May 02, 2026

পহেলা বৈশাখের অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা তাওহিদি বিশ্বাসে কুঠারাঘাত

 বাংলা নববর্ষের আগমন উপলক্ষে অনেক মুসলিম কবি ও সাধারণ মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ কবিতার একটি জনপ্রিয় পঙক্তি ব্যবহার করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন:

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ শুভ নববর্ষ!
বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি নববর্ষের একটি সাধারণ কবিতা মনে হলেও এর গভীরের অর্থ ও বিশ্বাস ইসলামি আকিদার (বিশ্বাস) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জেনে রাখা জরুরি যে, কেন এই শব্দচয়ন বা ধারণা আমাদের ইমানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
❂ অগ্নিস্নান কী?
‘অগ্নিস্নান’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো, আগুনের মাধ্যমে স্নান বা গোসল করা। সনাতন ধর্মীয় ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে পবিত্র করার জন্য আগুনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার একটি রীতি প্রচলিত ছিল। যেমন— রামায়ণে সীতার সতীত্ব প্রমাণের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’র বিবরণ পাওয়া যায়। এছাড়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় দেহকে আগুনে আহুতি দেওয়াকেও অনেক সময় রূপক অর্থে ‘অগ্নিস্নান’ বলা হয়, যা তাদের বিশ্বাস মতে আত্মাকে পার্থিব কলুষতা থেকে মুক্ত করে পবিত্র করার প্রতীক।
❂ ইসলাম কেন এটি সমর্থন করে না?
ইসলামি শরিয়াহ ও আকিদার মানদণ্ডে এই বাক্যটি অগ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:
১. ইসলামে পবিত্রতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে (যেমন: ওজু, গোসল বা তায়াম্মুম)। কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে পবিত্র করার ক্ষমতা আগুন কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক উপাদানের নেই। ‘অগ্নিস্নানে পৃথিবী পবিত্র হবে’—এমন বিশ্বাস রাখা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতে আগুনের মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করা হয়।
২. আগুনকে পবিত্রকারী বা উপাস্য মনে করা অগ্নিপূজারীদের প্রাচীন প্রথা। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অমুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতির অনুকরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১]
৩. যদি কেউ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, আগুন পৃথিবী বা মানুষকে পবিত্র (শুচি) করতে পারে তবে সে ব্যক্তি ইসলামি আকিদা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। কারণ আগুনের দহন ক্ষমতা যেমন আল্লাহর সৃষ্টি, তাকে পবিত্রকারী মনে করাও তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস পরিপন্থী।
❑ জাতীয় উৎসব ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামের দৃষ্টিতে দুই ঈদ ছাড়া জাতীয়ভাবে অন্য কোনো ঈদ-উৎসব পালন করা বৈধ নয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন দেখলেন সেখানকার মানুষেরা বছরে দুটি দিন (নওরোজ ও মেহেরজান) আনন্দ-উৎসব করে।
তিনি তাদের বললেন:
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا الْأَضْحَى وَالْفِطْرَ
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য ওই দুই দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।” [সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪]
➧ বিভিন্ন নব উদ্ভাবিত উৎসব বা বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণে উৎসব পালন সম্পর্কে প্রখ্যাত আলেম আল্লামা বকর আবু যাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
الِاحْتِفَالَاتُ الْبِدْعِيَّةُ؛ مِنْهَا: الِاحْتِفَالُ بِمَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالِاحْتِفَالُ بِلَيْلَةِ الْإِسْرَاءِ وَالْمِعْرَاجِ، وَالِاحْتِفَالُ بِلَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَالِاحْتِفَالُ بِرَأْسِ الْعَامِ الْهِجْرِيِّ وَالْمِيلَادِيِّ، وَالِاحْتِفَالُ بِرَأْسِ الْقَرْنِ الْهِجْرِيِّ، وَغَيْرُهَا مِنَ الْأَعْيَادِ الْمُبْتَدَعَةِ لَدَى الْعَالَمِ الْإِسْلَامِيِّ، وَالَّتِي أَدْخَلَهَا الْمُضَلِّلُونَ… وَلِذَا وَجَبَ عَلَى أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْهُدَى الْبَيَانُ عَنْ تَحْرِيمِ الْأَعْيَادِ الْمُحْدَثَةِ، وَتَرْكِ الْأَعْمَالِ فِيهَا
“বিদআতি উৎসবসমূহ; তার মধ্যে রয়েছে: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মবার্ষিকী (ঈদে মিলাদুন্নবি) পালন করা, শবে মেরাজ পালন করা, শবে বরাত (১৫ই শাবান) পালন করা, হিজরি ও খৃষ্ট নববর্ষ উদযাপন করা এবং হিজরি শতাব্দী পালন করা। এছাড়াও মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত অন্যান্য নবউদ্ভাবিত উৎসবসমূহ যা পথভ্রষ্টরা প্রবর্তন করেছে… তাই দ্বীনি ইলম ও হেদায়াতের অধিকারীদের (ওলামায়ে কেরাম) জন্য আবশ্যিক হলো—এ সকল নবউদ্ভাবিত উৎসবের অবৈধতা (হারাম হওয়া) বর্ণনা করা এবং এই দিনগুলোতে বিশেষ আমল। এমন অনৈসলামিক উৎসবে যদি শিরক মিশ্রিত বাক্য ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে হারামের উপরে হারাম। আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত আল্লাহর কাছে—তিনি যেন তাঁর রহমত ও ক্ষমার মাধ্যমে আমাদের জীবনের সব গ্লানি মুছে দেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate