Thursday, July 23, 2026

ঘুষের সংজ্ঞা এবং ঘুষ আদান-প্রদানের বিধান

 প্রশ্ন: ঘুষের সংজ্ঞা কি? শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুষ আদান-প্রদানের বিধান কি? কোনো পরিস্থিতিতে ঘুষ প্রদান করা জায়েজ?

▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সাধারণ ভাবে ঘুষ হলো—কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নিজের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জন, অধিকারবহির্ভূত সুবিধা লাভ, অথবা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিজের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রভাবিত করার জন্য অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা প্রদান করা।আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’-এ ঘুষের সংজ্ঞা এভাবে এসেছে—الرشوة هي ما يدفعه الإنسان ليأخذ ما ليس من حقه، أو ليتهرب بها من حق عليه.অর্থাৎ, “কোন ব্যক্তি তার প্রাপ্য নয় এমন কিছু অর্জন করার জন্য অথবা তার ওপর অর্পিত কোনো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি লাভের উদ্দেশ্যে যা কিছু প্রদান করে, তাই ঘুষ।”[আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ, ৫/৩৬২] এ সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঘুষ কেবল অর্থ বা সম্পদ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যায্য সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ উপকার করা, মূল্যবান উপহার দেওয়া, বিশেষ সেবা প্রদান করা বা অন্য যেকোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া—এসবও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।অর্থাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে অর্থ, উপহার, বিশেষ সেবা কিংবা অন্য কোনো সুবিধা দিয়ে যদি অন্যায়ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা অর্জন করা হয় অথবা তার দায়িত্ব পালনে প্রভাব বিস্তার করা হয়, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে।যদিও কিছু আলেম ঘুষকে “অন্যের অধিকার নষ্ট করে অন্যায়ভাবে কোনো সুবিধা বা অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে অর্থ বা অন্য কোনো বিনিময় প্রদান”—এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তবে ‘আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’-এর সংজ্ঞাটি অধিক ব্যাপক ও সর্বসম্মত অর্থ প্রকাশ করে। এটি শুধু অন্যের অধিকার হরণ নয়; বরং নিজের ওপর বর্তানো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রদত্ত সব ধরনের অবৈধ বিনিময়কেও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
.
ঘুসের সংজ্ঞায় ইমাম ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الرِّشْوة والرُّشْوة: الوُصلة إلى الحاجة بالمُصانعة. وأصله من الرِشاء الذي يُتَوصَّل به إلى الماء. فالراشي مَن يُعطِي الذي يُعِينه على الباطل. والمُرْتَشِي الآخِذُ. والرائِش الذي يسْعى بينهما يَسْتزيد لهذا ويَسْتنقِص لهذا.”রিশওয়াহ অর্থাৎ ঘুস বলতে বোঝায় কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য তোষামোদ বা অবৈধ উপায় অবলম্বন করা। এর মূল শব্দ রিশা, যার অর্থ সেই দড়ি যার মাধ্যমে কূপ থেকে পানি তোলা হয়। রাশি হলো সেই ব্যক্তি, যে অন্যায় কাজে সহযোগিতা লাভের জন্য অর্থ দেয়। মুরতাশি হলো যে সেই অর্থ গ্রহণ করে। আর রায়িশ হলো সেই মধ্যস্থতাকারী, যে উভয়ের মধ্যে দালালি করে, এক পক্ষের কাছ থেকে বেশি আদায় করে এবং অন্য পক্ষকে কম দেওয়ার চেষ্টা করে…..(আন নিহায়াহ ফি গরীবিল হাদীস;২/২২৬)
.
◽শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুস আদান-প্রদানের বিধান:
.
ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘুসের লেনদেন সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি কবিরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা ঘুস মানুষের অধিকার নষ্ট করে, যুলুম ও অবিচারের পথ সুগম করে এবং সমাজে দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থপরতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। তাই ইসলাম সর্বপ্রকার ঘুষের লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এ মর্মে মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে এরশাদ করেন-لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَ تُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ”আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ কর না এবং জানা সত্ত্বেও অসৎ উপায়ে মানুষের সম্পদ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের নিকট (ঘুষ দেয়ার জন্য) নিয়ে যেও না”।(সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৮)।হাদিসে এসেছে,আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন:لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।[মুসনাদে আহমদ হা/৬৭৯১; ও আবু দাউদ হা/৩৫৮০; শাইখ আলবানী ইরওয়াউল গালীল বইয়ে (২৬২১) এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন] অত্র হাদীসে স্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে, ঘুষ আদান-প্রদান অভিশাপের কারণ। যে ঘুষ প্রদান করবে, আর যে তা গ্রহণ করবে উভয়ের উপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা‘নত করেছেন। অভিশাপকৃত কর্ম বা অভিশপ্ত ব্যক্তির মধ্যে কোন কল্যাণ থাকতে পারে না। অন্য হাদিসে এসেছে, আবূ উমামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করল এবং সেই সুপারিশের প্রতিদান স্বরূপ তাকে কিছু উপহার দিল। যদি সে তা গ্রহণ করে তাহলে সে সূদের দরজাসমূহের একটি বড় দরজায় উপস্থিত হল”।(আবূ দাঊদ, হা/৩৫৪১; সিলসিলা সহীহাহ হা/৩৪৬৫; মিশকাত, হা/৩৭৫৭)
.
◽কোন কোন পরিস্থিতিতে ঘুস প্রদান জায়েজ হতে পারে?
ইসলামে ঘুস (রিশওয়াহ) দেওয়া ও নেওয়া—উভয়ই মূলত হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ওপর লানত করেছেন। তবে আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের ন্যায্য ও অপরিহার্য অধিকার আদায় করতে, অথবা অন্যায়-জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয় এবং ঘুষ প্রদান ছাড়া তার সামনে আর কোনো কার্যকর ও বৈধ উপায় না থাকে, তাহলে এমন চরম বাধ্যতামূলক অবস্থায় ঘুষ দেওয়ার অবকাশ (রুখসত) রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঘুষদাতা গুনাহগার হবে না; বরং সম্পূর্ণ গুনাহ বর্তাবে সেই ব্যক্তির ওপর, যে অন্যায়ভাবে ঘুষ গ্রহণ করেছে। যেমন—কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি বৈধ কাগজপত্র, লাইসেন্স বা প্রাপ্য সেবা দেওয়ার জন্য বেআইনিভাবে অর্থ দাবি করলে, অন্যায় আটক, নির্যাতন বা জুলুম থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে অর্থ দিতে হলে, কিংবা নিজের বৈধ সম্পদ বা ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার অন্য কোনো বাস্তবসম্মত উপায় না থাকলে—এসব ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করলে তা ঘুষদাতার জন্য ক্ষমাযোগ্য হবে; তবে ঘুষ গ্রহণকারীর জন্য তা সর্বাবস্থায় হারাম এবং সে-ই গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে, অন্যায় সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে ঘুষ দেওয়া কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়। যেমন—অন্যের অধিকার নষ্ট করে চাকরি লাভ, টেন্ডার বা চুক্তি অন্যায়ভাবে নিজের নামে নেওয়া, আদালত বা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অবৈধভাবে নিজের অনুকূলে আনা, পরীক্ষায় প্রতারণার মাধ্যমে পাস করা, অবৈধভাবে লাইসেন্স বা সনদ অর্জন করা,অথবা বৈধ বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ঘুষের পথ বেছে নেয়,কিংবা কোনো হারাম বা বেআইনি কাজের অনুমতি নেওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া—উভয়ই নিঃসন্দেহে হারাম। সুতরাং ইসলামের মূলনীতি হলো, অন্যায় সুবিধা লাভের জন্য ঘুষ সর্বাবস্থায় হারাম; তবে একান্ত বাধ্য হয়ে নিজের ন্যায্য অধিকার উদ্ধার করা বা জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হলে তার গুনাহ ঘুষগ্রহীতার ওপর বর্তাবে, ঘুষদাতার ওপর নয়। এ মতটি ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম হাসান আল-বাসরীসহ বহু প্রখ্যাত আলেম সমর্থন করেছেন। তারা এ বিষয়ে ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর হাদীস দ্বারা দলিল প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:”(إِنَّ أَحَدَهُمْ لَيَسْأَلُنِي الْمَسْأَلَةَ فَأُعْطِيهَا إِيَّاهُ فَيَخْرُجُ بِهَا مُتَأَبِّطُهَا ، وَمَا هِيَ لَهُمْ إِلا نَارٌ ، قَالَ عُمَرُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، فَلِمَ تُعْطِيهِمْ ؟ قَالَ : إِنَّهُمْ يَأْبَوْنَ إِلا أَنْ يَسْأَلُونِي ، وَيَأْبَى اللَّهُ لِي الْبُخْلَ) “তাদের কেউ কেউ আমার কাছে কিছু চায়। আমি তাকে তা দিয়ে দিই। অথচ সে তা বগলে নিয়ে বের হয়, কিন্তু বাস্তবে তা তার জন্য আগুন ছাড়া আর কিছু নয়।উমার (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে আপনি তাদের দেন কেন? তিনি বললেন, তারা চাওয়া ছাড়া মানে না, আর আল্লাহ আমার জন্য কৃপণতা পছন্দ করেন না।”(মুসনাদে আহমেদ হা/১০৭৩৯;সহিহ আত তারগীব হা/৮৪৪) অর্থাৎ,নবী (ﷺ) জানতেন যে তাদের জন্য এ সম্পদ গ্রহণ করা হারাম। তবুও তিনি তাদের দিতেন, যাতে কৃপণতার অপবাদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।এ হাদীস থেকে আলেমগণ বুঝিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের জবরদস্তি বা অনৈতিক দাবির কারণে বাধ্য হয়ে কিছু দিতে বাধ্য হয়, তবে সেই দেওয়ার গুনাহ তার ওপর নয়; বরং প্রকৃত গুনাহগার সেই ব্যক্তি, যে অন্যায়ভাবে তা গ্রহণ করেছে। তাই মুসলিমের কর্তব্য হলো, সর্বাবস্থায় ঘুষ থেকে বেঁচে থাকা; তবে একান্ত নিরুপায় অবস্থায় নিজের ন্যায্য অধিকার উদ্ধার বা জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করলে তার জন্য শরীয়তে অবকাশ রয়েছে, যদিও ঘুষ গ্রহণকারীর জন্য তা সর্বদাই হারাম ও গুরুতর পাপ।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” فأما إذا أهدى له هدية ليكف ظلمه عنه أو ليعطيه حقه الواجب كانت هذه الهدية حراما على الآخذ , وجاز للدافع أن يدفعها إليه , كما كان النبي صلى الله عليه وسلم يقول : ( إني لأعطي أحدهم العطية …الحديث )”কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কর্মকর্তাকে এই উদ্দেশ্যে উপহার দেয়, যেন সে তার ওপর থেকে জুলুম প্রতিহত করে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার তাকে বুঝিয়ে দেয়, তাহলে এই উপহার (ঘুস) গ্রহণ করা কর্মকর্তার জন্য হারাম হবে; কিন্তু প্রদানকারীর জন্য তা প্রদান করা জায়েজ।এর প্রমাণ নবী ﷺ-এর উক্তি: ‘আমি তো কখনো কখনো কাউকে কোনো দান দিয়ে থাকি… (হাদীস)’।”(আল-ফাতাওয়াল কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৭৪)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:قَالَ الْعُلَمَاءُ : يَجُوزُ رِشْوَةُ الْعَامِلِ لِدَفْعِ الظُّلْمِ لا لِمَنْعِ الْحَقِّ ، وَإِرْشَاؤُهُ حَرَامٌ فِيهِمَا ( يعني : أخذه للرشوة حرام ) . . .وَمِنْ ذَلِكَ : لَوْ أَعْطَى الرَّجُلُ شَاعِرًا أَوْ غَيْرَ شَاعِرٍ ; لِئَلا يَكْذِبَ عَلَيْهِ بِهَجْوٍ أَوْ غَيْرِهِ ، أَوْ لِئَلا يَقُولَ فِي عِرْضِهِ مَا يَحْرُمُ عَلَيْهِ قَوْلُهُ كَانَ بَذْلُهُ لِذَلِكَ جَائِزًا وَكَانَ مَا أَخَذَهُ ذَلِكَ لِئَلا يَظْلِمَهُ حَرَامًا عَلَيْهِ ; لأَنَّهُ يَجِبُ عَلَيْهِ تَرْكُ ظُلْمِهِ . . .فَكُلُّ مَنْ أَخَذَ الْمَالَ لِئَلا يَكْذِبَ عَلَى النَّاسِ أَوْ لِئَلا يَظْلِمَهُمْ كَانَ ذَلِكَ خَبِيثًا سُحْتًا ; لأَنَّ الظُّلْمَ وَالْكَذِبَ حَرَامٌ عَلَيْهِ فَعَلَيْهِ أَنْ يَتْرُكَهُ بِلا عِوَضٍ يَأْخُذُهُ مِنْ الْمَظْلُومِ فَإِذَا لَمْ يَتْرُكْهُ إلا بِالْعِوَضِ كَانَ سُحْتًا “আলেমগণ বলেছেন: জুলুম প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকর্তাকে অর্থ (ঘুস) প্রদান করা বৈধ,কিন্তু অন্যের হক নষ্ট করার জন্য ঘুষ দেওয়া বৈধ নয়। অবশ্য উভয় অবস্থাতেই গ্রহীতার জন্য তা গ্রহণ করা হারাম। (অর্থাৎ, তার জন্য ঘুষ নেওয়া নাজায়েজ)।এর একটি দৃষ্টান্ত হলো: কোনো ব্যক্তি যদি একজন কবি বা অন্য কাউকে এই উদ্দেশ্যে অর্থ দেয়, যাতে সে তার নামে মিথ্যা বা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে কুৎসা রটনা না করে, অথবা তার সম্মানহানি করে এমন কোনো কথা না বলে যা বলা তার জন্য হারাম—তবে দাতার জন্য এমন অর্থ (ঘুস) প্রদান করা জায়েজ। কিন্তু গ্রহীতা যে অর্থ গ্রহণ করল, তা তার জন্য হারাম।কারণ তার তো এমনিতেই জুলুম ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা ফরজ ছিল।অতএব, যে ব্যক্তি মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা বা তাদের ওপর জুলুম না করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করে, তার এ অর্থ নিকৃষ্ট ও হারাম।কারণ জুলুম ও মিথ্যা বলা তার ওপর সর্বাবস্থায় হারাম। তাই কোনো ধরনের বিনিময় বা প্রতিদান ছাড়াই তা পরিত্যাগ করা তার দায়িত্ব। কিন্তু সে যদি বিনিময় বা মূল্য ছাড়া জুলুম করা থেকে বিরত না থাকে, তবে তার গৃহিত সেই অর্থ হারাম হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৫২)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:قَالَ الْعُلَمَاءُ : إنَّ مَنْ أَهْدَى هَدِيَّةً لِوَلِيِّ أَمْرٍ لِيَفْعَلَ مَعَهُ مَا لا يَجُوزُ كَانَ حَرَامًا عَلَى الْمَهْدِيِّ وَالْمُهْدَى إلَيْهِ . وَهَذِهِ مِنْ الرَّشْوَةِ الَّتِي قَالَ فِيهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : ( لَعَنَ اللَّهُ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي ) .فَأَمَّا إذَا أَهْدَى لَهُ هَدِيَّةً لِيَكُفَّ ظُلْمَهُ عَنْهُ أَوْ لِيُعْطِيَهُ حَقَّهُ الْوَاجِبَ : كَانَتْ هَذِهِ الْهَدِيَّةُ حَرَامًا عَلَى الآخِذِ وَجَازَ لِلدَّافِعِ أَنْ يَدْفَعَهَا إلَيْهِ كَمَا ، كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : ( إنِّي لأُعْطِي أَحَدَهُمْ الْعَطِيَّةَ فَيَخْرُجُ بِهَا يَتَأَبَّطُهَا نَارًا . قِيلَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ فَلِمَ تُعْطِيهِمْ ، قَالَ : يَأْبَوْنَ إلا أَنْ يَسْأَلُونِي ، وَيَأْبَى اللَّهُ لِي الْبُخْلَ ) .وَمِثْلُ ذَلِكَ : إعْطَاءُ مَنْ كَانَ ظَالِمًا لِلنَّاسِ ، فَإِعْطَاءُه جَائِزٌ لِلْمُعْطِي ، حَرَامٌ عَلَيْهِ أَخْذُهُ .وَأَمَّا الْهَدِيَّةُ فِي الشَّفَاعَةِ : مِثْلُ أَنْ يَشْفَعَ لِرَجُلِ عِنْدَ وَلِيِّ أَمْرٍ لِيَرْفَعَ عَنْهُ مَظْلِمَةً أَوْ يُوَصِّلَ إلَيْهِ حَقَّهُ أَوْ يُوَلِّيَهُ وِلَايَةً يَسْتَحِقُّهَا أَوْ يَسْتَخْدِمُهُ فِي الْجُنْدِ الْمُقَاتِلَةِ – وَهُوَ مُسْتَحِقٌّ لِذَلِكَ – أَوْ يُعْطِيَهُ مِنْ الْمَالِ الْمَوْقُوفِ عَلَى الْفُقَرَاءِ أَوْ الْفُقَهَاءِ أَوْ الْقُرَّاءِ أَوْ النُّسَّاكِ أَوْ غَيْرِهِمْ – وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الِاسْتِحْقَاقِ . وَنَحْوَ هَذِهِ الشَّفَاعَةِ الَّتِي فِيهَا إعَانَةٌ عَلَى فِعْلٍ وَاجِبٍ أَوْ تَرْكُ مُحَرَّمٍ : فَهَذِهِ أَيْضًا لا يَجُوزُ فِيهَا قَبُولُ الْهَدِيَّةِ وَيَجُوزُ لِلْمهْدِي أَنْ يَبْذُلَ فِي ذَلِكَ مَا يَتَوَصَّلُ بِهِ إلَى أَخْذِ حَقِّهِ أَوْ دَفْعِ الظُّلْمِ عَنْهُ . هَذَا هُوَ الْمَنْقُولُ عَنْ السَّلَفِ وَالأَئِمَّةِ الأَكَابِرِ”আলেমগণ বলেছেন: যদি কেউ কোনো শাসক, কর্মকর্তা বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে এমন উদ্দেশ্যে উপহার (ঘুস) দেয় যে, তিনি তার জন্য এমন কোনো কাজ করবেন যা শরীয়তসম্মত নয়, তাহলে এই উপহার দেওয়া ও গ্রহণ উভয়ই হারাম। এটাই সেই ঘুষ, যার সম্পর্কে নবী ﷺ বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত করেছেন।কিন্তু যদি কেউ তাকে উপহার দেয়, যাতে সে তার ওপর থেকে জুলুম বন্ধ করে, অথবা তার ন্যায্য অধিকার তাকে প্রদান করে, তাহলে এই উপহার গ্রহণ করা গ্রহণকারীর জন্য হারাম; তবে প্রদানকারীর জন্য তা দেওয়া বৈধ। এ প্রসঙ্গে নবী সা. বলেছেন:আমি কখনো কাউকে কিছু দান করি, অথচ সে তা বগলদাবা করে আগুন (জাহান্নামের শাস্তি) নিয়ে চলে যায়। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আপনি তাদের দেন কেন? তিনি বললেন, তারা না চেয়ে থাকে না, আর আল্লাহ আমার জন্য কৃপণতা পছন্দ করেন না।অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি মানুষের ওপর জুলুম করে, তাকে (নিজের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য) কিছু দেওয়া দাতার জন্য বৈধ কিন্তু তা গ্রহণ করা তার জন্য হারাম।আর সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রেও একই বিধান। যেমন, কেউ কোনো শাসক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে কারো জন্য সুপারিশ করল, যাতে তার ওপর থেকে অন্যায় দূর করা হয়, অথবা তার ন্যায্য অধিকার তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়, অথবা সে যে পদ বা দায়িত্বের যোগ্য, তা তাকে দেওয়া হয়, কিংবা তাকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সে তার যোগ্য হয়—অথবা গরিব, ফকিহ, ক্বারী, ইবাদতকারী বা অন্য যাদের জন্য ওয়াকফকৃত সম্পদ নির্ধারিত, তাদের মধ্যে সে যদি প্রকৃত হকদার হয়, তবে তাকে সেই সম্পদ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এ ধরনের সুপারিশ, যা কোনো ফরজ কাজ সম্পাদন বা হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে এর বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করাও বৈধ নয়। তবে যার অধিকার আদায় বা যার ওপর থেকে জুলুম দূর করার জন্য এ সুপারিশ করা হচ্ছে, তার জন্য নিজের অধিকার পাওয়া বা জুলুম থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা বৈধ। এটাই সালাফে সালেহীন ও প্রখ্যাত ইমামদের থেকে বর্ণিত মত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ৩১; পৃষ্ঠা: ২৭৮)
.
তাকীউদ্দীন সুবকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:والمراد بالرشوة التي ذكرناها ما يعطى لدفع حق أو لتحصيل باطل ، وإن أعطيت للتوصل إلى الحكم بحق فالتحريم على من يأخذها , وأما من يعطيها فإن لم يقدر على الوصول إلى حقه إلا بذلك جاز ، وإن قدر إلى الوصول إليه بدونه لم يجز “আমরা যে ঘুষের কথা বলেছি, তার উদ্দেশ্য হলো এমন অর্থ বা উপহার, যা কোনো ন্যায্য অধিকার নষ্ট করার জন্য অথবা অন্যায় সুবিধা অর্জনের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু যদি ন্যায্য রায় বা নিজের বৈধ অধিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা দেওয়া হয়, তাহলে হারাম হবে গ্রহণকারীর জন্য। আর দাতার ক্ষেত্রে যদি সে এ ছাড়া নিজের অধিকার আদায় করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার জন্য তা দেওয়া বৈধ। তবে যদি ঘুষ ছাড়াই নিজের অধিকার আদায় করতে পারে, তাহলে তার জন্য ঘুষ দেওয়া বৈধ নয়।”(ফাতাওয়াউস সুবকী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২০৪)। ইমাম সুয়ূতী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আশবাহুন নাযায়ির নামক গন্থে বলেন:القاعدة السابعة والعشرون : ( ما حرم أخذه حرم إعطاؤه ) كالربا ، ومهر البغي , وحلوان الكاهن والرشوة , وأجرة النائحة والزامر .ويستثنى صور : منها : الرشوة للحاكم , ليصل إلى حقه , وفك الأسير ، وإعطاء شيء لمن يخاف هجوه “সাতাশতম মূলনীতি: যা গ্রহণ করা হারাম, তা প্রদান করাও হারাম। যেমন সুদ, ব্যভিচারিণীর মোহর, গণকের পারিশ্রমিক, ঘুষ, বিলাপকারিণী ও বাদ্যযন্ত্র-বাদকের পারিশ্রমিক।তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন বিচারকের কাছে ঘুষ দিয়ে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করা,বন্দীকে মুক্ত করার জন্য অর্থ প্রদান, অথবা এমন কাউকে কিছু দেওয়া, যার কুৎসা বা অপবাদ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হিলওয়ানুল কাহিন বলতে বোঝায গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তা তার গণনার বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে।”(আশবাহুন নাযায়ির পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহতে এসেছে:وفي “الأشباه” لابن نجيم (حنفي) , ومثله في “المنثور” للزركشي (شافعي) : ما حرم أخذه حرم إعطاؤه , كالربا ومهر البغي وحلوان الكاهن والرشوة للحاكم إذا بذلها ليحكم له بغير الحق , إلا في مسائل : في الرشوة لخوفٍ على نفسه أو ماله أو لفك أسير أو لمن يخاف هجوه ” ইবনু নুজাইমের আল আশবাহ এবং ইমাম যারকাশীর আল মানছুর-এ বলা হয়েছে: যা গ্রহণ করা হারাম, তা প্রদান করাও হারাম। যেমন সুদ, ব্যভিচারিণীর মোহর, গণকের পারিশ্রমিক এবং বিচারককে এমন ঘুষ দেওয়া, যাতে তিনি অন্যায়ভাবে রায় দেন। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যেমন: নিজের প্রাণ বা সম্পদের নিরাপত্তার জন্য ঘুষ দেওয়া, বন্দীকে মুক্ত করার জন্য, অথবা এমন ব্যক্তিকে কিছু দেওয়া, যার কুৎসার ভয় রয়েছে। ড. ওহবা যুহাইলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إذا تعينت الرشوة دون غيرها سبيلاً للوصول إلى الغرض جاز الدفع للضرورة‏ ،‏ ويحرم على الآخذ”যদি উদ্দেশ্য অর্জনের একমাত্র উপায় ঘুষ দেওয়াই হয়, তাহলে প্রয়োজনের কারণে ঘুষ দেওয়া বৈধ তবে তা গ্রহণ করা হারাম।
.
ইমাম ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فأمَّا ما يُعْطَى تَوصُّلا إلى أخْذِ حق أو دَفْع ظُلْم فغير داخلالظلم رُوِي أنّ ابن مسعود أُخِذ بأرض الحَبشة في شيء فأعْطَى دينارين حتى خُلّى سبيله. ورُوِي عن جماعة من أئمة التابعين قالوا: لا بأس أن يُصانِع الرجل عن نفسه ومالِه إذا خاف الظلم”নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে বা নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করতে যে অর্থ দেওয়া হয়, তা এই নিষিদ্ধ ঘুষের অন্তর্ভুক্ত নয়।বর্ণিত আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাবশায় একটি বিষয়ে আটক হয়েছিলেন। তখন তিনি দুই দীনার প্রদান করলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। আরও বর্ণিত হয়েছে, তাবেয়ীদের একদল ইমাম বলেছেন: ‘যদি কেউ নিজের জান-মালকে জুলুম থেকে রক্ষা করার আশঙ্কায় কিছু অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে, তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। (আন নিহায়াহ ফি গরীবিল হাদীস: ২/২২৬)
.
ইমাম খাত্তাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:إذا أَعطى ليتوصل به إلى حقه، أو يدفع عن نفسه ظلماً، فإنه غير داخل في هذا الوعيد”যদি কেউ নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য অথবা নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করার জন্য কিছু অর্থ প্রদান করে, তবে সে এই হাদিসে বর্ণিত কঠোর শাস্তির আওতাভুক্ত হবে না।”(মাআলিমুস সুনান: ৪/১৬১)
.
ইমাম মানাভী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الرشوة على تبديل أحكام الله إنما هي خصلة نشأت من اليهود المستحقين اللعنة ، فإذا سرت الخصلتان إلى أهل الإسلام استحقوا من اللعن ما استحقه اليهود … وقد جاء النهي عن الرشا حتى في التوراة ، ففي السفر الثاني منها : لا تقبلن الرشوة ؛ فإن الرشوة تعمي أبصار الحكام في القضاء”আল্লাহর বিধান পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ঘুষ গ্রহণ করা এমন একটি নিকৃষ্ট স্বভাব, যা মূলত সেই ইহুদিদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল, যারা আল্লাহর লানতের উপযুক্ত হয়েছিল। যখন এই দুটি নিকৃষ্ট স্বভাব মুসলিমদের মধ্যেও প্রবেশ করবে, তখন তারাও সেই লানতের অংশীদার হবে, যার উপযুক্ত ইহুদিরা হয়েছিল। এমনকি তাওরাতেও ঘুষের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে: তুমি ঘুষ গ্রহণ করবে না কারণ ঘুষ বিচারকদের দৃষ্টিশক্তিকে অন্ধ করে দেয় এবং ন্যায়বিচারকে বিকৃত করে।”(ফাইযুল কাদীর; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৪২)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:أما الرشوة التي يتوصل بها الإنسان إلى حقه ، كأن لا يمكنه الحصول على حقه إلا بشيء من المال ، فإن هذا حرام على الآخذ ، وليس حراماً على المعطي ، لأن المعطي إنما أعطى من أجل الوصول إلى حقه ، لكن الآخذ الذي أخذ تلك الرشوة هو الآثم لأنه أخذ ما لا يستحق “যে ঘুষের মাধ্যমে একজন মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে অর্থাৎ অর্থ না দিলে তার অধিকার পাওয়ার কোনো উপায় নেই সে ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণকারীর জন্য তা হারাম, কিন্তু অর্থদাতার জন্য হারাম নয়। কারণ অর্থদাতা কেবল নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য অর্থ দিয়েছে। কিন্তু গ্রহণকারী এমন অর্থ গ্রহণ করেছে, যার সে কোনো হকদার ছিল না। তাই গুনাহ তারই।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ: ৪/৩০২)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই মূলত হারাম এবং কবীরা গুনাহ। তবে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে—যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ন্যায্য ও প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে বা নিজের ওপর সংঘটিত জুলুম ও অবিচার থেকে রক্ষা পেতে বাধ্য হয়, এবং সেই অধিকার অর্জন বা জুলুম দূর করার অন্য কোনো বৈধ ও কার্যকর উপায় অবশিষ্ট না থাকে, তখন তার জন্য ঘুষ প্রদান করার অবকাশ থাকতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বৈধতা কেবল ঘুষ প্রদানকারীর জন্য; ঘুষ গ্রহণকারী কর্মচারীর জন্য তা সর্বাবস্থায় হারামই থেকে যায়। কিন্তু যদি কেউ এমন কোনো সুবিধা, পদ, সুযোগ বা অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে ঘুষ দেয়, যার সে আদৌ হকদার নয়, অথবা বৈধ বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ঘুষের পথ বেছে নেয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হারাম এবং কবীরা গুনাহ। তাই এ ক্ষেত্রে বৈধতার দাবি কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন (১) উদ্দেশ্য হবে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় বা জুলুম থেকে মুক্তি লাভ এবং (২) এর জন্য অন্য কোনো বৈধ ও কার্যকর উপায় বিদ্যমান থাকবে না।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, July 22, 2026

ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতি

 একথায় কোন সন্দেহ নাই যে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম। এটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের জীবন যাপন কষ্টসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভালো-মন্দ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির ওপর। নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলো:

▪️১. মোবাইল ফোন আল্লাহর দেওয়া এক বড় নেয়ামত। কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের গন্তব্য—জান্নাত নাকি জাহান্নাম।
একজন আত্মমর্যাদাশীল মুমিন হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, এই ডিভাইসের প্রতিটি স্পর্শ এবং প্রতিটি ক্লিক আমাদের আমলনামায় যুক্ত হচ্ছে। এটি ব্যবহারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মহৎ উদ্দেশ্য। কারণ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, ইলম অর্জন, ইসলামের প্রচার-প্রসার, আত্মীয়তার হক আদায় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি সেই প্রযুক্তিই যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে তবে তা ইহকাল ও পরকাল—উভয়কেই ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
হাদিসে এসেছে, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]
অথচ দুঃখজনকভাবে, অনেকেই এই মোবাইলকে গিবত, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া, অশ্লীলতার প্রসার, গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা কাউকে হুমকি দেওয়ার মতো কাজগুলো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই হারাম নয় বরং তা একজন মানুষের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো, অনলাইন ভিত্তিক জুয়া বা বেটিংয়ের মতো মরণফাঁদ। এটি কেবল অর্থলিপ্সা নয় বরং সুস্পষ্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ। যারা সাময়িক উত্তেজনার লোভে এই নেশায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছে তারা নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দিচ্ছে। আজকের দিনে অনলাইন গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস কিংবা অন্তহীন নাটক-সিনেমা মানুষকে এমন এক কৃত্রিম নেশায় ডুবিয়ে রেখেছে, যা তার জীবনের মূল্যবান সময়কে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে পড়ে থাকাটা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। সালাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত কিংবা জ্ঞান অর্জনের মতো মহৎ কাজগুলো আজ অনেকের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জিকির-আজকার তো দূরের কথা, রবের স্মরণের জন্য এক মুহূর্ত সময় বের করার মানসিকতাটুকুও অনেকে হারিয়ে ফেলেছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, এই আসক্তি মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দিচ্ছে যে, সে নিজের পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনেও চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। যে সময়টা তার পরিবারকে দেওয়ার কথা, যে সময়টা সন্তানদের লালন-পালন ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করার কথা তা সে নিঃশেষ করছে অর্থহীন স্ক্রলিং আর গেমিংয়ের পেছনে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় বরং একটি বড় সামাজিক অবক্ষয়। ধর্মীয় ও সামাজিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ধিক্কার জানানোর মতো এবং কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নিজের জীবনের মালিকানা হারিয়ে এভাবে আসক্তির দাস হওয়াটা মূলত নিজের সর্বনাশ ডেকে আনারই নামান্তর। একজন সচেতন ইমানদার কখনোই আল্লাহর দেওয়া এই নেয়ামতকে তার আমলনামা কলুষিত করার বা নিজের ধ্বংস ডেকে আনার মাধ্যম হতে দিতে পারেন না। তাই সতর্ক হোন, নিজের সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এই অনুভূতিই হোক মোবাইল ব্যবহারের মূল চালিকাশক্তি।
▪️২. মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক আদব ও শিষ্টাচার বজায় রাখা একজন সভ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যেন সৌজন্যবোধ হারিয়ে না ফেলি সেদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি।
জনসম্মুখে মোবাইল ব্যবহারের সময় নিচের বিষয়গুলো আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মার্জিত আচরণের প্রতিফলন ঘটায়:
– পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে মোবাইলে ডুবে থাকা শিষ্টাচার হীনতা। এটি উপস্থিত ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি তাদের চেয়ে আপনার ডিভাইসের স্ক্রিনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই সামাজিক পরিবেশে থাকাকালীন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সচেতন ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন।
– পাবলিক প্লেসে কথা বলার সময় চিৎকার করে বা চেঁচিয়ে কথা বলা অত্যন্ত অশোভন। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে বা গণপরিবহনে উচ্চস্বরে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক আলাপ চালিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়। আরও দুঃখজনক হলো, অনেকে রাগের মাথায় জনসম্মুক্ষে ফোনে গালাগালি বা কটু ভাষা ব্যবহার করেন যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ও রুচিকে সবার সামনে নিচু করে দেয়। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি আচরণই আপনার শিক্ষা ও রুচির পরিচয় বহন করে। প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার যেন আপনার ভেতরের মানবিক সৌজন্যবোধকে বিলীন করে না দেয়। একটি শান্ত ও মার্জিত কথোপকথন কেবল আপনার ব্যক্তিত্বকেই উজ্জ্বল করে না বরং আশপাশের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্কের গভীরতা ও শ্রদ্ধাবোধকেও অটুট রাখে। নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়ে, ধৈর্য ও শালীনতার পরিচয় দেওয়াই একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
– কোনো মাহফিল, মজলিস, সভা বা সেমিনারে উপস্থিত থাকা কিংবা কারো সাথে সরাসরি আলাপচারিতায় মগ্ন থাকা অবস্থায় মোবাইলে ডুবে থাকা কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, এটি রীতিমতো সৌজন্যবোধের অভাব ও বেয়াদবি। যখন আপনি কারো সাথে সামনাসামনি কথা বলছেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসে আছেন তখন মোবাইলে গেম খেলা, রিলস দেখা বা বারবার ভিডিও কল রিসিভ করা—এই প্রতিটি কাজই আপনার সামনে থাকা মানুষটিকে ছোট করার নামান্তর। আপনার এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই ব্যক্তি বা মজলিস আপনার কাছে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগত থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আপনার সাথে কথা বলছে বা যে মজলিসে আপনি উপস্থিত আছেন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া। অন্যের সময়ের মর্যাদা রক্ষা করা এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা একজন ব্যক্তিত্ববান ও রুচিশীল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মনে রাখবেন, আপনি যখন কারো সাথে কথোপকথনরত অবস্থায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তখন এটি উল্টো পাশের মানুষটির মনে বিরক্তি ও অবহেলার জন্ম দেয়। তাই যেকোনো সামাজিক জমায়েতে নিজের মোবাইল ফোনটিকে পকেটে বা ব্যাগে রেখে পূর্ণ মনোযোগ উপস্থিত মানুষের দিকে দেওয়াটাই সভ্যতা ও মার্জিত আচরণের দাবি। প্রযুক্তির নেশায় পড়ে যেন আমরা আমাদের মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোকে নষ্ট না করি, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন।
– মসজিদ, দ্বীনি মাহফিল বা হাসপাতালের মতো জায়গাগুলোর একটি নিজস্ব গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রয়েছে। মসজিদ আল্লাহর ঘর, দ্বীনি আলোচনা জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র, আর হাসপাতাল যেখানে মানুষ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় শান্তি খোঁজে—এই স্থানগুলোতে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার কেবল অসৌজন্যমূলক নয় বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এসব সংবেদনশীল স্থানে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা ভাইব্রেট মুডে না রাখা কেবল আপনার উদাসীনতাই প্রকাশ করে না বরং এটি অন্যের ইবাদত, মনোযোগ কিংবা বিশ্রামে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। ভাবুন তো, নামাজের রুকু-সিজদায় বা গোরস্থানের মতো কোনও স্থানে হঠাৎ কর্কশ কোনো রিংটোন বেজে ওঠা কতটা পীড়াদায়ক হতে পারে! হাসপাতালের ওয়ার্ডে যেখানে রোগী একটু প্রশান্তির অপেক্ষায়‌ পড়ে আছে সেখানে মোবাইলের উচ্চশব্দ তাদের বিরক্তির কারণ হওয়াটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। একজন সচেতন ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে এই জায়গাগুলোতে প্রবেশের সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আমাদেরই হাতে। তাই সামান্য সচেতনতা আর দায়িত্ববোধই পারে একটি মার্জিত পরিবেশ বজায় রাখতে। মনে রাখবেন, আপনার একটি ছোট পদক্ষেপই অন্যের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটায়।
– অন্যদের সাথে আলাপকালে অনুমতি ছাড়া লাউড স্পিকার ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং নৈতিকতার পরিপন্থী। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, অপর পক্ষের অজান্তে তার একান্ত কথা অন্যদের শোনানো—এটি কেবল সামাজিক অপরাধ নয় বরং আমানতের খেয়ানত ও গিবতের শামিল।
– মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যদি না সেই কথোপকথনে এমন কিছু থাকে যা অন্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তবে বিনা অনুমতিতে কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা—কোনোটাই বৈধ নয়। কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা এবং তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করা একজন ইমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
– রিংটোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের রুচিবোধ ও সচেতনতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই শখ করে রিংটোন হিসেবে উদ্ভট শব্দ, উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা অসংলগ্ন মিউজিক ব্যবহার করেন, যা জনসম্মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং অন্যের বিরক্তির কারণ হয়। আবার অনেকেই না বুঝে রিংটোন হিসেবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ব্যবহার করেন, যা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এটি আল্লাহর কালামের প্রতি এক ধরণের অবমাননা ও অপব্যবহার। কারণ ফোনের রিংটোন যখন কোনো অপবিত্র স্থানে বা বিব্রতকর মুহূর্তে বেজে ওঠে তখন তা কুরআনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
তাই একজন সচেতন ও মার্জিত মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত:
– কারো অনুমতি ছাড়া তার কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।
– রিংটোনের ক্ষেত্রে সব সময় সাধারণ ও স্বাভাবিক টোন ব্যবহার করা, যা কারো বিরক্তির কারণ হবে না।
– পবিত্র কুরআন বা দ্বীনি কোনো বিষয়কে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকে তার যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তির প্রতিটি ব্যবহারই আমাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। তাই নিজের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো যেমন গোপন রাখা জরুরি, অন্যের গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষা করাও তেমনি আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
▪️৩. কারো সাথে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ইসলামি আদব মেনে চলা কর্তব্য। যেমন:
– কথোপকথন শুরুর আগে সালাম বিনিময় করা।
– কারো বিশ্রামের সময় বা অসময়ে কল না দেওয়া এবং কেউ কল রিসিভ না করলে বারবার কল করে বিরক্ত না করে সম্ভব হলে একটি মেসেজ দিয়ে রাখা উত্তম।
– অন্যের অনুমতি ছাড়া তার ফোন ব্যবহার করা বা কারো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের কাছে শেয়ার করা নৈতিকভাবে অন্যায়।
▪️৪. ইসলামের দৃষ্টিতে সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক আমানত এবং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাবের খাতায় জমা হচ্ছে, তাই এই সময়কে কেবল বিনোদনের উপকরণে বা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে অপচয় করা মানে নিজের আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। মনে রাখা দরকার, অহেতুক কাজে ডুবে থাকা কেবল সময় হারানো নয় বরং এটি জীবনের সেই মূল্যবান অংশ হারানো যা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
একজন বুদ্ধিমান মুমিন তার সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে ইহকাল ও পরকালের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তির পেছনে অকারণে সময় না দিয়ে, সেই সময়টুকু যদি কুরআন তেলাওয়াত, ইলম অর্জন, সৃজনশীল কাজ, কিংবা সমাজ ও পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হয় তবেই জীবন সার্থক হয়। প্রবাদে আছে, “সময় একটি ধারালো তলোয়ারের মতো; তুমি যদি একে না কাটো তবে এটি তোমাকে কেটে ফেলবে।” তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম গতির পেছনে না ছুটে নিজের জীবনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি মুহূর্তকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করাই হলো প্রকৃত ইমানদারের কাজ। মনে রাখবেন, কাল কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। এই বোধটুকু জাগ্রত থাকলেই একজন মানুষ সময়ের অপচয় রোধ করে তার জীবনকে অর্থবহ ও সফল করে তুলতে পারবে। সহজ কথায়, মোবাইল ফোনকে আপনি আপনার জীবনের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, নাকি অধঃপতনের দিকে ছুটে চলবেন—এই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে। এর দ্বারা আপনি আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করবেন নাকি কলুষিত করবেন তাও আপনার সিদ্ধান্ত। কল্যাণকর কাজে এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বিজ্ঞানের এই মূল্যবান অবদানটি হবে আমাদের জন্য একটি বিশাল নেয়ামত। আর ভুল কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে আমাদের জন্য ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ। আল্লাহ আমাদেরকে মোবাইল ফোন কে উপকারী কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ফুটবল বিশ্বকাপ এবং সমসাময়িক ক্রীড়া সংস্কৃতি সম্পর্কে শাইখ সালেহ আল ফাউজান হাফিযাহুল্লাহ এর গুরুত্বপূর্ণ একগুচ্ছ ফতওয়া

 ফুটবল, বিশ্বকাপ এবং এবং সমসাময়িক খেলাধুলা বিষয়ে বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ এবং সৌদি আরবের প্রধান মুফতি আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া তুলে ধরা হলো:

❒ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে ফুটবল খেলার বিধান কী?
প্রশ্ন: শাইখ, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন। এই প্রশ্নকারী বলছেন: ফুটবল খেলার হুকুম সম্পর্কে আপনাদের মতামত কী? বিশেষত যারা দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য এর হুকুম কী—যদি খেলায় কোনও হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয় না থাকে? দয়া ফতওয়া প্রদানে বাধিত করবেন।
উত্তর:
إِذَا كَانَ الْقَصْدُ مِنْ هَذَا تَقْوِيَةَ الْجِسْمِ؛ يَعْمَلُ الرِّيَاضَةَ وَالْكُرَةَ مِنْ أَجْلِ تَقْوِيَةِ جِسْمِهِ، وَلَا يُكْثِرُ مِنْ هَذَا، وَإِنَّمَا بِقَدْرِ مَا يَحْصُلُ لَهُ تَقْوِيَةُ جِسْمِهِ فَقَطْ، وَلَا يَشْغَلُهُ ذَلِكَ عَنْ أَدَاءِ وَاجِبٍ وَلَا عَنْ طَلَبِ مَعِيشَةٍ؛ فَهَذَا مُبَاحٌ بِهَذَا الْقَدْرِ، مَعَ سَتْرِ الْعَوْرَةِ -مَا يَكُونُ كَاشِفًا لِعَوْرَتِهِ-، هَذَا يُبَاحُ لَا بَأْسَ بِهِ.
أَمَّا إِذَا تَجَاوَزَ هَذِهِ الضَّوَابِطَ؛ بِأَنْ كَانَ مِهْنَةً وَحِرْفَةً، وَيَشْغَلُ وَقْتَهُ كُلَّهُ، وَلَا يُعْرَفُ إِلَّا بِأَنَّهُ لَاعِبُ كُرَةٍ؛ هَذَا لَا يَجُوزُ؛ لِأَنَّهُ أَهْدَرَ وَقْتَهُ، وَأَهْدَرَ شَخْصِيَّتَهُ، وَأَهْدَرَ مَنَافِعَهُ، وَنَزَلَ عَنْ صِفَةِ الرِّجَالِ وَصِفَةِ ذَوِي الشَّهَامَةِ وَالْمُرُوءَةِ، وَصَارَ مَعْرُوفًا بِأَنَّهُ لَاعِبٌ -يُسَمَّى لَاعِبًا-، وَاللَّعِبُ إِذَا كَثُرَ،
اللهُ مَا ذَكَرَ اللَّعِبَ إِلَّا عَلَى وَجْهِ الذَّمِّ فِي الْقُرْآنِ؛ مَا جَاءَ اللَّعِبُ إِلَّا عَلَى وَجْهِ الذَّمِّ. فَيُتْرَكُ هَذَا الْأَمْرُ، وَلَا يَكُونُ مُحْتَرِفًا لِلَعِبِ الْكُرَةِ أَوْ كُلُّ وَقْتِهِ، مَا لَهُ مِهْنَةٌ إِلَّا لَعِبُ الْكُرَةِ؛ هَذَا لَا يَجُوزُ، هَذَا يُذِيبُ شَخْصِيَّةَ الْمُسْلِمِ، وَيُعَطِّلُ عَلَيْهِ مَصَالِحَهُ، وَيُنَزِّلُ قَدْرَهُ عِنْدَ النَّاسِ
“খেলার উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল শরীরচর্চা বা সুস্থ থাকা, আর সেটা করতে গিয়ে যদি নিজের জরুরি কাজ বা জীবিকার পথে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয়, তবে ফুটবল খেলাটা জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সতর ঢেকে রাখা জরুরি। শরীর গঠনের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার, ততটুকু খেলাধুলা করায় কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু এই খেলার নেশায় যদি কেউ সব সীমা ছাড়িয়ে যায় তবে তা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। যেমন:
খেলাধুলাকে যদি কেউ পেশা বা জীবন সংস্থানের প্রধান উপায় বানিয়ে নেয়, সারাটা সময় মাঠেই কাটিয়ে দেয় এবং নিজের আসল পরিচয় মুছে ফেলে শুধু একজন ‘ফুটবলার’ হিসেবেই পরিচিতি গড়ে তোলে—তাহলে সেটা জায়েজ নয়। কারণ এতে মূল্যবান সময় ও জীবনের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। এতে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অহেতুক খেলাধুলাকে কখনোই ভালো চোখে দেখেননি। তাই যারা খেলাধুলা নিয়ে অতিরিক্ত মেতে থাকে, তাদের উচিত নিজেকে শুধরে নেওয়া। একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিকর এমন কোনও কাজ বা পরিচয় আঁকড়ে ধরা উচিত নয়, যা মানুষের কাছে তার মর্যাদা কমিয়ে দেয় এবং তাকে আসল দায়িত্ব ও কল্যাণকর কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।” শাইখের এ বক্তব্যের আলোকে ফুটবল খেলা জায়েজ হওয়ার শর্তাবলী নিম্নরূপ:
● ১. খেলার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে কেবল শরীরচর্চা বা সুস্থতা অর্জন।
● ২. খেলাধুলা করতে গিয়ে নিজের জরুরি কাজ ও দায়িত্বে (ফরজ ইবাদত-বন্দেগিতে) অবহেলা করা যাবে না বা জীবিকা অর্জনের পথে কোনও বাধা সৃষ্টি হওয়া যাবে না।
● ৩. খেলার সময় সতর তথা শরীরে আবশ্যকীয় অংশ ঢেকে রাখা জরুরি।
● ৪. শরীর গঠনের প্রয়োজনে যতটুকু খেলাধুলা প্রয়োজন ঠিক ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে; অতিরিক্ত মেতে থাকা যাবে না।
● ৫. খেলাধুলাকে পেশা বা জীবিকার প্রধান উপায় বানানো যাবে না।
● ৬. সারাক্ষণ মাঠেই সময় কাটিয়ে দেওয়া এবং নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে শুধু ‘খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এতে মূল্যবান সময় ও জীবনের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়।
● ৭. এমন কোনও কাজ বা পরিচয় আঁকড়ে ধরা যাবে না, যা একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ করে এবং তাকে মানুষের কাছে মর্যাদাহীন করে তোলে।
● ৮. খেলাধুলা যেন মানুষকে তার আসল দায়িত্ব ও কল্যাণকর কাজ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
এসব শর্ত সাপেক্ষে ফুটবল খেলা জায়েজ। এর ব্যত্যয় ঘটলে জায়েজ নয়। (অনুবাদক)
❒ ২. কাফের দেশগুলোর ক্রীড়া টিমকে সমর্থন করা এবং তাদের জয় কামনা করার বিধান: এটি কি কাফেরদের প্রতি আন্তরিক বন্ধুত্ব ও গভীর ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত?
প্রশ্ন: আজকাল অনেকে বিভিন্ন দেশের খেলাধুলা দেখেন এবং কোনও কোনও দলের প্রতি সমর্থন জানান। এর মধ্যে অনেক সময় কাফের দেশগুলোর দলও থাকে। কাফেরদের দল জয়ী হোক—এমনটা কামনা করা বা তাদের সমর্থন করা কি তাদের প্রতি আন্তরিক গভীর ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব (মুওয়ালাত) হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর:
إِذَا أَحَبَّ أَنْ يَنْتَصِرَ الْكَافِرُ وَلَوْ بِالْأَلْعَابِ الرِّيَاضِيَّةِ فَهَذِهِ مَوَدَّةٌ لَهُمْ، إِذَا أَحَبَّ أَنْ يَنْتَصِرُوا وَلَوْ فِي الْأَلْعَابِ الرِّيَاضِيَّةِ فَهَذِهِ مُوَالَاةٌ لَهُمْ، نَعَمْ
“যদি কেউ চায় যে কাফেররা জয়ী হোক—তা সে সাধারণ কোনও বিষয় হোক কিংবা খেলাধুলা—তবে এটি তাদের প্রতি মনের টান বা ভালোবাসারই লক্ষণ। আর যদি কেউ মনেপ্রাণে তাদের জয় কামনা করে, তবে তা ইসলামি পরিভাষায় তাদের প্রতি ‘মুওয়ালাত’ বা আনুগত্য ও বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য হবে।”
❒ ৩. মুসলিম দলের বিপক্ষে অমুসলিম দলকে সমর্থন করার শরয়ি বিধান:
প্রশ্ন: অনেক ফুটবল ভক্ত অমুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি এতটাই অন্ধভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যে, তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। অথচ এর বিপরীতে, কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সদস্য হওয়ার কারণে মুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করেন। এই আচরণের শরয়ি হুকুম কী? এটি কি মানুষকে বড় ধরনের কোনও বিপদের দিকে ঠেলে দেয়?
উত্তর:
هَذَا مِنْ أَضْرَارِ التَّعَصُّبِ الرِّيَاضِيِّ الْمَذْمُومِ، فَإِذَا اقْتَرَنَ هَذَا التَّشْجِيعُ بِالْوَلَاءِ وَالْبَرَاءِ، بِحَيْثُ يُحَبُّ الْكَافِرُ وَيُوَالَى، وَيُبْغَضُ الْمُسْلِمُ وَيُعَادَى لِأَجْلِ مُبَارَاةٍ أَوْ نَادٍ، فَهَذَا أَمْرٌ لَا يَجُوزُ شَرْعًا، وَهُوَ مِنَ الِانْحِرَافِ فِي الْمَوَازِينِ. إِنَّ الْوَلَاءَ وَالْبَرَاءَ لَا يَكُونُ إِلَّا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ، فَمُوَالَاةُ الْكَافِرِينَ وَمَحَبَّتُهُمْ لِنُصْرَتِهِمْ فِي لُعْبَةٍ، وَمُعَادَاةُ الْمُسْلِمِينَ لِأَنَّهُمْ فِي فَرِيقٍ مُنَافِسٍ، هُوَ مَسْلَكٌ خَطِيرٌ يُرِيدُهُ أَعْدَاءُ الْإِسْلَامِ؛ فَقَدْ أَرَادُوا أَنْ يَغْرِسُوا فِي قُلُوبِ شَبَابِ الْمُسْلِمِينَ مَفَاهِيمَ الْوَلَاءِ وَالْبَرَاءِ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلِغَيْرِ الْإِسْلَامِ، لِيَصْرِفُوهُمْ عَمَّا يَنْفَعُهُمْ فِي دِينِهِمْ وَدُنْيَاهُمْ
“এটি মূলত খেলাধুলা নিয়ে অন্ধ গোঁড়ামির একটি ভয়াবহ পরিণাম। একজন মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি হলো ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’—অর্থাৎ ভালোবাসা ও ঘৃণা কেবল আল্লাহর জন্য হওয়া। কিন্তু কেউ যদি নিছক একটি খেলা বা ক্লাবকে কেন্দ্র করে কোনও অমুসলিমকে ভালোবাসে, সমর্থন দেয় এবং একই কারণে একজন মুসলিমকে ঘৃণা বা শত্রুতা করে, তবে তা ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই বৈধ নয়। এটি ঈমানের মাপকাঠিতে অনেক বড় একটি বিচ্যুতি।” আমাদের সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভালোবাসা ও আনুগত্য কেবল আল্লাহ, তাঁর রসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মুমিনদের জন্যই নির্দিষ্ট। নিছক একটি খেলায় জেতানোর আশায় কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব পোষণ করা এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে মুসলিম খেলোয়াড়দের প্রতি বিদ্বেষ রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি এমন একটি পথ, যা ইসলামের শত্রুরাই চায়। তারা চায় মুসলিম তরুণদের মন থেকে প্রকৃত ইমানি চেতনার জায়গা দখল করে নিতে। তারা চায় আমাদের তরুণরা যেন আল্লাহ ও ইসলামের পরিবর্তে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত কল্যাণ থেকে পুরোপুরি বিমুখ হয়ে যায়।”
❒ ৪. ফুটবল খেলায় গোল দেওয়ার পর সেজদা দেওয়ার বিধান:
প্রশ্ন: ফুটবল খেলোয়াড়রা গোল করার পর যে সেজদা দেয় তার হুকুম কী? অনেকে বলে, আপনি নাকি এটি জায়েজ বলেছিলেন আবার অনেকে বলে, আপনি নিষেধ করেছেন। আসলে বিষয়টি কী?
উত্তর:
«النَّقْلُ الْأَوَّلُ كَذِبٌ، مَا قُلْتُ مَشْرُوعِيَّةَ هَذَا، أَقُولُ: مَا هَذِهِ نِعْمَةٌ، أَقُولُ: الْكُرَةُ وَلَعِبُ الْكُرَةِ مَا هُوَ بِنِعْمَةٍ، وَسُجُودُ الشُّكْرِ يَكُونُ عِنْدَ تَجَدُّدِ نِعْمَةٍ، فَهُوَ بِدْعَةٌ فِي هَذَا الْمَوْضِعِ، إِيشْ حَصَّلْنَا مِنَ الْكُرَةِ وَإِيشِ الْمُسْلِمُونَ اسْتَفَادُوا مِنْهَا إِلَّا ضَيَاعَ شَبَابِهِمْ؟ مَا اسْتَفَادُوا، بَلْ هِيَ ضَرَرٌ عَلَى الْمُسْلِمِينَ».
“আমার পক্ষ থেকে এটি জায়েজ হওয়ার যে কথাটি ছড়ানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কখনোই এটিকে বৈধ বলিনি।
ফুটবল খেলা কোনও নিয়ামত বা অনুগ্রহ নয় যে, এর জন্য সেজদা দিতে হবে। সেজদায়ে শোকর তো কেবল তখনই করা হয় যখন কোনও নতুন নিয়ামত প্রাপ্তি ঘটে। সুতরাং খেলার মাঠে এমন সেজদা করা একটি বিদআত (দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত কাজ)।
ফুটবল থেকে আমরা কী পেয়েছি? মুসলমানরা এটি থেকে কী উপকার পেয়েছে? এটি কেবল যুবকদের সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং এটি মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর।
❒ ৫. ফুটবল ম্যাচ দেখার বিধান
প্রশ্ন: ফুটবল ম্যাচ মাঠে গিয়ে বা টিভিতে দেখা কি বৈধ?
উত্তর:
لَا خَيْرَ فِيهَا، لَا فَائِدَةَ فِيهَا إِلَّا ضَيَاعُ الْوَقْتِ، فَالْأَحْسَنُ أَنْ تَصْرِفَ نَفْسَكَ عَنْهَا، تَشْتَغِلَ فِي مَا فِيهِ فَائِدَةٌ، فِي دِينِكَ وَدُنْيَاكَ
“এর মধ্যে কোনও কল্যাণ বা উপকার নেই, বরং এটি সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বরং আপনার মূল্যবান সময়টুকু এমন কোনও কাজে ব্যয় করুন, যা আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণে আসবে।”
❒ ৬. ”খেলা দেখার পরিবর্তে ঘুমানো অধিক উত্তম”
প্রশ্ন: টেলিভিশনে ফুটবল ম্যাচ দেখার হুকুম কী?
উত্তর:
«يَعْنِي عِنْدَكَ فَرَاغٌ، مَا لَكَ شُغْلٌ إِلَّا مُتَابَعَةَ الْكُرَةِ وَمَا أَدْرِي وَش؟ الْمُسْلِمُ وَقْتُهُ ثَمِينٌ، مَا يَنْبَغِي أَنَّهُ يُضَيِّعَهُ فِي الْمُبَارَيَاتِ وَالْمُسَلْسَلَاتِ وَالْأَشْيَاءِ الْهَابِطَةِ الَّتِي لَا تُفِيدُهُ فِي دِينِهِ وَلَا فِي دُنْيَاهُ. يَحْفَظُ وَقْتَهُ فِيمَا يَنْفَعُهُ وَمَا يُفِيدُهُ. كَوْنُكَ تَنَامُ أَحْسَنُ مِنْ كَوْنِكَ تُشَاهِدُ الْمُبَارَاةَ؛ تَنَامُ، تَرْتَاحُ، تَقُومُ تُصَلِّي آخِرَ اللَّيْلِ، أَحْسَنُ لَكَ مِنْ أَنَّكَ تُشَاهِدُ شَيْئًا مَا فِيهِ فَائِدَةٌ، وَيُؤَخِّرُ عَلَيْكَ النَّوْمَ، وَيُكَسِّلُكَ عَنْ صَلَاةِ الْفَجْرِ».
“তার মানে আপনার হাতে অনেক অবসর সময়! খেলা দেখা ছাড়া আপনার আর কোনও কাজ নেই!
একজন মুসলিমের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই খেলাধুলা, নাটক-সিরিয়াল বা এই ধরনের অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করা তার জন্য শোভনীয় নয়—বিশেষ করে যেসব বিষয় দ্বীন বা দুনিয়ার কোনও উপকারে আসে না। বরং সময়ের সঠিক ব্যবহার করা এবং কল্যাণকর কাজে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সত্যি বলতে, খেলা না দেখে সেই সময়ে ঘুমানো আপনার জন্য অনেক বেশি উত্তম। ঘুমালে শরীর বিশ্রাম পাবে, এরপর শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারবেন। এটা এমন সব জিনিস দেখার চেয়ে অনেক ভালো, যাতে কোনও উপকার তো নেই-ই বরং তা আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং ফজরের সালাতের জন্য আপনাকে অলস করে দেয়।”
❒ ৭. বাড়াবাড়ি ছাড়া শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা দেখার বিধান
প্রশ্ন: কেউ যদি কোনও প্রকার বাড়াবাড়ি বা আসক্তি ছাড়া শুধু বিনোদনের জন্য ফুটবল খেলা দেখেন তবে তার হুকুম কী?
উত্তর:
«لَا تُضَيِّعْ وَقْتَكَ فِي هَذِهِ التُّرَهَاتِ، لَا تُضَيِّعْ وَقْتَكَ فِيهَا»
“এসব অনর্থক বা বাজে কাজে নিজের সময় নষ্ট করবেন না। আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনেক দামি, তাই এসবের পেছনে সময় ব্যয় করা থেকে বিরত থাকুন।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদান: আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ)।
প্রধান হাইআতু কিবারিল উলামা (সিনিয়র স্কলার পরিষদ) এবং গ্র্যান্ড মুফতি, সৌদি আরব।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জানাজার সালাতের বিধান

 প্রশ্ন: জানাজার সালাতের বিধান কী? তা কি ফরজ নাকি সুন্নত? একজন সালাফি আলেমের মুখে শুনলাম, জানাজার সালাত সুন্নত। কিন্তু আমরা আগে থেকে যা জানি তা হলো, এটি ফরজে কেফায়াহ। কোনটি সঠিক দয়া করে জানাবেন।

উত্তর: ইসলামি ফিকহের আলোকে জানাজার সালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ফরজে কিফায়াহ’ (সামষ্টিক ফরজ ইবাদত)। অর্থাৎ এটি মুসলিম সমাজের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক দায়িত্ব। যদি সমাজের কিছু মানুষ এটি আদায় করে তবে বাকিরা দায়মুক্ত হবে। কিন্তু সবাই যদি এটি পরিত্যাগ করে তবে পুরো সমাজ গুনাহগার হবে। সুতরাং এটিকে সুন্নত বলা সঠিক নয়।
◈ হাদিসে এসেছে,
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: ((أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِجِنَازَةٍ لِيُصَلِّيَ عَلَيْهَا، فَقَالَ: هَلْ عَلَيْهِ مِنْ دَيْنٍ؟ قَالُوا: لَا، فَصَلَّى عَلَيْهِ، ثُمَّ أُتِيَ بِجِنَازَةٍ أُخْرَى، فَقَالَ: هَلْ عَلَيْهِ مِنْ دَيْنٍ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: فَصَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ. قَالَ أَبُو قَتَادَةَ: عَلَيَّ دَيْنُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَصَلَّى عَلَيْهِ)).
সালামা ইবনে আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত: নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে একটি জানাজা আনা হলো যাতে তিনি সালাত পড়বেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তার কি কোনও ঋণ আছে?”
সাহাবিগণ বললেন, “না।”
তখন তিনি তার জানাজা পড়লেন।
এরপর অন্য একটি জানাজা আনা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তার কি কোনও ঋণ আছে?”
সাহাবিগণ বললেন, “হ্যাঁ।”
তিনি বললেন, “তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো। (অর্থাৎ তিনি নিজে তার জানাজা পড়তে অস্বীকৃতি জানালেন)।
তখন আবু কাতাদা (রা.) বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! তার ঋণের দায়ভার আমার ওপর রইল।” এরপর তিনি তার জানাজা পড়লেন। [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ২২৯৫]
এখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ—صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ বা “তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো”—এটি একটি আদেশসূচক বাক্য, যা ওয়াজিব বা ফরজের দাবি রাখে। [দ্রষ্টব্য: ইমাম নওয়াবি (রহ.)-এর ‘আল মাজমু’, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১২]
◈ হাদিসে আরও এসেছে,
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ((قَدْ تُوُفِّيَ الْيَوْمَ رَجُلٌ صَالِحٌ مِنَ الْحَبَشِ، فَهَلُمَّ، فَصَلُّوا عَلَيْهِ)).
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আজ হাবাশা (ইথিওপিয়া)-এর এক নেককার ব্যক্তি (বাদশাহ নাজাশি) মৃত্যুবরণ করেছেন। অতএব চলো তার জানাজার সালাতে যাই। অতঃপর তারা তার জানাজার সালাত পড়লো। [বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৯৫২]
কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে জীবিত মানুষদের উপর আবশ্যক হল, তার গোসল, কাফন, জানাজা এবং দাফন কার্য সম্পন্ন করা। অর্থাৎ এগুলো ফরজে কেফায়াহ। কিছু সংখ্যক মুসলিম এটি সম্পন্ন করলে সকলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে।
◈ জানাজার সালাত মুসলিমদের পারস্পারিক অধিকারের মধ্যে একটি এবং তা অনেক সওয়াবের কাজ। যেমন: আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
« مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّىَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ » . قِيلَ وَمَا الْقِيرَاطَانِ قَالَ « مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ »
“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজে উপস্থিত হবে তার জন্য রয়েছে এক কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব আর যে দাফনেও উপস্থিত হবে তার জন্য দু কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, কিরাত কী? তিনি বললেন: দুটি বড় বড় পাহাড় সমপরিমাণ। “[বুখারি ও মুসলিম]
❑ আলেমদের বক্তব্য ও ফতোয়া
◆ শাইখ বিন বায (রহ.) বলেন,
صَلَاةُ الْجِنَازَةِ مَشْرُوعَةٌ لِلْجَمِيعِ، لِلرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ، وَهِيَ فَرْضُ كِفَايَةٍ، إِذَا قَامَ بِهَا وَاحِدٌ كَفَى وَأَجْزَأَتْ
“জানাজার সালাত নারী ও পুরুষ সবার জন্যই শরিয়তসম্মত এবং এটি ‘ফরজে কিফায়াহ’। যদি একজন ব্যক্তিও তা আদায় করে তবেই তা যথেষ্ট হবে।”
◆ ইসলাম ওয়েবে বলা হয়েছে,
فَصَلَاةُ الْجِنَازَةِ فَرْضٌ عَلَى الْكِفَايَةِ عِنْدَ جُمْهُورِ الْعُلَمَاءِ مِنَ الْحَنَفِيَّةِ وَالشَّافِعِيَّةِ وَالْحَنَابِلَةِ، وَاخْتُلِفَ فِيهَا قَوْلُ الْمَالِكِيَّةِ، وَالْمَشْهُورُ عِنْدَهُمْ كَمَذْهَبِ الْجُمْهُورِ. وَفَرْضُ الْكِفَايَةِ كَمَا قَالَ عَنْهُ صَاحِبُ الْمُوَافَقَاتِ: مُتَوَجِّهٌ عَلَى الْجَمِيعِ، لَكِنْ إِذَا قَامَ بِهِ بَعْضُهُمْ سَقَطَ عَنِ الْبَاقِينَ. ا.هـ
“হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে জানাজার সালাত ‘ফরজে কিফায়াহ’। মালিকি মাজহাবে এ নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মতটি জুমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতেরই অনুরূপ। ‘আল মুয়াফাকাত’ কিতাবে বলা হয়েছে, ‘এটা এমন একটি দায়িত্ব যা সবার ওপরই বর্তায়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক যদি তা পালন করে তবে বাকিদের ওপর থেকে দায়িত্বটি নেমে যায়।'” [ইসলাম ওয়েব, ফতোয়া নম্বর: ১১৩৮৮]
◆ ইমাম ইবনে হাজম, ইমাম নওয়াবি, ইবনুল মুলাক্কিন এবং কামাল ইবনুল হুমাম (রহ.) এ বিষয়ে ইজমা বা সর্বসম্মত মত উল্লেখ করেছেন। [সূত্র: আদ দুরারুস সানিয়াহ-ওয়েব সাইট]
মোটকথা, জানাজার সালাত ‘ফরজে কিফায়াহ’। অর্থাৎ মুসলিমদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক মানুষ যদি জানাজার সালাত আদায় করে নেয় তবে বাকিদের ওপর থেকে দায়িত্বটি নেমে যাবে বা তারা তাদের ওপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। কিন্তু শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়া যদি এলাকার সবাই মিলে এটি পরিত্যাগ করে তবে ওই এলাকার সকল মুসলিম গুনাহগার হবে। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Tuesday, July 14, 2026

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে সাহাবিদের অবস্থান

 মূল: শাইখ ড. সুলতান ইবনে আবদুর রহমান আল উমাইরি।

(ডক্টরেট: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
সম্ভবত সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)হলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে। তাঁকে নিয়ে মতামত ভিন্ন হয়েছে, তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চলেছে। দুটি চরম পক্ষ তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ তাঁর প্রতি ভালোবাসায় ও সমর্থনে বাড়াবাড়ি করেছে। অন্য পক্ষ তাঁর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষে বাড়াবাড়ি করেছে। এমনকি তাঁকে কাফির ও মুনাফিক পর্যন্ত বলেছে! এই দুটি চরমপন্থী পক্ষ ইসলামি ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসবিদ ইমাম জাহাবি শান্ত ও বিচক্ষণভাবে এই দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
“وخلْفَ مُعاويةَ خَلْقٌ كثيرٌ يُحبِّونَه ويَتغالَوْن فيه ويُفضِّلونه، إمَّا قد ملَكَهم بالكَرَمِ والحِلمِ والعَطاءِ، وإمَّا قد وُلِدوا في الشَّامِ على حُبِّه، وتَربَّى أولادُهم على ذلك. وفيهم جَماعةٌ يَسيرةٌ من الصحابةِ، وعدَدٌ كثيرٌ من التابعين والفُضَلاءِ، وحارَبوا معه أهلَ العِراقِ، ونَشَؤوا على النَّصْبِ، نعوذُ باللهِ من الهَوى، كما قد نشَأَ جيشُ عليٍّ رضيَ اللهُ عنه ورعِيَّتُه -إلا الخَوارجَ منهم- على حُبِّه والقيامِ معه، وبُغضِ مَن بغى عليه والتبرِّي منهم، وغَلا خلقٌ منهم في التشيُّعِ”
“মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পেছনেও এক বিশাল জনসমষ্টি ছিল যারা তাঁকে ভালোবাসত, তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি রাখত এবং তাঁকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিত। এর কারণ ছিল, হয় তিনি তাঁর অসীম উদারতা, সহনশীলতা ও দানশীলতা দিয়ে তাদের মন জয় করেছিলেন অথবা তারা সিরিয়াতে তাঁর শাসনের ছায়াতলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তাদের সন্তানরাও সেভাবেই বড় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অল্প কিছু সাহাবি এবং বিপুল সংখ্যক তাবেয়ি ও পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে থেকে ইরাকবাসীদের (আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে একদল মানুষ ‘নাসবি’ [আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী] হিসেবে গড়ে উঠেছিল। (আমরা প্রবৃত্তি বা আবেগের তাড়না থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।) ঠিক একইভাবে আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাহিনী এবং তাঁর অনুসারীরাও—একমাত্র খারেজিরা ছাড়া—তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। যারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল তাঁদের প্রতি ঘৃণা ও সম্পর্কহীনতা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁদের মধ্য থেকে একদল মানুষ চরমপন্থী শিয়া (ভক্তি ও আনুগত্যে সীমা লঙ্ঘনকারী) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৩/১২৮-১২৯] মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে অতিভক্তিতে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে জাল হাদিস তৈরির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই নিকৃষ্ট অপকৌশল হাদিস বিশারদগণের চোখ এড়াতে পারেনি। তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং অন্যদের সতর্ক করেছেন। তাঁরা মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শানে বর্ণিত হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করে সহিহ ও জইফ (দুর্বল) বর্ণনাগুলোকে পৃথক করে দিয়েছেন।
এই বিষয়ে সতর্ক করে ইবনুল জাওজি (রাহ.) বলেন:
“قد تعصَّبَ قومٌ ممَّن يَدَّعي السُّنَّةَ، فوضَعوا في فضلِه أحاديثَ ليُغضِبوا الرافضةَ، وتعصَّبَ قومٌ من الرافضةِ، فوضَعوا في ذَمِّه أحاديثَ، وكِلَا الفريقينِ على الخطَأِ القبيحِ”
“সুন্নাহর অনুসারী দাবিদার একদল লোক গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয়ে তাঁর (মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রশংসায় কিছু হাদিস জাল করেছে, যাতে শিয়া-রাফেজিদের (চরমপন্থী শিয়া) ক্রোধান্বিত করা যায়। অন্যদিকে শিয়া-রাফেজিদের একটি দল তাঁর নিন্দায় কিছু হাদিস জাল করেছে। অথচ এই উভয় পক্ষই জঘন্য ভুলের ওপর রয়েছে।” [কিতাবুল মাওযুআত, ইবনুল জাওযী (২/২৪)] মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সংক্রান্ত এই মিথ্যার জাল ও বিকৃতি কেবল হাদিসের কিতাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন, গল্প এবং সাহিত্যের কিতাবগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একজন পাঠক যখন এসব কিতাব পড়েন তখন তিনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ পরস্পরবিরোধী তথ্যের সম্মুখীন হন। এর একদিকে রয়েছে তাঁর অতিভক্তদের তৈরি করা অতিরঞ্জিত প্রশংসা, আর অন্যদিকে রয়েছে তাঁর চরম বিদ্বেষীদের উদ্ভাবিত নিন্দা ও কুৎসা।
❑ এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়:
একজন গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চরম সতর্কতার সাথে গবেষণায় নামা। এই মানসিকতা তাকে এমনভাবে তৈরি করবে যেন কোনো তথ্যই তিনি যাচাই না করে গ্রহণ করবেন না এবং সেই তথ্যের প্রাসঙ্গিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবেন-যাতে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি একটি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কোনো গবেষকের পক্ষেই সতর্কতা অবলম্বন না করে এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো অবস্থান নেওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বা পদ্ধতিগত কোনোভাবেই সঠিক নয়। এই নীতি শুধু মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় বরং এটি একটি সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক নীতি যা অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অ্যারিস্টটল—যাঁকে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে বা মার্টিন লুথার—যাঁকে নিয়েও তীব্র মতভেদ রয়েছে—তাঁদের সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগেও একজন গবেষকের জন্য গবেষণায় সতর্ক থাকা, বর্ণনার সত্যতা ও সকল তথ্যের সঠিক অর্থ নিশ্চিত করা আবশ্যক—যাতে একটি ন্যায্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।
যদিও এই নিয়মটি সবার জন্যই প্রযোজ্য তবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ, তাঁদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান এবং তাঁরা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহচর্য ও সান্নিধ্য পেয়েছেন। এমন অনেক নসুস (দলিল), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে যা প্রমাণ করে যে—তাঁদের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার একটি গবেষণাপত্রে, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে “সাহাবি প্রজন্মের ইতিহাস পর্যালোচনার পদ্ধতিগত রূপরেখা” (المَدخلُ المنهجيُّ للتعاملِ مع جيلِ الصحابةِ) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।” এসব শরয়ি প্রশংসা এবং যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক এসব তথ্যের কারণেই মুমিনদের হৃদয়ে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এক বিশাল মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান অত্যন্ত গভীর। মুসলিম উম্মাহ সবসময় তাঁদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ এবং তাঁদের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র রাখার নীতি অনুসরণ করে থাকে—যতক্ষণ না এর বিপরীতে অত্যন্ত জোরালো ও অকাট্য কোনো দলিল পাওয়া যায়। এই কারণেই সাহাবিগণের জীবন ও তাঁদের পারস্পরিক বিবাদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞান, ইনসাফ, সতর্কতা, নিশ্চিত যাচাই-বাছাই এবং পরিষ্কার হৃদয় ছাড়া এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা আলোচনায় লিপ্ত হওয়া মোটেও বৈধ নয়। এই তথ্য ও উপাত্তগুলোই হলো সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ভিত্তি করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের উলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)এর মধ্যকার পারস্পরিক মতভেদ ও বিবাদ নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করার (অর্থাৎ সমালোচনা না করার) মত প্রদান করেছেন। তাঁদের এই রায় কেবল যুক্তিহীন কোনো দাবি নয় বরং এটি শরয়ি, ঐতিহাসিক এবং যৌক্তিক দলিলের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা সাহাবিগণের মর্যাদা, তাঁদের সুউচ্চ স্থান এবং তাঁদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও সততার প্রমাণ দেয়। পূর্বের আলোচনা এটিই নিশ্চিত করে যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি আরও জোরালো ও উচ্চতর হওয়া উচিত।
◈ এর প্রথম কারণ হলো—তিনি একজন সাহাবি (রা.)।
◈ দ্বিতীয়ত কারণ—তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র।
এই পরিস্থিতিই তাঁর ক্ষেত্রে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ও কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করাকে অপরিহার্য করে তোলে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে সেই ‘চরম সতর্কতা’র নিয়মটি মেনে চলেনি। তাঁরা হয় তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখিয়েছে অথবা অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভুল করেছে। তাঁরা মুয়াবিয়া (রা.)-এর কুৎসা সম্বলিত বিভিন্ন গল্প ও সংবাদের ওপর নির্ভর করেছে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তাঁর ব্যাপারে অন্যায্য ও জুলুমপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: উসমান (রা.)-এর যুগে মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ভারতে মূর্তি বিক্রি করতেন কিংবা তিনি মদ্যপান করতেন—এই জাতীয় বিভিন্ন অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হয় যে, অনেক আলেম তাঁদের হাদিস বা ইতিহাসের কিতাবে এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। অথচ আমরা সবাই জানি, ইতিহাস বা সংবাদের কিতাবে যা কিছু উল্লেখ করা হয় তার সবই সহিহ বা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তাতে প্রচুর দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রয়েছে। [এই সংবাদগুলোর দুর্বলতা প্রমাণের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ‘সাল্লুস সিনান ফিয যাব্বি আন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান’ (মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সপক্ষে বর্শা চালনা বা প্রতিরক্ষা” [অর্থাৎ তাঁর সম্মান রক্ষায় লেখনীর মাধ্যমে জোরালো প্রতিবাদ]। লেখক: সাদ আস সুবাইয়ী (পৃষ্ঠা: ১৯৭-ডিজিটাল সংস্করণ] এর বাইরেও আমরা যদি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় বর্ণিত সংবাদগুলো পরীক্ষা করি তবে দেখতে পাব যে, এগুলোর সনদ বা সূত্রগুলো বাতিল এবং এগুলোতে এমন সব ‘ইলাল’ বা হাদিসতাত্ত্বিক ত্রুটি রয়েছে যা এগুলোর অসারতা প্রমাণ করে। উপরন্তু এই বর্ণনাগুলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর ফজিলত বা মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলোর বিরোধী এবং সেইসব যৌক্তিক প্রমাণেরও পরিপন্থী যা এই গবেষণার সামনে আসবে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই শিথিলতা আমাদের এমন সব ভুল পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে যা বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতির বিরোধী। কারণ, এই শিথিলতা একদিকে যেমন মুয়াবিয়া (রা.)-এর ব্যাপারে অতি ভক্তি পোষণকারীদের সামনে দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে এমন সব ফজিলত প্রমাণের পথ খুলে দেবে যা প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত নয়—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে যেমন শিথিলতা দেখানো সঠিক নয়। তেমনি তাঁর ফজিলত প্রমাণের ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখানো জায়েজ নয়।
অন্যদিকে, এটি আলি বিন আবু তালিব (রা.)বা অন্যান্য সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের জন্যও সুযোগ করে দেবে, যাতে তারা অনির্ভরযোগ্য ও অপ্রমাণিত বর্ণনা দিয়ে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের নামে কুৎসা রটাতে পারে। সঠিক ও পদ্ধতিগত পথ হলো—সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে ‘চরম সতর্কতা’র নীতি বজায় রাখা, বিশেষ করে যাঁদের নিয়ে বিতর্ক বা মতভেদ রয়েছে। আমরা তাঁদের জন্য এমন কোনো ফজিলত প্রমাণ করব না যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। আবার তাঁদের প্রতি এমন কোনো নিন্দাও আরোপ করব না যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। এসব বিষয় এটাই প্রমাণ করে যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিন্দায় যারা শিথিলতা দেখায় বা বাড়াবাড়ি করে, তাদের মূল সমস্যা বিক্ষিপ্ত কোনো উদাহরণ বা তথ্যের মধ্যে নয়; বরং সমস্যাটি তাদের চিন্তাধারা ও ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতির মূলে। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইতিহাস পর্যালোচনায় আমাদের কেবল তথ্যের পাহাড় জমানোর প্রয়োজন নেই বরং প্রয়োজন হলো কোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখা। সেই সাথে যে ভুল পথগুলো মানুষকে ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করে, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা।

Translate