Tuesday, August 4, 2026

পুরুষ ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগী এবং মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরুষ ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগী এবং মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা কি জায়েজ? চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীর সতরের অংশ দেখা বা স্পর্শ করার বিধান কী? কোন পরিস্থিতিতে তা বৈধ এবং এর শরয়ি শর্তাবলি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো—পুরুষ ডাক্তার পুরুষ রোগীর এবং মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করবেন। অতএব, কোনো বাস্তব প্রয়োজন ও গ্রহনযোগ্য শরয়ি ওজর ছাড়া বিপরীত লিঙ্গের রোগীর চিকিৎসা করা বৈধ নয়। তবে চিকিৎসার একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে এবং সংশ্লিষ্ট লিঙ্গের উপযুক্ত চিকিৎসক পাওয়া না গেলে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসক রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া গেলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার দ্বারা মহিলা রোগীর চিকিৎসা করানো হবে; তাদের কেউ না পাওয়া গেলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার এবং একান্ত প্রয়োজন হলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার চিকিৎসা করতে পারবেন। তবে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকুই দেখবেন বা স্পর্শ করবেন; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা বা দেখা বৈধ হবে না এবং যথাসম্ভব দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে। একইসঙ্গে নারী রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তারের সঙ্গে রোগিনীর স্বামী, মাহরাম অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকা আবশ্যক, যাতে শরীয়তবিরোধী নির্জনতা সৃষ্টি না হয়। সুতরাং চিকিৎসার প্রকৃত প্রয়োজন, উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনের সীমা রক্ষা এবং খালওয়াত থেকে বেঁচে থাকা—এসব শরয়ি শর্ত পূরণ সাপেক্ষেই বিপরীত লিঙ্গের ডাক্তার দ্বারা রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা বৈধ হবে।
.
এ বিষয়ে ‘ইসলামী ফিকাহ একাডেমি’ থেকে একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে রয়েছে:
” الأصل أنه إذا توافرت طبيبة متخصصة يجب أن تقوم بالكشف على المريضة ، وإذا لم يتوافر ذلك فتقوم بذلك طبيبة غير مسلمة ثقة ، فإن لم يتوافر ذلك يقوم به طبيب مسلم ، وإن لم يتوافر طبيب مسلم يمكن أن يقوم مقامه طبيب غير مسلم ، على أن يطّلع من جسم المرأة على قدر الحاجة في تشخيص المرض ومداواته وألا يزيد عن ذلك وأن يغض الطرف قدر استطاعته ، وأن تتم معالجة الطبيب للمرأة هذه بحضور محرم أو زوج أو امرأة ثقة خشية الخلوة
“শরিয়তের মূল বিধান হচ্ছে- বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায় তাহলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি অমুসলিম মহিলা ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার সে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শর্ত হল,পুরুষ ডাক্তার রোগিনীর শরীরের ততটুকু দেখবেন যতটুকু দেখা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার স্বার্থে প্রয়োজন; এর বেশি দেখবে না এবং সাধ্যমত দৃষ্টি অবনত রাখবে। পুরুষ ডাক্তারকে রোগিনীর চিকিৎসা করতে হবে রোগিনীর মাহরামের কিংবা স্বামী কিংবা কোন বিশ্বস্ত নারীর উপস্থিতিতে; যাতে করে নিষিদ্ধ নির্জনবাস না ঘটে।”[একাডেমীর জার্নাল থেকে সংকলিত (৮/১/৪৯)]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الواجب أن تكون الطبيبات مختصات للنساء ، والأطباء مختصين للرجال إلا عند الضرورة القصوى إذا وجد مرض في الرجال ليس له طبيب رجل ، فهذا لا بأس به ، والله يقول : ( وقد فصل لكم ما حرم عليكم إلا ما اضطررتم إليه ) “ওয়াজিব হলো নারীদের চিকিৎসার জন্য নারী চিকিৎসক এবং পুরুষদের চিকিৎসার জন্য পুরুষ চিকিৎসক নির্দিষ্ট থাকা।তবে চরম জরুরতের ক্ষেত্রে,যদি কোনো পুরুষের এমন কোনো রোগ দেখা দেয় যার জন্য কোনো পুরুষ চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তাহলে নারী চিকিৎসক চিকিৎসা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:অথচ যা তোমাদের জন্য তিনি হারাম করেছেন তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের কাছে বিবৃত করেছেন,তবে তোমরা নিরুপায় হলে তা স্বতন্ত্র।”(সূরা আন‘আম: ১১৯; ফাতাওয়া আজিলাহ লিমানসুবিস সিহ্হাহ: ২৯)
.
◾কোন কোন পরিস্থিতিতে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য বিপরীত লিঙ্গের রোগীকে চিকিৎসা করা শরিয়তসম্মত?
.
আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি যে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—সম্ভব হলে নারী রোগীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসকের মাধ্যমে করানোই অধিক উত্তম ও অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করার দরকার হতে পারে। ফলে একই লিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া গেলে তার মাধ্যমেই চিকিৎসা গ্রহণ করা অধিক নিরাপদ এবং শরিয়তের পর্দা ও শালীনতার বিধান পালনের জন্যও অধিক উপযোগী।তবে বাস্তবতা ও চিকিৎসাগত প্রয়োজনের কারণে সব সময় একই লিঙ্গের দক্ষ চিকিৎসক পাওয়া সম্ভব হয় না। কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ শাখায় বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকই যদি অধিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ হন, একই লিঙ্গের চিকিৎসক না থাকেন, অথবা থাকলেও তার পর্যাপ্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকে—তাহলে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা বৈধ।তবে এই বৈধতা প্রয়োজনের পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই শরিয়তের পর্দা, শালীনতা, নির্জনতা এবং প্রয়োজনের সীমা-সংক্রান্ত বিধান যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি:
.
(১).চিকিৎসক ও রোগী নির্জনে অবস্থান করবে না: পুরুষ চিকিৎসক কোনো নারী রোগীর সঙ্গে এবং নারী চিকিৎসক কোনো পুরুষ রোগীর সঙ্গে এমন নির্জন স্থানে একাকী অবস্থান করবেন না, যেখানে তাদের সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নেই। সম্ভব হলে রোগীর স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, মাহরাম অথবা অন্য কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা উচিত। একইভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের এমন কোনো স্টাফের উপস্থিতিতেও নির্জনতা দূর হয়ে যায়, যার উপস্থিতিতে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। কারণ, গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান করা শরিয়তসম্মত নয় এবং এ বিষয়ে ফকীহদের সর্বসম্মত ইজমা রয়েছে। উভয়ে বৃদ্ধ হোক কিংবা একজন বৃদ্ধ ও অন্যজন তরুণ হোক—এ বিধানের কোনো পরিবর্তন হয় না। আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে: «ولفظ الرجل في الحديث يتناول الشيخ والشاب، كما أن لفظ المرأة يتناول الشابة والمتجالة (العجوز)»—“হাদীসে ‘পুরুষ’ শব্দটি যেমন যুবক ও বৃদ্ধ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনি ‘নারী’ শব্দটিও যুবতী ও বৃদ্ধা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।” (আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, ২৯/২৯৫)। এ বিষয়ে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثالثهما الشَّيْطَان»—“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।” (তিরমিযী, হা/১১৭১)। অপরদিকে ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন: «لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ»—“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে এবং কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।” (সহীহ বুখারী, হা/৩০০৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১)। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে চিকিৎসক ও রোগীর একান্ত নির্জনতা এড়িয়ে চলা আবশ্যক। পাশাপাশি চিকিৎসককে বিশ্বস্ত, সচ্চরিত্র ও দ্বীনদার হওয়া উচিত; তার চরিত্র ও আমানতদারির ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা বদনাম থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে মানুষের বাহ্যিক অবস্থাকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়াই যথেষ্ট।
.
ইমাম ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَأَمَّا إِذَا خَلَا الْأَجْنَبِيّ بِالْأَجْنَبِيَّةِ مِنْ غَيْر ثَالِث مَعَهُمَا، فَهُوَ حَرَام بِاتِّفَاقِ الْعُلَمَاء , وَكَذَا لَوْ كَانَ مَعَهُمَا مَنْ لَا يُسْتَحَى مِنْهُ لِصِغَرِهِ كَابْنِ سَنَتَيْنِ وَثَلَاث وَنَحْو ذَلِكَ , فَإِنَّ وُجُوده كَالْعَدَمِ , وَكَذَا لَوْ اِجْتَمَعَ رِجَال بِامْرَأَةٍ أَجْنَبِيَّة فَهُوَ حَرَام , بِخِلَافِ مَا لَوْ اِجْتَمَعَ رَجُل بِنِسْوَةٍ أَجَانِب , فَإِنَّ الصَّحِيح جَوَازه “যখন কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ছাড়া নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তা সকল আলেমের ঐকমত্য অনুযায়ী হারাম। অনুরূপভাবে, যদি তাদের সঙ্গে এমন ছোট শিশু থাকে, যার উপস্থিতিকে লজ্জার কারণ মনে করা হয় না—যেমন দুই বা তিন বছরের শিশু তাহলেও তার উপস্থিতি না থাকারই শামিল। আবার, একাধিক পুরুষ যদি একজন গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকে, তাও হারাম। তবে একজন পুরুষ যদি একাধিক গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে থাকে, তাহলে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তা বৈধ।”(নববী শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৫৩)
.
(২).চিকিৎসার প্রয়োজন যতটুকু,ততটুকুই দেখা যাবে এর অতিরিক্ত নয়:রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সেই অংশটুকুই দেখা যাবে। এর অতিরিক্ত কোনো অংশ দেখা কোনো ভাবেই বৈধ নয়। চিকিৎসকের উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং সর্বদা মনে রাখা—আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু অবগত আছেন এবং প্রত্যেক কাজের হিসাব গ্রহণ করবেন।মহান আল্লাহ বলেছেন:إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা:১) অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾“অতএব, তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।”—সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধান পালনে সামর্থ্য ও প্রয়োজনের সীমা বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু ততটুকুই দেখা হবে; অপ্রয়োজনীয় অংশ দেখা যাবে না।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ، وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ، وَلَا تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ ‘কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের এবং কোনো নারী যেন অপর নারীর ‘আওরাত’ না দেখে। আর কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে। অনুরূপ কোনো নারীও যেন অপর নারীর সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে”(সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৮)
.
হাদিসটির আলোকে ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فَفِيهِ تَحْرِيمٌ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَهَذَا لَا خِلَافَ فِيهِ وَكَذَلِكَ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ حَرَامٌ بِالْإِجْمَاعِ وَنَبَّهَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِنَظَرِ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ عَلَى نَظَرِهِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَذَلِكَ بِالتَّحْرِيمِ أَوْلَى ‘এ হাদীছে একজন পুরুষের অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে এবং একজন মহিলার অন্য মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো হারাম হওয়ার প্রমাণ আছে। আর এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। একইভাবে, কোনো পুরুষের জন্য কোনো মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে এবং কোনো মহিলার জন্য কোনো পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো ইজমার ভিত্তিতে হারাম। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন পুরুষকে অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে একজন পুরুষের জন্য একজন মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সাবধান করেছেন। বরং এটা আরো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হারাম”(আল-মিনহাজ শারহু সহীহি মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ,৪/৩০) এছাড়াও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম এর হাদিসে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:«فَزِنَا العَيْنِ النَّظَر»“চোখের যিনা দৃষ্টিপাত।”(সহিহ বুখারি হা/৬২৪৩; ও সহিহ মুসলিম হা/২৬৫৭) ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “দৃষ্টি ও কথাকে যিনা বলা হয়েছে যেহেতু এগুলো প্রকৃত যিনার আহ্বায়ক। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যৌনাঙ্গ সেটাকে বাস্তবায়ন করে অথবা করে না।” ফাতহুল বারি হতে সংকলিত। ইবনুল আরাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكَمَا لَا يَحِلُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إلَى الْمَرْأَةِ فَكَذَلِكَ لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَنْظُرَ إلَى الرَّجُلِ، فَإِنَّ عَلَاقَتَهُ بِهَا كَعَلَاقَتِهَا بِهِ، وَقَصْدُهُ مِنْهَا كَقَصْدِهَا مِنْهُ. ‘একজন পুরুষের জন্য যেমন একজন নারীর দিকে তাকানো বৈধ নয়, তেমনি একজন নারীর জন্যও একজন পুরুষের দিকে তাকানো বৈধ নয়। কারণ নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক যেমন, পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্কও তেমন। নারীর কাছ থেকে পুরুষের চাওয়াপাওয়া যা, পুরুষের কাছ থেকে নারীর চাওয়াপাওয়াও তা”।(ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, ৩/৩৮০)
.
(৩).চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া শরীর স্পর্শ করা যাবে না:চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ স্পর্শ করা অপরিহার্য, কেবল সেই অংশটুকুই প্রয়োজনের সীমায় স্পর্শ করা যাবে। অপ্রয়োজনীয় কোনো স্পর্শ বৈধ নয়। আর যদি হাতমোজা, কাপড় বা অন্য কোনো উপযুক্ত আবরণ ব্যবহার করে পরীক্ষা বা চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সরাসরি স্পর্শের পরিবর্তে আবরণ ব্যবহার করাই অপরিহার্য কর্তব্য।মা’ক্বিল বিন য়্যাসার বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”لأن يطعن في رأس رجل بمخيط من حديد خير من أن يمس امرأة لا تحل له “কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সূচ দ্বারা খোঁচা মারা ভাল, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ তাকে স্পর্শ করা ভাল নয়”(সিলসিলা সহীহাহ হা/২২৬; সহীহুত তারগীব হা/১৯১০)।হাদিসটির আলোকে ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:في الحديث : وعيد شديد لمن مس امرأة لا تحل له “হাদিসে ওই ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, যে এমন নারীকে স্পর্শ করে যে তার জন্য হালাল নয়।”(সিলসিলাহ সহীহা (১/৪৪৮) থেকে সমাপ্ত।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:ليس المراد بالخلوة المحرمة شرعاً انفراد الرجل بامرأة أجنبية منه في بيت بعيداً عن أعين الناس فقط ، بل تشمل انفراده بها في مكان تناجيه ويناجيها ، وتدور بينهما الأحاديث ، ولو على مرأى من الناس دون سماع حديثهما ، سواء كان ذلك في فضاء أم سيارة أو سطح بيت أو نحو ذلك ؛ لأن الخلوة منعت لكونها بريد الزنا وذريعة إليه [ أي : مقدمة الزنا ووسيلة إليه ] ، فكل ما وجد فيه هذا المعنى فهو في حكم الخلوة الحسية بعيدا عن أعين الناس”শরিয়তে নিষিদ্ধ খালওয়াত বলতে শুধু এমন নয় যে কোনো পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী মানুষের দৃষ্টির বাইরে কোনো ঘরে একান্তে থাকবে। বরং এমন যেকোনো অবস্থাও খালওয়াতের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তারা একান্তে কথা বলতে পারে, পরস্পরের সঙ্গে গোপনে আলাপ করতে পারে যদিও মানুষ তাদের দেখতে পায়, কিন্তু তাদের কথা শুনতে না পায়। তা খোলা মাঠে হোক, গাড়িতে, ছাদে বা অন্য যেকোনো স্থানে। কারণ খালওয়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেহেতু এটি ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম ও ভূমিকা। তাই যেখানে এই অর্থ বিদ্যমান, সেখানেই তা শরিয়তের দৃষ্টিতে খালওয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
(৪).কথাবার্তা চিকিৎসার প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে:চিকিৎসক ও বিপরীত লিঙ্গের রোগীর মধ্যে কথাবার্তা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা, হাসি-ঠাট্টা, ব্যক্তিগত আলোচনা কিংবা এমন কোনো কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে অথবা ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।মহান আল্লাহ বলেন,یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর তবে পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২) মহান আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন (যা থেকে হেফাযতের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নারী পুরুষের জন্য ফেতনার কারণ না হয়ে পড়ে।) অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা রেখেছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পর-পুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়। (অত্র আয়াতের তাফসির) তাছাড়া নারীরা বাসায় সালাত আদায়ের সময় আশেপাশে গায়ের মাহরাম পুরুষ থাকলে উচ্চস্বরে পড়া সালাতের কির’আত নীরবে পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। (নববী আল-মাজমূ; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা:;১০০; বিন বায,;ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ৯/৩৫)।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, إنْ كَانَ صَوْتَ امْرَأَةٍ ، فَإِنْ كَانَ السَّامِعُ يَتَلَذَّذُ بِهِ ، أَوْ خَافَ عَلَى نَفْسِهِ فِتْنَةً حَرُمَ عَلَيْهِ اسْتِمَاعُهُ ، وَإِلاَّ فَلاَ يَحْرُمُ ، وَيُحْمَل اسْتِمَاعُ الصَّحَابَةِ رِضْوَانُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ أَصْوَاتَ النِّسَاءِ حِينَ مُحَادَثَتِهِنَّ عَلَى هَذَا ، وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ تَرْخِيمُ الصَّوْتِ وَتَنْغِيمُهُ وَتَلْيِينُهُ ، لِمَا فِيهِ مِنْ إثَارَةِ الْفِتْنَةِ ، وَذَلِكَ لِقَوْلِهِ تَعَالَى : فَلاَ تَخْضَعْنَ بِالْقَوْل فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ নারীর কণ্ঠস্বরে যদি শ্রোতা আনন্দ পায় বা প্রলুব্ধ হওয়ার আশংকা করে, তবে তা শোনা তার জন্য হারাম। অন্যথায় তা হারাম নয়। এমন বর্ণনা এসেছে যে ,মহিলারা যখন কথা বলতো তখন সাহাবীরা তাদের কথা শুনতেন। এই বর্ননাগুলোকে বোঝাতে হবে সেসব ক্ষেত্রে উল্লেখ করে, যেখানে ফিতনার ভয় ছিল না। একজন মহিলার তার কণ্ঠস্বর নরম এবং লোভনীয় করা উচিত নয়, কারণ এটি ফিতনার কারণ। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন;…সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না,যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২, আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
(৫).চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনকে অজুহাত বানানো যাবে না: বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া মানে এই নয় যে, চিকিৎসার অজুহাতে পর্দার বিধান শিথিল করা যাবে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর দেখা, স্পর্শ করা বা অবাধ কথাবার্তা বলা যাবে। বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রে যতটুকু প্রয়োজন, শরিয়ত ততটুকুই অনুমতি দিয়েছে; প্রয়োজন শেষ হলে অনুমতির সীমাও শেষ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ﴾ “তিনি তোমাদের জন্য যা কিছু হারাম করেছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছেন; তবে তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও, তা ব্যতীত।” (সূরা আল-আন‘আম: ১১৯)। আয়াতের «إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ»—“তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও”—এই অংশটি প্রমাণ করে যে, জরুরি অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়ের যতটুকু অনুমতি দেওয়া হয়, তা কেবল প্রয়োজনের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আলেমগণের নিকট স্বতঃসিদ্ধ শরয়ি নীতি হলো—ইসলাম কল্যাণ সাধন ও তা পূর্ণতা দান এবং অকল্যাণ প্রতিহত বা হ্রাস করার জন্য এসেছে। তাই বড় অকল্যাণ দূর করার জন্য তুলনামূলক ছোট অকল্যাণে লিপ্ত হওয়া প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে। সুতরাং জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধ বিষয়কে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সাময়িকভাবে বৈধ করে। চিকিৎসার তীব্র প্রয়োজনের সময় রোগীর অসুস্থ স্থান দেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের অংশবিশেষ উন্মুক্ত করা বা স্পর্শ করার বৈধতার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই—যেমন জরুরী ক্ষেত্রে নারী রোগীর চিকিৎসায় পুরুষ চিকিৎসক এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসায় নারী চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কারণ, এখানে সতর ও পর্দা রক্ষার স্বার্থের সঙ্গে জীবন রক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনের সংঘাত হলে বৃহত্তর কল্যাণ তথা জীবন ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে “জরুরত তার মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়”—এই গুরুত্বপূর্ণ নীতির কারণে চিকিৎসার অনুমতিকে কখনোই সীমালঙ্ঘনের অজুহাত বানানো যাবে না। অতএব, যতটুকু দেখা, উন্মুক্ত করা, স্পর্শ করা বা কথা বলা চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য, কেবল ততটুকুই বৈধ হবে; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা শরয়ি বিধানের সীমালঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
.
◾বিপরীত লিঙ্গের রোগীর চিকিৎসা ও চিকিৎসকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান সম্পর্কে সালাফী আলেমগণের ফতোয়াসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো:
.
শাফেয়ী মাযহাবের আলেম শামসুদ্দীন খতীব শিরবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) পুরুষের নারীর প্রতি দৃষ্টির বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:النظر للمداواة كحجامة وعلاج ، ولو في فرج ، فيجوز إلى المواضع التي يحتاج إليها فقط ؛ لأن في التحريم حينئذ حرجاً ، فللرجل مداواة المرأة ، وعكسه ، وليكن ذلك بحضرة محرم ، أو زوج ، أو امرأة ثقة ، ويشترط عدم امرأة يمكنها تعاطي ذلك ، وأن لا يكون ذميا مع وجود مسلم ، ولو لم نجد لعلاج المرأة إلا كافرة ومسلما: فالظاهر أن الكافرة تقدم لأن نظرها ومسها أخف من الرجل…. وقيد في ” الكافي ” الطبيب بالأمين ، فلا يعدل إلى غيره مع وجوده ، وشرط الماوردي أن يأمن الافتتان ولا يكشف إلا قدر الحاجة “চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যেমন শিঙ্গা লাগানো বা অন্যান্য চিকিৎসা প্রয়োজন হলে, এমনকি লজ্জাস্থানও দেখতে হলে, কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দেখা বৈধ। কারণ, এ অবস্থায় নিষিদ্ধ করলে মানুষের জন্য কষ্ট সৃষ্টি হবে। সুতরাং পুরুষ চিকিৎসক নারীর চিকিৎসা করতে পারে, তেমনি নারী চিকিৎসকও পুরুষের চিকিৎসা করতে পারে। তবে এ সময় রোগিণীর সঙ্গে তার মাহরাম, স্বামী অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকতে হবে। আরও শর্ত হলো, এ চিকিৎসা করতে সক্ষম কোনো নারী চিকিৎসক থাকবে না। আর মুসলিম চিকিৎসক থাকলে অমুসলিম চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে না। তবে যদি নারীর চিকিৎসার জন্য কেবল একজন কাফির নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক পাওয়া যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে কাফির নারী চিকিৎসককেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, তার দেখা ও স্পর্শ পুরুষের তুলনায় হালকা। আল কাফী গ্রন্থে চিকিৎসককে বিশ্বস্ত হওয়ার শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইমাম মাওয়ারদী শর্ত করেছেন যে, ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর উন্মুক্ত করা যাবে না। (আল ইকনা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৬৯)
.
একই আলেম মুগনী আল মুহতাজ গ্রন্থে জরুরি প্রয়োজনে কারা নারীর গোপন অঙ্গ দেখতে পারে এ বিষয়ে ইমাম বুলকীনীর ক্রমবিন্যাস উল্লেখ করেছেন:
১. প্রথমে একজন মুসলিম নারী।
২. তিনি না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম বালক।
৩. সেও না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম বালক।
৪. তাও না থাকলে একজন অমুসলিম নারী।
৫. তারপর মুসলিম মাহরাম।
৬. তিনি না থাকলে অমুসলিম মাহরাম।
৭. এরপর মুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ।
৮. সবশেষে অমুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ। (মুগনী আল মুহতাজ ৪/২১৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত বা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা কি বৈধ? আর যদি কেবল একজন খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক থাকেন, তাহলে কার কাছে চিকিৎসা নেওয়া উচিত?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
كشف عورة الرجل للمرأة ، والمرأة للرجل عند الحاجة لذلك حال العلاج : لا بأس به بشرطين :
الشرط الأول : أن تؤمن الفتنة .
الشرط الثاني : أن لا يكون هناك خلوة .
والطبيبة النصرانية المأمونة أولى في علاج المرأة من الرجل المسلم ؛ لأنها من جنسها بخلاف الرجل .
والله المسئول أن يصلح أحوال المسلمين “
“চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত অথবা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা বৈধ, তবে দুটি শর্তে:
প্রথম শর্ত: ফিতনার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থাকা।
দ্বিতীয় শর্ত: নির্জন অবস্থায় না হওয়া।
আর বিশ্বস্ত খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক নারীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষ চিকিৎসকের তুলনায় অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; কারণ তিনি নারীরই সমগোত্রীয় (অর্থাৎ একই লিঙ্গের), পক্ষান্তরে পুরুষ ভিন্ন লিঙ্গের।আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৭৫)।
.
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো নারীর সতরের অংশ পরীক্ষা করা কি বৈধ? আর চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য রোগিণীর সতর দেখানো কি বৈধ? তিনি উত্তরে বলেন: “كشف المرأة ‌ما ‌يجب ‌عليها ‌ستره ‌من ‌أجل ‌مصلحة ‌الطب ‌ببيان ‌ما ‌فيها من مرض وتشخيصه هذا لا بأس به ، لأنه لحاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا المحرم ، إذ القاعدة المعروفة عند أهل العلم : أن ما حرم تحريم الوسائل أباحته الحاجة ، وما حرم تحريماً ذاتياً تحريم المقاصد فإنه لا يبيحه إلا الضرورة ، وذكروا لذلك أمثلة وهي النظر إلى ما لا يجوز النظر إليه من المرأة للحاجة ، كما يجوز نظر الخاطب إلى ما لا يجوز النظر إليه من أجل مصلحة النكاح”চিকিৎসার স্বার্থে রোগ নির্ণয় ও রোগের অবস্থা বোঝার জন্য নারীর যে অংশ সাধারণত আবৃত রাখা ফরজ, তা প্রয়োজনবশত উন্মুক্ত করা বৈধ। কারণ এটি প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। শরিয়তের একটি সুপরিচিত নীতি হলো যেসব বিষয় উপায়গত কারণে হারাম, প্রয়োজন হলে তা বৈধ হয়ে যায়। আর যেসব বিষয় নিজগতভাবে হারাম, সেগুলো কেবল চরম প্রয়োজন ছাড়া বৈধ হয় না। এর উদাহরণ হলো প্রয়োজনের কারণে নারীর এমন অঙ্গ দেখা, যা সাধারণ অবস্থায় দেখা বৈধ নয়। যেমন, বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রের জন্য কনেকে দেখা বৈধ, তেমনি চিকিৎসকের জন্য রোগ নির্ণয়ের স্বার্থে নারীর প্রয়োজনীয় অঙ্গ পরীক্ষা করাও বৈধ।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব: ৯/২)
.
অপর ফাতাওয়ায় মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একই বিষয়ে একজন নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান কী?
তিনি উত্তরে বলেন: “إذا كان الاختصاص واحداً والحذق (المهارة) متساوياً بين الرجل والمرأة فإن المرأة لا تذهب إلى الرجل ، لأنه لا داعي لذلك ولا حاجة ، أما إذا كان الرجل أحذق من المرأة ، أو كان اختصاصه أعمق فلا حرج عليها أن تذهب إليه ، وإن كان هناك امرأة ؛ لأن هذه حاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا “যদি পুরুষ ও নারী চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞতা একই হয় এবং দক্ষতাও সমান হয়, তাহলে নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এর কোনো প্রয়োজন বা জরুরি কারণ নেই। কিন্তু যদি পুরুষ চিকিৎসক নারী চিকিৎসকের তুলনায় অধিক দক্ষ হন, অথবা তাঁর বিশেষজ্ঞতা আরও গভীর হয়, তাহলে নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাছে চিকিৎসা নেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এটি একটি প্রয়োজন, আর প্রয়োজন এমন বিষয়কে বৈধ করে। (ফাতাওয়া উলামা আলা বালাদিল হারাম পৃষ্ঠা: ৬৯৩)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয় যে, “আমরা একদল ডাক্তার রিয়াদে চাকুরী করি। আমাদের ডিউটিকালে পুরুষ ও মহিলা রোগী আসে। কখনো কখনো কোন মহিলা রোগী মাথা ব্যথা বা পেটে ব্যথার কথা বলেন। পরিপূর্ণ চিকিৎসার দাবী হচ্ছে- রোগিনীকে পরীক্ষা করে দেখা। পরীক্ষার মাধ্যমে মাথা ব্যথার কারণ নির্ণয় করা। রোগের কারণ নির্ণয় করতে গেলে রোগীর পেট কিংবা মাথা কিংবা অন্য কোন অঙ্গ পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়; যাতে করে ডাক্তারের উপর কোন দায় না আসে। আর যদি রোগিনীকে পরীক্ষা করা না হয় হতে পারে এতে করে রোগিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে পরীক্ষা না করারও সুযোগ আছে। তবে যথাযথ কনসালটেন্সির করতে গেলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন…।
শাইখ জবাবে বলেন:الواجب على إدارة المستشفى أن تلاحظ هذا وأن تجعل المناوبة بين الرجال والنساء حتى إذا احتاج النساء المرضى أن يُعالجن أو يفحصن أُرسل إليهن النساء ، فإذا لم تقم الإدارة بهذا الواجب عليها ولم تبال فأنتم لا حرج أن تفحصوا النساء ، لكن بشرط ألا يكون هناك خلوة أو شهوة ، وأيضا يكون هناك حاجة إلى الفحص ، فإن لم يكن حاجة وأمكن تأخير الفحص الدقيق إلى وقت تحضر فيه النساء فأخروه ، وإذا كان لا يمكن فهذه حاجة ولا بأس بها ” হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হচ্ছে- পুরুষ ডাক্তার ও মহিলা ডাক্তারের মাঝে এমনভাবে ডিউটি ভাগ করে দেয়া যাতে করে মহিলা রোগী আসলে তাদের চেক-আপ করা ও পরীক্ষা করার জন্য মহিলা ডাক্তারের কাছে পাঠানো যায়। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ কর্তব্য পালন না করে, এ বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ না করে তাহলে মহিলাদের চিকিৎসা করায় আপনারা গুনাহগার হবেন না। তবে শর্ত হচ্ছে- চিকিৎসাকালে কোন মহিলা রোগীর সাথে নির্জনবাস না ঘটা এবং যৌন উত্তেজনা না আসা এবং প্রকৃতপক্ষে রোগীকে পরীক্ষা করার প্রয়োজন থাকা। যদি পরীক্ষা করার প্রয়োজন না থাকে, কিংবা সূক্ষ্ম পরীক্ষা পরবর্তীতে মহিলা ডাক্তার আসার পর করলেও চলে তাহলে সে পরীক্ষা পরবর্তীতেই করতে হবে। আর যদি দেরী করার সুযোগ না থাকে; তাহলে এটি প্রয়োজন। এমতাবস্থায় পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করলে গুনাহ হবে না।”[ইবনু উসাইমীন; লিকাআতুল বাব আল-মাফতুহ: ১/২০৬)]
.
পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসার মূলনীতি হলো—পুরুষের চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসক এবং নারীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে করা। তবে বাস্তব প্রয়োজন বা উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে শরয়ি শর্তসাপেক্ষে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা বৈধ। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সতর দেখা বা স্পর্শ করা, খালওয়াত ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি, স্পর্শ ও কথাবার্তা পরিহার করা আবশ্যক। অতএব, চিকিৎসার প্রয়োজনকে শরিয়তের সীমালঙ্ঘনের অজুহাত না বানিয়ে প্রয়োজনের সীমা যথাযথভাবে রক্ষা করাই শরিয়তের নির্দেশনা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়,ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কুকুরের লালা কারও শরীর পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী

 প্রশ্ন: কুকুর কি সত্তাগতভাবে নাপাক, নাকি কেবল তার লালাই নাপাক? কুকুরের লালা কারও শরীর, পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আহলুল ইলমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে:
◽প্রথম মত: কুকুর সত্তাগতভাবেই নাপাক। শুধু তার লালাই নয়; বরং তার সবকিছু তার দেহ, এমনকি পশমও নাপাক। এটি শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের একটি। সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির নির্বাচিত মতও এটি। এই মতের আলেমগন দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস:(طُهُورُ إِنَاءِ أحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الكَلْبُ أنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولاَهُنَّ بِالتُّرَابِ)“তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম হা/২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:ففيه دلالة ظاهرة لمذهب الشافعي وغيره رضي الله عنه ممن يقول بنجاسة الكلب لأن الطهارة تكون عن حدث أو نجس وليس هنا حدث فتعين النجس .فإن قيل: المراد الطهارة اللغوية ؟فالجواب: أن حمل اللفظ على حقيقته الشرعية مقدم على اللغوية“এ হাদীসে ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর সঙ্গে একমত অন্যান্য আলেমদের মতের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যারা কুকুরকে নাপাক বলেন। কারণ ‘পবিত্রতা’ (طهارة) হয় অপবিত্রতা (হাদাস) অথবা নাজাসাত (নাপাক বস্তু) থেকে। এখানে হাদাসের কোনো বিষয় নেই, তাই অবশ্যই তা নাজাসাতের কারণেই। যদি বলা হয়, এখানে ‘পবিত্রতা’ বলতে ভাষাগত অর্থ বোঝানো হয়েছে, তবে তার জবাব হলো—শরীয়তের পরিভাষাগত অর্থকে ভাষাগত অর্থের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।”—(শারহু সহীহ মুসলিম (৩/১৮৪)। আরও দেখুন: ফাতহুল বারী (১/২৭৬)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেছেন:والتعليل بالتنجيس أقوى، لأنه في معنى المنصوص، وقد ثبت عن ابن عباس التصريح بأن الغسل من ولوغ الكلب بأنه رجس رواه محمد بن نصر المروزي بإسناد صحيح ، ولم يصح عن أحد من الصحابة خلافه “কুকুরকে নাপাক বলার কারণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যাই অধিক শক্তিশালী। কারণ এটি হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইবন আব্বাস (রাযি.) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কুকুরের মুখ দেওয়া পাত্র ধোয়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন: ‘এটি অপবিত্র (رجس)।’ আর এ বিষয়ে কোনো সাহাবী থেকে এর বিপরীত মত সহীহভাবে বর্ণিত হয়নি।”(ফাতহুল বারী (১/২৭৭) খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন: في هذا الحديث من الفقه أن الكلب نجس الذات ، ولولا نجاسته لم يكن لأمره بتطهير الإناء من ولوغه معنى ، والطهور يقع في الأصل إما لرفع حدث أو لإزالة نجس ، والإناء لا يلحقه حكم الحدث ، فعُلم أنه قصد به إزالة النجس .وإذا ثبت أن لسانه الذي يتناول به الماء نجس يجب تطهير الإناء منه ، عُلم أن سائر أجزائة وأبعاضه في النجاسة بمثابة لسانه ، فبأي جزء من أجزاء بدنه ماسه وجب تطهيره“এ হাদীসে যে ফিকহী বিধান রয়েছে তাহলো: কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক। যদি সে নাপাক না হতো তবে কুকুরের মুখ দেওয়ার কারণে পাত্রকে ধোয়ার আদেশ করার কোনো অর্থ থাকে না। মূলতঃ পবিত্র করা হয় অপবিত্র অবস্থা (হাদাস) দূর করার জন্য অথবা নাপাকি (নাজাস) দূর করার জন্য। আর পাত্রের ক্ষেত্রে হাদাস (অপবিত্র অবস্থা) প্রযোজ্য নয়। অতএব বোঝা গেল, ধোয়ার নির্দেশ করা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল নাপাকি (নাজাস) দূর করা। যেহেতু প্রমাণিত হলো যে, তার জিহ্বা (যা দিয়ে সে পানি খায়) নাপাক এবং তা থেকে পাত্রকে পবিত্র করা জরুরী, সেহেতু এটাও বোঝা গেল যে, কুকুরের দেহের অন্যান্য অংশও নাপাক হওয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের জিহ্বার মতোই। অতএব কুকুরের দেহের যে অংশই কোনো কিছুকে স্পর্শ করবে সেটাকেই ধৌত করা ও পবিত্র করা ওয়াজিব।”(মা‘আলিমুস সুনান; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:فالنجس نوعان: أحدهما: ما هو نجس، رواية واحدة، وهو الكلب، والخنزير، وما تولد منهما، أو من أحدهما، فهذا نجس، عينه، وسؤره، وجميع ما خرج منه، روي ذلك عن عروة، وهو مذهب الشافعي، وأبي عبيد، وهو قول أبي حنيفة في السؤر خاصة “নাপাক বস্তু দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হলো—যা সর্বসম্মতিক্রমে (এক বর্ণনা অনুযায়ী) নাপাক। তা হলো: কুকুর, শূকর এবং এ দুটির উভয় থেকে অথবা এদের যেকোনো একটির থেকে জন্ম নেওয়া প্রাণী। এগুলোর সত্তা, উচ্ছিষ্ট এবং এগুলো থেকে নির্গত সবকিছুই নাপাক। এ মতটি উরওয়াহ (রাহি.) থেকে বর্ণিত। এটিই ইমাম শাফেয়ী, আবূ উবাইদ-এর মাযহাব। আর ইমাম আবূ হানীফার মতে অন্তত কুকুরের উচ্ছিষ্টের ক্ষেত্রে এ মত গ্রহণযোগ্য।”(আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৪)
.
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:الكلب نجس كله روثه وعرقه ولعابه، ويجب غسل ما لوثه من إناء وغيره بالماء حتى يطهر، أما اللعاب خاصة؛ فيجب غسل ما أصابه سبع مرات بالماء، إحداهن بالتراب، أو ما يقوم مقامه من المنظفات كالصابون وغيره؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم: طهور إناء أحدكم إذا ولغ فيه الكلب أن يغسله سبع مرات أولاهن بالتراب خرجه مسلم في (صحيحه)“কুকুর সম্পূর্ণই নাপাক। তার মল, ঘাম ও লালা—সবই নাপাক। যে পাত্র বা অন্য কোনো বস্তু কুকুর নাপাক করেছে, তা পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে। তবে বিশেষভাবে লালার ক্ষেত্রে সাতবার ধোয়া আবশ্যক। এর একটি ধোয়া মাটি দিয়ে বা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ, যেমন সাবান ইত্যাদি দিয়ে হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্রতা হলো সেটিকে সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।’” — ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (৪/১৯৭)
.
◽দ্বিতীয় মত: কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র। এমনকি তার লালাও সাধারণভাবে পবিত্র; তাই তা নাপাক বলে গণ্য হবে না। এটি মালেকি মাযহাবের মত।ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো: “কুকুরের লালা নাপাক নয়। তবে যে পাত্রে কুকুর মুখ দেয়, সেটি সাতবার ধোয়া হবে—এটি কেবল ইবাদতস্বরূপ (তাআব্বুদী বিধান)।” ইবনু আবদুল বার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: واختلف الفقهاء أيضا في سؤر الكلب وما ولغ فيه من الماء والطعام .فجملة ما ذهب إليه مالك واستقر عليه مذهبه عند أصحابه: أن سؤر الكلب طاهر، ويغسل الإناء من ولوغه سبعا ؛ تعبدا “ফকীহগণ কুকুরের উচ্ছিষ্ট এবং কুকুর মুখ দেওয়া পানি ও খাদ্য সম্পর্কে মতভেদ করেছেন। ইমাম মালিকের যে মতের ওপর তাঁর অনুসারীরা স্থির হয়েছেন, তা হলো—কুকুরের উচ্ছিষ্ট পবিত্র। তবে কুকুর মুখ দিলে পাত্র সাতবার ধুতে হবে, ইবাদতস্বরূপ।”—আত-তামহীদ: ১৮/২৬৯) কুকুরের লালা পবিত্র—এই মতকে ইমাম ইবনুল মুনযির ও ইমাম বুখারী (রহিমাহুমাল্লাহ) সমর্থন করেছেন। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল:আল্লাহ তাআলা শিকারি কুকুর যে শিকার ধরে আনে তা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু সেই শিকার ধুয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন:﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ﴾ “অতএব শিকারি কুকুর তোমাদের জন্য যা ধরে রাখে, তা থেকে খাও এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।”—(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪)
.
ইবনু রুশদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:فذهب مالك في الأمر بإراقة سؤر الكلب وغسل الإناء منه، إلى أن ذلك عبادة غير معللة، وأن الماء الذي يلغ فيه ليس بنجس، ولم ير إراقة ما عدا الماء من الأشياء التي يلغ فيها الكلب في المشهور عنه، وذلك كما قلنا لمعارضة ذلك القياس له .ولأنه ظن أيضا أنه إن فهم منه أن الكلب نجس العين عارضه ظاهر الكتاب، وهو قوله تعالى: ( فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ ) : يريد أنه لو كان نجس العين ، لنجس الصيد بمماسته “ইমাম মালিক কুকুরের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেওয়া এবং পাত্র ধোয়ার নির্দেশকে এমন একটি ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যার কোনো নির্দিষ্ট কারণ (ইল্লত) বর্ণিত হয়নি। তাই তাঁর মতে কুকুর মুখ দেওয়া পানি নাপাক নয়। প্রসিদ্ধ মতে, কুকুর মুখ দেওয়া অন্যান্য খাদ্যও ফেলে দিতে হবে—এ কথাও তিনি বলেননি। কারণ কিয়াস এ মতের বিরোধিতা করে। আর তাঁর ধারণা ছিল, যদি এ হাদীস থেকে কুকুরের সত্তা নাপাক হওয়া বোঝা যায়, তবে তা কুরআনের ظاهر (বাহ্যিক অর্থ)-এর বিরোধী হবে। কেননা আল্লাহ বলেন: ﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ﴾ অর্থাৎ, যদি কুকুরের সত্তাই নাপাক হতো, তবে তার স্পর্শে শিকারও নাপাক হয়ে যেত।”(বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/৮৩–৮৪)
.
◽তৃতীয় মত: কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। এটি ইমাম আবু হানীফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাব এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের অপর একটি। বহু মুহাক্কিক আলেমের মতে, এ মতটিই অধিক বিশুদ্ধ ও প্রাধান্যযোগ্য। এই মতের পক্ষে ও আলেমগন দলিল হিসেবে একই হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম (২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
উপরোক্ত হাদীসের আলোকে কিছু আলেম বলেছেন:أن الحديث يدل على نجاسة لعابه وريقه وفمه فقط ، وأما بقية بدنه فيبقى على الأصل وهو الطهارة ، وهو مذهب الحنفية ، واختاره شيخ الإسلام ابن تيمية . ينظر: “এ হাদীস কেবল তার লালা, থুতু ও মুখ নাপাক হওয়ার প্রমাণ করে। আর কুকুরের শরীরের বাকি অংশ মূল বিধানের উপর বলবৎ থাকবে। আর তা হলো পবিত্র হওয়া। এটি হানাফী মাযহাবের মত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[দেখুন: মাজমূউল ফাতাওয়া: (২১/৫৩০)] ইবনে দাকিকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন:بأن الحكم على جميع بدن الكلب بالنجاسة أنه اجتهاد من العلماء وليس نصًّا عن النبي صلى الله عليه وسلم فقال : ” فتبين بهذا أن الحديث إنما دل على النجاسة فيما يتعلق بالفم ، وأن نجاسة بقية البدن بطريق الاستنباط”কুকুরের পুরো দেহকে নাপাক বলা আলেমদের ইজতিহাদ; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি বক্তব্য নয়।তিনি বলেন: “এতে স্পষ্ট হলো যে, হাদীসটি কেবল মুখের সাথে সম্পৃক্ত কিছু নাপাক হওয়া প্রমাণ করে। আর দেহের বাকি অংশ নাপাক হওয়া দলিল থেকে উদ্ভাবিত (ইস্তিনবাতকৃত)।”[ইহকামুল আহকাম: (পৃ. ২৪) থেকে সমাপ্ত]
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি মতের মধ্যে অধিক শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মত হলো—কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র; তবে তার লালা অপবিত্র (নাজিস)। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহীহ হাদীস সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে, আর আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও কুকুরের লালায় ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতির বিষয়টি সমর্থন করে। তাই কোনো কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয় বা তা থেকে পান করে, এরপর সেই পাত্র ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমে পাত্রের ভেতরের পানি ফেলে দিতে হবে। অতঃপর পাত্রটি সাতবার পানি দিয়ে ধুতে হবে, যার একবার হবে মাটি দিয়ে ভালোভাবে ঘষে। তবে পাত্রটি যদি কুকুরের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যই নির্ধারিত থাকে, তাহলে তা ধোয়া আবশ্যক নয়। পাত্র পবিত্র করার ক্ষেত্রে মাটি ব্যবহার করাই শরীয়তের নির্দেশ; মাটি সহজলভ্য থাকলে অন্য কোনো বস্তু তার বিকল্প হতে পারে না। তবে যদি মাটি পাওয়া একেবারেই সম্ভব না হয়, তাহলে প্রয়োজনের কারণে সাবান বা অন্য কোনো পরিচ্ছন্নকারী পদার্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।অন্যদিকে, যেহেতু কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক নয়, তাই শুধু কুকুর স্পর্শ করা বা কুকুরের শরীরের স্পর্শ কাপড় বা শরীরে লাগার কারণে-বিশেষ করে কুকুরের শরীর শুষ্ক থাকলে এবং তার গায়ে কোনো বাহ্যিক নাপাকি না থাকলে-শরীর বা কাপড়কে বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে, যেমন মাটি বা সাতবার পানি দিয়ে ধোয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কুকুরের লালা শরীর, কাপড় বা পাত্রে লাগলে শরীয়তে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী তা পবিত্র করতে হবে,আর শুধু স্পর্শের কারণে অতিরিক্ত কঠোরতা বা অযথা সন্দেহে পতিত হওয়া উচিত নয়।
.
কুকুর সংক্রান্ত বিষয়ে আলেমদের মতভেদ করে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:وأما الكلب فقد تنازع العلماء فيه على ثلاثة أقوال: أحدها: أنَّه طاهرٌ حتى ريقه، وهذا هو مذهب مالك. والثانـي: نجس حتى شعره، وهذا هو مذهب الشافعي، وإحدى الروايتين عن أحمد. والثالث: شعره طاهـر، وريقه نجسٌ، وهذا هو مذهب أبي حنيفة وأحمد في إحدى الروايتين عنه. وهذا أصحُّ الأقوال، فإذا أصاب الثوبَ أو البدنَ رطوبةُ شعره لم ينجس بذلك”কুকুরের ব্যাপারে আলেমরা তিনটি মতে বিভক্ত। প্রথম মত হচ্ছে: কুকুর পবিত্র; এমনকি কুকুরের লালাও। এটি মালেকের মাযহাব। দ্বিতীয় মত হচ্ছে: এটি অপবিত্র; এমনকি পশমও। এটি শাফেয়ীর মাযহাব এবং ইমাম আহমদের বর্ণনাদ্বয়ের একটি। তৃতীয় মত হচ্ছে: এর পশম পবিত্র; লালা অপবিত্র। এটি ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদের অন্য বর্ণনা। এই মতটি বিশুদ্ধতম। তাই যদি কোনো পোশাকে বা কাপড়ে কুকুরের পশমের সিক্ততা স্পর্শ করে তাতে সেটি অপবিত্র হয়ে যায় না।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৫৩০)]
.
অন্য স্থানে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়ার (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: “কেননা বস্তুর মূল অবস্থা হচ্ছে পবিত্রতা। সুতরাং কোনো দলীল ছাড়া কোনো কিছুকে অপবিত্র বা হারাম বলা জায়েয নেই। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেন:وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلاَّ مَا اضْطُّرِرْتُم إِلَيْهِ“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা যা হারাম করেছেন বিস্তারিতভাবে সেগুলোর বিবরণ দিয়েছেন; অবশ্য নিরুপায় হয়ে তোমরা কিছু খেতে বাধ্য হলে তার কথা আলাদা।”[সূরা আন’আম: ১১৯] তিনি আরো বলেন:وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِلَّ قَوْماً بَعْدَ إِذْ هَدَاهُم حَتَّى يُبَيِّنَ لَهُم مَا يَتَّقُونَ“কোনো সম্প্রদায়কে পথ দেখানোর পর তারা কি কি পরিহার করবে তা স্পষ্টভাবে বলে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে বিপথগামী করেন না। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে জানেন।”[সূরা তাওবাহ: ১১৫] বিষয়টি যেহেতু এমন তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কুকুর কোন পাত্রে পান করলে সেই পাত্রকে পবিত্র করতে হলে সেটাকে সাতবার ধৌত করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে (মাজতে হবে)।” অন্য হাদীসে বলেছেন: “যদি কুকুর পান করে…” এ সংক্রান্ত সমস্ত হাদীসে কেবল ولوغ (জিহ্বা দিয়ে পান করা)-এর কথা বলা হয়েছে; বাকি কোনো অঙ্গের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং অন্যান্য অঙ্গকে নাপাক বলার ভিত্তি হচ্ছে কিয়াস।অধিকন্তু, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকারের কুকুর এবং গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত পাহারার কুকুর প্রতিপালনে ছাড় দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ ধরণের কুকুর পালে নিঃসন্দেহে তার শরীরে কুকুরের পশমের সিক্ততা লেগে যায়; যেমনিভাবে খচ্চর, গাধা বা অন্যান্য প্রাণীর সিক্ততা লাগে। তাই কুকুরের পশম নাপাক বলার মত এমন সংকীর্ণ পরিস্থিতি থেকে এ উম্মাহকে মুক্ত রাখা হয়েছে।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/২১৭, ২১৯)]
.
◾কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে? আর কুকুরের লালা কাপড়ে বা শরীরে লাগলে পবিত্রতা অর্জনের উপায় কি?
.
কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে না। কারণ ওযু বা পবিত্রতা যখন শরয়ী দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তখন তা কেবল শরয়ী দলিল দ্বারাই বাতিল হতে পারে। আর কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গের সপক্ষে কোনো দলিল নেই; তাই আলেমরা ওযু ভঙ্গের কারণগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখ করেননি। ইবন কুদামা আল-মুগনীতে ওযু ভঙ্গের কারণগুলো উল্লেখ করার পর (যেখানে তিনি কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কথা উল্লেখ করেননি) বলেন: “এগুলোই পবিত্রতা ভঙ্গের সমস্ত কারণ এবং সাধারণ আলেমদের মতে এর বাইরে অন্য কিছু দ্বারা তা ভঙ্গ হয় না।” (ইবন কুদামা আল-মুগনী (১/২৬৪)
.
তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুকুরের লালা নাপাক ও অপবিত্র। শুধু তাই নয়, এর নাপাকি অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র। তাই কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে সাধারণভাবে ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়; বরং শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করা আবশ্যক, যার একটি ধৌত মাটি দিয়ে হতে হবে। বর্তমান যুগে মাটির পরিবর্তে মাটির উপাদানসমৃদ্ধ বা মাটির সমতুল্য পরিষ্কারকারী দ্রব্য ব্যবহারেরও অবকাশ রয়েছে বলে একদল আলেম মত প্রকাশ করেছেন। অতএব, কুকুরের লালা লাগা স্থানটি শরয়ি বিধান অনুযায়ী সাতবার ভালোভাবে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে, যার একটি ধৌত অবশ্যই মাটি বা তার শরয়ি বিকল্প দ্বারা সম্পন্ন হবে।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের চেকপোস্টে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হয়। কুকুর গাড়ির ভেতরে ঢুকে শুঁকে দেখে এবং কখনো চেটে দেয়। এতে কি গাড়ির সিট বা যেসব জায়গা কুকুর শুঁকেছে বা চেটেছে, সেগুলো নাপাক হয়ে যাবে?”
তিনি উত্তরে বলেন:أما الشم فإنه لا يضر؛ لأنه لا يخرج من الكلب ريق، وأما اللحس فيخرج فيه من الكلب ريق، وإذا أصاب ريق الكلب ثياباً أو شبهها : فإنها تغسل سبع مرات، ولا نقول: إحداها بالتراب؛ لأنه ربما يضر، لكن نقول: يستعمل عن التراب صابوناً أو شبهه من المزيل ويكفي مع الغسلات السبع“শুধু শোঁকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই; কারণ শোঁকার সময় কুকুরের মুখ থেকে লালা বের হয় না। কিন্তু চাটার ক্ষেত্রে কুকুরের লালা বের হয়। সুতরাং কুকুরের লালা যদি কোনো কাপড় বা এ জাতীয় বস্তুর ওপর লাগে, তাহলে তা সাতবার ধুতে হবে। তবে আমরা বলি না যে, সাতবারের একবার অবশ্যই মাটি দিয়ে ধুতে হবে; কারণ এতে (উক্ত বস্তুটির) ক্ষতি হতে পারে। বরং মাটির পরিবর্তে সাবান বা অনুরূপ কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ ব্যবহার করা হবে। আর সাতবার ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৪৯/৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “কুকুরের লালা যদি মানুষের শরীরে বা কাপড়ে লাগে, তবে তার বিধান কী? আর সেই কাপড় যদি অন্য কাপড়ের সঙ্গে একই ওয়াশিং মেশিনে, একই পানিতে ধোয়া হয়, তবে সেই কাপড়গুলোর হুকুম কী?” তারা উত্তরে বলেন: لعاب الكلب نجس ، يجب غسل ما أصابه من إناء أو ثوب لقوله صلى الله عليه وسلم : (طَهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ) .والثياب إذا ألقيت في الماء الطهور وغسلت حتى زال أثر النجاسة عنها طهرت جميعا من نجاسة الكلب وغيره ، بشرط أن يتكرر غسلها من نجاسة الكلب سبع مرات ، تكون أولاهن بالتراب أو ما يقوم مقامه كالصابون والأشنان“কুকুরের লালা নাপাক। যে পাত্র বা কাপড়ে তা লাগে, তা ধোয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্র করার পদ্ধতি হলো—তা সাতবার ধোয়া; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে।”(সহীহ মুসলিম) আর কাপড় যদি পবিত্র পানিতে ধোয়া হয় এবং এমনভাবে ধোয়া হয় যে, তা থেকে নাপাকির সমস্ত চিহ্ন দূর হয়ে যায়, তাহলে তা কুকুরের নাপাকি এবং অন্যান্য সব নাপাকি থেকেই পবিত্র হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, কুকুরের নাপাকির ক্ষেত্রে কাপড়টি সাতবার ধোয়া হবে; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে অথবা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী বস্তু—যেমন সাবান বা উশনান (পরিষ্কারক উদ্ভিদ)—দিয়ে হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৯৬)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে: (১) কুকুর সম্পূর্ণরূপে নাপাক, (২) কুকুর ও তার লালা উভয়ই পবিত্র, এবং (৩) কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। দলিল-প্রমাণের গভীর পর্যালোচনায় বহু মুহাক্কিক আলেম—যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)—তৃতীয় মতটিকেই অধিক শক্তিশালী ও প্রাধান্যযোগ্য বলে গ্রহণ করেছেন। এ মতানুযায়ী, কুকুরের শরীর বা পশম স্পর্শ করলে—বিশেষত তা শুষ্ক অবস্থায় হলে—মানুষের শরীর বা পোশাক নাপাক হয় না। তবে কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে, শরীয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করতে হবে; যার একবার হবে মাটি দ্বারা (অথবা প্রয়োজনে মাটির সমতুল্য পরিচ্ছন্নকারী কোনো বস্তু দ্বারা)। এছাড়া কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গ হয় না। অতএব, এ বিষয়ে অযথা কঠোরতা, বাড়াবাড়ি বা অমূলক সন্দেহে না পড়ে, সহীহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল কুকুরের লালার নাপাকির বিধান যথাযথভাবে পালন করাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কোনো ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কি অন্যায়

 প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কি অন্যায়? এটা কি তাকে অপমান করা, লজ্জিত করা বা তার দোষ প্রকাশ করার অন্তর্ভুক্ত? নাকি তাকে একান্তে নিষেধ করা ও উপদেশ দেওয়া জরুরি?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর উপদেশ হচ্ছে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত। এটি পূর্ণ ঈমান ও পরিপূর্ণ ইহসান শ্রেণীর গুণ। কারণ কোন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা ভালবাসে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা ভালবাসে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা অপছন্দ করে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা অপছন্দ করে। আর এটাই হচ্ছে- উপদেশ দেয়ার প্রেরণা। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম -এ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, নামায আদায় করব, যাকাত প্রদান করব এবং প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করব।”(বুখারী হা/৫৭ ও সহিহ মুসলিম হা/৫৬) এবং সহিহ মুসলিমে তামিম আদ-দারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “দ্বীন হচ্ছে- নাসীহা (উপদেশ, কল্যাণ কামনা)। আমরা বললাম: কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ্‌র জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবর্গের জন্য এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য।”(মুসলিম হা/৫৫) হাদিসের ব্যাখায় ইবনুল আছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: সাধারণ মুসলমানদের জন্য নসীহত হচ্ছে- তাদেরকে নিজেদের কল্যাণের দিক-নির্দেশনা দেয়া।[আন-নিহায়া (৫/১৪২) থেকে সমাপ্ত]
.
দ্বিতীয়ত: ইসলামের মৌলিক নীতি হলো—কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে গোপনে একান্তে, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নসিহত করাই সুন্নাহসম্মত এবং অধিক কল্যাণকর পদ্ধতি। তাই শরীয়তসম্মত কোনো সুস্পষ্ট ও বৃহত্তর স্বার্থ বা প্রয়োজন ব্যতীত জনসমক্ষে কাউকে নসিহত বা ভর্ত্সনা করা উচিত নয়। কেননা, প্রকাশ্যে নসিহত অনেক সময় ব্যক্তির সম্মানহানি ও বিব্রতবোধের কারণ হয়, ফলে সে উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই সাধারণ অবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে নির্জনে নসিহত করাই ইসলামের শিক্ষা এবং নসিহতের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার জন্য এটিই সর্বাধিক হিকমতপূর্ণ ও ফলপ্রসূ পন্থা।
.
শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৫০ হি: মৃত: ২০৪ হি.]-এর দিওয়ানে তথা কবিতা সংকলনে এসেছে:تَعَمَّدني بِنُصحِكَ في اِنفِرادي *** وَجَنِّبني النَصيحَةَ في الجَماعَه,فَإِنَّ النُصحَ بَينَ الناسِ نَوعٌ *** مِنَ التَوبيخِ لا أَرضى اِستِماعَه,وَإِن خالَفتَني وَعَصِيتَ قَولي *** فَلا تَجزَع إِذا لَم تُعطَ طاعَه”আমাকে একান্ত গোপনে তোমার উপদেশে ধন্য করো এবং জনসমক্ষে উপদেশ দেওয়া থেকে দূরে থেকো। কেননা, মানুষের সামনে উপদেশ দেওয়া হলো এক প্রকার তিরস্কার যা শোনা আমি পছন্দ করি না।আর যদি তুমি আমার মতের বিরোধিতা করো এবং আমার কথা অমান্য করো,তাহলে আমার আনুগত্য না পেলে কোনো হতাশা প্রকাশ কোরো না।”
.
ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন, ” كان السَّلفُ إذا أرادوا نصيحةَ أحدٍ، وعظوه سراً، حتّى قال بعضهم: مَنْ وعظ أخاه فيما بينه وبينَه فهي نصيحة، ومن وعظه على رؤوس الناس فإنَّما وبخه.وقال الفضيل: المؤمن يَسْتُرُ ويَنْصَحُ، والفاجرُ يهتك ويُعيِّرُ”সলফে সালেহীন যখন কাউকে উপদেশ দিতে চাইতেন তখন তারা তাকে গোপনে সদুপদেশ দিতেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছেন: যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে একান্তে উপদেশ দিয়েছে সেটাই নসীহা। আর যে ব্যক্তি মানুষের সামনে সদুপদেশ দিয়েছে সে তাকে ভর্ৎসনা করেছে। ফুযাইল (রহঃ) বলেন: ঈমানদার লোক দোষ গোপন রাখে ও উপদেশ দেয়। আর পাপী লোক বেইজ্জত করে ও ভর্ৎসনা করে।[জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩৬ থেকে সমাপ্ত]
.
ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إِذا نصحت فانصح سرا لَا جَهرا، وبتعريض لَا تَصْرِيح، إِلَّا أَن لَا يفهم المنصوح تعريضك، فَلَا بُد من التَّصْرِيح…. فَإِن تعديت هَذِه الْوُجُوه فَأَنت ظَالِم لَا نَاصح”যদি তুমি উপদেশ দিতে চাও তাহলে গোপনে দাও; প্রকাশ্যে নয়। ইঙ্গিতে দাও, সরাসরি নয়। যদি সে তোমার ইঙ্গিত না বুঝে তাহলে সরাসরি উপদেশ দেয়া ছাড়া উপায় নেই…। যদি তুমি এ দিকগুলো এড়িয়ে যাও (অর্থাৎ প্রকাশ্যে অপমান করো বা কঠোরতা অবলম্বন করো) তাহলে তুমি জালিম; তুমি হিতৈষী নও।[আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার; পৃষ্ঠা-৪৫) থেকে সমাপ্ত]
.
তবে, প্রকাশ্যে উপদেশ দানের মধ্যে যদি কোন অগ্রগণ্য কল্যাণ থাকে তাহলে প্রকাশ্যে উপদেশ দিতে কোন আপত্তি নেই। উদাহরণত যে ব্যক্তি কোন আকিদার মাসয়ালায় জনসম্মুখে ভুল করেছে; যাতে করে তার কথা দ্বারা মানুষ বিভ্রান্ত না হয় এবং তার ভুলের অনুসরণ না করে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সুদকে জায়েয বলে প্রকাশ্যে তার প্রত্যুত্তর দেয়া। কিংবা যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিদআত ও পাপকর্মের প্রসার ঘটায়। এ ধরণের লোককে প্রকাশ্যে উপদেশ দেয়া শরিয়তসম্মত। বরং কখনও কখনও অগ্রগণ্য কল্যাণ হাছিল ও প্রবল সম্ভাবনাময় ক্ষতি প্রতিরোধার্থে ওয়াজিব।
.
ইমাম ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن كان مقصوده مجرد تبيين الحق، ولئلا يغتر الناس بمقالات من أخطأ في مقالاته: فلا ريب أنه مثاب على قصده، ودخل بفعله هذا بهذه النية في النصح لله ورسوله وأئمة المسلمين وعامتهم”যদি তার উদ্দেশ্য শুধু সত্যকে স্পষ্ট করা হয় এবং যাতে মানুষ ভুল মত পোষণকারী ব্যক্তির কথার দ্বারা প্রতারিত না হয়, তাহলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে তার এই সৎ উদ্দেশ্যের কারণে সওয়াবপ্রাপ্ত হবে।আর এই নিয়তের মাধ্যমে তার এই কাজ আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিমদের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মুসলিমদের প্রতি কল্যাণকামিতা (নসীহত) করার অন্তর্ভুক্ত হবে।”(আল-ফারকু বাইনান নাসিহা ওয়াত তা’য়ীর’ (উপদেশ ও ভর্ৎসনা এর মধ্যে পার্থক্য; পৃষ্ঠা: ৭)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
وإذا كان الإنسان من طبيعته التقصير والنقص والعيب؛ فإن الواجب على المسلم نحو أخيه أن يستر عورته ولا يشيعها إلا من ضرورة. فإذا دعت الضرورة إلى ذلك فلابد منه، لكن بدون ضرورة فالأولى والأفضل أن يستر عورة أخيه؛ لأن الإنسان بشر ربما يخطئ عن شهوة ـ يعني عن إرادة سيئة ـ أو عن شبهة، حيث يشتبه عليه الحق فيقول بالباطل أو يعمل به، والمؤمن مأمور بأن يستر عورة أخيه.هب أنك رأيت رجلاً على كذب وغش في البيع والشراء؛ فلا تفش ذلك بين الناس؛ بل أنصحه واستر عليه، فإن توفق واهتدى وترك ما هو عليه؛ كان ذلك هو المراد، وإلا وجب عليك أن تبين أمره للناس؛ لئلا يغتروا به.وهب أنك وجدت إنساناً مبتلى بالنظر إلى النساء، ولا يغض بصره، فاستر عليه، وانصحه وبين له أن هذا سهم من سهام إبليس؛ لأن النظر – والعياذ بالله – سهم من سهام إبليس يصيب به قلب العبد، فإن كان عنده مناعة، اعتصم بالله من هذا السهم الذي ألقاه الشيطان في قلبه، وإن لم يكن عنده مناعة؛ أصابه السهم، وتدرج به إلى أن يصل إلى الفحشاء والمنكر والعياذ بالله يكون أشد عذاباً.فما دام الستر ممكناً، ولم يكن في الكشف عن عورة أخيك مصلحة راجحة أو ضرورة ملحة، فاستر عليه
ولا تفضحه”
“যেহেতু মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাবই হলো ভুল-ত্রুটি, অপূর্ণতা ও দোষে পরিপূর্ণ, তাই একজন মুসলিমের ওপর তার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে কর্তব্য হলো তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া তা মানুষের মধ্যে প্রচার না করা। তবে যদি এমন প্রয়োজন দেখা দেয় যে তা প্রকাশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা প্রকাশ করতেই হবে। কিন্তু কোনো প্রয়োজন না থাকলে তার দোষ গোপন রাখাই অধিক উত্তম ও শ্রেয়। কারণ মানুষ তো মানুষই; সে কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় (অর্থাৎ খারাপ ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে) ভুল করে, আবার কখনো সত্য বিষয়টি তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বাতিল কথা বলে বা বাতিল কাজ করে। অথচ একজন মুমিনকে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ধরা যাক, আপনি একজন লোককে কেনাবেচায় মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করতে দেখলেন। তখন তার বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রচার করবেন না; বরং তাকে উপদেশ দিন এবং তার দোষ গোপন রাখুন। অতঃপর যদি আল্লাহ তাকে তাওফীক দেন, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং তার সেই কাজ পরিত্যাগ করে, তবে সেটাই তো উদ্দেশ্য। কিন্তু যদি সে তা পরিত্যাগ না করে, তখন মানুষের কাছে তার অবস্থা স্পষ্ট করে দেওয়া আপনার জন্য অপরিহার্য হবে, যাতে মানুষ তার দ্বারা প্রতারিত না হয়।আবার ধরা যাক, আপনি এমন একজন ব্যক্তিকে পেলেন, যে নারীদের দিকে তাকানোর পরীক্ষায় আক্রান্ত এবং সে তার দৃষ্টি অবনত রাখে না। তখনও তার দোষ গোপন রাখুন এবং তাকে উপদেশ দিন। তাকে বুঝিয়ে বলুন, এটি ইবলিসের নিক্ষিপ্ত তীরসমূহের একটি। কেননা (অবৈধ) দৃষ্টি ইবলিসের তীরসমূহের একটি, যার দ্বারা সে বান্দার অন্তরে আঘাত হানে। যদি তার অন্তরে প্রতিরোধশক্তি থাকে, তবে সে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে শয়তানের নিক্ষিপ্ত এ তীর থেকে আত্মরক্ষা করবে। আর যদি তার সেই প্রতিরোধশক্তি না থাকে, তবে সেই তীর তার অন্তরে বিদ্ধ হবে এবং ধাপে ধাপে তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। তখন তার শাস্তি আরও কঠিন হবে।সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত গোপন রাখা সম্ভব এবং তোমার ভাইয়ের দোষ প্রকাশ করার মধ্যে কোনো বড় কল্যাণ বা জরুরি প্রয়োজন না থাকে, ততক্ষণ তার দোষ গোপন রাখো এবং তাকে লাঞ্ছিত করো না।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬)
.
মুনকার বা অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধ করা এবং মানুষের সামনে সত্য স্পষ্ট করা অবশ্যই জরুরি। তবে এ উদ্দেশ্যে পাপী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা আবশ্যক নয়। বরং তার পরিচয় গোপন রেখে বিষয়টি তুলে ধরা অধিকতর হিকমতপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রদান করা হয়, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশোধনের সুযোগও অক্ষুণ্ন থাকে। হতে পারে, গোপনে নসিহত ও দোষ গোপন রাখার ফলে আল্লাহ তাকে তাওফীক দান করবেন, সে তাওবা করে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করবে এবং তার অনুসারীরাও এ থেকে শিক্ষা ও উপকার লাভ করবে।
.
এ বিষয়ে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন;
“وترك ذكر اسم الشخص فيه فائدتان عظيمتان:الفائدة الأولى: الستر على هذا الشخص.
الفائدة الثانية: أن هذا الشخص ربما تتغير حاله؛ فلا يستحق الحكم الذي يحكم عليه في الوقت الحاضر؛ لأن القلوب بيد الله، فمثلاً: هب أنني رأيت رجلاً على فسق، فإذا ذكرت اسمه، فقلت لشخص: لا تكن مثل فلان؛ يسرق أو يزني أو يشرب الخمر، أو ما أشبه ذلك، فربما تتغير حال هذا الرجل، ويستقيم، ويعبد الله، فلا يستحق الحكم الذي ذكرته من قبل، فهذا كان الإبهام في هذه الأمور أولى وأحسن، لما فيه من ستر، ولما فيه من الاحتياط إذا تغيرت حال الشخص”.
“কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করার মধ্যে দুটি মহৎ উপকার রয়েছে:
প্রথম উপকার: ঐ ব্যক্তির ওপর পর্দা রাখা (তার দোষ গোপন রাখা)।
দ্বিতীয় উপকার: ওই ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। তখন বর্তমান সময়ে তার ব্যাপারে যে বিধান বা মন্তব্য করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সে তার আর উপযুক্ত নাও থাকতে পারে। কারণ অন্তরসমূহ আল্লাহর হাতেই রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ,আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে পাপাচারে লিপ্ত দেখি, অতঃপর তার নাম উল্লেখ করে কাউকে বলি তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না,সে চুরি করে, ব্যভিচার করে, মদ পান করে ইত্যাদি। পরে যদি ঐ ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়, সে সঠিক পথে ফিরে আসে এবং আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে, তাহলে আগে যে অপবাদ বা মন্তব্য করা হয়েছিল, তা তার জন্য আর উপযুক্ত থাকবে না। তাই এ ধরনের বিষয়ে ব্যক্তির নাম গোপন রাখা অধিক উত্তম ও ভালো;কারণ এতে একদিকে তার দোষ গোপন থাকে, অন্যদিকে পরবর্তীতে যদি তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে তার সম্পর্কে এমন কথা বলার কারণে অন্যায়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও নিরাপদ থাকা যায়।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৪৬)
.
পরিশেষে সারকথা হলো: ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের মূলনীতি হলো—আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে তাকে একান্তে নসিহত করা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে তার দোষ মানুষের সামনে প্রকাশ না করা। এতে তার সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে এবং সংশোধনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। তবে যদি কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে ভ্রান্ত আকীদা, বিদআত, হারাম কাজ বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিভ্রান্তি প্রচার করে এবং গোপনে নসিহত করার পরও তা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাকে হেয় বা অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং সত্যকে সুস্পষ্ট করা, মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা এবং বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধের স্বার্থে তার ভুল প্রকাশ্যে খণ্ডন ও সতর্ক করা শরীয়তসম্মত; বরং কখনো কখনো তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর যেখানে ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করেও উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব, সেখানে নাম গোপন রাখাই অধিক হিকমতপূর্ণ ও উত্তম। একই সঙ্গে যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তার উচিত নিজেও সে আদেশের ওপর আমল করা এবং যে বিষয় থেকে নিষেধ করেন, তা নিজে বর্জন করা। আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে এ বিষয়ে তিরস্কার করে বলেন, “তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা বুঝো না?” (সূরা আল-বাকারা: ৪৪)। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় কিন্তু নিজে তা পালন করে না এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে অথচ নিজেই তা করে, তার ব্যাপারে হাদীসে কঠিন সতর্কবাণী এসেছে। অতএব, এ বিষয়ে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো—কাউকে অপমান বা হেয় করা নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কল্যাণকামিতা, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ফিতনা ও অনিষ্ট প্রতিরোধ করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

নখ গোঁফ বগলের লোম ও লজ্জাস্থানের লোম চল্লিশ দিনের বেশি রেখে দেওয়ার বিধান কী

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে নখ, গোঁফ, বগলের লোম ও লজ্জাস্থানের লোম চল্লিশ দিনের বেশি রেখে দেওয়ার বিধান কী? চল্লিশ দিন কি এসব অপসারণের নির্ধারিত সময়, নাকি এটি সর্বোচ্চ সীমা? আর ইচ্ছাকৃতভাবে এ সীমা অতিক্রম করলে একজন মুসলিমের হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওপর অতঃপর, সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে,চল্লিশ দিন পার হওয়ার আগেই নখের পরিচর্যা করা, গুপ্ত অঙ্গের লোম কাটা আবশ্যক। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নখ কাটা, নাভির নীচের পশম কাটা, বগলের পশম উপড়ানো এবং গোঁফ ছাটাই করার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন: এই মর্মে সহিহ মুসলিমে হা/২৫৮ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস সাব্যস্ত হয়েছে। আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, “وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً “গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভীর নিচের লোম ছেঁচে ফেলার জন্য আমাদেরকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে আমরা তা চল্লিশ দিনের অধিক দেরি না করি।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৫) তাই নর-নারী উভয়ের উপর এই বিষয়টি লক্ষ্য রাখা ওয়াজিব যে চল্লিশ দিনের বেশি সময় নখ, গোঁফ, নাভির নীচের পশম ও বগলের পশম রেখে দেওয়া যাবে না।আর এ বিধানের অন্যতম হিকমত হলো পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখা।
.
উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,”معناه: أن لا نترك تركا يتجاوز الأربعين.وقوله: ( وُقِّتَ لَنَا) هو من الأحاديث المرفوعة، مثل قوله: ” أمرنا بكذا “، وقد جاء في غير صحيح مسلم: ( وقت لنا رسول الله صلى الله عليه وسلم )، والله أعلم “এর অর্থ হলো—আমরা যেন এগুলো এমনভাবে অবহেলা করে না রাখি, যার মেয়াদ চল্লিশ রাত অতিক্রম করে যায়। আর তাঁর (আনাস রা.-এর) উক্তি:’আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে’—এই উক্তিটি মারফূ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, যেমন সাহাবিদের এই কথা যে, ‘আমাদের অমুক কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’। সহিহ মুসলিম ব্যতীত অন্য গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে: ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন’, আল্লাহই ভালো জানেন।”(শারহু সহিহ মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”وفي الحديث: (وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً).اعلم أنه متى زاد الزمان على هذا المقدار كثرت الأوساخ، وربما حصل تحت الظفر ما يمنع وصول الماء إليه. ثم إنها تعدم الزينة التي خصت بالأظفار والشارب”আর হাদিসে এসেছে: গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভীর নিচের লোম ছেঁচে ফেলার জন্য আমাদেরকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে আমরা তা চল্লিশ দিনের অধিক দেরি না করি।” জেনে রাখুন, যখন এর চেয়ে বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়, তখন শরীরে ময়লা-আবর্জনা জমে যায়। এমনকি নখের নিচে এমন কিছু জমে যেতে পারে যা (অজু বা গোসলের সময়) সেখানে পানি পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। তাছাড়া এর মাধ্যমে সেই সৌন্দর্যও নষ্ট হয়ে যায় যা নখ ও গোঁফের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।”(কাশফুল মুশকিল; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৩)
.
দ্বিতীয়ত: নখ কাটা এবং বগল ও নাভির নিচের লোম অপসারণে ৪০ রাত হলো সর্বোচ্চ সময়সীমা। এর অর্থ এই নয় যে, সুন্নত হলো ঠিক ৪০ রাত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর এগুলো অপসারণ করা। বরং সঠিক কথা হচ্ছে, যখনই নখ বা গুপ্ত অঙ্গের লোম বড় হয়ে যায় এবং অপসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই তা কেটে বা পরিষ্কার করে ফেলা সুন্নত ও উত্তম। তাই কোনো অবস্থাতেই ৪০ রাতের বেশি বিলম্ব করা বৈধ নয়। ইবনে হুবাইরা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:هذا الحديث هو الغاية في تأخير ذلك، والأولى أخذ ذلك فيما قبل هذه الغاية “এই হাদীসটি দেরি করার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। আর উত্তম হলো, এই সীমা পূর্ণ হওয়ার আগেই তা অপসারণ করা।”(আল ইফসাহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৯৬)
.
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,”وأما وقت حلقه – أي شعر القبل – فالمختار أنه يضبط بالحاجة وطوله، فإذا طال حلق، وكذلك الضبط في قص الشارب، ونتف الإبط، وتقليم الأظفار، وأما حديث أنس المذكور في الكتاب: ( وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً )، فمعناه: لا يترك تركا يتجاوز به أربعين، لا أنهم وقت لهم الترك أربعين، والله أعلم “
“আর লজ্জাস্থানের লোম কাটার সময়ের ব্যাপারে—নির্বাচিত মত হলো যে, এটি প্রয়োজন এবং এর দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। সুতরাং যখন এগুলো বড় হয়ে যায়, তখন তা কেটে ফেলতে হবে। অনুরূপ নিয়ম প্রযোজ্য গোঁফ ছাঁটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নখ কাটার ক্ষেত্রেও।আর কিতাবে বর্ণিত আনাস (রা.)-এর হাদিস: (‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং লজ্জাস্থানের লোম কাটার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন চল্লিশ রাতের বেশি সময় তা ফেলে না রাখি’)—এর অর্থ হলো: চল্লিশ রাতের বেশি সময় কোনো অবস্থাতেই এগুলো ফেলে রাখা যাবে না। এর অর্থ এই নয় যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত ফেলে রাখতেই হবে বলে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।ওয়াল্লাহু আ’লাম।”(শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৪৮,১৪৯)
.
তৃতীয়ত: এটিও জানা উচিত যে, হাদীসে ‘চল্লিশ রাত’ বলা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, লোম কেবল রাতের বেলায় কাটতে হবে বা সময়ের হিসাব শুধু রাতের ভিত্তিতেই হবে। বরং আরবি ভাষার প্রচলিত রীতিতে ‘রাত’ দ্বারা একটি পূর্ণ দিন-রাতের সময়কাল (২৪ ঘণ্টা) বোঝানো হয়। তাই এখানে উদ্দেশ্য হলো—চল্লিশ দিনের বেশি এ কাজ বিলম্বিত না করা।
.
ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহ তাআলার বাণী: (وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ) البقرة/51. قال رحمه الله تعالى:” وإنما ذكرت الليالي دون الأيام، لأن عادة العرب التأريخ بالليالي، لأن أول الشهر ليلة، واعتماد العرب على الأهلة، فصارت الأيام تبعا لليالي“আর যখন আমি মূসার জন্য চল্লিশ রাতের প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করেছিলাম, তারপর তাঁর (তূর পর্বতে যাওয়ার) পর তোমরা বাছুরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলে।”(সূরা আল-বাকারা: ৫১) এর ব্যাখ্যায় বলেন: “এখানে দিনের পরিবর্তে শুধু ‘রাত’-এর উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ আরবদের রীতি ছিল রাতকে ভিত্তি করে সময় গণনা ও তারিখ নির্ধারণ করা। কেননা মাসের সূচনা হয় রাত থেকেই, আর তাদের সময় গণনা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই দিনগুলোকে রাতের অনুসারী (অন্তর্ভুক্ত) হিসেবে ধরা হতো।”(যাদুল মাসীর: ১/৮০)
.
মোটকথা ‘চল্লিশ রাত’ বলতে শুধু রাতগুলো বোঝানো হয়নি; বরং পূর্ণ চল্লিশ দিন-রাতের সময়কালই উদ্দেশ্য। তাই হাদিসে ‘চল্লিশ রাত’ বলা হলেও এর অর্থ চল্লিশ পূর্ণ দিন-রাত, শুধুমাত্র রাত নয়।এছাড়া আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু).-এর হাদীসের আরেকটি বর্ণনায়, যা নাসাঈ ১৪ নং হাদীসে এসেছে, সেখানে দিন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব, হিসাব মানুষের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হবে। আমাদের বর্তমান সময়ে লোম কাটার পর প্রতি ২৪ ঘণ্টা অতিক্রম করলে এক দিন পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য হবে। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হবে।
.
চতুর্থত: এখন চল্লিশ দিনের বেশি সময় নখ এবং লজ্জাস্থানের লোম না কাটার বিধান কী? এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ী মাযহাবের মতে, চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা মাকরূহ। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” تقليم الأظفار، وإزالة شعر العانة، بحلق، أو نتف، أو قص، أو نورة، أو غيرها، والحلق أفضل. ويستحب إزالة شعر الإبط بأحد هذه الأمور، والنتف أفضل لمن قوي عليه. ويستحب قص الشارب، بحيث يبين طرف الشفة بيانا ظاهرا. ويبدأ في هذه كلها، باليمين، ولا يؤخرها عن وقت الحاجة، ويكره كراهة شديدة، تأخيرها عن أربعين يوما، للحديث في “صحيح مسلم” بالنهي عن ذلك “নখ কাটা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ করা—কামিয়ে, উপড়ে, কেটে, নাউরা (লোম অপসারণের বিশেষ মিশ্রণ) ব্যবহার করে অথবা অন্য যেকোনো উপায়ে করা যায়; তবে কামিয়ে ফেলা উত্তম। অনুরূপভাবে, এসব উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে বগলের লোম অপসারণ করা মুস্তাহাব; তবে যার পক্ষে সম্ভব ও কষ্টসহনীয়, তার জন্য উপড়ে ফেলা উত্তম। আর গোঁফ এমনভাবে ছাঁটা মুস্তাহাব, যাতে ঠোঁটের কিনারা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এসব কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা মুস্তাহাব। প্রয়োজনের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এগুলো বিলম্বিত করা উচিত নয়। আর চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা অত্যন্ত মাকরূহ। কেননা, সহীহ মুসলিমে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা-সংবলিত হাদিস বর্ণিত হয়েছে।”(নববী; রাওযাতুত ত্ব-তালিবীন: ৩/২৩৪)
.
হাম্বলী মাযহাবেও একই মত পাওয়া যায়।মাতালিবু উলিন নুহা গ্রন্থে বলা হয়েছে: فإن تركه فوق أربعين يوما: كره ، لحديث أنس قال: ( وقت لنا في قص الشارب وتقليم الأظفار ونتف الإبط وحلق العانة؛ أن لا يترك فوق أربعين ) رواه مسلم “যদি কেউ এগুলো (গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ) চল্লিশ দিনের বেশি সময় পর্যন্ত ফেলে রাখে, তবে তা মাকরূহ। কারণ আনাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন: ‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম কামানোর ব্যাপারে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে—যাতে আমরা এগুলো চল্লিশ দিনের বেশি ফেলে না রাখি।” (সহীহ মুসলিম; মাতালিবু উলিন নুহা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮৭)
.
অন্যদিকে, হানাফী মাযহাব এবং অন্যান্য কিছু সংখ্যক আলেমের মতে, হাদীসে উল্লেখিত এসব বিষয় চল্লিশ দিনের বেশি ফেলে রাখা হারাম।ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) হাশিয়াতু ইবনু আবেদীন -এ বলেন:قال في “شرح المنية”: وفي “المضمرات” عن ابن المبارك في تقليم الأظفار وحلق الرأس في العشر، أي عشر ذي الحجة، قال: لا تؤخَّر السُّنَّة، وقد ورد ذلك، ولا يجب التأخير اهـ.”শারহুল মুনইয়াহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, আর ‘আল-মুদাম্মারাত’ গ্রন্থে ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে নখ কাটা ও মাথা মুণ্ডানো সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে,“সুন্নতকে বিলম্বিত করা উচিত নয়। এ বিষয়ে (অর্থাৎ সুন্নত বিলম্ব না করার ব্যাপারে) বর্ণনা এসেছে। তবে বিলম্ব করাই যে আবশ্যক—এমনটি নয়।”(হাশিয়াতু ইবনু আবেদীন (৩/৬৬)
.
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যখন জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানির ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।”এই হাদীসটি আলেমগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী ওয়াজিবের নয়, বরং মুস্তাহাব (অনুপ্রেরণামূলক) বিধানের ওপর বহন করা হবে। সুতরাং এর দ্বারা বোঝা যায় যে, চুল ও নখ কাটা বিলম্বিত করা ওয়াজিব নয়।তবে কোনো কাজ ওয়াজিব না হওয়া, সেটি মুস্তাহাব হওয়ার বিরোধী নয়।অতএব, (কুরবানির ইচ্ছা থাকলে) চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব। কিন্তু যদি তা বিলম্ব করতে গিয়ে শরীয়ত অনুমোদিত সময়সীমা অতিক্রম হয়ে যায়, তাহলে আর তা মুস্তাহাব থাকবে না। আর বিলম্ব করার সর্বোচ্চ সীমা হলো চল্লিশ দিনের কম; চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা বৈধ নয়।আল কুনইয়াহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:”القنية”: الأفضل أن يقلم أظفاره ويقص شاربه ويحلق عانته وينظف بدنه بالاغتسال في كل أسبوع، وإلا ففي كل خمسة عشر يوما، ولا عذر في تركه وراء الأربعين، ويستحق الوعيد. فالأول: أفضل، والثاني: الأوسط، والأربعون: الأبعد”উত্তম হলো প্রতি সপ্তাহে একবার নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, লজ্জাস্থানের লোম অপসারণ করা এবং গোসলের মাধ্যমে শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত প্রতি পনেরো দিনে একবার তা করা উচিত। আর চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করার কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত নেই; (এর চেয়ে বেশি বিলম্বকারী) ব্যক্তি শাস্তির হুমকির উপযুক্ত হবে। অতএব, প্রতি সপ্তাহে একবার করা সর্বোত্তম; প্রতি পনেরো দিনে একবার করা মধ্যম পর্যায়ের; আর চল্লিশ দিনের (সীমা অতিক্রম করার) পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করা সর্বশেষ সীমা।”(ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতওয়া নং-৩৯৪৬২২)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] মত প্রকাশ করেছেন যে, ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই এসব অপসারণ করা ওয়াজিব। তিনি বলেন:
” الأظفار يجب تعهدها قبل مضي أربعين ليلة؛ لأن رسول الله صلى الله عليه وسلم وقّت للناس في قلم الأظفار، وحلق العانة، ونتف الإبط، وقص الشارب: ألا يترك ذلك أكثر من أربعين ليلة، هكذا ثبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم… “
“নখের যত্ন নেওয়া (অর্থাৎ সময়মতো নখ কাটা) ৪০ রাত অতিক্রম হওয়ার আগেই আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের জন্য নখ কাটা, লজ্জাস্থানের লোম কামানো, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং গোঁফ ছাঁটার ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন—যেন এগুলো ৪০ রাতের বেশি অবহেলায় না রাখা হয়। এভাবেই রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সহীহভাবে প্রমাণিত হয়েছে…”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড:১০; পৃষ্ঠা: ৫০)
.
.সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ-কে বর্তমান যুগে নারীদের নখ বড় রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে
তারা উত্তর দেন:
” لا يجوز تطويل الأظافر؛ لأن هذا مخالف لسنن الفطرة التي حث عليها النبي صلى الله عليه وسلم ومنها (قص الأظافر).
الواجب في تقليم الأظفار ونتف الإبط وحلق العانة وقص الشارب، أن لا يترك شيء من ذلك أكثر من أربعين ليلة؛ لما روى مسلم في “صحيحه” عن أنس رضي الله عنه قال: ( وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً )، فيجب على هؤلاء النسوة التوبة إلى الله، وترك هذه العادة السيئة المخالفة لما أمر به النبي صلى الله عليه وسلم، والله سبحانه وتعالى يقول: ( وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا )، ويقول سبحانه: ( فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ )
“নখ বড় করে রাখা জায়েয নয়। কারণ এটি ফিতরাতের (স্বভাবজাত সুন্নতসমূহের) অন্তর্ভুক্ত সুন্নতের বিরোধী। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব ফিতরাতের সুন্নতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন, তার অন্যতম হলো নখ কাটা।নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের লোম (যৌনাঙ্গের আশপাশের লোম) অপসারণ করা এবং গোঁফ ছাঁটা—এসব বিষয়ে কর্তব্য হলো,এগুলোর কোনোটি যেন চল্লিশ রাতের বেশি অবহেলায় রেখে দেওয়া না হয়। কারণ, ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে আনাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ করার ব্যাপারে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে—যাতে আমরা এগুলোর কোনোটি চল্লিশ রাতের বেশি রেখে না দিই।’ অতএব, এসব নারীর ওপর আল্লাহর নিকট তাওবা করা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনার বিরোধী এই নিকৃষ্ট অভ্যাস পরিত্যাগ করা আবশ্যক।মহান আল্লাহ বলেন: “রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো; আর তিনি তোমাদের যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”(সূরা আল-হাশর:৭) তিনি আরও বলেন: “অতএব, যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে—কোথাও তাদের ওপর কোনো ফিতনা (বিপর্যয়) এসে না পড়ে অথবা তাদের ওপর কোনো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে না আসে।”(সূরা আন-নূর: ৬৩; ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬০)
.
পরিশেষে বলা যায়, নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং লজ্জাস্থানের লোম অপসারণ ফিতরাতের সুন্নতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সহীহ হাদীস অনুযায়ী এগুলো চল্লিশ দিনের বেশি অবহেলায় ফেলে রাখা বৈধ নয়; বরং চল্লিশ দিন হলো সর্বোচ্চ সময়সীমা, নির্ধারিত সময় নয়। তাই প্রয়োজন দেখা দিলেই এগুলো অপসারণ করা সুন্নত ও উত্তম।আর শরয়ী কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনার বিরোধিতা এবং নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন। এ কারণে অধিকাংশ সমসাময়িক মুহাক্কিক আলেমের মতে এতে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদিও ফকীহদের মধ্যে এ বিষয়ে হারাম ও তীব্র মাকরূহ—উভয় মতই বিদ্যমান। অতএব একজন মুসলিমের উচিত চল্লিশ দিনের আগেই এসব ফিতরাতের সুন্নতের যথাযথ পরিচর্যা করা। (গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৯৪৬২২) আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী

 প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়? এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ কিংবা মূল ফাতওয়ায় কি কোনো ভুল রয়েছে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, সম্প্রতি এক ভাইকে দেখলাম আমাদের সম্মানিত কয়েকজন তরুণ দাঈ কর্তৃক অনূদিত ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন নামক গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়া—যার বিষয় মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তিনি প্রথমে দাবি করেন যে ফাতওয়ার অনুবাদে ভুল রয়েছে; কিন্তু কোথায় সেই ভুল হয়েছে জানতে চাওয়া হলে কোনো সুস্পষ্ট ইলমি ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করে পরবর্তীতে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মূল ফাতওয়াকেই ভুল বলে মন্তব্য করেন। অথচ তাঁর বক্তব্য ও আলোচনার ধরন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ বিষয়ে তাঁর পর্যাপ্ত ইলম ও গভীর গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।কারন বাস্তবতা হলো,ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীন-এর উক্ত ফাতওয়ার অনুবাদে কোনো ভুল প্রমাণিত হয়নি এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতকে সরাসরি ভুল বলা ন্যায়সংগত নয়। কারণ, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—এটি একটি সুপরিচিত ইজতিহাদি মাসআলা, যাতে প্রাচীন ও সমকালীন বহু আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ফাতওয়াটি তাঁর নিজস্ব কোনো ব্যতিক্রমী মত নয়; বরং তাঁর পূর্বেও বহু ইমাম একই মত গ্রহণ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে এর পক্ষে দলিল ও ইলমি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী।একই সঙ্গে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) নিজে এ আমলকে উত্তম বা অগ্রাধিকারযোগ্য বলেননি; বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য সংরক্ষণ করা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কেননা, দোয়াই তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব উৎসর্গ করার চেয়ে অধিক উত্তম ও উপকারী। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী। আমাদের সেই ভাইয়ের প্রতি আন্তরিক নসীহত হলো—শরঈ বিষয়ে কথা বলার সময় আল্লাহকে ভয় করুন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করে কথা বলুন এবং কোনো মতের সমালোচনা করতে চাইলে তা কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিনয়, ইনসাফ ও ইলমি পদ্ধতিতে উপস্থাপন করুন। কারণ, বিশুদ্ধ ইলম ছাড়া শরঈ বিষয়ে মন্তব্য করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথ প্রমাণ ব্যতীত কোনো ফাতওয়াকে ভুল হিসেবে প্রচার করা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী, মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন কি না, এবং এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ বা মূল ফাতওয়ায় কোনো ভুল রয়েছে কি না—এসব বিষয় কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষেপে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।
.
◽কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়?
.
প্রথমত: প্রথমেই জানা উচিত, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে তা তার কাছে পৌঁছায় কি না—এটি কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত (কাতঈ) দলিল দ্বারা প্রমাণিত এমন কোনো আকীদাগত বিষয় নয়, যার ওপর ঈমান আনা ফরজ; বরং এটি একটি ফিকহি ও ইজতিহাদভিত্তিক মাসআলা, যেখানে যুগে যুগে নির্ভরযোগ্য আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আলোচনা, গবেষণা বা মতামত প্রদান করতে হলে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং সালাফে সালেহীনের বুঝের আলোকে ইলমী আমানতদারিতা, ইনসাফ ও শরয়ী আদব বজায় রাখা অপরিহার্য। এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদকে আকীদাগত বিরোধে রূপ দেওয়া, কিংবা এর কারণে কাউকে বিদআতী, পথভ্রষ্ট বা আহলুস সুন্নাহর গণ্ডির বাইরে আখ্যায়িত করা মোটেও সঙ্গত নয়। বিশেষত যারা এ মাসআলায় অতি কঠোরতা বা বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়ে নিজেদের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মনে করে এবং ভিন্নমত পোষণকারী নির্ভরযোগ্য আলেমদের ইজতিহাদকে অবমূল্যায়ন বা নিন্দা করে, তারা ইলমী ইনসাফ ও আহলুস সুন্নাহর আদব থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অতএব, এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদের ক্ষেত্রে দলিলের অনুসরণ, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়পরায়ণতা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখাই একজন তালিবুল ইলম ও আহলুস সুন্নাহর অনুসারীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।
.
দ্বিতীয়ত: মূলনীতি হলো, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার নিজস্ব আমলের ধারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং তার আমলনামায় নতুন করে কোনো নেকি লিপিবদ্ধ হয় না। তবে শরীয়তে এ মূলনীতির কিছু সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। সহীহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু নেক আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতে পারেন এবং তার নিকট সেই আমলের সওয়াব পৌঁছাতে পারে। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকার লাভ করা হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১)। তবে জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় কি না—এ বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। (১). প্রথম মত অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে এবং তিনি এর দ্বারা উপকৃত হন। (২). আর দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে তা তার নিকট পৌঁছে না; বরং এ ক্ষেত্রে কেবল সেই সব আমলই মৃতের উপকারে আসে, যেগুলোর পক্ষে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় সুস্পষ্ট দলিল বিদ্যমান।
.
▪️প্রথম মত অনুযায়ী: যারা বলেন যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে, তারা এ বিষয়ে কুরআন বা সহিহ হাদিস থেকে কোনো সুস্পষ্ট, সহিহ ও সরাসরি দলিল পেশ করতে পারেন না। বরং তাদের মতের ভিত্তি হলো কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) এবং শরীয়তে প্রমাণিত কিছু সাধারণ নীতিমালা। তাদের বক্তব্য হলো, যেহেতু সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে মৃত ব্যক্তি জীবিতের দোয়া, সদকা, হজ্জ এবং মান্নতের রোজার মাধ্যমে উপকৃত হয়, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও তার কাছে পৌঁছানো উচিত। অর্থাৎ, তারা কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য কোনো স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট দলিল উপস্থাপন করেন না; বরং অন্যান্য ইবাদতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর প্রমাণের ওপর কিয়াস করে এ মত গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে তারা বিশেষভাবে দোয়ার দলিল পেশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ﴾ — “হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী মুমিন ভাইদের ক্ষমা করে দিন।” (সূরা আল-হাশর: ১০)। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু দোয়া মৃতের উপকারে আসে, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও পৌঁছাবে। একইভাবে সহিহ হাদিসে মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা, হজ্জ আদায় করা এবং মান্নতের রোজা পূরণ করার অনুমতি ও তার উপকারিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই তাদের দাবি, যখন এসব ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়, তখন কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও কিয়াসের ভিত্তিতে তার অন্তর্ভুক্ত হবে।এ মতটি হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী মত। এছাড়া কিছু শাফেয়ি আলেম, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং আরও বহু আলেম এ মতকে সমর্থন করেছেন। এমনকি এটিই জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের অভিমত। কিন্তু শাইখ ইবনু উসাইমীন, শাইখ আল-আলবানী প্রমুখ আলেম বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতকে উৎসর্গ করার পক্ষে সহিহ ও স্পষ্ট কোনো দলিল নেই। তাই এটিকে ইবাদত হিসেবে নিয়মিত করা শরয়িসম্মত নয়। তবে মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, হজ ইত্যাদি—যেগুলোর ব্যাপারে সহিহ দলিল রয়েছে—সেগুলোই করা উচিত।
.
আল মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ-এ বলা হয়েছে:
ذهب الحنفية والحنابلة إلى جواز قراءة القرآن للميت وإهداء ثوابها لـه، قال ابن عابدين نقلاً عن البدائع: ولا فرق بين أن يكون المجعول لـه ميتاً أو حياً، والظاهر أنه لا فرق بين أن ينوي به عند الفعل للغير أو يفعل لنفسه، ثم بعد ذلك يجعل ثوابه لغيره.وقال الإمام أحمد: الميت يصل إليه كل شيء من الخير، للنصوص الواردة فيه، ولأن الناس يجتمعون في كل مِصْرٍ، ويقرؤون ويهدون لموتاهم من غير نكير فكان إجماعاً. قاله البهوتي من الحنابلة.
وذهب المتقدمون من المالكية إلى كراهة قراءة القرآن للميت، وعدم وصول ثوابها إليه، لكن المتأخرين على أنه لا بأس بقراءة القرآن والذكر وجعل الثواب للميت ويحصل له الأجر.وقال ابن هلال: الذي أفتى به ابن رشد، وذهب إليه غير واحد من أئمتنا الأندلسيين، أن الميت ينتفع بقراءة القرآن الكريم ويصل إليه نفعه، ويحصل لـه أجره إذا وهب القارئ ثوابه لـه، وبه جرى عمل المسلمين شرقاً وغرباً، ووقفوا على ذلك أوقافاً، واستمر عليه الأمر منذ أزمنة سالفة.والمشهور من مذهب الشافعي أنه لا يصل ثواب القراءة إلى الميت، وذهب بعض الشافعية إلى وصول ثواب القراءة للميت، قال سليمان الجمل: ثواب القراءة للقارئ، ويحصل مثله أيضاً للميت، لكن إن كان بحضرته أو بنيته، أو يجعل ثوابها لـه بعد فراغها على المعتمد في ذلك.
“হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের মত:হানাফি ও হাম্বলি পন্থীগণ মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার সওয়াব তাকে বখশে দেওয়া (দান করা) জায়েয বলে মত দিয়েছেন। ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-বাদায়ে‘’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন,যার জন্য সওয়াব দান করা হবে সে ব্যক্তি জীবিত হোক কিংবা মৃত, তাতে কোনো পার্থক্য নেই। তিলাওয়াত করার সময় থেকেই অন্যের জন্য নিয়ত করা কিংবা নিজের জন্য আমল করার পর তার সওয়াব অন্যকে দান করা—উভয় পদ্ধতির মাঝেই দৃশ্যত কোনো পার্থক্য নেই।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মৃত ব্যক্তির কাছে সব ধরনের নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে। কারণ এ বিষয়ে বিভিন্ন দলিল রয়েছে। তাছাড়া মুসলমানরা সব যুগে ও সব দেশে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে তাদের মৃতদের সওয়াব দান করে আসছে,অথচ এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত বা অস্বীকৃতি জানা যায়নি; সুতরাং এটি ইজমা (ঐকমত্য) হিসেবে গণ্য।” কথাটি হাম্বলি আলেম আল-বাহূতি (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন।
মালিকি মাযহাবের মত: প্রাচীন মালিকি আলেমদের মতে, মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ এবং এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। তবে পরবর্তী মালিকি আলেমদের মতে, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি করে তার সওয়াব মৃতকে দান করতে কোনো অসুবিধা নেই এবং মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন।ইবনু হিলাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ইবনু রুশদ (রাহিমাহুল্লাহ) যে ফতোয়া দিয়েছেন এবং আন্দালুসের আমাদের বহু ইমাম যে মত গ্রহণ করেছেন তা হলো মৃত ব্যক্তি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের উপকার লাভ করেন এবং তিলাওয়াতকারী যদি তার সওয়াব মৃতকে তাকে দান করেন, তবে সে সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিম উম্মাহর সর্বযুগের আমল এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা ওয়াকফ বা endowments নির্ধারণ করেছেন এবং সুদূর অতীত থেকেই এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে।
শাফেয়ি মাযহাবের মত: প্রসিদ্ধ শাফেয়ি মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না।তবে শাফেয়ি মাযহাবের কিছু আলেম বলেন, কুরআনের তিলওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে।সুলাইমান জামাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:তিলওয়াতের মূল সওয়াব তো তিলাওয়াতকারীর জন্যই। তবে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী,যদি মৃত ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিলাওয়াত করা হয়, অথবা তার জন্য নিয়ত করা হয়, কিংবা তিলাওয়াত শেষ করে তার সওয়াব মৃতকে দান করা হয়, তাহলে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী মৃতও অনুরূপ সওয়াব লাভ করবেন।”(আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৩; পৃষ্ঠা:  ৬০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] তাঁর আল মুগনী গ্রন্থে মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর পক্ষে কিছু দলিল উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:وهذه أحاديث صحاح، وفيها دلالة على انتفاع الميت بسائر القرب، لأن الصوم والحج والدعاء والاستغفار عبادات بدنية قد أوصل الله نفعها إلى الميت، فكذلك ما سواها مع ما ذكرنا من الحديث في ثواب من قرأ سورة (يس) وتخفيف الله -تعالى- عن أهل المقابر بقراءته، ولأنه إجماع المسلمين، فإنهم في كل عصر ومصر يجتمعون ويقرأون القرآن ويهدون ثوابه إلى موتاهم من غير نكير”এগুলো সহীহ হাদিস। এগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃত ব্যক্তি অন্যান্য নেক আমলের দ্বারাও উপকৃত হয়। কারণ, রোজা, হজ, দোয়া ও ইস্তিগফার এসব শারীরিক ইবাদতের উপকারও আল্লাহ মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেন। সুতরাং অন্যান্য ইবাদতও একইভাবে পৌঁছবে। এছাড়া সূরা ইয়াসীন পাঠের সওয়াব এবং তা পাঠ করার কারণে কবরবাসীদের শাস্তি লাঘব হওয়ার যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেটিও এর পক্ষে উল্লেখযোগ্য। আরও কারণ হলো, এটি মুসলিমদের ধারাবাহিক আমল। কেননা, প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে মুসলিমরা একত্রিত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন এবং তার সওয়াব তাদের মৃতদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন; এ বিষয়ে কোনো আপত্তি বা অস্বীকৃতি দেখা যায়নি।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৬৮)
.
হানাফী ফকীহগণও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি তা দ্বারা উপকৃত হন। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছেويقرأ سورة (يس) لما ورد: من دخل المقابر فقرأ سورة (يس) خفف الله عنهم يومئذ، وكان له بعدد من فيها حسنات”সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে। কারণ, বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি কবরস্থানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে, আল্লাহ সেদিন কবরবাসীদের শাস্তি হালকা করে দেবেন এবং পাঠকারীর জন্য সেখানে সমাহিত ব্যক্তিদের সংখ্যার সমপরিমাণ নেকি লেখা হবে। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩)
.
মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن ثوابها يصل إليه فقد ذكر أن في هذه المسألة قولين للعلماء، ثم رجح القول بوصول ثواب قراءة القرآن للميت فقال -رحمه الله- تعالى: “وأما الصيام، وصلاة التطوع، وقراءة القرآن فهذا فيه قولان للعلماء:الأول:- ينتفع به وهو مذهب أحمد وأبي حنيفة وغيرهما.الثاني: لا تصل إليه وهو المشهور في مذهب مالك.ثم قال –رحمه الله- في فتوى له: وتنازعوا في وصول الأعمال البدنية: كالصوم والصلاة وقراءة القرآن، والصواب أن الجميع يصل إليه، أي يصل ثوابها إلى الميت”নিশ্চয়ই মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করলে তার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন: আর রোজা, নফল সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এগুলো সম্পর্কে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত: এগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তি লাভ করে। এটি ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু হানিফা এবং আরও অনেক আলেমের মত। দ্বিতীয় মত: এগুলোর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। এটি ইমাম মালিকের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত।এরপর তিনি অন্য এক ফতোয়ায় বলেন: শারীরিক ইবাদত যেমন রোজা, সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক মত হলো, এসব ইবাদতের সওয়াবই মৃতের কাছে পৌঁছে।”(মাজমূউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৩১৫ ও ৩৬৬)
.
আর ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: والعبادات قسمان : مالية وبدنية ، وقد نبه الشارع بوصول ثواب الصدقة على وصول سائر العبادات المالية ، ونبه بوصول ثواب الصوم على وصول سائر العبادات البدنية وأخبر بوصول ثواب الحج المركب من المالية والبدنية، فالأنواع الثلاثة ثابتة بالنص والاعتبار .”ইবাদত মূলত দুই প্রকার (১) আর্থিক ইবাদত এবং (২) শারীরিক ইবাদত। শরীয়ত সদকার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য আর্থিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার রোজার সওয়াব পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য শারীরিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আর হজ যা আর্থিক ও শারীরিক উভয় ধরনের ইবাদতের সমন্বয় তার সওয়াবও পৌঁছায় বলে জানিয়েছে। সুতরাং এই তিন প্রকার ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো কুরআন-সুন্নাহর দলিল এবং সঠিক কিয়াস উভয় দ্বারাই প্রমাণিত।”(কিতাবুর রূহ পৃষ্ঠা: ৪৮)
.
তবে এ মতের আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানোর কথা ধরা হলেও, তিলাওয়াত অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে; এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ গ্রহণ করা যাবে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে সেই আমলে কোনো সওয়াব অবশিষ্ট থাকে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وأما الاستئجار لنفس القراءة –أي قراءة القرآن – والإهداء، فلا يصح ذلك، لأنه لا يجوز إيقاعها إلا على وجه التقرب إلى الله تعالى، وإذا فعلت بعروض لم يكن فيها أجر بالاتفاق، لأن الله تعالى إنما يقبل من العمل ما أريد به وجهه لا ما فعل لأجل عروض الدنيا.ثم قال – رحمه الله تعالى-: وأما إذا كان لا يقرأ القرآن إلا لأجل العروض – أي الأعواض المادية – فلا ثواب له على ذلك، وإذا لم يكن في ذلك ثواب فلا يصل إلى الميت شيء؛ لأنه إنما يصل إلى الميت ثواب العمل لا نفس العمل ..”শুধু কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। কেননা এ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হওয়া উচিত। যদি তা দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে সর্বসম্মতিক্রমে এতে কোনো সওয়াব থাকে না; কারণ আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত হয়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি কেবল অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করে, সে নিজেই এ তিলাওয়াতের কোনো সওয়াব পাবে না। আর যখন তার নিজেরই কোনো সওয়াব থাকবে না, তখন মৃতের কাছেও কিছু পৌঁছাবে না। কেননা মৃতের নিকট পৌঁছে আমলের সওয়াব, আমলটি নিজে নয়।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মৃতের কবরের কাছে অথবা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ার জন্য কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করার হুকুম কী?
উত্তরে তারা বলেন: (لا يجوز استئجار من يقرأ القرآن على قبر الميت أو على روحه، ويهب ثوابه للميت؛ لأنه لم يفعله النبي – صلى الله عليه وسلم -، ولا أحدٌ من السَّلف، ولا أمر به أحد من أئمة الدين، ولا رخص فيه أحد منهم فيما نعلم، والاستئجار على نفس التلاوة غير جائز بلا خلاف) “মৃতের কবরের কাছে বা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃতকে দান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা বৈধ নয়।কারণ,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটি করেননি, সালাফে সালেহীনদের কেউও করেননি। দ্বীনের কোনো ইমাম এ কাজের নির্দেশ দেননি, এবং আমাদের জানা মতে কেউ এর অনুমতিও দেননি। বিশেষ করে কেবল কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ বা দেওয়া এটি সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯;পৃষ্ঠা: ৩৫–৪১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: ولكن استئجار من يقرأ القرآن له هذا هو الذي يكون حراما، لأن قراءة القرآن قربة، والقربة لا يصح أخذ الأجرة عليها، فلو استأجروا شخصا يقرأ القرآن للميت فإن عقد الإجارة محرم، والقارئ لا يملك الأجرة بذلك، وليس له ثواب من قراءته، لأنه أراد بها غير وجه الله، والميت لا ينتفع بها حينئذ، لأنها ليست مقبولة يترتب عليها الأجر والثواب، وحينئذ يكون أهل الميت الذين بذلوا هذه الدراهم خاسرين، وقد فات الميت ما يرجونه من الثواب”তবে মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করা হারাম। কারণ, কুরআন তিলাওয়াত একটি ইবাদত, আর ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। যদি কেউ মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে ভাড়া করে, তাহলে সেই চুক্তি শরিয়তসম্মত নয়। এভাবে পাঠকারী ব্যক্তি ওই পারিশ্রমিকের অধিকারী নয় এবং তার তিলাওয়াতেরও কোনো সওয়াব হবে না। কারণ, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, বরং দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করেছে।ফলে মৃত ব্যক্তিও এর দ্বারা উপকৃত হবে না। কেননা, এ তিলাওয়াত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না, আর কবুল না হলে এর ওপর কোনো সওয়াবও নির্ধারিত হয় না।সুতরাং মৃতের স্বজনরা যারা এ অর্থ ব্যয় করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মৃত ব্যক্তিও যে সওয়াবের আশা তারা করেছিল, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
শাইখ বকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবু যায়েদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:عند حديثه عن المحدثات فائدة هذا نصها:(استئجار شخص أو أكثر لقراءة القرآن، وإهداء ثوابها لميت أو حي، وهذا عمل مبتدع، وقد فات ثواب القراءة على القارئ لما فيه من إرادة الإنسان بعمله الدنيا، وفات على المستأجر؛ لأنه عمل مبتدع، وقد قال – صلى الله عليه وسلم -:”من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد”)”একজন বা একাধিক ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করানো এবং সেই তিলাওয়াতের সওয়াব কোনো মৃত বা জীবিত ব্যক্তিকে দান করা একটি বিদআত। এতে তিলাওয়াতকারীর সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়, কারণ সে তার আমলের মাধ্যমে দুনিয়াবি স্বার্থ কামনা করেছে। আর যে ব্যক্তি তাকে ভাড়া করেছে, সেও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ সে একটি বিদআতী কাজ করেছে। নবী (ﷺ) বলেছেন:”যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয়ের অবতারণা করে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”(সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রমজানে আমি যদি কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করি, অথবা তার পক্ষ থেকে তাওয়াফ করি এটি কি জায়েয?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:هذا يعني أنك تعمل عملاً صالحاً وتجعل ثوابه لشخص ميت، والجواب أن ذلك لا بأس به، فإذا أراد شخص أن يصلي ويجعل ثوابها لميته، أو يتصدق، أو يحج، أو يقرأ القرآن، أو يصوم، ويجعل ثواب ذلك لميته فلا بأس به. وذلك لما ورد في الحديث الصحيح أن رجلاً أتى رسول الله – صلى الله عليه وسلم- فقال: يا رسول الله، إن أمي افتُلتت نفسها، وإنها لو تكلمت لتصدقت أفأتصدق عنها؟ قال: «نعم». وكذلك أذن لسعد بن عبادة – رضي الله عنه- أن يتصدق لأمه، وسائر العبادات كالصدقة إذ لا فرق بينهما. والنبي – صلى الله عليه وسلم- لم يرد عنه نص يمنع مثل ثواب هذه للميت، حتى نقول: إننا نقتصر على ما ورد، فإذا جاءت السنة بجنس العبادات فإنه يكون المسكوت عنه مثل المنطوق به، لاسيما وأن هذا ليس بنطق من الرسول – صلى الله عليه وسلم-، بل إنه استفتاء في قضايا أعيان، وإفتاء الرسول – صلى الله عليه وسلم- بأنه يجوز أن يتصدق الإنسان عن أمه لا يدل على أن ما سواه ممنوع. ولكن الذي أرى أن يجعل الإنسان العمل الصالح لنفسه، وأن يدعو لأمواته، فالدعاء أفضل من التبرع لهم، لأن النبي – صلى الله عليه وسلم- قال: «إذا مات الإنسان انقطع عمله إلا من ثلاث: إلا من صدقة جارية، أو علم ينتفع به، أو ولد صالح يدعو له»، ولم يقل: يتعبد له. وبناء على ذلك فالدعاء لأبيك، أو لأمك أفضل من أن تهدي لهم الصلاة، أو القرآن، أو ما أشبه ذلك، واجعل الأعمال لنفسك كما أرشد إلى ذلك رسول الله – صلى الله عليه وسلم-. والله الموفق”এর অর্থ হলো, আপনি একটি নেক আমল করে তার সওয়াব একজন মৃত ব্যক্তিকে দান করছেন।এর জবাব হলো: এতে কোনো অসুবিধা নেই। অতএব, কেউ যদি নামাজ পড়ে, সদকা করে, হজ করে, কুরআন তিলাওয়াত করে অথবা রোজা রেখে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করতে চায়, তবে এতে কোনো দোষ নেই। কারণ, সহিহ হাদিসে এসেছে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি, যদি তিনি কথা বলতে পারতেন, তবে সদকা করতেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে সদকা করব? তিনি বললেন: হ্যাঁ। এছাড়া তিনি সা‘দ ইবনু উবাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কেও তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যান্য ইবাদতও সদকার মতোই, এদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। নবী (ﷺ) থেকে এমন কোনো সহিহ বর্ণনা নেই, যা মৃতকে কুরআন বা অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানো নিষিদ্ধ করে। তাই আমরা শুধু বর্ণিত কয়েকটি ইবাদতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখব এমন কথা বলা সঠিক নয়। বরং যখন সুন্নাহ একটি শ্রেণির ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানোর প্রমাণ দিয়েছে, তখন একই ধরনের অন্যান্য ইবাদতও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশেষ করে এগুলো রাসূল ﷺ -এর নিজ উদ্যোগে বলা কথা নয় বরং নির্দিষ্ট ঘটনার প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া ফতোয়া। সুতরাং তিনি যখন মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছেন, তখন তা থেকে অন্য ইবাদত নিষিদ্ধ এ কথা প্রমাণিত হয় না। তবে আমার (শাইখ ইবনু উসাইমীনের) অভিমত হলো: মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কারণ দোয়া, তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। নবী (ﷺ) বলেছেন: মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। তিনি বলেননি যে তার জন্য ইবাদত করবে। অতএব, আপনার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা তাদের উদ্দেশ্যে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত বা অনুরূপ ইবাদতের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। আর নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখুন যেমনটি রাসূলুল্লাহ সা. এর দিকনির্দেশনা থেকে প্রতীয়মান হয়। আল্লাহ তাআলা তাওফীকদাতা।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ২৫৩–২৫৪)। এটিই ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীনে রয়েছে।যেটা সম্পর্কে পোস্টকারী উক্ত ফাতওয়াটি সঠিকভাব না বুঝে মন্তব্য করেছেন। শাইখ এখানে মৃত ব্যক্তির জন্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানোর বিষয়ে একটি মত উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এটিকে সুন্নাহর নির্দেশিত সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বলেননি। বরং ফাতওয়ার শেষাংশে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা; কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃতের জন্য দোয়া করার বিষয়টিই উল্লেখ করেছেন। অতএব, শাইখ রাহিমাহুল্লাহ এখানে সরাসরি এ কথা বলেননি যে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করলে অবশ্যই সওয়াব পৌঁছে যায়; বরং তিনি একটি মত উল্লেখ করার পর দোয়ার শ্রেষ্ঠত্বের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাই কোনো আলেমের বক্তব্য বুঝতে হলে পুরো ফাতওয়া ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
.
▪️দ্বিতীয় মত অনুযায়ী: কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না। এ মতের মূল ভিত্তি হলো—এর পক্ষে সরাসরি কোনো সহীহ দলিল নেই তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কুরআন তিলাওয়াত করে তাঁর কোনো নিকটাত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত মুসলিমের উদ্দেশ্যে সাওয়াব উৎসর্গ করেননি। যদি এ আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতো, তবে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তা করতেন এবং উম্মতকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতেন। কারণ তিনি ছিলেন উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও কল্যাণকামী। একইভাবে খুলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)ও তাঁর যথাযথ অনুসরণ করেছেন; অথচ তাঁদের কারো থেকেই কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের উদ্দেশ্যে সাওয়াব বখশে দেওয়ার কোনো সহীহ প্রমাণ বর্ণিত হয়নি। তাই এ মতের আলেমগণ এটিকে বিদআতী আমল বলে মনে করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো; কেননা প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭১৮৫)। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক আলেমের মত, তবুও দলিলের বিচারে এটিই অধিক বিশুদ্ধ মত। তাঁদের যুক্তি হলো, কুরআন তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির নিজস্ব আমল; এটি মৃত ব্যক্তির আমল নয়। তাই এর সাওয়াব মূলত তিলাওয়াতকারীর জন্যই নির্ধারিত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ﴾ — “আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। অতএব, এ মত অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তি নিজের কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব অন্যের, বিশেষত মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেওয়ার শরয়ী অধিকার রাখে না।এ মতটি মালিকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত, শাফেয়ী মাযহাবের একদল আলেম, সৌদি আরবের স্থায়ী ফাতওয়া কমিটি (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ), শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ সমসাময়িক আলেমের অভিমত; দলিলের বিচারে অনেক মুহাক্কিক আলেম এটিকেই অধিক বিশুদ্ধ মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছে? মৃত ব্যক্তির সন্তান বা যার পক্ষ থেকেই হোক? উত্তরে তারা বলেছেন: আমরা যতদূর জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে নিকট আত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন নি। তিলাওয়াতের সাওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছত বা এর দ্বারা সে কোনোভাবে উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন, উম্মতকে বাতলে দিতেন, যেন তাদের মৃতরা উপকৃত হয়। তিনি ছিলেন মুমিনদের ওপর দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তাঁর পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সকল সাহাবায়ে কেরাম তার যথাযথ অনুসরণ করেছেন, (আল্লাহ তাদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট হোন) আমাদের জানা মতে তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করেন নি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য কল্যাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:«اياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة‏»“খবরদার! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে সতর্ক থেকো, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদ’আত, আর প্রত্যেক বিদ’আত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।”(আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৯৩) তিনি অন্যত্র বলেন:«من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد‏»“যে আমাদের এ দীনে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৪৮) তাই আমরা বলি, মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বা করানো জায়েয নয়, এর সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছে না, বরং এটা বিদ’আত। এ ছাড়া যেসব ইবাদাতের সাওয়াব মৃতদের নিকট পৌঁছে মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে তা অবশ্য গ্রহণীয়। যেমন, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা ও হজ করা মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে। আর যে সব বিষয়ে কোনো দলীল নেই তা বৈধ নয়। তাই প্রমাণিত হলো, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ নয়, তাদের নিকট এর সাওয়াব পৌঁছায় না, বরং এটা বিদ’আত। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত। আর আল্লাহই ভালো জানেন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬ ফাতওয়া নং-২২৩২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ডের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি,যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তি কোন কোন আমলের দ্বারা উপকৃত হন? শারীরিক ইবাদত ও আর্থিক ইবাদতের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? এ বিষয়ে একটি মূলনীতি জানিয়ে দিন।
তিনি উত্তর দেন:ينتفع الميت من الحي بما دل عليه الدليل من الدعاء له والاستغفار له والتصدق عنه والحج عنه والعمرة عنه وقضاء الديون التي عليه وتنفيذ وصاياه الشرعية ، كل ذلك قد دلت الأدلة على مشروعيته‏ .وقد ألحق بها بعض العلماء كل قربة فعلها مسلم وجعل ثوابها لمسلم حي أو ميت‏ ،‏ والصحيح الاقتصار على ما ورد به الدليل ، ويكون ذلك مخصصًا لقوله تعالى‏ : ( وَأَنْ لَيْسَ لِلإِنْسَانِ إِلا مَا سَعَى )”মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পক্ষ থেকে কেবল সেই সব আমলের মাধ্যমে উপকৃত হন, যেগুলোর ব্যাপারে শরিয়তের দলিল এসেছে। যেমন,তার জন্য দোয়া করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা,তার পক্ষ থেকে সদকা করা, তার পক্ষ থেকে হজ করা,তার পক্ষ থেকে উমরা করা, তার ওপর থাকা ঋণ পরিশোধ করা, এবং তার বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা।এসবের বৈধতার ব্যাপারে শরিয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।কিছু আলেম এ সবের সঙ্গে আরও প্রতিটি নেক আমলকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যদি কোনো মুসলিম তার সওয়াব জীবিত বা মৃত অন্য মুসলিমকে দান করে।কিন্তু সঠিক মত হলো, কেবল যেসব বিষয়ে শরিয়তের দলিল এসেছে, সেগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এটাই আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা ও বিশেষীকরণ:মানুষ কেবল সেই আমলেরই অধিকারী, যার জন্য সে নিজে চেষ্টা করেছে। (সূরা নাজম: ৩৯; আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬১)
.
শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিত ও মৃত অবস্থায় পিতা-মাতার জন্য কোন কোন আমল তাদের উপকারে আসে?
তিনি উত্তরে বলেন:الأعمال هي : برهما في حياتهما ، والإحسان إليهما بالقول والعمل ، والقيام بما يحتاجانه من النفقة والسكن وغير ذلك والأنس بهما ، والكلام الطيب معهما وخدمتهما ؛ لقوله تعالى ‏:‏ ( وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا) الإسراء‏/‏ 23‏ ،‏ خصوصًا في كبرهما ، أما بعد الممات : فإنه يبقى من برهما أيضًا الدعاء ، والصدقة لهما ، والحج والعمرة عنهما ، وقضاء الديون التي في ذمتهما ، وصلة الرحم المتعلقة بهما ، وكذلك برُّ صديقهما ، وتنفيذ وصاياهما المشروعة‏ “কাজগুলো হলো: জীবিত অবস্থায় পিতা মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করা, কথা ও কাজে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদের প্রয়োজনীয় খরচ, বাসস্থান ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা, তাদের সঙ্গ দেওয়া, তাদের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা এবং তাদের সেবা করা এসবই তাদের প্রতি সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত।কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:”আর আপনার রব ফায়সালা করেছেন যে, আপনারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবেন এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবেন”।(সূরা ইসরা: ২৩) বিশেষ করে যখন তারা বার্ধক্যে উপনীত হন। আর মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণ অব্যাহত থাকে। যেমন তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা, তাদের পক্ষ থেকে হজ ও উমরা আদায় করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা, তাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধুদের সম্মান ও সদ্ব্যবহার করা,এবং তাদের বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা।”(আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে কিনা—এটি একটি ইজতিহাদি ফিকহি মাসআলা, যেখানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম তা বৈধ বলেছেন, আবার অন্যদল বলেছেন এর পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল নেই। শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ফাতওয়ায় কোনো ভুল নেই; তিনি একটি মত উল্লেখ করার পাশাপাশি মৃতের জন্য দোয়াকে অধিক উত্তম বলেছেন। তাই এ বিষয়ে মতভেদকে সম্মান করা, আলেমদের বক্তব্য ইনসাফের সঙ্গে বোঝা এবং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমল যেমন দোয়া, সদকা ইত্যাদির প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই উচিত। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate