Wednesday, July 22, 2026

ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতি

 একথায় কোন সন্দেহ নাই যে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম। এটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের জীবন যাপন কষ্টসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভালো-মন্দ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির ওপর। নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলো:

▪️১. মোবাইল ফোন আল্লাহর দেওয়া এক বড় নেয়ামত। কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের গন্তব্য—জান্নাত নাকি জাহান্নাম।
একজন আত্মমর্যাদাশীল মুমিন হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, এই ডিভাইসের প্রতিটি স্পর্শ এবং প্রতিটি ক্লিক আমাদের আমলনামায় যুক্ত হচ্ছে। এটি ব্যবহারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মহৎ উদ্দেশ্য। কারণ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, ইলম অর্জন, ইসলামের প্রচার-প্রসার, আত্মীয়তার হক আদায় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি সেই প্রযুক্তিই যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে তবে তা ইহকাল ও পরকাল—উভয়কেই ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
হাদিসে এসেছে, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]
অথচ দুঃখজনকভাবে, অনেকেই এই মোবাইলকে গিবত, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া, অশ্লীলতার প্রসার, গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা কাউকে হুমকি দেওয়ার মতো কাজগুলো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই হারাম নয় বরং তা একজন মানুষের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো, অনলাইন ভিত্তিক জুয়া বা বেটিংয়ের মতো মরণফাঁদ। এটি কেবল অর্থলিপ্সা নয় বরং সুস্পষ্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ। যারা সাময়িক উত্তেজনার লোভে এই নেশায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছে তারা নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দিচ্ছে। আজকের দিনে অনলাইন গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস কিংবা অন্তহীন নাটক-সিনেমা মানুষকে এমন এক কৃত্রিম নেশায় ডুবিয়ে রেখেছে, যা তার জীবনের মূল্যবান সময়কে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে পড়ে থাকাটা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। সালাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত কিংবা জ্ঞান অর্জনের মতো মহৎ কাজগুলো আজ অনেকের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জিকির-আজকার তো দূরের কথা, রবের স্মরণের জন্য এক মুহূর্ত সময় বের করার মানসিকতাটুকুও অনেকে হারিয়ে ফেলেছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, এই আসক্তি মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দিচ্ছে যে, সে নিজের পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনেও চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। যে সময়টা তার পরিবারকে দেওয়ার কথা, যে সময়টা সন্তানদের লালন-পালন ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করার কথা তা সে নিঃশেষ করছে অর্থহীন স্ক্রলিং আর গেমিংয়ের পেছনে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় বরং একটি বড় সামাজিক অবক্ষয়। ধর্মীয় ও সামাজিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ধিক্কার জানানোর মতো এবং কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নিজের জীবনের মালিকানা হারিয়ে এভাবে আসক্তির দাস হওয়াটা মূলত নিজের সর্বনাশ ডেকে আনারই নামান্তর। একজন সচেতন ইমানদার কখনোই আল্লাহর দেওয়া এই নেয়ামতকে তার আমলনামা কলুষিত করার বা নিজের ধ্বংস ডেকে আনার মাধ্যম হতে দিতে পারেন না। তাই সতর্ক হোন, নিজের সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এই অনুভূতিই হোক মোবাইল ব্যবহারের মূল চালিকাশক্তি।
▪️২. মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক আদব ও শিষ্টাচার বজায় রাখা একজন সভ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যেন সৌজন্যবোধ হারিয়ে না ফেলি সেদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি।
জনসম্মুখে মোবাইল ব্যবহারের সময় নিচের বিষয়গুলো আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মার্জিত আচরণের প্রতিফলন ঘটায়:
– পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে মোবাইলে ডুবে থাকা শিষ্টাচার হীনতা। এটি উপস্থিত ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি তাদের চেয়ে আপনার ডিভাইসের স্ক্রিনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই সামাজিক পরিবেশে থাকাকালীন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সচেতন ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন।
– পাবলিক প্লেসে কথা বলার সময় চিৎকার করে বা চেঁচিয়ে কথা বলা অত্যন্ত অশোভন। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে বা গণপরিবহনে উচ্চস্বরে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক আলাপ চালিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়। আরও দুঃখজনক হলো, অনেকে রাগের মাথায় জনসম্মুক্ষে ফোনে গালাগালি বা কটু ভাষা ব্যবহার করেন যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ও রুচিকে সবার সামনে নিচু করে দেয়। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি আচরণই আপনার শিক্ষা ও রুচির পরিচয় বহন করে। প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার যেন আপনার ভেতরের মানবিক সৌজন্যবোধকে বিলীন করে না দেয়। একটি শান্ত ও মার্জিত কথোপকথন কেবল আপনার ব্যক্তিত্বকেই উজ্জ্বল করে না বরং আশপাশের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্কের গভীরতা ও শ্রদ্ধাবোধকেও অটুট রাখে। নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়ে, ধৈর্য ও শালীনতার পরিচয় দেওয়াই একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
– কোনো মাহফিল, মজলিস, সভা বা সেমিনারে উপস্থিত থাকা কিংবা কারো সাথে সরাসরি আলাপচারিতায় মগ্ন থাকা অবস্থায় মোবাইলে ডুবে থাকা কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, এটি রীতিমতো সৌজন্যবোধের অভাব ও বেয়াদবি। যখন আপনি কারো সাথে সামনাসামনি কথা বলছেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসে আছেন তখন মোবাইলে গেম খেলা, রিলস দেখা বা বারবার ভিডিও কল রিসিভ করা—এই প্রতিটি কাজই আপনার সামনে থাকা মানুষটিকে ছোট করার নামান্তর। আপনার এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই ব্যক্তি বা মজলিস আপনার কাছে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগত থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আপনার সাথে কথা বলছে বা যে মজলিসে আপনি উপস্থিত আছেন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া। অন্যের সময়ের মর্যাদা রক্ষা করা এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা একজন ব্যক্তিত্ববান ও রুচিশীল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মনে রাখবেন, আপনি যখন কারো সাথে কথোপকথনরত অবস্থায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তখন এটি উল্টো পাশের মানুষটির মনে বিরক্তি ও অবহেলার জন্ম দেয়। তাই যেকোনো সামাজিক জমায়েতে নিজের মোবাইল ফোনটিকে পকেটে বা ব্যাগে রেখে পূর্ণ মনোযোগ উপস্থিত মানুষের দিকে দেওয়াটাই সভ্যতা ও মার্জিত আচরণের দাবি। প্রযুক্তির নেশায় পড়ে যেন আমরা আমাদের মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোকে নষ্ট না করি, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন।
– মসজিদ, দ্বীনি মাহফিল বা হাসপাতালের মতো জায়গাগুলোর একটি নিজস্ব গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রয়েছে। মসজিদ আল্লাহর ঘর, দ্বীনি আলোচনা জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র, আর হাসপাতাল যেখানে মানুষ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় শান্তি খোঁজে—এই স্থানগুলোতে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার কেবল অসৌজন্যমূলক নয় বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এসব সংবেদনশীল স্থানে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা ভাইব্রেট মুডে না রাখা কেবল আপনার উদাসীনতাই প্রকাশ করে না বরং এটি অন্যের ইবাদত, মনোযোগ কিংবা বিশ্রামে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। ভাবুন তো, নামাজের রুকু-সিজদায় বা গোরস্থানের মতো কোনও স্থানে হঠাৎ কর্কশ কোনো রিংটোন বেজে ওঠা কতটা পীড়াদায়ক হতে পারে! হাসপাতালের ওয়ার্ডে যেখানে রোগী একটু প্রশান্তির অপেক্ষায়‌ পড়ে আছে সেখানে মোবাইলের উচ্চশব্দ তাদের বিরক্তির কারণ হওয়াটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। একজন সচেতন ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে এই জায়গাগুলোতে প্রবেশের সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আমাদেরই হাতে। তাই সামান্য সচেতনতা আর দায়িত্ববোধই পারে একটি মার্জিত পরিবেশ বজায় রাখতে। মনে রাখবেন, আপনার একটি ছোট পদক্ষেপই অন্যের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটায়।
– অন্যদের সাথে আলাপকালে অনুমতি ছাড়া লাউড স্পিকার ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং নৈতিকতার পরিপন্থী। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, অপর পক্ষের অজান্তে তার একান্ত কথা অন্যদের শোনানো—এটি কেবল সামাজিক অপরাধ নয় বরং আমানতের খেয়ানত ও গিবতের শামিল।
– মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যদি না সেই কথোপকথনে এমন কিছু থাকে যা অন্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তবে বিনা অনুমতিতে কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা—কোনোটাই বৈধ নয়। কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা এবং তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করা একজন ইমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
– রিংটোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের রুচিবোধ ও সচেতনতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই শখ করে রিংটোন হিসেবে উদ্ভট শব্দ, উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা অসংলগ্ন মিউজিক ব্যবহার করেন, যা জনসম্মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং অন্যের বিরক্তির কারণ হয়। আবার অনেকেই না বুঝে রিংটোন হিসেবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ব্যবহার করেন, যা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এটি আল্লাহর কালামের প্রতি এক ধরণের অবমাননা ও অপব্যবহার। কারণ ফোনের রিংটোন যখন কোনো অপবিত্র স্থানে বা বিব্রতকর মুহূর্তে বেজে ওঠে তখন তা কুরআনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
তাই একজন সচেতন ও মার্জিত মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত:
– কারো অনুমতি ছাড়া তার কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।
– রিংটোনের ক্ষেত্রে সব সময় সাধারণ ও স্বাভাবিক টোন ব্যবহার করা, যা কারো বিরক্তির কারণ হবে না।
– পবিত্র কুরআন বা দ্বীনি কোনো বিষয়কে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকে তার যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তির প্রতিটি ব্যবহারই আমাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। তাই নিজের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো যেমন গোপন রাখা জরুরি, অন্যের গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষা করাও তেমনি আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
▪️৩. কারো সাথে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ইসলামি আদব মেনে চলা কর্তব্য। যেমন:
– কথোপকথন শুরুর আগে সালাম বিনিময় করা।
– কারো বিশ্রামের সময় বা অসময়ে কল না দেওয়া এবং কেউ কল রিসিভ না করলে বারবার কল করে বিরক্ত না করে সম্ভব হলে একটি মেসেজ দিয়ে রাখা উত্তম।
– অন্যের অনুমতি ছাড়া তার ফোন ব্যবহার করা বা কারো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের কাছে শেয়ার করা নৈতিকভাবে অন্যায়।
▪️৪. ইসলামের দৃষ্টিতে সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক আমানত এবং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাবের খাতায় জমা হচ্ছে, তাই এই সময়কে কেবল বিনোদনের উপকরণে বা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে অপচয় করা মানে নিজের আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। মনে রাখা দরকার, অহেতুক কাজে ডুবে থাকা কেবল সময় হারানো নয় বরং এটি জীবনের সেই মূল্যবান অংশ হারানো যা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
একজন বুদ্ধিমান মুমিন তার সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে ইহকাল ও পরকালের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তির পেছনে অকারণে সময় না দিয়ে, সেই সময়টুকু যদি কুরআন তেলাওয়াত, ইলম অর্জন, সৃজনশীল কাজ, কিংবা সমাজ ও পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হয় তবেই জীবন সার্থক হয়। প্রবাদে আছে, “সময় একটি ধারালো তলোয়ারের মতো; তুমি যদি একে না কাটো তবে এটি তোমাকে কেটে ফেলবে।” তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম গতির পেছনে না ছুটে নিজের জীবনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি মুহূর্তকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করাই হলো প্রকৃত ইমানদারের কাজ। মনে রাখবেন, কাল কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। এই বোধটুকু জাগ্রত থাকলেই একজন মানুষ সময়ের অপচয় রোধ করে তার জীবনকে অর্থবহ ও সফল করে তুলতে পারবে। সহজ কথায়, মোবাইল ফোনকে আপনি আপনার জীবনের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, নাকি অধঃপতনের দিকে ছুটে চলবেন—এই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে। এর দ্বারা আপনি আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করবেন নাকি কলুষিত করবেন তাও আপনার সিদ্ধান্ত। কল্যাণকর কাজে এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বিজ্ঞানের এই মূল্যবান অবদানটি হবে আমাদের জন্য একটি বিশাল নেয়ামত। আর ভুল কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে আমাদের জন্য ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ। আল্লাহ আমাদেরকে মোবাইল ফোন কে উপকারী কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ফুটবল বিশ্বকাপ এবং সমসাময়িক ক্রীড়া সংস্কৃতি সম্পর্কে শাইখ সালেহ আল ফাউজান হাফিযাহুল্লাহ এর গুরুত্বপূর্ণ একগুচ্ছ ফতওয়া

 ফুটবল, বিশ্বকাপ এবং এবং সমসাময়িক খেলাধুলা বিষয়ে বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ এবং সৌদি আরবের প্রধান মুফতি আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া তুলে ধরা হলো:

❒ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে ফুটবল খেলার বিধান কী?
প্রশ্ন: শাইখ, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন। এই প্রশ্নকারী বলছেন: ফুটবল খেলার হুকুম সম্পর্কে আপনাদের মতামত কী? বিশেষত যারা দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য এর হুকুম কী—যদি খেলায় কোনও হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয় না থাকে? দয়া ফতওয়া প্রদানে বাধিত করবেন।
উত্তর:
إِذَا كَانَ الْقَصْدُ مِنْ هَذَا تَقْوِيَةَ الْجِسْمِ؛ يَعْمَلُ الرِّيَاضَةَ وَالْكُرَةَ مِنْ أَجْلِ تَقْوِيَةِ جِسْمِهِ، وَلَا يُكْثِرُ مِنْ هَذَا، وَإِنَّمَا بِقَدْرِ مَا يَحْصُلُ لَهُ تَقْوِيَةُ جِسْمِهِ فَقَطْ، وَلَا يَشْغَلُهُ ذَلِكَ عَنْ أَدَاءِ وَاجِبٍ وَلَا عَنْ طَلَبِ مَعِيشَةٍ؛ فَهَذَا مُبَاحٌ بِهَذَا الْقَدْرِ، مَعَ سَتْرِ الْعَوْرَةِ -مَا يَكُونُ كَاشِفًا لِعَوْرَتِهِ-، هَذَا يُبَاحُ لَا بَأْسَ بِهِ.
أَمَّا إِذَا تَجَاوَزَ هَذِهِ الضَّوَابِطَ؛ بِأَنْ كَانَ مِهْنَةً وَحِرْفَةً، وَيَشْغَلُ وَقْتَهُ كُلَّهُ، وَلَا يُعْرَفُ إِلَّا بِأَنَّهُ لَاعِبُ كُرَةٍ؛ هَذَا لَا يَجُوزُ؛ لِأَنَّهُ أَهْدَرَ وَقْتَهُ، وَأَهْدَرَ شَخْصِيَّتَهُ، وَأَهْدَرَ مَنَافِعَهُ، وَنَزَلَ عَنْ صِفَةِ الرِّجَالِ وَصِفَةِ ذَوِي الشَّهَامَةِ وَالْمُرُوءَةِ، وَصَارَ مَعْرُوفًا بِأَنَّهُ لَاعِبٌ -يُسَمَّى لَاعِبًا-، وَاللَّعِبُ إِذَا كَثُرَ،
اللهُ مَا ذَكَرَ اللَّعِبَ إِلَّا عَلَى وَجْهِ الذَّمِّ فِي الْقُرْآنِ؛ مَا جَاءَ اللَّعِبُ إِلَّا عَلَى وَجْهِ الذَّمِّ. فَيُتْرَكُ هَذَا الْأَمْرُ، وَلَا يَكُونُ مُحْتَرِفًا لِلَعِبِ الْكُرَةِ أَوْ كُلُّ وَقْتِهِ، مَا لَهُ مِهْنَةٌ إِلَّا لَعِبُ الْكُرَةِ؛ هَذَا لَا يَجُوزُ، هَذَا يُذِيبُ شَخْصِيَّةَ الْمُسْلِمِ، وَيُعَطِّلُ عَلَيْهِ مَصَالِحَهُ، وَيُنَزِّلُ قَدْرَهُ عِنْدَ النَّاسِ
“খেলার উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল শরীরচর্চা বা সুস্থ থাকা, আর সেটা করতে গিয়ে যদি নিজের জরুরি কাজ বা জীবিকার পথে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয়, তবে ফুটবল খেলাটা জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সতর ঢেকে রাখা জরুরি। শরীর গঠনের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার, ততটুকু খেলাধুলা করায় কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু এই খেলার নেশায় যদি কেউ সব সীমা ছাড়িয়ে যায় তবে তা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। যেমন:
খেলাধুলাকে যদি কেউ পেশা বা জীবন সংস্থানের প্রধান উপায় বানিয়ে নেয়, সারাটা সময় মাঠেই কাটিয়ে দেয় এবং নিজের আসল পরিচয় মুছে ফেলে শুধু একজন ‘ফুটবলার’ হিসেবেই পরিচিতি গড়ে তোলে—তাহলে সেটা জায়েজ নয়। কারণ এতে মূল্যবান সময় ও জীবনের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। এতে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অহেতুক খেলাধুলাকে কখনোই ভালো চোখে দেখেননি। তাই যারা খেলাধুলা নিয়ে অতিরিক্ত মেতে থাকে, তাদের উচিত নিজেকে শুধরে নেওয়া। একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিকর এমন কোনও কাজ বা পরিচয় আঁকড়ে ধরা উচিত নয়, যা মানুষের কাছে তার মর্যাদা কমিয়ে দেয় এবং তাকে আসল দায়িত্ব ও কল্যাণকর কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।” শাইখের এ বক্তব্যের আলোকে ফুটবল খেলা জায়েজ হওয়ার শর্তাবলী নিম্নরূপ:
● ১. খেলার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে কেবল শরীরচর্চা বা সুস্থতা অর্জন।
● ২. খেলাধুলা করতে গিয়ে নিজের জরুরি কাজ ও দায়িত্বে (ফরজ ইবাদত-বন্দেগিতে) অবহেলা করা যাবে না বা জীবিকা অর্জনের পথে কোনও বাধা সৃষ্টি হওয়া যাবে না।
● ৩. খেলার সময় সতর তথা শরীরে আবশ্যকীয় অংশ ঢেকে রাখা জরুরি।
● ৪. শরীর গঠনের প্রয়োজনে যতটুকু খেলাধুলা প্রয়োজন ঠিক ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে; অতিরিক্ত মেতে থাকা যাবে না।
● ৫. খেলাধুলাকে পেশা বা জীবিকার প্রধান উপায় বানানো যাবে না।
● ৬. সারাক্ষণ মাঠেই সময় কাটিয়ে দেওয়া এবং নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে শুধু ‘খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এতে মূল্যবান সময় ও জীবনের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়।
● ৭. এমন কোনও কাজ বা পরিচয় আঁকড়ে ধরা যাবে না, যা একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ করে এবং তাকে মানুষের কাছে মর্যাদাহীন করে তোলে।
● ৮. খেলাধুলা যেন মানুষকে তার আসল দায়িত্ব ও কল্যাণকর কাজ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
এসব শর্ত সাপেক্ষে ফুটবল খেলা জায়েজ। এর ব্যত্যয় ঘটলে জায়েজ নয়। (অনুবাদক)
❒ ২. কাফের দেশগুলোর ক্রীড়া টিমকে সমর্থন করা এবং তাদের জয় কামনা করার বিধান: এটি কি কাফেরদের প্রতি আন্তরিক বন্ধুত্ব ও গভীর ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত?
প্রশ্ন: আজকাল অনেকে বিভিন্ন দেশের খেলাধুলা দেখেন এবং কোনও কোনও দলের প্রতি সমর্থন জানান। এর মধ্যে অনেক সময় কাফের দেশগুলোর দলও থাকে। কাফেরদের দল জয়ী হোক—এমনটা কামনা করা বা তাদের সমর্থন করা কি তাদের প্রতি আন্তরিক গভীর ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব (মুওয়ালাত) হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর:
إِذَا أَحَبَّ أَنْ يَنْتَصِرَ الْكَافِرُ وَلَوْ بِالْأَلْعَابِ الرِّيَاضِيَّةِ فَهَذِهِ مَوَدَّةٌ لَهُمْ، إِذَا أَحَبَّ أَنْ يَنْتَصِرُوا وَلَوْ فِي الْأَلْعَابِ الرِّيَاضِيَّةِ فَهَذِهِ مُوَالَاةٌ لَهُمْ، نَعَمْ
“যদি কেউ চায় যে কাফেররা জয়ী হোক—তা সে সাধারণ কোনও বিষয় হোক কিংবা খেলাধুলা—তবে এটি তাদের প্রতি মনের টান বা ভালোবাসারই লক্ষণ। আর যদি কেউ মনেপ্রাণে তাদের জয় কামনা করে, তবে তা ইসলামি পরিভাষায় তাদের প্রতি ‘মুওয়ালাত’ বা আনুগত্য ও বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য হবে।”
❒ ৩. মুসলিম দলের বিপক্ষে অমুসলিম দলকে সমর্থন করার শরয়ি বিধান:
প্রশ্ন: অনেক ফুটবল ভক্ত অমুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি এতটাই অন্ধভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যে, তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। অথচ এর বিপরীতে, কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সদস্য হওয়ার কারণে মুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করেন। এই আচরণের শরয়ি হুকুম কী? এটি কি মানুষকে বড় ধরনের কোনও বিপদের দিকে ঠেলে দেয়?
উত্তর:
هَذَا مِنْ أَضْرَارِ التَّعَصُّبِ الرِّيَاضِيِّ الْمَذْمُومِ، فَإِذَا اقْتَرَنَ هَذَا التَّشْجِيعُ بِالْوَلَاءِ وَالْبَرَاءِ، بِحَيْثُ يُحَبُّ الْكَافِرُ وَيُوَالَى، وَيُبْغَضُ الْمُسْلِمُ وَيُعَادَى لِأَجْلِ مُبَارَاةٍ أَوْ نَادٍ، فَهَذَا أَمْرٌ لَا يَجُوزُ شَرْعًا، وَهُوَ مِنَ الِانْحِرَافِ فِي الْمَوَازِينِ. إِنَّ الْوَلَاءَ وَالْبَرَاءَ لَا يَكُونُ إِلَّا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ، فَمُوَالَاةُ الْكَافِرِينَ وَمَحَبَّتُهُمْ لِنُصْرَتِهِمْ فِي لُعْبَةٍ، وَمُعَادَاةُ الْمُسْلِمِينَ لِأَنَّهُمْ فِي فَرِيقٍ مُنَافِسٍ، هُوَ مَسْلَكٌ خَطِيرٌ يُرِيدُهُ أَعْدَاءُ الْإِسْلَامِ؛ فَقَدْ أَرَادُوا أَنْ يَغْرِسُوا فِي قُلُوبِ شَبَابِ الْمُسْلِمِينَ مَفَاهِيمَ الْوَلَاءِ وَالْبَرَاءِ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلِغَيْرِ الْإِسْلَامِ، لِيَصْرِفُوهُمْ عَمَّا يَنْفَعُهُمْ فِي دِينِهِمْ وَدُنْيَاهُمْ
“এটি মূলত খেলাধুলা নিয়ে অন্ধ গোঁড়ামির একটি ভয়াবহ পরিণাম। একজন মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি হলো ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’—অর্থাৎ ভালোবাসা ও ঘৃণা কেবল আল্লাহর জন্য হওয়া। কিন্তু কেউ যদি নিছক একটি খেলা বা ক্লাবকে কেন্দ্র করে কোনও অমুসলিমকে ভালোবাসে, সমর্থন দেয় এবং একই কারণে একজন মুসলিমকে ঘৃণা বা শত্রুতা করে, তবে তা ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই বৈধ নয়। এটি ঈমানের মাপকাঠিতে অনেক বড় একটি বিচ্যুতি।” আমাদের সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভালোবাসা ও আনুগত্য কেবল আল্লাহ, তাঁর রসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মুমিনদের জন্যই নির্দিষ্ট। নিছক একটি খেলায় জেতানোর আশায় কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব পোষণ করা এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে মুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি বিদ্বেষ রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি এমন একটি পথ, যা ইসলামের শত্রুরাই চায়। তারা চায় মুসলিম তরুণদের মন থেকে প্রকৃত ইমানি চেতনার জায়গা দখল করে নিতে। তারা চায় আমাদের তরুণরা যেন আল্লাহ ও ইসলামের পরিবর্তে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত কল্যাণ থেকে পুরোপুরি বিমুখ হয়ে যায়।”
❒ ৪. ফুটবল খেলায় গোল দেওয়ার পর সেজদা দেওয়ার বিধান:
প্রশ্ন: ফুটবল খেলোয়াড়রা গোল করার পর যে সেজদা দেয় তার হুকুম কী? অনেকে বলে, আপনি নাকি এটি জায়েজ বলেছিলেন আবার অনেকে বলে, আপনি নিষেধ করেছেন। আসলে বিষয়টি কী?
উত্তর:
«النَّقْلُ الْأَوَّلُ كَذِبٌ، مَا قُلْتُ مَشْرُوعِيَّةَ هَذَا، أَقُولُ: مَا هَذِهِ نِعْمَةٌ، أَقُولُ: الْكُرَةُ وَلَعِبُ الْكُرَةِ مَا هُوَ بِنِعْمَةٍ، وَسُجُودُ الشُّكْرِ يَكُونُ عِنْدَ تَجَدُّدِ نِعْمَةٍ، فَهُوَ بِدْعَةٌ فِي هَذَا الْمَوْضِعِ، إِيشْ حَصَّلْنَا مِنَ الْكُرَةِ وَإِيشِ الْمُسْلِمُونَ اسْتَفَادُوا مِنْهَا إِلَّا ضَيَاعَ شَبَابِهِمْ؟ مَا اسْتَفَادُوا، بَلْ هِيَ ضَرَرٌ عَلَى الْمُسْلِمِينَ».
“আমার পক্ষ থেকে এটি জায়েজ হওয়ার যে কথাটি ছড়ানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কখনোই এটিকে বৈধ বলিনি।
ফুটবল খেলা কোনও নিয়ামত বা অনুগ্রহ নয় যে, এর জন্য সেজদা দিতে হবে। সেজদায়ে শোকর তো কেবল তখনই করা হয় যখন কোনও নতুন নিয়ামত প্রাপ্তি ঘটে। সুতরাং খেলার মাঠে এমন সেজদা করা একটি বিদআত (দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত কাজ)।
ফুটবল থেকে আমরা কী পেয়েছি? মুসলমানরা এটি থেকে কী উপকার পেয়েছে? এটি কেবল যুবকদের সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং এটি মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর।
❒ ৫. ফুটবল ম্যাচ দেখার বিধান
প্রশ্ন: ফুটবল ম্যাচ মাঠে গিয়ে বা টিভিতে দেখা কি বৈধ?
উত্তর:
لَا خَيْرَ فِيهَا، لَا فَائِدَةَ فِيهَا إِلَّا ضَيَاعُ الْوَقْتِ، فَالْأَحْسَنُ أَنْ تَصْرِفَ نَفْسَكَ عَنْهَا، تَشْتَغِلَ فِي مَا فِيهِ فَائِدَةٌ، فِي دِينِكَ وَدُنْيَاكَ
“এর মধ্যে কোনও কল্যাণ বা উপকার নেই, বরং এটি সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বরং আপনার মূল্যবান সময়টুকু এমন কোনও কাজে ব্যয় করুন, যা আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণে আসবে।”
❒ ৬. ”খেলা দেখার পরিবর্তে ঘুমানো অধিক উত্তম”
প্রশ্ন: টেলিভিশনে ফুটবল ম্যাচ দেখার হুকুম কী?
উত্তর:
«يَعْنِي عِنْدَكَ فَرَاغٌ، مَا لَكَ شُغْلٌ إِلَّا مُتَابَعَةَ الْكُرَةِ وَمَا أَدْرِي وَش؟ الْمُسْلِمُ وَقْتُهُ ثَمِينٌ، مَا يَنْبَغِي أَنَّهُ يُضَيِّعَهُ فِي الْمُبَارَيَاتِ وَالْمُسَلْسَلَاتِ وَالْأَشْيَاءِ الْهَابِطَةِ الَّتِي لَا تُفِيدُهُ فِي دِينِهِ وَلَا فِي دُنْيَاهُ. يَحْفَظُ وَقْتَهُ فِيمَا يَنْفَعُهُ وَمَا يُفِيدُهُ. كَوْنُكَ تَنَامُ أَحْسَنُ مِنْ كَوْنِكَ تُشَاهِدُ الْمُبَارَاةَ؛ تَنَامُ، تَرْتَاحُ، تَقُومُ تُصَلِّي آخِرَ اللَّيْلِ، أَحْسَنُ لَكَ مِنْ أَنَّكَ تُشَاهِدُ شَيْئًا مَا فِيهِ فَائِدَةٌ، وَيُؤَخِّرُ عَلَيْكَ النَّوْمَ، وَيُكَسِّلُكَ عَنْ صَلَاةِ الْفَجْرِ».
“তার মানে আপনার হাতে অনেক অবসর সময়! খেলা দেখা ছাড়া আপনার আর কোনও কাজ নেই!
একজন মুসলিমের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই খেলাধুলা, নাটক-সিরিয়াল বা এই ধরনের অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করা তার জন্য শোভনীয় নয়—বিশেষ করে যেসব বিষয় দ্বীন বা দুনিয়ার কোনও উপকারে আসে না। বরং সময়ের সঠিক ব্যবহার করা এবং কল্যাণকর কাজে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সত্যি বলতে, খেলা না দেখে সেই সময়ে ঘুমানো আপনার জন্য অনেক বেশি উত্তম। ঘুমালে শরীর বিশ্রাম পাবে, এরপর শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারবেন। এটা এমন সব জিনিস দেখার চেয়ে অনেক ভালো, যাতে কোনও উপকার তো নেই-ই বরং তা আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং ফজরের সালাতের জন্য আপনাকে অলস করে দেয়।”
❒ ৭. বাড়াবাড়ি ছাড়া শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা দেখার বিধান
প্রশ্ন: কেউ যদি কোনও প্রকার বাড়াবাড়ি বা আসক্তি ছাড়া শুধু বিনোদনের জন্য ফুটবল খেলা দেখেন তবে তার হুকুম কী?
উত্তর:
«لَا تُضَيِّعْ وَقْتَكَ فِي هَذِهِ التُّرَهَاتِ، لَا تُضَيِّعْ وَقْتَكَ فِيهَا»
“এসব অনর্থক বা বাজে কাজে নিজের সময় নষ্ট করবেন না। আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনেক দামি, তাই এসবের পেছনে সময় ব্যয় করা থেকে বিরত থাকুন।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদান: আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ)।
প্রধান হাইআতু কিবারিল উলামা (সিনিয়র স্কলার পরিষদ) এবং গ্র্যান্ড মুফতি, সৌদি আরব।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জানাজার সালাতের বিধান

 প্রশ্ন: জানাজার সালাতের বিধান কী? তা কি ফরজ নাকি সুন্নত? একজন সালাফি আলেমের মুখে শুনলাম, জানাজার সালাত সুন্নত। কিন্তু আমরা আগে থেকে যা জানি তা হলো, এটি ফরজে কেফায়াহ। কোনটি সঠিক দয়া করে জানাবেন।

উত্তর: ইসলামি ফিকহের আলোকে জানাজার সালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ফরজে কিফায়াহ’ (সামষ্টিক ফরজ ইবাদত)। অর্থাৎ এটি মুসলিম সমাজের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক দায়িত্ব। যদি সমাজের কিছু মানুষ এটি আদায় করে তবে বাকিরা দায়মুক্ত হবে। কিন্তু সবাই যদি এটি পরিত্যাগ করে তবে পুরো সমাজ গুনাহগার হবে। সুতরাং এটিকে সুন্নত বলা সঠিক নয়।
◈ হাদিসে এসেছে,
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: ((أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِجِنَازَةٍ لِيُصَلِّيَ عَلَيْهَا، فَقَالَ: هَلْ عَلَيْهِ مِنْ دَيْنٍ؟ قَالُوا: لَا، فَصَلَّى عَلَيْهِ، ثُمَّ أُتِيَ بِجِنَازَةٍ أُخْرَى، فَقَالَ: هَلْ عَلَيْهِ مِنْ دَيْنٍ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: فَصَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ. قَالَ أَبُو قَتَادَةَ: عَلَيَّ دَيْنُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَصَلَّى عَلَيْهِ)).
সালামা ইবনে আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত: নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে একটি জানাজা আনা হলো যাতে তিনি সালাত পড়বেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তার কি কোনও ঋণ আছে?”
সাহাবিগণ বললেন, “না।”
তখন তিনি তার জানাজা পড়লেন।
এরপর অন্য একটি জানাজা আনা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তার কি কোনও ঋণ আছে?”
সাহাবিগণ বললেন, “হ্যাঁ।”
তিনি বললেন, “তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো। (অর্থাৎ তিনি নিজে তার জানাজা পড়তে অস্বীকৃতি জানালেন)।
তখন আবু কাতাদা (রা.) বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! তার ঋণের দায়ভার আমার ওপর রইল।” এরপর তিনি তার জানাজা পড়লেন। [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ২২৯৫]
এখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ—صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ বা “তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো”—এটি একটি আদেশসূচক বাক্য, যা ওয়াজিব বা ফরজের দাবি রাখে। [দ্রষ্টব্য: ইমাম নওয়াবি (রহ.)-এর ‘আল মাজমু’, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১২]
◈ হাদিসে আরও এসেছে,
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ((قَدْ تُوُفِّيَ الْيَوْمَ رَجُلٌ صَالِحٌ مِنَ الْحَبَشِ، فَهَلُمَّ، فَصَلُّوا عَلَيْهِ)).
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আজ হাবাশা (ইথিওপিয়া)-এর এক নেককার ব্যক্তি (বাদশাহ নাজাশি) মৃত্যুবরণ করেছেন। অতএব চলো তার জানাজার সালাতে যাই। অতঃপর তারা তার জানাজার সালাত পড়লো। [বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৯৫২]
কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে জীবিত মানুষদের উপর আবশ্যক হল, তার গোসল, কাফন, জানাজা এবং দাফন কার্য সম্পন্ন করা। অর্থাৎ এগুলো ফরজে কেফায়াহ। কিছু সংখ্যক মুসলিম এটি সম্পন্ন করলে সকলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে।
◈ জানাজার সালাত মুসলিমদের পারস্পারিক অধিকারের মধ্যে একটি এবং তা অনেক সওয়াবের কাজ। যেমন: আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
« مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّىَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ » . قِيلَ وَمَا الْقِيرَاطَانِ قَالَ « مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ »
“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজে উপস্থিত হবে তার জন্য রয়েছে এক কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব আর যে দাফনেও উপস্থিত হবে তার জন্য দু কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, কিরাত কী? তিনি বললেন: দুটি বড় বড় পাহাড় সমপরিমাণ। “[বুখারি ও মুসলিম]
❑ আলেমদের বক্তব্য ও ফতোয়া
◆ শাইখ বিন বায (রহ.) বলেন,
صَلَاةُ الْجِنَازَةِ مَشْرُوعَةٌ لِلْجَمِيعِ، لِلرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ، وَهِيَ فَرْضُ كِفَايَةٍ، إِذَا قَامَ بِهَا وَاحِدٌ كَفَى وَأَجْزَأَتْ
“জানাজার সালাত নারী ও পুরুষ সবার জন্যই শরিয়তসম্মত এবং এটি ‘ফরজে কিফায়াহ’। যদি একজন ব্যক্তিও তা আদায় করে তবেই তা যথেষ্ট হবে।”
◆ ইসলাম ওয়েবে বলা হয়েছে,
فَصَلَاةُ الْجِنَازَةِ فَرْضٌ عَلَى الْكِفَايَةِ عِنْدَ جُمْهُورِ الْعُلَمَاءِ مِنَ الْحَنَفِيَّةِ وَالشَّافِعِيَّةِ وَالْحَنَابِلَةِ، وَاخْتُلِفَ فِيهَا قَوْلُ الْمَالِكِيَّةِ، وَالْمَشْهُورُ عِنْدَهُمْ كَمَذْهَبِ الْجُمْهُورِ. وَفَرْضُ الْكِفَايَةِ كَمَا قَالَ عَنْهُ صَاحِبُ الْمُوَافَقَاتِ: مُتَوَجِّهٌ عَلَى الْجَمِيعِ، لَكِنْ إِذَا قَامَ بِهِ بَعْضُهُمْ سَقَطَ عَنِ الْبَاقِينَ. ا.هـ
“হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে জানাজার সালাত ‘ফরজে কিফায়াহ’। মালিকি মাজহাবে এ নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মতটি জুমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতেরই অনুরূপ। ‘আল মুয়াফাকাত’ কিতাবে বলা হয়েছে, ‘এটা এমন একটি দায়িত্ব যা সবার ওপরই বর্তায়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক যদি তা পালন করে তবে বাকিদের ওপর থেকে দায়িত্বটি নেমে যায়।'” [ইসলাম ওয়েব, ফতোয়া নম্বর: ১১৩৮৮]
◆ ইমাম ইবনে হাজম, ইমাম নওয়াবি, ইবনুল মুলাক্কিন এবং কামাল ইবনুল হুমাম (রহ.) এ বিষয়ে ইজমা বা সর্বসম্মত মত উল্লেখ করেছেন। [সূত্র: আদ দুরারুস সানিয়াহ-ওয়েব সাইট]
মোটকথা, জানাজার সালাত ‘ফরজে কিফায়াহ’। অর্থাৎ মুসলিমদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক মানুষ যদি জানাজার সালাত আদায় করে নেয় তবে বাকিদের ওপর থেকে দায়িত্বটি নেমে যাবে বা তারা তাদের ওপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। কিন্তু শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়া যদি এলাকার সবাই মিলে এটি পরিত্যাগ করে তবে ওই এলাকার সকল মুসলিম গুনাহগার হবে। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Tuesday, July 14, 2026

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে সাহাবিদের অবস্থান

 মূল: শাইখ ড. সুলতান ইবনে আবদুর রহমান আল উমাইরি।

(ডক্টরেট: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
সম্ভবত সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)হলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে। তাঁকে নিয়ে মতামত ভিন্ন হয়েছে, তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চলেছে। দুটি চরম পক্ষ তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ তাঁর প্রতি ভালোবাসায় ও সমর্থনে বাড়াবাড়ি করেছে। অন্য পক্ষ তাঁর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি তাঁকে কাফির ও মুনাফিক পর্যন্ত বলেছে! এই দুটি চরমপন্থী পক্ষ ইসলামি ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসবিদ ইমাম জাহাবি শান্ত ও বিচক্ষণভাবে এই দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
“وخلْفَ مُعاويةَ خَلْقٌ كثيرٌ يُحبِّونَه ويَتغالَوْن فيه ويُفضِّلونه، إمَّا قد ملَكَهم بالكَرَمِ والحِلمِ والعَطاءِ، وإمَّا قد وُلِدوا في الشَّامِ على حُبِّه، وتَربَّى أولادُهم على ذلك. وفيهم جَماعةٌ يَسيرةٌ من الصحابةِ، وعدَدٌ كثيرٌ من التابعين والفُضَلاءِ، وحارَبوا معه أهلَ العِراقِ، ونَشَؤوا على النَّصْبِ، نعوذُ باللهِ من الهَوى، كما قد نشَأَ جيشُ عليٍّ رضيَ اللهُ عنه ورعِيَّتُه -إلا الخَوارجَ منهم- على حُبِّه والقيامِ معه، وبُغضِ مَن بغى عليه والتبرِّي منهم، وغَلا خلقٌ منهم في التشيُّعِ”
“মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পেছনেও এক বিশাল জনসমষ্টি ছিল যারা তাঁকে ভালোবাসত, তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি রাখত এবং তাঁকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিত। এর কারণ ছিল, হয় তিনি তাঁর অসীম উদারতা, সহনশীলতা ও দানশীলতা দিয়ে তাদের মন জয় করেছিলেন অথবা তারা সিরিয়াতে তাঁর শাসনের ছায়াতলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তাদের সন্তানরাও সেভাবেই বড় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অল্প কিছু সাহাবি এবং বিপুল সংখ্যক তাবেয়ি ও পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে থেকে ইরাকবাসীদের (আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে একদল মানুষ ‘নাসবি’ [আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী] হিসেবে গড়ে উঠেছিল। (আমরা প্রবৃত্তি বা আবেগের তাড়না থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।) ঠিক একইভাবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাহিনী এবং তাঁর অনুসারীরাও—একমাত্র খারেজিরা ছাড়া—তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। যারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল তাঁদের প্রতি ঘৃণা ও সম্পর্কহীনতা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁদের মধ্য থেকে একদল মানুষ চরমপন্থী শিয়া (ভক্তি ও আনুগত্যে সীমা লঙ্ঘনকারী) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৩/১২৮-১২৯] মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে অতিভক্তিতে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে জাল হাদিস তৈরির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই নিকৃষ্ট অপকৌশল হাদিস বিশারদগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং অন্যদের সতর্ক করেছেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শানে বর্ণিত হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করে সহিহ ও জইফ (দুর্বল) বর্ণনাগুলোকে পৃথক করে দিয়েছেন।
এই বিষয়ে সতর্ক করে ইবনুল জাওজি (রাহ.) বলেন:
“قد تعصَّبَ قومٌ ممَّن يَدَّعي السُّنَّةَ، فوضَعوا في فضلِه أحاديثَ ليُغضِبوا الرافضةَ، وتعصَّبَ قومٌ من الرافضةِ، فوضَعوا في ذَمِّه أحاديثَ، وكِلَا الفريقينِ على الخطَأِ القبيحِ”
“সুন্নাহর অনুসারী দাবিদার একদল লোক গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয়ে তাঁর (মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রশংসায় কিছু হাদিস জাল করেছে, যাতে শিয়া-রাফেজিদের (চরমপন্থী শিয়া) ক্রোধান্বিত করা যায়। অন্যদিকে শিয়া-রাফেজিদের একটি দল তাঁর নিন্দায় কিছু হাদিস জাল করেছে। অথচ এই উভয় পক্ষই জঘন্য ভুলের ওপর রয়েছে।” [কিতাবুল মাওযুআত, ইবনুল জাওযী (২/২৪)] মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সংক্রান্ত এই মিথ্যার জাল ও বিকৃতি কেবল হাদিসের কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন, গল্প এবং সাহিত্যের কিতাবগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একজন পাঠক যখন এসব কিতাব পড়েন তখন তিনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ পরস্পরবিরোধী তথ্যের সম্মুখীন হন। এর একদিকে রয়েছে তাঁর অতিভক্তদের তৈরি করা অতিরঞ্জিত প্রশংসা, আর অন্যদিকে রয়েছে তাঁর চরম বিদ্বেষীদের উদ্ভাবিত নিন্দা ও কুৎসা।
❑ এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়:
একজন গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চরম সতর্কতার সাথে গবেষণায় নামা। এই মানসিকতা তাকে এমনভাবে তৈরি করবে যেন কোনো তথ্যই তিনি যাচাই না করে গ্রহণ করবেন না এবং সেই তথ্যের প্রাসঙ্গিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবেন-যাতে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি একটি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কোনো গবেষকের পক্ষেই সতর্কতা অবলম্বন না করে এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো অবস্থান নেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বা পদ্ধতিগত কোনোভাবেই সঠিক নয়। এই নীতি শুধু মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় বরং এটি একটি সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক নীতি যা অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অ্যারিস্টটল—যাঁকে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে বা মার্টিন লুথার—যাঁকে নিয়েও তীব্র মতভেদ রয়েছে—তাঁদের সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগেও একজন গবেষকের জন্য গবেষণায় সতর্ক থাকা, বর্ণনার সত্যতা ও সকল তথ্যের সঠিক অর্থ নিশ্চিত করা আবশ্যক—যাতে একটি ন্যায্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।
যদিও এই নিয়মটি সবার জন্যই প্রযোজ্য তবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ, তাঁদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান এবং তাঁরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহচর্য ও সান্নিধ্য পেয়েছেন। এমন অনেক নসুস (দলিল), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যা প্রমাণ করে যে—তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার একটি গবেষণাপত্রে, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে “সাহাবি প্রজন্মের ইতিহাস পর্যালোচনার পদ্ধতিগত রূপরেখা” (المَدخلُ المنهجيُّ للتعاملِ مع جيلِ الصحابةِ) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।” এসব শরয়ি প্রশংসা এবং যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক এসব তথ্যের কারণেই মুমিনদের হৃদয়ে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এক বিশাল মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান অত্যন্ত গভীর। মুসলিম উম্মাহ সবসময় তাঁদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ এবং তাঁদের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র রাখার নীতি অনুসরণ করে থাকে—যতক্ষণ না এর বিপরীতে অত্যন্ত জোরালো ও অকাট্য কোনো দলিল পাওয়া যায়। এই কারণেই সাহাবিগণের জীবন ও তাঁদের পারস্পরিক বিবাদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞান, ইনসাফ, সতর্কতা, নিশ্চিত যাচাই-বাছাই এবং পরিষ্কার হৃদয় ছাড়া এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা আলোচনায় লিপ্ত হওয়া মোটেও বৈধ নয়। এই তথ্য ও উপাত্তগুলোই হলো সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ভিত্তি করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের উলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)এর মধ্যকার পারস্পরিক মতভেদ ও বিবাদ নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করার (অর্থাৎ সমালোচনা না করার) মত প্রদান করেছেন। তাঁদের এই রায় কেবল যুক্তিহীন কোনো দাবি নয় বরং এটি শরয়ি, ঐতিহাসিক এবং যৌক্তিক দলিলের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা সাহাবিগণের মর্যাদা, তাঁদের সুউচ্চ স্থান এবং তাঁদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও সততার প্রমাণ দেয়। পূর্বের আলোচনা এটিই নিশ্চিত করে যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি আরও জোরালো ও উচ্চতর হওয়া উচিত।
◈ এর প্রথম কারণ হলো—তিনি একজন সাহাবি (রা.)।
◈ দ্বিতীয়ত কারণ—তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র।
এই পরিস্থিতিই তাঁর ক্ষেত্রে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ও কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করাকে অপরিহার্য করে তোলে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে সেই ‘চরম সতর্কতা’র নিয়মটি মেনে চলেনি। তাঁরা হয় তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখিয়েছে অথবা অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভুল করেছে। তাঁরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কুৎসা সম্বলিত বিভিন্ন গল্প ও সংবাদের ওপর নির্ভর করেছে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তাঁর ব্যাপারে অন্যায্য ও জুলুমপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: উসমান (রা.)-এর যুগে মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ভারতে মূর্তি বিক্রি করতেন কিংবা তিনি মদ্যপান করতেন—এই জাতীয় বিভিন্ন অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হয় যে, অনেক আলেম তাঁদের হাদিস বা ইতিহাসের কিতাবে এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। অথচ আমরা সবাই জানি, ইতিহাস বা সংবাদের কিতাবে যা কিছু উল্লেখ করা হয় তার সবই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তাতে প্রচুর দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে। [এই সংবাদগুলোর দুর্বলতা প্রমাণের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ‘সাল্লুস সিনান ফিয যাব্বি আন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান’ (মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সপক্ষে বর্শা চালনা বা প্রতিরক্ষা” [অর্থাৎ তাঁর সম্মান রক্ষায় লেখনীর মাধ্যমে জোরালো প্রতিবাদ]। লেখক: সাদ আস সুবাইয়ী (পৃষ্ঠা: ১৯৭-ডিজিটাল সংস্করণ] এর বাইরেও আমরা যদি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় বর্ণিত সংবাদগুলো পরীক্ষা করি তবে দেখতে পাব যে, এগুলোর সনদ বা সূত্রগুলো বাতিল এবং এগুলোতে এমন সব ‘ইলাল’ বা হাদিসতাত্ত্বিক ত্রুটি রয়েছে যা এগুলোর অসারতা প্রমাণ করে। উপরন্তু এই বর্ণনাগুলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর ফজিলত বা মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলোর বিরোধী এবং সেইসব যৌক্তিক প্রমাণেরও পরিপন্থী যা এই গবেষণার সামনে আসবে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই শিথিলতা আমাদের এমন সব ভুল পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে যা বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতির বিরোধী। কারণ, এই শিথিলতা একদিকে যেমন মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে অতি ভক্তি পোষণকারীদের সামনে দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে এমন সব ফজিলত প্রমাণের পথ খুলে দেবে যা প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত নয়—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে যেমন শিথিলতা দেখানো সঠিক নয়। তেমনি তাঁর ফজিলত প্রমাণের ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখানো জায়েজ নয়।
অন্যদিকে, এটি আলি বিন আবু তালিব (রা.)বা অন্যান্য সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের জন্যও সুযোগ করে দেবে, যাতে তারা অনির্ভরযোগ্য ও অপ্রমাণিত বর্ণনা দিয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের নামে কুৎসা রটাতে পারে। সঠিক ও পদ্ধতিগত পথ হলো—সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে ‘চরম সতর্কতা’র নীতি বজায় রাখা, বিশেষ করে যাঁদের নিয়ে বিতর্ক বা মতভেদ রয়েছে। আমরা তাঁদের জন্য এমন কোনো ফজিলত প্রমাণ করব না যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। আবার তাঁদের প্রতি এমন কোনো নিন্দাও আরোপ করব না যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। এসব বিষয় এটাই প্রমাণ করে যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় যারা শিথিলতা দেখায় বা বাড়াবাড়ি করে, তাদের মূল সমস্যা বিক্ষিপ্ত কোনো উদাহরণ বা তথ্যের মধ্যে নয়; বরং সমস্যাটি তাদের চিন্তাধারা ও ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতির মূলে। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইতিহাস পর্যালোচনায় আমাদের কেবল তথ্যের পাহাড় জমানোর প্রয়োজন নেই বরং প্রয়োজন হলো কোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখা। সেই সাথে যে ভুল পথগুলো মানুষকে ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করে, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা।

কবরস্থানে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করার বিধান

 প্রশ্ন: কবরস্থানে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করার বিধান কী? এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া কি?

উত্তর: আমাদের সমাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ঈদ, জানাজা ও দাফনের পর, রোজার ইফতারের পূর্বে কিংবা বাড়ি, দোকান ইত্যাদি যেকোনো শুভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে, বিয়ে অনুষ্ঠানে, এমনকি সিনেমার মহরত অনুষ্ঠানেও সম্মিলিত দুআ-মোনাজাত করার যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে। অথচ তার পক্ষে পবিত্র কুরআন, সহিহ সুন্নাহ, সাহাবি ও তাবেয়িগণের আমল কিংবা চার মাজহাবের ইমামগণের কারো থেকে এই প্রথার বৈধতার সপক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা বা এমন কোনও আমলকে ইবাদত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবিগণ করেননি তা নিঃসন্দেহে বিদআত বা নবসৃষ্ট। ইসলামে দ্বীনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নতুন প্রথা চালুর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি তার কঠিন পরিণতির কথা বলা হয়েছে। যেমন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ”
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনও এমন বিষয় সৃষ্টি করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৮]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুতবা বা বিভিন্ন বক্তব্যের শুরুতে বলতেন,
“فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ”
“সবচেয়ে উত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব সৃষ্ট বিষয়সমূহ (বিদআত)। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৭] অন্য বর্ণনায় আছে, “প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।”
নিম্নে আমাদের সমাজে প্রচলিত দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বা কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দলবল সহ সম্মিলিত দুআ-মুনাজাত সম্পর্কে কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:
❑ ১. আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.):
প্রশ্ন: দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে দোয়া করার হুকুম কী?
উত্তর:
الدُّعَاءُ الْجَمَاعِيُّ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ دَفْنِهِ بِدْعَةٌ؛ لِأَنَّ الرَّسُولَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ يَدْعُو بِأَصْحَابِهِ، بَلْ يَقُولُ: «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ».
وَأَمَّا أَنْ يَبْقَوْا مَثَلًا جَمِيعًا ثُمَّ يَدْعُوَ بِهِمْ وَاحِدٌ وَيُؤَمِّنُوا عَلَيْهِ فَهَذَا لَمْ تَأْتِ بِهِ السُّنَّةُ. نَعَمْ.
“দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিত দোয়া করা একটি বিদআত। কারণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে (এভাবে) দোয়া করতেন না। বরং তিনি বলতেন:
«اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ
“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য (প্রশ্নোত্তরের সময়) অবিচল থাকার দোয়া করো।”
কিন্তু উদাহরণ স্বরপ সকলে মিলে দাঁড়িয়ে থাকবে, এরপর একজন দোয়া করবে আর অন্যরা তার দোয়ার ওপর ‘আমিন’ ’আমিন’ বলবে—এমনটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।” [সূত্র: alathar]
❑ ২. আল্লামা শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.)
মাইয়েতকে দাফনের পর তার জন্য দোয়া করা কি দলবদ্ধভাবে হবে নাকি ব্যক্তিগতভাবে?
প্রশ্নকারী: হাদিসে এসেছে, «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَاسْأَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ» “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য অবিচলতা (কবরের প্রশ্নোত্তের সময় ইমানের ওপর স্থির থাকা)-এর দোয়া করো।” নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই নির্দেশটি কি এমন যে, সবাই মিলে করবে—অর্থাৎ একজন দোয়া করবে আর বাকিরা তাতে ‘আমিন’ বলবে—নাকি প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে দোঊ করবে?
উত্তর:
لَا، كُلٌّ لِحَالِهِ
“না, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দুআ করবে।”
❑ ৩. শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে দোয়া করার বিধান
প্রশ্ন: কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে মাইয়েতের (মৃত ব্যক্তির) জন্য দোয়া করা এবং উপস্থিত অন্যরা সেই দোয়ার সাথে সম্মিলিতভাবে ‘আমিন’ বলা—এর বিধান কী?
উত্তর:
هَذَا السُّنَّةُ؛ إِذَا زَارَ الْمَيِّتَ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ، أَنْ يَدْعُوَ لَهُ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرَّحْمَةِ، وَكُلٌّ يَدْعُو لَهُ، وَلَا يَدْعُونَ بِصَوْتٍ جَمَاعِيٍّ، أَوْ يَدْعُوَ وَاحِدٌ وَالْبَقِيَّةُ يُؤَمِّنُونَ عَلَى ذَلِكَ؛ لِأَنَّ هَذَا الشَّيْءَ لَمْ يَرِدْ، لَكِنَّ كُلَّ وَاحِدٍ يَدْعُو لِلْمَيِّتِ بِمُفْرَدِهِ.
“এটি সুন্নাহসম্মত নয় বা এর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুন্নাহ হল, কেউ যখন কবর জিয়ারত করতে যায় এবং সালাম দেয় তখন সে মাইয়েতের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করবে। তবে এই দোয়া কোনও দলবদ্ধ রূপ নেবে না, এমনকি একজনের দোয়ায় বাকিরা ‘আমিন’ও বলবে না। বরং নিয়ম হল, প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে একা একাই মাইয়েতের জন্য দোয়া করবে। দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে দোয়া করা বা একজনের দোয়ায় অন্যদের আমিন বলার কোনও প্রমাণ নেই;। তাই প্রত্যেকে আলাদাভাবে মাইয়েতের জন্য দোয়া করাই সঠিক পদ্ধতি।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল বিদআত থেকে বেঁচে থাকার এবং সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate