ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর একজন ব্যক্তি কখন কাফির বা মুরতাদ সাব্যস্ত হবে—এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর বিষয়। কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট ও নির্ভুল প্রমাণ ছাড়া কোনো মানুষ কারো ওপর কুফর আরোপ করা বা মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শরঈ হুকুম ঘোষণা করার অধিকার রাখে না। ইসলামী পরিভাষায় এমন কোনো কথা, কাজ বা বিশ্বাস গ্রহণ করা—যার ফলে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়—তাকে ‘রিদ্দাহ’ বলা হয়। আর ‘মুরতাদ’ শব্দটি আরবি রিদ্দাহ বা ইরতিদাদ থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে যাওয়া বা পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা। শরীয়তের দৃষ্টিতে, কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফর বা শিরকের দিকে ফিরে গেলে, অথবা ইসলামকে অস্বীকার করলে সে মুরতাদ বলে বিবেচিত হয়। এই বিষয়ে সৌদি আরবের স্থায়ী ফতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেছেন,“দ্বীনকে গালি দেওয়া, কুরআন-সুন্নাহর কোনো অংশকে উপহাস করা, অথবা যারা এগুলোর ওপর আমল করে তাদেরকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা—যেমন দাড়ি রাখা বা পর্দা করা নিয়ে ঠাট্টা করা—এসবই স্পষ্ট কুফরি। ব্যক্তি যদি বিষয়টি জানার পরও তওবা না করে, তবে তাকে কাফির হিসেবে গণ্য করা হবে।”(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, ১ম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ৩৮৭)
Thursday, January 8, 2026
একজন ব্যক্তি কখন কাফের বা মুরতাদ সাব্যস্ত হবে
.
কখন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়? এবং ইসলামে মুরতাদ (দ্বীন ত্যাগকারী) ব্যক্তির বিধান কী?
.
▪️এক: রিদ্দা মানে- ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরিতে ফিরে যাওয়া।
.
▪️দুই: কখন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়?
যে বিষয়গুলোতে লিপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোন ব্যক্তির ‘রিদ্দা’ সাব্যস্ত হয়-তা চার প্রকার।
(১). বিশ্বাসগতভাবে ইসলাম ত্যাগ করা। যেমন- আল্লাহর সাথে শিরক তথা অংশীদার স্থাপন করা, অথবা আল্লাহকে অস্বীকার করা অথবা আল্লাহ তাআলার সাব্যস্ত কোন গুণকে অস্বীকার করা।
(২). কোন কথা উচ্চারণ করার মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগ। যেমন- আল্লাহ তাআলাকে গালি দেয়া অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়া।
(৩). কর্মের মাধ্যমে ধর্মত্যাগ। যেমন-কোন নোংরা স্থানে কুরআন শরিফ নিক্ষেপ করা। এ কাজ আল্লাহর বাণীকে অবমূল্যায়নের নামান্তর। তাই এটি অন্তরে বিশ্বাস না থাকার আলামত। অনুরূপভাবে কোন প্রতিমাকে অথবা সূর্যকে অথবা চন্দ্রকে সিজদা করা।
(৪).কোন কর্ম বর্জন করার মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগ। যেমন- ইসলামের সকল অনুশাসনকে বর্জন করা এবং এর উপর আমল করা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।
.
জেনে রাখা উচিত, প্রত্যেক মুসলমান যদি কোনোভাবে কুফরির কোনো কাজে লিপ্তও হয়, তবুও তাকে সঙ্গে সঙ্গে মুরতাদ বলা যায় না। এমন কিছু অজুহাত ও কারণ রয়েছে, যেগুলোর জন্য তাকে ক্ষমা করা হতে পারে এবং তাকে কাফির বা মুরতাদ গণ্য করা হয় না। এসব অজুহাতের মধ্যে রয়েছে (১) অজ্ঞতা (২) ভুল ব্যাখ্যা (৩) জোর-জবরদস্তি (৪) ভুলক্রমে মুখ থেকে কুফরির কথা বেরিয়ে যাওয়া।
.
প্রথম অজুহাত (অজ্ঞতা): যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে তার কারণ হতে পারে, সে ইসলামি অঞ্চলের বাইরে বসবাস করছে, যেমন বেদুইন অঞ্চল বা অমুসলিম দেশে, অথবা সে সদ্য জাহিলিয়্যাত থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে এমন অনেক মুসলমানও অন্তর্ভুক্ত, যারা এমন সমাজে বাস করে যেখানে জ্ঞান অতি কম, আর অজ্ঞতা ব্যাপক। প্রশ্নকারী যে মুসলমানদের ব্যাপারে তাদের কুফরি ঘোষণা ও হত্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তাদের অনেকেই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
.
দ্বিতীয় অজুহাত: যেমন কেউ আল্লাহর বিধানকে শরিয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্যের বিপরীতে অর্থ করে যেমন যারা বিদআতিদের অনুসরণ করেছে, যেমন মুরজিআহ, মু‘তাযিলা, খারেজি ইত্যাদি দল যারা শরিয়তের পাঠ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
.
তৃতীয় অজুহাত: যেমন কোনো অত্যাচারী কোনো মুসলমানের ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাকে বাধ্য করে মুখে কুফরির কথা বলতে, যতক্ষণ না সে মুখে তা স্বীকার করে। অথচ তার অন্তর ঈমানে প্রশান্ত থাক।
.
চতুর্থ অজুহাত: যেমন কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখে কুফরিসূচক কথা বলে ফেলে, কিন্তু তার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।
.
উলামাগণ একমত পোষণ করেছেন, যে ব্যক্তি দুটো বিষয়ে-‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই’ এবং ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসুল’-সাক্ষ্য দেয়, তার মৌলিক অবস্থা হচ্ছে,সে মুসলিম এবং তার ক্ষেত্রে এটাই সুনিশ্চিত বিষয়।” সুতরাং যে ব্যক্তির ব্যাপারে (সুনিশ্চিত) জানা যায়, সে মুসলিম; অনুরূপ সুনিশ্চিত বিষয় ব্যতিরেকে তার থেকে মুসলিম পরিচয় উঠিয়ে নেওয়া না-জায়েজ। যদি কারও ব্যাপারে সংশয় তৈরি হয়, তাহলে মৌলিক অবস্থার দিকেই বিষয়টিকে প্রত্যার্পিত করতে হবে, সংশয়কে প্রতিহত করতে হবে, তাকফিরকে (কাফির আখ্যানকে) রোধ করতে হবে এবং বাহ্যিকভাবে মুসলিম হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির সাথে সেরূপ আচরণই করতে হবে, যেরূপ আচরণ মুসলিমদের সাথে করা হয়।”অর্থাৎ উলামাগণের নিকট বিষয়টি এরকম-কোনো ব্যক্তি যদি দুই সাক্ষ্যের ঘোষণা দেয়, তাহলে আমরা তাকে মুসলিম সাব্যস্ত করব এবং তার জন্য ইসলামের বিধিবিধান জারি করব; পক্ষান্তরে তার মুসলিম হওয়ার বিষয়ে আমাদের সন্দেহ হলে তার বিষয়টিকে মৌলিক অবস্থার দিকে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের জন্য আবশ্যক, আর উক্ত ব্যক্তির মৌলিক অবস্থা হচ্ছে, সে মুসলিম। এজন্য উলামাগণ একমত পোষণ করেছেন, যদি মুসলিমদের দেশে কোনো মুসলিমকে জানাজার নামাজের জন্য পেশ করা হয়, তাহলে তার জানাজার নামাজ পড়তে হবে। পক্ষান্তরে কিছু লোক যে মুসলিমদের মসজিদসমূহে কাউকে জানাজার জন্য পেশ করা হলে তার জানাজার নামাজ পড়ে না এবং যাকে সে মুসলিম হিসেবে জানে সেই লোক ব্যতীত কারও জানাজার নামাজ পড়ে না, তাদের এ কাজ বিদাতি পন্থা হিসেবে বিবেচিত। অনুরূপ আরেকটি বিদআতি পন্থা হচ্ছে- এ যুগের কতিপয় বিদআতির মতে মুসলিমদের জবাই হারাম, যতক্ষণ না নিশ্চিত জানা যাচ্ছে, জবাইকারী মুসলিম কিনা! ফলে মুসলিম জবাই করলেও এরা জবাইকৃত পশু খায় না, যতক্ষণ না জানতে পারছে, সে আসলেই মুসলিম! কেননা এদের কাছে মৌলিক অবস্থা হচ্ছে-সংশয় বা সন্দেহ। বিধানগত দিক থেকে তাদের কাছে কারও ‘মুসলিম হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়’ উক্ত ব্যক্তিকে কাফির হিসেবে জেনে ফেলার সমান! এটা বিদাত এবং ভ্রষ্টতা। এই আদর্শ মানুষকে কেবল অকল্যাণের দিকেই চালিত করে!
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মানহাজ বর্ণনা করে বলেছেন: وَلَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يُكَفِّرَ أَحَدًا مِنْ الْمُسْلِمِينَ وَإِنْ أَخْطَأْ وَغَلِطَ حَتَّى تُقَامَ عَلَيْهِ الْحُجَّةُ وَتُبَيِّنَ لَهُ الْمَحَجَّةُ وَمَنْ ثَبَتَ إِسْلَامُهُ بِيَقِينِ لَمْ يُزَلْ ذَلِكَ عَنْهُ بِالشَّكْ؛ بَلْ لَا يَزُولُ إِلَّا بَعْدَ إِقَامَةِ الْحُجَّةِ وَإِزَالَةِ الشَّبْهَةِ”মুসলিমদের মধ্যে কেউ ভুল ও ত্রুটি করলেও, তার বিরুদ্ধে হুজ্জাহ (প্রমাণ/দলিল) প্রতিষ্ঠা করা এবং তার জন্য সঠিক পথ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা না হওয়া পর্যন্ত তাকে কাফির আখ্যা দেওয়া কারও জন্য বৈধ নয়। আর যে ব্যক্তির ইসলাম সুনিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে তার থেকে সেই (ইসলামের) পরিচয় মুছে ফেলা যাবে না। বরং হুজ্জাহ প্রতিষ্ঠা করা এবং তার সংশয় দূর করা না হলে, তা (ইসলামের পরিচয়) তার থেকে অপসারিত হবে না।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৪৬৬) তিনি আরও বলেছেন,وَمَنْ ثَبَتَ إِيمَانُهُ بِيَقِينِ لَمْ يَزَلْ ذَلِكَ عَنْهُ بِالشَّكْ”যে ব্যক্তির ঈমান সুনিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে তার থেকে সেই (ঈমানের) পরিচয় অপসারিত হবে না।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৫০১)
ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَهَذَا أَصْلٌ مُسْتَعْمَلُ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنْ لَا تَزُولَ عَنْ أَصْلٍ أَنْتَ عَلَيْهِ إِلَّا بِيَقِينِ مِثْلِهِ وَأَنْ لَا يترك اليقين بِالشَّك”এটি আহালুল ইলম (জ্ঞানীদের) নিকট একটি সুপ্রচলিত মূলনীতি যে, আপনি যেই মৌলিক অবস্থার ওপরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন,অনুরূপ সুনিশ্চিত দলিলের (ইয়াকিন) মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আপনি সেই মৌলিক অবস্থা থেকে সরে যাবেন না; আর সন্দেহ-সংশয়ের (শাক্ক) কারণে সুনিশ্চিত বিষয়কে (ইয়াকিন) পরিত্যাগ করা যাবে না।” (আত-তামহিদ, খন্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩৩৯-৩৪০) তিনি রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন:وَمِنْ جِهَةِ النَّظَرِ الصَّحِيحِ الَّذِي لَا مِدْفَعَ لَهُ أَنْ كُلَّ مَنْ ثَبَتَ لَهُ عَقْدُ الْإِسْلَامَ فِي وَقْتِ بِإِجْمَاعِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ثُمَّ أَذْنَبَ ذَنْبًا أَوْ تَأْوَّلَ تَأْوِيلًا فَاخْتَلَفُوا بَعْدُ فِي خُرُوجِهِ مِنَ الْإِسْلَامِ لَمْ يَكُنْ لِاخْتِلَافِهِمْ بَعْدَ إِجْمَاعِهِمْ مَعْنَى يُوجِبُ حُجَّةٌ وَلا يُخْرِجُ مِنَ الْإِسْلَامِ الْمُتَّفَقِ عَلَيْهِ إِلَّا بِاتِّفَاقِ آخَرَ أَوْ سُنَّةٍ ثَابِتَةٍ لَا مُعَارِضَ لَهَا”অপ্রতিরোধ্য (যা প্রতিহত করা যায় না) এবং বিশুদ্ধ গবেষণালব্ধ অভিমত হলো: মুসলিমদের (ইজমা) সর্বসম্মতিক্রমে যে ব্যক্তির মুসলিম পরিচয় সাব্যস্ত হয়ে যায়, এরপর সে কোনো পাপকাজ করে কিংবা কোনো তাবিল তথা ভিন্ন ব্যাখ্যা করে, ফলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছে কিনা তা নিয়ে তারা মতভেদ করে, তাহলে তাদের (ওলামাদের) নিজেদের ইজমা সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পরে তাদের দ্বারা সংঘটিত এই মতভেদের এমন কোনো অর্থ নেই, যা কিনা দলিল হওয়াকে আবশ্যক করে (অর্থাৎ উক্ত মতভেদের এমন কোনো অর্থ নেই, যা বিষয়টিকে দলিল হওয়ার যোগ্য করে তোলে)।সর্বসম্মতিক্রমে সাব্যস্ত মুসলিমকে অনুরূপ সর্বসম্মত মত কিংবা অপ্রতিরোধ্য প্রমাণিত সুন্নাহ ছাড়া ইসলাম থেকে বের করা যাবে না।”(আত-তামহিদ, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ২১) কিংবা প্রমাণিত সুন্নাহ মানে: বিশুদ্ধ সুস্পষ্ট দলিল।তিনি (ইবনু আব্দিল বার) উলামাগণের আদর্শকে স্পষ্ট করে আরও বলেছেন,فَالْوَاجِبُ فِي النَّظَرِ أَنْ لَا يُكَفِّرَ إلا من اتفق الجميع على تكفيره أوقام عَلَى تَكْفِيرِهِ دَلِيلٌ لَا مِدْفَعَ لَهُ مِنْ كِتَابٍ أَوَسُنَّةٍ». “গবেষণা অনুযায়ী এটি একটি অত্যাবশ্যক বিষয় যে, কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে সবাই একমত না হলে, অথবা কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে কিতাব বা সুন্নাহ থেকে অপ্রতিরোধ্য দলিল প্রতিষ্ঠিত না হলে, তাকে কাফির বলা যাবে না।”(আত-তামহিদ, খন্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ২২)
ইবনু নুজাইম আল-হানাফি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-বাহরুর রায়িক’ গ্রন্থে বলেছেন,وَمَا يَشْكُ أَنَّهُ رِدَّةً لَا يَحْكُمُ بِهَا إِذْ الْإِسْلَامُ الثَّابِتُ لَا يَزُولُ بِشَكٍّ». “কোনো বিষয় ‘রিদ্দাহ (মুরতাদ কাফির হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়)’ কিনা এমন সন্দেহ হলে, সেটাকে রিদ্দাহ বলে হুকুম দেওয়া যাবে না। কেননা সন্দেহ-সংশয়ের দরুন কারও সাব্যস্ত মুসলিম পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না।”(আল-বাহরুর রায়িক, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৩৪)
.
এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো এই হাদিস-উসামা বিন জাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে হুরাক গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা ভোরবেলায় গোত্রটিকে আক্রমণ করি এবং তাদেরকে পরাজিত করি। এ সময় আনসারদের এক ব্যক্তি ও আমি তাদের (আক্রান্ত গোত্রের) একজনের পিছু ধাওয়া করলাম।” অর্থাৎ লোকটি মুসলিমদেরকে প্রচণ্ডভাবে হত্যা করেছে; যে মুসলিমকেই হত্যা করতে গেছে, তাকেই হত্যা করে ফেলেছে। যখন তার গোত্র পরাজিত হয়েছে, তখন সে পলায়ন করেছে। সাহাবি উসামা বলে চলেছেন:
«فَلَمَّا غَشِيْنَاهُ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَكَفَّ الْأَنْصَارِيُّ فَطَعَنَتُهُ بِرُمْحِي حَتَّى قَتَلْتُهُ فَلَمَّا قَدِمْنَا بَلَغَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا أُسَامَةُ أَقْتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قُلْتُ كَانَ مُتَعَوِّدًا فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي لَمْ أَكُنْ أَسْلَمْتُ قَبْلَ ذَلِكَ الْيَوْمِ».”আমরা যখন তাকে অস্ত্র দিয়ে ঘিরে ফেললাম, তখন সে বলে উঠল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই।’ এ বাক্য শুনে আনসারি সাহাবি তাঁর অস্ত্র সামলে নিলেন। কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদিনায় ফেরার পর এ সংবাদ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছলে তিনি বললেন, “উসামা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ?” আমি বললাম, “সে তো জান বাঁচানোর জন্য বলেছিল।” এরপর তিনি আমার কাছে এ কথাটি বারবার বলছিলেন, “উসামা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ?!” ফলে আমার আকাঙক্ষা হচ্ছিল, হায়, যদি সেই দিনের পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম!(সহিহ বুখারি, হা. ৪২৬৯; সহিহ মুসলিম, হা. ৯৬)
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে:بَعَثَنَا رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم في سَرِيَّةٍ فَصَبَّحْنَا الْحُرَقَاتِ مِنْ جهَيْنَة فَأَدْرَكْتُ رَجُلاً فَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، فَطَعَنْتُهُ فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ فَذَكَرْتُهُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : أَقَالَ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَقَتَلْتَهُ. قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا قَالَهَا خَوْفًا مِنَ السَّلَاحِ ، قَالَ : أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقالَهَا أَمْ لا فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا عَلَى حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي أَسْلَمْتُ يَوْمَئِذٍه.উসামা বিন জাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এক যুদ্ধাভিযানে পাঠালেন। আমরা ভোরবেলায় জুহাইনা গোত্রের ‘হুরাকা’ শাখার ওপর হামলা করলাম। যুদ্ধে আমি এক ব্যক্তিকে (ধাওয়া করে) তাকে ধরে ফেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে সে বলে ওঠে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। কিন্তু আমি তাকে (অস্ত্র দিয়ে) আঘাত করে ফেলি (যার দরুন সে মারা যায়)। কালিমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায়, আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হয়। তাই ঘটনাটি আমি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উল্লেখ করি। তিনি বলেন, ‘তুমি কি তাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পরেও হত্যা করেছ?” আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসুল, সে অস্ত্রের ভয়ে জান বাঁচানোর জন্যেই এরূপ বলেছে।’ তিনি বললেন, ‘তুমি কি তার অন্তর চিড়ে দেখলে না?! যাতে তুমি জানতে পারতে যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল, না বলেনি?!’ তিনি এ কথা বারবার বলতে থাকলেন। এমনকি আমার মনে হলো, হায়! যদি আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম! (সহিহ মুসলিম, হা/১৬)
.
এই ব্যক্তি শাহাদাহ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র সাক্ষ্য) আনয়ন করেছে, ফলে সে ইসলামের বন্ধনের আওতাভুক্ত হয়েছে (মুসলিম সাব্যস্ত হয়েছে)। কিন্তু ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে একটি বড়ো ইঙ্গিতবহ প্রমাণ রয়েছে, যা তার দাবির সত্যতার ব্যাপারে প্রবল সংশয় তৈরি করে। কেননা কিছুক্ষণ আগেও সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, মুসলিমদেরকে খুন করতে ব্যাপক চেষ্টাপ্রচেষ্টা করছিল এবং নিজের মাথার ওপর অস্ত্র দেখে পালিয়েও গিয়েছিল। এরপর বলেছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ সত্ত্বেও সে যেহেতু কালিমা পড়ার পরে ইসলাম-ভঙ্গকারী কোনো বিষয় সংঘটিত করেনি, তাই তাকে হত্যা করার জন্য উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভর্ৎসনা করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তির জন্য এই হাদিস এ বিষয়ের একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ-যে ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে, তাকে সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে কাফির বলা না-জায়েজ। যে ব্যক্তি শাহাদাতাইন তথা দুই সাক্ষ্য দিয়েছে, সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থা হচ্ছে-সে মুসলিম হিসেবেই সাব্যস্ত হবে; যতক্ষণ না ইসলাম-ভঙ্গকারী কোনো বিষয় সে সংঘটন করেছে বলে নিশ্চিত জানা যাচ্ছে। যখন আমরা নিশ্চিত জানতে পারব, সে ইসলাম-ভঙ্গকারী বিষয় সংঘটন করেছে, তখন সেই বিষয়ের ভিন্ন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে। এটি একটি ফলপ্রসূ মূলনীতি। এটি কাফির বলার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনের অপরাধ থেকে মুসলিমের অন্তরকে পবিত্র করে। ফলে যখনই সন্দেহ-সংশয় পাওয়া যাবে, তখনই তাকফির (কাফির-আখ্যান) রুদ্ধ হবে। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; বই, ইমান ভঙ্গের কারণ। মূল: ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ। ব্যাখ্যা: শাইখ ড. সুলাইমান আর-রুহাইলি হাফিজাহুল্লাহ অনুবাদ: মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা (হাফি) এবং ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২০৩২৭)।
(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment