Wednesday, September 17, 2025

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জন্য নাসিং পেশায় কাজ করার বিধান

 প্রশ্ন: নার্সিং পেশা কী মেয়েদের জন্য জায়েজ? আমার ভাই নেই।আর আব্বুর অবস্থা মোটামুটি আলহামদুলিল্লাহ। তো আমি চাচ্ছি জব করতে। আব্বুর বয়সও দিন দিন বাড়ছে। আমি পরিবারের বড় মেয়ে।

উত্তর: ইসলামে নার্সিং পেশায় বাধা নেই। তবে এর জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে।‌ ইসলামের নীতি হল, পুরুষ নার্স পুরুষ রোগীদের সেবা করবে আর নারী নার্স নারী রোগীদের সেবা করবে। বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া এর ব্যতিক্রম করা জায়েজ নেই। এই ক্ষেত্রে কতিপয় বিধান মেনে চলা অপরিহার্য। যথা:
১. নারী নার্সের জন্য মুখমণ্ডল সহ পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা।
২. বিপরীত লিঙ্গের শরীর স্পর্শ না করা। বিশেষ দরকারে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করে করবে।
৩. এক্ষেত্রে রোগীর শরীরের ঠিক অতটুকু স্থান স্পর্শ করবে যেটুকু না হলেই নয়। ‌
৪. একান্ত জরুরি স্থান ব্যতিরেকে রোগীর শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ না দেখা।
৫. ল্যাবরেটরি, এক্সরে রুমে বা অন্য কোথাও বিপরীত লিঙ্গের রোগীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করা। এক্ষেত্রে রোগীর সাথে স্বামী/স্ত্রী বাবা/মা, ভাই/বোন ইত্যাদি কোন মাহরাম ব্যক্তি থাকা আবশ্যক।
৬. রোগীর সাথে চিকিৎসা সেবা বা রোগ সংক্রান্ত জরুরি কথাবার্তা ছাড়া অন্যান্য অন্য কোন কথা না বলা।
কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যদি এমন পরিবেশ না পাওয়া যায় যেখানে এ সকল বিধি-বিধান মেনে চলা সম্ভব নয় অথবা কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না তাহলে অনতিবিলম্বে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে অন্যত্র হালাল ভাবে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে।
পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য রিজিকের পথ খোলা রয়েছে। কেউ যদি আল্লাহকে ভয় করে তাহলে আল্লাহ তাকে উত্তম পন্থায় ব্যবস্থা করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কবরে কিছু মৃতদেহ অক্ষত থাকার ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা

 প্রশ্ন: কিছু মৃতদেহ কবর দেওয়ার অনেক দিন পরও পচে না। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন। এতে করে কী কোনভাবে প্রমাণ হয় যে, সে ব্যক্তি আল্লাহর ওলি ছিলেন? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।

উত্তর: সাধারণত মৃতদেহ কবরস্থ করার কয়েক দিনের মধ্যেই পচন শুরু হয়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মৃতদেহটি দীর্ঘদিন পরও অক্ষত অবস্থায় আছে। এর পেছনের কারণগুলো বৈজ্ঞানিক ও ইসলামি উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।
❑ বৈজ্ঞানিক কারণ:
❖ ক. মৃতদেহের পচন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা মূলত অণুজীবের ক্রিয়াকলাপ, এনজাইমের নিঃসরণ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কিছু বিশেষ পরিস্থিতি এই প্রক্রিয়াকে ধীর বা বন্ধ করে দিতে পারে।
❖ খ. মাটির ধরন এবং পরিবেশ: অত্যন্ত শুষ্ক, শীতল বা কম অক্সিজেনের পরিবেশে মৃতদেহের পচন ধীর হয়। উদাহরণস্বরূপ: যদি কবরের মাটি খুব বালুকাময় ও শুষ্ক হয়, অথবা তাপমাত্রা খুব কম থাকে (যেমন: বরফাবৃত অঞ্চলে), তাহলে অণুজীবের কার্যকলাপ কমে যায়। ফলে পচন বিলম্বিত হয়।
❖ গ. বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ: যদি মৃতদেহটি কোনোভাবে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ, যেমন ফরমালডিহাইড বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভের সংস্পর্শে থাকে তাহলে পচন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত থাকতে পারে।
❖ ঘ. মমিফিকেশন: নির্দিষ্ট কিছু মাটির গঠন বা পরিবেশগত কারণে মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হতে পারে। এক্ষেত্রে দেহের জলীয় অংশ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
❖ ঙ. হিমায়িত অবস্থা: যদি কোনো মৃতদেহ হিমায়িত পরিবেশে থাকে তাহলে পচন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কারণ এই তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব নিষ্ক্রিয় থাকে।
❑ ইসলামি দৃষ্টিকোণ:
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, মৃতদেহ পচে না-এমন ঘটনাকে অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর কুদরত বা অলৌকিক ক্ষমতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
❖ নবী-রসুলগণ: হাদিসে বলা হয়েছে যে, নবী ও রসুলদের মৃতদেহ মাটির ওপর হারাম করা হয়েছে। অর্থাৎ মাটি তাঁদের দেহ ভক্ষণ করে না। এই কারণে তাঁদের মৃতদেহ অক্ষত থাকে। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إنَّ اللَّهَ عزَّ وجلَّ حرَّمَ علَى الأرضِ أجسادَ الأنبياءِ
“আল্লাহ তাআলা নবীদের দেহ মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।” [সহিহ সুনানে আবু দাউদ, হা/১০৪৭]
❖ আল্লাহর ওলি বা বুজুর্গ: যদিও নবী-রসুলদের মতো তাঁদের মৃতদেহ অক্ষত থাকার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বর্ণনা নেই। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তাঁর কোনো প্রিয় বান্দার মৃতদেহও অক্ষত থাকতে পারে। তবে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কোনো সাধারণ নিয়ম নয়।
❑ এটি আল্লাহর ওলি হওয়ার প্রমাণ কিনা?
কোনো মৃতদেহ অক্ষত থাকলেই সে ব্যক্তি আল্লাহর ওলি বা বুজুর্গ ছিল-এমনটা বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কারণ:
– অনেক সময় দেখা গেছে যে, দ্বীনের দিক থেকে খারাপ বা পাপী ব্যক্তির মৃতদেহও প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক কারণে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এর ফলে শুধুমাত্র মৃতদেহ অক্ষত থাকাটা কোনো ব্যক্তির ধার্মিকতা বা আল্লাহর নৈকট্যের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
– কুরআন ও হাদিসে এমন কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই যে, কোনো ওলি বা বুজুর্গের লাশ কবরে অক্ষত থাকবে। তাই এমন বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই।
– ইমানি পরীক্ষা: এই ধরনের ঘটনাকে ইমানের পরীক্ষা হিসেবে দেখা যেতে পারে। যারা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিরক, বিদআত বা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয় তারা ভুল পথে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে যারা এই ধরনের ঘটনাকে আল্লাহর ক্ষমতা হিসেবে স্বীকার করে এবং সঠিক ইসলামি শিক্ষার উপর অটল থাকে তারাই সঠিক পথের অনুসারী।
সুতরাং কোনো মৃতদেহ অক্ষত থাকলেই সে ব্যক্তি আল্লাহর ওলি ছিলেন বলে বিশ্বাস করা শরিয়তসম্মত নয়। এটি প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক কারণের জন্যও হতে পারে। অথবা এটি আল্লাহর কুদরতের একটি নিদর্শন হতে পারে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি বা কুসংস্কার ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

সালাতে ইমামের অনুসরণের বিধান

 প্রশ্ন: সালাতে ইমামের অনুসরণের বিধান কী? ইমামের থেকে আগে রুকু বা সিজদা করা অথবা ইমামের অনুসরণে বিলম্ব করা হলে তার হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইমাম শব্দের অর্থ নেতা। তিনি মাননীয় ও অনুসরণীয়। সালাত আদায়ে তিনি নেতৃত্ব দেন। সকল শ্রেণীর মুসল্লী তার নেতৃত্বে সালাতে রুকু সিজদা আদায় করেন, উঠেন ও বসেন। তার তাকবীর ধ্বনি শুনে সকলে তার অনুকরণ ও অনুসরণ করেন, কেউই তা লঙ্ঘন করে না। ইমামের এরূপ অনুসরণই হলো ইক্তিদা। ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী সালাতে ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব।কারন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ “ইমাম নিযুক্ত করা হয়, কেবল তাঁকে অনুসরণ করার জন্য”।(সহীহ বুখারী হা/৩৭৮) এখানে ইমামের অনুসরণ করার অর্থ হলো,ইমাম কোনো কাজ শেষ করার পরপরই মুক্তাদির সেই কাজটি শুরু করা।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; হাশিয়াতু ইবনে কাসিম খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৮৫; ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৬৯; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৪৪৫৮) অপর হাদিসে এসেছে,প্রখ্যাত সাহাবী আনাস (রাঃ) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সালাত আদায় করালেন। সালাত শেষে তিনি (ﷺ) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন এবং বললেন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের ইমাম। তাই তোমরা রুকু করার সময়, সাজদাহ্‌ করার সময়, দাঁড়াবার সময়, সালাম ফিরাবার সময় আমার আগে যাবে না, আমি নিশ্চয়ই তোমাদেরকে আমার সম্মুখ দিয়ে পেছন দিক দিয়ে দেখে থাকি।(সহীহ মুসলিম হা/৪২৬ মিশকাত হা/১১৩৭) এ ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোরতা আরোপ করেছেন। আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে তার মাথা ইমামের পূর্বেই উত্তোলন করে সে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ তার মাথাকে গাধার মাথাতে অথবা গাধার আকৃতিতে পরিনত করে দিবেন।”(সহীহ মুসলিম হা/৪২৭) এছাড়াও ইমাম কোনো রুকনে পৌঁছে যাওয়ার আগে মুক্তাদী সেই রুকন শুরু করবেন না। ইমাম মাটিতে তার কপাল রাখার আগে মুক্তাদী তার পিঠ ঝোঁকানো শুরু করবে না। আল-বারা ইবনে আযিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: “যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখনও আমাদের কেউ পিঠ ঝোঁকাত না যতক্ষণ না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন। তারপরে আমরা সিজদায় লুটিয়ে পড়তাম।”(সহিহ বুখারী হা/৬৯০; সহিহ মুসলিম হা/৪৭৪)
.
দ্বিতীয়ত: ইমামের সাথে মুক্তাদীর অবস্থাসমূহ:
.
শরীয় দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা ভাবনা করলে ইমামের সাথে মুক্তাদীর সর্বমোট চারটি অবস্থা হতে পারে;
(১). ইমামের আগে করা।
(২). ইমাম থেকে পিছিয়ে থাকা।
(৩). ইমামের সাথে সাথে করা।
(৪). ইমামের পরপর করা।
.
এবার আমরা প্রত্যেকটি অবস্থার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেখব:
.
▪️এক: ইমামের আগে করা: অর্থাৎ মুক্তাদী নামাযের কোনো রুকনের ক্ষেত্রে ইমামের তুলনায় এগিয়ে গিয়ে করা। যেমন: ইমামের আগে সিজদা দেয়া কিংবা সিজদা থেকে ওঠা কিংবা রুকু দেয়া কিংবা রুকু থেকে ওঠা। এমনটি করা হারাম। এর দলীল হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “তোমরা রুকু করো না যতক্ষণ না ইমাম রুকুতে যায়। তোমরা সিজদা করো না যতক্ষণ না ইমাম সিজদায় যায়।”(সহীহ মুসলিম হা/৪২৬) আর নিষেধাজ্ঞার মূল হুকুম হলো হারাম হওয়া। বরং কেউ যদি বলে: এটি কবীরা গুনাহ তাহলে সেটি বাড়িয়ে বলা হবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমামের আগে মাথা তোলে তার কি ভয় হয় না যে, মহান আল্লাহ তার মাথা গাধার মাথায় পরিবর্তন করে দিবেন অথবা তার আকৃতিকে গাধার আকৃতি বানিয়ে দিবেন!”(সহীহ বুখারী হা/৬৯১) এটি শাস্তির হুমকি। আর শাস্তির হুমকি দেয়া কবীরা গুনাহ হওয়ার আলামত।
.
যে ব্যক্তি নামাযের কার্যাবলি ইমামের আগে করে তার নামাযের হুকুম: যদি মুক্তাদী জেনে-বুঝে স্মরণ থাকা অবস্থায় ইমামের আগে কোনো আমল করে তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি না জেনে কিংবা ভুলে গিয়ে করে তাহলে তার নামায সঠিক হবে। তবে যদি ইমাম তাকে সংশ্লিষ্ট আমলে পাওয়ার আগে তার ওজর দূর হয়ে যায় তাহলে তার জন্য ফিরে যাওয়া ও ইমামের আগে কৃত আমলটি ইমামের অনুসরণে করা আবশ্যক হবে। যদি সে জেনে ও স্মরণে থাকা সত্ত্বেও এমনটি না করে, তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। অন্যথায় বাতিল হবে না।
.
▪️দুই: ইমাম থেকে পিছিয়ে থাকা: ইমামের তুলনায় আমলে পিছিয়ে থাকা দুই প্রকার:
.
(১). ওজরের কারণে পিছিয়ে থাকা।
(২). ওজর ছাড়া পিছিয়ে থাকা।
.
প্রথম প্রকার হলো: ওজরের কারণে পিছিয়ে থাকা। এমন ব্যক্তি যে অংশটুকুতে পিছিয়ে ছিল সে অংশ সম্পন্ন করে ইমামের অনুসরণ করবে; এতে কোনো সমস্যা নেই। এমনকি যদি পূর্ণ এক বা দুই রুকনও হয়ে থাকে। যদি কোনো ব্যক্তি ভুলে যায় বা উদাসীন হয়ে পড়ে কিংবা ইমামের আওয়াজ শুনতে না পায় এবং ইমাম এক বা দুই রুকন এগিয়ে যায়, তাহলে সে যেগুলোতে পিছিয়ে পড়েছে সেগুলো আদায় করে ইমামের অনুসরণ করবে। তবে যদি ইমাম সে যেই আমলে আছে সেই আমলে চলে আসে তাহলে সে পিছিয়ে পড়া আমলগুলো না করে বরং ইমামের সাথে থাকবে। এভাবে ইমামের দুই রাকাত থেকে তার এক রাকাত নামায শুদ্ধ হবে; অর্থাৎ যে রাকাতে সে পিছিয়ে পড়েছিল সেই রাকাত এবং ইমাম যেই রাকাতে পৌঁছেছে সেই রাকাত মিলে। এর উদাহরণ হলো:
এক লোক ইমামের সাথে নামায পড়ছে। ইমাম রুকু দিয়েছে, রুকু থেকে উঠেছে, সিজদা দিয়েছে, বসেছে, দ্বিতীয় সিজদা দিয়ে আবার দাঁড়িয়েছে, কিন্তু লোকটি কেবল দ্বিতীয় রাকাতে এসে ইমামের তাকবীর ধ্বনি শুনতে পেয়েছে। যেমন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। আমরা ধরে নিই এটি জুমার নামাযে ঘটেছে। সে ইমামের সূরা ফাতিহার তেলাওয়াত শুনতেছিল এর মধ্যে বিদ্যুত চলে যায়। ইমাম প্রথম রাকাত শেষ করে দাঁড়িয়ে গেল। এদিকে মুক্তাদী ভাবছে ইমাম প্রথম রাকাতের রুকু এখনো দেয়নি। মুক্তাদী ইমামকে সূরা গাশিয়া পড়তে শুনল। আমরা বলব: আপনি ইমামের সাথেই থাকবেন। ইমামের দ্বিতীয় রাকাত আপনার প্রথম রাকাতের বাকি অংশ হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম যখন সালাম ফিরাবেন তখন আপনি দ্বিতীয় রাকাত সম্পন্ন করবেন। আলেমরা বলেন: এভাবে মুক্তাদীর এক রাকাত হবে যা ইমামের দুই রাকাত দ্বারা গঠিত। কারণ সে ইমামকে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় রাকাতে অনুসরণ করেছে। আর যদি ইমাম তার স্থানে পৌঁছানোর আগে সে নিজের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি বুঝতে পারে তাহলে সে সেই আমলগুলো আদায় করে ইমামের অনুসরণ করবে। এর উদাহরণ হলো:
এক লোক ইমামের সাথে নামাযে দাঁড়িয়েছে। ইমাম রুকু দিয়েছে কিন্তু সে শুনতে পায়নি। তারপর যখন ইমাম ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলেছে তখন সেটা শুনতে পেয়েছে। এমন ব্যক্তিকে আমরা বলব: আপনি রুকু দিয়ে রুকু থেকে উঠুন এবং ইমামের অনুসরণ করুন। আপনি রাকাতটি পেয়েছেন বলে গণ্য হবে। কারণ এখানে আপনি ওজরের কারণে পিছিয়ে পড়েছেন।
.
দ্বিতীয় প্রকার হলো ওজর ছাড়া পিছিয়ে পড়া। এটি হতে পারে কোন রুকনের মধ্যে পিছিয়ে পড়া কিংবা এক রুকন পিছিয়ে পড়া। রুকনের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার অর্থ হলো আপনি ইমামকে অনুসরণে পিছিয়ে পড়েছেন, কিন্তু ইমাম যেই রুকনে চলে গেছেন আপনি তাকে সেখানে গিয়ে ধরতে পারবেন। যেমন: ইমাম রুকু দিয়ে ফেলেছেন, অথচ আপনার সূরা পড়ার এক বা দুই আয়াত বাকি। আপনি দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং সূরার বাকি অংশ শেষ করে তারপর রুকুতে গেলেন এবং ইমামকে রুকুতে পেলেন। এখানে রাকাতটি সঠিক হল। কিন্তু কাজটি সুন্নাহর খেলাফ। কারণ শরয়ি পদ্ধতি হলো ইমাম যখন রুকুতে পৌছেঁ যাবেন তখনই আপনি রুকু শুরু করে দিবেন। আপনি পিছিয়ে থাকবেন না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইমাম যখন রুকুতে যাবে তখন তোমরা রুকু করো।” আর এক রুকন পিছিয়ে পড়া বলতে উদ্দেশ্য হলো: ইমাম আপনার এক রুকন সামনে চলে যাওয়া। অর্থাৎ আপনি রুকু করার আগে তিনি রুকু করে উঠে গেছেন। ফকীহরা বলেন: যদি আপনি রুকুতে পিছিয়ে পড়েন তাহলে আপনার নামায বাতিল হয়ে যাবে, যেমনিভাবে আপনি আগে রুকুতে গেলে আপনার নামায বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি সিজদায় যেতে বিলম্ব করেন, তাহলে ফকীহদের মতে আপনার নামায সঠিক হবে। কারণ এটি রুকু ছাড়া অন্য রুকনে পিছিয়ে পড়া। তবে অগ্রগণ্য মত হচ্ছে: কোনো ওজর ছাড়া যদি কেউ এক রুকন পিছিয়ে যায় তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। হোক সেটা রুকু কিংবা রুকু ছাড়া অন্য কিছু। সুতরাং ইমাম যদি প্রথম সিজদা থেকে মাথা তুলে আর মুক্তাদী সিজদায় দোয়া করতে থাকে, তারপর ইমাম দ্বিতীয় সিজদায় চলে যায় তাহলে মুক্তাদীর নামায বাতিল হয়ে যাবে। কারণ মুক্তাদী এক রুকন পিছিয়ে পড়েছে। যদি ইমাম তার থেকে এক রুকন এগিয়ে যায় তাহলে অনুসরণ কোথায় হলো?
.
▪️তিন: ইমামের সাথে সাথে করা: সাথে সাথে করা কথার ক্ষেত্রে বা কাজের ক্ষেত্রে হতে পারে। তাই সাথে সাথে করা দুই প্রকার:
.
প্রথম প্রকার: নামাযের কথাগুলো ইমামের সাথে সাথে করা। শুধু তাকবীরে তাহরীমা ও সালামের ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো কথা ইমামের সাথে সাথে করলে নামাযের ক্ষতি হবে না। তাকবীরে তাহরীমা: ইমাম তাকবীরে তাহরীমা বলা শেষ করার আগে যদি আপনি তাকবীরে তাহরীমা বলেন তাহলে আপনার নামায হবে না। ইমাম তাকবীরে তাহরীমা পুরোপুরি সমাপ্ত করার পরই কেবল আপনি তাকবীরে তাহরীমা বলবেন।আর সালামের ক্ষেত্রে সাথে সাথে করার ব্যাপারে আলেমরা বলেন: ইমামের সাথে সাথে প্রথম ও দ্বিতীয় সালাম ফেরানো মাকরূহ। তবে যদি ইমাম প্রথম সালাম ফেরানোর পরে আপনি প্রথম সালাম ফেরান এবং ইমাম দ্বিতীয় সালাম ফেরানোর পরে আপনি দ্বিতীয় সালাম ফেরান, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু উত্তম হলো ইমাম দুই সালাম ফেরানোর পরেই কেবল আপনি সালাম ফেরাবেন। আর বাকি কথাগুলো ইমামের সাথে একত্রে করা কিংবা আগে অথবা পরে করার মাঝে কোনো সমস্যা নেই। যদি ধরে নেওয়া হয় যে আপনি ইমামকে তাশাহ্‌হুদ পড়তে শুনলেন, আপনি তাশাহ্‌হুদ পড়তে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে গেলেন, এতে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ তাকবীরে তাহরীমা আর সালাম ছাড়া অন্য কিছু আগে করে ফেললে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই এবং ক্ষতি হবে না। অনুরূপভাবে যদি আপনি যোহরের নামাযে সূরা ফাতিহা পড়ার ক্ষেত্রে ‘ওয়ালাদ্দাল্লীন’ পড়েন আর তিনি ‘ইয়্যাকা না’বূদূ ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’ পড়েন, তাহলেও সমস্যা নেই। কারণ ইমামের জন্য কখনো কখনো যোহর ও আসরের নামাযে মুক্তাদীকে শুনিয়ে শুনিয়ে তেলাওয়াত করা শরিয়তসম্মত; যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো করতেন।
.
দ্বিতীয় প্রকার: নামাযের কাজগুলো ইমামের সাথে সাথে করা করা। এটি মাকরূহ। এ প্রকারের উদাহরণ হলো: যখন ইমাম রুকুর জন্য আল্লাহু আকবার বলে মাথা নোয়ানো শুরু করবে তখন আপনি ও ইমাম একসাথে মাথা নোয়ালেন। এটি মাকরূহ। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইমাম যখন রুকুতে যাবে তখন তোমরা রুকু করবে। ইমাম রুকুতে না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা রুকু করবে না।” সিজদার ক্ষেত্রে ইমাম যখন সিজদার জন্য তাকবীর দিল তখন আপনিও সিজদা দিলেন এবং আপনি ও ইমাম একসাথে জমিনে মাথা রাখলেন। এটাও মাকরূহ। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: “ইমাম সিজদায় না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা সিজদা করো না।”
.
▪️চার: ইমামের পরপর করা: পরপর করাই সুন্নাহ। এর অর্থ হলো: ইমাম নামাযের কাজ শুরু করার সাথে সাথে মুক্তাদী নামাযের কাজ শুরু করা। কিন্তু সাথে সাথে নয়।
উদাহরণস্বরূপ: ইমাম রুকুতে যাওয়ার পরপর আপনি রুকুতে যাবেন, যদিও আপনি মুস্তাহাব ক্বিরাত শেষ করেননি, যদিও আপনার এক আয়াত পড়া বাকি রয়ে গেছে। কারণ এটি পূর্ণ করতে গেলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। এমতাবস্থায় আপনি আয়াতটি পূর্ণ করবেন না।সিজদার ক্ষেত্রে: ইমাম সিজদা থেকে উঠে গেলে আপনি ইমামের অনুসরণে উঠে যাবেন। সিজদায় থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করার চেয়ে ইমামের অনুসরণ করা উত্তম। কারণ আপনার নামায ইমামের সাথে সম্পৃক্ত এবং আপনি এখন আপনার ইমামের অনুসরণ করতে আদিষ্ট।”(ঈষৎ পরিবর্তিত ও সমাপ্ত পুরো ফাতওয়াটি জানতে দেখুন ইবনু উসাইমীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৭৫; গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৩৭৯০)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কাফের মুশরিক নাস্তিক মুরতাদ ইত্যাদির মৃত্যুতে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়া কি জায়েয

 প্রশ্ন: কাফের-মুশরিক, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদির মৃত্যুতে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়া কি জায়েয?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি। অতঃপর আহলুল আলেমগনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অমুসলিম কারো মৃত্যু হলে তার প্রসঙ্গে “إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ”—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলা শরিয়তসম্মত এবং এতে কোনো দোষ নেই। কেননা এই আয়াতের অর্থ হলো: “নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।”(সূরা বাকারাহ: ১৫৬) মুসলিমদের সাথে সাথে অমুসলিমদের জন্যও এ কথাটা প্রযোজ্য।কেননা অমুসলিমরাও আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে এবং তার কাছে ফিরে যেতে হবে। তাছাড়া এই বাক্যটি মূলত আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, দুনিয়ার সব কিছুই তাঁর মালিকানাধীন এবং সব কিছুর শেষ পরিণতি তাঁর কাছেই এ বিশ্বাসের বহি:প্রকাশ।
.
প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত:৯৪ হি:] বলেন,“উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) -এর জুতা ছিঁড়ে গেল (জুতার ফিতা বাঁধার জায়গা ছিঁড়ে যায়), তখন তিনি বললেন:إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ، فَقَالُوا : يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، أَفِي قُبَالِ نَعْلِكَ ؟ قَالَ: ” نَعَمْ، كُلُّ شَيْءٍ أَصَابَ الْمُؤْمِنَ يَكْرَهُهُ , فَهُوَ مُصِيبَةٌ”ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। লোকেরা বলল:”হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি কি আপনার জুতার জন্যও ইন্না লিল্লাহ বললেন? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, মুমিনের ওপর যা কিছু আপত্তিকর ঘটনা ঘটে,সেটাই মুসীবত (বিপদ)।”(মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/২৬৬৫২; সনদ সহীহ)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আপনি তাযিয়া (সান্ত্বনাদান) সম্পর্কে বলেছেন যে, এটি কেবল মৃত ব্যক্তির জন্য সীমাবদ্ধ নয়; তাহলে কি মৃত ব্যতীত অন্য কষ্টে পড়লেও (সান্ত্বনাদান) তাযিয়া দেওয়া সুন্নত? আর তাযিয়ার ধরন কেমন হওয়া উচিত?
উত্তরে বলেন:التعزية هي تقوية المصاب على تحمل الصبر، وانتظار الثواب سواء كان في ميت أو غيره، مثل أن يصاب بفقد مال كبير له، أو ما أشبه ذلك، فتأتي إليه وتعزيه وتحمله على الصبر حتى لا يتأثر تأثراً بالغاً ” ا“তাযিয়া বলতে বোঝায়— বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে ধৈর্য ধারণে সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াবের প্রত্যাশায় তাকে উৎসাহিত করা। এটি হোক মৃতের কারণে অথবা অন্য কোনো কারণে—যেমন, কেউ যদি বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়ে ফেলে অথবা অন্য কোনো দুঃখজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। তখন আপনি তার কাছে যান, তাকে সান্ত্বনা দেন, ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করেন, যাতে সে অতিমাত্রায় দুঃখ-কষ্টে ভেঙে না পড়ে।”(ইবনু উসাইমীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ৩৮৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো পুরুষ বা মহিলা কা/ফির (অমুসলিম-মুশরিক) অবস্থায় মারা গেলে, আমরা কি বলতে পারি “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” নাকি এটা জায়েয নয়? আমরা কি এটাও বলতে পারি “ইয়া আইয়্যাতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাহ, ইরজি‘ঈ ইলা রাব্বিকি রাদিয়াতাম মারদিয়্যাহ… শেষ পর্যন্ত”?
এ প্রশ্নের জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
الكافر إذا مات لا بأس أن تقول: إنا لله وإنا إليه راجعون، الحمد لله، من أقربائك لا بأس، كل الناس إلى الله راجعون، كل الناس ملك لله سبحانه وتعالى، لا بأس بهذا، ولكن لا يدعى له، ما دام كافر لا يدعى له، ولا يقال: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ۝ ارْجِعِي لأن النفس ما هي مطمئنة، نفس فاجرة، ما يقال لها، وإنما يقال هذا في المؤمن. فالحاصل أن الكافر إذا مات لا بأس أن تقول: إنا لله وإنا إليه راجعون ولا بأس أن يقول لك غيرك: أعظم الله أجرك فيه، وأحسن عزاءك فيه، ما في بأس، قد يكون لك مصلحة في حياته، قد يكون في حياته يحسن إليك، ينفعك فلا بأس، لكن لا يدعى له ولا يستغفر له، ولا يتصدق عنه إذا مات كافراً. نعم
“কা/ফির মারা গেলে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। যদি সে তোমার ঘনিষ্ঠজনদের (সবচেয়ে প্রিয় সন্তান,নাতি-নাতনি) কেউ হয়,তাহলে “আলহামদুলিল্লাহ” বলাতেও কোনো অসুবিধা নেই। সকল মানুষই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী,সকল মানুষই মহান আল্লাহর মালিকানাধীন। এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে তার জন্য দু‘আ করা যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে কা/ফির অবস্থায় রয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য দু’আ করা যাবে না,ক্ষমাপ্রার্থনা করা যাবে না। এবং “ইয়া আইয়্যাতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাহ, ইরজি‘ঈ” এধরনের আয়াত তার ব্যাপারে পড়া যাবে না। কারণ ঐ আত্মা প্রশান্ত নয়, বরং পাপাচারী আত্মা। তাকে এটা বলা যাবে না। বরং এটা মুমিনদের ক্ষেত্রে বলা হয়। সুতরাং,সারকথা হলো,কা/ফির মারা গেলে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। অন্য কেউ আপনাকে “আ‘জামাল্লাহু আজরাকা ফীহি” (আল্লাহ আপনাকে এতে মহান প্রতিদান দিন) এবং “আহসানাল্লাহু আযাআকা ফীহি” (আল্লাহ আপনাকে এতে উত্তম সান্ত্বনা দিন) বললে তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। তার জীবনে আপনার কোনো উপকার থাকতে পারে, তার জীবনে সে আপনার প্রতি ভালো ব্যবহার করতে পারে, আপনার উপকার করতে পারে, তাই এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে তার জন্য দু’আ করা যাবে না, তার জন্য ক্ষমা চাওয়া যাবে না এবং কা/ফির (অমুসলিম/মুশরিক) অবস্থায় মারা গেলে তার পক্ষ থেকে সদাকাহ করা যাবে না।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট;ফাতাওয়া নং ৪৮৯২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলিল আল মাদানী।
দাঈ জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কবর পাকা করা বা কবরের উপর নাম বা অন্য কিছু লেখার শারঈ বিধান কি

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো মৃত ব্যক্তির কবর পাকা করা এবং কবরের উপর কুরআনের আয়াত, হাদীসের বাণী কিংবা অন্য কোনো লেখা লিখা জায়েয নয়। সেটা লোহার ফলকেই হোক, পাথরের শিলালিপিতেই হোক কিংবা অন্য কোনো বস্তু দিয়েই হোক না কেন সবই নিষিদ্ধ।কারণ, জাবির (রা.)-এর হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরকে চুনকাম করতে, পাকা করতে এবং তার উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন। তবে অতিপ্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে, আলেমগণ মৃত ব্যক্তির কবর চিহ্নিত করার জন্য কেবল মাথার কাছে একটি সাধারণ চিহ্ন রাখা বা সেখানে শুধু নাম লেখার অনুমতি দিয়েছেন। দলিল হিসেবে তাঁরা সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছেন।যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান সাহাবী উসমান ইবনে মাযউনের কবরে পাশে একটি পাথর দিয়েছিলেন।(আবু দাউদ হা/৩২০৬) এই হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:السنة أن يجعل عند رأسه علامة شاخصة ، من حجر أو خشبة أو غيرهما ، هكذا قاله الشافعي والمصنِّف [ يعني :الشيرازي ] وسائر الأصحاب

(কবরস্থ) ব্যক্তির মাথার কাছে পাথর অথবা কাঠ অথবা এমন কিছু চিহ্ন হিসেবে প্রদান করা সুন্নত। এমনটি বলেছেন শাফেয়ী, গ্রন্থপ্রণেতা (অর্থাৎ শীরাযী) এবং মাযহাবের সকল আলেম।”(নববী আল-মাজমূ, খণ্ডঃ ৫; পৃষ্ঠা: ২৬৫)
.
আবু দাউদের হাদিসটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] তাঁর শারহু সুনানে আবি দাউদ” গ্রন্থে বলেছেন:
ومن تدبر نهي النبي صلى الله عليه وسلم عن الجلوس على القبر ، والاتكاء عليه ، والوطء عليه : علم أن النهي [ يعني : النهي عن المشي بين القبور بالنعلين ] : إنما كان احتراما لسكانها أن يُوطأ بالنعال فوق رؤوسهم ، ولهذا يُنهى عن التغوط بين القبور ، وأخبر النبي صلى الله عليه وسلم أن الجلوس على الجمر حتى تحرق الثياب : خير من الجلوس على القبر ، ومعلوم أن هذا أخف من المشي بين القبور بالنعال .وبالجملة : فاحترام الميت في قبره بمنزلة احترامه في دار التي كان يسكنها في الدنيا ، فإن القبر قد صار داره ، وقد تقدم قوله صلى الله عليه وسلم : ( كسر عظم الميت ككسره حيا ) ؛ فدل على أن احترامه في قبره كاحترامه في داره ، والقبور هي ديار الموتى ومنازلهم ، ومحل تزاورهم ، وعليها تنزل الرحمة من ربهم ، والفضل على محسنهم …؛ فكيف يستبعد أن يكون من محاسن الشريعة إكرامُ هذه المنازل عن وطئها بالنعال ، واحترامُها ، بل هذا من تمام محاسنها
“কেউ যদি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরের উপর বসা, হেলান দেওয়া, এবং তার উপর দিয়ে হাঁটা নিষেধ করার কারণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, তবে সে জানতে পারবে যে এই নিষেধাজ্ঞা (অর্থাৎ, জুতো পরে কবরের উপর দিয়ে হাঁটা নিষেধ) তাদের বাসিন্দাদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই। যাতে তাদের মাথার উপর দিয়ে জুতো পরে হাঁটা না হয়। এই কারণেই কবরের মাঝে মলত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও জানিয়েছেন যে,”কারো কবরের উপর বসা অপেক্ষা স্বীয় বস্ত্র জ্বালিয়ে দেওয়া পর্যন্ত আগুনের ফুলকির উপর বসে থাকা উত্তম।” আর এটা কবরের উপর জুতো পরে হাঁটার চেয়ে হালকা কাজ।মোটকথা, কবরে শায়িত ব্যক্তির সম্মান ঠিক তার জীবদ্দশায় তার বাড়ির সম্মানের মতোই। কেননা কবর এখন তার নতুন বাড়ি। পূর্বে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই উক্তিটি এসেছে: ‘মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা, জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার মতোই।”এই উক্তি আমাদের নির্দেশ করে যে কবরেও মৃত ব্যক্তির সম্মান জীবদ্দশার মতোই অটুট থাকে। কবর হলো মৃতদের বাসস্থান, যেখানে তারা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং যেখানে তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত নেমে আসে এবং তাদের ভালো কাজের প্রতিদান মিলতে থাকে।সুতরাং, শরিয়তের সৌন্দর্য এবং আদেশের অংশ হিসেবে এই স্থানগুলোকে জুতো দিয়ে মাড়ানো থেকে তাদের সম্মান রক্ষা করা এবং যত্নশীল হওয়াটা অদ্ভুত কিছু নয়। বরং, এটি শরিয়তের পূর্ণ সৌন্দর্যেরই একটি অংশ।”(শারহু সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৭-৩৯)
.
▪️“কবরের উপর নাম লেখা প্রসঙ্গে আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ:
.
আল-মাওসু’আ আল-ফিকহিয়্যাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
واختلف الفقهاء أيضاً في الكتابة على القبر , فذهب المالكية والشافعية والحنابلة إلى كراهة الكتابة على القبر مطلقاً ؛ لحديث جابر قال : ( نهى النبي صلى الله عليه وسلم أن يجصص القبر وأن يقعد عليه وأن يبنى عليه وأن يكتب عليه ) … وذهب الحنفية والسبكي من الشافعية إلى أنه لا بأس بالكتابة إن احتيج إليها حتى لا يذهب الأثر ولا يمتهن…
“কবরের উপর লেখা প্রসঙ্গে ফকিহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মালিকি, শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকিহদের মতে—কবরের উপর যেকোনো প্রকার লেখা মাকরূহ। এর প্রমাণ হলো জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস,তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর পাকা করতে, কবরের উপর বসতে ও কবরের উপর গৃহ নির্মাণ করতে, এবং কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন।” অন্যদিকে হানাফি ফকীহগণ এবং শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম আস-সুবকী (রহঃ) এর মতে, প্রয়োজনে কবরের উপর লেখা দোষণীয় নয়; যাতে নিদর্শন মুছে না যায় এবং (কবর) অসম্মানিত না হয়।”(আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড ৩২, পৃ. ২৫২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
“الكتابة التي لا يُراد بها إلا إثبات الاسم للدلالة على القبر ، فهذه لا بأس بها ، وأما الكتابة التي تشبه ما كانوا يفعلونه في الجاهلية يكتب اسم الشخص ويكتب الثناء عليه ، وأنه فعل كذا وكذا وغيره من المديح أو تكتب الأبيات …فهذا حرام .ومن هذا ما يفعله بعض الجهال أنه يكتب على الحجر الموضوع على القبر سورة الفاتحة مثلا ..أو غيرها من الآيات فكل هذا حرام وعلى من رآه في المقبرة أن يزيل هذا الحجر ، لأن هذا من المنكر الذي يجب تغييره . والله الموفق “
“কবরের উপর লেখা যদি কেবলমাত্র মৃত ব্যক্তির নাম সনাক্ত করার উদ্দেশ্যে হয়, যাতে কবর চিহ্নিত করা যায়, তবে এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি লেখা হয় এমনভাবে যা জাহিলিয়াতের রীতি নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ — যেখানে ব্যক্তির নামের পাশাপাশি তার প্রশংসা, কৃতিত্ব, কবিতা বা অন্যান্য প্রশংসামূলক বর্ণনা লেখা হয় সেগুলো হারাম।এছাড়া,কিছু অজ্ঞ লোক যা করে থাকে,যেমন কবরের ওপর রাখা পাথরে সূরা ফাতিহা বা অন্যান্য আয়াত লেখা—এই সকল কাজও হারাম।যে ব্যক্তি কবরস্থানে এমনটি দেখবে, তার উচিত সেই পাথরটি অপসারণ করা, কারণ এটি এক ধরনের গর্হিত কাজ, যার পরিবর্তন করা আবশ্যক। আর আল্লাহই তাওফীক দানকারী।”(মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, শারহু রিয়াদিস সালিহিন (রিয়াদ: দারুল ওয়াতান, প্রকাশের ক্রমধারাবিহীন, ১৪২৬ হি.)
.
শাইখ হামাদ বিন আব্দুল্লাহ্ আল-হামাদ হাফিযাহুল্লাহ [জন্ম:১৯৬৭ খ্রি:] বলেছেন:
لكن هل يجوز أن يكون ذلك ( وضع الاسم ) علامة إن لم يتمكن أهل الميت أن يضعوا علامة عليه لكثرة القبور وعدم التمييز بغير الكتابة ؟ ذهب طائفة من أهل العلم إلى جواز ذلك ، وأنها إذا وضعت الكتابة مجردة واكتفي بالاسم فحسب ، فإن ذلك لا بأس به ، بشرط ألا يتمكن من وضع علامة غيرها ، وذلك للحاجة إلى معرفة قبر الميت .فقد ثبت في سنن أبي داود أنه صلى الله عليه وسلم : (وضع صخرة عند رأس عثمان بن مظعون وقال : أتعلم بها قبر أخي ، وأدفن إليه من مات من أهلي) .وهذا القول حسن إن شاء الله
“যদি মৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনের কবরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কবর চিহ্নিত করার জন্য অন্য কোনো উপায় না থাকে এবং শুধু লেখার মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, তাহলে কি কবরের ওপর নাম লেখা জায়েজ? কিছু আলেম এটিকে জায়েয বলেছেন,তাদের মতে, যদি শুধু নাম লিখে রাখা হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই।কেননা এটি মৃত ব্যক্তির কবর চেনার প্রয়োজনে করা হয়।সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী উসমান ইবনে মাযউনের মাথার কাছে একটি পাথর রেখেছিলেন অতঃপর তিনি বললেনঃ এর দ্বারা আমি আমার ভাইয়ের কবর চিনতে পারবো এবং আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে তার কাছে দাফন করবো। ইনশাআল্লাহ, এই অভিমতটি উত্তম।”(শারহু আলা জাদিল মুস্তাকনি;গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৭৪৭৩৭)
.
▪️কবর পাকা করা, কবরের উপর গম্বুজ বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ প্রসঙ্গে আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ:
.
এ বিষয়ে করণীয় হলো—কবর কেবল এক বিঘত পরিমাণ উঁচু করা; এর চেয়ে বেশি নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর কবরও এমনটিই ছিল। ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: يرفع القبر عن الأرض قدر شبر ليعلم أنه قبر , فيتوقى ويترحم على صاحبه … ولا يستحب رفع القبر إلا شيئا يسيرا “কবর যমীন থেকে এক বিঘত উঁচু হবে, যাতে বোঝা যায় এটি কবর। তখন মানুষজন সতর্ক থাকবে এবং কবরবাসীর জন্য দোয়া করবে। …সামান্য পরিমাণ ছাড়া কবর উঁচু করা মুস্তাহাব নয়।”(ইবনু কুদামাহ আল-মুগনী;খণ্ড;২;পৃষ্ঠা:১৯০) আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ-এ প্রসঙ্গে ফকীহদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছে। সুতরাং কবরের উপর কিছু নির্মাণ করা। সেটি যা কিছুই নির্মাণ করা হোক না কেন। উঁচু হোক কিংবা নিচু। গম্বুজ কিংবা খানকা কিংবা অন্য যে কোনো কিছুর আকৃতিতে।(দেখুন আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৪২)
আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা গ্রন্থে এসেছে:ذهب المالكية والشافعية والحنابلة إلى كراهة البناء على القبر في الجملة , لحديث جابر : نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يجصص القبر وأن يبنى عليه . وسواء في البناء بناء قبة أم بيت أم غيرهما . وقال الحنفية : يحرم لو للزينة , ويكره لو للإحكام بعد الدفن “মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলীরা মনে করেন যে কবরের উপর কোনো কিছু নির্মাণ করা মৌলিকভাবে মাকরূহ। এর কারণ জাবের (রাঃ) এর হাদীস: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরকে চুনকাম করতে এবং কবরের উপর কিছু নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। সেটি গম্বুজ কিংবা ঘর কিংবা এই দুটি ছাড়া ভিন্ন কিছু হোক না কেন। হানাফীরা বলেন: সৌন্দর্যের জন্য হলে হারাম হবে। আর দাফন করার পর কবরকে মজবুত করার জন্য করা হলে মাকরূহ হবে।”(আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা, খণ্ড: ৩২; পৃষ্ঠা: ২৫০)
.
তদ্রুপ, কবরকে নানা প্রকার সৌন্দর্যবর্ধক রঙ বা চুনকাম দ্বারা প্রলেপ দেওয়াও নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল-মাউসু‘আতুল ফিকহিয়্যা গ্রন্থে উল্লেখ আছে:واتفق الفقهاء على كراهة تجصيص القبر , لما روى جابر رضي الله تعالى عنه : نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يجصص القبر ، وأن يقعد عليه ، وأن يبنى عليه . قال المَحَلِّي : التجصيص التبييض بالجص ، وهو الجير . قال عميرة : وحكمة النهي التزيين , وزاد إضاعة المال على غير غرض شرعي “কবর চুনকাম মাকরূহ হওয়ার বিষয়টিতে ফকীহরা একমত। কেননা জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর চুনকাম করতে, কবরের উপর বসতে এবং কবরের উপর কিছু নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। মাহাল্লী বলেন: চুনকাম হলো চুন-সুরকি দিয়ে সাদা করা। উমাইরা বলেন: নিষেধাজ্ঞার হিকমত হলো: কবরের সৌন্দর্যবর্ধন। তিনি আরও বলেন: এটি শরয়ি অনুমোদনহীন খাতে অর্থ নষ্ট করা।”(আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা, খণ্ড: ৩২: পৃষ্ঠা: ২৫০) আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১২৬৪০০, ১৭৪৭৩৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: উস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

আল্লাহ জাহান্নামের জন্য কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন এই হাদীসের অর্থ

 প্রশ্ন: হাদীসে এসেছে: “আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের জন্য কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন।”এই হাদীসের অর্থ কী? তবে কি এর মানে এই যে তারা কুফরি করতে বাধ্য এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি থেকে বঞ্চিত?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
▪️প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মহান আল্লাহ তা‘আলা কাউকেই জোরপূর্বক না আনুগত্যে বাধ্য করেন, না গুনাহে ঠেলে দেন। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের আনুগত্যের আদেশ দেন,গুনাহ থেকে নিষেধ করেন, ঈমানকে পছন্দ করেন এবং কুফরকে অপছন্দ করেন। যেমন তিনি বলেছেন:(إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِنْ تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ)”যদি তোমরা কুফরী কর তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তার বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না। এবং যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে তিনি তোমাদের জন্য তা-ই পছন্দ করেন।(সূরা যুমার: ৭) আর যে ব্যক্তি কুফরি করে, সে নিজের ইচ্ছায়ই করে। যদি তাকে জোর করা হতো, তবে সে তো অজুহাত দেখাতে পারতো,এবং তার কোনো জবাবদিহি থাকত না। আর কুফরের কারণে সে শাস্তির যোগ্য হতো না। আল্লাহ বলেছেন:(وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا * إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا)”আর বলুন, সত্য তোমাদের রব-এর কাছ থেকে; কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে কুফরী করুক। নিশ্চয় আমরা যালেমদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি আগুন, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে; এটা নিকৃষ্ট পানীয়! আর জাহান্নাম কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে–আমরা তো তার শ্ৰমফল নষ্ট করি না- যে উত্তমরূপে কাজ সম্পাদন করেছে।”(সূরা কাহফ: ২৯-৩০) আর তিনি আরও বলেছেন:وَ هَدَیۡنٰهُ النَّجۡدَیۡنِ”আর আমরা তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি।”(সূরা-বালাদ: ১০)
.
ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেছেন:
يقول تعالى ذكره: وهديناه الطريقين، ونجد: طريق في ارتفاع.واختلف أهل التأويل في معنى ذلك، فقال بعضهم
عُنِ بذلك: نَجْد الخير، ونَجْد الشرّ، كما قال: (إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا).ذكر من قال ذلك:حدثنا أبو كُرَيب، قال: ثنا وكيع، عن سفيان، عن عاصم، عن زرّ، عن عبد الله [بن مسعود] (وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ) قال: الخير والشرّ”
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমরা তাকে দুইটি পথ দেখিয়েছি। আর ‘নাজদ’ অর্থ উচ্চ ভূমির পথ।
তাফসীরবিদগণ এর অর্থ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: এখানে উদ্দেশ্য হলো: কল্যাণের পথ ও অকল্যাণের পথ, যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি তাকে পথ দেখিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, নয় সে অকৃতজ্ঞ হবে’। যারা এ কথা বলেছেন তাদের মধ্যে থেকে উল্লেখ করা হলো: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবু কুরায়ব, তিনি বলেছেন: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন ওয়াকী‘, তিনি বলেছেন: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান, তিনি বলেছেন: ‘আসিম থেকে, তিনি বলেছেন: যুরআ থেকে, তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে তিনি বলেছেন: (আর আমরা তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি) এর অর্থ হলো: ভালো (কল্যাণ) এবং মন্দ (অকল্যাণ)।”(তাফসীরে তাবারী; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৪৩৭)
.
অতএব, মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন। আর এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই তাকলিফ (দায়িত্ব) আরোপের মূলভিত্তি। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা জানেন মানুষ কী নির্বাচন করবে, এবং তা তিনি তার সৃষ্টি হওয়ার আগেই লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি জানেন কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, কিন্তু কাউকেই তিনি এমন কোনো কাজে বাধ্য করেন না—যা জান্নাত বা জাহান্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
.
▪️দ্বিতীয়ত: মু’মিন জননী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একটি নাবালক ছেলে মারা গেল আমি বললাম, তার জন্যে সৌভাগ্য। সে তো জান্নাতের চড়ুই পাখিদের থেকে এক চড়ুই পাখি (অর্থাৎ-নির্দ্বিধায় চলাচল করবে)। এরপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ তা’আলা তৈরি করেছেন জান্নাত এবং তৈরি করেছেন জাহান্নাম। এরপর তিনি এ জান্নাতের জন্য যোগ্য নিবাসী এবং জাহান্নামের জন্য যোগ্য নিবাসী তৈরি করেছেন।”(সহিহ মুসলিম হা/৬৬৬০) এই হাদীসে তিনি (আল্লাহ) জাহান্নামের জন্য কিছু লোক সৃষ্টি করেছেন এর অর্থ হলো,তাদের চুড়ান্ত পরিণতি জাহান্নাম হবে; এর মানে এই নয় যে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এখানে للنار (লিন্নার) এর লামের অর্থ হলো পরিণতি ও চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য, কারণ এর অর্থ নয়।
.
মনাওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) তার আত তানবীর শারহুল জামিউস সগীর গ্রন্থে বলেন:واعلم أنه تعالى ما خلق الخلق إلا لعبادته، كما قال: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ، فاللام هنا في الحديث لام الصيرورة والعاقبة، لا لام العلة، مثلها في قوله تعالى: وَلَقَدْ ذَرَأْنا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالإِنسِ “জেনে রেখো, আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, যেমনটি তিনি বলেন: ‘আর আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’। সুতরাং, হাদিসে ‘লাম’ (اللام) অর্থ হলো ‘চূড়ান্ত পরিণতি ও গন্তব্য’, কারণ এর অর্থে নয়।যেমনটি আল্লাহ তায়ালার এই বাণীতেও রয়েছে:”আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;।(সূরা আরাফ: ১৭৯; আত তানবীর শারহুল জামিউস সগীর; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩০৮)
.
ইমাম তাবারী (রহিমাহুল্লাহ) আল্লাহ তায়ালার এই বাণীটির তাফসীরে বলেন:”আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;।(সূরা আরাফ: ১৭৯) এটা আল্লাহর জ্ঞান তাদের ব্যাপারে পূর্বেই সম্পূর্ণ হওয়া যে, তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে কুফরী করার কারণে অবশেষে সেখানে (জাহান্নামে) গিয়ে পৌঁছাবে।”(তাফসীরে তাবারী; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৭৮)
.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর বান্দাদের থেকে এবং তাদের শাস্তি দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। যেমনটি তিনি বলেন:(مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَآمَنْتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا) “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও এবং ঈমান আনো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কী করবেন? আর আল্লাহ তো পরম কৃতজ্ঞ, মহাজ্ঞানী।” (সূরা নিসা: ১৪৭)
.
ইমাম তাবারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে-এ বলেন:
جل ثناؤه بقوله:”ما يفعل الله بعذابكم إن شكرتم وآمنتم”، ما يصنع الله، أيها المنافقون، بعذابكم، إن أنتم تُبتم إلى الله، ورجعتم إلى الحق الواجب لله عليكم، فشكرتموه على ما أنعم عليكم من نعمه في أنفسكم وأهاليكم وأولادِكم، بالإنابة إلى توحيده، والاعتصام به، وإخلاصكم أعمالَكم لوجهه، وترك رياء الناس بها، وآمنتم برسوله محمد صلى الله عليه وسلم فصدَّقتموه، وأقررتم بما جاءكم به من عنده فعملتم به؟ يقول: لا حاجة بالله أن يجعلكم في الدَّرك الأسفل من النار، إن أنتم أنبتم إلى طاعته، وراجعتم العمل بما أمركم به، وترك ما نهاكم عنه؛ لأنه لا يجتلب بعذابكم إلى نفسه نفعًا، ولا يدفع عنها ضُرًّا، وإنما عقوبته من عاقب من خلقه، جزاءٌ منه له على جرَاءته عليه، وعلى خلافه أمره ونهيه، وكفرانِه شكر نعمه عليه؛ فإن أنتم شكرتم له على نعمه، وأطعتموه في أمره ونهيه، فلا حاجة به إلى تعذيبكم، بل يشكر لكم ما يكون منكم من طاعةٍ له وشكر، بمجازاتكم على ذلك بما تقصر عنه أمانيكم، ولم تبلغه آمالكم”
“আল্লাহর বাণী ‘তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে ও ঈমান আনলে, আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে কি করবেন?’ এর অর্থ হলো: হে মুনাফিকরা! তোমরা যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং তোমাদের ওপর তাঁর যে নানান নেয়ামত দিয়েছেন নিজেদের মধ্যে, তোমাদের পরিবার ও সন্তানদের মধ্যে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো,তার একত্ববাদের দিকে ফিরে আসো, তার সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্ক রাখো, আমলগুলো তার জন্য খাঁটি করো, মানুষের দেখানোর জন্য নয়,আর তার রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি ঈমান আনো, তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করো এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর আনা বিষয়গুলো মানো ও সে অনুযায়ী কাজ করো,তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কী করবেন? তিনি বলেন: তাহলে আল্লাহর তোমাদের জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে নিক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন নেই।কারণ,আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে নিজের কোনো লাভ করবেন না, কিংবা কোনো ক্ষতি দূর করবেন না। বরং তাঁর শাস্তি কেবল সেই সৃষ্টির প্রতি প্রতিফল যিনি তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায় করেছে, তাঁর আদেশ অমান্য করেছে, তাঁর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা অস্বীকার করেছে। কিন্তু যদি তোমরা তাঁর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলো, তবে আল্লাহর তোমাদের শাস্তি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তিনি তোমাদের আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার প্রতিদান দেবেন এমনভাবে, যা তোমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি হবে। আল্লাহ মানুষকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেননি যে, তাদের জাহান্নামে শাস্তি দেবেন। তবে যারা কুফরী ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তাদের পরিণতি অবশ্যই জাহান্নাম। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, কে তাঁর আনুগত্য করবে এবং জান্নাতে যাবে, আর কে কুফরী করবে ও জাহান্নামে প্রবেশ করবে তিনি পূর্ব থেকেই জানেন।”(তাফসীরে তাবারি; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৪২)
.
▪️তৃতীয়ত: যে ব্যক্তি নেক আমল করে, তারপর তার সমাপ্তি হয় জাহান্নামের লোকদের আমলের মাধ্যমে—সে আসলে সেই ব্যক্তি, যে নেক আমল করে লোক দেখানোর জন্য (রিয়া) এবং কপটতার সাথে (নিফাক), যেমন হাদীসে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে এসেছে।সাহল ইব্‌নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, কোন এক যুদ্ধে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মুশরিকরা মুখোমুখী হলেন। তাদের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (শেষে) সকলেই আপন আপন সেনা ছাউনীতে ফিরে গেল। মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিল, যে মুশরিকদের কোন একাকী কিংবা দলবদ্ধ কোন শত্রুকেই রেহাই দেয়নি বরং তাড়িয়ে নিয়ে তরবারি দ্বারা হত্যা করেছে। তখন বলা হল “হে আল্লাহ্‌র রসূল! অমুক লোক আজ যতটা ‘আমল করেছে অন্য কেউ ততটা করতে পারেনি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সে ব্যক্তি জাহান্নামী। তারা বলল, তা হলে আমাদের মধ্যে আর কে জান্নাতী হবে যদি এ ব্যক্তিই জাহান্নামী হয়? তখন কাফেলার মধ্য থেকে একজন বলল, অবশ্যই আমি তাকে অনুসরণ করে দেখব (তিনি বলেন) লোকটির দ্রুত গতিতে বা ধীর গতিতে আমি তার সঙ্গে থাকতাম। শেষে, লোকটি আঘাতপ্রাপ্ত হলে তীব্র যন্ত্রণায় সে দ্রুত মৃত্যু কামনা করে তার তরবারির বাঁট মাটিতে রাখলো এবং ধারালো দিক নিজের বুকের মাঝে রেখে এর উপর সজোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল। তখন (অনুসরণকারী) সাহাবী নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্‌র রসূল। তিনি [নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তিনি তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সব ঘটনা জানালেন। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কেউ কেউ জান্নাতবাসীদের মতো ‘আমল করতে থাকে আর লোকজন তাকে তেমনই মনে করে থাকে অথচ সে জাহান্নামী। আবার কেউ কেউ জাহান্নামীর মতো ‘আমল করে থাকে আর লোকজনও তাকে তাই মনে করে অথচ সে জান্নাতী।”(সহিহ বুখারী হা/৪২০৭; সহীহ মুসলিম হা/১১২)
.
আর যে ব্যক্তি আন্তরিকতা ও ঈমানের ভিত্তিতে জান্নাতবাসীদের আমল করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এত ন্যায়পরায়ণ, মহামহিম ও পরম দয়ালু যে, তিনি তাকে জীবনের অন্তিম প্রান্তে পরিত্যাগ করেন না। বরং এমন মানুষই আল্লাহর তাওফীক, সঠিক পথে অটল থাকার দিকনির্দেশনা ও দৃঢ়তার প্রকৃত উপযুক্ত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:یُثَبِّتُ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِالۡقَوۡلِ الثَّابِتِ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ ۚ وَ یُضِلُّ اللّٰهُ الظّٰلِمِیۡنَ ۟ۙ وَ یَفۡعَلُ اللّٰهُ مَا یَشَآءُ”যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আর আল্লাহ যা ইচ্ছে তা করেন”।(সূরা ইবরাহীম: ২৭) তিনি আরও বলেন:وَ الَّذِیۡنَ جَاهَدُوۡا فِیۡنَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ “আর যারা আমাদের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের হিদায়াত দিব।আর নিশ্চয় আল্লাহ্ মুহসিনদের সঙ্গে আছেন।”(সূরা আনকাবূত:৬৯)
এবং আরও বলেছেন:اِنَّهٗ مَنۡ یَّـتَّقِ وَ یَصۡبِرۡ فَاِنَّ اللّٰهَ لَا یُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ”নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুহসিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।”(সূরা ইউসুফ: ৯০) এবং আরও বলেন:یَسۡتَبۡشِرُوۡنَ بِنِعۡمَۃٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ فَضۡلٍ ۙ وَّ اَنَّ اللّٰهَ لَا یُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ”তারা আনন্দ প্রকাশ করে আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য এবং এজন্য যে আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।”(আলে ইমরান :১৭১)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির,আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] তার আল-ফাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন:
وأما كون الرجل (يعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب) ، فإن هذا عمل أهل الجنة فيما يظهر للناس ، ولو كان عملا صالحا مقبولا للجنة ، قد أحبه الله ورضيه : لم يبطله عليه .وقوله : ( لم يبق بينه وبينها إلا ذراع ) يشكل على هذا التأويل، فيقال: لما كان العمل بآخره وخاتمته لم يصبر هذا العامل على عمله حتى يتم له، بل كان فيه آفة كامنة ونكتة خُذل بها في آخر عمره، فخانته تلك الآفة والداهية والباطنة في وقت الحاجة، فرجع إلى موجبها وعملت عملها .ولو لم يكن هناك غش وآفة لم يقلب الله إيمانه كفرا مع صدقه فيه وإخلاصه بغير سبب منه يقتضي إفساده عليه، والله يعلم من سائر العباد ما لا يعلمه بعضهم من بعض”
“যে বর্ণনায় এসেছে যে একজন মানুষ জান্নাতবাসীদের আমল করে, এমনকি তার সাথে জান্নাতের মাঝে শুধু এক হাত দূরত্ব থাকে, কিন্তু তার আগে লিখিত তাকদীর কার্যকর হয়ে যায় তাহলে এর অর্থ হলো: এটি জান্নাতবাসীদের আমল বলে মানুষের নিকট প্রকাশ পায়। কিন্তু যদি তার আমল সত্যিই জান্নাতের উপযোগী সৎ আমল হতো, যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও সন্তুষ্ট হন, তবে আল্লাহ তা নষ্ট করে দিতেন না। আর হাদীসে বলা হয়েছে: ‘তার সাথে জান্নাতের মাঝে আর শুধু এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে’ এটা এই ব্যাখ্যায় আপাতদৃষ্টিতে সমস্যাজনক মনে হতে পারে। তবে বলা হয়: যেহেতু আমলের আসল বিচার হয় শেষাংশ দ্বারা, তাই এ কর্মী তার আমলে অবিচল থাকতে পারেনি। বরং তার মধ্যে গোপন এক রোগ ও অন্তর্নিহিত এক দুর্বলতা ছিল, যা জীবনের শেষ সময়ে তাকে ব্যর্থ করে দেয়। তখন সেই গোপন দোষ ও লুকানো বিপদ তার কাছে প্রকাশ পায়, এবং সে তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে যায় ও সেই অনুযায়ী কাজ করে ফেলে। যদি তার ভেতরে কোনো প্রতারণা বা রোগ না থাকত, তবে আল্লাহ তার ঈমানকে কুফরে রূপান্তরিত করতেন না, অথচ সে এতে সত্যবাদী ও আন্তরিক ছিল এমনটা কোনো কারণ ছাড়া হতো না। আল্লাহ তো বান্দাদের ব্যাপারে জানেন যা তাদের একজন আরেকজন সম্পর্কে জানে না।”(ইবনুল কাইয়্যিম আল ফাওয়াইদ; পৃষ্ঠা: ১৬৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إن حديث ابن مسعود : (حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع) أي: بين الجنة، ليس المراد أن عمله أوصله إلى هذا المكان حتى لم يبق إلا ذراع، لأنه لو كان عمله عمل أهل الجنة حقيقة من أول الأمر، ما خذله الله عز وجل؛ لأن الله أكرم من عبده، عبد مقبل على الله، ما بقي عليه والجنة، إلا ذراع يصده الله؟ !هذا مستحيل، لكن المعنى: يعمل بعمل أهل الجنة ، فيما يبدو للناس، حتى إذا لم يبق على أجله إلا القليل: زاغ قلبه، والعياذ بالله -نسأل الله العافية-. هذا معنى حديث ابن مسعود. إذاً: لم يبق بينه وبين الجنة إلا ذراع بالنسبة لأجله، وإلا فهو من الأصل ما عِمِل عَمَلَ أهلِ الجنة -نعوذ بالله من ذلك، نسأل الله ألا يزيغ قلوبنا- عامل وفي قلبه سريرة خبيثة أودت به إلى أنه لم يبق إلا ذراع ويموت” ا”ইবনু মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীসে এসেছে: ‘যতক্ষণ না তার সাথে জান্নাতের মাঝে এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে’ এখানে জান্নাতের নিকটে পৌঁছানো বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, তার আমল তাকে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে যে জান্নাত থেকে মাত্র এক হাত দূরত্বে থাকতে সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। কারণ, যদি সত্যিই তার আমল প্রথম থেকেই জান্নাতবাসীদের আমল হতো, তাহলে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা তাকে ব্যর্থ করতেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার চেয়েও অধিক দয়ালু। একজন বান্দা যদি আল্লাহর দিকে মনোযোগী থাকে, আর জান্নাতের সাথে তার মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকতে আল্লাহ কি তাকে ফিরিয়ে দেবেন? এটা অসম্ভব। কিন্তু এর অর্থ হলো: সে (মানুষের দৃষ্টিতে) জান্নাতিদের কাজ করে, মানুষের দৃষ্টিতে ও তাই মনে হয়,যতক্ষণ না তার জীবনের সময় থেকে অল্পই বাকি থাকে; তখন তার অন্তর (পথভ্রষ্ট) বিপথগামী হয়ে যায় আল্লাহ আমাদের সেই অবস্থা থেকে রক্ষা করুন আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাই। এটাই ইবনে মাসউদের হাদীসের অর্থ।অতএব,তার মৃত্যু পর্যন্ত জান্নাতের সাথে তার মধ্যে কেবল এক হাত পরিমাণ দূরত্বই অবশিষ্ট থাকে,কিন্তু মূল কথা হলো, সে কখনোই জান্নাতবাসীদের আমল করেনি—আমরা আল্লাহর কাছে এর থেকে আশ্রয় চাই, এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের অন্তরকে পথভ্রষ্ট না করেন। সে বাহ্যিকভাবে আমল করেছে, অথচ তার অন্তরে ছিল একটি খারাপ গোপন অভিপ্রায়, যা তাকে ধ্বংস করেছে এমনকি মৃত্যু অবধি এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকা অবস্থায়ও।”(ইবনু উসাইমীন আল-লিক্বাউশ শাহরী; লিক্বা নং-১৩/১৪)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন:
وأما حديث ابن مسعود رضي الله عنه: (إن أحدكم ليعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها)؛ فهذا يوجب الحذر من أن يعمل الإنسان بعمل أهل الجنة، فيما يبدو للناس، دون ما في باطن قلبه. ويدل لهذا ما ثبت في الصحيح أيضاً: من أن رجلاً كان مع النبي صلى الله عليه وسلم في غزوة، وكان لا يدع للعدو شاذة ولا فاذة إلا قضى عليها ، فقال النبي صلى الله عليه وسلم (هذا من أهل النار) ، فعظم ذلك على الصحابة ، وشق عليهم كيف يكون هذا من أهل النار وهو على هذه الحال! ثم قال أحد الصحابة : والله لألزمنه -ألزم هذا الرجل وأمشي معه- حتى أنظر ماذا يكون من أمره ، يقول: فأصابه سهم -أصاب هذا الرجل الشجاع الجيد سهم- فغضب وجزع ثم أخذ بسيفه ووضعه على بطنه واتكأ عليه حتى خرج السيف من ظهره ، فمات ، فجاء الرجل الذي كان ملازماً له إلى النبي صلى الله عليه وسلم وقال: أشهد أنك رسول الله ، قال: (وبم ؟) قال: إن الرجل الذي قلت لنا إنه من أهل النار صارت خاتمته كذا وكذا -نعوذ بالله من سوء الخاتمة- فقال النبي صلى الله عليه وسلم: (إن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة فيما يبدو للناس وهو من أهل النار). وعلى هذا؛ فيكون حديث عبد الله بن مسعود رضي الله عنه فيه التحذير من سوء الطوية وفساد النية ، وأن الإنسان يجب عليه إذا عمل بعمل أهل الجنة أن يكون عمله مبنياً على إخلاص وتوحيد، حتى يكون نافعاً له عند وفاته ومفارقته الدنيا
“আর ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীস সম্পর্কে: তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতবাসীদের আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে এক হাত দূরত্ব ছাড়া আর কিছু না থাকে, তখন (পূর্ব নির্ধারিত) তাকদীর এগিয়ে আসে এবং সে জাহান্নামীদের কাজ করে, ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।” এই হাদীস মানুষের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। অর্থাৎ, সে যেন এমন কাজ না করে, যা বাহ্যিকভাবে মানুষের চোখে জান্নাতবাসীদের কাজের মতো মনে হয়, অথচ তার অন্তরের ভেতরে সেই সত্যিকারের বাস্তবতা না থাকে। এর প্রমাণ হলো সহীহ হাদীসে বর্ণিত ঘটনা: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে এক ব্যক্তি একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, সে শত্রুর বিরুদ্ধে এমনভাবে লড়ছিল যে, তাদের কাউকে ছেড়ে দিতেন না—ছোট-বড় সবাইকেই দমন করত। তখন নবী ﷺ বললেন: ‘সে জাহান্নামের লোক। এ কথা সাহাবীগণের কাছে অত্যন্ত বড় ও বিস্ময়কর মনে হলো। তারা খুবই বিচলিত হলো, কীভাবে এ ব্যক্তি জাহান্নামের লোক হতে পারে অথচ সে এত সাহসী! তখন এক সাহাবী বললেন: আল্লাহর কসম! আমি এই লোকটির সঙ্গেই থাকব, তাকে অনুসরণ করব, দেখি তার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন: সেই সাহসী লোকটি একটি তীরের আঘাতে আহত হলো। তখন সে রেগে গেল, ধৈর্য্য হারালো, তারপর তার তলোয়ার নিয়ে পেটে রাখল এবং তাতে ভর দিলো, ফলে তলোয়ার পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেল এবং সে মারা গেল। তখন যে সাহাবী তাকে অনুসরণ করছিলেন, তিনি এসে নবী ﷺ-কে বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন: ‘কিসের ভিত্তিতে? তিনি বললেন: আপনি যাকে আমাদের সম্পর্কে বলেছিলেন যে, সে জাহান্নামের লোক, তার শেষ পরিণতি এ রকম হলো। (আমরা আল্লাহর কাছে সুসমাপ্তি প্রার্থনা করি।)। তখন নবী (ﷺ) বললেন: মানুষের দৃষ্টিতে একজন জান্নাতবাসীদের আমল করে, অথচ সে জাহান্নামের লোক। অতএব ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসটি মানুষকে সতর্ক করে দেয় খারাপ অন্তরের উদ্দেশ্য ও নষ্ট নিয়তের ব্যাপারে। তাই মানুষের কর্তব্য হলো যখন সে জান্নাতবাসীদের কাজ করবে, তখন যেন তার কাজটি হয় খাঁটি আন্তরিকতা (إخلاص) ও তাওহীদের ভিত্তিতে। কেননা এভাবেই তার কাজ তার মৃত্যুর সময় এবং দুনিয়া থেকে বিদায়ের মুহূর্তে প্রকৃতপক্ষে তার জন্য কল্যাণকর হবে।”(ইবনু উসাইমীন, লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১২/২৩) শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, একজন ব্যক্তি সারাজীবন ভালো কাজ করতে থাকে, কিন্তু যদি তার অন্তরের উদ্দেশ্য খারাপ হয় বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেই আমল তাকে জান্নাতে পৌঁছাতে পারবে না। বাহ্যিকভাবে সে জান্নাতবাসীদের মতো মনে হলেও, তার অন্তরের গোপন পাপাচার বা কপটতা তাকে শেষ মুহূর্তে পথভ্রষ্ট করে। আমরা যেন সর্বদা আমাদের নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে পরিশুদ্ধ করি এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করি, এই শিক্ষাই এখানে দেওয়া হয়েছে।
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ শিক্ষাই গ্রহণ করি যে, একজন মুমিনের দৃঢ় বিশ্বাস থাকা উচিত আল্লাহ তা‘আলা সম্পূর্ণরূপে সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ ও জুলুম করা থেকে পবিত্র। তিনি কোনো ধরনের জুলুম করেন না, কাউকে কুফরী কিংবা গুনাহে বাধ্য করেন না। বরং তিনি একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সর্বজ্ঞ, যিনি পূর্ব থেকেই জানেন কার পরিণাম জান্নাতে হবে আর কার গন্তব্য হবে জাহান্নাম। জাহান্নামের জন্য এমন এক দল রয়েছে যারা অবশেষে সেখানে প্রবেশ করবে, আর জান্নাতের জন্য এমন একদল রয়েছে যারা সেখানে অনন্ত সুখ-শান্তি ভোগ করবে। আমরা আল্লাহর দরবারে দো‘আ করি তিনি যেন আমাদেরকে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে নিরাপদ রাখেন।আরও বিস্তারিত অধ্যয়নের জন্য দেখা যেতে পারে ড.আব্দুল করীম জাইদান (রহিমাহুল্লাহ)-এর মূল্যবান গবেষণা: “ক্বদা ও ক্বদর বিষয়ে ঈমান এবং তার মানুষের আচরণের উপর প্রভাব”।গৃহীত ইসলাম সওয়াল জবাব ফাতাওয়া নং-২৯৯৬১৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: উস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।

Translate