মানুষ সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে কোনো বিষয়কে দৃঢ়ভাবে উপস্থাপনের জন্য কসম বা শপথ করে থাকে। কিন্তু ইসলামের সঠিক জ্ঞান না থাকা অথবা নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে এমনভাবে কসম করা হয়, যা একজন মুমিনকে ভয়াবহ গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। তাই ইমান রক্ষার্থে কসমের সঠিক পদ্ধতি ও শরয়ি বিধান জানা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
❑ কসমের সঠিক ও ভুল পদ্ধতি:
ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার নামে অথবা তাঁর কোনো গুণবাচক নামের মাধ্যমেই কসম করা বৈধ। কসমের মূল উদ্দেশ্য হল, যাকে সাক্ষী রেখে কসম করা হচ্ছে বা যার নামে কসম করা হচ্ছে, তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা। আর সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা একমাত্র মহান আল্লাহরই প্রাপ্য।
উদাহরণ: “আল্লাহর কসম”, “আল্লাহর জাতের কসম”, “কাবার রবের কসম”, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম” ইত্যাদি।
আল্লাহর গুণাবলীর কসম: “আল্লাহর ইজ্জতের কসম”, ”আল্লাহর কুদরতের কসম”, “আল্লাহর কালামের কসম” ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ তাঁর বিশাল সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে যা ইচ্ছা তার কসম করতে পারেন, এটি একান্তই তাঁর অধিকার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূর্য, চন্দ্র, রাত, দিন, ফজর ও আসর ইত্যাদির কসম খেয়েছেন। কিন্তু সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর নামে কসম খাওয়ার অধিকার মানুষের নেই। কিন্তু মানুষের জন্য মাখলুক বা সৃষ্টির নামে কসম খাওয়া কুফরি বা শিরক পর্যায়ের গুনাহ। আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল কসম হলো:
❂ মাটির কসম, মা-বাবার কসম, ছেলে-মেয়ের কসম।
❂ পীরের কসম, কাবার কসম, মসজিদের কসম।
❂ শহিদের রক্তের কসম, আগুনের কসম, নিজের চোখের কসম ইত্যাদি।
এই প্রকার কসমগুলো সাধারণ কোনো হারাম কাজ নয় বরং তা সরাসরি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
এর ভয়াবহতা দুই ধরনের হতে পারে:
◈ ক. ছোট শিরক: যদি কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস অবিচল রেখে এবং সৃষ্টিকে আল্লাহর সমমর্যাদার মনে না করে অভ্যাসবশত বা আবেগে এসব নামে কসম খায় তবে তা ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক হবে। এটি কবিরা গুনাহের চেয়েও ভয়াবহ। তবে এর কারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।
◈ খ. বড় শিরক: যদি কেউ কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর মতো বা আল্লাহর চেয়েও বেশি সম্মানিত মনে করে অথবা অলৌকিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী ভেবে তার নামে কসম খায় তবে তা ‘শিরকে আকবার’ বা বড় শিরক হবে। এই প্রকার শিরক মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ اللَّـهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে শরীক করে। আর যাকে ইচ্ছা এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ ক্ষমা করেন।” [সূরা নিসা: ৪৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক (অংশীদার) স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদা: ৭২]
মোটকথা, সর্বাবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম খাওয়া শিরক। আর ইসলামের দৃষ্টিতে আসমানের নিচে ও জমিনের উপরে শিরকের চেয়ে বড় ও ভয়াবহ কোনো অপরাধ নেই। তাই আমাদের উচিত জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কসম করতে হলে কেবল আল্লাহর নামেই করা।
❑ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনও কিছুর কসম খাওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদিস:
◈ ১. আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
من حلفَ بغيرِ اللهِ فقد كفرَ أو أشركَ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর কসম খেল সে কুফরি করল (অথবা বলেছেন, সে শিরক করল)।” [আবু দাউদ: ৩২৫১, তিরমিজি: ১৫৩৫, ইরওয়াউল গালীল, ২৫৬১]
◈ ২. ইবনে উমর রা. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর দেখা পেলেন যখন তিনি একটি কাফেলার মধ্যে ছিলেন এবং নিজের পিতার নামে শপথ করছিলেন। তখন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের ডেকে বললেন:
ألَا إنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أنْ تَحْلِفُوا بآبَائِكُمْ، فمَن كانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ باللَّهِ، وإلَّا فَلْيَصْمُتْ
“জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের তোমাদের পিতৃপুরুষদের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি শপথ করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১০৮ ও মুসলিম, হাদিস নং ১৬৪৬]
◈ ৩. ইবনে ওমর রা. থেকে আরও বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لا تحلِفوا بآبائِكُم مَن حلفَ باللَّهِ فليصدُقْ ومَن حُلِفَ لَه باللَّهِ فليرضَ ومَن لم يرضَ باللَّهِ فليسَ منَ اللَّهِ
“তোমরা তোমাদের পিতাদের নামে কসম কর না। যে আল্লাহর নামে কসম করে তার উচিত সত্য বলা আর যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হল তার উচিত সন্তুষ্টি প্রকাশ করা। আর যে আল্লাহর নামে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক নেই।”
[সহিহ ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৭২১]
◈ ৪. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ
“যার কসম করতে হয় সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১০৮ ও মুসলিম, হাদিস নং ১৬৪৬]
◈ ৫. ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন:
لأَنْ أَحْلِفَ بِاللَّهِ كَاذِبًا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَحْلِفَ بِغَيْرِهِ صَادِقًا
“গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে সত্য কসম অপেক্ষা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করব━ এটা আমার নিকট অধিক প্রিয়।” [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১৫৯২৯, ইরওয়াউল গালীল: ২৫৬২]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন,
لأنَّ الحلفَ باللهِ كاذبًا فيه توحيدٌ، والحلفَ بغيرِ اللهِ صادقًا شِرْكٌ، وحسنةُ التّوحيدِ أعظمُ من حسنةِ الصّدقِ وسيِّئةُ الشركِ أشدُّ من سيِّئةِ الكذبِ.
“কেননা আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করার মধ্যেও তাওহিদ বিদ্যমান আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে সত্য শপথ করাও শিরক। আর তাওহিদের নেকি সত্যবাদিতার নেকির চেয়ে অনেক বড় এবং শিরকের গুনাহ মিথ্যাচারের গুনাহের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।” [জামিউল মাসাইল-ইবনে তাইমিয়া)]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment