Thursday, January 8, 2026

জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব

 প্রশ্ন: জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর সবার জানা উচিত জানাযা মূলত একটি সালাত—যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা আদায় করে থাকে। তবে এই সালাত অন্যান্য ফরয বা নফল সালাতের ন্যায় নয়। এতে আযান নেই, ইক্বামত নেই, রুকু নেই, সিজদাহ নেই এবং তাশাহুদও নেই। এতদসত্ত্বেও শরিয়তের পরিভাষায় একে সালাত’ বলেই আখ্যায়িত করা হয়েছে।বরং এ বিষয়ে সকল আলেমের ঐকমত্য রয়েছে যে জানাযার সালাত প্রকৃত অর্থেই সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এর অন্যতম সুস্পষ্ট দলিল হলো মহান আল্লাহ তাআলার বাণী—:وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ”আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা তওবা: ৮৪) এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। এবং এ আয়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সহীহ বুখারীতে ‘জানাযার সালাত আদায়ের পদ্ধতি’ শিরোনামের অধ্যায়ে এভাবেই উল্লেখ করেছেন—যে রাসূল (ﷺ) বলেছেন,صَلُّوا عَلَى النَّجَاشِيِّ “তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য (জানাযার) সালাত আদায় করো’। অতঃপর তিনি বলেন, سَمَّاهَا صَلاَةً لَيْسَ فِيهَا رُكُوعٌ وَلاَ سُجُودٌ وَلاَ يُتَكَلَّمُ فِيهَا وَفِيهَا تَكْبِيرٌ وَتَسْلِيمٌ “নবী করীম (ﷺ) একে সালাত বলেছেন, অথচ এর মধ্যে রুকূ ও সিজদাহ নেই এবং এতে কথা বলা যায় না, এতে রয়েছে তাকবীর ও তাসলীম”।(সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ নং-৫৬)
.
❖▌এবার আমরা আলোচনা করব জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব?
.
প্রিয় পাঠক! আমরা প্রথমেই স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এটি সালাতের অন্তর্ভুক্ত তবুও এতে সূরা ফাতেহা পড়া হবে কিনা বা জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করা রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব? এই বিষয়ে আহালুল আলেমদের থেকে সর্বমোট তিনটি মতামত পাওয়া যায়।প্রথমে আমরা সবগুলো মতামত উল্লেখ করব তারপর কোনটি অধিক সঠিক এবং নিরাপদ মত সেটিও উল্লেখ করার চেষ্টা করব।
.
❖১ম অভিমত: একদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করা কোনো অবস্থাতেই মুস্তাহাব বা সুন্নাহ নয়। কারন জানাযার সালাতে কোনো কিরাআত নেই; বরং এতে আল্লাহর প্রশংসা, নবী (ﷺ)–এর ওপর দরূদ পাঠ এবং মৃতের জন্য দুআ করা হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক,সুফিয়ান আস-সাওরি,আল-আওযায়ি (রাহিমাহুমাল্লাহ) এবং কুফাবাসী আলেমদের একটি দলের অভিমত। বলা হয়, প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু উমর ও আবু হুরায়রা, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তারা জানাযা সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করেননি মর্মে মওকুফু সূত্রে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়।যদিও জানাযা সালাতে তারা সূরা ফাতেহা পড়েননি মর্মে সরাসরি স্পষ্ট শব্দে কোনো আছার পাওয়া যায় না।যেমনটি ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন:
لَيْسَ عَنْ وَاحِدٍ مِنْ هَؤُلَاءِ أَنَّهُ قَالَ: لَا يَقْرَأُ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآن
এদের (সাহাবিদের) মধ্য থেকে একজনের পক্ষ থেকেও এমন কথা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি জানাযার সালাতে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করতেন না।”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
❖২য় অভিমত: আরেকদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা ওয়াজিব। বরং তাদের কেউ কেউ একে রুকন (মূল স্তম্ভ) পর্যন্ত বলেছেন। এ মতের অনুসারী আলেমদের সংখ্যা সর্বাধিক তাদের মধ্যে রয়েছেন: ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইমাম ইসহাক, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমগণ যেমন; ইমাম ইবনু বায, বনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)। আর প্রখ্যাত সাহাবীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস, মিসওয়ার, যাহহাক ইবনু কায়েস, আবু দারদা, ইবনু মাসঊদ ও আনাস ইবনু মালিক, ইবনু যুবায়ের ও উবাইদ ইবনু উমাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) প্রমূখ সূরা ফাতিহা পড়তেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
.
❖৩য় অভিমত: আরেকদল বলেছেন,জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সুন্নাহ (অনাবশ্যকীয় উত্তম আমল)। তাই কেউ যদি সুরা ফাতিহা না পড়ে শুধু দোয়া করে, তাতেও সালাত শুদ্ধ হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সূরা ফাতিহা পড়ার পক্ষে যে দলিলগুলো রয়েছে সেগুলো কেবল সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:“এটিই সঠিক মত।”(দেখুন: ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩০,পৃষ্ঠা: ৮০)
.
❖▌আমরা যদি চার মাজহাবের বক্তব্য স্পষ্ট জানতে চাই তাহলে দেখবো:
.
হানাফি মাযহাবের অভিমত: হানাফিরা বলেন,قراءة الفاتحة بنية التلاوة في صلاة الجنازة مكروهة تحريماً، أما بنية الدعاء فجائزة.”জানাজার সালাতে তিলাওয়াতের নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তাহরীমী (তথা নিষিদ্ধ পর্যায়ের) তবে দু‘আর নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা জায়েয।
.
মালিকি মাযহাবের অভিমত: মালিকিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها مكروهة تنزيهاً “জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তানযীহী (অপছন্দনীয়, তবে হারাম নয়)।
.
শাফেয়ি মাযহাবের অভিমত:শাফেয়িরা বলেন,قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة ركن من أركانها، والأفضل قراءتها بعد التكبيرة الأولى، وله قراءتها بعد أي تكبيرة، ومتى شرع فيها بعد أي تكبيرة وجب إتمامها، ولا يجوز قطعها ولا تأخيرها إلى ما بعدها، فإن فعل ذلك بطلت صلاته، ولا فرق بين المسبوق وغيره.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সালাতের একটি রুকন অপরিহার্য স্তম্ভ)। সর্বোত্তম হলো প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পাঠ করা। তবে যে কোনো তাকবীরের পর পড়াও বৈধ। কিন্তু যদি কেউ কোনো তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ শুরু করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ করা ওয়াজিব; মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া বা পরবর্তী তাকবীরের পরে বিলম্ব করা জায়েজ নয়। যদি কেউ তা করে, তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে মাসবূক (দেরিতে যোগদানকারী) ও অন্যদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
.
হাম্বলি মাযহাবের অভিমত: হাম্বলিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها ركن، ويجب أن تكون بعد التكبيرة الأولى.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রুকন এবং তা প্রথম তাকবীরের পরেই আদায় করা আবশ্যক।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: আব্দুর রহমান আল-জাযায়রী, কিতাবুল ফিকহ আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ (বৈরুত: দারুল ইলামিয়্যাহ, তা.বি) খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭৪)
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি অভিমতের মধ্যে কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। আর কেন সূরা ফাতিহা জানাজার সালাতে রুকন বা ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হবে—ইনশাআল্লাহ,আমরা বিষয়টি দলিলসহ স্পষ্ট ও সুসংহতভাবে উপস্থাপন করবো।
.
❖বর্তমানে যেসব আলেম বলেন যে, জানাযার সালাতে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পড়া হবে না বরং হামদ তথা আল্লাহর প্রশংসা (সানা) পাঠ করলেই যথেষ্ট, তাদের মূল দলিল কী? অন্যদিকে যারা বলেন সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক, অর্থাৎ এটি জানাযার সালাতের রুকন বা ওয়াজিব, তাদেরই বা দলিল কী?
.
▌(১).যারা বলেন যে জানাযার সালাতে চার তাকবীর থাকবে এবং প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা নয়; বরং আল্লাহর প্রশংসা তথা সানা পাঠ করা হবে—তাদের এই অভিমতের পক্ষে যে দলিলসমূহ পেশ করা হয় এবং সেই দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় আলেমদের কী বক্তব্য রয়েছে, তা আমরা এখানে বোঝার চেষ্টা করবো। তাদের মতের পক্ষে যেসব দলিল উল্লেখ করা হয়, সেগুলো হলো:
.
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ”তোমরা কোনো মৃতের জানাযা পড়লে তার জন্য নিষ্ঠার সাথে দু‘আ করবে।”(আবু দাউদ হা/৩১৯৯; ইবনু মাজাহ হা/১৪৯৭;ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি হাসান বলেছেন। কিন্তু এই হাদিসে ছানা পড়ার দলিল নেই। এই হাদীসের ব্যাখ্যাতে হানাফী ইমাম মুফতি তাকী উসমানী লিখেছেন, حنفیہ کی دلیل میں عموماً ابو داود کی اک حدیث پیش کی جاتی ہے ، إذا صليت على الميت فأخلصوا له الدعا، لیکن اس سے استدلال درست نہیں کیو نکہ اس کا مطلب اخلاص کے ساتھ دعا کرنا ہے نہ کہ فاتحہ نہ پڑھی جائے۔ “হানাফীদের দলীল হিসেবে আবু দাউদের একটি হাদীস পেশ করা হয়ে থাকে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোন মৃতের জানাযার সালাত পড়, তখন তার জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করো। কিন্তু এই বিষয়ে এই হাদীছের দলীল দেওয়া ঠিক না। কেননা এই হাদীছের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইখলাছের সাথে দো‘আ করা, ফাতিহা না পড়া উদ্দেশ্য না”।(তিরমিযী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩০৫ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে) ইমাম ইবনু হাযম [মৃত:৪৫৬ হি.] এই হাদীসের বিষয়ে বলেছেন,لَوْ صَحَّ لَمَا مَنَعَ مِنْ الْقِرَاءَةِ، لِأَنَّهُ لَيْسَ فِي إخْلَاصِ الدُّعَاءِ لِلْمَيِّتِ نَهْيٌ عَنْ الْقِرَاءَةِ، وَنَحْنُ نُخْلِصُ لَهُ الدُّعَاءَ وَنَقْرَأُ كَمَا أُمِرْنَا ‘যদি এই হাদীস সহীহও হয়, তবুও এই হাদীছ সূরা ফাতিহা পাঠ (ক্বিরাআত করতে) নিষেধ করে না। কেননা মৃতের ইখলাছের সাথে দো‘আ করা অর্থ ক্বিরাআত করা নিষেধ নয়। আমরা ইখলাছের সাথে দো‘আ করি আবার ক্বিরাআত পাঠ করি, ঠিক যেভাবে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লাহ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
অপর বর্ননায় এসেছে, আবু সাঈদ মাকবুরী (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা জানাযার সালাত কিভাবে পড়বেন তা আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নিকট প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,أَنَا، لَعَمْرُ اللَّهِ أُخْبِرُكَ. أَتَّبِعُهَا مِنْ أَهْلِهَا. فَإِذَا وُضِعَتْ كَبَّرْتُ، وَحَمِدْتُ اللَّهَ. وَصَلَّيْتُ عَلَى نَبِيِّهِ ثُمَّ أَقُولُ: اللَّهُمَّ إِنَّهُ عَبْدُكَ…আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে (তার নিয়ম) জানাব। আমি মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজন হ’তে জানাযার সাথে চলি। জানাযা যখন রাখা হয়, আমি তখন তাকবীর বলি এবং আল্লাহর হামদ ও তার নবীর উপর দরূদ পাঠ করি। তারপর বলি, আল্লাহুম্মা ইন্নাহু আব্দুকা…।(মুওয়াত্তা ইমাম মালিক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯; হা/৭৭৫; এবং বায়হাকি আস-সুনান আল-কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ৪০) এই হাদীসের জবাবে বলা যায়, প্রথমত; এখানেও সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…ছানা পড়ার কোন স্পষ্ট দলীল নেই। এখানে হামদ বলতে আবু হুরায়রা (রাঃ) সূরা ফাতিহা ছাড়া অন্য কিছুই বোঝাননি”। (সহীহ মুসলিম হা/৩৯৫)। আর সূরা ফাতিহার চেয়ে বড় হামদ আর কিংবা হতে পারে? এই হাদীসে সূরা ফাতিহা না পড়ার বিষয়ও স্পষ্ট নয়, যেমনটি এই হাদীসে একটি তাকবীরের কথায় উল্লেখ আছে। বাকী তাকবীরগুলো কি তাহলে দেওয়া লাগবে না? আবার শেষে সালামের কথাও উক্ত হাদীসে নেই, তাহ’লে কি সালাম ছাড়াই জানাযা শেষ হবে? যেখানে অন্য ছাহাবীগণ স্পষ্ট প্রথম তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়া ও অন্যান্য বিষয়গুলো বলেছেন।
.
তাদের মতের পক্ষে আরও একটি দলিল হলো; নাফে‘ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَة- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জানাযার সালাতে কোন ক্বিরাআত পড়তেন না”।(মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক হা/৫৩৫, অধ্যায় কিতাবুল জানায়েয; বর্ননাটির সনদ সহীহ;আলিমগন এটিকে গোল্ডেন চেইন উল্লেখ করেছে।(বিস্তারিত দেখুন: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) তবে এখানে কথা আছে অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) জানাজার সালাতে (কিরআত) পড়তেন না। এর সঠিক অর্থ কি? এটি আলেমদের মধ্যে একটি সুপরিচিত মতভেদের বিষয়। কারন প্রথমত: এই বর্ণনার মাধ্যমে সূরা ফাতিহা না পরে সানা পড়ার কোন দলিল নেই। দ্বিতীয়ত: এই বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় বোঝানো হতে পারে: (১).ইবনে ওমরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি জানাযার সালাতে “কিরাআত পড়েননি।”কিন্তু তিনি কি সূরা ফাতিহা পড়েননি, নাকি সূরা ফাতেহার পর অন্য কোনো সূরা পড়তেন না তা স্পষ্ট নয়। (২).এই হাদীস থেকে এটি প্রমাণ করা যায় না যে রাসূল (ﷺ) জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়তেন না; বরং এটি ইবনে ওমরের ব্যক্তিগত আমল। (৩).এছাড়া এটিও বোঝানো হতে পারে যে তিনি প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন না। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মাকহুল প্রথম দুই তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন, আর ইমাম হাসান বসরী প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতেহা পড়তেন। উপরন্তু ইবনু উমর জানজার সালাতে কিরাআত পড়তেন না,এটি নেতিবাচক কথা, আর সূরা আল ফাতিহা পাঠের হাদীসটি হলো ইতিবাচক; উসূলে হাদীস তথা হাদীস বিজ্ঞানের মূলনীতি হলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টি হাদীস পরস্পর সাংঘর্ষিক হলে ইতিবাচক হাদীসটি প্রাধান্য পাবে। সর্বোপরি সাহাবীর কোন কথা বা ‘আমল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাশ্বত সুন্নাহকে বর্জন কিংবা রহিত করতে পারে না। সমস্ত উম্মাতের ইজমা বা ঐকমত্য হলো, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো, হাত বাঁধা, জামা‘আত হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং অন্যান্য সালাতের ন্যায় এখানে ক্বিরাআত পাঠও আবশ্যক। তাছাড়াও সূরাহ্ আল ফাতিহা পাঠের নির্দেশ ও ‘আমল সংক্রান্ত সুস্পষ্ট হাদীস যেখানে বিদ্যমান সেখানে সংশয় সন্দেহ আর কি থাকতে পারে?
.
▌(২).কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে বিশুদ্ধ যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাধারণ বাণীর অন্তর্ভুক্ত:(لا صَلاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ) “যে ব্যক্তি সালাতে সূরা আল-ফাতিহা পড়লো না তার সালাত হলো না।”(সহীহ বুখারী হা/৭১৪) ও মুসলিম হা/৫৯৫)।সম্ভবত ইবনে উমরের (রা.) মতের প্রেক্ষিতেই ইবনু আব্বাস (রা.) মাঝে মাঝে জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা উচ্চস্বরে পাঠ করতেন—যদিও সুন্নাহ হলো তা নীরবে পাঠ করা। যখন তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন:( ليعلموا أنها سنة ) (আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে,এটা সুন্নাত।”(সহীহ বুখারী হা/১২৪৯; তিরমিযী হা/১০২৪) এই হাদীস উল্লেখ করার পরে ইমাম ছান‘আনী (মৃত ১১৮২ হি.) লিখেছেন,والحديثُ دليلٌ على وجوب قراءةِ الفاتحةِ في صلاةِ الجنازةِ “এই হাদীস জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার দলীল”।(সুবুলুস সালাম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৯০) আল্লামা আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) আহকামুল জানায়েয গ্রন্থে বলেন,قلت: وعليه فمن العجائب أن لا يأخذ الحنفية بهذا الحديث مع صحته ومجيئه من غير ما وجه، ومع صلاحيته لاثبات السنة على طريقتهم وأصولهم!”আমি বলি: আশ্চর্যের বিষয় হলো হানাফিরা এই সহিহ হাদিস গ্রহণ করেননি, অথচ এটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁদের নিজস্ব উসুল অনুযায়ীও সুন্নত প্রমাণের জন্য উপযুক্ত!
.
তাছাড়া আলেমগন বলেছেন, উক্ত হাদীসে “সুন্নত” বলার উদ্দেশ্য কেবল “মুস্তাহাব” (ঐচ্ছিক ভালো কাজ) বোঝানো হয়নি; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকা বা আদর্শ।অর্থাৎ,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এটি পাঠ করেছেন”।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) ইসলামী আক্বীদার উলামাগণের পরিভাষায় সুন্নাহ হল:فَهِيَ مَا أمَرَ بِهِ النَّبِيُّ ﷺ وَنَهَى عَنْهُ وَنَدَبَ إِلَيْهِ قَوْلًا وفِعْلًا، مِمَّا لَمْ يَنْطِقُ بِهِ الْكِتَابُ الْعَزِيْزُ‘তা (সুন্নাত) হল এমন বিষয়, যা নবী করীম (ﷺ) করতে আদেশ করেছেন ও যা থেকে নিষেধ করেছেন এবং কথা ও কর্ম দ্বারা এর প্রতি তিনি উৎসাহিত করেছেন, যে বিষয় মহিমান্বিত কিতাবে বলেনি’। এজন্য শরী‘আতের দলীলগুলো সম্পর্কে বলা হয়, কিতাব ও সুন্নাত। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস”।(নিহায়াহ ফী গারীবিল আছার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০৯) হাফেয ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السنة هي الطريقة المسلوكة فيشمل ذلك التمسك بما كان عليه ﷺ هو وخلفاؤه الراشدون من الاعتقادات والأعمال والأقوال وهذه هي السنة الكاملة”সুন্নাহ হল অনুসরণীয় পদ্ধতি, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের বিশ্বাস, আমল ও বক্তব্যসমূহকে অন্তর্ভূক্ত করে। এটাই পরিপূর্ণ সুন্নাত”।(জামিঊল ঊলুম ওয়াল হিকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২০) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السُّنَّةَ هِيَ مَا قَامَ الدَّلِيلُ الشَّرْعِيُّ عَلَيْهِ بِأَنَّهُ طَاعَةٌ لِلهِ وَرَسُولِهِ سَوَاءٌ فَعَلَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَوْ فُعِلَ عَلَى زَمَانِهِ أَوْ لَمْ يَفْعَلْهُ وَلَمْ يُفْعَلْ عَلَى زَمَانِهِ لِعَدَمِ الْمُقْتَضِي حِينَئِذٍ لِفِعْلِهِ أَوْ وُجُودِ الْمَانِعِ مِنْهُ”সুন্নাত হল ঐ সকল আমল, যা পালনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অনুগত হওয়ার ব্যাপারে দলীল রয়েছে। চাই তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে পালন করেছেন বা তাঁর যুগে পালন করা হয়েছে অথবা চাহিদা না থাকায় কিংবা অসুবিধার কারণে সে যুগে তিনি নিজে করেনি ও অন্যরাও করেননি। এসবই সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত”।(ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ,মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২১তম খণ্ড, পৃ. ৩১৭) সুতরাং জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠ করতে হবে উপরোক্ত হাদীস তার প্রকৃষ্ঠ দলীল। (অসংখ্য সাহাবীদের মধ্যে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) সূরাহ আল ফাতিহাহ পাঠ করলেন এবং সুন্নাত বলে দাবী করলেন এতে একজন সাহাবীও তার প্রতিবাদ অথবা বিরোধিতা করেননি, সুতরাং এটা ইজমায়ে সাহাবীর মর্যাদা রাখে)।এছাড়াও বহু সাহাবী থেকে জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।ইবনু আব্বাস (রাদিআল্লাহু আনহু) এর এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাকী ওসমানী বলেছেন, اور صحابی جب کسی عمل کو سنت کہے تو وہ حدیث مرفوع ہوتی ہے اور اس لئے اس کی جو تاویلات کی گئی ہیں وہ سب کمزور ہیں اور یہ حدیث بہت سی احادیث مرفوعہ سے مؤید ہے۔ “আর সাহাবী যখন কোন আমলকে সুন্নাত বলে, তখন সেই হাদীস মারফূ হয়ে যায়, আর এজন্য এই হাদীসের বিপক্ষে যত ব্যাখ্যা করা হয়েছে সব দুর্বল। আর এই হাদীছটি আরও অনেক মারফূ হাদীছ দ্বারা শক্তিশালী”।(ইন‘আমুল বারী খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫০১ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে)
.
অপর বর্ননায় কুতায়বা (রহঃ) …আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:السُّنَّةُ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يَقْرَأَ فِي التَّكْبِيرَةِ الأُولَى بِأُمِّ الْقُرْآنِ مُخَافَتَةً ثُمَّ يُكَبِّرَ ثَلاَثًا وَالتَّسْلِيمُ عِنْدَ الآخِرَةِ”জানাযার সালাতে সূন্নাত হল প্রথম তাকবীর চুপেচুপে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে। অতঃপর আরো তিনটি তাকবীর বলবে; শেষ তাকবীরে সালাম ফিরাবে।”(সুনানে নাসাঈ হা/১৯৯৩; মুছান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ হা/১১৩৭৯; বায়হাকী সুনানুল কুবরা, হা/৭২০৯)। ইমাম বুখারী, মুসলিমের শর্তে হাদীসটি সহীহ। আলবানী ও শু‘আইব আরনাউত্ব ও জুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) হাদীসটির সনদ সহীহ বলেছেন।(দেখুন ইমাম আলবানী ইরওয়াউল গালীল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮১; হা/৭৩৪) প্রিয় পাঠক! এই হাদীসে সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর জানাযার সালাতের সুন্নত ও তাতে কী কী করা হয়—তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন; যেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম সঠিকভাবে তা জানতে পারে এবং তাঁদের ওপর অর্পিত আমানত তারা যথাযথভাবে আদায় করতে পারে। এই হাদীসে আবূ উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:“জানাযার সালাতে সুন্নত হলো—অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির জন্য আদায় করা জানাযার সালাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর আমল ছিল এই যে “প্রথম তাকবীরে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) নীরবে পাঠ করা, অর্থাৎ, তাকবীরে তাহরিমার পর সূরা ফাতিহা চুপিসারে পাঠ করবে; উচ্চস্বরে পাঠ করবে না। “অতঃপর তিনবার তাকবীর দেওয়া, অর্থাৎ, প্রথম তাকবীরের পর আরও তিনটি তাকবীর দেবে। ফলে তাকবীরে তাহরিমাসহ মোট চারটি তাকবীর হবে।“এবং শেষ তাকবীরের পর সালাম দেওয়া,অর্থাৎ, চতুর্থ তাকবীরের পর সালাম ফিরাবে। এই হাদীস থেকে আরও প্রমাণিত হয় উলামায়ে কিরাম মানুষের জন্য যেসব বিষয় জটিল হয়ে যায়, সেগুলো স্পষ্ট করে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত: ৯৪ হি:] বলেন,السُّنَّةُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَائِزِ أَنْ تُكَبِّرَ، ثُمَّ تَقْرَأَ بِأُمِّ الْقُرْآنِ ثُمَّ تُصَلِّيَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ تُخْلِصَ الدُّعَاءَ لِلْمَيِّتِ،”জানাযার সালাতে সুন্নাত হ’ল, তুমি তাকবীর দিবে অতঃপর উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পড়বে। তারপর নবী করীম (ﷺ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করবে এরপর তুমি মাইয়েতের জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করবে”।(আল-মানহালুল আযবু; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৫৩ মিশকাতুল মাসাবীহ এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ এর লেখক ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, والحق والصواب أن قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة واجبة، كما ذهب إليه الشافعي وأحمد وإسحاق وغيرهم؛ “হক এবং সঠিক কথা হ’ল, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব, যেমনটি ইমাম শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক ও অন্যান্যরা বলেছেন”।(মির‘আতুল মাফাতীহ ;খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,
ويسر القراءة والدعاء في صلاة الجنازة لا نعلم بين أهل العلم فيه خلافا ، ولا يقرأ بعد أم القرآن شيئا ، وقد روي عن ابن عباس أنه جهر بفاتحة الكتاب. قال أحمد : إنما جهر ليعلمهم
“জানাযার সালাতে কিরাআত (সুরা ফাতিহা) এবং দোয়া নিঃশব্দে (মনে মনে) পড়তে হয়—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ আছে বলে আমাদের জানা নেই। আর সুরা ফাতিহার পর অন্য কোনো সুরা বা আয়াত পড়তে হয় না। তবে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (একবার) জানাযার সালাতে উচ্চস্বরে সুরা ফাতিহা পড়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি (ইবনে আব্বাস) উচ্চস্বরে পড়েছিলেন কেবল তাঁদের (উপস্থিত লোকদের) এটি শেখানোর জন্য (যে এটি পড়া সুন্নত)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪১২)
.
শাইখ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মুখতার আশ-শশানক্বীতি তাঁর শরহে জাদিল মুস্তাকনিʿ গ্রন্থে বলেন,
وللعلماء في قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة قولان:منهم من يقول: يشرع أن تقرأ سورة الفاتحة، وهو مذهب الإمام الشافعي وأحمد وإسحاق بن راهويه وطائفة من أهل الحديث، والدليل على ذلك عموم قوله عليه الصلاة والسلام: (لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب) وقوله عليه الصلاة والسلام: (أيما صلاة لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب .. الحديث)، فإنك إذا تأملت هذا اللفظ وجدته من صيغ العموم، فقوله: (لا صلاة) نكرة في سياق النفي، والقاعدة: أن النكرة في سياق النفي تفيد العموم. (أيما صلاةٍ) أيضاً يدل على العموم؛ لأن (أي) عند الأصوليين من صيغ العموم، فلما قال: أيما صلاةٍ لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب، فقد عمم ولم يفرق بين صلاة الجنازة ولا غيرها، فدل على أن صلاة الجنازة يجب أن يقرأ فيها بفاتحة الكتاب.وتأكدت هذه العمومات بحديث ابن عباس رضي الله عنه أنه صلى على الجنازة وجهر بالفاتحة؛ لكي يعلم الناس أنها سنة، فدل هذا على أن السنة أن يقرأ الفاتحة على الميت.وخالف في ذلك الحنفية والمالكية رحمة الله عليهم، وقالوا: إنه يقتصر على الدعاء، لآثار وردت عن أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم في صفة الصلاة على الميت، ذكر فيها الصلاة على النبي صلى الله عليه وسلم والدعاء، قالوا: فهذا يدل على أنه لا تقرأ الفاتحة.والجواب عن ذلك: أن المرفوع مقدمٌ على الموقوف، ويحمل كلام الصحابة على أن المقصد الأسمى والأعلى في الصلاة على الميت: أن يدعى له، فذكروه وتركوا غيره للعلم به بداهة، هذا مما يعتبر به.وأيضاً: يحتمل أنه لم يبلغهم النص بقراءة الفاتحة، وقد يخفى على بعض أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم من السنن ما لم يطلع عليه؛ ولذلك يُعمل بما ورد عنه عليه الصلاة والسلام ويقدم على غيره.
“জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে দুইটি মত রয়েছে। তাদের একদল বলেন: জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া শরিয়তসম্মত। এটি ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং আহলে হাদিসদের একটি দলের মত। এর দলিল হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ বানী: “যে সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, সে সালাত হয় না।”আর তাঁর আরেকটি বাণী: “যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না (হাদিস) আপনি যদি এই শব্দগুলোর প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন এগুলো সাধারণ অর্থবোধক বাক্য। কারণ, لا صلاة (কোনো সালাতই নয়) এটি নাকেরার প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি অনির্দিষ্ট শব্দ আর উসুলের নিয়ম হলো নাকেরার প্রেক্ষাপটে অনির্দিষ্ট শব্দ সাধারণ অর্থ প্রদান করে। এছাড়া أيما صلاة (যে কোনো সালাত) এটিও সাধারণ অর্থ নির্দেশ করে। কারণ উসুলবিদদের মতে أي শব্দটি আম এর/সাধারণতার অন্যতম শব্দ। অতএব, যখন বলা হলো: যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, তখন এতে জানাজার সালাত ও অন্যান্য সালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে জানাজার সালাতও সুরা ফাতিহা পড়া আবশ্যক। এই সাধারণ দলিলগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে ইবনু আব্বাস (রা.)–এর হাদিস দ্বারা। তিনি জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা জোরে পড়েছিলেন, যাতে মানুষ জানতে পারে যে এটি সুন্নাত। এ থেকে বোঝা যায় মৃত ব্যক্তির ওপর জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়াই সুন্নত। তবে হানাফি ও মালিকি মাযহাবের আলেমগণ এ মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, জানাজার সালাতে কেবল দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁরা এ মতের পক্ষে সাহাবিদের কিছু বর্ণনা পেশ করেন, যেখানে জানাজার সালাতের বিবরণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ এবং মৃতের জন্য দোয়ার কথা এসেছে, কিন্তু ফাতিহা পড়ার কথা উল্লেখ নেই। তাঁদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে জানাজার সালাতে ফাতিহা পড়া হয় না। এর জবাব হলো মারফূ হাদিস মাওকূফ বর্ণনার ওপর অগ্রাধিকার পায়।আর সাহাবিদের বক্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, জানাজার সালাতের মূল ও সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো মৃতের জন্য দোয়া করা। সে কারণে তাঁরা দোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, আর অন্যান্য বিষয় স্বতঃসিদ্ধ হওয়ার কারণে তা আলাদা করে বলেননি। আরেকটি সম্ভাবনা হলো ফাতিহা পড়ার হাদিসটি তাঁদের কারো কাছে পৌঁছেনি। কারণ সাহাবিদের কারো কাছেও কোনো কোনো সুন্নত গোপন থাকতে পারে, যা অন্যদের জানা ছিল।অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা প্রমাণিত হয়েছে, সেটিই গ্রহণযোগ্য এবং অন্য সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।”(ইমাম শানকীতি; শারহে যাদুল মুস্তাকনি খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, والفاتحة في صلاة الجنازة ركن ؛ لقول النبي عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) ، وصلاة الجنازة صلاة ؛ لقوله تعالى : ( وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَداً ) فسماها الله صلاة ؛ ولأن ابن عباس رضي الله عنهما قرأ الفاتحة على جنازة ، وقال : ( لتعلموا أنها سنة ) “সূরা ফাতিহা পাঠ জানাযার সালাতের একটি রুকন। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬)। আর জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। কারন মহান আল্লাহ বলেন,”আর তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না।”(সূরা তওবা; ৯/৮৪)। আল্লাহ এটাকে সালাত বলেছেন। আর ইবনে আব্বাস (রাঃ) জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পাঠ করলেন এবং বললেন; “যাতে তোমরা জানতে পারবে যে এটা সুন্নত।”(ইবনে উসাইমীন, আশ শারহুল মুমতি খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪০১; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১)। শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়।”(ইমাম ইবনু উসায়মীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১১৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পড়ার হুকুম কি? তিনি জবাব বলেন:واجبة ، كما قال صلى الله عليه وسلم : ( صلوا كما رأيتموني أصلي ) ، وقال عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) متفق على صحته”এটা ওয়াজিব। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবে সালাত আদায় কর।”(সহীহ বুখারী হা/৬৩১)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপর বর্ননায় বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬, সহীহ মুসলিম হা/৯০০,মাজমু’ ফাতাওয়া আল-শাইখ ইবনে বায, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৪৩)
.
জেনে রাখা ভালো যে, জানাযার সালাতে সানা পড়ার প্রমাণে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না।এজন্য ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়। (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৯)। জানাযার সালাতে সানা পাঠ করার প্রমাণ পাওয়া যায় না বিধায় বিগত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] “এটি বিদ‘আত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।(আহকামুল জানায়িয- বিদ‘আত নং-৭৬,পৃষ্ঠা: ৩১৬)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনায় আমি জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে নাকি হবে না বিষয়টি পরিস্কার করার চেষ্টা করেছি। যদিও একদল আলেমদের দাবি হলো—জানাযার সালাতে রুকু ও সিজদাহ নেই; সুতরাং এটি নাকি তাওয়াফের অনুরূপ। আর যেহেতু তাওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠের প্রয়োজন হয় না, তাই জানাযার সালাতেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা জরুরি নয়। কিন্তু এ ধরনের যুক্তি সুস্পষ্ট ও সহীহ হাদীসের মোকাবিলায় অত্যন্ত দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য। অতএব সচেতন পাঠকদের প্রতি আমার নিবেদন—পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে, কোন মতটি অধিক শক্তিশালী, নিরাপদ এবং দলীলসম্মত—তা ইনশাআল্লাহ আপনাদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা না পড়লে সালাত বাতিল হয়ে যাবে এমনটি আমি বলছি না, বরং আমি শুধু এইটুকুই বলবো যেমনটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِيْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ، تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ”তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দীর্ঘায়ু লাভ করবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তাই তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ এবং সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দৃঢ়ভাবে লেগে থাকো। নতুন নতুন বিষয় থেকে সাবধান থাকো, কারণ প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন বিদ‘আহ এবং প্রত্যেক বিদ‘আহ পথভ্রষ্টতা”।(আবূ দাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬)
(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate