Monday, June 1, 2026

জোরপূর্বক ধর্ষণের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে সেই বাচ্চা গর্ভপাতের বিধান কী

 প্রশ্ন: জোরপূর্বক ধর্ষণের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে, অনাকাঙ্ক্ষিত সেই বাচ্চা গর্ভপাতের বিধান কী? যদি যায় এতে কি ভুক্তভোগী নারী গুনাহগার হবেন?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ধর্ষণ বলতে বোঝায় কোনো নারীকে তার সম্মতি ও স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবরদস্তি, ভয়ভীতি, বলপ্রয়োগ বা প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ যৌন সম্পর্কে লিপ্ত করতে বাধ্য করা। এটি কেবল একজন নারীর দেহের ওপর সহিংস আগ্রাসন নয়; বরং তার পবিত্রতা, মর্যাদা, মানবিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তাবোধের জঘন্য লঙ্ঘন। এর ফলে ভুক্তভোগী নারী গভীর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। ইসলামি শরী‘আতের দৃষ্টিতে ধর্ষণ একটি জঘন্য, মহাপাপপূর্ণ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশেষত, যদি এ অপরাধ ভুক্তভোগী নারীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, জিম্মি করে, অপহরণপূর্বক বা সন্ত্রাসী কায়দায় সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু সাধারণ ধর্ষনের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ‘হিরাবাহ’ (দস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড)-এর অন্তর্ভুক্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এ ধরনের অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর,এ ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের জন্য মাত্র দুজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এই অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ”যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফাসাদ (সমাজে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা মায়িদাহ: ৩৩] এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোনো নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষের ওপর ‘হিরাবাহ’ বা দস্যুতার এই শাস্তি কার্যকর হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়, চাই সে ধর্ষণের উদ্দেশ্য সফল করতে পারুক বা না পারুক। কারণ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই সে ‘সন্ত্রাসী বা পথচারীর নিরাপত্তা বিনষ্টকারী’ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আর যদি সে অপহরণের পর ধর্ষণও করে, তবে তার অপরাধের মাত্রা তীব্রতর হবে; কেননা সে তখন দুটি বড় অপরাধ একত্রে করল ব্যভিচার এবং দস্যুতা।
.
তদুপরি, যদি সুস্পষ্ট আলামত,নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, সংঘটিত জোরপূর্বক ধর্ষণের ঘটনায় নারীর কোনো সম্মতি, অংশগ্রহণ বা দায় ছিল না, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ও মাজলুমা (নির্যাতিতা) হিসেবে গণ্য হবেন। সেক্ষেত্রে তার ওপর কোনো প্রকার হদ শাস্তি কার্যকর করা হবে না।এর পক্ষে দলিল হলো; প্রখ্যাত সাহাবী ওয়ায়িল ইবনু হুজর (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে জনৈকা মহিলা সালাতের উদ্দেশে বের হলো। এমন সময় এক ব্যক্তি তাকে ধরে নিয়ে জোরপূর্বক যিনা করলে মহিলাটির চিৎকারে পুরুষটি পালিয়ে যায়। তখন মুহাজিরদের একটি দল সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তখন মহিলাটি বলল, ঐ লোকটি আমার সাথে এরূপ এরূপ করেছে। তারা তখন ঐ লোকটিকে গ্রেফতার করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত করল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ মহিলাটিকে বললেন, اذْهَبِي فَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكِ”চলে যাও আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর যে লোকটি মহিলাটির সাথে যিনা করেছিল। যিনাকারীর ব্যাপারে হুকুম করলেন, একে পাথর নিক্ষেপে হত্যা কর। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, লোকটি এমনভাবে তওবা করেছে যদি মদীনার সকল লোক এরূপ তওবা্ করত, তাহলে তাদের সকলের পক্ষ থেকে তা কবুল করা হতো।”(আবু দাঊদ হা/৪৩৭৯; তিরমিযী হা/১৪৫৪, মিশকাত হা/৩৫৭২; ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূউল ফাতাওয়া ২৬/১৮৭)। এছাড়াও ইমাম ইবনে আবদিল বার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتُكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا ، وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا ، وَاسْتِغَاثَتِهَا، وَصِيَاحِهَا”নারীর ওপর কোনো শাস্তি থাকবে না যদি এটি সত্য প্রমাণিত হয় যে তাকে বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর খাটানো হয়েছে। আর এটি প্রকাশ পায় সাধারণত নারীর চিৎকার, আর্তনাদ এবং সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে।”(আল ইস্তিযকার: ৭/১৪৬)
.
কিছু আলেম বলেছেন: ধর্ষককে নারীর মহর (যেমনটা সাধারণত বিয়ের সময় দেওয়া হয়) পরিশোধ করতে হবে।
.
শাইখুল ইসলাম হুজ্জাতুল উম্মাহ ইমামু দারিল হিজরাহ আবূ ‘আব্দুল্লাহ মালিক বিন আনাস আল-আসবাহী আল-মাদানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৭৯ হি.] বলেছেন:الأمر عندنا في الرجل يغتصب المرأة، بكراً كانت أو ثيبا : أنها إن كانت حرة : فعليه صداق مثلها…، والعقوبة في ذلك على المغتصِب، ولا عقوبة على المغتصبة في ذلك كله”আমাদের মতে,কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করে সে নারী কুমারী হোক বা বিধবা হোক,তবে যদি সে স্বাধীন (দাসী নয়) নারী হয়, তার জন্য সমপর্যায়ের নারীদের মতোই মোহরানা নির্ধারিত হবে। এবং এ অপরাধের শাস্তি কেবল ধর্ষণকারী পুরুষের ওপরই প্রযোজ্য হবে; ধর্ষিত নারীর ওপর এর কোনো শাস্তি নেই।”(মুয়াত্তা ইমাম মালিক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৭৩৪)
.
ইমাম আল-বাজী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:المستكرَهة ؛ إن كانت حرة : فلها صداق مثلها على من استكرهها، وعليه الحد، وبهذا قال الشافعي، وهو مذهب الليث، وروي عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه .وقال أبو حنيفة والثوري: عليه الحد دون الصداق.والدليل على ما نقوله : أن الحد والصداق حقان: أحدهما لله، والثاني للمخلوق، فجاز أن يجتمعا، كالقطع في السرقة، وردها “যদি জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করা নারী স্বাধীন হয়, তবে তার সমপর্যায়ের নারীর মতোই তার জন্য মোহর নির্ধারিত হবে, আর যিনি তাকে বাধ্য করেছেন, তার ওপর ব্যভিচারের হদ্দ প্রয়োগ করা হবে। এই মতই ইমাম শাফেয়ী, ইমাম লায়স এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও সুফিয়ান সাওরী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেছেন: তার উপর হদ্দ প্রযোজ্য হবে, কিন্তু মোহরানা প্রযোজ্য হবে না। আমাদের কথার দলিল হলো এই যে, হদ্দ এবং মোহর উভয়ই দুই ধরনের অধিকার: একটিতে আল্লাহর অধিকার, আর অন্যটিতে সৃষ্টির অধিকার। সুতরাং এ দুটি একসঙ্গে প্রযোজ্য হতে পারে, যেমন চুরির ক্ষেত্রে (হাত) কাটা হয় এবং চুরি করা জিনিস ফেরত দেওয়া হয়। (মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬৮–২৬৯)
.
দ্বিতীয়ত: গর্ভপাতের মূলনীতি ও শরয়ি অবস্থান:
.
এই বিষয়েটি আমরা কয়েকটি পয়েন্টে উল্লেখ করার চেষ্টা করব।
.
(১).যে নারী জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী আত্মরক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, তার ওপর কোনো গুনাহ নেই—এমনকি এ ঘটনার ফলে যদি গর্ভধারণও ঘটে। কারণ সে স্বেচ্ছায় নয়; বরং জবরদস্তি, নিপীড়ন ও অসহায় অবস্থার শিকার। ইসলামে জবরদস্তির শিকার ব্যক্তির দায় লঘু করা হয়েছে—এমনকি কুফরির মতো গুরুতর বিষয়েও, যদি অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে। মহান আল্লাহ বলেন: “তবে যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, অথচ তার অন্তর ঈমানের ওপর সুদৃঢ় থাকে…” (সূরা আন-নাহল: ১০৬)। নবী ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের পক্ষ থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজে তাদের বাধ্য করা হয়েছে, সেগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (ইবনে মাজাহ: ২০৩৩; মান সহিহ)। তাই অসহায়ভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীর কোনো অপরাধ নেই; বরং সে যদি এ কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখে, তবে সে মহান প্রতিদানের অধিকারী হবে। নবী ﷺ বলেছেন: “মুমিনের ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, শোক, কষ্ট বা পেরেশানি আসে—এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও—আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।” (বুখারি ও মুসলিম)। একই সঙ্গে মুসলিম সমাজের, বিশেষত যুবকদের, উচিত এমন নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সম্মান, মর্যাদা ও মানসিক পুনর্গঠনে সহযোগিতা করা এবং বৈধ ও সম্মানজনক উপায়ে তাদের জীবনকে স্বাভাবিক ও নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখা।
.
(২).গর্ভপাতের বিষয়ে শরীয়তের মৌলিক নীতি হলো— স্বাভাবিকভাবে এটি মূলত নিষিদ্ধ ও হারাম। এমনকি গর্ভধারণ যদি অবৈধ সম্পর্ক, ধর্ষণ কিংবা ব্যভিচারের ফলেও সংঘটিত হয়ে থাকে,তবুও তা গর্ভস্থ প্রাণের জীবনহানিকে বৈধ করে না।এর অন্যতম কারণ হলো—মাতৃগর্ভে ভ্রূণ স্থিত হওয়ার পর থেকেই একটি নতুন জীবনের যাত্রা শুরু হয়। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে গর্ভস্থ সন্তান কেবল একটি মাংসপিণ্ড নয়; বরং সে একটি সম্ভাবনাময় মানবজীবন, যার জীবন, নিরাপত্তা ও বিকাশের অধিকার সংরক্ষিত।আর এ কারণে গর্ভধারণ যদি অবৈধ সম্পর্ক বা ব্যভিচারের ফলেও হয়ে থাকে, তবুও সেই পাপের দায় গর্ভস্থ সন্তানের ওপর বর্তায় না এবং তার জীবন নষ্ট করাও বৈধ হয়ে যায় না।এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় গামেদিয়া গোত্রের সেই গর্ভবতী নারীর ঘটনা থেকে, যিনি ব্যভিচারের অপরাধ স্বীকার করেছিলেন এবং শরয়ি দণ্ডের উপযুক্ত ছিলেন। তথাপি নবী ﷺ তাঁর ওপর তাৎক্ষণিকভাবে দণ্ড কার্যকর করেননি; বরং প্রথমে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে নির্দেশ দেন। অতঃপর সন্তান জন্মের পরও নবজাতকের দুধপান সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অবকাশ প্রদান করেন। এ ঘটনা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ইসলামে গর্ভস্থ ও নবজাতক সন্তানের জীবন, অধিকার ও নিরাপত্তার মর্যাদা অত্যন্ত মহান। এমনকি মায়ের অপরাধও সন্তানের জীবন ও মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের বৈধ কারণ হতে পারে না। তাই শরীয়ত মানবজীবনের পবিত্রতা, বিশেষত মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠা প্রাণের সুরক্ষা ও সংরক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে।
.
(৩).ইতিপূর্বে এটি পরিষ্কার হয়েছে যে, গর্ভপাত শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ; তবে ফিকহবিদ আলেমদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়সীমা, বৈধ প্রয়োজন ও বিশেষ জরুরি পরিস্থিতির আলোকে এতে কিছু সীমিত রুখসত (ছাড়) বিদ্যমান রয়েছে। বিশেষত গর্ভপাতের প্রাথমিক পর্যায়কে কেন্দ্র করে আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। একদল ফকীহ বিশেষ কারণবশত গর্ভধারণের প্রথম চল্লিশ দিনের মধ্যে গর্ভপাতের অনুমতি প্রদান করেছেন। অন্যদিকে, কিছু আলেম নির্দিষ্ট শর্ত ও যথার্থ প্রয়োজনের ভিত্তিতে রূহ সঞ্চারের সময়—অর্থাৎ ১২০ দিনের পূর্ব পর্যন্ত—সীমিত অবকাশের কথা উল্লেখ করেছেন। মোটকথা, প্রয়োজন, কষ্ট ও অনিবার্যতার মাত্রা যত বৃদ্ধি পাবে, অনুমতির ক্ষেত্রও তত প্রসারিত হওয়ার অবকাশ তৈরি হতে পারে। তবে গর্ভধারণের প্রথম চল্লিশ দিনের সময়সীমায় অনুমতির অভিমত তুলনামূলকভাবে অধিক শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হয়।
.
(৪).ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ: বিশেষ পরিস্থিতিতে ফাতওয়ার প্রেক্ষাপট ও ভিত্তি: এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, কোনো জালিম বা দুষ্কৃতিকারীর দ্বারা একজন স্বাধীন মুসলিম নারী ধর্ষণের শিকার হলে তা তাঁর ব্যক্তি জীবন, মানসিক অবস্থা এবং পারিবারিক মর্যাদার ওপর গভীর আঘাত হানে। এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর পরিবারের জন্য চরম বেদনা, লাঞ্ছনা ও কঠিন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক সময় নারী এই জঘন্য অপরাধের পরিণতিস্বরূপ সৃষ্ট গর্ভধারণকে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে অপারগ হন এবং তা থেকে পরিত্রাণ কামনা করেন।এই কঠিন বাস্তবতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং জরুরি প্রয়োজনের দিকটি বিবেচনায় নিয়েই আলেমগণ বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ফাতওয়ার অবকাশের আলোচনা করেছেন; বিশেষত যখন গর্ভধারণ একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে এবং বিষয়টি প্রয়োজন, ক্ষতি-নিবারণ ও শরয়ি বিবেচনার আলোকে পর্যালোচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ: চল্লিশ দিনের পূর্বে গর্ভপাত করার মাসয়ালায় ফিকাহবিদ আলেমগণ মতভেদ করেছেন। জমহুর হানাফী, শাফেয়ি এবং কিছু হাম্বলী আলেমদের মতে, এটি জায়েয। অপরদিকে মালেকি মাযহাবের মতে, সাধারণভাবে নাজায়েয। এটি কিছু হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলী আলেমেরও বক্তব্য। বিগত শতাব্দীর অন্যতম আলেমদের মতে যথাযথ শরয়ি কারণ ও সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে ব্যতীত গর্ভস্থিত ভ্রুণ যে ধাপের হোক না কেন সেটা নষ্ট করা নাজায়েয। তবে গর্ভস্থিত বস্তুটি যদি বীর্যের অবস্থায় থাকে; আর তা থাকে চল্লিশদিন বা তার চেয়ে কম সময়ের মধ্যে এবং সেটি ফেলে দেয়ার মধ্যে কোন শরয়ি কল্যাণ থাকে কিংবা মায়ের উপর থেকে সম্ভাব্য কোন ক্ষতি রোধ করার বিষয় থাকে; যেমন: যদি এই গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে লাগাতর গর্ভধারণের প্রেক্ষিতে মায়ের শারীরিক ক্ষতির আশংকা হয় কিংবা দুগ্ধপায়ী সন্তানের শারীরিক ক্ষতির আশংকা হয় তাহলে গর্ভপাত করা জায়েজ এতে কোন আপত্তি নেই ইনশাআল্লাহ।
.
ইবনুল হুমাম ‘ফতাহুল কাদির’ গ্রন্থে বলেন: ” وهل يباح الإسقاط بعد الحبل ؟ يباح ما لم يتخلق شيء منه ، ثم في غير موضع , قالوا : ولا يكون ذلك إلا بعد مائة وعشرين يوما , وهذا يقتضي أنهم أرادوا بالتخليق نفخ الروح ، وإلا فهو غلط ، لأن التخليق يتحقق بالمشاهدة قبل هذه المدة “গর্ভধারণের পর ভ্রূণ ফেলে দেয়া কি বৈধ? কোনরূপ আকৃতি তৈরী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বৈধ। এরপর তারা (আলেমগণ) একাধিক স্থানে বলেছেন: এটি ১২০ দিনের পূর্বে হয় না। এ কথার দাবী হচ্ছে যে, তারা আকৃতির দ্বারা রূহ ফুঁকে দেয়াকে বুঝিয়েছেন; নচেৎ এ কথা ভুল। কেননা চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে সাব্যস্ত যে আকৃতি এ সময়সীমার পূর্বেই গঠিত হয়।”(ফতাহুল কাদির; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪০১) রামলী ‘নিহায়াতুল মুহতাজ’ গ্রন্থে বলেন: ” الراجح تحريمه بعد نفخ الروح مطلقا وجوازه قبله “অগ্রগণ্য হলো রূহ ফুঁকে দেয়ার পর নিঃশর্ত তা হারাম। আর রূহ ফুঁকে দেয়ার পূর্বে জায়েয।”নিহায়াতুল মুহতাজ; খন্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪৪৩)
.
ক্বালয়ুবী এর পাশ্বটীকাতে (৪/১৬০) বলা হয়েছে: “يجوز إلقاؤه (الحمل) ولو بدواء قبل نفخ الروح فيه ، خلافاً للغزالي “রূহ ফুঁকে দেয়ার পূর্বে তা (ভ্রুণ) ফেলে দেয়া জায়েয; এমনকি ঔষধ ব্যবহারের মাধ্যমে হলেও। তবে গাজালীর দ্বিমত রয়েছে।” আল-মিরদাওয়ী ‘আল-ইনসাফ’ গ্রন্থে বলেন:” يجوز شرب دواء لإسقاط نطفة . وقال ابن الجوزي في أحكام النساء : يحرم . وقال في الفروع : وظاهر كلام ابن عقيل في الفنون : أنه يجوز إسقاطه قبل أن ينفخ فيه الروح ، وقال : وله وجه“ভ্রুণ ফেলে দেয়ার জন্য ঔষধ সেবন করা জায়েয। ইবনুল জাওযি ‘আহকামুন নিসা’ গ্রন্থে বলেন: ‘তা হারাম’। আল-ফুরু গ্রন্থে বলা হয়েছে: আল-ফুনুন গ্রন্থে ইবনে আকীলের বক্তব্যের প্রত্যক্ষ মর্ম হচ্ছে: রূহ ফুঁকে দেয়ার পূর্বে ফেলে দেয়া জায়েয। তিনি বলেন: এ কথার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। (মিরদাওয়ী; আল-ইনসাফ; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৬)
.
হাফিয যাইনুদ্দীন আবুল ফারজ ‘আব্দুর রহমান বিন শিহাব—যিনি ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ—রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:]
তার ‘জামেউল উলুমি ওয়াল হিকাম’ গ্রন্থে বলেন:
” : ورُوي عن رفاعة بن رافع قال : جلس إليَّ عمر وعليٌّ والزبير وسعد في نفر مِنْ أصحابِ رسول الله صلى الله عليه وسلم ، فتذاكَروا العزلَ ، فقالوا : لا بأس به ، فقال رجلٌ : إنَّهم يزعمون أنَّها الموؤدةُ الصُّغرى ، فقال علي : لا تكون موؤدةً حتَّى تمرَّ على التَّارات السَّبع : تكون سُلالةً من طين ، ثمَّ تكونُ نطفةً ، ثم تكونُ علقةً ، ثم تكون مضغةً ، ثم تكونُ عظاماً ، ثم تكون لحماً ، ثم تكون خلقاً آخرَ ، فقال عمرُ : صدقتَ ، أطالَ الله بقاءك . رواه الدارقطني في “المؤتلف والمختلف”.ثم قال ابن رجب : ” وقد صرَّح أصحابنا بأنَّه إذا صار الولدُ علقةً ، لم يجز للمرأة إسقاطُه ؛ لأنَّه ولدٌ انعقدَ ، بخلاف النُّطفة ، فإنَّها لم تنعقد بعدُ ، وقد لا تنعقدُ ولداً”
“রিফাআ বিন রাফে’ থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: ‘আমার কাছে উমর (রাঃ), আলী (রাঃ), সাদ (রাঃ) এবং একদল সাহাবী বসা ছিলেন। তখন তারা ‘আযল’ (যৌনাঙ্গের বাহিরে বীর্যপাত) নিয়ে আলোচনা করলেন এবং বললেন: এতে কোন আপত্তি নেই। তখন এক লোক বলল: তারা দাবী করে যে, এটি কণ্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়ার লঘু রূপ। তখন আলী (রাঃ) বললেন: এটি কণ্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সাতটি ধাপ অতিক্রম না করে: মাটির নির্যাস, তারপর শুক্রাণুতে পরিণত হওয়া, তারপর জমাট বাঁধা, তারপর গোশতের টুকরায় পরিণত হওয়া, তারপর হাড্ডিতে পরিণত হওয়া, এরপর গোশততে পরিণত হওয়া, এরপর স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টি হওয়া। তখন উমর (রাঃ) বললেন: আপনি সত্য বলেছেন; আল্লাহ্‌ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন।[এটি দারা কুতনী ‘আল‑মু’তালিফ ওয়াল মুখতালিফ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন] এরপর ইবনে রজব বলেন: আমাদের আলেমগণ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, জমাট‑বাঁধা রক্ত হয়ে যাওয়ার পর কোন নারীর জন্য গর্ভপাত করা নাজায়েয। কেননা তখন সেটি শিশু হওয়া শুরু হয়ে গেছে। ভ্রূণ অবস্থায় থাকাটি এর বিপরীত। যেহেতু তখনও সেটি শিশু হওয়া শুরু হয়নি।(ইবনু রজব;জামেউল উলুমি ওয়াল হিকাম;
ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১১৫৯৫৪)
.
মালেকি মাযহাবের মতে, সাধারণভাবে নাজায়েয। এটি কিছু হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলী আলেমেরও বক্তব্য। দিরদীদ ‘আল-শারহুল কাবীর’ গ্রন্থে বলেন:
” لا يجوز إخراج المني المتكون في الرحم ولو قبل الأربعين يوما، وإذا نفخت فيه الروح حرم إجماعا “
.“গর্ভায়শের অভ্যন্তরে স্থান করে নেয়া বীর্যকে বের করা নাজায়েয; এমনকি সেটা চল্লিশ দিনের পূর্বে হলেও। আর যদি রূহ ফুঁকে দেয়ার পরে হয় তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।”(শারহুল কাবীর’ খন্ড;২ পৃষ্ঠা; ২৬৬) ফিকাহবিদদের মধ্যে কেউ কেউ বৈধ হওয়ার জন্য ওজরগ্রস্ত হওয়ার শর্তযুক্ত করেছেন।(দেখুন: আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
উচ্চ উলামা পরিষদের সিদ্ধান্তে এসেছে:
1- لا يجوز إسقاط الحمل في مختلف مراحله إلا لمبرر شرعي وفي حدود ضيقة جداً .
2- إذا كان الحمل في الطور الأول ، وهي مدة الأربعين يوماً وكان في إسقاطه مصلحة شرعية أو دفع ضرر جاز إسقاطه . أما إسقاطه في هذه المدة خشية المشقّة في تربية الأولاد أو خوفاً من العجز عن تكاليف معيشتهم وتعليمهم أو من أجل مستقبلهم أو اكتفاء بما لدى الزوجين من الأولاد فغير جائز .
3- لا يجوز إسقاط الحمل إذا كان علقة أو مضغة ( وهي الأربعون يوماً الثانية والثالثة ) حتى تقرر لجنة طبية موثوقة أن استمراره خطر على سلامة أمه بأن يخشى عليها الهلاك من استمراره ، جاز إسقاطه بعد استنفاذ كافة الوسائل لتلافي تلك الأخطار .
4- بعد الطور الثالث ، وبعد إكمال أربعة أشهر لا يحل إسقاطه حتى يقرر جمع من الأطباء المتخصصين الموثوقين من أن بقاء الجنين في بطن أمه يسبب موتها ، وذلك بعد استنفاذ كافة الوسائل لإبقاء حياته ، وإنما رخص في الإقدام على إسقاطه بهذه الشروط دفعاً لأعظم الضررين وجلبا لعظمى المصلحتين .
১। যথাযথ শরয়ি কারণ ও খুবই সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে ব্যতীত গর্ভস্থিত ভ্রুণ যে ধাপের হোক না কেন সেটা নষ্ট করা নাজায়েয।
২। যদি গর্ভস্থিত ভ্রুণটি প্রথম ধাপে থাকে; প্রথম ধাপ হলো চল্লিশ দিনের সময়সীমায়; এবং গর্ভপাত করার মধ্যে কোন শরয়ি কল্যাণ থাকে কিংবা কোন ক্ষতি রোধকরণ থাকে তাহলে গর্ভপাত করা জায়েয হবে। পক্ষান্তরে এই সময়সীমার মধ্যে গর্ভপাতের কারণ যদি হয় সন্তানদের প্রতিপালনের কষ্ট কিংবা তাদের জীবিকা ও শিক্ষার ব্যয়ভার বহনের ভয় কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশংকা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর যে কয়জন সন্তান আছে তারাই যথেষ্ট এগুলো; তাহলে গর্ভপাত করা নাজায়েয।
৩। যদি গর্ভস্থিত ভ্রুণ রক্তপিণ্ড বা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয় (সেটা হয় দ্বিতীয় চল্লিশ দিনে ও তৃতীয় চল্লিশ দিনে) তাহলে সেই ভ্রুণ নষ্ট করা জায়েয নয়; যদি না কোনো বিশ্বস্ত ডাক্তারদের টীম এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, এই গর্ভধারণ অব্যাহত রাখা মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিজনক; যেমন গর্ভধারণ অব্যাহত রাখলে মায়ের মৃত্যু ঘটার আশংকা করা; সেক্ষেত্রে এই আশংকাকে রোধ করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর গর্ভপাত করা জায়েয হবে।
৪। তৃতীয় ধাপের পর তথা চারমাস অতিবাহিত হওয়ার পর গর্ভপাত করা বৈধ হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না একদল বিশেষজ্ঞ বিশ্বস্ত ডাক্তার এই মর্মে সিদ্ধান্ত দেয় যে, ভ্রুণটি মায়ের গর্ভে থেকে গেলে মায়ের মৃত্যু ঘটতে পারে। এটি করা যাবে ভ্রুণটিকে বাঁচিয়ে রাখার সকল উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার পর। গর্ভপাত করার অবকাশ এই শর্তগুলো পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে এই ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে যে, দুটো ক্ষতির মধ্যে বড় ক্ষতিটিকে রোধ করা ও অপেক্ষাকৃত বড় কল্যাণটি আনয়ন করা।(আল-ফাতাওয়া আল-জামিআ (৩/১০৫৬)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
“الأصل في حمل المرأة أنه لا يجوز إسقاطه في جميع مراحله إلا لمبرر شرعي ، فإن كان الحمل لا يزال نطفة وهو ما له أربعون يوماً فأقل ، وكان في إسقاطه مصلحة شرعية أو دفع ضرر يتوقع حصوله على الأم – جاز إسقاطه في هذه الحالة ، ولا يدخل في ذلك الخشية من المشقة في القيام بتربية الأولاد أو عدم القدرة على تكاليفهم أو تربيتهم أو الاكتفاء بعدد معين من الأولاد ونحو ذلك من المبررات الغير شرعية.
أما إن زاد الحمل عن أربعين يوماً حرم إسقاطه ، لأنه بعد الأربعين يوماً يكون علقة وهو بداية خلق الإنسان ، فلا يجوز إسقاطه بعد بلوغه هذه المرحلة حتى تقرر لجنة طبية موثوقة أن في استمرار الحمل خطراً على حياة أمه ، وأنه يخشى عليها من الهلاك فيما لو استمر الحمل
“নারীর গর্ভস্থিত ভ্রুণকে কোন শরয়ি কারণ ব্যতীত গর্ভপাত করা নাজায়েয। যদি গর্ভস্থিত বস্তুটি বীর্যের অবস্থায় থাকে; আর তা থাকে চল্লিশদিন বা তার চেয়ে কম সময়ের মধ্যে এবং সেটি ফেলে দেয়ার মধ্যে কোন শরয়ি কল্যাণ থাকে কিংবা মায়ের উপর থেকে সম্ভাব্য কোন ক্ষতি রোধ করার বিষয় থাকে; তাহলে এমতাবস্থায় সেটি ফেলে দেয়া জায়েয আছে। তবে সন্তানদের প্রতিপালনের কষ্ট, তাদের ব্যয়ভার বহন বা প্রতিপালনের অক্ষমতা কিংবা যে কয়জন সন্তান আছে তারাই যথেষ্ট ইত্যাদি অ-শরয়ি কারণগুলো এর মধ্যে পড়বে না। আর যদি ভ্রুণের বয়স চল্লিশ দিন পার হয়ে যায় তাহলে সেটি নষ্ট করা হারাম। কেননা চল্লিশ দিন পর সেটি রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়; যা মানবাকৃতির সূচনা। তাই এ স্তরে পৌঁছার পর বিশ্বস্ত কোন ডাক্তার ‘গর্ভধারণ চলমান রাখা মায়ের জীবনের জন্য বিপদজনক এবং চলমান রাখলে মায়ের জীবন বিপন্ন হতে পারে’ মর্মে সিদ্ধান্ত দেয়া ব্যতীত সেটি নষ্ট করা জায়েয নয়।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ৪৫০)
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও মাজলুম (নির্যাতিতা); এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে তিনি কোনো গুনাহগার হবেন না। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর গভীর মানসিক কষ্ট, সামাজিক সংকট ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায়—গর্ভস্থ ভ্রূণে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পূর্বে, বিশেষত প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে; আর কিছু আলেমের মতে রুহ ফুঁকে দেওয়ার পূর্বে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের আগ পর্যন্ত—বিশেষ ওজরের ভিত্তিতে গর্ভপাতের অবকাশ রয়েছে, এতে তিনি পাপী হবেন না; বরং ধৈর্য ও পরীক্ষার মুখে অবিচল থাকার কারণে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখবেন। তবে গর্ভের বয়স ১২০ দিন (চার মাস) অতিক্রম করলে ভ্রূণ পূর্ণাঙ্গ প্রাণসত্তায় পরিণত হয়; তাই মায়ের জীবন রক্ষার মতো চরম চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থা ছাড়া, এমনকি ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ হলেও, সাধারণ অবস্থায় গর্ভপাত করা শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
​উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ঈদের নামাজের সময় কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয়

 ▪️প্রথম: ঈদের নামাজের সময় শুরু হয় সূর্য একটি বর্শার পরিমাণ উঁচু হওয়ার পর থেকে—অর্থাৎ সূর্যোদয়ের প্রায় পনেরো থেকে বিশ মিনিট পর—এবং শেষ হয় সূর্য ঠিক মাথার উপরে আসার (যওয়াল) আগ পর্যন্ত।

জমহুর তথা হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাবের মতে—সময় শুরু হয় সূর্য একটি বর্শা পরিমাণ উঁচু হওয়ার পর থেকে। শাফেয়ি মাজহাবের মতে সময় শুরু হয় সূর্যোদয় থেকেই। কেননা এটি একটি বিশেষ কারণযুক্ত নামাজ, তাই মাকরুহ ওয়াক্তের বাধা এখানে প্রযোজ্য নয়।
প্রথম দলিল:
أَبُو عُمَيْرِ بنُ أَنَسِ بنِ مَالِكٍ قالَ: حَدَّثَنِي عُمُومَتِي مِنَ الأنصارِ مِن أصحابِ رسولِ اللهِ ﷺ قالُوا: أُغْمِيَ عَلَيْنَا هِلَالُ شَوَّالٍ فَأَصْبَحْنَا صِيَامًا، فَجَاءَ رَكْبٌ مِنْ آخِرِ النَّهَارِ فَشَهِدُوا عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُمْ رَأَوُا الهِلَالَ بِالأَمْسِ، فَأَمَرَهُمْ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ يُفْطِرُوا، وَأَنْ يَخْرُجُوا إِلَى عِيدِهِمْ مِنَ الغَدِ
আবু উমায়ের ইবনে আনাস ইবনে মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমার আনসারি চাচারা—যাঁরা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবি ছিলেন—আমাকে বলেছেন: একবার শাওয়ালের চাঁদ আমাদের কাছে দেখা যায়নি। তাই আমরা সিয়াম রেখে সকাল করলাম। দিনের শেষভাগে এক দল লোক নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে সাক্ষ্য দিল যে, তারা গতকাল চাঁদ দেখেছে। তখন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের রোজা ভঙ্গ করতে করতে এবং পরের দিন ঈদে বের হতে নির্দেশ দিলেন। [সুনানে আবু দাউদ: ১১৫৭; সুনানে নাসাই: ১৫৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৫৩। ইবনুল মুনজির, খাত্তাবি, ইবনে হাজম, নববি ও শাওকানি (রহিমাহুমুল্লাহ) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।]
দ্বিতীয় দলিল:
يَزِيدُ بنُ خُمَيْرٍ الرَّحَبِيُّ قالَ: خَرَجَ عَبْدُ اللهِ بنُ بُسْرٍ صَاحِبُ رَسُولِ اللهِ ﷺ مَعَ النَّاسِ فِي يَومِ عِيدِ فِطْرٍ أَوْ أَضْحَى، فَأَنْكَرَ إِبْطَاءَ الإِمَامِ، فَقَالَ: إِنَّا كُنَّا قَدْ فَرَغْنَا سَاعَتَنَا هَذِهِ، وَذَلِكَ حِينَ التَّسْبِيحِ
ইয়াজিদ ইবনে খুমায়র আর রাহবি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)—রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবি—একবার ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার দিন মানুষের সঙ্গে বের হলেন এবং ইমামের দেরিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন: “আমরা তো এই সময়ের মধ্যেই নামাজ শেষ করে ফেলতাম আর এটা হলো তাসবিহের (অর্থাৎ যখন চাশতের সময় শুরু হয়)।” [সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩১৭। আলবানি (রহিমাহুল্লাহ) সহিহ বলেছেন]
তৃতীয় দলিল—ইজমা: শাওকানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, কোনো কোনো আলেম বলেছেন: ঈদের নামাজের সময় সূর্য উঁচু হওয়ার পর থেকে যাওয়াল (সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়া) পর্যন্ত—এবং এতে কোনো মতভেদ আছে বলে আমার জানা নেই। [আদ দারারি আল মাদিয়্যাহ: ১/১১৮]
▪️দ্বিতীয়: ঈদের নামাজ পরের দিনে পড়া যাবে কি: যদি কোনো কারণে ঈদের দিন নামাজ পড়া না হয় তাহলে পরের দিন কাজা করা যাবে। এর দলিল হলো উপরে বর্ণিত প্রথম হাদিসটি — যেখানে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরের দিন ঈদে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
▪️তৃতীয়: ঈদুল আজহা আগে পড়া ও ঈদুল ফিতর দেরিতে পড়া মুস্তাহাব: ঈদুল আজহার নামাজ সময়ের শুরুতেই পড়া মুস্তাহাব। ঈদুল ফিতরের নামাজ প্রথম ওয়াক্ত থেকে সামান্য বিলম্বে পড়া মুস্তাহাব। এটি জমহুরের মত — হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব। [হানাফি সূত্র: আল-বাহরুর রায়েক, ইবনে নুজাইম (২/১৭৩); হাশিয়াতুত তাহতাউই (পৃ. ৩৪৬)। শাফেয়ি সূত্র: রাওদাতুত তালিবিন, নববি (২/৭৬); আল হাউয়িল কাবির, মাওয়ার্দি (২/৪৮৮)।] ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: ঈদুল ফিতর দেরিতে পড়ার কারণ হলো, মানুষ যাতে নামাজে বের হওয়ার আগেই সদাকাতুল ফিতর আদায় করার সুযোগ পায়। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসে এসেছে:
أُمِرَ أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ
“নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সদাকাতুল ফিতর মানুষ নামাজে বের হওয়ার আগেই আদায় করতে হবে।”
সুতরাং নামাজ দেরিতে হলে মানুষের জন্য সময় আরও প্রশস্ত হয়। আর ঈদুল আজহা আগে পড়ার কারণ হলো, কুরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিয়ার বা নিদর্শন।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে নামাজ ও কুরবানিকে পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন।” [সুরা কাউসার: ২]
কুরবানি নামাজের আগে করা যায় না। তাই নামাজ আগে পড়া হলে কুরবানির সময় আরও প্রশস্ত হয়। [আশ শারহুল মুমতি, ইবনে উসাইমিন: ৫/১২২]
সূত্র: আল মাওসুআহ আল ফিকহিয়্যাহ—দুরারুস সানিয়্যাহ (dorar.net)

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

আরাফাতের রোজা কোন দিন এ নিয়ে বিতর্ক এবং সমাধান

 আরাফার দিনের নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এই একটি রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার পূর্বের এবং পরের—মোট দুই বছরের গুনাহ খাতা মোচন করে দেন। তবে এই ফজিলতপূর্ণ দিনটি আসলে কোনটি তা নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে দুটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য অভিমত রয়েছে:

▪️প্রথম অভিমত (অধিকাংশ আলেমের মত): পূর্ববর্তী ও বর্তমান যুগের বহু গবেষক আলেমের মতে, নিজ নিজ দেশের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই ৯ জিলহজ আরাফার রোজা রাখতে হবে। যেভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে আমরা রমজান, ঈদ, কুরবানি ও অন্যান্য ইবাদতের তারিখ নির্ধারণ করি, এটিও ঠিক তেমনই। [এই মত অনুযায়ী, ভারত উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে আগামী বুধবার (২৭ মে, ২০২৬) রোজা রাখার দিন।]
▪️দ্বিতীয় অভিমত: আধুনিক যুগের একদল নির্ভরযোগ্য ও বরেণ্য আলেম মনে করেন, ‘আরাফা’ মূলত একটি স্থানের নাম। তাই সৌদি আরবের ৯ জিলহজ, অর্থাৎ আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থানের দিনটিকে প্রাধান্য দিয়ে বৈশ্বিকভাবে একই দিনে এই রোজা রাখা উচিত। [এই মতের ওপর ভিত্তিতে মঙ্গলবার ২৬ মে‌, ২০২৬ তারিখে রোজা রাখার দিন।] যেহেতু দুটি মতেরই শরিয়তসম্মত ভিত্তি এবং যুক্তি রয়েছে তাই যার কাছে যেটিকে অধিক বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মনে হয় তিনি সে অনুযায়ী আমল করতে পারেন। এই নফল ইবাদত নিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বা ঝগড়া-ফাসাদ করার কোনো সুযোগ নেই।
– সাধারণ নফলের নিয়তে দুইদিন রোজার মাধ্যমে আরাফাতের সওয়াব অর্জন করা সম্ভব:
কোনো ধরনের সংশয় বা বিতর্কে না গিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান হতে পারে—যদি কেউ আগামীকাল মঙ্গলবার এবং বুধবার (২৬ ও ২৭ মে), এই দুই দিনই রোজা রাখেন। তবে এ ক্ষেত্রে নিয়ত করতে হবে জিলহজ মাসের সাধারণ নফল রোজার, সুনির্দিষ্টভাবে ‘দুই দিন আরাফার রোজা’ মনে করে নয়। কারণ, আরাফার দিন মূলত একটিই, দুটি নয়; তাই সুনির্দিষ্টভাবে দুই দিনকে আরাফার দিন মনে করে রোজা রাখলে তা বিদআত বলে গণ্য হবে। কিন্তু জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন সাধারণ নফল রোজা রাখা যেহেতু স্বতঃসিদ্ধ ও শরিয়তসম্মত তাই সাধারণ নফল রোজার নিয়তে এই দুই দিন রোজা রাখলে ইনশাআল্লাহ আরাফার দিনের মূল সওয়াব নিশ্চিতভাবেই অর্জিত হয়ে যাবে। বিষয়টি ঠিক লাইলাতুল কদরের মতো। কদরের রাতকে নিশ্চিত করার জন্য কেউ যদি রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাত জেগে ইবাদত করে তবে সে যেমন নিশ্চিতভাবেই কদরের রাতের সওয়াব পেয়ে যায়; ঠিক তেমনি, সাধারণ নফলের নিয়তে এই দুই দিন রোজা রাখলে আরাফার দিনের অসামান্য ফজিলত মিস হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। তবে আমরা আগে যেমনটি বলেছি, নির্দিষ্টভাবে আরাফার নিয়তে রোজা রাখলে শুধু এক দিন রাখতে হবে‌। আর তা হয় সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে অথবা নিজ দেশের চাঁদের হিসেব অনুযায়ী। যেটা যার কাছে অধিক দলিলসম্মত ও যুক্তিযোগ্য মনে হয়। উভয় পক্ষই ইনশাআল্লাহ গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদি মত অনুসরণ করছেন।
▪️আমার ব্যক্তিগত মত:
আমার ব্যক্তিগত মত হল, জুমহুর বা অধিকাংশ আলেমের মত অনুযায়ী অন্যান্য ইবাদতের মতো আরাফাতের রোজা রাখা উচিত, নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী ৯ জিলহজ। যদিও একসময় আমি দ্বিতীয় মতের পক্ষে অর্থাৎ সৌদি আরবের চাঁদের হিসেবে রোজা রাখার পক্ষে ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে প্রথম মতটি অধিক যুক্তিযোগ্য মনে হওয়ায় সেখান থেকে ফিরে এসেছি।
আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। মহান আল্লাহ আমাদের ইবাদত-বন্দেগি কবুল করুন এবং ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। আমিন।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

চাঁদ দেখায় মতভেদ থাকলে আরাফার দিনের দোয়া কীভাবে করব

 প্রশ্ন: ঈদুল আজহার তারিখ নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি বিষয়ে আমি বিভ্রান্তিতে পড়েছি। আপনাদের আগের ফতোয়ায় পড়েছিলাম যে, হাজি নন এমন ব্যক্তিদের জন্য জিলহজ মাসের নবম দিন সিয়াম পালন করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, যাঁরা স্থানীয় তারিখ অনুসরণ করেন তাঁদের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের নবম তারিখ এবং যুক্তরাজ্যের নবম তারিখ আলাদা হয়ে যায়। অর্থাৎ সৌদিতে যেদিন ঈদ, সেদিন হয়তো ব্রিটেনে জিলহজের দশম দিন। আমি একটি বইয়ে পড়েছি যে, আরাফার দিন (নবম জিলহজ) হাজিদের সঙ্গে একই সময়ে দোয়া করা উচিত। যদি সকল মুসলিমের ঈদ একই দিনে হতো, তাহলে বিষয়টি সহজ হতো। কিন্তু স্থানীয় মত অনুসরণ করলে নবম তারিখ সবসময় ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, সৌদিতে আরাফার দিন যদি নবম জিলহজ হয়, আর ব্রিটেনে স্থানীয় হিসেবে সেটি অষ্টম জিলহজ হয়, তাহলে কি ব্রিটেনে বসে হাজিদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সেদিনই — যদিও সেটি সেখানে অষ্টম — দোয়া করতে হবে? নাকি নবম তারিখের জন্য অপেক্ষা করতে হবে? কোনো অবস্থাতেই পুরোপুরি মিল হবে না, কারণ ব্রিটেনের নবম তারিখ সৌদিতে হয়ে যাবে দশম। আশা করি প্রশ্নটি বোধগম্য হয়েছে। জাযাকুমুল্লাহু খায়রান (আল্লাহ আপনাদের উত্তম পুরস্কার দিন)।

উত্তর: আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর রসুলের প্রতি দরুদ ও সালামের পর:
▪️প্রথমত: আরাফার দিন ও সিয়াম প্রসঙ্গে: আরাফার দিন হলো জিলহজ মাসের নবম তারিখ। এই তারিখ প্রতিটি দেশের জন্য সেই দেশের স্থানীয় হিলাল (নতুন চাঁদ) দর্শনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ফলে মক্কায় যদি এটি বৃহস্পতিবার হয়, অন্য কোনো দেশে সেটি হতে পারে বুধবার বা শনিবার। চাঁদের উদয়স্থল (المطالع) ভিন্ন হলে মক্কাবাসীদের তারিখ অনুসরণ করা আবশ্যিক নয়। আহলে ইলমদের মধ্যে এটাই রাজেহ বা অগ্রাধিকারযোগ্য মত — প্রতিটি দেশের নিজস্ব রুইয়াত (চাঁদ দেখার সাক্ষ্য) গ্রহণযোগ্য, যখন উদয়স্থল ভিন্ন হয়। অতএব ব্রিটেনের মুসলিমরা যদি নিজেরা নতুন চাঁদ অনুসন্ধান করে তাহলে তাঁদের সেই চাঁদ দর্শন অনুযায়ী আমল করতে হবে।  অন্যথায় নিকটবর্তী দেশের অনুসরণ করবেন। [দ্রষ্টব্য: প্রশ্ন নং ৪০৭২০]
▪️দ্বিতীয়ত: আরাফার দিনের দোয়ার ফজিলত: আরাফার দিনের দোয়ার বিশাল ফজিলত (মর্যাদা ও পুরস্কার) রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
«خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»
“সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া। আর সর্বোত্তম কথা যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবিগণ বলেছেন তা হলো: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির — অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার উপাস্য নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসাও তাঁরই আর তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।” (তিরমিজি: ৩৫৮৫; আলবানি রহিমাহুল্লাহ ‘সহিহুত তারগিব’: ১৫৩৬-তে হাসান বলেছেন)
▪️এই ফজিলত কি কেবল আরাফায় অবস্থানকারী হাজিদের জন্য, নাকি সব স্থানের মুসলিমদের জন্য? এই বিষয়ে সম্মানিত আলেমদের মধ্যে ইখতিলাফ (মতভেদ) রয়েছে। [যার বিস্তারিত আলোচনা প্রশ্ন নং ৭০২৮২-তে করা হয়েছে] যাঁরা বলেন এই ফজিলত সব দেশ ও সব স্থানের জন্য প্রযোজ্য, তাঁদের মতে প্রতিটি ব্যক্তি নিজ দেশের চাঁদ দর্শনের ভিত্তিতে নির্ধারিত নবম জিলহজে দোয়া করবেন—হাজিরা তার আগের দিন আরাফায় অবস্থান করুন বা পরের দিন-এতে কোনো পার্থক্য নেই।
وَاللهُ أَعْلَم
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র: ইসলাম সওয়াল ও জওয়াব (islamqa.info)
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate