প্রশ্ন: কিছু মানুষ যখন বিপদ-আপদে পতিত হয় কিংবা তীব্র ব্যথা-বেদনায় কাতর হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে “ইয়া মুহাম্মদ” “ইয়া আলী”“ওগো বাবা”, “ওগো মা”, “ওগো ভাই” অথবা কোনো জড় বস্তুকে ডাকে—এরূপ ডাকা কি শিরক হিসাবে গণ্য হবে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র। প্রতি অতঃপর কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালিহীনদের গ্রন্থাবলি অধ্যয়ন এবং পর্যালোচনার পর যে উপলব্ধি সুস্পষ্ট হয়েছে তা হলো—অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি কিংবা জড় বস্তুকে আহ্বান করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিরক নয়; বরং এর শরঈ হুকুম নির্ধারিত হয় আহ্বানের উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং অন্তর্নিহিত আক্বীদার ভিত্তিতে।কারণ, আরবি ভাষায় “ডাকা” (নিদা/দু‘আ) শব্দটি কেবল সাড়া বা জবাব প্রত্যাশার অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বহুবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়,যা প্রসঙ্গ, প্রয়োগ ও ভাষাগত প্রমাণের আলোকে নির্ধারিত হয়। আরবি ভাষার সাহিত্য ও কবিতায় এ ধরনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়।এ ধরনের শব্দ কখনো তা আর্তনাদ, কখনো বেদনা, আবার কখনো গভীর আক্ষেপ ও শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
.
উদাহরণস্বরূপ এক কবি মাআন ইবনু যায়িদা-এর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন:فَيَا قَبْرَ مَعْنٍ كَيْفَ وَارَيْتَ جُودَهُ ** وَقَدْ كَانَ مِنْهُ الْبَرُّ والْبَحْرُ مُتْرَعاً”হে মাআনের কবর!তুমি কীভাবে তার উদারতাকে আড়াল করে রাখলে—অথচ তার দানশীলতা ছিল এমন, যা স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয়ই পরিপূর্ণ করে দেওয়ার মতো বিস্তৃত!”
.
কখনো এটি বিস্ময় প্রকাশের জন্য হয়। যেমন ত়ারাফাহ বলেছেন:”يا لَكِ من قُبَّرَةٍ بمَعْمِرِ خَلاَ لَكِ الجَوُّ فَبِيضي واصْفِري”হে ছোট পাখি (কুব্বারা)! কী অদ্ভুত তোমার অবস্থা এই বসতভূমিতে! তোমার জন্য আকাশ ফাঁকা হয়েছে—তাই তুমি নিশ্চিন্তে ডিম দাও এবং আনন্দে শিস দাও (ডাক দাও)।”
.
কখনো এর উদ্দেশ্য হয় বিলাপ বা শোক প্রকাশ, অর্থাৎ কোনো কিছুর জন্য দুঃখ বা কষ্ট প্রকাশ করা। যেমন আবুল আলা বলেছেন:فواعجباً كم يدَّعي الفضلَ ناقصٌ ** وَوَا أسفاً كم يظهر النقص فاضل”আশ্চর্যের বিষয়, কত অপূর্ণ মানুষ নিজেকে গুণবান দাবি করে আর হায় আফসোস, কত গুণবান মানুষের মধ্যেই ত্রুটি প্রকাশ পায়।
.
কখনো এমন ব্যক্তিকেও সম্বোধন করা হয়, যাকে শোনানো উদ্দেশ্য নয়। যেমন কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করতে গিয়ে বলা: يا زيد ما أجلّ مصيبتنا بفقدك.
হে যায়েদ! তোমাকে হারিয়ে আমাদের বিপদ কতই না বড়!
.
এ ধরনের উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি-ঘর, বসতভিটা বা বাহনকে সম্বোধন করা। যেমন আবুল আলা বলেছেন:يا ناقُ جِدّي فقدْ أفنَتْ أناتُكِ بي ** صَبري وعُمري وأحلاسي وأنساعي “হে উটনী! দ্রুত চলো; তোমার এই ধীরগতি আমার ধৈর্য ও জীবন শেষ করে দিচ্ছে, আর (দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে) আমার আসবাবপত্র ও উটের পিঠের রশিগুলোও জীর্ণ করে দিচ্ছে।”
.
নাবিগাতুয যিবয়ানী বলেছেন:يا دارَ مَيَّةَ بِالعَلياءِ فَالسَنَدِ ** أَقوَت وَطالَ عَلَيها سالِفُ الأَبَدِ “হে আলিয়া ও সানাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত মাইয়্যার ঘর! তুমি এখন জনশূন্য হয়ে গেছ, এবং সুদীর্ঘকাল তোমার ওপর দিয়ে সময় বয়ে গেছে।”
.
ইমরুল কায়েস বলেছেন:أَلا عِم صَباحاً أَيُّها الطَلَلُ البالي ** وَهَل يَعِمَن مَن كانَ في العُصُرِ الخالي” শুনো, ওহে জীর্ণ ধ্বংসস্তূপ! তোমার সকালটি আনন্দময় হোক। কিন্তু যে অতীতকালের (স্মৃতিতে) রয়ে গেছে, তার পক্ষে কি আর আনন্দময় জীবন কাটানো সম্ভব?
.
কখনো সময়কেও সম্বোধন করা হয় এর দীর্ঘতার অভিযোগ জানাতে, অথবা এতে প্রাপ্ত আনন্দের প্রশংসা করতে। যেমন ইমরুল কায়েস তার দীর্ঘ রাতের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন:أَلاَ أَيُّها اللَّيْلُ الطَّوِيلُ أَلاَ انْجَلِي ** بِصُبْحٍ وَمَا الإِصْبَاحُ مِنْكَ بِأَمْثَহে দীর্ঘ রজনী! তুমি কি শেষ হবে না? সকাল নিয়ে আসো যদিও (আমার কাছে) সেই সকালও তোমার চেয়ে উত্তম কিছু নয়।”
.
ইবনে শাজারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ৫৪২ হি.)-বলেন:فهذه وجوه شتّى قد احتملها النّداء، وإن كان في أصل وضعه لتنبيه المدعوّ “এগুলো (নিদাহ বা সম্বোধনের) বিভিন্ন দিক বা প্রকারভেদ যা ‘নিদাহ’ (ডাকা)-র মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে; যদিও শব্দগতভাবে এর মূল ব্যাকরণিক উদ্দেশ্য হলো যাকে ডাকা হচ্ছে তাকে কেবল সচেতন বা সজাগ করা।”(আমালি ইবনু শাজারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৭; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২৩৭৯৬৮) অর্থাৎ ইবনে শাজারী (রাহিমাহুল্লাহ) বোঝাতে চেয়েছেন যে, ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ডাকার কাজ কেবল কাউকে সজাগ করার জন্য হলেও, সাহিত্যের গভীরে এর ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। প্রসঙ্গের ওপর ভিত্তি করে একটি সাধারণ ‘ডাক’ বা ‘সম্বোধন’ বহু অর্থ ও ব্যঞ্জনা বহন করতে পারে। অর্থাৎ, নিদাহ-এর বাহ্যিক কাঠামো এক হলেও এর অভ্যন্তরীণ তাৎপর্য বা মর্ম অনেক গভীর ও বহুমুখী।
.
আল বালাগাতুল আরাবিয়া আসাসুহা ওয়া উলুমুহা ওয়া ফুনুনুহা বইয়ে রয়েছে:وقد يخرج النداء عن المعنى الأصليّ الموضوع له ، فيُسْتَعْمَلُ لدى البلغاء وغيرهم في أغراضٍ أخْرى غير النداء، وهذه الأغراضُ تُفْهَمُ من قرائن الحال أو قرائن المقال ، فكلُّ حَرَكَةٍ نفسيَّةٍ ذات مشاعِرَ ، تَدْفَعُ الإِنسان إلى التعبير عنها بنداء ما ، بطريقةٍ تلقائية ، ولو لم يشعر بأنّ هذا النداء يحقق له مرجوّاً أو مأمولاً ، أو يدفع عنه مكروها.كأن يستعمل النداء في : الزّجْر واللّوم ، أو التحسّر والتأسّف والتّفجع والندم أو النُّدْبة ، أو الإِغراء ، أو الاستغاثة ، أو اليأس وانقطاع الرجاء ، أو التمني ، أو التذكر وبث الأحزان ، أو التضجر ، أو الاختصاص ، أو التعجب ، إلى غير ذلك”কখনও কখনও ‘নিদা’ (আহ্বান) তার জন্য নির্ধারিত মূল অর্থের গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। বাগ্মীগণ এবং ভাষাবিদগণ একে কেবল ডাকার জন্য নয়, বরং বিবিধ উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করে থাকেন। এই উদ্দেশ্যগুলো পরিস্থিতি (Context of situation) কিংবা প্রসঙ্গের (Context of speech) ইঙ্গিত থেকে অনুধাবন করা যায়। মূলত, আবেগতাড়িত প্রতিটি মানসিক স্পন্দনই মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো না কোনো আহ্বানের মাধ্যমে তার মনের ভাব প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করে; যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি সর্বদা এটি অনুভব করে না যে, এই আহ্বানের মাধ্যমে তার কোনো উদ্দেশ্য পূরণ হবে কিংবা কোনো অনিষ্ট দূর হবে।যেমন,’নিদা’ বা সম্বোধন নিম্নোক্ত অর্থসমূহে ব্যবহৃত হতে পারে:ভর্ৎসনা ও তিরস্কার,আক্ষেপ,আতিশয্য দুঃখ ও শোক প্রকাশ, অনুশোচনা বা বিলাপ, উৎসাহ প্রদান বা প্রলুব্ধকরণ,আর্তনাদ বা সাহায্য প্রার্থনা, হতাশা ও নিরাশা, আকাঙ্ক্ষা বা তামান্না, স্মৃতিচারণ ও দুঃখের বহিঃপ্রকাশ, বিরক্তি বা অসহিষ্ণুতা, বিশেষত্ব প্রদান বা নির্দিষ্টকরণ, বিস্ময় প্রকাশ ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্যে।”(আরো দেখুন; জাওয়াহিরুল বালাগাহ ফিল মাআনী ওয়াল বায়ান ওয়াল বাদিঈ পৃষ্ঠা: ৯০; উলুমুল বালাগাহ আল বায়ান ওয়াল মাআনী ওয়াল বাদিঈ পৃষ্ঠা: ৮২; আল বালাগাতুল আরাবিয়া; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৫০)
.
দ্বিতীয়ত: অনুপস্থিত কোন ব্যক্তি কিংবা জড়বস্তুকে ডাকা কখন শিরক বলে গণ্য হবে?
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করলে যখন কোন মানুষ বলে: ‘ওগো বাবা’, ‘ওগো মা’, ‘ওগো ভাই’, বা ‘ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া আলী’, এমনকি কোনো জড় বস্তুকে সম্বোধন করলে, তখন এর দুটি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে—যার মধ্যে একটি শিরক এবং অন্যটি শিরক নয়।”
.
(১).যখন এধরনের আহ্বান শিরক: এই ধরনের আহ্বান তখন শিরকের অন্তর্ভুক্ত হয়, যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করে, বিপদ মুক্তির দোয়া করে কিংবা এমন বিষয়ে সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা করে যা পূরণ করার ক্ষমতা আল্লাহ ব্যতীত আর কারো নেই। এই অন্য সত্তা নবী, ওলি, ফেরেশতা, জিন কিংবা অন্য যেকোনো সৃষ্টিই হোক না কেন—তা শিরক হিসেবে গণ্য হবে।এই আহ্বানের দুটি রূপ হতে পারে: (১). প্রত্যক্ষ প্রার্থনা: যেমন সরাসরি বলা—’হে অমুক’ বা ‘হে মুহাম্মদ’ বা ‘হে আলী, আমার অমুক প্রয়োজন পূরণ করে দিন।’আমার বিপদ দূর করুন’ কিংবা ‘আমাকে সাহায্য করুন’ কিংবা ‘শক্তিবৃদ্ধি করুন’ ইত্যাদি।(২).পরোক্ষ প্রার্থনা (ইস্তিআনা): যেমন কোনো ভারী বস্তু তোলার সময় বা বিপদে পড়ে ‘ইয়া মুহাম্মদ’ বা ‘ইয়া আলী’ ও আব্বা ইত্যাদি বলে চিৎকার করা। এটি মূলত সাহায্য প্রার্থনা, যা ইবাদতের অংশ। কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মতের ঐক্যমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে আল্লাহ ছাড়া কোনো মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তিকে এভাবে ডাকা ‘শিরকে আকবর’ বা বড় শিরক। এটি একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয় এবং তার তাওহীদকে বাতিল করে দেয়। আল্লাহকে ডাকা বা দোয়া করা—তা কোনো কিছু চাওয়ার (দোয়া আল-মাসআলাহ) জন্যই হোক কিংবা ইবাদতের (দোয়া আল-ইবাদাহ) উদ্দেশ্যে বিনয় প্রকাশ ও নিজেকে সঁপে দেওয়াই হোক—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য তা করা জায়েয নেই। আল্লাহর প্রাপ্য এই মর্যাদা অন্য কাউকে প্রদান করাই হলো দোয়ার ক্ষেত্রে শিরক।
.
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: “সুতরাং তার চেয়ে কে অধিক যালিম, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ রটায় কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। তাদের ভাগ্যে লিখিত অংশ তাদের কাছে পৌঁছবে। অবশেষে যখন আমার প্রেরিত-দূতরা (ফেরেশতারা) তাদের নিকট তাদের জান কবজ করতে আসবে, তখন তারা বলবে, ‘কোথায় তারা, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকতে’? তারা বলবে, ‘তারা আমাদের থেকে হারিয়ে গিয়েছে’ এবং তারা নিজদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, নিশ্চয় তারা ছিল কাফির।”[সূরা আরাফ: ৩৭] আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেন: “আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”।[সূরা ইউনুস: ১০৬] আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেন: “তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে স্থলে পৌঁছে দেন, তখনই তারা শির্কে লিপ্ত হয়।”।[সূরা আনকাবুত: ৬৫] এখানে শির্ক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- গায়রুল্লাহ্কে ডাকা তথা প্রার্থনা করা। আল্লাহ্ আরও বলেন: “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যে বিষয়ে তার কাছে কোন প্রমাণ নেই; এর হিসাব (শাস্তি) হবে কেবলই তার রবের কাছে। নিশ্চয় কাফিরেরা সফলকাম হবে না।”[সূরা মুমিনূন: ১১৭] যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহ্কে ডাকে এটি তার ব্যাপারে সাধারণ হুকুম। আহুত সত্তাকে সে উপাস্য অভিহিত করুক কিংবা সাইয়্যেদ অভিহিত করুক কিংবা ওলী বা কুতুব অভিহিত করুক– হুকুমে কোন পার্থক্য নেই। কেননা আরবী ভাষায় ‘ইলাহ্’ বলা হয় উপাস্যকে। অতএব, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহ্ এর উপাসনা করল সে তাকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করল। যদিও মৌখিকভাবে সে এটা অস্বীকার করুক না কেন। এগুলো ছাড়াও অনেক সুস্পষ্ট আয়াতে কারীমসমূহ রয়েছে।
.
সহিহ বুখারীতে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন অংশীদারকে ডাকে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”(সহিহ বুখারী হা/৪৪৯৭) আলেমগণ এই মর্মে ইজমা (ঐকমত্য) করেছেন যে, যে বক্তি তার মাঝে ও আল্লাহ্র মাঝে বিভিন্ন-মাধ্যম বানিয়ে সেসব মাধ্যমকে ডাকে ও মাধ্যমদের উপর নির্ভর করে তারা কাফের। এই বিধান থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ডাকাও বাদ দেয়া হয়নি।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”فمن جعل الملائكة والأنبياء وسائط يدعوهم ويتوكل عليهم ، ويسألهم جلب المنافع ودفع المضار ، مثل أن يسألهم غفران الذنب ، وهداية القلوب ، وتفريج الكروب ، وسد الفاقات : فهو كافر بإجماع المسلمين “যে ব্যক্তি ফেরেশতাদেরকে কিংবা নবীদেরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদেরকে ডাকে, তাদের উপর নির্ভর করে, কল্যাণ আনয়ন ও অকল্যাণ দূর করার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে; যেমন- গুনাহ মাফ, অন্তরের হেদায়েত প্রাপ্তি, বিপদাপদ দূর হওয়া, অভাব দূর হওয়ার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে মুসলিম উম্মাহ্র ইজমা অনুযায়ী সে কাফের।”(মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ১২৪) থেকে সমাপ্ত) এ ইজমার প্রতি সম্মতি জানিয়ে একাধিক আলেম তা (নিজেদের গ্রন্থে) উদ্ধৃত করেছেন। যেমন দেখুন: “ইবনে মুফলিহ এর ‘আল-ফুরু’ (৬/১৬৫), ‘আল-ইনসাফ’ (১০/৩২৭), ‘কাশ্শাফুল ক্বিনা’ (৬/১৬৯), ‘মাতালিবু উলিন নুহা’ (৬/২৭৯)। কাশ্শাফুল ক্বিনা গ্রন্থে এই ইজমাটি উল্লেখ করার পর ‘মুরতাদ এর হুকুম পরিচ্ছেদ’-এ বলেন:لأن ذلك كفعل عابدي الأصنام قائلين: (ما نعبدهم إلا ليقربونا إلى الله زلفى)”কেননা তা মূর্তিপূজারীদের কর্মের মত যারা বলে: “আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।”(সমাপ্ত; কাশশাফুল ক্বিনা; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৬৯)
.
(২).যখন শিরক নয়: কাউকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি কিছু না চেয়ে কেবল তাকে অন্তরে স্মরণ করা বা ভক্তিভরে সম্বোধন করা শিরক নয়। যেমন— আবেগঘন মুহূর্তে ‘ওগো মা’ বা ‘ওগো বাবা’ বলে স্মরণ করা, কিংবা দরূদ পাঠের উদ্দেশ্যে ‘ইয়া মুহাম্মদ (ﷺ) বলা। যেহেতু এখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোনো সাহায্য প্রার্থনা করা হচ্ছে না, তাই এটি শিরকের পর্যায়ভুক্ত নয়।কেননা এর মধ্যে গাইরুল্লর কাছে প্রার্থনা নেই আর শিরকের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়া।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,( يا محمد يا نبي الله ) هذا وأمثاله نداء يُطلب به استحضار المنادَى في القلب ، فيخاطب المشهود بالقلب ، كما يقول المصلي : (السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته ) ، والإنسان يفعل مثل هذا كثيرا ، يخاطب من يتصوره في نفسه ، وإن لم يكن في الخارج من يسمع الخطاب “ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া নবী’ এগুলো এবং এ জাতীয় অন্য কথাগুলো সম্বোধনসূচক। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- সম্বোধিত ব্যক্তিকে অন্তরে স্মরণ করা এবং অন্তরে উপস্থিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করা। যেমনটি নামাযী ব্যক্তি বলে থাকেন: “আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ” (হে নবী, আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহ্র রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এ ধরণের সম্বোধন করে থাকে। নিজের মনে যাকে কল্পনা করছে তাকে সম্বোধন করে থাকে যদিও বহির্জগতে সে তার সম্বোধন শুনে না।”(ইবনু তাইমিয়া;ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম লি মুখালাফাতি আসহাবিল জাহিম; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯)
.
আর শাইখ সুলাইমান ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:المستغاث به عندهم هو الذي يُدعى ويُسأل ويُطلب منه الغوث ، والمنادي هو داعي المنادَى .لكن فرقوا بين دعاء المستغاث به وغيره ، كما فرقوا بين دعاء الندبة وغيره ، كقوله : يا حسرتا على ما فرطت ، وقولهم : يا أبتاه ، يا عمراه ، ونحو ذلك مما يلحقون في آخره ألفاً لأجل مد الصوت ، إذ النادب الحزين يمد صوته وهو يندب ما قد فات ، فيمد الصوت في آخر دعائه كقوله: يا أسداه ، يا ركناه ، يا أبتاه ، حتى قالوا يا أمير المؤمنيناه ، يا عبد الملكاه ، إذ نداء الندبة يقوله الإنسان عند حدوث أمر عظيم، ويقوله للتوجع، كقول سارة حين بشرت بإسحق: يا ويلتا.بخلاف المستغيث فإنه يدعو المستغاث به كما يدعو غيره ، فيقول: يا لزيد ، كقوله يا زيد ، لكن دل بهذه الصيغة أنه يطلب منه الإعانة على ما يهمه من أموره مطلقاً ، بخلاف النداء المجرد فإنه لا يدل على ذلك .فالمستغيث بالشيء : داعيه ، مع زيادة طلب الإغاثة”তাদের (ভাষাবিদদের) পরিভাষায়, ‘মুস্তাগাছ বিহি’ (যার নিকট উদ্ধারের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা হয়) হলেন তিনিই—যাকে আহ্বান করা হয়, যার নিকট যাঞ্চা করা হয় এবং যার কাছে ত্রাণ বা উদ্ধার কামনা করা হয়। আর ‘মুনাদী’ হলেন কেবল আহ্বানকারী। তবে তাঁরা (ভাষাবিদগণ) ‘সাহায্য প্রার্থনামূলক আহ্বান’ (ইস্তিগাছা) এবং অন্যান্য আহ্বানের মধ্যে পার্থক্য করেছেন; যেমনটি তাঁরা ‘বিলাপসূচক আহ্বান’ (নুদবাহ) এবং অন্যান্য ডাকের মাঝে পার্থক্য করেছেন।যেমন: হায় আফসোস, আমি যা অবহেলা করেছি তার জন্য, অথবা তাদের কথা:—’হে আমার পিতা!’ (ইয়া আবাতাহ), ‘হে উমর!’ (ইয়া উমারাহ)—এই জাতীয় শব্দসমূহ, যেখানে তারা স্বর দীর্ঘ করার জন্য শব্দের শেষে একটি ‘আলিফ’ যুক্ত করে।কেননা,শোকাতুর ব্যক্তি বিলাপ করার সময় বিয়োগব্যথায় কণ্ঠ প্রলম্বিত করে থাকে। তাই সে তার আর্তনাদের শেষে স্বর টেনে বলে: ‘হে আমার সিংহ!’ (ইয়া আসাদাহ), ‘হে আমার আশ্রয়!’ (ইয়া রুকনাহ), ‘হে পিতা!’ (ইয়া আবাতাহ); এমনকি তারা ‘হে আমীরুল মু’মিনীন!’ (ইয়া আমীরাল মু’মিনীনাহ), ‘হে আব্দুল মালিক!’ (ইয়া আব্দুল মালিকাহ) পর্যন্ত বলে থাকে। কারণ, বিলাপসূচক এই আহ্বান মানুষ কোনো মহাবিপদ বা তীব্র যাতনা প্রকাশের সময় ব্যবহার করে; যেমনটি সারা (আলাইহিস সালাম) ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর সুসংবাদ পাওয়ার সময় (বিস্ময়াভিভূত হয়ে) বলেছিলেন: ‘হায় দুর্ভোগ!’ (ইয়া অয়লাতা)। পক্ষান্তরে,(‘মুস্তাগিছ’) যে সাহায্য প্রার্থনা করে, সে যার কাছে সাহায্য চায় তাকে এমনভাবে ডাকে, যেমন অন্যকে ডাকে। যেমন সে বলে: ইয়া লি-যাইদিন’ (হে জায়েদ—সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসো)। কিন্তু এই বিশেষ বাক্যরীতির (ইস্তিগাছা) মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয় যে, সে তার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওই ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছে—যা কেবল সাধারণ আহ্বানের (নিদা) মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। সারকথা হলো: কোনো সত্তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা (ইস্তিগাছা) করার অর্থ হলো—তাকে আহ্বান করা, তবে এতে ‘উদ্ধার বা সাহায্য’ চাওয়ার একটি অতিরিক্ত অর্থ নিহিত থাকে।”(আত তাওযীহুত তাওহীদিল খল্লাক; পৃষ্ঠা: ৩০৪)
.
শাইখ মুহাম্মদ বশীর সাহসওয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত:১৩২৬ হি.) বলেন:
المانعون لنداء الميت والجماد ، وكذا الغائب ، إنما يمنعونه بشرطين:
الأول : أن يكون النداء حقيقياً ، لا مجازياً.
والثاني : أن يقصد ويطلب به من المنادَى ما لا يقدر عليه إلا الله ، من جلب النفع وكشف الضر. مثلاً يقال: يا سيدي فلان ؛ اشف مريضي وارزقني ولداً، ولا مرية أن هذا النداء هو الدعاء، والدعاء هو العبادة، فكيف يشك مسلم في كونه كفراً وإشراكاً وعبادة لغير الله؟ “.
ثم قال : ” وأما النداء المجازي : فلا يمنعه أحد”.
“যারা মৃতব্যক্তি, জড়বস্তু কিংবা অনুপস্থিত কাউকে সম্বোধন বা আহ্বান (নিদা) করা নিষিদ্ধ মনে করেন, তারা মূলত দুটি শর্তের ভিত্তিতে তা নিষেধ করেন:
প্রথমত: এই আহ্বান বা ডাক হতে হবে প্রকৃত (হাকিকি), রূপক (মাজাজি) নয়।
দ্বিতীয়ত: এই আহ্বানের মাধ্যমে আহ্বানকৃত ব্যক্তির কাছে এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা প্রার্থনা করা, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ করার ক্ষমতা রাখে না—যেমন কল্যাণ বয়ে আনা কিংবা বিপদ দূর করা।উদাহরণস্বরূপ বলা হয়: হে আমার নেতা অমুক! আমার রোগীকে সুস্থ করে দাও,অথবা আমাকে একটি সন্তান দান করুন।এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই আহ্বানই হলো ‘দোয়া’ (প্রার্থনা), আর দোয়াই হলো ইবাদত। সুতরাং একজন মুসলিম এটি ‘কুফর’, ‘শিরক’ এবং ‘গাইরুল্লাহর ইবাদত’ হওয়ার ব্যাপারে কীভাবে সন্দেহ পোষণ করতে পারে?
এরপর তিনি বলেন: ‘আর রূপক (মাজাজি) আহ্বানের ক্ষেত্রে—এটি কেউই নিষিদ্ধ বলেন না। (সিয়ানাতুল ইনসান ওয়াসওয়াসাতিশ শাইখ দাহলান;পৃষ্ঠা;৩৬৬)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:مراد المانعين للنداء ليس مطلق النداء ، بل النداء الحقيقي الذي يُقصد به من المنادَى ما لا يقدر عليه إلا الله ، من جلب النفع وكشف الضر، ولا مرية في أنه عبادة ، وكونه عبادة وممنوعاً لا يقتضي كون كل نداء ممنوعاً ، حتى يلزم منه عدم جواز نداء الأحياء فيما يقدرون عليه”নিষেধকারীদের উদ্দেশ্য সব ধরনের আহ্বান নয় বরং সেই বাস্তব আহ্বান, যার মাধ্যমে ডাকা ব্যক্তির নিকট এমন কিছু চাওয়া হয়, যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন যেমন উপকার আনা বা ক্ষতি দূর করা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি ইবাদত। তবে এটি ইবাদত এবং নিষিদ্ধ হওয়া মানেই এই নয় যে, সব ধরনের আহ্বানই নিষিদ্ধ। তাহলে তো এর ফলে জীবিত ব্যক্তিদেরও ডাকা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে যদিও তারা যা করতে সক্ষম, তা চাওয়া হচ্ছে।”(সিয়ানাতুল ইনসান ওয়াসওয়াসাতিশ শাইখ দাহলান; পৃষ্ঠা: ৩৬৭)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল কবিতা ইত্যাদিতে মনোলগ বা কল্পনার ভঙ্গিতে জড়বস্তু বা অনুভূত জিনিসকে সম্বোধন করা সম্পর্কে, এমন বিষয়ে যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন। যেমন ইমরুল কায়েস-এর কবিতার এই লাইন: হে দীর্ঘ রাত্রি! তুমি কি শেষ হবে না? অথবা নাবাতি কবিতার এই ধরনের লাইন: হে কবর! তুমি যে প্রিয় মানুষটিকে ধারণ করে আছো তার উপর মাটির ভার কিছুটা হালকা করো। এ ধরনের কথাগুলো কি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকা শিরক হিসেবে গণ্য হবে, নাকি এগুলো রূপক হিসেবে গ্রহণযোগ্য?
তিনি উত্তরে বলেন:الحمد لله، وصلى الله وسلم على نبينا محمد، أما بعد؛ فإن ما في البيتين من النداء ليس من قبيل دعاء غير الله الذي هو شرك. بل النداء والأمر في البيت الأول : غاية الشاعر فيه التمني بانجلاء الليل، ونداء الليل نوع من التخيل بأن الليل يسمع ويجيب، والشاعر يعلم أنه لا يسمع ولا يجيب، ولا ينجلي بإرادة منه. وكذا خطاب القبر في البيت الثاني : فإنه محض تخيل وأمانٍ، أو تحسر على الدفين الذي لا يملك له الشاعر ولا غيره إنقاذه من مصيره، بل المالك لذلك الله وحده، الذي يحيي ويميت، وهو على كل شيء قدير. وهكذا القول في كل ما يرد في الأشعار من خطاب الجمادات؛ كالأطلال والديار والدِّمن والقبور، فكل ذلك من قبيل التمني أو التحسر. أما خطاب أصحاب القبور الأموات ، لقضاء الحاجات : فهو الشرك المحبط للحسنات .فيجب الفرقان بين التمنيات ، والتحسرات ، ودعاء الأموات ، والله أعلم”আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক।
অতঃপর, উল্লিখিত কাব্যদ্বয়ে যে ধরনের সম্বোধন বা আহ্বান করা হয়েছে, তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকার (দুআ) অন্তর্ভুক্ত নয় যা শিরক হিসেবে গণ্য হয়। বরং: প্রথম পঙক্তিতে (রাত্রিকে) সম্বোধন ও আদেশ: এর মাধ্যমে কবির মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘ রাত শেষ হওয়ার একনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা (তামান্নি) প্রকাশ করা। রাত্রিকে সম্বোধন করা এখানে এক প্রকার কল্পনা মাত্র—যেন রাত শুনতে পায় এবং উত্তর দেয়। অথচ কবি ভালো করেই জানেন যে, রাত শুনতেও পায় না, উত্তরও দেয় না এবং নিজের ইচ্ছায় সে শেষও হয় না।
দ্বিতীয় পঙক্তিতে কবরকে সম্বোধন: এটিও নিছক কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষা, অথবা কবরে শায়িত ব্যক্তির জন্য কবির আক্ষেপ (তাহাসসুর) প্রকাশ মাত্র। কারণ কবি নিজে বা অন্য কেউই সেই মৃত ব্যক্তিকে তার পরিণতি থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে না। বরং এর একমাত্র মালিক আল্লাহ; যিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু দেন এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।এভাবেই কবিতায় জড়বস্তুকে সম্বোধন করা যেমন ধ্বংসাবশেষ, বাড়িঘর, কবর ইত্যাদি সবই কামনা বা আফসোসের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কবরবাসী মৃতদেরকে তাদের নিকট প্রয়োজন পূরণের জন্য আহ্বান করা এটি শিরক, যা সৎকর্ম নষ্ট করে দেয়। অতএব, কামনা-বাসনা, আফসোস এবং মৃতদেরকে ডেকে সাহায্য চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক।আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।”(আব্দুর রহমান ইবনে নাসির আল বাররাক, ১৭ সফর ১৪৩৪ হিজরি)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্নকারী: হে আমাদের শাইখ,মানুষ যখন কষ্টে বলে হে আমার বাবা! হে আমার মা! হে আমার ভাই! এর হুকুম কী?
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) জবাবে বলেন :طبعًا هذا كلام ظاهره شرك وضلال لكن هو لا يُقصد به الاستغاثة فيكون منكرًا لفظًا يكون من الألفاظ المنكرة التي يجب الإعراض عنها “বাহ্যিকভাবে এ ধরনের কথা শিরক বা বিভ্রান্তির মতো শোনায়। তবে সাধারণত এর দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা উদ্দেশ্য করা হয় না। তাই এটি শিরক নয়, বরং নিন্দনীয় শব্দ এ ধরনের শব্দ পরিত্যাগ করা উচিত।” (ফাতাওয়া আবরাত হাতিফ ওয়া আল-সাইয়্যারা (ফোনে ও গাড়িতে দেওয়া ফতোয়া ক্যাসেট নং: ১৬৫)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, সম্বোধন (نداء) সর্বাবস্থায় চাওয়া, দো‘আ বা সাহায্য প্রার্থনার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত নয়। বরং কখনো এটি প্রকৃত চাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, আবার কখনো কেবল আবেগ, অনুভূতি বা অলঙ্কারিক প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এর প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করে বাক্যের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী। অতএব, প্রতিটি সম্বোধনকে শিরক বা কুফরের মানদণ্ডে ফেলে দেওয়া সঠিক নয়; বরং এ বিষয়ে মৌলিক বিবেচ্য বিষয় হলো—আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো কাছে এমন কিছু প্রার্থনা করা, যা একমাত্র আল্লাহই প্রদান করতে সক্ষম। যেখানে এ ধরনের প্রার্থনা বিদ্যমান থাকবে, সেটিই শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে; আর যেখানে এমন কোনো প্রার্থনা নেই, সেখানে তা শিরক হিসেবে গণ্য হবে না—যদিও বাক্যটি সম্বোধন বা দো‘আর ভাষায় প্রকাশিত হোক।সুতরাং, কেউ যদি জড় বস্তু বা কোনো সৃষ্টিকে সম্বোধন করে, এবং প্রাসঙ্গিক ইঙ্গিত, অবস্থা বা ভাষার ধরন থেকে স্পষ্ট হয় যে সে প্রকৃতপক্ষে কিছু প্রার্থনা করছে না; বরং দুঃখ, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে—তাহলে বাস্তবিক অর্থে সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেনি।এই দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ যদি বলে—“হে আবলার ঘর!” অথবা “হে তাইবা!”—তাহলে তা কোনোভাবেই শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এখানে প্রকৃত কোনো চাওয়া নেই; বরং এটি কেবল হৃদয়ের অনুভূতির ভাষাগত প্রকাশ মাত্র।আর আহ্বান তখনই শিরক হয়, যখন এর মধ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য প্রার্থনা থাকে এবং তার নিকট এমন কিছু চাওয়া হয়, যা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন। (গৃহীত; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২৩৭৯৬৮; ৪৪০৬৪৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়,ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।