Friday, March 6, 2026

চাঁদাবাজি বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াহর বিধান

 প্রশ্ন: চাঁদাবাজি বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াহর বিধান কী? একটু বড় হলেও গুরুত্বপূর্ণ।

​▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর শার’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা-ভাবনা করলে বলা যায় হারাম সম্পদ দুই প্রকার: (১). স্বত্তাগত হারাম, ও (২). উপার্জনের কারণে হারাম।
.
⚫(১). স্বত্তাগত হারাম (নিজ বস্তুটিই হারাম): যে সম্পদ মূল মালিকের সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়েছে।যেমন: চুরি করা মাল, জবরদখল বা চাঁদাবাজি করা সম্পদ, লুট করা সম্পদ। এই ধরনের সম্পদ গ্রহণকারীর জন্য যেমন হারাম, তেমনি পরবর্তীতে যার কাছেই পৌঁছাক, যদি সে জানে যে এটি অবৈধভাবে অর্জিত, তবে তার জন্যও তা হারাম।কারণ এই হারাম হওয়ার বিষয়টি সম্পদের মূল সত্তার সাথেই সংশ্লিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এটি মাজলুমের হক, তাই তা তার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া ফরজ। এ থেকে উপকৃত হওয়া মানে জুলুমে সহযোগিতা করা এবং গুনাহে অংশীদার হওয়া। জোরপূর্বক দখল করা সম্পদ তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ফরজ হওয়ার বিষয়ে আলেমদের ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত্য বর্ণিত হয়েছে।
.
মহান আল্লাহ বলেন:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ”হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না;(সূরা নিসা;২৯)এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, পরস্পরের মধ্যে অন্যায় পন্থায় একের সম্পদ অন্যের পক্ষে ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.]-থেকে বর্নিত তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোরবানির দিন (বিদায় হজ্জের ভাষণে) সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন:(فإنَّ دِماءَكم وأموالَكم وأعراضَكم عليكم حرامٌ كحُرمةِ يَومِكم هذا، في بَلَدِكم هذا، في شَهْرِكم هذا )”নিশ্চয় তোমাদের জান-মাল এবং সম্মান (বিনষ্ট করা) তোমাদের উপর এরূপ হারাম, যেরূপ তোমাদের জন্য আজকের দিন, এ মাস এবং এ নগরের পবিত্রতা বিনষ্ট করা হারাম।”(সহীহ বুখারী হা/৬৭;সহীহ মুসলিম হা/৪২৭৬) অপর বর্ননায় প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৫৯ হি.]-থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,(من كانت له مَظلَمةٌ لأحَدٍ مِن عِرْضِه أو شَيءٍ فلْيَتحَلَّلْه منه اليومَ قبل ألَّا يَكونَ دِينارٌ ولا دِرْهمٌ! إن كان له عَمَلٌ صالحٌ أُخِذَ منه بقَدْرِ مَظلَمَتِه، وإن لم تَكُنْ له حَسَناتٌ أُخِذَ مِن سَيِّئاتِ صاحِبِه فحُمِلَ عليه! “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়; সে দিন আসার পূর্বে যে দিন কোন দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) থাকবে না। সে দিন তার কোন সৎকর্ম থাকলে সেটা থেকে তার যুলুমের পরিমাণ কেটে নেয়া হবে। আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার (মজলুম) প্রতিপক্ষের পাপের কিছু তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৪৪৯)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,إذا كان معه مال حرام وأراد التوبة والبراءة منه – فإن كان له مالك معين – وجب صرفه إليه أو إلى وكيله , فإن كان ميتا وجب دفعه إلى وارثه“যদি কারো কাছে হারাম সম্পদ থাকে এবং সে এর থেকে তাওবা করতে চায় ও মুক্ত হতে চায়; যদি উক্ত সম্পদের নির্দিষ্ট কোন মালিক থাকে; তাহলে সেটি সেই মালিককে বা মালিকের প্রতিনিধিকে প্রদান করা ওয়াজিব। যদি মালিক মৃত হন তাহলে তার ওয়ারিশদেরকে পরিশোধ করা ওয়াজিব।”(ইমাম নববী; শারহুল মুহায্‌যাব;  খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪২৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:এক ব্যক্তি জানে যে তার পিতার সম্পদের উৎস হারাম সে কি তার পিতার খাবার খেতে পারবে? আর যদি না খায়, তাহলে কি তা পিতামাতার অবাধ্যতা হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:الرجل الذي علم أن مال أبيه من الحرام إن كان حراماً بعينه، بمعنى: أنه يعلم أن أباه سرق هذا المال من شخص فلا يجوز أن يأكله، لو علمت أن أباك سرق هذه الشاة وذبحها، فلا تأكل، ولا تُجِبْ دعوته.أما إذا كان الحرام من كسبه يعني: أنه هو يرابي أو يعامل بالغش أو ما يشابه ذلك، فكل، والإثم عليه هو”যে ব্যক্তি জানে তার পিতার সম্পদ হারাম যদি তা স্বত্তাগত হারাম হয় (অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে হারাম সম্পদ), যেমন সে জানে তার পিতা এই সম্পদ কারো কাছ থেকে চুরি করেছে, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ নয়। যদি তুমি জানো তোমার পিতা এই ছাগল চুরি করে জবাই করেছে, তাহলে তা খেও না এবং তার দাওয়াতও গ্রহণ করো না। কিন্তু যদি হারাম হয় তার উপার্জনের কারণে যেমন সে সুদ খায়, প্রতারণা করে বা এ ধরনের লেনদেন করে, তাহলে তুমি খেতে পারো, গুনাহ তার উপরই হবে।”(ইবনু উসামীন; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ; লিক্বা নং-১৮৮/১৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে ব্যক্তি যা পাওয়ার অধিকার নেই সেটা গ্রহণ করেছে জবাবে তিনি বলেন: আপনার উপর আবশ্যকীয় হচ্ছে- এ সম্পদ ফেরত দেওয়া। কেননা আপনি এ দায়িত্ব পালন না করার কারণে আপনি সেটার হকদার নন। যদি সেটা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে কোন কল্যাণের পথে সেটা ব্যয় করুন; যেমন- গরীবদের মাঝে সদকা করে দেওয়া কিংবা কোন কল্যাণমুখী প্রজেক্টে দান করে দেওয়া। আর সাথে সাথে তওবা ও ইস্তিগফার করা এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ পুনরায় করা থেকে সতর্ক থাকা।”(ফাতাওয়া উলামায়িল বালাদিল হারাম; পৃষ্ঠা-৮৩১)
.
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রহণ করেছে তার উপর আবশ্যকীয় হচ্ছে—সে সম্পদ ঐ ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেয়া।তিনি মৃত হলে তার ওয়ারিশদের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া; এমনকি সেটা তার পক্ষে কঠিন হলেও; যেহেতু এটি সম্ভবপর। কঠিন হলেও সম্ভবপর হওয়া, আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হওয়া—দুটো বিষয়ের মাঝে পার্থক্য আছে। যদি সম্পদ তার মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয় তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যকীয়; কেননা তারাই এর হকদার। এ সম্পদ খরচ করার অধিকার তাদেরই। তাদেরকে না জানিয়ে তাদের সম্পদ দান করা জায়েয নয়;কারণ কোন ব্যক্তির জন্য অন্যের সম্পদ থেকে তার অজান্তে গরীবদের মাঝে দান করা সঙ্গত নয়। সে নিজের সম্পদ থেকে যা খুশি দান করতে পারে।সুতরাং আত্মসাৎকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার তওবা পূর্ণ হবে না। দলিল হচ্ছে আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার থেকে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) থাকবে না। যদি তার সৎকর্ম থাকে তাহলে তার সৎকর্ম থেকে জুলুমের সমপরিমাণ কেটে রাখা হবে। আর তার সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে জুলুমের সমপরিমাণ নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহিহ বুখারী হা/২৪৪৯)
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال العلماء: التوبة واجبة من كل ذنب ، فإن كانت المعصية بين العبد وبين الله تعالى لا تتعلق بحق آدمي فلها ثلاثة شروط : أحدها : أن يقلع عن المعصية. والثاني : أن يندم على فعلها . والثالث : أن يعزم أن لا يعود إليها أبدا . فإن فقد أحد الثلاثة لم تصح توبته . وإن كانت المعصية تتعلق بآدمي فشروطها أربعة : هذه الثلاثة ، وأن يبرأ من حق صاحبها ، فإن كانت مالا أو نحوه رده إليه ، وإن كانت حدّ قذف ونحوه مكّنه منه أو طلب عفوه ، وإن كانت غيبة استحله منها “আলেমগণ বলেন, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহটি বান্দার মাঝে ও আল্লাহ্‌র মাঝে হয়ে থাকে; কোন মানুষের হক্বের সাথে সম্পৃক্ত না হয় তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত তিনটি: ১। গুনাহ ত্যাগ করা। ২। কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। ৩। সে গুনাতে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি এ তিনটি শর্তের কোন একটি না পাওয়া যায় তাহলে সে তওবা শুদ্ধ হবে না।আর যদি গুনাহটি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত চারটি: উল্লেখিত তিনটি এবং হক্বদারের হক্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করা; যদি সম্পদ বা এ জাতীয় কিছু হয় তাহলে সেটা মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। আর যদি অপবাদ এবং এ ধরণের কিছু হয় তাহলে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিজেকে তার কাছে পেশ করা কিংবা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। আর যদি গীবত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।”(নববী; রিয়াদুস সালেহীন; পৃষ্ঠা-৩৩)
.
স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র” তে এসেছে—في جندي سرق مالا من عبدٍ : ” إن كان يعرف العبدَ أو يعرف من يعرفه : فيتعين عليه البحث عنه ليسلم له نقوده فضة أو ما يعادلها أو ما يتفق معه عليه ، وإن كان يجهله وييأس من العثور عليه : فيتصدق بها أو بما يعادلها من الورق النقدي عن صاحبها ، فإن عثر عليه بعد ذلك فيخبره بما فعل فإن أجازه فبها ونعمت ، وإن عارضه في تصرفه وطالبه بنقوده : ضمنها له وصارت له الصدقة ، وعليه أن يستغفر الله ويتوب إليه ويدعو لصاحبها”জনৈক সৈনিক একজন দাস থেকে কিছু অর্থ চুরি করেছে: যদি সৈনিক ব্যক্তি দাসটিকে চেনে কিংবা দাসটিকে যে ব্যক্তি চেনে তাকে চেনে সেক্ষেত্রে সন্ধান করে তাকে সে রৌপ্যমুদ্রা বা সমমূল্য বা তার সাথে যা পরিশোধ করতে একমত হবে সেটা পরিশোধ করা। আর যদি তাকে না চেনে ও তার সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে যায় তাহলে ঐ অর্থ কিংবা ঐ অর্থের সমমূল্যের কাগুজে মুদ্রা এর মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দিবে। পরে যদি উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে বিষয়টি তাকে অবহিত করবে। যদি মালিক সদকার বিষয়টি মেনে যায় তাহলে ভাল। আর যদি সদকা করাটা মেনে না যায় এবং অর্থ দাবী করে তাহলে তাকে তার অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং সদকাকৃত অর্থ সৈনিকের নিজের সদকা হিসেবে গণ্য হবে। এ সৈনিকের কর্তব্য হল: আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তিগফার করা, তওবা করা এবং এ অর্থের মালিকের জন্য দোয়া করা।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৬৫) থেকে সমাপ্ত]
.
ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন: “সম্পদগুলো মালিকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে; যেহেতু তারা চেনা ব্যক্তি কিংবা তাদের ওয়ারিশগণ চেনা ব্যক্তি। পক্ষান্তরে, আপনি যদি তাদেরকে ভুলে যান কিংবা মূলতঃই না চেনেন কিংবা তাদেরকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি নিরাশ হয়ে পড়েন— সে ক্ষেত্রে আপনি তাদের পক্ষ থেকে দান করে দিন। কিন্তু, তারা যদি চেনা মানুষ হয় কিংবা তারা মারা গেছেন তবে তাদের ওয়ারিশগণ চেনা হয়; কারো জন্য হয়ত তাদের কাছে গিয়ে বলা: ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে এ সম্পদগুলো অবৈধভাবে গ্রহণ করেছি, আপনারা আমার তওবা গ্রহণ করুন এবং সম্পদগুলো গ্রহণ করুন’—সমস্যা হতে পারে। এ দিক থেকেও এটা কঠিন হতে পারে যে, শয়তান হয়তো তাদের মনে ঢুকিয়ে দিবে যে, তুমি এর চেয়ে বেশি সম্পদ নিয়েছ ইত্যাদি। তাই, আপনি একজন আস্থাভাজন, বুদ্ধিমান ও দ্বীনদার মানুষ খুঁজে নিন। তাকে বলবেন: ভাই, বিষয়টি এমন এমন। অমুকের এই পাওনা আছে কিংবা সে মারা গিয়ে থাকলে তার ওয়ারিশদের এই পাওনা আছে। আশা করি সে ব্যক্তি আপনাকে দায়মুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন এবং যাদের পাওনা তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলবে যে, ভাই! এই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করেছেন। তিনি তোমাদের এত এত সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছেন। এই নাও সে সম্পদ। এভাবে তার দায়মুক্ত হবে। কারণ আলেমগণ বলেন: যে সম্পদের মালিক চেনা; সে সম্পদ তার মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে।”(ইবনু উসাইমীন; আল-লিকা আস-শাহরি; নং-৩১ থেকে সমাপ্ত)
.
⚫(২). উপার্জনের কারণে হারাম: হারাম সম্পদগুলো যদি উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে কোন হারাম বিনিময় কিংবা হারাম কাজের বিপরীতে অর্জিত হয়ে থাকে; যেমন মদের মূল্য, গানবাজনা, জ্যোতিষীপনা, সুদের লিখন, মিথ্যা-সাক্ষ্য দেয়া ইত্যাদি হারাম কাজের বিপরীতে তাহলে এটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ: এই প্রকার সম্পদ সম্পর্কে দুই দিক থেকে মতভেদ রয়েছে:
▪️প্রথম দিক: যদি উপার্জনকারী তওবা করে, তাহলে তার করণীয় কী? মালিককে ফিরিয়ে দেবে? দান করে দেবে? নাকি নিজের জন্য রাখা বৈধ হবে? আর শেষ মতের ক্ষেত্রে হারাম জানত কি জানত না এ বিষয়ে কি পার্থক্য হবে? এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
.
(ক).যদি ব্যক্তি এর হারাম হওয়া সম্পর্কে না-জেনে এটি উপার্জন করে থাকে তাহলে এই সম্পদ তার। এই সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়া তার উপর আবশ্যক নয়। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা সুদের নিষেধাজ্ঞা নাযিল করার পর সুদের ব্যাপারে বলেন:(فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ )“অতএব, যার নিকট তার রবের কাছ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়, তাহলে আগে যা (নেওয়া) হয়েছে তা তারই এবং তার বিষয়টি (ফয়সালার ভার) আল্লাহ্‌র কাছে। আর যারা ফিরে যাবে (অর্থাৎ পুনরায় সুদ খাবে) তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”[সুরা বাক্বারা: ২৭৫]
.
(খ).আর যদি সেই ব্যক্তি এই সম্পদ হারাম হওয়া সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে; তবে ঐ সম্পদটি সে খরচ করে ফেলে ও নিঃশেষ হয়ে যায়; তাহলে সে যদি খাঁটি তাওবা করে তার ওপর আর কিছু আবশ্যক হবে না।
.
(গ). আর যদি সেই সম্পদ অবশিষ্ট থাকে; তাহলে সেই সম্পদকে কোন ভাল খাতে ব্যয় করে এর থেকে মুক্ত হওয়া অনিবার্য। তবে সে যদি ঐ সম্পদের মুখাপেক্ষী থাকে তাহলে তার প্রয়োজন মাফিক সেই সম্পদ থেকে গ্রহণ করবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ থেকে সে অবমুক্ত হবে।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:আমি আপনাদেরকে জিজ্ঞেস করছি যে, একজন আলেমের একটি ফতোয়া মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি হলো যদি কোন ব্যক্তি মদ বানিয়ে বা বিক্রি করে কিংবা মাদকদ্রব্য বিক্রি করে সম্পদ উপার্জন করে এবং আল্লাহ্‌র কাছে তাওবা করে; তাহলে মদ বানানো বা বিক্রি করা কিংবা মাদকদ্রব্য বিক্রি করা বা বাজারজাত করার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ তার জন্য হালাল। তারা জবাবে বলেন:إذا كان حين كسب الحرام يعلم تحريمه ، فإنه لا يحل له بالتوبة ، بل يجب عليه التخلص منه بإنفاقه في وجوه البر وأعمال الخير”যদি হারাম সম্পদ উপার্জনকালে এটি হারাম হওয়া সম্পর্কে অবহিত থাকে তাহলে তাওবার মাধ্যমে এটি তার জন্য হালাল হবে না। বরং কোন নেক কাজে ও ভালো কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে এর থেকে মুক্ত হওয়া তার উপর আবশ্যক হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ৩৩)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন:إذا عاوض غيره معاوضة محرمة وقبض العوض ، كالزانية والمغني وبائع الخمر وشاهد الزور ونحوهم ثم تاب والعوض بيده . فقالت طائفة : يرده إلى مالكه ؛ إذ هو عين ماله ولم يقبضه بإذن الشارع ولا حصل لربه في مقابلته نفع مباح .وقالت طائفة : بل توبته بالتصدق به ولا يدفعه إلى من أخذه منه ، وهو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية ، وهو أصوب القولين …“যদি কোন ব্যক্তি অপর কাউকে কোন হারামের বিনিময় প্রদান করে ও বিনিয়মটি সেই ব্যক্তি গ্রহণ করে; যেমন ব্যভিচারিনী, গায়ক, মদবিক্রেতা, মিথ্যাসাক্ষ্যদানকারী প্রমুখ; পরবর্তীতে ঐ ব্যক্তি এর থেকে তাওবা করে এবং ঐ বিনিয়মটি তার হাতে থাকে; সেক্ষেত্রে একদল আলেম বলেন: বিনিময়টি এর মালিককে ফেরত দিবে। যেহেতু এটি স্বয়ং সেই সম্পদ; যা গ্রহণ করার অনুমতি শরিয়তপ্রণেতা (আইনদাতা) প্রদান করেননি এবং এ সম্পদের মালিকের এর বিপরীতে বৈধ উপকার অর্জিত হয়নি। আর অপর একদল আলেমের মতে, এই সম্পদ দান করে দেয়াটাই হলো তার তাওবা। যার কাছ থেকে এটি গ্রহণ করেছে তাকে ফেরত দিবে না। এটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার নির্বাচিত অভিমত এবং সর্বাধিক সঠিক অভিমত…।”(ইবনু ক্বাইয়িম,মাদারিজুস সালেকীন;খণ্ড;১;পৃষ্ঠা;৩৮৯)
ইবনু কাইয়্যেম (রাহিমাহুল্লাহ) এই মাসয়ালাটি ‘যাদুল মাআদ’-এ বিশদভাবে আলোচনা করেছেন এবং তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এই সম্পদ থেকে অবমুক্ত হওয়া ও তাওবার পরিপূর্ণতা হবে: এটি দান করে দেয়ার মাধ্যমে। আর যদি এই সম্পদের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে তার প্রয়োজন মাফিক এর থেকে গ্রহণ করবে এবং বাকীটুকু দান করে দিবে।”(ইবনু ক্বাইয়িম; যাদুল মা‘আদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৭৭৮)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:فإن تابت هذه البَغِيّ وهذا الخَمَّار ، وكانوا فقراء جاز أن يصرف إليهم من هذا المال قدر حاجتهم ، فإن كان يقدر يتّجر أو يعمل صنعة كالنسيج والغزل ، أعطي ما يكون له رأس مال “যদি এই পতিতা ও এই মদবিক্রেতা তাওবা করে এবং তারা গরীব হয়; তাহলে এই সম্পদ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ করা জায়েয হবে। যদি ব্যবসা জানে কিংবা কাপড় বুননের মত কোন পেশা জানে তাহলে তাকে এই সম্পদ থেকে মূলধন প্রদান করা হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩০৮)
.
▪️দ্বিতীয় দিক: অবৈধ পন্থায় উপার্জিত সম্পদ কি উপার্জনকারী ছাড়া অন্য কারো জন্য হালাল হবে? যেমন: দান, উত্তরাধিকার, খরচ ইত্যাদির মাধ্যমে কারো কাছে এলে। এ ব্যাপারে ফকিহদের দুই মত:
প্রথম মত: উপার্জনকারী ও অন্য কারো জন্যই হালাল নয়। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি মাযহাব এবং স্থায়ী ফতোয়া কমিটিও এই মত দিয়েছে।তাদের যুক্তি হল: এই সম্পদ উপার্জনকারীর জন্যই হালাল নয়, সে শরীয়ত অনুযায়ী এর মালিকও নয়। তার উপর ওয়াজিব এটি থেকে মুক্ত হওয়া বা আসল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। সুতরাং এটি অন্যের কাছে স্থানান্তরিত হবে না কারণ উত্তরাধিকার বা হিবা দ্বারা স্থানান্তর হওয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপর নির্ভরশীল এখানে তা পাওয়া যায়নি। এই মাসআলায় জমহুর আলেমদের বক্তব্য তুলনামূলক কম কারণ তারা মূল নীতির উপর নির্ভর করেছেন, হারাম সম্পদ মৃত্যু দ্বারা পবিত্র হয় না, এক হাত থেকে অন্য হাতে গেলেও তা হালাল হয় না।প্রখ্যাত সাহাবী আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার খাবার খেলেন, তারপর তাকে জানানো হলো যে তা হারাম থেকে এসেছে, তখন তিনি তা বমি করে বের করে দেন।(জামিউল উলূম;খণ্ড;১;পৃষ্ঠা;২১১) এ কারণেই স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ফতোয়া দিয়েছে যে, সুদের লাভ উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টিত হবে না, সন্তানরা তা ভোগ করবে না (ফাতাওয়া লাজনাতুদ দায়েমা; খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ৪৫৫, ও খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা: ৩৪৪) আহকামুল মালিল হারাম ওয়া দাওয়াবিতুল ইন্তিফা ওয়াত তাসাররুফ বিহি ফিল ফিক্বহিল ইসলামী ড. আব্বাস আহমাদ আল বায, পৃষ্ঠা ৭৩–৯২। এটি একটি গবেষণাধর্মী রিসালা, যেখানে গবেষক অধিকাংশ আলেমের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।এছাড়াও জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম ইবনু রজব ১/২০৮–২১১)
.
দ্বিতীয় মত: উপার্জনকারীর জন্য হারাম,কিন্তু বৈধ পথে অন্য কারো কাছে এলে তার জন্য হালাল। যেমন: উত্তরাধিকার, হিবা ইত্যাদি। এটি মালিকি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত,কিছু হানাফি আলেম, হাসান বসরি, যুহরি এবং শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহি.) এই মত গ্রহণ করেছেন।তাদের যুক্তি হল:নবী (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীগণ ইহুদিদের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া, ঋণ ইত্যাদি লেনদেন করতেন যদিও তাদের মধ্যে সুদ খাওয়া ও হারাম সম্পদ ভোগ করার বিষয়টি প্রসিদ্ধ ছিল।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:এক ব্যক্তি সুদী লেনদেন করত এবং সে সম্পদ ও সন্তান রেখে মারা গেছে এটা সন্তান জানে। তাহলে উত্তরাধিকার হিসেবে এই সম্পদ কি সন্তানের জন্য হালাল হবে, না হবে না?
তিনি উত্তরে বলেন:أما القدر الذي يَعلم الولد أنه ربا : فيخرجه إما أن يرده إلى أصحابه إن أمكن وإلا تصدق به. والباقي لا يحرم عليه؛ لكن القدر المشتبه يستحب له تركه. إذا لم يجب صرفه في قضاء دين أو نفقة عيال.وإن كان الأب قبضه بالمعاملات الربوية التي يرخص فيها بعض الفقهاء : جاز للوارث الانتفاع به. وإن اختلط الحلال بالحرام وجهل قدر كل منهما جعل ذلك نصفين”সন্তান যে পরিমাণ সম্পদকে নিশ্চিতভাবে সুদের টাকা বলে জানে, তা সে বের করে দেবে, সম্ভব হলে আসল মালিকদের ফেরত দেবে, তা সম্ভব না হলে সদকা করে দেবে। বাকিটা তার জন্য হারাম নয়। তবে যে অংশ সন্দেহযুক্ত, তা ছেড়ে দেওয়া মুস্তাহাব, যদি তা ঋণ পরিশোধ বা পরিবারের খরচে ব্যয় করা জরুরি না হয়। আর যদি পিতা এমন সুদী লেনদেনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে থাকে, যেগুলোকে কিছু ফকিহ অনুমোদন দিয়েছেন, তাহলে ওয়ারিসের জন্য তা ভোগ করা জায়েজ। আর যদি হালাল-হারাম মিশে যায় এবং কোনটা কত তা জানা না যায়, তাহলে তা অর্ধেক অর্ধেক ধরে নেওয়া হবে। (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৯/৩০৭) এ মতটি হচ্ছে অধিকাংশ আলেমের মতের ভিত্তিতে।
ইবনু রুশদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقال ابن رشد: “وروي عن ابن شهاب أنه قال فيمن كان على عمل فيأخذ الرشوة، والغلول، والخمس، وفيمن كانت أكثر تجارته الربا: إن ما تركا من الميراث سائغ لورثتهما بميراثهم الذي فرضه الله لهم، علموا بخبث كسبه أو جهلوه، وإثم الظلم على جانيه”ইবনু শিহাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্বপূর্ণ কাজে থেকে ঘুষ নেয়, অথবা গনিমতের সম্পদে খিয়ানত করে, অথবা যার অধিকাংশ ব্যবসা সুদের উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা যে সম্পদ রেখে মারা যায়, তা তাদের ওয়ারিসদের জন্য বৈধ কারণ তারা আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার হিসেবে তা পেয়েছে, তারা উপার্জনের হারাম হওয়া জানুক বা না জানুক। গুনাহ হবে জুলুমকারী উপার্জনকারীর উপরই।”(ফাতাওয়া ইবনু রুশদ ১/৬৪০)
.
ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ বিষয়ে সালাফদের থেকে বহু বর্ণনা রয়েছে। সহীহভাবে ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁকে এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যার প্রতিবেশী প্রকাশ্যে সুদ খায় এবং হারাম সম্পদ গ্রহণে কোনো পরোয়া করে না‌, সে তাকে খাবারের দাওয়াত দেয় তিনি বললেন: তার দাওয়াত কবুল করো, তোমাদের জন্য তা উপভোগ আর গুনাহ তার উপর। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন: আমি তার সম্পদের কিছুই জানি না, সবই নাপাক বা হারাম তবুও তিনি বলেছেন: তার দাওয়াত গ্রহণ করো। ইমাম আহমাদ এই বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। তবে এর বিপরীতে ইবনু মাসউদ (রা.) থেকেই আরেকটি বর্ণনা আছে তিনি বলেছেন: গুনাহ হচ্ছে যা অন্তরকে কাঁপিয়ে তোলে। সালমান (রাঃ) থেকেও প্রথম মতের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। আর সাঈদ ইবনু জুবাইর, হাসান বসরী, মুররিক আল ইজলি, ইবরাহিম নাখঈ, ইবনু সিরিন প্রমুখ থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনা ‘আল আদাব’ (হুমাইদ ইবনু জানজুয়াইহ), ‘আল‌ জামি’ (খাল্লাল),আব্দুর রাজ্জাক ও ইবনু আবি শাইবার মুসান্নাফ প্রভৃতি গ্রন্থে পাওয়া যায়। (জামি‘উল উলূম ওয়াল হিকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২০৯–২১০)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال بعض العلماء: ما كان محرما لكسبه، فإنما إثمه على الكاسب ، لا على من أخذه بطريق مباح من الكاسب، بخلاف ما كان محرما لعينه، كالخمر والمغصوب ونحوهما . وهذا القول وجيه قوي، بدليل أن الرسول صلى الله عليه وسلم اشترى من يهودي طعاما لأهله، وأكل من الشاة التي أهدتها له اليهودية بخيبر، وأجاب دعوة اليهودي، ومن المعلوم أن اليهود معظمهم يأخذون الربا ويأكلون السحت . وربما يقوي هذا القول قوله صلى الله عليه وسلم في اللحم الذي تصدق به على بريرة: (هو لها صدقة ، ولنا منها هدية) “কিছু আলেম বলেছেন: যে সম্পদ উপার্জনের কারণে হারাম, তার গুনাহ উপার্জনকারীর উপরই হবে, যে ব্যক্তি তার কাছ থেকে বৈধ পদ্ধতিতে তা গ্রহণ করেছে, তার উপর নয়। আর যে সম্পদ নিজ সত্তাগতভাবে হারাম যেমন মদ, জবরদখল করা মাল ইত্যাদি তার হুকুম ভিন্ন। এই মতটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য। এর দলিল হলো নবী (ﷺ) এক ইহুদির কাছ থেকে তাঁর পরিবারের জন্য খাদ্য ক্রয় করেছিলেন, খাইবারে এক ইহুদি নারী যে ছাগল হাদিয়া দিয়েছিল তা খেয়েছিলেন এবং এক ইহুদির দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন। অথচ জানা কথা যে অধিকাংশ ইহুদি সুদ গ্রহণ করত এবং হারাম সম্পদ ভোগ করত। আরও এ মতকে শক্তিশালী করে নবী (ﷺ) এর সেই কথা বারীরাকে যে গোশত সাদকাহ করা হয়েছিল সে সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি তার জন্য সাদকাহ, আর আমাদের জন্য হাদিয়া।”(আল কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ ৩/১১২)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:انظر مثلاً بريرة مولاة عائشة رضي الله عنهما، تُصُدق بلحم عليها، فدخل النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم يوماً إلى بيته ، ووجد البُرمة -القدر- على النار، فدعا بطعام ولم يؤت بلحم، أتي بطعام ولكن ما فيه لحم، فقال: ألم أر البرمة على النار؟ قالوا: بلى يا رسول الله، ولكنه لحم تصدق به على بريرة. والرسول عليه الصلاة والسلام لا يأكل الصدقة، فقال: (هو لها صدقة ، ولنا هدية) ؛ فأكله الرسول عليه الصلاة والسلام ، مع أنه يحرم عليه هو أن يأكل الصدقة؛ لأنه لم يقبضه على أنه صدقة ، بل قبضه على أنه هدية. فهؤلاء الإخوة نقول: كلوا من مال أبيكم هنيئاً مريئاً، وهو على أبيكم إثم ووبال، إلا أن يهديه الله عز وجل ويتوب، فمن تاب تاب الله عليه”বারীরা (রাঃ), যিনি আয়েশা (রাঃ)-এর দাসী ছিলেন তাকে কিছু গোশত সদকা করা হয়েছিল। একদিন নবী (ﷺ) তাঁর ঘরে প্রবেশ করে হাঁড়ি আগুনের উপর দেখলেন। তিনি খাবার আনতে বললেন, কিন্তু যে খাবার আনা হলো তাতে গোশত ছিল না। তিনি বললেন: আমি কি হাঁড়ি আগুনে দেখিনি? সাহাবারা বললেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল কিন্তু সেটি এমন গোশত যা বারীরাকে সদকা করা হয়েছে। রাসূল (ﷺ) নিজে সাদকাহ খান না। তখন তিনি বললেন: এটি তার জন্য সাদকাহ আর আমাদের জন্য হাদিয়া। অতঃপর তিনি তা খেলেন। কারণ তিনি সেটি সাদকাহ হিসেবে গ্রহণ করেননি, বরং হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অতএব আমরা এ ভাইদের বলি: তোমরা তোমাদের পিতার সম্পদ আনন্দের সাথে ভোগ করো। এর গুনাহ তোমাদের পিতার উপরই থাকবে, যদি না আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন এবং সে তওবা করে, যে তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”(ইবনু উসাইমীন; আল-লিক্বাউশ শাহরী; লিক্বা নং-৪৫/২৬)
.
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে এর সঠিক অনুসরণের তৌফিক দান করুন। (তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

দুজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত পড়ার সময় ইমাম ও মুক্তাদি কিভাবে দাঁড়াবে

 প্রশ্ন: দুজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত পড়ার সময় ইমাম ও মুক্তাদি কিভাবে দাঁড়াবে। একটু আগে-পিছে হয়ে নাকি সমান্তরাল হয়ে দাঁড়াবে?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর যখন মাত্র দু’জন ব্যক্তি জামাআতে সালাত আদায় করবেন, তখন সুন্নাহ হলো—ইমাম ও মুক্তাদী একই কাতারে পাশাপাশি দাঁড়াবেন। মুক্তাদী ইমামের ডান পাশে এমনভাবে অবস্থান করবে, যাতে উভয়ের কাঁধ কাঁধের সঙ্গে এবং পায়ের গোড়ালি গোড়ালির সঙ্গে সমান্তরাল থাকে। সে (মুত্তাদী) ইমামের সামনে অগ্রসর হবে না, আবার সম্মান দেখানোর অজুহাতে পেছনেও সরে দাঁড়াবে না; বরং সম্পূর্ণ সমানভাবে একই সরলরেখায় অবস্থান করবে। কিছু মানুষের ধারণা ইমামের মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুক্তাদীর সামান্য পেছনে দাঁড়ানো উত্তম। কিন্তু সহীহ হাদীসে এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ডান পাশে সমান্তরালভাবে দাঁড়িয়েছিলেন; পেছনে সরে যাননি।তাছাড়া ইমাম ও একজন মুক্তাদী মিলেও একটি পূর্ণ কাতার হিসেবে গণ্য হয়। আর কাতার সোজা করার শরয়ী নির্দেশ হলো—সবাই সমানভাবে দাঁড়াবে; কেউ কারো চেয়ে অগ্রবর্তী বা পশ্চাৎবর্তী হবে না। এটাই সুন্নাহসম্মত ও সহীহ পদ্ধতি। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি; আলা জাদিল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০-১২)
.
ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার সহিহ বুখারীতে এ মর্মে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন:بَاب يَقُومُ عَنْ يَمِينِ الْإِمَامِ بِحِذَائِهِ سَوَاءً إِذَا كَانَا اثْنَيْنِ”পরিচ্ছেদঃ দু জন ব্যক্তি সালাত আদায় করলে, মুক্তাদী ইমামের ডানপাশে সোজাসুজি দাঁড়াবে।(সহীহ বুখারী অধ্যায়: ১০/ আজান, পরিচ্ছেদ: ১০/৫৭) তারপর তিনি নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করেন: ইবনে আববাস (রাদিয়াল্লাহ আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,بِتُّ فِي بَيْتِ خَالَتِي مَيْمُونَةَ فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْعِشَاءَ، ثُمَّ جَاءَ فَصَلَّى أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ ثُمَّ نَامَ، ثُمَّ قَامَ فَجِئْتُ فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ، فَجَعَلَنِي عَنْ يَمِينِهِ، فَصَلَّى خَمْسَ رَكَعَاتٍ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ نَامَ حَتَّى سَمِعْتُ غَطِيطَهُ ـ أَوْ قَالَ خَطِيطَهُ ـ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الصَّلاَةِ‏“আমি আমার খালা মায়মুনা রা. এর ঘরে রাত কাটালাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইশার সালাত আদায় করে আসলেন এবং চার রাক‘আত সালাত আদায় করে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর উঠে সালাতে দাঁড়ালেন। তখন আমিও তাঁর বামপাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে তাঁর ডানপাশে নিয়ে নিলেন এবং পাঁচ রাকআত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আরও দু রাকআত সালাত আদায় করে নিদ্রা গেলেন। এমনকি আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর তিনি (ফজরের) সালাতের জন্য বের হলেন।”(সহীহ বুখারী হা/৬৯৯, ১১৭; মুসলিম হা/৬৬০)
.
“উক্ত হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইবনে আব্বাস (রা.)–কে নিজের ডান পাশে একই কাতারে সমান্তরালভাবে দাঁড় করিয়েছিলেন; তাঁকে চার আঙুল পরিমাণ বা সামান্য পিছনে দাঁড় করাননি। এ থেকেই বোঝা যায়, যখন ইমাম ও একজন মুক্তাদি একসাথে সালাত আদায় করবে, তখন মুক্তাদি ইমামের ডান পাশে সরাসরি সমান্তরালভাবে দাঁড়াবে। এ বিধানটির দিকেই ইঙ্গিত করে ইমাম বুখারি তাঁর গ্রন্থ সহিহ বুখারি-তে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম স্থির করেছেন: ‘যখন দু’জন ব্যক্তি সালাত আদায় করবে, তখন মুক্তাদি ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে।’”
.
এছাড়াও অন্য হাদিসে এসেছে: উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন: دَخَلْتُ عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِالْهَاجِرَةِ فَوَجَدْتُهُ يُسَبِّحُ فَقُمْتُ وَرَاءَهُ فَقَرَّبَنِي حَتَّى جَعَلَنِي حِذَاءَهُ عَنْ يَمِينِهِ فَلَمَّا جَاءَ يَرْفَا تَأَخَّرْتُ فَصَفَفْنَا وَرَاءَهُ.”আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট প্রবেশ করলাম।সময়টা ছিল গরম। আমি তখন তাঁকে নফল সালাত রত (সালাতুয যোহা বা চাশতের সালাত) অবস্থায় পেলাম। তাই আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। তারপর তিনি আমাকে কাছে আনলেন এবং তাঁর ডান পার্শ্বে তাঁর বরাবর আমাকে দাঁড় করালেন। তারপর ইয়ারফা (উমর রা. এর খাদেম) আসলে আমি পেছনে সরে আসলাম। তারপর আমরা দু’জনেই তাঁর পেছনে কাতার করে দাঁড়ালাম।”(মুআত্তা মালিক; পরিচ্ছদ-৯,হা/৩৪৮, সনদ সহিহ)
.
অপর একটি বর্ননায় আব্দুর রাযযাক তার মুসান্নাফ হাদিসগ্রন্থে ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেন قلت لعطاء: الرجل يصلي مع الرجل، أين يكون منه؟ قال: إلى شقه الأيمن، قلت: أيحاذي به حتى يصف معه لا يفوت أحدهما الآخر؟ قال: نعم، قلت: أتحب أن يساويه حتى لا تكون بينهما فرجة؟ قال: نعم”তিনি বললেন, আমি আত্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন ব্যক্তি আরেকজনের সাথে সালাত আদায় করলে সে কোথায় অবস্থান করবে? তিনি বললেন: তার ডান পাশে।আমি বললাম: সে কি তার সাথে এমন সমন্তরালভাবে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াবে যে, একজন অপরজন থেকে দূরে থাকবে না? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: আপনি এটা পছন্দ করেন যে, সে তার এমন বরাবর দাঁড়াবে যে,তাদের মাঝ কোনো ফাঁক থাকবে না? তিনি বললেন: হ্যাঁ।”(মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪০৬; হা/৩৮৭০)
.
​দুঃখজনক হলেও সত্যি মাযহাবের দোহাই দিয়ে কেউ কেউ বলেন,ইমাম মুক্তাদী দুজন মিলে জামাআতে সালাত পড়ার সময় মুক্তাদী ইমাম থেকে একটু পেছনে সরে দাঁড়াবে। তাদের এই যুক্তি যে বাতিল সে সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্ভল (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর মুসনাদে প্রখ্যাত সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ فَصَلَّيْتُ خَلْفَهُ ، فَأَخَذَ بِيَدِي فَجَرَّنِي فَجَعَلَنِي حِذَاءَهُ ، فَلَمَّا أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى صَلاتِهِ خَنَسْتُ ، فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ لِي : ( مَا شَأْنِي أَجْعَلُكَ حِذَائِي فَتَخْنِسُ ؟) فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَوَ يَنْبَغِي لأَحَدٍ أَنْ يُصَلِّيَ حِذَاءَكَ وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ الَّذِي أَعْطَاكَ اللَّهُ ؟
​”আমি শেষ রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এলাম এবং তাঁর পেছনে সালাতে দাঁড়ালাম। তখন তিনি আমার হাত ধরে টেনে আমাকে তাঁর পাশে (বরাবর) দাঁড় করালেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সালাতে পূর্ণ মনোযোগ দিলেন, তখন আমি (চুপিচুপি) পিছিয়ে গেলাম। সালাত শেষ করে তিনি আমাকে বললেন: ‘কী ব্যাপার, আমি তোমাকে আমার পাশে দাঁড়ালাম আর তুমি পিছিয়ে গেলে?’ আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা কি কারো জন্য সমীচীন, যেখানে আপনি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল যাকে আল্লাহ (এত বিশাল) মর্যাদা দান করেছেন?”।(মুসনাদে আহমাদ হা/২৯০২,ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটি ‘সিলসিলাহ সহিহাহ’ গ্রন্থে হা/২৫৯০ সহিহ বলেছেন)
.
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, ইমামের সাথে মাত্র একজন মুক্তাদী হলে সে ইমামের ঠিক বরাবর ডান পাশে দাঁড়াবে—পিছনে নয়; কারণ রাসূল (ﷺ) নিজেই আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-কে পাশে দাঁড় করিয়ে এ বিধান শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসটির সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:
وفيه فائدة فقهية هامة …وهي : أن السنة أن يقتدي المصلِّي مع الإمام عن يمينه وحذاءه غير متقدِّم عليه ولا متأخِّر عنه ، خلافاً لما في بعض المذاهب أه ينبغي أن يَأَخَّر عن الإمام قليلاً ، بحيث يجعل أصابع رجليه حذاء عقبي الإمام أو نحوه ، وهذا كما ترى خلاف هذا الحديث الصحيح ..
“​এই হাদিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি শিক্ষা (উপকারিতা) রয়েছে…আর তা হলো: সুন্নাহ পদ্ধতি হলো—ইমামের সাথে (একাকী) সালাত আদায়কারী ব্যক্তি তাঁর ডান পাশে তাঁর বরাবর দাঁড়াবে; ইমামের থেকে সামনে এগিয়ে নয়, আবার পিছিয়েও নয় এটি কিছু মাযহাবের সেই মতের বিরোধী, যেখানে বলা হয়েছে যে, মুসল্লী ইমামের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে দাঁড়াবেন,এমনভাবে যাতে মুসল্লির পায়ের আঙুলগুলো ইমামের গোড়ালি বরাবর থাকে। আর আপনি দেখতেই পাচ্ছেন যে, এই ধারণাটি এই সহিহ হাদিসের বিরোধী।”(দ্রষ্টব্য: সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সহিহাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৭৪)। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কেউ যদি ফজর হওয়ার আগে রাত বাকি আছে মনে করে অথবা সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে ভুলবশত পানাহার করে তাহলে তার সিয়ামের বিধান

 প্রশ্ন: কেউ যদি ফজর হওয়ার আগে রাত বাকি আছে মনে করে অথবা সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে ভুলবশত পানাহার করে তাহলে তার সিয়ামের বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ফজর হওয়ার আগে রাত বাকি আছে মনে করে অথবা সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে কেউ যদি ভুলবশত পানাহার করে এবং পরে তার ভুল ধরা পড়ে, তবে এ ক্ষেত্রে তার সিয়ামের বিধান কি হবে? সে বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
.
প্রথম মত: অধিকাংশ আলেমদের মতে, এতে রোজা ভেঙে যাবে এবং এর পরিবর্তে অন্য একদিন কাযা রোজা রাখা ওয়াজিব।
.
দ্বিতীয় মত: অন্যান্য আলেমদের মতে, তার রোজা সঠিক এবং সে রোজা পূর্ণ করবে, তাকে কোনো কাযা করতে হবে না। এটি তাবেয়ি মুজাহিদ ও হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ’র মত এবং ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা। শাফেয়ি মাযহাবের ইমাম মুযানী ও শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এটি পছন্দ করেছেন এবং শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) একে প্রধান্য দিয়েছেন।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ​ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
والذين قالوا لا يفطر في الجميع ( يعني : إذا أخطأ أو نسي في أول النهار أو آخره ) قالوا حجتنا أقوى ، ودلالة الكتاب والسنَّة على قولنا أظهر : فإن الله تعالى قال : ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا ، فجمع بين النسيان والخطأ ؛ ولأن من فعل محظورات الحج والصلاة مخطئا كمن فعلها ناسيا ، وقد ثبت في الصحيح ” أنهم أفطروا على عهد النبي صلى الله عليه وسلم ثم طلعت الشمس ” ولم يذكروا في الحديث أنهم أُمروا بالقضاء ، ولكن هشام بن عروة قال : ” لا بدَّ من القضاء ” ، وأبوه أعلم منه وكان يقول : ” لا قضاء عليهم ” ، وثبت في الصحيحين ” أن طائفة من الصحابة كانوا يأكلون حتى يظهر لأحدهم الخيط الأبيض من الخيط الأسود ، وقال النبي صلى الله عليه وسلم لأحدهم إن وسادك لعريض ، إنما ذلك بياض النهار وسواد الليل ” ، ولم ينقل أنه أمرهم بقضاء ، وهؤلاء جهلوا الحكم فكانوا مخطئين ، وثبت عن عمر بن الخطاب أنه أفطر ثم تبين النهار فقال : ” لا نقضي فإنا لم نتجانف لإثم ” ، وروي عنه أنه قال : ” نقضي ” ، ولكن إسناد الأول أثبت ، وصح عنه أنه قال :” الخطْب يسير ” فتأول ذلك مَن تأوله على أنه أراد خفة أمر القضاء ، لكن اللفظ لا يدل على ذلك .وفى الجملة : فهذا القول أقوى أثراً ونظراً ، وأشبه بدلالة الكتاب والسنَّة والقياس
“যারা বলেন যে, কোনো অবস্থাতেই রোজা ভঙ্গ হবে না (অর্থাৎ দিনের শুরুতে বা শেষে যদি কেউ ভুলবশত বা অজ্ঞতাবশত সময় নির্ধারণে ভুল করে পানাহার করে), তাদের যুক্তিই অধিক শক্তিশালী এবং কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসমূহ তাদের মতের পক্ষেই অধিক স্পষ্ট। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা যদি বিস্মৃত হই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের অপরাধী করবেন না।’ (সূরা বাকারা: ২৮৬) এখানে আল্লাহ তাআলা বিস্মৃতি (ভুলে যাওয়া) এবং ভুল করা (অজ্ঞতা) উভয়টিকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া, হজ্জ ও সালাতের নিষিদ্ধ কাজগুলো যে ব্যক্তি ভুলবশত (অজ্ঞতাবশত) করে ফেলে, সে ঐ ব্যক্তির মতো যে তা ভুলে গিয়ে করেছে (উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমাযোগ্য)।সহিহ হাদিসে প্রমাণিত আছে যে, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সাহাবীগণ (মেঘলা দিনে সূর্য ডুবেছে মনে করে) ইফতার করেছিলেন, এরপর সূর্য দেখা গিয়েছিল’; কিন্তু হাদিসের কোথাও এটি উল্লেখ করা হয়নি যে তাঁদেরকে ঐদিনের রোজার কাযা আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও বর্ণনাকারী হিশাম ইবনে উরওয়াহ বলেছিলেন যে ‘কাজা করা আবশ্যক’, তবে তাঁর পিতা (উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের) তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞানী ছিলেন এবং তিনি বলতেন: ‘তাঁদের ওপর কোনো কাজা নেই’। তদ্রূপ সহিহাইন (বুখারি ও মুসলিম)-এ বর্ণিত হয়েছে যে,সাহাবীদের একটি দল (আয়াত বুঝতে ভুল করে) ততক্ষণ পর্যন্ত (সাহরি) খেতেন যতক্ষণ না সাদা সুতা কালো সুতা থেকে স্পষ্ট হতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের একজনকে বলেছিলেন: ‘তোমার বালিশ তো তাহলে অনেক চওড়া (যদি তার নিচে দুই সুতা থাকে), আসলে তা হলো দিনের শুভ্রতা ও রাতের অন্ধকার’; এমতাবস্থায় তিনি তাঁদের কাযা করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।মূলত তাঁরা হুকুম বা বিধানটি জানতেন না, তাই তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলকারী (মুকতি) হিসেবে গণ্য ছিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার ইফতার করার পর সূর্য প্রকাশিত হয়ে পড়লে বলেছিলেন, ‘আমরা কাযা আদায় করব না, কারণ আমরা (স্বেচ্ছায়) পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ার জন্য এমনটা করিনি’। যদিও তাঁর থেকে ‘কাযা আদায়ের স্বপক্ষেও বর্ণনা রয়েছে, তবে পূর্বোক্ত (কাযা না করার) বর্ণনাটির সনদ (সূত্র) অধিক শক্তিশালী। তাঁর থেকে এটিও সহিহ সূত্রে বর্ণিত যে তিনি (এ ভুল ইফতার প্রসঙ্গে) বলেছিলেন, ‘বিষয়টি সামান্য।’কেউ কেউ এর ব্যাখ্যা করেছেন যে—কাযা করা সহজ বিধায় তিনি এমনটি বলেছেন, কিন্তু শব্দের প্রয়োগ এই অর্থের দিকে নির্দেশ করে না (বরং এটি ভুলের গুরুত্বহীনতা বা ক্ষমা পাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে)।
সারসংক্ষেপ হলো: এই মতটিই (কাযা না করা) বর্ণনাগত ও যুক্তিগতভাবে অধিক শক্তিশালী এবং কুরআন, সুন্নাহ ও কিয়াসের (যৌক্তিক তুলনা) প্রমাণের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৫৭২, ৫৭৩; ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪১১)
.
এছাড়াও অপর একটি হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইসলামী শরিয়তে অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বিস্মৃতিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এর একটি বড় প্রমাণ হলো রোজা অবস্থায় ভুলবশত পানাহার করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রোযা রাখার কথা ভুলে গিয়ে আহার ও পান করেছে; সে যেন তার রোযা পরিপূর্ণ করে। কেননা আল্লাহ্‌ই তাকে খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন”।(সহিহ বুখারী হা/১৩৯৯; ও সহিহ মুসলিম হা/১১৫৫) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, মানুষের অনিচ্ছাকৃত ভুল ইবাদতে কোনো ত্রুটি ঘটায় না। সুতরাং এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, এ অবস্থায় রোজা সঠিক হওয়ার এবং কাযা না করার দলিলগুলো অত্যন্ত জোরালো। তবুও কোনো মুসলিম যদি অধিক সতর্কতার খাতিরে সেই রোজার বদলে একদিন কাযা করে নেন তবে তা উত্তম হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম

 প্রশ্ন: তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর বিবাহের প্রস্তাব সংক্রান্ত মূলনীতি হলো— কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ের ইচ্ছা পোষণ করে এবং নির্দিষ্ট কোনো নারীকে প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করে, তবে সে একা কিংবা তার কোনো নিকট আত্মীয়— যেমন বাবা বা ভাই—কে সঙ্গে নিয়ে মেয়ের অভিভাবকের কাছে যেতে পারে। চাইলে অন্য কাউকে মাধ্যম হিসেবেও প্রস্তাব পাঠানো যায়। এ বিষয়ে শরিয়তে প্রশস্ততা রয়েছে।তবে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিও বিবেচনায় রাখা উচিত; কারণ কিছু দেশে প্রস্তাবদাতার একাকী যাওয়া অপ্রচলিত বা অসমীচীন হিসেবে দেখা হয়।এছাড়া প্রস্তাবদাতার জন্য প্রস্তাবিত নারীকে দেখা শরিয়তসম্মত। অন্যদিকে,
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন; এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা প্রয়োজন।
.
প্রথমত: বিয়ের প্রস্তাব (খুতবাহ) দুই ধরনের হতে পারে: স্পষ্ট প্রকাশ (تصريح) অথবা ইঙ্গিত প্রদান (تعريض)।
(ক).স্পষ্ট প্রকাশ (তাসরিহ): এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা যা শুধুমাত্র বিয়ের অর্থ বহন করে, অন্য কোনো সন্দেহ বা দ্ব্যর্থবাদ রাখে না। উদাহরণস্বরূপ— “তোমার ইদ্দত শেষ হলে আমি তোমার সঙ্গে বিয়ে করব” বলা, অথবা সরাসরি তার অভিভাবকের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি।
.
(খ).ইঙ্গিত প্রদান (তারিদ): এমন শব্দ ব্যবহার করা যাতে বিয়ের প্রস্তাবের সম্ভাবনাও থাকে আবার অন্য অর্থও হতে পারে। যেমন— “আপনার মতো গুণবতী নারী সবার কাম্য,” অথবা “আমি একজন স্ত্রী খুঁজছি,” অথবা “আশা করি আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম কোনো ব্যবস্থা বা রিজিকের ফয়সালা করবেন” ইত্যাদি।
.
দ্বিতীয়ত: ইদ্দত পালনরত নারীকে সরাসরি বা স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ (হারাম)। চাই তিনি তালাক-এ-রাজয়ি (ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে এমন তালাক),হোক কিংবা তালাক-এ-বায়েন (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ এমন তালাক) অথবা স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত পালনকারিণী হোন না কেন।যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না।”[সূরা বাকারা: ২৩৫] এ বিধানের গূঢ় রহস্য হলো সেই নারী গর্ভবতী হওয়া থেকে নিরাপদ না হওয়া। যার ফলে একজনের পানির সাথে অন্যজনের পানির মিশ্রণ ঘটবে এবং বংশ পরিচয়ে জটিলতা তৈরী হবে।
.
​তবে ইঙ্গিতপূর্ণ বিবাহ প্রস্তাবের (তারিদ) ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিধান রয়েছে:
​(১).যদি নারী তালাক-এ-রাজয়ি-এর ইদ্দত পালন করেন, তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়াও জায়েজ নেই। কারণ, রাজয়ি তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর মর্যাদাভুক্ত থাকেন। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন:(وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلاحا)”আর তাদের স্বামীরা এই মেয়াদের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নিতে চাইলে তারা অধিক হকদার” (সূরা বাকারা: ২২৮)। এখানে আল্লাহ তালাকদাতা স্বামীকে স্পষ্টভাবে ‘স্বামী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অতএব,যখন নারী এখনও অন্যের বিবাহাধীনে আছেন,তখন তাকে অন্য কেউ প্রস্তাব দেওয়া কীভাবে সম্ভব!
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;ولا يجوز التعريض لخطبة الرجعية إجماعا؛ لأنها كالزوجة” انتهى.”ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তালাকে রাজ’ঈপ্রাপ্তা নারীকে (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে) ইশারা-ইঙ্গিতেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বৈধ নয়; কারণ ইদ্দত চলাকালীন তিনি স্ত্রীর মতোই গণ্য।”(তাফসিরে কুরতুবি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
​(২).যদি কোনো নারীর স্বামীর মৃত্যুবরণ করে বা তিন তালাক দেয়, অথবা অন্য কোনো শরীয়ত সম্মত ত্রুটির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ইদ্দত পালন করেন,তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ,কিন্তু সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ। ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব জায়েজ হওয়ার দলিল হলো মহান আল্লাহর এই বাণী:وَ لَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِهٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَكۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّكُمۡ سَتَذۡكُرُوۡنَهُنَّ وَ لٰكِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡهُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ وَ لَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّكَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡكِتٰبُ اَجَلَهٗ ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ فَاحۡذَرُوۡهُ ۚ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ”আর যদি তোমরা আকার-ইঙ্গিতে (সে) নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দাও বা তোমাদের অন্তরে গোপন রাখ তবে তোমাদের কোন পাপ নেই। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে অবশ্যই আলোচনা করবে: কিন্তু বিধিমতো কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের সাথে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখো না; এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন। কাজেই তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম সহনশীল।”(সূরা বাকারা: ২৩৫)
.
সূরা বাকারা’র এই আয়াতটি মূলত সেই মহিলার ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে যার স্বামী মারা গেছেন। তবে ওলামায়ে কেরাম (ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ) কিয়াস বা সাদৃশ্যের ভিত্তিতে একে সেই সব মহিলাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেছেন যারা এমন ইদ্দত পালন করছেন যেখানে স্বামীর আর ফিরিয়ে নেওয়ার (রাজআত) সুযোগ নেই।
.
আয়াতটির তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেছেন:والتعريض هو الكلام الذي لا تصريح فيه، كأنه يَعْرِض لفكر المتكلم به.وأجمعت الأمة على أن الكلام مع المعتدة بما هو نص في تزويجها ، وتنبيه عليه : لا يجوز. وكذلك أجمعت على أن الكلام معها ، بما هو رفث وذكر جماع أو تحريض عليه: لا يجوز. وجُوِّز ما عدا ذلك”
“তা’রীয’ (ইশারা-ইঙ্গিত) হলো এমন কথা যাতে (উদ্দেশ্যটি) স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয় না, বরং তা কেবল বক্তার চিন্তাকে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে। উম্মতের আলেমগণ এই বিষয়ে (ইজমা) একমত হয়েছেন যে, ইদ্দত পালনকারী নারীর সাথে এমন কথা বলা জায়েজ নয় যা সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব বা তার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তেমনিভাবে আলেমগণ এ বিষয়েও ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে,অশ্লীল কথাবার্তা, যৌন মিলন বা তার প্রতি উস্কানিমূলক কথা বলাও যে নাজায়েজ এ ছাড়া বাকি সব (ইশারা-ইঙ্গিতপূর্ণ) কথা বলা বৈধ রাখা হয়েছে”।(তাফসীরে ইবনে আতিয়্যাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩১৫)
.
সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন,”
هذا حكم المعتدة من وفاة, أو المبانة في الحياة. فيحرم على غير مبينها (زوجها) أن يصرح لها في الخطبة, وهو المراد بقوله : ( وَلَكِنْ لَا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا ).وأما التعريض, فقد أسقط تعالى فيه الجناح. والفرق بينهما: أن التصريح, لا يحتمل غير النكاح, فلهذا حرم, خوفاً من استعجالها, وكذبها في انقضاء عدتها, رغبة في النكاح ، وقضاءً لحق زوجها الأول, بعدم مواعدتها لغيره مدة عدتها.وأما التعريض وهو: الذي يحتمل النكاح وغيره, فهو جائز للبائن كأن يقول: إني أريد التزوج, وإني أحب أن تشاوريني عند انقضاء عدتك, ونحو ذلك, فهذا جائز لأنه ليس بمنزلة التصريح, وفي النفوس داع قوي إليه. وكذا إضمار الإنسان في نفسه أن يتزوج من هي في عدتها, إذا انقضت (يعني لا حرج فيه أيضاً) . ولهذا قال : ( أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ ) هذا التفصيل كله, في مقدمات العقد. وأما عقد النكاح فلا يحل ( حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ ). أي: تنقضي العدة “
​”এটি এমন নারীর বিধান যে তার (স্বামীর) মৃত্যুতে কিংবা জীবদ্দশায় চূড়ান্ত বিচ্ছেদের (বায়েন তালাক) কারণে ইদ্দত পালন করছে। সুতরাং যে স্বামী তাকে বিচ্ছিন্ন করেছে (অর্থাৎ বায়েন তালাকের ক্ষেত্রে), সে ব্যতীত অন্য কারো জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হারাম। আর আল্লাহ তাআলার বাণী— ‘কিন্তু তোমরা তাদের সাথে গোপনে কোনো প্রতিশ্রুতি দিও না’—এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।তবে ইশারায় বা ইঙ্গিতে (বিয়ের কথা) বলার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ গুনাহ তুলে নিয়েছেন (অর্থাৎ তা বৈধ করেছেন)।সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য হলো:’সরাসরি প্রস্তাব’ বিবাহ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বহন করে না, তাই এটি হারাম করা হয়েছে; এই আশঙ্কায় যে,যাতে নারীটি দ্রুত বিয়ের লোভে ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য না দেয় এবং প্রথম স্বামীর হকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ইদ্দত চলাকালীন অন্য কারো সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ না হয়। আর ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব যা বিয়ে কিংবা অন্য কোনো অর্থও বহন করতে পারে—তা ‘বায়েন’ (চূড়ান্ত ভাবে বিচ্ছিন্ন) নারীর ক্ষেত্রে জায়েজ। যেমন কেউ তাকে বলল: ‘আমি বিয়ে করার ইচ্ছা রাখি’ অথবা ‘আমি পছন্দ করি যে, আপনার ইদ্দত শেষ হলে আপনি আমার সাথে পরামর্শ করবেন’—এই জাতীয় কথা। এটি জায়েজ হওয়ার কারণ হলো এটি স্পষ্ট প্রস্তাবের সমপর্যায়ভুক্ত নয় এবং মানুষের মনে এমন আকাঙ্ক্ষা জাগা স্বাভাবিক।অনুরূপভাবে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর কোনো নারীকে বিয়ে করার সংকল্প মনে মনে গোপন রাখাও বৈধ। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন: ‘অথবা তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে যা গোপন রাখো, আল্লাহ জানেন যে তোমরা অবশ্যই তাদের কথা স্মরণ করবে। এই বিস্তারিত আলোচনাটি কেবল বিয়ের প্রাথমিক আলোচনা (প্রস্তাব) সংক্রান্ত। আর বিয়ের মূল আকদ বা চুক্তি করা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ নয়, ‘যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় (ইদ্দত) তার শেষ সীমায় পৌঁছাবে’—অর্থাৎ, যতক্ষণ না ইদ্দত পূর্ণ হবে।”(তাফসির আস সাদী; পৃষ্ঠা: ১০৬; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-মুগনি; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১১২; আল-মাওসুআহতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ১৯১)।
.
▪️এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে-সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্যের হিকমত (রহস্য) কী?
.
​সরাসরি প্রস্তাব এবং ইশারার মধ্যে পার্থক্যের পেছনে হিকমত হলো:সরাসরি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একজন নারীর মনে এই নিশ্চয়তা তৈরি হয় যে, প্রস্তাবকারী তাকে বিয়ে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমতাবস্থায় দ্রুত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নারী তার ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে অসত্য তথ্য দিতে পারে। কিন্তু ইশারা-ইঙ্গিত কোনো নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি অস্পষ্ট সম্ভাবনা মাত্র। এই অনিশ্চয়তার কারণে নারী কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মিথ্যা বলার ঝুঁকি নেয় না।শরীয়ত এখানে দুটি স্বার্থের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছে:(১).আগ্রহী পুরুষের স্বার্থ: ইশারা-ইঙ্গিতের সুযোগ রেখে আগ্রহী পুরুষকে তার পছন্দ প্রকাশের একটি পথ দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্য কেউ তার আগে বিয়ের সুযোগ না পায়। (২)অনিষ্ট রোধ: সরাসরি প্রস্তাব নিষিদ্ধ করে তাড়াহুড়ো বা মিথ্যার মাধ্যমে ইদ্দতের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে।এছাড়া ইশারা সব সময় নিজের জন্যই হতে হবে এমন নয়; অনেক সময় তা অন্য কারো পক্ষেও হতে পারে। যেমন সহীহ মুসলিম-এর (১৪৮০) হাদিসে বর্ণিত আছে,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইদ্দত চলাকালে ফাতিমা বিনতে কায়েস-এর কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন: “আমার অনুমতি ছাড়া তুমি নিজের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।” পরে তাঁর ইদ্দত শেষ হলে তিনি তাঁকে উসামাহ্‌ ইবনু হারিসাহ্‌ (রাঃ)-এর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৯২) আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩২৩৭)
.
▪️আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা অত্যন্ত জরুরি:
.
আর তা হলো:কখনো কখনো অজ্ঞতার কারণে এমন ঘটে যে, কোনো নারীর ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই তার সঙ্গে বিবাহ সম্পাদন করা হয়। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী এটি হারাম। তাই কোনো নারী ইদ্দত অবস্থায় থাকা অবস্থায় যদি তার সঙ্গে বিবাহ করা হয়, তবে সে বিবাহ শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো আবশ্যক। এরপর ওই নারীকে অবশ্যই তার প্রথম স্বামীর ইদ্দত সম্পূর্ণ করতে হবে।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে;
اتفق الفقهاء على أنه لا يجوز للأجنبي نكاح المعتدة أيا كانت عدتها من طلاق أو موت أو فسخ أو شبهة ، وسواء أكان الطلاق رجعيا أم بائنا بينونة صغرى أو كبرى . وذلك لحفظ الأنساب وصونها من الاختلاط ومراعاة لحق الزوج الأول ، فإن عقد النكاح على المعتدة في عدتها ، فُرّق بينها وبين من عقد عليها ، واستدلوا بقوله تعالى : ( ولا تعزموا عقدة النكاح حتى يبلغ الكتاب أجله ) والمراد تمام العدة ، والمعنى : لا تعزموا على عقدة النكاح في زمان العدة ، أو لا تعقدوا عقدة النكاح حتى ينقضي ما كتب الله عليها من العدة … وفي الموطأ : أن طليحة الأسدية كانت زوجة رشيد الثقفي وطلقها ، فنكحت في عدتها ، فضربها عمر بن الخطاب وضرب زوجها بخفقةٍ ضربات ، وفرق بينهما ، ثم قال عمر : أيما امرأة نكحت في عدتها فإن كان الذي تزوجها لم يدخل بها فرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من زوجها الأول ، ثم إن شاء كان خاطبا من الخطاب . وإن كان دخل بها فُرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من الأول ، ثم اعتدت من الآخر ، ثم لا ينكحها أبدا “
“ফকিহগণ (ইসলামি আইনজ্ঞ) এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো ভিনদেশি বা পরপুরুষের জন্য ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা বৈধ নয়; চাই সেই ইদ্দত তালাক, মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ (ফাসখ) কিংবা শুবহাহ (সংশয়পূর্ণ মিলন) যে কারণেই হোক না কেন।তালাকটি রাজঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) হোক কিংবা বাইন—ছোট বিচ্ছেদ (বাইনুনা সুগরা) কিংবা বড় বিচ্ছেদ (বাইনুনা কুবরা) হোক—সর্বাবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।এ বিধান রাখা হয়েছে বংশধারা সংরক্ষণ, বংশের মিশ্রণ থেকে সুরক্ষা এবং প্রথম স্বামীর অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্য।যদি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীর সাথে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন করা হয়, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে তারা আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমে দলিল পেশ করেছেন: (আর তোমরা বিবাহের সংকল্প করো না যতক্ষণ না ইদ্দত তার নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায় (অর্থাৎ শেষ হয়)।”(সূরা বাকারা: ২৩৫) আর (এই আয়াতে বর্ণিত নির্ধারিত সময়) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইদ্দত পূর্ণ হওয়া। এর অর্থ হলো: তোমরা ইদ্দত চলাকালীন সময়ের মধ্যে বিবাহের সংকল্প করো না, অথবা আল্লাহ তার (নারীর) ওপর ইদ্দতের যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না।”মুয়াত্তা (ইমাম মালিক)-এ বর্ণিত হয়েছে যে: তালিহা আল-আসাদিয়্যা রুশাইদ আস-সাকাফীর স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি তাকে তালাক দিয়েছিলেন।তারপর ওই নারী তার ইদ্দত চলাকালীন সময়েই (অন্যত্র) বিবাহ করেন। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাকে এবং তার স্বামীকে চাবুক দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন। অতঃপর উমর (রা.) বলেন:”যে নারীই তার ইদ্দত চলাকালীন সময়ে বিবাহ করবে, যদি সেই বিবাহকারী স্বামী তার সাথে সহবাস না করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সেই নারী তার প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে। এরপর (ইদ্দত শেষে) সেই ব্যক্তি চাইলে অন্য আর দশজন প্রস্তাবকারীর মতো পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব দিতে পারবে। আর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তার সাথে সহবাস করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ওই নারী প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে, অতঃপর (সহবাসের কারণে) দ্বিতীয় স্বামীর জন্য ইদ্দত পালন করবে। এরপর (শাস্তিস্বরূপ) ওই (দ্বিতীয় স্বামী ও স্ত্রী) উভয় আর কখনোই (আজীবন) বিবাহ করতে পারবে না।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
.
প্রিয় পাঠক!ওমর (রা.)-এর এই আসার (বর্ণনা) থেকে বোঝা যায় যে, কোনো তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তার ক্ষেত্রে দুটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথমত: যদি শুধু বিবাহ সম্পন্ন হয় কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মিলন (সহবাস) না ঘটে: সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি চাইলে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত: যদি বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মিলন ঘটে থাকে: সেক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় স্বামীর কারণেও তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। এমতাবস্থায় (ওমর রা.-এর ফতোয়া অনুযায়ী) ওই নারী দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবেন; তিনি তাকে আর কখনোই বিবাহ করতে পারবেন না। এটি মালিকী মাযহাবের মত এবং হাম্বলী মাযহাবের দুটি মতের একটি। তবে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত (জমহুর) অনুযায়ী, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে বিবাহ করতে পারবেন।
.
​অবশ্য হাম্বলী ফকীহগণ বলেন: দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে ততক্ষণ বিবাহ করতে পারবেন না যতক্ষণ না “উভয় ইদ্দত” (প্রথম স্বামীর ইদ্দত এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে মিলনের কারণে পালনীয় ইদ্দত) শেষ হয়।মাতালিবু উলিন নুহা” গ্রন্থে বলা হয়েছে:وللثاني الذي تزوجته في عدتها ووطئها أن ينكحها بعد انقضاء العدتين ، لأنه قبل انقضاء عدة الأول يكون ناكحا في عدة غيره ، وأما انقضاء عدته فلأنها عدة لم تثبت لحقه ؛ لأن نكاحه لا أثر له ، وإنما هي لحق الولد فلم يجز له النكاح فيها كعدة غيره”যে ব্যক্তি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীকে বিবাহ করেছে এবং তার সাথে সহবাস করেছে, সে ব্যক্তি উভয় ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। কারণ প্রথম ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে বিবাহ করলে তা অন্যের ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। আর দ্বিতীয় ইদ্দত (যা নিজের মিলনের ফলে ওয়াজিব হয়েছে) শেষ হওয়া জরুরি, কারণ এটি একটি শরয়ি ইদ্দত যা সন্তানের বংশপরিচয় রক্ষার জন্য আবশ্যক। তাই অন্যের ইদ্দতের মতোই এই ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ জায়েজ নয়।”(দ্রষ্টব্য: আল-মুনতাকা লিল-বাজি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৭; মাতালিবু উলিন নুহা; খণ্ড: ৫/৯৭, ৫৭৭; আহকামুল কুরআন লিল-জাসাস; খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ৫৮০), ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৪৮)।
.
তবে এই মাসালায় (আল্লাহু আলাম) অধিকতর সঠিক (রাজ্যেহ) মত হলো:ইদ্দতের মধ্যে বিবাহকারী নারী যদি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করেন, তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি তার সাথে নতুন করে আকদ (বিবাহ) করতে পারবেন; সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য আলাদা ইদ্দতের প্রয়োজন নেই। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই নারীর অভিভাবকের (ওয়ালী) অনুমতি এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিতে হতে হবে। নারী নিজে নিজের বিয়ের আকদ করতে পারেন না।(দ্রষ্টব্য: ইবনু উসাইমীন আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
​▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য এবং রমাদান মাসে একই রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান

 প্রশ্ন: তারাবি ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য কি? রমাদান মাসে একই রাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:
.
▪️তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য:
.
রাত্রির বিশেষ নফল সালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত। আর এগুলো কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। রমাদানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রমাদান ও রমাদানের বাহিরে অন্যান্য সময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়। রাত্রির সালাত বা সালাতুল লায়েল’ নফল হলেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيْضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ “ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হল রাত্রির (নফল) সালাত”।(সহীহ মুসলিম, হা/১১৬৩; মিশকাত, হা/২০৩৯)। তিনি আরও বলেন, “আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহ্বান করেন”। (সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৩; মিশকাত, হা/১২২৩)।সুতরাং তারাবি ও তাহাজ্জুদ এ দুইটি পৃথক কোন সালাত নয়, যেমনটি অনেক সাধারণ মানুষ ধারণা করে থাকেন। বরং রমজান মাসে যে ‘কিয়ামুল লাইল’ আদায় করা হয় সেটাকে‘সালাতুত তারাবী’বা বিরতিপূর্ণ নামায বলা হয়।কারণ সলফে সালেহীন (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণের প্রজন্ম) যখন এই সালাত আদায় করতেন তখন তাঁরা প্রতি দুই রাকাত বা চার রাকাত অন্তর বিরতি নিতেন। কেননা তাঁরা মহান মৌসুমকে কাজে লাগাতে ও রাসূলের হাদিস“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়”?সহীহ বুখারী হা/৩৬) এ বর্ণিত সওয়াব পাওয়ার আশায় নামাযকে দীর্ঘ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।আল্লাহ তা‘আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৭৩০)
.
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, تِلْكَ صَلَاةٌ وَاحِدَةٌ إِذَا تَقَدَّمَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّرَاوِيْحِ إِذَا تَأَخَّرَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّهَجُّدِ “এটা (তারবি ও তাহাজ্জুদ) একই সালাত; যখন রাতের প্রথমাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তারাবীহ। আর যখন শেষাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তাহাজ্জুদ’ (ফায়যুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪২০)
.
আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ-এ বলা হয়েছে:” لا خلاف بين الفقهاء في سنية قيام ليالي رمضان ؛ لقوله صلى الله عليه وسلم : ( من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ) وقال الفقهاء : إن التراويح هي قيام رمضان ؛ ولذلك فالأفضل استيعاب أكثر الليل بها ; لأنها قيام الليل “রমজানের রাতগুলোতে কিয়াম করা সুন্নত।এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ রাসূল (ﷺ) বলেছেন:যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ফকীহগণ বলেছেন: তারাবীহই হলো রমজানের কিয়াম। তাই উত্তম হলো:এর মাধ্যমে রাতের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করা, কারণ এটি মূলত কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ)”।(আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা: ১২৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: তারাবিহ এবং কিয়ামের (তাহাজ্জুদ) মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? রমজানের শেষ দশকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা (কিয়াম), দীর্ঘ রুকু এবং দীর্ঘ সেজদা করার কি বিশেষ কোনো দলিল আছে?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
الفرق بين التراويح والقيام والإطالة في العشر الأواخر
س: هل هناك فرق بين التراويح والقيام؟ وهل من دليلٍ على تخصيص العشر الأواخر بطول القيام والركوع والسجود؟
ج: الصلاة في رمضان كلها تُسمَّى قيامًا كما قال ﷺ: مَن قام رمضان إيمانًا واحتسابًا غُفر له ما تقدَّم من ذنبه[1]، فإذا قام ما تيسر منه مع الإمام سُمِّي قيامًا، ولكن في العشر الأخيرة يُستحب الإطالة؛ لأنه يُشرع إحياؤها بالصلاة والقراءة والدعاء؛ لأن الرسول عليه الصلاة والسلام كان يُحيي الليل كله في العشر الأخيرة، ولهذا شُرعت الإطالة فيها كما أطال النبي ﷺ فإنه قرأ في بعض الليالي بالبقرة والنساء وآل عمران في ركعةٍ واحدةٍ.فالمقصود أنه عليه الصلاة والسلام كان يُطيل في العشر الأخيرة ويُحييها؛ فلهذا شُرع للناس إحياؤها والإطالة فيها حتى يتأسّوا به ﷺ بخلاف العشرين الأول، فإنه ما كان النبي عليه الصلاة والسلام يُحييها، كان يقوم وينام عليه الصلاة والسلام كما جاء ذلك في الأحاديث، أما في العشر الأخيرة فكان عليه الصلاة والسلام يُحيي الليل كله، ويُوقظ أهله، ويشدّ المئزر عليه الصلاة والسلام ولأن فيها ليلةً مباركةً؛ ليلة القدر
“রমাদান মাসের নফল নামাজসমূহকে সামগ্রিকভাবে ‘কিয়াম’ বলা হয়। কারণ মুহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমাদানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/৩৭) অতএব,কেউ যদি ইমামের সঙ্গে যতটুকু সম্ভব সালাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাও তার জন্য কিয়াম হিসেবেই গণ্য হবে। তবে রমাদানের শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম করা মুস্তাহাব। কেননা এই সময়কে সালাত, তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে জীবন্ত রাখা শরিয়তসম্মত আমল। রাসূল ﷺ নিজেও শেষ দশকে পুরো রাত ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। এ কারণেই এ সময়ে দীর্ঘ কিয়ামের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।নবী (ﷺ) দীর্ঘ তিলাওয়াত করতেন এমনকি কোনো কোনো রাতে এক রাকাআতেই সূরা আল-বাকারা, আন-নিসা ও আলে-ইমরান তিলাওয়াত করেছেন। মূল উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম ও রাত জাগরণের মাধ্যমে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন; তাই উম্মতের জন্যও এই সময় ইবাদতে জাগ্রত থাকা ও কিয়াম দীর্ঘ করা সুন্নাহ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, যাতে তারা তাঁর অনুসরণ করতে পারে।রমজানের প্রথম বিশ রাতের অবস্থা ভিন্ন ছিল। তখন তিনি পুরো রাত জেগে থাকতেন না; বরং কিছু সময় নামাজ আদায় করতেন এবং কিছু সময় (ঘুমিয়ে) বিশ্রাম নিতেন যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে;কিন্তু শেষ দশকে তিনি রাতভর ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন (অর্থাৎ ইবাদতে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন)। আর এর বিশেষ কারণ হলো—এই দশকের মধ্যেই রয়েছে এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত, লাইলাতুল কদর।”।(ইমাম বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৩৮)
.
▪️রমাদান মাসে একই রাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান কি?
.
একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে তারাবি এবং শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ আদায় করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের একদল এটিকে জায়েজ মনে করেন, আবার অপর একটি অংশ একে বিদআত বলে অভিহিত করেছেন।
.
যারা এমনটি করা বিদআত বলেছেন তাদের যুক্তি হল:
‘তারাবীহ’ ও ‘তাহাজ্জুদ’ মূলত একই সালাত। আর এ জন্যই মুহাদ্দিছগণ একই হাদীস ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন, ‘তারাবীহ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন (সহীহ বুখারী, হা/২০১৩, ১/২৬৯ পৃ.হা/১১৪৭, ১/১৫৪, হা/৩৫৬৯, ১/৫০৪)।তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়েননি। প্রশ্নকারী আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে রমাদানের রাত্রির সালাত কেমন ছিল সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছিলেন। আর তারই উত্তরে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ১১ রাক‘আতের কথা বলেন। এছাড়া উক্ত উদ্ভট দাবীকে চূর্ণ করেছেন প্রখ্যাত হানাফী বিদ্বান আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীছটি উল্লেখ করে বলেন, فِيْهِ تَصْرِيْحٌ أَنَّهُ حَالُ رَمَضَانَ فَإنَّ السَّائِلَ سَأَلَ عَنْ حَالِ رَمَضَانَ وَغَيْرِه ‘এতে পরিষ্কার ব্যাখ্যা রয়েছে যে, এটা রমাদানেরই অবস্থা। কারণ প্রশ্নকারী রামাযানসহ অন্যান্য অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন’ (আল-আরফুশ শাযী শরহে তিরমিযী, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬৬) অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তৃতীয় দিন ২৭-এর রাত্রে সাহারীর সময় পর্যন্ত তারাবীহর ছালাত দীর্ঘ করেছিলেন, যাতে সাহাবায়ে কেরাম সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে, فَقَامَ بِنَا حَتَّى خَشِيْنَا أَنْ تَفُوْتَنَا الْفَلَاحُ ‘আমাদের নিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে ছালাত পড়লেন, যাতে আমরা সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলাম’ (আবু দাঊদ, হা/১৩৭৫, ১/১৯৫; তিরমিযী, হা/৮০৬, ১/১৬৬; মিশকাত, হা/১২৯৮)। তাহলে এই রাতে তাহাজ্জুদ কখন পড়লেন?
.
অনুরূপ সাহাবীদের যুগেও তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই সালাত বলে গণ্য হত। কারণ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যে হাদীছে ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ঐ হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘ক্বিরাআত লম্বা হওয়ার কারণে (পরিশ্রান্ত হয়ে) আমরা লাঠির উপর ভর দিতাম এবং ফজরের সালাতের সময় হওয়ার উপক্রম হলে সালাত শেষ করে চলে আসতাম”।(সহীহ ইবনু খুযায়মাহ, ৪/১৮৬ পৃ.; মুওয়াত্ত্বা মালেক, ১/১১৫)।সুতরাং স্পষ্ট হল যে,রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরাম একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়তেন না। অন্য আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّىْ مَا بَيْنَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى الْفَجْرِ إِحْدَى عَشَرَةَ رَكْعَةً”নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাত শেষ করার পর হতে ফজর পর্যন্ত মাত্র ১১ রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন’ (সহীহ মুসলিম, হা/৭৩৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৫৮)। উক্ত হাদীস থেকে আরো স্পষ্ট হল যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত ১১ রাক‘আতের বেশী সালাত কখনো পড়তেন না।অনুরূপ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সংক্রান্ত ছহীহ বুখারীতে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তাতে একই সালাতের কথা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, وَالَّتِىْ يَنَامُوْنَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِىْ يَقُوْمُوْنَ يُرِيْدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُوْمُوْنَ أَوَّلَهُ ‘তবে তারা যা পড়ছে তার চেয়ে উত্তম সেটাই, যার জন্য তারা ঘুমাত অর্থাৎ শেষ রাত্রের ছালাত। তবে লোকেরা প্রথমাংশেই পড়ত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০১০; মিশকাত, হা/১৩০১, পৃ. ১১৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১২২৭, ৩/১৫১-৫২)।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: প্রশ্নকারী: হে আমাদপর শাইখ, বর্তমানে যা ঘটছে রমাদানেরশেষ দশকে তারা কিয়ামের (তাহাজ্জুদ/তারাবিহ) সালাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নিচ্ছে; কিছু রাতের প্রথম অংশে এবং কিছু শেষ অংশে। আর এটা যেন একটি স্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়েছে? জবাবে ইমাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
: بدعة, السائل : طيب كيف يكون, يعني لو أردنا أن نقيم السنة ونخفف على الناس, فكيف نفعل ؟
الشيخ : تؤخرون كما قال عمر: ” والتي يؤخرونها أفضل ” يعني هو أمر أبيّ بن كعب أن يقيم صلاة القيام بالناس بعد صلاة العشاء ففعل ولما خرج يتحسس قال: ” نعمة البدعة هذه والتي ينامون عنها أفضل ” .السائل : يعني يبقى الحال على ما هو قبل العشر ؟ الشيخ : أي نعم
“(এটি একটি) বিদআত। প্রশ্নকারী: তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি কী হবে? অর্থাৎ, যদি আমরা সুন্নাহ কায়েম করতে চাই এবং মানুষের জন্য সহজও করতে চাই, তবে আমাদের কী করা উচিত?
শাইখ: তোমরা এটি বিলম্বিত করবে (রাতের শেষ অংশে পড়বে), যেমনটি ওমর (রা.) বলেছিলেন: “যেটি তারা বিলম্বিত করে আদায় করে, সেটিই উত্তম।” অর্থাৎ, তিনি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি ইশার পর লোকদের নিয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করেন। তিনি তা-ই করলেন। এরপর ওমর (রা.) (বাইরে) বের হয়ে পরিস্থিতি দেখলেন এবং বললেন: “এটি কতই না উত্তম বিদআত! আর রাতের যে অংশে তারা ঘুমিয়ে থাকে (অর্থাৎ শেষ রাত), সেই সময়ের সালাতেই অধিক উত্তম।” প্রশ্নকারী: তার মানে কি শেষ দশকের আগের দিনগুলোতে যেভাবে চলত, তেমনই থাকবে?
​শাইখ: হ্যাঁ, তাই থাকবে।”(ইমাম আলবানী; সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিয়ো ক্লিপ নং-৭১৯)
.
অপরদিকে যেসব আলেম একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয় সালাত আদায়কে জায়েজ বলেছেন, তাঁদের অভিমত হলো: রমাদানের রাতের নফল ইবাদত মূলত কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত; আর কিয়ামুল লাইলকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ—এই দুই ধাপে আদায় করা শরীয়তসম্মত। কারণ, তারাবীহর জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো রাকাতসংখ্যা নির্ধারিত হয়নি এবং ইশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত পুরো রাতই ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত সময়। অতএব, যেহেতু সমগ্র রাতই কিয়ামের সময়,তাই ইবাদতের মাঝে বিরতি দেওয়া যদি স্বতন্ত্র কোনো নতুন ইবাদত হিসেবে উদ্দেশ্য না হয়ে বরং মুসল্লিদের জন্য সহজতা সৃষ্টি, অধিক সওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া এবং রাতের শেষ তৃতীয়াংশের বিশেষ ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে হয়—যেমনটি বিশেষত রমজানের শেষ দশকে অনেক ইমাম করে থাকেন তাহলে তা শরীয়তসম্মত এবং নিষিদ্ধ নয়। যেমন: এশার পর জামাতের সাথে তারাবি আদায় করা, তারপর রাতের শেষ ভাগে পুনরায় মসজিদে ফিরে এসে কিয়াম করা। এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার মতো কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই; বরং শেষ দশকে সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদতে অধিক প্রচেষ্টা করাই কাম্য।আর যদি কেউ নিজের রাতকে নামাজ, বিশ্রাম, ঘুম ও কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে ভাগ করে নেয়, তবে সে অবশ্যই উত্তম কাজই করলো। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়ও দেখা যায়, মুসলিমরা সহজতা ও সহনীয়তার জন্য অনেক সময় ইবাদতকে এভাবেই ভাগ করে নিয়েছেন।পক্ষান্তরে, সমসাময়িক কিছু আলেম এই বিভাজন পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ বলেছেন। তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো—বিতরসহ এগারো রাকআতের বেশি আদায় করা বিদআত। তবে এ মতটি দুর্বল; কারণ এটি নবী ﷺ-এর সাধারণ (মুতলাক) নির্দেশনার পরিপন্থী এবং সাহাবা ও পরবর্তী যুগের আমলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে কেউ বিশ রাকআত, কেউ ঊনচল্লিশ রাকআত পর্যন্তও আদায় করেছেন। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়: যারা রাতের প্রথমাংশে তারাবি আদায় করে পরে তাহাজ্জুদ পড়তে চান, তাদের জন্য উত্তম হলো প্রথম অংশে বিতির না পড়ে বরং রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের পর বিতির আদায় করা যাতে সেটিই রাতের সর্বশেষ সালাত হয়।
আর এরই মতো: যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম হিসেবে দুই মসজিদে বা দুই জামাতে সালাত পড়ান রাতের শুরুতে একবার এবং রাতের শেষে একবার; অথবা যদি এমন হয় যে, এক জামাতে তিনি মুক্তাদি হিসেবে সালাত পড়েন এবং অন্যটিতে ইমাম হিসেবে সালাত পড়ান—এর প্রতিটিই ইনশাআল্লাহ জায়েজ এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই। দলিল হচ্ছে: ক্বায়িস ইবনু ত্বালক্ব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা রমাদান মাসে ত্বালক্ব ইবনু ‘আলী (রাঃ) আমাদের সাথে দেখা করতে এসে এখানে সন্ধ্যা অতিবাহিত করেন এবং এখানেই ইফতার করেন। অতঃপর রাতে আমাদেরকে নিয়ে তারাবীহ ও বিতর সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি নিজেদের মাসজিদে গিয়ে তার সাথীদেরকে নিয়েও সালাতআদায় করেন। অতঃপর বিতর সালাতের জন্য এক ব্যক্তিকে সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার সাথীদেরকে বিতর পড়াও। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনছি : একই রাতে দুইবার বিতর হয় না”।(সুনানে আবু দাউদ হা/১৪৩৯;তিরমিযী হা/৪৭০;নাসাঈ হা/১৬৭৯;মুসনাদে আহমদ হা/১৬২৯৬;এই হাদিসটিকে ইবনুিল মুলাককিন তাঁর “আল-বদরুল মুনীর” (৪/৩১৭) গ্রন্থে, একইভাবে হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারী” (২/৪৮১) গ্রন্থে ‘হাসান’ বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ-এর মুহাক্কিকগণও একে ‘হাসান’ বলেছেন এবং ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সুনানে আবু দাউদ”-এ হাদিসটি ‘সহীহ’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
হাদিসটির ব্যাখায় আস-সিন্দী (রাহিমাহুলাহ) বলেন: فصلى بِأَصْحَابِهِ ) الظَّاهِر أَنه صلى بهم الْفَرْض وَالنَّفْل جَمِيعًا ، فَيكون اقْتِدَاء الْقَوْم بِهِ فِي الْفَرْض ، من اقْتِدَاء المفترض بالمتنفل) (অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবীদের নিয়ে সালাত পড়লেন—এর বাহ্যিক অর্থ হলো তিনি তাঁদের নিয়ে ফরজ ও নফল উভয় সালাতই আদায় করেছেন। এমতাবস্থায় (সাহাবীগণের তথা) কওমের এই ইক্তিদা ছিল ‘নফল আদায়কারীর পেছনে ফরজ আদায়কারীর ইক্তিদা’ করার অন্তর্ভুক্ত।”[হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সুনানিন নাসাঈ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৩০)
​ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহকে.)-কে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে রমাদান মাসে সালাত (তারাবীহ) আদায় করে এবং তাদের নিয়ে বিতর পড়ে, অথচ সে অন্য একদল মানুষের ইমামতি করারও ইচ্ছা রাখে? তিনি (রাহি.) উত্তরে বলেন:يشتغل بينهما بشيء ، بأكل أو شرب أو يجلس “সে যেন এই দুইয়ের মাঝে কোনো কিছুতে নিয়োজিত হয়; যেমন— পানাহার করা অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকা।”
.
​ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة ، فيشتغل بينهم بشيء ، ليكون فصلا بين وتره وبين الصلاة الثانية ، وهذا إذا كان يصلي بهم في موضعه ، أما في موضع آخر فذهابه فصل ، ولا يعيد الوتر ثانية ( لا وتران في ليلة ) “এর কারণ হলো—তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বিতর সালাতের সাথে (অন্য কোনো) সালাত সরাসরি জুড়ে দেওয়া অপছন্দ করতেন। তাই তিনি এ দুটির মাঝে কোনো কাজে মশগুল হতেন যেন বিতর এবং পরবর্তী সালাতের মধ্যে একটি ‘বিচ্ছেদ’ বা পার্থক্য তৈরি হয়। এটি তখনকার নিয়ম যখন কেউ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে (উভয়) সালাত আদায় করে। কিন্তু যদি অন্য স্থানে গিয়ে সালাত পড়ে, তবে তার সেই হেঁটে যাওয়াই একটি ‘বিচ্ছেদ’ হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কেননা (এক রাতে দুইবার বিতর নেই)”।(ইবনু কাইয়ুৃম; বাদায়ে‘উল ফাওয়ায়েদ খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন,وروى المروذي، عن أحمد – في الرجل يصلي شهر رمضان، يقوم فيوتر بهم، وهو يريد يصلي بقوم آخرين -: يشتغل بينهما بشيء، يأكل أو يشرب أو يجلس.قال أبو حفص البرمكي: وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة، ويشتغل بينهما بشيء؛ ليكون فصلا بين وتره، وبين الصَّلاة الثانية. وهذا إذا كانَ يصلي بهم في موضعه، فإما إن كانَ موضع آخر، فذهابه فصل، ولا يعيد الوتر ثانية؛ لأنه لا وتران في ليلة. “আল-মারওয়াযী ইমাম আহমাদ (রাহি.) থেকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—যে রমাদান মাসে লোকদের নিয়ে সালাত (তারাবি) পড়ে এবং তাদের নিয়ে বিতরও পড়ে ফেলে, অথচ সে এরপর অন্য একটি দলের সাথে সালাত আদায়ের ইচ্ছা রাখে—ইমাম আহমাদ বলেন: সে দুই সালাতের মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে; যেমন—কিছু খাবে বা পান করবে অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকবে। আবু হাফস আল-বারমাকী বলেন: এটি এ কারণে যে, বিতরের সাথে সাথে (পরবর্তী) সালাত মিলিয়ে ফেলা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। তাই মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে যেন তার বিতর এবং দ্বিতীয় সালাতের মাঝে একটি ব্যবধান তৈরি হয়। এটি তখন প্রযোজ্য যখন সে একই স্থানে তাদের নিয়ে সালাত পড়ে। তবে যদি স্থান ভিন্ন হয়, তবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়াই ‘বিচ্ছেদ’ বা ব্যবধান হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কারণ এক রাতে দুই বিতর নেই। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
​তবে ইমাম আহমাদ থেকে এর বিপরীত বক্তব্যও বর্ণিত আছে: যেমন-সালিহ-এর বর্ণনায় ইমাম আহমাদ সেই ব্যক্তি সম্পর্কে—যে ইমামের সাথে বিতর পড়ে ঘরে ফিরে গেছে—বলেছেন: ‘আমার কাছে পছন্দনীয় হলো সে যেন (পুনরায় সালাত শুরুর আগে) একটু শুয়ে নেয় অথবা দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বলে।’ রমাদান মাসে ‘তাকীব’ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘তাকীব’ হলো: লোকজন মসজিদে জামাতের সাথে সালাত (তারাবীহ ও বিতর) পড়ার পর বেরিয়ে যাবে, এরপর আবার মসজিদে ফিরে এসে রাতের শেষাংশে জামাতের সাথে সালাত আদায় করবে। আবু বকর আব্দুল আজিজ ইবনে জাফর এবং আমাদের (হাম্বলি মাযহাবের) অন্যান্য ফকিহগণ এভাবেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মারওয়াযী ও অন্যান্যরা ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: এতে কোনো অসুবিধা নেই। আনাস (রা.) থেকেও এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে। আবার ইবনুল হাকাম তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন: ‘আমি এটি অপছন্দ করি। আনাস (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে তিনি এটি অপছন্দ করতেন। আবু মিজলায ও অন্যান্য থেকেও এর অপছন্দনীয়তার কথা বর্ণিত আছে। বরং তারা কিয়ামকে (সালাত) রাতের শেষাংশ পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন, যেমনটি উমর (রা.) বলেছিলেন।’আবু বকর আব্দুল আজিজ বলেন: ‘ইবনে হাকামের বর্ণিত মতটি ইমাম আহমাদের পুরনো মত। বর্তমানে আমল হলো সেই বর্ণনার ওপর যা একদল ফকিহ বর্ণনা করেছেন যে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
প্রখ্যাত তাবি‘ঈ, আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস, ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৯৭ হি: মৃত: ১৬১ হি] বলেন:التعقيب محدث. ومن أصحابنا من جزم بكراهيته، إلا أن يكون بعد رقدة، أو يؤخره إلى بعد نصف الليل، وشرطوا: أن يكون قد أوتروا جماعة في قيامهم الأول، وهذا قول ابن حامد والقاضي وأصحابه. ولم يشترط أحمد ذلك. وأكثر الفقهاء على أنه لا يكره بحالٍ…ونقل ابن المنصور، عن إسحاق بن راهويه، أنه إن أتم الإمام التراويح في أول الليل، كره له أن يصلي بهم في آخره جماعة أخرى؛ لما روي عن أنس وسعيد بن جبير من كراهته. وإن لم يتم بهم في أول الليل وآخر تمامها إلى آخر الليل لم يكره.”তাকীব (তারাবীহ শেষে পুনরায় জামাতে নফল পড়া) একটি নব-উদ্ভাবিত বিষয়। আমাদের (হাম্বলী মাজহাবের) একদল ফকীহ একে ‘মাকরূহ’ বলে সুনিশ্চিত মত দিয়েছেন—কিন্তু যদি তা সামান্য ঘুমের পর হয় অথবা রাতের মধ্যভাগের পরে বিলম্বিত করে পড়া হয়,তাহলে ভিন্ন কথা। তারা আরও শর্ত দিয়েছেন যে, মুসল্লিরা যেন তাদের প্রথম দফার কিয়ামেই (তারাবিহতে) জামাতের সাথে বিতর সম্পন্ন করে নেয়। এটি ইবনে হামিদ, কাজী আবু ইয়ালা ও তাঁর অনুসারীদের অভিমত। অবশ্য ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এই (বিতর পড়ার) শর্তটি দেননি। অন্যদিকে অধিকাংশ ফকীহর মত হলো এটি কোনো অবস্থাতেই মাকরূহ নয়।…ইবনে মানসুর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: যদি ইমাম রাতের প্রথম ভাগে তারাবিহ (পুরো ৮/২০ রাকাত বা নির্ধারিত অংশ) সম্পন্ন করে ফেলেন, তবে রাতের শেষ ভাগে মুসল্লিদের নিয়ে পুনরায় জামাতে সালাত পড়া মাকরূহ। কারণ আনাস (রা.) ও সাঈদ ইবনুল জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে এর অপছন্দনীয়তা বর্ণিত হয়েছে। তবে যদি তিনি রাতের প্রথম ভাগে সালাত পূর্ণ না করে তার কিছু অংশ রাতের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, তবে তা মাকরূহ হবে না।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইবনু রজব; ‘ফাতহুল বারী’, ইবনে রজব; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৭৪)। আর এই ‘মাকরূহ’ হওয়াটা সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন ইমাম রাতের প্রথম ভাগে বিতর পড়ে ফেলেন এবং এরপর আবার জামাতে সালাত শুরু করেন। বর্তমানে কিছু মানুষ এমনটা করে থাকেন। তবে ইবনে রজব যেমনটি বলেছেন—অধিকাংশ ফকিহর মতে এটি মাকরূহ নয়। মূল কথা হলো, এই ‘ফাসল’ বা বিরতি দেওয়া একটি প্রাচীন বিষয় যা নিয়ে সালাফগণ (পূর্বসূরিরা) আলোচনা করেছেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনির ব্যাখ্যায় বলেন:
قوله: لا التعقيب في جماعة ، أي: لا يُكره التَّعقيب بعد التَّراويح مع الوِتر، ومعنى التَّعقيب: أن يُصلِّيَ بعدها ، وبعد الوِتر ، في جماعة. وظاهرُ كلامه: ولو في المسجد.
مثال ذلك: صَلّوا التَّراويح والوتر في المسجد، وقالوا: احضروا في آخر الليل لنقيم جماعة، فهذا لا يُكره على ما قاله المؤلِّف.ولكن هذا القول ضعيف، لأنه مستندٌ إلى أثر عن أنس بن مالك رضي الله عنه أنَّه قال: لا بأس به، إنما يرجعون إلى خير يرجونه … أي: لا ترجعوا إلى الصَّلاة إلا لخير ترجونه.لكن هذا الأثر، إنْ صَحَّ عن أنس: فهو مُعَارِض لقوله صلّى الله عليه وسلّم: اجْعَلوا آخِرَ صَلاتِكم بالليل وِتْراً ؛ فإنَّ هؤلاء الجماعة صَلُّوا الوِتر، فلو عادوا للصَّلاة بعدها ، لم يكن آخرُ صلاتهم بالليل وِتراً. ولهذا كان القولُ الرَّاجحُ: أنَّ التَّعقيب المذكور مكروه، وهذا القول إحدى الرِّوايتين عن الإمام أحمد رحمه الله، وأطلق الروايتين في المقنع و الفروع و الفائق وغيرها، أي: أنَّ الروايتين متساويتان عن الإمام أحمد، لا يُرَجَّح إحداهما على الأخرى.لكن لو أنَّ هذا التَّعقيبَ جاء بعد التَّراويح، وقبل الوِتر، لكان القول بعدم الكراهة صحيحاً، وهو عمل النَّاس اليوم في العشر الأواخر من رمضان، يُصلِّي النَّاس التَّراويح في أول الليل، ثم يرجعون في آخر الليل، ويقومون يتهجَّدون”
লেখকের কথা—”জামাতে তাকীব নয়”অর্থাৎ তারাবি ও বিতর আদায়ের পর ‘তাকীব’ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয়। ‘তাকীব’-এর অর্থ হলো: তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতের সাথে (নফল) সালাত আদায় করা। তাঁর (মূল লেখকের) বক্তব্যের বাহ্যিক মর্ম হলো: এটি মসজিদে হলেও (মাকরূহ হবে না)।
​উদাহরণস্বরূপ: তারা মসজিদে তারাবীহ ও বিতর আদায় করল এবং বলল, ‘আপনারা রাতের শেষাংশে উপস্থিত হবেন, আমরা পুনরায় জামাত কায়েম করব’—লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী এটি মাকরূহ নয়। কিন্তু এই মতটি দুর্বল। কারণ, এটি আনাস ইবনে মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি আছরের (উক্তির) ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন: ‘এতে কোনো অসুবিধা নেই, তারা তো কেবল সেই কল্যাণের দিকেই ফিরে আসে যার তারা আশা রাখে…’ অর্থাৎ: তোমরা সালাতে ফিরে এসো না কেবল সেই কল্যাণ লাভের প্রত্যাশা ব্যতীত। তবে আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই আছরটি যদি বিশুদ্ধও হয়, তবুও তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণীর পরিপন্থী: ‘তোমরা তোমাদের রাতের শেষ সালাতটিকে বিতর করো।’ কারণ, এই জামাতটি তো ইতিপূর্বেই বিতর পড়ে ফেলেছে। এমতাবস্থায় তারা যদি পুনরায় সালাতে ফিরে আসে, তবে তাদের রাতের শেষ সালাতটি আর বিতর থাকল না। এ কারণেই সঠিক মত (কওলু রাজেহ) হলো: উল্লিখিত এই ‘তাকীব’ মাকরূহ। এটি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত দুটি বর্ণনার একটি। ‘আল-মুগনি’, ‘আল-ফুরু’ এবং ‘আল-ফাইক’ সহ অন্যান্য কিতাবে উভয় বর্ণনাকে (কোনোটি প্রাধান্য না দিয়ে) সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত উভয় মতই সমপর্যায়ের, একটির ওপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। তবে, যদি এই ‘তাকীব’ (পুনরায় জামাত) তারাবীহর পরে কিন্তু বিতরের আগে হয়, তবে মাকরূহ না হওয়ার বিষয়টিই সঠিক হবে। আর রমাদানের শেষ দশকে বর্তমানে মানুষের আমলও এটিই—তারা রাতের প্রথম ভাগে তারাবি পড়ে, অতঃপর রাতের শেষ ভাগে ফিরে আসে এবং তাহাজ্জুদ (কিয়ামুল লাইল) আদায় করে (অতঃপর বিতর পড়ে)।”(ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬৭)।
.
শায়খ আব্দুল্লাহ আবাত্বিন রাহিমাহুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;প্রশ্ন: রমজানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষ দশকে নামাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কিছু মানুষ যে অস্বীকার বা আপত্তি করে, তার জবাব কী? জবাবে শাইখ বলেন:
مسألة في الجواب عما أنكره بعض الناس على من صلى في العشر الأواخر من رمضان زيادة على المعتاد في العشرين الأول ، وسبب إنكارها لذلك غلبة العادة ، والجهل بالسنة وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام . فنقول‏:‏ قد وردت الأحاديث عن النبي صلى الله وعليه وسلم بالترغيب في قيام رمضان ، والحث عليه ، وتأكيد ذلك في عشره الأخير .إذا تبين أنه لا تحديد في عدد التراويح ، وأن وقتها عند جميع العلماء من بعد سنة العشاء إلى طلوع الفجر ، وأن إحياء العشر سنة مؤكدة ، وأن النبي صلى الله وعليه وسلم صلاها ليالي جماعة ، فكيف ينكر على من زاد في صلاة العشر الأواخر عما يفعلها أول الشهر ، فيصلي في العشر أول الليل ، كما يفعل في أول الشهر ، أو قليل ، أو كثير ، من غير أن يوتر ، وذلك لأجل الضعيف لمن يحب الاقتصار على ذلك ، ثم يزيد بعد ذلك ما يسره الله في الجماعة ، ويسمى الجميع قياماً وتراويح .وربما اغتر المنكر لذلك بقول كثير من الفقهاء ‏:‏ يستحب أن لا يزيد الإمام على ختمة ، إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة ، وعللوا عدم استحباب الزيادة على ختمة بالمشقة على المأمومين ، لا كون الزيادة غير مشروعة ، ودل كلامهم على أنهم لو آثروا الزيادة على ختمة كان مستحباً ، وذلك مصرح به في قولهم : إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة‏ .‏ وأما ما يجري على ألسنة العوام من تسميتهم ما يفعل أول الليل تراويح ، وما يصلي بعد ذلك قياماً ، فهو تفريق عامي ، بل الكل قيام وتراويح ، وإنما سمي قيام رمضان تراويح لأنهم كانوا يستريحون بعد كل أربع ركعات من أجل أنهم كانوا يطيلون الصلاة ، وسبب إنكار المنكر لذلك لمخالفته ما اعتاده من عادة أهل بلده وأكثر أهل الزمان ، ولجهله بالسنة والآثار ، وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام ، وما يظنه بعض الناس من أن صلاتنا في العشر هي صلاة التعقيب الذي كرهه بعض العلماء فليس كذلك ؛ لأن التعقيب هو التطوع جماعة بعد الفراغ من التراويح والوتر‏ .‏
هذه عبارة جميع الفقهاء في تعريف التعقيب أنه التطوع جماعة بعد الوتر عقب التراويح، فكلامهم ظاهر في أن الصلاة جماعة قبل الوتر ليس هو التعقيب
“এটি রমাদানের শেষ দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা; বিশেষ করে মাসের প্রথম বিশ দিনের স্বাভাবিক অভ্যাসের চেয়ে শেষ দশকে যারা বেশি সালাত আদায় করেন, তাদের প্রতি কিছু মানুষের আপত্তির জবাব প্রসঙ্গে। তাদের এই আপত্তির মূল কারণ হলো—প্রচলিত অভ্যাসের প্রাধান্য এবং সুন্নাহ, সাহাবী, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের আমল সম্পর্কে অজ্ঞতা।আমরা বলি: নবী ﷺ থেকে রমজানের কিয়াম (রাতের নামাজ) সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এই ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং শেষ দশকে এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি স্পষ্ট যে তারাবির রাকাআতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারিত নয় এবং সকল আলেমের মতে এর সময় এশার সালাতের পর থেকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত; সেহেতু শেষ দশ রাত ইবাদতে জাগরণ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’। নবী ﷺ নিজে কয়েক রাত জামাতে তা আদায় করেছেন। ​তাহলে সেই ব্যক্তির ওপর কেন আপত্তি করা হবে, যে মাসের শুরুতে যতটুকু সালাত পড়ত, শেষ দশকে তার চেয়ে বেশি পড়ে? অর্থাৎ, সে শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে মাসের শুরুর মতোই সালাত আদায় করল, কিন্তু তখন বিতর পড়ল না—যাতে দুর্বলরা বা যারা এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় তারা চলে যেতে পারে। এরপর ইমাম আবার জামাতে আল্লাহ যতটুকু তাওফিক দেন অতিরিক্ত সালাত আদায় করলেন; আর এসবকেই সমষ্টিগতভাবে ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’ বলা হয়। সম্ভবত আপত্তিকারীরা অনেক ফকীহের এই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছে যে: “ইমামের জন্য এক খতমের বেশি না করা মুস্তাহাব, যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।” ফকীহরা এক খতমের বেশি না করাকে মুস্তাহাব বলেছেন মুসল্লিদের কষ্টের আশঙ্কার কারণে; অতিরিক্ত পড়া শরিয়তসম্মত নয়—এই কারণে নয়। বরং তাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, যদি মুসল্লিরা চায় তবে এক খতমের বেশি পড়াও মুস্তাহাব হবে। এটি তাদের কথাতেই স্পষ্ট: “যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।”সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত রাতের প্রথম অংশের সালাতকে “তারাবি” এবং পরের অংশকে “কিয়াম” বলা—এটি তাদের তৈরি একটি কৃত্রিম পার্থক্য মাত্র। মূলত সবই ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’। রমাদানের কিয়ামকে “তারাবীহ” বলা হয়েছে এই কারণে যে, তারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সালাত পড়তেন এবং প্রতি চার রাকাআত পরপর বিশ্রাম (তারউয়িহ) নিতেন। এ বিষয়ে আপত্তিকারীর আপত্তির মূল কারণ হলো—নিজ এলাকার প্রচলিত রীতি ও অধিকাংশ মানুষের অভ্যাসের বিরোধিতা হওয়া এবং সুন্নাহ, সাহাবীদের আছার, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের পথ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আর কিছু মানুষ মনে করে শেষ দশকে এই অতিরিক্ত সালাতটি সেই “তা‘কীব”, যা কিছু আলেম অপছন্দ করেছেন; বিষয়টি আসলে তা নয়। কারণ সমস্ত ফকীহদের সংজ্ঞা অনুযায়ী “তা‘কীব” হলো—তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতে নফল সালাত আদায় করা। সুতরাং তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিতরের আগে জামাতে অতিরিক্ত সালাত পড়া কোনোভাবেই “তা‘কীব” নয়।”(আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৪)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
ولا بأس أن يزيد في عدد الركعات في العشر الأواخر عن عددها في العشرين الأول ويقسمها إلى قسمين قسما يصليه في أول الليل ويخففه على أنه تراويح كما في العشرين الأول ؛ وقسما يصليه في آخر الليل ويطيله على أنه تهجد ، فقد كان النبي صلى الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيرها ، وكان إذا دخلت العشر الأواخر شمر وشد المئزر وأحيا ليله وأيقظ أهله تحريا لليلة القدر ، فالذي يقول لا يزيد في آخر الشهر عما كان يصليه في أول الشهر مخالف لهدي النبي صلى الله عليه وسلم ومخالف لما كان عليه السلف الصالح من طول القيام في آخر الشهر في آخر الليل فالواجب اتباع سنته صلى الله عليه وسلم وسنة الخلفاء الراشدين من بعده وحث المسلمين على صلاة التراويح وصلاة القيام لا تخذيلهم عن ذلك وإلقاء الشبه التي تقلل من اهتمامهم بقيام رمضان .
وبالله التوفيق ، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم
“রমাদানের শেষ দশকে (রাতের) রাকাত সংখ্যা প্রথম বিশ দিনের তুলনায় বৃদ্ধি করাতে কোনো অসুবিধা নেই। এই রাকাতগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: এক ভাগ রাতের প্রথম অংশে আদায় করা হবে এবং কিছুটা হালকা বা সংক্ষেপ করা হবে—যাকে প্রথম বিশ দিনের মতো ‘তারাবীহ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর অন্য ভাগটি রাতের শেষ অংশে আদায় করা হবে এবং দীর্ঘ করা হবে—যাকে ‘তাহাজ্জুদ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। কেননা, নবী করীম (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শেষ দশকে ইবাদতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, তা অন্য সময়ে করতেন না। যখন শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন তিনি কোমর বেঁধে নামতেন (তথা পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন), লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন, সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে তুলতেন।অতএব, যে ব্যক্তি বলে যে—মাসের শেষে রাকাত সংখ্যা বাড়ানো যাবে না যা মাসের শুরুতে পড়া হতো, তার এই কথা নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের পরিপন্থী। এটি সলফে সালেহীনদের (পুণ্যবান পূর্বসূরি) আমলেরও বিরোধী, কারণ তাঁরা মাসের শেষে রাতের শেষাংশে দীর্ঘ কিয়াম (সালাত) আদায় করতেন।কাজেই ওয়াজিব বা আবশ্যক হলো নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ করা এবং মুসলমানদেরকে তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। তাদেরকে এ থেকে নিরুৎসাহিত করা এবং এমন সংশয় ছড়ানো উচিত নয় যা রমজানের কিয়ামের প্রতি তাদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিক দানকারী। আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর পরিবার ও সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৮২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] তাঁর কিতাব ‘ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান’ এ বলেন:
وأما في العشر الأواخر من رمضان ، فإن المسلمين يزيدون من اجتهادهم في العبادة ، اقتداء بالنبي صلى الله عليه وسلم ، وطلباً لليلة القدر التي هي خير من ألف شهر ، فالذين يصلون ثلاثاً وعشرين ركعة في أول الشهر يقسمونها في العشر الأواخر ، فيصلون عشر ركعات في أول الليل ، يسمونها تراويح‏ ،‏ ويصلون عشراً في آخر الليل ، يطيلونها مع الوتر بثلاث ركعات ، ويسمونها قياماً‏ ،‏ وهذا اختلاف في التسمية فقط ، وإلا فكلها يجوز أن تسمى تراويح ، أو تسمى قياماً‏ ،‏ وأما من كان يصلى في أول الشهر إحدى عشرة أو ثلاث عشرة ركعة فإنه يضيف إليها في العشر الأواخر عشر ركعات ، يصليها في آخر الليل ، ويطيلها ، اغتناماً لفضل العشر الأواخر ، وزيادة اجتهاد في الخير ، وله سلف في ذلك من الصحابة وغيرهم ممن كانوا يصلون ثلاثاً وعشرين كما سبق ، فيكونون جمعوا بين القولين ‏:‏ القول بثلاث عشرة في العشرين الأول ، والقول بثلاث وعشرين في العشر الأواخر “
“আর রমজানের শেষ দশকের ব্যাপারে কথা হলো—নিশ্চয়ই মুসলিমগণ এই সময়ে ইবাদতে অধিকতর সচেষ্ট হন; যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে করা হয়, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।সুতরাং যারা মাসের শুরুতে ২৩ রাকাত (তারাবীহ) পড়েন, তারা শেষ দশকে তা দু’ভাগে ভাগ করে নেন। রাতের প্রথম অংশে তারা ১০ রাকাত পড়েন যাকে তারা ‘তারাবীহ’ নামকরণ করেন; আর রাতের শেষ অংশে ৩ রাকাত বিতরসহ আরও ১০ রাকাত পড়েন যা তারা দীর্ঘ করেন এবং একে ‘কিয়াম’ (তাহাজ্জুদ) নামে অভিহিত করেন। মূলত এটি কেবল নামকরণের পার্থক্য মাত্র; অন্যথায় এই সবগুলোকে ‘তারাবীহ’ বা ‘কিয়াম’ উভয়ই বলা বৈধ।আর যারা মাসের শুরুতে ১১ বা ১৩ রাকাত পড়তেন, তারা শেষ দশকের ফযিলত অর্জন এবং নেক আমলে অধিকতর পরিশ্রমের উদ্দেশ্যে রাতের শেষভাগে আরও ১০ রাকাত বৃদ্ধি করে দীর্ঘ করে পড়েন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্যদের আদর্শ (পূর্বসূরি) বিদ্যমান যারা ২৩ রাকাত পড়তেন—যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত উভয় মতের মধ্যেই সমন্বয় ঘটালেন: অর্থাৎ প্রথম বিশ রাতে ১৩ রাকাতের মত এবং শেষ দশকে ২৩ রাকাতের মত।”(ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান পুস্তিকা; আরও দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৯৭৬৮)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে রাতের সকল নফল সালাতই কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। তাই রাতের প্রথম অংশ সংক্ষিপ্ত এবং শেষ অংশ দীর্ঘ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করা বৈধ ও শরিয়তসম্মত। এমনকি কেউ একাধিক জামাতে ইমাম বা মুক্তাদি হিসেবে সালাত আদায় করলেও তা জায়েজ; তবে একই রাতে দুইবার বিতির আদায় করা শরিয়তে প্রমাণিত নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate