Saturday, March 14, 2026

সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনিন এর মর্যাদা রক্ষা করা

 সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনিন (রা.)-এর মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাদের প্রতি যারা শত্রুতা পোষণ করে তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা ওয়াজিব:

ইসলামের ভিত্তি যাদের ত্যাগ ও কুরবানির ওপর দাঁড়িয়ে সেই শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবায়ে কেরাম এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র স্ত্রীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কেবল নিন্দনীয় নয় বরং এটি দ্বীনের শিকড়ে আঘাত করার শামিল।
✪ সাহাবায়ে কেরামের সম্মান রক্ষা:
আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) সহ সকল সাহাবির ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন। যারা তাঁদের গালিগালাজ করে বা তাঁদের ওপর কুফর আরোপ করে তারা মূলত আল্লাহর ফয়সালাকে অস্বীকার করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
“আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসার এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” [সূরা তাওবা: ১০০]
✪ উম্মাহাতুল মুমিনিনের পবিত্রতা:
মা জননী আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে অবতীর্ণ করেছেন। যারা তাঁকে অপবাদ দেয় বা গালি দেয় তারা সরাসরি কুরআনের আয়াতকে অস্বীকার করার কারণে ইসলামের গণ্ডি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তাই উম্মাহাতুল মুমিনিন হাফসা (রা.) সহ সকল স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের ইমানি দায়িত্ব।
পবিত্র কুরআনে মা জননী আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা সূরা নূরের ১১ থেকে ২১ নম্বর পর্যন্ত মোট ১১টি আয়াত নাজিল করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ করে নিচের আয়াতটিতে তাঁর চারিত্রিক শুভ্রতা এবং যারা তাঁর ওপর অপবাদ আরোপ করে তাদের কঠোর পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ۚ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم ۖ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ ۚ وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“যারা এই অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল; একে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে তা-ই যা সে পাপ হিসেবে কামাই করেছে। আর তাদের মধ্যে যে এই অপবাদের বড় দায়িত্বটি গ্রহণ করেছে, তার জন্য রয়েছে কঠিন আজাব।” [সূরা নূর: ১১]
একই সূরার ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন:
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ ۚ أُولَٰئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ۖ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
“দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। আর সচ্চরিত্রা নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্রা নারীদের জন্য। তারা যা বলে, এরা তা থেকে মুক্ত। এদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।” [সূরা নূর: ২৬]
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মতো পবিত্র ব্যক্তিত্বের জন্য আল্লাহ পবিত্রা নারীকেই নির্ধারণ করেছেন এবং আয়েশা (রা.) সকল অপবাদ থেকে মুক্ত। যারা এরপরেও তাঁকে অপবাদ দেয় তারা সরাসরি কুরআনের এই আয়াতগুলোকে অস্বীকার করার শামিল।
✪ সাহাবিদের প্রতি কটুক্তি করা নিষিদ্ধ:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেওয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:
لا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلوْ أنَّ أحَدَكُمْ أنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا ما بَلَغَ مُدَّ أحَدِهِمْ، ولا نَصِيفَهُ
“তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিও না। কসম সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করো তবুও তাঁদের এক মুদ (এক অঞ্জলি) বা তার অর্ধেক পরিমাণ সওয়াবও অর্জন করতে পারবে না।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৪০]
❑ আমাদের অবস্থান ও করণীয়:
যারা দ্বীনের এই আলোকবর্তিকাদের প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করে এবং তাঁদেরকে অপবাদ দেয়━
◈ তাদের ভ্রান্ত আকিদা থেকে নিজেকে এবং সমাজকে দূরে রাখা ওয়াজিব।
◈ ইসলামের শত্রুদের পতন বা তাদের অনিষ্ট থেকে উম্মাহর মুক্তি পাওয়া অবশ্যই মুমিনের জন্য স্বস্তির বিষয়।
◈ তাদের সাথে ধর্মীয় কোনও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক থাকতে পারে না। কারণ তারা ইসলামের ভিত্তি মূলেই মূলেই কুঠারাঘাত করেছে।
◈ সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনিনের প্রতি ভালোবাসা রাখা ইমানের অংশ এবং তাঁদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা নিফাকের আলামত। যারা তাঁদের প্রতি চরম বিদ্বেষ রাখে তাদের কোনও পথ বা মতের সাথে একজন প্রকৃত মুমিনের আপস হতে পারে না।
❑ সাহাবায়ে কেরাম এবং উম্মাহাতুল মুমিনিন (রা.)-এর শানে যারা চরম ধৃষ্টতা দেখায় তাদের মৃত্যুতে আমাদের অবস্থান:
সাহাবায়ে কেরাম এবং উম্মাহাতুল মুমিনিন (রা.)-এর শানে যারা চরম ধৃষ্টতা দেখায় এবং কুফরি আকিদা পোষণ করে তাদের মৃত্যু বা পতনে একজন মুমিনের মনের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত তা ইসলামের ইতিহাসের আলোকে নিচে তুলে ধরা হলো:
❑ ইসলামের শত্রুদের মৃত্যুতে খুশি হওয়া আবশ্যক:
ইসলামি শরিয়ত ও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, যারা দ্বীন ইসলাম, সাহাবায়ে কেরাম এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র স্ত্রীদের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে এবং উম্মাহর মধ্যে ফিতনা ছড়ায় তাদের মৃত্যুতে আনন্দিত হওয়া বা স্বস্তি প্রকাশ করা মুমিনের ঈমানি চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
যারা সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং উম্মাহাতুল মুমিনিন (রা.)এর ওপর অপবাদ দেয় তারা মূলত দ্বীনের ভিত্তি ধ্বংস করতে চায়। এ ধরনের ফিতনা সৃষ্টিকারীদের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করা জায়েজ। কারণ এর মাধ্যমে ইসলামের শত্রু ও ফিতনার অবসান ঘটে। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক কুখ্যাত বিদআতি বা ইসলামের দুশমন যখন মৃত্যুবরণ করেছে, তখন তৎকালীন বড় বড় আলেমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, বিদআতি ও পথভ্রষ্টদের মৃত্যুতে কি খুশি হওয়া যাবে? তিনি বলেছিলেন, “কে না এতে খুশি হবে?” সালাফগণ বলতেন যখন কোনও বড় ফিতনাবাজ বা সাহাবায়ে কেরামের কুৎসা রটনাকারী মারা যায় তখন তা উম্মাহর জন্য খুশির কারণ।
মা জননী আয়েশা (রা.)-এর নামে অপবাদ দেওয়া বা আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর মতো মহান সাহাবিদের কাফের বা মুরতাদ বলা চরমতম ধৃষ্টতা। যারা এই পথভ্রষ্ট আকিদা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় তাদের মৃত্যুতে খুশি হওয়া মানে তাদের প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয় বরং দ্বীনের সম্মান রক্ষা পাওয়া এবং ফিতনা কমে যাওয়ার কারণে আনন্দিত হওয়া।
জালিমদের পতন মুমিনদের অন্তরের প্রশান্তি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের অন্তর প্রশান্ত করার কথা বলেছেন যখন জালেমদের পতন ঘটে:
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ
“এবং তিনি মুমিন সম্প্রদায়ের অন্তরসমূহকে প্রশান্ত করবেন।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১৪]
যারা সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেয় তারা নিঃসন্দেহে মুমিনদের হৃদয়ে কষ্ট দেয়। তাই তাদের মৃত্যুতে মুমিনদের অন্তর শান্ত হওয়া স্বাভাবিক এবং এটি ঈমানি গায়রত বা আত্ম মর্যাদাবোধের পরিচয়। যারা চরমপন্থি শিয়া আকিদা পোষণ করে এবং সাহাবায়ে কেরাম ও মা আম্মাজানদের প্রতি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, তাদেরকে জাহান্নামী, ষড়যন্ত্রকারী, মুরতাদ ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করে তাদের মৃত্যুতে খুশি হওয়া বা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কারণ এতে দ্বীনের শত্রুর দাপট কমে এবং ইসলামের সম্মান সমুন্নত থাকে।
তবে এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা অহেতুক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

No comments:

Post a Comment

Translate