প্রশ্ন: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস সাকাফী কি মুসলিম ছিলেন? মুমিনদের জন্য তার ভালো ও খারাপ দিকগুলো কী?
▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস-সাকাফী ছিলেন ইরাকের এক প্রভাবশালী শাসক, যাকে নিযুক্ত করেছিলেন উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তিনি অত্যাচার, রক্তপাত এবং সামান্য সন্দেহে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করার জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। ইতিহাস ও জীবনীবিদগণ একমত যে, তিনি মানুষের মধ্যে অন্যতম কঠোর জালেম ছিলেন এবং অতি দ্রুত অবৈধভাবে রক্তপাত করতেন।তিনি রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীদের মর্যাদা রক্ষা করেননি, এবং তাঁদের অনুসারী আলেম, নেককার ও সৎ লোকদের প্রতিও রাসূল (ﷺ). এর নির্দেশ মানেননি। তিনি নাসেবী (অর্থাৎ, আলী রা. ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী) ছিলেন।কিছু সাহাবী যেমন-আনাস ইবনে মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমর তার পিছনে নামাজ পড়তেন। যদি তারা তাকে কাফির মনে করতেন, তাহলে তারা তার পিছনে নামাজ পড়তেন না।
.
ইমাম ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,كان ناصبيا يبغض عليا وشيعته في هوى آل مروان بني أمية ، وكان جبارا عنيدا ، مقداما على سفك الدماء بأدنى شبهة .وقد روي عنه ألفاظ بشعة شنيعة ظاهرها الكفر ، فإن كان قد تاب منها وأقلع عنها ، وإلا فهو باق في عهدتها ، ولكن قد يخشى أنها رويت عنه بنوع من زيادة عليه ، فإن الشيعة كانوا يبغضونه جدا لوجوه ، وربما حرفوا عليه بعض الكلم ، وزادوا فيما يحكونه عنه بشاعات وشناعات” ا”তিনি (হাজ্জাজ) ছিলেন একজন নাসেবী, যিনি আলে মারওয়ান তথা বনু উমাইয়ার প্রতি অনুরাগের কারণে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। তিনি ছিলেন একগুঁয়ে স্বৈরাচারী এবং সামান্য সন্দেহেই রক্তপাতে অত্যন্ত সাহসী। তাঁর থেকে এমন কিছু জঘন্য ও নিকৃষ্ট কথাও বর্ণিত হয়েছে,যেগুলোর বাহ্যিক অর্থ কুফর নির্দেশ করে।যদি সে এসব থেকে তওবা করে থাকে এবং তা ত্যাগ করে থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা, অন্যথায় সে এগুলোর দায়ভার বহন করবে। তবে আশঙ্কা আছে যে, তার সম্পর্কে কিছু কথা বাড়িয়ে বলা হয়েছে,কারণ শিয়ারা নানা কারণে তাঁকে তীব্র ঘৃণা করত। ফলে তারা সম্ভবত তাঁর কিছু কথা বিকৃত করেছে এবং তাঁর বর্ণনায় বিভিন্ন জঘন্য ও কুৎসিত বিষয় বাড়িয়ে দিয়েছে।”(ইবনু কাসীর বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৫৩)
.
আসমা বিনতে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হাজ্জাজকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন:أَمَا إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدَّثَنَا أَنَّ فِي ثَقِيفٍ كَذَّابًا وَمُبِيرًا ، فَأَمَّا الْكَذَّابُ فَرَأَيْنَاهُ ، وَأَمَّا الْمُبِيرُ فَلَا إِخَالُكَ إِلَّا إِيَّاهُ).والمبير : المهلك ، الذي يسرف في إهلاك الناس .وقد كان الحجاج نشأ شابا لبيبا فصيحا بليغا حافظا للقرآن ، قال بعض السلف : كان الحجاج يقرأ القرآن كل ليلة ، وقال أبو عمرو بن العلاء : “ما رأيت أفصح منه ومن الحسن البصري ، وكان الحسن أفصح منه” .وقال عقبة بن عمرو : “ما رأيت عقول الناس إلا قريبا بعضها من بعض ، إلا الحجاج وإياس بن معاوية ، فإن عقولهما كانت ترجح على عقول الناس” .”নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে জানিয়েছেন যে,সাকীফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী এবং একজন ধ্বংসকারী হবে। মিথ্যাবাদীকে আমরা দেখেছি আর ধ্বংসকারী সম্পর্কে আমি মনে করি সে তুমি (হাজ্জাজ) ছাড়া আর কেউ নও।” মুবীর অর্থ: ধ্বংসকারী যে মানুষ হত্যা ও ধ্বংসে বাড়াবাড়ি করে। হাজ্জাজ যুবক অবস্থায় বুদ্ধিমান, স্পষ্টভাষী, প্রাঞ্জল বক্তা এবং কুরআনের হাফেজ ছিল। কিছু সালাফ বলেন: হাজ্জাজ প্রতি রাতে কুরআন তিলাওয়াত করত। আবু আমর ইবনুল আ’লা বলেন: আমি তার চেয়ে বেশি সাবলীল বক্তা আর কাউকে দেখিনি,শুধু হাসান বসরী ব্যতীত আর হাসান বসরী তার থেকেও বেশি সাবলীল ছিলেন।উকবা ইবনে আমর বলেন: আমি মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রায় কাছাকাছি দেখেছি, তবে হাজ্জাজ এবং ইয়া’স ইবনে মু‘আবিয়া ব্যতিক্রম তাদের বুদ্ধি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি প্রাধান্য পেত।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৩৮–১৩৯)
.
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وكانت فيه شهامة عظيمة ، وفي سيفه رهق ، وكان كثير قتل النفوس التي حرمها الله بأدنى شبهة ، وكان يغضب غضب الملوك”তার মধ্যে ছিল অসাধারণ বীরত্ব ও দৃঢ়তা; কিন্তু তার তরবারিতে ছিল কঠোরতা ও সীমালঙ্ঘন। সে সামান্যতম সন্দেহের বশেই আল্লাহ যাদের প্রাণ হারাম করে দিয়েছেন, তাদের হত্যা করত। আর সে রাজাদের ন্যায় প্রচণ্ড ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে উঠত।”(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৩৮)
.
তার স্বভাবের মধ্যে অপচয় ও বাতিল কাজে তাড়াহুড়ো ছিল, আর হিংসা ও বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সে ছিল একগুঁয়ে ও অনড়।আসিম ইবন আবি নাজূদ ও আল-আ‘মাশ বর্ণনা করেন—তারা হাজ্জাজকে বলতে শুনেছেন:”والله ولو أمرتكم أن تخرجوا من هذا الباب فخرجتم من هذا الباب لحلت لي دماؤكم ، ولا أجد أحدا يقرأ على قراءة ابن أم عبد إلا ضربت عنقه ، ولأحكنها من المصحف ولو بضلع خنزير” আল্লাহর কসম! যদি আমি তোমাদেরকে এই দরজা দিয়ে বের হতে আদেশ করি, আর তোমরা অন্য দরজা দিয়ে বের হও, তাহলে তোমাদের রক্ত আমার জন্য হালাল হয়ে যাবে। আর যদি আমি কাউকে ইবনু উম্মে আব্দ (অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ)-এর কিরাআতে কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখি, তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর আমি অবশ্যই এটিকে (কুরআনকে) মুসহাফ থেকে মুছে ফেলব এমনকি যদি তা শূকরের হাড় দিয়েও করতে হয়।”
.
আসমাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: قال عبد الملك يوما للحجاج : ما من أحد إلا وهو يعرف عيب نفسه ، فصف عيب نفسك . فقال : أعفني يا أمير المؤمنين ، فأبى ، فقال : أنا لجوج حقود حسود . فقال عبد الملك : إذاً بينك وبين إبليس نسب “একদিন আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজ-কে বললেন, প্রত্যেক মানুষই নিজের দোষ জানে; তুমি তোমার দোষ বর্ণনা করো। হাজ্জাজ বলল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমাকে মাফ করুন।কিন্তু তিনি জোর করলে হাজ্জাজ বলল: আমি একগুঁয়ে, বিদ্বেষপূর্ণ ও হিংসুক। তখন আব্দুল মালিক বললেন: তাহলে তোমার সঙ্গে ইবলিসের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।”(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৪৯–১৫৩)
.
হাজ্জাজ নামাজ নষ্ট করত এবং এতে অবহেলা করত সে নামাজ সময়মতো আদায় করত না। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ আদী ইবনু আরতাতকে লিখেন, আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, তুমি হাজ্জাজের নীতি অনুসরণ করছ। তুমি তার নীতি অনুসরণ করো না। কারণ সে নামাজ নির্ধারিত সময়ের বাইরে আদায় করত, যাকাত অন্যায়ভাবে গ্রহণ করত, এবং এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়েও সে আরও বেশি অবহেলাকারী ছিল। (তারিখে দিমাশক ১২/১৮৭)
.
ইমাম হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: إن الحجاج عذاب الله، فلا تدفعوا عذاب الله بأيديكم، و لكن عليكم بالاستكانة والتضرع، فإنه تعالى يقول {ولقد أخذناهم بالعذاب فما استكانوا لربهم وما يتضرعون} [المؤمنون /64) “নিশ্চয়ই হাজ্জাজ আল্লাহর শাস্তি। সুতরাং তোমরা নিজেদের হাতে আল্লাহর শাস্তিকে প্রতিহত করতে যেও না;বরং তোমাদের উচিত বিনয় ও কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন:আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছি, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের সামনে বিনয় প্রকাশ করেনি এবং কাকুতি-মিনতি করেনি।’[সূরা আল-মুমিনূন: ৭৬; তাবাকাত ইবনে সা‘দ; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৬৪)
.
.
হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ কাফের ছিলেন কি না—এ প্রশ্নটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দীর্ঘদিনের বিতর্কিত একটি আকীদাগত বিষয়। এ প্রসঙ্গে আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়, এবং সামগ্রিকভাবে তাদের অবস্থানকে প্রধানত তিনটি ভিন্ন মতের আলোকে উপস্থাপন করা যায়:
.
(১).অধিকাংশ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আলেম মনে করেন যে, হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ একজন ফাসেক (পাপী) এবং যালিম (অত্যাচারী) শাসক ছিলেন, কিন্তু তিনি কাফের ছিলেন না। তারা মনে করেন, তিনি অনেক বড় গুনাহ এবং রক্তপাত করলেও ইসলামের মৌলিক আকীদা ত্যাগ করেননি। ইমাম আয-যাহাবী এবং ইবনে কাসীরের মতো ঐতিহাসিকরা তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলেও তাকে মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য করেছেন।কিছু সাহাবী যেমন-আনাস ইবনে মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমর তার পিছনে নামাজ পড়তেন। যদি তারা তাকে কাফির মনে করতেন, তাহলে তারা তার পিছনে নামাজ পড়তেন না।
.
(২).কিছু আলেম, বিশেষ করে সাহাবী ও তাবেয়ীদের সমসাময়িক একটি ছোট দল তাকে কাফের মনে করতেন। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলেন সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রাহি.), যাকে হাজ্জাজ অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করেছিলেন। এছাড়াও মুজাহিদ (রাহি.) এবং আশ-শা’বী (রাহি.) এর মতো ব্যক্তিত্বরা হাজ্জাজের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতার কারণে তাকে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত মনে করতেন। তাদের যুক্তি ছিল, হাজ্জাজ ইবাদতের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং পবিত্র কাবার অবমাননাসহ এমন সব কাজ করেছিলেন যা কুফরীর শামিল।হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘তাহযিব আল-তাহযিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:وكفّره جماعة منهم سعيد بن جبير والنخعي ومجاهد وعاصم بن أبي النجود والشعبي وغيرهم“এবং তাদের একদল তাঁকে কাফির (অবিশ্বাসী) সাব্যস্ত করেছেন; তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাঈদ ইবনে জুবায়ের, (ইব্রাহিম) আন-নাখায়ী, মুজাহিদ, আসিম ইবনে আবি আন-নাজুদ, আশ-শা‘বি এবং আরও অনেকে।”(তাহযিব আল-তাহযিব’ (২/২১১)
.
(৩) একদল আলেম হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ-এর ব্যাপারে সরাসরি তাকে কাফের বলা বা না বলার বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তাদের মতে, তার চূড়ান্ত পরিণতি ও বিচার আল্লাহ তাআলার ওপর ছেড়ে দেওয়াই অধিক নিরাপদ ও উত্তম পথ।নিঃসন্দেহে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের জীবন ছিল নানা স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ। একদিকে তিনি কুরআনের হরকত (যের-যবর) প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে অবদান রেখেছেন; অন্যদিকে তিনি নিরপরাধ সাহাবি ও তাবেয়ীদের রক্তপাত ঘটিয়েছেন।তবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মূলনীতি হলো—কোনো ব্যক্তি বড় গুনাহে লিপ্ত হলেও, যতক্ষণ না সে ঈমানের মৌলিক ভিত্তিকে অস্বীকার করে, ততক্ষণ তাকে কাফের সাব্যস্ত করা হয় না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও আলেমের অভিমত হলো, হাজ্জাজ যদিও একজন চরম যালিম শাসক হিসেবে কুখ্যাত, তবুও তাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে কাফের বলা সঠিক নয়।
.
ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وقد روينا عنه أنه كان يتدين بترك المسكر ، وكان يكثر تلاوة القرآن ، ويتجنب المحارم ، ولم يشتهر عنه شيء من التلطخ بالفروج ، وإن كان متسرعا في سفك الدماء ، فالله تعالى أعلم بالصواب وحقائق الأمور وساترها ، وخفيات الصدور وضمائرها .وأعظم ما نقم عليه وصح من أفعاله سفك الدماء ، وكفى به عقوبة عند الله عز وجل ، وقد كان حريصا على الجهاد وفتح البلاد ، وكان فيه سماحة بإعطاء المال لأهل القرآن ، فكان يعطي على القرآن كثيرا ، ولما مات لم يترك فيما قيل إلا ثلاثمائة درهم”আমরা বর্ণনা পেয়েছি যে, সে মদ্যপান থেকে বিরত থাকাকে দ্বীন হিসেবে মানত, কুরআন বেশি তিলাওয়াত করত এবং হারাম বিষয়গুলো থেকে বেঁচে চলত। তার বিরুদ্ধে নারী-সংক্রান্ত কোনো অপকর্মের অভিযোগ প্রসিদ্ধ নয়। যদিও সে রক্তপাতের ক্ষেত্রে খুব তাড়াহুড়া করত।আল্লাহই ভালো জানেন প্রকৃত সত্য, অন্তরের গোপন বিষয় এবং মানুষের অন্তরের অবস্থা। তার সবচেয়ে বড় দোষ এবং নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত কাজ হলো রক্তপাত করা আর এটিই আল্লাহর কাছে তার জন্য যথেষ্ট শাস্তির কারণ। তবে সে জিহাদ ও দেশ বিজয়ে আগ্রহী ছিল এবং কুরআনের লোকদেরকে অর্থ দানে উদার ছিল কুরআনের জন্য সে অনেক অর্থ দিত। আর বলা হয়, মৃত্যুর সময় সে মাত্র তিনশো দিরহাম রেখে গিয়েছিল।” (ইবনু কাসীর; বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৫৩)
.
কাতাদা বলেন: সাঈদ ইবনে জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করা হলো: আপনি কি হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন? তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিনি যতক্ষণ না সে কুফির করেছে।
.
আ‘মাশ বলেন: হাজ্জাজ সম্পর্কে মতভেদ হলো। তখন তারা মুজাহিদ ইবনু জাবর-কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন: তোমরা কি সেই বৃদ্ধ কাফির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ?।(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; ৯/১৫৬–১৫৭)
.
ইমাম শা‘বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الحجاج مؤمن بالجبت والطاغوت كافر بالله العظيم”হাজ্জাজ জিবত ও তাগুতের প্রতি বিশ্বাসী, মহান আল্লাহর সাথে কুফরি করেছে।কাসিম ইবনু মুখাইমিরা বলেন,كان الحجاج ينقض عرى الإسلام “হাজ্জাজ ইসলামের বন্ধনগুলো একে একে ভেঙে দিত।আসিম ইবনে আবি নাজুদ বলেন,ما بقيت لله تعالى حرمة إلا وقد انتهكها الحجاج “আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কোনো মর্যাদা অবশিষ্ট ছিল না, যা হাজ্জাজ লঙ্ঘন করেনি।”(তারিখে দিমাশক ১২/১৮৫–১৮৮) ইমাম তিরমিযি তাঁর সুনানে বর্ণনা করেছেন হিশাম ইবনু হাসসান বলেন:أَحْصَوْا مَا قَتَلَ الْحَجَّاجُ صَبْرًا فَبَلَغَ مِائَةَ أَلْفٍ وَعِشْرِينَ أَلْفَ قَتِيلٍ”হাজ্জাজ যাদেরকে বন্দী অবস্থায় হত্যা করেছে, তা গণনা করা হয়েছিল সংখ্যা দাঁড়ায় এক লক্ষ বিশ হাজার নিহত।”(তিরমিযি হা/২২২০)উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,لو تخابثت الأمم وجئتنا بالحجاج لغلبناهم ، وما كان يصلح لدنيا ولا لآخرة “যদি সব জাতি তাদের সবচেয়ে খারাপ লোকদের নিয়ে আমাদের কাছে আসে, আর আমরা হাজ্জাজকে নিয়ে যাই তাহলে আমরা তাদের ওপর জয়ী হবো। সে দুনিয়া বা আখিরাত কোনোটার জন্যই উপযুক্ত ছিল না।(তারিখে দিমাশক; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৮৫)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,ظلوما جبارا ناصبيا خبيثا سفاكا للدماء .وكان ذا شجاعة وإقدام ومكر ودهاء ، وفصاحة وبلاغة ، وتعظيم للقرآن .قد سقت من سوء سيرته في تاريخي الكبير ، وحصاره لابن الزبير بالكعبة ، ورميه إياها بالمنجنيق ، وإذلاله لأهل الحرمين ، ثم ولايته على العراق والمشرق كله عشرين سنة ، وحروب ابن الأشعث له ، وتأخيره للصلوات إلى أن استأصله الله .فنسبه ولا نحبه ، بل نبغضه في الله ؛ فإن ذلك من أوثق عرى الإيمان .وله حسنات مغمورة في بحر ذنوبه ، وأمره إلى الله .وله توحيد في الجملة ، ونظراء من ظلمة الجبابرة والأمراء “সে ছিল অত্যাচারী, জবরদস্ত, নাসেবি, নিকৃষ্ট স্বভাবের এবং রক্তপাতকারী।তবে তার মধ্যে সাহস, দৃঢ়তা, কৌশল, বুদ্ধিমত্তা, বাগ্মিতা এবং কুরআনের প্রতি সম্মানও ছিল। আমি তার খারাপ কার্যকলাপগুলো আমার বড় ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছি যেমন: তার দ্বারা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর-কে কাবার ভেতরে অবরোধ করা, কাবা শরীফে মঞ্জনীক দিয়ে আঘাত করা, দুই হারামের অধিবাসীদের অপমান করা, এরপর তার ইরাক ও পুরো পূর্বাঞ্চলের ওপর প্রায় বিশ বছর শাসন, ইবনুল আশআসের সাথে তার যুদ্ধ, নামাজ দেরি করে আদায় করা অবশেষে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। সুতরাং আমরা তাকে গালি দেই (অর্থাৎ তার নিন্দা করি), কিন্তু ভালোবাসি না বরং আল্লাহর জন্য তাকে ঘৃণা করি এটি ঈমানের দৃঢ় বন্ধনের একটি অংশ। তার কিছু ভালো কাজ ছিল, কিন্তু তা তার গুনাহের সাগরে ডুবে গেছে। তার ব্যাপার আল্লাহর কাছে ন্যস্ত। মোটের ওপর তার মধ্যে তাওহীদ ছিল, এবং সে এমন অনেক জালিম শাসকদের মতোই একজন।”(সিয়ার আ‘লামুন নুবালা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৪৩)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
كان أهل العلم يختارون فيمن عرف بالظلم ونحوه، مع أنه مسلم له أعمال صالحة في الظاهر – كالحجاج بن يوسف وأمثاله – أنهم لا يلعنون أحدا منهم بعينه؛ بل يقولون كما قال الله تعالى: (أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ)، فيلعنون من لعنه الله ورسوله عاما. كقوله صلى الله عليه وسلم: (لَعَنَ اللهُ الْخَمْرَ، وَلَعَنَ شَارِبَهَا، وَسَاقِيَهَا، وَعَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَبَائِعَهَا، وَمُبْتَاعَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ، وَآكِلَ ثَمَنِهَا).ولا يلعنون المعين. كما ثبت في صحيح البخاري وغيره: (أن رجلا كان يدعى حمارا وكان يشرب الخمر. وكان النبي صلى الله عليه وسلم يجلده. فأتي به مرة. فلعنه رجل. فقال النبي صلى الله عليه وسلم لا تلعنه. فإنه يحب الله ورسوله). وذلك لأن اللعنة من باب الوعيد، والوعيد العام لا يقطع به للشخص المعين، لأحد الأسباب المذكورة: من توبة أو حسنات ماحية أو مصائب مكفرة أو شفاعة مقبولة. وغير ذلك.وطائفة من العلماء يلعنون المعين كيزيد. وطائفة بإزاء هؤلاء؛ يقولون بل نحبه، لما فيه من الإيمان الذي أمرنا الله أن نوالي عليه. إذ ليس كافرا. والمختار عند الأمة: أنا لا نلعن معينا مطلقا. ولا نحب معينا مطلقا. فإن العبد قد يكون فيه سبب هذا وسبب هذا، إذا اجتمع فيه من حب الأمرين. إذ كان من أصول أهل السنة التي فارقوا بها الخوارج: أن الشخص الواحد تجتمع فيه حسنات وسيئات، فيثاب على حسناته، ويعاقب على سيئاته. ويحمد على حسناته ويذم على سيئاته. وأنه من وجه مرضي محبوب ومن وجه بغيض مسخوط. فلهذا كان لأهل الإحداث: هذا الحكم.”
“যারা অত্যাচারী হিসেবে পরিচিত, কিন্তু মুসলিম এবং বাহ্যিকভাবে কিছু ভালো আমলও আছে যেমন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এবং তার মতো অন্যরা এদের ব্যাপারে আলেমরা এই মত গ্রহণ করেছেন যে, তাদের কাউকে নির্দিষ্টভাবে লানত করা হবে না। বরং বলা হবে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: সতর্ক হও! আল্লাহর লানত জালিমদের ওপর। অর্থাৎ সাধারণভাবে যাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল লানত করেছেন, তাদের ওপর লানত করা হবে। যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহ লানত করেছেন মদ, তার পানকারী, পরিবেশনকারী, প্রস্তুতকারী, ক্রয়কারী, বহনকারী, যার কাছে বহন করা হয় এবং তার মূল্য ভক্ষণকারীকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লানত করা হবে না। কারণ সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে, একজন লোক ছিল, যার নাম ছিল হিমার, সে মদ পান করত। নবী (ﷺ) তাকে শাস্তি দিতেন। একবার তাকে আনা হলে একজন তাকে লানত করল। তখন নবী (ﷺ) বললেন: তাকে লানত করো না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।এর কারণ হলো লানত করা শাস্তির একটি দিক, আর সাধারণ শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা নিশ্চিত নয়। কারণ থাকতে পারে সে তওবা করেছে, বা তার এমন নেক আমল আছে যা গুনাহ মুছে দেয়, বা বিপদ-আপদ তার গুনাহ মোচন করেছে,অথবা (পরকালে) তার জন্য কবুলযোগ্য সুপারিশ (শাফাআত), কিংবা অন্যকিছু।একদল আলেম নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে যেমন ইয়াজিদকে লানত করেন। আবার অন্য একদল বলেন: বরং আমরা তাকে ভালোবাসি, কারণ তার মধ্যে এমন ঈমান আছে, যার ভিত্তিতে আল্লাহ আমাদের ভালোবাসা রাখতে বলেছেন। কেননা সে কাফির নয়। কিন্তু উম্মতের গ্রহণযোগ্য মত হলো: আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে একেবারে নিঃশর্তভাবে লানত করি না, আবার নিঃশর্তভাবে ভালোবাসিও না। কারণ, একজন মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ দুটোরই কারণ থাকতে পারে। যখন তার মধ্যে উভয় ধরনের বিষয় একত্রিত হয়, তখন (তার ব্যাপারে এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা হয়)। এটি আহলুস সুন্নাহর মূলনীতিগুলোর একটি, যার মাধ্যমে তারা খারিজিদের থেকে পৃথক হয়েছে। তা হলো একজন ব্যক্তির মধ্যে নেক আমল ও গুনাহ উভয়ই থাকতে পারে। সে তার নেক আমলের জন্য সওয়াব পাবে এবং গুনাহের জন্য শাস্তি পেতে পারে। তার ভালো কাজের জন্য তাকে প্রশংসা করা হবে এবং মন্দ কাজের জন্য নিন্দা করা হবে। অর্থাৎ, এক দিক থেকে সে সন্তোষজনক ও প্রিয়, আর অন্য দিক থেকে অপছন্দনীয় ও নিন্দিত। এ কারণেই বিদ‘আতপন্থীদের ব্যাপারে এ ধরনের বিধান প্রযোজ্য হয়েছে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৭; পৃষ্ঠা: ৪৭৫–৪৭৬)
.
হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের মৃত্যুকে ঘিরে যে বর্ণনাগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়—যেমন তার কঠোরতা ও সমালোচিত দিকগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি কিছু প্রশংসনীয় দিকও ইতিহাসে প্রমাণিত রয়েছে।যখন তার অসুস্থতা মারাত্মক আকার ধারণ করল, তখন তিনি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন—তার পরবর্তী সময়ে ইরাক যেন বিশৃঙ্খলা ও ফিতনার কবলে না পড়ে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে লাগলেন এবং চেষ্টা করলেন যেন অঞ্চলটি উমাইয়া রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই স্থিতিশীলভাবে অব্যাহত থাকে।অবশেষে যখন তিনি এ ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন, তখন জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলোতে তিনি তার প্রতিপালকের দরবারে এবং দুনিয়াতে যার প্রতি তিনি দায়বদ্ধ—সবার কাছে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে একটি ওসিয়ত লিপিবদ্ধ করলেন।তিনি লিখলেন—“بسم الله الرحمن الرحيم”এটি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ওসিয়ত। তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, তিনি কেবল ওয়ালিদ ইবনু আবদুল মালিকের আনুগত্যকেই স্বীকার করেন। এ আনুগত্যের ওপরই তিনি জীবন যাপন করেছেন, এর ওপরই মৃত্যুবরণ করবেন এবং এর ওপরই পুনরুত্থিত হবেন।”
.
তার সম্পর্কে আরও বর্ণিত আছে,মৃত্যুর আগে তাকে বলা হলো:আপনি কি তওবা করবেন না? তিনি উত্তরে বললেন:যদি আমি গুনাহগার হয়ে থাকি, তবে এটি তওবার সময় নয়। আর যদি আমি সৎকর্মশীল হয়ে থাকি, তবে এটি ভয় পাওয়ার সময় নয়।”(মুহাযারাতুল উদাবা: ৪/৪৯৫) এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি দো‘আ করেছিলেন:”হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। কারণ মানুষ ধারণা করে যে আপনি তা করবেন না।”(তারিখ দিমাশক ৪/৮২, বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৯/১৩৮)
.
আর আমরা তাদের বলি, যারা মানুষের নিয়ত নিয়ে কটাক্ষ করে তোমরা শুনো, হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) কী বলেছেন। একবার তিনি শুনলেন, তার এক সঙ্গী হাজ্জাজের মৃত্যুর পর তাকে গালি দিচ্ছে। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে তার দিকে ফিরে বললেন:يا ابن أخي فقد مضى الحجاج إلى ربه ، و إنك حين تقدم على الله ستجد إن أحقر ذنبٍ ارتكبته في الدنيا أشد على نفسك من أعظم ذنبٍ اجترحه الحجاج ، و لكل منكما يومئذٍ شأن يغنيه ، و اعلم يا ابن أخي أن الله عز وجل سوف يقتص من الحجاج لمن ظلمهم ، كما سيقتص للحجاج ممن ظلموه فلا تشغلن نفسك بعد اليوم بسب أحد “হে ভাতিজা! হাজ্জাজ তো তার রবের কাছে চলে গেছে। আর তুমি যখন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, তখন দেখবে দুনিয়াতে তুমি যে ছোট গুনাহই করেছ, তা তোমার কাছে হাজ্জাজের বড় গুনাহের চেয়েও বেশি কঠিন মনে হবে। সেদিন তোমাদের প্রত্যেকেরই এমন অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যস্ত করে রাখবে। জেনে রাখো, হে ভাতিজা! আল্লাহ অবশ্যই হাজ্জাজের কাছ থেকে তাদের প্রতিশোধ নেবেন, যাদের ওপর সে জুলুম করেছে। আর যেসব লোক হাজ্জাজের ওপর জুলুম করেছে,তাদের কাছ থেকেও আল্লাহ হাজ্জাজের প্রতিশোধ নেবেন। সুতরাং আজ থেকে তুমি কাউকে গালি দেওয়ার কাজে নিজেকে ব্যস্ত করো না।”(হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৭১)
.
পরিশেষে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ছিল অত্যন্ত জুলুমকারী ও সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তি। সে অন্যদের ওপর যেমন অত্যাচার করেছে, তেমনি নিজের ব্যাপারেও অনেক বাড়াবাড়ি করেছে। তবে তার কিছু নেক আমলও ছিল, যা তার অসংখ্য অন্যায় ও অপরাধের ভিড়ে প্রায় আড়াল হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় এবং ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তার কিছু প্রচেষ্টা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।অতএব, তার চূড়ান্ত হিসাব আল্লাহ তা‘আলার কাছেই ন্যস্ত। আমরা আল্লাহর নিকট তার জুলুম ও অবিচার থেকে নিজেদেরকে মুক্ত ঘোষণা করি। একইসঙ্গে সাহাবা ও তাবেঈদের মধ্যে যারা মুসলমানদের ন্যায়ের পথে পরিচালিত নেতা ছিলেন এবং তার বিরোধিতা করেছেন—আমরা তাদেরকে ভালোবাসি; আর সে কারণেই হাজ্জাজকে অপছন্দ করি। তবে তার বিষয়টি আমরা আল্লাহর ওপরই ছেড়ে দিই। আর উত্তম হলো—এ ধরনের বিতর্কে অতিরিক্ত নিমগ্ন না হওয়া। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তাঁর আয-যুহদ গ্রন্থে বর্ণনা করেন: বিলাল ইবনু মুনযির বলেন, এক ব্যক্তি বলল: “আমি যদি আজ রাবি‘ ইবনু খাইসাম-এর কোনো দোষ বের করতে না পারি, তাহলে আর কখনো পারব না।” তখন আমি বললাম: “হে আবু ইয়াযীদ! হুসাইন ইবনু আলী (রাযি.)—যিনি ফাতিমা (রাযি.)-এর সন্তান—তাকে হত্যা করা হয়েছে।” তিনি তখন বললেন: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”। অতঃপর তিনি (সূরা যুমার: ৪৬) আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:”বলুন, হে আল্লাহ! আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা, গায়েব ও প্রকাশ্য সবকিছুর জ্ঞানী! আপনি আপনার বান্দাদের মধ্যে সেই বিষয়ে ফয়সালা করবেন, যেগুলো নিয়ে তারা মতভেদ করত।’ (সূরা যুমার: ৪৬) আমি জিজ্ঞাসা করলাম: “আপনি এ ব্যাপারে কী বলেন?” তিনি উত্তরে বললেন: “আমি কী-ই বা বলব? তাদের প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই, এবং তাদের হিসাবও আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত।” আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।(এ বিষয়ে আরও দেখুন: ‘ওফিয়াতুল আ‘ইয়ান’ (২/২৯–৪৬), ‘তারীখে দামেস্ক’ (১২/১১৩–১২৩), ‘তারীখুল ইসলাম: ৫/৩১০–৩১৬), (৬/৩১৪– …)
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment