Tuesday, July 7, 2026

নামাজের ইস্তিফতাহ রুকু কওমা সিজদা ও দুই সিজদার মাঝখানে বসার সুন্নাহসম্মত দোয়াসমূহ

 ❑ ১. ইস্তিফতাহ বা সালাত শুরুর দুআ যা তাকবিরে তাহরিমার পর পঠিতব্য:

◈ দোয়া-১
وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ، وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الْمَلِكُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي، وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا، إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، وَاهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ، لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا، لَا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ، وَالشَّرُّ لَيْסَ إِلَيْكَ، أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ، تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
উচ্চারণ: ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াাতী ওয়াল আরদ্বা হানীফান্, ওয়া মাা আনা মিনাল মুশরিকীন।
ইন্না সালাাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাাতী লিল্লাাহি রাব্বিল আালামীন, লাা শারীকা লাহু, ওয়া বিযাালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন।
আল্ল-হুম্মা আনতাল মালিকু লাা ইলাাহা ইল্লাা আনতা, আনতা রাব্বী ওয়া আনা আবদুকা, যালামতু নাফসী, ওয়া’তারাফতু বিযাম্বী, ফাগফিরলী যুনূবী জামী’আন্, ইন্নাহু লাা ইয়াগফিরুজ যুনূবা ইল্লাা আনতা, ওয়াহদিনী লিআহসানিল আখলাা ক্ব, লাা ইয়াহদী লিআহসানিহাা ইল্লাা আনতা, ওয়াসরিফ আন্নী সাইয়িআহাা, লাা ইয়াসরিফু আন্নী সাইয়িআহাা ইল্লাা আনতা,
লাব্বাইকা ওয়া সা’দাইকা, ওয়াল খাইরু কুল্লুহু ফী ইয়াদাইকা, ওয়াশ শাররু লাইসা ইলাইকা, আনা বিকা ওয়া ইলাইকা, তাবারাকতা ওয়া তা’আালাইতা,
আসতাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা।
অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে আমার চেহারা সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।
নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য — তাঁর কোনো শরিক নেই।
আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।
হে আল্লাহ! আপনি বাদশাহ, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমার প্রতিপালক এবং আমি আপনার বান্দা। আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। সুতরাং আমার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। আমাকে উত্তম চরিত্রের দিকে হেদায়েত দিন। আপনি ছাড়া কেউ উত্তম চরিত্রের দিকে হেদায়েত দিতে পারে না।
আমার থেকে মন্দ চরিত্র দূর করে দিন। আপনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না।
আমি হাজির, আপনার আনুগত্যে প্রস্তুত। সকল কল্যাণ আপনার হাতে, আর অকল্যাণ আপনার দিকে সম্বন্ধিত নয়। আমি আপনার মাধ্যমেই টিকে আছি ও আপনার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। আপনি বরকতময়, আপনি মহিমান্বিত। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার দিকে তওবা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১ — আলি ইবনে আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৭৬০; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ৩৪২১ — হাদিসের মান: সহিহ]
◈ দোয়া-২ (ইস্তিফতাহ-এর দোয়াগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সহিহ)
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বাা’ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাত্বাায়াায়া কামাা বাা’আদতা বাইনাল মাশরিক্বি ওয়াল মাগরিব, আল্লাহুম্মা নাক্ব ক্বিনী মিনাল খাত্বাায়াা কামাা ইউনাক্ব ক্বাস সাউবুল আবইয়াদু মিনাদ দানাস, আল্লাহুম্মাগসিলনী মিন খাত্বাায়াায়া বিল মাা’ই ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার ও আমার গুনাহসমূহের মাঝে তেমন দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেমন আপনি পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন। হে আল্লাহ! আমাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! আমার গুনাহসমূহ পানি, বরফ ও শিলাবৃষ্টি দিয়ে ধুয়ে দিন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৪৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৫৯৮ — আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, মুত্তাফাকুন আলাইহি। হাফেজ ইবনে হাজার ও ইবনুল হুমাম রহ. একে ইস্তিফতাহ-এর দোয়াগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সহিহ বলে উল্লেখ করেছেন]
◈ দোয়া-৩ (সংক্ষিপ্ততম ইস্তিফতাহ,যা উমর রা. মানুষকে শিক্ষা দিতেন)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবাারাকাসমুকা, ওয়া তা’আালাই জাদ্দুকা, ওয়া লাা ইলাাহা গাইরুক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মহিমা সুউচ্চ, এবং আপনি ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৯৯ — উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর আমল হিসেবে বর্ণিত, সহিহ; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৭৭৫-৭৭৬; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৪২-২৪৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৮০৬ — আয়িশা ও আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত সনদগুলো পৃথকভাবে দুর্বল (জইফ)। তবে পরস্পরকে শক্তিশালী করায় সম্মিলিতভাবে হাসান/সহিহ লি গাইরিহি। আল্লামা আলবানী রহ. একে সহিহ বলেছেন (ইরওয়াউল গালিল, হাদিস নম্বর: ৩৪০) (উমর রা.-এর বর্ণনাসূত্রে)।
হাসান লি গাইরিহী অন্যান্য সূত্রে]
➧ মনে রাখা জরুরি: উপরের তিনটি দোয়ার যেকোনো একটি প্রতি রাকাতের শুরুতে (শুধু প্রথম রাকাতে) একবার পড়া সুন্নাহ; একসাথে সবগুলো মিলিয়ে পড়া সুন্নাহসম্মত নয়। বৈচিত্র্য আনার উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামাজে ভিন্ন ভিন্ন দোয়া পড়া মুস্তাহাব। ইস্তিফতাহ ছুটে গেলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লেও নামাজ সহিহ হয়ে যায়, কেননা এটি ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাহ।
❑ ২. রুকুতে পাঠ করার দোয়া:
◈ দোয়া-১ (সবচেয়ে প্রচলিত)
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহাানা রাব্বিয়াল আযীম।
অর্থ: আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭২]
◈ দোয়া-২ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকু ও সিজদায় সবচেয়ে বেশি পড়তেন)
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্ল-হুম্মা রাব্বানাা ওয়া বিহামদিকা আল্ল-হুম্মাগফিরলী।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৪]
◈ দোয়া-৩
سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন কুদ্দূসুন, রাব্বুল মালাা’ইকাতি ওয়ার রূুহ।
অর্থ: ফেরেশতাকুল ও রুহ (জিবরাইল)-এর প্রতিপালক অত্যন্ত পবিত্র, মহিমান্বিত।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৭]
◈ দোয়া-৪ (বিশেষভাবে নফল বা তাহাজ্জুদে পঠিত)
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي، وَمُخِّي وَعَظْمِي وَعَصَبِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা রাকা’তু, ওয়া বিকা আামানতু, ওয়া লাকা আসলামতু, খাশা’আ লাকা সাম’ঈ ওয়া বাসারী, ওয়া মুখ্খী ওয়া আজমী ওয়া আসাবী।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার জন্যই রুকু করলাম, আপনার প্রতিই ইমান আনলাম, আপনার নিকটই আত্মসমর্পণ করলাম। আপনার সমীপে বিনীত হলো আমার কান, চোখ, মগজ, অস্থি ও স্নায়ুমণ্ডলী।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১]
➧ মনে রাখা জরুরি: রুকুতে ওয়াজিব একবার “সুবহানা রব্বিয়াল আযীম” বলা; বাকি সব দোয়া ও পুনরাবৃত্তি (৩/৫/৭ বার) সুন্নাহ।
❑ ৩. রুকু থেকে ওঠার সময় ও পরের দোয়া (কওমা):
মাথা তোলার সময় ইমাম ও একা নামাজ আদায়কারী বলবেন:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
উচ্চারণ: সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ।
অর্থ: আল্লাহ তার প্রশংসা শুনলেন যে তাঁর প্রশংসা করলো।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৩৬]
এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তাদি, ইমাম ও একা নামাজ আদায়কারী নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক দোয়া পড়বেন:
◈ দোয়া-১
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: রাব্বানাা ওয়া লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৬]
◈ দোয়া-২
رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: রাব্বানাা লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই প্রশংসা (ওয়াও ছাড়া)।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৯২]
◈ দোয়া-৩
اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই প্রশংসা।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৪৮ — হাদিসের মান: সহিহ]
◈ দোয়া-৪:
اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা ওয়া লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৬ (অন্য বর্ণনা)]
দোয়া-৫ (অধিক ফজিলতপূর্ণ):
حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ
উচ্চারণ: হামদান কাসীরান ত্বাইয়্যিবাম মুবাারাকান ফীহ।
অর্থ: এমন প্রশংসা যা প্রচুর, পবিত্র ও বরকতময় (উপরের “রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ”-এর সাথে যুক্ত করে পড়া হয়)।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৭৯৯]
◈ দোয়া-৬
اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ، وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানাা লাকাল হামদু মিলআস সামাাওয়াাতি ওয়া মিলআল আরদ্বি, ওয়া মিলআ মাা শি’তা মিন শাইয়িন বা’দু।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আকাশমণ্ডলী পূর্ণ, পৃথিবী পূর্ণ এবং এরপর আপনি যা চান তা পূর্ণ করার মতো সমস্ত প্রশংসা আপনারই।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৭৬]
◈ দোয়া-৭ (দীর্ঘতম ও সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ)
رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ، أَحَقُّ مَا قَالَ الْعَبْدُ، وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدٌ، اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ، وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ
উচ্চারণ: রাব্বানাা লাকাল হামদু মিলআস সামাাওয়াাতি ওয়াল আরদ্বি, ওয়া মিলআ মাা শি’তা মিন শাইয়িন বা’দু, আহলাস সানাা’ই ওয়াল মাজদি, আহাক্ক্বু মাা ক্বাালাল আবদু, ওয়া কুল্লাহনাা লাকা আবদুন, আল্লাহুম্মা লাা মাানি’আ লিমাা আ’তাইতা, ওয়া লাা মু’তিয়া লিমাা মানা’তা, ওয়া লাা ইয়ানফাউ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আকাশ-জমিন পূর্ণ এবং এরপর আপনি যা চান তা পূর্ণ করার মতো সমস্ত প্রশংসা আপনারই। আপনিই প্রশংসা ও মহিমার যোগ্য অধিকারী। বান্দা যা বলেছে তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে সত্য কথা, আর আমরা সবাই আপনার বান্দা।
হে আল্লাহ! আপনি যা দেন তা রোধ করার কেউ নেই, আর আপনি যা রোধ করেন তা দেওয়ার কেউ নেই। আর কোনো ধনবান বা প্রতাপশালীর ধন-প্রতাপ আপনার সামনে তাকে উপকৃত করতে পারে না।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৭৭]
❑ ৪. সিজদায় পাঠ করার দোয়া:
◈ দোয়া-১ (সবচেয়ে প্রচলিত)
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
উচ্চারণ: সুবহাানা রাব্বিয়াল আ’লাা।
অর্থ: আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭২]
◈ দোয়া-২
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহাানাকাল্ল-হুম্মা রাব্বানাা ওয়া বিহামদিকা আল্ল-হুম্মাগফিরলী।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ७৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৪]
◈ দোয়া-৩
سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন ক্বুদ্দূসুন, রাব্বুল মালাা’ইকাতি ওয়ার রূুহ।
অর্থ: ফেরেশতাকুল ও রুহ (জিবরাইল)-এর প্রতিপালক অত্যন্ত পবিত্র, মহিমান্বিত।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৭]
◈ দোয়া-৪
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، سَجَدَ وَجْهِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَّرَهُ، وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ، تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সাজাদতু, ওয়া বিকা আামানতু, ওয়া লাকা আসলামতু, সাজাদা ওয়াজহী লিল্লাযী খালাক্বাহু ওয়া সোয়াউওয়ারাহু, ওয়া শাক্ব ক্বা সাম’আহু ওয়া বাস্বারাহু, তাবাারাকাল্লাাহু আহসানুল খ্বাালিক্বীন।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার জন্যই সিজদা করলাম, আপনার প্রতিই ইমান আনলাম, আপনার নিকটই আত্মসমর্পণ করলাম। আমার চেহারা সিজদা করলো সেই সত্তার জন্য, যিনি একে সৃষ্টি করেছেন, আকৃতি দিয়েছেন এবং এর কান ও চোখ প্রকাশ করেছেন। মহান, বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৭১]
◈ দোয়া-৫
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ: دِقَّهُ وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী যাম্বী কুল্লাহু: দিক্ব ক্বাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আউয়ালাহু ওয়া আাখিরাহু, ওয়া আলাানিইয়াতাহু ওয়া সিররাহু।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিন — ছোট ও বড়, প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য ও গোপন।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৪৮৩]
➧ মনে রাখা জরুরি: সিজদায় ওয়াজিব একবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা” বলা; বাকি সব দোয়া ও পুনরাবৃত্তি সুন্নাহ। সিজদায় যত ইচ্ছা দোয়া করা মুস্তাহাব — কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, বান্দা তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদারত অবস্থায়। সুতরাং তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।
❑ ৫. দুই সিজদার মাঝখানে বসার দোয়া:
◈ দোয়া-১
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়া আাফিনী, ওয়ারযুক্বনী।
অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মাফ করো, রহম করো, হেদায়েত দাও, নিরাপত্তা দাও এবং রিজিক দাও।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৫০; জামে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৮৪ — হাদিসের মান: হাসান]
◈ দোয়া-২
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৮৭৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৮৯৭ — হাদিসের মান: সহিহ]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ দুআগুলোর উপর আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

সালাতের বাইরে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াতের পর আমিন বলার হুকুম

 প্রশ্ন: সালাতের বাইরে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াতের পর ‘আমিন’ (آمين) বলার হুকুম কী?

উত্তর:
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
সালাতের ভেতরে সুরা ফাতিহা শেষ করার পর ‘আমিন’ বলা ইমাম ও মুক্তাদি—উভয়ের জন্যই সুন্নাত। জাহরি বা সশব্দ সালাতে তাঁরা তা উচ্চস্বরে বলবেন। আর সিররি বা নিঃশব্দ সালাতে তা নিচু স্বরে বলবেন।
অনুরূপভাবে সালাতের বাইরেও সুরা ফাতিহা পাঠের পর ‘আমিন’ বলা সুন্নত।
🔹হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) বলেন,
يُسْتَحَبُّ لِمَنْ قَرَأَ الْفَاتِحَةَ أَنْ يَقُولَ بَعْدَهَا: آمِينَ … قَالَ أَصْحَابُنَا وَغَيْرُهُمْ: وَيُسْتَحَبُّ ذَٰلِكَ لِمَنْ هُوَ خَارِجُ الصَّلَاةِ، وَيَتَأَكَّدُ فِي حَقِّ الْمُصَلِّي، وَسَوَاءٌ كَانَ مُنْفَرِدًا أَوْ إِمَامًا أَوْ مَأْمُومًا، وَفِي جَمِيعِ الْأَحْوَالِ
“যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এরপর ‘আমিন’ বলা মুস্তাহাব। আমাদের (শাফেয়ি) মাজহাবের আলেমগণ এবং অন্যরা বলেছেন: সালাতের বাইরে থাকা ব্যক্তির জন্যও তা বলা মুস্তাহাব; তবে সালাত আদায়কারীর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি জোরালো—সে একাকী সালাত আদায়কারী হোক, ইমাম হোক কিংবা মুক্তাদি হোক, সব অবস্থাতেই।” [তাফসিরে ইবনে কাসির, ১/১৪৪-১৪৫]
🔹শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন,
قَوْلُ (آمِين) بَعْدَ الْفَاتِحَةِ لَيْسَتْ مِنْ آيَاتِ الْفَاتِحَةِ، وَإِنَّمَا هِيَ دُعَاءٌ بِمَعْنَى: اسْتَجِبْ يَا رَبَّنَا، فَهِيَ سُنَّةٌ وَلَيْسَتْ وَاجِبَةً، سُنَّةٌ بَعْدَ الْفَاتِحَةِ، يَقُولُهَا الْقَارِئُ فِي الصَّلَاةِ وَغَيْرِهَا، يَقُولُ آمِينَ إِذَا قَرَأَ الْفَاتِحَةَ، يَقُولُهَا الْإِمَامُ، يَقُولُهَا الْمَأْمُومُ، يَقُولُهَا الْمُنْفَرِدُ، فِي الصَّلَاةِ وَخَارِجَهَا
“সুরা ফাতিহার পর ‘আমিন’ বলা এ সুরার কোনো আয়াত নয়; বরং তা একটি দোয়া, যার অর্থ—‘হে আমাদের রব! আপনি কবুল করুন।’ সুতরাং তা সুন্নাত, ওয়াজিব নয়। সুরা ফাতিহার পর পাঠক তা বলবে, সে সালাতের ভেতরে থাকুক বা বাইরে। যখনই সে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে, তখনই ‘আমিন’ বলবে। ইমাম তা বলবে, মুক্তাদিও তা বলবে, একাকী সালাত আদায়কারীও তা বলবে—সালাতের ভেতরে ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই।” [ফাতাওয়া শায়খ ইবনে বায]
🔹ইমাম নববি (রহ.) ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে লিখেছেন,
قَالَ أَصْحَابُنَا: وَيُسَنُّ التَّأْمِينُ لِكُلِّ مَنْ فَرَغَ مِنَ الْفَاتِحَةِ سَوَاءٌ كَانَ فِي الصَّلَاةِ أَوْ خَارِجَهَا
“আমাদের আলেমগণ বলেছেন: যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ শেষ করবে, তার জন্য ‘আমিন’ বলা সুন্নাত—সে সালাতের ভেতরে থাকুক বা বাইরে।”
🔹ইমাম ওয়াহিদি (রহ.) বলেন,
لَكِنَّهُ فِي الصَّلَاةِ أَشَدُّ اسْتِحْبَابًا
“তবে সালাতের ভেতরে এর মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি আরও অধিক জোরালো।”
وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ
[source: islamqa info, islamweb]
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কালো জাদুর প্রভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটলে বা সব কিছু ভুলে গেলে সে ব্যাপারে ইসলামের বিধান

 কালো জাদুর প্রভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটলে বা সব কিছু ভুলে গেলে সে ব্যাপারে ইসলামের বিধান এবং ভুৃলে যাওয়ার চিকিৎসা ও কিছু পরামর্শ:

প্রশ্ন: কোনও মানুষের ওপর যদি কালো জাদু করা হয়ে থাকে এবং সেই মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পায় তাহলে তার সালাত-রোজার বিধান কী? আর তার যেন আগের সবকিছু মনে পড়ে, সেজন্য কি তার কোনও আমল রয়েছে? এমন অবস্থায় সে মারা গেলে তার পরিণতি কী হবে?
উত্তর: আল্লাহর নিকট তার সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর— কালো জাদু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যদি কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন বা উন্মাদ হয়ে যায় তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে তার ওপর সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইসলামি বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে না, যতদিন না সে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কারণ পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ
“তিন শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; শিশু, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়; এবং পাগল, যতক্ষণ না সে সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়।” [সহিহ আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৩৯৯]
তবে যদি মানসিক দিক থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে কিন্তু পেছনের কথাবার্তা ভুলে যাওয়ার কারণে সালাত বা সিয়াম আদায় করেছে কি না তা স্মরণ করতে না পারে তাহলে ইনশাআল্লাহ এতে গুনাহ হবে না—কারণ সে মা’যুর (ওজর গ্রস্ত)। তবে যখনই স্মরণ হবে তখনই তা কাজা আদায় করে নেবে। কিন্তু তার নিকটে যারা থাকে তাদের কর্তব্য তাকে সালাত/সিয়ামের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
এই সমস্যার সমাধানে দ্রুত শরিয়তসম্মত রুকইয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
🔹সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও এর চিকিৎসা:
সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বা অতিরিক্ত মাত্রায় স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যামনেসিয়া (Amnesia) বা সাধারণ ভাষায় স্মৃতিভ্রংশ বলা হয়। তবে এটি নিজে কোনও একক রোগ নয়, বরং অন্য কোনও শারীরিক বা মানসিক সমস্যার একটি বড় লক্ষণ।
বয়সের কারণে কিছুটা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কেউ যদি সবকিছু বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পূর্ণ ভুলে যেতে শুরু করে, তবে সেটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
🔹 এটি কি রোগ?
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ভুলে যাওয়া মূলত একটি বড় উপসর্গ বা লক্ষণ। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ বা রোগ দায়ী থাকতে পারে:
– সাধারণত বয়স্কদের ক্ষেত্রে (৬০ বছরের ঊর্ধ্বে) মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয়ের কারণে এটি বেশি দেখা যায়। আলঝেইমার্স হলো ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ রূপ।
– অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, অবসাদ বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব সাময়িকভাবে মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।
– মাথায় বড় কোনও আঘাত লাগলে বা স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ স্মৃতিশক্তি হারাতে পারে।
– শরীরে ভিটামিন বি-১২ (Vitamin B12)-এর ঘাটতি হলে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।
– থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে (হাইপোথাইরয়েডিজম) অলসতা ও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
🔹 এর চিকিৎসা ও করণীয় কী?
ভুলে যাওয়ার সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে এর পেছনের মূল কারণের ওপর। তাই এ ধরনের সমস্যায় অবহেলা না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১. সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা সাইকিয়াট্রিস্ট (Psychiatrist) দেখানো। চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা (যেমন রক্ত পরীক্ষা, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান) এবং কিছু মানসিক দক্ষতার পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবেন সমস্যাটি কেন হচ্ছে। কারণ অনুযায়ী তারা ওষুধ বা থেরাপি নির্ধারণ করবেন।
২. পর্যাপ্ত ঘুম—মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে ও স্মৃতি ধরে রাখতে দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি। পুষ্টিকর খাবার—খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন সামুদ্রিক মাছ বা বাদাম) ও ভিটামিন যুক্ত খাবার রাখা প্রয়োজন। শারীরিক ব্যায়াম—নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, যা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।
৩. মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করা যেতে পারে। যেমন নিয়মিত বই পড়া, ধাঁধা বা সুডোকু মেলানো, ডায়েরি লেখার অভ্যাস করা এবং নতুন কোনও দক্ষতা শেখার চেষ্টা করা।
৪. জরুরি কাজ, নাম বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট মনে রাখার জন্য নোটবুক, মোবাইল রিমাইন্ডার বা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবকিছু ভুলে যাওয়ার এই সমস্যা যদি হঠাৎ শুরু হয় কিংবা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে তবে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে যত দ্রুত সম্ভব একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
🔹আখিরাতে জাদুগ্রস্থ ব্যক্তির পরিণতি:
কোনও জাদুগ্রস্থ ব্যক্তি যদি মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে অথবা ভুলে যাওয়ার কারণে তার নামাজ-রোজা ইত্যাদি কোনও ফরজ ইবাদত ছুটে যায় এবং এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে আশা করা যায়, মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। কারণ আল্লাহ মানুষের ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনও ভার চাপিয়ে দেন না। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারায় বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোনও আত্মাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
সূরা আরাফেও একই মর্মে বলা হয়েছে,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“আর যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে—আমরা কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিই না—তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” [সূরা আরাফ: ৪২]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ
“নিশ্চয়ই দ্বীন অত্যন্ত সহজ।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯]
আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় আরও এসেছে, সূরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াত নাজিলের পর মুমিনগণ যখন দোয়া হিসেবে তা পাঠ করেন তখন আল্লাহ তায়ালা জবাবে বলেন,
نَعَمْ
“হ্যাঁ (আমি তোমাদের দোয়া কবুল করলাম এবং সাধ্যের অতিরিক্ত কোনও দায়িত্ব তোমাদের ওপর চাপালাম না)।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৫]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

কেউ ইসলাম ভঙ্গকারী কোনো কাজের মাধ্যমে দ্বীন থেকে বিচ্যুত হলে সে কীভাবে পূণরায় ইসলামে ফিরে আসবে

 কেউ ইসলাম বা ইমান ভঙ্গকারী (নাওয়াকিজুল ইসলাম) কোনও কাজ করে ফেললে সে কীভাবে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসবে? নিম্নে এ বিষয়ে শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর দেওয়া উত্তর পেশ করা হলো:

শাইখকে প্রশ্ন করা হয়, কেউ যদি ইসলাম ভঙ্গকারী কোনো কাজ (নাওয়াকিদুল ইসলাম) করে ফেলে তবে সে কীভাবে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসবে?
উত্তরে তিনি বলেন,
التَّوْبَةُ، بَابُ التَّوْبَةِ مَفْتُوحٌ، إِذَا وَقَعَ فِي نَاقِضٍ؛ فَعَلَيْهِ أَنْ يَرْجِعَ إِلَى الإِسْلَامِ بِالتَّوْبَةِ، يَنْدَمُ عَلَى الْمَاضِي، وَيَعْزِمُ أَلَّا يَعُودَ، وَيَتْرُكَ هَذَا النَّاقِضَ، فَإِذَا كَانَ كُفْرُهُ بِدُعَاءِ الْأَمْوَاتِ، وَالِاسْتِغَاثَةِ بِالْأَمْوَاتِ وَالْأَصْنَامِ؛ تَرَكَ ذَلِكَ، وَتَابَ إِلَى اللهِ مِنْ ذَلِكَ، وَبِهَذَا يَرْجِعُ إِلَى الإِسْلَامِ، إِلَّا إِذَا كَانَ كُفْرُهُ بِأَنَّهُ جَحَدَ وُجُوبَ الصَّلَاةِ؛ يُقِرُّ، يَقُولُ: لَا، أَنَا غَلْطَانُ، الصَّلَاةُ فَرْضٌ عَلَى الْمُكَلَّفِينَ، وَأَتُوبُ إِلَى اللهِ مِنْ ذَلِكَ، وَيَنْدَمُ، وَيُقْلِعُ، وَيَعْزِمُ أَلَّا يَعُودَ، يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِ، أَوْ كَانَ يَتْرُكُ الصَّلَاةَ لَا يُصَلِّي، فَالتَّوْبَةُ أَنْ يَفْعَلَ الصَّلَاةَ، وَيَنْدَمَ عَلَى الْمَاضِي، وَيَسْتَغْفِرَ مِمَّا مَضَى، وَيَعْزِمَ أَلَّا يَعُودَ فِيهِ، وَهَذِهِ التَّوْبَةُ. كَذَلِكَ إِذَا كَانَ كُفْرُهُ؛ لِأَنَّهُ يَقُولُ: الزِّنَا حَلَالٌ، فَإِذَا تَابَ وَقَالَ: لَا، الزِّنَا حَرَامٌ، وَأَنَا أَتُوبُ إِلَى اللهِ، وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ، وَقَدْ أَخْطَأْتُ، وَاللهُ يَعْلَمُ مِنْ قَلْبِهِ أَنَّهُ صَادِقٌ؛ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِ، وَهَكَذَا
“তওবা করবে। তওবার দরজা সবসময় খোলা। কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয় যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় তবে তাকে অবশ্যই তওবার মাধ্যমে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসতে হবে। এর অর্থ হলো:
– অতীতের কাজের জন্য মনে মনে লজ্জিত হওয়া।
– ভবিষ্যতে আর কখনোই এমন কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
– যে কাজটি কুফরির কারণ হয়েছিল তা অবিলম্বে বর্জন করা।
কিছু উদাহরণ:
যদি কেউ মৃত ব্যক্তি বা প্রতিমার কাছে বিপদ-আপদে সাহায্য প্রার্থনা করার মতো কুফরি কাজে লিপ্ত হয় তবে তাকে তা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। এভাবে সে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসবে।
যদি তার কুফরি এমন হয় যে, সে নামাজের ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করেছিল তবে তাকে স্বীকার করতে হবে যে—‘না, আমার ভুল হয়েছে। নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর ফরজ এবং আমি এর জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করছি।’ এভাবে লজ্জিত হয়ে, নামাজ শুরু করার মাধ্যমে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো অস্বীকার না করার সংকল্প করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
একইভাবে কেউ যদি নামাজ ত্যাগ করে থাকে তবে তার তওবা হলো—অবিলম্বে নামাজ আদায় শুরু করা, অতীতের গাফিলতির জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
আর যদি কেউ এমন কথা বলে যে—‘ব্যভিচার (জিনা) হালাল’ তবে তাকে অবশ্যই বলতে হবে—‘না, ব্যভিচার হারাম। আমি আমার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করছি এবং ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ আল্লাহ যদি তার অন্তরে সততা দেখেন তবে তিনি অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেবেন। [সূত্র: মাজমু ফাতাওয়া, শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত]
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate