প্রশ্ন: গাছে ফল বা শস্য আসার পর কিন্তু পাকার আগে বা ফসল কাটার উপযুক্ত হওয়ার আগে যে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি হয়, ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী তার বৈধতা কতটুকু? কিভাবে এই ধরনের ক্রয় বিক্রয় বৈধ হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর গাছের ফল, শস্য বিক্রির ক্ষেত্রে শরিয়তের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন ফল অর্থাৎ গাছে ফল আসার আগেই অগ্রিম বিক্রি করা বৈধ নয়। এমনকি ফল আসার পরেও যতক্ষণ না তা পরিপক্ব হয় বা খাওয়ার উপযোগী (লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করা) হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা কেনাবেচা করা উম্মাহ’র ইজমা বা সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ। অনেকে মনে করেন, ফল নষ্ট হলে গাছের দাম কমিয়ে সমন্বয় করা যাবে—এমন শর্তেও এই লেনদেন শুদ্ধ হবে না। কারণ মূল চুক্তিতেই যেখানে ‘গারার’ বা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান, সেখানে পরবর্তী কোনো অজুহাতে তা বৈধ হতে পারে না বরং এই ধরনের চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।
.
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন;عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ نَهَى عَنْ بَيْعِ الثَّمَرَةِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا، وَعَنِ النَّخْلِ حَتَّى يَزْهُوَ. قِيلَ وَمَا يَزْهُو قَالَ يَحْمَارُّ أَوْ يَصْفَارُّ. “নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন এবং খেজুরের রং ধরার আগে (বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন)। জিজ্ঞেস করা হল, রং ধরার অর্থ কী? তিনি বলেন, লাল বর্ণ বা হলুদ বর্ণ ধারণ করা।”(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২১৯৭) অপর বর্ননায় আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ بَيْعِ الثِّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا، نَهَى الْبَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ.”আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফল
পরিপক্ক হওয়ার (ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার) আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন।”(সহিহ বুখারী হা/২১৯৪; সহীহ মুসলিম, হা/১৫৩৪)
.
ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ প্রকাশের আগে তা বিক্রি করা জায়েজ নয়—আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে এ ধরনের বিক্রি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, ফলের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হওয়ার আগেই তা নষ্ট হয়ে যাওয়া বা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে; কারণ অনেক সময় ফল তাদের অবস্থা প্রকাশের আগেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:أَرَأَيْتَ إِذَا مَنَعَ اللَّهُ الثَّمَرَةَ، بِمَ يَأْخُذُ أَحَدُكُمْ مَالَ أَخِيهِ ”. “দেখ, যদি আল্লাহ্ তা‘আলা ফল ধরা বন্ধ করে দেন, তবে তোমাদের কেউ (বিক্রেতা) কিসের বদলে তার ভাইয়ের মাল (ফলের মূল্য) নিবে?”(সহীহ বুখারী (২১৯৮) ও সহীহ মুসলিম (১৫৫৫) মোটকথা ফল যখন প্রথম দৃশ্যমান হয় এবং তাতে পাকার লক্ষণ ফুটে ওঠে, তখনই তার গুণাগুণ বা অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।তবে এর অর্থ এই নয় যে, ফলটিকে পুরোপুরি পাকতে হবে। এ কারণেই হাদিসে বলা হয়েছে—’যতক্ষণ না তার অবস্থা স্পষ্ট হয়’; এটি বলা হয়নি যে—’যতক্ষণ না তা পুরোপুরি খাওয়ার উপযোগী হয়’।যেমন ইমাম মুসলিম জাবির ইব্নু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ননা করেছেন।নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফল ব্যবহারযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।এবং অন্য বর্ণনা অনুসারে, যতক্ষণ না তা পাকা হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/১৫৫৩)
.
কাশ্শাফুল ক্বিনাআ গ্রন্থে বলা হয়েছে:ولا) يصح بيع (الزرع قبل اشتداد حبه) ، لحديث ابن عمر أن النبي – صلى الله عليه وسلم – نهى عن بيع السنبل حتى يبيض ويأمن العاهة رواه مسلم.وعن أنس مرفوعا أنه نهى عن بيع الحب حتى يشتد رواه أحمد والحاكم وقال : على شرط مسلم .(إلا) إذا باع الثمرة قبل بدو صلاحها ، والزرع قبل اشتداد حبه ، (بشرط القطع في الحال) ؛ فيصح، قال في المغني: بالإجماع؛ لأن المنع إنما كان خوفا من تلف الثمرة وحدوث العاهة عليها، بدليل ما روى أنس أن النبي – صلى الله عليه وسلم – نهى عن بيع الثمار حتى تزهي. قال : أرأيت إذا منع الله الثمرة بم بما يأخذ أحدكم مال أخيه؟ رواه البخاري.(إن كان) ما ذكر (منتفعا به حينئذ) أي حين القطع ، فإن لم ينتفع بها كثمرة الجوز وزرع الترمس : لم يصح لعدم النفع بالمبيع “
(শস্যের দানা শক্ত হওয়ার আগে) তা বিক্রি করা সহীহ (বৈধ) নয়। এর দলিল হলো ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত হাদিস—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শস্যের শীষ (ধান/গমের ছড়া) সাদা হওয়া এবং তা আপদ-বিপদ থেকে নিরাপদ হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন (সহীহ মুসলিম)। আর আনাস (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণিত—তিনি (ﷺ) শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।”হাদিসটি ইমাম আহমাদ ও ইমাম হাকিম বর্ণনা করেছেন, এবং ইমাম হাকিম বলেছেন: এটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। (তবে ব্যতিক্রম হলো:) যদি ফল পরিপক্কতার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে কিংবা শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে (তা তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্তে) বিক্রি করা হয়; তবে তা সহীহ হবে। ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: এ বিষয়ে ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং তাতে দুর্যোগ বা রোগ-বালাইয়ের আশঙ্কা। এর প্রমাণ হলো আনাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস, যেখানে নবী (ﷺ) ফল ‘যাহি’ (বর্ণযুক্ত বা পরিপক্ক) হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।এরপর তিনি বলেছেন: “বলো তো, যদি আল্লাহ ফল উৎপাদনে বাধা দেন (নষ্ট করে দেন), তবে তোমাদের কেউ কোন জিনিসের বিনিময়ে তার ভাইয়ের সম্পদ গ্রহণ করবে?”হাদিসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। শর্ত হলো বিক্রিত বস্তুটি কেটে নেওয়ার সময় উপকারযোগ্য হতে হবে। যদি তা উপকারযোগ্য না হয় যেমন: কাঁচা আখরোটের ফল, কিংবা তরমুজজাতীয় শস্য তাহলে সে বিক্রয় শুদ্ধ হবে না কারণ বিক্রিত বস্তুতে তখন কোনো বৈধ উপকার নেই।”(কাশ্শাফুল ক্বিনাআ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৮১)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:”মানদণ্ড হলো কখন এটি (ফল) ভক্ষণযোগ্য ও সুস্বাদু হয়;কারণ,এই পর্যায়ে পৌঁছালেই মূলত তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব। এর আগে (কাঁচা অবস্থায়) এটি গ্রহণ করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। এছাড়া, ফল যখন পাকার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সাধারণত এটি নষ্ট হওয়া বা রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেও নিরাপদ হয়ে যায়।”(আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৩)
.
আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:
: “جمهور الفقهاء – بوجه عام – على أن بيع الثمر قبل بدو صلاحه، غير جائز ولا صحيح.
قال ابن المنذر: أجمع أهل العلم على القول بجملة هذا الحديث.
ومع ذلك فقد فصلوا فيه القول، تبعا لتقييد العقد بشرط وإطلاقه، ولا يخلو بيع الثمرة من هذه الأحوال:
الأولى: أن يبيعها قبل الظهور والبروز، أي قبل انفراك الزهر عنها وانعقادها ثمرة، فهذا البيع لا يصح اتفاقا.
الثانية: أن يبيعها بعد الظهور، قبل بدو الصلاح، بشرط الترك والتبقية على الشجر حتى تنضج، فلا يصح هذا البيع إجماعا ….
وعلله ابن قدامة: بالنهي عنه في الحديث المذكور، والنهي يقتضي الفساد.
قالوا: ومثل بيع الثمرة قبل بدو الصلاح بشرط الترك، بيع الزرع قبل أن يشتد.
الثالثة: أن يبيعها بعد الظهور، قبل بدو الصلاح بشرط القطع في الحال، فهذا البيع صحيح بالإجماع، ولا خلاف في جوازه…
غير أن الفقهاء قيدوا هذا الحكم، وهو جواز بيع الثمرة قبل بدو صلاحها بشرط القطع في الحال، بقيود بعضها متفق عليه، وبعضها انفرد به فريق من الفقهاء، نشير إليها فيما يلي: الشرط الأول: أن يكون الثمر منتفعا به…
وقد أجاز الفقهاء أيضا، إضافة إلى هذه الصورة الجائزة، وهي بيع ما لم يبدُ صلاحه بشرط القطع في الحال، هذه الصور:
(1) أن يبيع الثمرة التي لم يبد صلاحها مع الشجر، أو الزرع الأخضر مع الأرض، ولا يختلف فيها الفقهاء؛ لأن الثمر فيها والزرع تابعان للشجر والأرض، اللذين لا تعرض لهما عاهة، كما يقول الشافعية.
(2) أن يبيع الثمرة لمالك الأصل، وهو الشجر، أو يبيع الزرع لمالك الأرض، لأنه إذا بيع مع أصل، دخل تبعا في البيع، فلم يضرّ احتمال الغرر فيه، كما احتُملت الجهالة في بيع اللبن في الضرع مع الشاة.
نص على هذه الصورة الحنابلة، كما نص على الأولى الجميع. وزاد المالكية الصورة التالية:
(3) أن يبيع الأصل، وهو الشجر أو الأرض، ثم بعد ذلك بفترة ما، قربت أو بعدت، وقبل خروجهما من يد المشتري، يلحق الثمر أو الزرع بالأصل المبيع قبله”
“জমহুর ফকীহদের সাধারণ মত হলো: ফল পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে তা বিক্রি করা জায়েযও নয়,সহীহও নয়।ইবনু মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:’আহলুল ইলমগণ এই হাদিসের সামগ্রিক বক্তব্যের ওপর ঐক্যমত (ইজমা) পোষণ করেছেন। তবে ফকীহগণ এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন চুক্তি শর্তযুক্ত নাকি শর্তবিহীন, তার ওপর ভিত্তি করে। ফল বিক্রির অবস্থা সাধারণত এই কয়েক ভাগে বিভক্ত:
প্রথম অবস্থা: ফল দৃশ্যমান বা প্রকাশ পাওয়ার আগেই বিক্রি করা। অর্থাৎ ফুল ঝরে গিয়ে ফল গঠন হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা। এ ধরনের বিক্রয় সর্বসম্মতভাবে (ইত্তেফাকান) সহীহ নয়।
দ্বিতীয় অবস্থা: ফল দৃশ্যমান হওয়ার পর কিন্তু পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে এই শর্তে বিক্রি করা যে, তা গাছেই রেখে দেওয়া হবে (যতক্ষণ না পাকে)। ইজমা অনুযায়ী এই বিক্রি সহীহ নয়।ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) এর কারণ হিসেবে বলেন: হাদিসে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, আর নিষেধাজ্ঞা (চুক্তি) ফাসিদ হওয়াকেই সাব্যস্ত করে। ফকীহগণ বলেন: পাকার লক্ষণ প্রকাশের আগে ফল রেখে দেওয়ার শর্তে বিক্রি করা যেমন, শস্য দানা শক্ত হওয়ার আগে তা (রেখে দেওয়ার শর্তে) বিক্রি করাও ঠিক তেমন (অর্থাৎ অবৈধ)।
তৃতীয় অবস্থা: ফল দৃশ্যমান হওয়ার পর কিন্তু পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে এই শর্তে বিক্রি করা যে, তা তৎক্ষণাৎ কেটে নেওয়া হবে। এই বিক্রি ইজমা অনুযায়ী সহীহ ও জায়েজ এবং এর বৈধতায় কোনো মতভেদ নেই। তবে ফকীহগণ ‘তৎক্ষণাৎ কেটে নেওয়ার শর্তে’ পাকার আগে ফল বিক্রির এই বৈধতাকে কিছু শর্ত দ্বারা সীমাবদ্ধ করেছেন। এর কিছু শর্ত সর্বসম্মত, আর কিছু শর্ত নির্দিষ্ট কিছু ফকীহগণের নিজস্ব মত। সংক্ষেপে সেগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হলো:
প্রথম শর্ত: ফলটি এমন হতে হবে যা থেকে (বর্তমানেই) উপকার গ্রহণ করা যায়।(অর্থাৎ খাওয়া বা অন্যভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে)। পরিণত হওয়ার আগে তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্তে বিক্রয় করার এই বৈধ সুরতটির পাশাপাশি ফকিহগন আরও কিছু সুরত বা পদ্ধতিকে জায়েয বলেছেন:
(১).পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি এমন ফলকে গাছসহ বিক্রি করা, অথবা সবুজ শস্যকে জমিসহ বিক্রি করা। এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ এখানে ফল বা শস্য মূলত গাছ বা জমির অনুসারী (তাবে‘); আর শাফেয়ি ফকীহদের মতে গাছ ও জমির ক্ষেত্রে সাধারণত এমন কোনো আপদ বা ঝুঁকি (عاهة) থাকে না (যা ফল বা শস্যের ক্ষেত্রে থাকে)।
(২).ফলকে গাছের মালিকের কাছেই বিক্রি করা, অথবা শস্যকে জমির মালিকের কাছেই বিক্রি করা। কারণ এটি যখন তার মূলের (গাছ বা জমির) সাথে বিক্রি হয়, তখন তা অনুগামী হিসেবে বিক্রির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে এতে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা (গারার) কোনো ক্ষতি করে না; যেমনটি বকরির সাথে তার ওলানে থাকা দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে দুধের পরিমাণ অজানা থাকা সত্ত্বেও তা জায়েয ধরা হয়। হাম্বলি ফকীহগণ এই সুরতটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, আর প্রথম সুরতটি (গাছসহ বিক্রি) সবাই উল্লেখ করেছেন। মালিকি ফকীহগণ এর সাথে নিচের সুরতটি যুক্ত করেছেন:
(৩). মূল বস্তু অর্থাৎ গাছ বা জমি বিক্রি করা, তারপর কিছু সময় পর (সময় কাছাকাছি হোক বা দীর্ঘ সময় পর), কিন্তু যতক্ষণ না তা ক্রেতার দখল থেকে বের হয়ে যায়, ততক্ষণে সেই গাছ বা জমিতে ফল বা শস্য উৎপন্ন হলে সে ফল বা শস্য পূর্বে বিক্রীত মূল বস্তুর অনুগামী হিসেবে গণ্য হবে।(অর্থাৎ মূলের সঙ্গেই যুক্ত হবে)।”(আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৮৯)
.
দ্বিতীয় শর্ত: কোনো ফল বিক্রির ক্ষেত্রে বাগানের প্রতিটি ফলে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। বরং কোনো একটি গাছের কিছু ফলে পাকার লক্ষণ (বা খাওয়ার উপযোগী হওয়া) দেখা দিলেই ওই গাছের সব ফল বিক্রি করা বৈধ; এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐক্যমত্য (ইজমা) রয়েছে। আর পুরো বাগানটি যদি একই সীমানায় হয়, তবে বাগানের প্রতিটি গাছে পাকার লক্ষণ আসা জরুরি নয়। বরং এ ক্ষেত্রে ফলের ‘জাত’ বা প্রজাতিকে (Species) ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট জাতের অন্তত একটি গাছেও যদি পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ওই জাতের সব গাছের ফল বিক্রি করা বৈধ হবে।উদাহরণস্বরূপ: একটি বাগানে যদি ‘বরহি’ এবং ‘সুক্কারি’—এই দুই জাতের খেজুর গাছ থাকে, তবে শুধু বরহি খেজুর পাকার লক্ষণ দেখা দেওয়া সুক্কারি খেজুর বিক্রির জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিটি জাতের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে অন্তত একটি গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া আবশ্যক।(বিস্তারিত দেখুন: ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৫০)।”
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
إذا بدا صلاح بعض الشجرة ، كان صلاحًا لباقيها ، باتفاق العلماء ، ويكون صلاحها صلاحًا لسائر ما في البستان من ذلك النوع ، في أظهر قولي العلماء ، وقول جمهورهم ، بل يكون صلاحًا لجميع ثمرة البستان التي جرت العادة بأن يباع جملة، في أحد قولي العلماء
“যখন কোনো গাছের কিছু ফলের পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন তা গাছের বাকি অংশের জন্যও পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। আর সেই গাছের পাকার লক্ষণ একই ধরনের গাছসমূহের জন্যও পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে এটি আলেমদের দুই মতের মধ্যে অধিক স্পষ্ট মত, এবং জমহুর আলেমদের মত। বরং এমনও বলা হয়েছে যে সব ফল সাধারণত একত্রে বিক্রি করার রীতি আছে, সেই ক্ষেত্রে একটি মত অনুযায়ী, বাগানের সব ফলের জন্যই তা পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯;পৃষ্ঠা: ৪৮৯)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি
গন্থে বলেন:
قوله: ( وصلاح بعض الشجرة صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان) مثال ذلك: البستان فيه أنواع من التمر كالسكري والبرحي وأم حمام ، بدا الصلاح في واحدة من البرحي ، يقول المؤلف: إن بدو الصلاح في هذه الشجرة صلاح لها ، ولسائر النوع ، الذي هو البرحي .
أما السكري وأم الحمام : فلا يكون صلاح البرحية صلاحاً لهما؛ لأن النوع مختلف.
وظاهر كلام المؤلف أنه سواء بِيع النوع جميعاً ، أو بيع تفريداً ، بأن بعنا التي بدا صلاحها ، وانتقل ملكها إلى المشتري ، ثم بعنا البقية من نوعها على آخرين ، فالكل صحيح ، حيث ذكر المؤلف أن صلاح بعض الثمرة صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان .
وهذا أحد القولين في مذهب الإمام أحمد: أنه إذا بدا صلاح في شجرة ، فهو صلاح لها ولسائر النوع الذي في البستان.
أما المذهب : فإنه إذا بِيعَ النوع جميعاً ، فصلاح بعض الشجرة ، صلاح للنوع ؛ لأنه لما بيع جميعاً ، صار كأنه نخلة واحدة ، وصلاح بعض النخلة صلاح لجميعها ، فالعقد يقع عليها جميعاً .
أما إذا أفرد : فإنك إذا بعت ما بدا صلاحه ، ثم جددت عقداً لِمَا لم يبدُ صلاحه ، صدق عليك أنك بعت ثمرة قبل بدو صلاحها ، وقد نهى النبي صلّى الله عليه وسلّم عن بيع الثمرة حتى يبدو صلاحها .والمذهب أصح مما هو ظاهر كلام المؤلف .
وقال بعض العلماء : إن صلاح بعض الشجرة : صلاح لها ، ولنوعها ، ولجنسها ؛ فمثلاً : إذا كان عند إنسان بستان فيه عشرة أنواع من النخل ، وبدا الصلاح في نوع منها : جاز بيع الجميع صفقة واحدة ، الذي من نوعه ، والذي ليس من نوعه .
لكن المذهب لا يعتبرون ذلك ، يعتبرون النوع ، والمذهب أحوط ، وإن كان هذا القول قوياً جداً…”
লেখকের বক্তব্য: “(কোনো গাছের) ফলের কিছু অংশে পাকার লক্ষণ (সালাহ) প্রকাশ পাওয়া, সেই গাছ এবং বাগানে বিদ্যমান ওই একই জাতীয় সকল ফলের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।)
এর উদাহরণ হলো: একটি বাগানে বিভিন্ন জাতের খেজুর আছে, যেমন— সুক্কারী, বারহী এবং উম্মু হাম্মাম। এখন বারহী জাতের একটি গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দিল। লেখকের (যাদুল মুস্তাকনি প্রণেতার) বক্তব্য অনুযায়ী: এই গাছের পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মানে তা ওই নির্দিষ্ট গাছের জন্য এবং বাগানে থাকা বারহী জাতীয় সকল গাছের জন্যই পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু সুক্কারি ও উম্মু হাম্মাম জাতের ক্ষেত্রে বরহি গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া তাদের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না কারণ এগুলোর জাত ভিন্ন। লেখকের বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ হলো, একই জাতের সব গাছ একসঙ্গে বিক্রি করা হোক, কিংবা আলাদাভাবে (খুচরা) বিক্রি করা হোক দুই অবস্থাতেই বিক্রয় সহীহ। যেমন: প্রথমে যে গাছে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে সেটি বিক্রি করা হলো এবং তার মালিকানা ক্রেতার কাছে চলে গেল। এরপর একই জাতের বাকি গাছগুলো অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হলো লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, সবগুলো বিক্রয়ই শুদ্ধ হবে।কারণ লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ফলের কিছু অংশে পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মানে তা ওই গাছ এবং বাগানে থাকা ওই জাতীয় সকল ফলের জন্যই পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। আর এটি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবের দুটি মতের একটি: “যদি একটি গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা সেই গাছের জন্য এবং বাগানে থাকা ওই একই জাতীয় সকল গাছের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।” তবে মাযহাবের (হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য) মত হলো: যদি ওই জাতীয় সকল ফল একত্রে (এক চুক্তিতে) বিক্রি করা হয়, তবে একটি গাছের পাকার লক্ষণ পুরো জাতের জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ যখন সব একত্রে বিক্রি করা হয়, তখন তা একটি মাত্র খেজুর গাছের ন্যায় হয়ে যায়; আর একটি গাছের কিছু অংশ পাকা মানেই পুরো গাছের জন্য তা পাকার লক্ষণ— ফলে পুরো চুক্তিতেই তা কার্যকর হয়। কিন্তু যদি আলাদা আলাদাভাবে (খুচরা) বিক্রি করা হয় (তবে ভিন্ন কথা)। কারণ আপনি যদি প্রথমে সেই ফল বিক্রি করেন, যেটির পাকার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, এরপর নতুন করে চুক্তি করে সেই ফল বিক্রি করেন, যার পাকার লক্ষণ এখনো প্রকাশ পায়নি তাহলে বাস্তবে আপনি এমন ফল বিক্রি করছেন, যার পাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি।অথচ নবী ﷺ) ফল পাকার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। তাই মাযহাবের এই মতটিই লেখকের বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থের তুলনায় অধিক সহীহ ও শক্তিশালী।
কোনো কোনো আলেম বলেন: একটি গাছের কিছু ফলে পাকার লক্ষণ দেখা দেওয়া মানে তা ওই গাছের জন্য, ওই জাতের (Variety) জন্য এবং ওই লিঙ্গের (Genus/পুরো খেজুর শ্রেণির) জন্য পাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ: যদি কোনো ব্যক্তির বাগানে দশ পদের খেজুর গাছ থাকে এবং তার মধ্যে মাত্র এক জাতের গাছে পাকার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে সব কটি গাছ এক চুক্তিতে বিক্রি করা জায়েয হবে— চাই তা একই জাতের হোক বা ভিন্ন জাতের।কিন্তু (হাম্বলী) মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত এ বিষয়টি গ্রহণ করে না।তারা কেবল জাত পর্যন্তই বিবেচনা করেন।আর মাযহাবের এই মতটিই অধিক সতর্কতামূলক যদিও ওই মতটি (সকল লিঙ্গের জন্য প্রযোজ্য হওয়া) অত্যন্ত শক্তিশালী।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি‘,আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪০)
.
দ্বিতীয়ত: বৃক্ষের ফল পরিপক্ক হওয়ার (পাকা শুরু হওয়ার) আগেই তা বিক্রয় করার বৈধ সূরতসমূহ কি?
.
ওলামায়ে কেরাম এমন কিছু বিশেষ ক্ষেত্র বা সূরত (Exceptions) বাদ দিয়েছেন যেগুলোতে ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা জায়েজ। সেগুলো হলো:
.
(১).গাছের সাথে ফল বিক্রি করা: গাছের সাথে ফল বিক্রি করা অথবা জমির সাথে সবুজ শস্য বিক্রি করা বৈধ—ফল পাকা শুরু হোক বা না হোক। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ এখানে ফলের বিক্রয়টি স্বতন্ত্রভাবে নয়; বরং গাছের অনুগামী (تابع) হিসেবে গণ্য হয়।আলেমগণের নিকট স্বীকৃত একটি মূলনীতি হলো:أنه يغتفر في التابع ما لا يغتفر في الشيء المستقل”যা কোনো স্বতন্ত্র (প্রধান) বিষয়ের ক্ষেত্রে মার্জনীয় নয়, তা কোনো বিষয়ের অনুগামী বা অংশবিশেষের ক্ষেত্রে মার্জনীয়।” এই নীতিটির মূল কথা হলো—একটি কাজ যখন নিজে নিজে আলাদাভাবে করা হয়, তখন তার ওপর যে কঠোর নিয়ম বা শর্ত প্রযোজ্য হয়; সেই একই কাজ যখন অন্য কোনো বড় কাজের অংশ বা অনুগামী হিসেবে আসে, তখন নিয়মগুলো কিছুটা শিথিল হতে পারে।উদাহরণস্বরূপ: পশুর পেটে থাকা বাচ্চা আলাদাভাবে কেনাবেচা করা জায়েজ নেই (কারণ এটি অনির্দিষ্ট বা অজ্ঞাত)। কিন্তু আপনি যদি একটি গর্ভবতী গরু কেনেন, তবে পেটের বাচ্চাটি গরুর অনুসারী বা অংশ (تابع) হিসেবে কেনাবেচার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং তা বৈধ হবে।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:أن يبيعها مع الأصل ، فيجوز بالإجماع ؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم : ( من ابتاع نخلا بعد أن تؤبر ، فثمرتها للذي باعها ، إلا أن يشترط المبتاع ) ، ولأنه إذا باعها مع الأصل حصلت تبعا في البيع ، فلم يضر احتمال الغرر فيها “ফলের মূলের (গাছের) সাথে ফল বিক্রি করা সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা অনুযায়ী) জায়েজ। কারণ নবী করীম (ﷺ) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো খেজুর গাছ ক্রয় করল যা পরাগায়ন করা হয়েছে, তবে তার ফল বিক্রেতার প্রাপ্য হবে, যদি না ক্রেতা তা শর্ত হিসেবে (নিজের জন্য) গ্রহণ করে।’ তাছাড়া, যখন মূল গাছের সাথে ফল বিক্রি করা হয়, তখন তা বিক্রিতে অনুগামী হিসেবে গণ্য হয়, তাই এতে অনিশ্চয়তার (Gharar) আশঙ্কা কোনো ক্ষতি করে না।”(ইবনু কুদামাহ আল-মুগনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৫০)
’আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’-তে বলা হয়েছে:واستثنى الفقهاء من عدم جواز بيع الثمر قبل بدو صلاحه : ما إذا بيع الثمر مع الأصل ، وذلك بأن يبيع الثمرة مع الشجر ؛ لأنه إذا بيع مع الأصل ، دخل تبعا في البيع ، فلم يضر احتمال الغرر فيه “ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান থেকে ফকিহগণ গাছসহ ফল বিক্রিকে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ যখন গাছের সাথে ফল বিক্রি হয়, তখন তা মূলের অনুগামী হিসেবে বিক্রয়ভুক্ত হয়, ফলে অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা কোনো ক্ষতি করে না।”(আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ১৫)
.
(২).অবিলম্বে কেটে ফেলার শর্তে ফল বিক্রি করা: ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই তা বিক্রি করা জায়েজ, যদি ক্রেতা তা তৎক্ষণাৎ বা অবিলম্বে কেটে নেওয়ার শর্তে ক্রয় করে এবং পাকার জন্য অপেক্ষা না করে। ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে এই ক্রয়-বিক্রয় সঠিক। আলেমগণ এর কারণ হিসেবে বলেছেন যে, পরিপক্ক হওয়ার আগে ফল বিক্রি নিষিদ্ধ করার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বা ফল সংগ্রহের আগে তাতে কোনো রোগ বা আপদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। কিন্তু যা সাথে সাথে কেটে ফেলা হয়, সে ক্ষেত্রে এই ভয় থাকে না।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:أن يبيعها بشرط القطع في الحال ، فيصح بالإجماع ؛ لأن المنع إنما كان خوفًا من تلف الثمرة ، وحدوث العاهة عليها قبل أخذها ؛ بدليل ما روى أنس : ( أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن بيع الثمار حتى تزهو . قال : أرأيت إذا منع الله الثمرة ، بم يأخذ أحدكم مال أخيه ؟ ) رواه البخاري . وهذا مأمون فيما يُقطع ، فصح بيعه ، كما لو بدا صلاحه”আর যদি ফল (পরিপক্ক হওয়ার আগে) এই শর্তে বিক্রি করা হয় যে, তা তৎক্ষণাৎ কেটে (সংগ্রহ করে) ফেলা হবে, তবে সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা অনুযায়ী) তা বৈধ। কারণ, [পরিপক্ক হওয়ার আগে ফল বিক্রিতে] নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ফল নষ্ট হয়ে যাওয়া বা সংগ্রহের পূর্বে তাতে কোনো দুর্যোগ/মড়ক (আফাত) আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। এর প্রমাণ আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীস:’নবী (ﷺ) ফল লাল বা হলুদ (পরিপক্ক) হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহ যদি ফল উৎপাদনে বাধা দেন (অর্থাৎ ফল নষ্ট করে দেন), তবে তোমাদের কেউ কোন জিনিসের বিনিময়ে তার ভাইয়ের সম্পদ ভোগ করবে?’ (সহীহ বুখারী) আর যে ফল তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলার শর্ত থাকে, তাতে এই ঝুঁকি (নষ্ট হওয়ার ভয়) নেই। ফলে এর ক্রয়-বিক্রয় সহীহ বা বৈধ, ঠিক যেমন ফল পরিপক্ক হওয়ার পর বিক্রি করা বৈধ।”
(ইবনু কুদামাহ;আল-মুগনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৪৯) জেনে রাখা ভাল যে, এই বিধান তখনই কার্যকর হবে যখন ফলটি কাঁচা অবস্থায় কোনো না কোনো উপকারে আসে (যেমন: কাঁচা আম বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য ফল)। যদি ফলটি এতোই ছোট বা অকেজো হয় যে তা কেটে ফেললে কোনো কাজেই আসবে না, তবে সেই বিক্রয় ‘মাল’ (সম্পদ) হিসেবে গণ্য না হওয়ায় তা বাতিল হতে পারে।
.
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে এর সঠিক অনুসরণের তৌফিক দান করুন। (তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।