Thursday, January 8, 2026

মহিলারা কোথায় ঈদের সালাত আদায় করবে

 প্রশ্ন: মহিলারা কোথায় ঈদের সালাত আদায় করবে? তাদের জন্য কি গৃহে একাকীভাবে অথবা জামাআতের সঙ্গে ঈদের সালাত আদায় করার অনুমতি রয়েছে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◆◯◆▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর নারীরা যদি মুসলিমদের সঙ্গে ঈদের জামাতে ঈদগাহে গিয়ে সালাত আদায় করতে সক্ষম হয়,তাহলে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদে পূর্ণভাবে ইসলামী অনুশাসন মেনে, ফিতনার উদ্রেককারী এবং দুর্বল ঈমানদারদের অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি করে এমন সব ধরনের সৌন্দর্যপ্রদর্শন থেকে বিরত থেকে ঈদের সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে গমন করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিম নারীদের এমনকি হায়েযগ্রস্ত নারী, অন্তঃপুরবাসিনী কিশোরী, অবিবাহিত তরুণী এবং যারা সাধারণত বাইরে বের হন না তাদেরকেও ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট ও জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন। তবে হায়েযগ্রস্ত নারীরা সালাতের স্থান থেকে পৃথক স্থানে অবস্থান করবেন। দলিল হচ্ছে, জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ঈদের দিনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সালাতে উপস্থিত ছিলাম। দেখলাম তিনি খুৎবার পূর্বে ছালাত আরম্ভ করলেন আযান ও ইক্বামত ছাড়া এবং যখন ছালাত শেষ করলেন বেলালের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর আল্লাহর মহিমা ও তাঁর প্রশন্তি বর্ণনা করলেন। তৎপর লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। তাদেরকে (পরকালের কথা) স্মরণ করালেন এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর মহিলাদের দিকে অগ্রসর হলেন আর তখন তাঁর সাথে ছিলেন বেলাল, তাদেরকে তিনি আল্লাহভীতির উপদেশ দিলেন। কিছু নছীহত করলেন এবং (আখেরাতের কথা) স্মরণ করালেন”।(সহীহ নাসাঈ হা/১৫৭৫; ইবনু খুযায়মা হা/১৪৬০; মিশকাত হা/১৪৪৬)। অপর বর্ননায় উম্মে আতিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, আমরা যেন ঋতুবতী ও পর্দানশীন মহিলাদেরও দুই ঈদের দিনে (ঈদগাহে) বের করি, যাতে তারা মুসলিমদের জামাআতে এবং তাদের দু‘আয় শামিল হতে পারে; কিন্তু ঋতুবতীগণ যেন তাদের ছালাতের স্থান হতে একদিকে সরে বসে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কারও (শরীর ঢাকবার) বড় চাদর নেই। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার সাথী তাকে আপন চাদর পরাবে”।(সহীহ বুখারী, হা/৩৫১; সহীহ মুসলিম, হা/৮৯০)
.
উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহার) হাদিসটির আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:”فِيهِ اِسْتِحْبَابُ خُرُوجِ النِّسَاءِ إِلَى شُهُودِ الْعِيدَيْنِ سَوَاءٌ كُنَّ شَوَابَّ أَمْ لا وَذَوَاتِ هَيْئَاتٍ أَمْ لا.” ا “এই হাদিসটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দুই ঈদের সালাতে নারীদের বের হওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়); তারা যুবতী হোক বা না হোক, আর তারা উচ্চমর্যাদা বা বিশেষ সামাজিক অবস্থানের অধিকারী হোক বা না হোক।”(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৪৫)
.
​ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَالْحَدِيثُ وَمَا فِي مَعْنَاهُ مِنْ الأَحَادِيثِ قَاضِيَةٌ بِمَشْرُوعِيَّةِ خُرُوجِ النِّسَاءِ فِي الْعِيدَيْنِ إلَى الْمُصَلَّى مِنْ غَيْرِ فَرْقٍ بَيْنَ الْبِكْرِ وَالثَّيِّبِ وَالشَّابَّةِ وَالْعَجُوزِ وَالْحَائِضِ وَغَيْرِهَا مَا لَمْ تَكُنْ مُعْتَدَّةً أَوْ كَانَ خُرُوجُهَا فِتْنَةً أَوْ كَانَ لَهَا عُذْرٌ.”এই হাদিস এবং এই অর্থবোধক অন্যান্য হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, দুই ঈদে নারীদের ঈদগাহে যাওয়া শরীয়তসম্মত। এক্ষেত্রে কুমারী, বিবাহিতা (বা বিধবা/তালাকপ্রাপ্তা), যুবতী, বৃদ্ধা, ঋতুমতী বা অন্য কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে শর্ত হলো— নারী যেন ইদ্দত পালনরত না থাকে, তার বের হওয়া যেন ফিতনার (বিশৃঙ্খলা বা পাপের) কারণ না হয় অথবা তার অন্য কোনো সঙ্গত ওজর (অপারগতা) না থাকে।” (শাওকানী; নায়লুল আওত্বার; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৪২)।
.
সুতরাং প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদীসদ্বয় থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মহিলাদের জন্য ঈদের মাঠে উপস্থিত হওয়া শরীয়তসম্মত; যাতে তারা ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে ঋতুবতী নারীরা সালাত আদায় করবে না; বরং তারা খুৎবা শ্রবণ ও তাকবীরের সঙ্গে শরীক হবে।স্মরণ রাখা জরুরি যে, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নারীদের জন্য ঈদের সালাত আদায় করা সুন্নাত; এটি তাদের জন্য ওয়াজিব নয়। কিন্তু এই সুন্নাত আদায়ের উদ্দেশ্যে নারীদের নিজেদের মধ্যে একজনকে ইমাম বানিয়ে গৃহে ঈদের সালাত আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়।অনুরূপভাবে,নারীদের জন্য আলাদা কোনো স্থান নির্ধারণ করে সেখানে একান্তভাবে কোনো মহিলার ইমামতিতে ঈদের সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করাও শরীয়তসম্মত নয়; বরং এটি বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর যুগে এ ধরনের কোনো প্রচলন ছিল না।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”মহিলাদের উপর ঈদের সালাত পড়া কি ওয়াজিব? যদি ওয়াজিব হয় তাহলে তারা কি বাসায় পড়বে; নাকি ঈদগাহে? উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেছেন:
حكم صلاة العيد للمرأة أنها ليست واجبة ولكنها سنة في حقها، وتصليها في المصلى مع المسلمين؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أمرهن بذلك .ففي الصحيحين وغيرهما عن أم عطية رضي الله عنها قالت: (أُمِرنَا – وفي رواية أمَرَنا؛ تعني النبي صلى الله عليه وسلم – أن نخرج في العيدين العواتق وذوات الخدور، وأمر الحيض أن يعتزلن مصلى المسلمين.” رواه البخاري 1/93 ومسلم (890) وفي رواية أخرى: (أمرنا أن نخرج ونخرج العواتق وذوات الخدور)، وفي رواية الترمذي: (أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يُخرج الأبكار والعواتق وذوات الخدور والحيض في العيدين، فأما الحيض فيعتزلن المصلى ويشهدن دعوة المسلمين، قالت إحداهن: يا رسول الله، إن لم يكن لها جلباب، قال: فلتعرها أختها من جلابيبها متفق عليه،. وفي رواية النسائي: قالت حفصة بنت سيرين: كانت أم عطية لا تذكر رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا قالت: بأبي، فقلت: أسمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يذكر كذا وكذا؟ قالت نعم بأبي، قال: لتخرج العواتق وذوات الخدور والحيض فيشهدن العيد، ودعوة المسلمين، وليعتزل الحيض المصلى. رواه البخاري 1/84 وبناء على ما سبق يتضح أن خروج النساء لصلاة العيدين سنة مؤكدة ، لكن بشرط أن يخرجن متسترات، لا متبرجات كما يعلم ذلك من الأدلة الأخرى .وأما خروج الصبيان المميزين لصلاة العيد والجمعة وغيرهما من الصلوات فهو أمر معروف ومشروع للأدلة الكثيرة في ذلك .والله أعلم.
“মহিলাদের উপর ঈদের সালাত ওয়াজিব নয়; বরং সুন্নত। মহিলারা মুসলমানদের সাথে ঈদগাহে ঈদের সালাত আদায় করবেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সেই নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য গ্রন্থে উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল” অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে “তিনি আমাদেরকে আদেশ দিয়েছিলেন (অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনীদেরকে দুই ঈদের সময় (ঈদগাহে) নিয়ে যেতে এবং ঋতুবতী নারীদেরকে সালাতের জায়গা থেকে দূরে থাকতে।”(সহিহ বুখারী (১/৯৩) ও সহিহ মুসলিম (৮৯০)] অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে‑ “আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে আমরা যেন ঈদগাহে যাই এবং প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে ও অন্তপুরবাসিনী তরুনীদেরকেও সাথে নিয়ে যাই।” তিরমিযির বর্ণনায় এসেছে- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবিবাহিত নারী, প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনী, ঋতুবতী নারীদেরকে দুই ঈদের সময় ঈদগাহে হাজির হতে বলতেন। তবে, ঋতুবতী নারীরা ঈদগাহ থেকে দূরে থাকত এবং সবার সাথে দোয়ায় শরীক হতো। জনৈক নারী বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! যদি কোন নারীর জিলবাব (বোরকা) না থাকে? তিনি বললেন: তাহলে তার কোন বোন যেন তাকে নিজের কোন একটি জিলবাব ধার দেয়।”(সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম)। নাসাঈ-এর রেওয়ায়েতে এসেছে‑ হাফসা বিনতে সিরিন বলেন: “উম্মে আতিয়্যা যখনি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করতেন তখনি বলতেন: ‘আমার পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক’। আমি বললাম: আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন এমন বলতে শুনেছেন? তখন তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমার পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি বলেছেন: প্রাপ্ত বয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনী ও ঋতুবতী নারীরা যেন বের হয় এবং ঈদের নামাযে ও মুসলমানদের দোয়াতে হাযির হয়। ঋতুবতী নারীরা যেন নামাযের জায়গা থেকে দূরে থাকে।”(সহিহ বুখারী (১/৮৪) পূর্বোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে পরিষ্কার যে, নারীদের জন্য দুই ঈদের সালাতে গমন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে শর্ত হচ্ছে তারা পর্দাসহকারে বের হবেন; বেপর্দা নয়­‑ যেমনটি অন্যান্য দলিল থেকে জানা যায়।আর বুঝবান বাচ্চাদের ঈদের সালাতে, জুমার সালাতে ও অন্যান্য সালাতে যাওয়ার বিধান সুবিদিত এবং অনেক দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ্‌ই উত্তম তাওফিকদাতা।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ: খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২৮৪-২৮৬; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া-২৬৯৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”নারীরা কি ঈদের সালাত তাদের বাড়িতে পড়তে পারবে?
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
المشروع في حق النساء أن يصلين صلاة العيد في مصلى العيد مع الرجال ، لحديث أم عطية رضي الله عنها ، فالسنة أن يخرج النساء إلى مصلى العيد مع الرجال ، أما صلاة النساء في البيوت فلا أعلم في ذلك سنة”
“নারীদের জন্য শরীয়তের নির্দেশ হলো—তারা পুরুষদের সঙ্গে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের সালাত আদায় করবে। কারণ উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীসে এমনটাই এসেছে। তাই সুন্নাত হলো, নারীরা পুরুষদের সঙ্গে ঈদগাহে যাবে। আর নারীরা বাড়িতে ঈদের সালাত পড়বে—এ বিষয়ে আমি কোনো সুন্নাতের কথা জানি না।”(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুল আলাদ দুরাব: ১৮৯/৮)
.
তাঁকে (শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ-কে) আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “একজন নারী জানতে চেয়েছেন, আমাদের এলাকায় নারীদের জন্য কোনো ঈদগাহ নেই। তাই আমি কিছু নারীকে আমার বাসায় একত্র করি এবং তাদের নিয়ে ঈদের সালাত আদায় করি। এ ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?জেনে রাখুন, আমার বাসা পর্দাপূর্ণ এবং পুরুষদের থেকে দূরে।
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
الحكم في ذلك أن هذا من البدعة ؛ فصلاة العيد إنما تكون جماعة في الرجال ، والمرأة مأمورة بأن تخرج إلى مصلى العيد فتصلى مع الرجال وتكون خلفهم بعيدة عن الاختلاط بهم .
وأما أن تكون صلاة العيد في بيتها فغلط عظيم ؛ فلم يعهد عن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم ولا عن أصحابه أن النساء يقمن صلاة العيد في البيوت “
“এই কাজটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত; কারণ ঈদের সালাত জামাতে আদায় করা হয় পুরুষদের সঙ্গে। নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঈদগাহে গিয়ে পুরুষদের পেছনে থেকে সালাত পড়তে এবং পুরুষদের থেকে দূরে থাকতে। আর যদি নারী তার বাসায় ঈদের সালাত আদায় করে, তাহলে তা গুরুতর ভুল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের থেকে এমন কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না যে, নারীরা ঈদের সালাত বাড়িতে আদায় করেছেন। “(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুল আলাদ দুরাব: ১৮৯/৮)
.
প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নারীরা যদি সক্ষম হন, তবে শারঈ পর্দা ও অন্যান্য বিধান পূর্ণভাবে মেনে ঈদগাহে গিয়ে পুরুষ ইমামের নেতৃত্বে ঈদের সালাত আদায় করাই সুন্নত ও উত্তম পদ্ধতি। ইসলামী শরীয়তে নারীদের জন্য পৃথকভাবে একাকী কিংবা বাড়িতে জামাআতের মাধ্যমে ঈদের সালাত আদায় করার কোনো স্বতন্ত্র বিধান প্রমাণিত নয়। যদিও ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) সহ কেউ কেউ অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু বিশুদ্ধ মতানুসারে, ঈদের সালাত পুরুষদের জন্য ওয়াজিব হলেও নারীদের জন্য তা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সুতরাং সুন্নত হচ্ছে—পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও খোলা ময়দানে ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ করবে। তবে ঈদগাহ বা ঈদের সালাত আদায়ের স্থান অধিক দূরে হওয়ার কারণে যাতায়াতের অসুবিধা থাকলে,অথবা সেখানে নারীদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে, কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য শারঈ কারণে কোনো নারী ঈদের সালাতে অংশ নিতে না পারলে এতে ইনশাআল্লাহ তার ওপর কোনো গুনাহ বর্তাবে না।অন্যদিকে, যদি কোনো পুরুষ ব্যক্তি শরীয়তসম্মত ওজরের কারণে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের দুই রাকাআত সালাত আদায় করতে অক্ষম হন, তাহলে একদল আলেমদের মতে তিনি বাড়িতে একাকী অথবা পরিবার-পরিজনসহ জামাআতের সঙ্গে ঈদের সালাত আদায় করতে পারবেন—এর প্রমাণ হিসেবে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর আমল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘যাবিরা’ নামক স্থানে তাঁর মুক্তকৃত গোলাম ইবনু আবূ উতবাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাঁর পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের নিয়ে শহরের অধিবাসীদের ন্যায় তাকবীরসহ ঈদের সালাত আদায় করেন।(সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈদাইন, অনুচ্ছেদ: ২৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◆◯◆▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব

 প্রশ্ন: জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর সবার জানা উচিত জানাযা মূলত একটি সালাত—যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা আদায় করে থাকে। তবে এই সালাত অন্যান্য ফরয বা নফল সালাতের ন্যায় নয়। এতে আযান নেই, ইক্বামত নেই, রুকু নেই, সিজদাহ নেই এবং তাশাহুদও নেই। এতদসত্ত্বেও শরিয়তের পরিভাষায় একে সালাত’ বলেই আখ্যায়িত করা হয়েছে।বরং এ বিষয়ে সকল আলেমের ঐকমত্য রয়েছে যে জানাযার সালাত প্রকৃত অর্থেই সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এর অন্যতম সুস্পষ্ট দলিল হলো মহান আল্লাহ তাআলার বাণী—:وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ”আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা তওবা: ৮৪) এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। এবং এ আয়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সহীহ বুখারীতে ‘জানাযার সালাত আদায়ের পদ্ধতি’ শিরোনামের অধ্যায়ে এভাবেই উল্লেখ করেছেন—যে রাসূল (ﷺ) বলেছেন,صَلُّوا عَلَى النَّجَاشِيِّ “তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য (জানাযার) সালাত আদায় করো’। অতঃপর তিনি বলেন, سَمَّاهَا صَلاَةً لَيْسَ فِيهَا رُكُوعٌ وَلاَ سُجُودٌ وَلاَ يُتَكَلَّمُ فِيهَا وَفِيهَا تَكْبِيرٌ وَتَسْلِيمٌ “নবী করীম (ﷺ) একে সালাত বলেছেন, অথচ এর মধ্যে রুকূ ও সিজদাহ নেই এবং এতে কথা বলা যায় না, এতে রয়েছে তাকবীর ও তাসলীম”।(সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ নং-৫৬)
.
❖▌এবার আমরা আলোচনা করব জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব?
.
প্রিয় পাঠক! আমরা প্রথমেই স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এটি সালাতের অন্তর্ভুক্ত তবুও এতে সূরা ফাতেহা পড়া হবে কিনা বা জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করা রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব? এই বিষয়ে আহালুল আলেমদের থেকে সর্বমোট তিনটি মতামত পাওয়া যায়।প্রথমে আমরা সবগুলো মতামত উল্লেখ করব তারপর কোনটি অধিক সঠিক এবং নিরাপদ মত সেটিও উল্লেখ করার চেষ্টা করব।
.
❖১ম অভিমত: একদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করা কোনো অবস্থাতেই মুস্তাহাব বা সুন্নাহ নয়। কারন জানাযার সালাতে কোনো কিরাআত নেই; বরং এতে আল্লাহর প্রশংসা, নবী (ﷺ)–এর ওপর দরূদ পাঠ এবং মৃতের জন্য দুআ করা হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক,সুফিয়ান আস-সাওরি,আল-আওযায়ি (রাহিমাহুমাল্লাহ) এবং কুফাবাসী আলেমদের একটি দলের অভিমত। বলা হয়, প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু উমর ও আবু হুরায়রা, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তারা জানাযা সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করেননি মর্মে মওকুফু সূত্রে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়।যদিও জানাযা সালাতে তারা সূরা ফাতেহা পড়েননি মর্মে সরাসরি স্পষ্ট শব্দে কোনো আছার পাওয়া যায় না।যেমনটি ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন:
لَيْسَ عَنْ وَاحِدٍ مِنْ هَؤُلَاءِ أَنَّهُ قَالَ: لَا يَقْرَأُ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآن
এদের (সাহাবিদের) মধ্য থেকে একজনের পক্ষ থেকেও এমন কথা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি জানাযার সালাতে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করতেন না।”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
❖২য় অভিমত: আরেকদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা ওয়াজিব। বরং তাদের কেউ কেউ একে রুকন (মূল স্তম্ভ) পর্যন্ত বলেছেন। এ মতের অনুসারী আলেমদের সংখ্যা সর্বাধিক তাদের মধ্যে রয়েছেন: ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইমাম ইসহাক, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমগণ যেমন; ইমাম ইবনু বায, বনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)। আর প্রখ্যাত সাহাবীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস, মিসওয়ার, যাহহাক ইবনু কায়েস, আবু দারদা, ইবনু মাসঊদ ও আনাস ইবনু মালিক, ইবনু যুবায়ের ও উবাইদ ইবনু উমাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) প্রমূখ সূরা ফাতিহা পড়তেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
.
❖৩য় অভিমত: আরেকদল বলেছেন,জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সুন্নাহ (অনাবশ্যকীয় উত্তম আমল)। তাই কেউ যদি সুরা ফাতিহা না পড়ে শুধু দোয়া করে, তাতেও সালাত শুদ্ধ হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সূরা ফাতিহা পড়ার পক্ষে যে দলিলগুলো রয়েছে সেগুলো কেবল সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:“এটিই সঠিক মত।”(দেখুন: ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩০,পৃষ্ঠা: ৮০)
.
❖▌আমরা যদি চার মাজহাবের বক্তব্য স্পষ্ট জানতে চাই তাহলে দেখবো:
.
হানাফি মাযহাবের অভিমত: হানাফিরা বলেন,قراءة الفاتحة بنية التلاوة في صلاة الجنازة مكروهة تحريماً، أما بنية الدعاء فجائزة.”জানাজার সালাতে তিলাওয়াতের নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তাহরীমী (তথা নিষিদ্ধ পর্যায়ের) তবে দু‘আর নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা জায়েয।
.
মালিকি মাযহাবের অভিমত: মালিকিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها مكروهة تنزيهاً “জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তানযীহী (অপছন্দনীয়, তবে হারাম নয়)।
.
শাফেয়ি মাযহাবের অভিমত:শাফেয়িরা বলেন,قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة ركن من أركانها، والأفضل قراءتها بعد التكبيرة الأولى، وله قراءتها بعد أي تكبيرة، ومتى شرع فيها بعد أي تكبيرة وجب إتمامها، ولا يجوز قطعها ولا تأخيرها إلى ما بعدها، فإن فعل ذلك بطلت صلاته، ولا فرق بين المسبوق وغيره.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সালাতের একটি রুকন অপরিহার্য স্তম্ভ)। সর্বোত্তম হলো প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পাঠ করা। তবে যে কোনো তাকবীরের পর পড়াও বৈধ। কিন্তু যদি কেউ কোনো তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ শুরু করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ করা ওয়াজিব; মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া বা পরবর্তী তাকবীরের পরে বিলম্ব করা জায়েজ নয়। যদি কেউ তা করে, তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে মাসবূক (দেরিতে যোগদানকারী) ও অন্যদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
.
হাম্বলি মাযহাবের অভিমত: হাম্বলিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها ركن، ويجب أن تكون بعد التكبيرة الأولى.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রুকন এবং তা প্রথম তাকবীরের পরেই আদায় করা আবশ্যক।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: আব্দুর রহমান আল-জাযায়রী, কিতাবুল ফিকহ আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ (বৈরুত: দারুল ইলামিয়্যাহ, তা.বি) খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭৪)
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি অভিমতের মধ্যে কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। আর কেন সূরা ফাতিহা জানাজার সালাতে রুকন বা ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হবে—ইনশাআল্লাহ,আমরা বিষয়টি দলিলসহ স্পষ্ট ও সুসংহতভাবে উপস্থাপন করবো।
.
❖বর্তমানে যেসব আলেম বলেন যে, জানাযার সালাতে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পড়া হবে না বরং হামদ তথা আল্লাহর প্রশংসা (সানা) পাঠ করলেই যথেষ্ট, তাদের মূল দলিল কী? অন্যদিকে যারা বলেন সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক, অর্থাৎ এটি জানাযার সালাতের রুকন বা ওয়াজিব, তাদেরই বা দলিল কী?
.
▌(১).যারা বলেন যে জানাযার সালাতে চার তাকবীর থাকবে এবং প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা নয়; বরং আল্লাহর প্রশংসা তথা সানা পাঠ করা হবে—তাদের এই অভিমতের পক্ষে যে দলিলসমূহ পেশ করা হয় এবং সেই দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় আলেমদের কী বক্তব্য রয়েছে, তা আমরা এখানে বোঝার চেষ্টা করবো। তাদের মতের পক্ষে যেসব দলিল উল্লেখ করা হয়, সেগুলো হলো:
.
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ”তোমরা কোনো মৃতের জানাযা পড়লে তার জন্য নিষ্ঠার সাথে দু‘আ করবে।”(আবু দাউদ হা/৩১৯৯; ইবনু মাজাহ হা/১৪৯৭;ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি হাসান বলেছেন। কিন্তু এই হাদিসে ছানা পড়ার দলিল নেই। এই হাদীসের ব্যাখ্যাতে হানাফী ইমাম মুফতি তাকী উসমানী লিখেছেন, حنفیہ کی دلیل میں عموماً ابو داود کی اک حدیث پیش کی جاتی ہے ، إذا صليت على الميت فأخلصوا له الدعا، لیکن اس سے استدلال درست نہیں کیو نکہ اس کا مطلب اخلاص کے ساتھ دعا کرنا ہے نہ کہ فاتحہ نہ پڑھی جائے۔ “হানাফীদের দলীল হিসেবে আবু দাউদের একটি হাদীস পেশ করা হয়ে থাকে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোন মৃতের জানাযার সালাত পড়, তখন তার জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করো। কিন্তু এই বিষয়ে এই হাদীছের দলীল দেওয়া ঠিক না। কেননা এই হাদীছের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইখলাছের সাথে দো‘আ করা, ফাতিহা না পড়া উদ্দেশ্য না”।(তিরমিযী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩০৫ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে) ইমাম ইবনু হাযম [মৃত:৪৫৬ হি.] এই হাদীসের বিষয়ে বলেছেন,لَوْ صَحَّ لَمَا مَنَعَ مِنْ الْقِرَاءَةِ، لِأَنَّهُ لَيْسَ فِي إخْلَاصِ الدُّعَاءِ لِلْمَيِّتِ نَهْيٌ عَنْ الْقِرَاءَةِ، وَنَحْنُ نُخْلِصُ لَهُ الدُّعَاءَ وَنَقْرَأُ كَمَا أُمِرْنَا ‘যদি এই হাদীস সহীহও হয়, তবুও এই হাদীছ সূরা ফাতিহা পাঠ (ক্বিরাআত করতে) নিষেধ করে না। কেননা মৃতের ইখলাছের সাথে দো‘আ করা অর্থ ক্বিরাআত করা নিষেধ নয়। আমরা ইখলাছের সাথে দো‘আ করি আবার ক্বিরাআত পাঠ করি, ঠিক যেভাবে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লাহ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
অপর বর্ননায় এসেছে, আবু সাঈদ মাকবুরী (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা জানাযার সালাত কিভাবে পড়বেন তা আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নিকট প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,أَنَا، لَعَمْرُ اللَّهِ أُخْبِرُكَ. أَتَّبِعُهَا مِنْ أَهْلِهَا. فَإِذَا وُضِعَتْ كَبَّرْتُ، وَحَمِدْتُ اللَّهَ. وَصَلَّيْتُ عَلَى نَبِيِّهِ ثُمَّ أَقُولُ: اللَّهُمَّ إِنَّهُ عَبْدُكَ…আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে (তার নিয়ম) জানাব। আমি মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজন হ’তে জানাযার সাথে চলি। জানাযা যখন রাখা হয়, আমি তখন তাকবীর বলি এবং আল্লাহর হামদ ও তার নবীর উপর দরূদ পাঠ করি। তারপর বলি, আল্লাহুম্মা ইন্নাহু আব্দুকা…।(মুওয়াত্তা ইমাম মালিক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯; হা/৭৭৫; এবং বায়হাকি আস-সুনান আল-কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ৪০) এই হাদীসের জবাবে বলা যায়, প্রথমত; এখানেও সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…ছানা পড়ার কোন স্পষ্ট দলীল নেই। এখানে হামদ বলতে আবু হুরায়রা (রাঃ) সূরা ফাতিহা ছাড়া অন্য কিছুই বোঝাননি”। (সহীহ মুসলিম হা/৩৯৫)। আর সূরা ফাতিহার চেয়ে বড় হামদ আর কিংবা হতে পারে? এই হাদীসে সূরা ফাতিহা না পড়ার বিষয়ও স্পষ্ট নয়, যেমনটি এই হাদীসে একটি তাকবীরের কথায় উল্লেখ আছে। বাকী তাকবীরগুলো কি তাহলে দেওয়া লাগবে না? আবার শেষে সালামের কথাও উক্ত হাদীসে নেই, তাহ’লে কি সালাম ছাড়াই জানাযা শেষ হবে? যেখানে অন্য ছাহাবীগণ স্পষ্ট প্রথম তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়া ও অন্যান্য বিষয়গুলো বলেছেন।
.
তাদের মতের পক্ষে আরও একটি দলিল হলো; নাফে‘ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَة- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জানাযার সালাতে কোন ক্বিরাআত পড়তেন না”।(মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক হা/৫৩৫, অধ্যায় কিতাবুল জানায়েয; বর্ননাটির সনদ সহীহ;আলিমগন এটিকে গোল্ডেন চেইন উল্লেখ করেছে।(বিস্তারিত দেখুন: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) তবে এখানে কথা আছে অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) জানাজার সালাতে (কিরআত) পড়তেন না। এর সঠিক অর্থ কি? এটি আলেমদের মধ্যে একটি সুপরিচিত মতভেদের বিষয়। কারন প্রথমত: এই বর্ণনার মাধ্যমে সূরা ফাতিহা না পরে সানা পড়ার কোন দলিল নেই। দ্বিতীয়ত: এই বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় বোঝানো হতে পারে: (১).ইবনে ওমরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি জানাযার সালাতে “কিরাআত পড়েননি।”কিন্তু তিনি কি সূরা ফাতিহা পড়েননি, নাকি সূরা ফাতেহার পর অন্য কোনো সূরা পড়তেন না তা স্পষ্ট নয়। (২).এই হাদীস থেকে এটি প্রমাণ করা যায় না যে রাসূল (ﷺ) জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়তেন না; বরং এটি ইবনে ওমরের ব্যক্তিগত আমল। (৩).এছাড়া এটিও বোঝানো হতে পারে যে তিনি প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন না। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মাকহুল প্রথম দুই তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন, আর ইমাম হাসান বসরী প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতেহা পড়তেন। উপরন্তু ইবনু উমর জানজার সালাতে কিরাআত পড়তেন না,এটি নেতিবাচক কথা, আর সূরা আল ফাতিহা পাঠের হাদীসটি হলো ইতিবাচক; উসূলে হাদীস তথা হাদীস বিজ্ঞানের মূলনীতি হলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টি হাদীস পরস্পর সাংঘর্ষিক হলে ইতিবাচক হাদীসটি প্রাধান্য পাবে। সর্বোপরি সাহাবীর কোন কথা বা ‘আমল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাশ্বত সুন্নাহকে বর্জন কিংবা রহিত করতে পারে না। সমস্ত উম্মাতের ইজমা বা ঐকমত্য হলো, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো, হাত বাঁধা, জামা‘আত হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং অন্যান্য সালাতের ন্যায় এখানে ক্বিরাআত পাঠও আবশ্যক। তাছাড়াও সূরাহ্ আল ফাতিহা পাঠের নির্দেশ ও ‘আমল সংক্রান্ত সুস্পষ্ট হাদীস যেখানে বিদ্যমান সেখানে সংশয় সন্দেহ আর কি থাকতে পারে?
.
▌(২).কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে বিশুদ্ধ যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাধারণ বাণীর অন্তর্ভুক্ত:(لا صَلاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ) “যে ব্যক্তি সালাতে সূরা আল-ফাতিহা পড়লো না তার সালাত হলো না।”(সহীহ বুখারী হা/৭১৪) ও মুসলিম হা/৫৯৫)।সম্ভবত ইবনে উমরের (রা.) মতের প্রেক্ষিতেই ইবনু আব্বাস (রা.) মাঝে মাঝে জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা উচ্চস্বরে পাঠ করতেন—যদিও সুন্নাহ হলো তা নীরবে পাঠ করা। যখন তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন:( ليعلموا أنها سنة ) (আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে,এটা সুন্নাত।”(সহীহ বুখারী হা/১২৪৯; তিরমিযী হা/১০২৪) এই হাদীস উল্লেখ করার পরে ইমাম ছান‘আনী (মৃত ১১৮২ হি.) লিখেছেন,والحديثُ دليلٌ على وجوب قراءةِ الفاتحةِ في صلاةِ الجنازةِ “এই হাদীস জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার দলীল”।(সুবুলুস সালাম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৯০) আল্লামা আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) আহকামুল জানায়েয গ্রন্থে বলেন,قلت: وعليه فمن العجائب أن لا يأخذ الحنفية بهذا الحديث مع صحته ومجيئه من غير ما وجه، ومع صلاحيته لاثبات السنة على طريقتهم وأصولهم!”আমি বলি: আশ্চর্যের বিষয় হলো হানাফিরা এই সহিহ হাদিস গ্রহণ করেননি, অথচ এটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁদের নিজস্ব উসুল অনুযায়ীও সুন্নত প্রমাণের জন্য উপযুক্ত!
.
তাছাড়া আলেমগন বলেছেন, উক্ত হাদীসে “সুন্নত” বলার উদ্দেশ্য কেবল “মুস্তাহাব” (ঐচ্ছিক ভালো কাজ) বোঝানো হয়নি; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকা বা আদর্শ।অর্থাৎ,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এটি পাঠ করেছেন”।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) ইসলামী আক্বীদার উলামাগণের পরিভাষায় সুন্নাহ হল:فَهِيَ مَا أمَرَ بِهِ النَّبِيُّ ﷺ وَنَهَى عَنْهُ وَنَدَبَ إِلَيْهِ قَوْلًا وفِعْلًا، مِمَّا لَمْ يَنْطِقُ بِهِ الْكِتَابُ الْعَزِيْزُ‘তা (সুন্নাত) হল এমন বিষয়, যা নবী করীম (ﷺ) করতে আদেশ করেছেন ও যা থেকে নিষেধ করেছেন এবং কথা ও কর্ম দ্বারা এর প্রতি তিনি উৎসাহিত করেছেন, যে বিষয় মহিমান্বিত কিতাবে বলেনি’। এজন্য শরী‘আতের দলীলগুলো সম্পর্কে বলা হয়, কিতাব ও সুন্নাত। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস”।(নিহায়াহ ফী গারীবিল আছার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০৯) হাফেয ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السنة هي الطريقة المسلوكة فيشمل ذلك التمسك بما كان عليه ﷺ هو وخلفاؤه الراشدون من الاعتقادات والأعمال والأقوال وهذه هي السنة الكاملة”সুন্নাহ হল অনুসরণীয় পদ্ধতি, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের বিশ্বাস, আমল ও বক্তব্যসমূহকে অন্তর্ভূক্ত করে। এটাই পরিপূর্ণ সুন্নাত”।(জামিঊল ঊলুম ওয়াল হিকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২০) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السُّنَّةَ هِيَ مَا قَامَ الدَّلِيلُ الشَّرْعِيُّ عَلَيْهِ بِأَنَّهُ طَاعَةٌ لِلهِ وَرَسُولِهِ سَوَاءٌ فَعَلَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَوْ فُعِلَ عَلَى زَمَانِهِ أَوْ لَمْ يَفْعَلْهُ وَلَمْ يُفْعَلْ عَلَى زَمَانِهِ لِعَدَمِ الْمُقْتَضِي حِينَئِذٍ لِفِعْلِهِ أَوْ وُجُودِ الْمَانِعِ مِنْهُ”সুন্নাত হল ঐ সকল আমল, যা পালনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অনুগত হওয়ার ব্যাপারে দলীল রয়েছে। চাই তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে পালন করেছেন বা তাঁর যুগে পালন করা হয়েছে অথবা চাহিদা না থাকায় কিংবা অসুবিধার কারণে সে যুগে তিনি নিজে করেনি ও অন্যরাও করেননি। এসবই সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত”।(ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ,মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২১তম খণ্ড, পৃ. ৩১৭) সুতরাং জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠ করতে হবে উপরোক্ত হাদীস তার প্রকৃষ্ঠ দলীল। (অসংখ্য সাহাবীদের মধ্যে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) সূরাহ আল ফাতিহাহ পাঠ করলেন এবং সুন্নাত বলে দাবী করলেন এতে একজন সাহাবীও তার প্রতিবাদ অথবা বিরোধিতা করেননি, সুতরাং এটা ইজমায়ে সাহাবীর মর্যাদা রাখে)।এছাড়াও বহু সাহাবী থেকে জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।ইবনু আব্বাস (রাদিআল্লাহু আনহু) এর এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাকী ওসমানী বলেছেন, اور صحابی جب کسی عمل کو سنت کہے تو وہ حدیث مرفوع ہوتی ہے اور اس لئے اس کی جو تاویلات کی گئی ہیں وہ سب کمزور ہیں اور یہ حدیث بہت سی احادیث مرفوعہ سے مؤید ہے۔ “আর সাহাবী যখন কোন আমলকে সুন্নাত বলে, তখন সেই হাদীস মারফূ হয়ে যায়, আর এজন্য এই হাদীসের বিপক্ষে যত ব্যাখ্যা করা হয়েছে সব দুর্বল। আর এই হাদীছটি আরও অনেক মারফূ হাদীছ দ্বারা শক্তিশালী”।(ইন‘আমুল বারী খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫০১ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে)
.
অপর বর্ননায় কুতায়বা (রহঃ) …আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:السُّنَّةُ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يَقْرَأَ فِي التَّكْبِيرَةِ الأُولَى بِأُمِّ الْقُرْآنِ مُخَافَتَةً ثُمَّ يُكَبِّرَ ثَلاَثًا وَالتَّسْلِيمُ عِنْدَ الآخِرَةِ”জানাযার সালাতে সূন্নাত হল প্রথম তাকবীর চুপেচুপে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে। অতঃপর আরো তিনটি তাকবীর বলবে; শেষ তাকবীরে সালাম ফিরাবে।”(সুনানে নাসাঈ হা/১৯৯৩; মুছান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ হা/১১৩৭৯; বায়হাকী সুনানুল কুবরা, হা/৭২০৯)। ইমাম বুখারী, মুসলিমের শর্তে হাদীসটি সহীহ। আলবানী ও শু‘আইব আরনাউত্ব ও জুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) হাদীসটির সনদ সহীহ বলেছেন।(দেখুন ইমাম আলবানী ইরওয়াউল গালীল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮১; হা/৭৩৪) প্রিয় পাঠক! এই হাদীসে সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর জানাযার সালাতের সুন্নত ও তাতে কী কী করা হয়—তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন; যেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম সঠিকভাবে তা জানতে পারে এবং তাঁদের ওপর অর্পিত আমানত তারা যথাযথভাবে আদায় করতে পারে। এই হাদীসে আবূ উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:“জানাযার সালাতে সুন্নত হলো—অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির জন্য আদায় করা জানাযার সালাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর আমল ছিল এই যে “প্রথম তাকবীরে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) নীরবে পাঠ করা, অর্থাৎ, তাকবীরে তাহরিমার পর সূরা ফাতিহা চুপিসারে পাঠ করবে; উচ্চস্বরে পাঠ করবে না। “অতঃপর তিনবার তাকবীর দেওয়া, অর্থাৎ, প্রথম তাকবীরের পর আরও তিনটি তাকবীর দেবে। ফলে তাকবীরে তাহরিমাসহ মোট চারটি তাকবীর হবে।“এবং শেষ তাকবীরের পর সালাম দেওয়া,অর্থাৎ, চতুর্থ তাকবীরের পর সালাম ফিরাবে। এই হাদীস থেকে আরও প্রমাণিত হয় উলামায়ে কিরাম মানুষের জন্য যেসব বিষয় জটিল হয়ে যায়, সেগুলো স্পষ্ট করে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত: ৯৪ হি:] বলেন,السُّنَّةُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَائِزِ أَنْ تُكَبِّرَ، ثُمَّ تَقْرَأَ بِأُمِّ الْقُرْآنِ ثُمَّ تُصَلِّيَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ تُخْلِصَ الدُّعَاءَ لِلْمَيِّتِ،”জানাযার সালাতে সুন্নাত হ’ল, তুমি তাকবীর দিবে অতঃপর উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পড়বে। তারপর নবী করীম (ﷺ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করবে এরপর তুমি মাইয়েতের জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করবে”।(আল-মানহালুল আযবু; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৫৩ মিশকাতুল মাসাবীহ এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ এর লেখক ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, والحق والصواب أن قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة واجبة، كما ذهب إليه الشافعي وأحمد وإسحاق وغيرهم؛ “হক এবং সঠিক কথা হ’ল, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব, যেমনটি ইমাম শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক ও অন্যান্যরা বলেছেন”।(মির‘আতুল মাফাতীহ ;খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,
ويسر القراءة والدعاء في صلاة الجنازة لا نعلم بين أهل العلم فيه خلافا ، ولا يقرأ بعد أم القرآن شيئا ، وقد روي عن ابن عباس أنه جهر بفاتحة الكتاب. قال أحمد : إنما جهر ليعلمهم
“জানাযার সালাতে কিরাআত (সুরা ফাতিহা) এবং দোয়া নিঃশব্দে (মনে মনে) পড়তে হয়—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ আছে বলে আমাদের জানা নেই। আর সুরা ফাতিহার পর অন্য কোনো সুরা বা আয়াত পড়তে হয় না। তবে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (একবার) জানাযার সালাতে উচ্চস্বরে সুরা ফাতিহা পড়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি (ইবনে আব্বাস) উচ্চস্বরে পড়েছিলেন কেবল তাঁদের (উপস্থিত লোকদের) এটি শেখানোর জন্য (যে এটি পড়া সুন্নত)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪১২)
.
শাইখ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মুখতার আশ-শশানক্বীতি তাঁর শরহে জাদিল মুস্তাকনিʿ গ্রন্থে বলেন,
وللعلماء في قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة قولان:منهم من يقول: يشرع أن تقرأ سورة الفاتحة، وهو مذهب الإمام الشافعي وأحمد وإسحاق بن راهويه وطائفة من أهل الحديث، والدليل على ذلك عموم قوله عليه الصلاة والسلام: (لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب) وقوله عليه الصلاة والسلام: (أيما صلاة لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب .. الحديث)، فإنك إذا تأملت هذا اللفظ وجدته من صيغ العموم، فقوله: (لا صلاة) نكرة في سياق النفي، والقاعدة: أن النكرة في سياق النفي تفيد العموم. (أيما صلاةٍ) أيضاً يدل على العموم؛ لأن (أي) عند الأصوليين من صيغ العموم، فلما قال: أيما صلاةٍ لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب، فقد عمم ولم يفرق بين صلاة الجنازة ولا غيرها، فدل على أن صلاة الجنازة يجب أن يقرأ فيها بفاتحة الكتاب.وتأكدت هذه العمومات بحديث ابن عباس رضي الله عنه أنه صلى على الجنازة وجهر بالفاتحة؛ لكي يعلم الناس أنها سنة، فدل هذا على أن السنة أن يقرأ الفاتحة على الميت.وخالف في ذلك الحنفية والمالكية رحمة الله عليهم، وقالوا: إنه يقتصر على الدعاء، لآثار وردت عن أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم في صفة الصلاة على الميت، ذكر فيها الصلاة على النبي صلى الله عليه وسلم والدعاء، قالوا: فهذا يدل على أنه لا تقرأ الفاتحة.والجواب عن ذلك: أن المرفوع مقدمٌ على الموقوف، ويحمل كلام الصحابة على أن المقصد الأسمى والأعلى في الصلاة على الميت: أن يدعى له، فذكروه وتركوا غيره للعلم به بداهة، هذا مما يعتبر به.وأيضاً: يحتمل أنه لم يبلغهم النص بقراءة الفاتحة، وقد يخفى على بعض أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم من السنن ما لم يطلع عليه؛ ولذلك يُعمل بما ورد عنه عليه الصلاة والسلام ويقدم على غيره.
“জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে দুইটি মত রয়েছে। তাদের একদল বলেন: জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া শরিয়তসম্মত। এটি ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং আহলে হাদিসদের একটি দলের মত। এর দলিল হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ বানী: “যে সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, সে সালাত হয় না।”আর তাঁর আরেকটি বাণী: “যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না (হাদিস) আপনি যদি এই শব্দগুলোর প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন এগুলো সাধারণ অর্থবোধক বাক্য। কারণ, لا صلاة (কোনো সালাতই নয়) এটি নাকেরার প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি অনির্দিষ্ট শব্দ আর উসুলের নিয়ম হলো নাকেরার প্রেক্ষাপটে অনির্দিষ্ট শব্দ সাধারণ অর্থ প্রদান করে। এছাড়া أيما صلاة (যে কোনো সালাত) এটিও সাধারণ অর্থ নির্দেশ করে। কারণ উসুলবিদদের মতে أي শব্দটি আম এর/সাধারণতার অন্যতম শব্দ। অতএব, যখন বলা হলো: যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, তখন এতে জানাজার সালাত ও অন্যান্য সালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে জানাজার সালাতও সুরা ফাতিহা পড়া আবশ্যক। এই সাধারণ দলিলগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে ইবনু আব্বাস (রা.)–এর হাদিস দ্বারা। তিনি জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা জোরে পড়েছিলেন, যাতে মানুষ জানতে পারে যে এটি সুন্নাত। এ থেকে বোঝা যায় মৃত ব্যক্তির ওপর জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়াই সুন্নত। তবে হানাফি ও মালিকি মাযহাবের আলেমগণ এ মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, জানাজার সালাতে কেবল দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁরা এ মতের পক্ষে সাহাবিদের কিছু বর্ণনা পেশ করেন, যেখানে জানাজার সালাতের বিবরণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ এবং মৃতের জন্য দোয়ার কথা এসেছে, কিন্তু ফাতিহা পড়ার কথা উল্লেখ নেই। তাঁদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে জানাজার সালাতে ফাতিহা পড়া হয় না। এর জবাব হলো মারফূ হাদিস মাওকূফ বর্ণনার ওপর অগ্রাধিকার পায়।আর সাহাবিদের বক্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, জানাজার সালাতের মূল ও সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো মৃতের জন্য দোয়া করা। সে কারণে তাঁরা দোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, আর অন্যান্য বিষয় স্বতঃসিদ্ধ হওয়ার কারণে তা আলাদা করে বলেননি। আরেকটি সম্ভাবনা হলো ফাতিহা পড়ার হাদিসটি তাঁদের কারো কাছে পৌঁছেনি। কারণ সাহাবিদের কারো কাছেও কোনো কোনো সুন্নত গোপন থাকতে পারে, যা অন্যদের জানা ছিল।অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা প্রমাণিত হয়েছে, সেটিই গ্রহণযোগ্য এবং অন্য সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।”(ইমাম শানকীতি; শারহে যাদুল মুস্তাকনি খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, والفاتحة في صلاة الجنازة ركن ؛ لقول النبي عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) ، وصلاة الجنازة صلاة ؛ لقوله تعالى : ( وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَداً ) فسماها الله صلاة ؛ ولأن ابن عباس رضي الله عنهما قرأ الفاتحة على جنازة ، وقال : ( لتعلموا أنها سنة ) “সূরা ফাতিহা পাঠ জানাযার সালাতের একটি রুকন। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬)। আর জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। কারন মহান আল্লাহ বলেন,”আর তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না।”(সূরা তওবা; ৯/৮৪)। আল্লাহ এটাকে সালাত বলেছেন। আর ইবনে আব্বাস (রাঃ) জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পাঠ করলেন এবং বললেন; “যাতে তোমরা জানতে পারবে যে এটা সুন্নত।”(ইবনে উসাইমীন, আশ শারহুল মুমতি খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪০১; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১)। শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়।”(ইমাম ইবনু উসায়মীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১১৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পড়ার হুকুম কি? তিনি জবাব বলেন:واجبة ، كما قال صلى الله عليه وسلم : ( صلوا كما رأيتموني أصلي ) ، وقال عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) متفق على صحته”এটা ওয়াজিব। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবে সালাত আদায় কর।”(সহীহ বুখারী হা/৬৩১)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপর বর্ননায় বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬, সহীহ মুসলিম হা/৯০০,মাজমু’ ফাতাওয়া আল-শাইখ ইবনে বায, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৪৩)
.
জেনে রাখা ভালো যে, জানাযার সালাতে সানা পড়ার প্রমাণে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না।এজন্য ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়। (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৯)। জানাযার সালাতে সানা পাঠ করার প্রমাণ পাওয়া যায় না বিধায় বিগত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] “এটি বিদ‘আত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।(আহকামুল জানায়িয- বিদ‘আত নং-৭৬,পৃষ্ঠা: ৩১৬)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনায় আমি জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে নাকি হবে না বিষয়টি পরিস্কার করার চেষ্টা করেছি। যদিও একদল আলেমদের দাবি হলো—জানাযার সালাতে রুকু ও সিজদাহ নেই; সুতরাং এটি নাকি তাওয়াফের অনুরূপ। আর যেহেতু তাওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠের প্রয়োজন হয় না, তাই জানাযার সালাতেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা জরুরি নয়। কিন্তু এ ধরনের যুক্তি সুস্পষ্ট ও সহীহ হাদীসের মোকাবিলায় অত্যন্ত দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য। অতএব সচেতন পাঠকদের প্রতি আমার নিবেদন—পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে, কোন মতটি অধিক শক্তিশালী, নিরাপদ এবং দলীলসম্মত—তা ইনশাআল্লাহ আপনাদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা না পড়লে সালাত বাতিল হয়ে যাবে এমনটি আমি বলছি না, বরং আমি শুধু এইটুকুই বলবো যেমনটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِيْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ، تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ”তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দীর্ঘায়ু লাভ করবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তাই তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ এবং সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দৃঢ়ভাবে লেগে থাকো। নতুন নতুন বিষয় থেকে সাবধান থাকো, কারণ প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন বিদ‘আহ এবং প্রত্যেক বিদ‘আহ পথভ্রষ্টতা”।(আবূ দাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬)
(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

শরিয়তের দৃষ্টিতে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁককে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার হুকুম

 প্রশ্ন: শরিয়তের দৃষ্টিতে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁককে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর: শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে অসুস্থ রোগীর ওপর রুকিয়া করার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তেমন কোনো মতভেদ নেই। তবে রুকিয়াকে একমাত্র ও স্থায়ী অর্থ উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ কি না—এটি একটি মতভেদপূর্ণ বিষয়।একদল আলেম নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন।পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেমগণের মতে রুকিয়াকে স্থায়ী ও পেশাগত উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ নয়।কারণ এটি সালাফে সালেহীনের আমল ও অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদুপরি, প্রসিদ্ধ কোনো সালাফ থেকে রুকিয়াকে জীবিকা নির্বাহের স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায় না।আমরা দুই পক্ষের দলিলসমূহ পর্যালোচনা করব।
.
(১).যাঁরা রুকিয়াকে স্থায়ী আয়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা এবং রোগীর আরোগ্যের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণকে শর্তসাপেক্ষে বৈধ মনে করেন—তারা তাদের এ মতের পক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ও শর্ত উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—(১).তাকওয়া ও ইখলাস: রাকীর অন্তরে আল্লাহভীতি ও খাঁটি নিয়ত থাকতে হবে। তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য হবে রোগীর কল্যাণ ও উপকার সাধন—অর্থ উপার্জন যেন কখনোই মূল লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়। (২).শোষণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা: রোগীর অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও আরোগ্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের আর্থিক শোষণ বা সুযোগসন্ধানী আচরণ গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।(৩).যুক্তিসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ পারিশ্রমিক: নির্ধারিত পারিশ্রমিক হতে হবে ন্যায্য ও সংযত। তা যেন অতিরঞ্জিত, চাপিয়ে দেওয়া বা লোভপ্রসূত না হয়। (৪).মিথ্যা ও প্রতারণা পরিহার: নিজের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা রুকিয়ার প্রভাব সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবি, ভিত্তিহীন প্রচার কিংবা কোনো ধরনের প্রতারণামূলক আচরণ থেকে পুরোপুরি দূরে থাকতে হবে।
আর হাদিস থেকে দলিল হচ্ছে;আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃأَنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَتَوْا عَلٰى حَيٍّ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ فَلَمْ يَقْرُوهُمْ فَبَيْنَمَا هُمْ كَذ‘لِكَ إِذْ لُدِغَ سَيِّدُ أُولَئِكَ فَقَالُوا هَلْ مَعَكُمْ مِنْ دَوَاءٍ أَوْ رَاقٍ فَقَالُوا إِنَّكُمْ لَمْ تَقْرُونَا وَلاَ نَفْعَلُ حَتّٰى تَجْعَلُوا لَنَا جُعْلاً فَجَعَلُوا لَهُمْ قَطِيعًا مِنْ الشَّاءِ فَجَعَلَ يَقْرَأُ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَيَجْمَعُ بُزَاقَه“ وَيَتْفِلُ فَبَرَأَ فَأَتَوْا بِالشَّاءِ فَقَالُوا لاَ نَأْخُذُه“ حَتّٰى نَسْأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلُوه“ فَضَحِكَ وَقَالَ وَمَا أَدْرَاكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ خُذُوهَا وَاضْرِبُوا لِي بِسَهْمٍ”নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সাহাবীদের কতক সাহাবী আরবের এক গোত্রের নিকট আসলেন। গোত্রের লোকেরা তাঁদের কোন আতিথেয়তা করল না। তাঁরা সেখানে থাকতেই হঠাৎ সেই গোত্রের নেতাকে সর্প দংশন করলো। তখন তারা এসে বললঃ আপনাদের কাছে কি কোন ঔষধ আছে কিংবা আপনাদের মধ্যে ঝাড়-ফুঁককারী লোক আছেন কি? তাঁরা উত্তর দিলেনঃ হ্যা। তবে তোমরা আমাদের কোন আতিথেয়তা করোনি। কাজেই আমাদের জন্য কোন পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট না করা পর্যন্ত আমরা তা করবো না। ফলে তারা তাদের জন্য এক পাল বকরী পারিশ্রমিক দিতে রাযী হল। তখন একজন সাহাবী উম্মুল কুরআন (সূরা আল-ফাতিহা) পড়তে লাগলেন এবং মুখে থুথু জমা করে সে ব্যক্তির গায়ে ছিটিয়ে দিলেন। ফলে সে রোগমুক্ত হল। এরপর তাঁরা বকরীগুলো নিয়ে এসে বলল, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করার পূর্বে এটি স্পর্শ করব না। এরপর তাঁরা এ বিষয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে জিজ্ঞেস করলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনে হেসে দিলেন এবং বললেনঃ তোমরা কীভাবে জানলে যে, এটি রোগ সারায়? ঠিক আছে বক্‌রীগুলো নিয়ে যাও এবং তাতে আমার জন্যও এক ভাগ রেখে দিও।”(সহীহ বুখারী হা/৫৭৫৬)। উক্ত হাদীসের আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, هَذَا تَصْرِيح بِجَوَازِ أَخْذ الْأُجْرَة عَلَى الرُّقْيَة بِالْفَاتِحَةِ وَالذِّكْر , وَأَنَّهَا حَلَال لَا كَرَاهَة فِيهَا সূরা ফাতিহা এবং অন্যান্য দুয়ার মাধ্যমে রুকিয়াহ করার জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া অর্থাৎ অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ। এটা হালাল; মাকরুহ নয়।”(নববী শরহে সহিহ মুসলিম; খন্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন; لَا بَأْسَ بِجَوَازِ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى الرُّقْيَةِ ، وَنَصَّ عَلَيْهِ أَحْمَدُ রুকিয়াহ করার জন্য অর্থ গ্রহণ করাতে কোন সমস্যা নেই অর্থাৎ জায়েজ। এ বিষয়ে ইমাম আহমাদের নস রয়েছে। (ইবনে তাইমিয়া ফাতাওয়া আল-কুবরা; খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪০৫ )
.
রুহায়বানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন; وَلَا يَحْرُمُ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَى رُقْيَةٍ , نَصَّ عَلَيْهِ الْإِمَامُ أَحْمَدُ رحمه الله تعالى , وَاخْتَارَ جَوَازَهُ ، وَقَالَ : لَا بَأْسَ بِهِ ، لِحَدِيثِ أَبِي سَعِيدٍ রুকিয়াহ করার জন্য অর্থ নেওয়া হারাম নয়। এ বিষয়ে ইমাম আহমদের নস রয়েছে। তিনি এটাকে জায়েজ বলে মন্তব্য করেছেন এবং আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন এটা অর্থাৎ অর্থ নেওয়াতে কোনো দোষ নেই।”(মাতালিব আওলান নাহি; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬৩৯)
.
এছাড়াও ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘ইজারা’ (ভাড়া/মজুরি) অধ্যায়ে একটি শিরোনাম রেখেছেন: باب ما يعطى في الرقية على أحياء العرب بفاتحة الكتاب “সূরা ফাতিহা দ্বারা আরবের লোকদের চিকিৎসা করার বিনিময়ে কী দেওয়া যাবে সে সম্পর্কে অধ্যায়।” এবং তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যে,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মজুরী গ্রহন করো এমন সব বস্তুর মধ্যে কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহন করা সর্বাপেক্ষা বেশী হকদার”।(বুলুগুল মারাম, হা/৯১২; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬০১৬২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: এক ব্যক্তি কুরআন ও নববি দুআ দিয়ে রোগীর ওপর পড়ে, কিন্তু পড়ার আগেই নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক ঠিক করে এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:لا بأس بذلك إذا كان يقرأ ما تيسر من القرآن، ويدعو لهم بالدعوات، وينفث على المريض، لا بأس أن يحدد الأجر الذي له. كما وقع لبعض الصحابة مع لديغ لدغ، وكانوا نزلوا بهم، ولم يضيفوهم، فجاءوا إليهم يطلبون من يرقي ليرقي هذا المريض، فقالوا: إلا أن تضربوا لنا سهمًا، فضربوا لهم شيئًا قطيعًا من الغنم، فرقوه حتى عافاه الله، وسلموا لهم نفس الأجرة، وبلغوا النبي ﷺ فأقرهم على ذلك.”যদি সে কুরআন থেকে যা সহজ হয় তা পড়ে, দুআ করে এবং রোগীর ওপর ফুঁ দেয়‌ তাহলে পারিশ্রমিক নির্ধারণে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সাহাবিদের যুগে এমন ঘটনা ঘটেছে এক গোত্রের নেতা সাপে দংশিত হয়েছিল। সাহাবিরা তাদের অতিথি ছিল, কিন্তু তারা মেহমানদারি করেনি। পরে তারা এসে রুকইয়ার অনুরোধ করলে সাহাবিরা বলেন আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে। তারা কিছু ছাগল নির্ধারণ করল। ফাতিহা পড়ে রুকইয়া করা হলো লোকটি সুস্থ হয়ে গেল। এ বিষয়টি নবী সা. এর কাছে জানানো হলে তিনি তা অনুমোদন করেন।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৩৬২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] প্রথমদিকে রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহন করা ঠিক নয় বললেও (ভিডিও: https://youtu.be/VkP96R4OaRk) পরবর্তীতে আরেক ফাতওয়ায় বলেন:যদি তিনি (রুকইয়াহকারী) বিশ্বস্ত হন এবং শুদ্ধ ও যথাযথভাবে রুকইয়াহ করতে সক্ষম হন—অর্থাৎ রুকইয়াহর বিধানসমূহ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী হন—তবে তার জন্য রুকইয়াহর কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা বৈধ। এতে শরীয়তের কোনো আপত্তি নেই। কেননা এর মাধ্যমে তিনি মানুষের উপকার সাধন করছেন।আর তিনি তার সময় ব্যয় করা এবং এ কাজের কারণে অন্য পেশা ত্যাগ করার বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারেন—এতে কোনো অসুবিধা নেই.কারণ এতে মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।” (উক্ত ফতোয়ার অফিসিয়াল ইউটিউব লিংক- https://youtu.be/yYP_Rjji9CQ)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন; قَالَ ابْنُ أَبِي مُوسَى : لَا بَأْسَ بِمُشَارَطَةِ الطَّبِيبِ عَلَى الْبُرْءِ ; لِأَنَّ أَبَا سَعِيدٍ حِينَ رَقَى الرَّجُلَ , شَارَطَهُ عَلَى الْبُرْءِ ، وَالصَّحِيحُ إنْ شَاءَ اللَّهُ أَنَّ هَذَا يَجُوزُ , لَكِنْ يَكُونُ جَعَالَةً لَا إجَارَةً , فَإِنَّ الْإِجَارَةَ لَا بُدَّ فِيهَا مِنْ مُدَّةٍ , أَوْ عَمَلٍ مَعْلُومٍ , فَأَمَّا الْجَعَالَةُ , فَتَجُوزُ عَلَى عَمَلٍ مَجْهُولٍ , كَرَدِّ اللُّقَطَةِ وَالْآبِقِ , وَحَدِيثُ أَبِي سَعِيدٍ فِي الرُّقْيَةِ إنَّمَا كَانَ جَعَالَةً , فَيَجُوزُ هَاهُنَا مِثْلُهُ ইবনে আবু মুসা বলেছেন, সুস্থ হওয়ার বিষয়ে ডাক্তারের সাথে চুক্তি করাতে কোন ক্ষতি নেই। কারণ আবু সাঈদ খুদরি (রা:) যখন লোকটির উপর রুকিয়াহ করেছিলেন, তখন তিনি তাকে শর্ত দিয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ এটা করাতে কোনো সমস্যা নাই। এটা পারিশ্রমিক হবে কিন্তু ইজারা হবে না। কারণ ইজারাটির মাঝে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সময়কাল এবং নির্দিষ্ট কাজ হতে হবে৷ আর পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের জন্য অনির্দিষ্ট কাজ হয়ে থাকে। আবু সাঈদ খুদরি (রা:)-এর রুকিয়াহর ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক বা পুরস্কার ছিল ফলে এটা জায়েজ। (ইবনে কুদামাহ আল মুগনী; খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩১৪; হাশিয়াতুশ সাবী; খন্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৯৮)
.
অপরদিকে যদি ডাক্তার সুস্থ হওয়ার শর্ত দেয়, তাহলে সুস্থ না হলে অর্থ গ্রহণ করা তার জন্য উচিত নয়। এই মর্মে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)বলেন; إذَا جَعَلَ لِلطَّبِيبِ جُعْلًا عَلَى شِفَاءِ الْمَرِيضِ جَازَ كَمَا أَخَذَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الَّذِينَ جُعِلَ لَهُمْ قَطِيعٌ عَلَى شِفَاءِ سَيِّدِ الْحَيِّ ، فَرَقَاهُ بَعْضُهُمْ حَتَّى بَرِئَ فَأَخَذُوا الْقَطِيعَ ؛ فَإِنَّ الْجُعْلَ كَانَ عَلَى الشِّفَاءِ لَا عَلَى الْقِرَاءَةِ অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হয়ে যাওয়ার উপর ভিত্তি করে ডাক্তারকে পুরস্কার বা হাদিয়া দেওয়া বা গ্রহণ করা জায়েজ যেমনভাবে সাহাবীরা গ্রহণ করেছিলেন। যারা গোত্রের নেতাকে সুস্থ করার কারণে তাদেরকে একটি ছাগলের পাল দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা সুস্থ হওয়ার জন্য এই পুরস্কারটি নিয়েছিলেন কিন্তু সূরা ফাতিহা বা অন্যান্য দোয়া পাঠ করার জন্য নেননি। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খন্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৫০৭ )
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.] বলেন; لا مانع من أخذ الأجرة على الرقية الشرعية بشرط البراءة من المرض وزوال أثره অসুস্থ থেকে সুস্থ হওয়া বা না হওয়ার শর্তে শরয়ী রুকইয়াহর জন্য অর্থ নিতে কোন আপত্তি নেই।
.
সুতরাং উক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রুকিয়ার জন্য অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন দোষ নেই। এর দুটি রূপ রয়েছে। (১). প্রথমত: এটি একটি হাদিয়া/পারিশ্রমিক। রোগী সুস্থ হোক আর নাই হোক যে রুকিয়াহ করবে তাকে তার মজুরি দিতে হবে। উভয়ে মিলে সমাধান করে।(অর্থাৎ তারা উভয় যে বিষয়ে সম্মত হবে) তাকে তা কাজের আগে কিংবা পরে দেওয়া যাবে। (২). দ্বিতীয়ত: এটা একটা পুরষ্কার। যা রোগী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার পারিশ্রমিক গ্রহণ করা উচিত নয়।
.
(২).অপরদিকে যারা রুকইয়াকে একমাত্র ও স্থায়ী জীবিকা হিসেবে গ্রহণের বিরোধিতা করেন, তাদের যুক্তি হলো—মূলনীতি হচ্ছে, রুকইয়া শরিয়তসম্মত ও অনুমোদিত একটি আমল। এটি মূলত দোয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা ইবাদতেরই একটি শাখা এবং যার প্রতি শরিয়ত আমাদের উৎসাহিত করেছে। অতএব, রুকইয়াকে পূর্ণাঙ্গ পেশায় পরিণত করা—বিনিময় গ্রহণ করা হোক বা না হোক—এর দৃষ্টান্ত সালাফে সালেহীনদের যুগে পাওয়া যায় না। তারা নিজেরা রুকইয়া করতেন, অন্যের জন্য রুকইয়া করতেন এবং প্রয়োজনে অন্যদেরকেও রুকইয়া করার অনুমতি দিতেন।কিন্তু রুকইয়াকে এমন একটি পেশা বানানো, যার জন্য কেউ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করে নেয় এবং একে স্থায়ী আয়ের মাধ্যম বানিয়ে ফেলে—এমন দৃষ্টান্ত তাদের কর্মপদ্ধতিতে বিদ্যমান নয়।তাছাড়া যদি কেউ রুকিয়াকে স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করে এবং মূল উদ্দেশ্য হয় শুধু অর্থ উপার্জন, তবে তা ঝাড়ফুঁকের বরকত নষ্ট করে দেয় এবং ব্যক্তিকে দুনিয়ার দাসে পরিণত করে—টাকা পেলে খুশি, না পেলে অসন্তুষ্ট। তাই যারা রুকিয়ায় নিয়োজিত, তাদের উচিত নিয়ত খাঁটি রাখা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ দান করলে গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু কাউকে জোর করে দিতে বলা উচিত নয়। এভাবেই বরকত ও সৎ উদ্দেশ্য দুটোই রক্ষা পায়। উদাহরণস্বরূপ;শাইখ নাসির ইবনে আবদুল কারীম আল-আকল,ইমাম আলবানী,শাইখ রাবী আল মাদখালী এবং শাইখ আব্দুর রহমান আল-বাররাক সকলেই উল্লেখ করেছেন যে, সালাফে সালেহীনদের কেউই রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতেন না। তারা নিজেরা রুকইয়া করতেন, অন্যদের সাহায্য করতেন, কিন্তু এটি কখনো তাদের পেশা ছিল না।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: রোগীদের ওপর কুরআন পড়ার জন্য নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা এবং এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বলেন:أقول: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته. التفرغ للقراءة على المرضى من الخير والإحسان، إذا قصد الإنسان بذلك وجه الله عز وجل، ونفع عباد الله، وتوجيههم إلى الرقى الشرعية التي جاءت في كتاب الله وفي سنة رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم. وأما اتخاذ ذلك لجمع الأموال فإن هذه النية تنزع البركة من القراءة، وتوجب أن يكون القارىء عبداً للدنيا: إن أعطي رضي، وإن لم يعط سخط. لذلك أنصح إخواني الذين يتفرغون للقراءة على المرضى أن يخلصوا النية لله عز وجل، وألا يكون همهم المال، بل إن أعطوا أخذوا، وإن لم يعطوا لم يطلبوا، وبذلك تحصل البركة في قراءتهم على إخوانهم، هذا ما أقوله لإخواني القراء.”আমি বলছি আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।রোগীদের ওপর কুরআন পড়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করা কল্যাণ ও উপকারের কাজ যদি মানুষ এতে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করে, তাঁর বান্দাদের উপকার করার উদ্দেশ্য রাখে এবং তাদের কুরআন ও রাসূল সা. এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত শরয়ি রুকইয়ার দিকে পথনির্দেশ করে। কিন্তু যদি এর উদ্দেশ্য হয় অর্থ উপার্জন, তাহলে এই নিয়ত কুরআন পড়ার বরকত কেড়ে নেয় এবং পাঠককে দুনিয়ার গোলামে পরিণত করে পেলে খুশি হয়, না পেলে অসন্তুষ্ট হয়। এ কারণে আমি আমার সেই ভাইদের উপদেশ দিচ্ছি, যারা রোগীদের ওপর রুকইয়া পড়েন তারা যেন আল্লাহর জন্য নিয়ত খাঁটি করেন, অর্থ যেন তাদের মূল লক্ষ্য না হয়। দেওয়া হলে গ্রহণ করবে, না দিলে চাইবে না। এতে তাদের পাঠে বরকত হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই আমি আমার কুরআন পাঠক ভাইদের উদ্দেশ্যে বলছি।”(ইবনু উসাইমীন,ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, ২/৪)
.
শাইখ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল:বর্তমানে কিছু পাঠক রুকইয়াকে বিশেষ পেশা বানিয়ে ফেলেছে কেউ ক্লিনিক খুলেছে, কেউ নিজের বাড়িতে রোগী দেখে। এর হুকুম কী?
তিনি বলেন:نفع الناس طيب، ولكن ليس بهذا التوسع وبهذا الابتذال الذي قد حصل، فهذا التوسع غير جيد، حتى أن بعضهم بسبب كثرة المتعالجين عنده يقرأ على عدة أشخاص! فهذا لا وجه له، وكونه يبيع الماء المرقي هذا توسع غير جيد.”মানুষের উপকার করা (নিঃসন্দেহে) ভালো কাজ, তবে বর্তমানে যে ধরণের ব্যাপকতা এবং অপকৌশল (বা সস্তা জনপ্রিয়তা) লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা কাম্য নয়। এই অতি-বিস্তার মোটেই ভালো কিছু নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রোগীর ভিড় বেশি হওয়ার কারণে কেউ কেউ একসাথে অনেক ব্যক্তির ওপর (ঝাড়ফুঁক বা দোয়া) পড়ে থাকেন! এর কোনো শার’ঈ ভিত্তি নেই। এছাড়া রুকইয়াহ-পঠিত পানি বিক্রি করা এটাও অনুচিত ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত।”(শরহু সুনান আবি দাউদ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৯১)
.
শাইখ মুহাম্মাদ বিন হাদি আল মাদখালি (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছেন—এটা কি সঠিক যে, যিনি জাদুগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করেন, তিনি কি জীনদের দ্বারা আক্রান্ত বা শত্রুতার শিকার হন? শাইখ উত্তরে বলেন:قد يناله شيءٌ من هذا، ولكن لا يضرّه إذا كان متحصِّنًا – بفضل الله ورحمته- بالأذكار الشرعية والأوراد الشرعية من الآيات القرآنية والأحاديث النبوية لا يضرّونه أبدًا، وعمله هذا من العمل الصالح الذي فيه النفع لإخوانه المسلمين ما دام يُحسن الرقية الشرعية، وهو مِمَّن يقوم بها ويُرجى فيه الخير والصلاح ونفع النَّاس، فينبغي أن يستمر في هذا العمل، ولكن لا يتَّخذه مهنةً وتجارةً مثل ما نراه الآن على السَّاحة، وإنّما ينفع إخوانه، فإن أُعطيَ شيئًا أخذ؛ لا بأس، أمَّا أن يجعل الرُّقى؛ القارورة المقروء عليها بالماء الفلاني بكذا، واللي بالزّيت الفلاني بكذا، والقراءة بالساعة كذا، كما يبلغنا عن بعض هؤلاء القرّاء، فهؤلاء في الحقيقة ما هم قرّاء وإنّما هم متأكِّلون، فليُحذر من مثل هؤلاء.”হ্যাঁ,কখনো কখনো তার ওপর কিছু প্রভাব (আক্রমণ বা শত্রুতা) পড়তে পারে। তবে তিনি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে কুরআনের আয়াত ও নববি যিকির আযকার দ্বারা সুরক্ষিত থাকে তাহলে জিনেরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি সঠিকভাবে শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করবেন এবং তিনি নেককার ও মানুষের উপকারে আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকবেন, ততক্ষণ তাঁর এই কাজটি একটি নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে—যার মাধ্যমে তিনি তাঁর মুসলিম ভাইদের উপকার করছেন। সুতরাং তাঁর এই কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত।তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন তিনি এটাকে বর্তমান সময়ের মতো পেশা বা ব্যবসায় পরিণত না করেন। বরং তিনি তাঁর ভাইদের উপকার করবেন; এমতাবস্থায় তাকে যদি কিছু (পারিশ্রমিক) দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ঝাড়ফুঁককে এভাবে গ্রহণ করা যে—অমুক পানির বোতলে ফু দিলে এত টাকা, অমুক তেলের বোতলে ফু দিলে এত টাকা, কিংবা প্রতি ঘণ্টা পড়ার জন্য এত টাকা—যেমনটা আমরা অনেক পাঠকদের (রাক্বী) সম্পর্কে শুনে থাকি; এরা আসলে প্রকৃত পাঠক বা রুকইয়াহকারী নয়, বরং এরা দ্বীনকে উপার্জনের মাধ্যম বানিয়েছে। এদের থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।”(https://ruqya.net/forum/showthread.php?t=64628)
.
সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সাবেক প্রধান মুফতি প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)- জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: কিছু মানুষ ‘রুকইয়াহ শরইয়াহ’কে (ঝাড়ফুঁক) পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এর বিনিময়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছেন। এই বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা কী?
উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;”মূলনীতি অনুযায়ী, রুকিয়াহ-এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ সুন্নাহর দ্বারা বৈধ।এর প্রমাণ হলো সেই গোত্রপতির ঘটনা যাকে বিচ্ছু দংশন করেছিল এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাকে রুকিয়াহ করেছিলেন।অতঃপর তিনি পুরো হাদিসটি উল্লেখ করেন এবং শেষে বলেন;فلا مانع أن يأخذ الراقي أجرًا على رقيته هذه، لا مانع منه، لكنني أنصح أولئك الذين امتهنوا الرقية أن يتقوا الله في أنفسهم، وألا يستغلوا ضعف المريض وعجزه؛ فإن المريض يتطلع إلى العلاج بكل وسيلة، وربما استعملوا أكاذيب وأشياء لا حقائق لها ليظهروا أنهم مهرة في رقيتهم، وأنهم حذاق في هذا الأمر، فليتق الله أولئك الراقون، وليراقبوا الله، وليبتعدوا عن الكذب والدجل، وليكن همهم منفعة المريض، ولا شك أن الأخذ أخذ الأجرة جائز لهم، ولكن لتكن هذه الأجرة بالمعقول، ولا تكن استغلالية ولا انتهازية، فليتقوا الله في أمورهم.অতএব,একজন রুকিয়াহকারী তার কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিলে তাতে কোনো বাধা নেই।কিন্তু আমি ঐ সমস্ত লোকদের উপদেশ দিচ্ছি যারা রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে,তারা যেন নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং রোগীর দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো থেকে বিরত থাকে।কেননা একজন রোগী যেকোনো উপায়েই আরোগ্য লাভের আশায় থাকে।অনেক সময় তারা (ঝাড়ফুঁককারীরা) নিজেদের রুকিয়ায় অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন বিষয়ের আশ্রয় নিয়ে থাকেন।অতএব, ঐ সমস্ত রাকীগণ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুক, আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থাকুক, মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকুক এবং তাদের লক্ষ্য হোক রোগীর উপকার করা। নিঃসন্দেহে তাদের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ জায়েয।তবে এই পারিশ্রমিক যেন হয় যুক্তিসঙ্গত, শোষণমূলক বা সুযোগসন্ধানী যেন না হয়। অতএব, তারা যেন তাদের যাবতীয় কাজকর্মে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে।”(আল-জাজিরাহ পত্রিকা, সংখ্যা-১০০৯৭; কলাম; ফাসআলু আহলায যিকর)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমাদের দেশে এক ব্যক্তি মানুষের উপর ঝাড়ফুঁক করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেন এবং ঝাড়ফুঁকের জন্য তেল ও পানি দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন, এবং তিনি এ ছাড়া অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।তাহলে ঝাড়ফুঁককে পেশা হিসেবে গ্রহণের হুকুম কী? এবং সালাফদের যুগে এর কোন ভিত্তি আছে কি?
জবাবে শাইখ বলেন:هذا يستدلُّونَ بقصةِ الصَّحابة الذين رقَى أحدُهم سيِّدَ أولئك القوم، رقاهُ بالفاتحة فشُفِيَ فأعطَوهم قطيعًا مِن الغنم، فأقرَّهُم الرَّسول وقال: (إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ)، فأُخِذَ مِن هذا جوازُ أَخْذِ الأجرِ على الرُّقية، لكن لم يكن مِن عادة السَّلَفِ اتخاذُ ذلك حِرْفَةً كما يفعلُ النَّاس اليوم، لكن لو إنسان رقى إنسانًا أعطاه مالًا فلا حرجَ عليه أن يأخذَ، أمَّا أن يكون ذلك حِرفة فهذا غيرُ معروفٍ في ما علمتُ في تاريخ المسلمين. “এ বিষয়ে তারা (দলিল হিসেবে) সেই সাহাবীদের ঘটনাটি পেশ করেন, যাঁদের মধ্যে একজন গোত্রের প্রধানকে ‘সুরা ফাতিহা’ পড়ে ঝাড়ফুঁক (রুকিয়া) করেছিলেন। এতে তিনি সুস্থ হয়ে যান এবং তারা সাহাবীদের একপাল (বকরি) ছাগল উপহার দেয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সমর্থন করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “নিশ্চয়ই তোমরা মজুরী গ্রহন করো এমন সব বস্তুর মধ্যে কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহন করা সর্বাপেক্ষা বেশী হকদার”।(বুলুগুল মারাম, হা/৯১২) এ (হাদিস) থেকে ঝাড়ফুঁকের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার বৈধতা পাওয়া যায়।কিন্তু সালাফদের যুগে এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার প্রচলন ছিল না,যেমনটি মানুষ আজ করে থাকে। তবে কেউ যদি কাউকে ঝাড়ফুঁক করে এবং বিনিময়ে তাকে কিছু টাকা দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করায় কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এটাকে নিয়মিত পেশা হিসেবে গ্রহণ করা—আমার জানা মতে মুসলিম ইতিহাসে এমনটি পরিচিত ছিল না।”(https://sh-albarrak.com/article/১৭৯৩৪)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ইয়া শাইখানা! জিনগ্রস্ত রোগীদের ওপর কুরআন পড়ে ফুঁ দেয়াকে কি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ? আর রুগীর শরীর থেকে জ্বিন বের করা কি জায়েয? এমন প্রশ্নের উত্তরে দীর্ঘ আলোচনা করে বলেন:
“কিন্তু বর্তমানে যেসব তথাকথিত পেশাদার রুকিয়াকারীদের কাছে দীর্ঘ কথোপকথন, বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ, নানা প্রশ্নোত্তর ও বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়—এ ধরনের কোনো পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত নয়। সুতরাং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার যে প্রচলন আজ দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত নয়—না সরাসরি, না পরোক্ষভাবে, এমনকি কাছাকাছি অর্থেও নয়।বরং আমি এটিকে বিদ‘আত (নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়)-এর অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য করি। কারণ যারা এ পেশায় নিয়োজিত, তাদের মধ্যে যারা নিজেদের সৎ বলে দাবি করে, তারা বলে: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াবের আশায় এটি করি।” আর অন্যরা স্পষ্টতই দুনিয়াবী স্বার্থ ও আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই এ কাজে লিপ্ত।রুকিয়াকে পেশা বানিয়ে নেওয়া সেই সব নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:“তোমরা নতুন সৃষ্ট বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো। কেননা প্রতিটি নতুন সৃষ্ট বিষয়ই বিদ‘আত, প্রতিটি বিদ‘আতই গোমরাহি, আর প্রতিটি গোমরাহির পরিণাম জাহান্নাম।”এমনকি এক পর্যায়ে প্রশ্নকারী, শাইখকে আরও জিজ্ঞেস করেছিলেন; হে আমাদের শাইখ, রুকিয়া শুরুর আগেই যদি চুক্তি বা দামাদামি করা হয়?! শাইখ: সেটা কেমন? প্রশ্নকারী: অর্থাৎ রোগী দেখার আগেই যদি চুক্তিবদ্ধ হয়। অন্য একজন প্রশ্নকারী: মানে যদি শর্তারোপ করে!প্রশ্নকারী: যেমন—বলল যে ৫০ দিনার দিতে হবে।
শাইখ: না না, এমনটা করা উচিত নয়।প্রশ্নকারী: হে শেখ, এই উপার্জনকে কি ‘সুহত’ বা হারাম মাল বলা হবে?শাইখ: কী বললে? প্রশ্নকারী: এটাকে কি হারাম মাল (সুহত) গণ্য করা হবে? শাইখ: না।”(উৎস: সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ১৯৩ নং অডিয়ো ক্লিপ)
.
পরিশেষে, উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়—অসুস্থ রোগীর রুকিয়া করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা বৈধ কিন্তু সালাফে সালেহীনদের যুগে রুকিয়াহ কখনোই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়ী পেশা ছিল না। অথচ আজ এ বরকতময় ইবাদতকে অনেক ক্ষেত্রে পেশায় পরিণত করে দুর্বল, অসচেতন ও অসহায় মানুষদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে শোষণ করা হচ্ছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। রুকিয়াহ মূলত মানুষের কষ্ট লাঘবের পাশাপাশি অন্তরকে আল্লামুল গায়ূব—অদৃশ্যের পরিপূর্ণ জ্ঞাতা মহান আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করার একটি শরঈ মাধ্যম। এর মৌলিক শর্ত হলো—রুকিয়াহর ওপর নির্ভরতা নয়; বরং রুকিয়াহর বিধানদাতা মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা। সুতরাং, রুকিয়াহকে উপার্জনের পেশা বানানো উচিত নয়; কেননা এতে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও বরকত নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রকৃত রাকী কখনো নিজেকে কোনো ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন না; বরং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—আরোগ্য একমাত্র আল্লাহ তাআলাই দান করেন।নির্দিষ্ট সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া কিংবা পারিশ্রমিক ও উপহারের শর্ত আরোপ করা আল্লাহর বিধানের প্রতি স্পষ্ট বেয়াদবি ও আত্মিক ধৃষ্টতা। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—লোভ, প্রতারণা ও দুনিয়ালোভে জড়িত ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।

শরীয়তের দৃষ্টিতে যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের মর্যাদা লাভ করেন এবং তাদের গোসল ও কাফন ও জানাজা আদায়ের শারঈ বিধান

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের মর্যাদা লাভ করেন তারা কারা? এবং তাদের গোসল, কাফন ও জানাজা আদায়ের শার’ঈ বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর শহীদ একটি ইসলামী পরিভাষা যার অর্থ, মর্যাদা ও তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে ইসলামের সাথেই সম্পর্কিত। ইসলামে শহীদের মর্যাদা অতুলনীয়। শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণের সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করতে শুরু করে—এটি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।শহীদ কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ধারণা নয়, এবং এটিকে সেসব পরিভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখাও সঠিক নয়। বরং শহীদের পরিচয়, শর্ত ও মর্যাদা নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার ইসলামেরই। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শহীদ সেই ব্যক্তি, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে নিহত হন। মোটকথা ইসলামি শরিয়ত ও বিশুদ্ধ আক্বীদা মানহাজের আলোকে ‘শহীদ’ শব্দটির মর্যাদা ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যারা ইখলাসের সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং তার দ্বীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির বা জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন, তারাই প্রকৃত অর্থে শহীদ হিসেবে গণ্য হন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে শহীদ হওয়ার বিষয়টি শুধু বাহ্যিক মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শরিয়ত শহীদদের মর্যাদা ও বিধানের দিক থেকে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছে। এই বিবেচনায় শহীদদের মূলত সর্বমোট তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, শহীদ তিন শ্রেনীর। যেমন:
(১).যে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন, সে দুনিয়া ও আখেরাতে শহীদ। এরাই প্রকৃত শহীদ।(বিশুদ্ধ মতে) মৃত্যুর পর তাকে গোসল দেওয়া হবেনা এবং তাদের জন্য জানাজার নামাজ পড়া হবেনা।
.
(২).যে ব্যক্তি আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবে কিন্তু দুনিয়ায় তাকে গোসল দেওয়া হবে এবং তার জন্য জানাজার নামাজ পড়া হবে।রাসূল (ﷺ) এদেরকে হুকুমের দিক থেকে শহীদ বলেছেন। এরা প্রকৃত শহীদ নয়,বরং শহীদের কাছাকাছি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এই মুমিনগণ আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবেন। প্রথম শ্রেণীর লোকদের সওয়াবের সমান হবে না। যেমন হাদীসে এসেছে:
.
(৩).দুনিয়াতে শহীদ, আখেরাতে নয়। এরা হল যুদ্ধের ময়দানে গণীমতের মাল আত্মসাৎকারী অথবা জিহাদ থেকে পলাতক অবস্থায় নিহত ব্যক্তি। তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হলেও শহীদ বলে গণ্য হবে না। যেহেতু এধরনের ব্যক্তি দুনিয়াতে শহীদদের বিধানের আওতায় আসে, তাই তাকে গোসল দেওয়া উচিত নয় এবং তার জানাজা পড়া উচিত নয়,তবে আখেরাতে তার পূর্ণ সওয়াব হবে না।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইমাম নববী, শারহু সহীহ মুসলিম খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
মোটকথা যেসব মুসলিম একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের খাঁটি নিয়তে, তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির, জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন, শরিয়তের পরিভাষায় তারাই প্রকৃত শহীদ বা শহীদে কামিল।এঁদেরকে দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে তারা দুনিয়ায় বিশেষ বিধান এবং আখেরাতে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হন। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় ব্যক্তিকে হুকুমের দিক থেকে শহীদ বলেছেন। প্রকৃত শহীদ নয় বরং শহীদের কাছাকাছি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এই মুমিনগণ আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবেন।যেমনটি বিভিন্ন হাদীসে রয়েছে-আজ আমরা শুধু দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় বিচারের আলোকে প্রকৃত শহীদদের একটি সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান উপস্থাপন করার চেষ্টা কবর।
.
কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে শহীদের পরিচয় ও মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِنْ لَا تَشْعُرُونَ “আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়,তাদের মৃত বলো না বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা অনুভব করতে পারো না।” (সূরা বাকারা: ১৫৩) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ ۚ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا “কাজেই আল্লাহর কাছে যারা পার্থিব জীবনকে আখিরাতের পরিবর্তে বিক্রি করে দেয় তাদের জিহাদ করাই কর্তব্য। বস্তুত: যারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করে কিংবা বিজয় অর্জন করে, আমি তাদেরকে বিশাল প্রতিদান দান করব।”(সূরা নিসা: ৭৪) হাদিসের ভাষায় শহীদ:আবু মুসা রাদি. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “এক ব্যক্তি গনিমতের সম্পদ অর্জনের জন্য জিহাদ করল, একজন নিজের সুনামের জন্য জিহাদ করল, আরেকজন তার বীরত্ব দেখানোর জন্য যুদ্ধ করল। এদের মাঝে কে আল্লাহর আল্লার রাস্তায় যুদ্ধ করল? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উজ্জীবিত করতে যুদ্ধ করলো সেই কেবল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করলো।”(অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে নিহত হল সেই শহীদ)।(সহীহ বুখারী হা/২৬৫৫, সহীহ মুসলিম হা/৫০২৯)
.
একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে জানা থাকা উচিত—শহীদ হওয়ার জন্য কেবল কাফিরদের হাতেই নিহত হতে হবে—এমন কোনো শর্ত নেই। বরং কেউ যদি অন্যায় ও জুলুমের শিকার হয়ে মুসলিমদের হাতেও নিহত হয়, তবুও সে শহীদের মর্যাদা লাভ করতে পারে। আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ’র আরেক ফাতওয়ায় বলা হয়েছে,ذهب الفقهاء إلى أن للظلم أثراً في الحكم على المقتول بأنه شهيد ، ويُقصد به غير شهيد المعركة مع الكفار ، ومِن صوَر القتل ظلماً : قتيل اللصوص ، والبغاة ، وقطَّاع الطرق ، أو مَن قُتل مدافعاً عن نفسه ، أو ماله ، أو دمه ، أو دِينه ، أو أهله ، أو المسلمين ، أو أهل الذمة ، أو مَن قتل دون مظلمة ، أو مات في السجن وقد حبس ظلماً .واختلفوا في اعتباره شهيد الدنيا والآخرة ، أو شهيد الآخرة فقط ؟ .فذهب جمهور الفقهاء إلى أن مَن قُتل ظلماً : يُعتبر شهيد الآخرة فقط ، له حكم شهيد المعركة مع الكفار في الآخرة من الثواب ، وليس له حكمه في الدنيا ، فيُغسَّل ، ويصلَّى عليه”ফিকহবিদরা একমত যে, জুলুমের কারণে নিহত হওয়া কোনো ব্যক্তিকে শহীদ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত শহীদ ব্যতীত অন্যান্য শহীদ। জুলুমে হত্যার কিছু উদাহরণ ডাকাত, সন্ত্রাসী বা পথকাটা দলের হাতে নিহত ব্যক্তি বিদ্রোহী বা জালিমদের দ্বারা নিহত ব্যক্তি নিজের জান, মাল, রক্ত, দ্বীন, পরিবার রক্ষায় নিহত ব্যক্তি মুসলমান বা অমুসলিম নাগরিক রক্ষায় নিহত ব্যক্তি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি এদের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে এরা কি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিক থেকে শহীদ, নাকি শুধু আখিরাতের শহীদ? জমহুর আলেমদের মত হলো যে ব্যক্তি জুলুমের কারণে নিহত হয়, সে শুধু আখিরাতের শহীদ। অর্থাৎ আখিরাতে সে শহীদের সওয়াব পাবে কিন্তু দুনিয়াতে তার ওপর শহীদে ময়দানের বিধান প্রযোজ্য হবে না তাই তাকে গোসল দেওয়া হবে এবং জানাযার নামাজ পড়ানো হবে।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৭৪)
.
▪️দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের গোসল,কাফন ও জানাজা আদায়ের শার’ঈ বিধান:
.
যেসব মুসলিম একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের খাঁটি নিয়তে, তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির, জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন তাদের গোসল ও জানাজার বিধান নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে মূলত তিনটি মত পাওয়া যায়।
.
প্রথমত, অধিকাংশ বা জুমহুর উলামাদের মতে, যেসব শহীদ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, তাদের দুনিয়াবি বিধি অনুযায়ী গোসল দেওয়া বা জানাজার নামাজ আদায় করা হয় না। বরং তাঁরা রক্তমাখা পোশাকেই দাফন করা হয়। তবে আখেরাতের বিচারে, এই শহীদরা বিনা শর্তে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করবেন এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান, মর্যাদা ও অপরিসীম রিজিকের অধিকারী হবেন।
.
দ্বিতীয়ত, কিছু আলেমের মত হলো—তাঁকে গোসল দেওয়া হবে এবং জানাজার নামাজও পড়া হবে।
.
তৃতীয়ত, আরেক দল আলেম মনে করেন—তাঁকে গোসল দেওয়া হবে না; তবে জানাজার নামাজ আদায় করা হবে।
.
এই মতভেদের মূল কারণ হলো উহুদ যুদ্ধের শহীদদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন কি না—এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর মধ্যে আপাত বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। বিভিন্ন রেওয়ায়েতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব বর্ণনার মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোই জুমহুর ওলামায়ে কেরাম দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ রণাঙ্গনের শহীদকে গোসল দেওয়া হবে না এবং তাঁর জানাজার নামাজও আদায় করা হবে না। উদাহরণস্বরূপ; জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর হাদিস। যিনি বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদদের রক্তের সাথে দাফন করার নির্দেশ দিয়েছেন, গোসল দেওয়া উচিত নয়।”(সহীহ বুখারী, হা/ ১৩৪৬)
.
▪️যদি প্রশ্ন করা হয় শহীদদের কেন গোসল করানো হয় না?
.
এ বিষয়ে কথা হচ্ছে তাদেরকে গোসল করানো উচিত নয়,যাতে শাহাদাতের চিহ্ন তাদের শরীরে অটুট থাকে। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, কোন ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহত হলে এবং আল্লাহ্ই ভাল জানেন কে তাঁর পথে আহত হবে কিয়ামতের দিন সে তাজা রক্ত বর্ণে রঞ্জিত হয়ে আসবে এবং তা থেকে মিশ্কের সুগন্ধি ছড়াবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৮০৩ এবং সহীহ মুসলিম হা/১৮৭৬) অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ছা’লাবা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহুদের শহীদদের সম্পর্কে বলেছিলেন, তাদেরকে স্বীয় রক্তসহ ঢেকে দাও। কেননা যে কোন ক্ষত যা আল্লাহ্‌র রাস্তায় হয় কিয়ামতের দিন সেখান থেকে রক্ত প্রবাহিত হবে রং হবে রক্তের কিন্তু তাঁর সুগন্ধি হবে মিশ্‌কের সুগন্ধির ন্যায়।”(সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২০০২; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি সহীহ বলেছেন সহীহুল জামি’ হা/ ৩৫৭৩; আরও দেখুন: আল-মুগনি মা’আ আশ-শারহ আল-কবীর, ২/৩৩৩; আল-মাসওয়াতুল-ফিকহিয়্যাহ, ২৬/২৭৪)
.
আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে তা হল অপবিত্র অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শহীদদের গোসল সম্পর্কে আলেমদের মতামত কি?
.
যদি কোনো শহীদ যৌনকর্মের পর তীব্র (বড়) অপবিত্রতায় মারা যান, তাহলে তাকে গোসল দেওয়া উচিত কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, এমন শহীদকেও গোসল দেওয়া প্রয়োজন নেই। কারণ যে অবস্থায় শহীদ মারা যান, তা অপরিষ্কার বা অপবিত্র ব্যক্তির অবস্থার সঙ্গে কোনো বাস্তব পার্থক্য রাখে না। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে নিহত শহীদদের গোসল দেননি। তদুপরি, শাহাদাত নিজেই সকল পাপ এবং অপরিষ্কারতার কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়। কেউ যদি উদাহরণ হিসেবে বলেন যে হানযালা ইবনে আবি আমর (রাঃ)-কে গোসল দেওয়া হয়েছিল, এর জবাবে আলেমরা বলছেন, এটি ফেরেশতাদের মাধ্যমে ঘটেছিল। আর এমনটি সত্য হলেও, এটি প্রমাণ করে না যে শহীদকে মানুষ দ্বারা গোসল দেওয়া আবশ্যক। কারণ ফেরেশতাদের আচরণ আমাদের জন্য দৃশ্যমান নয়, এবং মানুষের বিধানকে ফেরেশতাদের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। হানযালা (রাঃ)-এর সঙ্গে যা ঘটেছিল তা শুধুই তাঁকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের ওপর কোনো শর্ত আরোপের জন্য নয়।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু উসাইমীন;আশ-শারহুল মুমতি’খন্ড; ৫; পৃষ্ঠা: ৩৬৫) তাছাড়া নাপাক অবস্থায় নিহত শহীদকে গোসল দেওয়া যদি ওয়াজিব হত, তাহলে ফেরেশতাদের জন্য গোসল দেওয়ায় সেই ওয়াজিব পূরন হতো না। বরং নবী (ﷺ) সাহাবীদেরকে আদেশ দিতেন মৃত শহীদকে গোসল দেওয়ার জন্য। কারণ মৃতকে গোসল দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ইবাদত পালন করা।”(দেখুন আহকামুল জানাইয পৃষ্ঠা ৫৬ এর টীকা)
.
প্রকৃত শহীদদের জানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কে আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে,وقد قال جمهور العلماء بأنه لا يُصلى عليه وهو قول الإمام مالك والشافعي وأصح الروايتين عن أحمد ( أنظر المغني 2/334 )؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يصل على شهداء أحد ( رواه البخاري 1347 ) ، ولأن الحكمة من الصلاة هي الشفاعة والشهيد يُكفر عنه كل شيء ( فلا يحتاج شفاعة ) إلا الدين فإنه لا يسقط بالشهادة بل يبقى في ذمة الميت “জমহুর আলেমের মত হলো শহীদের ওপর জানাযার নামাজ আদায় করা হয় না। এটাই ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদের দুই বর্ণনার মধ্যে সহিহ মত।(আল মুগনী ২/৩৩৪) এর কারণ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযার নামাজ আদায় করেননি। (সহিহ বুখারি ১৩৪৭) আর জানাযার নামাজের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃতের জন্য শাফাআত করা। কিন্তু শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাই তার জন্য শাফাআতের প্রয়োজন হয় না। তবে একটি বিষয় ব্যতিক্রম ঋণ, কারণ ঋণ শহীদ হওয়ার কারণে মাফ হয় না, বরং তা মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থেকেই যায়।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ২৭২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الشهداء الذين يموتون في المعركة لا تشرع الصلاة عليهم مطلقاً ولا يُغسلون ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يُصلِّ على شهداء أحد ولم يُغسلهم .. رواه البخاري في صحيحه (1347) عن جابر ابن عبد الله رضي الله عنهما “যেসব শহীদ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান, তাদের ওপর কোনো অবস্থাতেই জানাযার নামাজ পড়া বৈধ নয়, এবং তাদের গোসলও দেওয়া হয় না। কারণ নবী ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযার নামাজ পড়েননি এবং গোসলও দেননি।”(সহিহ বুখারি ১৩৪৭,মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:” ( الشهيد ) لا يصلي عليه أحدٌ من الناس لا الإمام ولا غير الإمام ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم : ” لم يصلِّ على شهداء أحد ” ، ولأن الحكمة من الصلاة الشفاعة ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم : ” ما من رجل مسلم يموت فيقوم على جنازته أربعون رجلاً لا يُشركون بالله شيئاً إلا شفعهم الله فيه ” والشهيد يُكفر عنه كل شيء إلا الدَّيْن ؛ لأن الدين لا يسقط بالشهادة بل يبقى في ذمة الميت في تركته إن خَلَّف تركة ، وإلا فإنه إذا أخذه يريد أداءه أدى الله عنه “যে ব্যক্তি শহীদ, তার ওপর ইমাম কিংবা অন্য কেউ কেউই জানাযার নামাজ পড়বে না। কারণ নবী ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযা পড়েননি। জানাযার নামাজের উদ্দেশ্য হলো শাফাআত। যেমন নবী ﷺ বলেছেন যদি কোনো মুসলিমের জানাযায় চল্লিশ জন এমন ব্যক্তি দাঁড়ায় যারা আল্লাহর সাথে শরিক করে না,তবে আল্লাহ তাদের শাফাআত কবুল করেন। কিন্তু শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, ঋণ ছাড়া। কারণ ঋণ শহীদ হওয়ার মাধ্যমেও মাফ হয় না। যদি মৃত ব্যক্তি সম্পদ রেখে যায়, তবে তা তার সম্পদ থেকে পরিশোধ করা হবে। আর যদি সম্পদ না থাকে এবং সে ঋণ নেওয়ার সময় পরিশোধের নিয়ত করে থাকে, তবে আল্লাহ নিজেই তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেবেন।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate