প্রশ্ন: আমি সফর থেকে ফিরে এসেছি কিন্তু এখনো মাগরিবের সালাত আদায় করিনি। আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম তারা ইশার সালাত আদায় করছে। এখন আমার জন্য কী করা উচিত? আমি কি তাদের সঙ্গে ইশার সালাত আদায় করব নাকি আগে একা মাগরিব আদায় করে পরে ইশা আদায় করব?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কেউ যদি মসজিদে এসে দেখে যে ইশার সালাতের জামাত ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, অথচ তিনি এখনো মাগরিবের সালাত আদায় করেননি, তাহলে করনীয় কি এ বিষয়ে ফিকহবিদ আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।একদল আলেমের মতে, তিনি প্রথমে একাকীভাবে মাগরিবের সালাত আদায় করবেন, এরপর ইশার জামাতে যোগ দেবেন।অন্যদিকে, আরেকদল আলেমের অভিমত হলো তিনি সরাসরি ইশার জামাতে অংশ নেবেন, এবং ইশার সালাত শেষ করার পর একাকীভাবে মাগরিবের সালাত আদায় করবেন। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে ইশার জামাতে শরিক হবে, তবে মাগরিবের নিয়তে। অতঃপর যখন সে তৃতীয় রাকআতে পৌঁছাবে, তখন তাশাহহুদের জন্য বসে তাশাহহুদ দুরুদ এবং অন্যান্য দোয়া পড়বেন এবং সালাম ফিরাবেন।এরপর ইমামের ইশার সালাতে যতটুকু অংশ অবশিষ্ট থাকবে, ব্যক্তি সে অংশে পুনরায় ইমামের সঙ্গে যোগ দেবে।অথবা সে চাইলে তৃতীয় রাকআতে তাশাহহুদের জন্য বসে ইমামের সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে এবং ইমামের সঙ্গে সালাম ফিরাতে পারে। এরপর সে পূর্ণরূপে ইশার সালাত পৃথকভাবে আদায় করবে।এটাই ইমাম শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাব এবং ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ)-এর দুটি মতের একটি।ইমাম মারদাওয়ী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-ইনসাফ”-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অনুসারীদের একটি দল এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর দাদা মাজদ ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-ইনসাফ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪১৩)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,
ولو نوى الصبح خلف مصلي الظهر وتمت صلاة المأموم ، فإن شاء انتظر في التشهد حتى يفرغ الإمام , ويسلم معه , وهذا أفضل , وإن شاء نوى مفارقته وسلم , و(لا) تبطل صلاته هنا بالمفارقة بلا خلاف ، لتعذر المتابعة , وكذا فيما أشبهها من الصور
“যদি কোনো ব্যক্তি যোহরের সালাত আদায়কারী ইমামের পেছনে ফজরের নিয়ত করে সালাত আদায় করে এবং তার সালাত ইমামের সালাতের আগেই শেষ হয়ে যায় তবে সে চাইলে তাশাহহুদে বসে ইমাম সালাত শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে এবং তাঁর সঙ্গে সালাম ফিরাতে পারে; আর এটাই উত্তম। আবার চাইলে সে ইমামের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নিয়ত করে নিজে সালাম ফিরাতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিনা মতভেদে তার সালাত বাতিল হবে না; কারণ এখানে ইমামের অনুসরণ করা সম্ভব নয়। অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিতেও একই বিধান প্রযোজ্য।”(ইমাম নববী আল-মাজমু; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৪৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: কিছু মুসল্লি মাগরিবের সালাতে দেরি করে ফেললেন এবং এসে দেখলেন যে ইমাম এশার সালাত শুরু করে দিয়েছেন। এখন তারা কি আলাদাভাবে মাগরিবের জামাত করবেন, নাকি ইমামের সাথে এশার জামাআতে যোগ দেবেন? আর ইমামের সাথে যোগ দিলে তাদের সালাত পড়ার পদ্ধতি কী হবে?
জবাবে তিনি বলেন:
” الصحيح أن الإنسان إذا جاء والإمام في صلاة العشاء ، سواء كان معه جماعة أم لم يكن ، فإنه يدخل مع الإمام بنية المغرب ، ولا يضر أن تختلف نية الإمام والمأموم لعموم قول النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى ) . فإن دخلوا معه في الركعة الثانية سلموا معه ، لأنهم يكونون صلوا ثلاثاً ، ولا يضر أن يكون جلسوا في الركعة الأولى ، وإن دخلوا معه في أول ركعة ، فإذا قام إلى الرابعة جلسوا وتشهدوا وسلموا ، ثم دخلوا معه فيما بقي من صلاة العشاء .
القول الثاني في المسألة : أن يدخلوا معه بنية العشاء ، ويصلوا بعده المغرب ويسقط الترتيب هنا مراعاةً للجماعة .
القول الثالث :
أن يصلوا وحدهم صلاة المغرب ، ثم يدخلوا معه فيما بقي من صلاة العشاء ، والقولان الأخيران فيهما محذور ، أما الأول فمحذوره فوات الترتيب حيث قدم صلاة العشاء على صلاة المغرب ، وأما الثاني فمحذوره إقامة جماعتين في مسجد واحد وفي آن واحد ، وهذا تفريق للأمة .
أما القول الأول الذي ذكرنا أنه الصحيح ، فربما قال قائل إن فيه محذوراً وهو تسليم هؤلاء قبل أن يسلم إمامهم ، وهذا في الحقيقة ليس فيه محذور ، فقد ورد انفراد المأموم عن الإمام في مواضع من السُّنَّة ، منها : صلاة الخوف ، فإن الإمام يصلي بهم ركعة ثم يتمون لأنفسهم وينصرفون .
ومنها : قصة الرجل الذي دخل مع معاذ بن جبل رضي الله عنه ، فلما بدأ بسورة البقرة أو سورة نحوها انفصل عنه ولم يكمل معه .
ومنها : أن العلماء قالوا : لو أن الإنسان أثناء الصلاة وهو مأموم ثارت عليه الريح (الغازات) أو احتاج إلى نقض الوضوء ببول أو غائط ، فإنه لا بأس أن ينوي الانفراد ويكمل صلاته وينصرف ، فهذا يدل على أن الانفراد لحاجة لا يعتبر محذوراً “
”সঠিক মত হলো এই যে, ব্যক্তি যখন আসবে এবং ইমামকে এশার সালাতে পাবে (চাই তার সাথে আরও লোক থাকুক বা না থাকুক), সে মাগরিবের নিয়ত করে ইমামের সাথে শামিল হবে। ইমাম ও মুক্তাদির নিয়ত ভিন্ন হওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাধারণ বাণী হলো: “নিশ্চয়ই আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পাবে যার সে নিয়ত করবে।”(সহীহ বুখারী হা/১) যদি তারা ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাকাআত থেকে শামিল হয়, তবে তারা ইমামের সাথেই সালাম ফেরাবে। কারণ এতে তাদের তিন রাকাআত পূর্ণ হবে। আর তাদের প্রথম রাকাআতে (ইমামের দ্বিতীয় রাকাআত) বসাটা কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু যদি তারা ইমামের সাথে প্রথম রাকাআতেই যোগ দেয়, তাহলে ইমাম যখন চতুর্থ রাকাআতের জন্য দাঁড়াবেন, তখন তারা (মাগরিবের তিন রাকাআত শেষে) বসে পড়বে, তাশাহুদ (দুরুদসহ অন্যান্য দোয়া) পড়বে এবং সালাম ফেরাবে। এরপর ইমামের সাথে এশার সালাতের অবশিষ্ট অংশে যোগদান করবে।
.
এই মাসআলায় দ্বিতীয় মত: তারা এশার নিয়ত করে ইমামের সাথে যোগ দেবে এবং পরে মাগরিব পড়ে নেবে। জামাতের স্বার্থে এখানে সালাতের (তারতীব) ধারাবাহিকতা (মাগরিবের আগে এশা পড়া) রক্ষা না করাকে জায়েজ মনে করা হয়।
.
এই মাসআলায় তৃতীয় মত: তারা প্রথমে আলাদাভাবে মাগরিবের জামাআত করবে, এরপর ইমামের সাথে এশার যতটুকু পাওয়া যায় তাতে শরিক হবে। শেষোক্ত দুটি মতের মধ্যেই ত্রুটি রয়েছে। দ্বিতীয় মতের ত্রুটি হলো—সালাতের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা (মাগরিবের আগে এশা পড়ে ফেলা)। আর তৃতীয় মতের ত্রুটি হলো—একই সময়ে একই মসজিদে দুটি আলাদা জামাত কায়েম করা, যা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। প্রথম মতটি—যাকে আমরা সঠিক বলেছি—সেখানে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন যে, ইমামের আগে মুক্তাদির সালাম ফেরানো একটি ত্রুটি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ সুন্নাহতে প্রয়োজনের খাতিরে মুক্তাদির ইমাম থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ: (১).সালাতুল খওফ (ভয়-ভীতির সময়ের সালাত): ইমাম এক দল নিয়ে এক রাকাআত পড়েন, এরপর মুক্তাদিরা নিজেরা বাকি সালাত শেষ করে চলে যান।
(২). মু‘আয ইবনু জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা: এক ব্যক্তি তাঁর পেছনে সালাত শুরু করেছিলেন। কিন্তু মুয়াজ (রা.) যখন সূরা বাকারা বা অনুরূপ দীর্ঘ সূরা তেলাওয়াত শুরু করলেন, তখন সেই ব্যক্তি জামাআত ছেড়ে আলাদা হয়ে নিজের সালাত শেষ করেন।
(৩).ফকীহগণ বলেন: যদি কোনো ব্যক্তি সালাতরত অবস্থায় ইমামের পিছনে থাকাকালীন হঠাৎ বাতাসের চাপ (গ্যাস) অনুভব করে, অথবা পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেয়—তাহলে তার জন্য কোনো সমস্যা নেই যে সে ইনফিরাদ (আলাদা হওয়ার) নিয়ত করে, নিজের সালাত পূর্ণ করে চলে যাবে। এগুলো প্রমাণ করে যে, প্রয়োজনবশত ইমাম থেকে পৃথক হয়ে সালাত শেষ করা দোষণীয় কিছু নয়।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাআতুল বাবিল মাফতূহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪২৫)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম এমতাবস্থায় যে এশার জামাত চলছে। সালাতে প্রবেশের ঠিক আগ মুহূর্তে আমার মনে পড়ল যে আমি মাগরিবের সালাত পড়িনি। এখন আমি কি আগে মাগরিব পড়ে নেব এবং এরপর এশার জামাতের যতটুকু পাই তাতে শরিক হব, নাকি জামাতের সাথে এশা পড়ে নিয়ে পরে মাগরিব পড়ব?
উত্তরে শাইখ বলেন:
دخلت المسجد وصلاة العشاء مقامة ، ثم تذكرت أنك لم تصل المغرب ، فادخل مع الجماعة بنية صلاة المغرب ، وإذا قام الإمام إلى الركعة الرابعة فاجلس أنت في الثالثة واقرأ التشهد الأخير – أعني التحيات والصلاة على النبي صلى الله عليه وسلم – والدعاء بعدها وانتظر الإمام حتى يسلم ثم تسلم معه ، ولا يضر اختلاف النية بين الإمام والمأموم على الصحيح من أقوال أهل العلم ، وإن صليت المغرب وحدك ثم دخلت مع الجماعة فيما أدركت من صلاة العشاء فلا بأس
“যদি আপনি মসজিদে প্রবেশ করেন এবং এশার জামাত দাঁড়িয়ে যায়, এমতাবস্থায় আপনার মনে পড়ে যে আপনি মাগরিব পড়েননি, তবে আপনি মাগরিবের নিয়ত করে জামাআতে শরিক হয়ে যাবেন। অতঃপর ইমাম যখন চতুর্থ রাকাআতের জন্য দাঁড়াবেন, তখন আপনি (তিন রাকাত শেষে) বসে যাবেন এবং শেষ তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা) পড়ে নেবেন। এরপর ইমামের সালাম ফেরানো পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন এবং তাঁর সাথেই সালাম ফেরাবেন।এক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, ইমাম ও মুক্তাদির নিয়ত ভিন্ন হওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। আর আপনি যদি আগে একা মাগরিব পড়ে নেন এবং এরপর এশার জামাতের যতটুকু পান তাতে শরিক হন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।”(১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন, ইমাম বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৮৯)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কোনো ব্যক্তি যদি ফজর পড়তে ভুলে যায় এবং জোহরের জামাআত দাঁড়ানোর সময় তার তা মনে পড়ে, কিংবা জোহর পড়তে ভুলে যায় এবং আসরের সময় তা মনে পড়ে—তবে তার করণীয় কী? সে কি ইমামের পেছনে ওই কাজা সালাতের নিয়ত করে প্রবেশ করবে, নাকি বর্তমান ওয়াক্তের সালাতের নিয়ত করবে এবং পরে কাজা সালাতটি পড়বে?
উত্তরে তারা বলেছেন:يصلي الصلاة التي نسيها وراء الإمام ، ولا يضره اختلاف نيته عن نية الإمام على الصحيح من قولي العلماء ”তিনি ইমামের পেছনে ওই ভুলে যাওয়া সালাতটিই (কাজা) আদায় করবেন। ওলামায়ে কেরামের দুটি মতের মধ্যে বিশুদ্ধতর মত অনুযায়ী, ইমামের নিয়ত আর মুক্তাদির নিয়ত আলাদা হওয়াতে সালাতের কোনো ক্ষতি হয় না।” (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৪০৭)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: এক ব্যক্তি এশার ওয়াক্ত পর্যন্ত সফর করছিলেন, পথিমধ্যে একটি গ্রাম অতিক্রম করার সময় দেখলেন গ্রামবাসী এশার সালাত পড়ছেন। (তিনি মাগরিব পড়েননি তাই তাদের সাথে যোগ দিলেন)। অন্য এক ব্যক্তি ওই গ্রামেরই অধিবাসী, তিনিও তাদের সাথে মাগরিবের নিয়তে সালাত পড়লেন এই ধারণা করে যে তারা মাগরিব পড়ছে। এই দুই ব্যক্তির সালাতের বিধান কী? দলিলসহ আমাদের ফতোয়া দিন, জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) জবাবে বলেন:
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وآله وصحبه ومن والاه, الحقيقة أنه لا يوجد لدينا نص في مثل هذه المسألة التي جاء السؤال عنها, وإنما تؤخذ بطريق شيء من الاستنباط والاجتهاد, فنحن نقول أنه من الثابت في السنة أن اختلاف النية, نية المقتدي عن نية الإمام لا تؤثر في صحة الصلاة وصحة القدوة فهناك مثلا صلاة معاذ بن جبل العشاء الآخرة وراء النبي صلى الله عليه وسلم, ثم صلاته إياها لقومه، وكما جاء في صحيح البخاري أنها تكون له نافلة ولمن وراءه فريضة, كما أن هناك بعض الأحاديث الصحيحة التي جاءت في كيفية من كيفيات صلاة النبي صلى الله عليه وسلم لأصحابه صلاة الخوف, فمن ذلك أنه كان يصليها ركعتين بالطائفة الأولى ثم يسلم بهم فينطلق هؤلاء إلى مصاف الطائفة الأخرى لتأتي وتصلي بالنبي صلى الله عليه وسلم وراء النبي صلى الله عليه وسلم ركعتين, فتكون بطبيعة الحال الركعتان الأوليان بالنسبة للرسول عليه السلام هي الفريضة والركعتان الأخريان بالجماعة الاخرى إنما هي نافلة, وهكذا ربما توجد أمثلة أخرى لا أستحضرها الآن كذلك لا بد أن نذكر هنا, حادثة ذلك الأعرابي الذي كان يعمل بالنواضح في أثناء النهار ويأتي مساء ليصلي خلف معاذ رضي الله عنه فلما اقتدى به ذات يوم صلاة العشاء الآخرة وسمعه وقد ابتدأ سورة البقرة فظن أو أُلقي في نفسه أن هذه القراءة ستكون طويلة وطويلة جدا بالنسبة إليه ولذلك قطع الصلاة من خلف معاذ وصلى لوحده, فإذا نظرنا إلى هذه النصوص حينئذ نستطيع أن نقول بأن صلاة هذا المسافر أو ذاك المقيم الذي اقتدى بالإمام وهو يصلي صلاة العشاء ويتوهم كل منهما أنه إنما يصلي صلاة المغرب فيتبين له أنه إنما كان يصلي صلاة العشاء فهو في هذه الحالة إذا أدرك الإمام في أول ركعة فحينما ينهض الإمام إلى الركعة الرابعة كل منهما ينوي الانفصال ويقطع القدوة بالإمام ليجلس في التشهد الأخير على رأس الثلاث بالنسبة إليه فيسلم ثم ينهض ويقتدي بالإمام ما أدرك من صلاة العشاء له هذا ما يبدو لي في الجواب عن هذا السؤال.
السائل : نعم, الرجل المسافر يعلم أن ذلك الإمام يصلي العشاء
الشيخ : طيب.
السائل : وهو أخر المغرب فدخل مع الجماعة يدخل معهم بنية المغرب؟
الشيخ : طبعا, لا يجوز تأخير صلاة المغرب عن صلاة العشاء, وإنما يقتدي بهم ثم ينوي المفارقة كما قلت آنفا حينما ينهض الإمام إلى الركعة الرابعة.
السائل : بعض العلماء قال يدخل معهم بنية النافلة, يصلي معهم العشاء نافلة له ثم يصلي المغرب ثم العشاء.
الشيخ : لماذا؟
السائل : لا أدري فما صحة هذا القول أو
الشيخ : هذا الذي قدمت له قدمت ما قدمت من أدلة وهو لأبين أن اختلاف نية المقتدي عن نية الإمام, لا تضر في صحة الصلاة, فإذا كان هو يصلي المغرب والإمام يصلي العشاء فأولى أن تكون هذه الصلاة صحيحة من أن تكون صلاة المفترضين ورائه المتنفل صحيحة, كل ما في الأمر أنه يحتاج إلى واسطة في الموضوع وهو أن ينوي المفارقة.
السائل : نعم, جزاك الله خيرا.
الشيخ : وإياك.
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ ওয়া আলিহি ওয়া সহবিহি ওয়া মান ওয়ালাহ।প্রকৃতপক্ষে, এই নির্দিষ্ট মাসআলাটি সম্পর্কে আমাদের কাছে সরাসরি কোনো নস (স্পষ্ট কুরআন-সুন্নাহর বাণী) নেই। বরং এটি ইস্তিম্বাত (গবেষণা ও মূলনীতি থেকে আহরণ) এবং ইজতিহাদের মাধ্যমেই সমাধান করতে হয়। সুন্নাহর মাধ্যমে এটি সুসাব্যস্ত যে—ইমাম ও মুক্তাদির নিয়তের ভিন্নতা সালাতের শুদ্ধতা বা ইকতিদার (অনুসরণ) ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। এর স্বপক্ষে কিছু দলিল হলো: মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)-এর ঘটনা: তিনি নবী ﷺ-এর পেছনে এশার সালাত পড়তেন, এরপর ফিরে গিয়ে নিজ গোত্রের ইমামতি করতেন। সহীহ বুখারীতে এসেছে—এটি মুয়াজ (রা.)-এর জন্য ছিল নফল আর মুক্তাদিদের জন্য ছিল ফরজ। সালাতুল খাউফ (ভীতিভীতি অবস্থার সালাত): সহীহ হাদিসে বর্ণিত নবী ﷺ-এর সালাত পড়ার একটি পদ্ধতি হলো—তিনি প্রথম এক দলকে নিয়ে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাতেন। এরপর অন্য দল আসলে তাদের নিয়ে পুনরায় দুই রাকাত পড়তেন। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই রাসূল ﷺ-এর প্রথম দুই রাকাত ছিল ফরজ এবং দ্বিতীয় দলটির সাথে পড়া শেষ দুই রাকাত ছিল তাঁর জন্য নফল। এছাড়া সেই গ্রাম্য সাহাবীর ঘটনাটিও উল্লেখ্য—যিনি সারাদিন সেচের কাজ শেষে রাতে মুয়াজ (রা.)-এর পেছনে এশায় দাঁড়াতেন। একদিন মুয়াজ (রা.) সূরা বাকারা শুরু করলে দীর্ঘ কিরাতের আশঙ্কায় তিনি জামাত ছেড়ে (সালাত না ভেঙে) আলাদা হয়ে একাকী সালাত সম্পন্ন করেছিলেন। এই দলিলগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি: যদি কোনো মুসাফির বা মুকিম ব্যক্তি মাগরিবের সালাত আদায় করতে চান, কিন্তু ইমামকে এশার সালাত পড়তে দেখেন—তবে তিনি ইমামের পেছনে মাগরিবের নিয়তেই শরিক হবেন। এক্ষেত্রে তিনি যদি ইমামের সাথে প্রথম রাকাত থেকেই থাকেন, তবে ইমাম যখন চতুর্থ রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন, তখন ওই ব্যক্তি মনে মনে ‘মুফারাগাত’ বা ইমামের অনুসরণ ত্যাগের নিয়ত করবেন। এরপর তিনি তিন রাকাত শেষ করে নিজ থেকে তাশাহহুদে বসে সালাম ফিরাবেন। এরপর চাইলে তিনি ইমামের বাকি থাকা এশার নামাজেও (নতুন নিয়তে) শরিক হতে পারেন। এটিই আমার কাছে সঠিক উত্তর।
প্রশ্নকর্তা: আচ্ছা, মুসাফির ব্যক্তি যদি আগে থেকেই জানেন যে ইমাম এশা পড়ছেন, তবে কি তিনি মাগরিবের নিয়তেই যোগ দেবেন?
শায়খ: অবশ্যই। কারণ মাগরিবকে এশার পরে পড়া জায়েজ নেই (অর্থাৎ সালাতের ক্রম বজায় রাখা জরুরি)। তাই তিনি মাগরিবের নিয়তেই যোগ দেবেন এবং ইমাম যখন চতুর্থ রাকাতে যাবেন, তখন তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন—যেমনটি আমি আগে বললাম।
প্রশ্নকর্তা: কিছু আলেম বলেন যে, তিনি প্রথমে ইমামের সাথে এশা (নফল হিসেবে) পড়বেন, এরপর মাগরিব পড়বেন এবং সবশেষে এশা পড়বেন?
শায়খ: কেন? (এর স্বপক্ষে যুক্তি কী?)
প্রশ্নকর্তা: আমি ঠিক জানি না। তবে এই মতটি কতটা সঠিক?
শায়খ: আমি যে দলিলগুলো এতক্ষণ উপস্থাপন করলাম, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো এটি বোঝানো যে—মুক্তাদির নিয়ত ইমামের থেকে ভিন্ন হলে সালাতের কোনো ক্ষতি হয় না। সুতরাং নফল সালাত আদায়কারীর পেছনে ফরজ পড়া যদি সহীহ হয়, তবে ফরজ সালাত আদায়কারীর (এশা) পেছনে অন্য ফরজ (মাগরিব) পড়া আরও বেশি সংগত। এখানে কেবল একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, আর তা হলো (তিন রাকাত শেষে) ইমাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নিয়ত করা।
প্রশ্নকর্তা: জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
শায়খ: ওয়া ইয়্যাকা (আপনাকেও উত্তম প্রতিদান দিন)। (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর; ৪৯৭ নং অডিয়ো ক্লিপ)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
No comments:
Post a Comment