প্রশ্ন: নবী ﷺ-এর যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যেসব সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত আলেম ইলমের সনদ ও ধারাবাহিকতা বহন করে আসছেন এবং যাদের নিকট থেকে শার’ঈ ইলম গ্রহণ করা নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য তাদের পরিচয় সম্পর্কে অবগত হতে চাই।
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর: দ্বীনি ইলম অর্জনের প্রতি আপনার আন্তরিক আগ্রহ এবং সত্যের অনুসন্ধানে সচেষ্ট হওয়াকে আমরা আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। কাদের কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করা উচিত—এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলা আপনার সচেতনতা ও দায়িত্ববোধেরই পরিচয়। কারণ কেবল বাকপটুতা, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা কিংবা কিছু মাসয়ালা ও দলিল মুখস্থ থাকলেই কেউ ইলম গ্রহণের উপযুক্ত ‘আলেম’ হয়ে যায় না। বরং ইলমের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো আকীদা, মানহাজ, আমল ও নির্ভরযোগ্য ইলমি সনদ।এজন্য আমাদের কর্তব্য হবে প্রকৃত ইলম অনুসন্ধান করা এবং সত্যিকারের বিশ্বস্ত ইলমি ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকেই ইলম গ্রহণ করা। কারণ শরিয়তের ইলম নেওয়ার সময় সতর্ক থাকা অত্যাবশ্যক। এই গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে প্রখ্যাত তাবি‘ঈ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সীরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১১০ হি.] বলেছেন, ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢَ ﺩِﻳﻦٌ ﻓَﺎﻧْﻈُﺮُﻭﺍ ﻋَﻤَّﻦْ ﺗَﺄْﺧُﺬُﻭﻥَ ﺩِﻳﻨَﻜُﻢ
“নিশ্চয়ই এই ইলম (জ্ঞান) হলো দ্বীন। অতএব, তোমরা কার কাছ থেকে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ—সে বিষয়ে সতর্কভাবে লক্ষ্য করো।”(সহীহ মুসলিমের ভূমিকা’; পরিচ্ছেদ-৫; পৃষ্ঠা: ৯; সুনানে দারিমি: ৪৩৮)
.
অতএব শার’ঈ ইলম গ্রহণ করা যাবে কেবল সেইসব আলেমদের কাছ থেকেই,যারা সত্যবাদিতা, দ্বীনদারি, তাকওয়া, সুদৃঢ় চরিত্র, বিশুদ্ধ আকীদা এবং সহিহ মানহাজের জন্য সুপরিচিত। পক্ষান্তরে পাপাচারী, বিদ‘আতপন্থী কিংবা সুন্নাহবিরোধী পথের দিকে আহ্বানকারীদের কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করা বৈধ নয়। এটি তাদের জন্য একপ্রকার শাস্তিস্বরূপ এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করার একটি গ্রহণযোগ্য শার’ঈ পদ্ধতি। কারণ, এ শ্রেণির লোকেরা অনেক সময় সত্যের আবরণে মিথ্যা মিশিয়ে উপস্থাপন করে—যেমন মধুর ভেতর বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়,ফলে শিক্ষার্থী উপলব্ধিই করতে পারে না যে কখন এবং কীভাবে সে বিদ‘আতের শিক্ষায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।বিখ্যাত তাবেয়ি ইমাম মুহাম্মাদ বিন সিরিন (রাহিমাহুল্লাহ) ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণের সেই নীতি বর্ণনা করে বলেছেন, لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلاَ يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ “এমন সময় ছিল যখন তারা (সাহাবা ও তাবেয়িগণ) কখনো হাদিসের সনদ নিয়ে প্রশ্ন করতেন না। কিন্তু পরে যখন ফিতনা উদ্ভূত হলো—হাদিসের নামে মিথ্যা প্রচলন বিদআত বৃদ্ধি পেতে লাগল—তখন তারা বললেন: তোমরা যাদের নিকট থেকে হাদিস গ্রহণ করেছ, আমাদের কাছে তাদের নাম বল। কারণ তারা যাচাই করতে চেয়েছিলেন যে, এই ব্যক্তিরা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত কিনা। যদি তারা আহলুস সুন্নাহ থেকে হয়, তবে তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য; আর যদি তারা বিদআতি বা পথভ্রষ্ট হয়, তবে তাদের হাদিস গ্রহণ করা যাবে না।”(দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা তথা ভূমিকা, পরিচ্ছেদ: ৫; পৃষ্ঠা: ৯) এজন্য সত্যিকারের আলিম কারা, ইলম নেওয়া যায় এমন নির্ভরযোগ্য তালিবুল ইলম কারা, সেগুলো জেনে নেওয়াও আমাদের কর্তব্য।
.
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমাম ও আলেমগণ, যাদের কাছ থেকে নিরাপদভাবে শার’ঈ ইলম গ্রহণ করা যায়, সংখ্যায় অগণিত তাদের সবাইকে গণনা করা সম্ভব নয়। তবে দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা নিচে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি:
• শীর্ষস্থানীয়: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ বিশেষ করে চার খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। এরপর প্রবীণ সাহাবীগণ যেমন:
প্রখ্যাত সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস‘ঊদ, মুয়াজ ইবনে জাবাল, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আবু মুসা আল-আশআরি, উবাদাহ ইবনে সামিত, আবু দারদা, আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর,
আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, আবু সাঈদ খুদরি এবং আনাস ইবনে মালেক (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সহ আরও অনেকে।
• তাবেয়ীগণ: আবুল আলিয়া, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আলকামা, আল-আসওয়াদ, ইকরিমা, সাঈদ ইবনু জুবায়ের, মুজাহিদ ইবনু জাবার, মুহাম্মদ ইবনু সীরীন, নাফে (ইবনে উমরের মুক্তদাস) এবং হাসান বিন ইয়াসার ওরফে হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ।
• তাঁদের ছাত্রগণ: ইব্রাহিম নাখয়ী, ইবনু শিহাব যুহরী, শা’বী, আমাশ, আবু যিনাদ, মাকহুল, আব্দুর রহমান বিন আমর ওরফে ইমাম আওযাঈ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক সুফিয়ান বিন সাঈদ ওরফে ইমাম সুফিয়ান সাওরি, এবং ইবনে উইয়ায়না (রাহিমাহুল্লাহ)।
• চার ইমাম: চার মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমামগণ: আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ী ও আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ। এছাড়াও তাঁদের সমসাময়িক আবু সাওর, লাইস ইবনে সাদ, ইবনে ওয়াহাব এবং ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম।
• মুহাদ্দিস ইমামগণ: ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম এবং সুনান গ্রন্থকারগণ (ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজী, ইমাম নাসাঈ ও ইমাম ইবনে মাজাহ রাহিমাহুল্লাহ)। এরপর হাদিস সংকলক যেমন: ইমাম ইবনে খুজাইমা, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম দারাকুতনী, ইমাম তাহাবী ও ইমাম বায়হাকী রাহিমাহুল্লাহ।
• পরবর্তী যুগের ফকীহগণ: ইমাম ইবনুল মুনজির, ইমাম নববী, ইমাম ইরাকী, ইমাম ইবনুস সালাহ, ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবনুল আরাবী, ইমাম ইবনে আব্দুল বার, ইমাম ইবনে কুদামা, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম যাহাবী, ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম ইজ্জ ইবনে আব্দুস সালাম, ইমাম ইবনে জামাআহ, ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন, ইমাম ইবনে হাজার এবং ইমাম ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ)।
• তাঁদের অনুসারীগণ: ইমাম ইবনে আবিল ইজ্জ, ইমাম সুয়ূতী, ইমাম শাওকানী এবং ইমাম সানআনী (রাহিমাহুল্লাহ)।
• সাম্প্রতিককালের আলেমগণ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব, ইমাম আহমাদ শাকের, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আল-শেখ, ইমাম আব্দুর রহমান আস-সাদী, ইমাম ইবনে বায, ইমাম ইবনে উসাইমীন, ইমাম আলবানী, ইমাম মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতী, ইমাম আতিয়া সালিম, আব্দুর রাজ্জাক আফিফী, আবু বকর আল-জাযায়েরী, আব্দুল্লাহ ইবনে হুমাইদ, সালিহ আল-লুহাইদান, সালিহ আল-ফাওজান, আব্দুল্লাহ ইবনে জিবরীন, আব্দুর রহমান আল-বাররাক এবং আরও অনেকে।
শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তালিকা:
.
(ক).আক্বীদাহ বিষয়ক গ্রন্থ:
.
(১).কিতাবু সালাসাতিল উসূল।
(২).কিতাবু ক্বাওয়ায়িদুল আরবা’য়াহ।
(৩).কিতাবু কাশফুশ-শুবহাতি।
(৪).কিতাবুত তাওহীদ।
এই চারটি বই শায়খুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রাহিমাহুল্লাহ।
(৫).কিতাবুল আক্বিদাতুল ওয়াসিত্বিয়্যাহ।
এই কিতাব তাওহীদুল আসমায়ি ওয়াস-সিফাতি তথা আল্লাহ তাআলার নাম ও তার গুণাবলীর একাত্বতা সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য। এটি এই বিষয়ে লিখিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর একটি কিতাব। যা পর্যালোচনা ও পঠনযোগ্য হিসেবে উল্লেখিত।
(৬).কিতাবুল হামবিয়্যাহ।
(৭).কিতাবুত-তাদরুমিয়্যাহ।
এই তিনটি শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কিতাব।
.
(৮).কিতাবুল আক্বিদাতুত ত্বাহাবিয়্যাহ,(লেখক:আবু জা’ফার আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আত্ব-ত্বাহাবী)।
(৯).কিতাবু শারহিল আক্বিদাতিত-ত্বাহাবিয়্যাহ,(লেখক: আবুল হাসান আলী বিন আবিল-ইয্যী)
(১০).কিতাবুদ-দুরারিস-সানিয়্যাহ ফিল-আজবিবাতিন-নাজদিয়্যাহ)। শাইখ আব্দুর রহমান বিন ক্বাসিম রাহিমাহুল্লাহ সংকলন করেছেন।
(১১).কিতাবুদ-দুর্রাতিল মাযিয়্যাহ ফি আক্বিদাতিল ফিরক্বাতিল মারযিয়্যাহ,লেখক: মুহাম্মাদ বিন আহমদ আস-সাফারিনী আল-হাম্বলী)। তবে এই কিতাবে এমন কিছু বিষয় রয়েছে; যা সালাফদের মতামত তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিরোধী। যেমন:وليس ربنا بجوهر ولا عرض ولا جسم تعالى في العلى”এইজন্য একজন জ্ঞানপিপাসু ছাত্রের জন্য কর্তব্য হলো সালাফী আক্বিদার সাথে পরিচিত শায়েখদের নিকট অধ্যায়ন করা। যাতে করে তিনি সালাফী আক্বিদার বিরোধী দিকগুলো বর্ণনা করে দিবেন।
.
(খ). হাদিস ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ:
.
কুতুবে সিত্তা (ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ): যেমন সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনু মাজাহ, নাসাঈ ইত্যাদি। হাদিস গ্রন্থের ব্যাখ্যা: ইবনু হাজার, ফাতহুল-বারী শারহু সহিহুল বুখারী, ইমাম নববী শরহে সহীহ মুসলিম, ইবনু উসাইমীন শরহে রিয়াদুস সালিহীন, ইমাম শাওকানী নাইলুল আওতার, সানআনী, সুবুলুস সালাম শারহু বুলুগিল মারাম।
.
(গ). ফুররি (ফিকহ):
.
ইমাম বুহুতি; যাদুল মুস্তাকনি ও তার ব্যাখ্যা ‘আর-রওদুল মুরবি; ইবনু কুদামাহ, উমদাতুল ফিকহ; ইবনু হাযম আন্দালুসী, আল-মুহাল্লা বিল আছার, ইবনু উসাইমীন; আস-শারহুল মুমতি; ইবনু উসাইমীন; আল-উসূল মিন ইলমিল উসূল, ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী এবং ইমাম নববী আল-মাজমু।
.
(ঘ).তাফসীর গ্রন্থ:
.
ইবনু জারীর আত-তাবারী, তাফসীরে তাবারী, ইমাম কুরতুবী, আল-জামি‘ঊ লি আহকামিল কুরআন, তাফসিরে ইবনে কাসীর, শাওকানী,ফাতহুল কাদীর, তাফসিরে আস-সাদী, ইমাম শানক্বীত্বী, আযওয়াউল বায়ান ফী ইযাহুল কুরআন বিল কুরআন এবং ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এর তাফসীর।
(ঙ).ফাতওয়া গ্রন্থ:
.
ইবনু তাইমিয়া এর মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে বায এর মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানা ওয়্যা‘আহ, ইবনে উসাইমীন এর মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, সালিহ আল-ফাওযান এর আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস, ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ এর ফাতওয়া সমগ্র। এবং আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী) এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১২৯৫৩৯)।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
No comments:
Post a Comment