় ওযু করতে হবে। আর যদি খুব কাছাকাছি সময়ে হয় তাহলে যে অংশটুকু বাদ পড়েছে সেটা ধৌত করতে হবে। অর্থাৎ তখন সে দুই হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করবে এবং তৎপরবর্তী অঙ্গগুলো ধৌত করবে।” (আল-লুলুউল মাকীন মিন ফাতাওয়াশ শাইখ ইবন জিবরীন’; পৃষ্ঠা: ৭৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:” وهنا نقف لننبه على ما يغفل عنه كثير من الناس حيث كانوا يغسلون اليد من الكف إلى المرفق ظناً منهم أن غسلها قد تم قبل غسل الوجه، وهذا غير صحيح، ولا بد أن تغسلها من أطراف الأصابع إلى المرفقين “এখানে আমরা একটু সময় নিব যাতে করে এমন একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি যেটার ব্যাপারে অনেক মানুষ গাফেল। তারা হাতের কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত ধৌত করে; এ ধারণা থেকে যে, মুখ ধোয়ার আগে হাতের কব্জি ধোয়া হয়েছে। এটি অসঠিক। অবশ্যই দুই হাত আঙুলের ডগা থেকে কনুই পর্যন্ত ধৌত করতে হবে।”(ইবনু উসাইমীন; আল-লিকাউশ শাহরী: ৩/৩৩০)
.
পরিশেষে বলা যায়: ওযুর শুরুতে মুখমণ্ডল ধৌত করার পূর্বে উভয় হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা নবী ﷺ-এর সুন্নাত এবং মুস্তাহাব আমল। সহিহ হাদিসে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং ফকিহগণও এর বৈধতা ও সুন্নাত হওয়ার বিষয়ে একমত। তবে শুরুতে কবজি পর্যন্ত যে হাত ধোয়া হয়, তা মুখমণ্ডল ধৌত করার পর কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়ার ফরজের বিকল্প নয়। অতএব, মুখমণ্ডল ধৌত করার পর অবশ্যই উভয় হাত আঙুলের ডগা থেকে কনুইসহ পুনরায় ধৌত করতে হবে। কেউ যদি শুধু কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত ধৌত করে এবং কবজি ও আঙুলের অংশ বাদ দেয়, তাহলে সে ওযুর ফরজ অঙ্গ পূর্ণভাবে ধৌত করেনি। পক্ষান্তরে, ওযুর শুরুতে কবজি পর্যন্ত হাত না ধুলেও ওযু সহিহ হবে; তবে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতের ফযিলত থেকে বঞ্চিত হবে। সুতরাং সুন্নাত হলো—প্রথমে কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়া, এরপর মুখমণ্ডল ধোয়ার পর আঙুলের ডগা থেকে কনুইসহ সম্পূর্ণ দুই হাত ধৌত করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Subscribe to:
Posts (Atom)