Monday, June 15, 2026

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

 

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

কু’রআনে এমন  কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: আমরা কীভাবে নিজেরাই নিজেদের জীবনটাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিই। আর কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, ভয় হাসিমুখে পার করার শক্তি যোগায়। এরকম একটি আয়াত হলো—

2_155_title

2_155আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও। [আল-বাক্বারাহ ১৫৫]

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই

আল্লাহ ﷻ শুরু করছেন: وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ — আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই দুনিয়াতে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই, নেবেন। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরবিতে দুই বার জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন। কারো বেলায় সেই পরীক্ষা হয়তো চাকরি হারিয়ে ফেলে অভাবে, কষ্টে জীবন পার করা। কারো বেলায় হয়তো বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তানদের জটিল অসুখের চিকিৎসায় দিনরাত সংগ্রাম করা। কারো বেলায় হয়তো নিজেরই নানা ধরনের জটিল অসুখ। কারো বেলায় আবার জমি-জমা, সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সাথে শত্রুতা, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার, দুশ্চরিত্র স্বামী, পরপুরুষে আসক্ত স্ত্রী, ড্রাগে আসক্ত ছেলে, পরিবারের মুখে কালিমা লেপে দেওয়া মেয়ে —কোনো না কোনো সমস্যায় আমরা পড়বোই। এই সমস্যাগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য পরীক্ষা।

পৃথিবীতে আমরা এসেছি পরীক্ষা দিতে —এটা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। হিন্দি সিরিয়াল, মিউজিক, ভিডিও গেম, রংবেরঙের পানীয়, হাজারো বিনোদন সবসময় আমাদেরকে চেষ্টা করে এই বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দিতে। আমরা নিজেদেরকে প্রতিদিন নানা ধরনের বিনোদনে বুঁদ করে রেখে জীবনের কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বিনোদনে যতই গা ভাসাই, ততই বিনোদনের প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। যতক্ষণ বিনোদনে ডুবে থাকি, ততক্ষণ জীবনটা আনন্দময় মনে হয়। তারপর বিনোদন শেষ হয়ে গেলেই অবসাদ, বিরক্তি, একঘেয়েমি ঘিরে ধরে। ধীরে ধীরে একসময় আমরা জীবনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। “কেন আমার নেই, কিন্তু ওর আছে?” “কেন আমারই বেলায় এরকম হয়, অন্যের কেন এরকম হয় না?” —এই সব অসুস্থ প্রশ্ন করে আমরা আমাদের মানসিক অশান্তিকে জ্বালানী যোগাই। এত যে অশান্তি, তার মূল কারণ হলো: আমরা যে এই জীবনে শুধু পরীক্ষা দিতে এসেছি —এই কঠিন বাস্তবতাটা ভুলে যাওয়া।

মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, জান, মাল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে

আল্লাহ ﷻ আমাদের কীভাবে পরীক্ষা নেবেন, তার কিছু উদাহরণ তিনি আমাদেরকে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা যদি ভালো করে বুঝে নিই পরীক্ষাগুলো কেমন হবে, তাহলে সেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আগে থেকেই আমরা তৈরি থাকবো। তারপর যখন পরীক্ষা শুরু হবে, তখন পরীক্ষা পার করা সহজ হয়ে যাবে। যারা জীবনে অনেকবার কঠিন বিপদে পড়েছেন, তারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, যদি চিন্তা করে বের করা যায় কেন বিপদটা হয়েছে, কতদিন তা চলতে পারে এবং বিপদটা কীভাবে একসময় শেষ হয়ে যেতে পারে — তখন সেই বিপদটা ধৈর্য ধরে পার করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। একারণে পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে জীবনটা সহজ হয়ে যায়।

ভয়

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ ভয়ের জন্য خَوْف (খাউফ) ব্যবহার করেছেন। কু’রআনে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের জন্য বারোটি আলাদা আলাদা শব্দ রয়েছে: خاف, خشي, خشع, اتقى, حذر, راع, اوجس, وجف, وجل, رهب, رعب, اشفق —যার মধ্যে এই আয়াতে বিশেষভাবে খাউফ ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি বিশেষ ধরনের ভয়: আমাদের জীবনে কোনো একটা বিপদ এগিয়ে আসছে বা এসে গেছে, এবং আমরা তা নিয়ে ভয়ে, আতঙ্কে আছি —এটা হচ্ছে খাউফ।

এই ভয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক, পারিবারিক যে কোনো বিপদের ভয় হতে পারে। দেশের সরকার মুসলিমদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে। কেউ মুখ খুলতে পারছে না। সত্য কথা বললে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ভরা হচ্ছে, গুম করে ফেলা হচ্ছে। মুসলিমরা সবাই ভয়ে আছে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মহামারি, দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। চারিদিকে মানুষের অভাব, অনটন, যে কোনো সময় গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। খাবারের দাম বাড়তে বাড়তে কেনার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে সামনেই অচিরেই পরিবার নিয়ে এক বেলা না খেয়ে দিন পার করতে হবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ছেলে রাতের বেলা ঘরের দরজা বন্ধ করে কী জানি করে। মাঝে মধ্যে কোনো মেয়ের গলা শোনা যায়। দিনের বেলা বখাটে দেখতে কিছু বন্ধুর সাথে ঘোরাঘুরি করে। ছেলেটা নিশ্চয়ই একটা বাজে কিছুতে জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনদিন না অসামাজিক কিছু করে ফেলে। লজ্জায় আর ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। মানুষ থু থু দেবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ক্ষুধার কষ্ট

আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট। ক্ষুধার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এমন কিছু নেই যা করে না। একজন দিনমজুরের মাথায় সারাদিন একটা চিন্তাই ঘুরে, কালকে সে খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা অর্জন করতে পারবে কি? একজন চাকুরীজীবী সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে: আমি মারা গেলে আমারা ছেলেমেয়েরা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে তো? একজন ব্যবসায়ীর মাথায় সবসময় হিসেব ঘুরতে থাকে: ব্যবসায় কতটা পর্যন্ত লোকসান হলে না-খেয়ে পথে বসতে হবে না। সকালে ঘুমের থেকে উঠে মাথায় চিন্তা আসে নাস্তায় কী খাবো, যা খেয়ে দুপুর পর্যন্ত ক্ষুধার কষ্ট লাগবে না। দুপুরে খাওয়ার সময় মাথায় চিন্তা আসে কত খেলে আর বিকেলে ক্ষুধার কষ্ট করতে হবে না, একবারে রাত পর্যন্ত থাকা যাবে। রাতে খাওয়ার সময় হিসেব চলে ফজরের সময় উঠলে আবার ক্ষুধা লেগে যাবে না তো?

খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা থাকবে কিনা –এই ভয়টা এতই কঠিন ভয় যে, ১৩-১৭ বছর বয়সীদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, ক্ষুধার কষ্টের ভয় তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা জন্ম দেওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যে সমস্ত পরিবারের উঠতিবয়সী যুবক-যুবতীরা ক্ষুধার কষ্ট করে, তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে গিয়ে বাবা-মার কঠিন সংগ্রাম দেখে, মাঝে মধ্যেই এক-দুই বেলা না খেয়ে ক্ষুধার কষ্টে দিন বা রাত পার করে, তাদের মনের মধ্যে ক্ষুধার কষ্টের ভয় ঢুকে যায়। এই ভয় থেকে এক সময় তাদের মধ্যে অস্থিরতা এবং নানা ধরনের মানসিক ব্যাধি দেখা দেয়।[২৯৭]

যারা জীবনে এক সময় অনেক অভাবে পার করেছেন, প্রতিটি দিন সংগ্রাম করতেন কীভাবে মাস চলবে, কীভাবে বাচ্চাদের খাওয়াবেন, তারা যখন একসময় গিয়ে স্বচ্ছল হন, তারপরেও তাদের অনেকের ভেতরে আবার অভাবের জীবনে ফিরে যাওয়ার আতঙ্ক চলে যায় না। ব্যাংক ব্যালেন্সে একটা শূন্য কমে গেলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। কোনো একমাসে আয় একটু কম হলে আতঙ্ক শুরু হয়ে যায়। যদিও তাদের খাওয়া, পড়ার কোনোই সমস্যা নেই, আল্লাহ ﷻ তাদেরকে কয়েক মাস বা বছর স্বচ্ছন্দে চলার মতো যথেষ্ট সম্পদ দিয়ে রেখেছেন, তারপরেও তাদের ভেতরে আগের সেই অভাবী জীবনের দুঃস্বপ্ন কাটে না। তারা চেষ্টা করলেও আল্লাহর ﷻ প্রতি পুরোপুরি কৃতজ্ঞ হয়ে, মন থেকে অশান্তি দূর করে, শান্তির সাথে জীবন পার করতে পারেন না। ক্ষুধার কষ্ট, অভাবের জীবনের ভয় তাদেরকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়।

 

অনিশ্চয়তা

ভয় এবং ক্ষুধা — এই দুটির মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপার রয়েছে, তা হলো অনিশ্চয়তা। মানুষ নিশ্চয়তা অর্জনের জন্য পাগল, অনিশ্চয়তাকে তার কাছে অসহ্য। সবসময় চেষ্টা করে কীভাবে বেতনের নিশ্চয়তা, সমাজে স্ট্যাটাসের নিশ্চয়তা, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়ির নিশ্চয়তা, নিরাপদে রাস্তায় চলার জন্য গাড়ির নিশ্চয়তা, লোন শোধ করার জন্য নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা —এই সব অনিশ্চয়তাকে সবসময় নিশ্চিত করে রাখার জন্য বাবা-মা, সন্তান, আত্মীয়, বন্ধু, যে কোনো সম্পর্ককে উপেক্ষা করে হলেও মানুষ দিনরাত খাটতে রাজি আছে। কিন্তু তার জীবনে নিশ্চয়তা চাই-ই চাই।

মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, তা অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারে না। যখনি মস্তিষ্ক কোনো অনিশ্চয়তা হতে যাচ্ছে এই উপলব্ধি করে বসে, সাথে সাথে সেটি সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। তখন অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে সেই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে মস্তিষ্ক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে একটা বিরাট জটিল যন্ত্র, যার একটা মূল কাজ হচ্ছে সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা।[২৯১]

আমরা শুধু শুনি না, আমরা শুনি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী শুনতে যাচ্ছি। আমরা শুধু দেখি না, আমরা দেখি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী দেখতে যাচ্ছি। আমরা শুধুই পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝার চেষ্টা করি না। আমাদের দেহ প্রায় ৪০টি পারিপার্শ্বিক উৎস থেকে সবসময় সিগনাল প্রসেস করে। অবচেতনভাবে প্রায় ২০ লক্ষ ব্যাপার নিয়ে আমরা সবসময় ভাবছি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নিশ্চিত করার জন্য। কল্পনাতিত পরিমাণের তথ্য আমাদের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে প্রক্রিয়া করছে, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় চেষ্টা করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার। এটি অনিশ্চয়তা একেবারেই পছন্দ করে না।[২৯১]

তথ্য আসক্তি

আধুনিক যুগে এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে — তথ্য-আসক্তি। মানুষ প্রতিনিয়ত শত শত তথ্য গোগ্রাসে গিলছে, যদিও তার সেগুলোর কোনোই দরকার নেই। এর মূল কারণ: মানুষ এভাবে অনিশ্চয়তা দূর করে।[২৯২]ফেইসবুকে কেউ আমাকে নিয়ে কিছু বলল কিনা, কেউ আমার পোস্টে কমেন্ট করলো কিনা, কেউ আমার ছবিতে লাইক দিল কিনা —এই অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য সে দিনের মধ্যে বহুবার ফেইসবুকে গিয়ে দেখে কিছু হলো না।

একইভাবে শেয়ার বাজারের দালাল, তথ্য প্রণেতারা ব্যাপক ব্যবসা করে নেয় আমাদের শেয়ার সম্পর্কে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে। একটার পর একটা সংবাদ চ্যানেল, পত্রিকা চালু হচ্ছে কারণ আমরা অলিতে গলিতে, দেশে, বিদেশে, ডানপন্থী, বামপন্থী, শাসকদল, বিরোধী দল, নিরপেক্ষ দল সব দিকের সব রকম তথ্য জানতে চাই। অনেকে একটা পত্রিকা না রেখে দুটো-তিনটে পত্রিকা রাখেন, তিন-চারটা সংবাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে খবর পড়েন, পাছে কোনো একদিকের মত, কোনো একটা খবর তার অগোচরে থেকে যায়। একদিন রাতের খবর না দেখলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়, কী জানি হারিয়ে ফেললাম? এই তথ্য-আসক্তির মূল কারণ হলো অনিশ্চয়তা।

অনিশ্চয়তার নিশ্চয়তা

মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাজারো ব্যবসা শুরু হয়েছে মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য। লাইফ ইনস্যুরেন্স, বাড়ির লোন, গাড়ির লোন, মোবাইল ফোনের প্যাকেজ, ব্রডব্যান্ড কানেকশন, ওয়ারান্টি, গ্যারান্টি —এরকম হাজারো ভাবে মানুষকে নিশ্চয়তার লোভ দেখানো হচ্ছে। মার্কেটিং কোম্পানিগুলো শিখে গেছে কীভাবে এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের পণ্যের বিক্রি বাড়ানো যায়। তাদের বিজ্ঞাপনে প্রথমে মানুষকে এক অজানা, অনিশ্চয়তার ভয় দেখানো হয়। তারপর বেশি দামে, চড়া সুদে নিশ্চয়তা বিক্রি করা হয়। বোকা মানুষ নিশ্চয়তার এই মিথ্যা ফাঁদে পা দিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে ফেলে। নিশ্চয়তা কিনতে গিয়ে স্বাস্থ্য, সংসার, সন্তান, সুখ সব বিসর্জন দিয়ে দেয়।

আল্লাহ ﷻ মানুষকে এই আয়াতে সাবধান করে দিচ্ছে যে, তিনি মানুষকে অনিশ্চয়তা দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই। সুতরাং অনিশ্চয়তাকে জয় করার জন্য হারাম পথে পা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এক দিকে অনিশ্চয়তা দূর করলে আরেক দিকে আসবে। মাঝখান থেকে সব অনিশ্চয়তাকে জয় করার মিথ্যা স্বপ্ন যেন মানুষকে শেষ করে না দেয়।

সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানো

এরপর আল্লাহ ﷻ পরীক্ষা নেবেন সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু ইত্যাদি নানা সম্পর্কের ভেতরে মৃত্যু আসবেই। এটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে কারো মৃত্যু হয়তো অল্প বয়সে হয়ে যায়। কারো হয়তো দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু হয়। আমরা তখন বলি ‘কপাল খারাপ’, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘আহারে, বেচারা অল্প বয়সে মারা গেল’ ইত্যাদি —এগুলো সব ভীষণ রকমের ভুল কথা। মুসলিমদের কাছে কোনো ‘কপাল খারাপ’ নেই, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘কম বয়সে’ মৃত্যু বলে কিছু নেই। এগুলো বিধর্মী এবং নাস্তিকদের ডিকশনারির শব্দ।

কারো কপাল কখনো খারাপ হয় না, আল্লাহ ﷻ তার জন্য ঠিক যে সব সমস্যা হওয়ার কথা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, তার জীবনে ঠিক তাই ঘটে। কারো অকালে মৃত্যু হয় না, তার ঠিক যে সময় মৃত্যু হওয়ার কথা, ঠিক তখনি মৃত্যু হয়। কারো অপমৃত্যু হয় না, বরং মু’মিন অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা গেলে সে শহীদ হয়ে মরে। তখন এর চেয়ে বড় প্রাপ্য তার জন্য আর কিছু হতে পারে না। কারো অল্প বয়সে মৃত্যু হয় না, পৃথিবীতে তার আয়ু সেটুকুই নির্ধারণ করা ছিল। সে ঠিক সময়মতো মারা গেছে, আগেও না, পরেও না। —এই সত্যগুলো আমরা যদি উপলব্ধি করি, তাহলে আমরা নিজেদেরকে অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট দেবো, অন্যের মাঝেও অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট ছড়াবো।

এরপর আসবে সম্পদ, ফল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। স্টক মার্কেট ধ্বসে যাবে। কেউ লোনে জর্জরিত হয়ে যাবে। কেউ দেউলিয়া হয়ে যাবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যায় ফসল ধ্বংস হয়ে যাবে। নদীর পাড় ভেঙ্গে বাড়ি, জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। —এই হচ্ছে জীবন। এগুলো সবই আল্লাহর ﷻ পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারি যে, আমাদের জীবনের কঠিন সময়গুলো আসলে এক একটা পরীক্ষা এবং আমাদের কাজ হচ্ছে এই পরীক্ষায় ঈমান বজায় রেখে পাশ করা, তাহলে জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করা যেমন সহজ হবে, তেমনি আমরা পরীক্ষায় পাশ করে বিরাট প্রতিদান পাবো।

আর যদি তা না করি, তাহলে জীবনটা অসহ্য হয়ে যাবে। ডিপ্রেশনের ওষুধ খেয়ে দিন পার করতে হবে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুমাতে হবে। হাজার হাজার ওষুধ খেয়ে নষ্ট করা কিডনি নিয়ে ডায়ালাইসিস করতে করতে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে হবে। আর আখিরাতে থাকবে অপমান এবং শাস্তি।

 

আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও

প্রশ্ন আসে: কীসের সুখবর? মুমিনদের জন্য সুখবর একটাই: জান্নাতের নিশ্চয়তা। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই আয়াতে বলে দিলেন: কী করলে আমাদের আর জান্নাত পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আসুন আমরা আমাদের জীবনে ঘটে চলা পরীক্ষাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। এই পরীক্ষাগুলো কীভাবে দিলে আমরা পরীক্ষায় পাশ করবো, তা চিন্তা করে বের করি। তারপর যথাসাধ্য চেষ্টা করি নিজেদের মধ্যে যা কিছু পরিবর্তন করতে হবে, তা করার। ঈমান বজায় রেখে প্রতিটি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ করি।

আল্লাহ ﷻ তখন আমাদেরকে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় সুখবর দিয়ে দেবেন। সেদিন সেই সুখবর পেয়ে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবো। পৃথিবীর জীবনটা তখন কয়েক মুহূর্তের দুঃস্বপ্ন মনে হবে। জান্নাতের সুখবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আমরা ভুলে যাবো পৃথিবীতে কত কষ্ট, কত সংগ্রাম করেছিলাম, কত দুঃখ পেয়েছিলাম। সামনে যে এক নতুন অনন্ত জীবন শুরু হবে, শুধুই আনন্দ, সুখ, হাসি, তৃপ্তির জীবন, সেই জীবন নিয়ে আমরা তখন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে যাবো। কখন জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর ﷻ সাথে দেখা হবে, তাঁর কথা প্রথম বারের মতো নিজের কানে শুনতে পাবো, তাঁর সাথে মন উজাড় করে কথা বলতে পারবো –সেই তীব্র আনন্দে আমরা বাকি সবকিছু ভুলে যাবো।

এর পরের আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জানাবেন এই সুখবর যারা পাবে, তারা কেমন মানুষ। তারা কোনো সাধারণ মানুষ নন। তারা প্রচণ্ড রকমের ধৈর্যশীল। কু’রআনের শিক্ষাকে তারা তাদের কথা, কাজ, চিন্তায় আত্মস্থ করে ফেলেছেন। জীবনের বাস্তবতা কী, বিপদ কেন আসে, কীভাবে আসে, তারা তা খুব ভালভাবে উপলব্ধি করেন। কোনো ধরনের বিপদ তাদেরকে তাদের ইস্পাত দৃঢ় ঈমান থেকে টলাতে পারে না।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • collected from http://quranerkotha.com/

সৃষ্টির উদ্দেশ্য:শেষ পর্ব

Image

লিখেছেন আবু তালহা মোঃ মাহি উদ্দিন

আমরা মানুষ হয়ে জন্ম নেবার পর আমরা কতই না অসহায় অবস্থাই থাকি।আর এই অসহায় অবস্থা থেকে সময়ের  বির্বতনে আস্তে আস্তে আমাদের মনের ভিতরের অদৃশ্য জানালাটা খুলতে শুরু করে।সেই জানালাতে একটি কালো পর্দা থেকে যায়।যারা মনের  জানালার এই কালো পর্দাটা সরাতে চায় তাদের সামনে একটি ঔষধ  আছে।শুধুমাত্র সেই ঔষধ দ্বারাই কালো পর্দাটা সরিয়ে আসল জগৎটা দেখা সম্ভব।আর সেই ঔষধটা হল পবিত্র আল-কুরআন।যার মধ্যে আমদের জীবন পরিচালনার  পরিপূর্ন্য দিক নির্দেশনা পাই।আর এটার মূল কথা হল আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন করা অর্থ্যাৎ আল্লাহের দাসত্ব করা।আর এই দাসত্বের মধ্যেই প্রকৃত স্বার্থকতা কেননা আল্লাহ তা’আলা শুধুমাত্র তার দাসত্বের জন্যই আমাদের সৃষ্টি করেছেন।আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেনঃ

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾

 জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব  করবে৷ “

[সূরা আয যারিয়াতঃ৫৬]

এটা মানে আবার বুঝবেন না যে ,ঘর-সংসার বাদ দিয়ে বৈরাগী হয়ে যাওয়া।আমাদের এই জীবনকে সর্ম্পূন ব্যালান্স করে চলতে হবে।যেমনটি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ(সা) তার জীবনে করেছিলেন।তার জীবনীই আমাদের একমাত্র মডেল হওয়া উচিত,অন্য কারো জীবনী আমাদের জীবনের মডেল হতে পারে না।আল্লাহ তা’আলা কুরাআনে বলেনঃ

﴿مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا﴾

 যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ “

[সূরা আন নিসাঃ৮০]

আল্লাহ তা’আলা অন্য এক আয়াতে বলেনঃ

﴿وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنتُمْ تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ آيَاتُ اللَّهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُ ۗ وَمَن يَعْتَصِم بِاللَّهِ فَقَدْ هُدِيَ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ﴾

 তোমাদের জন্যে কুফরীর দিকে ফিরে যাবার এখন আর কোন সুযোগটি আছে, যখন তোমাদের শুনানো হচ্ছে আল্লাহর আয়াত এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর রসূল ? যে ব্যক্তি আল্লাহকে মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরবে, সে অবশ্যি সত্য সঠিক পথ লাভ করবে৷ “

[সূরা আল ইমরানঃ১০১]

অর্থ্যাৎ আমরা যদি হযরত মুহাম্মদ(সা) এর সুন্নাহ আমাদের জীবনে প্রয়োগ করি তাহলেই সফল হব।

এজন্যই  হযরত মুহাম্মদ(সা) তার বিদায় হজ্জে আমাদের দুটি জিনিস আকঁড়ে ধরে রাখতে বলেছিলেন,এক আল কুরআন ও তার রেখে যাওয়া সুন্নাহ।কুরাআনে আল্লাহ বলেনঃ

 “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জু  মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরো ।”

[সূরা আল ইমরানঃ১০৩]

আমরা কি তার দেয়া নির্দেশ মানছি?আপনাদের মনকে প্রশ্ন করেন ,উত্তর পেয়ে যাবেন।

বস্তুত আমরা ত  আছি এক  অদৃশ্য মোহে।এই মোহ হতে পারে টাকা-পয়সা,ধন-দৌলত,হতে পারে নারী,গাড়ী,মদ আরো অনেক কিছু ।আর এই মোহটাই আমাদের মনের জানালার উন্মচন করার পথে প্রধান  অন্তরায় অর্থ্যাৎ মরিচা  হিসাবে কাজ করছে।এই মরিচা তখনই রোধ করতে পারব যখন আমরা কুরআন পড়ব,বুঝব এবং সেই অনুযায়ী আমল  করব।

আমরা কিন্তু আমাদের সৃষ্টির যে প্রকৃত উদ্দেশ্য তা ভুলে গিয়ে কোন গন্তব্য ছাড়া অজানা পথে চলছি।গন্তব্যহীন কোন পথিক যদি চলতে থাকে তাহলে কি তার পথের দিশা পাবে ?

অবশ্যই “না”।।

তাকে সবাই পাগল বলবে ।আসলে আমরা কতই হতভাগা যে ঐ পথেই চলছি কোন গন্তব্যছাড়া।আল্লাহ কুরআনে বলছেনঃ

﴿ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ﴾

 এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ৷  এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য ।”

[সূরা আল বাকারাহঃ২]

একটু ভাবুন আমরা কত অকৃতজ্ঞ ,বেইমান কেননা যে আল্লাহ রাব্বিল আলামিন আমাদের সৃষ্টি করল তাকেই কিনা আমরা ভুলে যাই।আমরা বড়ই নাফরমানি করছি।আর আল্লাহ তা’আলা এই নাফরমান লোকদের সর্ম্পকে কুরআনে বলছেনঃ

﴿أُولَٰئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ﴾

 এরা এমন সব লোক যাদের কর্মকাণ্ড (আমল) দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই নষ্ট হয়ে গেছে এবং এদের কোন সাহায্যকারী নেই ।”

[সূরা আল ইমরানঃ২২]

অর্থ্যাৎ আমাদের এই তুচ্ছ জীবনে সামান্য ভোগ-বিলাস এর বিনিময়ে আমরা জাহান্নাম কিনে নিচ্ছি।সুতরাং আমাদের  এই তুচ্ছ জীবনকে আনন্দ- ফূর্তিতে কাটাতে গিয়ে… যে অবহেলায় সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারল না তার জন্য আখেরাতে শুধুই আফসস এবং অনন্তকাল আগুনে পোড়ার সূর্বন সুযোগ।এই প্রসজ্ঞে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

﴿مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۚ وَبِئْسَ الْمِهَادُ﴾

 এটা নিছক কয়েক দিনের জীবনের সামান্য আনন্দ ফূর্তি মাত্র ৷ তারপর এরা সবাই জাহান্নামে চলে যাবে, যা সবচেয়ে খারাপ স্থান৷ “

[সূরা আল ইমরানঃ১৯৭]

আমরা যদি এই ভোগ-বিলাসীতা ,খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকে কুরআন -সুন্নাহ মোতাবেক আমাদের জীবন পরিচালনা করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই তাহলেই আমরা আমাদের আসল  গন্তব্যে  পৌছেঁ যাব।আমাদের সৌভাগ্য যে আমারা এখনও বেঁচে আছি।একটু ভেবে দেখুন আপনাদের নিকট আত্বীয়-স্বজন ,বন্ধু-বান্ধব যারা জীবিত নেই তাদের কথা স্বরণ করুন,তারাও আমাদের মত আনন্দ-ফূর্তি করত,ধন-দৌলত এর লোভ  ছিল।তারা কই এখন?

তাদের অবস্থা কি?……আপনি কি জনেন?…তাদের কবরে কি হছে?আমাদের মনকে আমারা জিজ্ঞেস করি আমরা কি ওই কবরে যেতে প্রস্তুত?

আপনার মনকে আপনি এই প্রশ্ন করুন উত্তর পেয়ে যাবেন।আমাদের একটু ধৈর্যশীল হয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে আখিরাতের প্রস্তুতি নেবার মাঝেই  এই জীবনের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে।কুরাআনে আল্লাহ বলছেনঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾

হে ঈমানদানগণ! ধৈর্যের পথ অবলম্বন করো, বাতিলপন্থীদের মোকাবলায় দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো৷ আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে৷

সর্বশেষে আল্লাহ তা’আলা আমাদের সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন…।আমিন…।।

সৃষ্টির উদ্দেশ্য: পর্ব ১

 লিখেছেন আবু তালহা মোঃ মাহি উদ্দিন

জীবনের সংজ্ঞা হয়ত বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্নরকম।আমাদের কাছে যদি জীবন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় তাহলে আমরা অধিকাংশ মানুষ হয়ত সোজাসাপ্টা কিছু মুখের বলি মারব।যেটা আনেকটা এই রকম,

“জীবনটা একটা রহস্য।যতুটুকু বুঝি ,জীবন মানে Enjoy,ফূর্তি,বিয়ে ,সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া,
টাকা-পয়সা,গাড়ি-বাড়ি হওয়া …আরও অনেক কিছু……। 
এইত্……।“

শেষ।আর যদি প্রশ্ন করা হয়,এইগুলো শেষ হবার পর কি করবেন?মানে সহজে ৬০ বছর পর বেঁচে থাকলে এরপর কি করবেন?কথাটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেটা হয়………

“ওহ…৬০ বছর পর।হমমম…….নামাজ পড়তে হবে,হজ্জ করতে হবে,মানুষকে যাকাত দিতে হবে।পারলে মসজিদ বানাতে হবে।আর কি?এটাই ত করতে হবে।“

এগুলোই বলে অধিকাংশ মানুষ ।যদিও আমরা মুসলিম।আমরা ভাবি বৃদ্ধ বয়সের কাজ হল নামাজ,হজ্জ ইত্যাদি।আর যৌবনের কাজ হল ফূর্তি ,পয়সা উপার্জন ইত্যাদি। আমাদের জীবনটা কি এটাই?আমরা কি কখনও ভাবি না আমরা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছি?কিভাবে কথা বলছি,শুনছি,পড়ছি,নতুন কিছু আবিষ্কার করছি,আরো কত কিছু…।
এটা কিভাবে করছি এই কাজগুলো,কার সাহায্যে করছি,কে আমাকে সাহায্য করছে ?এটা কি কখনো ভেবে দেখেছি।
না… দেখি নি।আরে…সময় কই?কত কাজ…………
এই সাহায্যগুলো করছে আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।যার সাহায্য ছাড়া আমরা এক মূহুর্ত কল্পনা করা যায় না। আমরা এই সহজ উত্তরটা জানি।অথচ তাকেই কিনা আমরা মনে রাখি না ।ছি ছি কতই না অকৃতজ্ঞ আমরা।
আমাদের দৃষ্টিতে আমরা আশেপাশে যেসব প্রানি দেখি সেসব প্রানিরও প্রাণ আছে আমাদেরও প্রাণ আছে ।তাহলে পার্থক্যটা কি?আমরা সবাই জানি ,বুদ্ধি!!!তাই না……।
এই বুদ্ধি থাকার ফলেই আমরা সৃষ্টির সেরা জীব।কিন্তু আমাদের এই বুদ্ধি থাকার পরও আমাদের এই বুদ্ধি নামক জিনিসটাতে এক আবরন অর্থাৎ মরিচা পড়ে বলতে পারি।অবাক করার বিষয় আমরা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারছি না।কুরআনে আল্লাহ বলছেনঃ

“ আমি তাদের সামনে একটি দেয়াল এবং পেছনে একটি দেয়াল দাঁড় করিয়ে দিয়েছি৷ আমি তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি, এখন তারা কিছুই দেখতে পায় না৷ 

﴿وَسَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ﴾ 
[সুরা ইয়াসিনঃআয়াত৯]
অর্থাৎ আমরা আল্লাহকে ভুলে যাবার ফলে আল্লাহ আমাদের ব্রেনের সামনে একটা দেয়াল দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।এর অন্যতম কারণ আমরা এই দুনিয়ার মোহে মত্ত হয়ে আছি।আমরা মনে করছি যে,আমরা ত ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি হয়েছি,টাকা-পয়সা উপার্জন করছি,সমাজে খ্যাতি পাচ্ছি।তাহলে বুদ্ধিতে মরিচা পড়ল কিভাবে?প্রশ্নটা হতেই পারে…স্বাভাবিক।নাস্তিকদের সাথে সাথে মুসলিমদেরও একই অবস্থা।
এই মরিচা বা আবরণ পড়ার আন্যতম কারণ হল আমরা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দেওয়া শেষ আসমানি কিতাব আলকুরআন না পড়া।আর আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলছেনঃ

“ এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ৷ এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য 

﴿الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ﴾ 
[ সূরা বাকারাঃআয়াত ২]

ইসলামে সঙ্গীতঃশেষ পর্ব

 

লিখেছেন হাসান মাহমুদ

না, করছেন না। ইসলাম তো স্বাভাবিক ধর্ম − সঙ্গীত কি অস্বাভাবিক হতে পারে ?
পশু-পাখি-মাছেরা পশু-পাখি-মাছ হয়েই জন্মায় কিন্তু মানুষ হয়ে উঠতে মানুষের সুকুমার
বৃত্তির দরকার হয়, সঙ্গীতই সেই সুকুমার বৃত্তি। সাহিত্য, কবিতা, চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যের
ক্ষেত্রেও তা সত্য। হারাম তো শূকরের মাংস, গান কবে থেকে শূকরের মাংস হল ? আর,
বাড়াবাড়ি করা ? ‘গান হারাম’ বলাই তো সেই বাড়াবাড়ি ! খোদ ইসলাম নিয়েই তো
বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ (সুরা মায়েদা ৭৭, নিসা ১৭১ ও নবীজীর বিদায় হজ্বের ভাষণ)।
ইসলাম আপনার হৃদয়ে আছে, সেখানে প্রশড়ব করুন সৎভাবে। এবং তার জবাব
নিয়ে শক্ত সোজা হয়ে দাঁড়ান। আপনার ইসলামের মালিকানা আর কারো হাতে
ছেড়ে দেবেন না। মাথাটা নত করলেই ওরা আপনার পিঠে সুপারগু
লাগিয়ে ঠেসে
বসবে। আপনি সোজা হয়ে দাঁড়ালে তা পারবে না। অন্যের মতামতের ফটোকপি
হবার জন্য আমাদের মাথাটা দেয়া হয়নি। ঘাড়ের ওপর সারাজীবন বোঝার মতো
বইতেও দেয়া হয়নি, কাজে লাগানোর জন্যই দেয়া হয়েছে।
সঙ্গীত হল আমাদের সসীম জীবনে এক টুকরো অসীমের ছোঁয়া। চারদিকের আকাশবাতাস
সাগর-পর্বত গ্রহ-নক্ষত্র, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক বিপুল সুরস্রষ্টার মহাসঙ্গীত। তাই,
গান শুনুন এবং বাচ্চাদের গান শোনান। গান করুন এবং বাচ্চাদের গান শেখান। গান যে
ভালবাসে না সে মানুষ খুন করতে পারে। গানের মত বেহেশতি জিনিস যে অপদর্শনে
শূকরের মাংস হয় সেটা আসলে ইসলামের ছদ্মবেশে অন্যকিছু, বিশ্ব-মুসলিমের মঙ্গলের
জন্যই ওটাকে শক্তহাতে প্রতিহত করা প্রয়োজন।
শেষ করছি বর্তমান বিশ্বের অবিসম্বাদিত সর্বোচ্চ শারিয়া-নেতার উদ্ধৃতি দিয়ে।
“সঙ্গীত এমন বিনোদন যাহা প্রাণে আনন্দ দেয়, হৃদয় তৃপ্ত করে এবং শ্রবণকে আরাম
দেয়…উত্তেজনাপূর্ণ না হইলে ইহার সহিত বাদ্যযন্ত্র থাকিলে ক্ষতি নাই…আয়েশা
বলিয়াছেন যখন এক আনসারের সাথে এক মহিলার বিবাহ হইতেছিল তখন রসুল (সাঃ)
বলিলেন, ‘আয়েশা, তাহারা কি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করিয়াছে ? আনসারেরা
চিত্তবিনোদন ভালবাসে’ (বুখারি)।” ইবনে আব্বাস বলিয়াছেন আয়েশা তাঁহার এক
আত্মীয়াকে এক আনসারের সাথে বিবাহ দিলেন। রসুল (সাঃ) আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন
‘তাহার সাথে কি কোন গায়িকা দিয়াছ ?’ আয়েশা বলিলেন, ‘না।’ তখন রসুল (সাঃ)
বলিলেন, ‘আনসারেরা কবিতা ভালবাসে। এমন কাউকে পাঠানো তোমার উচিত ছিল যে
গাহিবে − আমরা আসিলাম তোমাদের কাছে, আমাদের সম্ভাষণ করো, আমরাও
তোমাদের সম্ভাষণ করি’ (ইবনে মাজাহ)। আয়েশা বলিয়াছেন ঈদুল আজহা’র দিনে
মিনা’তে তাঁহার সহিত দুইজন বালিকা ছিল যাহারা ‘দফ’ (অনেকটা আমাদের ঢোলকের
মতো – লেখক) বাজাইয়া গান গাহিতেছিল। রসুল (সাঃ) মুখ চাদরে ঢাকিয়া তাহা
শুনিতেছিলেন (হাদিসে আছে তিনি মুখ ঢেকে শুয়েছিলেন)। আবু বকর আসিয়া
বালিকাদিগকে বকাবকি করিলেন। রসুল (সাঃ) মুখ বাহির করিয়া বলিলেন, ‘উহাদিগকে
ছাড়িয়া দাও, আবু বকর। আজ ঈদের দিন’ (বুখারী ও মুসলিম)। ইমাম গাজ্জালী তাঁহার
এহিয়ে উলুম আল্ দ্বীন কেতাবে (‘গান শোনা’ অধ্যায়ে ‘অভ্যাস’ পরিচ্ছেদে) গায়িকাবালিকার
উলেখ
করিয়াছেন…‘ইহা নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে গান গাওয়া ও খেলাধুলা করা
হারাম নহে…দলিলে আছে বহু সাহাবি ও পরের প্রজন্মের মুসলিম বিশেষজ্ঞরা গান
শুনিতেন ও ইহাতে কোন দোষ দেখিতেন না। গবেষকদের মতে গান গাহিবার বিরুদ্ধে
যেসব হাদিস আছে তাহা নির্ভরযোগ্য নহে।’ আইনবিদ আবু বকর আল্ আরাবি বলেন,
‘সঙ্গীত নিষিদ্ধের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনই হাদিস নাই।’ ইবনে হাজম (১১শ’ শতাব্দীর
স্পেন খেলাফতের বিখ্যাত শারিয়াবিদ − লেখক) বলিয়াছেন, ‘এই বিষয়ে (সঙ্গীত নিষিদ্ধের
বিষয়ে − লেখক) যাহা কিছুই লিখা আছে সকলই মিথ্যা ও ভেজাল।’
(সুরা লোকমান ৬-এর ব্যাপারে) ইবনে হাজম বলেন, ‘এই আয়াতে আলাহ’র
পথ নিয়া
ঠাট্টা করার অভ্যাসকেই আলাহ
নিন্দা করিয়াছেন, উহাকে নহে যেই অলস কথাবার্তা মানুষ
করে মানসিক প্রশান্তির জন্যই, কাউকে আলাহ’র
পথ হইতে পথভ্রষ্ট করার জন্য নহে।’
সুরা ইউনুস আয়াত ৩২-এর ভিত্তিতে যাঁহারা বলেন সঙ্গীত যেহেতু ‘সত্য’ নহে তাই
সঙ্গীত নিশ্চয়ই ‘মিথ্যা’, তাহাদের যুক্তিকেও ইবনে হাজম ভুল প্রমাণ করিয়াছেন…তাই যে
ব্যক্তি আলাহ’র
প্রতি দায়িত্ব পালন ও ভাল কাজের শক্তিলাভের জন্য চিত্তবিনোদনের
উদ্দেশ্যে গান শোনে সে আলাহ’র
অনুগত বান্দা এবং তাহার এই কর্ম সত্য। পক্ষান্তরে,
যে ব্যক্তি আলাহ’র
প্রতি বাধ্য বা অবাধ্য হইবার চিন্তা না করিয়া গান শোনে, সে নিরপেক্ষ
ও ক্ষতিকর নহে এমন কাজ করে যেমন পার্কে যাওয়া বা হাঁটিয়া বেড়ানো, কিংবা জানালায়
দাঁড়াইয়া আকাশ দেখা, কিংবা নীল বা সবুজ কাপড় পরা, ইত্যাদি। যাহা হউক, সঙ্গীতের
ব্যাপারে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন গানের কথায় যদি মদ্যপানের প্রশংসা থাকে ও
লোককে মদ্যপানে উৎসাহিত করা হয়, তবে উহা গাওয়া বা শোনা হারাম। গানের
পরিবেশনাও উহা হারাম করিতে পারে যেমন গানের সাথে শারীরিক উত্তেজক অঙ্গভঙ্গি।”
কার উদ্ধৃতি দিলাম ? তিনি পুরো শারিয়া-বিশ্বের সর্বোচ্চ নেতা ডঃ ইউসুফ
কারজাভী, বিশ্বময় বহু শারিয়া-ব্যাঙ্ক, দেশি ও আন্তর্জাতিক বহু শারিয়া-সংগঠনের
প্রেসিডেণ্ট ও চেয়ারম্যান। উদ্ধৃতি দিলাম তাঁর বই “দ্য ল’ফূল অ্যাণ্ড প্রোহিবিটেড
ইন্ ইসলাম” থেকে ঃ
এর পরেও যদি কেউ বলেন গান হারাম তবে তাঁর উচিত ডঃ ইউসুফ কারজাভী’র
সাথে বিতর্ক করে তাঁকে পরাজিত করা।
মুসলমান হতে হলে মানবদরদী হতেই হবে এবং মানবদরদী হতে হলে কাব্যসঙ্গীতময়
হৃদয় থাকতেই হবে। তাই ভালো মুসলমান আর হিংস্র মুসলমানের একটি পার্থক্য হল
সাঙ্গীতিক মন থাকা ও না-থাকা ॥
 

ইসলামে সঙ্গীতঃপর্ব ১

 লিখেছেন হাসান মাহমুদ

ডিরেক্টর, শারিয়া আইন ও প্রাক্তন প্রেসিডেণ্ট,


মুসলিম ক্যানাডিয়ান কংগ্রেস

আমাদের মতো গান-পাগল জাত, নাচে-গানে ভরপুর, ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’
দুনিয়ায় বোধহায় আর নেই। হাজার বছর ধরে গ্রামের রাস্তায় একতারা বাজিয়ে
নেচে নেচে গভীর দার্শনিক গান গায়নি আর কোনো জাতির ছিনড়ববস্ত্র উদাস বাউল।
আমাদের চাষি-জেলে-তাঁতি-মাঝি-কামার-কুমোর, এমনকি সাপ-ধরা বেদে ও ছাদ-
পেটানো পর্যন্ত প্রতিটি পেশা তার নিজস্ব মৌলিক গানে সমৃদ্ধ। দেবর-ভাবির পরিহাসের
গান, নানা-নাতির গম্ভীরা বা কবিয়ালের তাৎক্ষণিক গান-যুদ্ধ তো বাংলার আশ্চর্য সম্পদ −
দুনিয়ার কোনো জাতিরই নেই। তাই গান নেই তো বাংলাও নেই, বাঙালিও নেই।
আর, একাত্তরে ? একাত্তরে গান আমাদের ‘দৃপ্ত স্লোগান,
ক্ষিপ্ত তীর-ধনুক।’
তারপরেও অনেকেই মনে মনে অপরাধবোধে ভোগেন − কি জানি, গান গেয়ে
গান শুনে গুনাহ্ করছি নাতো ! সেজন্যই নিরপেক্ষভাবে সবদিকের ইসলামি দলিল
দেখিয়ে এ নিবন্ধ লেখা যাতে সবাই দলিলগুলো জেনে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটা
আরও দরকার এজন্য যে আমরাই একমাত্র জাতি যার সঙ্গীতকে উচ্ছেদ করার জন্য
বোমা মেরে মানুষ খুন করার লোক আছে। তাই বুকের রক্ত ঢেলে আমাদের সঙ্গীতকে
রক্ষা করতে হয়। পৃি থবীর অন্য কোনো জাতির এ অ™ুত¢ ও ভয়ানক সমস্যাটা নেই।
বহু আগে কেউ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলেছিল −
‘গান হারাম’! সেই ফিসফিস হয়েছে কানাকানি, কানাকানি হয়েছে আলোচনা, আলোচনা হয়ে
উঠেছে দাবি, কোথাও কোথাও দাবি হয়ে উঠেছে হুঙ্কার। ‘গান হারাম’ নাকি তাঁদের নিজস্ব
মতামত নয়, এ নাকি একেবারে আলা-
রসুলের নির্দেশ। উদ্ধৃতি ঃ “সঙ্গীত, নৃত্য ও
চিত্রশিল্পকলা হইল অশীল
শিল্প ও কঠিনভাবে ইসলাম বিরোধী” − মওলানা মওদুদি ‘এ শর্ট
হিস্ট্রি অব্ দ্য রিভাইভালিস্ট মুভমেণ্ট ইন্ ইসলাম’ পৃঃ ৩০।
তাই ? ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ হারাম ? ‘আমি বাংলার গান গাই’ কঠিনভাবে
ইসলাম-বিরোধী ? ‘বাড়ির পাশে আরশিনগর’, ‘কান্দে হাছন রাজার মন ময়না’ অশীল
শিল্প ?
‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া’ এবং বাংলার মায়েদের মধুকণ্ঠে
‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’ সবই হারাম ? কেন ?
ভারতবর্ষের রাগৈশ্বর্য পরিপূর্ণ হয়ে নেই মিয়া তানসেন. আমির খসরু, ওস্তাদ আলাউদ্দিন, বড়ে
গোলাম আলী, ছোটে গোলাম আলী, করিম খান, বিসমিলা
খান, বেলায়েৎ হুসেন, কেরামত
আলী, আলী আকবর, জাকির হুসেন, আলারাখা,
আমজাদ আলী, রইস খান, নাজাকাতসালামত,
আমানত-ফতে আলী, আর আমাদের নিলুফার ইয়াসমিন, আখতার সাদমানী,
মোবারক হোসেন খান ও ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দীনের অজস্র উপহারে ? হার্মোনিয়াম-তবলাপাে
খায়াজের সাথে গান হয় না আমাদের ইসলাম প্রচারকদের দরগাতেও ? (এর নাম
‘সামা’)।

বিদেশেও এক জামাতি কনফারেন্সে শুনেছি সাওন্ড ভিশন সঙ্গীত-কোম্পানীর
অ্যাডাম্স্-ওয়ার্ল্ড সিরিজের ইসলামি গান, বাদ্যযন্ত্রের কানফাটানো হুঙ্কারে গায়কের “আ-ল্-
লা-হু আ-ক-বা-র” ছাড়া আর কিছুই বোঝা গেল না। টরণ্টোর ইসলামি-কনফারেন্সে
দেখেছি গায়ক হালাল, গায়িকা হারাম, এবং বাদ্যযন্ত্র মাকরুহ । বছর দশেক আগে
বাংলাদেশ জামাতিদের ১৬ই ডিসেম্বরের উৎসবও ছিল তাই।
গানকে হারাম, অপমানিত ও নিষিদ্ধ করেছে শারিয়াপন্থীদের (সবাই নন) কেতাব,
সংগঠন, শারিয়া আইন এবং কোথাও কোথাও সরকারি আইনও। গানের কুৎসিৎ কথা,
কুৎসিৎ অঙ্গভঙ্গি বা গানের অতিরিক্ত নেশায় জীবনের ক্ষতি ইত্যাদির সীমা টানেননি তাঁরা,
পুরো সঙ্গীতকেই বাতিল করেছেন ঢালাওভাবে। উদাহরণ দিচ্ছি ঃ
১।

শারিয়া কোর্টে গায়িকার সাক্ষী নিষিদ্ধ-হানাফি আইন হেদায়া পৃষ্ঠা ৩৬১,
শাফি’ আইন নং ও-২৪-৩-৩।
২।

স্ত্রীকে কোনো বাদ্যযন্ত্র দেয়া যাইবে না − টি পি হিউগ্স্ − ডিকশনারী অব
ইসলাম, পৃষ্ঠা ৬৭৫, শিকাগো।
৩।

চুরির মাল কতটা‘সম্মানিত’ তার উপরেও চোরের হাত কাটা নির্ভর করে।
যেমন, বাদ্যযন্ত্র চুরি করা বৈধ − মেমরি, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৪। অর্থাৎ
বাদ্যযন্ত্র এতই নিকৃষ্ট যে ওটা চুরি করা যেতে পারে।
৪। ২০০৪ সালের জানুয়ারীতে আফগান সরকার সংসদে এসেই সর্বপ্রম যে
অপকর্মটি করেছে তা হলো রেডিও-টিভি-বিচিত্রানুষ্ঠানে নারীর গান ও খবর
পড়া নিষিদ্ধ, এ-আইন পাশ করা ও প্রয়োগ করা।
৫।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে শারিয়াপন্থীরা ভোটে জিতে ক্ষমতায়
এসে প্রমেই ওই একই অপকর্ম করেছে। ওদের জন্য এটা হলো বেহেশতের
সিঁড়ি। তাই বাংলাদেশেও ওরা সরকারি বা সামাজিকভাবে শক্তিশালী হওয়া
মাত্রই ঐ অপকর্ম করবে তা নিশ্চিত নিশ্চিত।
কোরাণে হালাল-হারামের স্পষ্ট তালিকা আছে। গান হারাম হলে সে-তালিকায় গানের
কথা অবশ্যই থাকত কারণ আলাহ
কোনকিছু ভুলে যান না। তবু গানকে হারাম করতে
কোরাণের বাহানা করা হয় প্রধানত দু’টো সুরা দিয়ে ঃ (১) সুরা লোকমান ৬ −
“একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আলাহ’র
পথ হইতে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে
অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহা লইয়া ঠাট্টা-

বিদ্রুপ করে”, এবং (২)
বনি ইসরাইল আয়াত ৬৪ (আলাহ
শয়তানকে বলছেন) −“তুই তাদের মধ্য থেকে যাকে
পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে সত্যচ্যুত করে
তাদেরকে আক্রমণ করো।”

তাঁরা বলেন সঙ্গীত হারাম কারণ সুরা লোকমান ৬-এর ‘অবান্তর কথাবার্তা’-ই নাকি
সঙ্গীত (মওলানা মুহিউদ্দিনের কোরাণের অনুবাদ, পৃঃ ৭৮৩ ও ১০৫৩-৫৪)।

খবরটা তাঁদের কে দিল তার কোনো উলেখ
নেই কিন্তু কথাটা মতলবি ও উদ্ভট তা বাচ্চাও
বোঝে। অবান্তর কথাবার্তা অবান্তর কথাবার্তাই, অন্যকিছু নয়। একই খেলা করা হয়েছে
বনি ইসরাইল ৬৪ নিয়েও। আজিজুল হক সাহেব তাঁর সহি বোখারী ৪র্থ খণ্ড ১৮ পৃষ্ঠায়
এর অনুবাদ করেছেন (আলাহ
শয়তানকে বলছেন) ঃ “তুই তোর চেলাবেলা, লোক-লস্কর
দ্বারা ও রাগ-রাগিনী গান-বাজনা ও বাদ্যবাজনা দ্বারা মানুষকে বিপথগামী করার চেষ্টা
চালিয়ে যা।” অর্থাৎ রাগ-রাগিনী, গান-বাজনা ও বাদ্যবাজনা হলো শয়তানের অস্ত্র, তাই
সেটা হারাম। অনুবাদটা ডাঁহা মিথ্যা। সঙ্গীতের আরবি শব্দ “মুসিকি”।

আয়াতটায় মুসিকি নেই, আছে ‘সাওত’ অর্থাৎ ‘আওয়াজ’।
বিভিনড়ব বিষয়ে এক রসুলের দুই বিপরীত সুনড়বত দিয়ে ইসলামি কেতাবগুলো ভর্তি।
গানেরও পক্ষে-বিপক্ষে কিছু হাদিস আছে। প্রমে বিপক্ষের তিনটি দেখাচ্ছি ঃ
ক্স রসুল নিষিদ্ধ করিয়াছেন মদ্যপান, জুয়া ও সারিন্দা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্র − আবু দাউদ।
ক্স রসুল বলিয়াছেন − আমার পরোয়ারদিগার আমাকে আদেশ করিয়াছেন সকল
বাদ্যযন্ত্র ও বাঁশি উচ্ছেদ করিতে − মিশকাত ৩১৮।
ক্স রসুল বলিয়াছেন কেয়ামতের ইঙ্গিত হিসেবে গায়িকা ও বিভিনড়বরকমের বাদ্যযন্ত্রের
আবির্ভাব হইবে − মিশকাত ৪৭০।
আমরা সটান বলতে পারি এগুলো মিথ্যা হাদিস কিন্তু গান-হারামকারীদের কাছে
আমাদের কথার গুরুত্ব কিই বা। তাই চলুন যাঁদের কথার গুরুত্ব আছে সেই
শারিয়া-নেতাদের উদ্ধৃতি থেকেই প্রমাণ করি গান হারাম তো নয়ই বরং গান হারাম
বলাই হারাম। তাঁরা সহি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন কিন্তু হাদিসের নম্বরগুলো
দেননি। নম্বরগুলো দিচ্ছি যাতে আপনারা মিলিয়ে নিতে পারেন ঃ বুখারী ৩৯৩১,
২য় খণ্ড ৭০, ৪র্থ খণ্ড ১৫৫, ৫ম খণ্ড ৩৩৬ ; মুসলিম ৯৮২, ও মিশকাত ৬ষ্ঠ খণ্ড।
১। “রসুল (সাঃ) বিবাহ-অনুষ্ঠানে গানের শুধু অনুমতিই দেন নাই বরং বালিকাদের
গান শুনিয়াছেন।এমনি এক অনুষ্ঠানে যখন তাহারা গাহিতেছিল − ‘আমাদের মধ্যে
এক রসুল আছেন যিনি জানেন আগামীকাল কি ঘটিবে’ − তখন তিনি তাহাদিগকে
থামাইয়া বলিয়াছেন ‘এই বাক্যটি বাদ দাও এবং গাহিতে থাক।’ ইহাকে শুধু বিবাহ-
অনুষ্ঠানের অনুমতি মনে করিবার কোনই কারণ নাই।” (অর্থাৎ বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও
গানকে নবীজী অনুমতি দিয়েছেন)। ক্যানাডার সুবিখ্যাত ইমাম শেখ আহমেদ কুট্টি
২। “হজরত ওসর (রঃ)-এর আবাদকৃত শহরের মধ্যে দ্বিতীয় হইল বসরা। আরবি ব্যাকরণ,
আরূয শাস্ত্র এবং সঙ্গীতশাস্ত্র এই শহরেরই অবদান” − বিখ্যাত কেতাব ‘আশারা
মোবাশ্শারা’, মওলানা গরিবুলাহ
ইসলামাবাদী ফাজেল-এ দেওবন্দ, পৃষ্ঠা ১০৬।
৩। “ডেভিডকে আমরা দাউদ (আঃ) বলে জানি। তিনি মূলত ধর্মোপদেশকে, ও
যোদ্ধা, জ্ঞানী ব্যক্তি সর্বোপরি একজন নবী ছিলেন। ইতিহাসের পাতায় তাঁকে
আমরা দেখতে পাই একজন কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবেও” − সেনানায়ক মহানবী
(সঃ) − যুদ্ধ ও শান্তি − ব্যারিস্টার তমিজুল হক, পৃষ্ঠা ১৭।
৪।

ব্যারিষ্টারের লেখা ইসলামি কিতাব কারো মন না ওঠে তবে তার জন্য
আছেন অখণ্ড ভারতের সর্বোচ্চ ইসলামি নেতাদের অন্যতম, ভারতীয় কংগ্রেসের
দু’দু’বার সভাপতি কোলকাতার ঈদের নামাজ পড়ানোর পেশ ইমাম মওলানা
আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেছেন ঃ “পয়গম্বর দাউদ (আঃ)-এর কণ্ঠস্বর
অত্যন্ত মিষ্টি ছিল। তিনি সর্বপ্রম হিব্র“ সঙ্গীতের সঙ্কলন করেন ও মিশরের ও
ব্যাবিলনের গাছ হইতে উচ্চমানের বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবনা করেন” − তাঁর তর্জুমান
আল্ কুরাণ, ২য় খণ্ড পৃঃ ৪৮০
৫।

ব্যারিষ্টারের লেখা ইসলামি কিতাব কারো অপছন্দ হলে তিনি এটাও
দেখতে পারেন। এ নিয়ে যাঁরা বিস্তৃত গবেষণা করে মুস্তাফা কানাদি
(www.shahbazcenter.org) কোরাণের ইউসুফ আলী’র ব্যাখ্যার (বিশ্বে
সর্বাধিক প্রচলিত) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন ঃ “আলাহ
প্রজ্ঞা হইল যে, স্থান-কালের
পরিপ্রেক্ষিতে নবীগণের আধ্যাত্মিক গুণাবলী বিভিনড়ব রূপ ধারণ করে। ইহার উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত হইল দাউদকে গান ও সঙ্গীত দেওয়া হইয়াছিল।”
৬।

যাদের  পড়ার ধৈর্য নাই  কিন্তু নাটক সিনেমার  পোকা তারা দেখুন পাকিস্থানি
ছায়াছবি ‘খুদা কে লিয়ে’ − বোম্বের নাসিরুদ্দীন শাহ্ দরবেশ-এর দুর্ধর্ষ অভিনয়
করেছেন। ওটাতেও সহি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো হয়েছে ইসলামে গান
হারাম তো নয়ই, বরং শক্তভাবে হালাল।
৭।

এতেও যদি কারো মন না ওঠে তবে সোজা চলে জান ইমাম গাজ্জালী এর কাছেঃ
‘নবী করিম (সাঃ) হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে বলিয়াছেন − তাঁহাকে
হযরত দাউদ (আঃÑ-এর সঙ্গীদের অংশ প্রদান করা হইয়াছে” − মুরশিদে আমিন,
পৃষ্ঠা ১৭০ − এমদাদিয়া লাইব্রেরী।
এর পরেও আমাদের শুনতে হয় গান হারাম, গানের উৎসব রক্তাক্ত হয়ে যায় ঘাতকের
অস্ত্রে। আর জাতি ভোগে অন্তর্দ্বন্দ্বে, গান গেয়ে গান শুনে গুনাহ্ করছি না তো !!

চলবে…।।

যায়িদ ইবন্‌ হারিসা(রা)- দাসত্বের মাঝে মুক্তি পেয়েছিলেন যিনি!


(১)
সকলে রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল সে ঘোষনা। এ কী করে সম্ভব! বলা নেই, কওয়া নেই- উকাযের বাজার হতে একটা কিনে আনা দাসকে মুক্ত করে দিয়েছে! আচ্ছা, ঠিক আছে, তাই বলে তাকে নিজের উত্তরাধিকারী বানানোর অর্থ কী!! মুহাম্মদ কি এ সমাজের রীতিনীতি সব উল্টে দিতে চায়?

হ্যাঁ! সপ্তম শতকের আরবের মরুচারী চল্লিশোর্ধ্ব মুহাম্মদ(স) সমাজ পালটে দেবার অনমনীয় প্রতিজ্ঞা নিয়েই কাজে নেমে ছিলেন আর সে পরিবর্তনের শুরু করেছিলেন নিজের অন্দরমহল হতে। আভিজাত্যে মদমত্ত নির্বোধ কুরাইশরা সেটা বুঝতে একটু দেরি করে ফেলেছিল!

ঘটনা সেদিনের বেলা দ্বিপ্রহরের। আরবের ধূ ধূ মরুর মাঝে ছোট্ট নগরী মক্কা। অন্ধ বংশগৌরবে মত্ত কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ক্বাবার পাদদেশে আলোচনারত। ক্বাবা সেসময়ে কুরাইশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আরব উপদ্বীপে প্রশ্নাতীত নেতৃত্বের চাবিকাঠি।

এমন সময়ে সেখানে এক সৌম্যকান্তি মানুষের উপস্থিতি দেখা গেল। জনপদের সুপরিচিত চল্লিশোর্ধ্ব সেই ব্যক্তির সাথে তার তরুণ কৃতদাসটিও হাজির। এইতো কিছুদিন আগে পর্যন্ত সমগ্র জনপদের নয়নের মণি হিসেবে বিবেচিত এই পরোপকারী ব্যক্তিটি এখন সবার চক্ষুশুল। হত-দরিদ্র, অনাথ হিসেবে জীবনের শুরু হলেও যৌবনে নগরীর সবচাইতে ধনী মহিলার পাণিগ্রহণ তাঁর অবস্থা ফিরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য, এতে তাঁর পরোপকারিতায় কোন ঘাটতি দেখা দেয় নি- মানুষের সাথে আচরনেও কোন অভব্যতা প্রকাশ পায় নি। ফলে, সকলের ভালবাসার পাত্র হিসেবে সমাজে বিচরণ করছিলেন তিনি।

সমস্যার শুরু হলো তখনই, যখন তিনি এক নতুন মতাদর্শ প্রচারে মাঠে নামলেন; বর্ণ-গোত্র-বংশ নির্বিশেষে মানুষের মাঝে টেনে দেয়া কৃত্রিম বিভেদের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে সবাইকে সাম্যের কাতারে আনতে চাইলেন। হাজার বছরের লালিত কুসংস্কার আর নেতৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত হয়ে আসা এই মতাদর্শ জনপদের অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর সুখনিদ্রা কেড়ে নিয়েছিল। বসে বসে তাই তারা সারাক্ষন ফন্দি আঁটে-কেমন করে এই আদর্শের প্রচার বন্ধ করে দেয়া যায়! সেদিনও হয়তো তেমন কিছু নিয়েই আলোচনা চলছিল। স্বভাবতইঃ অনাকাঙ্খিত ব্যক্তির উপস্থিতি সভায় বিরক্তির উদ্রেক করলো।

সৌম্যকান্তি মানুষটি সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করলেন না! কোনরকম ভণিতায় না গিয়ে সরাসরি সাথে থাকা কৃতদাস তরুণটির দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, “এই হচ্ছে যায়িদ। আজ হতে সে মুক্ত এবং আমার পুত্র। সে আমার উত্তরাধিকারী হবে আর আমি তার উত্তরাধিকারী হব।”

এ ছিল এমন এক পৃথিবী যেখানে মানুষের সংখ্যা কম ছিল না, মানবতার অভাব ছিল প্রকট। সাধারণ মানুষের জীবন-সম্মান-সম্পদ সবকিছু যেখানে ক্ষমতাবানের খেলার পুতুল মাত্র, সেখানে একটা কৃতদাসের অধিকার বলে কোন কিছু থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বাজারের দ্বিপদী কৃতদাস আর ভারবাহী চতুষ্পদী জন্তুতে তফাৎ ছিল শুধু ঐ অতিরিক্ত পদযুগলেই- আর কিছুতে নয়। এমন সমাজে একটা ‘নিকৃষ্ট’ কৃতদাসকে শুধু মুক্ত করে দেয়াই নয়, নিজের পুত্র বলে স্বীকৃতি প্রদান-একটা প্রবল ভূ-কম্পন ছাড়া আর কী! সেদিন হতে মুক্ত কৃতদাস যায়িদ, ততদিন পর্যন্ত যায়িদ ইবন মুহাম্মদ(মুহাম্মদের পুত্র যায়িদ) নামে সমাজে পরিচিত হলেন, যতদিন না কুর’আনের আমোঘ বাণী রক্তের সম্পর্কিত পিতা ব্যতীত অন্য কাউকে পিতৃপরিচয় দানের কুসংস্কার রহিত করে।

(২)
যায়িদের জীবনের গল্পটা আরেকটু পেছনের। লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষা দক্ষিন আরবের ইয়েমেন অঞ্চল। আরব উপদ্বীপের স্বভাবজাত রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম এ উর্বর এলাকাটি ইতিহাসের নানান উন্নত সভ্যতার সংস্পর্শে থেকে সবসময় নিজেকে সমৃদ্ধ রেখেছে। গ্রীক দার্শনিক টলেমী এর নাম দিয়েছিলেন, ‘অ্যারাবিয়া ফেলিক্স’ বা ‘উর্বর আরব’।

এখানেই প্রভাবশালী গোত্র বনী কুজায়ার বাস। গোত্রপতি হারিসা ইবন শারাহবিল। স্ত্রী সু’দা বিনতে সালাবাহ্‌ ও আরবের আরেক বিখ্যাত তাঈ গোত্রের কন্যা। ইতিহাসখ্যাত হাতিম তাঈ এ গোত্রেই জন্মেছিলেন। এ দম্পতিরই আদরের পুত্র যায়িদ; দুরন্ত-আদুরে।

সু’দা অনেককাল ধরে বাবার বাড়ি যেতে পারছিলেন না। মূলতঃ সে সময়টাই ছিল নিরাপত্তাহীনতার। হত্যা-লুটতরাজ যে জনপদের মানুষের জীবনের প্রাথমিক অনুসঙ্গ, সেখানে এত দুরের পথ নিরাপদে পাড়ি দেয়াটা কঠিন বৈ কী! এদিকে, হারিসা ব্যস্ততার ফাঁকে সময় দিতে পারেন না। অবশেষে আট বছরের বালক যায়িদকে নিয়ে মা’ সু’দা একদিন এক কাফেলার সাথে বাবার বাড়ির পথ ধরেন। স্ত্রী-সন্তানকে উটের পিঠে বসিয়ে বিদায় দেয়ার সময় হারিসার বুক কেমন যেন অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে।

পথে কোন সমস্যা হলো না। নিরাপদে মাতা-পুত্র পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। খবর পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন হারিসা। কিন্তু, বিধির বিধান, না যায় খন্ডন। পথের বিপদ বাড়িতে এসে পড়ে। এক রাতে বনী তাঈয়ের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বনী কাইনের দুর্বৃত্তরা। অন্য অনেকের সাথে অপহৃত হন যায়িদ। সন্তান হারিয়ে বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে পড়েন সু’দা আর ওদিকে বাকরুদ্ধ হারিসা।

(৩)
উকাযের মেলা আরবের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাৎসরিক মেলা। সারা উপদ্বীপ এবং উপদ্বীপের বাইরে থেকে হাজারো ব্যবসায়ী রাজ্যের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে তায়েফ শহরের সন্নিকটের এই মেলায়। আরবে দাস ব্যবসার সে সময়ে রমরমা অবস্থা আর উকায হচ্ছে সে ব্যবসার এক লোভনীয় বাজার।

সে বাজারে এসেছেন হাকিম ইবন হিশাম। উদ্দেশ্য ফুফু খাদিজা ইবন খুয়াইলিদের(রা) বিয়ে উপলক্ষ্যে একটা ভাল উপহার ক্রয়। আরবের বিখ্যাত মহিলা ব্যবসায়ী চল্লিশোর্ধ্ব বিধবা অল্প ক’দিন হয় সনামধন্য যুবক মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ্‌(স)কে বিয়ে করেছেন। অনেক খুঁজে পেতে হাকিম ফুফুর জন্য একটা সুদর্শন বালক কৃতদাস কিনে নেন এবং উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। ফুফু খাদিজা সে বালককে স্বামীর সেবার জন্য নিয়োজিত করেন। এ বালকটিই যায়িদ।

তিরিশের কাছাকাছি বয়সের মুহাম্মদ(স) তখনো তাঁর মতাদর্শের প্রচার শুরু করেন নি। সে সময়ে তিনি সমাজের মানুষের উপকারে ব্যস্ত- ব্যস্ত আত্মনুসন্ধানে। একদিকে ‘হিলফুল ফুজুল’- এর মাধ্যমে সমাজের দুঃখী-অত্যাচারিতের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন, অন্যদিকে, এর স্থায়ী সমাধানের পথ অনুসন্ধানে একটু একটু করে খোদার ধ্যানে মগ্ন হয়ে উঠছেন।

এমন আকর্ষনীয় এক মনীব পেয়ে নতুন জীবনের শুরু হলো যায়িদের। আরবের অন্য মালিকেরা যেখানে স্বীয় কৃতদাসদের পশুরও অধম মনে করে সেখানে, যায়িদ তার মালিকের ঘরে পুত্রস্নেহে লালিত হতে থাকে। শৈশবে হারানো পিতা-মাতার অভাব এক প্রকার ভুলতেই বসে।

সন্তান পিতা-মাতাকে ভুলে থাকতে পারে হয়তো- পিতা-মাতা কখনোই পারেন না। তাইতো হারিসা প্রতি মূহুর্তে হারানো সন্তানের খোঁজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবেই প্রায় এক যুগের অনুসন্ধান শেষে এক সময় মক্কার মুহাম্মদের(স) গৃহে যায়িদের সন্ধানও পেয়ে যান।

ততদিনে মুহাম্মদ(স) তাঁর নতুন মতাদর্শ প্রচারে ব্রতী হয়েছেন আর মুষ্টিমেয় যে ক’জন তাঁর সঙ্গী হয়েছেন, সদ্য যুবক যায়িদ(রা), তাঁদেরই একজন।

হারিসা তাঁর ভাই কাআবকে সঙ্গে করে সোজ চলে এলেন মুহাম্মদের(স) দোরগোড়ায়। আর্জি একটাই। যত অর্থ লাগে লাগুক, তাঁরা আপন সন্তানকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে চান, পরিবারের মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। সন্তানসম স্নেহ দিয়ে এত বছর ধরে লালন-পালন করা যায়িদকে হারানোর বেদনায় মুহাম্মদের(স) হৃদয় আচ্ছন্ন হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু, সত্য পথের অগ্রপথিক তিনি- মানবতার মুক্তির জন্য খোদার মনোনীত যিনি, তিনি কি ক্ষনিক আবেগের বশে অন্যায় করতে পারেন? না, তিনি তা করেন নি।

যখন যায়িদ(রা) তাঁর গৃহে প্রথম এসেছিলেন, তখন তিনি নাবালক। এখন, তিনি পূর্ণ যুবক-নিজের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে সক্ষম। তাই, মুহাম্মদের(স) স্পষ্ট বক্তব্য- “যায়েদকে অধিকার দেওয়া হোক! সে যদি তোমাদের সাথে চলে যেতে সম্মত হয় তাহলে আমার পক্ষ থেকে সে মুক্ত। এর জন্য মুক্তিপণেরও প্রয়োজন নেই। আর যদি সে যেতে অসম্মত হয়, তাহলে আমি তার সম্মতির বাইরে নই।” এমন সহজ শর্তে রাজি না হয়ে হারিসার উপায় ছিল না।

যায়িদকে(রা) ভেতর হতে ডেকে আনা হল। এত বছর পরে পিতা-পুত্রের অশ্রুসিক্ত মিলনে উপস্থিত অন্যদের হৃদয়কেও আর্দ্র করে তুলল। পিতা ও পিতৃব্য হিসেবে হারিসা ও কাআবকে যায়িদ সনাক্ত করলে মুহাম্মদ তাঁর সামনে মুক্তির দরজা খুলে দিলেন। আত্মীয়-পরিজনের সাথে স্বাধীন জীবনযাপন অথবা তাঁর সান্নিধ্যের যেকোন একটি বেছে নেবার স্বাধীনতা দিলেন।

শব্দহীন অশ্রুসিক্ত নতশির- যায়িদ(রা)।
অনেক আশায় বুক বেঁধে দুই হাত বাড়িয়ে থাকা পিতা হারিসা।
আর প্রশান্ত চিত্তে অপেক্ষমান মুহাম্মদ(স)।
মহাকালের পৃথিবীতে ক্ষনিক স্থির যেন সময়ের ঘড়ি।
এ ছিল যায়িদের(রা) জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। পিতা-মাতা-সন্তানের সুদীর্ঘ সময়ের বিচ্ছেদ বেদনার পর আনন্দের মিলন আর পিতৃ-মাতৃহীন জীবনে সদয় আশ্রয়দাতা এবং নতুন আদর্শের দীক্ষাগুরুর সার্বক্ষনিক সাহচর্যের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া দুরহ বৈ কী!

কিছুক্ষন পর তিনি মাথা তুললেন। দু’চোখে তখনও অশ্রুর ঢল। কিন্তু, ভাষা সংযত, কন্ঠ স্থির।“হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার মুকাবিলায় অন্য কাউকে প্রাধান্য দিতে পারি না। আমার মাতা-পিতা এবং আত্মীয়-স্বজনের তুলনায় আপনি আমার কাছে অধিক কাম্য। তাই আমি আপনার সান্নিধ্য থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।”

হারিসা বাকরুদ্ধ, কাআব কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আর মুহাম্মদ(স) পূর্ববৎ প্রশান্ত।
এ কেমন রঙ্গযাদু- পিতার ভাবনায় আসে না! নাকি এত বছরের দাসত্বের জীবনে যায়িদের(রা) মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে! পরিবার-পরিজন, পিতা-মাতার নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে কে আবার দাসত্বের জীবনকে বরণ করে নেয়! প্রশ্ন করেন পুত্রকে।

বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত যায়িদ(রা) রক্তের সম্পর্কের উপরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে সম্পর্ককে প্রাধান্য দিলেন আর জানিয়ে দিলেন যে, এ সিদ্ধান্ত তিনি স্থির মস্তিষ্কেই গ্রহণ করেছেন।

যায়িদের(রা) বক্তব্যকে পিতা-পিতৃব্য বুকের কষ্ট চেপে মেনে নিলেও এবার মুহাম্মদ(স) অশান্ত হয়ে উঠলেন। যায়িদের(রা) হাত চেপে ধরে সোজা চলে এলেন ক্বাবার অঙ্গনে। এরপরের ঘটনা তো ইতিহাস।

স্থির চিত্তে দাসত্বকে বরন করে নেয়া যায়িদ(রা) মুক্তি তো পেলেনই, সেই সাথে মক্কার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির পুত্র হিসেবে গৃহীত হলেন। রাসূলের(স) সাহাবীদের মাঝেও সম্মান ও মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হলেন।

“কতই না ভাল হত, যদি তারা সন্তুষ্ট হত আল্লাহ ও তার রসূলের উপর এবং বলত, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট, আল্লাহ আমাদের দেবেন নিজ করুণায় এবং তাঁর রসূলও, আমরা শুধু আল্লাহকেই কামনা করি।”(আল-কুরআন-৯: ৫৯)

(৪)
দ্বিতীয় খলিফা উমরের(রা) সময়ে তিনি যায়িদের(রা) পুত্র উসামা ইবন যায়িদের(রা) রাষ্ট্রীয় ভাতা স্বীয় পুত্র প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন উমরের(রা) চাইতে বেশি নির্ধারণ করলে, আবদুল্লাহ আপত্তি জানান। উমর(রা) তাঁকে এই বলে চুপ করিয়ে দেন যে, “উসামা আল্লাহর রাসূলের(স) কাছে তোমার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন আর তার পিতাও আল্লাহর রাসূলের(স) কাছে তোমার পিতার চেয়ে প্রিয় ছিলেন।”

রাসূলের(স) জন্য কৃতদাস যায়িদের(রা) ভালবাসা আমাদের সবার হৃদয়ে উপ্ত হোক।

Translate