Thursday, January 8, 2026

যদি কারও ঈমান ভেঙ্গে যায় তাহলে তার দুনিয়াবী জীবন এবং পরকালীন জীবনে পরিনতি কী হবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলামের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘ঈমান’। প্রত্যেক নবী-রাসূলের প্রথম দাওয়াত ছিল ঈমানের দাওয়াত। ঈমান ব্যতীত বান্দার কোন আমল আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। ঈমানের উপর নির্ভর করেই বান্দার জান্নাত-জাহান্নাম ও পরকালীন মুক্তি। আলোচ্য প্রবন্ধে যদি কারও ঈমান নষ্ট হয়ে যায়, তবে দুনিয়াবী এবং পরকালীন জীবনে তার পরিণতি কী হবে সে বিষয়ে আলোচনা করা হল।

.
প্রথমত: কারও ইমান ভেঙ্গে গেলে দুনিয়াবী জীবনে কী হয়?
(১).কারও ঈমান ভেঙ্গে গেলে তার শরয়ি অভিভাবকত্ব ও কর্তৃত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহর বিধানে সে আর নিজের সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে গণ্য হবে না। তেমনি, মুসলিমদের ওপর শরয়ি শাসন পরিচালনারও সে অধিকার রাখে না। যদি সে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তবে আল্লাহভীরু আলেমদের পরামর্শে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা আবশ্যক হবে।(দ্রষ্টব্য: নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ২২৯)
.
(২).সে মুসলিমদের উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, মুসলিম পিতা-মাতা কিংবা অন্য কোনো মুসলিম আত্মীয়ের সম্পত্তিতে তার কোনো অংশ বা অধিকার থাকে না।
(সহিহুল বুখারি হা/৬৭৬৪; সহিহ মুসলিম হা/১৬১৪)
.
(৩).ইমান ভেঙে গেলে ব্যক্তি মক্কা ও তার পবিত্র হারাম অঞ্চলে প্রবেশ করার অধিকার হারায়। দলিল আল্লাহর বানী:یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡمُشۡرِكُوۡنَ نَجَسٌ فَلَا یَقۡرَبُوا الۡمَسۡجِدَ الۡحَرَامَ بَعۡدَ عَامِهِمۡ هٰذَا ۚ”হে ঈমানদারগণ মুশরিকরা তো অপবিত্র; কাজেই এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের ধারে-কাছে না আসে।..(সুরা তাওবা: ২৮) এখানে মুশরিকরা অপবিত্র কথার অর্থ হল, আকীদা-বিশ্বাস ও আমল হিসাবে তারা (অভ্যন্তরীণভাবে) অপবিত্র।
.
(৪).তার জবাইকৃত পশুপাখির গোশত খাওয়া মুসলিমদের জন্য হারাম হয়ে যায়।যেহেতু আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ“(জবাইকালে) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি এমন প্রাণীর মাংস খেয়ো না।”[সূরা আন’আম: ১২১] এছাড়া তিনি হারাম প্রাণীসমূহের ব্যাপারে বলেন:إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ “আল্লাহ তোমাদের জন্য মৃতদেহ, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গীকৃত (অথবা জবাইকালে আল্লাহর নাম না নিয়ে দেব-দেবীর নামে জবাইকৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন)।”[সূরা বাকারা: ১৭৩](বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু কুদাম আল-মুগনি,খন্ড;১৩;পৃষ্ঠা;২৯৭)
.
(৫).তার সঙ্গে কোনো মুসলিম মেয়ের বিয়ে দেওয়া হারাম; আর সে যদি মেয়ে হয়, তবে কোনো মুসলিম পুরুষের জন্য তাকে বিয়ে করা হারাম। এর পক্ষে দলীল হল আল্লাহর বাণী:”হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কাছে মুমিন নারীরা হিজরত করে আসলে তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা করো আল্লাহ তাদের ঈমান সম্বন্ধে সম্যক অবগত। অতঃপর যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন নারী, তবে তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে না। মুমিন নারীগণ কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিরগণ মুমিন নারীদের জন্য বৈধ নয়।”(সুরা মুমতাহিনা: ১০)আর যদি স্বামী বা স্ত্রীর কারও ঈমান নষ্ট হয়ে যায়, তবে তাদের বিবাহবন্ধনও বাতিল হয়ে যায়; কারণ ঈমান ভঙ্গ হলে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকে থাকে না।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু কুদামা,আল-মুগনি, খণ্ড: ১০,পৃষ্ঠা: ৩৯)
.
(৬).যার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে, আল্লাহর শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তার মৃত্যু হলে তাকে গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, তার জানাজার নামাজ পড়া বৈধ নয়।এমনকি তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করাও নিষিদ্ধ; বরং তার জন্য দো‘আ করা বা ক্ষমা প্রার্থনাও জায়েজ নয়।দলিল: মহান আল্লাহর বানী:وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ “আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা আত-তাওবা: ৮৪) ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা: ৪৬৬) ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-মাজমূ’ বইয়ে বলেন: “কাফেরের জন্য রহমত প্রার্থনা করা ও তার ক্ষমার জন্য দোয়া করা কুরআনের দ্ব্যর্থহীন দলিল ও ইজমার ভিত্তিতে হারাম।(নববী আল-মাজমূ’ ৫/১২০)
.
▪️পক্ষান্তরে কারও ঈমান ভেঙে গেলে পরকালে কী হবে?
(১).মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ তার চেহারা ও পশ্চাদ্দেশে প্রহার করবেন। দলিল মহান আল্লাহর বানী:وَ لَوۡ تَرٰۤی اِذۡ یَتَوَفَّی الَّذِیۡنَ كَفَرُوا ۙ الۡمَلٰٓئِكَۃُ یَضۡرِبُوۡنَ وُجُوۡهَهُمۡ وَ اَدۡبَارَهُمۡ ۚ وَ ذُوۡقُوۡا عَذَابَ الۡحَرِیۡقِ”আর আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন ফিরিশতাগণ যারা কুফরী করেছে তাদের প্রাণ হরণ করছিল, তাদের মুখমণ্ডলে ও পিঠে আঘাত করছিল।আর বলছিল তোমরা দহনযন্ত্রণা ভোগ কর।”(সুরা আনফাল: ৫০) আলোচ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহর ফিরিশতাগণ কাফেরদের রূহ কবজ করছিলেন, তাদের মুখে ও পিঠে আঘাত করছিলেন এবং বলছিলেন যে, আগুনে জ্বলার আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর।
.
(২).সে কবরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে অপারগ হবে। ফলে কেয়ামত পর্যন্ত সে সেখানে কঠিন ও স্থায়ী শাস্তির মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে। তার জন্য কবরের ভেতর জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হবে, জাহান্নামের পোশাক পরিয়ে দেওয়া হবে, এবং জাহান্নামের দিকে একটি দ্বার খুলে দেওয়া হবে। এরপর তার কবর সংকুচিত করে ফেলা হবে, এমনকি এক পাশের পাঁজর অন্য পাশের পাঁজরের ভেতর ঢুকে যাবে।”(দেখুন আবু দাউদ, হা/৪৭৫৩)
(৩).তার পুনরুত্থান হবে কাফির ও মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ে।দলিল আল্লাহর বানী:اُحۡشُرُوا الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا وَ اَزۡوَاجَهُمۡ وَ مَا كَانُوۡا یَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ فَاهۡدُوۡهُمۡ اِلٰی صِرَاطِ الۡجَحِیۡمِ(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ‘একত্র কর যালিম ও তাদের সঙ্গী-সাথীদেরকে এবং যাদের ইবাদাত তারা করত তাদেরকে।আল্লাহর পরিবর্তে। আর তাদেরকে পরিচালিত কর জাহান্নামের পথে”।(সুরা সাফফাত: ২২-২৩) আয়াতের তাফসিরে আল্লামা শানকীতী বলেন, যালেম বলে এখানে কাফেরদেরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, পরবর্তী অংশ “আর যাদের ইবাদাত করত তারা আল্লাহর পরিবর্তে” থেকে এটাই সুস্পষ্ট। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে যুলুম বলে শির্ক উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [আদওয়াউল বায়ান]
.
(৪).সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে—যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত হবে যন্ত্রণার, আর সেই যন্ত্রণার কোনো শেষ থাকবে না। মুক্তির আশাও সেখানে চিরতরে নিভে যাবে।এমনকি জাহান্নাম থেকে আর কোনোদিন বের হওয়ার সুযোগ পাবে না।দলিল আল্লাহর বানী:اِنَّ اللّٰهَ لَعَنَ الۡكٰفِرِیۡنَ وَ اَعَدَّ لَهُمۡ سَعِیۡرًا خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَاۤ اَبَدًا ۚ لَا یَجِدُوۡنَ وَلِیًّا وَّ لَا نَصِیۡرًا “নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কাফিরদেরকে করেছেন অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য প্ৰস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত আগুন; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং তারা কোন অভিভাবক পাবে না, কোন সাহায্যকারীও নয়।(সুরা আহজাব: ৬৪-৬৬) পবিত্র কুরআনসহ শরীয়তের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে হাসি-ঠাট্টার বিধান”। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate