Thursday, January 8, 2026

শরীয়তের দৃষ্টিতে যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের মর্যাদা লাভ করেন এবং তাদের গোসল ও কাফন ও জানাজা আদায়ের শারঈ বিধান

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের মর্যাদা লাভ করেন তারা কারা? এবং তাদের গোসল, কাফন ও জানাজা আদায়ের শার’ঈ বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর শহীদ একটি ইসলামী পরিভাষা যার অর্থ, মর্যাদা ও তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে ইসলামের সাথেই সম্পর্কিত। ইসলামে শহীদের মর্যাদা অতুলনীয়। শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণের সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করতে শুরু করে—এটি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।শহীদ কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ধারণা নয়, এবং এটিকে সেসব পরিভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখাও সঠিক নয়। বরং শহীদের পরিচয়, শর্ত ও মর্যাদা নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার ইসলামেরই। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শহীদ সেই ব্যক্তি, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে নিহত হন। মোটকথা ইসলামি শরিয়ত ও বিশুদ্ধ আক্বীদা মানহাজের আলোকে ‘শহীদ’ শব্দটির মর্যাদা ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যারা ইখলাসের সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং তার দ্বীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির বা জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন, তারাই প্রকৃত অর্থে শহীদ হিসেবে গণ্য হন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে শহীদ হওয়ার বিষয়টি শুধু বাহ্যিক মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শরিয়ত শহীদদের মর্যাদা ও বিধানের দিক থেকে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছে। এই বিবেচনায় শহীদদের মূলত সর্বমোট তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, শহীদ তিন শ্রেনীর। যেমন:
(১).যে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন, সে দুনিয়া ও আখেরাতে শহীদ। এরাই প্রকৃত শহীদ।(বিশুদ্ধ মতে) মৃত্যুর পর তাকে গোসল দেওয়া হবেনা এবং তাদের জন্য জানাজার নামাজ পড়া হবেনা।
.
(২).যে ব্যক্তি আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবে কিন্তু দুনিয়ায় তাকে গোসল দেওয়া হবে এবং তার জন্য জানাজার নামাজ পড়া হবে।রাসূল (ﷺ) এদেরকে হুকুমের দিক থেকে শহীদ বলেছেন। এরা প্রকৃত শহীদ নয়,বরং শহীদের কাছাকাছি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এই মুমিনগণ আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবেন। প্রথম শ্রেণীর লোকদের সওয়াবের সমান হবে না। যেমন হাদীসে এসেছে:
.
(৩).দুনিয়াতে শহীদ, আখেরাতে নয়। এরা হল যুদ্ধের ময়দানে গণীমতের মাল আত্মসাৎকারী অথবা জিহাদ থেকে পলাতক অবস্থায় নিহত ব্যক্তি। তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হলেও শহীদ বলে গণ্য হবে না। যেহেতু এধরনের ব্যক্তি দুনিয়াতে শহীদদের বিধানের আওতায় আসে, তাই তাকে গোসল দেওয়া উচিত নয় এবং তার জানাজা পড়া উচিত নয়,তবে আখেরাতে তার পূর্ণ সওয়াব হবে না।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইমাম নববী, শারহু সহীহ মুসলিম খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
মোটকথা যেসব মুসলিম একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের খাঁটি নিয়তে, তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির, জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন, শরিয়তের পরিভাষায় তারাই প্রকৃত শহীদ বা শহীদে কামিল।এঁদেরকে দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে তারা দুনিয়ায় বিশেষ বিধান এবং আখেরাতে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হন। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় ব্যক্তিকে হুকুমের দিক থেকে শহীদ বলেছেন। প্রকৃত শহীদ নয় বরং শহীদের কাছাকাছি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এই মুমিনগণ আখিরাতে শহীদের মর্যাদা পাবেন।যেমনটি বিভিন্ন হাদীসে রয়েছে-আজ আমরা শুধু দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় বিচারের আলোকে প্রকৃত শহীদদের একটি সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান উপস্থাপন করার চেষ্টা কবর।
.
কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে শহীদের পরিচয় ও মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِنْ لَا تَشْعُرُونَ “আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়,তাদের মৃত বলো না বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা অনুভব করতে পারো না।” (সূরা বাকারা: ১৫৩) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ ۚ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا “কাজেই আল্লাহর কাছে যারা পার্থিব জীবনকে আখিরাতের পরিবর্তে বিক্রি করে দেয় তাদের জিহাদ করাই কর্তব্য। বস্তুত: যারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করে কিংবা বিজয় অর্জন করে, আমি তাদেরকে বিশাল প্রতিদান দান করব।”(সূরা নিসা: ৭৪) হাদিসের ভাষায় শহীদ:আবু মুসা রাদি. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “এক ব্যক্তি গনিমতের সম্পদ অর্জনের জন্য জিহাদ করল, একজন নিজের সুনামের জন্য জিহাদ করল, আরেকজন তার বীরত্ব দেখানোর জন্য যুদ্ধ করল। এদের মাঝে কে আল্লাহর আল্লার রাস্তায় যুদ্ধ করল? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উজ্জীবিত করতে যুদ্ধ করলো সেই কেবল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করলো।”(অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে নিহত হল সেই শহীদ)।(সহীহ বুখারী হা/২৬৫৫, সহীহ মুসলিম হা/৫০২৯)
.
একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে জানা থাকা উচিত—শহীদ হওয়ার জন্য কেবল কাফিরদের হাতেই নিহত হতে হবে—এমন কোনো শর্ত নেই। বরং কেউ যদি অন্যায় ও জুলুমের শিকার হয়ে মুসলিমদের হাতেও নিহত হয়, তবুও সে শহীদের মর্যাদা লাভ করতে পারে। আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ’র আরেক ফাতওয়ায় বলা হয়েছে,ذهب الفقهاء إلى أن للظلم أثراً في الحكم على المقتول بأنه شهيد ، ويُقصد به غير شهيد المعركة مع الكفار ، ومِن صوَر القتل ظلماً : قتيل اللصوص ، والبغاة ، وقطَّاع الطرق ، أو مَن قُتل مدافعاً عن نفسه ، أو ماله ، أو دمه ، أو دِينه ، أو أهله ، أو المسلمين ، أو أهل الذمة ، أو مَن قتل دون مظلمة ، أو مات في السجن وقد حبس ظلماً .واختلفوا في اعتباره شهيد الدنيا والآخرة ، أو شهيد الآخرة فقط ؟ .فذهب جمهور الفقهاء إلى أن مَن قُتل ظلماً : يُعتبر شهيد الآخرة فقط ، له حكم شهيد المعركة مع الكفار في الآخرة من الثواب ، وليس له حكمه في الدنيا ، فيُغسَّل ، ويصلَّى عليه”ফিকহবিদরা একমত যে, জুলুমের কারণে নিহত হওয়া কোনো ব্যক্তিকে শহীদ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এখানে উদ্দেশ্য হলো কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত শহীদ ব্যতীত অন্যান্য শহীদ। জুলুমে হত্যার কিছু উদাহরণ ডাকাত, সন্ত্রাসী বা পথকাটা দলের হাতে নিহত ব্যক্তি বিদ্রোহী বা জালিমদের দ্বারা নিহত ব্যক্তি নিজের জান, মাল, রক্ত, দ্বীন, পরিবার রক্ষায় নিহত ব্যক্তি মুসলমান বা অমুসলিম নাগরিক রক্ষায় নিহত ব্যক্তি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি এদের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে এরা কি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিক থেকে শহীদ, নাকি শুধু আখিরাতের শহীদ? জমহুর আলেমদের মত হলো যে ব্যক্তি জুলুমের কারণে নিহত হয়, সে শুধু আখিরাতের শহীদ। অর্থাৎ আখিরাতে সে শহীদের সওয়াব পাবে কিন্তু দুনিয়াতে তার ওপর শহীদে ময়দানের বিধান প্রযোজ্য হবে না তাই তাকে গোসল দেওয়া হবে এবং জানাযার নামাজ পড়ানো হবে।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৭৪)
.
▪️দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে প্রকৃত শহীদের গোসল,কাফন ও জানাজা আদায়ের শার’ঈ বিধান:
.
যেসব মুসলিম একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের খাঁটি নিয়তে, তাঁর কালিমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে—অর্থাৎ ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে—যুদ্ধক্ষেত্রে কাফির, জালিম ও অন্যায়কারীর হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হন তাদের গোসল ও জানাজার বিধান নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে মূলত তিনটি মত পাওয়া যায়।
.
প্রথমত, অধিকাংশ বা জুমহুর উলামাদের মতে, যেসব শহীদ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, তাদের দুনিয়াবি বিধি অনুযায়ী গোসল দেওয়া বা জানাজার নামাজ আদায় করা হয় না। বরং তাঁরা রক্তমাখা পোশাকেই দাফন করা হয়। তবে আখেরাতের বিচারে, এই শহীদরা বিনা শর্তে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করবেন এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান, মর্যাদা ও অপরিসীম রিজিকের অধিকারী হবেন।
.
দ্বিতীয়ত, কিছু আলেমের মত হলো—তাঁকে গোসল দেওয়া হবে এবং জানাজার নামাজও পড়া হবে।
.
তৃতীয়ত, আরেক দল আলেম মনে করেন—তাঁকে গোসল দেওয়া হবে না; তবে জানাজার নামাজ আদায় করা হবে।
.
এই মতভেদের মূল কারণ হলো উহুদ যুদ্ধের শহীদদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন কি না—এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর মধ্যে আপাত বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। বিভিন্ন রেওয়ায়েতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব বর্ণনার মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোই জুমহুর ওলামায়ে কেরাম দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ রণাঙ্গনের শহীদকে গোসল দেওয়া হবে না এবং তাঁর জানাজার নামাজও আদায় করা হবে না। উদাহরণস্বরূপ; জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর হাদিস। যিনি বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদদের রক্তের সাথে দাফন করার নির্দেশ দিয়েছেন, গোসল দেওয়া উচিত নয়।”(সহীহ বুখারী, হা/ ১৩৪৬)
.
▪️যদি প্রশ্ন করা হয় শহীদদের কেন গোসল করানো হয় না?
.
এ বিষয়ে কথা হচ্ছে তাদেরকে গোসল করানো উচিত নয়,যাতে শাহাদাতের চিহ্ন তাদের শরীরে অটুট থাকে। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, কোন ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহত হলে এবং আল্লাহ্ই ভাল জানেন কে তাঁর পথে আহত হবে কিয়ামতের দিন সে তাজা রক্ত বর্ণে রঞ্জিত হয়ে আসবে এবং তা থেকে মিশ্কের সুগন্ধি ছড়াবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৮০৩ এবং সহীহ মুসলিম হা/১৮৭৬) অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ছা’লাবা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহুদের শহীদদের সম্পর্কে বলেছিলেন, তাদেরকে স্বীয় রক্তসহ ঢেকে দাও। কেননা যে কোন ক্ষত যা আল্লাহ্‌র রাস্তায় হয় কিয়ামতের দিন সেখান থেকে রক্ত প্রবাহিত হবে রং হবে রক্তের কিন্তু তাঁর সুগন্ধি হবে মিশ্‌কের সুগন্ধির ন্যায়।”(সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২০০২; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি সহীহ বলেছেন সহীহুল জামি’ হা/ ৩৫৭৩; আরও দেখুন: আল-মুগনি মা’আ আশ-শারহ আল-কবীর, ২/৩৩৩; আল-মাসওয়াতুল-ফিকহিয়্যাহ, ২৬/২৭৪)
.
আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে তা হল অপবিত্র অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শহীদদের গোসল সম্পর্কে আলেমদের মতামত কি?
.
যদি কোনো শহীদ যৌনকর্মের পর তীব্র (বড়) অপবিত্রতায় মারা যান, তাহলে তাকে গোসল দেওয়া উচিত কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, এমন শহীদকেও গোসল দেওয়া প্রয়োজন নেই। কারণ যে অবস্থায় শহীদ মারা যান, তা অপরিষ্কার বা অপবিত্র ব্যক্তির অবস্থার সঙ্গে কোনো বাস্তব পার্থক্য রাখে না। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে নিহত শহীদদের গোসল দেননি। তদুপরি, শাহাদাত নিজেই সকল পাপ এবং অপরিষ্কারতার কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়। কেউ যদি উদাহরণ হিসেবে বলেন যে হানযালা ইবনে আবি আমর (রাঃ)-কে গোসল দেওয়া হয়েছিল, এর জবাবে আলেমরা বলছেন, এটি ফেরেশতাদের মাধ্যমে ঘটেছিল। আর এমনটি সত্য হলেও, এটি প্রমাণ করে না যে শহীদকে মানুষ দ্বারা গোসল দেওয়া আবশ্যক। কারণ ফেরেশতাদের আচরণ আমাদের জন্য দৃশ্যমান নয়, এবং মানুষের বিধানকে ফেরেশতাদের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। হানযালা (রাঃ)-এর সঙ্গে যা ঘটেছিল তা শুধুই তাঁকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের ওপর কোনো শর্ত আরোপের জন্য নয়।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু উসাইমীন;আশ-শারহুল মুমতি’খন্ড; ৫; পৃষ্ঠা: ৩৬৫) তাছাড়া নাপাক অবস্থায় নিহত শহীদকে গোসল দেওয়া যদি ওয়াজিব হত, তাহলে ফেরেশতাদের জন্য গোসল দেওয়ায় সেই ওয়াজিব পূরন হতো না। বরং নবী (ﷺ) সাহাবীদেরকে আদেশ দিতেন মৃত শহীদকে গোসল দেওয়ার জন্য। কারণ মৃতকে গোসল দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ইবাদত পালন করা।”(দেখুন আহকামুল জানাইয পৃষ্ঠা ৫৬ এর টীকা)
.
প্রকৃত শহীদদের জানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কে আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে,وقد قال جمهور العلماء بأنه لا يُصلى عليه وهو قول الإمام مالك والشافعي وأصح الروايتين عن أحمد ( أنظر المغني 2/334 )؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يصل على شهداء أحد ( رواه البخاري 1347 ) ، ولأن الحكمة من الصلاة هي الشفاعة والشهيد يُكفر عنه كل شيء ( فلا يحتاج شفاعة ) إلا الدين فإنه لا يسقط بالشهادة بل يبقى في ذمة الميت “জমহুর আলেমের মত হলো শহীদের ওপর জানাযার নামাজ আদায় করা হয় না। এটাই ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদের দুই বর্ণনার মধ্যে সহিহ মত।(আল মুগনী ২/৩৩৪) এর কারণ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযার নামাজ আদায় করেননি। (সহিহ বুখারি ১৩৪৭) আর জানাযার নামাজের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃতের জন্য শাফাআত করা। কিন্তু শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাই তার জন্য শাফাআতের প্রয়োজন হয় না। তবে একটি বিষয় ব্যতিক্রম ঋণ, কারণ ঋণ শহীদ হওয়ার কারণে মাফ হয় না, বরং তা মৃত ব্যক্তির জিম্মায় থেকেই যায়।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ২৭২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الشهداء الذين يموتون في المعركة لا تشرع الصلاة عليهم مطلقاً ولا يُغسلون ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يُصلِّ على شهداء أحد ولم يُغسلهم .. رواه البخاري في صحيحه (1347) عن جابر ابن عبد الله رضي الله عنهما “যেসব শহীদ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান, তাদের ওপর কোনো অবস্থাতেই জানাযার নামাজ পড়া বৈধ নয়, এবং তাদের গোসলও দেওয়া হয় না। কারণ নবী ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযার নামাজ পড়েননি এবং গোসলও দেননি।”(সহিহ বুখারি ১৩৪৭,মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:” ( الشهيد ) لا يصلي عليه أحدٌ من الناس لا الإمام ولا غير الإمام ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم : ” لم يصلِّ على شهداء أحد ” ، ولأن الحكمة من الصلاة الشفاعة ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم : ” ما من رجل مسلم يموت فيقوم على جنازته أربعون رجلاً لا يُشركون بالله شيئاً إلا شفعهم الله فيه ” والشهيد يُكفر عنه كل شيء إلا الدَّيْن ؛ لأن الدين لا يسقط بالشهادة بل يبقى في ذمة الميت في تركته إن خَلَّف تركة ، وإلا فإنه إذا أخذه يريد أداءه أدى الله عنه “যে ব্যক্তি শহীদ, তার ওপর ইমাম কিংবা অন্য কেউ কেউই জানাযার নামাজ পড়বে না। কারণ নবী ﷺ উহুদের শহীদদের ওপর জানাযা পড়েননি। জানাযার নামাজের উদ্দেশ্য হলো শাফাআত। যেমন নবী ﷺ বলেছেন যদি কোনো মুসলিমের জানাযায় চল্লিশ জন এমন ব্যক্তি দাঁড়ায় যারা আল্লাহর সাথে শরিক করে না,তবে আল্লাহ তাদের শাফাআত কবুল করেন। কিন্তু শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, ঋণ ছাড়া। কারণ ঋণ শহীদ হওয়ার মাধ্যমেও মাফ হয় না। যদি মৃত ব্যক্তি সম্পদ রেখে যায়, তবে তা তার সম্পদ থেকে পরিশোধ করা হবে। আর যদি সম্পদ না থাকে এবং সে ঋণ নেওয়ার সময় পরিশোধের নিয়ত করে থাকে, তবে আল্লাহ নিজেই তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেবেন।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate