Saturday, February 21, 2026

তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহার করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে জানাবাত অবস্থায় তায়াম্মুম করে কি সালাত আদায় করা যাবে

 প্রশ্ন: তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহার করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে, জানাবাত অবস্থায় তায়াম্মুম করে কি সালাত আদায় করা যাবে যদিও তখন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো যে ব্যক্তির উপর গোসল ফরয হয়েছে সে ব্যক্তি সালাত পড়তে চাইলে তার উপর ফরয হচ্ছে– পানি দিয়ে গোসল করে নেয়া। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বানী:( وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا )“আর তোমরা জুনুবী (অপবিত্র) হলে প্রকৃষ্টভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] তাই কেউ যদি পানি ব্যবহারে অক্ষম হয়– পানি না থাকার কারণে কিংবা পানি থাকলেও এর ব্যবহারে রোগের ক্ষতি হতে পারে কিংবা তীব্র ঠান্ডার কারণে (তার কাছে পানি গরম করার মত কিছু না থাকলে); তাহলে সে ব্যক্তি পানি দিয়ে গোসল করার পরিবর্তে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে পারেন। এর দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী:(وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا ) “আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ মলত্যাগ করে আসে বা তোমরা স্ত্রী সহবাস কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] এ আয়াতে দলিল রয়েছে যে, অসুস্থ ব্যক্তি পানি ব্যবহার করার ফলে যদি তার মৃত্যু ঘটা, কিংবা রোগ বেড়ে যাওয়া কিংবা আরোগ্য লাভ বিলম্ব হওয়ার আশংকা থাকে সেক্ষেত্রে তিনি তায়াম্মুম করবেন। আল্লাহ্‌ তাআলা তায়াম্মুমের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:(فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ )“তা দ্বারা মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] আল্লাহ্‌ তাআলা এ বিধান প্রদান করার গূঢ় রহস্যও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:( مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ) “আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর কোন কাঠিন্য রাখতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬]
.
এছাড়াও হাদিসে এসেছে, আমর বিন আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:احتلمت في ليلة باردة في غزوة ” ذات السلاسل ” فأشفقت إن اغتسلت أن أهلك ، فتيممت ، ثم صليت بأصحابي الصبح ، فذكروا ذلك للنبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا عمرو صليت بأصحابك وأنت جنب ؟ فأخبرته بالذي منعني من الاغتسال وقلت : إني سمعت الله يقول : ( وَلا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيماً ) النساء/29، فضحك رسول الله صلى الله عليه وسلم ولم يقل شيئاً “যাতুস সালাসিল’ এর অভিযানে এক ঠান্ডার রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়ে গেল। আমি আশংকা করলাম, আমি যদি গোসল করি তাহলে ধ্বংস হয়ে যাব। তাই আমি তায়াম্মুম করলাম। এরপর আমার সাথীদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলাম। আমার সাথীরা বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন: হে আমর! তুমি কি জুনুবী (গোসল ফরজ হওয়া) অবস্থায় তোমার সাথীদের নিয়ে সালাত পড়েছ? তখন আমি তাঁকে জানালাম কি কারণে আমি গোসল করিনি এবং আমি আরও বললাম: আমি শুনেছি আল্লাহ্‌ বলেন: ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তোমাদের প্রতি দয়ালু”(সূরা নিসা, আয়াত: ২৯) তখন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন, কোন কিছু বললেন না।(সুনানে আবু দাউদ (৩৩৪), আলবানী ‘সহিহ সুনানে আবু দাউদ’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:وفي هذا الحديث جواز التيمم لمن يتوقع من استعمال الماء الهلاك سواء كان لأجل برد أو غيره ، وجواز صلاة المتيمم بالمتوضئين “এ হাদিসে দলিল রয়েছে যে, পানি ব্যবহার করলে যে ব্যক্তি মারা যাওয়ার আশংকা রয়েছে; সেটা ঠান্ডার কারণে হোক কিংবা অন্য কোন কারণে হোক– তার জন্য তায়াম্মুম করা জায়েয। তায়াম্মুমকারীর জন্য ওজুকারীদের ইমাম হওয়াও জায়েয।”(ইবনু হাজার ফাতহুল বারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৫৪)
.
.বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,إن كنت تستطيع أن تجد ماء دافئا أو تستطيع تسخين البارد ، أو الشراء من جيرانك أو غير جيرانك : فالواجب عليك أن تعمل ذلك ؛ لأن الله يقول : ( فاتَّقوا الله ما استَطَعْتُم ) ، فعليك أن تعمل ما تستطيع من الشراء أو التسخين أو غيرهما من الطرق التي تمكنك من الوضوء الشرعي بالماء ، فإن عجزت وكان البرد شديداً ، وفيه خطر عليك ، ولا حيلة لك بتسخينه ولا شراء شيء من الماء الساخن ممن حولك : فأنت معذور ، ويكفيك التيمم ؛ لقول الله تعالى : ( فاتَّقوا الله ما استَطَعْتُم ) وقوله سبحانه : ( فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ ) .والعاجز عن استعمال الماء حكمه حكم من لم يجد الماء
“যদি আপনার পক্ষে গরম পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় কিংবা আপনি গরম করতে পারেন কিংবা প্রতিবেশি বা অন্য কারো থেকে কিনে নিতে পারেন তাহলে সেটা করা আপনার উপর আবশ্যকীয়। কেননা আল্লাহ্‌ বলেন: “তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ্‌কে ভয় কর।”[সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬] তাই আপনার কর্তব্য হচ্ছে পানি কেনা বা গরম করা কিংবা অন্য যেভাবে শরিয়তের বিধান মোতাবেক ওজু করা যায় সেটা করা। যদি আপনি অপারগ হন এবং ঠান্ডা অতি তীব্র হয়, পানি ব্যবহারে বিপদ ঘটার আশংকা থাকে, পানি গরম করা বা আশপাশে কারো থেকে গরম পানি কেনার কোন উপায় না থাকে সেক্ষেত্রে আপনার ওজর গ্রহণযোগ্য এবং তায়াম্মুম করাই আপনার জন্য যথেষ্ট। যেহেতু আল্লাহ্‌ বলেছেন: “তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ্‌কে ভয় করো” এবং তিনি আরও বলেছেন: “পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে: তা দ্বারা মুখমন্ডল ও হাত মাসেহ করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] যে ব্যক্তি পানি ব্যবহারে অক্ষম সে ব্যক্তির হুকুম যে ব্যক্তি পানি পায়নি তার হুকুমের অনুরূপ।”(ইমাম বিন বায;মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০০; গৃহীত: ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-৭০৫০৭)
.
উল্লেখ্য যে, উক্ত বিধান কেবল স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা জাগ্রত অবস্থায় বীর্যপাতের মাধ্যমে জুনুবি (নাপাক) হওয়া, নারীদের হায়েয (ঋতুস্রাব) থেকে পবিত্র হওয়া এবং প্রসূতি নারীর নিফাস শেষে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ফরয গোসলের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate