প্রশ্ন: শরিয়তের দৃষ্টিতে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁককে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার হুকুম কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর: শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে অসুস্থ রোগীর ওপর রুকিয়া করার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তেমন কোনো মতভেদ নেই। তবে রুকিয়াকে একমাত্র ও স্থায়ী অর্থ উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ কি না—এটি একটি মতভেদপূর্ণ বিষয়।একদল আলেম নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন।পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেমগণের মতে রুকিয়াকে স্থায়ী ও পেশাগত উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ নয়।কারণ এটি সালাফে সালেহীনের আমল ও অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদুপরি, প্রসিদ্ধ কোনো সালাফ থেকে রুকিয়াকে জীবিকা নির্বাহের স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায় না।আমরা দুই পক্ষের দলিলসমূহ পর্যালোচনা করব।
.
(১).যাঁরা রুকিয়াকে স্থায়ী আয়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা এবং রোগীর আরোগ্যের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণকে শর্তসাপেক্ষে বৈধ মনে করেন—তারা তাদের এ মতের পক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ও শর্ত উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—(১).তাকওয়া ও ইখলাস: রাকীর অন্তরে আল্লাহভীতি ও খাঁটি নিয়ত থাকতে হবে। তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য হবে রোগীর কল্যাণ ও উপকার সাধন—অর্থ উপার্জন যেন কখনোই মূল লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়। (২).শোষণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা: রোগীর অসহায়ত্ব, দুর্বলতা ও আরোগ্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের আর্থিক শোষণ বা সুযোগসন্ধানী আচরণ গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।(৩).যুক্তিসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ পারিশ্রমিক: নির্ধারিত পারিশ্রমিক হতে হবে ন্যায্য ও সংযত। তা যেন অতিরঞ্জিত, চাপিয়ে দেওয়া বা লোভপ্রসূত না হয়। (৪).মিথ্যা ও প্রতারণা পরিহার: নিজের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা রুকিয়ার প্রভাব সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবি, ভিত্তিহীন প্রচার কিংবা কোনো ধরনের প্রতারণামূলক আচরণ থেকে পুরোপুরি দূরে থাকতে হবে।
আর হাদিস থেকে দলিল হচ্ছে;আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃأَنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَتَوْا عَلٰى حَيٍّ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ فَلَمْ يَقْرُوهُمْ فَبَيْنَمَا هُمْ كَذ‘لِكَ إِذْ لُدِغَ سَيِّدُ أُولَئِكَ فَقَالُوا هَلْ مَعَكُمْ مِنْ دَوَاءٍ أَوْ رَاقٍ فَقَالُوا إِنَّكُمْ لَمْ تَقْرُونَا وَلاَ نَفْعَلُ حَتّٰى تَجْعَلُوا لَنَا جُعْلاً فَجَعَلُوا لَهُمْ قَطِيعًا مِنْ الشَّاءِ فَجَعَلَ يَقْرَأُ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَيَجْمَعُ بُزَاقَه“ وَيَتْفِلُ فَبَرَأَ فَأَتَوْا بِالشَّاءِ فَقَالُوا لاَ نَأْخُذُه“ حَتّٰى نَسْأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلُوه“ فَضَحِكَ وَقَالَ وَمَا أَدْرَاكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ خُذُوهَا وَاضْرِبُوا لِي بِسَهْمٍ”নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সাহাবীদের কতক সাহাবী আরবের এক গোত্রের নিকট আসলেন। গোত্রের লোকেরা তাঁদের কোন আতিথেয়তা করল না। তাঁরা সেখানে থাকতেই হঠাৎ সেই গোত্রের নেতাকে সর্প দংশন করলো। তখন তারা এসে বললঃ আপনাদের কাছে কি কোন ঔষধ আছে কিংবা আপনাদের মধ্যে ঝাড়-ফুঁককারী লোক আছেন কি? তাঁরা উত্তর দিলেনঃ হ্যা। তবে তোমরা আমাদের কোন আতিথেয়তা করোনি। কাজেই আমাদের জন্য কোন পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট না করা পর্যন্ত আমরা তা করবো না। ফলে তারা তাদের জন্য এক পাল বকরী পারিশ্রমিক দিতে রাযী হল। তখন একজন সাহাবী উম্মুল কুরআন (সূরা আল-ফাতিহা) পড়তে লাগলেন এবং মুখে থুথু জমা করে সে ব্যক্তির গায়ে ছিটিয়ে দিলেন। ফলে সে রোগমুক্ত হল। এরপর তাঁরা বকরীগুলো নিয়ে এসে বলল, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করার পূর্বে এটি স্পর্শ করব না। এরপর তাঁরা এ বিষয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে জিজ্ঞেস করলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনে হেসে দিলেন এবং বললেনঃ তোমরা কীভাবে জানলে যে, এটি রোগ সারায়? ঠিক আছে বক্রীগুলো নিয়ে যাও এবং তাতে আমার জন্যও এক ভাগ রেখে দিও।”(সহীহ বুখারী হা/৫৭৫৬)। উক্ত হাদীসের আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, هَذَا تَصْرِيح بِجَوَازِ أَخْذ الْأُجْرَة عَلَى الرُّقْيَة بِالْفَاتِحَةِ وَالذِّكْر , وَأَنَّهَا حَلَال لَا كَرَاهَة فِيهَا সূরা ফাতিহা এবং অন্যান্য দুয়ার মাধ্যমে রুকিয়াহ করার জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া অর্থাৎ অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ। এটা হালাল; মাকরুহ নয়।”(নববী শরহে সহিহ মুসলিম; খন্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন; لَا بَأْسَ بِجَوَازِ أَخْذِ الْأُجْرَةِ عَلَى الرُّقْيَةِ ، وَنَصَّ عَلَيْهِ أَحْمَدُ রুকিয়াহ করার জন্য অর্থ গ্রহণ করাতে কোন সমস্যা নেই অর্থাৎ জায়েজ। এ বিষয়ে ইমাম আহমাদের নস রয়েছে। (ইবনে তাইমিয়া ফাতাওয়া আল-কুবরা; খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪০৫ )
.
রুহায়বানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন; وَلَا يَحْرُمُ أَخْذُ الْأُجْرَةِ عَلَى رُقْيَةٍ , نَصَّ عَلَيْهِ الْإِمَامُ أَحْمَدُ رحمه الله تعالى , وَاخْتَارَ جَوَازَهُ ، وَقَالَ : لَا بَأْسَ بِهِ ، لِحَدِيثِ أَبِي سَعِيدٍ রুকিয়াহ করার জন্য অর্থ নেওয়া হারাম নয়। এ বিষয়ে ইমাম আহমদের নস রয়েছে। তিনি এটাকে জায়েজ বলে মন্তব্য করেছেন এবং আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন এটা অর্থাৎ অর্থ নেওয়াতে কোনো দোষ নেই।”(মাতালিব আওলান নাহি; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬৩৯)
.
এছাড়াও ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘ইজারা’ (ভাড়া/মজুরি) অধ্যায়ে একটি শিরোনাম রেখেছেন: باب ما يعطى في الرقية على أحياء العرب بفاتحة الكتاب “সূরা ফাতিহা দ্বারা আরবের লোকদের চিকিৎসা করার বিনিময়ে কী দেওয়া যাবে সে সম্পর্কে অধ্যায়।” এবং তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যে,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মজুরী গ্রহন করো এমন সব বস্তুর মধ্যে কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহন করা সর্বাপেক্ষা বেশী হকদার”।(বুলুগুল মারাম, হা/৯১২; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬০১৬২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: এক ব্যক্তি কুরআন ও নববি দুআ দিয়ে রোগীর ওপর পড়ে, কিন্তু পড়ার আগেই নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক ঠিক করে এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:لا بأس بذلك إذا كان يقرأ ما تيسر من القرآن، ويدعو لهم بالدعوات، وينفث على المريض، لا بأس أن يحدد الأجر الذي له. كما وقع لبعض الصحابة مع لديغ لدغ، وكانوا نزلوا بهم، ولم يضيفوهم، فجاءوا إليهم يطلبون من يرقي ليرقي هذا المريض، فقالوا: إلا أن تضربوا لنا سهمًا، فضربوا لهم شيئًا قطيعًا من الغنم، فرقوه حتى عافاه الله، وسلموا لهم نفس الأجرة، وبلغوا النبي ﷺ فأقرهم على ذلك.”যদি সে কুরআন থেকে যা সহজ হয় তা পড়ে, দুআ করে এবং রোগীর ওপর ফুঁ দেয় তাহলে পারিশ্রমিক নির্ধারণে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সাহাবিদের যুগে এমন ঘটনা ঘটেছে এক গোত্রের নেতা সাপে দংশিত হয়েছিল। সাহাবিরা তাদের অতিথি ছিল, কিন্তু তারা মেহমানদারি করেনি। পরে তারা এসে রুকইয়ার অনুরোধ করলে সাহাবিরা বলেন আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে। তারা কিছু ছাগল নির্ধারণ করল। ফাতিহা পড়ে রুকইয়া করা হলো লোকটি সুস্থ হয়ে গেল। এ বিষয়টি নবী সা. এর কাছে জানানো হলে তিনি তা অনুমোদন করেন।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৩৬২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] প্রথমদিকে রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহন করা ঠিক নয় বললেও (ভিডিও: https://youtu.be/VkP96R4OaRk) পরবর্তীতে আরেক ফাতওয়ায় বলেন:যদি তিনি (রুকইয়াহকারী) বিশ্বস্ত হন এবং শুদ্ধ ও যথাযথভাবে রুকইয়াহ করতে সক্ষম হন—অর্থাৎ রুকইয়াহর বিধানসমূহ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী হন—তবে তার জন্য রুকইয়াহর কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা বৈধ। এতে শরীয়তের কোনো আপত্তি নেই। কেননা এর মাধ্যমে তিনি মানুষের উপকার সাধন করছেন।আর তিনি তার সময় ব্যয় করা এবং এ কাজের কারণে অন্য পেশা ত্যাগ করার বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারেন—এতে কোনো অসুবিধা নেই.কারণ এতে মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।” (উক্ত ফতোয়ার অফিসিয়াল ইউটিউব লিংক- https://youtu.be/yYP_Rjji9CQ)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন; قَالَ ابْنُ أَبِي مُوسَى : لَا بَأْسَ بِمُشَارَطَةِ الطَّبِيبِ عَلَى الْبُرْءِ ; لِأَنَّ أَبَا سَعِيدٍ حِينَ رَقَى الرَّجُلَ , شَارَطَهُ عَلَى الْبُرْءِ ، وَالصَّحِيحُ إنْ شَاءَ اللَّهُ أَنَّ هَذَا يَجُوزُ , لَكِنْ يَكُونُ جَعَالَةً لَا إجَارَةً , فَإِنَّ الْإِجَارَةَ لَا بُدَّ فِيهَا مِنْ مُدَّةٍ , أَوْ عَمَلٍ مَعْلُومٍ , فَأَمَّا الْجَعَالَةُ , فَتَجُوزُ عَلَى عَمَلٍ مَجْهُولٍ , كَرَدِّ اللُّقَطَةِ وَالْآبِقِ , وَحَدِيثُ أَبِي سَعِيدٍ فِي الرُّقْيَةِ إنَّمَا كَانَ جَعَالَةً , فَيَجُوزُ هَاهُنَا مِثْلُهُ ইবনে আবু মুসা বলেছেন, সুস্থ হওয়ার বিষয়ে ডাক্তারের সাথে চুক্তি করাতে কোন ক্ষতি নেই। কারণ আবু সাঈদ খুদরি (রা:) যখন লোকটির উপর রুকিয়াহ করেছিলেন, তখন তিনি তাকে শর্ত দিয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ এটা করাতে কোনো সমস্যা নাই। এটা পারিশ্রমিক হবে কিন্তু ইজারা হবে না। কারণ ইজারাটির মাঝে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সময়কাল এবং নির্দিষ্ট কাজ হতে হবে৷ আর পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের জন্য অনির্দিষ্ট কাজ হয়ে থাকে। আবু সাঈদ খুদরি (রা:)-এর রুকিয়াহর ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক বা পুরস্কার ছিল ফলে এটা জায়েজ। (ইবনে কুদামাহ আল মুগনী; খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩১৪; হাশিয়াতুশ সাবী; খন্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৯৮)
.
অপরদিকে যদি ডাক্তার সুস্থ হওয়ার শর্ত দেয়, তাহলে সুস্থ না হলে অর্থ গ্রহণ করা তার জন্য উচিত নয়। এই মর্মে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)বলেন; إذَا جَعَلَ لِلطَّبِيبِ جُعْلًا عَلَى شِفَاءِ الْمَرِيضِ جَازَ كَمَا أَخَذَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الَّذِينَ جُعِلَ لَهُمْ قَطِيعٌ عَلَى شِفَاءِ سَيِّدِ الْحَيِّ ، فَرَقَاهُ بَعْضُهُمْ حَتَّى بَرِئَ فَأَخَذُوا الْقَطِيعَ ؛ فَإِنَّ الْجُعْلَ كَانَ عَلَى الشِّفَاءِ لَا عَلَى الْقِرَاءَةِ অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হয়ে যাওয়ার উপর ভিত্তি করে ডাক্তারকে পুরস্কার বা হাদিয়া দেওয়া বা গ্রহণ করা জায়েজ যেমনভাবে সাহাবীরা গ্রহণ করেছিলেন। যারা গোত্রের নেতাকে সুস্থ করার কারণে তাদেরকে একটি ছাগলের পাল দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা সুস্থ হওয়ার জন্য এই পুরস্কারটি নিয়েছিলেন কিন্তু সূরা ফাতিহা বা অন্যান্য দোয়া পাঠ করার জন্য নেননি। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খন্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৫০৭ )
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.] বলেন; لا مانع من أخذ الأجرة على الرقية الشرعية بشرط البراءة من المرض وزوال أثره অসুস্থ থেকে সুস্থ হওয়া বা না হওয়ার শর্তে শরয়ী রুকইয়াহর জন্য অর্থ নিতে কোন আপত্তি নেই।
.
সুতরাং উক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রুকিয়ার জন্য অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন দোষ নেই। এর দুটি রূপ রয়েছে। (১). প্রথমত: এটি একটি হাদিয়া/পারিশ্রমিক। রোগী সুস্থ হোক আর নাই হোক যে রুকিয়াহ করবে তাকে তার মজুরি দিতে হবে। উভয়ে মিলে সমাধান করে।(অর্থাৎ তারা উভয় যে বিষয়ে সম্মত হবে) তাকে তা কাজের আগে কিংবা পরে দেওয়া যাবে। (২). দ্বিতীয়ত: এটা একটা পুরষ্কার। যা রোগী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার পারিশ্রমিক গ্রহণ করা উচিত নয়।
.
(২).অপরদিকে যারা রুকইয়াকে একমাত্র ও স্থায়ী জীবিকা হিসেবে গ্রহণের বিরোধিতা করেন, তাদের যুক্তি হলো—মূলনীতি হচ্ছে, রুকইয়া শরিয়তসম্মত ও অনুমোদিত একটি আমল। এটি মূলত দোয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা ইবাদতেরই একটি শাখা এবং যার প্রতি শরিয়ত আমাদের উৎসাহিত করেছে। অতএব, রুকইয়াকে পূর্ণাঙ্গ পেশায় পরিণত করা—বিনিময় গ্রহণ করা হোক বা না হোক—এর দৃষ্টান্ত সালাফে সালেহীনদের যুগে পাওয়া যায় না। তারা নিজেরা রুকইয়া করতেন, অন্যের জন্য রুকইয়া করতেন এবং প্রয়োজনে অন্যদেরকেও রুকইয়া করার অনুমতি দিতেন।কিন্তু রুকইয়াকে এমন একটি পেশা বানানো, যার জন্য কেউ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করে নেয় এবং একে স্থায়ী আয়ের মাধ্যম বানিয়ে ফেলে—এমন দৃষ্টান্ত তাদের কর্মপদ্ধতিতে বিদ্যমান নয়।তাছাড়া যদি কেউ রুকিয়াকে স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করে এবং মূল উদ্দেশ্য হয় শুধু অর্থ উপার্জন, তবে তা ঝাড়ফুঁকের বরকত নষ্ট করে দেয় এবং ব্যক্তিকে দুনিয়ার দাসে পরিণত করে—টাকা পেলে খুশি, না পেলে অসন্তুষ্ট। তাই যারা রুকিয়ায় নিয়োজিত, তাদের উচিত নিয়ত খাঁটি রাখা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ দান করলে গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু কাউকে জোর করে দিতে বলা উচিত নয়। এভাবেই বরকত ও সৎ উদ্দেশ্য দুটোই রক্ষা পায়। উদাহরণস্বরূপ;শাইখ নাসির ইবনে আবদুল কারীম আল-আকল,ইমাম আলবানী,শাইখ রাবী আল মাদখালী এবং শাইখ আব্দুর রহমান আল-বাররাক সকলেই উল্লেখ করেছেন যে, সালাফে সালেহীনদের কেউই রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতেন না। তারা নিজেরা রুকইয়া করতেন, অন্যদের সাহায্য করতেন, কিন্তু এটি কখনো তাদের পেশা ছিল না।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: রোগীদের ওপর কুরআন পড়ার জন্য নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা এবং এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বলেন:أقول: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته. التفرغ للقراءة على المرضى من الخير والإحسان، إذا قصد الإنسان بذلك وجه الله عز وجل، ونفع عباد الله، وتوجيههم إلى الرقى الشرعية التي جاءت في كتاب الله وفي سنة رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم. وأما اتخاذ ذلك لجمع الأموال فإن هذه النية تنزع البركة من القراءة، وتوجب أن يكون القارىء عبداً للدنيا: إن أعطي رضي، وإن لم يعط سخط. لذلك أنصح إخواني الذين يتفرغون للقراءة على المرضى أن يخلصوا النية لله عز وجل، وألا يكون همهم المال، بل إن أعطوا أخذوا، وإن لم يعطوا لم يطلبوا، وبذلك تحصل البركة في قراءتهم على إخوانهم، هذا ما أقوله لإخواني القراء.”আমি বলছি আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।রোগীদের ওপর কুরআন পড়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করা কল্যাণ ও উপকারের কাজ যদি মানুষ এতে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করে, তাঁর বান্দাদের উপকার করার উদ্দেশ্য রাখে এবং তাদের কুরআন ও রাসূল সা. এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত শরয়ি রুকইয়ার দিকে পথনির্দেশ করে। কিন্তু যদি এর উদ্দেশ্য হয় অর্থ উপার্জন, তাহলে এই নিয়ত কুরআন পড়ার বরকত কেড়ে নেয় এবং পাঠককে দুনিয়ার গোলামে পরিণত করে পেলে খুশি হয়, না পেলে অসন্তুষ্ট হয়। এ কারণে আমি আমার সেই ভাইদের উপদেশ দিচ্ছি, যারা রোগীদের ওপর রুকইয়া পড়েন তারা যেন আল্লাহর জন্য নিয়ত খাঁটি করেন, অর্থ যেন তাদের মূল লক্ষ্য না হয়। দেওয়া হলে গ্রহণ করবে, না দিলে চাইবে না। এতে তাদের পাঠে বরকত হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই আমি আমার কুরআন পাঠক ভাইদের উদ্দেশ্যে বলছি।”(ইবনু উসাইমীন,ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, ২/৪)
.
শাইখ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল:বর্তমানে কিছু পাঠক রুকইয়াকে বিশেষ পেশা বানিয়ে ফেলেছে কেউ ক্লিনিক খুলেছে, কেউ নিজের বাড়িতে রোগী দেখে। এর হুকুম কী?
তিনি বলেন:نفع الناس طيب، ولكن ليس بهذا التوسع وبهذا الابتذال الذي قد حصل، فهذا التوسع غير جيد، حتى أن بعضهم بسبب كثرة المتعالجين عنده يقرأ على عدة أشخاص! فهذا لا وجه له، وكونه يبيع الماء المرقي هذا توسع غير جيد.”মানুষের উপকার করা (নিঃসন্দেহে) ভালো কাজ, তবে বর্তমানে যে ধরণের ব্যাপকতা এবং অপকৌশল (বা সস্তা জনপ্রিয়তা) লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা কাম্য নয়। এই অতি-বিস্তার মোটেই ভালো কিছু নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রোগীর ভিড় বেশি হওয়ার কারণে কেউ কেউ একসাথে অনেক ব্যক্তির ওপর (ঝাড়ফুঁক বা দোয়া) পড়ে থাকেন! এর কোনো শার’ঈ ভিত্তি নেই। এছাড়া রুকইয়াহ-পঠিত পানি বিক্রি করা এটাও অনুচিত ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত।”(শরহু সুনান আবি দাউদ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৯১)
.
শাইখ মুহাম্মাদ বিন হাদি আল মাদখালি (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছেন—এটা কি সঠিক যে, যিনি জাদুগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করেন, তিনি কি জীনদের দ্বারা আক্রান্ত বা শত্রুতার শিকার হন? শাইখ উত্তরে বলেন:قد يناله شيءٌ من هذا، ولكن لا يضرّه إذا كان متحصِّنًا – بفضل الله ورحمته- بالأذكار الشرعية والأوراد الشرعية من الآيات القرآنية والأحاديث النبوية لا يضرّونه أبدًا، وعمله هذا من العمل الصالح الذي فيه النفع لإخوانه المسلمين ما دام يُحسن الرقية الشرعية، وهو مِمَّن يقوم بها ويُرجى فيه الخير والصلاح ونفع النَّاس، فينبغي أن يستمر في هذا العمل، ولكن لا يتَّخذه مهنةً وتجارةً مثل ما نراه الآن على السَّاحة، وإنّما ينفع إخوانه، فإن أُعطيَ شيئًا أخذ؛ لا بأس، أمَّا أن يجعل الرُّقى؛ القارورة المقروء عليها بالماء الفلاني بكذا، واللي بالزّيت الفلاني بكذا، والقراءة بالساعة كذا، كما يبلغنا عن بعض هؤلاء القرّاء، فهؤلاء في الحقيقة ما هم قرّاء وإنّما هم متأكِّلون، فليُحذر من مثل هؤلاء.”হ্যাঁ,কখনো কখনো তার ওপর কিছু প্রভাব (আক্রমণ বা শত্রুতা) পড়তে পারে। তবে তিনি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে কুরআনের আয়াত ও নববি যিকির আযকার দ্বারা সুরক্ষিত থাকে তাহলে জিনেরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি সঠিকভাবে শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করবেন এবং তিনি নেককার ও মানুষের উপকারে আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকবেন, ততক্ষণ তাঁর এই কাজটি একটি নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে—যার মাধ্যমে তিনি তাঁর মুসলিম ভাইদের উপকার করছেন। সুতরাং তাঁর এই কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত।তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন তিনি এটাকে বর্তমান সময়ের মতো পেশা বা ব্যবসায় পরিণত না করেন। বরং তিনি তাঁর ভাইদের উপকার করবেন; এমতাবস্থায় তাকে যদি কিছু (পারিশ্রমিক) দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ঝাড়ফুঁককে এভাবে গ্রহণ করা যে—অমুক পানির বোতলে ফু দিলে এত টাকা, অমুক তেলের বোতলে ফু দিলে এত টাকা, কিংবা প্রতি ঘণ্টা পড়ার জন্য এত টাকা—যেমনটা আমরা অনেক পাঠকদের (রাক্বী) সম্পর্কে শুনে থাকি; এরা আসলে প্রকৃত পাঠক বা রুকইয়াহকারী নয়, বরং এরা দ্বীনকে উপার্জনের মাধ্যম বানিয়েছে। এদের থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।”(https://ruqya.net/forum/showthread.php?t=64628)
.
সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সাবেক প্রধান মুফতি প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)- জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: কিছু মানুষ ‘রুকইয়াহ শরইয়াহ’কে (ঝাড়ফুঁক) পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এর বিনিময়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছেন। এই বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা কী?
উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;”মূলনীতি অনুযায়ী, রুকিয়াহ-এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ সুন্নাহর দ্বারা বৈধ।এর প্রমাণ হলো সেই গোত্রপতির ঘটনা যাকে বিচ্ছু দংশন করেছিল এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাকে রুকিয়াহ করেছিলেন।অতঃপর তিনি পুরো হাদিসটি উল্লেখ করেন এবং শেষে বলেন;فلا مانع أن يأخذ الراقي أجرًا على رقيته هذه، لا مانع منه، لكنني أنصح أولئك الذين امتهنوا الرقية أن يتقوا الله في أنفسهم، وألا يستغلوا ضعف المريض وعجزه؛ فإن المريض يتطلع إلى العلاج بكل وسيلة، وربما استعملوا أكاذيب وأشياء لا حقائق لها ليظهروا أنهم مهرة في رقيتهم، وأنهم حذاق في هذا الأمر، فليتق الله أولئك الراقون، وليراقبوا الله، وليبتعدوا عن الكذب والدجل، وليكن همهم منفعة المريض، ولا شك أن الأخذ أخذ الأجرة جائز لهم، ولكن لتكن هذه الأجرة بالمعقول، ولا تكن استغلالية ولا انتهازية، فليتقوا الله في أمورهم.অতএব,একজন রুকিয়াহকারী তার কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিলে তাতে কোনো বাধা নেই।কিন্তু আমি ঐ সমস্ত লোকদের উপদেশ দিচ্ছি যারা রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে,তারা যেন নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং রোগীর দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো থেকে বিরত থাকে।কেননা একজন রোগী যেকোনো উপায়েই আরোগ্য লাভের আশায় থাকে।অনেক সময় তারা (ঝাড়ফুঁককারীরা) নিজেদের রুকিয়ায় অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন বিষয়ের আশ্রয় নিয়ে থাকেন।অতএব, ঐ সমস্ত রাকীগণ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুক, আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থাকুক, মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকুক এবং তাদের লক্ষ্য হোক রোগীর উপকার করা। নিঃসন্দেহে তাদের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ জায়েয।তবে এই পারিশ্রমিক যেন হয় যুক্তিসঙ্গত, শোষণমূলক বা সুযোগসন্ধানী যেন না হয়। অতএব, তারা যেন তাদের যাবতীয় কাজকর্মে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে।”(আল-জাজিরাহ পত্রিকা, সংখ্যা-১০০৯৭; কলাম; ফাসআলু আহলায যিকর)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমাদের দেশে এক ব্যক্তি মানুষের উপর ঝাড়ফুঁক করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেন এবং ঝাড়ফুঁকের জন্য তেল ও পানি দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন, এবং তিনি এ ছাড়া অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।তাহলে ঝাড়ফুঁককে পেশা হিসেবে গ্রহণের হুকুম কী? এবং সালাফদের যুগে এর কোন ভিত্তি আছে কি?
জবাবে শাইখ বলেন:هذا يستدلُّونَ بقصةِ الصَّحابة الذين رقَى أحدُهم سيِّدَ أولئك القوم، رقاهُ بالفاتحة فشُفِيَ فأعطَوهم قطيعًا مِن الغنم، فأقرَّهُم الرَّسول وقال: (إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ)، فأُخِذَ مِن هذا جوازُ أَخْذِ الأجرِ على الرُّقية، لكن لم يكن مِن عادة السَّلَفِ اتخاذُ ذلك حِرْفَةً كما يفعلُ النَّاس اليوم، لكن لو إنسان رقى إنسانًا أعطاه مالًا فلا حرجَ عليه أن يأخذَ، أمَّا أن يكون ذلك حِرفة فهذا غيرُ معروفٍ في ما علمتُ في تاريخ المسلمين. “এ বিষয়ে তারা (দলিল হিসেবে) সেই সাহাবীদের ঘটনাটি পেশ করেন, যাঁদের মধ্যে একজন গোত্রের প্রধানকে ‘সুরা ফাতিহা’ পড়ে ঝাড়ফুঁক (রুকিয়া) করেছিলেন। এতে তিনি সুস্থ হয়ে যান এবং তারা সাহাবীদের একপাল (বকরি) ছাগল উপহার দেয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সমর্থন করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “নিশ্চয়ই তোমরা মজুরী গ্রহন করো এমন সব বস্তুর মধ্যে কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহন করা সর্বাপেক্ষা বেশী হকদার”।(বুলুগুল মারাম, হা/৯১২) এ (হাদিস) থেকে ঝাড়ফুঁকের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার বৈধতা পাওয়া যায়।কিন্তু সালাফদের যুগে এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার প্রচলন ছিল না,যেমনটি মানুষ আজ করে থাকে। তবে কেউ যদি কাউকে ঝাড়ফুঁক করে এবং বিনিময়ে তাকে কিছু টাকা দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করায় কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এটাকে নিয়মিত পেশা হিসেবে গ্রহণ করা—আমার জানা মতে মুসলিম ইতিহাসে এমনটি পরিচিত ছিল না।”(https://sh-albarrak.com/article/১৭৯৩৪)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ইয়া শাইখানা! জিনগ্রস্ত রোগীদের ওপর কুরআন পড়ে ফুঁ দেয়াকে কি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা জায়েজ? আর রুগীর শরীর থেকে জ্বিন বের করা কি জায়েয? এমন প্রশ্নের উত্তরে দীর্ঘ আলোচনা করে বলেন:
“কিন্তু বর্তমানে যেসব তথাকথিত পেশাদার রুকিয়াকারীদের কাছে দীর্ঘ কথোপকথন, বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ, নানা প্রশ্নোত্তর ও বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়—এ ধরনের কোনো পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত নয়। সুতরাং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, রুকিয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার যে প্রচলন আজ দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত নয়—না সরাসরি, না পরোক্ষভাবে, এমনকি কাছাকাছি অর্থেও নয়।বরং আমি এটিকে বিদ‘আত (নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়)-এর অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য করি। কারণ যারা এ পেশায় নিয়োজিত, তাদের মধ্যে যারা নিজেদের সৎ বলে দাবি করে, তারা বলে: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াবের আশায় এটি করি।” আর অন্যরা স্পষ্টতই দুনিয়াবী স্বার্থ ও আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই এ কাজে লিপ্ত।রুকিয়াকে পেশা বানিয়ে নেওয়া সেই সব নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:“তোমরা নতুন সৃষ্ট বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো। কেননা প্রতিটি নতুন সৃষ্ট বিষয়ই বিদ‘আত, প্রতিটি বিদ‘আতই গোমরাহি, আর প্রতিটি গোমরাহির পরিণাম জাহান্নাম।”এমনকি এক পর্যায়ে প্রশ্নকারী, শাইখকে আরও জিজ্ঞেস করেছিলেন; হে আমাদের শাইখ, রুকিয়া শুরুর আগেই যদি চুক্তি বা দামাদামি করা হয়?! শাইখ: সেটা কেমন? প্রশ্নকারী: অর্থাৎ রোগী দেখার আগেই যদি চুক্তিবদ্ধ হয়। অন্য একজন প্রশ্নকারী: মানে যদি শর্তারোপ করে!প্রশ্নকারী: যেমন—বলল যে ৫০ দিনার দিতে হবে।
শাইখ: না না, এমনটা করা উচিত নয়।প্রশ্নকারী: হে শেখ, এই উপার্জনকে কি ‘সুহত’ বা হারাম মাল বলা হবে?শাইখ: কী বললে? প্রশ্নকারী: এটাকে কি হারাম মাল (সুহত) গণ্য করা হবে? শাইখ: না।”(উৎস: সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ১৯৩ নং অডিয়ো ক্লিপ)
.
পরিশেষে, উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়—অসুস্থ রোগীর রুকিয়া করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা বৈধ কিন্তু সালাফে সালেহীনদের যুগে রুকিয়াহ কখনোই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়ী পেশা ছিল না। অথচ আজ এ বরকতময় ইবাদতকে অনেক ক্ষেত্রে পেশায় পরিণত করে দুর্বল, অসচেতন ও অসহায় মানুষদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে শোষণ করা হচ্ছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। রুকিয়াহ মূলত মানুষের কষ্ট লাঘবের পাশাপাশি অন্তরকে আল্লামুল গায়ূব—অদৃশ্যের পরিপূর্ণ জ্ঞাতা মহান আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করার একটি শরঈ মাধ্যম। এর মৌলিক শর্ত হলো—রুকিয়াহর ওপর নির্ভরতা নয়; বরং রুকিয়াহর বিধানদাতা মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা। সুতরাং, রুকিয়াহকে উপার্জনের পেশা বানানো উচিত নয়; কেননা এতে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও বরকত নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রকৃত রাকী কখনো নিজেকে কোনো ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন না; বরং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—আরোগ্য একমাত্র আল্লাহ তাআলাই দান করেন।নির্দিষ্ট সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া কিংবা পারিশ্রমিক ও উপহারের শর্ত আরোপ করা আল্লাহর বিধানের প্রতি স্পষ্ট বেয়াদবি ও আত্মিক ধৃষ্টতা। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—লোভ, প্রতারণা ও দুনিয়ালোভে জড়িত ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
No comments:
Post a Comment