প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র (ﷺ) প্রতি। অতঃপর প্রথমেই আমাদের জানা উচিত বিবাহ মহান আল্লাহর এক বরকতময় ফয়সালা তাকদিরের এক সূক্ষ্ম ও কল্যাণময় বণ্টন। তাঁর অসীম রহমতের অনন্য নিদর্শন এই যে, তিনি মানুষের জন্য কল্যাণের পথ কখনো সংকীর্ণ করে দেননি; বরং তা উন্মুক্ত রেখেছেন। যেমন রিযিক নির্দিষ্ট কোনো উৎসে সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি জীবনসঙ্গীর কল্যাণও কেবল একজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে বরং দ্বীনদারি ও চারিত্রিক মাধুর্যের সঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন। সুতরাং, মুমিনের প্রকৃত তৃপ্তি সেখানেই, যেখানে এই গুণাবলির সন্ধান মেলে। তাকদিরে বিশ্বাসী প্রত্যেক মুমিন মুসলিম নারী পুরুষ জানেন অনেক সময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় কিছু থেকে তাকে বঞ্চিত করেন, শুধু এ জন্য যে, এর চেয়েও উত্তম কিছু তিনি তাকে দান করবেন। তাই বান্দা যা হারায় বা হারিয়েছে তার জন্য আফসোস নয়; বরং আল্লাহর হিকমত ও ফয়সালার ওপর দৃঢ় ভরসাই হলো সত্যিকার ঈমানের পরিচয়।
Monday, April 13, 2026
নির্দিষ্ট কোনো নারী বা পুরুষকে বিয়ের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার বিধান
.
দ্বিতীয়ত: দোয়া হলো বান্দার জন্য তার রবের নৈকট্য লাভের এক অনন্য মাধ্যম; এর মাধ্যমে সে শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা পায়, কল্যাণ অর্জন করে এবং হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ খুঁজে পায়।একজন মেয়ের কোনো নির্দিষ্ট পুরুষকে পছন্দ করা বা তাকে স্বামী হিসেবে কামনা করা স্বাভাবিক বিষয়, এতে নিজে থেকে কোনো গুনাহ নেই—যতক্ষণ না সে হারাম পথে জড়ায় (যেমন গোপন সম্পর্ক, অবৈধ যোগাযোগ ইত্যাদি)। তবে নির্দিষ্ট কাউকে বিয়ের জন্য সরাসরি দোয়া করার চেয়ে উত্তম হলো—এ বিষয়ে দোয়াকে আল্লাহর অসীম ইলম ও হিকমতের উপর ছেড়ে দিয়ে শর্তযুক্ত করা।যেমন এভাবে বলা যেতে পারে: “হে আল্লাহ! যদি এ ব্যক্তি আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হয়, তবে আপনি তাকে আমার জন্য সহজ করে দিন; আর যদি এতে কোনো অকল্যাণ থাকে, তবে তাকে আমার থেকে দূরে রাখুন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন”। কারণ মানুষ অনেক সময় এমন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, যা প্রকৃতপক্ষে তার জন্য উপকারী নয়। হতে পারে, যাকে আপনি পছন্দ করছেন, তার সাথে বিবাহ হওয়া আপনার জন্য মঙ্গলজনক নয়;আর সে ক্ষেত্রে দোয়া কবুল হলেও আপনি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই সর্বোত্তম পথ হলো—নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর প্রজ্ঞার কাছে সমর্পণ করা এবং তাঁর পক্ষ থেকে যা নির্ধারিত হয়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা।যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ “তোমাদের জন্য যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তোমাদের কাছে সেটি অপছন্দনীয়। তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা একটা জিনিস অপছন্দ করো, অথচ সেটা তোমাদের জন্য ভালো; আবার এমনও হতে পারে যে, তোমরা একটা জিনিস পছন্দ করো, অথচ সেটা তোমাদের জন্য খারাপ। আল্লাহ জানেন (প্রকৃতপক্ষে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ) আর তোমরা জানো না।”(সূরা বাকারা: ২১৬)
.
উক্ত আয়াতের অন্যতম একটা শিক্ষা হচ্ছে; মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ। তাই আমরা যেটাকে খারাপ বা অপছন্দ মনে করি, সেটাই অনেক সময় আমাদের জন্য কল্যাণকর হয়। আর যেটাকে ভালোবাসি বা ভালো মনে করি,সেটাই কখনো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই কারণেই আমাদের জন্য ইস্তিখারার দোয়ায় এই শব্দগুলো শেখানো হয়েছে:اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي”হে আল্লাহ! তুমি যদি মনে কর যে, এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায়, ইহকালে ও পরকালে সত্বর কিংবা বিলম্বে আমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে তা হলে আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দাও এবং তার প্রাপ্তি আমার জন্য সহজতর করে দাও। অতঃপর তুমি তাতে বরকত দাও। আর যদি তুমি মনে কর এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায় ইহকালে ও পরকালে আমার জন্য ক্ষতিকর হবে শীঘ্র কিংবা বিলম্বে তাহলে তুমি তাকে আমার হতে দূর করে দাও এবং আমাকে তা হতে দূরে রাখো; অতঃপর তুমি আমার জন্য যা মঙ্গলজনক তা ব্যবস্থা কর সেটা যেখান থেকেই হোক না কেন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্টচিত্ত করে তোল”।(সহীহ বুখারী হা/১১৬৬)
.
সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: জনৈক মেয়ে এক লোককে গোপনে ভালোবাসে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে যেন সে লোক তার স্বামী হয়- এটা কি ভুল?
উত্তরে তিনি বলেন:الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:إذا لم تشغل هذه المحبّة عن محبّة الله ولم تؤدّ إلى حصول أقوال أو أفعال محرّمة فلا بأس إن شاء الله ، ولا بأس أن تدعو الله أن يجعله من نصيبها ما دام مسلما يخاف الله .”সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি। পর সমাচার: এ ভালবাসা যদি আল্লাহর ভালবাসা থেকে বিমুখ না করে এবং কোন প্রকার হারাম কথা ও কাজের দিকে নিয়ে না যায় তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপভাবে এ ব্যক্তি যেন তার ভাগ্যে জুটে এমন দোয়া করতেও কোন অসুবিধা নেই; যতক্ষণ পর্যন্ত এই নারী আল্লাহকে ভয় করে।” (ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪৩১)
.
পরিশেষে, আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য উত্তম পরামর্শ হলো—আপনি এভাবে দোয়া করুন: “হে আল্লাহ! আমাকে একজন নেককার স্বামী/স্ত্রী দান করুন।” কারণ এভাবে দোয়া করলে আপনি বিষয়টিকে আল্লাহর ইলম ও হিকমতের উপর সোপর্দ করছেন। তখন আল্লাহ চাইলে আপনার জন্য এমন একজন সঙ্গী নির্ধারণ করতে পারেন, যিনি আপনার ধারণার সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকেও অধিক উত্তম ও কল্যাণকর—যদিও তার মধ্যেও কিছু কল্যাণ বিদ্যমান থাকতে পারে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment