ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:ভোরের (ফজরের) সালাত আদায়কারীরা এক সফল জনগোষ্ঠী; তাঁদের চেহারা হয় প্রদীপ্ত, ললাট হয় উজ্জ্বল এবং তাঁদের সময় হয় বরকতময়। আপনি যদি তাঁদের অন্তর্ভুক্ত হন, তবে আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য শুকরিয়া আদায় করুন। আর যদি তাঁদের অন্তর্ভুক্ত না হন, তবে আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আপনাকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
.
(১).ফজরের সালাত নিয়মিত আদায় করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম।
.
দলিল রাসূল ﷺ বলেন:”যে ব্যক্তি দুই শীতল সময়ের সালাত (ফজর ও আসর) আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(সহিহ বুখারি: ৫৭৪, সহিহ মুসলিম: ৬৩৫)
.
(২).ফজরের সালাত আদায়কারীকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।
.
দলিল রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:”এমন কোনো ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে সূর্যোদয়ের আগের (ফজর) এবং সূর্যাস্তের আগের (আসর) সালাত আদায় করে।”(সহিহ মুসলিম:১৩২২)
.
(৩).যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করে, সে সারাদিন আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় থাকে।
.
দলিল রাসূল ﷺ বলেন:”যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে (নিরাপত্তায়) চলে গেল।”(সহিহ মুসলিম: ১৩৮০)
.
(৪).জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করলে পূর্ণ রাত জেগে ইবাদত করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়।
.
দলিল রাসূল (ﷺ) বলেছেন:”যে ব্যক্তি এশার সালাত জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত সালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত সালাত আদায় করল।”(সহিহ মুসলিম:১৩৭৭)
.
(৫).ফজরের সময় দিনের ও রাতের ফেরেশতারা একত্রিত হন এবং আল্লাহর কাছে মুসল্লিদের নাম পেশ করেন। কুরআন মাজিদের সূরা বনী ইসরাঈলের ৭৮ নং আয়াতে এর ইঙ্গিত রয়েছে। এ ছাড়া হাদিসে এসেছে:
”ফেরেশতারা পালাবদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন—এক দল রাতে, অন্য দল দিনে। তারা ফজর ও আসরের সালাতে একত্রিত হন। এরপর তোমাদের মাঝে রাত যাপনকারীরা যখন উপরে উঠে যান, তখন আল্লাহ (সব জানলেউ) তাদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা আমার বান্দাদের কী অবস্থায় রেখে এলে?’ তারা বলেন, ‘আমরা তাদের সালাত রত অবস্থায় রেখে এসেছি এবং সালাত রত অবস্থায় তাদের কাছে গিয়েছিলাম’।”(সহিহ বুখারি: ৫৫৫, সহিহ মুসলিম: ৬৩২)
.
(৬).রাতের অন্ধকারে (ফজরের সালাতে) মসজিদসমুহে যাতায়াতকারীদেরকে কিয়ামাতের দিনের পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে:
.
দলিল: রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”রাতের অন্ধকারে মসজিদসমুহে যাতায়াতকারীদেরকে কিয়ামাতের দিনের পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও।”(ইবনু মাজাহ হা/৭৮১)
.
(৭).কিয়ামতের দিন মুমিনদের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হবে আল্লাহ তাআলাকে দেখা। হাদিস অনুযায়ী, যারা ফজর ও আসরের সালাতের প্রতি যত্নশীল হবে, তারা আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হবে।
.
দলিল: সাহাবীদেরকে নিয়ে একদা রাতে রাসূল (ﷺ) (পূর্ণিমার) চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ঐ চাঁদকে তোমরা যেমন দেখছ, ঠিক তেমনি অচিরেই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা দেখতে পাবে। তাঁকে দেখতে তোমরা কোন ভীড়ের সম্মুখীন হবে না। কাজেই সূর্য উদয়ের (ফরজ) এবং অস্ত যাওয়ার পূর্বের (আসর) সালাত (শয়তানের প্রভাবমুক্ত হয়ে) আদায় করতে পারলে তোমরা তাই করবে। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন, “কাজেই তোমার প্রতিপালকের প্রশংসার তাসবীহ্ পাঠ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে”- (সুরা ক্বাফ ৫০/৩৯)। ইসমাঈল (রহঃ) বলেন, এর অর্থ হল- এমনভাবে আদায় করার চেষ্টা করবে যেন কখনো ছুটে না যায়।”সহিহ বুখারী হা/৫৫৪)
.
(৮).রাতে ঘুমানোর সময় শয়তান মানুষের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। ফজরের সালাত এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত করে একজন মানুষকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
.
দলিল: রাসূল ﷺ বলেন:”…অতঃপর সে যদি জেগে আল্লাহর জিকির করে তবে একটি গিঁট খুলে যায়, ওজু করলে আরেকটি গিঁট খুলে যায় এবং সালাত আদায় করলে সব কটি গিঁট খুলে যায়। ফলে তার সকাল হয় আনন্দিত মনে ও পবিত্র চিত্তে। অন্যথায় সে অপবিত্র মন ও অলসতা নিয়ে সকালে উপনীত হয়।”(সহিহ বুখারি: ১১৪২, সহিহ মুসলিম: ৭৭৬)
.
(৯).মুনাফেকদের জন্য জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করা অত্যন্ত কষ্টকর। তাই যারা নিয়মিত এটি আদায় করে, তারা নিজেদের ঈমানের প্রমাণ দেয়।
.
দলিল: রাসূল (ﷺ) বলেন:মুনাফেকদের জন্য ফজর ও এশার সালাতের চেয়ে অধিক ভারী আর কোনো সালাত নেই। তারা যদি জানত এই দুই সালাতের মধ্যে কী (নেয়ামত) রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এতে উপস্থিত হতো।”(সহিহ বুখারি: ৬৫৭, সহিহ মুসলিম: ৬৫১)
.
(১০). ফজরের দুই রাকাআত সুন্নত দুনিয়া ও এর ভেতরকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম:
.
দলিল: রাসূল ﷺ বলেন:”ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) সালাত দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।”(সহিহ মুসলিম: ৭২৫)
.
পরিশেষে, ফজরের সালাত আদায় করা কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি একদিকে যেমন মুনাফিকি থেকে মুক্তির সনদ; অন্যদিকে রিজিক ও বরকত লাভের মাধ্যম। কারন রাসূল ﷺ উম্মতের সকালের সময়ের জন্য বরকতের দোয়া করেছেন। তিনি দু’আয় বলেছেন:اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا.”হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের জন্য তাদের ভোরের সময়ে বরকত দান করুন।”(সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৬, তিরমিজি: ১২১২—হাদিসটি সহিহ) তাই এই সালাতের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রতিটি মুসলমানের ঈমানের পরিচয়।আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিয়মিত জামাতের সাথে ফজর নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
No comments:
Post a Comment