কুরআন ও সুন্নাহ নাকি আহলে বাইত (নবী পরিবার)-কোনটি অনুসরণীয়? বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সচেতন হোন!!
প্রশ্ন: আমি জানি, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম, মুসলিম শরিফের হাদিসে বলা আছে, পবিত্র কুরআন ও আহলে বায়তকে অনুসরণ করতে। তাহলে সুন্নাহ নাকি আহলে বায়েতকে অনুসরণ করব? বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্ত । দয়া করে আমাকে সঠিক বিষয়টি জানাবেন। জাযাকাল্লাহ খাইরান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনেক হাদিসে আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার আদেশ করেছেন। আর সহিহ মুসলিমের উক্ত হাদিসে আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়ার পর আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের অধিকার ও তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তাদেরকে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি দেখুন:
انطَلَقتُ أَنَا وَحُصَيْنُ بْنُ سَبْرَةَ وَعُمَرُ بْنُ مُسْلِمٍ إِلَى زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، فَلَمَّا جَلَسْنَا إِلَيْهِ قَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا؛ رَأَيْتَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَسَمِعْتَ حَدِيثَهُ، وَغَزَوْتَ مَعَهُ، وَصَلَّيْتَ خَلْفَهُ، لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا! حَدِّثْنَا يَا زَيْدُ مَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: يَا ابْنَ أَخِي، وَاللهِ لَقَدْ كَبِرَتْ سِنِّي، وَقَدُمَ عَهْدِي، وَنَسِيتُ بَعْضَ الَّذِي كُنْتُ أَعِي مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَا حَدَّثْتُكُمْ فَاقْبَلُوا، وَمَا لَا فَلَا تُكَلِّفُونِيهِ.
ثُمَّ قَالَ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فِينَا خَطِيبًا بِمَاءٍ يُدْعَى خُمًّا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ، فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَوَعَظَ وَذَكَّرَ، ثُمَّ قَالَ: “أَمَّا بَعْدُ، أَلَا أَيُّهَا النَّاسُ؛ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ رَسُولُ رَبِّي فَأُجِيبَ، وَأَنَا تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ: أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللهِ، فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ، فَخُذُوا بِكِتَابِ اللهِ، وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ”، فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللهِ وَرَغَّبَ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ: “وَأَهْلُ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي”.
فَقَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: وَمَنْ أَهْلُ بَيْتِهِ يَا زَيْدُ؟ أَلَيْسَ نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ؟ قَالَ: نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَكِنْ أَهْلُ بَيْتِهِ مَنْ حُرِمَ الصَّدَقَةَ بَعْدَهُ، قَالَ: وَمَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمْ آلُ عَلِيٍّ، وَآلُ عَقِيلٍ، وَآلُ جَعْفَرٍ، وَآلُ عَبَّاسٍ، قَالَ: كُلُّ هَؤُلَاءِ حُرِمَ الصَّدَقَةَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
“হুসাইন ইবনে সাবরা, উমর ইবনে মুসলিম এবং আমি (ইয়াজিদ ইবনে হাইয়ান) একদা জায়েদ ইবনে আরকাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলাম। আমরা যখন তাঁর পাশে বসলামতখন হুসাইন তাঁকে বললেন,
‘হে জায়েদ! আপনি তো অনেক কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখেছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। হে জায়েদ! আপনি সত্যিই অনেক সৌভাগ্যের অধিকারী। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে আপনি যা শুনেছেন, আমাদের কাছে তা বর্ণনা করুন।’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আল্লাহর কসম, আমার বয়স হয়েছে, সেই সময়টাও অনেক আগে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যা আমি মুখস্থ রেখেছিলাম, তার কিছু অংশ ভুলেও গেছি। অতএব আমি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করি তা গ্রহণ করো আর যা বর্ণনা না করি সে বিষয়ে আমাকে বাধ্য করো না।’ এরপর তিনি বললেন, ‘একদিন মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি ‘খুম’ নামক স্থানে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সামনে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন এবং নসিহত ও উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন: “হে লোকসকল! সাবধান! আমি একজন মানুষ মাত্র। অচিরেই আমার রবের পক্ষ থেকে পাঠানো দূত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আসবে আর আমিও তাতে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু (মূল্যবান সম্পদ) রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হলো, আল্লাহর কিতাব, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরো এবং তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো।’ তিনি আল্লাহর কিতাবের প্রতি অত্যন্ত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বললেন, ‘আর (দ্বিতীয়টি হলো) আমার আহলে বাইত (পরিবারবর্গ)। আমি আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি (অর্থাৎ তাদের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় আল্লাহর ভয় দেখাব)।’ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে জায়েদ! তাঁর আহলে বাইত কারা? তাঁর স্ত্রীগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘তাঁর স্ত্রীগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তবে (মূলত) আহলে বাইত তারা, যাদের ওপর নবীজির ওফাতের পর সদকা গ্রহণ করা হারাম।” হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কারা?’ তিনি বললেন, ‘তারা হলো আলি-্এর পরিবার, আকিলের পরিবার, জাফরের পরিবার এবং আব্বাসের পরিবার।’ হুসাইন আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এদের সবার জন্যই কি সদকা হারাম?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’।” [সহিহ মুসলিম: ২৪০৮] আরও বর্ণিত হয়েছে, মুসনাদে ইমাম আহমদ (১৯২৬৫), আবু আওয়ানা (১০৬৭৭) এবং তাবারানি (৫/১৮৩, হাদিস নং ৫০২৮)
❑ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের নিকট আহলে বাইত বা নবী পরিবারের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেন:
وَيُحِبُّونَ أَهْلَ بَيْتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ، وَيَتَوَلَّوْنَهُمْ، وَيَحْفَظُونَ فِيهِمْ وَصِيَّةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم: حَيْثُ قَالَ يَوْمَ غَدِيرِ خُمٍّ: “أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي” وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمِّه وَقَدِ اشْتَكَى إِلَيْهِ أَنَّ بَعْضَ قُرَيْشٍ يَجْفُو بَنِي هَاشِمٍ- فَقَالَ: “وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ؛ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ؛ للهِ وَلِقَرَابَتِي وَقَالَ: “إِنَّ اللهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ”
“আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের লোকগণ নবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ অসিয়তকে হেফাজত করে, যা তিনি গাদিরে খুমের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি’।” [মাজমু ফাতাওয়া ৩/১৫৪]
তাঁর চাচা আব্বাস (রা.) যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন, কুরাইশদের কিছু লোক বনি হাশেমদের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন, “সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে।” রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের থেকে বনী ইসমাইলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাইলের সন্তানদের থেকে বনী কেনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনী কেনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনী হাশেমকে। আর হাশেমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে।” [সহীহ মুসলিম, ৪২২১]
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারকে নিঃশর্ত অনুসরণে ব্যাপারে কোনও সহিহ হাদিস নেই:
বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে এমন কিছু হাদিস পাওয়া যায় যেগুলোতে বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর কিতাব এবং আহলে বাইতকে অনুসরণ করো তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু এ মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলো সবগুলোই দুর্বল।
──────────
❑ নিম্নে এমন কয়েকটি জইফ (দুর্বল) হাদিস উপাস্থাপন করা হলো:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ مَا إِنْ تَمَسَّكْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا بعدي أَحَدُهُمَا أَعْظَمُ مِنَ الآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَلَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الحَوْضَ فَانْظُرُوا كَيْفَ تَخْلُفُونِي فِيهِمَا”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। এর একটি অন্যটির চেয়ে বড় আল্লাহর কিতাব যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত এক রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আমার কাছে না আসা পর্যন্ত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। সুতরাং দেখো, আমার অবর্তমানে তোমরা তাদের সাথে কেমন আচরণ করো।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৮]
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এই সূত্রে হাবিব বিন আবি সাবিত রয়েছেন, যিনি একজন ‘মুদাল্লিস’ (বর্ণনাকারীর নাম গোপনকারী)। ইমাম আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন, ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রা.) ছাড়া অন্য কোনো সাহাবীর থেকে তাঁর সরাসরি হাদিস শোনা প্রমাণিত নয়। এছাড়া বর্ণনাকারী আ’মাশও একজন মুদাল্লিস। [জামেউত তাহসিল, ১১৭]
“أَيُّهَا النَّاسُ، إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا إِنِ اتَّبَعْتُمُوهُمَا، وَهُمَا كِتَابُ اللَّهِ، وَأَهْلُ بَيْتِي عِتْرَتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা তা অনুসরণ করো তবে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)।” [মুস্তাডরাকে হাকেম ৪৫৭৭]
এর ইসনাদ ওয়াহি (অত্যন্ত দুর্বল)। এর সূত্রে মুহাম্মদ বিন সালামাহ বিন কুহাইল রয়েছেন। ইমাম জুযজানি তাঁকে ‘যাহিবুল হাদিস’ (পরিত্যক্ত) বলেছেন। ইবনে আদি তাঁকে কুফার কট্টর শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।[আহওয়ালুর রিজাল, পৃষ্ঠা ৮৬; আল কামিল, ৭/৪৪৫]
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ كِتَابَ اللهِ، وَأَهْلَ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। তারা হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [তাবারানি ৫/১৬৯]
এই সূত্রটি মুনকার (অগ্রহণযোগ্য)। এর সূত্রে হাসান বিন উবাইদুল্লাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর বর্ণনাগুলো ‘মুদতারিব’ (বিশৃঙ্খল), তাই তিনি তাঁর হাদিস গ্রহণ করেননি। [তাহজিবুত তাহজিব, ২/২৯২]
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ، أَحَدُهُمَا أَكْبَرُ مِنَ الْآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَفْتَرِقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, যার একটি অন্যটির চেয়ে বড়। আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত একে অপর থেকে পৃথক হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ১১১০৪]
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এর বর্ণনাকারী আতিয়্যাহ আল আউফি সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল বলে বিবেচিত।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এই হাদিসটিকে কুফাবাসীদের বর্ণনাকৃত ‘মুনকার’ হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। [দিওয়ানুয যুয়াফা, ২৮৪৩; আল মুন্তাখাব মিনাল ইলাল, ১১৭]
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللهِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৬]
এর ইসনাদ অত্যন্ত দুর্বল (ضعيف جدا)। এর সূত্রে যায়েদ বিন হাসান আলআনমাতি রয়েছেন। ইমাম আবু হাতিম তাঁকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৫৬০]
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ خَلِيفَتَيْنِ كِتَابُ اللهِ، حَبْلٌ مَمْدُودٌ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، أَوْ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুজন প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ ও জমিনের মাঝে বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ২১৫৭৮]
এটি সহিহ নয়। এর বর্ণনাকারী কাসিম বিন হাসান সম্পর্কে ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর হাদিস ‘মুনকার’ এবং তিনি অপরিচিত। [মিজানুল ইতিদাল, ৩/৩৬৯]
“إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللَّهِ سَبَبُهُ بِيَدِ اللَّهِ، وَسَبَبُهُ بِأَيْدِيكُمْ، وَأَهْلَ بَيْتِي”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা গ্রহণ করলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব—যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে এবং অন্য প্রান্ত তোমাদের হাতে এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে ইবনে আবি আসিম ১৫৫৮]
এর ইসনাদ ‘لا يصح (সহিহ নয়)। এর প্রথম সূত্রে মুহাম্মদ বিন উমর ‘মাজহুল’ (অপরিচিত) এবং কাসির বিন যায়েদ ‘দুর্বল’। দ্বিতীয় সূত্রে হারিস আলআওয়ার রয়েছেন, যাকে ইমাম শাবি ও অন্যরা ‘মিথ্যাবাদী’ (কাযযাব) হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৭৯]
◯ এর বিপরীতে বিভিন্ন হাদিসে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের নির্দেশনা এসেছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হাদিস হল,
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَدًا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গিয়েছি যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।” [মুস্তাদরাকে হাকেম: ৩১৮]
এই বর্ণনার ইসনাদ সহিহ। এই হাদিসটি ইসমাইল বিন আবি উওয়াইস তাঁর পিতার সূত্রে এবং মুহাম্মদ বিন ইসহাক যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। যদিও মুয়াত্তায় এটি সরাসরি (بلاغاً) এসেছে তবে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এই সূত্রটি শক্তিশালী। এছাড়া বিদায় হজের অন্যান্য ভাষণের সাথে এর অর্থের মিল রয়েছে। ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) বলেছেন, এই হাদিসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত পরিচিত ও প্রসিদ্ধ, যা এর বর্ণনাসূত্রের প্রয়োজনীয়তাকেও ছাপিয়ে যায় [আত তামহিদ: ২৪/৩৩১]। মুহাদ্দিস শাইখ আলবানি (রহ.) এই হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন [সহিহুল জামে: ২৯৩৭]।
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারের অনুসরণ: মূলনীতি ও শর্তাবলী:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরবর্তীতে যুগ পরম্পরায় নবী পরিবারের সকল সদস্য নিঃশর্তভাবে অনুসরণীয় নন। তাঁদের অনুসরণের বিষয়টি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল:
◈ ১. আহলে বাইতের সদস্যগণের মধ্যে শুধুমাত্র তাঁরাই অনুসরণীয়, যাঁরা নিজেদের জীবন আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর ছাঁচে গড়েছেন। কারণ দ্বীনের মানদণ্ড হলো ওহি। কোনো বিশেষ বংশীয় পরিচয় নয়।
◈ ২. ইসলামি আকিদা অনুযায়ী একমাত্র নবী-রসুলগণই ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ। আহলে বাইতের সদস্যগণ সম্মানীত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। তাই তাঁদের কোনো কথা বা কাজ যদি কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে বংশীয় সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তা গ্রহণ করা যাবে না।
◈ ৩. তাঁদের মধ্যে যাঁরা হক্কানী আলেম, মুত্তাকি এবং দ্বীনদার উম্মত কেবল তাঁদেরই অনুসরণ করবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতে, ‘আহলে বাইত’ এবং ‘আল্লাহর কিতাব’ কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না—এই কথার অর্থ হলো, কিয়ামত পর্যন্ত নবী পরিবারের একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। উম্মতের দায়িত্ব হলো সেই হকপন্থীদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের আদর্শ গ্রহণ করা।
◈ ৪. আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব (নিঃশর্ত ভালোবাসা)। তবে আমল ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ কেবল তাঁদেরই করা হবে, যাঁরা ইলমে দ্বীন ও সুন্নাহর ওপর সুদৃঢ় (শর্তযুক্ত অনুসরণ)।
মোটকথা, আহলে বাইতের মধ্যে যাঁরা আল্লাহওয়ালা, পরহেজগার এবং সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী তাঁরাই আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক। তাঁদের বংশীয় আভিজাত্য যখন ইলম ও তাকওয়ার সাথে মিলিত হয় তখন তা আমাদের জন্য ‘নূরুন আলা নূর’ বা আলোর ওপর আলো হিসেবে কাজ করে। আহলে বাইতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাঁদের সুন্নাহপন্থী সদস্যদের অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে বলব, পরকালীন মুক্তি এবং সফলতার জন্য মুসলিম উম্মাহর ওপর প্রধান ও অপরিহার্য কর্তব্য হলো—একমাত্র আল্লাহর কিতাব এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ করা। দ্বীনের এই দুটি মজবুত স্তম্ভই হচ্ছে হেদায়েতের মূল উৎস। এর পাশাপাশি, আহলে বাইত বা নবী পরিবারের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তাঁদের বিশেষ মর্যাদা বজায় রাখা আমাদের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহর অনুসারী, দ্বীনদার এবং পরহেজগার কেবল তাঁদেরকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সেই সাথে আমাদের অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে সেই সব স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যাপারে, যারা আহলে বাইতের প্রতি অতি-ভক্তি বা ভালোবাসার আড়ালে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। বিশেষ করে যারা জাল ও অত্যন্ত দুর্বল হাদিসের আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায় এবং উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করে, তাদের আসল পরিচয় ও মতবাদ সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরণের ফিতনা, বিভ্রান্তি ও গোমরাহি থেকে হেফাজত করুন এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অবিচল রাখুন। আমিন।
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।