Tuesday, July 14, 2026

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে সাহাবিদের অবস্থান

 মূল: শাইখ ড. সুলতান ইবনে আবদুর রহমান আল উমাইরি।

(ডক্টরেট: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
সম্ভবত সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)হলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে। তাঁকে নিয়ে মতামত ভিন্ন হয়েছে, তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চলেছে। দুটি চরম পক্ষ তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ তাঁর প্রতি ভালোবাসায় ও সমর্থনে বাড়াবাড়ি করেছে। অন্য পক্ষ তাঁর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি তাঁকে কাফির ও মুনাফিক পর্যন্ত বলেছে! এই দুটি চরমপন্থী পক্ষ ইসলামি ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসবিদ ইমাম জাহাবি শান্ত ও বিচক্ষণভাবে এই দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
“وخلْفَ مُعاويةَ خَلْقٌ كثيرٌ يُحبِّونَه ويَتغالَوْن فيه ويُفضِّلونه، إمَّا قد ملَكَهم بالكَرَمِ والحِلمِ والعَطاءِ، وإمَّا قد وُلِدوا في الشَّامِ على حُبِّه، وتَربَّى أولادُهم على ذلك. وفيهم جَماعةٌ يَسيرةٌ من الصحابةِ، وعدَدٌ كثيرٌ من التابعين والفُضَلاءِ، وحارَبوا معه أهلَ العِراقِ، ونَشَؤوا على النَّصْبِ، نعوذُ باللهِ من الهَوى، كما قد نشَأَ جيشُ عليٍّ رضيَ اللهُ عنه ورعِيَّتُه -إلا الخَوارجَ منهم- على حُبِّه والقيامِ معه، وبُغضِ مَن بغى عليه والتبرِّي منهم، وغَلا خلقٌ منهم في التشيُّعِ”
“মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পেছনেও এক বিশাল জনসমষ্টি ছিল যারা তাঁকে ভালোবাসত, তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি রাখত এবং তাঁকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিত। এর কারণ ছিল, হয় তিনি তাঁর অসীম উদারতা, সহনশীলতা ও দানশীলতা দিয়ে তাদের মন জয় করেছিলেন অথবা তারা সিরিয়াতে তাঁর শাসনের ছায়াতলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তাদের সন্তানরাও সেভাবেই বড় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অল্প কিছু সাহাবি এবং বিপুল সংখ্যক তাবেয়ি ও পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে থেকে ইরাকবাসীদের (আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে একদল মানুষ ‘নাসবি’ [আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী] হিসেবে গড়ে উঠেছিল। (আমরা প্রবৃত্তি বা আবেগের তাড়না থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।) ঠিক একইভাবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাহিনী এবং তাঁর অনুসারীরাও—একমাত্র খারেজিরা ছাড়া—তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। যারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল তাঁদের প্রতি ঘৃণা ও সম্পর্কহীনতা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁদের মধ্য থেকে একদল মানুষ চরমপন্থী শিয়া (ভক্তি ও আনুগত্যে সীমা লঙ্ঘনকারী) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৩/১২৮-১২৯] মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে অতিভক্তিতে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে জাল হাদিস তৈরির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই নিকৃষ্ট অপকৌশল হাদিস বিশারদগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং অন্যদের সতর্ক করেছেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শানে বর্ণিত হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করে সহিহ ও জইফ (দুর্বল) বর্ণনাগুলোকে পৃথক করে দিয়েছেন।
এই বিষয়ে সতর্ক করে ইবনুল জাওজি (রাহ.) বলেন:
“قد تعصَّبَ قومٌ ممَّن يَدَّعي السُّنَّةَ، فوضَعوا في فضلِه أحاديثَ ليُغضِبوا الرافضةَ، وتعصَّبَ قومٌ من الرافضةِ، فوضَعوا في ذَمِّه أحاديثَ، وكِلَا الفريقينِ على الخطَأِ القبيحِ”
“সুন্নাহর অনুসারী দাবিদার একদল লোক গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয়ে তাঁর (মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রশংসায় কিছু হাদিস জাল করেছে, যাতে শিয়া-রাফেজিদের (চরমপন্থী শিয়া) ক্রোধান্বিত করা যায়। অন্যদিকে শিয়া-রাফেজিদের একটি দল তাঁর নিন্দায় কিছু হাদিস জাল করেছে। অথচ এই উভয় পক্ষই জঘন্য ভুলের ওপর রয়েছে।” [কিতাবুল মাওযুআত, ইবনুল জাওযী (২/২৪)] মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সংক্রান্ত এই মিথ্যার জাল ও বিকৃতি কেবল হাদিসের কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন, গল্প এবং সাহিত্যের কিতাবগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একজন পাঠক যখন এসব কিতাব পড়েন তখন তিনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ পরস্পরবিরোধী তথ্যের সম্মুখীন হন। এর একদিকে রয়েছে তাঁর অতিভক্তদের তৈরি করা অতিরঞ্জিত প্রশংসা, আর অন্যদিকে রয়েছে তাঁর চরম বিদ্বেষীদের উদ্ভাবিত নিন্দা ও কুৎসা।
❑ এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়:
একজন গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চরম সতর্কতার সাথে গবেষণায় নামা। এই মানসিকতা তাকে এমনভাবে তৈরি করবে যেন কোনো তথ্যই তিনি যাচাই না করে গ্রহণ করবেন না এবং সেই তথ্যের প্রাসঙ্গিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবেন-যাতে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি একটি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কোনো গবেষকের পক্ষেই সতর্কতা অবলম্বন না করে এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো অবস্থান নেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বা পদ্ধতিগত কোনোভাবেই সঠিক নয়। এই নীতি শুধু মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় বরং এটি একটি সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক নীতি যা অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অ্যারিস্টটল—যাঁকে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে বা মার্টিন লুথার—যাঁকে নিয়েও তীব্র মতভেদ রয়েছে—তাঁদের সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগেও একজন গবেষকের জন্য গবেষণায় সতর্ক থাকা, বর্ণনার সত্যতা ও সকল তথ্যের সঠিক অর্থ নিশ্চিত করা আবশ্যক—যাতে একটি ন্যায্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।
যদিও এই নিয়মটি সবার জন্যই প্রযোজ্য তবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ, তাঁদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান এবং তাঁরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহচর্য ও সান্নিধ্য পেয়েছেন। এমন অনেক নসুস (দলিল), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যা প্রমাণ করে যে—তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার একটি গবেষণাপত্রে, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে “সাহাবি প্রজন্মের ইতিহাস পর্যালোচনার পদ্ধতিগত রূপরেখা” (المَدخلُ المنهجيُّ للتعاملِ مع جيلِ الصحابةِ) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।” এসব শরয়ি প্রশংসা এবং যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক এসব তথ্যের কারণেই মুমিনদের হৃদয়ে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এক বিশাল মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান অত্যন্ত গভীর। মুসলিম উম্মাহ সবসময় তাঁদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ এবং তাঁদের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র রাখার নীতি অনুসরণ করে থাকে—যতক্ষণ না এর বিপরীতে অত্যন্ত জোরালো ও অকাট্য কোনো দলিল পাওয়া যায়। এই কারণেই সাহাবিগণের জীবন ও তাঁদের পারস্পরিক বিবাদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞান, ইনসাফ, সতর্কতা, নিশ্চিত যাচাই-বাছাই এবং পরিষ্কার হৃদয় ছাড়া এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা আলোচনায় লিপ্ত হওয়া মোটেও বৈধ নয়। এই তথ্য ও উপাত্তগুলোই হলো সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ভিত্তি করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের উলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)এর মধ্যকার পারস্পরিক মতভেদ ও বিবাদ নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করার (অর্থাৎ সমালোচনা না করার) মত প্রদান করেছেন। তাঁদের এই রায় কেবল যুক্তিহীন কোনো দাবি নয় বরং এটি শরয়ি, ঐতিহাসিক এবং যৌক্তিক দলিলের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা সাহাবিগণের মর্যাদা, তাঁদের সুউচ্চ স্থান এবং তাঁদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও সততার প্রমাণ দেয়। পূর্বের আলোচনা এটিই নিশ্চিত করে যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি আরও জোরালো ও উচ্চতর হওয়া উচিত।
◈ এর প্রথম কারণ হলো—তিনি একজন সাহাবি (রা.)।
◈ দ্বিতীয়ত কারণ—তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র।
এই পরিস্থিতিই তাঁর ক্ষেত্রে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ও কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করাকে অপরিহার্য করে তোলে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে সেই ‘চরম সতর্কতা’র নিয়মটি মেনে চলেনি। তাঁরা হয় তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখিয়েছে অথবা অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভুল করেছে। তাঁরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কুৎসা সম্বলিত বিভিন্ন গল্প ও সংবাদের ওপর নির্ভর করেছে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তাঁর ব্যাপারে অন্যায্য ও জুলুমপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: উসমান (রা.)-এর যুগে মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ভারতে মূর্তি বিক্রি করতেন কিংবা তিনি মদ্যপান করতেন—এই জাতীয় বিভিন্ন অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হয় যে, অনেক আলেম তাঁদের হাদিস বা ইতিহাসের কিতাবে এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। অথচ আমরা সবাই জানি, ইতিহাস বা সংবাদের কিতাবে যা কিছু উল্লেখ করা হয় তার সবই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তাতে প্রচুর দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে। [এই সংবাদগুলোর দুর্বলতা প্রমাণের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ‘সাল্লুস সিনান ফিয যাব্বি আন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান’ (মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সপক্ষে বর্শা চালনা বা প্রতিরক্ষা” [অর্থাৎ তাঁর সম্মান রক্ষায় লেখনীর মাধ্যমে জোরালো প্রতিবাদ]। লেখক: সাদ আস সুবাইয়ী (পৃষ্ঠা: ১৯৭-ডিজিটাল সংস্করণ] এর বাইরেও আমরা যদি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় বর্ণিত সংবাদগুলো পরীক্ষা করি তবে দেখতে পাব যে, এগুলোর সনদ বা সূত্রগুলো বাতিল এবং এগুলোতে এমন সব ‘ইলাল’ বা হাদিসতাত্ত্বিক ত্রুটি রয়েছে যা এগুলোর অসারতা প্রমাণ করে। উপরন্তু এই বর্ণনাগুলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর ফজিলত বা মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলোর বিরোধী এবং সেইসব যৌক্তিক প্রমাণেরও পরিপন্থী যা এই গবেষণার সামনে আসবে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই শিথিলতা আমাদের এমন সব ভুল পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে যা বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতির বিরোধী। কারণ, এই শিথিলতা একদিকে যেমন মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে অতি ভক্তি পোষণকারীদের সামনে দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে এমন সব ফজিলত প্রমাণের পথ খুলে দেবে যা প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত নয়—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে যেমন শিথিলতা দেখানো সঠিক নয়। তেমনি তাঁর ফজিলত প্রমাণের ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখানো জায়েজ নয়।
অন্যদিকে, এটি আলি বিন আবু তালিব (রা.)বা অন্যান্য সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের জন্যও সুযোগ করে দেবে, যাতে তারা অনির্ভরযোগ্য ও অপ্রমাণিত বর্ণনা দিয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের নামে কুৎসা রটাতে পারে। সঠিক ও পদ্ধতিগত পথ হলো—সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে ‘চরম সতর্কতা’র নীতি বজায় রাখা, বিশেষ করে যাঁদের নিয়ে বিতর্ক বা মতভেদ রয়েছে। আমরা তাঁদের জন্য এমন কোনো ফজিলত প্রমাণ করব না যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। আবার তাঁদের প্রতি এমন কোনো নিন্দাও আরোপ করব না যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। এসব বিষয় এটাই প্রমাণ করে যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় যারা শিথিলতা দেখায় বা বাড়াবাড়ি করে, তাদের মূল সমস্যা বিক্ষিপ্ত কোনো উদাহরণ বা তথ্যের মধ্যে নয়; বরং সমস্যাটি তাদের চিন্তাধারা ও ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতির মূলে। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইতিহাস পর্যালোচনায় আমাদের কেবল তথ্যের পাহাড় জমানোর প্রয়োজন নেই বরং প্রয়োজন হলো কোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখা। সেই সাথে যে ভুল পথগুলো মানুষকে ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করে, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা।

কবরস্থানে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করার বিধান

 প্রশ্ন: কবরস্থানে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করার বিধান কী? এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া কি?

উত্তর: আমাদের সমাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ঈদ, জানাজা ও দাফনের পর, রোজার ইফতারের পূর্বে কিংবা বাড়ি, দোকান ইত্যাদি যেকোনো শুভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে, বিয়ে অনুষ্ঠানে, এমনকি সিনেমার মহরত অনুষ্ঠানেও সম্মিলিত দুআ-মোনাজাত করার যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে। অথচ তার পক্ষে পবিত্র কুরআন, সহিহ সুন্নাহ, সাহাবি ও তাবেয়িগণের আমল কিংবা চার মাজহাবের ইমামগণের কারো থেকে এই প্রথার বৈধতার সপক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা বা এমন কোনও আমলকে ইবাদত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবিগণ করেননি তা নিঃসন্দেহে বিদআত বা নবসৃষ্ট। ইসলামে দ্বীনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নতুন প্রথা চালুর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি তার কঠিন পরিণতির কথা বলা হয়েছে। যেমন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ”
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনও এমন বিষয় সৃষ্টি করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৮]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুতবা বা বিভিন্ন বক্তব্যের শুরুতে বলতেন,
“فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ”
“সবচেয়ে উত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব সৃষ্ট বিষয়সমূহ (বিদআত)। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৭] অন্য বর্ণনায় আছে, “প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।”
নিম্নে আমাদের সমাজে প্রচলিত দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বা কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দলবল সহ সম্মিলিত দুআ-মুনাজাত সম্পর্কে কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:
❑ ১. আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.):
প্রশ্ন: দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে দোয়া করার হুকুম কী?
উত্তর:
الدُّعَاءُ الْجَمَاعِيُّ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ دَفْنِهِ بِدْعَةٌ؛ لِأَنَّ الرَّسُولَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ يَدْعُو بِأَصْحَابِهِ، بَلْ يَقُولُ: «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ».
وَأَمَّا أَنْ يَبْقَوْا مَثَلًا جَمِيعًا ثُمَّ يَدْعُوَ بِهِمْ وَاحِدٌ وَيُؤَمِّنُوا عَلَيْهِ فَهَذَا لَمْ تَأْتِ بِهِ السُّنَّةُ. نَعَمْ.
“দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিত দোয়া করা একটি বিদআত। কারণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে (এভাবে) দোয়া করতেন না। বরং তিনি বলতেন:
«اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ
“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য (প্রশ্নোত্তরের সময়) অবিচল থাকার দোয়া করো।”
কিন্তু উদাহরণ স্বরপ সকলে মিলে দাঁড়িয়ে থাকবে, এরপর একজন দোয়া করবে আর অন্যরা তার দোয়ার ওপর ‘আমিন’ ’আমিন’ বলবে—এমনটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।” [সূত্র: alathar]
❑ ২. আল্লামা শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.)
মাইয়েতকে দাফনের পর তার জন্য দোয়া করা কি দলবদ্ধভাবে হবে নাকি ব্যক্তিগতভাবে?
প্রশ্নকারী: হাদিসে এসেছে, «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَاسْأَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ» “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য অবিচলতা (কবরের প্রশ্নোত্তের সময় ইমানের ওপর স্থির থাকা)-এর দোয়া করো।” নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই নির্দেশটি কি এমন যে, সবাই মিলে করবে—অর্থাৎ একজন দোয়া করবে আর বাকিরা তাতে ‘আমিন’ বলবে—নাকি প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে দোঊ করবে?
উত্তর:
لَا، كُلٌّ لِحَالِهِ
“না, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দুআ করবে।”
❑ ৩. শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে দোয়া করার বিধান
প্রশ্ন: কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে মাইয়েতের (মৃত ব্যক্তির) জন্য দোয়া করা এবং উপস্থিত অন্যরা সেই দোয়ার সাথে সম্মিলিতভাবে ‘আমিন’ বলা—এর বিধান কী?
উত্তর:
هَذَا السُّنَّةُ؛ إِذَا زَارَ الْمَيِّتَ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ، أَنْ يَدْعُوَ لَهُ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرَّحْمَةِ، وَكُلٌّ يَدْعُو لَهُ، وَلَا يَدْعُونَ بِصَوْتٍ جَمَاعِيٍّ، أَوْ يَدْعُوَ وَاحِدٌ وَالْبَقِيَّةُ يُؤَمِّنُونَ عَلَى ذَلِكَ؛ لِأَنَّ هَذَا الشَّيْءَ لَمْ يَرِدْ، لَكِنَّ كُلَّ وَاحِدٍ يَدْعُو لِلْمَيِّتِ بِمُفْرَدِهِ.
“এটি সুন্নাহসম্মত নয় বা এর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুন্নাহ হল, কেউ যখন কবর জিয়ারত করতে যায় এবং সালাম দেয় তখন সে মাইয়েতের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করবে। তবে এই দোয়া কোনও দলবদ্ধ রূপ নেবে না, এমনকি একজনের দোয়ায় বাকিরা ‘আমিন’ও বলবে না। বরং নিয়ম হল, প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে একা একাই মাইয়েতের জন্য দোয়া করবে। দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে দোয়া করা বা একজনের দোয়ায় অন্যদের আমিন বলার কোনও প্রমাণ নেই;। তাই প্রত্যেকে আলাদাভাবে মাইয়েতের জন্য দোয়া করাই সঠিক পদ্ধতি।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল বিদআত থেকে বেঁচে থাকার এবং সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

ইসলামে ধীরস্থিরতা ও দ্রুততা কখন কোথায়

 ইসলামী জীবনদর্শনে ধীরস্থিরতা অত্যন্ত প্রশংসনীয় গুণ। পক্ষান্তরে, বিশেষে কিছু ক্ষেত্র ছাড়া অহেতুক তাড়াহুড়ো বা অস্থিরতা মানুষকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আনাস ইবনে মালিক ও সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الأَنَاةُ مِنَ اللَّهِ، وَالعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
“ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়ো হলো শয়তানের পক্ষ থেকে।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২০১২; হাদিসটি হাসান, যুরকানি মুখতাসারুল মাকাসিদ, হা/২৮৭-যদিও কিছূ মুহাদ্দিসের মতে এ হাদিসটি জইফ। তবে অন্যান্য দলিল আলোকে এর মমার্থ গ্রহনযোগ্য ]
❑ ধীরস্থিরতা বলতে কী বুঝায়?
ধীরস্থিরতা মানে হলো, যেকোনো বিষয়ে যাচাই-বাছাই ও সতর্কতা অবলম্বন করা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অনেক সময় তাড়াহুড়া সিদ্ধান্ত মানুষকে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।
আল্লাহ তাআলা তাই তো সতর্ক করে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
“হে মুমিনগণ! যদি কোনও ফাসেক (পাপাচারী ব্যক্তি) তোমাদের কাছে কোনও বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনও জাতিকে তোমরা আক্রান্ত না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের লজ্জিত হতে না হয়।” [সূরা হুজুরাত: ৬]
ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.) বলেন:
“إِنَّ الْعَجَلَةَ خِفَّةٌ وَطَيْشٌ وَحِدَّةٌ لِلْعَبْدِ تَمْنَعُهُ مِنَ التَّثَبُّتِ وَالْوَقَارِ وَالْحِلْمِ، وَتُوجِبُ وَضْعَ الشَّيْءِ فِي غَيْرِ مَحَلِّهِ، وَتَجْلِبُ الشُّرُورَ وَتَمْنَعُ الْخَيْرَ”
“তাড়াহুড়ো করলে মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। এতে মানুষ অস্থির ও চঞ্চল হয়ে পড়ে, যা তাকে কোনও কিছু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে দেয় না। তাড়াহুড়োর কারণে মানুষ কাজ ঠিকমতো করতে পারে না, বরং সঠিক জায়গায় সঠিক কাজটি না করে উল্টো ভুল করে ফেলে। এতে শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি হয় এবং ভালো কিছু অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
[মাদারিদুস সালিকীন]
ধৈর্য ও ধীরস্থিরতা মুমিনের এমন বৈশিষ্ট্য যা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পছন্দ করেন। যেমন: আশাজ্জ আব্দুল কাইস রা. কে উদ্দেশ্য করে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِنَّ فِيكَ لَخَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ: الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ
“তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে যা আল্লাহ ও তাঁর রসুল পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৭]
এসব কারণে আমাদের ধীরস্থিরতা গুণটি চর্চা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে অস্থিরতা পরিহার করা জরুরি:
১. গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ: জীবনের বড় কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাড়াহুড়ো করলে ভুলের ঝুঁকি থাকে, যা দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের কারণ হতে পারে।
২. ইবাদত: নামাজ বা অন্যান্য ইবাদতে তাড়াহুড়ো করা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য ও প্রশান্তিকে নষ্ট করে।
৩. দোয়া: দোয়া কবুলের জন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও স্থিরতা বজায় রাখা কাম্য। অস্থির হৃদয়ের দুআ আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত হয়।
৪. মন্তব্য: কোনও বিষয়ে পর্যাপ্ত তদন্ত ও যাচাই-বাছায় ছাড়া তাড়াহুড়া করে মন্তব্য করা সামাজিক অস্থিরতা ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে লজ্জিত হতে হয়।
❑ যে সব কাজ যথাসম্ভব দ্রুততার বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা উচিত:
কিছু ক্ষেত্রে যেসব কাজে সময়ক্ষেপণ না করে যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করেই প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়কই শুধু নয় বরং তা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নত। এর মূল নীতি হল, আখিরাতের কাজে বিলম্ব না করা। যেমন: হাদিসে এসেছে,
◈ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
التُّؤَدَةُ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا فِي عَمَلِ الْآخِرَةِ
“সবকিছুতেই ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা উচিত। কিন্তু পরকালের কাজের ক্ষেত্রে নয়।”
[আস সিলসিলাতুস সাহিহা, হাদিস নম্বর ১৭৯৪। এটি ইমাম মুসলিমের শর্তানুসারে সহিহ]
◈ বিশেষ তিনটি কাজে বিলম্ব করা নিষেধ:
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا تُؤَخِّرُهَا: الصَّلَاةُ إِذَا أَتَتْ، وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ، وَالْأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ كُفُؤًا»
“তিনটি কাজ বিলম্ব করবে না: নামাজ যখন ওয়াক্ত হয়, জানাজা যখন উপস্থিত হয় এবং অবিবাহিতা নারী যখন উপযুক্ত পাত্র পায়।” [সুনান তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৭১; হাদিসটির সনদ হাসান]
◈ দ্রুতগতিতে হাঁটা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ছিল:
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَسْرَعَ فِي مِشْيَتِهِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَأَنَّمَا الْأَرْضُ تُطْوَى لَهُ، وَإِنَّا لَنُجْهِدَ أَنْفُسَنَا وَإِنَّهُ لَغَيْرُ مُكْتَرِثٍ
“আমি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে আর কাউকেই দেখিনি—মনে হতো যেন তাঁর জন্য জমিন গুটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজেদের কষ্ট দিতাম অথচ তিনি স্বাভাবিকভাবেই চলতেন। তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র ক্লান্তি ছিল না।”
[সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস নম্বর ৩৬৪০; হাদিসটি হাসান]
ইবনুল কাইয়িম (রাহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন: “হাঁটার সময় পা মাটি থেকে জোরালো ভাবে তোলা হলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও উদ্যমী মানুষের বৈশিষ্ট্য। এটি সবচেয়ে সুষম চলন, যা কৃত্রিমতা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত।”
◈ সালাফগণ ব্যক্তি জীবনের তিনটি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন:
বলা হয়ে থাকে, সালাফ বা পূর্বসূরি পুণ্যবান ব্যক্তিগণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধীরস্থির ছিলেন। তবে জীবনের কিছু সাধারণ কাজ, যেমন—
ক. গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য হাঁটা।
খ. ইলম সংরক্ষণের জন্য লেখা।
গ. এবং পরিমিতভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য খাওয়া। —তারা এসব ক্ষেত্রে তৎপরতা বা দ্রুততা পছন্দ করতেন।
❑ আরও যেসব ক্ষেত্রে কাল বিলম্ব করা উচিৎ নয়:
◈ ১. হজ পালন: হজ ফরজ হওয়ার পর তা আদায় করার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করা মুমিনের দায়িত্ব। কেননা সে জানে না, ভবিষ্যতে তার জন্য কোন সমস্যা অপেক্ষা করছে।
◈ ২. গুনাহ থেকে তওবা: গুনাহ হয়ে গেলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তওবা করা এবং নিজেকে সংশোধন করা কর্তব্য। কেননা হয়তো তওবার পূর্বেই মৃত্যু দূত তার সামনে এসে হাজির হবে।
◈ ৩. ঋণ পরিশোধ: কারোর পাওনা বা ঋণ থাকলে তা কাল বিলম্ব না করে পরিশোধ করা কর্তব্য।
◈ ৪. ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি ও ওসিয়াত পূরণ: বৈধ বিষয়ে কারও সাথে ওয়াদা করা হলে বা কাউকে কোনও বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে বা ওসিয়ত থাকলে সময় মত তা পূরণ করা কর্তব্য। ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা ইমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়।
◈ ৫. জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা: মানুষ মারা গেলে যথাসম্ভব দ্রুত তার কাফন-দাফন সম্পন্ন করা জরুরি।
◈ ৬. মেহমানদারি করা: বাড়িতে মেহমান আসলে যথাসম্ভব দ্রুত তার প্রয়োজন পূরণ ও আপ্যায়নে মনোযোগী হওয়া উচিত।
◈ ৭. ইফতার করা: রোজা ইফতারের সময় হওয়া মাত্র ইফতার করা হাদিসের নির্দেশ।
◈ ৮. সন্তানের আকিকা করা: সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে নির্দিষ্ট সময়ে (সপ্তম দিনে) তার আকিকা দেওয়া সুন্নত।
◈ ৯. কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন তিলাওয়াতে তারতিল বা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করার পাশাপাশি বুঝে তেলাওয়াত করা উত্তম কাজ।
◈ ১০. বিপদগ্রস্তকে যথাসাধ্য দ্রুত বিপদ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করা মানবিক দায়িত্ব।
মোটকথা, জীবনের আসল সৌন্দর্য হলো, ভারসাম্য রক্ষা করা। পার্থিব সিদ্ধান্ত, গুরুত্বপূর্ণ বিচারকার্য এবং ব্যক্তিগত আচরণে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করুন কিন্তু ইবাদত-বন্দেগি ও মানব কল্যাণে অগ্রগামী থাকুন। সর্বোপরি কাজের প্রকৃতি বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক গতিতে চলাই মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি কাজে প্রজ্ঞা ও ভারসাম্য বজায় রাখার তাওফিক দান করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

প্রশান্তিময় জীবনের জন্য একগুচ্ছ ইসলামি নির্দেশিকা

 কঠিন বাস্তবতার এই কন্টকময় জীবনে মানুষ একটু প্রশান্তি কিংবা এক চিলতে সুখের খোঁজে কত কিছুই না করে। কিন্তু প্রকৃত সুখ কি কেবল বাহ্যিক প্রাপ্তিতে? নাকি তা হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক পরম অনুভূতির নাম? এই প্রশ্নের উত্তর না জানার কারণে অধিকাংশ মানুষের কাছে সে প্রত্যাশিত সুখ যেন এক সোনার হরিণ। এই প্রেক্ষাপটে সৌভাগ্যমণ্ডিত ও আনন্দমুখর জীবন যাপনের অত্যন্ত শৈল্পিক ও দিকনির্দেশনামূলক রূপরেখা এঁকেছেন সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা শাইখ আব্দুর রাহমান ইবনে নাসের আস সাদী (রাহ.)। তাঁর কালজয়ী পুস্তিকা ‘আল ওয়াসাইলুল মুফিদাহ লিল হায়াতিস সাঈদাহ’ (সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায়সমূহ) থেকে আহরিত সেই অমূল্য রত্নগুলোকে এখানে ভিন্ন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলে ধরা হলো।

চলুন, শাইখের এই প্রজ্ঞাময় উপদেশগুলো হৃদয়ে ধারণ করি এবং নিজের জীবনকে প্রশান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন। সুখ সমৃদ্ধ ও আনন্দমুখর জীবনের জন্য যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হল:
১. দৃঢ় ইমান: সুখী জীবনের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি অবিচল ও খাঁটি বিশ্বাস। মনে প্রশান্তি আনার এটিই প্রথম ধাপ।
২. সৎকর্ম: ইমানের সাথে সৎ কাজের সমন্বয় ঘটান। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা সৎ কাজ করবে তাদের জীবন তিনি আনন্দময় করে তুলবেন।
৩. সবার প্রতি দয়া: মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং পরোপকারে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। অন্যের উপকার করলে নিজের মনের দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি অনেকখানি কমে যায়।
৪. কাজে ডুবে থাকা: অলস সময় কাটাবেন না। জ্ঞান অর্জন ও গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন, এতে মন খারাপ করা চিন্তাগুলো দূরে থাকবে।
৫. বর্তমানকে গুরুত্ব দেওয়া: অতীত নিয়ে আক্ষেপ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাদ দিন। বর্তমান দিনটি কীভাবে ভালোভাবে কাটানো যায়, সেই লক্ষ্যেই আপনার সবটুকু মনোযোগ দিন।
৬. আল্লাহর জিকির: নিয়মিত আল্লাহর স্মরণে থাকুন। জিকির বা তার নাম উচ্চারণ হৃদয়ে প্রশান্তি ও এক অদ্ভুত প্রফুল্লতা আনে।
৭. কৃতজ্ঞ থাকা: আল্লাহর দেওয়া অগণিত নেয়ামত নিয়ে চিন্তা করুন। যখনই কোনো বিপদে পড়বেন, আল্লাহর নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করবেন, দেখবেন মনের ভার অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।
৮. নিজের অবস্থার দিকে তাকানো: জীবনের প্রাপ্তিগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন। আপনার চেয়ে যাদের জীবনযাত্রার মান নিম্নতর, তাদের দিকে তাকালে আপনি নিজের অবস্থা নিয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার উপলক্ষ খুঁজে পাবেন।
৯. সক্রিয় হওয়া: কোনো কিছু নিয়ে শুধু দুশ্চিন্তা না করে, সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করুন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন।
১০. দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া: নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। নিজের দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া প্রশান্তির বড় মাধ্যম।
১১. মনকে প্রস্তুত রাখা: কঠিন পরিস্থিতির কথা আগে থেকেই মাথায় রাখুন, এতে যেকোনো বিপদে আপনি ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরতে পারবেন।
১২. ধৈর্য ও মনোবল: রাগ, অস্থিরতা বা অহেতুক আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মনোবল অটুট থাকলে যেকোনো কঠিন সময় পার করা সহজ হয়।
১৩. আল্লাহর ওপর ভরসা: যেকোনো কাজে নিজের সর্বাত্মক চেষ্টার পর আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করুন। এটিই মানসিক শক্তির আসল উৎস।
১৪. সহনশীল হওয়া: মানুষের খুঁত ধরা বন্ধ করুন। সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো দেখুন এবং অন্যের ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমা করতে শিখুন।
১৫. জীবনকে ছোট ভাবা: আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবন দুশ্চিন্তা করে নষ্ট করার মতো নয়। তাই মনকে অহেতুক চিন্তার ভার থেকে মুক্ত রাখুন।
১৬. তুলনামূলক চিন্তা করা: আপনার জীবনে যা কিছু আছে, তা দুঃখ-কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি—এই হিসাবটি মাঝে মাঝে মনে করাবেন। কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো অনেক কিছুই আপনার চারপাশে আছে।
১৭. উপেক্ষা করা: মানুষ আপনার সম্পর্কে কী বলল বা কী আচরণ করল, তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাববেন না। গুরুত্ব না দিলে সেগুলো আপনার মনে কোনো আঁচড় কাটতে পারবে না।
১৮. ইতিবাচক চিন্তা: আপনার চিন্তাই আপনার জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয়। তাই সব সময় ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভাবনায় মনকে রাঙিয়ে তুলুন।
১৯. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা: মানুষ আপনার কাজের প্রশংসা করল কি করল না, সেটা মুখ্য নয়। প্রতিটি কাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করুন। এতে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া না পাওয়ার বেদনা আপনাকে স্পর্শ করবে না।
২০. উপকারী কাজে মনোনিবেশ: জীবন থেকে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় অভ্যাস ঝেড়ে ফেলুন এবং উপকারী কাজের দিকে এগিয়ে যান।
২১. কাজ জমিয়ে না রাখা: সময়মতো কাজ শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কাজ জমিয়ে রাখলে মনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
২২. পরামর্শ ও অগ্রাধিকার: যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করুন। কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগিয়ে যান।
আপনার জীবন সুন্দর ও প্রশান্তিময় হোক, এই কামনাই করি। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আল্লামা শাইখ আব্দুর রাহমান ইবনে নাসের আস সাদী (রাহ.) রচিত الوسائل المفيدة للحياة السعيدة (বা সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায় সমূহ) গ্রন্থের ছায়া অবলম্বনে প্রস্তুতকৃত)।
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

প্রশ্ন: একজন মহিলা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন এবং পর্দাও করেন। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য স্বামীর আদেশ মানতে চান না।

 প্রশ্ন: একজন মহিলা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন এবং পর্দাও করেন। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য স্বামীর আদেশ মানতে চান না। যেমন: স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও ভাইয়ের পাত্রী দেখার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেল। তার দাবি, আমি আম্মার সাথে গিয়েছি। এটা আমার জন্য অনুমতি আছে। কিন্তু স্বামী এতে রাজি নয়। প্রশ্ন হল, এভাবে উক্ত মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে? এ ক্ষেত্রে স্বামীর করণীয় কী?

উত্তর: স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা ফরজ যদি তা গুনাহের কাজ বা সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজের নির্দেশ না হয়। সুতরাং স্ত্রীর জন্য জরুরি হল, বিশেষ কোনো কাজে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে স্বামীর নিকট অনুমতি নেয়া। স্বামী অনুমতি দিলে পরিপূর্ণ পর্দা সহকারে এবং নিজেকে ফিতনা থেকে হেফাযতে রেখে স্ত্রী বাইরে যেতে পারে। দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে অবশ্যই তার পিতা, ভাই ইত্যাদি মাহরাম পুরুষের সাথে যাবে। কিন্তু স্বামী যদি তাকে যেতে নিষেধ করে তাহলে স্ত্রীর জন্য তা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। অন্যথায় সে স্বামীর ‘অবাধ্য’ হিসেবে গণ্য হবে এবং গুনাহগার হবে। পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই আনুগত্য করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা পুরুষকে পরিবারের মূল পরিচালনার দায়িত্ব এবং স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
“পুরুষেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল, এ কারণে যে আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ কারণেও যে তারা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে।” [সূরা নিসা: ৩৪]
সুতরাং স্ত্রী যদি এই আনুগত্যের বিষয়টিকে উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ না করে তাহলে পরিবারিক শৃঙ্খলা ভেঙে যেতে বাধ্য। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
জ্ঞাতব্য যে, ইসলামের বিধান হল, কোন স্ত্রী যদি স্বামীর ‘অবাধ্য’ হয় বা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করে তাহলে তার জন্য স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেয়া বন্ধ করার অধিকার রয়েছে।
ইসলামে স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার আনুগত্যের বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সুষ্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়:
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ اللَّهِ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا تُؤَدِّي الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّىٰ تُؤَدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا، وَلَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِيَ عَلَىٰ قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ
“যদি আমি কাউকে নির্দেশ দিতাম আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করার, তাহ’লে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য। ঐ সত্তার শপথ করে বলছি যার হাতে আমার জীবন, মহিলারা ঐ পর্যন্ত আল্লাহর হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে স্বামীর হক আদায় না করে, এমনকি স্বামী যদি যাত্রা পথে ঘোড়ার পৃষ্ঠেও তাকেও আহবান করে তখনও তাকে বাধা না দেয়।” [ইবনে মাজাহ: ১৮৫৩, সহীহাহ: ১২০৩]
সুতরাং স্ত্রীর জন্য স্বামীর অবাধ্যতা করে বাইরে কোথাও যাওয়া জায়েয নয় যদি নিজের বাবা-মা বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ি হোক না কেন।
◈ এর দলিল হল, বিখ্যাত ইফকের ঘটনায় মা আয়েশা রা. রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট তার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি চাওয়ার হাদিস:
তিনি বলেন:
أَتَأْذَنُ لِي أَنْ آتِيَ أَبَوَيَّ؟
“আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিবেন?” [সহিহ বুখারী ও মুসলিম]
ইরাকী বলেন, “আয়েশা রা. এ কথা থেকে বুঝা গেল, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার পিতামাতার বাড়িতে যাবে না।” [ত্বরবুত তাসরীব: ৮/৫৮]
◈ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রা. এক বিবাহিত মহিলার ব্যাপারে বলেন—যার মা অসুস্থ ছিল:
طَاعَةُ زَوْجِهَا أَوْجَبُ عَلَيْهَا مِنْ أُمِّهَا، إِلَّا أَنْ يَأْذَنَ لَهَا
“মা’র চেয়ে স্বামীর কথার আনুগত্য করা তার জন্য অধিক অপরিহার্য। তবে স্বামী যদি তাকে অনুমতি দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।” [শারহু মুনতাহাল ইরাদাত: ৩/৪৭]
◈ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি বলেন:
لَا يَجُوزُ لِلْمَرْأَةِ الْخُرُوجُ مِنْ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا بِإِذْنِهِ، لَا لِوَالِدَيْهَا وَلَا لِغَيْرِهِمْ؛ لِأَنَّ ذَٰلِكَ مِنْ حُقُوقِهِ عَلَيْهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ هُنَاكَ مُسَوِّغٌ شَرْعِيٌّ يَضْطَرُّهَا لِلْخُرُوجِ
“কোন মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া জায়েয নয়। পিতামাতা বা অন্য কারো নিকট নয়। কারণ এটি তার উপর স্বামীর হক। অবশ্য যদি শরিয়ত সম্মত বিশেষ কোনো কারণ থাকে যা তাকে বাধ্য করে তাহলে ভিন্ন কথা।” [ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা: ১৯/১৬৫]
তবে স্বামীর কতর্ব্য হল, সময়-সুযোগ ও প্রয়োজন বুঝে স্ত্রীকে মাঝে-মধ্যে তার পিতামাতা ও অন্যান্য মাহরাম নিকটাত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া যদি এতে ক্ষয়-ক্ষতি ও ফেতনার আশঙ্কা না করে। অবশ্য একান্ত জরুরি অবস্থায় স্বামীর অনুমতি ছাড়াও বাইরে যাওয়া জায়েয আছে। যেমন, বাড়িতে থাকা যদি তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়, ঘর ভেঙে পড়ে, জরুরি চিকিৎসা, ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য সামগ্রী ক্রয় ইত্যাদি।
পরিশেষে বলব, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাস, ভালবাসা ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে যে কোনো সমস্যা সমাধান করা যায়। এগুলো দাম্পত্য জীবনে অপরিহার্য দাবী। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের চাহিদা ও হক আদায় করবে এবং প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখবে। তাহলে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে ইনশাআল্লাহ। তবে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দাম্পত্য জীবনের বৃহত্তর স্বার্থে উভয়কে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত সমাধান করতে হবে। তাহলে দুজনের দাম্পত্য জীবন ভরে থাকবে অবারিত সুখ, শান্তি ও অনাবিল ভালোবাসায় ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate