Monday, May 25, 2026

বদলি হজ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি।অতঃপর মহান আল্লাহ সামর্থ্যবান ও শরয়ীভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেক মুসলিমের উপর জীবনে একবার হজ্ব ফরজ করেছেন এবং এটিকে ইসলামের অন্যতম মহান রুকন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।এটি দ্বীনের এমন এক অকাট্য ও সর্বজনবিদিত বিধান, যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা আবশ্যক। অতএব, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর আদেশের আনুগত্য এবং তাঁর প্রতিদানের আশা ও শাস্তির ভয় অন্তরে ধারণ করে মুসলমানের উপর ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা অপরিহার্য।এ বিশ্বাসও হৃদয়ে দৃঢ় রাখা প্রয়োজন যে, মহান আল্লাহ তাঁর সকল বিধান ও ফয়সালায় পরম প্রজ্ঞাময় ও অসীম দয়ালু। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কেবল সেসব বিধানই নির্ধারণ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও উপকার নিহিত রয়েছে। অতএব, বিধানদানের একমাত্র অধিকার তাঁরই; আর বান্দার দায়িত্ব হলো তাঁর বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করা।এই প্রেক্ষাপটে, বদলি হজ্ব—অর্থাৎ অন্যের পক্ষ থেকে হজ্ব পালন—একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী ইবাদত। তাই এ ইবাদত বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শরিয়ত নির্ধারিত কিছু প্রয়োজনীয় শর্ত, বিধান ও আদব সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। নিম্নে সে বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

.
(১).যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে সুস্থ এবং নিজেই নিজের পক্ষ থেকে হজ্ব পালনে সক্ষম, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ্ব করানো বা তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ হজ্ব করলে তা শুদ্ধ হবে না।
.
​(২).বদলি হজ্ব কেবল ওই ব্যক্তির পক্ষ থেকেই বৈধ, যার উপরে হজ্ব ফরজ হয়েছিল কিন্তু তিনি হজ্ব করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা জীবিত থাকলেও আর্থিকভাবে সক্ষম; কিন্তু বার্ধক্য বা এমন স্থায়ী শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত, যার থেকে সুস্থ হওয়ার কোনো আশা নেই,যার ফলে তিনি সৌদি আরব গিয়ে হজ্ব করতে অক্ষম। তবে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি আর্থিকভাবে অক্ষম কিংবা নিরাপত্তা, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা বা অনুরূপ বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে হজ্বে যেতে পারছেন না—তার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব আদায় করা বৈধ নয়।
.
​(৩).আবারও বলছি, যার সাময়িক কোনো ওজর বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং যা অচিরেই দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করা জায়েজ নয়। যেমন: এমন কোনো নারী যার সাথে সফর করার মতো আপাতত কোনো মাহরাম নেই, অথবা এমন কোনো ব্যক্তি যার আইডেন্টিটি কার্ড বা পরিচয়পত্র নেই, কিংবা যাকে তার রাষ্ট্র কোন কারনে সফরে যেতে বাধা দিচ্ছে। কারণ, এই ব্যক্তিদের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে এবং পরিস্থিতির বদলও হতে পারে, যার ফলে তারা পরবর্তীতে নিজেরাই হজ্বের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হতে পারেন। এটি সেই ব্যক্তির মতো নয়, যার শারীরিক অক্ষমতা স্থায়ী ও চিরস্থায়ী।
.
(৪).যার হজ্ব করার মত আর্থিক সামর্থ্য না হওয়ার কারণে হজ্ব করতে পারেননি এমন ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করে কারো পক্ষ থেকে বদলি হজ্বে পাঠানো বৈধ কিনা মাসআলা কিছুটা মতভেদ থাকলেও গ্রহণযোগ্য কথা হলো এমনটি জায়েজ নয় কারণ রাসূল (ﷺ) জৈনক সাহাবীকে নিজের হজ্ব আদায় করেনি বলে শুবরুমার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করার অনুমতি দেননি।
.
(৫).বদলি হজ্জের ক্ষেত্রে নিয়ত ছাড়া পদ্ধতিগত আর কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ সে ব্যক্তি নিয়ত করবে যে, তিনি এ অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করছেন। তালবিয়ার সময় নাম উল্লেখ করে বলবে: ‘লাব্বাইকা আন ফুলান’ (অর্থ- অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমি হাজির)। এরপর হজ্জের মধ্যে দোয়া করার সময় নিজের জন্য দোয়া করবে এবং যার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করছে তার জন্যেও দোয়া করবে।
.
৬.দারিদ্র্যের কারণে কারো ওপর হজ্ব ফরজ না হলে, তার পক্ষ থেকে হজ্ব করার প্রয়োজন নেই। বদলি হজ্ব মূলত তাদের জন্যই প্রযোজ্য যাদের ওপর হজ্ব ফরজ হওয়া সত্ত্বেও স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতার অভাবে তা পালন করতে পারছেন না।
.
​৭.আর বদলি হজ্জকারী; আত্মীয়ের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জকারী হোক কিংবা অনাত্মীয় কারো পক্ষ থেকে বদলি হজ্জকারী হোক তাকে অবশ্যই বদলি হজ্জের আগে নিজের হজ্জ আদায় করেছে এমন হতে হবে। নিজের ওপর ফরজ হওয়া হজ্ব সম্পন্ন না করে অন্য কারো পক্ষ থেকে হজ্ব করা বৈধ নয়।যদি কেউ প্রতিনিধি হয়ে এমনটি করেন,আলেমদের মতামত অনুযায়ী সেটি তার নিজের পক্ষ থেকেই গণ্য হবে, অন্যের পক্ষ থেকে নয়।
.
​৮.একজন পুরুষ অন্য নারী বা পুরুষের পক্ষ থেকে এবং একজন নারী অন্য পুরুষ বা নারীর পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করতে পারেন।
.
​৯.মনে রাখবেন, একই বছরে একজন ব্যক্তি একই সাথে একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারবেন না।তবে তিনি চাইলে নিজের পক্ষ থেকে বা অন্য কারো পক্ষ থেকে উমরাহ করতে পারেন, কিন্তু হজ্বটি করতে হবে কেবল একজনের পক্ষ থেকেই।
.
​১০.বদলি হজ্ব করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইবাদত সম্পাদন, পবিত্র স্থানসমূহ জিয়ারত এবং কোনো মুমিনের উপকার করা। অর্থ উপার্জন বা ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এটি করা শরীয়ত সম্মত নয়।
.
​১১.কোনো ব্যক্তি হজ্ব ফরজ হওয়ার পর তা আদায় না করেই মৃত্যুবরণ করলে, তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে হজ্ব করানো ওয়াজিব, সে অসিয়ত করে থাকুক বা না থাকুক এটাই বিশুদ্ধ মত।
.
​১২.বিশুদ্ধ মতানুসারে, বদলি হজ্বের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় করেন, হজ্বের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আমল ও ইবাদতের যেমন তাওয়াফ, সাঈ, আরাফায় অবস্থান, মুযদালিফায় অবস্থান ইত্যাদির মূল সওয়াব সেই ব্যক্তির আমলনামায়ই লিপিবদ্ধ হবে। তবে হজ্ব পালনকালে প্রতিনিধি নিজে যে অতিরিক্ত ইবাদত, দোয়া, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য নেক আমল করবেন, সেগুলোর সওয়াব তিনি নিজেও লাভ করবেন। পাশাপাশি প্রতিনিধি যদি আন্তরিকতা, ইখলাস, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি, যথাযথ আদব ও বিধিবিধান মেনে হজ্ব সম্পন্ন করেন, তাহলে তিনিও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশেষ সওয়াব ও কল্যাণ লাভের আশা রাখতে পারেন; বরং আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিও হজ্বের বরকতে গুনাহমুক্ত ও পবিত্র হয়ে ফিরে আসতে পারেন—ইনশাআল্লাহ।
.
​১৩.বদলি হজ্ব করার ক্ষেত্রে উত্তম হলো সন্তান তার বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে এবং নিকটাত্মীয়রা একে অপরের পক্ষ থেকে হজ্ব পালন করা। তবে প্রয়োজনে অপরিচিত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে দিয়েও বদলি হজ্ব করানো জায়েজ।
.
​১৪.হজ্ব পালনের সময় যার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করা হচ্ছে, তার নাম মুখস্থ থাকা জরুরি নয়; বরং অন্তরে তার পক্ষ থেকে আদায় করার নিয়ত থাকাই যথেষ্ট।
.
​১৫.যাকে বদলি হজ্বের দায়িত্ব (উকালতি) দেওয়া হয়েছে, তিনি যার পক্ষ থেকে হজ্ব করছেন তার অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন না।
.
​১৬.নফল হজ্বের ক্ষেত্রে বদলি বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা শরীয়তসম্মত কিনা এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।কেউ কেউ জায়েজ বললেও (আল্লাহু আলম) আমরা নিষিদ্ধের মতকে অধিক বিশুদ্ধ মনে করি যেমনটি আমাদের ইমাম ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ প্রাধান্য দিয়েছেন।কেউ যদি প্রশ্ন করেন নফল হজ্ব কোনটি জবাব হচ্ছে,প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য জীবনে একবার হজ্ব ফরজ।ফরজ আদায়ের পর তিনি যদি পুনরায় হজ্ব করতে চান তবে পরবর্তী প্রত্যেকটিই তার জন্য নফল হিসেবে গণ্য হবে।
.
​১৭.যিনি অন্যের পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় করেন, তিনি মূলত হজ্ব ও হজ্ব-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আমল সেই ব্যক্তির পক্ষ থেকেই সম্পাদন করেন। তাই দোয়ার স্থানগুলোতে উত্তম ও অধিকতর পরিপূর্ণ আদব হলো—যার প্রতিনিধি হয়ে হজ্ব করছেন তার জন্য দোয়া করা পাশাপাশি নিজেকেও সেই দোয়ায় শামিল করা। কারণ প্রতিনিধি হিসেবে হজ্ব আদায়ের দাবি হলো ইখলাস, বিশ্বস্ততা ও তাকওয়ার পরিচয় বহন করা। অতএব, কেউ যদি কেবল নিজের জন্যই দোয়া করে এবং যার পক্ষ থেকে হজ্ব করছে তাকে দোয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তা উত্তম আচরণ ও তাকওয়ার পরিপূর্ণতার পরিপন্থী বটে; তবে এর দ্বারা হজ্বের শুদ্ধতার কোনো ক্ষতি হবে না, হজ্ব সহীহই গণ্য হবে।
.
১৮.সবশেষে, বদলি হজ্বের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি দ্বীনদার, সৎ, বিশ্বস্ত ও আমানতদার; বিশুদ্ধ সুন্নাহর অনুসারী; এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে হজ্বের বিধি-বিধান, শর্ত, ওয়াজিব ও করণীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রাখেন, যাতে তিনি সঠিক পদ্ধতিতে হজ্বের দায়িত্ব আদায় করতে সক্ষম হন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
​আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

হজ্বের মাসসমূহে উমরাহ আদায়ের পর কেউ যদি মক্কা থেকে কোনো দূরবর্তী স্থানে সফর করে পুনরায় মক্কায় ফিরে এসে ৮ই জিলহজ্ব তামাত্তু হজ্বের ইহরাম বাঁধে তাহলে কি তার তামাত্তু সহীহ ও বহাল থাকবে

 প্রশ্ন: হজ্বের মাসসমূহে উমরাহ আদায়ের পর কেউ যদি মক্কা থেকে মদিনা, তায়েফ বা অন্য কোনো দূরবর্তী স্থানে সফর করে পুনরায় মক্কায় ফিরে এসে ৮ই জিলহজ্ব তামাত্তু হজ্বের ইহরাম বাঁধে, তাহলে কি তার তামাত্তু সহীহ ও বহাল থাকবে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর তামাত্তু হজ্ব হচ্ছে, হজ্বের মাসসমূহে (হজ্বের মাস হচ্ছে- শাওয়াল, জ্বিলক্বদ, জ্বিলহজ্ব মাস) এককভাবে উমরার ইহরামবাঁধা, মক্কায় পৌঁছে তওয়াফ করা, উমরার সায়ী করা, মাথা মুণ্ডন করা অথবা চুল ছাটাই করে উমরা থেকে হালাল হয়ে যাওয়া। এরপর তারবিয়ার দিন অর্থাৎ ৮ জ্বিলহজ্ব এককভাবে হজ্বের ইহরাম বাঁধা এবং হজ্বের যাবতীয় কার্যাবলী শেষ করা। অতএব, তামাত্তু হজ্বকারী পরিপূর্ণ একটি উমরা পালন করেন এবং পরিপূর্ণ একটি হজ্ব পালন করেন।
.
এখন প্রশ্ন হলো: হজ্বের মাসসমূহে উমরাহ পালন করে তামাত্তু‘ হজ্বের নিয়ত করার পর কোনো ব্যক্তি যদি ৮ই জিলহজ্বের পূর্বে মক্কা থেকে মদিনা, তায়েফ অথবা কসর পরিমাণ দূরত্বে অবস্থিত অন্য কোনো স্থানে সফর করে, অতঃপর পুনরায় মক্কায় ফিরে এসে তামাত্তু‘ হজ্বের ইহরাম বাঁধে, তাহলে তার পূর্বের তামাত্তু‘ বহাল থাকবে কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মাঝে সুপরিচিত মতভেদ রয়েছে।অনুরূপভাবে এ বিষয়েও মতভেদ রয়েছে যে, ফিরে আসার সময় তার জন্য নতুন করে মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে কি না, কিংবা মক্কায় প্রবেশের পর জিলহজ্বের ৮ তারিখের পূর্বে পুনরায় একটি উমরাহ আদায় করতে হবে কি না।এটি প্রাচীনকাল থেকেই আলোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি মাসআলা। সালাফে সালেহীন, ইমামগণ এবং পরবর্তী যুগের ফকীহদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ও দলীল বর্ণিত হয়েছে। সালাফদের বক্তব্য, দলিল ও ফকীহদের বিশ্লেষণ একত্র করলে এ বিষয়ে সহজেই একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচিত হতে পারে। তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা পরিহার করে কেবল মূল বক্তব্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হবে।
.
যদি কোনো ব্যক্তি হজ্বের মাসসমূহে উমরাহ সম্পন্ন করে মক্কা বা হারাম এলাকার ভেতরেই অবস্থান করেন, অতঃপর ৮ জিলহজ (ইয়াওমুত তারবিয়াহ) মক্কা থেকেই হজ্বের ইহরাম বেঁধে হজ্ব আদায় করেন, তাহলে ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী তিনি ‘মুতামাত্তি’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং তার ওপর তামাত্তু’র হাদী ওয়াজিব হবে। তবে ফকীহগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন যে, কেউ উমরাহ আদায়ের পর তামাত্তু’ হজের নিয়ত রেখে ইয়াওমুত তারবিয়াহর পূর্বে মক্কা থেকে এমন দূরত্বে সফর করেন,যাতে সালাত কসর করা যায়, তাহলে তার তামাত্তু’ কি বাতিল হয়ে যাবে, যার ফলে মক্কায় ফেরার সময় তাকে কোনো মীকাত থেকে নতুন করে ইহরাম বাঁধতে হবে, নাকি তার তামাত্তু’ বহাল থাকবে এবং নতুন ইহরামের প্রয়োজন হবে না? এ বিষয়ে আলেমদের দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। তামাত্তু’ বহাল থাকার অর্থ হলো—উমরাহ ও হজ্বের মধ্যকার যোগসূত্র অক্ষুণ্ন থাকবে; ফলে তিনি ইহরাম ছাড়াই মক্কায় ফিরে ৮ জিলহজ মক্কা থেকেই হজ্বের ইহরাম বাঁধতে পারবেন এবং তার ওপর দমে-শুকর তথা তামাত্তু’র কুরবানি ওয়াজিব থাকবে। পক্ষান্তরে, তামাত্তু’ বাতিল হওয়ার অর্থ হলো—উমরাহর পর হারাম এলাকার বাইরে সফর করার কারণে সেই যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; তাই তাকে মীকাত থেকেই নতুন করে ইহরাম বাঁধতে হবে। তখন তিনি যদি শুধু হজ্বের ইহরাম বাঁধেন, তবে ‘মুফরিদ’ হিসেবে গণ্য হবেন; আর যদি পুনরায় উমরাহর ইহরাম বাঁধেন, তাহলে প্রথম উমরাহর ভিত্তিতে নয়, বরং দ্বিতীয় উমরাহর সূত্রে নতুনভাবে ‘মুতামাত্তি’ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
.
▪️প্রথম মত: একদল আলেমের মতে, উমরাহ আদায়ের পর মক্কা থেকে দূরবর্তী স্থানে সফর করলে তামাত্তু’ হজের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তামাত্তু’ বাতিল হয়ে পড়ে। তবে কোন ধরনের সফর এবং কতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করলে তা বাতিল হবে—এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। এই মতটি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব এবং তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে। তাবেয়ীগণের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, সাঈদ ইবনে জুবাইর, ইবরাহীম আন-নাখায়ী, তাউস ইবনে কাইসান এবং মুজাহিদ ইবনে জাবর (রাহিমাহুমুল্লাহ) এ মত গ্রহণ করেছেন। মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রাহিমাহুল্লাহ)-ও এ মতের সমর্থক ছিলেন। যদিও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকেও এ মতটি নিসবত করা হয়, তবে এ সংক্রান্ত বর্ণনাটি সনদের দিক থেকে সহীহ নয়। হানাফী মাযহাবের মতে, তামাত্তু’ হজে উমরাহকারী ব্যক্তি যদি সাথে হাদী (কোরবানির পশু) নিয়ে না আসে এবং উমরাহ শেষে নিজ দেশে ফিরে যায়, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে তার তামাত্তু’ বাতিল হয়ে যাবে। তবে হানাফি ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, ব্যক্তি হাদী সাথে আনুক বা না আনুক, এমনকি নিজ দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করলেও তার তামাত্তু’ বাতিল হয়ে যাবে। অন্যদিকে মালেকী মাযহাবের মতে, উমরাহ আদায়ের পর কেউ যদি নিজ দেশে ফিরে যায় অথবা এমন দূরত্বে সফর করে যা তার দেশ থেকে মক্কার দূরত্বের সমপরিমাণ, তাহলে তার তামাত্তু’ বাতিল হয়ে যাবে। এ মতের সমর্থনে ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি প্রাচীন কওলও বর্ণিত হয়েছে। সমকালীন আলেমদের মধ্যে বিগত শতাব্দীর অন্যতম দুই প্রখ্যাত ফকীহ আবদুল আযীয ইবনে বায এবং মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুমাল্লাহ) এ মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উমরাহ সম্পন্ন করার পর কেউ যদি সৌদি আরবের অন্য কোথাও না গিয়ে সরাসরি নিজ দেশ বা স্থায়ী বাসস্থানে ফিরে যায়, তবেই তার তামাত্তু’ হজ বাতিল বলে গণ্য হবে; অন্যথায় নয়। আর দলিলের বিচারে এই দুই ইমাম (ইবনু বায ও ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর মতটিই অধিক বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য—যার প্রমাণ শেষে উল্লেখ করা হবে।
.
এই পক্ষের আলেমদের দলিল হলো:মহান আল্লাহ তাআলার বাণী:فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ(অর্থ: “অতঃপর যে ব্যক্তি হজ্ব পর্যন্ত উমরাহর দ্বারা লাভবান (তামাত্তু’) হতে চায়, সে যেন সাধ্যমত হাদী (পশু কোরবানি) দান করে। আর যে ব্যক্তি তা পাবে না, সে যেন হজ্বের দিনসমূহে তিনটি এবং ফিরে যাওয়ার পর সাতটি রোযা রাখে; এই হলো পূর্ণ দশটি। এই নিয়ম তার জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা [মক্কাবাসী] নয়।”(সূরা বাকারা আয়াত:১৯৬)
.
​এই আয়াতের আলোকে আল-জাসসাস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الله تعالى خص أهل مكة بأن لم يجعل لهم متعة وجعلها لسائر أهل الآفاق وكان المعنى فيه إلمامهم بأهاليهم بعد العمرة مع جواز الإحلال منها وذلك موجود فيمن رجع إلى أهله لأنَّه قد حصل له إلمام بعد العمرة فكان بمنزلة أهل مكة
“আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন যে, তিনি তাদের জন্য ‘তামাত্তু হজ’ (হজের সাথে উমরাহ যুক্ত করা) নির্ধারণ করেননি, বরং এটি অন্যান্য দূর-দূরান্তের অঞ্চলের মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন।এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো—উমরাহ শেষ করে ইহরাম থেকে হালাল (মুক্ত) হওয়ার পর তারা যেন নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। আর এই বিষয়টি এমন প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যে (উমরাহ শেষে) নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যায়; কারণ উমরাহ সম্পন্ন করার পর তার নিজ পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার বিষয়টি ঘটে গেছে। ফলে সে (হজ্বের হুকুমের ক্ষেত্রে) মক্কাবাসীদের সমপর্যায়ভুক্ত হয়ে গেছে।”(আহকামুল কুরআন’; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৯৫)। প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: إذا اعتمر في أشهر الحج ثم أقام فهو متمتع، فإن رجع فليس بمتمتع “যদি কেউ হজ্বের মাসসমূহে উমরাহ করে অতঃপর (মক্কায়) অবস্থান করে, তবে সে মুতামাত্তি’। আর যদি সে ফিরে যায় (সফর করে), তবে সে মুতামাত্তি’ নয়”( মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ হা/১৩১৬৩) এই বর্ণনার আলোকে তারা বলেন, এর বাহ্যিক অর্থ হলো, সে নিজের দেশে ফিরে যাক বা অন্য কোথাও—উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে বিশুদ্ধ মতে এই বর্ণনাটি (আসার) মুহাদ্দিসগণের নিকট যঈফ (দুর্বল) হিসেবে গণ্য।
.
ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-কাফী’ গ্রন্থে তামাত্তু‘র শর্তসমূহ আলোচনা করতে গিয়ে বলেনঃأن لا يسافر بينهما سفرا يقصر فيه؛ لما روي عن عمر رضي الله عنه قال: إذا اعتمر في أشهر الحج ثم أقام فهو متمتع فإن خرج ثم رجع فليس بمتمتع ولأنه إذا سافر لزمه الإحرام من الميقات أو من حيث انتهى إليه … انتهى.“উমরা ও হজ্বের মধ্যবর্তী সময়ে এমন কোনো সফরে না যাওয়া, যে সফরে সালাত কসর করা বৈধ হয়। কারণ উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:”যে ব্যক্তি হজের মাসসমূহে উমরা সম্পূর্ণ করে অতঃপর (মক্কায়) অবস্থান করে, সে মুতামাত্তি‘। আর যদি সে (মক্কা থেকে) বের হয়ে যায়, তারপর ফিরে আসে, তবে সে মুতামাত্তি‘ নয়।”আর এর কারণ হলো, সে যখন সফর করবে, তখন তার উপর মীকাত থেকে অথবা যে স্থান পর্যন্ত তার সফর শেষ হয়েছে সেখান থেকে ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে….”(কিতাবুল কাফী ফী ফিকহিল ইমাম আহমাদ; খণ্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৩১০; গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১১৫৫৮৬)
.
▪️দ্বিতীয় মত: আরেকদল আলেমের মতে,উমরাহ আদায়ের পর মাঝখানে সফর করলেও স্বাভাবিক ভাবে তামাত্তু’ বাতিল হয় না। তাই পুনরায় মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা তার জন্য জরুরি নয়; বরং মক্কায় ফিরে এসে ইয়াওমুত তারওিয়াহর (৮ জিলহজ্ব) দিন সে মক্কা থেকেই হজের ইহরাম বাঁধবে। তবে কোনো ধরনের সফরে তা বাতিল হবে কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। এই মতটি গ্রহণ করেছেন প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ও বিখ্যাত তাবে’ঈ হাসান বাসরী রাহিমাহুল্লাহ। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-ও এ মত পোষণ করেছেন—বিশেষত যদি ব্যক্তি হাদী সঙ্গে নিয়ে আসে, অথবা নিজ দেশের বাইরে অন্য কোথাও সফর করে।এছাড়া ইবনুল হুমাম, ইবনুল মুনযির এবং ইবনু হাযম-ও তামাত্তু’ বাতিল না হওয়ার মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবেও মূলত এ মতই পাওয়া যায়, যদিও সফরের দূরত্ব ও ধরন নিয়ে তাদের মধ্যে কিছু বিস্তারিত পার্থক্য রয়েছে। বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই বিশিষ্ট ফকীহ আব্দুল আযীয ইবনে বায এবং মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন-ও এ মতকেই শক্তিশালী বলেছেন—বিশেষত যখন ব্যক্তি নিজের দেশে ফিরে না গিয়ে সৌদি আরবের অন্য কোথাও যেমন মদিনা,তায়েফ সফর করে।দলিলের আলোকে এটিই এই মাসালায় অধিক প্রকাশ্য ও অধিক প্রাধান্যযোগ্য মত।
.
​এই মতের পক্ষে প্রথম দলিল: আল্লাহ তাআলার বাণী: فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ(অর্থ: “অতঃপর যে ব্যক্তি হজ্ব পর্যন্ত উমরাহর দ্বারা লাভবান (তামাত্তু’) হতে চায়, সে যেন সাধ্যমত হাদী (পশু কোরবানি) দান করে। আর যে ব্যক্তি তা পাবে না, সে যেন হজ্বের দিনসমূহে তিনটি এবং ফিরে যাওয়ার পর সাতটি রোযা রাখে; এই হলো পূর্ণ দশটি। এই নিয়ম তার জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা [মক্কাবাসী] নয়।”(সূরা বাকারা আয়াত: ১৯৬) এর আলোকে আলেমগন বলেছেন,এই আয়াতটি সাধারণ (আম)। ইবনুল মুনযির বলেন: আয়াতে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া ব্যক্তি এবং ফিরে না যাওয়া ব্যক্তির মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম করা হয়নি। যদি এই বিষয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকত, তবে আল্লাহ তাঁর কিতাবে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে তা স্পষ্ট করে দিতেন।”(আল-ইশরাফ আলা মাযাহিবিল উলামা (৩/ ২৯৭)।
.
​ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:لا خلاف فيمن جاز على ميقات لا يريد حجاً، ولا عمرة، ولا دخول مكة لكن لحاجة له… لا يلزمه الإهلال من هنالك، وأنَّه إن بدا له في الحج والعمرة، وقد تجاوز الميقات فإنَّه يهل من مكانه ذلك، وحجه تام وعمرته تامة، وأنَّه غير مقصر في شيء مما يلزمه. فصح أنَّ القصد للحج أو العمرة من بلد الإنسان، أو من مثل بلده في البعد، أو من الميقات لمن لم يمر به، وهو يريد حجاً أو عمرة ليس شيء من ذلك من شروط الحج “এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, যে ব্যক্তি কোনো মীকাত অতিক্রম করল অথচ সে হজ্ব বা ওমরার ইচ্ছা রাখেনি, এমনকি মক্কায় প্রবেশের উদ্দেশ্যও তার ছিল না, বরং নিজের কোনো প্রয়োজনে (সেখান দিয়ে) গেছে… তার জন্য সেখান থেকে ইহরাম বাঁধা আবশ্যক নয়। পরবর্তীতে (মীকাত অতিক্রম করার পর) যদি তার মধ্যে হজ্ব বা ওমরার ইচ্ছা জাগ্রত হয়—অথচ সে মীকাত অতিক্রম করে গেছে—তবে সে তার ওই (বর্তমান) স্থান থেকেই ইহরাম বাঁধবে। আর তার হজ্ব ও ওমরাহ পূর্ণাঙ্গ হবে এবং তার ওপর ওয়াজিব (আবশ্যক) কোনো কিছুতেই সে ত্রুটিকারী বা অবহেলাকারী বলে গণ্য হবে না।সুতরাং এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, কোনো মানুষের নিজস্ব দেশ থেকে, কিংবা দূরত্বের দিক থেকে তার দেশের সমপর্যায়ের কোনো স্থান থেকে, অথবা যে ব্যক্তি মীকাত অতিক্রম করেনি (ভিন্ন পথ দিয়ে এসেছে) তার জন্য মীকাত থেকে হজ্ব বা ওমরার সংকল্প (নিয়ত) করা—এর কোনোটিই হজ্ব (শুদ্ধ হওয়ার) শর্তসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়।”।( আল মুহাল্লা খন্ড: ৭ পৃষ্ঠা: ১৬৪)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কোনো মুতামাত্তি‘ ব্যক্তি যদি উমরার পর নবী ﷺ-এর মসজিদ (মদিনা) জিয়ারত করতে যায় অথবা তায়েফে বের হয়, তারপর মক্কায় ফিরে আসে, তাহলে কি তার উপর ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে?
তিনি উত্তরে বলেন: لا يلزمه الإحرام، يعني: إذا أدى المتمتع العمرة، وخرج من مكة إلى الطائف أو إلى جدة أو إلى المدينة، ثم رجع فإنه لا يلزمه الإحرام بالحج، لأنه رجع إلى مقره، فيحرم بالحج يوم التروية من مكة، كما لو كان من أهل مكة وذهب إلى المدينة في أشهر الحج، ثم رجع من المدينة وهو في نيته أن يحج في هذا العام، فإنه لا يلزمه الإحرام بالحج إلا من مكة … اتنهى .“তার উপর ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে না। অর্থাৎ, যখন মুতামাত্তি‘ ব্যক্তি উমরা সম্পন্ন করে, এরপর মক্কা থেকে তায়েফ, জেদ্দা বা মদীনায় যায়, তারপর ফিরে আসে, তখন তার উপর হজের ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে না। কারণ সে তার অবস্থানস্থলে ফিরে এসেছে। তাই সে ইয়াওমুত তারওিয়াহর দিন মক্কা থেকেই হজের ইহরাম বাঁধবে। যেমন মক্কার অধিবাসী কেউ হজের মাসগুলোতে মদীনায় গেল, তারপর এ বছরের হজ্ব করার নিয়তসহ মদীনা থেকে ফিরে এলো—তাহলেও তার উপর মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও থেকে হজের ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে না…”সমাপ্ত। গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১১৫৫৮৬)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) অপর ফাতাওয়ায় আরও স্পষ্ট করে বলেছেনঃإذا أحرم الإنسان بالتمتع، ووصل إلى مكة: فالواجب عليه أن يطوف ويسعى ويقصر، وبذلك يحل من عمرته، وله بعد ذلك أن يخرج إلى جدة ، أو إلى الطائف ، أو إلى المدينة ، أو إلى غيرها من البلاد ، ولا ينقطع تمتعه بذلك ، حتى لو رجع محرماً بالحج ، فإن التمتع لا ينقطع .أما لو سافر إلى بلده، ثم عاد من بلده محرماً بالحج: فإن تمتعه ينقطع.فإن عاد محرماً بعمرة، بعد أن رجع إلى بلده، صار متمتعاً بالعمرة الثانية، لا بالعمرة الأولى؛ لأن العمرة الأولى انقطعت عن الحج بكونه رجع إلى بلده .وخلاصة القول: أن من كان متمتعاً، فله أن يسافر بين العمرة والحج إلى بلده، أو غيره.لكن إن سافر إلى بلده، ثم عاد محرماً بالحج: فقد انقطع تمتعه، ويكون مفرداً. وإن سافر إلى غير بلده، ثم عاد محرماً بالحج: فإنه لا يزال على تمتعه، وعليه الهدي كما هو معروف “যখন কোনো মানুষ তামাত্তু হজের ইহরাম বাঁধে এবং মক্কায় পৌঁছায়, তখন তার ওপর ওয়াজিব হলো—তাওয়াফ করা, সাঈ করা এবং চুল ছোট করা (কাটা)। আর এর মাধ্যমেই তিনি তার উমরাহ থেকে হালাল হয়ে যাবেন। এরপর তার জন্য জেদ্দা, তায়েফ, মদীনা কিংবা অন্য যেকোনো শহরে (বা দেশে) যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। এর দ্বারা তার তামাত্তু (হজ) বিচ্ছিন্ন (বা বাতিল) হবে না; এমনকি সে যদি (সেখান থেকে সরাসরি) হজের ইহরাম বেঁধেও ফিরে আসে, তবুও তার তামাত্তু ভঙ্গ হবে না।তবে, সে যদি নিজ দেশে ফিরে যায়, অতঃপর নিজ দেশ থেকে হজ্বের ইহরাম বেঁধে ফিরে আসে, তাহলে তার তামাত্তু বিচ্ছিন্ন (বাতিল) হয়ে যাবে।আর যদি সে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পর (সেখান থেকে) পুনরায় উমরার ইহরাম বেঁধে ফিরে আসে, তবে সে এই দ্বিতীয় উমরার কারণে ‘মুতামাত্তি‘ (তামাত্তুকারী) হিসেবে গণ্য হবে, প্রথম উমরার কারণে নয়। কারণ, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ফলে প্রথম উমরাটি হজ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
​সারকথা হলো: যিনি তামাত্তুকারী, তিনি উমরা ও হজের মধ্যবর্তী সময়ে নিজ দেশে কিংবা অন্য কোথাও সফর করতে পারেন।কিন্তু তিনি যদি নিজ দেশে সফর করেন (ফিরে যান), অতঃপর হজের ইহরাম বেঁধে ফিরে আসেন, তবে তার তামাত্তু বাতিল হয়ে যাবে এবং তিনি ‘মুফরিদ’ (এককভাবে কেবল হজ সম্পাদনকারী) হয়ে যাবেন।আর যদি তিনি নিজ দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করেন, অতঃপর হজের ইহরাম বেঁধে ফিরে আসেন, তবে তিনি তার তামাত্তু’র ওপরই বহাল থাকবেন এবং নিয়মানুযায়ী তার ওপর ‘হাদি’ (কুরবানি) আবশ্যক হবে।”(ইবনু উসাইমীন;আল-লিক্বাউশ শাহরী, লিক্বা নং-১৬/৪)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:إذا أحرمت بالعمرة في أشهر الحج ، وأنت قد نويت الحج هذا العام فأنت متمتع… ما لم ترجع إلى بلدك ، فإذا رجعت إلى بلدك ثم عدت من بلدك محرما بالحج وحده : فأنت غير متمتع ؛ فلا هدي عليك “যখন তুমি হজের মাসগুলোতে উমরার ইহরাম বাঁধো এবং এ বছরের হজ করার নিয়ত রাখো, তাহলে তুমি মুতামাত্তি‘ যতক্ষণ না তুমি নিজ দেশে ফিরে যাও।অতঃপর যদি তুমি নিজ দেশে ফিরে যাও, তারপর নিজ দেশ থেকে শুধু হজের ইহরাম বেঁধে ফিরে আসো, তাহলে তুমি মুতামাত্তি‘ নও; সুতরাং তোমার উপর কোনো হাদি নেই।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ১৯১)
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেছেন:” ما دمت قادما من بلادك وأنت تريد الحج وأحرمت بالعمرة في أشهر الحج فأنت متمتع سواء نويت أنك متمتع أم لم تنوه ؛ لأن هذا الذي فعلته هو التمتع“যতক্ষণ তুমি নিজ দেশ থেকে হজের উদ্দেশ্যে আগত হও এবং হজের মাসগুলোতে উমরার ইহরাম বাঁধো, তাহলে তুমি মুতামাত্তি‘ চাই তুমি তামাত্তু‘র নিয়ত করো বা না করো। কারণ তুমি যা করেছ, সেটাই তো তামাত্তু‘।(ইবনু উসাইমীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৩০১)
.
এমনকি ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ“আমি রমযানে উমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে এসেছিলাম এবং হজ পর্যন্ত অবস্থান করার নিয়ত করেছিলাম। শাওয়ালের চতুর্থ দিনে আমি আমার মৃত বোনের পক্ষ থেকে একটি উমরা আদায় করি। অথচ আমি জানতাম না যে, কেউ যদি হজের মাসগুলোতে উমরা করে তাহলে সে মুতামাত্তি‘ হিসেবে গণ্য হয়। তাহলে এখন কি আমার উপর হাদি আবশ্যক হবে, যেহেতু আমি মুতামাত্তি‘ হয়ে গেছি?
তিনি উত্তরে বলেন:
المتمتع هو الذي يحرم بالعمرة في أشهر الحج بعد دخول شهر شوال بنية الحج هذا العام ثم يحج، ويجب على المتمتع ما استيسر من الهدي ، شاة ، ماعز ، ضأن تم له ستة أشهر، وسلم من العيوب المانعة من الإجزاء ، وإذا لم تجد فصيام ثلاثة أيام في الحج وسبعة إذا رجعت ، تلك عشرة، ثلاثة أيام بالحج، تبتدىء من حين أن يحرم بالعمرة، يعني مثلا الإنسان متمتع الآن وليس عنده فلوس، نقول: صم من الآن، صم ثلاثة أيام في الحج وسبعة إذا رجع إلى أهله وانتهى سفره، ولو قال: لا أستطيع أن أصوم تبتباعا؟
قلنا: يصوم يوما ويفطر يوما أو يومين، والدليل أن الله قال: (فصيام ثلاثة أيام في الحج) ولم يقل: متتابعة، ولو أراد الله منا أن نتابع لقال متتابعة، ولو قال: لا أستطيع أن أصوم عندي سكر وأحتاج إلى ماء ولا أستطيع أن أصوم ثلاثة أيام ولا يوما واحدا ، فليس عليه شيء، والدليل: قال الله- عز وجل-: (لا يكلف الله نفسا إلا وسعها) “
“মুতামাত্তি‘ হলো সেই ব্যক্তি, যে শাওয়াল মাস প্রবেশের পর হজের মাসগুলোতে এ বছরের হজের নিয়তে উমরার ইহরাম বাঁধে, অতঃপর হজ্ব আদায় করে।আর মুতামাত্তি‘র উপর সহজলভ্য হাদি আবশ্যক হয়,একটি ভেড়া বা ছাগল; এমন ভেড়া যা ছয় মাস পূর্ণ করেছে এবং এমন ত্রুটিমুক্ত যা কুরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য। আর যদি সে হাদি না পায়, তাহলে হজের সময় তিন দিন এবং ফিরে যাওয়ার পর সাত দিন রোজা রাখবে। এভাবে মোট দশ দিন হবে।হজ্বের মধ্যে তিন দিন,এটি উমরার ইহরাম বাঁধার পর থেকেই শুরু করা যায়। অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি এখন মুতামাত্তি‘ হয়েছে কিন্তু তার কাছে টাকা নেই, তখন আমরা বলব: এখন থেকেই রোজা রাখো। হজের মধ্যে তিন দিন এবং নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে সফর শেষ হওয়ার পর সাত দিন রোজা রাখবে।যদি সে বলে: ‘আমি ধারাবাহিকভাবে রোজা রাখতে পারব না?
আমরা বলব: সে একদিন রোজা রাখবে, তারপর একদিন বা দুইদিন বিরতি দেবে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তাহলে হজের মধ্যে তিন দিন রোজা রাখতে হবে।”আল্লাহ বলেননি: “ধারাবাহিকভাবে”। যদি আল্লাহ আমাদের উপর ধারাবাহিক করা আবশ্যক করতেন, তাহলে অবশ্যই “متتابعة” (একটানা) বলতেন।আর যদি সে বলে:“আমি রোজা রাখতে পারি না। আমার ডায়াবেটিস আছে, পানি প্রয়োজন হয়, আমি তিন দিন তো দূরের কথা, একদিনও রোজা রাখতে পারি না।” তাহলে তার উপর কিছুই আবশ্যক হবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ“আল্লাহ কোনো প্রাণকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা: ৪২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,من جاء للحج وأدى العمرة ثم بقي في جده أو الطائف وهو ليس من أهلهما ثم أحرم بالحج فهذا متمتع، فخروجه إلى الطائف أو جده أو المدينة لا يخرجه كونه متمتعا، لأنه جاء لأدائهما جميعا، وإنما سافر إلى جدة أو الطائف لحاجة، وكذا من سافر إلى المدينة للزيارة كل ذلك لا يخرجه عن كونه متمتعا في الأظهر والأرجح فعليه هدي التمتع ..“যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে আসে এবং উমরা আদায় করে, অতঃপর জেদ্দা বা তায়েফে অবস্থান করে—যদিও সে ঐ দুই স্থানের অধিবাসী না হয়—এরপর হজের ইহরাম বাঁধে, তাহলে সে মুতামাত্তি‘ (তামাত্তু‘কারী) হিসেবেই গণ্য হবে।কারণ তার তায়েফ, জেদ্দা বা মদীনায় বের হওয়া তাকে মুতামাত্তি‘ হওয়া থেকে বের করে দেয় না। কেননা সে মূলত উমরা ও হজ উভয়টিই আদায়ের উদ্দেশ্যে এসেছে। আর জেদ্দা বা তায়েফে গিয়েছে কোনো প্রয়োজনবশত। অনুরূপভাবে কেউ যদি যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনায় সফর করে, তাহলেও তা তাকে মুতামাত্তি‘ হওয়া থেকে বের করবে না—এটাই অধিক প্রকাশ্য ও অধিক প্রাধান্যযোগ্য মত। সুতরাং তার উপর তামাত্তু‘র হাদি (কুরবানি) আবশ্যক হবে…” সমাপ্ত।
.
অপর ফাতাওয়ায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ“এক ব্যক্তি শাওয়াল মাসে উমরা আদায় করেছে, এরপর নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। তারপর মক্কায় ফিরে এসে ইফরাদ হজের নিয়ত করেছে। সে কি মুতামাত্তি‘ গণ্য হবে এবং তার উপর কি হাদি আবশ্যক হবে?”
তিনি উত্তরে বলেন:
إذا أدى الإنسان العمرة في شوال، ثم رجع إلى أهله، ثم أتى بالحج مفرداً: فالجمهور على أنه ليس بمتمتع ، وليس عليه هدي ، لأنه ذهب إلى أهله ثم رجع بالحج مفرداً. وهذا هو المروي عن عمر وابنه رضي الله عنهما ، وهو قول الجمهور.والمروي عن ابن عباس: أنه يكون متمتعاً ، وأن عليه الهدي ، لأنه جمع بين الحج والعمرة في أشهر الحج في سنة واحدة.أما الجمهور فيقولون : إذا رجع إلى أهله ، وبعضهم يقول : إذا سافر مسافة قصر ثم جاء بحج مفرد، فليس بمتمتع .والأظهر ـ والله أعلم ـ أن الأرجح ما جاء عن عمر وابنه رضي الله عنهما ، أنه إذا رجع إلى أهله فإنه ليس بمتمتع ، ولا دم عليه ، وأما من جاء للحج وأدى العمرة، ثم بقي في جدة أو الطائف، وهو ليس من أهلهما، ثم أحرم بالحج فهذا متمتع ، فخروجه إلى الطائف أو جدة أو المدينة لا يخرجه عن كونه متمتعاً ، لأنه جاء لأدائهما جميعاً ، وإنما سافر إلى جدة أو الطائف لحاجة ، وكذا من سافر إلى المدينة للزيارة، كل ذلك لا يخرجه عن كونه متمتعاً، في الأظهر والأرجح، فعليه هدي التمتع ، ويسعى للحج كما سعى لعمرته “
“যখন কোনো ব্যক্তি শাওয়ালে উমরা আদায় করে, এরপর নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যায়, তারপর ইফরাদ হজ্বের উদ্দেশ্যে আসে,তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে সে মুতামাত্তি‘ নয় এবং তার উপর হাদি আবশ্যক নয়।কারণ সে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গিয়েছিল, তারপর আলাদা ইফরাদ হজ্বের নিয়তে এসেছে। এ মতটিই উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।তবে ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাকে মুতামাত্তি‘ মনে করেন এবং বলেন যে, তার উপর হাদি আবশ্যক হবে। কারণ সে একই বছরে হজের মাসগুলোর মধ্যে উমরা ও হজ্ব একত্র করেছে।কিন্তু অধিকাংশ আলেম বলেনঃ যখন সে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গেছে,আর কিছু আলেম বলেন, যদি সে কসর পরিমাণ দূরত্ব সফর করে,তারপর ইফরাদ হজ্ব নিয়ে আসে, তাহলে সে আর মুতামাত্তি‘ থাকবে না। প্রকাশ্য ও অধিক প্রাধান্যযোগ্য মত,আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত,হলো উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর পুত্র থেকে যে মত বর্ণিত হয়েছে তা। আর তা হলো, যখন কেউ নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যায়, তখন সে আর মুতামাত্তি‘ থাকে না এবং তার উপর কোনো দম (কুরবানি) ও আবশ্যক হয় না।তবে যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে আসে, উমরা আদায় করে, তারপর জেদ্দা বা তায়েফে অবস্থান করে।যদিও সে ঐ দুই স্থানের অধিবাসী নয়।এরপর হজের ইহরাম বাঁধে, তাহলে সে মুতামাত্তি‘ হিসেবেই গণ্য হবে। কারণ তার তায়েফ, জেদ্দা বা মদীনায় বের হওয়া তাকে তামাত্তু‘ থেকে বের করে দেয় না। কেননা সে মূলত উমরা ও হজ উভয়টিই আদায়ের উদ্দেশ্যে এসেছে। আর জেদ্দা বা তায়েফে গিয়েছে কোনো প্রয়োজনবশত। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি যিয়ারতের জন্য মদীনায় সফর করে, তার ক্ষেত্রেও একই হুকুম। এসব কিছুই তাকে মুতামাত্তি‘ হওয়া থেকে বের করবে না, এটাই অধিক প্রকাশ্য ও অধিক প্রাধান্যযোগ্য মত। সুতরাং তার উপর তামাত্তু‘র হাদি (কুরবানি) আবশ্যক হবে। আর তাকে হজের জন্য সাঈ করতে হবে, যেমন সে উমরার জন্য সাঈ করেছিল।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৯৬)।
.
তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তামাত্তু‘ হজের উদ্দেশ্যে উমরাহ আদায় করার পর মদিনা, তায়েফ কিংবা অন্য কোনো দূরবর্তী স্থানে সফর করেন, তিনি চাইলে পুনরায় সেখানকার মীকাত থেকে উমরাহর ইহরাম বেঁধে মক্কায় ফিরে এসে আরেকটি উমরাহ আদায় করতে পারেন। এরপর ৮ জিলহজ্ব পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করে হজ সম্পন্ন করলে তিনি মুতামাত্তি‘ হিসেবে গণ্য হবেন।
এ প্রসঙ্গে ইমাম আবদুল আযীয ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) অন্য একটি ফাতওয়ায় বলেন:وإن رجع محرماً بالعمرة – يعني في سفره الثاني- وحل منها، ثم أقام حتى يحج: فهذا متمتع ، وعمرته الأولى لا تجعله متمتعاً عند الجمهور، ولكن صار متمتعاً بالعمرة الأخيرة التي أداها، ثم بقي في مكة حتى حج“যদি সে দ্বিতীয় সফরে উমরাহর ইহরাম বেঁধে ফিরে আসে, অতঃপর উমরাহ সম্পন্ন করে হালাল হয় এবং হজ্ব পর্যন্ত অবস্থান করে, তাহলে সে মুতামাত্তি‘ হবে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, তার প্রথম উমরাহ তাকে মুতামাত্তি‘ বানায়নি; বরং সর্বশেষ যে উমরাটি সে আদায় করেছে, সেটির কারণেই সে মুতামাত্তি‘ হয়েছে। এরপর সে মক্কায় অবস্থান করেছে এবং পরবর্তীতে হজ আদায় করেছে।”—(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাতুম মুতানাওয়ি‘আহ (১৭/৯৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ“আমি ১৩৯৫ হিজরির শাওয়াল মাসে উমরার মানাসিক আদায় করেছি। উমরা শেষে নিজ শহরে ফিরে গেছি। এখন ইনশাআল্লাহ একই বছর ১৩৯৫ হিজরিতে হজ আদায়ের ইচ্ছা রাখি। তাহলে কি আমার উপর ফিদইয়া/হাদি আবশ্যক হবে, নাকি হবে না?
তারা উত্তরে বলেন:جمهور الفقهاء يرون أنه ليس عليك هدي؛ لأنك لم تتمتع بالعمرة إلى الحج في سفرة واحدة، حيث ذكرت أنك رجعت بعد أداء العمرة في شوال عام 95هـ إلى بلدك، ولم تبق بمكة حتى تؤدي الحج.ويرى بعض الفقهاء أن عليك الهدي إذا حججت من عامك ولو رجعت إلى بلدك أو إلى أبعد منها؛ لعموم قوله تعالى: ( فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ ) البقرة/196 . والفتوى والعمل جاريان على قول الجمهور من عدم وجوب الهدي في ذلك “অধিকাংশ ফকীহের মতে, তোমার উপর হাদি আবশ্যক হবে না। কারণ তুমি একই সফরে উমরা থেকে হজ পর্যন্ত তামাত্তু‘ করোনি। কেননা তুমি উল্লেখ করেছ যে, ৯৫ হিজরির শাওয়ালে উমরা আদায়ের পর নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলে এবং হজ আদায় পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করোনি। তবে কিছু ফকীহের মতে, যদি তুমি একই বছরে হজ করো, তাহলে তোমার উপর হাদি আবশ্যক হবে,যদিও তুমি নিজ দেশে বা তার চেয়েও দূরে ফিরে গিয়ে থাকো। তারা আল্লাহ তাআলার এ সাধারণ বাণী দ্বারা দলিল গ্রহণ করেছেনঃ“অতঃপর যে ব্যক্তি উমরার মাধ্যমে হজ পর্যন্ত উপকৃত হবে, তার উপর সহজলভ্য হাদি আবশ্যক।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৯৬] তবে ফতোয়া ও আমল অধিকাংশ আলেমের মত অনুযায়ী চলছে,যে এ অবস্থায় হাদি ওয়াজিব নয়।”(ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৬৬)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনার সারকথা হলো—কেউ যদি উমরাহ সম্পন্ন করার পর ৮ই জিলহজ্বের পূর্বে মদিনা, তায়েফ বা জেদ্দার মতো দূরবর্তী স্থানে সফর করেন, তাহলে তার তামাত্তু‘ হজ্ব বাতিল হবে না; বরং বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তা সহীহ ও বহাল থাকবে। কারণ আলেমগন তামাত্তু‘ ভঙ্গ হওয়ার বিষয়টি মূলত নিজ দেশ বা স্থায়ী বাসস্থানে ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছেন, সৌদি আরবের অন্য কোনো শহরে সফর করার সঙ্গে নয়। সুতরাং মদিনা বা তায়েফ সফরকারী ব্যক্তি মক্কায় ফিরে আসার সময় স্বাভাবিক পোশাকেই মীকাত অতিক্রম করে মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন; তার জন্য নতুন করে ইহরাম বাঁধা বা উমরাহ করা আবশ্যক নয়। তবে তিনি চাইলে মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে পুনরায় উমরাহ আদায় করতে পারেন। অতঃপর ৮ই জিলহজ্বে তিনি মক্কায় অবস্থানস্থল থেকেই হজের ইহরাম বেঁধে তামাত্তু‘ হজ সম্পন্ন করবেন এবং বিধান অনুযায়ী তাঁর ওপর তামাত্তু‘র হাদী বা কুরবানি ওয়াজিব থাকবে”। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই। জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বিধানের মধ্যে পার্থক্য এবং আধুনিক উপায়ে ধর্ষণ প্রমাণ

 ▪️প্রথমত: ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বিধান: মূলগতভাবে ধর্ষণ এক প্রকার ব্যভিচার (জিনা)। তাই সাধারণ অবস্থায় এটি প্রমাণিত হওয়ার জন্য ব্যভিচার প্রমাণের পদ্ধতিই প্রযোজ্য অর্থাৎ চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ধর্ষণের অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি অবিবাহিত হলে তার শাস্তি একশত বেত্রাঘাত এবং বিবাহিত হলে রজম বা পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড। তবে ধর্ষণ যদি অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা কোনো নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে করা হয় তখন এই অপরাধটি ‘হিরাবাহ’ বা দস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের জন্য মাত্র দুজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এই অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফাসাদ (সমাজে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা মায়িদাহ: ৩৩]
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোনো নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষের ওপর ‘হিরাবাহ’ বা দস্যুতার এই শাস্তি কার্যকর হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়, চাই সে ধর্ষণের উদ্দেশ্য সফল করতে পারুক বা না পারুক। কারণ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই সে ‘সন্ত্রাসী বা পথচারীর নিরাপত্তা বিনষ্টকারী’ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আর যদি সে অপহরণের পর ধর্ষণও করে, তবে তার অপরাধের মাত্রা তীব্রতর হবে; কেননা সে তখন দুটি বড় অপরাধ একত্রে করল—ব্যভিচার এবং দস্যুতা।
▪️দ্বিতীয়ত: অমুসলিমদের অপবাদের জবাব: ইসলামের বিরুদ্ধে অমুসলিমদের এই অভিযোগ যে, মুসলিম সমাজে কেবল পুরুষের কথাই চূড়ান্ত, নারী নিজেকে ধর্ষিতা প্রমাণ করতে পারে না এবং পুরুষ অপরাধ করে অনায়াসে পার পেয়ে যায়—তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। শরিয়ত ও প্রচলিত আইন উভয়ের একটি মৌলিক নীতি হলো: “অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ।” কোনো পক্ষ দাবি করলেই—তিনি পুরুষ হোন বা নারী—তা উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা যায় না। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لَادَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
“মানুষকে যদি কেবল তাদের দাবির ভিত্তিতেই সবকিছু দিয়ে দেওয়া হতো, তবে কিছু মানুষ অন্য মানুষের রক্ত ও সম্পদের ওপর দাবি বসিয়ে দিত। তবে নিয়ম হলো, যার বিরুদ্ধে দাবি করা হয়েছে তার ওপর কসম করা আবশ্যক।” [সহিহ বুখারি: ৪২৭৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১১]
ইমাম নওয়াবি (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
هَذَا الْحَدِيثُ قَاعِدَةٌ كَبِيرَةٌ مِنْ قَوَاعِدِ أَحْكَامِ الشَّرْعِ ؛ فَفِيهِ : أَنَّهُ لَا يُقْبَلُ قَوْلُ الْإِنْسَانِ فِيمَا يَدَّعِيهِ بِمُجَرَّدِ دَعْوَاهُ ، بَلْ يَحْتَاجُ إِلَى بَيِّنَةٍ أَوْ تَصْدِيقِ الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
“এই হাদিসটি শরিয়তের বিচারব্যবস্থার একটি অন্যতম মূলনীতি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো মানুষের দাবি কেবল মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা যাবে না বরং এর জন্য অকাট্য প্রমাণ (বাইয়্যিনাহ) লাগবে অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বীকারোক্তি লাগবে।” [শারহ মুসলিম: ১২/৩]
যদি প্রমাণ ছাড়া কেবল কোনো নারীর মৌখিক দাবিতেই ধর্ষণের রায় দেওয়া হতো তবে কারাগারগুলো মানুষের শত্রুদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে যেত, যেখানে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো সুযোগ থাকত না। সমাজ কোনো বিশৃঙ্খল জায়গা নয় যে কেবল নারীর বক্তব্যকেই পরম সত্য ধরে নেওয়া হবে। অন্যথায়, কোনো নারী তার প্রাক্তন প্রেমিকের ওপর প্রতিশোধ নিতে, কোনো ধনী বা বিখ্যাত ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করতে কিংবা নিজের বাবা বা ভাইয়ের অভিভাবকত্ব ও শাসন থেকে মুক্ত হতেও এমন মিথ্যা অভিযোগ তুলতে পারত, যা পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিত।
▪️তৃতীয়ত: নারীর জোরপূর্বক আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ: অকাট্য প্রমাণ বা জোরালো কোনো পারিপার্শ্বিক আলামত ছাড়া কেবল নারীর এই দাবি মেনে নেওয়া যায় না যে, তাকে বাধ্য করা হয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণ না থাকলে তার ওপরও ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। ইমাম ইবনে আবদিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتُكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا ، وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا ، وَاسْتِغَاثَتِهَا، وَصِيَاحِهَا
“নারীর ওপর কোনো শাস্তি থাকবে না যদি এটি সত্য প্রমাণিত হয় যে তাকে বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর খাটানো হয়েছে। আর এটি প্রকাশ পায় সাধারণত নারীর চিৎকার, আর্তনাদ এবং সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে।” [আল ইস্তিযকার: ৭/১৪৬]
▪️চতুর্থত: আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা ও ডিএনএ (DNA) টেস্টের কার্যকারিতা: নারীর শরীরে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি সরাসরি ধর্ষণের প্রমাণ বহন করে না। কারণ এমনটি নারীর সম্মতিতে পারস্পরিক ব্যভিচারের ফলেও হতে পারে—যে ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান শাস্তির যোগ্য। আবার এমনও হতে পারে যে, কোনো বিরোধের জেরে পুরুষকে শাস্তি দেওয়া বা ব্ল্যাকমেইল করার জন্য নারী এই অভিযোগ তুলেছে। এমনকি এটি সরাসরি জিনা বা মিলনের প্রমাণও নাও হতে পারে; কারণ প্রকৃত মিলন ছাড়াই বীর্য নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো বা করা সম্ভব। যেখানে এত রকমের সংশয় ও সম্ভাবনা থাকে, সেখানে শরিয়ত নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া হদ (নির্ধারিত শাস্তি) কায়েম করে না। তদুপরি, ডিএনএ টেস্টের ফলাফলে ভুল হওয়া, ল্যাবরেটরিতে নমুনা অদলবদল হওয়া বা জালিয়াতির সুযোগ থাকে। তাই একে শরিয়তের প্রধান ‘বাইয়্যিনাহ’ বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য করে সরাসরি হদ বা রজম কার্যকর করা যায় না। ইসলামি ফিকহ একাডেমি (রাবেতাতুল আলাম আল ইসলামি)-এর সভায় ডিএনএ-এর ব্যবহারের পরিধি নিয়ে প্রদত্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে:
أَوَّلًا : لَا مَانِعَ شَرْعًا مِنَ الِاعْتِمَادِ عَلَى الْبَصْمَةِ الْوِرَاثِيَّةِ فِي التَّحْقِيقِ الْجِنَائِيِّ ، وَاعْتِبَارِهَا وَسِيلَةَ إِثْبَاتٍ فِي الْجَرَائِمِ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا حَدٌّ شَرْعِيٌّ وَلَا قِصَاصٌ ؛ لِخَبَرِ : ( ادْرَؤُوا الحُدُودَ بالشُّبُهاتِ ) وَذَلِكَ يُحَقِّقُ الْعَدَالَةَ وَالأَمْنِ لِلْمُجْتَمَعِ ، وَيُؤَدِّي إِلَى نَيْلِ الْمُجْرِمِ عِقَابَهُ وَتَبْرِئَةِ الْمُتَّهَمِ ، وَهَذَا مَقْصِدٌ مُهِمٌّ مِنْ مَقَاصِدِ الشَّرِيعَةِ
অপরাধবিজ্ঞানের তদন্তে ডিএনএর ওপর নির্ভর করায় শরিয়তের কোনো বাধা নেই। যেসব অপরাধে শরিয়ত নির্ধারিত হদ বা কিসাস নেই, সেগুলোতে একে প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। কারণ হাদিসে এসেছে: ‘তোমরা সংশয়ের মাধ্যমে হদ বা নির্ধারিত শাস্তিগুলো মওকুফ করো।’ এর ফলে সমাজে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পায় এবং নির্দোষ ব্যক্তি মুক্তি পায় — যা শরিয়তের অন্যতম প্রধান একটি উদ্দেশ্য।” এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, শরিয়ত নির্ধারিত অকাট্য প্রমাণের অভাবে যদি অভিযুক্তের ওপর প্রধান হদ বা নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব নাও হয় তবুও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জোরালো পারিপার্শ্বিক আলামতের (Circumstantial Evidence) ভিত্তিতে বিচারক তার বিবেচনা অনুযায়ী অপরাধীকে ‘তাযির’ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিতে পারেন।
অতএব, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীকে শনাক্ত করে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা সম্ভব এবং সে শাস্তি থেকে পার পাবে না। আর কোনো অপরাধী যদি দুনিয়ার আইনের ফাঁকফোকর গলে বা প্রমাণের অভাবে পার পেয়েও যায়, তবে তা শরিয়তের কোনো ত্রুটি নয়; বরং তা মানুষের সীমাবদ্ধতা বা প্রমাণের অভাবের কারণে ঘটে থাকে।
পরিশেষে, দুনিয়ার শাস্তি থেকে বাঁচলেও আখিরাতের কঠিন শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে, যদি না সে খাঁটি তাওবা করে কিংবা মজলুম নারী তাকে ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন)।

[উৎস: Islamqa info]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত এবং কুরবানি ও ঈদের বিধি-বিধান

 জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত এবং কুরবানি ও ঈদের বিধি-বিধান:

فَضْلُ عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ وَأَحْكَامُ الْأُضْحِيَةِ وَعِيدِ الْأَضْحَى الْمُبَارَكِ
( بِاللُّغَةِ الْبَنْغَالِيَّةِ )
প্রণয়নে: অনুবাদ বিভাগ
আস সুলাই ইসলামি দাওয়াহ সেন্টার, রিয়াদ, সৌদি আরব।
প্রথম কথা:
اَلْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى أَشْرَفِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ أَمَّا بَعْدُ.
প্রশংসা বলতে যা কিছু সব টুকুই বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার পাওনা। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল — আমাদের নবী মুহাম্মাদ +সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের উপরও অগণিত শান্তির ধারা বর্ষিত হোক। এরপর কথা হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন সময় নানাবিধ ভালো কাজের সুব্যবস্থা দিয়ে করুণা করে থাকেন। যাতে তারা ঐ সময়ের মধ্যে ভালো কাজ করে কল্যাণময় জীবনের পুঁজিভাগ বৃদ্ধি করতে পারে। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা মানুষের জীবনে বারবার আসলেও তন্মধ্যে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ব্যাপারটা অন্যরকম। কেননা এ দিনগুলিতে নানা রকমের ভালো কাজের সমাবেশ ঘটেছে। এ দিনগুলির ফজিলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে ভূরি ভূরি প্রমাণ বিদ্যমান। তন্মধ্যে দুচারটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
🔸জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত:
১. মহান আল্লাহর বাণী:
وَالْفَجْرِ ۝ وَلَيَالٍ عَشْرٍ
“কসম ভোরবেলার, আরও শপথ দশ রাতের” [সুরা ফাজর: ১-২]। ইবনে কাসির (রাহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “এখানে দশ রাত বলতে জিলহজের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে”।
২. মহান আল্লাহর বাণী:
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِيْ أَيَّامٍ مَّعْلُوْمَاتٍ
“আর যাতে তারা মহান আল্লাহকে নির্দিষ্ট দিনগুলিতে বিশেষভাবে স্মরণ করে” [সুরা হজ: ২৮]। হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাজিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, “এখানে নির্দিষ্ট দিনগুলি বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনই ইঙ্গিত করা হয়েছে”।
৩. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান:
«مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ قَالَ: «وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ»
“কোনো আমলই এ দশ দিনের আমলের সমকক্ষ নয়”। জিহাদও নয়? বলে সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন: “না, জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ যে ব্যক্তি জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার কোনো কিছুই আর ফেরত আসেনি” (অর্থাৎ তিনি যুদ্ধের ময়দানে শহিদ হয়ে গেছেন। ঐ ব্যক্তির জিহাদ এ দশ দিনের আমলের সমকক্ষ হতে পারে) [বুখারি]।
৪. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান:
«مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ سُبْحَانَهُ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ»
“মহাপবিত্র মহান আল্লাহর নিকটে এই দশ দিনের নেক কাজের তুলনায় মহৎ ও প্রিয় কোনো কাজ নেই। সুতরাং তাতে তাকবির ধ্বনি, মহান আল্লাহর প্রশংসা বাণী ও তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা করতে থাক” [ইমাম তাবরানি (রাহ.) মুজামুল কাবির গ্রন্থে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন]।
৫. হজরত সাঈদ বিন জুবায়র (রাহেমাহুল্লাহ) (যিনি হজরত ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত পূর্বোল্লিখিত হাদিসের বর্ণনাকারী) জিলহজ মাসের প্রথম দশকে চূড়ান্ত পর্যায়ে ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতেন। (ইমাম দারেমি (রাহ.) হাসান সনদে গ্রহণযোগ্য সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন)।
৬. হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রাহ.) স্বীয় ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: “জিলহজ মাসের প্রথম দশকে সালাত (নামাজ), সিয়াম (রোজা), সদকা, হজ ইত্যাদি মৌলিক ইবাদতসমূহ একত্রিত হয়ে থাকে, যা অন্য কোনো সময় হয় না। বোধহয় এ কারণেই উহাকে এত মর্যাদাবান করা হয়েছে”।
৭. মুহাদ্দিক-গবেষণাকারী আলেমগণ বলেন: ‘দিন হিসাবে উত্তম দিন হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আর রাত হিসাবে উত্তম রাত হলো রমজান মাসের শেষ দশ রাত’।
🔸 এ দিনগুলিতে করণীয় কাজসমূহ:
১. সালাত (নামাজ): ফরজ নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া আর নফলসমূহ বেশি বেশি আদায় করা। কেননা উহা মহান মালিকের নৈকট্য লাভের অতি উত্তম পন্থা। হজরত সাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:
«عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلهِ، فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلهِ سَجْدَةً إِلَّا رَفَعَكَ اللهُ بِهَا دَرَجَةً وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً»
“তোমার উচিত মহান আল্লাহর জন্যে বেশি বেশি সিজদায় লুটিয়ে পড়া। কেননা তুমি সিজদা করামাত্রই উহার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তোমার এক স্তর মর্যাদা বৃদ্ধি করেন আর একটি করে পাপ মাফ করেন” [মুসলিম]। বলাবাহুল্য এ সুযোগ সব সময়ের জন্যেই।
২. সিয়াম: হুনায়দাহ বিন খালেদ স্বীয় স্ত্রীর মাধ্যমে কোনো কোনো নবি-সহধর্মিণী হতে বর্ণনা করেন। তিনি (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ»
“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, আশুরার দিন আর প্রত্যেক চাঁদে (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) তিন দিন রোজা পালন করতেন” [আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসাঈ]।
ইমাম নাওয়াভি (রাহেমাহুল্লাহ) এ দশ দিনের মধ্যে রোজা পালন করা সম্পর্কে বলেন: ‘উহা অত্যন্ত ভালো কাজ’।
৩. তাকবির: (মহান আল্লাহর মহত্ব ধ্বনি), তাহলিল (তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা) আর তাহমিদ (তাঁর প্রশংসা বাণী) পাঠ করা যা পূর্বোল্লিখিত ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
সুতরাং ‘ঐ দিনগুলিতে বেশি বেশি তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ পাঠ করতে থাকবে’। ইমাম বুখারি (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এ দিনগুলিতে বাজারে বের হয়ে তাকবির দিলে উপস্থিত জনতা তাদের দেখাদেখি তাকবির দিতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মিনায় স্বীয় তাঁবুতে তাকবির দিলে তা শুনে মসজিদে অবস্থানরত জনতাও তাকবির দিতেন। যার ফলে বাজারের লোকেরাও তাকবির দিতেন। অবশেষে পুরো মিনা তাকবির ধ্বনিতে কেঁপে উঠত।’ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এ দিনগুলিতে মিনায় তাকবির দিতেন; প্রত্যেক নামাজান্তে, স্বীয় বিছানায়, তাঁবুতে, বৈঠকখানায় ও চলার পথে।
হজরত উমর, তাঁর ছেলে এবং আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ফরজ তাকবির পাঠ করতেন বিদায় হজের পুণ্যময় মুহূর্ত বা স্থানগুলোতে। আমরা মুসলিম। আমাদের উচিত, আজকে এই পরিত্যক্ত সুন্নাতকে জীবিত করা; যা প্রায় ভুলতেই বসেছে মুসলিম মিল্লাতের অধিকাংশ জনতা।
৪. আরাফার দিনে রোজা পালন করা: হজ পালনের উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানে অবস্থানরত ব্যক্তি ছাড়া সকল মুসলমানকে ঐ দিন রোজা রাখার প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেননা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ফজিলত সম্পর্কে বলেন:
«صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ»
“আমি আশা করি যে, উহা বিগত ও আগত বর্ষদ্বয়ের (ছোট) গুনাহসমূহের কাফফারাস্বরূপ” [মুসলিম]।
৫. কুরবানির দিনের ফজিলত: এ মহান দিবসের ফজিলত সম্পর্কে অনেক মুসলমান উদাসীন রয়েছেন। অথচ কিছুসংখ্যক ইসলামি বিদ্বান এ দিনকে সারা বছরের সকল দিনগুলির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এমনকি আরাফার দিনের উপরেও। ইমাম ইবনে কাইয়্যেম (রাহ.) বলেন, ‘মহান আল্লাহর নিকটে উত্তম দিন হলো কুরবানির দিন আর ওটাই হলো (হজে আকবার) অর্থাৎ মহান হজের দিন’। সুনানে আবু দাউদে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ মর্মে হাদিস এসেছে — “মহান আল্লাহর নিকটে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো কুরবানির দিন। তারপর (আল কার) অর্থাৎ মিনায় অবস্থানের দিন। আর সেটা হলো একাদশ তারিখ”। কেউ কেউ বলেন, ‘আরাফার দিন এ দিনের চেয়ে উত্তম। কেননা ঐ দিনের রোজা দুই বছরের গুনাহ মোচনকারী এবং মহান আল্লাহ ঐ দিন অধিক পরিমাণ মানুষকে মুক্তি দান করে থাকেন।’ তবে প্রথম মতই যে বিশুদ্ধ এতে কোনো সন্দেহ নেই।
▪️এ সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
একমাত্র পাপ-পঙ্কিলতাই হলো মহান আল্লাহর দয়া-মায়া ও বদান্যতা লাভের অন্যতম অসহায় বাধা এবং তার ও মহান মালিকের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টিকারী। সুতরাং মুসলমানদের উচিত সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতাকে ঝেড়ে ফেলে খালেস তওবা করতঃ মহান আল্লাহর দিকে ফেরত আসার মাধ্যমে কল্যাণময় মওসুমগুলিকে অভ্যর্থনা জানানো। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
“আর যারা আমার রাস্তায় জিহাদ করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার বিভিন্নমুখি পথের সন্ধান দিয়ে থাকি” [সুরা আনকাবুত: ৬৯]।
তিনি আরও বলেন,
وَسَارِعُوْا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِيْنَ
“তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও জমিন। যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্যে” [সুরা আলে ইমরান: ১৩৩]।
সুতরাং ওহে আমার মুসলিম ভাই! চলমান এ সুবর্ণ সুযোগ চলে যাওয়ার আগেই তাকে কাজে লাগান।
মহান মালিক তাঁর এ বাণীতে উল্লেখ করেছেন:
إِنَّهُمْ كَانُوْا يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوْا لَنَا خَاشِعِيْنَ
“নিশ্চয় তারা ভালো ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত আর আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি সহকারে এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত” [সুরা আম্বিয়া: ৯০]।
▪️কুরবানির কতিপয় বিধান:
মহান আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াতে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“হে নবি! আপনি আপনার প্রভুর জন্যে নামাজ আদায় করুন আর কুরবানি করুন” [সুরা কাওসার: ২]। তিনি আরও বলেন,
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِّنْ شَعَائِرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ
“উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের জবেহ করার সময়ে তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর” [সুরা হজ: ৩৬]।
কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উহা পরিত্যাগ করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। কেননা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, হজরত আনাস (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,
«ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ وَسَمَّى وَكَبَّرَ»
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উঁচু শিং বিশিষ্ট দুটি ধূসর বর্ণের দুম্বা কুরবানি করেছিলেন। তিনি ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে উহা নিজ হস্তেই জবেহ করেছিলেন”।
▪️কুরবানির উপযুক্ত পশুসমূহ:
উট, গরু-মহিষ ও ছাগল জাতীয় পশু ছাড়া অন্য কোনো পশুতে কুরবানি বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْ بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানি নির্ধারণ করেছি যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময়ে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে” [সুরা হজ: ৩৪]।
কুরবানির পশু দোষমুক্ত হওয়া শর্ত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْعَجْفَاءُ الَّتِي لَا تُنْقِي»
চার প্রকার পশু কুরবানির অযোগ্য: স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, স্পষ্ট খোঁড়া এবং অত্যন্ত দুর্বল জীর্ণশীর্ণ ও বোধশক্তিহীন [তিরমিজি]।
▪️জবেহ করার শরিয়তসম্মত সময়:
ঈদের নামাজের পর হতে ১৩ তারিখ সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত কুরবানির পশু জবেহ করার শরিয়তসম্মত সময়। কেননা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا يَذْبَحُ لِنَفْسِهِ، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ وَالْخُطْبَتَيْنِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ»
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে যে জানোয়ার জবেহ করল সে কেবল তার নিজের নফসের খাতিরে জবেহ করল। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাজ ও খুতবাদ্বয়ের পরে জানোয়ার জবেহ করল সে তার কুরবানি পূর্ণ করল এবং সুন্নাতের অনুসরণ করল” [বুখারি ও মুসলিম]।
তিনি আরও বলেন:
«كُلُّ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ ذَبْحٌ»
“তাশরিকের দিনগুলিতেও কুরবানির পশু জবেহ করা যায়” [সিলসিলা সহিহা: ২৪৭৩]। পারলে নিজের কুরবানি নিজ হাতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহুম্মা হাযা আন…….’ বলে জবেহ করা সুন্নাত।
▪️কুরবানির গোশত বণ্টন:
কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবকে হাদিয়া দেওয়া এবং ফকির-মিসকিনকে দান করা সুন্নাত। মহান আল্লাহ বলেন,
فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيْرَ
“অতঃপর উহা হতে তোমরা আহার কর এবং দুঃস্থ ফকিরদেরকে আহার করাও” [সুরা হজ: ২৮]।
তিনি আরও বলেন,
فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ
“— তখন উহা হতে তোমরা নিজেরা আহার কর এবং আহার করাও তাদেরকে যারা চায় না এবং তাদেরকেও যারা চায়” [সুরা হজ: ৩৬]। এ জন্যেই তো সালাফে সালেহিনের কতক মহামনীষী উহা তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেদের জন্যে রাখতেন, এক ভাগ ধনী বন্ধুদের উপঢৌকন দিতেন, আর এক ভাগ গরিব-মিসকিনদেরকে দান করতেন। উল্লেখ্য যে, গোশত বানানোর মজুরি হিসাবে কসাইকে কুরবানির গোশত দেওয়া বৈধ নয়।
▪️কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের করণীয়:
কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর হতে কুরবানি জবেহ করার আগ পর্যন্ত নিজের পশম, নখ, চামড়া ও মাথার চুল না কাটা ভালো। কেননা হজরত উম্মে সালামা (রাজিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণিত হাদিসে আছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান:
«إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ بَشَرِهِ شَيْئًا»
“জিলহজ মাস শুরু হলে তোমাদের মধ্যকার কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যেন তার চুল ও নখ না কাটে” [আহমাদ ও মুসলিম]। অন্য বর্ণনায় এসেছে: “কুরবানি না করা পর্যন্ত নিজের চুল এবং চামড়া কাটবে না” কুরবানিদাতার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর এ সব বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য নয়।
▪️ঈদের আদব এবং উহার বিধি-বিধান:
প্রিয় মুসলিম ভাই! মহান আল্লাহ আমাদেরকে এবারের ঈদেও বাঁচিয়ে রেখে বেশ ভালো ভালো কাজের সুযোগ করে দিয়ে পারলৌকিক জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করার সময়সীমা বাড়িয়ে দিলেন সে জন্যে রিমঝিম ও সজল প্রশংসার হকদার তিনিই। এই তো সেদিনের কথা! গত ঈদ যারা আমাদের সাথে পালন করেছেন তাদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই, আর আসবেনও না কোনো দিন। আজকের দিনের কিছুক্ষণ আগেও তো কত মানুষ চলে গেলেন, তারা এখন কোথায় আছেন কে জানে? সুতরাং হে ভাই আর দেরি নয়। অবহেলাও নয়। হেলায়-খেলায় সময় নষ্ট না করে ঈদের গুরুত্ব উপলব্ধি করি। প্রিয় ভাই!
ঈদের দিন মুসলমানদের অবৈধ কাজে সময় নষ্ট করার দিন নয় বরং উহা ইসলামের প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহের অন্যতম, মুসলিম মিল্লাতের বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন,
ذَلِكَ وَمَنْ يُّعَظِّمْ شَعَائِرَ اللهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ
“অর্থাৎ এটা শুনে রাখ যে, কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান দেখালে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতির প্রসূত” [সুরা হজ: ৩২]। প্রিয় পাঠক/পাঠিকা! সংক্ষিপ্তাকারে আপনাদের সামনে ঈদের বিধানগুলি অর্থাৎ করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. তাকবির: কুরবানির দিনের আগের দিন ফজর হতে তের তারিখ আসর পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
وَاذْكُرُوا اللهَ فِيْ أَيَّامٍ مَّعْدُوْدَاتٍ
“নির্দিষ্ট কতক দিনে আল্লাহকে বিশেষভাবে স্মরণ কর” [সুরা বাকারা: ২০৩]।
তাকবিরের বাক্যগুলি নিম্নরূপ:
اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، وَلِلهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ”।
মহান আল্লাহর মহত্ব ঘোষণা এবং তাঁর ইবাদত ও শুকরিয়া প্রকাশার্থে পুরুষদের জন্যে হাটে-বাজারে, মসজিদে-বাড়িতে বিশেষ করে প্রত্যেক নামাজ শেষে উচ্চস্বরে এ তাকবির পড়া সুন্নাত।
২. গোসল করা এবং অপব্যয় না করে সম্ভাব্য ভালো পোশাক পরিধান করা:
পুরুষগণ পায়ের টাখনু থেকে কাপড় পরবেন না, দাড়ি কাটবেন না এবং স্বর্ণালংকার ব্যবহার করবেন না। কেননা এগুলি তাদের জন্যে হারাম। তারা সুগন্ধি ব্যবহার করবেন। কিন্তু মেহেদি লাগাবেন না। পক্ষান্তরে মহিলাগণ মেহেদি লাগাবেন, সুগন্ধি ব্যবহার করবেন না। তারা পর্দা ও শালীনতার সাথে ঈদগাহে যাবেন। যাদের নামাজ নেই তারা একটু ফাঁকে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকবেন।
৩. সম্ভব হলে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া: ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা সুন্নাত। বৃষ্টি বা ঐ জাতীয় শরিয়তসম্মত কোনো ওজর থাকলে মসজিদে আদায় করা যাবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করেছেন। তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত।
৪. দুই ঈদের নামাজ:
মুসলমানদের সাথে জামাআতে আদায় করা জরুরি: নামাজ শেষে খুতবা শোনা যুক্ত। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহেমাহুল্লাহ) সহ কুরআন ও হাদিস বিশ্লেষণকারীগণের অধিকতর বিশুদ্ধ মত হিসাবে উল্লিখিত। শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া উহা পরিত্যাজ্য নয়। কেননা মহান আল্লাহ বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব হে নবি! আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন” [সুরা কাওসার: ২]। মহিলাগণও মুসলিম মিল্লাতের ঈদগাহে হাজির হবেন। এমনকি অত্যন্ত পর্দানশিন যুবতী কুমারী ও ঋতুবতী মহিলারাও যাতে শরিক হবেন। ঋতুবতীগণ নামাজ না পড়ে একটু ফাঁকে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকবেন।
৫. দুই ঈদের নামাজ সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা:
(ক) ঈদের নামাজের কোনো আজান-ইকামত নেই।
(খ) ঈদের নামাজের আগে ও পরে কোনো নফল ও সুন্নাত নামাজ নেই।
(গ) ঈদের নামাজের প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমা ছাড়াও অতিরিক্ত আরও ৭টি আর দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কেরাআতের আগে ৫টি অর্থাৎ সর্বমোট ১২টি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হবে।
(ঘ) সূর্য দুই বল্লম পরিমাণ ওঠার পরে ঈদুল ফিতরের নামাজ আর এক বল্লম পরিমাণ ওঠার পরে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করা সুন্নাত।
৬. রাস্তা পরিবর্তন করা: ঈদগাহে যাওয়ার জন্য যে পথ ব্যবহার করা হয়েছে ফেরত আসার সময় ঐ পথে না এসে অন্য পথে ফেরত আসা মুস্তাহাব। কেননা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করেছেন।
৭. কুরবানির পশু জবেহ করা:
কুরবানির পশু ঈদের নামাজের পরে জবেহ করতে হবে। যারা নামাজের আগেই জবেহ করে ফেলেছে তাদেরকে পুনরায় কুরবানি করতে হবে। কেননা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيُعِدْ مَكَانَهَا أُخْرَى»
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজ পড়ার আগেই জবেহ করল সে যেন এটার পরিবর্তে পুনরায় কুরবানি করে” [বুখারি ও মুসলিম]।
৮. ঈদের দিন কুরবানিকৃত পশুর গোশত দিয়ে নাশতা করা: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতরের দিন বেজোড় খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন। আর ঈদুল আজহার দিন কিছু না খেয়ে ঈদগাহে গিয়ে সকাল সকাল নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরে এসে কুরবানি করে উহার গোশত দিয়ে নাশতা করতেন।
৯. ঈদের মুবারকবাদ: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম সালেহাল আমাল’ অর্থাৎ ‘মহান আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের সকল নেক আমল কবুল করুন’ বলে পরস্পরের মুবারকবাদ দেওয়া ভালো।
▪️ঈদের সাথে জড়িত কতকগুলি অবাঞ্ছিত কাজ:
প্রিয় ভাই! অন্যান্যদের মতো আপনিও যেন অবৈধ কাজে জড়িয়ে না পড়েন সে জন্যে সতর্ক হোন:
অন্যের সাথে তাল মিলিয়ে দল বেঁধে তাকবির বলা, নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করা এবং দীর্ঘদিন সাক্ষাৎ না হওয়া ব্যক্তি ও সফর থেকে প্রত্যাগত ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্যদের সাথে কোলাকুলি করা বিদআত।
সুতরাং তা পরিহার করা দরকার। হারাম খেলাধুলা, গান-বাজনা শোনা, অশ্লীল ছবি দেখা এবং বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি কাজ পরিহার করা উচিত। চাঁদ ওঠার পর হতে কুরবানি জবেহ করা পর্যন্ত কুরবানিদাতা নিজের চুল, নখ ইত্যাদি কাটবে না। ছাগল-ভেড়া না পেয়ে গরুতে আকিকা দেওয়া বৈধ হলেও তাতে ভাগাভাগি চলবে না। অতএব আকিকা ও কুরবানি এক গরুতে ভাগে দেওয়া সুস্পষ্ট বিদআত।
পরিশেষে প্রিয় মুসলিম ভাই! সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ছেড়ে দিয়ে খালেস তওবা করে ভালো কাজের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করুন। সেই সাথে সংকীর্ণতা ও হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ঈদের ছুটিতেই আত্মীয়-স্বজন সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে আত্মীয়তার বন্ধনকে সুদৃঢ় করুন। মনের গভীর ভালোবাসা নিয়ে অভাবগ্রস্ত ফকির-মিসকিন ও ইয়াতিমদেরকে সাহায্য করে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করুন। মহান আল্লাহ আপনাদের এবং আমাদেরকে তাঁর পছন্দসই কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সঙ্গী-সাথীদের উপর অনাবিল শান্তির ধারা বর্ষিত হোক।
إِعْدَادُ قِسْمِ الْجَالِيَاتِ, مَكْتَبُ الدَّعْوَةِ بِالسُّلَيِّ, الرياض، المملكة العربية السعودية
অনুবাদ: শায়েখ আমানুল্লাহ (পাবনা)।
সম্পাদনায়: শায়েখ আবুল কালাম আজাদ।
উপস্থাপনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate