Saturday, February 21, 2026

গাছে ফসল আসার পর কিন্তু কাটার উপযুক্ত হওয়ার আগে যে ক্রয় বিক্রয় চুক্তি হয় তার বিধান

 প্রশ্ন: গাছে ফল বা শস্য আসার পর কিন্তু পাকার আগে বা ফসল কাটার উপযুক্ত হওয়ার আগে যে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি হয়, ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী তার বৈধতা কতটুকু? কিভাবে এই ধরনের ক্রয় বিক্রয় বৈধ হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর গাছের ফল, শস্য বিক্রির ক্ষেত্রে শরিয়তের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন ফল অর্থাৎ গাছে ফল আসার আগেই অগ্রিম বিক্রি করা বৈধ নয়। এমনকি ফল আসার পরেও যতক্ষণ না তা পরিপক্ব হয় বা খাওয়ার উপযোগী (লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করা) হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা কেনাবেচা করা উম্মাহ’র ইজমা বা সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ। অনেকে মনে করেন, ফল নষ্ট হলে গাছের দাম কমিয়ে সমন্বয় করা যাবে—এমন শর্তেও এই লেনদেন শুদ্ধ হবে না। কারণ মূল চুক্তিতেই যেখানে ‘গারার’ বা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান, সেখানে পরবর্তী কোনো অজুহাতে তা বৈধ হতে পারে না বরং এই ধরনের চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।
.
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন;عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ نَهَى عَنْ بَيْعِ الثَّمَرَةِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا، وَعَنِ النَّخْلِ حَتَّى يَزْهُوَ‏.‏ قِيلَ وَمَا يَزْهُو قَالَ يَحْمَارُّ أَوْ يَصْفَارُّ‏.‏ “নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন এবং খেজুরের রং ধরার আগে (বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন)। জিজ্ঞেস করা হল, রং ধরার অর্থ কী? তিনি বলেন, লাল বর্ণ বা হলুদ বর্ণ ধারণ করা।”(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২১৯৭) অপর বর্ননায় আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন:
‎أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ بَيْعِ الثِّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا، نَهَى الْبَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ‏.‏”আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফল
পরিপক্ক হওয়ার (ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার) আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন।”(সহিহ বুখারী হা/২১৯৪; সহীহ মুসলিম, হা/১৫৩৪)
.
ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ প্রকাশের আগে তা বিক্রি করা জায়েজ নয়—আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে এ ধরনের বিক্রি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, ফলের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হওয়ার আগেই তা নষ্ট হয়ে যাওয়া বা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে; কারণ অনেক সময় ফল তাদের অবস্থা প্রকাশের আগেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:أَرَأَيْتَ إِذَا مَنَعَ اللَّهُ الثَّمَرَةَ، بِمَ يَأْخُذُ أَحَدُكُمْ مَالَ أَخِيهِ ‏”‏‏.‏ “দেখ, যদি আল্লাহ্‌ তা‘আলা ফল ধরা বন্ধ করে দেন, তবে তোমাদের কেউ (বিক্রেতা) কিসের বদলে তার ভাইয়ের মাল (ফলের মূল্য) নিবে?”(সহীহ বুখারী (২১৯৮) ও সহীহ মুসলিম (১৫৫৫) মোটকথা ফল যখন প্রথম দৃশ্যমান হয় এবং তাতে পাকার লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখনই তার গুণাগুণ বা অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।তবে এর অর্থ এই নয় যে, ফলটিকে পুরোপুরি পাকতে হবে। এ কারণেই হাদিসে বলা হয়েছে—’যতক্ষণ না তার অবস্থা স্পষ্ট হয়’; এটি বলা হয়নি যে—’যতক্ষণ না তা পুরোপুরি খাওয়ার উপযোগী হয়’।যেমন ইমাম মুসলিম জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ননা করেছেন।নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফল ব্যবহারযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।এবং অন্য বর্ণনা অনুসারে, যতক্ষণ না তা পাকা হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/১৫৫৩)
.
কাশ্শাফুল ক্বিনাআ গ্রন্থে বলা হয়েছে:ولا) يصح بيع (الزرع قبل اشتداد حبه) ، لحديث ابن عمر أن النبي – صلى الله عليه وسلم – نهى عن بيع السنبل حتى يبيض ويأمن العاهة رواه مسلم.وعن أنس مرفوعا أنه نهى عن بيع الحب حتى يشتد رواه أحمد والحاكم وقال : على شرط مسلم .(إلا) إذا باع الثمرة قبل بدو صلاحها ، والزرع قبل اشتداد حبه ، (بشرط القطع في الحال) ؛ فيصح، قال في المغني: بالإجماع؛ لأن المنع إنما كان خوفا من تلف الثمرة وحدوث العاهة عليها، بدليل ما روى أنس أن النبي – صلى الله عليه وسلم – نهى عن بيع الثمار حتى تزهي. قال : أرأيت إذا منع الله الثمرة بم بما يأخذ أحدكم مال أخيه؟ رواه البخاري.(إن كان) ما ذكر (منتفعا به حينئذ) أي حين القطع ، فإن لم ينتفع بها كثمرة الجوز وزرع الترمس : لم يصح لعدم النفع بالمبيع “
(শস্যের দানা শক্ত হওয়ার আগে) তা বিক্রি করা সহীহ (বৈধ) নয়। এর দলিল হলো ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত হাদিস—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শস্যের শীষ (ধান/গমের ছড়া) সাদা হওয়া এবং তা আপদ-বিপদ থেকে নিরাপদ হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন (সহীহ মুসলিম)। আর আনাস (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণিত—তিনি (ﷺ) শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।”হাদিসটি ইমাম আহমাদ ও ইমাম হাকিম বর্ণনা করেছেন, এবং ইমাম হাকিম বলেছেন: এটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। (তবে ব্যতিক্রম হলো:) যদি ফল পরিপক্কতার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে কিংবা শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে (তা তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্তে) বিক্রি করা হয়; তবে তা সহীহ হবে। ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: এ বিষয়ে ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং তাতে দুর্যোগ বা রোগ-বালাইয়ের আশঙ্কা। এর প্রমাণ হলো আনাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস, যেখানে নবী (ﷺ) ফল ‘যাহি’ (বর্ণযুক্ত বা পরিপক্ক) হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।এরপর তিনি বলেছেন: “বলো তো, যদি আল্লাহ ফল উৎপাদনে বাধা দেন (নষ্ট করে দেন), তবে তোমাদের কেউ কোন জিনিসের বিনিময়ে তার ভাইয়ের সম্পদ গ্রহণ করবে?”হাদিসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। শর্ত হলো বিক্রিত বস্তুটি কেটে নেওয়ার সময় উপকারযোগ্য হতে হবে। যদি তা উপকারযোগ্য না হয় যেমন: কাঁচা আখরোটের ফল, কিংবা তরমুজজাতীয় শস্য তাহলে সে বিক্রয় শুদ্ধ হবে না কারণ বিক্রিত বস্তুতে তখন কোনো বৈধ উপকার নেই।”(কাশ্শাফুল ক্বিনাআ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৮১)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:”মানদণ্ড হলো কখন এটি (ফল) ভক্ষণযোগ্য ও সুস্বাদু হয়;কারণ,এই পর্যায়ে পৌঁছালেই মূলত তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব। এর আগে (কাঁচা অবস্থায়) এটি গ্রহণ করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। এছাড়া, ফল যখন পাকার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সাধারণত এটি নষ্ট হওয়া বা রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেও নিরাপদ হয়ে যায়।”(আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৩)
.
আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:
: “جمهور الفقهاء – بوجه عام – على أن بيع الثمر قبل بدو صلاحه، غير جائز ولا صحيح.
قال ابن المنذر: أجمع أهل العلم على القول بجملة هذا الحديث.
ومع ذلك فقد فصلوا فيه القول، تبعا لتقييد العقد بشرط وإطلاقه، ولا يخلو بيع الثمرة من هذه الأحوال:
الأولى: أن يبيعها قبل الظهور والبروز، أي قبل انفراك الزهر عنها وانعقادها ثمرة، فهذا البيع لا يصح اتفاقا.
الثانية: أن يبيعها بعد الظهور، قبل بدو الصلاح، بشرط الترك والتبقية على الشجر حتى تنضج، فلا يصح هذا البيع إجماعا ….
وعلله ابن قدامة: بالنهي عنه في الحديث المذكور، والنهي يقتضي الفساد.
قالوا: ومثل بيع الثمرة قبل بدو الصلاح بشرط الترك، بيع الزرع قبل أن يشتد.
الثالثة: أن يبيعها بعد الظهور، قبل بدو الصلاح بشرط القطع في الحال، فهذا البيع صحيح بالإجماع، ولا خلاف في جوازه…
غير أن الفقهاء قيدوا هذا الحكم، وهو جواز بيع الثمرة قبل بدو صلاحها بشرط القطع في الحال، بقيود بعضها متفق عليه، وبعضها انفرد به فريق من الفقهاء، نشير إليها فيما يلي: الشرط الأول: أن يكون الثمر منتفعا به…
وقد أجاز الفقهاء أيضا، إضافة إلى هذه الصورة الجائزة، وهي بيع ما لم يبدُ صلاحه بشرط القطع في الحال، هذه الصور:
(1) أن يبيع الثمرة التي لم يبد صلاحها مع الشجر، أو الزرع الأخضر مع الأرض، ولا يختلف فيها الفقهاء؛ لأن الثمر فيها والزرع تابعان للشجر والأرض، اللذين لا تعرض لهما عاهة، كما يقول الشافعية.
(2) أن يبيع الثمرة لمالك الأصل، وهو الشجر، أو يبيع الزرع لمالك الأرض، لأنه إذا بيع مع أصل، دخل تبعا في البيع، فلم يضرّ احتمال الغرر فيه، كما احتُملت الجهالة في بيع اللبن في الضرع مع الشاة.
نص على هذه الصورة الحنابلة، كما نص على الأولى الجميع. وزاد المالكية الصورة التالية:
(3) أن يبيع الأصل، وهو الشجر أو الأرض، ثم بعد ذلك بفترة ما، قربت أو بعدت، وقبل خروجهما من يد المشتري، يلحق الثمر أو الزرع بالأصل المبيع قبله”
“জমহুর ফকীহদের সাধারণ মত হলো: ফল পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে তা বিক্রি করা জায়েযও নয়,সহীহও নয়।ইবনু মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:’আহলুল ইলমগণ এই হাদিসের সামগ্রিক বক্তব্যের ওপর ঐক্যমত (ইজমা) পোষণ করেছেন। তবে ফকীহগণ এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন চুক্তি শর্তযুক্ত নাকি শর্তবিহীন, তার ওপর ভিত্তি করে। ফল বিক্রির অবস্থা সাধারণত এই কয়েক ভাগে বিভক্ত:
প্রথম অবস্থা: ফল দৃশ্যমান বা প্রকাশ পাওয়ার আগেই বিক্রি করা। অর্থাৎ ফুল ঝরে গিয়ে ফল গঠন হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা। এ ধরনের বিক্রয় সর্বসম্মতভাবে (ইত্তেফাকান) সহীহ নয়।
দ্বিতীয় অবস্থা: ফল দৃশ্যমান হওয়ার পর কিন্তু পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে এই শর্তে বিক্রি করা যে, তা গাছেই রেখে দেওয়া হবে (যতক্ষণ না পাকে)। ইজমা অনুযায়ী এই বিক্রি সহীহ নয়।ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) এর কারণ হিসেবে বলেন: হাদিসে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, আর নিষেধাজ্ঞা (চুক্তি) ফাসিদ হওয়াকেই সাব্যস্ত করে। ফকীহগণ বলেন: পাকার লক্ষণ প্রকাশের আগে ফল রেখে দেওয়ার শর্তে বিক্রি করা যেমন, শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে তা (রেখে দেওয়ার শর্তে) বিক্রি করাও ঠিক তেমন (অর্থাৎ অবৈধ)।
তৃতীয় অবস্থা: ফল দৃশ্যমান হওয়ার পর কিন্তু পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে এই শর্তে বিক্রি করা যে, তা তৎক্ষণাৎ কেটে নেওয়া হবে। এই বিক্রি ইজমা অনুযায়ী সহীহ ও জায়েজ এবং এর বৈধতায় কোনো মতভেদ নেই। তবে ফকীহগণ ‘তৎক্ষণাৎ কেটে নেওয়ার শর্তে’ পাকার আগে ফল বিক্রির এই বৈধতাকে কিছু শর্ত দ্বারা সীমাবদ্ধ করেছেন। এর কিছু শর্ত সর্বসম্মত, আর কিছু শর্ত নির্দিষ্ট কিছু ফকীহগণের নিজস্ব মত। সংক্ষেপে সেগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হলো:
প্রথম শর্ত: ফলটি এমন হতে হবে যা থেকে (বর্তমানেই) উপকার গ্রহণ করা যায়।(অর্থাৎ খাওয়া বা অন্যভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে)। পরিণত হওয়ার আগে তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্তে বিক্রয় করার এই বৈধ সুরতটির পাশাপাশি ফকিহগন আরও কিছু সুরত বা পদ্ধতিকে জায়েয বলেছেন:
​(১).পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি এমন ফলকে গাছসহ বিক্রি করা, অথবা সবুজ শস্যকে জমিসহ বিক্রি করা। এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ এখানে ফল বা শস্য মূলত গাছ বা জমির অনুসারী (তাবে‘); আর শাফেয়ি ফকীহদের মতে গাছ ও জমির ক্ষেত্রে সাধারণত এমন কোনো আপদ বা ঝুঁকি (عاهة) থাকে না (যা ফল বা শস্যের ক্ষেত্রে থাকে)।
​(২).ফলকে গাছের মালিকের কাছেই বিক্রি করা, অথবা শস্যকে জমির মালিকের কাছেই বিক্রি করা। কারণ এটি যখন তার মূলের (গাছ বা জমির) সাথে বিক্রি হয়, তখন তা অনুগামী হিসেবে বিক্রির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে এতে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা (গারার) কোনো ক্ষতি করে না; যেমনটি বকরির সাথে তার ওলানে থাকা দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে দুধের পরিমাণ অজানা থাকা সত্ত্বেও তা জায়েয ধরা হয়। হাম্বলি ফকীহগণ এই সুরতটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, আর প্রথম সুরতটি (গাছসহ বিক্রি) সবাই উল্লেখ করেছেন। মালিকি ফকীহগণ এর সাথে নিচের সুরতটি যুক্ত করেছেন:
(৩). মূল বস্তু অর্থাৎ গাছ বা জমি বিক্রি করা, তারপর কিছু সময় পর (সময় কাছাকাছি হোক বা দীর্ঘ সময় পর), কিন্তু যতক্ষণ না তা ক্রেতার দখল থেকে বের হয়ে যায়, ততক্ষণে সেই গাছ বা জমিতে ফল বা শস্য উৎপন্ন হলে সে ফল বা শস্য পূর্বে বিক্রীত মূল বস্তুর অনুগামী হিসেবে গণ্য হবে।(অর্থাৎ মূলের সঙ্গেই যুক্ত হবে)।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৮৯)
.
দ্বিতীয় শর্ত: কোনো ফল বিক্রির ক্ষেত্রে বাগানের প্রতিটি ফলে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। বরং কোনো একটি গাছের কিছু ফলে পাকার লক্ষণ (বা খাওয়ার উপযোগী হওয়া) দেখা দিলেই ওই গাছের সব ফল বিক্রি করা বৈধ; এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐক্যমত্য (ইজমা) রয়েছে। আর পুরো বাগানটি যদি একই সীমানায় হয়, তবে বাগানের প্রতিটি গাছে পাকার লক্ষণ আসা জরুরি নয়। বরং এ ক্ষেত্রে ফলের ‘জাত’ বা প্রজাতিকে (Species) ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট জাতের অন্তত একটি গাছেও যদি পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ওই জাতের সব গাছের ফল বিক্রি করা বৈধ হবে।উদাহরণস্বরূপ: একটি বাগানে যদি ‘বরহি’ এবং ‘সুক্কারি’—এই দুই জাতের খেজুর গাছ থাকে, তবে শুধু বরহি খেজুর পাকার লক্ষণ দেখা দেওয়া সুক্কারি খেজুর বিক্রির জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিটি জাতের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে অন্তত একটি গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া আবশ্যক।(বিস্তারিত দেখুন: ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৫০)।”
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
إذا بدا صلاح بعض الشجرة ، كان صلاحًا لباقيها ، باتفاق العلماء ، ويكون صلاحها صلاحًا لسائر ما في البستان من ذلك النوع ، في أظهر قولي العلماء ، وقول جمهورهم ، بل يكون صلاحًا لجميع ثمرة البستان التي جرت العادة بأن يباع جملة، في أحد قولي العلماء
“যখন কোনো গাছের কিছু ফলের পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন তা গাছের বাকি অংশের জন্যও পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। আর সেই গাছের পাকার লক্ষণ একই ধরনের গাছসমূহের জন্যও পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে এটি আলেমদের দুই মতের মধ্যে অধিক স্পষ্ট মত, এবং জমহুর আলেমদের মত। বরং এমনও বলা হয়েছে যে সব ফল সাধারণত একত্রে বিক্রি করার রীতি আছে, সেই ক্ষেত্রে একটি মত অনুযায়ী, বাগানের সব ফলের জন্যই তা পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯;পৃষ্ঠা: ৪৮৯)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি
গন্থে বলেন:
قوله: ( وصلاح بعض الشجرة صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان) مثال ذلك: البستان فيه أنواع من التمر كالسكري والبرحي وأم حمام ، بدا الصلاح في واحدة من البرحي ، يقول المؤلف: إن بدو الصلاح في هذه الشجرة صلاح لها ، ولسائر النوع ، الذي هو البرحي .
أما السكري وأم الحمام : فلا يكون صلاح البرحية صلاحاً لهما؛ لأن النوع مختلف.
وظاهر كلام المؤلف أنه سواء بِيع النوع جميعاً ، أو بيع تفريداً ، بأن بعنا التي بدا صلاحها ، وانتقل ملكها إلى المشتري ، ثم بعنا البقية من نوعها على آخرين ، فالكل صحيح ، حيث ذكر المؤلف أن صلاح بعض الثمرة صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان .
وهذا أحد القولين في مذهب الإمام أحمد: أنه إذا بدا صلاح في شجرة ، فهو صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان.
أما المذهب : فإنه إذا بِيعَ النوع جميعاً ، فصلاح بعض الشجرة ، صلاح للنوع ؛ لأنه لما بيع جميعاً ، صار كأنه نخلة واحدة ، وصلاح بعض النخلة صلاح لجميعها ، فالعقد يقع عليها جميعاً .
أما إذا أفرد : فإنك إذا بعت ما بدا صلاحه ، ثم جددت عقداً لِمَا لم يبدُ صلاحه ، صدق عليك أنك بعت ثمرة قبل بدو صلاحها ، وقد نهى النبي صلّى الله عليه وسلّم عن بيع الثمرة حتى يبدو صلاحها .والمذهب أصح مما هو ظاهر كلام المؤلف .
وقال بعض العلماء : إن صلاح بعض الشجرة : صلاح لها ، ولنوعها ، ولجنسها ؛ فمثلاً : إذا كان عند إنسان بستان فيه عشرة أنواع من النخل ، وبدا الصلاح في نوع منها : جاز بيع الجميع صفقة واحدة ، الذي من نوعه ، والذي ليس من نوعه .
لكن المذهب لا يعتبرون ذلك ، يعتبرون النوع ، والمذهب أحوط ، وإن كان هذا القول قوياً جداً…”
লেখকের বক্তব্য: “(কোনো গাছের) ফলের কিছু অংশে পাকার লক্ষণ (সালাহ) প্রকাশ পাওয়া, সেই গাছ এবং বাগানে বিদ্যমান ওই একই জাতীয় সকল ফলের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।)
এর উদাহরণ হলো: একটি বাগানে বিভিন্ন জাতের খেজুর আছে, যেমন— সুক্কারী, বারহী এবং উম্মু হাম্মাম। এখন বারহী জাতের একটি গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দিল। লেখকের (যাদুল মুস্তাকনি প্রণেতার) বক্তব্য অনুযায়ী: এই গাছের পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মানে তা ওই নির্দিষ্ট গাছের জন্য এবং বাগানে থাকা বারহী জাতীয় সকল গাছের জন্যই পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু সুক্কারি ও উম্মু হাম্মাম জাতের ক্ষেত্রে বরহি গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া তাদের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না কারণ এগুলোর জাত ভিন্ন। লেখকের বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ হলো, একই জাতের সব গাছ একসঙ্গে বিক্রি করা হোক, কিংবা আলাদাভাবে (খুচরা) বিক্রি করা হোক দুই অবস্থাতেই বিক্রয় সহীহ। যেমন: প্রথমে যে গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে সেটি বিক্রি করা হলো এবং তার মালিকানা ক্রেতার কাছে চলে গেল। এরপর একই জাতের বাকি গাছগুলো অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হলো লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, সবগুলো বিক্রয়ই শুদ্ধ হবে।কারণ লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ফলের কিছু অংশে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মানে তা ওই গাছ এবং বাগানে থাকা ওই জাতীয় সকল ফলের জন্যই পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। আর এটি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবের দুটি মতের একটি: “যদি একটি গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা সেই গাছের জন্য এবং বাগানে থাকা ওই একই জাতীয় সকল গাছের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।” তবে মাযহাবের (হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য) মত হলো: যদি ওই জাতীয় সকল ফল একত্রে (এক চুক্তিতে) বিক্রি করা হয়, তবে একটি গাছের পাকার লক্ষণ পুরো জাতের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ যখন সব একত্রে বিক্রি করা হয়, তখন তা একটি মাত্র খেজুর গাছের ন্যায় হয়ে যায়; আর একটি গাছের কিছু অংশ পাকা মানেই পুরো গাছের জন্য তা পাকার লক্ষণ— ফলে পুরো চুক্তিতেই তা কার্যকর হয়। কিন্তু যদি আলাদা আলাদাভাবে (খুচরা) বিক্রি করা হয় (তবে ভিন্ন কথা)। কারণ আপনি যদি প্রথমে সেই ফল বিক্রি করেন, যেটির পাকার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, এরপর নতুন করে চুক্তি করে সেই ফল বিক্রি করেন, যার পাকার লক্ষণ এখনো প্রকাশ পায়নি তাহলে বাস্তবে আপনি এমন ফল বিক্রি করছেন, যার পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি।অথচ নবী ﷺ) ফল পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। তাই মাযহাবের এই মতটিই লেখকের বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থের তুলনায় অধিক সহীহ ও শক্তিশালী।
​কোনো কোনো আলেম বলেন: একটি গাছের কিছু ফলে পাকার লক্ষণ দেখা দেওয়া মানে তা ওই গাছের জন্য, ওই জাতের (Variety) জন্য এবং ওই লিঙ্গের (Genus/পুরো খেজুর শ্রেণির) জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ: যদি কোনো ব্যক্তির বাগানে দশ পদের খেজুর গাছ থাকে এবং তার মধ্যে মাত্র এক জাতের গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে সব কটি গাছ এক চুক্তিতে বিক্রি করা জায়েয হবে— চাই তা একই জাতের হোক বা ভিন্ন জাতের।কিন্তু (হাম্বলী) মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত এ বিষয়টি গ্রহণ করে না।তারা কেবল জাত পর্যন্তই বিবেচনা করেন।আর মাযহাবের এই মতটিই অধিক সতর্কতামূলক যদিও ওই মতটি (সকল লিঙ্গের জন্য প্রযোজ্য হওয়া) অত্যন্ত শক্তিশালী।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি‘,আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪০)
.
দ্বিতীয়ত: বৃক্ষের ফল পরিপক্ক হওয়ার (পাকা শুরু হওয়ার) আগেই তা বিক্রয় করার বৈধ সূরতসমূহ কি?
.
​ওলামায়ে কেরাম এমন কিছু বিশেষ ক্ষেত্র বা সূরত (Exceptions) বাদ দিয়েছেন যেগুলোতে ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা জায়েজ। সেগুলো হলো:
.
(১).গাছের সাথে ফল বিক্রি করা: গাছের সাথে ফল বিক্রি করা অথবা জমির সাথে সবুজ শস্য বিক্রি করা বৈধ—ফল পাকা শুরু হোক বা না হোক। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ এখানে ফলের বিক্রয়টি স্বতন্ত্রভাবে নয়; বরং গাছের অনুগামী (تابع) হিসেবে গণ্য হয়।আলেমগণের নিকট স্বীকৃত একটি মূলনীতি হলো:أنه يغتفر في التابع ما لا يغتفر في الشيء المستقل”যা কোনো স্বতন্ত্র (প্রধান) বিষয়ের ক্ষেত্রে মার্জনীয় নয়, তা কোনো বিষয়ের অনুগামী বা অংশবিশেষের ক্ষেত্রে মার্জনীয়।” এই নীতিটির মূল কথা হলো—একটি কাজ যখন নিজে নিজে আলাদাভাবে করা হয়, তখন তার ওপর যে কঠোর নিয়ম বা শর্ত প্রযোজ্য হয়; সেই একই কাজ যখন অন্য কোনো বড় কাজের অংশ বা অনুগামী হিসেবে আসে, তখন নিয়মগুলো কিছুটা শিথিল হতে পারে।উদাহরণস্বরূপ: পশুর পেটে থাকা বাচ্চা আলাদাভাবে কেনাবেচা করা জায়েজ নেই (কারণ এটি অনির্দিষ্ট বা অজ্ঞাত)। কিন্তু আপনি যদি একটি গর্ভবতী গরু কেনেন, তবে পেটের বাচ্চাটি গরুর অনুসারী বা অংশ (تابع) হিসেবে কেনাবেচার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং তা বৈধ হবে।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:أن يبيعها مع الأصل ، فيجوز بالإجماع ؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم : ( من ابتاع نخلا بعد أن تؤبر ، فثمرتها للذي باعها ، إلا أن يشترط المبتاع ) ، ولأنه إذا باعها مع الأصل حصلت تبعا في البيع ، فلم يضر احتمال الغرر فيها “ফলের মূলের (গাছের) সাথে ফল বিক্রি করা সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা অনুযায়ী) জায়েজ। কারণ নবী করীম (ﷺ) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো খেজুর গাছ ক্রয় করল যা পরাগায়ন করা হয়েছে, তবে তার ফল বিক্রেতার প্রাপ্য হবে, যদি না ক্রেতা তা শর্ত হিসেবে (নিজের জন্য) গ্রহণ করে।’ তাছাড়া, যখন মূল গাছের সাথে ফল বিক্রি করা হয়, তখন তা বিক্রিতে অনুগামী হিসেবে গণ্য হয়, তাই এতে অনিশ্চয়তার (Gharar) আশঙ্কা কোনো ক্ষতি করে না।”(ইবনু কুদামাহ আল-মুগনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৫০)
​’আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’-তে বলা হয়েছে:واستثنى الفقهاء من عدم جواز بيع الثمر قبل بدو صلاحه : ما إذا بيع الثمر مع الأصل ، وذلك بأن يبيع الثمرة مع الشجر ؛ لأنه إذا بيع مع الأصل ، دخل تبعا في البيع ، فلم يضر احتمال الغرر فيه “ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান থেকে ফকিহগণ গাছসহ ফল বিক্রিকে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ যখন গাছের সাথে ফল বিক্রি হয়, তখন তা মূলের অনুগামী হিসেবে বিক্রয়ভুক্ত হয়, ফলে অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা কোনো ক্ষতি করে না।”(আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ১৫)
.
​(২).অবিলম্বে কেটে ফেলার শর্তে ফল বিক্রি করা: ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা জায়েজ, যদি ক্রেতা তা তৎক্ষণাৎ বা অবিলম্বে কেটে নেওয়ার শর্তে ক্রয় করে এবং পাকার জন্য অপেক্ষা না করে। ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে এই ক্রয়-বিক্রয় সঠিক। আলেমগণ এর কারণ হিসেবে বলেছেন যে, পরিপক্ক হওয়ার আগে ফল বিক্রি নিষিদ্ধ করার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বা ফল সংগ্রহের আগে তাতে কোনো রোগ বা আপদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। কিন্তু যা সাথে সাথে কেটে ফেলা হয়, সে ক্ষেত্রে এই ভয় থাকে না।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:أن يبيعها بشرط القطع في الحال ، فيصح بالإجماع ؛ لأن المنع إنما كان خوفًا من تلف الثمرة ، وحدوث العاهة عليها قبل أخذها ؛ بدليل ما روى أنس : ( أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن بيع الثمار حتى تزهو . قال : أرأيت إذا منع الله الثمرة ، بم يأخذ أحدكم مال أخيه ؟ ) رواه البخاري . وهذا مأمون فيما يُقطع ، فصح بيعه ، كما لو بدا صلاحه”আর যদি ফল (পরিপক্ক হওয়ার আগে) এই শর্তে বিক্রি করা হয় যে, তা তৎক্ষণাৎ কেটে (সংগ্রহ করে) ফেলা হবে, তবে সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা অনুযায়ী) তা বৈধ। কারণ, [পরিপক্ক হওয়ার আগে ফল বিক্রিতে] নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়া বা সংগ্রহের পূর্বে তাতে কোনো দুর্যোগ/মড়ক (আফাত) আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। এর প্রমাণ আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীস:’নবী (ﷺ) ফল লাল বা হলুদ (পরিপক্ক) হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহ যদি ফল উৎপাদনে বাধা দেন (অর্থাৎ ফল নষ্ট করে দেন), তবে তোমাদের কেউ কোন জিনিসের বিনিময়ে তার ভাইয়ের সম্পদ ভোগ করবে?’ (সহীহ বুখারী) আর যে ফল তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্ত থাকে, তাতে এই ঝুঁকি (নষ্ট হওয়ার ভয়) নেই। ফলে এর ক্রয়-বিক্রয় সহীহ বা বৈধ, ঠিক যেমন ফল পরিপক্ক হওয়ার পর বিক্রি করা বৈধ।”
(ইবনু কুদামাহ;আল-মুগনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৪৯) জেনে রাখা ভাল যে, এই বিধান তখনই কার্যকর হবে যখন ফলটি কাঁচা অবস্থায় কোনো না কোনো উপকারে আসে (যেমন: কাঁচা আম বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য ফল)। যদি ফলটি এতোই ছোট বা অকেজো হয় যে তা কেটে ফেললে কোনো কাজেই আসবে না, তবে সেই বিক্রয় ‘মাল’ (সম্পদ) হিসেবে গণ্য না হওয়ায় তা বাতিল হতে পারে।
.
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে এর সঠিক অনুসরণের তৌফিক দান করুন। (তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

রাস্তায় পড়ে থাকা টাকা বা মূল্যবান বস্তু পাওয়ার পর একজন মুমিনের দায়িত্ব কী

 প্রশ্ন: রাস্তায় পড়ে থাকা টাকা বা মূল্যবান বস্তু পাওয়ার পর একজন মুমিনের দায়িত্ব কী? এই সম্পদ কি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভোগ করা জায়েজ নাকি এর ভিন্ন কোনো ব্যবস্থাপনা রয়েছে?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর কেউ যদি রাস্তায় কোনো সম্পদ কুড়িয়ে পায় সেটির বিধান কী? শার’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নটি ‘লুক্বাতা’ (কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস সম্পর্কে) সম্পর্কে যা ইসলামী ফিকহের অন্যতম একটি অধ্যায়।
‘লুক্বাতা’ বলতে বোঝানো হয়:কোনো ব্যক্তির হারানো সম্পদ। অর্থাৎ এটি এমন সম্পদ, যা তার প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।ইসলাম এই মহৎ দ্বীনের অংশ হিসেবে সম্পদের সংরক্ষণ ও রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।মুসলিমদের সম্পদকে সম্মান করা ও তা সুরক্ষিত রাখা শরীয়তের নির্দেশিত বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। এরই ধারাবাহিকতায় লুক্বাতা (কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস) সম্পর্কিত বিধানাবলী প্রণীত হয়েছে। যখন কোনো সম্পদ তার মালিকের নিকট থেকে হারিয়ে যায়, তখন সেটির তিনটি সম্ভাব্য অবস্থা হতে পারে।
.
প্রথম অবস্থা: এটি এমন কিছু হওয়া যা সাধারণ মানুষের কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না। যেমন: চাবুক, রুটি, একটি ফল, লাঠি ইত্যাদি। এগুলো যে ব্যক্তি পায় সে-ই এগুলোর মালিক হয়ে যায় এবং কোনো ঘোষণা ছাড়াই তা ব্যবহার করতে পারে। এই মতটি বর্ণিত হয়েছে, ওমর (রা.), আলী (রা.), ইবনে ওমর (রা.) এবং আয়েশা (রা.) থেকে। এছাড়া আতা, জাবির বিন যায়েদ, তাউস, নাখয়ী, ইয়াহইয়া বিন আবু কাসীর, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী এবং আহলে রায় (হানাফী আলেমগণ)-ও একই মত পোষণ করেছেন। এর সপক্ষে দলীল হচ্ছে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীস,তিনি বলেন: رخَّص رسولُ اللهِ في العصا والسَّوطِ والحَبْلِ ( وأشباهه ) يلتقطُه الرجلُ ينتفعُ به”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাঠি, চাবুক এবং দড়ি কুড়িয়ে পেলে তা মানুষের জন্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছেন।”(আবু দাউদ হা/১৭১৭-তে হাদীসটি বর্ণনা করেন,তবে অনেক ইমাম হাদিসটির সনদ দুর্বল বলেছেন)।
.
অপর বর্ননায় এসেছে,নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনৈক ব্যক্তিকে একটি খেজুর খেতে দেখে তাকে নিষেধ করেননি, বরং বলেছিলেন: “তুমি যদি এর কাছে না যেতে, তবে এটিই তোমার কাছে আসত (অর্থাৎ তুমি না নিলেও এটি তোমার জন্য নির্ধারিত ছিল)।” সহীহ ইবনে হিব্বান হা/৩২৪০;ইমাম বায়হাকী শু’আব আল-ঈমান হা/১১৯০) এমনকি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে একবার একটি খেজুর পড়ে থাকতে দেখে বলেছিলেন: “যদি আমার এই আশঙ্কা না থাকত যে এটি সদকার খেজুর, তবে আমি নিজেই এটি খেয়ে নিতাম।”
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:ولا نعلم خلافا بين أهل العلم في إباحة أخذ اليسير، والانتفاع به.”সকল ইমামের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, সামান্য ও মূল্যহীন হারানো জিনিস নেওয়া এবং তাতে উপকার গ্রহণ করা জায়েয।”(ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৭৬)
.
দ্বিতীয় অবস্থা: এমন কোনো প্রাণী হওয়া যে নিজে ছোট ছোট হিংস্র প্রাণীকে প্রতিহত করতে পারে। প্রাণীটি বিশালাকায় হওয়ার কারণে; যেমন: উট, ঘোড়া, গরু বা খচ্চর। কিংবা উড়তে পারার কারণে; যেমন: পাখি। কিংবা দ্রুত দৌড়াতে পারার কারণে; যেমন: হরিণ। অথবা দাঁত দিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারার কারণে; যেমন: চিতা। এই ধরনের প্রাণী কুড়িয়ে নেওয়া হারাম। যে এটি কুড়িয়ে নিয়েছে সে ঘোষণা দিলেও মালিকানা লাভ করবে না। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হারানো উটের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, مالك ولها ؟! معها سقاؤها وحذاؤها ترد الماء ، وتأكل الشجر حتى يجدها ربها “তোমার হস্তক্ষেপের কোন প্রয়োজন নেই?!তার সাথেই (জুতার ন্যায়) ক্ষুর ও পানির পাত্র রয়েছে, সে পানি পান করবে এবং গাছের পাতা খাবে, এক পর্যায়ে তার মালিক তাকে খুঁজে পাবে।”(হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন; দেখুন সহীহ মুসলিম হা/৪৩৯০) আরেক বর্ননায় উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: (من أخذ الضالة فهو ضال )“যে ব্যক্তি হারানো উট হস্তগত করে, সে-ই পথভ্রষ্ট।”(অর্থাৎ ভুলকারী। এই হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুকুম দিয়েছেন যেন হারানো উটকে কুড়িয়ে নেওয়া না হয়। বরং এটি পানি পান করবে, গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকবে। এক পর্যায়ে এর মালিক তাকে পেয়ে যাবে। এই হুকুমের অধিভুক্ত হবে বড় বড় সরঞ্জামাদি; যেমন: বিশাল পাতিল, কাঠ, লোহা ইত্যাদি, যেগুলো নিজ স্থানে সংরক্ষিত থাকে, নষ্ট হয় না এবং স্থানান্তরিত হয় না। হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর মত এসব হস্তগত করা সব না নেওয়া আরো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষিদ্ধ।
.
তৃতীয় অবস্থা: হারিয়ে যাওয়া জিনিস অন্য সব ধরনের সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া। যেমন: টাকা-পয়সা, মালপত্র, এবং এমন প্রাণী যেগুলো ছোট হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। যথা: ছাগল, উটের বাচ্চা, গরুর বাছুর ইত্যাদি। এই প্রকারের সম্পদ যিনি পাবেন তিনি যদি নিজেকে খেয়ানত করা থেকে নিরাপদ মনে করেন তাহলে তার জন্য এটি কুড়িয়ে নেওয়া বৈধ হবে। তবে এটি আবার তিন প্রকার:
.
প্রথম প্রকার: খাওয়ার উপযুক্ত পশু। যেমন উটের বাছুর, ছাগল, মুরগি ইত্যাদি। যে ব্যক্তি এমন কিছু কুড়িয়ে পাবে তার উপর অনিবার্য তিনটি এখতিয়ারের মধ্যে যেটি মালিকের স্বার্থ অধিক রক্ষাকারী সেটি গ্রহণ করা:-সে এটি খেয়ে ফেলবে। আর অবিলম্বে মালিককে এর মূল্য পরিশোধ করা তার উপর আবশ্যক হবে।-এর বিবরণ জেনে নিয়ে একে বিক্রি করে এর মূল্য মালিকের জন্য সংরক্ষণ করে রেখে দিবে।-এর হেফাজত করবে, নিজের সম্পদ থেকে এর লালন-পালনের জন্য খরচ করবে। তবে এটাকে নিজের মালিকানায় নিবে না। মালিক এটি নিতে আসলে তখন মালিকের কাছে খরচের অর্থ দাবী করবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছাগল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন: (خذها ، فإنما هي لك أو لأخيك أو للذئب ) “এটা কুড়িয়ে নাও। এটি হয়তো তোমার জন্য, নয়তো তোমার ভাইয়ের জন্য, কিংবা নেকড়ের জন্য।”(সহিহ বুখারী হা/২৪৩৬ ও সহিহ মুসলিম হা/৪৩৯৪) অর্থাৎ ছাগল দুর্বল ও ধ্বংসের ঝুঁকিতে আছে। ছাগলের অবস্থা হলো হয়তো তুমি এটাকে হস্তগত করবে, নতুবা অন্য কেউ হস্তগত করবে নতুবা নেকড়ে এটাকে খেয়ে ফেলবে। ইবনে কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: ( وفيه جواز التقاط الغنم ، وأن الشاة إذا لم يأت صاحبها ، فهي ملك المتلقط ، فيخير بين أكلها في الحال وعليه قيمتها ، وبين بيعها وحفظ ثمنها ، وبين تركها والإنفاق عليها من ماله ، وأجمعوا على أنه لو جاء صاحبها قبل أن يأكلها الملتقط ، له أخذها ) “এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়: হারানো ছাগল কুড়িয়ে নেওয়া বৈধ। যদি মালিক না আসে তবে যিনি কুড়িয়ে পেলেন তিনি এর মালিক হয়ে যাবেন। কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তির একাধিক এখতিয়ার থাকবে। তৎক্ষণাৎ ছাগলটি খেয়ে এর মূল্য বহন করা নতুবা বিক্রি করে দাম রেখে দিবে কিংবা ছাগলটি রেখে দিয়ে নিজের সম্পদ থেকে লালন-পালন করবে। এই তিনটির মাঝে যে কোনোটি করার ব্যাপারে সে স্বাধীন। আলেমরা একমত যে যদি সে এটি খাওয়ার আগে এর মালিক চলে আসে, তাহলে মালিক নিয়ে নিতে পারবে।”(গৃহীত: ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫০৪৯)
.
দ্বিতীয় প্রকার: পচনশীল জিনিস। যেমন: তরমুজ, ফলমূল। এগুলো যিনি কুড়িয়ে পাবেন তিনি নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে যেটি মালিকের স্বার্থ অধিক রক্ষাকারী সে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সে ব্যবস্থাগুলো হচ্ছে: এটি খেয়ে এর মূল্য মালিককে দেওয়া অথবা এটি বিক্রি করে মালিক আসা পর্যন্ত এর মূল্য সংরক্ষণ করা।
.
তৃতীয় প্রকার: প্রথম দুই প্রকার ছাড়া অন্যান্য সব সম্পদ। যেমন: নগদ অর্থ, থালা-বাসন ইত্যাদি। এগুলো আমানত হিসেবে নিজের কাছে সংরক্ষণ করা আবশ্যক।তবে এই ধরনের অর্থ-সম্পদ পাওয়ার পর জনসমাগম স্থলে এগুলোর ব্যাপারে ঘোষণা দিতে হবে।
.
কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করে এবং এ ব্যাপারে যে ঘোষণা দিতে হবে তা দেওয়ার মত সক্ষমতা যদি তার না থাকে, তাহলে তার জন্য কুড়িয়ে নেওয়া বৈধ হবে না। কারণ যাইদ ইবনে খালিদ আল-জুহানী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীস আছে: তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুড়িয়ে পাওয়া স্বর্ণ বা অর্থের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন:“এর বাঁধন ও থলে চিহ্নিত করে রাখো, তারপর এক বছর ঘোষণা করো। যদি তার মালিককে জানতে না পারো, তাহলে তুমি এটি খরচ করে ফেলো। তবে এটি তোমার কাছে আমানত হিসেবে থাকবে। কোনো দিন মালিক এসে চাইলে তাকে ফেরত দেবে।” আর ছাগল সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: “তুমি এটি গ্রহণ কর, এটি হয়তো তোমার জন্য, নয়তো তোমার অন্য ভাইয়ের জন্য, নয়তো নেকড়ের জন্য।” হারিয়ে যাওয়া উট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: “তোমার হস্তক্ষেপের কোন প্রয়োজন নেই?! উটের সাথে পানি আছে, উটের পা আছে। সে পানি পান করতে পারবে এবং গাছপালা খেতে পারবে যতক্ষণ না মালিক তাকে পেয়ে যায়।”(হাদীসটি বুখারী হা/২৪৩৬ ও মুসলিম হা/৪৩৯১ বর্ণনা করেন)। উক্ত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “বাঁধন ও থলে চিহ্নিত করে রাখো” এখানে বাঁধন বলতে উদ্দেশ্য যা দিয়ে থলের মুখ বাঁধা হয়। আর থলে হচ্ছে যে পাত্রের মাঝে বস্তুটি থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “এক বছর ঘোষণা করো” বলতে বোঝানো হয়েছে: মানুষের সমাবেশ স্থলে যেমন: বাজার, মসজিদের দরজা, সামাজিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে। কুড়িয়ে নেওয়ার প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন ঘোষণা দিতে হবে। কারণ ঐ সপ্তাহে মালিক ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এরপর থেকে ঘোষণার ক্ষেত্রে মানুষের প্রচলন অনুযায়ী ঘোষণা দিবে।(প্রাচীন যুগে এগুলোই ছিল ঘোষণার পদ্ধতি। বর্তমান সময়ে কুড়িয়ে নেওয়া ব্যক্তি উপযুক্ত মাধ্যম ব্যবহার করে ঘোষণা করবে। মূলকথা হলো: এর দ্বারা যেন উদ্দেশ্য হাসিল হয়। অর্থাৎ মালিককে খুঁজে পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়।) উক্ত হাদীস আরো প্রমাণ করে যে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু চিনে রাখা আবশ্যক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “এর বাঁধন ও থলে চিনে রাখো” প্রমাণ করে যে এর বৈশিষ্ট্য জেনে রাখা আবশ্যক। ফলে মালিক এসে এর যথাযথ বর্ণনা দিলেই তাকে সেটি প্রদান করা হবে। আর যদি তার বিবরণ প্রকৃত অবস্থার চেয়ে ভিন্ন হয় তাহলে তাকে দেওয়া জায়েয হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “যদি তুমি এর মালিক জানতে না পারো, তাহলে খরচ করে ফেলো” এটি প্রমাণ করে যে কুড়িয়ে নেওয়া ব্যক্তি এক বছর ঘোষণা দেওয়ার পর সে এর মালিক হয়ে যায়। কিন্তু কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসের বৈশিষ্ট্যাবলি চেনার আগে তার জন্য এতে হস্তক্ষেপ করা যথাযথ হবে না। অর্থাৎ সে এর বাঁধন, থলে, পরিমাণ, ধরন এবং বৈশিষ্ট্য জেনে রাখবে; যাতে করে এক বছর পর মালিক এসে যদি যথাযথ বিবরণ দেয় তাহলে তাকে সেটি দিতে পারে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কোনো দিন মালিক এসে চাইলে তাকে ফেরত দেবে।”
.
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে কুড়িয়ে পাওয়া সম্পদের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় আবশ্যক; যথা:
.
এক: কেউ যদি নিজের ব্যাপারে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসের আমানত রক্ষা করা ও ঘোষণা দেয়ার সক্ষমতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় তবেই সে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস নিতে এগিয়ে আসবে। যে নিজেকে এর ব্যাপারে নিরাপদ মনে করে না তার জন্য এটি গ্রহণ করা বৈধ নয়। যদি সে এটি গ্রহণ করে তাহলে সে আত্মসাৎকারী হিসেবে গণ্য হবে। কারণ সে অন্য ব্যক্তির সম্পদ এমনভাবে গ্রহণ করেছে যেভাবে গ্রহণ করা জায়েয নেই। আর যেহেতু এটি গ্রহণ করা অন্যের সম্পদ বিনষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত।
.
দুই: কোন পাওয়া জিনিস হস্তগত করার আগে অবশ্যই এর বিবরণ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে; এর থলে, এর বাঁধন, এর পরিমাণ, এর ধরন ও প্রকার ইত্যাদি। এর পাত্র দ্বারা উদ্দেশ্য যেটার ভেতরে জিনিসটি পাওয়া গিয়েছে; সেটা কোনো পলিথিন হতে পারে কিংবা কোন কাপড়খণ্ড হতে পারে। আর বাঁধন বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে: যা দিয়ে জিনিসটিকে বাঁধা হয়েছে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবরণ সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর ‘নির্দেশ’ আবশ্যক (ওয়াজিব) করাকে দাবি করে।
.
তিন: পুরো এক বছর জিনিসটি পাওয়ার ব্যাপারে ঘোষণা দিতে হবে। প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন ঘোষণা দিতে হবে। এরপর প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ঘোষণা দিতে হবে। ঘোষণার সময় উদাহরণস্বরূপ এভাবে বলবে: ‘এমন বস্তু কার হারানো গিয়েছে?’ কিংবা এ ধরণের অন্য কোন কথা। ঘোষণা হবে মানুষের সমাবেশ স্থলে, যেমন: বাজারে। কিংবা নামাযের সময়গুলোতে মসজিদের দরজায়। মসজিদের ভেতরে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু ঘোষণা করা নিষিদ্ধ; কারণ মসজিদ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কেউ যদি মসজিদের ভেতরে কোনো ব্যক্তিকে হারানো জিনিসের ঘোষণা করতে শুনে যেন সে বলে দেয়: ‘আল্লাহ তোমার জিনিসটি তোমাকে ফিরিয়ে না দিন’।”
.
চার: যদি দাবীদার এসে এর সঠিক বিবরণ দিতে পারে তবে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ বা কসমের ছাড়াই তাকে সেটা ফেরত দিতে হবে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি নির্দেশ দিয়েছে। আর যেহেতু বিবরণ বলতে পারা সাক্ষ্য-প্রমাণ ও কসমের স্থলাভিষিক্ত। বরং তার বিবরণ প্রদান করাটা সাক্ষ্য-প্রমাণ ও কসমের চেয়ে বেশি স্পষ্ট ও সত্য হতে পারে। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস থেকে যা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে সেটাও ফেরত দিতে হবে; বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জিনিস সংযুক্ত হোক কিংবা আলাদা হোক। যদি দাবীদার ব্যক্তি বিবরণ দিতে না পারে তাহলে তাকে জিনিসটি দেওয়া হবে না। কারণ এই জিনিস তার হাতে একটি আমানত। সেজন্য যে ব্যক্তি এই জিনিসের মালিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি তাকে দেওয়া জায়েয হবে না।
.
পাঁচ: যদি পূর্ণ এক বছর ঘোষণা করার পরেও মালিক না আসে তখন জিনিসটির উপর কুড়িয়ে নেওয়া ব্যক্তির মালিকানা সাব্যস্ত হবে। তবে সে ব্যবহার করার আগে এর বিবরণ সংরক্ষণ করে রাখতে হবে; যাতে করে পরে যে কোনো সময় মালিক আসলে জিনিসটি থাকলে তাকে ফেরত দিতে পারে কিংবা জিনিসটি না থাকলে এর বদলে অন্য কিছু তাকে ফেরত দিতে পারে। কারণ জিনিসটির মালিক ফেরত আসার মাধ্যমে কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তির মালিকানা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
.
দ্রষ্টব্য: হারানো বস্তু সম্পর্কে ইসলামের দিক-নির্দেশনা থেকে উপলব্ধি করা যায় ইসলাম সম্পদের প্রতি ও সম্পদ সংরক্ষণের প্রতি কতবেশি যত্নশীল, একজন মুসলিমের সম্পদের পবিত্রতা ও তার সম্পদ রক্ষায় কতবেশি যত্নবান। মোটকথা, এর থেকে আমরা উপলব্ধি করি ইসলাম কল্যাণের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে।আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের সকলকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং আমাদেরকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন; শাইখ সালিহ ইবন ফাওযান আল-ফাওযান রচিত ‘আল-মুলাখ্‌খাস আল-ফিকহী’; পৃষ্ঠা: ১৫০; গৃহীত: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫০৪৯)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:দুইটি বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে: একটি হলো একটি ছোট ব্যাগে থাকা কিছু টাকা এবং অন্যটি হলো একটি বস্তায় থাকা কিছু কাপড়, যার উপর একটি নারীর নাম লেখা ছিল। প্রথমটি পাওয়া গেছে ‘আল-যুলফি’ শহরে, এবং দ্বিতীয়টি ‘মাদীনা’র পথে। উক্ত বিষয়ে দয়া করে জানাবেন।
উত্তরে তারা বলেছেন:روى البخاري ومسلم : (أن رسول الله صلى الله عليه وسلم سئل عن مثل هذه اللقطة، فقال صلى الله عليه وسلم- للسائل: اعرف عفاصها ووكاءها ثم عرفها سنة، فإن جاء صاحبها وإلا فشأنك بها) فعليك أن تحتفظ بهما وتعرف أوصافهما معرفة تامة، وأن تعرف بكل واحدة منهما سنة كاملة في مجامع الناس، مثل ما بعد صلاة الجمعة ونحوه في الزلفي والرياض والمدينة والقصيم ونحو ذلك، وإن أخبرت عنهما عن طريق الإذاعة والتلفاز فهو أكمل. فإن جاء صاحب أي واحدة منهما وعرفها فأدها إليه، وإن عرفت بهما واجتهدت ومضى حول لم تعرف فيه فهي لك، وإذا جاء صاحبها بعد الحول وعرفها فأدها إليه، أو ثمنها بالنسبة للقماش، وإن شئت أن تتصدق بهما لأصحابهما، فإن جاء أحد منهم وعرفها أخبرته بالواقع، فإن قبل فذاك، وإن لم يقبل صرفتها له، ولك من الله الأجر على عملك الطيب- فذلك حسن. وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم “ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহ.) বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এই জাতীয় কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু (লুকাতা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তুমি এর পাত্রের মুখ ও বাঁধন (চেনার উপায়) ভালোভাবে চিনে রাখো। এরপর এক বছর পর্যন্ত ঘোষণা দাও। যদি এর মালিক আসে (তবে দিয়ে দাও), অন্যথায় তুমি তা ব্যবহার করতে পারো।’
সুতরাং আপনার কর্তব্য হলো—জিনিস দুটির বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নগুলো ভালোভাবে সংরক্ষণ করা এবং এক বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত জনসমাগমস্থলে (যেমন: জুমার নামাজের পর বা বড় মসজিদের সামনে) ঘোষণা দেওয়া। যদি রেডিও বা টেলিভিশনের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়, তবে তা আরও নিখুঁত হবে। যদি এর মধ্যে মালিক এসে সঠিক বর্ণনা দিয়ে তা চিনে নেয়, তবে তাকে তা দিয়ে দিন। আর যদি এক বছর যথাযথ চেষ্টার পরও কেউ না আসে, তবে তা আপনার জন্য (ব্যবহার করা) বৈধ। তবে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যদি মালিক আসে এবং সঠিক বর্ণনা দেয়, তবে তাকে মূল জিনিসটি অথবা (কাপড় জাতীয় জিনিসের ক্ষেত্রে) তার সমমূল্য পরিশোধ করতে হবে। আপনি চাইলে মালিকের পক্ষ থেকে তা সদকাও করে দিতে পারেন। পরবর্তীতে মালিক আসলে তাকে বিষয়টি জানাবেন; সে যদি সদকাতে রাজি হয় তবে ভালো, আর রাজি না হলে তাকে তার জিনিসের মূল্য পরিশোধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার এই উত্তম কাজের জন্য আল্লাহর নিকট সওয়াব পাবেন।” (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪৪৪)
.
স্থায়ী কমিটির আলেমগনকে অপর ফাতাওয়ায় আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:এক ব্যক্তি ২০ বছর আগে ৩৩০ রিয়াল পেয়েছিল, কিন্তু সেটি ঘোষণা দেয়নি বরং তা দিয়ে বিয়ের জন্য একটি উট কিনেছিল।যখন আত্মীয়রা জিজ্ঞাসা করে, সে বলে দেয় এটি তার বেতনের টাকা। পরে সে এক আলেমকে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন, এটি সদকা করে দাও। এখন সে জানাতে চায়,তার কী করা উচিত?
উত্তরে তারা বলেছেন:يلزمه أن يعرف عن هذا المبلغ في الجهة التي وجده فيها، فإن وجد من يدعيه وعرف أوصافه التي كان عليها يوم وجده من التقطه أعطيه، وإلا تصدق به على الفقراء عن صاحبه الذي سقط منه، فإن تبين له صاحبه في المستقبل أخبره الملتقط بأنه تصدق به عنه، فإن رضي بذلك برئت ذمة الملتقط، وإلا وجب عليه أن يدفعه له. ثم عليه أن يستغفر الله ويتوب إليه من تفريطه في تعريفه تلك المدة الطويلة، ومن كذبه على من سأله عن حصوله على ثمن الناقة التي اشتراها لزواجه، وقد يكون من بينهم من ضاع منه هذا المبلغ. وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم “”তার জন্য আবশ্যক হলো—সে যে স্থানে অর্থটি পেয়েছিল, সেখানে সেই অর্থের ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া (প্রচার করা)। যদি এমন কাউকে পাওয়া যায় যে সেটি দাবি করে এবং অর্থটি পাওয়ার দিন সেটি যে অবস্থায় ছিল তার সঠিক বিবরণ দিতে পারে, তবে তাকে তা দিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় (মালিককে পাওয়া না গেলে), যার কাছ থেকে এটি হারিয়েছিল তার পক্ষ থেকে এই অর্থ দরিদ্রদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে।পরবর্তীতে যদি কখনো মালিকের সন্ধান পাওয়া যায়, তবে কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তি তাকে জানাবে যে তার পক্ষ থেকে এটি সদকা করে দেওয়া হয়েছে। যদি মালিক এতে সন্তুষ্ট হয়, তবে ওই ব্যক্তি (কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তি) দায়মুক্ত হবে। আর যদি মালিক সন্তুষ্ট না হয়, তবে তাকে ওই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে দেওয়া কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব (আবশ্যক)।এর পাশাপাশি, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রচার না করে অবহেলা করার কারণে এবং যে অর্থ দিয়ে সে বিয়ের উট কিনেছিল তার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা ব্যক্তিদের কাছে মিথ্যা বলার কারণে—তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) ও তওবা করতে হবে। কারণ, যাদের কাছে সে মিথ্যা বলেছিল, তাদের মধ্যেই হয়তো প্রকৃত মালিক থেকে থাকতে পারেন।আর আল্লাহর তাওফীকেই সকল কাজ সুসম্পন্ন হয়। আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”ফতোয়া প্রদানকারীগণ:শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বায,শায়খ আব্দুর রাজ্জাক আফিফিশায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে গুদাইয়ান।(ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪৪২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: প্রশ্ন: অনেক সময় একজন মানুষ পথে কিছু স্বল্প পরিমাণ অর্থ পেয়ে যায়। সে তা নিয়ে নেয় এই বলে: আমি তো এটি শহরের রাস্তায় পেয়েছি, কিভাবে মালিককে খুঁজে বের করব? এই কাজ কি গুনাহ?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:إذا كان شيئًا يسيرًا لا تتبعه همة أوساط الناس، ولا يُلتفت إليه؛ فلا بأس، مثل عصا لا قيمة لها، حبل لا قيمة له، درهمين إلى عشرة دراهم، أشباه ذلك، هذه أمرها سهل، ولا حرج في أخذها.أما الشيء الذي له أهمية، وله قيمة: هذا عليه أن يعرفه لمعارفه، في مجامع الناس، من له اللقطة الفلانية؟ من له الدراهم؟ من له البشت؟ من له النعل المعروف؛ كذا يبين، يبين حتى إذا جاء من يعرف هذه اللقطة؛ سلمها له، إذا عرف صفاتها الخاصة الدقيقة؛ أعطاه إياها، أو أقام الدليل عليها، وإلا فليدعها، يأخذها غيره.أما أن يأخذ، ولا يعرف: لا، لابد أن يعرف اللقطة -إذا كانت ثمينة لها أهمية- في مجامع الناس كل شهر مرتين ثلاث، حتى يكمل السنة. فإذا تمت السنة؛ فهي له كسائر ماله. ومتى جاء صاحبها بعد ذلك أعطاه إياها، ولو بعد مدة طويلة، أو يوكل من يعرفها، إنسان … ينادي عليها كل شهر مرتين ثلاث في مجامع الناس؛ لعلها تظهر حتى يكمل السنة، نعم.”যদি কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুটি এমন সামান্য হয় যা সাধারণ মানুষ খুব একটা গুরুত্ব দেয় না বা যার পেছনে ছোটে না, তবে তা (মালিকের ঘোষণা ছাড়াই) গ্রহণে কোনো সমস্যা নেই। যেমন: গুরুত্বহীন কোনো লাঠি, মূল্যহীন কোনো রশি, কিংবা ২ থেকে ১০ দিরহাম বা এই জাতীয় সামান্য কিছু। এগুলোর বিধান সহজ এবং গ্রহণে কোনো দোষ নেই। কিন্তু যদি বস্তুটি এমন হয় যার গুরুত্ব ও মূল্য রয়েছে, তবে তাকে অবশ্যই লোকসমাগমস্থলে সেটির ঘোষণা দিতে হবে। সে বলবে: ‘অমুক হারানো বস্তুটি কার?’, ‘এই দিরহামগুলো কার?’, ‘এই চাদর বা পরিচিত জুতাটি কার?’—এভাবে সে বর্ণনা দেবে। সে ঘোষণা দিতে থাকবে যেন এমন কেউ আসে যে বস্তুটিকে চিনতে পারে। যদি কেউ বস্তুটির বিশেষ ও নিখুঁত বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করতে পারে কিংবা এর সপক্ষে প্রমাণ পেশ করতে পারে, তবে সে তা তাকে দিয়ে দেবে। অন্যথায় (যদি ঘোষণা দেওয়ার ইচ্ছে না থাকে), সে যেন তা রেখে দেয় যাতে অন্য কেউ (ঘোষণা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে) সেটি তুলে নেয়।তবে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো বস্তু কুড়িয়ে নিয়ে সেটির ঘোষণা না দেওয়া বৈধ নয়। বরং তাকে অবশ্যই লোকসমাগমস্থলে প্রতি মাসে দুই-তিনবার করে পুরো এক বছর ঘোষণা দিতে হবে। যখন এক বছর পূর্ণ হয়ে যাবে, তখন সেটি তার অন্যান্য মালের মতোই তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। এরপর দীর্ঘ সময় পরেও যদি কখনো এর প্রকৃত মালিক আসে, তবে তাকে সেটি দিয়ে দিতে হবে। অথবা সে এমন কাউকে প্রতিনিধি (উকিল) নিয়োগ করতে পারে যে এটি ঘোষণা করবে। সেই ব্যক্তি প্রতি মাসে দুই-তিনবার করে লোকসমাগমস্থলে ঘোষণা দেবে—হয়তো মালিকের সন্ধান পাওয়া যাবে—এভাবে এক বছর পূর্ণ করতে হবে। হ্যাঁ।”(উৎস: মাজমূ‘ ফাতাওয়ায় ইবন বায; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৪৪১) এছাড়াও এ জাতীয় আরও বহু ফাতওয়া রয়েছে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

মসজিদে কিংবা মসজিদের বাহিরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করার শারয়ি হুকুম

 প্রশ্ন: মসজিদে কিংবা মসজিদের বাহিরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করার শারয়ি হুকুম কী? উভয় ক্ষেত্রে বিধান কি একই, নাকি ভিন্নতা রয়েছে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মসজিদে কিংবা মসজিদের বাহিরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করার শারয়ি হুকুম কী? আমরা এই বিষয়টি দুটি পয়েন্টে জানার চেষ্টা করব। যার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে: (১). মসজিদে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ এবং (২). সালাতের বাইরে ও মসজিদের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপের বিধান।
.
(১). মসজিদে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করার বিধান:
.
মসজিদ মহান আল্লাহর ঘর, আর এর পবিত্রতা বজায় রাখা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। মসজিদে অবস্থানকালীন কিবলার দিকে থুতু ফেলা কেবল শিষ্টাচারবিরোধী নয়, বরং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি গর্হিত ও নিষিদ্ধ কাজ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহীহ হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আমাদের সালাফে সালেহীনদের মতে, কিবলার দিকে থুতু নিক্ষেপ করা মসজিদের পবিত্রতা ও কিবলার মর্যাদাহানির শামিল। তাই ইবাদতের এই পবিত্র স্থানে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আদব বজায় রাখা অপরিহার্য।মসজিদে অবস্থানকালে কিবলার দিকে থুতু ফেলা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘সহীহ বুখারী’ গ্রন্থে (হাদীস নং ৪১৬) প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ إِلَى الصَّلاَةِ، فَلاَ يَبْصُقْ أَمَامَهُ، فَإِنَّمَا يُنَاجِي اللَّهَ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ، وَلاَ عَنْ يَمِينِهِ، فَإِنَّ عَنْ يَمِينِهِ مَلَكًا، وَلْيَبْصُقْ عَنْ يَسَارِهِ، أَوْ تَحْتَ قَدَمِهِ، فَيَدْفِنُهَا “তোমাদের কেউ যখন সালাতে (নামাজে) দাঁড়ায়, সে যেন তার সামনের দিকে থুতু না ফেলে। কারণ, যতক্ষণ সে তার (মুসল্লায়) সালাতের জায়গায় থাকে, ততক্ষণ সে মূলত আল্লাহর সাথে গোপনে কথা বলে (মুনাজাত করে)। আর সে যেন তার ডান দিকেও থুতু না ফেলে, কারণ তার ডান দিকে ফেরেশতা থাকেন। বরং সে যেন তার বাম দিকে অথবা পায়ের নিচে থুতু ফেলে এবং পরে তা মিটিয়ে (মাটি দিয়ে ঢেকে) দেয়।”(সহিহ বুখারী, হা/৪১৬)
.
একইভাবে, মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া বা বিরক্তি সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টিও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আলেমগণ এই বিধান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নামাজের বাইরে থাকা ব্যক্তিও (অর্থাৎ যে নামাজ পড়ছে না) মসজিদের ভেতরে কিবলার দিকে থুতু ফেলতে পারবে না; ঠিক যেমন একজন মুসল্লির জন্য তা নিষিদ্ধ।নবী (ﷺ) এর বাণী:مَنْ ‌تَفَلَ ‌تُجَاهَ ‌القبلةِ جاءَ يومَ القيامة تَفَلُهُ بين عينيه”যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার সেই থুথুই তার দুই চোখের মাঝখানে পতিত অবস্থায় উপস্থিত হবে’ (আবু দাউদ হা/৩৮২৪; সিলসিলা হীহাহ হা/২২২)। তিনি (ﷺ) আরো বলেন,”ক্বিবলার দিকে যে কফ ফেলে তার চেহারায় ঐ কফ থাকা অবস্থায় সে ব্যক্তিকে ক্বিয়ামতের দিন উঠানো হবে (ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/১৩১৩;সিলসিলা সহীহাহ হা/২২৩)। তিনি আরো বলেন,মসজিদে থুথু নিক্ষেপ করা গুনাহ ও তা দাফন করা ছওয়াবের কাজ।(সহীহুত তারগীব হা/২৮৭)। এমনকি জনৈক ইমাম মসজিদে ক্বিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করলে পরবর্তীতে রাসূল (ﷺ) তাকে ইমামতি করতে নিষেধ করতে দেননি।(আবু দাউদ হা/৪৮১; মিশকাত হা/৭৪৭)।
.
রাসূল (ﷺ)-এর বানী: “যে ব্যক্তি ক্বিবলার দিকে থুথু ফেলে ক্বিয়ামতের দিন তার ঐ থুথু দু’চোখের মধ্যখানে পতিত অবস্থায় উপস্থিত হবে” এ হাদিসের ব্যাখ্যায়, আল্লামা সাহারানপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:من تَفَلَ تجاه القبلة» أي: جهة القبلة، «جاء» أي: يجيء، «يوم القيامة»، وإنما عبَّره بصيغة الماضي؛ لتحقق وقوعه، «تَفَلُهُ» أي: بصاقه، «بين عينيه»، واستدل بهذا على احترام جهة القبلة، والاحتراز عن البول والغائط والاستنجاء إليها مطلقًا في الصحراء كان أو في البنيان. “যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে অর্থাৎ কিবলার দিক বা অভিমুখে। সে (থুথু) এসে পড়বে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আসবে। এখানে অতীতকাল ব্যবহার করা হয়েছে ঘটনার নিশ্চিত সংঘটন বোঝানোর জন্য। তার থুথু অর্থাৎ তার নিক্ষিপ্ত থুথু। তার দুই চোখের মাঝখানে এ দ্বারা বোঝানো হয়েছে কিবলার দিকের সম্মান রক্ষা করা আবশ্যক।এই হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খোলা জায়গা হোক বা ঘরের ভিতর সর্বাবস্থায় কিবলার দিকে পেশাব-পায়খানা করা ও সেদিকে ইস্তিঞ্জা করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।‌
.
ইমাম বাহুতি (রাহিমাহুল্লাহ) কাশাফুল ক্বিনা গন্থে বলেন:
وإن بدره)، أي المصلي: (مخاط أو بزاق) – ويقال: بالسين والصاد أيضا – (ونحوه) كنخامة، (في المسجد: بصق في ثوبه، و) حك بعضه ببعض، إذهابا لصورته. لحديث أنس أن النبي – صلى الله عليه وسلم – قال إذا قام أحدكم في صلاته: فإنه يناجي ربه؛ فلا يبزُقنَّ قبل قبلته لكن عن يساره أو تحت قدمه، ثم أخذ طرف ردائه فبزق فيه، ثم رد بعضه على بعض رواه البخاري، ولمسلم معناه من حديث أبي هريرة؛ لما فيه من صيانة المسجد عن البصاق فيه.ويبصق ونحوه (في غيره [أي: في غير المسجد] عن يساره، وتحت قدمه)، وفي أكثر النسخ: عن يساره تحت قدمه، ولعل فيه سقط الواو، أو: ليوافق الخبر. وكلام الأصحاب (اليسرى) لأن بعض الأحاديث مقيد بذلك، والمطلق يحمل على المقيد، وإكراما للقدم اليمنى (للحديث الصحيح) وتقدم.(و) بصقه (في ثوبه أولى، إن كان في صلاة) …(ويكره) بصقه ونحوه، (أمامَه، وعن يمينه)؛ لخبر أبي هريرة وليبصق عن يساره، أو تحت قدمه؛ فيدفنها رواه البخاري.ولأبي داود بإسناد جيد عن حذيفة مرفوعا: من تفل تجاه القبلة جاء يوم القيامة وتفله بين عينيه”
“আর যদি তার (অর্থাৎ সালাতরত ব্যক্তির) নাকের শ্লেষ্মা বা থুথু (এবং এই জাতীয় কিছু যেমন কফ) নির্গত হওয়ার উপক্রম হয় এবং সে মসজিদে থাকে তাহলে সে যেন তার কাপড়ে থুথু ফেলে এবং কাপড়ের এক অংশ অন্য অংশের সাথে ঘষে নেয়, যাতে সেটির দৃশ্যমান চিহ্ন দূর হয়ে যায়। আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিসের কারণে, যেখানে নবী (ﷺ) বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন নামাজে দাঁড়ায়, সে মূলত তার রবের সাথে কথোপকথন করে; সুতরাং সে যেন তার কিবলার দিকে থুথু না ফেলে। বরং তার বাম দিকে অথবা পায়ের নিচে (ফেলে)।’ এরপর তিনি (ﷺ) তাঁর চাদরের এক প্রান্ত ধরলেন এবং তাতে থুথু ফেললেন, তারপর চাদরের এক অংশ অন্য অংশের ওপর ভাঁজ করে দিলেন।(সহীহ বুখারি)। ইমাম মুসলিমও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে অনুরূপ অর্থ বর্ণনা করেছেন। এটি করা হয় মসজিদকে থুথু থেকে পবিত্র রাখার জন্য। ​আর মসজিদের বাইরে (অন্য কোথাও) থাকলে সে তার বাম দিকে বা পায়ের নিচে ফেলবে। অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে আছে: ‘তার বাম দিকে পায়ের নিচে’ (عن يساره تحت قدمه); সম্ভবত এখানে ‘ওয়াও’ (ও) বর্ণটি বাদ পড়ে গিয়েছে অথবা এটি বর্ণনার সাথে মিল রাখার জন্য এমন হয়েছে। ফকিহগণের বক্তব্য হলো—’বাম পা’; কারণ কিছু হাদিসে এটি সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আর সাধারণ বিধানকে (যদি সীমাবদ্ধ না করা হয়) সীমাবদ্ধ বিধানের ওপর প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া এটি ডান পায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যও (সহিহ হাদিসের কারণে)। আর নামাজের মধ্যে হলে কাপড়ে থুথু ফেলা অধিক উত্তম। সামনে এবং ডান দিকে থুথু ফেলা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) এর হাদিসের কারণে—’সে যেন বাম দিকে অথবা বাম পায়ের নিচে ফেলে এবং তা মাটি চাপা দেয়’ যেমনটি বুখারী বর্ণনা করেছেন। আবু দাউদ (রাহিমাহুল্লাহ)‌ হুযাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে হাসান (উত্তম) সনদে বর্ণিত হয়েছে—”যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার থুথু তার দুই চোখের মাঝখানে (ললাটে) থাকবে।”(বাহুতি কাশাফুল ক্বিনা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
শাইখ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:قوله: «‌من ‌تَفَلَ ‌تجاه ‌القبلة جاء يوم القيامة تَفَلُه بين عينيه» هذا يدل على تحريم التَفَلَ إلى القبلة أو باتجاه القبلة، وأن على الإنسان أن يتْفَلَ إلى غير تلك الجهة، وهو عام في الصلاة وفي غير الصلاة، وفي المسجد أو في غيره. .”এই হাদিস প্রমাণ করে যে, কিবলার দিকে বা কিবলার অভিমুখে থুথু নিক্ষেপ করা হারাম। মানুষের উচিত অন্য দিকে থুথু নিক্ষেপ করা। এই বিধানটি সাধারণ‌ সালাতে হোক বা সালাতের বাইরে, মসজিদে হোক বা মসজিদের বাইরে সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
.
ইবনু রাসলান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:جاء» في «يوم القيامة» و«تَفَلُه» ظاهر «بين عينيه»؛ لأجل الموقف يذمه من رآه على فعله. .”কিয়ামতের দিন আসবে’ এবং ‘তার থুথু তার দুই চোখের মাঝখানে থাকবে’ এটি কিয়ামতের ময়দানে প্রকাশ্য লাঞ্ছনার জন্য যাতে মানুষ তাকে তার কৃতকর্মের কারণে ঘৃণা ও নিন্দা করে।”
.
ইমাম ইরাকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:يدل على تحريم البصاق في القبلة: ما رواه أبو داود بإسناد جيد من حديث السائب بن خلاد «أن رجلًا أمَّ قومًا فبصق في القبلة، ورسول الله -صلى الله عليه وسلم- ينظر إليه، فقال حين فرغ: لا يصلي لكم» الحديث، وفيه: أنه قال له: «إنك آذيتَ الله ورسوله». .”কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ হারাম হওয়ার প্রমাণ হলো আবু দাউদ (রাহিমাহুল্লাহ) সনদসহ হাসান সূত্রে যে হাদিস বর্ণনা করেছেন, সাহাবি সায়িব ইবনু খাল্লাদ (রাঃ) থেকে: এক ব্যক্তি একদল লোকের ইমামতি করছিল। সে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করল, আর রাসূলুল্লাহ নবী ﷺ) তা দেখছিলেন। সালাত শেষ হলে তিনি বললেন: সে যেন আর তোমাদের ইমামতি না করে।হাদিসের এক বর্ণনায় আছে, তিনি তাকে বলেছিলেন: তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছ।”
.
ইমাম ইবনুল আরাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
إنَّ حُرمة الصلاة تتعلق بمحلين: مسجد وقبلة، ثم ثبت أن المسجد يُحترم؛ لأنه بقعة مخصوصة بالصلاة، فكذلك ينبغي أن تُحترم القبلة؛ لأنها جهة مخصوصة بالصلاة، وهذا هو مذهب مالك -رحمه الله-؛ لأنه عقَّب الباب بقوله: باب النهي عن البُصاق في القبلة، فأفهمك أنها إذا احتُرِمَتْ عن البصاق إلى جهتها، فأوْلى وأَحْرى أن تُحترم عن البول والغائط، وهما نجسان.
“সালাতের পবিত্রতা দুইটি স্থানের সাথে সম্পর্কিত:
১) মসজিদ
২) কিবলা।
অতঃপর যেহেতু মসজিদকে সম্মান করা অপরিহার্য কারণ এটি সালাতের জন্য নির্ধারিত স্থান ঠিক তেমনি কিবলাকেও সম্মান করা জরুরি কারণ এটি সালাতের জন্য নির্ধারিত দিক। এটাই ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাব। কারণ তিনি অধ্যায়ের শিরোনাম রেখেছেন: ‘কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ নিষেধ’ এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন যে, যদি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করাও নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তার চেয়েও অধিকভাবে কিবলার দিকে পেশাব ও পায়খানা করা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত কারণ এগুলো নাপাক।
.
ফখরুল ইসলাম শাশী বলেনقال لنا أبو إسحاق الشيرازي: لو كانت الحرمة للقبلة لما جاز الفصد إليها، ولا الحجامة؛ لأنها نجاسة تستقبل بها، قلنا: هذه الأمور الضرورية كالفصد والحجامة والقيء والرعاف التي تأتي العبد بغير اختياره، لا يتعلق بها هذا التكليف كما لم يتعلق بالبنيان. .”আমাদেরকে আবু ইসহাক শিরাজী বলেছেন: যদি কিবলার নিজস্ব পবিত্রতার কারণেই নিষেধাজ্ঞা হতো, তাহলে কিবলার দিকে শিরা কাটা করা কিংবা হিজামা করা বৈধ হতো না কারণ এসবের মাধ্যমেও নাপাক বের হয়। আমরা বললাম: এগুলো জরুরি বিষয় যেমন ফাসদ, হিজামা, বমি ও নাক থেকে রক্তপাত যেগুলো অনেক সময় মানুষের ইচ্ছার বাইরে ঘটে। তাই এসব ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয় যেমনটি ঘরের নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়।
.
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وإنما يُكره البصاق إلى القبلة في الصلاة أو المسجد، فأمّا مَن بصق إلى القبلة في غير مسجد فلا يكره له ذلك. “সালাতের সময় বা মসজিদের ভেতরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা মাকরূহ। আর যে ব্যক্তি মসজিদের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে তার জন্য তা মাকরূহ নয়।
.
ইমাম সানআনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقد جزم ‌النووي ‌بالمنع ‌في ‌كُل ‌حالة ‌داخل الصلاة، وخارجها، سواء كان في المسجد أو غيره، وقد أفاده حديث (أنس) في حقِّ المصلي، إلا أنَّ غيرهُ من الأحاديث قد أَفادت تحريم البُصاق إلى القبلة مطلقًا في المسجد وفي غيره، وعلى المُصلي وغيره؛ ففي صحيح ابن خزيمة وابن حبان من حديث (حذيفة) مرفوعًا: «مَن تَفل تجاه القِبلة جاء يوم القيامة وتَفلته بين عينيه» ولابن خزيمة من حديث (ابن عمر) مرفوعًا: «يُبعث صاحب النُّخامة في القِبلة يوم القيامة وهي في وجهه».”ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) সুস্পষ্টভাবে বলেছেন সালাতের ভেতরে ও বাইরে, সব অবস্থাতেই কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ চাই তা মসজিদে হোক বা মসজিদের বাইরে। আনাস (রাঃ) এর হাদিস সালাতরত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রমাণ করে।‌ আর অন্যান্য হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় হারাম মসজিদে হোক বা বাইরে, সালাতরত হোক বা না হোক। এর প্রমাণ হিসেবে সহিহ ইবনু খুযাইমা ও ইবনু হিব্বানে হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত মারফূ হাদিসে আছে: যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার থুথু তার দুই চোখের মাঝখানে থাকবে। আর ইবনু খুযাইমা (রহ.) ইবনে উমার (রাঃ) থেকে মারফূ বর্ণনায় এনেছেন: যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তাকে উঠানো হবে, আর সেই থুথু তার মুখে থাকবে।”(সানআনি; সুবুলুস সালাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩২)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:وفي الحديث دلالة على تحريم البُصاق إلى القبلة مطلقًا، سواء ذلك في المسجد أو في غيره، وعلى المصلي وغيره، كما قال الصنعاني في (سبل السلام) (1/230)، قال: “وقد جزم النووي بالمنع في كل حالة داخل الصلاة وخارجها وفي المسجد أو غيره”.قلت: وهو الصواب، والأحاديث الواردة في النهي عن البصق في الصلاة تجاه القبلة كثيرة مشهورة في الصحيحين وغيرها، وإنما آثرت هذا دون غيره، لعزته, وقلة من أحاط علمه به. ولأن فيه أدبا رفيعا مع الكعبة المشرفة، طالما غفل عنه كثير من الخاصة، فضلا عن العامة، فكم رأيت في أئمة المساجد من يبصق إلى القبلة من نافذة المسجد! “এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় হারাম চাই তা মসজিদের ভেতরে হোক বা বাইরে, সালাতরত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হোক বা সালাতে না থাকা ব্যক্তির পক্ষ থেকে হোক। যেমনটি ইমাম সানআনি (রহ.) তাঁর সুবুলুস সালাম-এ বলেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন: ইমাম নববী (রহ.) নিশ্চিতভাবে বলেছেন সালাতের ভেতরে ও বাইরে, মসজিদে হোক বা মসজিদের বাইরে সব অবস্থাতেই কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ। আমি (আলবানী) বলছি: আমার মতে এটাই সঠিক মত। সালাতের সময় কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ নিষিদ্ধ এ বিষয়ে সহিহ বুখারি ও মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে বহু প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। আমি এই হাদিসটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছি অন্যগুলোর পরিবর্তে কারণ এটি তুলনামূলকভাবে বিরল এবং খুব কম মানুষই এর ব্যাপারে অবগত। এ ছাড়া এতে কাবা ঘরের প্রতি এক উচ্চমানের আদবের শিক্ষা রয়েছে, যা বহু বিশেষজ্ঞ আলেম তো বটেই সাধারণ মানুষের কথা তো বাদই দিলাম অনেকেই অবহেলা করে থাকেন। আমি নিজ চোখে বহু মসজিদের ইমামকেও দেখেছি যারা মসজিদের জানালা দিয়ে কিবলার দিকেই থুথু নিক্ষেপ করেন।”
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] তার ফাতহুল বারী গন্থে বলেন:قوله: (ما دام في مصلاه) يقتضي تخصيص المنع بما إذا كان في الصلاة، لكن التعليل المتقدم بأذى المسلم يقتضي المنع في جدار المسجد مطلقا، ولو لم يكن في صلاة، فيجمع بأن يقال : كونه في الصلاة أشد إثما مطلقا، وكونه في جدار القبلة أشد إثما من كونه في غيرها من جدر المسجد، فهي مراتب متفاوتة مع الاشتراك في المنع”হাদিসে নবী (ﷺ) এর বাণী “যতক্ষণ সে তার সালাতের স্থানে থাকে” এটি আপাতদৃষ্টিতে বোঝায় যে, নিষেধাজ্ঞাটি শুধু সালাতরত  অবস্থার সাথেই সম্পর্কিত। কিন্তু এর পূর্বে যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া তা প্রমাণ করে যে, মসজিদের দেয়ালে থুথু নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ, চাই সে সালাতে থাকুক বা না থাকুক। এ দু’টি দিকের মধ্যে সমন্বয় এভাবে করা যায় সালাতরত অবস্থায় এটি করা হলে গুনাহ আরো বেশি, আর মসজিদের অন্যান্য দেয়ালের তুলনায় কিবলার দেয়ালে এটি করা আরো গুরুতর অপরাধ। অতএব, নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে সবার মধ্যে মিল রয়েছে কিন্তু গুনাহের মাত্রা অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন এটি গুনাহের স্তরভেদমাত্র, নিষেধাজ্ঞার ভিন্নতা নয়।”(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৫১২)
.
(২). সালাতের বাইরে ও মসজিদের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপের বিধান:
.
সালাতের বাইরে এবং মসজিদের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ বিষয়ে ফিকহে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেম এটি অনুমোদন করেছেন এবং মনে করেছেন যে, নিষেধ শুধুমাত্র সালাতের সময় প্রযোজ্য, তাই সালাতের বাইরে থুথু নিক্ষেপ করা যেতে পারে। অন্যদিকে, কিছু আলেম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং সর্বাবস্থায় কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ হারাম বলে বলেছেন। নিষেধের সর্বজনীন প্রমাণ হিসেবে বর্ণিত আছে আবু দাউদ, ইবনু খুযাইমা এবং ইবনু হিব্বান এর হাদিসে হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত মারফূ হাদিস:مَنْ تَفَلَ تُجَاهَ الْقِبْلَةِ : جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تَفْلُهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ ” যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার থুথু তার দুই চোখের মাঝখানে এসে পড়বে।‌”(ইবনু খুযাইমা হা/ ১৬৬৩;এবং ইবনু হিব্বান হা/১৬৩৯) এই হাদিসকে শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বলেছেন। সামান্য সতর্কতা হিসেবে অনেকে সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে থেকে ডান দিকে থুথু না নিক্ষেপ করার পরামর্শ এসেছে।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] ফাতহুল বারী –এ বলেন: “وقد جزم النووي بالمنع في كل حالة، داخل الصلاة وخارجها، سواء كان في المسجد أم غيره.وقد نقل عن مالك أنه قال: لا بأس به يعني خارج الصلاة.ويشهد للمنع ما رواه عبد الرزاق وغيره عن ابن مسعود أنه كره أن يبصق عن يمينه وليس في صلاة.وعن معاذ بن جبل قال: ما بصقت عن يميني منذ أسلمت. وعن عمر بن عبد العزيز أنه نهى ابنه عنه مطلقا. وكأن الذي خصه بحالة الصلاة أخذه من علة النهي المذكورة في رواية همام عن أبي هريرة، حيث قال: (فإن عن يمينه ملكا) .هذا إذا قلنا: إن المراد بالملك غير الكاتب والحافظ ؛ فيظهر حينئذ اختصاصه بحالة الصلاة “
“ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) সর্ব অবস্থাতেই (ডান দিকে থুথু ফেলা) নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন চাই তা সালাতের ভেতরে হোক বা বাইরে, মসজিদে হোক বা অন্য কোথাও।‌ পক্ষান্তরে ইমাম মালিকের মতানুসারে সালাতের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা (বৈধ) অনুমোদনযোগ্য।তবে (সকল অবস্থায় কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ) নিষেধের পক্ষে আরও প্রমাণ আব্দুর রাজাক ও অন্যদের বর্ণনা অনুযায়ী,তারা ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন—তিনি সালাতের বাইরে থাকা অবস্থায়ও ডান দিকে থুথু ফেলা অপছন্দ করতেন। মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) বলেছেন:‌ আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনোই ডান দিকে থুথু নিক্ষেপ করিনি। উমার ইবনু আব্দুল আজিজ থেকেও বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর ছেলেকে সবক্ষেত্রে (সালাতে বা বাইরে) ডান দিকে থুথু নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছিলেন। আর যারা এই নিষেধাজ্ঞাটিকে কেবল সালাতের অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট করেছেন, তারা সম্ভবত এই নিষেধাজ্ঞার কারণটি গ্রহণ করেছেন, হুমাম-এর সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিস থেকে, যেখানে বলা হয়েছে:”(কেননা সে যখন সালাতে দাঁড়ায়) তখন তার ডান দিকে ফেরেশতা থাকেন”। এটি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন আমরা বলব যে: (এই হাদিসে) ‘ফেরেশতা’ বলতে আমল লেখক (কিরামান কাতিবিন) বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা ব্যতীত অন্য কোনো ফেরেশতাকে বোঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞাটি সালাতের অবস্থার সাথেই সীমাবদ্ধ হওয়া স্পষ্ট হয়ে যায়।”(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৫১০)
.
সর্বাধিক সমর্থিত মত, আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন, হলো কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা প্রধানত নামাজের ভেতরে নিষিদ্ধ বা হারাম। তবে সালাতের বাইরেও কিবলার সম্মান রক্ষার্থে এটি এড়িয়েচলাই অধিকতর উত্তম ও নিরাপদ; কারণ একদল আলেমের মতে এটি সব অবস্থাতেই নিষিদ্ধ। এছাড়া সালাতের বাইরেও ডান দিকে থুথু না ফেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ডান দিকে থুথু ফেলা অনুচিত এবং একজন মানুষের পক্ষে কিবলা চেনার চেয়ে নিজের ডান দিক চেনা অনেক বেশি সহজ। কেননা কিবলা চিহ্নিত করা সব সময় সহজ নয়।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: ইবনু খুযাইমার বর্ণনা অনুযায়ী যে ব্যক্তি কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন তার থুথু তার দুই চোখের মাঝখানে এসে পড়বে। এটি কি সালাতের জন্য প্রযোজ্য?
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
هذا محتمل، وهذا مما يؤيد كونه يتفل عن يساره أحسن.أما في الصلاة : فيتعيّن ، مثل ما قال صلى الله عليه وسلم : (فلا يبصقن) ؛ نهي، والأصل منه التحريم، فلا يبصق أمامه في الصلاة أبدًا، لا في النفل، ولا في الفرض، لا في المسجد، ولا في غيره.أما في خارج الصلاة : فهذا محل نظر، الأمر فيه سهل، لكن إذا كان عن يساره حتى في خارج الصلاة ، يكون أكمل وأحوط”
“এটি সম্ভাব্য (হতে পারে); আর এটি সেই বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত যা তার (ব্যক্তির) বাম দিকে থুথু ফেলা উত্তম হওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করে। তবে সালাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও (স্পষ্ট) সুনির্ধারিত, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (সে যেন অবশ্যই (সামনে) থুথু নিক্ষেপ না করে); এটি একটি নিষেধাজ্ঞা, আর নিষেধাজ্ঞার মূল বিধান হলো কোনো কাজ নিষিদ্ধ বা হারাম হওয়া। অতএব, সালাতে থাকা অবস্থায় সে কখনোই নিজের সামনের দিকে থুতু ফেলবে না—তা নফল নামায হোক বা ফরয, আর মসজিদ হোক বা অন্য কোনো স্থান। তবে সালাতের বাইরে বিষয়টি পর্যালোচনার অবকাশ রাখে এবং এ ব্যাপারে নিয়ম কিছুটা শিথিল। কিন্তু সালাতের বাইরে থাকলেও যদি সম্ভব হয় বাম দিকে থুথু নিক্ষেপ করা, তবে এটি অধিকতর পূর্ণাঙ্গ এবং সতর্কতা অবলম্বনকারী (উত্তম)।”(ইমাম ইবনু বায; এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সমাপ্ত; ফাতওয়া নং-২৩৬০৪)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক, আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: সালাতের বাইরে কিবলার দিকে থুথু নিক্ষেপ করা কেমন?
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
لا إله إلا الله، يظهرُ أنَّهُ لا يَنْبَغِي تعمُّدُ هذا مِن غيرِ حاجة، يظهر، وإلَّا الذي وردَ: (إذا قامَ أحدُكُم في الصَّلاةِ فإنَّه يُنَاجِي ربَّهُ فلا يَبْصُقَنَّ قِبَلَهُ) ؛ فالأحاديثُ ظاهرُها أنَّ ذلكَ خاصٌّ بالصَّلاةِ، لكن القبلةَ لها يعني حُرمةٌ، ولهذا جاءَ النَّهيُ عَن استقبالِها واستدبارِها في قضاءِ الحاجةِ، فالأولى أنْ يبصقَ عَن يمينِه أو عَن يسارِه ، ولا يبصقَ إلى جهةِ القِبلةِ. الذي وردَ في النّصوصِ هو فِعْلُ ذلكَ في الصَّلاةِ ، لأنَّهُ عَلَّلَهُ بقولِهِ: (فإنَّ اللهَ قِبَلَ وجهِهِ) . وذِكْرُ القبلةِ؛ لأنَّ الرَّسولَ -عليه الصَّلاة والسَّلام- رأى نُخَامةً في قبلةِ المسجدِ، في قبلةِ المسجدِ، يظهر مِن ذلكَ أنَّ الذي فعلَها كانَ يصلّي، فبصقَ قِبَلَ وجهِهِ وهو يُصلّي، فكانَتْ في جدارِ المسجدِ القِبْلِي، في جدارِ المسجِد القِبْلِي
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ,(আল্লাহ ছাড়া হক কোনো উপাস্য নেই) এটি স্পষ্ট যে, প্রয়োজন ছাড়া উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই কাজটি করা সমীচীন নয়; এটাই স্পষ্ট।অন্যথায় হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে তা হলো: (তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন সে তার রবের সাথে নিভৃতে কথা বলে; সুতরাং সে যেন তার সামনের দিকে থুতু না ফেলে)। এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, মূলত এটি (সামনের দিকে থুতু না ফেলা) সালাতের জন্য (খাস) বিশেষ বিধান। তবুও কিবলার নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে। আর একারণেই মল-মূত্র ত্যাগের সময় কিবলার দিকে মুখ করা বা পিঠ দিয়ে বসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”সর্বোত্তম হলো বাম বা ডান দিকে থুথু নিক্ষেপ করা, কিন্তু কিবলার দিকে না। মূল দলীলসমূহে যা বর্ণিত হয়েছে তা মূলত সালাত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট, কারণ তিনি (রাসূল ﷺ)-এর কারণ হিসেবে বলেছেন: (নিশ্চয়ই আল্লাহ তার চেহারার সামনে থাকেন)।”আর কিবলার কথা একারণে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদের কিবলার দিকে (সামনের দেওয়ালে শ্লেষ্মা) থুথু দেখতে পেয়েছিলেন; এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যিনি এটি করেছিলেন তিনি সালাত পড়ছিলেন; এমতাবস্থায় তিনি তার সামনের দিকে থুতু ফেলেছিলেন যেহেতু তিনি সালাতরত ছিলেন, ফলে তা মসজিদের কিবলার দিকের দেওয়ালে গিয়ে লেগেছিল”।(ইমাম আব্দুর রহমান আল-বাররাক (হাফিজাহুল্লাহ)-এর ওয়েবসাইট থেকে সমাপ্ত; গৃহীত,ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৫৪৩৭৩)
.
পরিশেষে বলা যায়, কিবলার দিকে থুথু ফেলার নিষেধাজ্ঞা মূলত মসজিদ এবং সালাত আদায়কালীন অবস্থার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। তবে একদল বিশেষজ্ঞ আলেমের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা সর্বাবস্থায় কার্যকর এবং তা হারাম। তাই মতভেদ এড়িয়ে কিবলার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও পবিত্রতা বজায় রাখার স্বার্থে, সর্বাবস্থায় সেদিকে থুথু নিক্ষেপ না করাই হবে প্রকৃত তাকওয়া ও উন্নত শিষ্টাচারের পরিচয়। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ। (আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৫৪৩৭৩)।
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফকালীন কাবার বিভিন্ন কোণ স্পর্শ করার বিধান এবং কাবায় লাগানো সুগন্ধি যদি ইহরামকারীর শরীরে লেগে যায় তবে তার শরয়ী হুকুম কী

 প্রশ্ন: হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফকালীন কাবার বিভিন্ন কোণ স্পর্শ করার বিধান কী? এছাড়া কাবায় লাগানো সুগন্ধি যদি ইহরামকারীর শরীরে লেগে যায় তবে তার শরয়ী হুকুম বা করণীয় কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর হজ্জ বা উমরাহর ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফকালীন কা’বার বিভিন্ন কোণে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা এবং ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি স্পর্শ করার বিষয়টি আমারা তিনটি অংশে বিভক্ত করার চেষ্টা করব।
প্রথম অংশ: হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফকালীন কাবার বিভিন্ন কোণে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করার বিধান:
.
রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফের সময় কা‘বার সর্বমোট তিনটি স্থানে স্পর্শ/চুমু। বুক লাগবে দোয়া করা সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত। এর মধ্যে দুটি স্থান যথা: হাজারে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানী শুধুমাত্র চুমু/স্পর্শ করা সরাসরি রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত এবং অপর একটি স্থান যাকে শারঈ পরিভাষায় “মুলতাযাম” বলা হয়। মুলতাযাম হলো কাবার সেই অংশ, যা হাজারে আসওয়াদ ও কাবার দরজার মাঝখানে অবস্থিত (প্রায় ২ মিটার জায়গা)। এখানে মানুষ বুক, গাল, হাত লাগিয়ে দোয়া করে। এটি সরাসরি রাসূল (ﷺ) থেকে প্রমাণিত না হলেও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
দলিল হচ্ছে:
.
(১). হাজারে আসওয়াদ: হাজারে আসওয়াদে ‘চুমু দেওয়ার দলিল হচ্ছে; যুবায়র ইবনু ‘আরাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) কে হাজারে আসওয়াদে ‘চুমু দেয়া’ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলো। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) জবাবে বললেন,رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَلِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ.”আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা স্পর্শ করতে ও চুমু দিতে দেখেছি।”(সহীহ বুখারী হা/১৬১১) হাজারে আসওয়া চুমুর পদ্ধতি হচ্ছে তাওয়াফকারী তওয়াফ শুরু করার জন্য হাজারে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাবে। ডান হাত দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করবে ও চুমু খাবে। যদি হাজারে আসওয়াদে চুমু খেতে না পারে হাত দিয়ে স্পর্শ করবে ও হাতে চুমু খাবে (স্পর্শ করার মানে হচ্ছে- হাত দিয়ে ছোঁয়া)। যদি হাত দিয়ে স্পর্শ করতে না পারে তাহলে হাজারে আসওয়াদের দিকে মুখ করে হাত দিয়ে ইশারা করবে এবং তাকবির (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর) বলবে; কিন্তু হাতে চুমু খাবে না। হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করার ফজিলত অনেক। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “আল্লাহ তাআলা হাজার আসওয়াদকে পুনরুত্থিত করবেন। তার দুইটি চোখ থাকবে যে চোখ দিয়ে পাথরটি দেখতে পাবে।তার একটি জিহ্বা থাকবে যে জিহ্বা দিয়ে পাথরটি কথা বলতে পারবে। যে ব্যক্তি সঠিকভাবে পাথরটিকে স্পর্শ করেছে পাথরটি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে।[আলবানী আল-তারগীব ও আল-তারহীব হা/১১৪৪) গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন] তবে সেখানে অনেক মানুষ থাকলে উত্তম হচ্ছে- ভিড় না করা। মানুষকে কষ্ট না দেয়া এবং নিজেও কষ্ট না পাওয়া। যেহেতু হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি উমরকে লক্ষ্য করে বলেছেন- “হে উমর! তুমি শক্তিশালী মানুষ। হাজারে আসওয়াদের নিকট ভিড় করে দুর্বল মানুষকে কষ্ট দিও না। যদি ফাঁকা পাও তবে স্পর্শ করবে; নচেৎ হাজারে আসওয়াদমুখি হয়ে তাকবীর বলবে।[মুসনাদে আহমাদ (১৯১), আলবানী তাঁর ‘মানাসিকুল হাজ্জ ও উমরা’ গ্রন্থে হাদিসটিকে ‘কাওয়ি’ (শক্তিশালী) মন্তব্য করেছেন
.
(২). রুকনে ইয়ামানী: কাবা’ ঘরের হাজারে আসওয়াদ যে কোণে অবস্থিত, তার ঠিক আগের কোণটিই হলো রুকনে ইয়ামানী। এটি স্পর্শ করার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী, সম্ভব হলে এই কোণটি কেবল ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। তবে হাজারে আসওয়াদের মতো এখানে চুমু খাওয়ার বা কপালে ঠেকানোর কোনো বিধান নেই, এমনকি স্পর্শ করার পর নিজের হাতে চুমু খাওয়াও সুন্নাহ পরিপন্থী। যদি ভিড়ের কারণে স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তবে হাজারে আসওয়াদের মতো দূর থেকে ইশারা করারও প্রয়োজন নেই। এই কোণে পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দুআ নেই, তবে এখান থেকে হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত যাওয়ার পথে ‘রাব্বানা আতিনা…’ দুআটি পড়া সুন্নাত।” রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করার দলিল হচ্ছে,প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেবল ইয়ামানী দু’ রুকনকে ইস্তিলাম করতে দেখেছি।” (সহীহ বুখারী হা/১৬০৯)
.
(৩). এবং তৃতীয় একটি স্থান যাকে শারঈ পরিভাষায় “মুলতাযাম” বলা হয়, মুলতাযাম হলো কা‘বার সেই অংশ, যা হাজারে আসওয়াদ ও কা‘বার দরজার মাঝখানে অবস্থিত (প্রায় ২ মিটার জায়গা)। এখানে দোয়াকারী তার বুক, মুখমণ্ডল, দুই বাহু এবং দুই হাতের তালু এই অংশের ওপর রেখে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারে। তবে এই আমল সরাসরি রাসূল (ﷺ) থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত না হলেও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। মুলতাজামে পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। যদি সুযোগ হয় তবে কাবা ঘরে প্রবেশের সময়, বিদায়ী তাওয়াফের আগে অথবা যেকোনো সময় এটি করা যেতে পারে। তবে দোয়াকারীর উচিত অন্যকে কষ্ট না দেওয়া বা দীর্ঘ সময় নিয়ে ভিড় তৈরি না করা। যদি খালি জায়গা পাওয়া যায় তবেই সেখানে গিয়ে দোয়া করবে, নতুবা তাওয়াফরত অবস্থায় বা নামাজের সিজদায় দোয়া করাই যথেষ্ট। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে মুলতাজাম আঁকড়ে ধরার বিষয়টি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। দলিল হচ্ছে,আবদুর রহমান ইবনে সাফওয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কা বিজয় করলেন, আমি বললাম: আমি কাপড় পরিধান করে দেখি রাসূল (সা.) কী করেন। আমি গিয়ে দেখলাম তিনি এবং তাঁর সাহাবীরা কাবা থেকে বের হয়েছেন এবং তাঁরা দরজা থেকে হাতিম পর্যন্ত কাবা শরীফ স্পর্শ করছেন। তাঁরা কাবার দেয়ালে গাল লাগিয়ে রেখেছেন এবং রাসূল (ﷺ) ছিলেন তাদের মাঝে।” (আবু দাউদ:হা/১৮৯৮, মুসনাদে আহমদ: ১৫১২৪)। এই বর্ননাটি দুর্বল কারণ এই বর্ণনায় ইয়াজিদ বিন আবি জিয়াদ রয়েছেন, যাকে ইবনে মাঈন ও আবু হাতিমসহ অনেকেই দুর্বল বলেছেন। অপর এক বর্ননায় আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আমি আবদুল্লাহর সাথে তাওয়াফ করলাম। যখন আমরা কাবার পেছনের দিকে পৌঁছলাম, আমি বললাম: আপনি কি আশ্রয় চাইবেন না? তিনি বললেন: আমরা জাহান্নামের আগুন থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। এরপর তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন এবং রুকন ও দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের বুক, মুখমণ্ডল, বাহু ও হাতের তালু এভাবে বিছিয়ে দিলেন এবং বললেন: আমি রাসূল (ﷺ)-কে এভাবেই করতে দেখেছি।” (আবু দাউদ: ১৮৯৯, ইবনে মাজাহ: ২৯৬২)। এই বর্ণনায় মুসান্না বিন সাবাহ রয়েছেন, যাকে ইমাম আহমদ ও নাসায়িসহ অনেকে দুর্বল বলেছেন। তবে ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ‘সিলসিলা সহীহা’তে হা/২১৩৮) হাদীস দুটিকে একটি অন্যটির পরিপূরক হিসেবে সহীহ বলেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন: “মুলতাজাম হলো রুকন (হাজরে আসওয়াদ) ও দরজার মধ্যবর্তী স্থান।”
.
এ বিষয়ে হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন:وإنْ أحبَّ أنْ يأتيَ الملتزم – وهو ما بين الحجر الأسود والباب – فيضع عليه صدره ووجهه وذراعيه وكفيه ويدعو ويسأل الله تعالى حاجته فعل ذلك ، وله أنْ يفعل ذلك قبل طواف الوداع فإنَّ هذا الالتزام لا فرق بين أنْ يكون حالَ الوداع أو غيره ، والصحابة كانوا يفعلون ذلك حين دخول مكة ، وإنْ شاء قال في دعائه الدعاء المأثور عن ابن عباس : اللهمَّ إني عبدك وابن عبدك وابن أمتك حملتني على ما سخرتَ لي مِن خلقك وسيرتَني في بلادك حتى بلغتَني بنعمتِك إلى بيتِك وأعنتَني على أداء نسكي فإنْ كنتَ رضيتَ عني فازدَدْ عني رضا وإلا فمِن الآن فارضَ عني قبل أنْ تنآى عن بيتك داري فهذا أوان انصرافي إنْ أذنتَ لي غير مستبدلٍ بك ولا ببيتِك ولا راغبٍ عنك ولا عن بيتِك اللهمَّ فأصحبني العافيةَ في بدني والصحةَ في جسمي والعصمة في ديني وأحسن منقلبي وارزقني طاعتك ما أبقيتَني واجمع لي بين خيري الدنيا والآخرة إنك على كل شيء قدير .ولو وقف عند الباب ودعا هناك من غير التزام للبيت كان حسناً
“যদি কেউ ‘মুলতাজাম’-এ (হাজরে আসওয়াদ এবং কাবার দরজার মধ্যবর্তী স্থান) আসতে চায়—তবে সে সেখানে নিজের বুক, মুখমণ্ডল, দুই হাত ও হাতের তালু রেখে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারে এবং নিজের হাজত (প্রয়োজন) পূরণের প্রার্থনা করতে পারে।সে চাইলে বিদায়ী তওয়াফের (তাওয়াফ আল-ওয়াদা) আগেও এটি করতে পারে। কারণ, এই ‘ইলতিজাম’ (কাবার দেয়াল জড়িয়ে ধরে দোয়া করা) বিদায়ের সময় বা অন্য যেকোনো সময়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মক্কায় প্রবেশের সময়ও এটি করতেন।ব্যক্তি চাইলে দোয়ার ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত দোয়াটি পাঠ করতে পারে: “হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা, আপনার এক বান্দা ও এক বাঁদীর পুত্র।আপনি আপনার সৃষ্ট যে বাহন আমার জন্য অনুগত করে দিয়েছেন, তার ওপর সওয়ার করে এবং আপনার জনপদসমূহের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করিয়ে আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার ঘর পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। আমার হজের আহকাম পালনে আপনি আমাকে সাহায্য করেছেন। এখন আপনি যদি আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, তবে আমার প্রতি আপনার সন্তুষ্টি আরও বাড়িয়ে দিন। আর যদি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, তবে আপনার ঘর থেকে আমার আবাসস্থল দূরে সরে যাওয়ার আগেই এখন থেকে আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। এটাই আমার বিদায়ের সময়, যদি আপনি আমাকে অনুমতি দেন। আমি আপনার পরিবর্তে অন্য কাউকে গ্রহণ করছি না এবং আপনার ঘরের বদলে অন্য ঘরকে প্রাধান্য দিচ্ছি না; আপনার প্রতি বা আপনার ঘরের প্রতি আমি বিমুখ নই। হে আল্লাহ! আপনি আমার শরীরে নিরাপত্তা ও সুস্থতা দান করুন, আমার দ্বীনকে হিফাজত করুন, আমার প্রত্যাবর্তনকে উত্তম করুন এবং যতদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন ততদিন আপনার আনুগত্য করার রিজিক দান করুন। আমার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকে একত্রিত করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” আর যদি কেউ কাবা স্পর্শ (জড়িয়ে ধরা) না করে শুধু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করে, তবে সেটিও উত্তম।”(সূত্র: মাজমু আল-ফাতাওয়া: ২৬/১৪২-১৪৩)
.
​অপরদিকে সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- বলেন:وهذه مسألة اختلف فيها العلماء مع أنها لم ترد عن النبي صلى الله عليه وسلم ( يعني لم ترد في حديث صحيح ، بناءً على تضعيف الأحاديث الواردة في هذا ) ، وإنما عن بعض الصحابة رضي الله عنهم ، فهل الالتزام سنة ؟ ومتى وقته ؟ وهل هو عند القدوم ، أو عند المغادرة ، أو في كل وقت ؟ .وسبب الخلاف بين العلماء في هذا : أنه لم ترد فيه سنة عن النبي صلى الله عليه وسلم ، لكن الصحابة – رضي الله عنهم – كانوا يفعلون ذلك عند القدوم .والفقهاء قالوا : يفعله عند المغادرة فيلتزم في الملتزم ، وهو ما بين الركن الذي فيه الحجر والباب …وعلى هذا : فالالتزام لا بأس به ما لم يكن فيه أذية وضيق .”এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যদিও এটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়নি (অর্থাৎ এই সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করার কারণে এটি কোনো সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়)। তবে এটি কয়েকজন সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো: এই ‘ইলতিজাম’ (কা’বা শরীফের দেয়াল আঁকড়ে ধরে দোয়া করা) কি সুন্নাত? এর সময় কখন? এটি কি আসার সময়, নাকি বিদায়ের সময়, নাকি যেকোনো সময় করা যাবে? আলেমদের মধ্যে এই মতভেদের কারণ হলো: এ বিষয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে কোনো সুন্নাত (সহীহ হাদিস) প্রমাণিত নেই। তবে সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মক্কায় আসার সময় এটি করতেন।অন্যদিকে ফুকাহায়ে কেরাম (ফিকহ বিশেষজ্ঞগণ) বলেছেন: এটি বিদায়ের সময় করতে হয়। তখন ‘মুলতাজাম’-এ (হাজরে আসওয়াদ ও কা’বার দরজার মধ্যবর্তী দেয়াল) বুক ও পেট লাগিয়ে দোয়া করা হয়।এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়: ইলতিজাম করাতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ না এটি অন্যের জন্য কষ্টদায়ক হয় বা ভিড় সৃষ্টি করে।”(ইবনু ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৪০২, ৪০৩)
.
সম্মানিত পাঠক! কাবা ঘরের উল্লেখিত তিনটি স্থান ব্যতীত অন্য কোনো কোণ, দেয়াল, গিলাফ কিংবা মাকামে ইবরাহিম স্পর্শ করা বা চুমু দেওয়া সুন্নাহর পরিপন্থী। ইবাদত মনে করে এমন কাজ করা শরিয়তসম্মত নয়; বরং অতি আবেগের বশবর্তী হয়ে এসব করা ‘বিদআত’ বা মাকরূহের অন্তর্ভুক্ত। মনে রাখতে হবে, যেকোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো তা নবীজি (ﷺ)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হওয়া।” কারন এমন সকল কাজ,যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য চাওয়া হয় ও ইবাদত হিসেবে করা হয়, কিন্তু যার শরিয়তে কোনো ভিত্তি নেই তা বিদ‘আত।এর প্রমাণ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীস, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশনা নেই (আমাদের শরিয়তে নেই) সেটা প্রত্যাখ্যাত।”(সহিহ মুসলিম হা/১৭১৮) সুতরাং ইবাদতের বিষয়াদির ব্যাপারে কেবল কুরআন-সুন্নাহ থেকেই নিতে হবে; এক্ষেত্রে স্বপ্ন, কাশফ, ইলহাম, মনগড়া যুক্তি অথবা ব্যক্তি পূজার কোনো স্থান নেই। এগুলো কস্মিনকালেও গ্রহণ করা হবে না। বরং এগুলো প্রত্যাখ্যান করা হবে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:الْأُمُورُ التَّعَبُّدِيَّةُ لَا تُؤْخَذُ إِلَّا مِنَ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَلَا تُؤْخَذُ بِالرَّأْيِ وَلَا بِعَمَلِ النَّاسِ لِأَنَّ الْأَصْلَ فِي الْعِبَادَاتِ التَّحْرِيمُ حَتَّى يَقُومَ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّهَا عِبَادَةٌ مَشْرُوعَةٌ “‘ইবাদাত সংক্রান্ত বিষয়াদি কিতাব (কুর‘আন) ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে গ্রহণ করা যাবে না এবং তা ব্যক্তিগত মতামত কিংবা মানুষের ‘আমল দ্বারাও গ্রহণ করা যাবে না। কারণ ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা হারাম, যতক্ষণ না কোনো শার‘ঈ দলীল দ্বারা তা (‘ইবাদাতটি) শরী‘আতসম্মত প্রমাণিত হয়।”(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরূন ‘আলাদ দারব, খণ্ড নং ৪, পৃষ্ঠা নং ৫৫৮)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] তাঁর “ইক্তিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,المنع من تقبيل جوانب الكعبة، غير الركنين اليمانيين، عن عامة السلف، وإجماع الأئمة الأربعة، فقال: قد ثبت باتفاق أهل العلم أن النبي صلى الله عليه وسلم لما حج البيت، لم يستلم من الأركان، إلا الركنين اليمانيين، فلم يستلم الركنين الشاميين، ولا غيرهما من جوانب البيت، ولا مقام إبراهيم، ولا غيره من المشاعر، وأما التقبيل، فلم يقبل إلا الحجر الأسود. وقد اختلف في الركن اليماني: فقيل: يقبله. وقيل: يستلمه ويقبل يده، وقيل: لا يقبله ولا يقبل يده. والأقوال الثلاثة مشهورة في مذهب أحمد، وغيره.والصواب: أنه لا يقبله، ولا يقبل يده، فإن النبي صلى الله عليه وسلم لم يفعل هذا ولا هذا، كما تنطق به الأحاديث الصحيحة، ثم هذه مسألة نزاع.
“কাবাঘরের দুই ইয়ামানি রুকন (রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ) ছাড়া অন্য দিক বা কোণ চুম্বন করা নিষিদ্ধ এ বিষয়ে অধিকাংশ সালাফ এবং চার মাজহাবের ইমামদের ঐকমত্য রয়েছে। তিনি বলেন: আলেমদের সর্বসম্মত মত হলো নবী (ﷺ) যখন হজ পালন করেন, তখন তিনি কাবার কোণগুলোর মধ্যে কেবল দুই ইয়ামানি রুকনই স্পর্শ (ইস্তিলাম) করেছেন। তিনি শাম দিকের দুই রুকন স্পর্শ করেননি, কাবার অন্য কোনো অংশও স্পর্শ করেননি মাকামে ইবরাহীম বা অন্য কোনো মাশাআর (পবিত্র স্থান) স্পর্শ করেননি। আর চুম্বনের ব্যাপারে তিনি কেবল হাজরে আসওয়াদকেই চুম্বন করেছেন। রুকনে ইয়ামানি সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে: কেউ বলেছেন এটিও চুম্বন করা হবে। কেউ বলেছেন হাত দিয়ে স্পর্শ করে, পরে সেই হাত চুম্বন করবে। কেউ বলেছেন না এটিকে চুম্বন করবে, না হাত চুম্বন করবে।
এই তিনটি মতই ইমাম আহমাদের মাযহাবসহ অন্যদের মধ্যেও প্রসিদ্ধ। কিন্তু সঠিক মত হলো: রুকনে ইয়ামানি চুম্বন করা হবে না এবং হাত চুম্বনও করা হবে না। কারণ নবী (ﷺ) এ দুটির কোনোটিই করেননি সহিহ হাদিসসমূহ এ কথাই প্রমাণ করে। তবে এটি একটি মতভেদপূর্ণ মাসআলা।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:কাবা শরীফের গিলাফ, হাজারে আসওয়াদ ও মুসহাফ চুম্বন করার হুকুম কি?
জবাবে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:تقبيل أي مكان في الأرض بدعة إلا الحجر الأسود ولولا الإتباع لكان تقبيل الحجر الأسود بدعة وكان عمر رضي الله عنه الله عنه يقول ( إني أعلم أنك حجر لا تضر ولا تنفع ولولا النبي صلى الله عليه وسلم قبلّك ما قبلتك ) لذلك لا يجوز تقبيل أستار الكعبة أو الحجرات أو الركن اليماني أو المصحف وكذلك التمّسح به إذا كان من أجل التبرك به إذ أن مسحه للتعبد فقط”কেবল হাজারে আসওয়াদ ছাড়া পৃথিবীর যে কোন স্থান চুম্বন করা বিদাত। যদি না হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন করা নিছক অনুসরণ না হত তাহলে এটাকে চুম্বন করাও বিদাত হত। উমর (রাঃ) বলতেন: “নিশ্চয় আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর ছাড়া আর কিছু নও; তুমি ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পার না। যদি না আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তোমাকে চুমু খেতে না দেখতাম তাহলে আমিও তোমাকে চুমু খেতাম না।” এ কারণে কাবা শরীফের গিলাফগুলোকে চুম্বন করা কিংবা অন্যান্য পাথর কিংবা রুকনে ইয়ামেনীকে কিংবা মুসহাফকে চুম্বন করা নাজায়েয। অনুরূপভাবে বরকত নেয়ার জন্য মোছন করাও নাজায়েয; যদি সেটি নিছক ইবাদত হিসেবে করা হয়।”(মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-উছাইমীন (রহঃ), গৃহীত ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২১৩৯২)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন; সন্মানিত শাইখ তওয়াফ করার সময় দেখা যায় কিছু মানুষ কাবার দেয়াল, কাবার গিলাফ, মকামে ইব্রাহিম এবং হিজর-এ-ইসমাইল (হাতীম) স্পর্শ বা মাসেহ করে বরকত হাসিল করার চেষ্টা করছেন।শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কাজের বিধান কী?
জবাব শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:
هذا العمل يفعله الناس ، يريدون به التقرب إلى الله عز وجل والتعبد له ، وكل عمل تريد به التقرب إلى الله والتعبد له ، وليس له أصل في الشرع فإنه بدعة ، حذر منه النبي صلى الله عليه وسلم فقال : ” إياكم ومحدثات الأمور ، فإن كل بدعة ضلالة ” رواه الترمذي (2676) وأبو داوود (4607) .
ولم يرد عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه مسح سوى الركن اليماني والحجر الأسود .وعليه فإذا مسح الإنسان أي ركن من أركان الكعبة أو جهة من جهاتها ، غير الركن اليماني والحجر الأسود ، فإنه يعتبر مبتدعا ، ولما رأى عبد الله بن عباس رضي الله عنهما معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنهما يمسح الركنين الشماليين ، نهاه ، فقال له معاوية رضي الله عنه : ليس شيء من البيت مهجورا ، فقال ابن عباس رضي الله عنهما : ( لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة ) الأحزاب / 21 وقد رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يمسح الركنين اليمانيين ، يعني الركن اليماني والحجر الأسود ، فرجع معاوية رضي الله عنه إلى قول ابن عباس .ومن باب أولى في البدعة ، ما يفعله بعض الناس من التمسح بمقام إبراهيم ، فإن ذلك لم يرد عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه تمسح في أي جهة من جهات المقام .وكذلك ما يفعله بعض الناس من التمسح بزمزم ، والتمسح بأعمدة الرواق – وهي أعمدة المبنى العثماني القديمة – ، وكل ذلك مما لم يرد عن النبي صلى الله عليه وسلم فكله بدعة ، وكل بدعة ضلالة
“এই কাজটি মানুষ করে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে। অথচ যে কোনো কাজ, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য চাওয়া হয় ও ইবাদত হিসেবে করা হয়, কিন্তু যার শরিয়তে কোনো ভিত্তি নেই তা বিদ‘আত। আর নবী সা. এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন: “তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নবউদ্ভাবিত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকো, কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।'(সুনানে তিরমিজি (২৬৭৬) ও আবু দাউদ (৪৬০৭)। নবী (ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয় যে, তিনি রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করেছেন। সুতরাং কেউ যদি কাবার অন্য কোনো রুকন বা দিক স্পর্শ করে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ ছাড়া তবে সে বিদ‘আতে লিপ্ত বলে গণ্য হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) যখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) -কে কাবার উত্তর দিকের দুই কোণ স্পর্শ (মাসেহ) করতে দেখলেন, তখন তিনি তাকে বাধা দিলেন।মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন:বাইতুল্লাহর (আল্লাহর ঘরের) কোনো অংশই পরিত্যক্ত নয় অর্থাৎ(সবই বরকতময়)। তখন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ [সূরা আহজাব: ২১] এবং তিনি আরও বললেন: আমি নবী (ﷺ)-কে শুধুমাত্র দুই ইয়ামানি রুকন অর্থাৎ (রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ) স্পর্শ করতে দেখেছি। এরপর মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইবনু আব্বাসের মতের দিকে ফিরে এলেন (অর্থাৎ নিজের ভুল বুঝতে পেরে তা গ্রহণ করলেন)।এর চেয়েও স্পষ্ট বিদ‘আত হলো কিছু মানুষ যা করে,যেমন মাকামে ইবরাহীমে গা ঘষা বা স্পর্শ করা। নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত নয় যে তিনি মাকামের কোনো দিক স্পর্শ করেছেন।একইভাবে, কেউ কেউ জমজম কূপ, কিংবা রিওয়াকের স্তম্ভসমূহ স্পর্শ করে বরকত নেওয়ার চেষ্টা করে এগুলোর কোনো কিছুই নবী ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয়। সুতরাং সবই বিদ‘আত,আর প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা”।(ইবনু উসাইমীন; হজ উমরা পালনকারীদের ভুলভ্রান্তি নির্দেশিকা থেকে সমাপ্ত গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৬৪৪)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
উত্তর:পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি।অতঃপর;হজ্জ বা উমরাহর ইহরাম অবস্থায় তাওয়াফকালীন কা’বার বিভিন্ন কোণে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা এবং ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি স্পর্শ করার বিষয়টি ইতিপূর্বে আমরা তিনটি অংশে বিভক্ত করার কথা উল্লেখ করেছিলাম যার একটি অংশ গত পর্বে পোস্ট করা হয়েছিল আজ দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশ নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
.
▪️দ্বিতীয় অংশ: হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান:
.
ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা;সেটা কাপড়ে হোক কিংবা শরীরে হোক; খাবার-দাবারে হোক কিংবা গোসলের সামগ্রীতে হোক কিংবা অন্য যে কোন কিছুতে হোক ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। দলিল হচ্ছে- এর প্রমাণ আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.)-এর বর্ণিত হাদীস, রাসূল (ﷺ) মুহরিম (ইহরামকারী ব্যক্তি) সম্পর্কে বলেন:لَا يَلْبَسُ الْمُحْرِمُ الْقَمِيصَ وَلَا الْعِمَامَةَ وَلَا السَّرَاوِيلَ وَلَا الْبُرْنُسَ وَلَا ثَوْبًا مَسَّهُ زَعْفَرَانٌ وَلَا وَرْس”মুহরিম ব্যক্তি জামা, পাগড়ী, পাজামা, বুরনুস (মাথা ঢাকা জামা) পরিধান করবে না এবং এমন কাপড় যাতে জা’ফরান বা ওয়ার্স নামক সুগন্ধিযুক্ত ঘাস স্পর্শ করেছে।”(সহীহ বুখারী ৫৭৯৪, সহীহ মুসলিম ১১১৭)
.
​এই হাদিসের ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,قوله صلى الله عليه وسلم: ( وَلَا تَلْبَسُوا مِنَ الثِّيَابِ شَيْئًا مَسَّهُ الزَّعْفَرَانُ، وَلَا الْوَرْسُ ):أجمعت الأمة على تحريم لباسهما، لكونهما طيبا. وألحقوا بهما جميع أنواع ما يقصد به الطيب.وسبب تحريم الطيب: أنه داعية إلى الجماع، ولأنه ينافي تذلل الحاج؛ فإن الحاج أشعث أغبر، وسواء في تحريم الطيب الرجل والمرأة “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণী: “আর তোমরা জাফরান বা ওয়ারস মাখা কোনো কাপড় পরিধান করো না” প্রসঙ্গে:”উম্মত (ওলামায়ে কেরাম) এই দুটি পরিধান করা হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন, কারণ এগুলো সুগন্ধি। আর যা কিছু সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এমন সকল প্রকার বস্তুকে এই দুটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।সুগন্ধি হারাম হওয়ার কারণ হলো: এটি যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রতকারী এবং এটি হজের বিনম্রতা ও মলিনতার পরিপন্থী। কেননা একজন হাজি হবে উস্কোখুস্কো চুলধারী ও ধূলিমলিন। আর সুগন্ধি হারামের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান।”(নববী; শারহু সহীহ মুসলিম: খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৭৫)।
.
এছাড়াও রাসূল (ﷺ) আরাফায় অবস্থানকালে যেই মুহরিম সাহাবীকে একটি উট পায়ের নীচে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে সে ব্যক্তি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তাকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল দাও। দুই কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তার মাথা ঢাকবে না। তাকে হানুত দিবে না”। হানুত হচ্ছে- এক জাতীয় সুগন্ধির মিশ্রণ যা মৃত ব্যক্তির গায়ে লাগানো হয়।”(সহীহ বুখারী) আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ গ্রন্থে এসেছে:”ويلتحق بالثياب الجلوس على فراش مزعفر أو مطيب بزعفران. ولا يضع عليه ثوبا مزعفرا، ولو علق بنعاله زعفران أو طيب وجب أن يبادر إلى نزعه “পোশাকের মতোই জাফরান রঙে রাঙানো বা জাফরান দিয়ে সুগন্ধিযুক্ত করা বিছানায় বসা (নিষেধের) অন্তর্ভুক্ত হবে। জাফরান রঙে রাঙানো কোনো কাপড়ও তার ওপর রাখা যাবে না। আর যদি তার জুতোয় জাফরান বা সুগন্ধি লেগে যায়, তবে তা দ্রুত খুলে ফেলা বা দূর করা ওয়াজিব (আবশ্যক)।”(আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ (২৩/২২৫) এর দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি লাগানো নিষেধ।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- বলেন:
المحظور الخامس من المحظورات وهو الطيب، وليس كل ما كان زكي الرائحة يكون طيبا، فالطيب ما أعد للتطيب به عادة، وعلى هذا فالتفاح والنعناع وما أشبه ذلك مما له رائحة زكية تميل إليها النفس لا يكون طيباً، إنما الطيب ما يستعمل للتطيب به، كدهن العود والمسك والريحان والورد وما أشبه ذلك، هذا لا يجوز للمحرم استعماله.والدليل على ذلك: أن النبي صلّى الله عليه وسلّم قال: ( لَا تَلْبَسُوا مِنَ الثِّيَابِ شَيْئًا مَسَّهُ الزَّعْفَرَانُ، أَوِ الْوَرْسُ )، والزعفران طيب.لكن قد يقول قائل: الزعفران أخص من كونه طيباً؛ لأنه طيبٌ ولون، ونحن نقول إن الطيب بأي نوع كان يحرم على المحرم. وجوابه: أن النبي صلّى الله عليه وسلّم قال في الذي وقصته ناقته في عرفة ( لَا تُحَنِّطُوهُ )، وتحنيط الميت أطياب مجموعة تجعل في مواضع من جسمه، وهذا عام لكل طيب، وقال: ( فَإِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ القِيَامَةِ مُلَبِّيًا )، وهذا دليل على أن المحرم لا يجوز استعماله للطيب…والطيب هنا يشمل الطيب في رأسه، وفي لحيته، وفي صدره، وفي ظهره، وفي أي مكان من بدنه، وفي ثوبه أيضاً…
“ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর পঞ্চমটি হলো সুগন্ধি। তবে যেকোনো সুগন্ধযুক্ত জিনিসই ‘সুগন্ধি’ হিসেবে গণ্য হবে না।সুগন্ধি বলতে বুঝায় যা সাধারণত সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সুতরাং আপেল, পুদিনা ইত্যাদি যেগুলোর সুন্দর গন্ধ আছে এবং মন সেদিকে আকৃষ্ট হয় সেগুলো ‘সুগন্ধি’ নয়। বরং সুগন্ধি হলো যা সুগন্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন: আগর তেল, মিশক, রাইহান, গোলাপ ইত্যাদি। এগুলো ইহরাম অবস্থায় ব্যবহার করা জায়েয নয়। এর দলিল হলো— নবী (ﷺ) বলেছেন: তোমরা এমন কোনো কাপড় পরবে না, যা জাফরান বা ওয়ার্স দ্বারা স্পর্শ করা হয়েছে। জাফরান একটি সুগন্ধি। কেউ বলতে পারে: জাফরান কেবল সুগন্ধি নয়, এতে রঙও আছে। আমরা বলি: যে কোনো প্রকার সুগন্ধিই ইহরাম অবস্থায় হারাম। এর প্রমাণ নবী (ﷺ) সেই ব্যক্তির ব্যাপারে বলেছেন, যাকে আরাফায় তার উট ফেলে দিয়েছিল (মৃত্যুবরণ করেছিল): তাকে সুগন্ধি দিও না (তাহনিত করো না)।মৃতদেহে তাহনিত মানে বিভিন্ন সুগন্ধি একত্র করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে লাগানো। এটি সব ধরনের সুগন্ধির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি আরও বলেন: কারণ সে কিয়ামতের দিন তালবিয়া বলতে বলতে উঠবে। এটি প্রমাণ করে যে, ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তি সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারে না। এখানে সুগন্ধি বলতে বোঝায়‌ মাথা, দাড়ি, বুক, পিঠ শরীরের যে কোনো অংশে সুগন্ধি লাগানো, এমনকি কাপড়েও।”(ইবনু ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৩৭)
.
▪️তৃতীয় অংশ: ইহরাম অবস্থায় কাবার বিভিন্ন কোণ যেখানে সুগন্ধি লাগানো আছে তা স্পর্শ করার বিধান এবং কাফফারার বিধান:
.
ইহরাম অবস্থায় এমন কোনো স্থান স্পর্শ করা জায়েজ নেই যেখানে সুগন্ধি (যেমন: আতর বা উদ) লাগানো আছে। যদি কাবা ঘরের কোনো কোণে (যেমন: রুকনে ইয়ামানি বা হাজরে আসওয়াদ) সুগন্ধি মাখানো থাকে, তবে তা সরাসরি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনকি কাবার গিলাফেও প্রায়ই সুগন্ধি ছিটানো থাকে। তাই ইহরাম অবস্থায় গিলাফ ধরা বা মুলতাজামে (কাবা শরীফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান) বুক ও মুখ লাগিয়ে দোয়া করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেন সুগন্ধি তার শরীরে না লাগে। তবে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভিড়ের চাপে তাওয়াফকারীর শরীরে বা ইহরামের কাপড়ে কাবা’র সুগন্ধি লেগে যায়, তবে দ্রুত তা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।তবে কোনো কাফফারা বা জরিমানা (দম) দিতে হবে না। কারন এ ক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হল: কোন মানুষ যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কিংবা জবরদস্তির শিকার হয়ে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “হে আমাদের রব্ব! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি সেটাই করব। আরও দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[সূরা আহযাব, আয়াত: ৫] পক্ষান্তরে কেউ যদি ইহরাম অবস্থায় ইচ্ছাকৃত ভাবে সুগন্ধি যুক্ত স্থান স্পর্শ করে এবং সুগন্ধি তাওয়াফকারীর হাতে বা কাপড়ে লেগে যায় তাহলে তার ওপরে দম দেওয়া ওয়াজিব হবে। আর এই ফিদিয়ার ক্ষেত্রে তিনটি অপশন রয়েছে (যেকোনো একটি বেছে নেওয়া যায়): (১).একটি ছাগল যবেহ করা,(২).অথবা তিন দিন রোজা রাখা,(৩).অথবা ছয়জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তি যদি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে বা চুম্বন করে, অথচ সেখানে সুগন্ধি (আতর) লাগানো থাকে এর হুকুম কী? সুগন্ধি শুকনো হলে আর ভেজা হলে কি হুকুমে পার্থক্য আছে? আর হাজরে আসওয়াদ বা কাবার অন্যান্য রুকনে যেগুলো ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তি স্পর্শ করে সেখানে সুগন্ধি লাগানো কি শরিয়তসম্মত?
উত্তরে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন:
الحمد لله وحده، وصلى الله وسلم على من لا نبي بعده؛ أما بعد:
فإنَّ مِن محظورات الإحرام الطِّيبَ في البدن والثياب[1]، والأصل في ذلك قوله -صلى الله عليه وسلم- في المتفق عليه: ولا تلبسوا من الثياب شيئا مسَّه زعفران، ولا الورس[2]، وقوله -صلى الله عليه وسلم- لصاحب الجُبَّة: اخلع عنك الجُبَّة، واغسل أثر الخَلوق عنك رواه الشيخان[3].
واتفق العلماء على تحريم تعمد المُحْرِم لابتداء الطيب[4]، أمَّا استدامته فقد اختُلف فيها، والصواب جواز استدامته[5]؛ فإنه يستحب للمحرم الطِّيبُ قبل الإحرام، ثم لا يضرُّه استدامته، كما في حديث عائشة -رضي الله عنها- في الصحيحين قالت: “كنت أطيِّب رسول الله -صلى الله عليه وسلم- لإحرامه قبل أن يحرم، ولحله قبل أن يطوف بالبيت”[6]، فإذا جاز للمحرم التطيب قبل الإحرام جاز له استدامته؛ وقد ثبت أنه -صلى الله عليه وسلم- كان يُرى وبيص الطيب في مَفارِقه وهو مُحْرِم[7]، ولعل أمر النبي -صلى الله عليه وسلم- لصاحب الجُبَّة أن يغسل عنه الخلوق لأنه وضعه بعد إحرامه[8]، فمن تطيَّب ناسيًا أو جاهلًا في ثوبه أو بدنه وجب عليه غسله، والمشهور عند الفقهاء قياس الطيب على حلق الشعر في وجوب الفدية[9].
أمَّا مسألة تطييب الحجر الأسود فأقول: إنه مستحبٌّ، وليس بسنَّة، وما جاء عن ابن عمر -رضي الله عنهما- أنه رؤي خارجًا من الكعبة، وقد تلطَّخ صدرُه من طيبها[10]، وما جاء عن سعيد بن جبير أنه قال: أصابني من خَلوق الكعبة فسألتُ ابن عباس: أغسله؟ قال: لا[11].فهذان الأثران يدلَّان على أن الكعبة تُطيَّب في عهد الصحابة، والأحرى بذلك منها الحجر الأسود، وتطييب الحجر يراعى فيه اعتباران:الأول: تقبيل الناس له قبل تطييبه؛ فإنَّ لذلك أثرًا في وجود شيء من الرائحة الكريهة في الحجر.
والاعتبار الآخر: تقبيل الناس بعد تطييبه من أجلهم، فكان تطييبُه بسببهم ولأجلهم، ولكن ينبغي أن يكون الطِّيب الموضوع على الحجر خفيفًا، سريع الجفاف، حتى لا يَعْلَق بِيَدِّ مَن يستلمه وهو مُحْرِم، فإن استلم الحجر وفيه طيب رطب علِق بيده منه شيء، فلا شيء عليه، أي: لا فدية عليه، والأولى غسله[12].ومن فروع هذه المسألة أنه لا يجوز للمحرم أن يستلم الحجر، وهو يعلم أن الطِّيب سيعلق به؛ فإن استلامه مستحبٌّ، ومباشرة الطيب محظور، وبناءً على ما تقدم فإنه يصح أن يقال: لا يصح تطييب الحجر الأسود بطيبٍ رطبٍ يعلق بكفِّ مَن يستلمه، أمَّا إذا كان الطِّيب يابسًا لا يعلق بالكفِّ فلا يضر استلامه ولا تقبيله[13]، والله أعلم.
“সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম সেই নবীর উপর, যার পরে আর কোনো নবী নেই।ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর একটি হলো শরীর ও কাপড়ে সুগন্ধি ব্যবহার করা। এর প্রমাণ নবী (ﷺ)–এর বাণী: যা মুত্তাফাকুন আলাইহি (বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে বর্ণিত): “তোমরা এমন কোনো পোশাক পরিধান করো না যাতে জাফরান বা ওয়ারস (এক প্রকার সুগন্ধি ঘাস) লেগে আছে।”(বুখারী (৫৮০৩; মুসলিম (১১৭৭) এবং জুব্বা পরিহিত সাহাবীর প্রতি তাঁর নির্দেশ: “তোমার জুব্বাটি খুলে ফেলো এবং তোমার শরীর থেকে সুগন্ধির (খালুক) চিহ্ন ধুয়ে ফেলো।”(এটিও শাইখাইন (বুখারি ও মুসলিম) বর্ণনা করেছেন।” (বুখারী হা/১৭৮৯; মুসলিম হা/ ১১৮০) আলেমগণ একমত যে, ইহরাম অবস্থায় নতুন করে সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। তবে ইহরামের আগে লাগানো সুগন্ধির গন্ধ বা প্রভাব (ইহরামের পর) অব্যাহত থাকা বিষয়ে মতভেদ আছে। সঠিক মত হলো এটি জায়েজ। কারণ, ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি ব্যবহার করা মুহরিম ব্যক্তির জন্য মুস্তাহাব, অতঃপর তা স্থায়ী থাকলে তার কোনো ক্ষতি হবে না। যেমন সহিহাইন-এ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:ইহরাম বাঁধার সময় আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর গায়ে সুগন্ধি মেখে দিতাম এবং বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পূর্বে ইহরাম খুলে ফেলার সময়ও সুগন্ধি মাখিয়ে দিতাম।”(বুখারী ২৬৭, মুসলিম ১১৮৯) সুতরাং যদি ইহরামের আগে সুগন্ধি মাখা জায়েজ হয়, তবে তা অবশিষ্ট থাকাও জায়েজ। আর এটিও প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও তাঁর সিথিতে সুগন্ধির উজ্জ্বল আভা দেখা যেত।”(বুখারী হা/২৭১; এবং মুসলিম হা/১১৯০) সম্ভবত জুব্বা পরিহিত ব্যক্তিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুগন্ধি ধুয়ে ফেলার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা এ কারণে ছিল যে তিনি সেটি ইহরাম বাঁধার পরে ব্যবহার করেছিলেন। (নববী আল-মাজমু’ শারহুল মুহাযযাব;৭/২২২)। অতএব, যে ব্যক্তি ভুলে বা না জেনে তার পোশাকে বা শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করবে, তার ওপর তা ধুয়ে ফেলা ওয়াজিব। আর ফকিহদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হলো, ফিদইয়া ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে সুগন্ধি ব্যবহার করাকে চুল কাটার ওপর কিয়াস (তুলনা) করা হয়।”(দেখুন: হাশিয়া ইবনে আবিদিন;২/ ৫৪৪), আল-মাজমু’ শারহুল মুহাযযাব (৭/২৬৯), এবং আল-মুগনি (৫/৩৮৯) হাজরে আসওয়াদে সুগন্ধি মাখানোর মাসআলা সম্পর্কে আমি বলব: এটি মুস্তাহাব, সুন্নাত নয়। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁকে কাবার ভেতর থেকে বের হতে দেখা গেছে এমতাবস্থায় যে তাঁর বুক কাবার সুগন্ধিতে মাখামাখি ছিল।”(ইবনে আবি শায়বা তাঁর ‘মুসান্নাফ’ হা/১৪০১৬) সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন: “কাবার সুগন্ধি (খালুক) আমার গায়ে লেগে গিয়েছিল, তখন আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম: আমি কি এটি ধুয়ে ফেলব? তিনি বললেন: না।”(আল-ফাকিহি তাঁর ‘আখবারু মক্কা’ (৭১৪)-এ সংকলন করেছেন) এই দুটি বর্ণনা প্রমাণ করে যে, সাহাবায়ে কেরামের যুগে কাবা ঘরে সুগন্ধি লাগানো হতো আর কাবার অংশগুলোর মধ্যে হাজরে আসওয়াদ এ পন্থার জন্য অধিক উপযোগী। হাজরে আসওয়াদে সুগন্ধি লাগানোর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনা করা হয়: প্রথমত: সুগন্ধি লাগানোর আগে মানুষের তা চুম্বন করা; কারণ এর ফলে হাজরে আসওয়াদে কিছুটা দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ার প্রভাব থাকে। দ্বিতীয়ত: সুগন্ধি লাগানোর পর মানুষের সুবিধার্থে তা চুম্বন করা; ফলে এটি মানুষের কারণেই এবং তাদের উদ্দেশেই সুগন্ধিময় করা হয়েছে। তবে হাজরে আসওয়াদে যে সুগন্ধি লাগানো হবে তা হালকা এবং দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন হওয়া উচিত, যেন তা ইহরামকারীর হাতে লেগে না যায়। যদি কেউ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে এবং তাতে থাকা কাঁচা (ভেজা) সুগন্ধি তার হাতে লেগে যায়, তবে তার ওপর কোনো গুনাহ বা ফিদইয়া নেই, তবে তা ধুয়ে ফেলা উত্তম।”(দেখুন: আল-মাওয়ার্দীর ‘আল-হাউয়ি’;৪/১১৩) এই মাসআলার শাখা হিসেবে বলা যায় যে, মুহরিম ব্যক্তির জন্য হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা জায়েজ নয় যদি সে জানে যে সুগন্ধি তার গায়ে লেগে যাবে; কারণ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা মুস্তাহাব আর সুগন্ধির সংস্পর্শে আসা নিষিদ্ধ। উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়: হাজরে আসওয়াদকে এমন কাঁচা বা তরল সুগন্ধি দ্বারা সুবাসিত করা সঠিক নয় যা স্পর্শকারীর হাতে লেগে যায়। তবে সুগন্ধি যদি শুকনো হয় যা হাতে লাগে না, তাহলে তা স্পর্শ করা বা চুম্বন করা ক্ষতিকর নয়।”(দেখুন: আল-মুগনি (৫/১৪২) আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।”(ইমাম আব্দুর রহমান বিন নাসের আল-বাররাক; সম্পাদিত: ২০ যিলকদ ১৪৪৬ হিজরি দেখুন; শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৩৩৩৫২)
.
কাতার ভিত্তিক বিখ্যাত ফতোয়াবোর্ড ইসলাম ওয়েব-এর আলেমদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: একজন ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় তওয়াফ করার সময় হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করেছেন। আমরা জানি যে হাজরে আসওয়াদে সুগন্ধি লাগানো থাকে। কেউ কেউ তাকে ফতোয়া দিয়েছেন যে, সুগন্ধি স্পর্শ করার কারণে তার তওয়াফ বাতিল হয়ে গেছে এবং তাকে পুনরায় তওয়াফ করতে হবে। এই বিষয়ে সঠিক বিধান কী?
জবাবে তারা বলেছেন;الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه، أما بعد: فقد اتفق العلماء على أن المحرم يحظر عليه مس الطيب، وذلك لما في الصحيحين من حديث ابن عمر أن النبي صلى الله عليه وسلم قال عن المحرم: “ولا يلبس ثوبا مسه ورس ولا زعفران” ولما في الصحيحين أيضا من حديث ابن عباس أن النبي صلى الله عليه وسلم قال في المحرم الذي وقصته ناقته فمات: “ولا تحنطوه”. ومن ارتكب هذا المحظور عالما عامدا لزمه الفدية، وهي على التخيير: ذبح شاة أو صيام ثلاثة أيام أو إطعام ستة مساكين، وأما القول بأنه يلزمه إعادة الطواف فلا يصح، بل لا قائل به من أهل العلم فيما نعلم. وأما من مس الطيب الموجود على الحجر الأسود أو غيره ناسيا إحرامه أو جاهلا أنه طيب فلا شيء عليه، لكن يلزمه إزالته عند تذكره وعلمه، فإن استدامه حينئذ لزمته الفدية، لأن استدامة المحظور كفعله ابتداء. وعلى كل حال فنقول للسائل الكريم: إنه لا تلزمه إعادة الطواف، ولو استعمل الطيب لأن استعمال الطيب يلزم منه دم فقط، والذي يظهر أن السائل علقت به رائحة الطيب من خلال لمسه للحجر الأسود، وهذا لا شيء فيه، وإنما عليه أن يزيل هذه الرائحة بغسل أو مسح ونحو ذلك.”সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল, তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাথীদের ওপর। এরপর:উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, ইহরামকারী ব্যক্তির জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত ইবনে উমর (রা.)-এর হাদীস, যেখানে নবী করীম ( ﷺ) ইহরামকারী সম্পর্কে বলেছেন:”সে এমন কোনো পোশাক পরবে না যাতে ওয়ারাস (এক ধরণের সুগন্ধি ঘাস) বা জাফরানের স্পর্শ লেগেছে।’ এছাড়া বুখারী ও মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় উটের পিঠ থেকে পড়ে মারা গেলে নবী (ﷺ) বলেছিলেন: ‘তোমরা তাকে সুগন্ধি দিও না।”যদি কেউ এই নিষিদ্ধ কাজটি (সুগন্ধি ব্যবহার) জেনে-বুঝে এবং স্বেচ্ছায় করে ফেলে, তবে তার ওপর ‘ফিদিয়া’ ওয়াজিব হবে। এই ফিদিয়ার ক্ষেত্রে তিনটি অপশন রয়েছে (যেকোনো একটি বেছে নেওয়া যায়):(১).একটি ছাগল যবেহ করা,(২).অথবা তিন দিন রোজা রাখা,(৩).অথবা ছয়জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।তবে কেউ যদি বলে যে, এর কারণে তাকে আবারও তওয়াফ করতে হবে, তবে সেই কথা সঠিক নয়। বরং আমাদের জানামতে কোনো আলেম এমন কথা বলেননি। আর যদি কেউ ইহরামের কথা ভুলে গিয়ে কিংবা সুগন্ধি হওয়ার বিষয়টি না জেনে হাজরে আসওয়াদ বা অন্য কোথাও থাকা সুগন্ধি স্পর্শ করে ফেলে, তবে তার কোনো গুনাহ বা ফিদিয়া হবে না। কিন্তু মনে পড়ার সাথে সাথে বা জানার সাথে সাথেই সেটি মুছে ফেলা বা ধুয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক। যদি জানার পরেও সে সুগন্ধি মাখা অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে, তবে তার ওপর ফিদিয়া ওয়াজিব হবে। কারণ, কোনো নিষিদ্ধ কাজ চালিয়ে যাওয়া বা বজায় রাখা তা নতুন করে শুরু করার মতোই।পরিশেষে প্রশ্নকারীকে আমরা বলছি: আপনার ওপর তওয়াফ পুনরায় করা আবশ্যক নয়, এমনকি আপনি সুগন্ধি ব্যবহার করলেও। কারণ সুগন্ধি ব্যবহারের ফলে কেবল ‘দম’ (ফিদিয়া) ওয়াজিব হয় (তওয়াফ বাতিল হয় না)। তবে দৃশ্যত যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার কারণে আপনার শরীরে সুগন্ধি লেগেছে। এতে আপনার কোনো দোষ নেই। আপনার দায়িত্ব হলো শুধু ধুয়ে ফেলে বা মুছে ফেলে এই সুগন্ধ দূর করা।”(দেখুন; ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১৩৪৩৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:ইহরামকারী যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কোন একটি নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় যাতে লিপ্ত হওয়ার হারাম; তখন এর হুকুম কি?
জবাবে শাইখ ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
إذا فعل شيئاً من محظورات الإحرام ناسياً أو جاهلاً فلا شيء عليه ، ولكن يجب عليه بمجرد ما يزول العذر أن يتخلى عن ذلك المحظور والواجب تذكير الناسي ، وتعليم الجاهل .مثال هذا : لو أن رجلاً نسي فلبس ثوباً وهو محرم فلا شيء عليه ، ولكن من حين ما يذكر يجب عليه أن يخلع هذا الثوب ، وكذلك لو نسي فأبقى سرواله عليه ، ثم تذكر بعد أن عقد النيّة ولبى ، فإنه يجب عليه أن يخلع سرواله فوراً ولا شيء عليه ، وكذلك لو كان جاهلاً فإنه لا شيء عليه مثل أن يلبس فنيلة ليس فيها خياطة ، ظناً منه أن المُحَرَّم لبس ما فيه خياطة فإنه لا شيء عليه ، ولكن إذا تبيّن له أن الفنيلة وإن لم يكن بها خياطة فإنها من اللباس الممنوع فإنه يجب عليه أن يخلعها .والقاعدة العامة في هذا أن جميع محظورات الإحرام إذا فعلها الإنسان ناسياً أو جاهلاً أو مكرها فلا شيء عليه لقوله تعالى : ( رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ) البقرة /286. فقال الله تعالى : قد فعلت . ولقوله تعالى : ( وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَحِيماً) الأحزاب /5. ولقوله تعالى في خصوص الصيد ، هو من محظورات الإحرام : ( وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّداً ) المائدة /95. ولا فرق في ذلك بين أن يكون محظور الإحرام من اللباس ، والطيب ونحوهما ، أو من قتل الصيد وحلق شعر الرأس ونحوهما ، وإن كان بعض العلماء فرّق بين هذا وهذا ، ولكن الصحيح عدم التفريق ، لأن هذا من المحظور الذي يعذر فيه الإنسان بالجهل والنسيان والإكراه .
“যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কোন একটি নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, তার ওজর দূর হওয়ার সাথে সাথে সে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত হওয়া কর্তব্য। ওয়াজিব হচ্ছে- ভুলকারীকে মনে করিয়ে দেয়া ও অজ্ঞ লোককে জ্ঞানদান করা।ঊদাহরণতঃ- কোন ইহরামকারী যদি ভুলবশতঃ জামা পরে ফেলে তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে জামাটি খুলে ফেলতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি ভুলবশতঃ পায়জামা পরে থাকে, নিয়ত বাঁধা ও তালবিয়া পড়ার পর স্মরণে আসে তাহলে সাথে সাথে পায়জামা খুলে ফেলতে হবে এবং তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। অনুরূপ বিধান অজ্ঞ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অজ্ঞের উপরেও কোন কিছু বর্তাবে না। ঊদাহরণতঃ গেঞ্জিতে সেলাই না থাকায় কেউ যদি এই মনে করে গেঞ্জি পরে যে, নিষিদ্ধ হচ্ছে- সেলাইযুক্ত পোশাক পরা; তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কিন্তু, যখনই সে জানতে পারবে যে, গেঞ্জির মধ্যে সেলাই না থাকলেও ইহরাম অবস্থায় গেঞ্জি পরা নিষিদ্ধ পোশাকের অন্তর্ভুক্ত তাহলে সাথে সাথে গেঞ্জি খুলে ফেলা কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হল: কোন মানুষ যদি ভুলবশতঃ কিংবা অজ্ঞতাবশতঃ কিংবা জবরদস্তির শিকার হয়ে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “হে আমাদের রব্ব! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি সেটাই করব। আরও দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[সূরা আহযাব, আয়াত: ৫] ‘শিকার-করা’ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন; যা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ: “তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছে করে সেটাকে হত্যা করলে…।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৯৫] এ ক্ষেত্রে ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয় পোশাক, সুগন্ধি ও এ জাতীয় অন্য কিছু হোক কিংবা শিকার করা, মাথার চুল মুণ্ডন করা ও এ জাতীয় অন্য কোন নিষিদ্ধ বিষয় হোক— হুকুমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যদিও কোন কোন আলেম এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তবে, বিশুদ্ধ মত হচ্ছে- পার্থক্য নেই। কারণ এটি এমন নিষিদ্ধ কর্ম; অজ্ঞতা, ভুল ও জবরদস্তির কারণে যে ক্ষেত্রে মানুষের ওজর গ্রহণযোগ্য।”(ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম (পৃষ্ঠা ৫৩৬-৫৩৭; গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৫২২)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এবং শাইখ সালেহ আল মুয়াজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:”কিছু মানুষ মনে করে সে যদি ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেলে তখন তার উপর একটা পশু যবাই অথবা তিনদিন রোযা রাখা কিংবা ছয়জন মিসকীনকে খাদ্য প্রদান আবশ্যক। তিনটির মাঝে যে কোনো একটি বাছাইয়ের সুযোগ তার আছে।
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:يحرم على المحرم بحج أو عمرة حلق الشعر ، وقلم الأظفار ، وتغطية الرأس بما يلاصقها ، ولبس المخيط للرجل ، والبرقع والقفازين للمرأة ، والطيب في البدن أو الثوب ، وقتل الصيد ، وعقد النكاح ، والجماع ومقدماته .فإذا وقع المحرم في شيء من هذه المحظورات ، فإنه لا يخلو من أحوال: الأولى : أن يفعله ناسيا ، أو جاهلا ، أو مكرها ، أو نائما ، فلا شيء عليه .الثانية : أن يفعله عمدا ، ولكن لعذر يبيح فعل المحظور ، فلا إثم عليه ، ويلزمه فدية ذلك المحظور ، ويأتي بيانها .الثالثة : أن يفعله عمدا بلا عذر ، فهو آثم ، وفديته على أقسام :القسم الأول : ما ليس فيه فدية ، وهو عقد النكاح .القسم الثاني : ما فديته بَدَنة ( بعير ) ، وهو الجماع في الحج قبل التحلل الأول .القسم الثالث : ما فديته صيام ثلاثة أيام ، إن شاء متوالية ، وإن شاء متفرقة ، أو ذبح شاة مما يجزئ في الأضحية ، أو ما يقوم مقامه من سُبع بدنة ، أو سُبع بقرة ، ويفرق اللحم على الفقراء ، ولا يأكل منه شيئا ، أو إطعام ستة مساكين ، لكل مسكين نصف صاع مما يطعم . فهو مخير بين هذه الأشياء الثلاثة في إزالة الشعر والظفر ، والطيب ، والمباشرة لشهوة [ يعني مباشرة المرأة من غير جماع ] ، ولبس القفازين ، وانتقاب المرأة ، ولبس الذكر المخيطَ ، وتغطية رأسه .القسم الرابع : ما فديته جزاؤه ، أو ما يقوم مقامه ، وهو قتل الصيد ؛ فإن كان للصيد مثل خير بين ثلاثة أشياء :1- إما ذبح المثل ، وتفريق لحمه على فقراء الحرم .2- أن ينظر كم يساوي المثل ، ويخرج ما يقابل قيمته طعاما يفرق على المساكين ، لكل مسكين نصف صاع .3- أن يصوم عن إطعام كل مسكين يوما .أما إذا لم يكن للصيد مثل ، فإنه يخير بين شيئين :1- أن ينظر كم يساوي الصيد المقتول ، ويخرج ما يقابلها طعاما ، يفرقه على المساكين ، لكل مسكين نصف صاع .2- أن يصوم عن إطعام كل مسكين يوما )
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:হজ্জ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় মাথা মুণ্ডানো, নখ কাটা, মাথার সাথে লেগে থাকে এমন কিছু দিয়ে মাথা ঢাকা, পুরুষের জন্য সেলাই করা কাপড় পরা, মহিলাদের জন্য নিকাব ও হাত-মোজা পরা, শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো, শিকারী পশু হত্যা করা, বিবাহের চুক্তি করা, সহবাস বা তার অগ্রবর্তী কাজগুলো করা হারাম।ইহরামকারী ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ কাজগুলোর কোনটায় লিপ্ত হয় তাহলে তার অবস্থা নিম্নের কোনো একটি: প্রথমত: সে ভুলে বা অজ্ঞতাবশতঃ বা বাধ্য হয়ে কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায় তাতে লিপ্ত হলো; এতে করে তার উপর কোন কিছু আবশ্যক হবে না। দ্বিতীয়ত: সে ইচ্ছাকৃত এতে লিপ্ত হলো; তবে এমন কোন ওজর থাকার কারণে যেটা নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয়। এক্ষেত্রে তার কোনো পাপ হবে না। তবে তাকে নিষিদ্ধ কাজের ফিদিয়া দিতে হবে। ফিদিয়ার বিবরণ আসবে।তৃতীয়ত: সে কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃত তাতে লিপ্ত হলো। তাহলে সে পাপী হবে। এর ফিদিয়া কয়েক প্রকার: প্রথম প্রকার: যাতে কোনো ফিদিয়া নেই। যেমন: বিবাহের চুক্তি করা।দ্বিতীয় প্রকার: যে নিষিদ্ধ কাজের ফিদিয়া হলো উট। হজ্জের মধ্যে প্রথম হালাল হওয়ার আগে সহবাস করা। তৃতীয় প্রকার: যে নিষিদ্ধ কাজের ফিদিয়া হলো তিনদিন রোযা রাখা। তিনি চাইলে টানা তিনদিন রাখবেন, আর চাইলে আলাদা আলাদাভাবে রাখবেন।অথবা কুরবানী করার উপযুক্ত একটি ভেড়া (বা ছাগল) জবাই করা কিংবা ভেড়ার স্থলাভিষিক্ত তথা উট বা গরুর এক-সপ্তমাংশ। যবাইকৃত পশুর গোশত দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করে দিবে। এর থেকে নিজে কিছু খাবে না।অথবা ছয়জন মিসকীনকে খাদ্য প্রদান। প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা পরিমাণ খাদ্য দিবে। এই তিনটির যে কোনো একটি করার এখতিয়ার তার থাকবে—যদি সে চুল উপড়ে ফেলে, নখ কাটে, সুগন্ধি লাগায়, যৌন উত্তেজনাসহ শৃঙ্গার করে (অর্থাৎ সহবাস ছাড়া স্ত্রীর সাথে অন্য যৌনাচার), হাত-মোজা পরে, মহিলা নিকাব পরে, পুরুষ সেলাই করা কাপড় পরে কিংবা মাথা ঢাকে। চতুর্থ প্রকার: যে নিষিদ্ধ কাজের ফিদিয়া হলো নিষিদ্ধ জিনিসটির সমকক্ষ বা সমমূল্য কিছু দেওয়া। এই নিষিদ্ধ কাজটি হলো পশু শিকার করা। যদি শিকারকৃত পশুর অনুরূপ পশু থাকে তাহলে তিনটি বিষয়ের মাঝে এখতিয়ার দেওয়া হবে: (১)- অনুরূপ পশু যবাই করে হারামের দরিদ্রদের মাঝে গোশত বিতরণ করা। (২)- অনুরূপের পশুর মূল্য কত সেটি নির্ধারণ করে সমান মূল্যের খাদ্য মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করা। প্রত্যেক মিসকীনের জন্য অর্ধ সা করে। (৩)- প্রত্যেক মিসকীনকে খাদ্য দেওয়ার পরিবর্তে একদিন করে রোযা রাখা। আর যদি শিকারকৃত পশুর অনুরূপ পশু না থাকে তাহলে দুটি বিষয়ের মাঝে এখতিয়ার দেওয়া হবে: (১)- নিহত পশুর মূল্য নির্ধারণ করে মূল্যের সমান খাদ্য মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করে দেয়া। প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা করে দেয়া। (২)- প্রত্যেক মিসকীনকে খাওয়ানোর পরিবর্তে একদিন করে রোযা রাখা।'(ফাতাওয়াশ শাইখ ইবনে উসাইমীন (২২/২০৫-২০৬ গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪৯০২৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।

Translate