প্রশ্ন: ইবাদতের রুকনগুলো কি কি? এই রুকনগুলো কি ইবাদত কবুলের শর্ত?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ইবাদতের রুকন (মূলভিত্তি) বলতে সেই মৌলিক উপাদানগুলোকে বোঝায়,যেগুলো ছাড়া যে-কোন ইবাদত পরিপূর্ণ হয় না। উলামায়ে সালফদের-এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইবাদাতের ভিত্তি বা রুকন তিনটি-আর সেগুলো হল: “ভয়” (খাওফ),”আশা” (রজা) এবং “ভালোবাসা” (মাহাব্বাহ)।অন্তরের ইবাদতের এ তিনটি রুকনই দাসত্বের মূল ভিত্তি।কারন বান্দার অন্তর আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণভাবে বিনত ও নিবেদিত হয় তখনই, যখন তিনটি রুকনই একত্রে উপস্থিত থাকে। এদের কোনো একটি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকলে কোনো আমলই প্রকৃত অর্থে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় না। বরং পূর্ণ ইবাদতের জন্য এ তিনটির কমবেশি উপস্থিতি অপরিহার্য।ভালোবাসা বান্দাকে তাঁর রবের ইবাদতে আগ্রহী ও নিবেদিত করে।ভয় তাকে গুনাহ, হারাম ও অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখে।আর আশা তাকে আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ ও পুরস্কারের প্রতি প্রত্যাশায় সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে।এই তিনটি গুণ মিলেই গড়ে ওঠে প্রকৃত দাসত্ব।আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি বলেই তাঁর ইবাদত করি; আমরা তাঁর শাস্তিকে ভয় করি বলেই তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকি; এবং আমরা তাঁর দয়া ও প্রতিদানের আশায় থাকি বলেই অবিরাম তাঁর দিকে ফিরে যাই।এই ত্রিবিধ অনুভূতির সমন্বয় ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ইবাদত সম্ভব নয়।হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:و” العبادة ” تتضمن كمال الحب، وكمال التعظيم، وكمال الرجاء والخشية والإجلال والإكرام. …”ইবাদত বলতে বোঝায় আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা, পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা, পরিপূর্ণ আশা, এবং পরিপূর্ণ ভয়, মহিমা-স্বীকৃতি ও সম্মান প্রকাশ।”(ইবনু তায়মিয়াহ, জামে‘উর রাসায়েল; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৮৪) তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন;إن غلب عليه الرجاء ؛ وقعفي الأمن من مكر الله ، وإن غلب عليه الخوف ؛ وقع القنوط من رحمة الله ، وكلاهما من كبائر الذنوب “যদি কারো ওপর আশা (রজা) প্রাধান্য পায়, তাহলে সে আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ ভাবার মধ্যে পড়ে যায়। আর যদি তার ওপর ভয়ই প্রাধান্য পায়, তাহলে সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে। উভয়টিই বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাবিল মাফতূহ; ১১/৭)
.
ইবাদাতের তিনটি ভিত্তি কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। ভালোবাসা, ভয় এবং আশা এই তিনটি বিষয় কুরআনের এক আয়াতের মধ্যেই সমন্বিত আছে,আল্লাহ বলেন;اُولٰٓئِكَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ یَبۡتَغُوۡنَ اِلٰی رَبِّهِمُ الۡوَسِیۡلَۃَ اَیُّهُمۡ اَقۡرَبُ وَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَهٗ وَ یَخَافُوۡنَ عَذَابَهٗ ؕ اِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُوۡرًا”তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, আর তারা তার দয়া প্রত্যাশা করে এবং তার শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।”(সূরা বনি ইসরাইল;৫৭) অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:اِنَّهُمۡ كَانُوۡا یُسٰرِعُوۡنَ فِی الۡخَیۡرٰتِ وَ یَدۡعُوۡنَنَا رَغَبًا وَّ رَهَبًا ؕوَ كَانُوۡا لَنَا خٰشِعِیۡنَ “তারা সৎকাজে ঝাঁপিয়ে পড়তো, আর তারা আগ্রহ ও ভীতির সাথে আমাকে ডাকতো এবং তারা ছিল আমার কাছে ভীত-অবনত।”(সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৯০) উক্ত আয়াতের তাফসিরে ইবনে জারীর তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ( رَغَباً ) : أنهم كانوا يعبدونه رغبة منهم فيما يرجون منه ، من رحمته ، وفضله .( وَرَهَباً ) : يعني : رهبة منهم ، من عذابه ، وعقابه ، بتركهم عبادته ، وركوبهم معصيته .وبنحو الذي قلنا في ذلك قال أهل التأويل.“আগ্রহ” এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- তারা তাঁর ইবাদত করতো তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ পাওয়ার আশা আগ্রহ নিয়ে। “ভীতির সাথে” অর্থাৎ তাঁর ইবাদত বর্জন ও নিষেধ লঙ্ঘন করতো না তাঁর শাস্তির ভয়ে। আমরা যে তাফসির করেছি এ তাফসির অপরাপর তাফসিরকারকগণ উল্লেখ করেছেন।”(তাফসিরে তাবারী; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ৫২১)
.
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা হচ্ছে- শরয়ি ইবাদত: মহব্বত ও সম্মানকে অন্তর্ভুক্ত করে। মহব্বত আশা তৈরী করে; আর সম্মান ভয় তৈরী করে।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:والعبادة مبنية على أمرين عظيمين ، هما : المحبة ، والتعظيم ، الناتج عنهما : ( إنهم كانوا يسارعون في الخيرات ويدعوننا رغباً ورهَباً ) الأنبياء/ 90 ، فبالمحبة تكون الرغبة ، وبالتعظيم تكون الرهبة ، والخوف .ولهذا كانت العبادة أوامر ، ونواهي : أوامر مبنية على الرغبة ، وطلب الوصول إلى الآمر ، ونواهي مبنية على التعظيم ، والرهبة من هذا العظيم .فإذا أحببتَ الله عز وجل : رغبتَ فيما عنده ، ورغبت في الوصول إليه ، وطلبتَ الطريق الموصل إليه ، وقمتَ بطاعته على الوجه الأكمل ، وإذا عظمتَه : خفتَ منه ، كلما هممتَ بمعصية استشعرت عظمة الخالق عز وجل ، فنفرتَ ، ( وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ) يوسف/ 24 .فهذه مِن نعمة الله عليك ، إذا هممتَ بمعصية وجدتَ الله أمامك ، فهبتَ ، وخفتَ ، وتباعدتَ عن المعصية ؛ لأنك تعبد الله ، رغبة ، ورهبة”ইবাদত দুইটি মহান বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত: ভালবাসা ও সম্মান। আর এ দুইটি থেকে তৈরী হয়: “তারা সৎকাজে ঝাঁপিয়ে পড়তো, আর তারা আগ্রহ ও ভীতির সাথে আমাকে ডাকতো এবং তারা ছিল আমার কাছে ভীত-অবনত।”[সূরা আম্বিয়া: ৯০] সুতরাং ভালবাসার মাধ্যমে আগ্রহ তৈরী হয় এবং সম্মানের মাধ্যমে ভয়-ভীতি তৈরী হয়। এ কারণেই তো ইবাদত হচ্ছে- কতগুলো আদেশ ও নিষেধ। নির্দেশগুলোর ভিত্তি হচ্ছে- আগ্রহের উপর এবং নির্দেশকারীর কাছে পৌছার অভিপ্রায়ের উপর। আর নিষেধগুলোর ভিত্তি হচ্ছে- সম্মান করা ও এ সম্মানিত সত্তাকে ভয় করার উপর।যদি আপনি আল্লাহকে ভালবাসেন তাহলে তাঁর কাছে যা আছে সেটা পাওয়ার জন্য ও তাঁর কাছে পৌঁছার জন্য আপনি আগ্রহী হবেন, তাঁর কাছে পৌঁছার রাস্তা সন্ধান করবেন এবং পরিপূর্ণভাবে তাঁর আনুগত্য পালন করবেন।আর যদি আপনি আল্লাহকে সম্মান করেন: তাহলে আপনি তাঁকে ভয় করবেন, যখনি কোন গুনাহ করার আকাঙ্ক্ষা মনে জাগবে আপনি স্রষ্টার মহত্ত্ব অনুভব করে সে গুনাহ থেকে বিরত থাকবেন। “নিশ্চয় মহিলা তাকে আকাঙ্ক্ষা করেছিল এবং তিনিও মহিলাকে আকাঙ্ক্ষা করতেন; যদি না তিনিও স্বীয় রবের নিদর্শন দেখতে পেতেন।”[সূরা ইউসূফ, আয়াত: ২৪] সুতরাং আপনি যদি কোন পাপকাজ করার মনস্থ করেন এবং আল্লাহকে আপনার সামনে ভেবে ভয় পেয়ে যান, ভীত হয়ে পড়েন ও পাপ থেকে দূরে সরে আসেন তাহলে এটি আপনার প্রতি আল্লাহর নেয়ামত। যেহেতু আপনি আগ্রহ ও ভয় দুটোর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে পারলেন।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ১৭, ১৮)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] বলেন:اﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﺗﺘﺮﻛﺰ ﻋﻠﻰ ﺛﻼﺛﺔ ﺃﺷﻴﺎء: ﻋﻠﻰ اﻟﻤﺤﺒﺔ، ﻭﻋﻠﻰ اﻟﺨﻮﻑ، ﻭﻋﻠﻰ اﻟﺮﺟﺎء و ﻫﻲ ﺭﻛﺎﺋﺰ اﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﻭﺃﺳﺎﺳﻬﺎ، ﻓﺈﺫا اﺟﺘﻤﻌﺖ ﺗﺤﻘﻘﺖ اﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﻭﻧﻔﻌﺖ ﻛﺎﻟﺼﻼﺓ ﻭاﻟﺤﺞ ﻭﺳﺎﺋﺮ اﻟﻌﺒﺎﺩاﺕ، ﺃﻣﺎ ﺇﺫا اﺧﺘﻠﺖ ﻫﺬﻩ اﻟﺜﻼﺛﺔ ﻓﺈﻥ اﻹﻧﺴﺎﻥ ﻭﺇﻥ ﺻﺎﻡ ﻭﺇﻥ ﺻﻠﻰ ﻭﺇﻥ ﺣﺞ ﻓﺈﻧﻬﺎ ﻻ ﺗﻜﻮﻥ ﻋﺒﺎﺩﺗﻪ ﺻﺤﻴﺤﺔ”ইবাদত তিনটি বিষয়ের ওপরই প্রতিষ্ঠিত: আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহর ভয়, এবং আল্লাহর প্রতি আশা। এগুলোই ইবাদতের স্তম্ভ ও মূলভিত্তি।এই তিনটি একত্র হলে ইবাদত সম্পূর্ণ হয় এবং উপকারী হয়,যেমন- স্বলাত, হজ্জ এবং অন্যান্য সব ইবাদত।কিন্তু যদি এ তিনটির মধ্যে কোনো একটি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে মানুষ রোজা রাখলেও, নামাজ পড়লেও, হজ্জ করলেও তার ইবাদত সঠিক হবে না।”
.
তিনি (হাফিজাহুল্লাহ) আরও বলেন:
ﻭﻳﻘﻮﻝ اﻟﻌﻠﻤﺎء: “ﻣﻦ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﺎﻟﻤﺤﺒﺔ ﻓﻘﻂ ﻓﻬﻮ ﺻﻮﻓﻲ”،
ﻷﻥ اﻟﺼﻮﻓﻴﺔ ﻳﺰﻋﻤﻮﻥ ﺃﻧﻬﻢ ﻳﻌﺒﺪﻭﻥ اﻟﻠﻪ ﻷﻧﻬﻢ ﻳﺤﺒﻮﻧﻪ ﻓﻘﻂ، ﻭﻳﻘﻮﻟﻮﻥ: ﻻ ﻧﻌﺒﺪﻩ ﻧﺨﺎﻑ ﻣﻦ ﻧﺎﺭﻩ ﻭﻻ ﻧﺮﺟﻮ ﺟﻨﺘﻪ، ﻭﺇﻧﻤﺎ ﻧﻌﺒﺪﻩ ﻷﻧﻨﺎ ﻧﺤﺒﻪ. ﻭﻫﺬا ﺿﻼﻝ.
ﻭﻣﻦ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﺎﻟﺮﺟﺎء ﻓﻘﻂ ﻓﻬﻮ ﻣﺮﺟﺊ ، ﻷﻥ اﻟﻤﺮﺟﺌﺔ ﻳﺨﺮﺟﻮﻥ اﻷﻋﻤﺎﻝ ﻋﻦ ﻣﺴﻤﻰ اﻹﻳﻤﺎﻥ.
ﻭﻣﻦ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﺎﻟﺨﻮﻑ ﻓﻘﻂ ﻓﻬﻮ ﺧﺎﺭﺟﻲ، ﻷﻥ اﻟﺨﻮاﺭﺝ ﻳﻜﻔﺮﻭﻥ اﻟﻤﺆﻣﻨﻴﻦ ﺑﺎﻟﻤﻌﺎﺻﻲ.
ﻓﺎﻟﻤﺮﺟﺌﺔ ﺃﺧﺬﻭا ﺟﺎﻧﺐ اﻟﺮﺟﺎء ﻓﻘﻂ، ﻭاﻟﺼﻮﻓﻴﺔ ﺃﺧﺬﻭا ﺟﺎﻧﺐ اﻟﻤﺤﺒﺔ ﻓﻘﻂ، ﻭاﻟﺨﻮاﺭﺝ ﺃﺧﺬﻭا ﺟﺎﻧﺐ اﻟﺨﻮﻑ ﻓﻘﻂ.
ﻭﺃﻫﻞ اﻟﺴﻨﺔ ﻭاﻟﺠﻤﺎﻋﺔ ﺟﻤﻌﻮا ﺑﻴﻦ اﻷﻣﻮﺭ اﻟﺜﻼﺛﺔ ﻭﻟﻠﻪ اﻟﺤﻤﺪ : اﻟﻤﺤﺒﺔ ﻣﻊ اﻟﺨﻮﻑ ﻭاﻟﺮﺟﺎء ﻭاﻟﺬﻝ ﻭاﻻﻧﻘﻴﺎﺩ ﻭاﻟﻄﺎﻋﺔ، ﻭﺑﻨﻮا ﻋﻠﻰ ﺫﻟﻚ ﺳﺎﺋﺮ ﺃﻧﻮاﻉ التعبد ﻭاﻟﺘﻘﺮﺏ ﺇﻟﻰ اﻟﻠﻪ ﺳﺒﺤﺎﻧﻪ ﻭﺗﻌﺎﻟﻰ
আহালুল আলেমগন বলেছেন:
(১).যে কেবল ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে আল্লাহর ইবাদত করে সে সুফি; কারণ সুফিরা দাবি করে আমরা আল্লাহকে কেবল ভালোবাসি বলে ইবাদত করি। আমরা জাহান্নামের ভয় থেকে ইবাদত করি না, জান্নাতের আশা থেকেও করি না শুধু ভালোবাসার জন্য করি। এটি হলো ভ্রান্ত মত।
(২).যে শুধু আশার (রজা) ওপর ইবাদত করে সে মুরজিঈ;কারণ মুরজিয়ারা আমলকে ঈমানের সংজ্ঞা থেকে বের করে দেয়। তারা মনে করে শুধু আশা থাকলেই যথেষ্ট।
(৩).যে কেবল ভয় (খাওফ) দিয়ে ইবাদত করে সে খারিজি; কারণ খারিজিরা কবিরাহ গোনাহ করার কারণে মুসলিমদেরকে কাফির বলে।সুতরাং মুরজিয়ারা শুধু আশা নিয়েছে, সুফিরা শুধু ভালোবাসা নিয়েছে, আর খারিজিরা শুধু ভয় নিয়েছে। কিন্তু শুদ্ধ ইসলাম হলো ভালোবাসা, ভয় এবং আশা এই তিনটি একসঙ্গে রেখে আল্লাহর ইবাদত করা।আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনটি মূল ভিত্তিকে একত্র করেছেন এটাই তাদের বৈশিষ্ট্য ও প্রশংসনীয় পন্থা। এই তিনটি হলো: আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর ভয় ও তাঁর প্রতি আশা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আল্লাহর সামনে বিনয়, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য। তারা এসব ভিত্তির ওপরই সমস্ত ধরনের ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ গঠন করেছেন।”(ইআনাতুল মুস্তাফীদ শারহু কিতাবুত তাওহীদ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৬-৩৭)
.
ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন,لا صلاح للقلوب حتى يستقر فيها معرفة الله وعظمته ومحبته، وخشيته ومهابته، ورجاؤه والتوكل عليه، وتمتلئ من ذلك، وهذا هو حقيقة التوحيد، وهو معنى قول: لا إله إلا الله، فلا صلاح للقلوب حتى يكون إلهها الذي تألهه وتعرفه وتحبه وتخشاه هو الله وحده لا شريك له.”হৃদয়ের কোনো সংশোধন হবে না যতক্ষণ না সেই হৃদয়ে আল্লাহকে চেনা, তাঁর মহত্ত্ব উপলব্ধি করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, মর্যাদা ও ভরসা স্থায়ীভাবে স্থাপিত হয় এবং হৃদয় এগুলোর দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। এটাই তাওহীদের সত্য রূপ, এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর প্রকৃত অর্থ। হৃদয় কখনোই ঠিক হবে না যতক্ষণ না তার উপাস্য, যাকে সে মানবে, ভালোবাসবে ও ভয় করবে সেটি শুধু আল্লাহ একাই হয়, তাঁর কোনো শরিক নেই।”(ইমাম ইবনু রজব হাম্বালী, জামিঊল ‘উলূম ওয়াল হিকাম; পৃষ্ঠা: ৭১)
.
ইমাম ইবনু আবিল ‘ইয হানাফি (রাহিমাহুল্লাহ),শারহুল আক্বীদাহ আত- ত্বাহাউয়িয়্যাহ গ্রন্থে বলেন: يجب أن يكون العبد خائفا راجيا، فإن الخوف المحمود الصادق: ما حال بين صاحبه وبين محارم الله، فإذا تجاوز ذلك خيف منه اليأس والقنوط. والرجاء المحمود: رجاء رجل عمل بطاعة الله، على نور من الله، فهو راج لثوابه، أو رجل أذنب ذنبا ثم تاب منه إلى الله، فهو راج لمغفرته. قال الله تعالى: {إن الذين آمنوا والذين هاجروا وجاهدوا في سبيل الله أولئك يرجون رحمة الله والله غفور رحيم}.أما إذا كان الرجل متماديا في التفريط والخطايا، يرجو رحمة الله بلا عمل، فهذا هو الغرور والتمني والرجاء الكاذب.قال: أبو علي الروذباري رحمه الله: الخوف والرجاء كجناحي الطائر، إذا استويا استوى الطير وتم طيرانه، وإذا نقص أحدهما وقع فيه النقص، وإذا ذهبا صار الطائر في حد الموت… فالرجاء يستلزم الخوف، ولولا ذلك لكان أمنا، والخوف يستلزم الرجاء، ولولا ذلك لكان قنوطا ويأسا. وكل أحد إذا خفته هربت منه، إلا الله تعالى، فإنك إذا خفته هربت إليه، فالخائف هارب من ربه إلى ربه…وقال بعضهم: من عبد الله بالحب وحده فهو زنديق، ومن عبده بالخوف وحده فهو حروري. وروي: ومن عبده بالرجاء وحده فهو مرجئ، ومن عبده بالحب والخوف والرجاء فهو مؤمن موحد …”বান্দার উচিত ভয় ও আশার মাঝে থাকা। প্রশংসনীয় ভয় হলো যে ভয় মানুষকে আল্লাহর হারাম কাজ থেকে দূরে রাখে। কিন্তু যদি ভয় এত বাড়ে যে আশা নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা হতাশার দিকে নিয়ে যায়। প্রশংসনীয় আশা হলো যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত নূরের ওপর ভিত্তি করে তাঁর প্রতিদানের আশায় থাকে। অথবা যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে পরে আন্তরিকভাবে তওবা করে, সে আল্লাহর ক্ষমার আশা করে। আল্লাহ বলেছেন: যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তারা আল্লাহর রহমতের আশা রাখে। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।কিন্তু কেউ যদি অবহেলা ও পাপের মধ্যে লিপ্ত থাকে এবং কাজ ছাড়া শুধু আল্লাহর রহমতের আশা করে তাহলে এটি প্রতারণা, মিথ্যা আশা এবং গোমরাহি।আবু আলী আর রূযবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ভয় ও আশা পাখির দুই ডানার মতো। দুটো সমান থাকলে পাখি সুন্দরভাবে উড়তে পারে। কোনোটি কমে গেলে উড়ান কমে যায়। দুটোই না থাকলে পাখি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যায়।তাই সত্যিকারের আশা অবশ্যই ভয়ের সঙ্গে থাকে ভয় না থাকলে তা নির্ভীকতা হয়ে যায়। আর সত্যিকারের ভয় আশা সৃষ্টি করে আশা না থাকলে তা হতাশা হয়ে দাঁড়ায়। আর সব সৃষ্টির ক্ষেত্রে এমন যাকে তুমি ভয় পাও তার থেকে দূরে পালাও কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে উল্টো তুমি আল্লাহকে ভয় পেলে তাঁর দিকেই দৌড়ে ফিরে যাও। তাই আল্লাহকে ভয়কারী ব্যক্তি তাঁর রবের কাছ থেকেই তাঁর রবের দিকে পলায়ন করে।কিছু আলেম বলেছেন: যে ব্যক্তি শুধু ভালোবাসার ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করে সে হলো বিধর্মী ।আর যে ব্যক্তি কেবল ভয়কে ভিত্তি করে ইবাদত করে সে হারুরি (খারিজিদের মতাবলম্বী)।আর বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আশাকে ভিত্তি করে ইবাদত করে সে মুরজিঈ।আর যে ব্যক্তি ভালোবাসা, ভয় এবং আশা এই তিনটির সমন্বয়ে ইবাদত করে সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার ও তাওহীদবাদী।”(শারহুল আক্বীদাহ আত- ত্বাহাউয়িয়্যাহ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৫৬; গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-৪৮২৬৫৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন গ্রন্থে বলেছেন:,فضيلة كل شيء بقدر إعانته على طلب السعادة، وهي لقاء الله تعالى، والقرب منه، فكل ما أعان على ذلك فهو فضيلة…”প্রত্যেক বিষয়ের মর্যাদা নির্ভর করে সেটি কতটুকু সাহায্য করে প্রকৃত সুখ অর্জনে। আর প্রকৃত সুখ হলো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ এবং তাঁর নৈকট্য লাভ। সুতরাং যা কিছু মানুষকে এ লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে সেটিই প্রকৃত গুণ/মহত্ত্ব।” তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: জেনে রাখুন, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ভয় উত্তম, নাকি আশা উত্তম? এ প্রশ্ন ঠিক তেমন যেমন কেউ জিজ্ঞেস করে: রুটি উত্তম নাকি পানি উত্তম?
وجواب: أن يقال الخبز للجائع أفضل، والماء للعطشان أفضل، فإن اجتمعا نظر إلى الأغلب، فإن استويا، فهما متساويان، والخوف والرجاء دواءان يداوى بهما القلوب، ففضلهما بحسب الداء الموجود، فإن كان الغالب على القلب الأمن من مكر الله، فالخوف أفضل، وكذلك إن كان الغالب على العبد المعصية، وإن كان الغالب عليه اليأس والقنوط، فالرجاء أفضل….
“এর সঠিক উত্তর হলো ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য রুটি উত্তম, আর তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য পানি উত্তম। যদি উভয় অবস্থাই একত্রে থাকে, তখন দেখা হবে কোন প্রয়োজন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। আর যদি দুটোই সমান হয়, তবে দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।একইভাবে ভয় ও আশা এ দুটি হলো হৃদয়ের রোগ দূর করার ঔষুধ। হৃদয়ে যে রোগ বেশি ঔষুধও সে অনুযায়ী হবে। যদি কারো হৃদয়ে আল্লাহর আযাব থেকে নিরাপদে থাকার প্রবণতা (আত্মতুষ্টি) বেশি থাকে তাহলে তার জন্য ভয় উত্তম। যদি কারো মধ্যে গুনাহের প্রবণতা বেশি থাকে তাহলেও ভয় অধিক উপযোগী। কিন্তু যদি হতাশা ও নিরাশা তাকে গ্রাস করে তাহলে তার জন্য আশা উত্তম।”(মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন; পৃষ্ঠা: ৩০৫; গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-৪৮২৬৫৯)। ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) তার মাদারিজুস সালিকীন গ্রন্থে বলেছেন:القلب في سيره إلى الله عز وجل بمنزلة الطائر، فالمحبة رأسه، والخوف والرجاء جناحاه، فمتى سلم الرأس والجناحان فالطائر جيد الطيران، ومتى قطع الرأس مات الطائر، ومتى فقد الجناحان فهو عرضة لكل صائد وكاسر، ولكن السلف استحبوا أن يقوى في الصحة جناح الخوف على جناح الرجاء، وعند الخروج من الدنيا يقوى جناح الرجاء على جناح الخوف، هذه طريقة أبي سليمان، وغيره، قال: ينبغي للقلب أن يكون الغالب عليه الخوف، فإن غلب عليه الرجاء فسد. وقال غيره: أكمل الأحوال: اعتدال الرجاء والخوف، وغلبة الحب، فالمحبة هي المركب. والرجاء حاد، والخوف سائق، والله الموصل بمنه وكرمه.”আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে মানুষের হৃদয় হলো একটি পাখির মতো।পাখির মাথা হলো ভালোবাসা, আর দুই ডানা হলো ভয় ও আশা। মাথা এবং ডানা ঠিক থাকলে পাখিটি ভালোভাবে উড়তে পারে। মাথা কাটা গেলে পাখি মারা যায়। আর ডানা হারালে পাখি শিকারি ও ধ্বংসকারীর সামনে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে।তবে সালাফগণ (প্রথম যুগের সৎকর্মশীলরা) বলেছেন সুস্থ অবস্থায় ভয় এর ডানাকে কিছুটা শক্তিশালী রাখা উচিত। আর মৃত্যুর সময় আশা-এর ডানা বেশি শক্তিশালী হওয়া উচিত। এটি ছিল আবু সুলায়মান (রহ.)-এর পদ্ধতি এবং অনেক আলেমের মতামত।তিনি আরও বলেন: হৃদয়ে ভয় প্রাধান্য থাকা উচিত। যদি আশা বেশি প্রাধান্য পায় হৃদয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অন্যরা বলেছেন: সর্বোত্তম অবস্থা হলো আশা ও ভয় দুটোই ভারসাম্যপূর্ণ থাকা, আর ভালোবাসা এগুলোর ওপর প্রাধান্য পাওয়া। কারণ ভালোবাসা হলো বাহন, আশা হলো পথ দেখানো গাইড (চালক), আর ভয় হলো সামনে ঠেলে নিয়ে যাওয়া প্রেরণা। আর আল্লাহই তাঁর অনুগ্রহ ও করুণায় মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন।”(মাদারিজুস সালিকীন; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৫১৪; গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-৪৮২৬৫৯)
.
মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মাসজিদে নাবাউয়ীর সম্মানিত মুদার্রিস, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রাযযাক্ব বিন ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বদর (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৮২ হি.] যিকিরসহ অন্তরের ইবাদাতের মূলভিত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন;
إنَّ ذكر الله عز وجل والتقرّب إليه بما يحبّ من صالح الأعمال والأقوال لا يكون مقبولاً عند الله إلاّ إذا أقامه العابد على أركان ثلاثة، وهي الحب والخوف والرّجاء. فهذه الأركان الثلاثة هي أركان التعبّد القلبية التي لا قبول لأيِّ عبادة إلاّ بها، فالله جلّ وعلا، يعبد حبًّا فيه ورجاءً لثوابه وخوفًا من عقابه، وقد جمع الله تبارك وتعالى بين هذه الأركان الثلاثة في سورة الفاتحة التي هي أفضل سور القرآن، فقوله سبحانه: {الحَمْدُ للهِ رَبِّ العَالَمِينَ} فيه المحبّة؛ لأنَّ الله منعم، والمنعم يُحب على قدر إنعامه؛ ولأنَّ الحمد هو المدح مع الحبّ للممدوح. وقوله: {الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} فيه الرجاء، فالمؤمن يرجو رحمة الله ويطمع في نيلها، وقوله: {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} فيه الخوف، ويوم الدّين هو يوم الجزاء والحساب، ثمّ قال تعالى: {إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ} أي أعبدك يا ربّ بما مضى بهذه الثلاث: بمحبّتك ورجائك وخوفك، فهذه الثلاث هي أركان العبادة التي عليها قيام {إِيَّاكَ نَعْبُدُوَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ} فـ {إِيَّاكَ نَعْبُدُ} لا تقوم إلاّ على المحبّة التي دلّ عليها قوله {الحَمْدُ للهِ رَبِّ العَالَمِينَ} والرّجاء الذي دلّ عليه قوله {الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} والخوف الذي دلّ عليه قوله {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} ١.وقد جمع الله أيضًا بين هذه الأركان في قوله: {أُولَئِكَ الَّذِينَ
”আল্লাহ তা‘আলার যিকির এবং তাঁর (পছন্দনীয় সকল) নেক আমল ও উত্তম কথাবার্তার মাধ্যমে বান্দা যে নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে—তা ততক্ষণ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না সে এগুলোকে তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। আর সেই তিনটি ভিত্তি হলো: ভালোবাসা (المحبة)، ভয় (الخوف)، এবং আশা (الرجاء)। এই তিনটি রুকন বা ভিত্তি হলো অন্তরের ইবাদতের এমন ভিত্তি,যা ছাড়া কোনো ইবাদতই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ জাল্লা ওয়া আ’লা-এর ইবাদত করা হয় তাঁকে ভালোবাসার কারণে، তাঁর পুরস্কারের আশায় এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা এই তিনটি ভিত্তিকে একত্র করেছেন সূরা ফাতিহায়, যা কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা। আল্লাহর বানী: {الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ}—যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”(সূরা ফাতেহা: ১) এখানে রয়েছে ভালবাসা কারণ আল্লাহ মহা-অনুগ্রহকারী; আর অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা স্বাভাবিক। পাশাপাশি, “হামদ” শব্দের মধ্যেই রয়েছে—প্রশংসা ও ভালোবাসা উভয়ের সমন্বয়। অতঃপর الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ۙ”যিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু।”(সূরা ফাতেহা: ২) এখানে রয়েছে আশা কারণ মুমিন আল্লাহর অশেষ রহমতের আশা রাখে এবং তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা করে।{مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} যিনি বিচার দিনের মালিক।”(সূরা ফাতেহা: ৩) এখানে রয়েছে ভয় কারণ ‘ইয়াওমিদ্দীন’ হলো প্রতিফল ও হিসাবের দিন, যা বান্দার মনে ভয় ও সচেতনতা সৃষ্টি করে। এরপর আল্লাহ্ বলেন: {إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ} অর্থাৎ—“হে প্রভু! আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদাত করি”—এই তিনটি ভিত্তির মাধ্যমে: আপনার প্রতি ভালোবাসা, আপনার রহমতের আশা এবং আপনার শাস্তির ভয়। এ তিনটি ভিত্তিই হলো ইবাদাতের স্তম্ভ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে {إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ}।সুতরাং—{إِيَّاكَ نَعْبُدُ} দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ভালোবাসার উপর—যা প্রমাণিত হয়েছে {الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} দ্বারা, প্রতিষ্ঠিত আশার উপর—যা প্রমাণিত হয়েছে {الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} দ্বারা,এবং প্রতিষ্ঠিত ভয়ের উপর—যা প্রমাণিত হয়েছে {مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ} দ্বারা। এভাবেই আল্লাহ্ তাআলা একটি সূরার মধ্যেই ইবাদাতের এই তিন ভিত্তিকে একত্র করেছেন।”(ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওহহাব—সংকলিত রচনাবলি, আকীদা ও ইসলামী আদব, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮২–৩৮৩; এবং আব্দুর রাযজাক আল-বদর; ফিকহুল আদ‘ইয়া ওয়াল-আযকার; পৃষ্ঠা: ১০৯)।
ভালবাসা, ভয় এবং আশা এই রুকনগুলো কি ইবাদত কবুলের শর্ত?
.
এখানে আমাদের দু’টি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি: ইবাদতের রুকন এবং ইবাদত কবুলের শর্ত।
ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, ইবাদতের রুকন হচ্ছে সেই মৌলিক উপাদানগুলো, যেগুলো ছাড়া কোনো আমল প্রকৃত অর্থে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় না।উদাহরণস্বরূপ,আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে বান্দা যখন কোনো আমল করে, সেটি ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে তার ভেতরে ভালবাসা, ভয় ও আশা—এই তিনটি রুকনের উপস্থিতি জরুরি।অন্যদিকে, ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত হলো আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণ করা। অর্থাৎ,একজন মুসলিম যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত করে,তখন তাকে তা আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে তাঁর ইবাদত করতে হবে।সুতরাং শুধুমাত্র রুকন থাকা মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইবাদত কবুল নয়; বরং কবুল হওয়ার জন্য রুকনের সাথে ইবাদত কবুলের শর্তগুলোও পূরণ করতে হয়।
.
ইবাদত সংক্রান্ত মূলনীতি হচ্ছে,তাওক্বীফিয়্যাহ তথা বিলকুল কুরআন-হাদীসের দলিলনির্ভর, এতে বিবেকের কোনো স্থান নেই।(অর্থাৎ,ইবাদতগুলোকে শুধুমাত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে করতে হবে যেখানে ব্যক্তিগত মতামতের কোন অবকাশ নেই)। শার’ঈ প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রকার ইবাদত নির্ধারিত নয়। যে ব্যক্তি এমন কিছু নিয়ে আসে যা আল্লাহ বা তাঁর রাসূল ﷺ) কর্তৃক নির্ধারিত ছিল না, সে আল্লাহর দ্বীনে একটি বিদআত প্রবর্তন করেছে এবং তার এই কাজটি প্রত্যাখ্যান করা হবে, কারণ যেকোন আমল আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য হওয়ার জন্য নিদিষ্ট শর্ত পূরন করা আবশ্যক।প্রখ্যাত তাবি‘ তাবি‘ঈ, আহলুস সুন্নাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘আলিম, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ফুদ্বাইল বিন ‘ইয়াদ্ব (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৮৭ হি.] বলেছেন,إنَّ الْعَمَلَ إذَا كَانَ خَالِصًا وَلَمْ يَكُنْ صَوَابًا لَمْ يُقْبَلْ، وَإِذَا كَانَ صَوَابًا وَلَمْ يَكُنْ خَالِصًا لَمْ يُقْبَلْ، حَتَّى يَكُونَ خَالِصًا صَوَابًا فَالْخَالِصُ أَنْ يَكُونَ لِلَّهِ، وَالصَّوَابُ أَنْ يَكُونَ عَلَى السُّنَّةِ،”নিশ্চয়ই আমল যদি একনিষ্ঠ (খাঁটি) হয়, কিন্তু বিশুদ্ধ (সহীহ) না হয়, তবে তা কবুল হবে না।আবার যদি সঠিকভাবে আমল সম্পাদন করা হয়, কিন্তু সেটা যদি একনিষ্ঠভাবে না করা হয়,সে আমলও কবুল করা হবে না। যতক্ষণ সেই আমল একই সাথে খালেস ও সঠিক না হবে। আমল খালেস হওয়ার অর্থ হলো তা কেবল আল্লাহর জন্যই সম্পাদিত হওয়া। আর সঠিক হওয়ার অর্থ হলো সেই আমল রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত মোতাবেক হওয়া”।(ইবনু তাইমিয়াহ, ইক্বতিযাউস সিরাত্বিল মুস্তাক্বীম, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৭৩)
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোনও ইবাদত আল্লাহ্র কাছে কবুল হওয়া এবং বান্দা এর সওয়াবপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক দুটো শর্ত পরিপূর্ণ হতে হবে:
.
.
মহান আল্লাহ বলেন,وما أمروا إلا ليعبدوا الله مخلصين له الدين حنفاء”অথচ তাদেরকে এই আদেশই দেওয়া হয়েছিল যে, অন্য সব (ধর্ম) থেকে বিমুখ হয়ে দ্বীনকে আল্লাহ্র জন্য একনিষ্ঠ করে তারা আল্লাহ্র ইবাদত করবে।”[সূরা বাইয়্যেনা: ৫] ইখলাস (একনিষ্ঠতা) মানে: বান্দার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সকল বচন ও কর্মের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্র সন্তষ্টি অন্বেষণ। আল্লাহ্ তাআলা বলেন,”তার কাছে কারো এমন কোন অনুগ্রহ থাকে না,যার প্রতিদান দিতে হবে (অর্থাৎ সে কারো কাছ থেকে এরকম কোন অনুগ্রহ পেতে চায় না), সে শুধু তার সুউচ্চ প্রভুর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে”।(সূরা লাইল: ১৯-২০) মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদেরকে খাওয়াই আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোন প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাইনা।(সূরা ইনসান: ৯] আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেন, “যে ব্যক্তি পরকালের ফসল (পুরস্কার) চায় তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই, আর যে ইহকালের ফসল চায় তাকে আমি তা থেকে (কিছু) দিয়ে দেই।আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না”।[সূরা শূরা: ২০] তিনি আরও বলেন, “যারা দুনিয়ার জীবন ও চাকচিক্য চায় আমি তাদেরকে সেখানে তাদের কাজের পুরোপুরি ফল দিয়ে থাকি, সেখানে তাদেরকে (কোন কিছু) কম দেওয়া হবে না। ওদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু নাই। এখানে তারা যা কিছু করেছে তা নিষ্ফল হয়েছে এবং তারা যেসব কাজ করত তা বাতিল।[সূরা হুদ: ১৫-৬] উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে তিনি বলেন, আমলসমূহের শুদ্ধাশুদ্ধি কেবল নিয়তের উপরই নির্ভর করে প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে সেটাই তার প্রাপ্য। অতএব যার হিজরত হবে দুনিয়া পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা কোন নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে তাহলে সে যে উদ্দেশ্যে সফর করেছে সে উদ্দেশ্যেই তার হিজরত পরিগণিত হবে।(সহিহ বুখারী; ওহীর সূচনা হা/১) সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদিস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ বলেন;أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنْ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ”আমি শির্ককারীদের শির্ক (অংশ) থেকে সর্বাধিক অমুখাপেক্ষীযে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যে আমলে সে আমার সাথে অন্যকেও অংশীদার করে আমি সেই ব্যক্তিকে ও সেই ব্যক্তির আমল প্রত্যাখ্যান করি।”(সহিহ মুসলিম, (আয-যুহদ ওয়ার রাকায়েক/৫৩০০)
.
.
হাফিয যাইনুদ্দীন আবুল ফারজ ‘আব্দুর রহমান বিন শিহাব—যিনি ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ—রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.] বলেছেন,
هذا الحديث أصل عظيم من أصول الإسلام وهو كالميزان للأعمال في ظاهرها، كما أن حديث إنما الأعمال بالنيات ميزان للأعمال في باطنها، فكما أن كل عمل لا يُراد به وجه الله تعالى، فليس لعامله فيه ثواب، فكذلك كل عمل لا يكون عليه أمر الله ورسوله فهو مردود على عامله، وكل من أحدث في الدين ما لم يأذن به الله ورسوله، فليس من الدين في شيء
“এ হাদিসটি ইসলামের একটি সুমহান মূলনীতি। এটি আমলের বহিঃরূপের মানদণ্ড; যেমনিভাবে “সকল আমলের শুদ্ধাশুদ্ধি নিয়তের উপর নির্ভরশীল” হাদিসটি আমলগুলোর আন্তঃরূপের মানদণ্ড। যে সকল আমলের মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি চাওয়া হয় না সে সব আমলের জন্য আমলকারী যেমন সওয়াব পাবে না; ঠিক তেমনি প্রত্যেক যে আমল আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনা মোতাবেক সম্পাদিত হবে না সেটাও আমলকারীর উপর প্রত্যাখ্যাত হবে। আর প্রত্যেক যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে এমন কোন কিছু চালু করে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা করার অনুমতি দেননি সেটি ধর্মীয় কিছু নয়।”(জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৭৬)
.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করার এবং এ দুটোকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,”তোমাদের উপর আবশ্যক আমার সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং আমার পরে সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ্ অনুসরণ করা। তোমরা এটাকে মাড়ির দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধর।” তিনি বিদাত থেকে সাবধান করে বলেছেন,”তোমরা নব
চালুকৃত বিষয়াবলী থেকে বেঁচে থাক।কেননা প্রত্যেক বিদাত পথভ্রষ্টতা”।(সুনানে তিরমিযি হা/২৬০০) ইমাম ইবনু কাইয়্যেম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:فإن الله جعل الإخلاص والمتابعة سببا لقبول الأعمال فإذا فقد لم تقبل الأعمال”আল্লাহ্ তাআলা ইখলাস ও অনুসরণকে আমল কবুলের দুটো হেতু হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যদি কোন একটি হেতু না পাওয়া যায় তাহলে সে আমল কবুল হবে না।(ইবনু কাইয়ুম; আর-রূহ: ১/১৩৫) আল্লাহ্ তাআলা বলেন,”যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য; তোমাদের মধ্যে কে আমলে ভালো।” ইমাম ফুযাইল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: أحسن عملاً، أخلصه وأصوبه.আমলে ভালো অর্থাৎ আমলটি অধিকতর ইখলাসপূর্ণ ও অধিকতর শুদ্ধ। (বিস্তারিত দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪২৫৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment