Tuesday, September 15, 2026

মসজিদে হারানো বস্তু বা ব্যক্তির সন্ধানে ঘোষণা দেওয়ার বিধান

 প্রশ্ন: মসজিদে হারানো বস্তু বা ব্যক্তির সন্ধানে ঘোষণা দেওয়ার বিধান কী? মসজিদের ভেতরে কোন ধরনের ঘোষণা জায়েয এবং কোন ধরনের ঘোষণা নিষিদ্ধ?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া বা তার পরিচয় তুলে ধরা বৈধ নয়। কারণ মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি। বরং মসজিদ নির্মিত হয়েছে আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠার জন্য।সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:( مَنْ سَمِعَ رَجُلًا يَنْشُدُ ضَالَّةً فِي الْمَسْجِدِ فَلْيَقُلْ : لَا رَدَّهَا اللَّهُ عَلَيْكَ ؛ فَإِنَّ الْمَسَاجِدَ لَمْ تُبْنَ لِهَذَا )“যে ব্যক্তি মসজিদে কাউকে হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে শুনবে, সে যেন বলে: ‘আল্লাহ তোমাকে তা ফিরিয়ে না দেন।’ কেননা মসজিদ এ জন্য নির্মিত হয়নি।”(সহিহ মুসলিম হা/৫৬৮) সহিহ মুসলিমে অপর বর্ননায় বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি মসজিদে ঘোষণা দিল: ‘লাল উটটির সন্ধান কে দিতে পারবে?’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ( لَا وَجَدْتَ ؛ إِنَّمَا بُنِيَتْ الْمَسَاجِدُ لِمَا بُنِيَتْ لَهُ )“তুমি যেন সেটা আর খুঁজে না পাও! নিশ্চয় মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি।”(সহিহ মুসলিম হা/৫৬৯)
.
উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:قَوْله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( لَا وَجَدْت ) وَأَمَرَ أَنْ يُقَال مِثْل هَذَا , فَهُوَ عُقُوبَة لَهُ عَلَى مُخَالَفَته وَعِصْيَانه وَيَنْبَغِي لِسَامِعِهِ أَنْ يَقُول : لَا وَجَدْت فَإِنَّ الْمَسَاجِد لَمْ تُبْنَ لِهَذَا . أَوْ يَقُول : لَا وَجَدْت إِنَّمَا بُنِيَتْ الْمَسَاجِد لِمَا بُنِيَتْ لَهُ . كَمَا قَالَهُ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ‘তুমি যেন তা আর খুঁজে না পাও’ এটি তার অবাধ্যতা ও ভুলের শাস্তিস্বরূপ। যে ব্যক্তি এমন ঘোষণা শুনবে, তার উচিত এটা বলা: ‘তুমি যেন না আর খুঁজে না পাও; নিশ্চয় মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি।’ অথবা বলা: ‘তুমি যেন তা আর খুঁজে না পাও; মসজিদ তো যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে, কেবল সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই নির্মিত হয়েছে।’ যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।”(শারহু সহীহ মুসলিম,ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ১৪৫১৯৮)
ইবনে আব্দিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: وقد ذكر الله تعالى المساجد بأنها بيوت أذن الله أن ترفع ويذكر فيها اسمه وأن يسبح له فيها بالغدو والآصال ، فلهذا بنيت ، فينبغي أن تنزه عن كل ما لم تبن له“আল্লাহ তা‘আলা মসজিদসমূহ সম্পর্কে বলেছেন: এগুলো এমন ঘর, যেগুলোকে উঁচু করার ও তাতে তাঁর নাম স্মরণ করার এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যেই মসজিদগুলো নির্মিত হয়েছে। সুতরাং যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি, তা থেকে মসজিদকে পবিত্র রাখা উচিত।”[আল-ইস্তিযকার (২/৩৬৮)] বাইহাকী ‘আস-সুনান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের পাশে একটি খোলা জায়গা তৈরি করেন, যার নাম দেন ‘আল-বুতাইহা’। তিনি বলতেন: “من أراد أن يلغط أو ينشد شعرا أو يرفع صوتا فليخرج إلى هذه الرحبة“যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে কথা বলতে চায়, কবিতা আবৃত্তি করতে চায় বা কোলাহল করতে চায়, সে যেন এই খোলা জায়গায় বেরিয়ে যায়।”
(বাইহাকী ‘আস-সুনান’ হা/২০৭৬৩: আরও দেখুন: আল-ইস্তিযকার (২/৩৬৮)।
যে ব্যক্তি হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে চায়, সে যেন মসজিদের বাইরে যায়। এমনকি সে যদি একটি কাগজে লিখে মসজিদের বাইরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।আর যদি কারো জিনিস মসজিদের ভেতরে হারিয়ে যায় এবং সে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা কর্মচারীকে গোপনে জানায়, যাতে যিনি জিনিসটি পেয়েছেন তিনি মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই, যদি বিষয়টি তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:” المساجد لم تُبن لنشد الضوال أو البيع والشراء ، وإنما بنيت لعبادة الله وطاعته بالصلاة والذكر وحلقات العلم ونحو ذلك .وكتابة ورقة وتعلق في المسجد فهذا إذا كان في الجدار الخارجي فلا بأس أو على الباب الخارجي فلا بأس ، أما من الداخل فلا ينبغي لأن هذا يشبه الكلام ، ولأنه قد يشغل الناس بمراجعة الورقة وقراءتها .فالذي يظهر لنا : أنه لا يجوز ، لأن تعليق أوراق في المسجد معناه نشد الضوال ، ولكن إذا كتب على الجدار الخارجي من ظهر المسجد أو على الباب وتكون خارج المسجد فلا بأس بهذا “হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া বা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মসজিদ নির্মিত হয়নি। বরং তা নির্মিত হয়েছে আল্লাহর ইবাদত, নামায, যিকির, ইলমের মজলিস ইত্যাদির জন্য। যদি মসজিদের বাইরের দেয়ালে বা বাইরের দরজায় কাগজ লিখে ঝুলানো হয়, তবে তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু ভেতরে ঝুলানো উচিত নয়। কারণ তা কথা বলার মতো হয়ে যায় এবং মানুষকে কাগজ পড়ায় ব্যস্ত করে দিতে পারে। অতএব আমাদের কাছে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, মসজিদের ভেতরে কাগজ ঝুলানো জায়েয নয়। কারণ এর অর্থই হলো হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া। তবে যদি মসজিদের পেছনের বাইরের দেয়ালে বা মসজিদের বাইরে দরজায় লেখা হয়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই।”(সংক্ষপিত ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব (২/৭০৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:” المساجد بما أن الله أضافها إلى نفسه وأضافها النبي صلى الله عليه وسلم إلى ربه وأذن الله أن ترفع لها حرمة ولها أحكام واحترام وتعظيم .ومن أحكام المساجد أنه لا يجوز بها البيع والشراء سواء كان قليلا أو كثيرا ، كذلك أيضا إنشاد الضالة يجيء رجل ويقول : ضاع مني كذا ، مثل محفظة الدراهم ، فهذا حرام لا يجوز حتى وإن غلب على أمرك أنه سرق في المسجد ، لا تقل كيف أتوصل إلى هذا ؟ اجلس عند باب المسجد خارج المسجد وقل : جزاكم الله خيرا ، ضاع مني كذا .المهم أن المساجد يا إخواني يجب أن تحترم”যেহেতু আল্লাহ মসজিদকে নিজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদকে তাঁর রবের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন, আর আল্লাহ এগুলোকে মর্যাদা দিয়েছেন, তাই এগুলোর সম্মান, বিধান ও মর্যাদা রয়েছে।মসজিদের বিধানের অন্তর্ভুক্ত হলো: এতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয নয়, তা কম হোক বা বেশি হোক। তেমনি হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া যাবে না। কেউ যদি এসে বলে: আমার অমুক জিনিস হারিয়ে গেছে, যেমন: টাকা-পয়সার থলে, এটি হারাম; জায়েয নয়। এমনকি যদি প্রবল ধারণা হয় যে তা মসজিদেই চুরি হয়েছে, তবুও নয়। তুমি বলবে না: আমি কীভাবে তা উদ্ধার করব? বরং মসজিদের দরজার বাইরে বসে বলুন: আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন, আমার অমুক জিনিস হারিয়ে গেছে। ভাইয়েরা, মূল কথা হলো মসজিদকে সম্মান করা আবশ্যক।” [সংক্ষেপিত: শরহু রিয়াদিস সালেহীন; পৃষ্ঠা: ২০১৪)]
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:يمكن أن يلصق الإعلان خارج باب المسجد في مكان معين دائما ليعرفه الناس“মসজিদের দরজার বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে বিজ্ঞপ্তি টাঙানো যেতে পারে, যাতে লোকেরা তা জানতে পারে।”[ফাতাওয়াল-লাজনা আদ-দায়িমা (৫/২৭৫)]
.
দ্বিতীয়ত: মসজিদে হারানো বস্তু খোঁজার জন্য উচ্চস্বরে ঘোষণা করা নিষিদ্ধ—এ নিষেধাজ্ঞা মূলত এমন সব ঘোষণা ও উচ্চবাচ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা মসজিদের উদ্দেশ্য ও মর্যাদার পরিপন্থী। তবে কোনো ঘোষণা যদি আল্লাহর আনুগত্য, নেক আমল ও সৎকাজের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে তা এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং প্রয়োজন ও উপযোগিতা বিবেচনায় মসজিদের ভেতরে এ ধরনের দ্বীনি ঘোষণা করা বৈধ।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:لا يجوز أن تتخذ المساجد، أو شيء من مرافقها، أو ساحاتها التابعة لها الخارجة عنها، ميدانا لعرض النشرات واللوحات الدعائية والإعلانات التجارية ، سواء كان ذلك للمدارس أو المصانع أو المؤسسات أو غيرها ؛ لأن المساجد إنما بنيت لعبادة الله تعالى من صلاة وذكر وتعلم العلم وتعليمه وقراءة القرآن ونحو ذلك من أمور الدين .فيجب تنزيهها عما ذكر ، ومراعاة حرمتها ، والحرص على عدم إشغال الناس بما يصرفهم عن عبادة الله تعالى ، وتعلقهم بالآخرة“মসজিদসমূহকে অথবা এর কোনো অংশকে কিংবা মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাইরের আঙিনাকে নোটিশ, প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপন বোর্ড ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নয়; চাই তা স্কুলের হোক, কারখানার হোক, প্রতিষ্ঠানের হোক কিংবা অন্য কিছুরই হোক। কারণ মসজিদ মূলত নির্মিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্য। যেমন নামাজ, যিকির, দ্বীনি জ্ঞান শেখা ও শেখানো, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এ জাতীয় দ্বীনি কাজের জন্য।অতএব, মসজিদকে এসব বিষয় থেকে পবিত্র রাখা আবশ্যক, এর মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি এবং মানুষকে এমন বিষয়ে ব্যস্ত না করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে যা তাদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিচ্যুত করে এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে।”(ফাতাওয়াল-লাজনা আদ-দায়িমা (৫/২৭৬–২৭৭) থেকে সংক্ষেপিত]
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: একটি মসজিদে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, প্রতি বৃহস্পতিবার যারা রোযা রাখতে চান তাদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা আছে। এর হুকুম কী? তিনি উত্তরে বলেন:هذا الإعلان لا بأس به ؛ لأنه إعلان فيه دعوة للخير وليس المقصود به بيعا ولا شراء ، المحرم أن يعلن عن البيع وشراء أو تأجير واستئجار مما لم تبن المساجد من أجله ، وأما الدعوة إلى الخير وإطعام الطعام والصدقة فلا بأس به“এই ঘোষণা দিতে কোনো সমস্যা নেই; কারণ এটি কল্যাণের দিকে আহ্বান। এর উদ্দেশ্য ক্রয়-বিক্রয় নয়। হারাম হলো বেচাকেনা করা, ভাড়া দেওয়া বা ভাড়া নেওয়ার ঘোষণা দেওয়াসহ আরো যেসব কাজের জন্য মসজিদ নির্মিত হয়নি সেগুলো করা। কল্যাণের দিকে আহ্বান করা, মানুষকে খাবার খাওয়ানো ও সদকা সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই।”[সমাপ্ত] তাঁকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: ‘মসজিদে কিছু বিজ্ঞপ্তি টাঙানোর বিধান কী? যেমন: হজ বা উমরার কাফেলার বিজ্ঞপ্তি বা কোনো বয়ান বা দারসের বিজ্ঞপ্তি।’
তিনি উত্তরে বলেন:أما ما كان إعلانا عن طاعة فلا بأس به ؛ لأن الطاعة مما يقرب إلى الله ، والمساجد بنيت لطاعة الله سبحانه وتعالى .وأما ما كان لأمور الدنيا ، فإنه لا يجوز ، ولكن يعلن عنه على جدار المسجد من الخارج . فالحملات – حملات الحج – أمر دنيوي ، فلا نرى أن نعلن عنها في الداخل .وحلق الذكر – كدورات العلم – خيرٌ محض ، فلا بأس أن يعلن عنها في داخل المسجد ؛ لأنها خير “যা আনুগত্য সংক্রান্ত ঘোষণা, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ আনুগত্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। আর মসজিদগুলো আল্লাহর আনুগত্যের জন্যই নির্মিত।আর যা দুনিয়াবি বিষয়সংক্রান্ত, তা জায়েয নয়। বরং তা মসজিদের বাইরের দেয়ালে ঘোষণা করা যাবে। যেমন: হজ্জের কাফেলা একটি দুনিয়াবি বিষয়; তাই আমরা এটাকে মসজিদের ভেতরে ঘোষণা দেওয়ার পক্ষপাতী নই।আর যিকিরের মজলিস তথা ইলমি কোর্স এগুলো নিখাদ নেকীর কাজ, তাই এগুলোর ঘোষণা মসজিদের ভেতরে দেওয়া যেতে পারে। কারণ এগুলো নেকীর কাজ।”[শরহু মানযূমাতিল কাওয়ায়িদ আল-ফিকহিয়্যা (পৃ. ৫২) থেকে সংক্ষেপিত]
.
অনুরূপভাবে, মসজিদে হারিয়ে যাওয়া শিশুর সন্ধানে মাইকে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিও আলেমদের মধ্যে মতভেদপূর্ণ। তবে দলিল ও শরিয়তের উদ্দেশ্য বিবেচনায় অধিকতর সঠিক মত হলো—হারিয়ে যাওয়া শিশুকে খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া জায়েজ। কেননা, মসজিদে হারানো বস্তু বা সম্পদের সন্ধানে ঘোষণা দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা এবং হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষের সন্ধানে ঘোষণা দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি হারানো সম্পদ খোঁজার অন্তর্ভুক্ত; পক্ষান্তরে দ্বিতীয়টি একজন সম্মানিত ও নিরাপরাধ মানুষের সন্ধান এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
.
এ বিষয়ে শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যার সন্তান মসজিদে হারিয়ে গেছে—সে কী করবে? উত্তরে শায়খ বলেন:يبحث عنه، ويسأل من يراه في المسجد: هل رأيت طفلا وصفه كذا وكذا … إلخ، أو يقف عند باب المسجد ويسأل من يخرج عن مطلوبه، لكن لا يقف ويعلن السؤال: من رأى كذا وكذا، بل يسأل خارج المسجد“সে তার সন্তানের সন্ধান করবে। মসজিদে যাদের পাবে, তাদের জিজ্ঞেস করবে: ‘আপনি কি এমন বর্ণনার কোনো শিশুকে দেখেছেন?…ইত্যাদি। অথবা সে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে সেখান থেকে বের হওয়া লোকদের কাছে তার নিখোঁজ সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে পারে। তবে মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে এভাবে ঘোষণা করবে না যে, ‘কে অমুক শিশুকে দেখেছেন?’ বরং মসজিদের বাইরে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করবে।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৪৫০৮)
.
​ইমাম ইবনু উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:”যদি কোনো মানুষ হারিয়ে যায়, তবে কি মসজিদের মাইকে তার ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া জায়েজ আছে? এটি কি হারানো বস্তু খোঁজা সংক্রান্ত হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক?” ​তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:نعم يجوز، وليس هذا من إنشاد الضالة، لأن إنشاد الضالة إنشاد شيء يملك، وإنشاد مال، أما هذا فهو إنشاد نفس معصومة محترمة، فلا بأس بذلك” انتهى من “دروس وفتاوى الحرم المكহ্যাঁ, তা জায়েজ। এটি হারানো বস্তু সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ ‘হারানো বস্তু সম্পর্কে ঘোষণা’ বলতে এমন কোনো বস্তুর সন্ধান করা বোঝায়, যা কারও মালিকানাধীন এবং যা সম্পদ হিসেবে গণ্য। পক্ষান্তরে, এখানে একজন সুরক্ষিত ও সম্মানিত মানুষের সন্ধান করা হচ্ছে। অতএব, এতে কোনো অসুবিধা নেই।”—(দুরূস ওয়া ফাতাওয়া আল-হারাম আল-মাক্কী;আরও দেখুন;ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৪৫০৮)
.
পরিশেষে, মসজিদ আল্লাহর ঘর; এটি সালাত, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি জ্ঞানচর্চা ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য নির্মিত। তাই মসজিদের ভেতরে হারানো সম্পদ বা বস্তু খোঁজার জন্য উচ্চস্বরে ঘোষণা দেওয়া কিংবা এ উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তি টাঙানো শরিয়তসম্মত নয়। তবে মসজিদের বাইরের দেয়াল বা নির্ধারিত স্থানে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, আল্লাহর আনুগত্য ও কল্যাণের প্রতি আহ্বানকারী—যেমন দ্বীনি দারস, ইলমি কার্যক্রম, সদকা বা খাবার বিতরণের—ঘোষণা প্রয়োজন অনুযায়ী মসজিদের ভেতরে দেওয়া বৈধ। আর হারিয়ে যাওয়া শিশু বা কোনো মানুষের সন্ধানকে হারানো সম্পদের ঘোষণার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়; মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজন বিবেচনায় এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। সুতরাং মসজিদের পবিত্রতা, মর্যাদা ও উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে কোন ঘোষণা ইবাদতের সহায়ক আর কোনটি দুনিয়াবি বিষয়—এ পার্থক্যটি বিবেচনা করাই শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ওসিয়তের কি কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা বাধ্যতামূলক নমুনা রয়েছে

 প্রশ্ন: শরিয়তে ওসিয়তের কি কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা বাধ্যতামূলক নমুনা রয়েছে? কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার আলোকে একটি শরিয়তসম্মত ওসিয়তের নমুনা জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর— মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নিজের ওপর থাকা ঋণ, মানুষের অধিকার, আমানত, পাওনা ও অন্যান্য দায়-দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে লিখে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, মৃত্যুর পর তার জানাযা-দাফন, ঋণ ও দায়-দেনা পরিশোধ এবং শরিয়তসম্মতভাবে অবশিষ্ট সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রেখে যাওয়া উত্তম।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওসিয়ত লিখে রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَا حَقُّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَهُ شَيْءٌ يُوصِي فِيهِ يَبِيتُ لَيْلَتَيْنِ إِلَّا وَوَصِيَّتُهُ مَكْتُوبَةٌ عِنْدَهُ» —“কোনো মুসলিম ব্যক্তির এমন কোনো বিষয় থাকলে, যাতে তার ওসিয়ত করার প্রয়োজন রয়েছে, তার জন্য লিখিত ওসিয়ত নিজের কাছে না রেখে দুই রাত অতিবাহিত করা উচিত নয়।”(সহীহ বুখারী হা/২৭৩৮; সহীহ মুসলিম হা/১৬২৭)।
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেন:
فيه الْحَثّ عَلَى الْوَصِيَّة ، وَقَدْ أَجْمَعَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى الْأَمْر بِهَا ، لَكِنَّ مَذْهَبنَا وَمَذْهَب الْجَمَاهِير أَنَّهَا مَنْدُوبَة لَا وَاجِبَة . وَقَالَ دَاوُدُ وَغَيْره مِنْ أَهْل الظَّاهِر : هِيَ وَاجِبَة ؛ لِهَذَا الْحَدِيث ، وَلَا دَلَالَة لَهُمْ فِيهِ ، فَلَيْسَ فِيهِ تَصْرِيح بِإِيجَابِهَا ، لَكِنْ إِنْ كَانَ عَلَى الْإِنْسَان دَيْن أَوْ حَقّ أَوْ عِنْده وَدِيعَة وَنَحْوهَا لَزِمَهُ الْإِيصَاء بِذَلِكَ . قَالَ الشَّافِعِيّ رَحِمَهُ اللَّه : مَعْنَى الْحَدِيث : مَا الْحَزْم وَالِاحْتِيَاط لِلْمُسْلِمِ إِلَّا أَنْ تَكُون وَصِيَّته مَكْتُوبَة عِنْده .وَيُسْتَحَبّ تَعْجِيلهَا ، وَأَنْ يَكْتُبهَا فِي صِحَّته ، وَيُشْهِد عَلَيْهِ فِيهَا ، وَيَكْتُب فِيهَا مَا يَحْتَاج إِلَيْهِ ، فَإِنْ تَجَدَّدَ لَهُ أَمْر يَحْتَاج إِلَى الْوَصِيَّة بِهِ أَلْحَقَهُ بِهَا . قَالُوا : وَلَا يُكَلَّف أَنْ يَكْتُب كُلّ يَوْم مُحَقَّرَات الْمُعَامَلَات وَجُزْئِيَّات الْأُمُور الْمُتَكَرِّرَة”
“এই হাদীসে ওসিয়তের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিমরা উক্ত বিষয়ে আদিষ্ট। কিন্তু আমাদের এবং অধিকাংশের মাযহাব হলো ওসিয়ত করা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। দাউদসহ কিছু যাহেরীর মত হলো ওসিয়ত করা উক্ত হাদীসের কারণে ওয়াজিব। এই হাদীসে তাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। হাদীসটিতে স্পষ্টত আবশ্যকতার কথা বলা হয়নি। কিন্তু যদি কোনো মানুষের ঋণ, অধিকার, আমানত বা অনুরূপ কিছু থাকে, তাহলে তার জন্য সে বিষয়ে ওসিয়ত করা আবশ্যক হয়ে যাবে। শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসটির অর্থ: মুসলিমের বিচক্ষণতা ও নিরাপত্তার পরিচায়ক হলো তার কাছে নিজের ওসিয়ত লেখা থাকবে।ওসিয়ত আগেভাগে করে ফেলা মুস্তাহাব। সুস্থ অবস্থায় ওসিয়ত লিখবে। ওসিয়তের ব্যাপারে সাক্ষীও রাখবে। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সেখানে লিখবে। নতুন কোনো বিষয়ে ওসিয়তের প্রয়োজন হলে সেটা সংযুক্ত করবে। তারা বলেন: প্রতিদিনের তুচ্ছ লেনদেন এবং বারংবার ঘটে যাওয়া ছোটখাট বিষয় লেখা দায়িত্ন নয়।” (শারহু সহীহ মুসলিম থেকে সমাপ্ত; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬৯৮২৭)
.
▪️ওসিয়ত দুই প্রকার:
(১).ওয়াজিব ওসিয়ত: ব্যক্তির দায়ে ও ব্যক্তির প্রাপ্য যে সকল অধিকার রয়েছে সেগুলোর বিবরণ সম্বলিত ওসিয়ত। যেমন: ঋণ, কর্জ, তার কাছে সঞ্চিত আমানত কিংবা মানুষের জিম্মায় তার থাকা কিছু অধিকার। এখানে নিজ সম্পদের সুরক্ষা ও নিজের দায় মুক্তির জন্য ওসিয়ত করা ওয়াজিব।
.
(২).মুস্তাহাব ওসিয়ত: এটা হলো নিছক দান। যেমন: ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা এর কম পরিমাণ ওয়ারিশ নয় এমন আত্মীয়ের জন্য বা অন্য কারো জন্য ওসিয়ত করা। অথবা দরিদ্র-মিসকীন কিংবা কল্যাণকর খাতে দান করার মত নেক কাজে ওসিয়ত করা।(দেখুন,ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ;খণ্ড; ১৬;পৃষ্ঠা;২৬৪)]।
.
মানুষ তার পরিবারকে জানাযার সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ে ওসিয়ত করতে পারে। যেমন: কে তাকে গোসল দিবে, কে তার জানাযা পড়াবে ইত্যাদি। তাদেরকে বিদাত পরিত্যাগের ওসিয়ত করতে পারে। এছাড়া বিলাপসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকার ওসিয়তও করতে পারে। বিশেষতঃ যদি সে জেনে থাকে যে তারা হয়তো এমন কিছু কাজে লিপ্ত হবে।এর পক্ষে প্রমাণ হলো মুসলিমের হাদীস,আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু মুমূর্ষু অবস্থায় বলেন: (فَإِذَا أَنَا مُتُّ فَلَا تَصْحَبْنِي نَائِحَةٌ وَلَا نَارٌ)“আমি মারা যাওয়ার পর কোনো বিলাপকারিণী এবং (ধূপের) আগুন যেন আমার সঙ্গী না হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/১২১)
.
অপর বর্ননায় ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:(إِذَا مِتُّ فَلَا تُؤْذِنُوا بِي ، إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَكُونَ نَعْيًا ، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنْ النَّعْيِ)“আমি মারা গেলে তোমরা আমাকে নিয়ে কোনো ঘোষণা দিবে না। আমার আশঙ্কা হয় যে, এটা মৃত্যু সংবাদ প্রচার বলে ধরা হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মৃত্যুসংবাদ প্রচারে নিষেধ করতে শুনেছি।”(তিরমিযী হা/৯৮৬; ও ইবনে মাজাহ হা/১৪৭৬; শাইখ আলবানী সহীহুত তিরমিযীতে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।
.
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমার কবরে তাঁবু টানাবে না। (ধূপের) আগুন নিয়ে আমার পিছে পিছে আসবে না। আমাকে দ্রুত আমার রবের কাছে নিয়ে যাবে। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নেককার বান্দা বা ব্যক্তিকে খাটিয়ায় রাখার পর সে বলতে থাকে: “তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও। তোমরা আমাকে সামনে এগিয়ে দাও।” আর বদকার হলে সে বলতে থাকে: “তোমাদের ধ্বংস হোক! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?” (মুসনাদে আহমদ হা/১০১৪১; শুয়াইব আরনাউত্ব মুসনাদ আহমদের তাহকীকে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন]।
.
ইমাম হাকেম মুস্তাদরাক বইয়ে বর্ণনা করেন, কাইস ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় স্বজনদের ওসিয়ত করেন:(إذا أنا مت فلا تنوحوا علي فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم ينح عليه) “আমি মারা যাওয়ার পর তোমরা আমাকে নিয়ে বিলাপ করবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে বিলাপ করা হয়নি।”(হাকেম মুস্তাদরাক হা/১৪০৯; হাকেম বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। তারা দু’জন (বুখারী ও মুসলিম) এটা বর্ণনা করেননি। যাহাবী তালখীস বইয়ে বলেন: হাদীসটি সহীহ।
.
এটি ছাড়া অন্যান্য হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, জানাযার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়, বিলাপ থেকে সতর্ক করা কিংবা অনুরূপ বিষয়ে ওসিয়ত করা বৈধ। তবে শরিয়তে ওসিয়তের জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট ছক, ভাষা বা বাধ্যতামূলক নমুনা নির্ধারিত নেই, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি তার পারিবারিক অবস্থা, দায়-দায়িত্ব, পাওনা ও প্রাপ্য অধিকার এবং প্রয়োজনের বিবেচনায় কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত ওসিয়ত করবে। অতএব, ওসিয়তের কিছু নির্দিষ্ট বাক্যই শরিয়তনির্ধারিত—এমন বিশ্বাস করা উচিত নয়।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি’ (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল-বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা)-এর আলিমগণকে ‘হাযিহি ওয়াসিয়্যাতি আশ-শার‘ইয়্যাহ’ পুস্তিকায় উল্লিখিত ওসিয়ত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। স্থায়ী কমিটির আলেমগন এর উত্তরে বলেন:
” بقراءة الوصية المذكورة لم يوجد فيها ما يخالف الشرع ، ولكن صياغتها بشكل وصية من كل فرد وتوزيعها على الناس يوهم أنه يستحب لكل شخص أن يوصي بما فيها أو يشتريها ويدفعها لمن يتولى شأنه بعد موته ، مع أنه لا داعي لذلك ؛ لأن أحكام الجنائز المذكورة فيها موجودة في كتب الفقه ، يراجعها من يحتاج إليها بدون إيصاء أو توزيع ، لا سيما وعمل المسلمين في هذه البلاد والحمد لله في أحكام الجنائز يتمشى على السنة “
“উল্লিখিত ওসিয়ত পাঠ করে শরীয়তের বিপরীত কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এভাবে ওসিয়তের নমুনা প্রণয়ন করে মানুষের মাঝে বিতরণ করলে ভুল ধারণা তৈরি হবে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উক্ত নমুনা অনুযায়ী ওসিয়ত করা, এটা ক্রয় করা এবং মৃত্যুর পর যে তার সকল কিছুর দায়িত্ব নিবে তাকে এটা দেওয়া মুস্তাহাব। অথচ এর প্রয়োজন নেই। কেননা এতে উল্লিখিত বিধি-বিধান ফিকহের বইসমূহে রয়েছে। যার প্রয়োজন সে পড়ে নিবে। এর জন্য পরামর্শ দেওয়া এবং বিতরণ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষতঃ যেহেতু আল্লাহর অনুগ্রহে এই অঞ্চলে জানাযার হুকুমের ক্ষেত্রে মুসলিমদের আমল সুন্নাহর অনুগামী।”(সমাপ্ত; ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ: খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ২৮৯)।
.
▪️এক নজরে একটি শরিয়তসম্মত ওসিয়তনামার নমুনা:
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারিম। আমি [নাম], সুস্থ মস্তিষ্কে, পূর্ণ জ্ঞান-বিবেচনায় এবং স্বেচ্ছায় আমার প্রিয় পরিবার-পরিজনের উদ্দেশে এই ওসিয়তনামা রেখে যাচ্ছি। আমার সর্বপ্রথম ওসিয়ত—তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, ঈমানকে আঁকড়ে ধরবে এবং ইসলামের ওপর অটল থাকবে। নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হবে, হালালকে গ্রহণ করবে, হারাম থেকে দূরে থাকবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করবে। তোমরা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও উত্তম আচরণ বজায় রাখবে; আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখবে এবং সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। মনে রেখো, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী; একদিন আমাদের প্রত্যেককেই একা আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই আমার মৃত্যুর পর আমার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হবে তোমাদের আন্তরিক দোয়া, তোমাদের নেক আমল এবং তোমাদের সুন্নাহসম্মত জীবন। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ—“হে আমার সন্তানগণ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীনকে মনোনীত করেছেন; সুতরাং তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না।”(সূরা আল-বাকারা, ২: ১৩২)।
.
আমার মৃত্যুর পর তোমাদের প্রতি বিশেষ ওসিয়ত হলো— তোমরা বিলাপ, মাতম, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং জাহেলিয়াতের কোনো প্রথায় লিপ্ত হবে না। আমার সতর ও পর্দার বিধান যথাযথভাবে রক্ষা করবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে আমার গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করবে। আমার জানাযা ও কাফন-দাফনের প্রতিটি কার্যক্রম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পন্ন করবে; কোনো বিদআত, কুসংস্কার বা শরিয়তবিরোধী রীতিনীতি পালন করবে না। আমার জানাযা পড়ানো বা গোসল দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে [নাম]-এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে; তবে সবকিছু শরিয়তের বিধানের অধীনেই হবে। আমাকে দাফন করার পর কোনো নির্দিষ্ট দিন—তৃতীয়, সপ্তম, চল্লিশতম কিংবা অন্য কোনো দিন—নির্ধারণ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা খাবারের আয়োজন করবে না। তবে সাধারণ সদকা হিসেবে যেকোনো সময় দরিদ্র-মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে বা দান-সদকা করতে পারো। আমার রেখে যাওয়া সম্পদ সম্পর্কে প্রথমে শরিয়তসম্মত প্রয়োজনীয় কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহ করবে; এরপর আমার ওপর থাকা ঋণ, কর্জ, মানুষের প্রাপ্য অধিকার, আমানত ও অন্যান্য দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিশোধ করবে। এরপর আমার কোনো বৈধ ওসিয়ত থাকলে তা বাস্তবায়ন করবে—তবে তা এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না এবং কোনো শরিয়তসম্মত ওয়ারিশের জন্য হবে না। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত মিরাসের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক হকদার ওয়ারিশের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে বণ্টন করবে।
.
হে আমার প্রিয়জন! আমার কোনো ভুল-ত্রুটি, অবহেলা বা কষ্টদায়ক আচরণ তোমাদের হৃদয়ে থেকে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করো। আমার পক্ষ থেকে কোনো মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা যথাসম্ভব আদায় করে দিও। তোমরা স্বেচ্ছায় আমার পক্ষ থেকে সদকা করতে পারো এবং কোনো নেক আমল করে আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করতে পারো। আমার এই ওসিয়তনামার বৈধ নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন করবে; অন্যায়ভাবে কোনো বৈধ ওসিয়ত গোপন, নষ্ট বা পরিবর্তন করবে না। তবে এই ওসিয়তনামার কোনো অংশ যদি শরিয়তের বিধানের পরিপন্থী হয়, তা কার্যকর হবে না; বরং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর বিধানই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَمَنۢ بَدَّلَهُۥ بَعْدَ مَا سَمِعَهُۥ فَإِنَّمَآ إِثْمُهُۥ عَلَى ٱلَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُۥ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ—“অতঃপর যে ব্যক্তি তা শোনার পর পরিবর্তন করে, তার গুনাহ তাদের ওপরই বর্তাবে যারা তা পরিবর্তন করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, ২: ১৮১)।
.
ইতি, ওসিয়তকারীর নাম——————————
সাক্ষী (১)———— নাম: ————পিতা: —————-
সাক্ষী (২)————-নাম: ————পিতা: ————— তারিখঃ—————(স্বাক্ষর) ——————————
পরিশেষে, কবি আবুল ‘আতাহিয়াহ (মৃত: ২১৩ হি.) বলেন, নিশ্চয়ই শেষ বিচারের দিন বড়ই কঠিন দিন, সেদিন যালেমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’। ‘অতএব হে বিজয়ী! তুমি কবরে যাওয়ার পূর্বে এবং পুলসিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য আসার পূর্বে পাথেয় সঞ্চয় কর’। হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে অটুট রাখুন, আমাদের জীবনকে নেক আমলে পরিপূর্ণ করুন, আমাদের অন্তিম সময়কে ঈমান ও তাওহীদের ওপর করুন এবং আমাদের সবাইকে আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের অধিকারী করুন- আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

দুলাভাই বা ভগ্নিপতির সঙ্গে সম্পর্ক কথাবার্তা ও পর্দা-সংক্রান্ত জরুরি বিধিবিধান

 প্রশ্ন: একজন নারীর বোনের স্বামী (দুলাভাই) তার মাহরাম নন। এ অবস্থায়━

১. বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া একজন নারী কি তার বোনের স্বামীর সাথে মুখ খোলা রেখে সামনাসামনি কথা বলতে পারবেন? এ বিষয়ে পর্দা ও কথাবার্তার শরয়ি বিধান কী?
২. প্রয়োজন ছাড়া তাঁর সাথে অডিও বা ভিডিও কলে কথা বলা এবং ভিডিও কলে পরস্পরকে দেখার হুকুম কী?
৩. ওই নারী যদি তাঁর বোনের স্বামীর সাথে কথা বলতে না চান তাহলে তাঁর বোন, মা বা পরিবারের অন্য কেউ কি তাঁকে চাপ প্রয়োগ বা মানসিক পীড়নের মাধ্যমে কথা বলতে বাধ্য করতে পারে?
কুরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যসহ বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিলে উপকৃত হব।
🔸উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে দুলাভাই বা বোনের স্বামী একজন পরপুরুষ (গায়রে মাহরাম)। তাই তাঁর সাথেও সাধারণ পরপুরুষের মতোই পূর্ণাঙ্গ পর্দা রক্ষা করা ফরজ। সুতরাং দুলাভাইয়ের সাথে অনলাইন কিংবা অফলাইন—সর্বাবস্থায় অহেতুক আড্ডাবাজি ও খোশগল্পে লিপ্ত হওয়া, হাসি-ঠাট্টা করা বা নির্জনে একাকী সময় কাটানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ। একইভাবে পরস্পরকে স্পর্শ করা, বেপর্দা হয়ে সামনে আসা কিংবা তার সাথে ভ্রমণ করার মতো বিষয়গুলো সম্পূর্ণ বর্জনীয়। ইসলামে এসব ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোর কোনও অবকাশ নেই। নিম্নে সংক্ষেপে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করা হলো:
❑ ১. বোনের স্বামী বা দুলাভাইয়ের সামনাসামনি বসা এবং কথা বলার বিধান:
কোনও অবস্থাতেই বোনের স্বামী তথা ভগ্নিপতি বা দুলাভাইয়ের সামনে বেপর্দা অবস্থায় আসা অথবা মুখমণ্ডল খোলা রেখে সামনাসামনি বসা, খোশগল্প করা, হাসি-দুষ্টুমি, আড্ডাবাজি ইত্যাদি জায়েজ নয়। তবে নিতান্ত জরুরি প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ণ পর্দা বজায় রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা, হাসি-দুষ্টুমি ও ফিতনা সৃষ্টি করে এমন সব কিছু এড়িয়ে সংক্ষেপে কেবল প্রয়োজনীয় কথা বলতে হবে। কথা বলার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠস্বর বা বাচন ভঙ্গি কোমল ও প্রলুব্ধকর না করা হয়।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
“হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চাদর নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এটিই উপযুক্ত পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে (পর্দানশীন ও শালীন নারী হিসেবে) চেনা যায় এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া না হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা আল-আহযাব: ৫৯] উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যখন আয়াতে হিজাব— (يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ) ‘তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের ওপর নামিয়ে দেয়’— অবতীর্ণ হলো তখন আনসার নারীরা এমন অবস্থায় বের হলেন, যেন তাঁদের শান্ত-স্থির ভঙ্গিমার কারণে মাথায় কাক বসে আছে এবং তাঁদের পরনে ছিল কালো রঙের চাদর।” [সুনানে আবু দাউদ, ৪১০১, সহিহ] [তাফসিরে ইবনে কাসির] ইমাম ইবনে জারির আত তাবারি এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (র.) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা এবং আয়েশা (রা.) থেকে অনুরূপ বর্ণনা বিভিন্ন সনদে তাঁদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা আয়াতে হিজাব অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাহাবি-নারীদের (আনসার ও মুহাজির) আমল ও পর্দার ধরণকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যাহোক, উপরোক্ত আয়াতে নারীদের বহিরাগত ও নন মাহরাম পুরুষদের সামনে পর্দাবৃত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর বোনের স্বামী বা দুলাভাইও যেহেতু গায়রে মাহরাম সেহেতু তাঁর সামনেও এ বিধান প্রযোজ্য।
✪ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يٰنِسَآءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهٖ مَرَضٌ وَّقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا
“হে নবি-পত্নীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় কণ্ঠে কোমলতা এনো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে। বরং ন্যায়সঙ্গত ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো। [সুরা আল-আহজাব: ৩২]
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেবর-দুলাভাইয়ের মতো নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারেও বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوُ الْمَوْتُ
“তোমরা পরনারীদের কাছে অবাধ যাতায়াত থেকে সতর্ক থাকো।” তখন এক আনসারি সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! দেবর-দুলাভাই সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?” তিনি বললেন, “দেবর তো মৃত্যুস্বরূপ” (অর্থাৎ তাদের সাথে নিয়ন্ত্রণহীন মেলামেশা ধ্বংসাত্মক—বাইরের মানুষ থেকেও বেশি)। [সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২]
✪ মাহরাম নয় এমন পুরুষের সাথে কোনও নারীর জন্য নির্জনে একাকী অবস্থান করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
“কোনও পুরুষ যেন পরনারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে; কারণ তখন তাদের তৃতীয় জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয়। [জামে তিরমিজি: ১১৭১]
🔸সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (আল-লাজনাতুদ দায়িমাহ)-এর ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
زَوْجُ الْأُخْتِ لَيْسَ مِنْ مَحَارِمِ الْمَرْأَةِ، وَيُعْتَبَرُ أَجْنَبِيًّا عَنْهَا، لَا يَحِلُّ لَهَا أَنْ تَكْشِفَ وَجْهَهَا لَهُ، وَلَا تُصَافِحَهُ، وَلَا تَخْلُوَ بِهِ، وَلَا أَنْ تُسَافِرَ مَعَهُ، شَأْنُهُ شَأْنُ الرِّجَالِ الْأَجَانِبِ، لَكِنْ إِذَا جَلَسَتْ مَعَهُ مَعَ وُجُودِ مَحْرَمٍ مِنْ مَحَارِمِهَا وَمَعَ احْتِجَابِهَا وَتَسَتُّرِهَا وَتَحَفُّظِهَا فَلَا بَأْسَ
“বোনের স্বামী নারীর মাহরামদের অন্তর্ভুক্ত নন, বরং তিনি তার জন্য গায়রে মাহরাম হিসেবে গণ্য। তার সামনে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করা, তার সাথে মুসাফাহা (হাত মেলানো) করা, তার সাথে নির্জনে অবস্থান করা কিংবা তার সাথে সফর করা তার জন্য বৈধ নয়—অন্যান্য গায়রে মাহরাম পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন বিধান, তার ক্ষেত্রেও তেমনি। তবে যদি তার কোনও মাহরাম উপস্থিত থাকা অবস্থায়, পূর্ণ পর্দা, আবরণ ও সতর্কতা বজায় রেখে সে তার সাথে বসে, তাহলে তাতে কোনও অসুবিধা নেই।” [ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমাহ: ১৭/৪২০] এই ফতওয়া থেকে স্পষ্ট হয়, দুলাভাই বা ভগ্নিপতি শরিয়তের দৃষ্টিতে নন মাহরাম পুরুষ। সুতরাং তাঁর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো গায়রে মাহরাম পুরুষের মতোই বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে কেবল মাহরামের উপস্থিতিতে ও পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার অনুমতি রয়েছে।
❑ ২. অডিও-ভিডিও কলে কথা বলা ও পারস্পরিক দেখাদেখি করা:
বাস্তব জীবনে যা নিষিদ্ধ, ডিজিটাল বা অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কোনও দ্বীনি বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বোনের স্বামী বা দুলাভাইয়ের সাথে অডিও কলের মাধ্যমে খোশগল্পে লিপ্ত হওয়া কিংবা ভিডিও কলে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত রেখে পরস্পরকে দেখাদেখি করা ও আড্ডা দেওয়া নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। কারণ এতে শয়তান ও কুপ্রবৃত্তি উভয়কে ফিতনার দিকে টেনে নেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
✪ তাই তো আল্লাহ তাআলা পরপুরুষ ও পরনারী উভয়কেই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়ে বলেন:
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ؕ ذٰلِكَ اَزْكٰى لَهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ
“মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিক পবিত্র পন্থা। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত। [সুরা নুর: ৩০]
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যায় দৃষ্টি ও শ্রবণ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন:
فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاِسْتِمَاعُ
“চোখের জিনা হলো (অন্যায় ও হারাম) দৃষ্টিপাত করা আর কানের জিনা হলো (অন্যায় ও হারাম কথাবার্তা) শ্রবণ করা। [সহিহ মুসলিম: ২৬৫৭]
❑ ৩. কথা বলতে চাপ প্রয়োগ করলে:
কোনও ইমানদার নারী যখন আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে পর্দা রক্ষা করা ফরজ এমন পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও যোগাযোগ বন্ধ করতে চান তখন তাঁর মা-বাবা, পরিবারের কোনও সদস্য কিংবা আত্মীয়স্বজনের কারো অধিকার নেই তাঁকে তা করতে বাধ্য করার বা চাপ প্রয়োগ করার। শরিয়তবিরোধী হারাম কাজে কাউকে চাপ দেওয়া তো দূরের কথা, এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাও ইসলামে নিষিদ্ধ।
✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى ۖ وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করো। কিন্তু পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। [সুরা মায়েদা: ২] আল্লাহর নির্দেশের বাইরে গিয়ে অন্য কারও অন্যায় আদেশ বা নির্দেশ মেনে নেওয়ার কোনও সুযোগ ইসলামে নেই। পরিবারের কেউ হলেও যদি আপনাকে আল্লাহর বিধান বিরোধী কাজ করতে বাধ্য করে, যোগাযোগ বা মেলামেশার সীমা লঙ্ঘন করতে চাপ দেয় কিংবা হারাম কোনও কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্য মানসিক নিপীড়ন চালায়—তবে সে স্পষ্টত জুলুমকারী হিসেবে গণ্য হবে। পরিবার কিংবা আপনজনের আনুগত্য কেবল সৎ ও হালাল কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দ্বীন পরিপন্থী কাজে জোরজবরদস্তি করা এক ধরনের চরম অন্যায়, আর আল্লাহর দরবারে জুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। বান্দাকে খুশি করতে গিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে অসন্তুষ্ট করার পথ বেছে নেওয়া কখনোই একজন মুমিনের কাজ হতে পারে না।
✪ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“আল্লাহর অবাধ্যতা বা পাপের কাজে কারো আনুগত্য করা যাবে না। আনুগত্য কেবল ভালো ও ন্যায়সংগত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।” [সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০]
পরিবারের যতই চাপ থাকুক না কেন, কোনও অবস্থাতেই হারাম বা গুনাহের কাজে পা বাড়ানো যাবে না। শত প্রতিকূলতার মাঝেও অন্তরে আল্লাহর ভয় লালন করে নিজের ইমান ও আখলাকের উপর পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থাকতে হবে। একই সাথে, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে যে স্বজনেরা ভুল পথে চালিত করছেন তাদের ওপর রাগান্বিত না হয়ে বরং গভীর ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া চাই। অসীম ভদ্রতা, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তাদের সামনে ইসলামের আলো তুলে ধরতে হবে—বোঝাতে হবে কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম। হেদায়েত ও সঠিক পথ দেখানোর মূল মালিক আল্লাহ। তিনি সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ একনিষ্ঠভাবে মেনে চলার তাওফিক দান করুন। সব ধরনের নাফরমানি, পাপাচার ও ফিতনা থেকে তিনি আমাদের আপন রহমতে হেফাজত করুন এবং দ্বীনের ওপর মজবুত রাখুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

স্বামী ধনী হোক বা গরিব পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের উত্তরাধিকার তার শরিয়তসম্মত অধিকার

 প্রশ্ন: স্বামী সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও কোনো মেয়ে যদি পিতা-মাতার সম্পত্তিতে তার প্রাপ্য অংশ না ছাড়ে এবং বাবা-মায়ের অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের হক দাবি করে তাহলে এটি কি নাজায়েজ হবে? এতে সে কি গুনাহগার হবে এবং বাবা-মায়ের কথা অমান্য করার কারণে আখিরাতে আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করবেন কি?

🔸উত্তর: কোনো বিবাহিত মেয়ের স্বামী যত সম্পদশালী হোক না কেন পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের যে উত্তরাধিকার বা হক রয়েছে তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই ওই মেয়ের জন্য তার প্রাপ্য অধিকার দাবি করা শরিয়তসম্মত। এতে সে মোটেও গুনাহগার হবে না। এমনকি পিতা-মাতা জীবিতাবস্থায় যদি মেয়েকে তাদের মৃত্যুর পর তার হক ছেড়ে দিতে বলেন (নাদাবি দেওয়ার নির্দেশ দেন) তবুও পিতা-মাতার এই নির্দেশ পালন করা আবশ্যক নয়। এর জন্য আল্লাহ তাআলা আখিরাতে তাকে পাকড়াও বা শাস্তি দেবেন না। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও মিরাসের অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا
“পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; তা অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত ফরজ।” [সূরা নিসা: ৭]
সুতরাং হকদার ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না ছাড়লে মা-বাবা কিংবা অন্য কেউ তাকে তা ছাড়তে বাধ্য করতে পারে না; বাবা-মা ছাড়তে নির্দেশ দিলেও তা পালন করা আবশ্যক নয়। বরং এক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করে নাদাবি নেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায় ও জুলুম।
✪ অন্যায় আদেশে পিতা-মাতার আনুগত্য করা আবশ্যক নয়:
পিতা-মাতা যদি আল্লাহর নির্ধারিত কোনো ফরজের বিরুদ্ধে আদেশ করেন তবে তা মেনে চলা জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল সৎ ও ন্যায়সংগত কাজে।” [সহিহ বুখারি: ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম: ১৮৪০]
মেয়েটি নিজের অধিকার দাবি করে কোনো গুনাহ করছে না। তাই তাকে নাদাবি দিতে বাধ্য করা পিতা-মাতা বা ভাইদের জন্য কোনোভাবেই বৈধ নয়। সুতরাং মেয়েটি নিজের শরিয়তসম্মত মিরাসি হক দাবি করার অধিকার রাখে; শরিয়তে এতে কোনো বাধা নেই। তবে হক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ বা অনুরোধের প্রেক্ষাপটে পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের সাথে সম্পর্ক অটুট রাখতে নম্রতা ও প্রজ্ঞার সাথে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা উচিত যে, এই হক আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান; এর সাথে স্বামীর আর্থিক অবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো কারণে স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে তালাক ঘটলে ভবিষ্যতে তার নিজের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। আর সে আসলে অন্যায্য কিছু দাবি করছে না—এটা মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তার পাওনা। তবে হ্যাঁ, কোনো নারী যদি চান প্রয়োজন না থাকলে তিনি তার প্রাপ্য হক পুরোটা কিংবা আংশিক তার অন্যান্য গরিব উত্তরাধিকারীদের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন। এতে তিনি সওয়াবের অধিকারী হবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কাউকে তার প্রাপ্য অংশ ছেড়ে দিতে বা নাদাবি দিতে বাধ্য করা যাবে না। কেউ এমনটি করলে সে গুনাহগার হবে। তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রাপককে তার প্রাপ্য কোনো ধরনের দ্বিধা-সংকট ছাড়া নিঃশর্তভাবে প্রদান করা। আল্লাহু আলাম।
⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯
❑ ফতওয়া: মেয়ের তার বাবার ওয়ারিশি সম্পত্তি দাবি করার অধিকার আছে, সে গরিব হোক বা ধনী হোক:
প্রশ্ন: আমি বিবাহিতা এবং আমার স্বামী গরিব। তাঁর বেতন কম যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। এমতাবস্থায় আমি কি আমার মৃত বাবার সম্পত্তি থেকে আমার ওয়ারিশি অংশ পরিবারের কাছে দাবি করতে পারি? আর আমার বাবার একটি বিল্ডিংয়ে যেভাবে অন্যান্য ওয়ারিশরা ভাড়া ছাড়াই থাকছেন, সেভাবে আমিও কি বিনা ভাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে থাকার অধিকার রাখি?
ওয়ারিশরা হলেন: আমার মা, সাত বোন এবং দুই ভাই। বিল্ডিংয়ে থাকেন আমার মা, তাঁর স্বামী, আমার ভাইয়েরা এবং চার বোন। বাকি বোনেরা বিবাহিত এবং নিজেদের বাড়িতে থাকেন। আমি আমার স্বামীর সাথে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু স্বামীর বেতন কম হওয়ায় ভাড়া দিতে কষ্ট হয়। আমাকে জানাবেন কী করণীয়?
🔸 উত্তর: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের (রা.) ওপর। প্রশ্নকারী বোন, আপনার পিতার সম্পত্তি থেকে আপনার সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত অংশ দাবি করার অধিকার আপনার রয়েছে—আপনি গরিব হোন বা ধনী হোন—এতে কোনো পার্থক্য নেই। এটি পিতামাতার অবাধ্যতা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বলে গণ্য হবে না। আপনার পরিবারের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশকে তার শরিয়তসম্মত অংশ বুঝিয়ে দেওয়া। যে ওয়ারিশ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া কোনো ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তাঁর উচিত বাকি ওয়ারিশদের ভাড়া পরিশোধ করা—যদি না তারা স্বেচ্ছায় তা মাফ করে দেন। শুধু তাই নয়, অতীতের বছরগুলোর জন্যও আপনি আপনার প্রাপ্য ভাড়ার অংশ দাবি করতে পারেন। কারণ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া প্রতিটি ফ্ল্যাট সমস্ত ওয়ারিশের যৌথ সম্পত্তি বলে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যেকে তার শরিয়তসম্মত অংশ অনুযায়ী তাতে অংশীদার। কোনো একজন ওয়ারিশ সেখানে বসবাস করলেই বাকি ওয়ারিশদের অধিকার বাতিল হয়ে যায় না—তারা ভাড়া দাবি করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

যে শর্ত দিয়ে টাকা ধার দিলে সুদ হয়ে যায়

 প্রশ্ন: আমার স্বামীর বোন তাঁকে ৫ লাখ টাকা ধার দিতে চান, যা দিয়ে আমাদের বাড়ির (আমি ও আমার স্বামীর মালিকানাধীন, বোনের কোনো অংশ নেই) বাকি নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। শর্ত হলো, বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলে ভাড়ার অর্ধেক অংশ প্রতি মাসে বোন পাবেন এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে দেওয়া ৫ লাখ টাকাও তাঁকে সম্পূর্ণ ফেরত দিতে হবে। আমরা আর্থিক সমস্যার কারণে শুধু ধার চেয়েছিলাম। কিন্তু বোন এই শর্তে টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। এটি কি সুদ, নাকি বৈধ ব্যবসায়িক বিনিয়োগ? সুদ হলে কারণসহ জানাবেন।

🔸উত্তর: এই লেনদেন জায়েজ নয়। এটা সুদি কারবার। কারণ এখানে মূল লেনদেনটি একটি কর্জ বা ঋণ। আর ঋণের নিয়ম হলো, যত টাকা নেওয়া হয়েছে ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হয়; কোনো বাড়তি সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু এখানে বোন কর্জ দেওয়ার শর্ত হিসেবে ভাড়ার একটা অংশও নিচ্ছেন আর সেইসঙ্গে নির্দিষ্ট সময় শেষে তাঁর সম্পূর্ণ মূলধনও ফেরত পাচ্ছেন। অর্থাৎ তিনি ঋণ দিয়ে নিশ্চিতভাবে বাড়তি একটা লাভ পাচ্ছেন।
আর ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا
“যে কর্জ থেকে ঋণদাতা অতিরিক্ত সুবিধা নেয় তা-ই সুদ।” তাই এই লেনদেনকে “ভাড়ার ভাগ” নাম দিলেও মূল বাস্তবতায় এটি সুদি লেনদেন, যা হারাম।
➧ কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এটা হয়তো ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের (মুশারাকা) মতো কিছু অথবা পুঁজি-শ্রমের অংশীদারিত্বের (মুদারাবা) মতো কিছু। কিন্তু আসলে তা নয়।
কেননা—
◈ বৈধ ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব (মুশারাকা) হতে হলে, যিনি টাকা দিচ্ছেন তাঁর সেই সম্পদে প্রকৃত মালিকানা থাকতে হয় এবং লাভ-ক্ষতি উভয়ই তাঁকে ভাগাভাগি করতে হয়। কিন্তু এই বাড়িতে বোনের কোনো মালিকানা নেই। আর ক্ষতি হলেও তিনি তার ভাগী হচ্ছেন না; শুধু লাভের অংশ নিচ্ছেন।
◈ আবার পুঁজি-শ্রমের ভিত্তিতে ব্যবসা (মুদারাবা) হতে হলে, পুঁজিদাতার মূলধন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে না; কোনো কারণে ক্ষতি হলে আর্থিক ক্ষতি সম্পূর্ণটা তাঁকেই বহন করতে হয়। কিন্তু এখানে বোনকে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ মূলধন ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে তাঁর পুঁজি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। সুতরাং এটি বৈধ লেনদেন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই এমন লেনদেন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে করণীয় হলো, বোন যদি চান, তাহলে সহায়তার উদ্দেশ্যে কোনো ফায়দা গ্রহণের শর্ত আরোপ ছাড়াই কর্জ দেবেন। এক্ষেত্রে তিনি শুধু প্রদত্ত মূলধন ফেরত নেবেন। অতিরিক্ত কোনো মুনাফা বা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। অথবা লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে অর্থ বিনিয়োগ করবেন (মুদারাবা)। অন্যথায় এভাবে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায: ফায়দা দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়ার হুকুম
প্রশ্ন: এক যুবক ঋণগ্রস্ত। সে একটি ব্যাংকে গিয়ে এই শর্তে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নেয় যে, এক বছর পর বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেবে। এটা কি সুদ? এতে কি সে গুনাহগার হবে?
উত্তর: “হ্যাঁ, এটি নিশ্চিতভাবেই সুদ। ব্যাংক থেকে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নিয়ে বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেওয়ার শর্ত করা স্পষ্ট সুদের অন্তর্ভুক্ত। এতে আলেমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। চাই এই লেনদেন ব্যাংকের সাথে হোক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে—সব ক্ষেত্রে তা সমানভাবে হারাম। ইসলামে বাড়তি কিছু ফেরত দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়া বা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তা বাড়তি পরিমাণের পরিমাণ মাত্র এক দিরহাম হলেও। তবে কেউ যদি কোনো শর্ত ছাড়া ঋণ নেয় এবং পরিশোধের সময় স্বেচ্ছায় কোনো চাপ বা পূর্বপ্রত্যাশা ছাড়া কিছু বেশি ফেরত দেয় তবে তা জায়েজ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً»
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উদার।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০১]
নবি করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও যখন কারো কাছ থেকে ঋণ নিতেন পরিশোধের সময় তার চেয়ে উত্তম ও বেশি কিছু ফেরত দিতেন।”
প্রশ্ন: কিন্তু যদি নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক নির্ধারণ না করে আগে থেকেই অলিখিত কোনো চুক্তি বা বাড়তি দেওয়ার ইঙ্গিত থাকে তবে তার বিধান কী?
উত্তর: “এমন অলিখিত বোঝাপড়া বা মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যাশাও জায়েজ নয়। মুখে বা কাগজে নির্দিষ্ট করে লেখা না থাকলেও যদি বাড়তি কিছু দেওয়ার পূর্বশর্ত বা ইঙ্গিত থেকে থাকে তবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে যত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হবে।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।

Translate