Monday, April 13, 2026

নেতৃত্বের জন্য কে বেশি উপযুক্ত

 নেতৃত্বের জন্য কে বেশি উপযুক্ত? এমন ব্যক্তি যে, দক্ষ ও শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী? নাকি এমন ব্যক্তি যে, সৎ ও আমানতদার কিন্তু অদক্ষ ও দুর্বল?

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহ. বলেন,
(وَاجْتِمَاعُ الْقُوَّةِ وَالْأَمَانَةِ فِي النَّاسِ قَلِيلٌ، وَلِهَذَا كَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يَقُولُ: اللَّهُمَّ أَشْكُو إِلَيْكَ جَلَدَ الْفَاجِرِ وَعَجْزَ الثِّقَةِ. فَالْوَاجِبُ فِي كُلِّ وِلَايَةٍ الْأَصْلَحُ بِحَسَبِهَا؛ فَإِذَا تَعَيَّنَ رَجُلَانِ أَحَدُهُمَا أَعْظَمُ أَمَانَةً وَالْآخَرُ أَعْظَمُ قُوَّةً، قُدِّمَ أَنْفَعُهُمَا لِتِلْكَ الْوِلَايَةِ وَأَقَلُّهُمَا ضَرَرًا فِيهَا؛ فَيُقَدَّمُ فِي إِمَارَةِ الْحُرُوبِ الرَّجُلُ الْقَوِيُّ الشُّجَاعُ وَإِنْ كَانَ فِيهِ فُجُورٌ عَلَى الرَّجُلِ الضَّعِيفِ الْعَاجِزِ وَإِنْ كَانَ أَمِينًا، كَمَا سُئِلَ الْإِمَامُ أَحْمَدُ عَنِ الرَّجُلَيْنِ يَكُونَانِ أَمِيرَيْنِ فِي الْغَزْوِ، وَأَحَدُهُمَا قَوِيٌّ فَاجِرٌ وَالْآخَرُ صَالِحٌ ضَعِيفٌ، مَعَ أَيِّهِمَا يُغْزَى؟ فَقَالَ: أَمَّا الْفَاجِرُ الْقَوِيُّ فَقُوَّتُهُ لِلْمُسْلِمِينَ وَفُجُورُهُ عَلَى نَفْسِهِ، وَأَمَّا الصَّالِحُ الضَّعِيفُ فَصَلَاحُهُ لِنَفْسِهِ وَضَعْفُهُ عَلَى الْمُسْلِمِينَ، فَيُغْزَى مَعَ الْقَوِيِّ الْفَاجِرِ. وَقَدْ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ. وَرُوِيَ: بِأَقْوَامٍ لَا خَلَاقَ لَهُمْ. وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَاجِرًا كَانَ أَوْلَى بِإِمَارَةِ الْحَرْبِ مِمَّنْ هُوَ أَصْلَحُ مِنْهُ فِي الدِّينِ إِذَا لَمْ يَسُدَّ مَسَدَّهُ).
“মানুষের মধ্যে শক্তি (দক্ষতা) ও আমানতদারিতার (সততা) সমন্বয় খুব কমই দেখা যায়। এজন্যই ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন:
اللَّهُمَّ أَشْكُو إِلَيْكَ جَلَدَ الْفَاجِرِ وَعَجْزَ الثِّقَةِ
‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পাপাচারী ব্যক্তির কর্মতৎপরতা এবং বিশ্বাসভাজন (সৎ) ব্যক্তির অক্ষমতা ও দুর্বলতা থেকে পানাহ চাই।’
সুতরাং নিয়ম হলো—প্রত্যেক পদের জন্য ঐ পদের প্রকৃতি অনুযায়ী যে সবচেয়ে বেশি যোগ্য তাকেই নিয়োগ দেওয়া। যদি কোনো পদের জন্য এমন দুজন ব্যক্তি সামনে আসে যাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত আমানতদার কিন্তু দুর্বল। আর অন্যজন অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ কিন্তু পাপাচারী। তবে তাদের মধ্যে যে ঐ পদের জন্য বেশি উপকারী এবং যার দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা কম তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন শক্তিশালী ও সাহসী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে যদিও তার মধ্যে কিছু ব্যক্তিগত পাপাচার থাকে। এর বিপরীতে একজন সৎ কিন্তু দুর্বল ব্যক্তিকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে না। যেমন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: ‘যুদ্ধে সেনাপতি হওয়ার মতো দুজন ব্যক্তি আছেন। একজন শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী, অন্যজন নেককার কিন্তু দুর্বল। কার নেতৃত্বে যুদ্ধ করা হবে?’
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: ‘পাপাচারী শক্তিশালী ব্যক্তির শক্তি ও দক্ষতা মুসলিমদের উপকারে আসবে আর তার পাপের দায়ভার একান্তই তার নিজের। অন্যদিকে নেককার দুর্বল ব্যক্তির নেক আমল তার নিজের জন্য। কিন্তু তার দুর্বলতার কুফল ভোগ করতে হবে পুরো মুসলিম বাহিনীকে। তাই শক্তিশালী পাপাচারীর নেতৃত্বেই যুদ্ধ করা হবে।’
কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে পাপাচারী লোক দ্বারাও সাহায্য করেন।” [সহিহ বুখারি: ৩০৬২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
إنَّ اللهَ ليُؤيِّدُ هذا الدِّينَ بقومٍ لا خلاقَ لهم
“নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে এমন জাতি দ্বারা (সাহায্য করেন) যাদের পরকালে কোনো অংশ নেই।” [সুনানে নাসায়ি: ৩০৯১, ইরাকি তার ‘তাখরিজ এহিয়া উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে বলেন, إسناده جيد ”এর সনদ ভালো।]
যদি সেই শক্তিশালী ব্যক্তি পাপাচারী না হয়ে সৎ হতেন তবে তিনিই যুদ্ধের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হতেন। কিন্তু যদি এমন কাউকে পাওয়া না যায় তবে যুদ্ধের ময়দানে কেবল দ্বীনদারির খাতিরে একজন অদক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার চেয়ে দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়াই উত্তম।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৮, পৃষ্ঠা: ২৫৪]
উৎস: মাওসুআতুল আখলাকিল ইসলামিয়্যাহ (ইসলামি নীতি-নৈতিকতার বিশ্বকোষ)
মোটকথা, ইসলামি নীতি অনুসারে, নিখুঁত নেতা হলেন তিনি যিনি সৎ, আমানতদার, দক্ষ এবং শক্তিশালী। তবে যদি এই দুইটি গুণ একসাথে পাওয়া না যায় তবে জাতির নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করার লক্ষ্যে ‘শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী’ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে যতক্ষণ না তার পাপাচার জাতির মৌলিক ধর্ম বা স্বার্থকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ তার ব্যক্তিগত পাপ আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। কিন্তু তার ক্ষমতা দিয়ে তিনি জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। অন্যদিকে, একজন সৎ কিন্তু দুর্বল নেতার অধীনে জাতির ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

তাকিয়াহ কী

 প্রশ্ন: তাকিয়াহ কী এবং তা কি আহলে সুন্নাত ব্যবহার করে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্য। আমাদের নবী, সর্বশেষ নবী, রাসূলদের সর্দার মুহাম্মদ এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরাম সকলের প্রতি আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর তাকিয়াহ (التقية) হচ্ছে মানুষের মনের বিপরীত অভিমত প্রকাশ করা। অর্থাৎ ভিতর এক রকম, আর বাহির অন্য রকম। আর পথভ্রষ্ট শিয়া মতবাদে এটি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে, প্রয়োজনবোধে মিথ্যা বলা ও কপটতাকেও বৈধ ধরা হয় যা তাদের নিজস্ব গ্রন্থ উসূলুল কাফী-এর বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, যেখানে তাকিয়াহকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এমনকি ঈমানের শর্ত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-আল-কুলাইনী বর্ণনা করেন: “ইবনু ‘উমাইর আল-আ‘জামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আবূ আবদিল্লাহ আ. বলেন: হে আবূ ওমর! নিশ্চয় দীনের দশ ভাগের নয় ভাগ ‘তাকিয়াহ’ (التقية)-র মধ্যে; যার ‘তাকিয়াহ’ নেই, তার ধর্ম নেই। আর মদ ও মোজার উপর মাসেহ ব্যতীত সকল বস্তুর মধ্যে ‘তাকিয়াহ’ আছে।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮২) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: “আবূ জাফর আ. বলেন: ‘তাকিয়াহ’ আমার এবং আমার বাপ-দাদাদের ধর্ম। যার ‘তাকীয়া’ নেই, তার ঈমান নেই।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮৪) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: “আবূ আবদিল্লাহ আ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে ভয় কর এবং তাকে ‘তাকিয়াহ’ দ্বারা ঢেকে রাখ। কারণ, যার ‘তাকিয়াহ’ নেই, তার ঈমান নেই।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮৩) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: আবূ আবদিল্লাহ আ. থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَلَا تَسۡتَوِي ٱلۡحَسَنَةُ وَلَا ٱلسَّيِّئَةُ) (ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না)-প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ভাল (ٱلۡحَسَنَةُ) হচ্ছে ‘তাকিয়াহ’ (التقية) বা গোপন করা এবং মন্দ (ٱلسَّيِّئَةُ) হচ্ছে প্রচার করা। আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ ٱدۡفَعۡ بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ ﴾ (মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা)- প্রসঙ্গে তিনি বলেন: উৎকৃষ্ট হল ‘তাকীয়া’ (التقية)।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮২) সারকথা হলো, রাফেযি শিয়াদের চিন্তাধারায় ‘তাকিয়াহ’ কেবলমাত্র বিশেষ ও সীমিত পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কোনো সাময়িক ছাড় নয়; বরং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণ ব্যবস্থার মধ্যে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায় স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়েছে, যা তাদের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এ কারণে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা ও মানহাজ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এই বিশ্বাসের ফলস্বরূপ তাদের অনেক অনুসারীর মধ্যে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায় যে, তারা বাহ্যিকভাবে ভিন্ন আচরণ প্রকাশ করে এবং অন্তরের প্রকৃত বিশ্বাসকে গোপন রাখে—যাকে তারা ‘তাকিয়াহ’ নীতিরই অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। অথচ এই ভ্রান্ত আকীদা ও ধারণা আহলুস সুন্নাহর আকীদার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অসংগত ও পরিপন্থী।তাদের কিছু বর্ণনা ও ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমনকি প্রথম তিন শতাব্দীর সময়কালকেও ‘তাকিয়াহ’র যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়,যেমন তাদের শাইখ আল-মুফিদ-এর বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে। তাদের গ্রন্থসমূহে ‘ইমাম’দের নামে এই মতবাদকে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যায়।এ কারণেই তাদের কিছু চরমপন্থী ব্যাখ্যায় এমন ধারণাও পাওয়া যায় যে, পথভ্রষ্ট শিয়ারা আহলে সুন্নাহর অনুসারীদেরকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের চেয়েও বড় কাফের মনে করে, কারণ তাদের মতে, যে ব্যক্তি বারো ইমামের ইমামত অস্বীকার করে, সে এমনকি নবুয়ত অস্বীকারকারীর চেয়েও বড় কাফের (নাউজুবিল্লাহ)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
الرَّافِضَة أَجْهَلُ الطَّوَائِفِ وَأَكْذَبُهَا وَأَبْعَدُهَا عَنْ مَعْرِفَةِ الْمَنْقُولِ وَالْمَعْقُولِ وَهُمْ يَجْعَلُونَ التَّقِيَّةَ مِنْ أُصُولِ دِينِهِمْ ، وَيَكْذِبُونَ عَلَى أَهْلِ الْبَيْتِ كَذِبًا لَا يُحْصِيهِ إلَّا اللَّهُ ، حَتَّى يَرْوُوا عَنْ جَعْفَرٍ الصَّادِقِ أَنَّهُ قَالَ : التَّقِيَّةُ دِينِي وَدِينُ آبَائِي ، و ” التَّقِيَّةُ ” هِيَ شِعَارُ النِّفَاقِ ؛ فَإِنَّ حَقِيقَتَهَا عِنْدَهُمْ أَنْ يَقُولُوا بِأَلْسِنَتِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَهَذَا حَقِيقَةُ النِّفَاقِ
“রাফেযিরা (শিয়াদের একটি চরমপন্থী দল) সমস্ত দল-উপদলের মধ্যে সবচেয়ে অজ্ঞ, সবচেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান—উভয় ক্ষেত্র থেকেই সবচেয়ে দূরে অবস্থানকারী। তারা ‘তাকিয়াহ’কে তাদের দ্বীনের মৌলিক নীতি বানিয়েছে। তারা আহলে বাইতের নামে এত অধিক মিথ্যাচার করে যে, তার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ গণনা করতে পারবে না। এমনকি তারা জাফর আস-সাদিক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নামে বর্ণনা করে যে, তিনি নাকি বলেছেন:”তাকিয়াহ আমার দ্বীন এবং আমার পূর্বপুরুষদের দ্বীন।”অথচ ‘তাকিয়াহ’ তাদের নিকট নিফাকের প্রতীক; কারণ এর প্রকৃত অর্থ হলো—মুখে এমন কিছু বলা, যা অন্তরে নেই। আর এটিই নিফাকের প্রকৃত রূপ।(মাজমূ‘ ফাতাওয়া; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৬৩)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:
وأما الرافضة فأصل بدعتهم عن زندقة وإلحاد وتعمد الكذب كثير فيهم ، وهم يقرون بذلك حيث يقولون : ديننا التقية ، وهو أن يقول أحدهم بلسانه خلاف ما في قلبه وهذا هو الكذب والنفاق ، ويدعون مع هذا أنهم هم المؤمنون دون غيرهم من أهل الملة ، ويصفون السابقين الأولين بالردة والنفاق ! فهم في ذلك كما قيل : رمتني بدائها وانسلّت ، إذ ليس في المظهرين للإسلام أقرب إلى النفاق والردة منهم ، ولا يوجد المرتدون والمنافقون في طائفة أكثر مما يوجد فيهم
“রাফেযিদের বিদআতের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে যিন্দিকতা (ধর্মদ্রোহিতা) ও নাস্তিকতার ওপর। তাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার অত্যন্ত বেশি।তারা নিজেরাই তা স্বীকার করে, যখন বলে: ‘আমাদের দ্বীন হলো তাকিয়াহ।’ এর অর্থ হলো—তাদের কেউ নিজের অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত কথা মুখে প্রকাশ করে; যা মূলত মিথ্যা ও নিফাক ছাড়া কিছুই নয়। এরপরও তারা দাবি করে যে, এই উম্মতের মধ্যে তারাই একমাত্র মুমিন! অথচ তারা অগ্রগামী ঈমানদারদের (বিশেষত সাহাবায়ে কেরামকে) মুরতাদ ও মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করে। তাদের অবস্থা সেই প্রবাদের মতো—‘নিজে দোষী হয়েও অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজে সরে যাওয়া।’ কারণ, ইসলাম প্রকাশকারীদের মধ্যে তাদের চেয়ে নিফাক ও ধর্মত্যাগের নিকটবর্তী আর কেউ নেই। বরং তাদের দলেই সবচেয়ে বেশি মুরতাদ ও মুনাফিক পাওয়া যায়—যা অন্য কোনো দলে এ পরিমাণে পাওয়া যায় না।(ইবনু তাইমিয়াহ; মিনহাজুস সুন্নাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
অপরদিকে ইসলামি শরীয়তে ‘তাকীয়াহ’ কোনো মৌলিক নীতি নয়; বরং আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সীমিত বিধান। কারণ, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মানহাজ অনুযায়ী মিথ্যা বলা মুনাফিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হাদিসে এসেছে, একজন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে বলতে এবং মিথ্যার অনুসন্ধান করতে করতে অবশেষে আল্লাহর নিকট ‘চরম মিথ্যাবাদী’ (কাযযাব) হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। অথচ সত্যবাদিতা ও সততা ইসলামের মৌলিক নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত। তাই মিথ্যাকে ভিত্তি করে কোনো আকীদা বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।তাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সীমিত বিধান। তাদের দৃষ্টিতে ‘তাকীয়াহ’ হলো একান্তই নিরুপায় অবস্থার জন্য প্রদত্ত শরীয়তের একটি রুখসাহ (ব্যতিক্রমী অনুমতি)। সাধারণ অবস্থায় সত্য গোপন করা বা দ্বীনের বিষয়ে আপস করা ইসলামের আদর্শ নয়; এটি কেবলমাত্র জীবননাশের মতো চরম বিপদের পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৈধ হয়।
.
তুলনামূলকভাবে বলা যায়—যেমন জীবন রক্ষার প্রয়োজনে নিরুপায় ব্যক্তির জন্য শূকরের মাংস ভক্ষণ বৈধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে প্রাণনাশের আশঙ্কার মুহূর্তে ‘তাকিয়াহ’-এরও অনুমতি রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নিরুপায় অবস্থায় শূকরের মাংস ভক্ষণ অনেক সময় বাধ্যতামূলক হয়ে যায়—না খেলে জীবনহানির আশঙ্কা থাকলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। কিন্তু ‘তাকীয়াহ’র ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন; এটি জরুরি পরিস্থিতিতে বৈধ হলেও বাধ্যতামূলক নয়। বরং কেউ যদি চরম নির্যাতন ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও ‘তাকীয়াহ’ গ্রহণ না করে সত্যের উপর অবিচল থাকে এবং সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর নিকট শহীদী মর্যাদা ও মহাপুরস্কারের অধিকারী হবে। অর্থাৎ এখানে রুখসাহ গ্রহণ করা জায়েয, কিন্তু ‘আযীমাহ’—অর্থাৎ দৃঢ়তা ও সত্যের উপর অটল থাকা—অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও উত্তম পথ। ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণ মুশরিকদের কঠোর নির্যাতন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে সহ্য করেছেন। আবূ বকর সিদ্দীক (রা.), বিলাল ইবন রাবাহ (রা.)-এর অবিচলতা, সুমাইয়া বিনতে খাইয়্যাত (রা.)-এর শাহাদাত এবং খুবাইব ইবন আদী (রা.)-এর দৃঢ়তা—সবই প্রমাণ করে যে, সত্যের উপর অবিচল থাকা এবং দ্বীনের জন্য কষ্ট সহ্য করাই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।সুতরাং,’তাকিয়াহ’ যদিও একটি সীমিত ও শর্তাধীন অনুমতি, তবুও সর্বাবস্থায় সত্যের উপর অটল থাকা, দ্বীনের জন্য দৃঢ় থাকা এবং প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করাই অধিক উত্তম, মহিমান্বিত এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় পথ।
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,التقية أن يقول العبد خلاف ما يعتقده لاتقاء مكروه يقع به لو لم يتكلم بالتقية “তাকিয়াহ হল—কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট এড়ানোর উদ্দেশ্যে কেউ যদি নিজের প্রকৃত বিশ্বাসের বিপরীত কিছু বলে।”(আহকাম আহলুয্-যিম্মাহ; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০৩৮)
.
তাকিয়াহর অনুমতির মূল ভিত্তি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে পাওয়া যায় যেখানে মহান আল্লাহ বলেন:لَّا يَتَّخِذِ ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلْكَـٰفِرِينَ أَوْلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلْمُؤْمِنِينَ‌ۖ وَمَن يَفْعَلْ ذَٲلِكَ فَلَيْسَ مِنَ ٱللَّهِ فِى شَىْءٍ إِلَّآ أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَـٰةً‌ۗ وَيُحَذِّرُكُمُ ٱللَّهُ نَفْسَهُۥ‌ۗ وَإِلَى ٱللَّهِ ٱلْمَصِيرُ”মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহ্‌র কোন সম্পর্কে থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর; (তাহলে ভিন্ন কথা) আর আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করছেন এবং আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮)
.
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭০১ মৃত: ৭৭৪ হি.] বলেছেন:( إِلا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً ) أي: إلا من خاف في بعض البلدان أو الأوقات من شرهم ، فله أن يتقيهم بظاهره لا بباطنه ونيته ؛ كما حكاه البخاري عن أبي الدرداء أنه قال: ” إنَّا لَنَكْشرُ فِي وُجُوهِ أقْوَامٍ وَقُلُوبُنَا تَلْعَنُهُمْ “আয়াতের “(إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً)” অংশের অর্থ হলো,যখন কেউ নির্দিষ্ট কোনো সময় বা জায়গায় তাদের (অমুসলিমদের) অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে ভয় পায়, তখন বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে সদাচরণ বা নম্রতা দেখানো যেতে পারে, কিন্তু অন্তরের বিশ্বাস ও ভীতি আল্লাহর প্রতি স্থির ও অটুট থাকতে হবে। বুখারিতে আবু আদ-দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “আমরা মানুষের মুখে হাসি ফোটাই, যদিও আমাদের হৃদয় তাদেরকে অভিশাপ দেয়।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে, مَذْهَبُ جُمْهُورُ عُلَمَاءِ أَهْل السُّنَّةِ أَنَّ الأْصْل فِي التَّقِيَّةِ هُوَ الْحَظْرُ ، وَجَوَازُهَا ضَرُورَةٌ ، فَتُبَاحُ بِقَدْرِ الضَّرُورَةِ ، قَال الْقُرْطُبِيُّ : وَالتَّقِيَّةُ لاَ تَحِل إِلاَّ مَعَ خَوْفِ الْقَتْل أَوِ الْقَطْعِ أَوِ الإْيذَاءِ الْعَظِيمِ ، وَلَمْ يُنْقَل مَا يُخَالِفُ ذَلِكَ فِيمَا نَعْلَمُ إِلاَّ مَا رُوِيَ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ مِنَ الصَّحَابَةِ ، وَمُجَاهِدٍ مِنَ التَّابِعِينَ “
“আহলে সুন্নাহর অধিকাংশ আলেমের মতে,তাকিয়াহ সংক্রান্ত মূলনীতি হল, এটি নিষিদ্ধ’; এটা শুধুমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রে জায়েয, এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণে অনুমোদিত।ইমাম কুরতুবী বলেন: তাকিয়া সম্পর্কে মূল নীতি হল যে মৃত্যু ভয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা বা চরম ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে তা জায়েয নয়এবং আমরা যতদূর জানি এর বিপরীতে কোনো বর্ণনা নেই সাহাবাদের মধ্যে মুআয ইবনে জাবাল থেকে এবং তাবেয়ীনদের মধ্যে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা ছাড়া”।(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৮৭-১৮৮)
.
▪️আহলে সুন্নাহর মতে তাকিয়াহ বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ:
.
আহলে সুন্নাতের নিকট তাকিয়া বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হওয়া জরুরি:
(১).কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে হবে, অর্থাৎ এমন একটি ভয় থাকতে হবে যা কোনো ক্ষতিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
.
(২). তাকিয়াহ ছাড়া সেই কষ্ট বা ক্ষতি থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় না থাকে।
.
(৩). এবং আশঙ্কিত ক্ষতি এমন হতে হবে যা সহ্য করা খুব কঠিন ও কষ্টদায়ক।
তাকিয়াহ গ্রহণকারী ব্যক্তির উচিত, যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া ছাড়া কষ্ট থেকে বাঁচার অন্য কোনো বৈধ পথ থাকে, তাহলে তাকিয়াহর পরিবর্তে সেই বৈধ বিকল্প পথই গ্রহণ করা আবশ্যক। রুখসাহ (অস্থায়ী শিথিলতা) গ্রহণ করার সময় সাবধান থাকতে হবে, যেন সে এতে অভ্যস্ত না হয়ে পড়ে এবং বিপদ কেটে যাওয়ার পরও হারাম কাজে লিপ্ত না থাকে। কেননা, এতে সে তাকিয়াহর সীমা অতিক্রম করে গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়বে। এই মূলনীতি আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন মুযতারের (বাধ্য ব্যক্তির) বিষয়ে:فَمَنِ ٱضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ”অতএব,যে নিরুপায় হয়ে, ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন ব্যতীত, (প্রয়োজন মুতাবেক গ্রহণ করবে) তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল,দয়ালু।”(সূরা আন-নাহল: ১১৫) আল্লাহ তায়ালা তাকিয়াহ প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন: “মুমিনরা যেন কাফেরদের বন্ধু না বানায়, মুমিনদের বাদ দিয়ে। আর কেউ যদি তা করে, তবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুই নয়; তবে যদি তোমরা তাদের থেকে বাঁচার জন্য কোনো রকম নিরাপত্তা গ্রহণ করো (তবে ভিন্ন কথা)। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮) এখানে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, যেন কেউ তাকিয়াহর নামে আত্মতুষ্টি বা ধোঁকার শিকার না হয় এবং পরবর্তীতে হারামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এছাড়াও তাকিয়াহ গ্রহণকারীর উচিত নিজের নিয়ত খেয়াল রাখা,সে যেন এই বিশ্বাস রাখে যে, সে যা করছে তা মূলত হারাম, কিন্তু চরম প্রয়োজনের কারণে আল্লাহর দেওয়া রুখসাহ গ্রহণ করছে। যদি কেউ এই কাজকে সহজ ও অবহেলার যোগ্য মনে করে, তাহলে সে অবশ্যই গোনাহগার হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; আল-মুসউ’আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৯১-২০০)
.
ড. নাসের আল-কাফারী বলেন:ইসলামে তাকিয়াহ অধিকাংশ সময় কাফেরদের সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:ِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً”তাদের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়া।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮)।
ইবনু জারীর আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”التقية التي ذكرها الله في هذه الآية إنما هي تقية من الكفار لا من غيرهم”আল্লাহ এই আয়াতে যে তাকিয়াহর কথা বলেছেন, তা কেবল কাফেরদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য, অন্য কারও জন্য নয়।” এই কারণে কিছু সালাফ (প্রথম যুগের আলেম) মনে করতেন যে, ইসলাম যখন দুর্বল ছিল তখন তাকিয়াহ বৈধ ছিল, কিন্তু আল্লাহ যখন ইসলামকে সম্মানিত করেছেন, তখন আর তাকিয়াহর প্রয়োজন নেই।যেমনটি মুআয ইবন জাবাল ও মুজাহিদ বলেন:التقية في جدة الإسلام قبل قوة المسلمين ، أما اليوم فقد أعز الله المسلمين أن يتقوا منهم تقاة”ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা দুর্বল ছিল, তখন শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে ‘তাকিয়া’ বা কৌশলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইসলাম যখন শক্তিশালী হলো এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদের সম্মানিত করলেন, তখন আর তাকিয়া করার প্রয়োজনীয়তা রইল না।”
.
কিন্তু শিয়া মতবাদের আলোচনায় ‘তাকিয়াহ’ এমন একটি নীতি, যা কেবল অমুসলিমদের সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মুসলিমদের সাথেও বিশেষ করে আহলে সুন্নাহর সাথে প্রয়োগযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তাদের কিছু আলেমের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি দীর্ঘ সময়কালকে ‘তাকিয়াহর যুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে; যেমন শাইখ আল-মুফিদ এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তারা তাদের গ্রন্থসমূহে ‘ইমামদের’ নামের প্রতি সম্বন্ধিত করে এ ধারণাকে সমর্থন করার চেষ্টা করে।তাদের আকীদাগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বারো ইমামের ইমামতকে মৌলিক বিশ্বাস হিসেবে দেখা। এ বিশ্বাস অস্বীকারকারীদের বিষয়ে তাদের কিছু বক্তব্যে কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়, যেখানে গুরুতর বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।অপরদিকে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে তাকিয়াহ কোনো সাধারণ নীতি নয়; বরং এটি একটি রুখসাহ (অস্থায়ী ছাড়), যা কেবল চরম বিপদ, নির্যাতন বা প্রাণনাশের আশঙ্কার মতো পরিস্থিতিতে সীমিতভাবে গ্রহণযোগ্য। এটি স্বাভাবিক অবস্থায় অবলম্বনযোগ্য কোনো পদ্ধতি নয়।এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা কাফেরদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন—যদি কারো পক্ষ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে কিছুটা গোপনতা বা নমনীয়তা অবলম্বন করা যেতে পারে; কিন্তু তা অন্তরের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করবে না।এ বিষয়ে আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো—তাকিয়াহ একটি জরুরি অবস্থার বিধান (রুখসাহ), যা কেবল প্রয়োজনের সীমায় সীমাবদ্ধ; এটি কোনো স্থায়ী বা স্বাভাবিক আচরণপদ্ধতি নয়।
.
ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:أجمعوا على أن من أكره على الكفر حتى خشي على نفسه القتل ، فكفر وقلبه مطمئن بالإيمان : أنه لا يحكم عليه بالكفر”তারা (ওলামায়ে কেরাম) এই বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং সে নিজের জীবননাশের আশঙ্কা করছে— এমতাবস্থায় সে যদি কুফরি কথা বলে কিন্তু তার অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে, তবে তাকে কাফের হিসেবে গণ্য করা হবে না।”
.
তবে কেউ যদি এমন চরম বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতেও কুফরি উচ্চারণ না করে বরং নিজের জীবন বিসর্জন দেয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে অধিক সাওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হবে। এ বিষয়ে ইবন বত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”وأجمعوا على أن من أكره على الكفر واختار القتل : أنه أعظم أجرًا عند الله”অর্থাৎ, ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, কাউকে যদি কুফরি করতে বাধ্য করা হয়, আর সে তা গ্রহণ না করে মৃত্যুকে (শাহাদাতকে) বেছে নেয়, তবে আল্লাহর নিকট তার প্রতিদান আরও মহান।পক্ষান্তরে, শিয়াদের ‘তাকিয়াহ’ ধারণা এ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দৃষ্টিতে তাকিয়াহ কেবল একটি সীমিত পরিসরের রুখসাহ (অনুমোদিত ছাড়) নয়; বরং তা তাদের দ্বীনের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা একে নামাজের মতো মৌলিক ইবাদতের সমপর্যায়ে—কিংবা কখনো তার চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলে তাদের গ্রন্থসমূহে প্রতীয়মান হয়।(বিস্তারিত জানতে দেখুন: উসূল মাযহাবুশ শিয়া আল-ইমামিয়া: ২/৮০৬–৮০৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইমাম শাওকানী এর আকীদা

 প্রশ্ন: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদাগত অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই: তিনি কি জাইদি শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন? এবং তিনি কি এই মতাদর্শের উপর অবিচল থেকে ইন্তিকাল করেছেন?

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি অতঃপর তাঁর বংশ ও জীবন:
.
ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা নিজ প্রতিভা, সাধনা ও কর্মের মাধ্যমে যুগকে অতিক্রম করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদেরই একজন হলেন—আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আলী আল-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)।তিনি ছিলেন একাধারে একজন মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, কাজী, গবেষক ও প্রাজ্ঞ শিক্ষক—যাঁর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, শিক্ষা ও রচনার এক অনন্য সমন্বয়। তাঁর কলম যেমন ছিল প্রাঞ্জল ও শক্তিশালী, তেমনি তাঁর চিন্তা ছিল গভীর, বিশ্লেষণধর্মী ও স্বাধীন। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আকীদাহ, ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, ফারায়িজ, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত—প্রায় প্রতিটি জ্ঞানশাখায় তিনি রেখে গেছেন অসাধারণ অবদান। তিনি শুধু জ্ঞানের বাহক ছিলেন না; বরং ছিলেন জ্ঞানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যিনি ইলমকে আত্মস্থ করেছিলেন এবং তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রজ্ঞা ও প্রভাবের সাথে।ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) ১১৭৩ হিজরির ২৮ জিলকদ ইয়েমেনের “হিজরাতু শাওকান” এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সান‘আ নগরীতে বেড়ে ওঠেন। শৈশবেই কুরআন মাজীদ হিফযের মাধ্যমে তাঁর জ্ঞানযাত্রা শুরু হয়। অতঃপর তিনি দ্বীনি ইলমের বিভিন্ন শাখায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন এবং যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।তিনি নাহু, সরফ, বালাগাত, উসূলসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের অসংখ্য মূলগ্রন্থ (মুতূন) মুখস্থ করেন এবং অল্প বয়সেই গবেষণা, বিশ্লেষণ ও ইজতিহাদের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর প্রখর মেধা, বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডার ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমসাময়িক আলেমগণ তাঁকে সর্বসম্মতভাবে “ইমাম” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
.
তিনি আজীবন শিক্ষা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে ইলমের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলির মধ্যে রয়েছে;ফাতহুল কাদীর—এর পূর্ণ নাম: “ফাতহুল কাদীর: আল-জামি‘ বায়না ফান্নাই রিওয়ায়াতি ওয়াদ-দিরায়াতি মিন ‘ইলমিত-তাফসীর”।ফাতহুল কাদীর তাফসীরশাস্ত্রের একটি অনন্য ও মৌলিক গ্রন্থ যা পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত।এটি কেবল সাধারণ তাফসীরগ্রন্থ নয়; বরং রিওয়ায়াত (বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর) এবং দিরায়াত (গভীর বিশ্লেষণমূলক তাফসীর)—এই দুই ধারাকে সমন্বিত করে তাফসীরের মূলনীতি ও ভিত্তিগত দিকসমূহকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছে। এজন্যই এটি তাফসীরবিদ্যায় একটি বুনিয়াদি ও প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ নাইলুল আওতার’—এটি হাদিসভিত্তিক গ্রন্থ “মুনতাকা আল-আখবার”-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ। মূল গ্রন্থটি রচনা করেন হাম্বলি মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম শায়খ আবুল বারাকাত মাজদুদ্দিন আব্দুস সালাম আল-হাররানি (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ইবনে তাইমিয়্যার পূর্বপুরুষ ছিলেন। ‘নাইলুল আওতার’-এ হাদিসের দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করে ফিকহি মাসআলার ওপর সুগভীর আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।এছাড়াও তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হলো—‘আল-কাউলুল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলিদ’ এবং ‘ইরশাদুল থিকাত ইলা ইত্তিফাকিশ শারায়ি‘ আলাত তাওহিদ ওয়াল মিয়াদ ওয়ান নুবুয়াত’।এই গ্রন্থগুলোতে তিনি যুক্তি ও দলিলের মাধ্যমে বিভিন্ন মতবাদের সমালোচনা করেছেন। বিশেষত ইহুদি দার্শনিক মুসা বিন মাইমুন আল-আন্দালুসির দর্শনের উপর তিনি সুগভীর ও তর্কসমৃদ্ধ পর্যালোচনা পেশ করেছেন।এভাবে তাঁর রচনাবলি ইলমী গভীরতা, দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও সমাদৃত।অবশেষে ১২৫০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন—রেখে যান জ্ঞান, আমল ও সংস্কারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
.
▪️ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদা:
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদা” প্রসঙ্গে ড. আব্দুল্লাহ নুমাসূক তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রে—যার শিরোনাম: “ইমাম শাওকানীর আকীদার পদ্ধতি”—উল্লেখ করেন: ‘আল্লাহর সাহায্য ও তাওফীকেই ভর করে আমি এই গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। অতএব, এই উপসংহারে আমি এর গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল, মৌলিক দিকনির্দেশনা এবং অর্জিত উপকারিতাসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করতে চাই। তিনি বলেন; আমি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তগুলোতে পৌঁছেছি:
.
(১).ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) এমন এক অস্থির ও সংকটময় যুগে জীবনযাপন করেছেন, যখন সমগ্র ইসলামী বিশ্ব ভাঙন, দুর্বলতা ও অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। মুসলিম সমাজে—বিশেষত ইয়েমেনে—মাযহাবি সংকীর্ণতা, দলীয় বিভক্তি এবং গোত্রভিত্তিক সংঘাত প্রকট আকার ধারণ করেছিল। তিনি রাফেযা, যায়দিয়া, সুফি, মুতাযিলা প্রভৃতি বিভিন্ন মতাদর্শ ও গোষ্ঠীর সমসাময়িক ছিলেন এবং তাদের মধ্যে বিরাজমান গোঁড়ামি, জড়তা, আকীদাগত বিচ্যুতি ও আমলগত বিকৃতি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন, যা ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষার পরিপন্থী ছিল।তাঁর চারপাশে তিনি দেখতে পান—ফাসাদ, অনিষ্ট, বিদআত, শিরক এবং দ্বীনের ব্যাপারে ব্যাপক অজ্ঞতা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, আলেমসমাজ ও শাসকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সৎ কাজের আদেশ (আমর বিল-মা‘রূফ) ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ (নাহী আনিল-মুনকার) করার মহান দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করছিল। পাশাপাশি বিচারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শাসকদের আচরণে সামাজিক অবিচার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল।এমন প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিবেশই ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর চিন্তাধারা, ব্যক্তিত্ব এবং সংস্কারমূলক দাওয়াহ কার্যক্রমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, যা পরবর্তীতে তাঁর ইলমি ও দাওয়াহি জীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
.
(২).ইমাম মুহাম্মদ ইবন আলী আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) একটি জ্ঞানসমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান পরিবারে প্রতিপালিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন তাঁর যুগের বিশিষ্ট আলেমদের অন্যতম, যিনি তাঁর চরিত্র গঠন ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি পুত্রের জন্য এমন অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেন, যাতে তিনি সম্পূর্ণভাবে ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করতে পারেন; এমনকি জীবিকার দায়ভারও নিজে বহন করেন।ফলত,ইমাম শাওকানী অতি অল্প বয়স থেকেই জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রসর হন। তিনি ইয়েমেনের সানআ নগরীর প্রখ্যাত আলেমদের নিকট ইলম শিক্ষা করেন এবং সেখানেই অবস্থান করে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন; জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তিনি অন্য কোথাও সফর করেননি। তাঁর ওপর বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেন তাঁর সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী—আব্দুল কাদির ইবন আহমাদ আল-কাওকাবানী, হাসান ইবন ইসমাঈল আল-মাগরিবী এবং আব্দুল্লাহ ইবন ইসমাঈল আন-নাহমী।তিনি শরঈ ও আরবি সকল শাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সমকালীন দার্শনিক বিদ্যাগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দেন—যেমন যুক্তিবিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও গণিত। অল্প বয়সেই তাঁর প্রতিভা এমন উচ্চতায় পৌঁছে যে, শিক্ষালাভের সময়কালেই তিনি অন্যদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন এবং মাত্র বিশ বছর বয়সেই ফতোয়া প্রদান করতে সক্ষম হন।পরবর্তীতে ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি ইজতিহাদের পুনর্জাগরণ, অন্ধ তাকলীদের পরিহার এবং সালাফে সালিহীনের অনুসৃত পথের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানোর সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং অবশেষে ১২৫০ হিজরিতে সানআ নগরীতেই ইন্তেকাল করেন।
.
(৩).ইমাম শাওকানী রহিমাহুল্লাহ তাঁর নানাবিধ ব্যস্ততা ও দায়িত্বের মাঝেও বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ ও রিসালা রচনা করে গেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁর এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের একটি বড় অংশ এখনো পাণ্ডুলিপি আকারেই রয়ে গেছে। সুতরাং এগুলোকে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই, গবেষণা ও সহজবোধ্য ভাষায় মুদ্রণের ব্যবস্থা করা সময়ের একান্ত দাবি, যাতে সাধারণ মানুষও তাঁর জ্ঞানধারা থেকে উপকৃত হতে পারে।”
.
(৪).ইমাম শাওকানী প্রাথমিকভাবে যায়দিয়া মাজহাবের উপর ফিকহ শিখেছিলেন এবং এই মাজহাবের অনুসারী ছিলেন,তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মাজহাবগত তাকলীদ ও নির্দিষ্ট দলবদ্ধ ধারার প্রতি আবদ্ধতা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে কোনো মাজহাব বা দলবদ্ধ সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং কুরআন ও সুন্নাহকে ন্যায়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন।তিনি শরঈ বিধান ও আকীদার ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ’র দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করতেন, মুখস্থ বা অনুসরণমূলক পদ্ধতিকে কখনোই প্রধান উৎস মানতেন না। ত্রিশ বছরের আগেই তিনি এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছান। তাঁর ইজতিহাদ, তাকলীদ ত্যাগ এবং শরীয়তকে সালাফে সালেহীনের পথে ফিরিয়ে আনার দাওয়াহ পূর্ববর্তী মুজাদ্দিদ ও সংস্কারকদের ধারাবাহিকতারই অংশ, যেমন: ইমাম মালেক, আবু হানিফা, আহমাদ বিন হাম্বল, ইবনু তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনুল ওয়াজীর, মাকবিলী, আমীর সানআনী এবং ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ).তবে, তাঁর এই দাওয়াহর কারণে তিনি তাঁর যুগের অনেক গোঁড়া ও অন্ধ অনুসারীদের কটু সমালোচনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে আহলে বাইতের মাজহাব নষ্টের অপবাদ দেওয়া হয়, অথচ এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে, যুগে যুগে দলিলনির্ভর মুজতাহিদ আলেমদের একই ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
.
(৫).ইমাম শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ প্রাথমিকভাবে কিছু গ্রন্থে সাহাবী আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফযীলত সম্পর্কে এমন হাদীস উল্লেখ করেছিলেন, যেগুলো দুর্বল বা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে জীবনের শেষ সময়ে তিনি ‘আল ফাওয়ায়িদুল মাজমূআ ফিল আহাদীসিল মাওযুআ’ গ্রন্থে এগুলোর অগ্রহণযোগ্যতা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন। এটি নির্দেশ করে যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে এসব হাদীসের দুর্বলতা তাঁর কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না; কিন্তু জ্ঞান ও অনুধাবনের পরিপক্কতার মাধ্যমে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এভাবেই তাঁর হাদীসবিদ্যায় ক্রমাগত জ্ঞানবৃদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তার পরিপক্কতা প্রতিফলিত হয়েছে—যা অন্যান্য মহান মুজতাহিদ আলেমদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়।
.
(৬).ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদার পদ্ধতি নিয়ে আমার গবেষণার মাধ্যমে আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ঈমানের মূল ভিত্তিতে আহলে সুন্নাহর সালাফদের সাথে সাধারণত একমত ছিলেন। বিশেষত ঈমানের ছয়টি মূল দিকের প্রতি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল:
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
৪. রাসূলগণের প্রতি ঈমান
৫. আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান
(৬). তাকদীর (নিয়তির বিষয়) প্রতি ঈমান। তবে কিছু অল্পসংখ্যক বিষয়ে তিনি সালাফদের মত থেকে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে তার মতামত এক গ্রন্থ থেকে অন্য গ্রন্থে ভিন্ন বা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দেখা যায়, যেমন কিছু গুণাবলীর বিষয়ে। নীচে সংক্ষেপে এসব বিষয় উল্লেখ করা হলো:
.
ক. তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ: তিনি সত্তা ও মর্যাদার মাধ্যমে মধ্যস্থতা প্রার্থনা করা বৈধ বলেছেন এবং এটিকে নেক আমলের মাধ্যমে তাওয়াসসুলের মতো গণ্য করেছেন। এটি তাঁরই কিছু গ্রন্থে শিরকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শিরকের দিকে নিয়ে যায় এমন সব মাধ্যম বন্ধ করার আহ্বানের সাথে সাংঘর্ষিক।
.
খ. আল্লাহর নামসমূহ: তিনি মত প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহর জন্য তাঁর গুণাবলী থেকে নাম রাখা বৈধ, চাই তা শরীয়তের নির্দিষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত হোক বা না হোক। তবে আমি তাঁর এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ তাঁর তাফসীর বা অন্য কোনো গ্রন্থে খুঁজে পাইনি।
.
গ. আল্লাহর সিফাতসমূহ:তিনি তাঁর তাফসীর “ফাতহুল কাদীর”-এ মহান আল্লাহর কিছু গুণাবলী আশআরী পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা (তাবীল) করেছেন।যেসব সিফাত তিনি এভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেগুলো হলো:যেমন: মুখমণ্ডল (ওয়াজহ), চোখ (আইন), হাত (ইয়াদ), উচ্চতা (উলুউ), আগমন (মাজি’ ও ইতিয়ান), ভালোবাসা (মুহাব্বাহ) এবং রাগ (গদব)।এই সিফাতগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে, এ ধরনের তাবীল বা ব্যাখ্যা তাঁর আরেকটি গ্রন্থ “আত-তুহাফ”-এ বর্ণিত নীতির পরিপন্থী। আত-তুহাফে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, সিফাতগুলোকে প্রকৃত অর্থেই গ্রহণ করতে হবে, কোনো বিকৃতি, অস্বীকার, পদ্ধতি বা সাদৃশ্য ব্যবহার না করে। এটাই হলো সালাফদের পদ্ধতি।তিনি তাঁর গ্রন্থ আত তুহাফ এ আল্লাহর সাথে থাকা সিফাতের ক্ষেত্রে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। সেখানে তিনি এটিকে ইলমের সাথে থাকা হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি বরং তিনি দাবি করেছেন যে, এভাবে ব্যাখ্যা করা তাবীলের একটি শাখা, যা সালাফদের পদ্ধতির বিরোধী। কিন্তু এটি তাঁর তাফসীর এবং তুহফাতুয যাকিরীন গ্রন্থে প্রদত্ত মতের সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি এই আল্লাহর সাথে থাকাকে ইলমের সাথে থাকা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এটিকেই সালাফদের ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট এই বিষয়ে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণকারীদের মত গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেননি যে কুরআন সৃষ্টি, না অসৃষ্টি।
.
ঘ. তাওহীদের বিরোধী বিষয়সমূহ:তিনি নবী ও নেককার ব্যক্তিদের কবরের কাছে দোয়া করার জন্য বিশেষভাবে স্থান নির্বাচন করা বৈধ বলেছেন, এ ধারণায় যে এসব স্থান বরকতময় এবং সেখানে দোয়া কবুল হয়। এটি তাঁর অন্যান্য গ্রন্থে শিরকের দিকে নিয়ে যায় এমন সব মাধ্যম বন্ধ করার যে আহ্বান তিনি দিয়েছেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক।তিনি কুরআনের নামে কসম করাকে আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর নামে কসম করার মতো গণ্য করেছেন।
.
ঙ. নবুওয়াত (নবীগণ): তিনি নবী ও রাসূলদের মধ্যে কে অধিক শ্রেষ্ঠ এই বিষয়ে নির্দিষ্ট মত প্রদান না করে বিরত থেকেছেন। সবশেষে, ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) যেসব আকীদাগত বিষয়ে মত প্রদান করেছেন, সেগুলোর প্রমাণ উপস্থাপনে সালাফদের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি বর্ণনাগত দলিলকে বুদ্ধিভিত্তিক যুক্তির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং কুরআন হাদীসের প্রকাশ্য অর্থকে রূপক অর্থের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন যেমনটি তাঁর আততুহাফ গ্রন্থে দেখা যায়। তবে আল্লাহ সাথে থাকা বিষয়টি এর ব্যতিক্রম, যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, তাঁর তাফসীরে ইস্তিওয়া-সহ অন্যান্য যেসব সিফাত তিনি উল্লেখ করেছেন, সেগুলো তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেগুলোর তাবীল করেননি। তার গ্রন্থসমূহে এই বিষয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যে দ্বিধা ও আপাত বিরোধিতা দেখা যায় এবং যেখানে তিনি সালাফ আহলে সুন্নাহর বিরোধিতা করেছেন তার জন্য এভাবে ওজর পেশ করা যায় যে, তিনি একটি যায়দিয়া পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর পড়াশোনাও সেই পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সেখান থেকে বাইরে যাননি। সম্ভবত সেই পরিবেশগত পরিস্থিতি তাঁকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সালাফ ইমামদের গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে জানার সুযোগ খুব বেশি করে দেয়নি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু বিষয়ে ভুল করেছেন। আমরা তাঁর জন্য নির্ভুলতার দাবি করি না। আমরা তাঁর সম্পর্কে এটুকুই বলি যে, তিনি একজন মানুষ আর মানুষ ভুলও করে, সঠিকও করে। যেমন তিনি নিজেই বলেছেন: ভুল করা মানুষের স্বভাব। প্রত্যেকের কথাই গ্রহণও করা হয়, আবার বর্জনও করা হয় তবে, একমাত্র নির্ভুল হলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। মানুষের প্রবৃত্তি ভিন্ন ভিন্ন হয়, উদ্দেশ্যও বিভিন্ন হয়, আর তোমার প্রতিপালক তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করত।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ. বলেন:(وقل طائفة من المتأخرين إلا وقع في كلامها نوع غلط لكثرة ما وقع من شبه أهل البدع ، و لهذا يوجد في كثير من المصنفات في أصول الفقه ، و أصول الدين و الفقه و الزهد و التفسير و الحديث ، من يذكر في الأل العظيم عدة أقوال ، ويحكي من مقالات الناس ألوانا ، و القول الذي بعث الله به رسوله صلى الله عليه و سلم لايذكره لعدم علمه به لا لكراهية لما عليه الرسول صلى الله عليه و سلم ) “পরবর্তী প্রজন্মের খুব কম দলই এমন আছে যাদের বক্তব্যে কোনো না কোনো প্রকার ভুল অনুপ্রবেশ করেনি; কারণ বিদআতিদের সংশয়-সন্দেহ তখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই কারণেই উসূলুল ফিকহ, উসূলুদ্দীন (আকীদা), ফিকহ, যুহদ (তপস্যা), তাফসীর এবং হাদীসের বহু গ্রন্থে এমন লেখক পাওয়া যায়, যারা মহান মূলনীতিসমূহ সম্পর্কে একাধিক মতভেদ উল্লেখ করেন এবং মানুষের নানাবিধ বক্তব্য বর্ণনা করেন; অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সত্য বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেটিই তিনি (লেখক) উল্লেখ করেন না। এটি তাঁর না-জানার কারণে হয়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি বিদ্বেষবশত নয়।”(শারহু হাদীসিন নুযূল ১১৮)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) আরও একটি মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, যেখানে তিনি এমন আলেম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন,যিনি সাধারণভাবে সত্যের পথে থাকেন, তবে কখনো কখনো কিছু বিষয় বা কিছু সময়ে তা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। একই সাথে তিনি জ্ঞানার্জনরত ছাত্রদের সতর্ক করেছেন যেন তারা কোনো আলেমের ত্রুটি বা ভুলকর্ম অনুসরণ না করে এবং তা পুনঃপ্রচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে না দেয়, শুধুমাত্র তার খ্যাতি, নেকীয়াত্ব, প্রভাব বা জ্ঞানের বিস্তারের কারণে নয়। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وليس لأحد أن يتبع زلات العلماء ، كما ليس له أن يتكلم في أهل العلم و الإيمان إلا بما هم له أهل ، فإن الله تعالى عفا للمؤمنين عما أخطؤوا ، كما قال تعالى : (ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا ) – البقرة 286 قال الله : قد فعلت . رواه مسلم و أمرنا أن نتبع ما أنزل إلينا من ربنا و لانتبع من دونه أولياء ، و أمرنا أن لا نطيع مخلوقا في معصية الخالق ، و نستغفر لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان ، فنقول : (ربنا اغفر لنا و لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان ) – الحشر 10 – الآية. وهذا أمر واجب على المسلمين في كل ما كان يشبه هذا من الأمور ، و نعظم أمره تعالى بالطاعة لله و رسوله و نرعى حقوق المسلمين ، لاسيما أهل العلم منهم ، كما أمر الله و رسوله ، ومن عدل عن هذه الطريق فقد عدل عن اتباع الحجة إلى اتباع الهوى في التقليد ، و آذى المؤمنين و المؤمنات بغير ما اكتسبوا ، فهو من الظالمين ، ومن عظم حرمات الله ، و أحسن إلى عباد الله ، كان من أولياء الله المتقين ، و الله سبحانه أعلم) “
“কারো জন্যই আলেমদের বিচ্যুতি বা ভুলসমূহ অনুসরণ করা বৈধ নয়; ঠিক যেমনিভাবে আলেম ও মুমিনদের সম্পর্কে তাদের প্রাপ্য (মর্যাদা) ব্যতীত অন্যভাবে কথা বলাও তার জন্য বৈধ নয়। কারণ,আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ভুলবশত করা অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, যেমনটি তিনি বলেছেন:’হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।’ (সূরা বাকারা: ২৮৬) আল্লাহ তাআলা (এর জবাবে) বলেছেন: ‘আমি তা কবুল করলাম।’ (সহীহ মুসলিম)।আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা আমাদের রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করি এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের (মনগড়া মতের) অনুসরণ না করি। আমাদের আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা স্রষ্টার নাফরমানি করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য না করি। আর আমরা যেন আমাদের সেই ভাইদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে চলে গেছেন, আমরা বলি:”হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদের ক্ষমা করুন যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছেন।”(সূরা হাশর: ১০)। অনুরূপ সকল বিষয়ে এটিই মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব বা অপরিহার্য কর্তব্য। আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের আদেশকে যথাযথ সম্মান প্রদান করব এবং মুসলমানদের অধিকার—বিশেষ করে আলেম সমাজের অধিকার—রক্ষা করব, যেভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নির্দেশ দিয়েছেন।যে ব্যক্তি এই পথ থেকে বিচ্যুত হলো, সে মূলত ‘হুজ্জত’ বা দলিলের অনুসরণ ছেড়ে প্রবৃত্তি ও অন্ধ অনুকরণের (তাকলীদ) দিকে ঝুঁকে পড়ল। সে মুমিন নর-নারীদের এমন বিষয়ে কষ্ট দিল যা তারা করেনি, ফলে সে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হলো। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পবিত্র বিষয়সমূহকে (হুরমাত) সম্মান করে এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ইহসান (সদাচরণ) করে, সে আল্লাহর মুত্তাকী বন্ধুদের (আউলিয়া) অন্তর্ভুক্ত হয়। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই সর্বাধিক অবগত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ৩২; পৃষ্ঠা: ২৩৯) এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে শাইখ মুহাম্মাদ উমর বাযমূলের গ্রন্থ আল ইন্তিসারু লিআহলিল হাদীস দেখুন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। (ফাসল আইয়ান আহলিল হাদীস ১০৩–১৩০)।
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) কি যায়েদী মাযহাব ত্যাগ করেছিলেন?
উত্তরে শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:نعم ليس هو على مذهب الزيدية، ولكن بحكم النشأة والدراسة ينقل عنهم، ينقل عن أئمة آل البيت؛ كالهادي وفلان والناصر والقاسم وفلان وفلان، عدد “হ্যাঁ, তিনি যায়েদী মাযহাবের ওপর (প্রতিষ্ঠিত) ছিলেন না। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনার প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি তাঁদের থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি আহলে বাইতের ইমামদের থেকে বর্ণনা করেন; যেমন আল-হাদী, অমুক, নাসির, কাসিম এবং আরও অনেকের থেকে।”(শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-২৫৪৫২)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্নকারী: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদা কী ছিল? এবং তাঁর কিতাবসমূহ—যেমন:’নাইলুল আওতার’ ও ‘আস-সাইলুল জাররার’—এর ফিকহী বৈশিষ্ট্য কী?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
: لا شك أن الإمام الشوكاني إمام مجتهد ، وله قدم راسخة في الفقه ، وهو مجتهد حتى في العقائد ، وليس فقط في الأحكام ، وهو يغلب عليه العقيدة السلفية ، ولكن صدق الإمام مالك الذي قال : ” ما منَّا من أحد إلا ردَّ و رُدَّ عليه ؛ إلا صاحب هذا القبر ” – وأشار إلى قبر النبي صلى الله عليه وآله وسلم – ، فله بعض الآراء التي يُخالف ما كان عليه السلف ، وهذه تُغتفر منه تجاه أن غالب عقيدته مطابقة لعقيدة السلف الصالح .يحضرني الآن من شواذِّه أنه يُجيز التوسُّل بالنبي – صلى الله عليه وآله وسلم – ، طبعًا هذا بعد وفاته – عليه السلام – ، ويستدل على ذلك بحديث الأعمى المعروف والمشهور بين طلبة العلم في هذا الزمان ، أنه لا يدل إلا على التوسُّل بدعاء النبي – صلى الله عليه وآله وسلم – وشفاعته ؛ فهو إذًا يُدْرس علمه من كتبه كلِّها ، ويُستفاد منها كثير من المسائل التي يغفلُ عنها بعض العلماء ، فضلًا عن طلبة العلم ، ولكن ينظر إلى ذلك مقرونًا بالدليل ؛ لكيلا يقع في شيء من الخطأ الذي قد يقع هو ونحن وغيرنا ممَّن يدرس العلم ؛ فإن العصمة للنبي – صلى الله عليه وآله وسلم – وليس لأحد سواه .نعم .
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাম শাওকানী একজন ‘মুজতাহিদ’ ইমাম এবং ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর সুগভীর জ্ঞান ও মজবুত পদচারণা রয়েছে। তিনি কেবল আহকাম বা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রেই নয়, বরং আকীদার বিষয়েও একজন মুজতাহিদ ছিলেন। তাঁর ওপর ‘সালাফি আকীদা’র প্রাধান্যই বেশি লক্ষ্য করা যায়।তবে ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) সত্যই বলেছেন:”আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার কথা গ্রহণও করা হয় আবার বর্জনও করা হয় না; কেবল এই কবরের অধিবাসী (অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যতীত।”সুতরাং, আকীদার ক্ষেত্রে তাঁর এমন কিছু বিচ্ছিন্ন মতামত রয়েছে যা সালাফদের (পূর্বসূরিদের) মানহাজ বা পথের পরিপন্থী। তবে তাঁর অধিকাংশ আকিদাই যেহেতু সালাফে সালেহীনের আকিদার সাথে সংগতিপূর্ণ, তাই সেই বিচ্যুতিগুলো তাঁর মহান ইলমি খিদমতের তুলনায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়। এই মুহূর্তে তাঁর একটি ব্যতিক্রমী মতের কথা আমার মনে পড়ছে—তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর তাঁর মাধ্যমে ‘তাওয়াসসুল’ (মধ্যস্থতা) করা জায়েজ মনে করতেন। এক্ষেত্রে তিনি অন্ধ ব্যক্তির সেই সুপরিচিত হাদীসটি দিয়ে দলিল পেশ করেন, যা বর্তমান সময়ের তলেবে ইলমদের নিকট সুপরিচিত। অথচ সেই হাদীসটি কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘দোয়া’ ও ‘শাফায়াত’ বা সুপারিশের মাধ্যমে তাওয়াসসুল করার প্রমাণ দেয় (তাঁর সত্তার মাধ্যমে নয়)।যাই হোক, তাঁর লিখিত সকল কিতাব থেকেই ইলম অর্জন করা উচিত। বিশেষ করে এমন অনেক সূক্ষ্ম মাসআলা তাঁর কিতাব থেকে শেখা যায় যা অনেক বড় আলেম বা তলেবে ইলমদের নজর এড়িয়ে যায়। তবে তাঁর বক্তব্যগুলো অবশ্যই দলিলের নিরিখে যাচাই করে নিতে হবে; যেন তাঁর বা আমাদের মতো অন্য কারো ভুলগুলো আমরা গ্রহণ না করে ফেলি। কারণ, ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে বা ‘মাসুম’ কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি ছাড়া আর কেউ নন। হ্যাঁ।”(সূত্র: ফাতাওয়া জিদ্দাহ, ক্যাসেট নম্বর: ০২)
.
পরিশেষে বলা যেতে পারে—ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত একজন বিশিষ্ট আলেম। অতএব, যারা দাবি করেন যে তিনি জায়েদি মাজহাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং এর ওপরই ইন্তেকাল করেছেন—তাদের এ বক্তব্য সঠিক নয়; বরং এটি তাঁর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।তবে এটিও সত্য যে, তিনি ইয়েমেনের একটি জায়েদি পরিবেশে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বিধায় জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি স্বাভাবিকভাবেই জাইদি শিয়া ছিলেন। ফলে প্রথমদিকে ফিকহের ক্ষেত্রে জাইদি মাজহাব অনুসরণ করতেন। আহলে বাইতের ইমামদের সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্যে সে পরিবেশের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জাইদি মাজহাব থেকে বের হয়ে আসেন এবং বিভিন্ন কিতাবে জাইদি মতাদর্শের সমালোচনা ও খণ্ডন করেন। যেমন : ইরশাদুল গবি ইলা মাজহাবি আহলিল বাইতি ফি সাহবিন নাবি, আস-সাইলুল জার্রার ইত্যাদি গ্রন্থ। সুতরাং আকীদা-মানহাজের দিক থেকে তিনি ছিলেন সুস্পষ্টভাবে সালাফি আহালুল হাদিস—যিনি কুরআন-সুন্নাহর বাহ্যিক (শাব্দিক) অর্থকে গ্রহণ করতেন এবং আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলাকে প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতেন।ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনাকে প্রামাণিক বলে গ্রহণ করতেন—বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ হোক বা অপ্রসিদ্ধ। এ বিষয়ে তিনি “আল-কাওলুল মাকবূল…”নামক গ্রন্থও রচনা করেছেন। তিনি কুতুবে সিত্তাহ ও বিভিন্ন মাসানিদ গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে ফতোয়া প্রদান করতেন এবং বহু ক্ষেত্রে জায়েদি মাজহাবের মতামতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “আস-সাইলুল জার্রার” মূলত জায়েদি ফিকহের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রতিপক্ষতা হিসেবে বিবেচিত। পরিশেষে, রাসূলগণ ব্যতীত কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন; তবে একজন বিজ্ঞ আলিমের নেক আমল ও ইলমি খিদমতের বিশাল সমুদ্র তাঁর ছোটখাটো ভুলগুলোকে ঢেকে দেয়। “আল্লাহ তাআলা তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁর ভালো খেদমতগুলো কবুল করে নিন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কিছু মানুষ যখন বিপদ-আপদে পতিত হয়ে কিংবা তীব্র ব্যথা-বেদনায় কাতর হয়ে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে

 প্রশ্ন: কিছু মানুষ যখন বিপদ-আপদে পতিত হয় কিংবা তীব্র ব্যথা-বেদনায় কাতর হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে “ইয়া মুহাম্মদ” “ইয়া আলী”“ওগো বাবা”, “ওগো মা”, “ওগো ভাই” অথবা কোনো জড় বস্তুকে ডাকে—এরূপ ডাকা কি শিরক হিসাবে গণ্য হবে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
​ ▪️প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র। প্রতি অতঃপর কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালিহীনদের গ্রন্থাবলি অধ্যয়ন এবং পর্যালোচনার পর যে উপলব্ধি সুস্পষ্ট হয়েছে তা হলো—অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি কিংবা জড় বস্তুকে আহ্বান করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিরক নয়; বরং এর শরঈ হুকুম নির্ধারিত হয় আহ্বানের উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং অন্তর্নিহিত আক্বীদার ভিত্তিতে।কারণ, আরবি ভাষায় “ডাকা” (নিদা/দু‘আ) শব্দটি কেবল সাড়া বা জবাব প্রত্যাশার অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বহুবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়,যা প্রসঙ্গ, প্রয়োগ ও ভাষাগত প্রমাণের আলোকে নির্ধারিত হয়। আরবি ভাষার সাহিত্য ও কবিতায় এ ধরনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়।এ ধরনের শব্দ কখনো তা আর্তনাদ, কখনো বেদনা, আবার কখনো গভীর আক্ষেপ ও শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
.
উদাহরণস্বরূপ এক কবি মাআন ইবনু যায়িদা-এর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন:فَيَا قَبْرَ مَعْنٍ كَيْفَ وَارَيْتَ جُودَهُ ** وَقَدْ كَانَ مِنْهُ الْبَرُّ والْبَحْرُ مُتْرَعاً”হে মাআনের কবর!তুমি কীভাবে তার উদারতাকে আড়াল করে রাখলে—অথচ তার দানশীলতা ছিল এমন, যা স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয়ই পরিপূর্ণ করে দেওয়ার মতো বিস্তৃত!”
.
কখনো এটি বিস্ময় প্রকাশের‌ জন্য হয়। যেমন ত়ারাফাহ বলেছেন:”يا لَكِ من قُبَّرَةٍ بمَعْمِرِ خَلاَ لَكِ الجَوُّ فَبِيضي واصْفِري”হে ছোট পাখি (কুব্বারা)! কী অদ্ভুত তোমার অবস্থা এই বসতভূমিতে! তোমার জন্য আকাশ ফাঁকা হয়েছে—তাই তুমি নিশ্চিন্তে ডিম দাও এবং আনন্দে শিস দাও (ডাক দাও)।”
.
কখনো এর উদ্দেশ্য হয় বিলাপ বা শোক প্রকাশ, অর্থাৎ কোনো কিছুর জন্য দুঃখ বা কষ্ট প্রকাশ করা। যেমন আবুল আলা বলেছেন:فواعجباً كم يدَّعي الفضلَ ناقصٌ ** وَوَا أسفاً كم يظهر النقص فاضل”আশ্চর্যের বিষয়, কত অপূর্ণ মানুষ নিজেকে গুণবান দাবি করে আর হায় আফসোস, কত গুণবান মানুষের মধ্যেই ত্রুটি প্রকাশ পায়।
.
কখনো এমন ব্যক্তিকেও সম্বোধন করা হয়, যাকে শোনানো উদ্দেশ্য নয়। যেমন কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করতে গিয়ে বলা: يا زيد ما أجلّ مصيبتنا بفقدك.
হে যায়েদ! তোমাকে হারিয়ে আমাদের বিপদ কতই না বড়!
.
এ ধরনের উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি-ঘর, বসতভিটা বা বাহনকে সম্বোধন করা। যেমন আবুল আলা বলেছেন:يا ناقُ جِدّي فقدْ أفنَتْ أناتُكِ بي ** صَبري وعُمري وأحلاسي وأنساعي “হে উটনী! দ্রুত চলো; তোমার এই ধীরগতি আমার ধৈর্য ও জীবন শেষ করে দিচ্ছে, আর (দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে) আমার আসবাবপত্র ও উটের পিঠের রশিগুলোও জীর্ণ করে দিচ্ছে।”
.
নাবিগাতুয যিবয়ানী বলেছেন:يا دارَ مَيَّةَ بِالعَلياءِ فَالسَنَدِ ** أَقوَت وَطالَ عَلَيها سالِفُ الأَبَدِ “হে আলিয়া ও সানাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত মাইয়্যার ঘর! তুমি এখন জনশূন্য হয়ে গেছ, এবং সুদীর্ঘকাল তোমার ওপর দিয়ে সময় বয়ে গেছে।”
.
ইমরুল কায়েস বলেছেন:أَلا عِم صَباحاً أَيُّها الطَلَلُ البالي ** وَهَل يَعِمَن مَن كانَ في العُصُرِ الخالي” শুনো, ওহে জীর্ণ ধ্বংসস্তূপ! তোমার সকালটি আনন্দময় হোক। কিন্তু যে অতীতকালের (স্মৃতিতে) রয়ে গেছে, তার পক্ষে কি আর আনন্দময় জীবন কাটানো সম্ভব?
.
কখনো সময়কেও সম্বোধন করা হয়‌ এর দীর্ঘতার অভিযোগ জানাতে, অথবা এতে প্রাপ্ত আনন্দের প্রশংসা করতে। যেমন ইমরুল কায়েস তার দীর্ঘ রাতের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন:أَلاَ أَيُّها اللَّيْلُ الطَّوِيلُ أَلاَ انْجَلِي ** بِصُبْحٍ وَمَا الإِصْبَاحُ مِنْكَ بِأَمْثَহে দীর্ঘ রজনী! তুমি কি শেষ হবে না? সকাল নিয়ে আসো যদিও (আমার কাছে) সেই সকালও তোমার চেয়ে উত্তম কিছু নয়।”
.
ইবনে শাজারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ৫৪২ হি.)-বলেন:فهذه وجوه شتّى قد احتملها النّداء، وإن كان في أصل وضعه لتنبيه المدعوّ “এগুলো (নিদাহ বা সম্বোধনের) বিভিন্ন দিক বা প্রকারভেদ যা ‘নিদাহ’ (ডাকা)-র মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে; যদিও শব্দগতভাবে এর মূল ব্যাকরণিক উদ্দেশ্য হলো যাকে ডাকা হচ্ছে তাকে কেবল সচেতন বা সজাগ করা।”(আমালি ইবনু শাজারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৭; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২৩৭৯৬৮) অর্থাৎ ইবনে শাজারী (রাহিমাহুল্লাহ) বোঝাতে চেয়েছেন যে, ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ডাকার কাজ কেবল কাউকে সজাগ করার জন্য হলেও, সাহিত্যের গভীরে এর ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। প্রসঙ্গের ওপর ভিত্তি করে একটি সাধারণ ‘ডাক’ বা ‘সম্বোধন’ বহু অর্থ ও ব্যঞ্জনা বহন করতে পারে। অর্থাৎ, নিদাহ-এর বাহ্যিক কাঠামো এক হলেও এর অভ্যন্তরীণ তাৎপর্য বা মর্ম অনেক গভীর ও বহুমুখী।
.
আল বালাগাতুল আরাবিয়া আসাসুহা ওয়া উলুমুহা ওয়া ফুনুনুহা বইয়ে রয়েছে:وقد يخرج النداء عن المعنى الأصليّ الموضوع له ، فيُسْتَعْمَلُ لدى البلغاء وغيرهم في أغراضٍ أخْرى غير النداء، وهذه الأغراضُ تُفْهَمُ من قرائن الحال أو قرائن المقال ، فكلُّ حَرَكَةٍ نفسيَّةٍ ذات مشاعِرَ ، تَدْفَعُ الإِنسان إلى التعبير عنها بنداء ما ، بطريقةٍ تلقائية ، ولو لم يشعر بأنّ هذا النداء يحقق له مرجوّاً أو مأمولاً ، أو يدفع عنه مكروها.كأن يستعمل النداء في : الزّجْر واللّوم ، أو التحسّر والتأسّف والتّفجع والندم أو النُّدْبة ، أو الإِغراء ، أو الاستغاثة ، أو اليأس وانقطاع الرجاء ، أو التمني ، أو التذكر وبث الأحزان ، أو التضجر ، أو الاختصاص ، أو التعجب ، إلى غير ذلك”কখনও কখনও ‘নিদা’ (আহ্বান) তার জন্য নির্ধারিত মূল অর্থের গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। বাগ্মীগণ এবং ভাষাবিদগণ একে কেবল ডাকার জন্য নয়, বরং বিবিধ উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করে থাকেন। এই উদ্দেশ্যগুলো পরিস্থিতি (Context of situation) কিংবা প্রসঙ্গের (Context of speech) ইঙ্গিত থেকে অনুধাবন করা যায়। মূলত, আবেগতাড়িত প্রতিটি মানসিক স্পন্দনই মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো না কোনো আহ্বানের মাধ্যমে তার মনের ভাব প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করে; যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি সর্বদা এটি অনুভব করে না যে, এই আহ্বানের মাধ্যমে তার কোনো উদ্দেশ্য পূরণ হবে কিংবা কোনো অনিষ্ট দূর হবে।যেমন,’নিদা’ বা সম্বোধন নিম্নোক্ত অর্থসমূহে ব্যবহৃত হতে পারে:ভর্ৎসনা ও তিরস্কার,আক্ষেপ,আতিশয্য দুঃখ ও শোক প্রকাশ, অনুশোচনা বা বিলাপ, উৎসাহ প্রদান বা প্রলুব্ধকরণ,আর্তনাদ বা সাহায্য প্রার্থনা, হতাশা ও নিরাশা, আকাঙ্ক্ষা বা তামান্না, স্মৃতিচারণ ও দুঃখের বহিঃপ্রকাশ, বিরক্তি বা অসহিষ্ণুতা, বিশেষত্ব প্রদান বা নির্দিষ্টকরণ, বিস্ময় প্রকাশ ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্যে।”(আরো দেখুন; জাওয়াহিরুল বালাগাহ ফিল মাআনী ওয়াল বায়ান ওয়াল বাদিঈ পৃষ্ঠা: ৯০; উলুমুল বালাগাহ আল বায়ান ওয়াল মাআনী ওয়াল বাদিঈ পৃষ্ঠা: ৮২; আল বালাগাতুল আরাবিয়া; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৫০)
.
▪️দ্বিতীয়ত: অনুপস্থিত কোন ব্যক্তি কিংবা জড়বস্তুকে ডাকা কখন শিরক বলে গণ্য হবে?
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করলে যখন কোন মানুষ বলে: ‘ওগো বাবা’, ‘ওগো মা’, ‘ওগো ভাই’, বা ‘ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া আলী’, এমনকি কোনো জড় বস্তুকে সম্বোধন করলে, তখন এর দুটি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে—যার মধ্যে একটি শিরক এবং অন্যটি শিরক নয়।”
.
(১).যখন এধরনের আহ্বান শিরক: এই ধরনের আহ্বান তখন শিরকের অন্তর্ভুক্ত হয়, যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করে, বিপদ মুক্তির দোয়া করে কিংবা এমন বিষয়ে সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা করে যা পূরণ করার ক্ষমতা আল্লাহ ব্যতীত আর কারো নেই। এই অন্য সত্তা নবী, ওলি, ফেরেশতা, জিন কিংবা অন্য যেকোনো সৃষ্টিই হোক না কেন—তা শিরক হিসেবে গণ্য হবে।এই আহ্বানের দুটি রূপ হতে পারে: (১). প্রত্যক্ষ প্রার্থনা: যেমন সরাসরি বলা—’হে অমুক’ বা ‘হে মুহাম্মদ’ বা ‘হে আলী, আমার অমুক প্রয়োজন পূরণ করে দিন।’আমার বিপদ দূর করুন’ কিংবা ‘আমাকে সাহায্য করুন’ কিংবা ‘শক্তিবৃদ্ধি করুন’ ইত্যাদি।(২).পরোক্ষ প্রার্থনা (ইস্তিআনা): যেমন কোনো ভারী বস্তু তোলার সময় বা বিপদে পড়ে ‘ইয়া মুহাম্মদ’ বা ‘ইয়া আলী’ ও আব্বা ইত্যাদি বলে চিৎকার করা। এটি মূলত সাহায্য প্রার্থনা, যা ইবাদতের অংশ। কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মতের ঐক্যমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে আল্লাহ ছাড়া কোনো মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তিকে এভাবে ডাকা ‘শিরকে আকবর’ বা বড় শিরক। এটি একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয় এবং তার তাওহীদকে বাতিল করে দেয়। আল্লাহকে ডাকা বা দোয়া করা—তা কোনো কিছু চাওয়ার (দোয়া আল-মাসআলাহ) জন্যই হোক কিংবা ইবাদতের (দোয়া আল-ইবাদাহ) উদ্দেশ্যে বিনয় প্রকাশ ও নিজেকে সঁপে দেওয়াই হোক—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য তা করা জায়েয নেই। আল্লাহর প্রাপ্য এই মর্যাদা অন্য কাউকে প্রদান করাই হলো দোয়ার ক্ষেত্রে শিরক।
.
আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “সুতরাং তার চেয়ে কে অধিক যালিম, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ রটায় কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। তাদের ভাগ্যে লিখিত অংশ তাদের কাছে পৌঁছবে। অবশেষে যখন আমার প্রেরিত-দূতরা (ফেরেশতারা) তাদের নিকট তাদের জান কবজ করতে আসবে, তখন তারা বলবে, ‘কোথায় তারা, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকতে’? তারা বলবে, ‘তারা আমাদের থেকে হারিয়ে গিয়েছে’ এবং তারা নিজদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, নিশ্চয় তারা ছিল কাফির।”[সূরা আরাফ: ৩৭] আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”।[সূরা ইউনুস: ১০৬] আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে স্থলে পৌঁছে দেন, তখনই তারা শির্কে লিপ্ত হয়।”।[সূরা আনকাবুত: ৬৫] এখানে শির্ক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- গায়রুল্লাহ্‌কে ডাকা তথা প্রার্থনা করা। আল্লাহ্‌ আরও বলেন: “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যে বিষয়ে তার কাছে কোন প্রমাণ নেই; এর হিসাব (শাস্তি) হবে কেবলই তার রবের কাছে। নিশ্চয় কাফিরেরা সফলকাম হবে না।”[সূরা মুমিনূন: ১১৭] যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহ্‌কে ডাকে এটি তার ব্যাপারে সাধারণ হুকুম। আহুত সত্তাকে সে উপাস্য অভিহিত করুক কিংবা সাইয়্যেদ অভিহিত করুক কিংবা ওলী বা কুতুব অভিহিত করুক– হুকুমে কোন পার্থক্য নেই। কেননা আরবী ভাষায় ‘ইলাহ্‌’ বলা হয় উপাস্যকে। অতএব, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহ্‌ এর উপাসনা করল সে তাকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করল। যদিও মৌখিকভাবে সে এটা অস্বীকার করুক না কেন। এগুলো ছাড়াও অনেক সুস্পষ্ট আয়াতে কারীমসমূহ রয়েছে।
.
সহিহ বুখারীতে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন অংশীদারকে ডাকে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”(সহিহ বুখারী হা/৪৪৯৭) আলেমগণ এই মর্মে ইজমা (ঐকমত্য) করেছেন যে, যে বক্তি তার মাঝে ও আল্লাহ্‌র মাঝে বিভিন্ন-মাধ্যম বানিয়ে সেসব মাধ্যমকে ডাকে ও মাধ্যমদের উপর নির্ভর করে তারা কাফের। এই বিধান থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডাকাও বাদ দেয়া হয়নি।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”فمن جعل الملائكة والأنبياء وسائط يدعوهم ويتوكل عليهم ، ويسألهم جلب المنافع ودفع المضار ، مثل أن يسألهم غفران الذنب ، وهداية القلوب ، وتفريج الكروب ، وسد الفاقات : فهو كافر بإجماع المسلمين “যে ব্যক্তি ফেরেশতাদেরকে কিংবা নবীদেরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদেরকে ডাকে, তাদের উপর নির্ভর করে, কল্যাণ আনয়ন ও অকল্যাণ দূর করার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে; যেমন- গুনাহ মাফ, অন্তরের হেদায়েত প্রাপ্তি, বিপদাপদ দূর হওয়া, অভাব দূর হওয়ার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে মুসলিম উম্মাহ্‌র ইজমা অনুযায়ী সে কাফের।”(মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ১২৪) থেকে সমাপ্ত) এ ইজমার প্রতি সম্মতি জানিয়ে একাধিক আলেম তা (নিজেদের গ্রন্থে) উদ্ধৃত করেছেন। যেমন দেখুন: “ইবনে মুফলিহ এর ‘আল-ফুরু’ (৬/১৬৫), ‘আল-ইনসাফ’ (১০/৩২৭), ‘কাশ্‌শাফুল ক্বিনা’ (৬/১৬৯), ‘মাতালিবু উলিন নুহা’ (৬/২৭৯)। কাশ্‌শাফুল ক্বিনা গ্রন্থে এই ইজমাটি উল্লেখ করার পর ‘মুরতাদ এর হুকুম পরিচ্ছেদ’-এ বলেন:لأن ذلك كفعل عابدي الأصنام قائلين: (ما نعبدهم إلا ليقربونا إلى الله زلفى)”কেননা তা মূর্তিপূজারীদের কর্মের মত যারা বলে: “আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।”(সমাপ্ত; কাশশাফুল ক্বিনা; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৬৯)
.
(২).যখন শিরক নয়: কাউকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি কিছু না চেয়ে কেবল তাকে অন্তরে স্মরণ করা বা ভক্তিভরে সম্বোধন করা শিরক নয়। যেমন— আবেগঘন মুহূর্তে ‘ওগো মা’ বা ‘ওগো বাবা’ বলে স্মরণ করা, কিংবা দরূদ পাঠের উদ্দেশ্যে ‘ইয়া মুহাম্মদ (ﷺ) বলা। যেহেতু এখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোনো সাহায্য প্রার্থনা করা হচ্ছে না, তাই এটি শিরকের পর্যায়ভুক্ত নয়।কেননা এর মধ্যে গাইরুল্লর কাছে প্রার্থনা নেই আর শিরকের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়া।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,( يا محمد يا نبي الله ) هذا وأمثاله نداء يُطلب به استحضار المنادَى في القلب ، فيخاطب المشهود بالقلب ، كما يقول المصلي : (السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته ) ، والإنسان يفعل مثل هذا كثيرا ، يخاطب من يتصوره في نفسه ، وإن لم يكن في الخارج من يسمع الخطاب “ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া নবী’ এগুলো এবং এ জাতীয় অন্য কথাগুলো ‌সম্বোধনসূচক। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- সম্বোধিত ব্যক্তিকে অন্তরে স্মরণ করা এবং অন্তরে উপস্থিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করা। যেমনটি নামাযী ব্যক্তি বলে থাকেন: “আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ” (হে নবী, আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহ্‌র রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এ ধরণের সম্বোধন করে থাকে। নিজের মনে যাকে কল্পনা করছে তাকে সম্বোধন করে থাকে যদিও বহির্জগতে সে তার সম্বোধন শুনে না।”(ইবনু তাইমিয়া;ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম লি মুখালাফাতি আসহাবিল জাহিম; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯)
.
আর শাইখ সুলাইমান ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:المستغاث به عندهم هو الذي يُدعى ويُسأل ويُطلب منه الغوث ، والمنادي هو داعي المنادَى .لكن فرقوا بين دعاء المستغاث به وغيره ، كما فرقوا بين دعاء الندبة وغيره ، كقوله : يا حسرتا على ما فرطت ، وقولهم : يا أبتاه ، يا عمراه ، ونحو ذلك مما يلحقون في آخره ألفاً لأجل مد الصوت ، إذ النادب الحزين يمد صوته وهو يندب ما قد فات ، فيمد الصوت في آخر دعائه كقوله: يا أسداه ، يا ركناه ، يا أبتاه ، حتى قالوا يا أمير المؤمنيناه ، يا عبد الملكاه ، إذ نداء الندبة يقوله الإنسان عند حدوث أمر عظيم، ويقوله للتوجع، كقول سارة حين بشرت بإسحق: يا ويلتا.بخلاف المستغيث فإنه يدعو المستغاث به كما يدعو غيره ، فيقول: يا لزيد ، كقوله يا زيد ، لكن دل بهذه الصيغة أنه يطلب منه الإعانة على ما يهمه من أموره مطلقاً ، بخلاف النداء المجرد فإنه لا يدل على ذلك .فالمستغيث بالشيء : داعيه ، مع زيادة طلب الإغاثة”তাদের (ভাষাবিদদের) পরিভাষায়, ‘মুস্তাগাছ বিহি’ (যার নিকট উদ্ধারের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা হয়) হলেন তিনিই—যাকে আহ্বান করা হয়, যার নিকট যাঞ্চা করা হয় এবং যার কাছে ত্রাণ বা উদ্ধার কামনা করা হয়। আর ‘মুনাদী’ হলেন কেবল আহ্বানকারী। তবে তাঁরা (ভাষাবিদগণ) ‘সাহায্য প্রার্থনামূলক আহ্বান’ (ইস্তিগাছা) এবং অন্যান্য আহ্বানের মধ্যে পার্থক্য করেছেন; যেমনটি তাঁরা ‘বিলাপসূচক আহ্বান’ (নুদবাহ) এবং অন্যান্য ডাকের মাঝে পার্থক্য করেছেন।যেমন: হায় আফসোস, আমি যা অবহেলা করেছি তার জন্য, অথবা তাদের কথা:—’হে আমার পিতা!’ (ইয়া আবাতাহ), ‘হে উমর!’ (ইয়া উমারাহ)—এই জাতীয় শব্দসমূহ, যেখানে তারা স্বর দীর্ঘ করার জন্য শব্দের শেষে একটি ‘আলিফ’ যুক্ত করে।কেননা,শোকাতুর ব্যক্তি বিলাপ করার সময় বিয়োগব্যথায় কণ্ঠ প্রলম্বিত করে থাকে। তাই সে তার আর্তনাদের শেষে স্বর টেনে বলে: ‘হে আমার সিংহ!’ (ইয়া আসাদাহ), ‘হে আমার আশ্রয়!’ (ইয়া রুকনাহ), ‘হে পিতা!’ (ইয়া আবাতাহ); এমনকি তারা ‘হে আমীরুল মু’মিনীন!’ (ইয়া আমীরাল মু’মিনীনাহ), ‘হে আব্দুল মালিক!’ (ইয়া আব্দুল মালিকাহ) পর্যন্ত বলে থাকে। কারণ, বিলাপসূচক এই আহ্বান মানুষ কোনো মহাবিপদ বা তীব্র যাতনা প্রকাশের সময় ব্যবহার করে; যেমনটি সারা (আলাইহিস সালাম) ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর সুসংবাদ পাওয়ার সময় (বিস্ময়াভিভূত হয়ে) বলেছিলেন: ‘হায় দুর্ভোগ!’ (ইয়া অয়লাতা)। পক্ষান্তরে,(‘মুস্তাগিছ’) যে সাহায্য প্রার্থনা করে, সে যার কাছে সাহায্য চায় তাকে এমনভাবে ডাকে, যেমন অন্যকে ডাকে। যেমন সে বলে: ইয়া লি-যাইদিন’ (হে জায়েদ—সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসো)। কিন্তু এই বিশেষ বাক্যরীতির (ইস্তিগাছা) মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয় যে, সে তার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওই ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছে—যা কেবল সাধারণ আহ্বানের (নিদা) মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। সারকথা হলো: কোনো সত্তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা (ইস্তিগাছা) করার অর্থ হলো—তাকে আহ্বান করা, তবে এতে ‘উদ্ধার বা সাহায্য’ চাওয়ার একটি অতিরিক্ত অর্থ নিহিত থাকে।”(আত তাওযীহুত তাওহীদিল খল্লাক; পৃষ্ঠা: ৩০৪)
.
শাইখ মুহাম্মদ বশীর সাহসওয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত:১৩২৬ হি.) বলেন:
المانعون لنداء الميت والجماد ، وكذا الغائب ، إنما يمنعونه بشرطين:
الأول : أن يكون النداء حقيقياً ، لا مجازياً.
والثاني : أن يقصد ويطلب به من المنادَى ما لا يقدر عليه إلا الله ، من جلب النفع وكشف الضر. مثلاً يقال: يا سيدي فلان ؛ اشف مريضي وارزقني ولداً، ولا مرية أن هذا النداء هو الدعاء، والدعاء هو العبادة، فكيف يشك مسلم في كونه كفراً وإشراكاً وعبادة لغير الله؟ “.
ثم قال : ” وأما النداء المجازي : فلا يمنعه أحد”.
“যারা মৃতব্যক্তি, জড়বস্তু কিংবা অনুপস্থিত কাউকে সম্বোধন বা আহ্বান (নিদা) করা নিষিদ্ধ মনে করেন, তারা মূলত দুটি শর্তের ভিত্তিতে তা নিষেধ করেন:
​প্রথমত: এই আহ্বান বা ডাক হতে হবে প্রকৃত (হাকিকি), রূপক (মাজাজি) নয়।
​দ্বিতীয়ত: এই আহ্বানের মাধ্যমে আহ্বানকৃত ব্যক্তির কাছে এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা প্রার্থনা করা, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ করার ক্ষমতা রাখে না—যেমন কল্যাণ বয়ে আনা কিংবা বিপদ দূর করা।উদাহরণস্বরূপ বলা হয়: হে আমার নেতা অমুক! আমার রোগীকে সুস্থ করে দাও,অথবা আমাকে একটি সন্তান দান করুন।এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই আহ্বানই হলো ‘দোয়া’ (প্রার্থনা), আর দোয়াই হলো ইবাদত। সুতরাং একজন মুসলিম এটি ‘কুফর’, ‘শিরক’ এবং ‘গাইরুল্লাহর ইবাদত’ হওয়ার ব্যাপারে কীভাবে সন্দেহ পোষণ করতে পারে?
​এরপর তিনি বলেন: ‘আর রূপক (মাজাজি) আহ্বানের ক্ষেত্রে—এটি কেউই নিষিদ্ধ বলেন না। (সিয়ানাতুল ইনসান ওয়াসওয়াসাতিশ শাইখ দাহলান;পৃষ্ঠা;৩৬৬)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:مراد المانعين للنداء ليس مطلق النداء ، بل النداء الحقيقي الذي يُقصد به من المنادَى ما لا يقدر عليه إلا الله ، من جلب النفع وكشف الضر، ولا مرية في أنه عبادة ، وكونه عبادة وممنوعاً لا يقتضي كون كل نداء ممنوعاً ، حتى يلزم منه عدم جواز نداء الأحياء فيما يقدرون عليه”নিষেধকারীদের উদ্দেশ্য সব ধরনের আহ্বান নয় বরং সেই বাস্তব আহ্বান, যার মাধ্যমে ডাকা ব্যক্তির নিকট এমন কিছু চাওয়া হয়, যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন যেমন উপকার আনা বা ক্ষতি দূর করা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি ইবাদত। তবে এটি ইবাদত এবং নিষিদ্ধ হওয়া মানেই এই নয় যে, সব ধরনের আহ্বানই নিষিদ্ধ। তাহলে তো এর ফলে জীবিত ব্যক্তিদেরও ডাকা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে যদিও তারা যা করতে সক্ষম, তা চাওয়া হচ্ছে।”(সিয়ানাতুল ইনসান ওয়াসওয়াসাতিশ শাইখ দাহলান; পৃষ্ঠা: ৩৬৭)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল কবিতা ইত্যাদিতে মনোলগ বা কল্পনার ভঙ্গিতে জড়বস্তু বা অনুভূত জিনিসকে সম্বোধন করা সম্পর্কে, এমন বিষয়ে যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন। যেমন ইমরুল কায়েস-এর কবিতার এই লাইন: হে দীর্ঘ রাত্রি! তুমি কি শেষ হবে না? অথবা নাবাতি কবিতার এই ধরনের লাইন: হে কবর! তুমি যে প্রিয় মানুষটিকে ধারণ করে আছো তার উপর মাটির ভার কিছুটা হালকা করো। এ ধরনের কথাগুলো কি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকা শিরক হিসেবে গণ্য হবে, নাকি এগুলো রূপক হিসেবে গ্রহণযোগ্য?
তিনি উত্তরে বলেন:الحمد لله، وصلى الله وسلم على نبينا محمد، أما بعد؛ فإن ما في البيتين من النداء ليس من قبيل دعاء غير الله الذي هو شرك. بل النداء والأمر في البيت الأول : غاية الشاعر فيه التمني بانجلاء الليل، ونداء الليل نوع من التخيل بأن الليل يسمع ويجيب، والشاعر يعلم أنه لا يسمع ولا يجيب، ولا ينجلي بإرادة منه. وكذا خطاب القبر في البيت الثاني : فإنه محض تخيل وأمانٍ، أو تحسر على الدفين الذي لا يملك له الشاعر ولا غيره إنقاذه من مصيره، بل المالك لذلك الله وحده، الذي يحيي ويميت، وهو على كل شيء قدير. وهكذا القول في كل ما يرد في الأشعار من خطاب الجمادات؛ كالأطلال والديار والدِّمن والقبور، فكل ذلك من قبيل التمني أو التحسر. أما خطاب أصحاب القبور الأموات ، لقضاء الحاجات : فهو الشرك المحبط للحسنات .فيجب الفرقان بين التمنيات ، والتحسرات ، ودعاء الأموات ، والله أعلم”আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক।
অতঃপর, উল্লিখিত কাব্যদ্বয়ে যে ধরনের সম্বোধন বা আহ্বান করা হয়েছে, তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকার (দুআ) অন্তর্ভুক্ত নয় যা শিরক হিসেবে গণ্য হয়। বরং: ​প্রথম পঙক্তিতে (রাত্রিকে) সম্বোধন ও আদেশ: এর মাধ্যমে কবির মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘ রাত শেষ হওয়ার একনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা (তামান্নি) প্রকাশ করা। রাত্রিকে সম্বোধন করা এখানে এক প্রকার কল্পনা মাত্র—যেন রাত শুনতে পায় এবং উত্তর দেয়। অথচ কবি ভালো করেই জানেন যে, রাত শুনতেও পায় না, উত্তরও দেয় না এবং নিজের ইচ্ছায় সে শেষও হয় না।
​দ্বিতীয় পঙক্তিতে কবরকে সম্বোধন: এটিও নিছক কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষা, অথবা কবরে শায়িত ব্যক্তির জন্য কবির আক্ষেপ (তাহাসসুর) প্রকাশ মাত্র। কারণ কবি নিজে বা অন্য কেউই সেই মৃত ব্যক্তিকে তার পরিণতি থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে না। বরং এর একমাত্র মালিক আল্লাহ; যিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু দেন এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।এভাবেই কবিতায় জড়বস্তুকে সম্বোধন করা‌ যেমন ধ্বংসাবশেষ, বাড়িঘর, কবর ইত্যাদি সবই কামনা বা আফসোসের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কবরবাসী মৃতদেরকে তাদের নিকট প্রয়োজন পূরণের জন্য আহ্বান করা এটি শিরক, যা সৎকর্ম নষ্ট করে দেয়। অতএব, কামনা-বাসনা, আফসোস এবং মৃতদেরকে ডেকে সাহায্য চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক।আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।”(আব্দুর রহমান ইবনে নাসির আল বাররাক, ১৭ সফর ১৪৩৪ হিজরি)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্নকারী: হে আমাদের শাইখ,মানুষ যখন কষ্টে বলে হে আমার বাবা! হে আমার মা! হে আমার ভাই! এর হুকুম কী?
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) জবাবে বলেন :طبعًا هذا كلام ظاهره شرك وضلال لكن هو لا يُقصد به الاستغاثة فيكون منكرًا لفظًا يكون من الألفاظ المنكرة التي يجب الإعراض عنها “বাহ্যিকভাবে এ ধরনের কথা শিরক বা বিভ্রান্তির মতো শোনায়। তবে সাধারণত এর দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা উদ্দেশ্য করা হয় না। তাই এটি শিরক নয়, বরং নিন্দনীয় শব্দ এ ধরনের শব্দ পরিত্যাগ করা উচিত।” (ফাতাওয়া আবরাত হাতিফ ওয়া আল-সাইয়্যারা (ফোনে ও গাড়িতে দেওয়া ফতোয়া ক্যাসেট নং: ১৬৫)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, সম্বোধন (نداء) সর্বাবস্থায় চাওয়া, দো‘আ বা সাহায্য প্রার্থনার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত নয়। বরং কখনো এটি প্রকৃত চাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, আবার কখনো কেবল আবেগ, অনুভূতি বা অলঙ্কারিক প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এর প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করে বাক্যের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী। অতএব, প্রতিটি সম্বোধনকে শিরক বা কুফরের মানদণ্ডে ফেলে দেওয়া সঠিক নয়; বরং এ বিষয়ে মৌলিক বিবেচ্য বিষয় হলো—আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো কাছে এমন কিছু প্রার্থনা করা, যা একমাত্র আল্লাহই প্রদান করতে সক্ষম। যেখানে এ ধরনের প্রার্থনা বিদ্যমান থাকবে, সেটিই শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে; আর যেখানে এমন কোনো প্রার্থনা নেই, সেখানে তা শিরক হিসেবে গণ্য হবে না—যদিও বাক্যটি সম্বোধন বা দো‘আর ভাষায় প্রকাশিত হোক।সুতরাং, কেউ যদি জড় বস্তু বা কোনো সৃষ্টিকে সম্বোধন করে, এবং প্রাসঙ্গিক ইঙ্গিত, অবস্থা বা ভাষার ধরন থেকে স্পষ্ট হয় যে সে প্রকৃতপক্ষে কিছু প্রার্থনা করছে না; বরং দুঃখ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে—তাহলে বাস্তবিক অর্থে সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেনি।এই দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ যদি বলে—“হে আবলার ঘর!” অথবা “হে তাইবা!”—তাহলে তা কোনোভাবেই শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এখানে প্রকৃত কোনো চাওয়া নেই; বরং এটি কেবল হৃদয়ের অনুভূতির ভাষাগত প্রকাশ মাত্র।আর আহ্বান তখনই শিরক হয়, যখন এর মধ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য প্রার্থনা থাকে এবং তার নিকট এমন কিছু চাওয়া হয়, যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন। (গৃহীত; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২৩৭৯৬৮; ৪৪০৬৪৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়,ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate