Thursday, January 8, 2026

মহিলাদের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ এবং জানাজার অনুগমনে করবস্থান পর্যন্ত যাওয়ার বিধান

 একজন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে তার জানাজা ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করা মুসলিমদের জন্য ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলিম এটি সম্পন্ন করলে সকলের পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে।

আর এতে বিশাল সওয়াব রয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
« مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّىَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ » . قِيلَ وَمَا الْقِيرَاطَانِ قَالَ « مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ »
“যে ব্যক্তি জানাজার সালাতে উপস্থিত হবে তার জন্য রয়েছে এক কীরাত সমপরিমাণ সওয়াব আর যে দাফনেও উপস্থিত হবে তার জন্য দু কীরাত সমপরিমাণ সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, কিরাত কী? তিনি বললেন: দুটি বড় বড় পাহাড় সমপরিমাণ।“ [বুখারি ও মুসলিম]
❑ পুরুষ-নারী সকলের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। তবে মহিলাদের জন্য দূরবর্তী স্থানে না যাওয়াই উত্তম:
ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষ-নারী সকলের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণ এবং মহিলা সাহাবিগণ পড়েছেন বলে হাদিসে প্রমাণিত। বর্তমান যুগেও মক্কা-মদিনায় প্রতি দিন প্রায় ৫ ওয়াক্ত নামাজ শেষে নারী-পুরুষ সহ সকলেই জানাজার সালাত আদায় করে। পৃথিবীর সর্বত্র একই বিধান। সুতরাং যদি বাড়ির আশেপাশে মসজিদ বা মসজিদের বর্হিঃচত্বরে, খোলা মাঠে, স্থানীয় ইদগাহ ময়দানে জানাজার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং পর্দার সাথে মহিলাদের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকে তাহলে তাতে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারে। তবে শর্ত হল, তারা পর্দা লঙ্ঘন করা, পরপুরুষের ভিড়ে প্রবেশ করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, বিলাপ বা চিৎকার করে কান্নাকাটি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকবে এবং এমন কোনও আচরণ করবে না যা ফিতনার কারণ হয়। তবে জানাজার জন্য দূরে কোথাও না যাওয়াই ভালো। কারণ মনে রাখতে হবে, নারীদের জন্য ফরজ সালাতও তার নিজ গৃহে পড়া উত্তম। এমনকি দু হারাম তথা কাবা শরিফ ও মসজিদে নব্বীর থেকেও। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম আহমদ (রহ.) উম্মে হুমাইদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন:
يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أُحِبُّ الصَّلَاةَ مَعَكَ. قَالَ: “قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي، وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي دَارِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِي
“হে আল্লাহর রসুল! আমি আপনার সাথে নামাজ পড়তে ভালোবাসি।”
তিনি বললেন: ‘আমি জানি যে তুমি আমার সাথে নামাজ পড়তে ভালোবাসো। তবে তোমার ঘরের ভেতরের অংশে (অন্তঃপুরে) নামাজ পড়া তোমার কামরায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। তোমার কামরায় নামাজ পড়া তোমার বাড়ির আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। তোমার বাড়ির আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার গোত্রের মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। আর তোমার গোত্রের মসজিদে নামাজ পড়া আমার মসজিদে (মসজিদে নববী) নামাজ পড়ার চেয়েও উত্তম।’
ইবনুল মুনজির (রহ.) ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে এই হাদিসের কিছু অংশ বর্ণনা করেছেন এবং এরপর বলেছেন:
“فَإِذَا كَانَ هَذَا سَبِيلَهَا فِي الصَّلَاةِ، وَقَدْ أُمِرْنَ بِالسِّتْرِ، فَالْقُعُودُ عَنِ الْجَنَائِزِ أَوْلَى بِهِنَّ وَأَسْتَرُ.”
“সাধারণ নামাজের ক্ষেত্রে যদি নারীদে অবস্থা এই হয়—যেখানে তাদের পর্দার মধ্যে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তবে জানাজায় শরিক না হওয়া তাদের জন্য আরও বেশি উপযুক্ত এবং অধিকতর পর্দা রক্ষাকারী’।”
তাই জানাজার মত ফরজে কেফায়া সালাতে অংশ গ্রহণ করার জন্য দূরবর্তী স্থানে তাদেরকে যাওয়ার জন্য মহিলাদেরকে উৎসাহিত করা ঠিক নয়। তবে বাড়ির আশেপাশে উপরোক্ত শর্ত সাপেক্ষে অংশ গ্রহণ করতে পারে।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায:
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি এবং বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে এক নারী নারীদের জন্য জানাজার নামাজে অংশ গ্রহণের হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,
الصلاة على الجنازة مشروعة للجميع للرجال والنساء، تصلي على الجنازة في البيت أو في المسجد، كل ذلك لا بأس به، وقد صلت عائشة والنساء على سعد بن أبي وقاص لما توفي.
فالمقصود: أن الصلاة على الجنائز مشروعة للجميع، وإنما المنهي عنه ذهابها للقبور، اتباع الجنائز إلى المقبرة، وزيارة القبور، أما صلاتها على الميت في مسجد أو في مصلى أو في بيت أهله فلا بأس بذلك
“জানাজার নামাজ পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই শরিয়ত সম্মত। আপনি বাড়িতে বা মসজিদে যেকোনো স্থানে জানাজার নামাজ আদায় করতে পারেন। এতে কোনও অসুবিধা নেই। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) এবং অন্যান্য নারীরা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন।
মোটকথা, জানাজার নামাজ সবার জন্য শরিয়ত সম্মত। তবে নারীদের জন্য যা নিষিদ্ধ হল, মৃত লাশের পেছনে পেছনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া এবং কবর জিয়ারত করা। (অবশ্য এ ব্যাপারেও দ্বিমত আছে-অনুবাদক)
কিন্তু কোনও নারী যদি মসজিদে, ঈদগাহে বা মৃতের পরিবারের ঘরে জানাজার নামাজ আদায় করেন তবে তাতে কোনও সমস্যা নেই।”
✪ তিনি আরও বলেন,
“জানাজার নামাজ পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই শরিয়ত সম্মত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“من شهد الجنازة حتى يصلى عليها، فله قيراط، ومن شهدها حتى تدفن، فله قيراطان، قيل يا رسول الله: وما القيراطان؟ قال: مثل الجبلين العظيمين”
“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য এক কীরাত পরিমাণ সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য দু কীরাত পরিমাণ সওয়াব রয়েছে। প্রশ্ন করা হল, “ইয়া রসুলুল্লাহ, দু কীরাত কী?” তিনি বললেন, “দুটি বিশাল পাহাড়ের মতো।” [সহিহ বুখারি, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ১৩২৫; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ৯৪৫]
তবে নারীদের জন্য কবরস্থান পর্যন্ত জানাজা অনুসরণ করে যাওয়া অনুমোদিত নয়। কারণ তাদেরকে এটি থেকে নিষেধ করা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম-এ বর্ণিত উম্মে আতিয়্যাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন:
نُهِينَا عَنْ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ وَلَمْ يُعْزَمْ عَلَيْنَا
“আমাদেরকে (নারীদেরকে) জানাজার অনুগমন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এতে কঠোরতা করা হয়নি।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ১২৭৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ৯৩৮]
কিন্তু মৃতের জানাজার নামাজ আদায় করা থেকে নারীদের নিষেধ করা হয়নি। এই নামাজ মসজিদে হোক, বাড়িতে হোক বা ঈদগাহে হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মসজিদে তাঁর জীবদ্দশাতে এবং তাঁর পরে নারীরা জানাজার নামাজ আদায় করতেন। আর কবর জিয়ারতের বিষয়টিও শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। ঠিক যেমন কবরস্থান পর্যন্ত জানাজা অনুসরণ করা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর জিয়ারতকারী নারীদেরকে অভিশাপ (লানত) দিয়েছেন।” [মাজমূ’ ফাতাওয়া ইবনে বায (১৩/১৩৪)]
❑ মহিলাদের জানাজার অনুগমনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া:
পর্বোক্ত উম্মে আতিয়্যাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কর্তৃক বর্ণিত হাদিস-যেখানে বলা হয়েছে “আমাদেরকে (নারীদেরকে) জানাজার অনুগমন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এতে কঠোরতা করা হয়নি।”
❂ এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন:
أي ولم يؤكد علينا في المنع كما أكد علينا في غيره من المنهيات، فكأنها قالت: كره لنا اتباع الجنائز من غير تحريم
“অর্থাৎ অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আমাদের ওপর যেভাবে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পুরুষদের সাথে জানাজার অনুগমনে সেভাবে জোর দেওয়া হয়নি। যেন তিনি বলতে চেয়েছেন যে,—আমাদের জন্য জানাজার অনুসরণ করাকে ‘মাকরুহ’ (অ পছন্দনীয়) করা হয়েছে। তবে তা ‘হারাম’ (পুরোপুরি নিষিদ্ধ) করা হয়নি।”
❂ ইমাম কুরতুবি (র.) বলেন:
ظاهر سياق أم عطية أن النهي نهي تنزيه
“উম্মে আতিয়্যাহ (রা.)-এর বর্ণনার ধরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই নিষেধটি হল ‘নাহি তানজিহি’ (তথা অ পছন্দনীয় বা অনুত্তম কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য নিষেধ)।” আর জমহুর (অধিকাংশ) আলেমগণও এই মতটিই পোষণ করেছেন।”
মোটকথা, জানাজায় অংশগ্রহণ করা আর জানাজার অনুগমনে কবরস্থানে যাওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, নারীদের জানাজার সালাতে অংশগ্রহণ হারাম নয়। তবে জানাজার অনুগমনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate