Thursday, January 8, 2026

এমন ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করার হুকুম যে অলসতাবশত বা কাজের কারণে কিছু ফরয সালাত আদায় করে আর কিছু ছেড়ে দেয় বা মাঝে মাঝে ক্বাযা করে

 প্রশ্ন:​ এমন ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করার হুকুম কী, যে অলসতাবশত বা কাজের কারণে কিছু ফরয সালাত আদায় করে আর কিছু ছেড়ে দেয় বা মাঝে মাঝে ক্বাযা করে।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর শার’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে সালাত কেবল একটি আমল নয়; বরং এটি ঈমান ও কুফরের মধ্যকার স্পষ্ট সীমারেখা। যে ব্যক্তি সালাতের ফরজিয়ত স্বীকার করে, কিন্তু বাস্তবে কাজ, ব্যস্ততা বা নানা অজুহাতে তা যথাযথভাবে কায়েম করে না—বরং নিয়মিতভাবে কিছু সালাত আদায় করে আর কিছু সালাত ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়—সে প্রকৃতপক্ষে সালাতকে তার জীবনের আবশ্যিক ফরজ ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেনি। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সালাত এমন কোনো ইবাদত নয়, যা মানুষের সুবিধা ও অবসরের ওপর নির্ভরশীল হবে; বরং এটি নির্ধারিত সময়ে অবশ্যই আদায়যোগ্য এক অবিচ্ছেদ্য ফরজ দায়িত্ব। এ কারনে আহালুস সুন্না’হর একদল আলেমদের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী—ফরজ সালাত ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা, তা অলসতাবশত হলেও কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এই কুফরকে তারা আমলি কুফর নয়; বরং এমন কুফর হিসেবে দেখেন, যা ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। এই অবস্থান থেকে স্বাভাবিকভাবেই যে ফলাফল আসে তা হলো—যে ব্যক্তি নিজেই শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত নয়, সে ইমাম হওয়ার যোগ্য নয়। ফলে তার পেছনে সালাত আদায়ও সহিহ হতে পারে না। কারণ সালাতে ইমামতি একটি শরয়ি আমানত, যা ফাসিক তো দূরের কথা—ইসলামি পরিচয় হারানো ব্যক্তিকে দেওয়া যায় না। সুতরাং এমন ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ করা এবং তার পিছনে সালাত আদায় করা জায়েজ নয়। তারা দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
.
রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ ‘মানুষ এবং শিরক-কুফুরীর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত ছেড়ে দেয়া’ (সহীহ মুসলিম, হা/৮২)। তিনি আরো বলেন, اَلْعَهْدُ الَّذِىْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلاَةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ ‘আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে যে পার্থক্য তা হলো ছালাত। অতএব যে সালাত ছেড়ে দিল সে কুফুরী করল’ (তিরমিযী, হা/২৬২১; ইবনু মাজাহ, হা/১০৭৯, সনদ সহীহ)। প্রখ্যাত তাবেঈ শাক্বীক্ব ইবনু আব্দুল্লাহ আল-উক্বাইলী বলেন, كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ ﷺ لَا يَرَوْنَ شَيْئًا مِنَ الْأَعْمَالِ تَرْكُهُ كُفْرٌ غَيْرَ الصَّلَاةِ ‘মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ সালাত ব্যতীত অন্য কোন আমল ছেড়ে দেয়াকে কুফরী মনে করতেন না (অর্থাৎ সালাত ত্যাগ করাকে কুফরী মনে করতেন)’ (তিরমিযী, হা/২৬২২,সনদ সহীহ)। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সালাত ছেড়ে দিল ইসলামে তার কোন অংশ নেই’। উল্লেখিত ও অন্যান্য দলীলসমূহ সালাত পরিত্যাগকারী বড় কুফুরীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ; যদিও সে পরিত্যাগকারী ব্যক্তি সালাত ফরয হওয়াকে অস্বীকার না করে। আর এ মত পোষণ করেন ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিম্নোক্ত হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেন,أَوَّلُ مَا تَفْقِدُوْنَ مِنْ دِيْنِكُمُ الْخُشُوْعُ، وَآخِرُ مَا تَفْقِدُوْنَ مِنْ دِيْنِكُمُ الصَّلَاةُ‘সর্বপ্রথম তোমরা তোমাদের দ্বীনের যা হারাবে তা হলো আমানত এবং সর্বশেষ দ্বীনের যা হারাবে তা হলো সালাত’ (আল-মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হা/৮৪৪৮,সনদ সহীহ)। ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সুতরাং ইসলাম থেকে চলে যাওয়া সর্বশেষ বস্তু যখন সালাত, তখন যে বস্তুর শেষ চলে যায় সে বস্তু সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। এ জন্য আপনাদের দ্বীনের সর্বশেষ অংশ (সালাত)-কে যথাযথভাবে আঁকড়ে ধরুন, আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন’ (ইমাম আহমদের কিতাবুস সালাত)। বর্তমান যুগে আমাদের বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম সালাত ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগকারীর ব্যাপারে কুফুরীর ফাতওয়া দিয়েছেন, আর তাদের শীর্ষে রয়েছেন, মাননীয় (সাবেক) মুফতী শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ,শাইখ সালেহ আল ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ)
.
শাইখ মুস্তফা রুহাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ( فصل ) ولا تصح إمامة فاسق مطلقا ) أي : سواء كان فسقه بالاعتقاد أو الأفعال المحرمة ، ولو كان مستوراً لقوله تعالى : أفمن كان مؤمنا كمن كان فاسقا لا يستوون …”(অধ্যায়) সাধারণভাবে ফাসিক (প্রকাশ্য ও গোপনে পাপাচারী) ব্যক্তির ইমামতি সহীহ নয়। অর্থাৎ তার ফিসক যদি আকীদাগত হয় বা হারাম কাজের মাধ্যমে হয় উভয় অবস্থাতেই (তার ইমামতি সহিহ নয়)। এমনকি সে বাহ্যিকভাবে সৎ মনে হলেও। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: সুতরাং যে ব্যাক্তি মুমিন, সে কি তার ন্যায় যে ফাসেক? তারা সমান নয়।”(সূরা আস-সাজদাহ: ১৮; মাতালিব উলিন নুহা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৫৩)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:الأئمة متفقون على كراهة الصلاة خلف الفاسق لكن اختلفوا في صحتها فقيل : لا تصح ، كقول مالك وأحمد في إحدى الروايتين عنهما ، وقيل : بل تصح كقول أبي حنيفة والشافعي والرواية الأخرى عنهما ، ولم يتنازعوا أنه لا ينبغي توليته”ইমামগণ (আইম্মায়ে কিরাম) এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, ফাসিক ব্যক্তির পেছনে নামাজ আদায় করা অপছন্দনীয় (মাকরূহ)। তবে সেই সালাত শুদ্ধ (সহীহ) হবে কি না—এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেমের মত হলো: সে সালাত শুদ্ধ হবে না—এটাই ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রাহিমাহুমাল্লাহ)-এর থেকে বর্ণিত একটি মত। আর অন্যদল আলেমের মত হলো: বরং সে সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে—এটাই ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুমাল্লাহ)-এর মত এবং ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদের আরেকটি বর্ণনাও এই মতের পক্ষে। তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই যে, ফাসিক ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করা উচিত নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: যে ব্যক্তি কিছু ফরজ সালাত আদায় করে, আর কিছু সালাত অলসতা ও অবহেলার কারণে ছেড়ে দেয়, তার পেছনে সালাত আদায় করার হুকুম কী?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: هذا لا يصلى خلفه؛ لأنه قد أتى منكرا عظيما بإجماع المسلمين، وهو ترك الصلاة تهاونا، وقد ذهب جمع من أهل العلم إلى أنه كافر بتركها تهاونا ولو بعضها، فإذا ترك الظهر تهاونا أو العصر تهاونا واستمر على ذلك، أو تارة يصلي وتارة لا يصلي يكون كافرا، فلا يصلى خلفه، بل يستتاب من جهة ولاة الأمور. وعلى ولي الأمر إذا ثبت لديه ذلك أن يستتيبه، فإن تاب وإلا قتل، ولا يصلى خلفه ولا كرامة؛ لقول النبي -صلى الله عليه وسلم-: «بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة» وقوله -صلى الله عليه وسلم-: «العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة، فمن تركها فقد كفر» نسأل الله العافية والسلامة.”এরূপ ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করা যাবে না। কারণ সে মুসলিমদের ঐক্যমতে একটি গুরুতর গুনাহে লিপ্ত তা হলো অলসতাবশত সালাত পরিত্যাগ করা। অনেক আলেমের মত হলো, কেউ যদি অলসতার কারণে সালাত ছেড়ে দেয়, যদিও তা কিছু সালাত হয় তবুও সে কাফির হয়ে যায়। অতএব, যদি কেউ যোহর সালাত অলসতাবশত ছেড়ে দেয়, বা আসরের সালাত অলসতাবশত ছেড়ে দেয় এবং এতে স্থায়ী থাকে কিংবা কখনো সালাত আদায় করে, আবার কখনো করে না তাহলে সে কাফের বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করা যাবে না। বরং তাকে শাসক পক্ষ থেকে তওবার জন্য আহ্বান করা হবে। যদি সে তওবা করে, তবে ঠিক আছে আর যদি তওবা না করে, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তার পেছনে ছালাত আদায় করা যাবে না এবং তার কোনো সম্মান নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: বান্দা ও শিরক-কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত পরিত্যাগ করা। তিনি অন্য হাদিসে বলেন: আমাদের ও তাদের মধ্যে অঙ্গীকার হলো সালাত। যে তা পরিত্যাগ করে, সে কুফরী করে। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করি।”(বিন বায; ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৯৬-৯৭)
.
পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক দলিলসমূহ পর্যালোচনার ভিত্তিতে অপর একদল আলেমের অভিমত হলো—যে ব্যক্তি সালাতের ফরযিয়াতকে দৃঢ়ভাবে স্বীকার করে, কিন্তু বাস্তবে কাজ, ব্যস্ততা বা নানা অজুহাতে তা যথাযথভাবে কায়েম করে না—বরং শয়তানের ধোকায় পড়ে নিয়মিতভাবে কিছু সালাত আদায় করে আর কিছু সালাত ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়—যেমনটি বর্তমান যুগে বহু মুসলিমের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত—তাকে কাফির বলা যাবে না। বরং ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ (রহিমাহুমাল্লাহ)সহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের জমহূর সালাফের মতে, সে ব্যক্তি একজন ফাসেক মুসলিম।এই মতানুসারে, এমন ফাসেক ব্যক্তির পেছনে আদায়কৃত সালাত সহীহ হবে, যদিও তার ফাসেকী প্রকাশ্য হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাত ফরয হওয়াকে স্বীকার করেও শয়তানের প্ররোচনায় অলসতাবশত কিছু ফরয সালাত আদায় করে আর কিছু পরিত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে এক মারাত্মক কবিরা গুনাহে লিপ্ত এবং ফাসেক হিসেবে গণ্য হবে; কিন্তু সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় না। এ ধরনের ব্যক্তিকে জেনে–বুঝে ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করা শরীয়তসম্মত নয়। তবে কেউ যদি বাস্তবতার কারণে তার পেছনে সালাত আদায় করে, তাহলে সে সালাত পুনরায় আদায় করা আবশ্যক হবে না। কেননা এ বিষয়ে মূলনীতি হলো—“যার নিজের নামাজ সহীহ, তার ইমামতিও সহীহ।”তবে যদি সেই (ফাসেক) গুনাহগার ইমামকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো নেককার ও যোগ্য ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করার সুযোগ থাকে, তাহলে সেটাই করা আবশ্যক। বিশেষত আলেম সমাজ ও তালিবুল ইলমদের জন্য এ বিষয়টি আরও অধিক গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা এটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ঐ ইমামের পেছনে সালাত বর্জনের অজুহাতে জামাত ছেড়ে একাকী ঘরে সালাত আদায় করা—জামাতযুক্ত সালাতের ক্ষেত্রে বৈধ নয়। এটিই অধিক সঠিক মত এবং আমাদের শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এই মতটি গ্রহণ করেছেন। এর দলিলসমূহ হলো:
.
প্রখ্যাত সাহাবী আবূ মাস’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আমাদেরকে বললেনঃيَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ وَأَقْدَمُهُمْ قِرَاءَةً “আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদের জ্ঞান যার সবচেয়ে বেশী এবং যে কুরআন তিলাওয়াতও সুন্দরভাবে করতে পারে সে-ই সলাতের জামা’আতে ইমামাত করবে।…(সহীহ মুসলিম হা/১৪২০)
.
জালেম শাসকদের বিষয়ে নবী (ﷺ)-এর বিশেষ উক্তি যারা দেরিতে সালাত আদায় করত: প্রখ্যাত সাহাবী আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, সে সময় তুমি কী করবে যখন তোমাদের উপর শাসকবৃন্দ এমন হবে, যারা সলাতের প্রতি অমনোযোগী হবে অথবা তা সঠিক সময় হতে পিছিয়ে দিবে? আমি বললাম, আপনি কী আমাকে নির্দেশ দেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,صلِّ الصلاة لوقتها ، فإن أدركتها معهم فصلِّ فإنها لك نافلة “এ সময়ে তুমি তোমার সলাতকে সঠিক সময়ে আদায় করে নিবে। অতঃপর তাদের সাথে পাও, আবার আদায় করবে। আর এ সলাত তোমার জন্য নফল হিসেবে গন্য হবে।”(সহীহ মুসলিম হা/৬৪৮, আবূ দাঊদ হা/৪৩১) সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ”يصلون لكم فإن أصابوا فلكم ولهم ، وإن أخطأوا فلكم وعليهم “যারা তোমাদের ইমামত করে। যদি তারা সঠিকভাবে আদায় করে তাহলে তার সওয়াব তোমরা পাবে। আর যদি তারা ভুল করে, তাহলে তোমাদের জন্য সওয়াব আছে, আর ভুলত্রুটির দায়িত্ব তাদের (ইমামের) উপরই বর্তাবে।”(সহিহ বুখারী হা/৬৯৪)
.
সাহাবীগণ (যেমন ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পেছনে সালাত পড়েছেন। অথচ ইবনে উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) সুন্নাহ অনুসরণে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং হাজ্জাজ আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম বড় ফাসেক হিসেবে পরিচিত ছিল। যৌক্তিক দলিল হিসেবে বলা হয়: যার নিজের সালাত সহীহ, তার ইমামতিও সহীহ। নিজের সালাত ও ইমামতির মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অকাট্য দলিল নেই। কারণ সে যদি গুনাহ করে, তবে সেই গুনাহের দায়ভার একান্তই তার নিজের। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনু উসাইমীন, আশ শারহুল মুমতি, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩০৪)।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] সালাত পরিত্যাগকারীর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বলেছেন, ,والخلاصة؛ أن مجرد الترك لا يمكن أن يكون حجة لتكفير المسلم، وإنما هو فاسق، أمره إلى الله، إن شاء عذبه؛ وإن شاء غفر له، وحديث الترجمة نص صريح في ذلك لا يسع مسلماً أن يرفضه.”সারকথা হল, কেবল সালাত ত্যাগ করা একজন মুসলিমকে কাফের সাব্যস্ত করার দলীল হতে পারে না। বরং সে ফাসেক। আর তার বিষয়টি আল্লাহর নিকট ন্যস্ত। তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন এবং চাইলে ক্ষমা করে দিবেন। আর হাদীছের অধ্যায় নির্বাচন এই ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল। একে প্রত্যাখ্যান করা কোন মুসলমানের জন্য ঠিক হবে না।(ইমাম আলবানী, সিলসিলা সহীহাহ হা/৩০৫৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য; হুকমু তারিকিছ সালাত ১/৫১)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন: “যদি মুক্তাদি জানে যে, ইমাম বিদআতি, বিদআতের দিকে আহ্বান করে অথবা এমন ফাসেক (কবিরা-গুনাহগার) যার মধ্যে গুনাহের আলামত প্রকাশ্য এবং সেই-ই নির্ধারিত ইমাম; সালাত পড়লে তার পিছনেই পড়তে হবে যেমন- জুমার ইমাম, ঈদের ইমাম, আরাফাতে হজ্জের সালাতের ইমাম ইত্যাদি এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল আলেমের অভিমত হচ্ছে- মুক্তাদিকে তার পিছনেই সালাত আদায় করতে হবে। এটি ইমাম আহমাদ, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য আলেমের অভিমত। এ কারণে আলেমগণ আকিদার কিতাবে লিখেন যে, ইমাম নেককার হোক কিংবা পাপাচারী হোক তিনি ইমামের পিছনে জুমার সালাত ও ঈদের সালাত আদায় করেন। অনুরূপভাবে এলাকাতে যদি শুধু একজন ইমাম থাকে তাহলে তার পিছনেই জামাতে সালাতগুলো আদায় করতে হবে। কেননা জামাতে সালাত আদায় করা, একাকী সালাত আদায় করার চেয়ে উত্তম; এমনকি ইমাম ফাসেক (কবিরা-গুনাহতেলিপ্ত) হলেও। এটি অধিকাংশ আলেম: আহমাদ ইবনে হাম্বল, শাফেয়ী ও অন্যান্যদের অভিমত। বরং ইমাম আহমাদের প্রকাশ্য অভিমত হচ্ছে- জামাতে সালাত আদায় করা ফরজে আইন। ইমাম ফাসেক হওয়ার কারণে যে ব্যক্তি জুমার সালাত ও জামাতে সালাত পড়ে না সে ইমাম আহমাদ ও আহলে সুন্নাহর অন্যান্য ইমামের মতে- বিদআতী; আব্দুস, ইবনে মালেক ও আত্তারের ‘রিসালা’ তে এভাবে এসেছে। সঠিক মতানুযায়ী: সে ব্যক্তি সালাত পড়ে নিবে; তাকে এ সালাতকে পুনরায় আদায় করতে হবে না। কারণ সাহাবায়ে কেরাম জুমার সালাত, জামাতে সালাত ফাসেক ইমামদের পিছনেও আদায় করেছেন; তাঁরা তাদের পিছনে আদায়কৃত সালাত পুনরায় আদায় করতেন না। যেমন- ইবনে উমর হাজ্জাজের পিছনে সালাত পড়তেন। ইবনে মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবী ওয়ালিদ ইবনে উকবার পিছনে সালাত পড়তেন। ওয়ালিদ বিন উকবা মদ্যপ ছিল। একবার ফজরের সালাত চার রাকাত পড়িয়েছে। এরপর বলল: আরো বাড়াবো নাকি? তখন ইবনে মাসউদ বললেন: আজ তো আপনি বেশিই পড়িয়েছেন! এরপর তাঁরা তার বিরুদ্ধে ওসমান (রাঃ) এর নিকট অভিযোগ করেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে- ওসমান (রাঃ) যখন অবরুদ্ধ হলেন এবং জনৈক লোক এগিয়ে গিয়ে নামাযের ইমামতি করল তখন এক ব্যক্তি ওসমান (রাঃ) কে প্রশ্ন করল: নিঃসন্দেহে আপনি সর্বসাধারণের ইমাম। আর যে ব্যক্তি এগিয়ে এসে ইমামতি করল সে ফিতনার ইমাম। তখন ওসমান (রাঃ) বললেন: ভাতিস্পুত্র শোন, সালাত হচ্ছে- ব্যক্তির সবচেয়ে উত্তম কাজ। যদি লোকেরা ঠিকভাবে সালাত আদায় করে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করো। আর যদি তারা মন্দ আচরণ করে তাদের সে মন্দ আচরণকে এড়িয়ে চল। এ ধরণের বাণী অনেক আছে। ফাসেক বা বিদআতীর সালাত সহিহ। অতএব, মোক্তাদি যদি তার পিছনে সালাত পড়ে তাহলে তার সালাত বাতিল হবে না। তবে, যারা বিদআতির পিছনে সালাত পড়াকে মাকরুহ বলেছেন তারা দিক থেকে বলেছেন: সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ওয়াজিব। যে ব্যক্তি প্রকাশ্য বিদআত করে তাকে ইমাম হিসেবে নির্ধারণ না করাটা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের অন্তর্গত। কেননা সে শাস্তিযোগ্য যতক্ষণ না তওবা করে। যদি তাকে এড়িয়ে চলা যায় যাতে করে সে তওবা করে সেটা— ভাল। যদি কোন কোন লোক তার পিছনে সালাত পড়া ছেড়ে দিলে, অন্যেরা সালাত পড়লে সেটা তার উপরে প্রভাব ফেলে যাতে করে সে তওবা করে অথবা বরখাস্ত হয় অথবা মানুষ এ জাতীয় গুনাহ থেকে দূরে সরে আসে এবং সে মোক্তাদির জুমা বা জামাত ছুটে না যায় যদি এমন হয় তাহলে এ ধরণের লোকের তার পিছনে সালাত বর্জন করাতে কল্যাণ আছে। পক্ষান্তরে মোক্তাদির যদি জুমা ও জামাত ছুটে যাওয়ার আশংকা থাকে তাহলে তার পিছনে সালাত বর্জন করাটা বিদআত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলের পরিপন্থী।”(ইবনু তাইমিয়া; আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩০৭-৩০৮; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-১২২৩৩৯)
.
পরিশেষে, সালাত ইসলামের সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শে‘আর (নিদর্শন)। এর মাধ্যমেই একজন ব্যক্তির মুসলিম বা অমুসলিম হওয়া নির্ভর করে। সালাত পরিত্যাগকারী সম্পর্কে ফিকহি মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই—ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতাবসত সালাত ত্যাগ করা অত্যন্ত ভয়াবহ কবীরা গুনাহ। সুতরাং প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের ওপর ফরয হলো দিনে-রাতে নির্ধারিত সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে সালাতের প্রতি যত্নবান ও অবিচল থাকার তাওফীক দান করেন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate