লিখেছেন হাসান মাহমুদ
না, করছেন না। ইসলাম তো স্বাভাবিক ধর্ম − সঙ্গীত কি অস্বাভাবিক হতে পারে ?
পশু-পাখি-মাছেরা পশু-পাখি-মাছ হয়েই জন্মায় কিন্তু মানুষ হয়ে উঠতে মানুষের সুকুমার
বৃত্তির দরকার হয়, সঙ্গীতই সেই সুকুমার বৃত্তি। সাহিত্য, কবিতা, চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যের
ক্ষেত্রেও তা সত্য। হারাম তো শূকরের মাংস, গান কবে থেকে শূকরের মাংস হল ? আর,
বাড়াবাড়ি করা ? ‘গান হারাম’ বলাই তো সেই বাড়াবাড়ি ! খোদ ইসলাম নিয়েই তো
বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ (সুরা মায়েদা ৭৭, নিসা ১৭১ ও নবীজীর বিদায় হজ্বের ভাষণ)।
ইসলাম আপনার হৃদয়ে আছে, সেখানে প্রশড়ব করুন সৎভাবে। এবং তার জবাব
নিয়ে শক্ত সোজা হয়ে দাঁড়ান। আপনার ইসলামের মালিকানা আর কারো হাতে
ছেড়ে দেবেন না। মাথাটা নত করলেই ওরা আপনার পিঠে সুপারগু
লাগিয়ে ঠেসে
বসবে। আপনি সোজা হয়ে দাঁড়ালে তা পারবে না। অন্যের মতামতের ফটোকপি
হবার জন্য আমাদের মাথাটা দেয়া হয়নি। ঘাড়ের ওপর সারাজীবন বোঝার মতো
বইতেও দেয়া হয়নি, কাজে লাগানোর জন্যই দেয়া হয়েছে।
সঙ্গীত হল আমাদের সসীম জীবনে এক টুকরো অসীমের ছোঁয়া। চারদিকের আকাশবাতাস
সাগর-পর্বত গ্রহ-নক্ষত্র, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক বিপুল সুরস্রষ্টার মহাসঙ্গীত। তাই,
গান শুনুন এবং বাচ্চাদের গান শোনান। গান করুন এবং বাচ্চাদের গান শেখান। গান যে
ভালবাসে না সে মানুষ খুন করতে পারে। গানের মত বেহেশতি জিনিস যে অপদর্শনে
শূকরের মাংস হয় সেটা আসলে ইসলামের ছদ্মবেশে অন্যকিছু, বিশ্ব-মুসলিমের মঙ্গলের
জন্যই ওটাকে শক্তহাতে প্রতিহত করা প্রয়োজন।
শেষ করছি বর্তমান বিশ্বের অবিসম্বাদিত সর্বোচ্চ শারিয়া-নেতার উদ্ধৃতি দিয়ে।
“সঙ্গীত এমন বিনোদন যাহা প্রাণে আনন্দ দেয়, হৃদয় তৃপ্ত করে এবং শ্রবণকে আরাম
দেয়…উত্তেজনাপূর্ণ না হইলে ইহার সহিত বাদ্যযন্ত্র থাকিলে ক্ষতি নাই…আয়েশা
বলিয়াছেন যখন এক আনসারের সাথে এক মহিলার বিবাহ হইতেছিল তখন রসুল (সাঃ)
বলিলেন, ‘আয়েশা, তাহারা কি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করিয়াছে ? আনসারেরা
চিত্তবিনোদন ভালবাসে’ (বুখারি)।” ইবনে আব্বাস বলিয়াছেন আয়েশা তাঁহার এক
আত্মীয়াকে এক আনসারের সাথে বিবাহ দিলেন। রসুল (সাঃ) আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন
‘তাহার সাথে কি কোন গায়িকা দিয়াছ ?’ আয়েশা বলিলেন, ‘না।’ তখন রসুল (সাঃ)
বলিলেন, ‘আনসারেরা কবিতা ভালবাসে। এমন কাউকে পাঠানো তোমার উচিত ছিল যে
গাহিবে − আমরা আসিলাম তোমাদের কাছে, আমাদের সম্ভাষণ করো, আমরাও
তোমাদের সম্ভাষণ করি’ (ইবনে মাজাহ)। আয়েশা বলিয়াছেন ঈদুল আজহা’র দিনে
মিনা’তে তাঁহার সহিত দুইজন বালিকা ছিল যাহারা ‘দফ’ (অনেকটা আমাদের ঢোলকের
মতো – লেখক) বাজাইয়া গান গাহিতেছিল। রসুল (সাঃ) মুখ চাদরে ঢাকিয়া তাহা
শুনিতেছিলেন (হাদিসে আছে তিনি মুখ ঢেকে শুয়েছিলেন)। আবু বকর আসিয়া
বালিকাদিগকে বকাবকি করিলেন। রসুল (সাঃ) মুখ বাহির করিয়া বলিলেন, ‘উহাদিগকে
ছাড়িয়া দাও, আবু বকর। আজ ঈদের দিন’ (বুখারী ও মুসলিম)। ইমাম গাজ্জালী তাঁহার
এহিয়ে উলুম আল্ দ্বীন কেতাবে (‘গান শোনা’ অধ্যায়ে ‘অভ্যাস’ পরিচ্ছেদে) গায়িকাবালিকার
উলেখ
করিয়াছেন…‘ইহা নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে গান গাওয়া ও খেলাধুলা করা
হারাম নহে…দলিলে আছে বহু সাহাবি ও পরের প্রজন্মের মুসলিম বিশেষজ্ঞরা গান
শুনিতেন ও ইহাতে কোন দোষ দেখিতেন না। গবেষকদের মতে গান গাহিবার বিরুদ্ধে
যেসব হাদিস আছে তাহা নির্ভরযোগ্য নহে।’ আইনবিদ আবু বকর আল্ আরাবি বলেন,
‘সঙ্গীত নিষিদ্ধের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনই হাদিস নাই।’ ইবনে হাজম (১১শ’ শতাব্দীর
স্পেন খেলাফতের বিখ্যাত শারিয়াবিদ − লেখক) বলিয়াছেন, ‘এই বিষয়ে (সঙ্গীত নিষিদ্ধের
বিষয়ে − লেখক) যাহা কিছুই লিখা আছে সকলই মিথ্যা ও ভেজাল।’
(সুরা লোকমান ৬-এর ব্যাপারে) ইবনে হাজম বলেন, ‘এই আয়াতে আলাহ’র
পথ নিয়া
ঠাট্টা করার অভ্যাসকেই আলাহ
নিন্দা করিয়াছেন, উহাকে নহে যেই অলস কথাবার্তা মানুষ
করে মানসিক প্রশান্তির জন্যই, কাউকে আলাহ’র
পথ হইতে পথভ্রষ্ট করার জন্য নহে।’
সুরা ইউনুস আয়াত ৩২-এর ভিত্তিতে যাঁহারা বলেন সঙ্গীত যেহেতু ‘সত্য’ নহে তাই
সঙ্গীত নিশ্চয়ই ‘মিথ্যা’, তাহাদের যুক্তিকেও ইবনে হাজম ভুল প্রমাণ করিয়াছেন…তাই যে
ব্যক্তি আলাহ’র
প্রতি দায়িত্ব পালন ও ভাল কাজের শক্তিলাভের জন্য চিত্তবিনোদনের
উদ্দেশ্যে গান শোনে সে আলাহ’র
অনুগত বান্দা এবং তাহার এই কর্ম সত্য। পক্ষান্তরে,
যে ব্যক্তি আলাহ’র
প্রতি বাধ্য বা অবাধ্য হইবার চিন্তা না করিয়া গান শোনে, সে নিরপেক্ষ
ও ক্ষতিকর নহে এমন কাজ করে যেমন পার্কে যাওয়া বা হাঁটিয়া বেড়ানো, কিংবা জানালায়
দাঁড়াইয়া আকাশ দেখা, কিংবা নীল বা সবুজ কাপড় পরা, ইত্যাদি। যাহা হউক, সঙ্গীতের
ব্যাপারে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন গানের কথায় যদি মদ্যপানের প্রশংসা থাকে ও
লোককে মদ্যপানে উৎসাহিত করা হয়, তবে উহা গাওয়া বা শোনা হারাম। গানের
পরিবেশনাও উহা হারাম করিতে পারে যেমন গানের সাথে শারীরিক উত্তেজক অঙ্গভঙ্গি।”
কার উদ্ধৃতি দিলাম ? তিনি পুরো শারিয়া-বিশ্বের সর্বোচ্চ নেতা ডঃ ইউসুফ
কারজাভী, বিশ্বময় বহু শারিয়া-ব্যাঙ্ক, দেশি ও আন্তর্জাতিক বহু শারিয়া-সংগঠনের
প্রেসিডেণ্ট ও চেয়ারম্যান। উদ্ধৃতি দিলাম তাঁর বই “দ্য ল’ফূল অ্যাণ্ড প্রোহিবিটেড
ইন্ ইসলাম” থেকে ঃ
এর পরেও যদি কেউ বলেন গান হারাম তবে তাঁর উচিত ডঃ ইউসুফ কারজাভী’র
সাথে বিতর্ক করে তাঁকে পরাজিত করা।
মুসলমান হতে হলে মানবদরদী হতেই হবে এবং মানবদরদী হতে হলে কাব্যসঙ্গীতময়
হৃদয় থাকতেই হবে। তাই ভালো মুসলমান আর হিংস্র মুসলমানের একটি পার্থক্য হল
সাঙ্গীতিক মন থাকা ও না-থাকা ॥
No comments:
Post a Comment