প্রশ্ন: ইসলামে আমানতের সংজ্ঞা ও রক্ষার গুরুত্ব কী এবং আমানতের খেয়ানতের সংজ্ঞা ও এর শরয়ি বিধান কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ‘আমানত’ (الأمانة) একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ—বিশ্বস্ততা, আস্থা, নিরাপত্তা, তত্ত্বাবধান ও হেফাযত ইত্যাদি। প্রখ্যাত অভিধানবিদ ইবনু মানযূর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الأمانة ضد الخيانة—অর্থাৎ আমানত হলো খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘আমানত’-এর বহুবচন أمانات, যার দ্বারা বিশ্বস্ততা, আস্থা, নিরাপত্তা প্রদান, দায়িত্ব রক্ষা ও হেফাযতের অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا ‘যখন আমরা কা‘বা গৃহকে মানব জাতির জন্য সুরক্ষিত স্থান ও মানুষের জন্য মিলনস্থল করলাম”।(সূরা বাক্বারাহ ২/১২৫)। যদি কেউ আমানতদার ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত হয়, তবে তার কাছ থেকে ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ অনিশ্চয়তায় থাকে না। পরিভাষিক অর্থে, আমানত হলো সেই সমস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য যা একজন বান্দার উপর ফরজ করা হয়েছে, যেমন—সালাত, সিয়াম, যাকাত এবং ঋণ পরিশোধ।”
.
.
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় আমানতের দুটি অর্থ রয়েছে, একটি সাধারণ অর্থ এবং অপরটি নির্দিষ্ট অর্থ। আমানতের সাধারণ অর্থ ইসলামের সকল আদেশ-নিষেধের সাথে সম্পর্কিত। এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা যে আয়াতটি বলেছেন:اِنَّا عَرَضۡنَا الۡاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ الۡجِبَالِ فَاَبَیۡنَ اَنۡ یَّحۡمِلۡنَهَا وَ اَشۡفَقۡنَ مِنۡهَا وَ حَمَلَهَا الۡاِنۡسَانُ ؕ اِنَّهٗ كَانَ ظَلُوۡمًا جَهُوۡلًا”নিশ্চয়ই আমরা তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত (আমানত বা নৈতিক দায়িত্ব বা সততা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সকল কর্তব্য) পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা (আল্লাহর আযাবের ভয়ে) বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হল, আর মানুষ তা বহন করল; প্রকৃতপক্ষে, সে (নিজের প্রতি) অত্যন্ত জুলুমকারী, এবং (এর ফলাফল সম্পর্কে) খুবই অজ্ঞ।”(সূরা আহযাব: ৭২)
.
আয়াতে ‘আমানত’ বলতে মূলত শরিয়তের যাবতীয় বিধিবিধানকেই বোঝানো হয়েছে। এমনটিই বলেছেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনু জুবাইর, যাহহাক, ইবনু যায়দসহ অধিকাংশ মুফাসসির। (বিস্তারিত জানতে তাফসীরে তাবারী; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা; ৩৩৬–৩৪০), তাফসীরে ইবনে কাসীর; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৮৮–৪৮৯), আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২৫২–২৫৩), এবং ফাতহুল কাদীর; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪৩৭)।
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেছেন:عُرِضَتْ عَلَى آدَمَ فَقَالَ : خُذْهَا بِمَا فِيهَا، فَإِنْ أَطَعْتَ غَفَرت لَكَ، وَإِنْ عَصَيت عَذَّبْتُكَ قَالَ : قَبِلْتُ، فَمَا كَانَ إِلاَّ قَدْرُ مَا بَيْنَ الْعَصْرِ إِلَى اللَّيْلِ مِنْ ذَلِكَ الْيَوْمِ، حَتَّى أَصَابَ الْخَطِيئَةَ-“আল্লাহ আদমকে বলেন, তুমি আমানত গ্রহণ কর এই মর্মে যে, যদি তুমি আনুগত্য কর, তাহ’লে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। আর যদি অবাধ্যতা কর, তাহ’লে তোমাকে শাস্তি দেব। আদম বলল, আমি কবুল করলাম। অতঃপর আছর থেকে মাগরিবের মধ্যেই আদম ভুল করে বসেন”।(তাফসীর ইবনু জারীর; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৩৩৭)
.
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) “আমানাহ” শব্দের ব্যাখ্যা সম্পর্কে পূর্ববর্তী পণ্ডিতদের বেশ কিছু মতামত উদ্ধৃত করেছেন,সবগুলো মত উল্লেখ করে তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;وكل هذه الأقوال لا تنافي بينها ، بل هي متفقة وراجعة إلى أنها : التكليف ، وقبول الأوامر والنواهي بشرطها ، وهو أنه إن قام بذلك أثيب ، وإن تركها عوقب ، فقبلها الإنسان على ضعفه وجهله وظلمه ، إلا من وفق الله ، وبالله المستعان”এই সকল মতামতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং এগুলো পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোর মূল কথা হলো: এটি (আমানত) হলো ‘তাকলীফ’ (শরীয়তের বিধান পালনের দায়িত্ব) এবং শর্তসাপেক্ষে আদেশ ও নিষেধসমূহ গ্রহণ করা।শর্তটি হলো;যদি সে এটি পালন করে তবে পুরস্কৃত হবে, আর যদি তা বর্জন করে তবে শাস্তি পাবে। মানুষ তার দুর্বলতা, অজ্ঞতা ও জুলুম (অবিচার) সত্ত্বেও এটি গ্রহণ করে নিয়েছে; তবে তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ তাওফীক দান করেছেন। আর আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করছি।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৮৯)
.
এই ব্যাখ্যাটিই ইমাম ইবনু জারীর আত্ব-ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৩১০ হি.] গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন—إنه عُنِي بالأمانة في هذا الموضع جميع معاني الأمانات في الدين ، وأمانات الناس . وذلك أن الله لم يَخُصّ بقوله (عَرَضْنَا الأمَانَةَ) بعض معاني الأمانات لما وصفنا“এ বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক মত হলো তাদের মত, যারা বলেছেন এখানে ‘আমানত’ বলতে দ্বীনের সকল প্রকার আমানত এবং মানুষের পারস্পরিক সব আমানতই উদ্দেশ্য। কারণ আল্লাহর বানী:”আমরা আমানত পেশ করলাম” এর মাধ্যমে আমানতের কোনো নির্দিষ্ট অর্থকে আলাদা করে সীমাবদ্ধ করেননি;যেমনটি আমরা পূর্বে ব্যাখ্যা করেছি।” (তাফসীরে আত-তাবারী: খণ্ড: ১৯: পৃ. ২০৪–২০৫)
.
ইমাম আবু ‘আব্দুল্লা-হ্ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আল ক্বুরত্বুবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭১ হি.] বলেন:والأمانة تعمّ جميع وظائف الدّين على الصحيح من الأقوال ، وهو قول الجمهور “সঠিক মত অনুযায়ী আমানত দ্বীনের সকল দায়িত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।” (তাফসীরে কুরতুবী; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ২৪৪)
.
আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘আদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:جميع ما أوجبه الله على عبده أمانة ، على العبد حفظها بالقيام التام بها ، وكذلك يدخل في ذلك أمانات الآدميين ، كأمانات الأموال والأسرار ونحوهما ، فعلى العبد مراعاة الأمرين ، وأداء الأمانتين ( إن الله يأمركم أن تؤدوا الأمانات إلى أهلها ) “আল্লাহ তার বান্দার ওপর যা কিছু ফরজ করেছেন সবই আমানত। বান্দার কর্তব্য তা পূর্ণভাবে সংরক্ষণ ও আদায় করা। এর মধ্যে মানুষের পারস্পরিক আমানতও অন্তর্ভুক্ত যেমন সম্পদের আমানত, গোপন কথা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়। সুতরাং বান্দার ওপর আবশ্যক—এই উভয় প্রকার আমানতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং উভয় আমানতই যথাযথভাবে আদায় করা। (আল্লাহ তাআলা বলেন): “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে আদেশ করেছেন।”(তাফসীরে সা‘আদী, পৃষ্ঠা: ৫৪৭)
.
ইমাম শানকিতী (রাহিমাহুল্লাহ ) বলেন:ذكر جل وعلا في هذه الآية الكريمة أنه عرض الأمانة ، وهي التكاليف مع ما يتبعها من ثواب وعقاب على السماوات والأرض والجبال ، وأنهن أبين أن يحملنها وأشفقن منها ، أي : خفن من عواقب حملها أن ينشأ لهن من ذلك عذاب الله وسخطه ، وهذا العرض والإباء والإشفاق كله حق ، وقد خلق الله للسماوات والأرض والجبال إدراكا يعلمه هو جل وعلا ، ونحن لا بعلمه ، وبذلك الإدراك أدركت عرض الأمانة عليها ، وأبت وأشفقت ، أي : خافت “এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে আমানত পেশ করেছেন। আর এই আমানত হলো (শরিয়তের) বিধিবিধান বা দায়িত্বসমূহ, যার সাথে পুরস্কার ও শাস্তি জড়িত। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে এবং এ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, তারা এই আমানত বহনের পরিণাম সম্পর্কে ভীত ছিল যে, এর ফলে আল্লাহর আযাব ও তাঁর ক্রোধের শিকার হতে হয় কি না সেই আশঙ্কায়। এই যে আমানত পেশ করা, তাদের অস্বীকার করা এবং ভীত হওয়া—এর পুরোটাই সত্য ও বাস্তব। আল্লাহ তাআলা আসমান, জমিন ও পাহাড়-পর্বতের জন্য এমন এক প্রকার উপলব্ধি বা বোধশক্তি সৃষ্টি করেছেন যা কেবল আল্লাহই জানেন, আমরা তা জানি না। সেই বোধশক্তির মাধ্যমেই তারা তাদের ওপর আমানত পেশ করার বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং তা গ্রহণে অস্বীকার করেছে ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে; অর্থাৎ ভয় পেয়েছে।”(আদ্বা’উল বায়ান; খণ্ড: ৩৬; পৃষ্ঠা: ১৩৯)
.
.
শরীয়তে বহু স্থানেই আমানত সংরক্ষণ ও খেয়ানত না করার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফিকহের গ্রন্থগুলো এবং সাধারণ মানুষের মুখে এই বিশেষ অর্থটিই বেশি প্রচলিত। এই অর্থে, আমানত হলো অন্যের অধিকার যা মানুষকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং যা আদায় করা ফরজ বা ওয়াজিব। এটির তিনটি প্রসিদ্ধ রূপ বিদ্যমান।
প্রথম রূপ: চুক্তিভিত্তিক আর্থিক অধিকার যেমন আমানত (ওয়াদী‘আ), ঋণ, ভাড়া ইত্যাদি; অথবা চুক্তি ছাড়াও যেমন কুড়ানো জিনিস (লুক্বতা), হারানো সম্পদ যা কেউ পায়।আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ,গন্থে-এ বলা হয়েছে:
وبالتتبع تبين أن الأمانة قد استعملها الفقهاء بمعنيين :
أحدهما: بمعنى الشيء الذي يوجد عند الأمين ، وذلك يكون في :
أ – العقد الذي تكون الأمانة فيه هي المقصد الأصلي ، وهو الوديعة ، وهي العين التي توضع عند شخص ليحفظها، فهي أخص من الأمانة ، فكل وديعة أمانة ولا عكس.
ب – العقد الذي تكون الأمانة فيه ضمنا ، وليست أصلا ، بل تبعا ، كالإجارة والعارية والمضاربة والوكالة والشركة والرهن .
ج – ما كانت بدون عقد ، كاللقطة ، وكما إذا ألقت الريح في دار أحد مال جاره ، وذلك ما يسمى بالأمانات الشرعية “
“অনুসন্ধানের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে,ফুকাহারা ‘আমানত’ শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহার করেছেন:
প্রথমটি: এমন কোনো বস্তু যা আমানতদার ব্যক্তির কাছে গচ্ছিত থাকে। এটি মূলত নিচের ক্ষেত্রগুলোতে হয়ে থাকে:
(ক).এমন চুক্তি যেখানে আমানত রক্ষা করাই মূল উদ্দেশ্য: আর তা হলো ‘ওয়াদিয়া’ (গচ্ছিত রাখা)। এটি এমন একটি বস্তু যা কোনো ব্যক্তির কাছে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়। এটি (ওয়াদিয়া) সাধারণ আমানতের চেয়ে আরও সুনির্দিষ্ট। তাই প্রতিটি ‘ওয়াদিয়া’ই আমানত, কিন্তু প্রতিটি ‘আমানত’ ই ‘ওয়াদিয়া’ নয়।
(খ) এমন চুক্তি যেখানে আমানত আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে থাকে: অর্থাৎ এখানে আমানত মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং অন্য কোনো চুক্তির অনুগামী হিসেবে আসে। যেমন— ইজারা (ভাড়া), আরিয়াহ (ধারে দেওয়া), মুদারাবাহ (অংশীদারিত্বের ব্যবসা), ওকালাহ (প্রতিনিধিত্ব), শিরকাহ (অংশীদারিত্ব) এবং রাহন (বন্ধক)।
.
(গ) যা কোনো চুক্তি ছাড়াই আমানত হিসেবে গণ্য হয়: যেমন— লুক্বাতা’ (কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসপত্র )
অথবা যদি বাতাসের ঝাপটায় প্রতিবেশীর কোনো মাল কারও বাড়িতে এসে পড়ে। এগুলোকে ‘আমানত শারইয়্যাহ’ (শরয়ি আমানত) বলা হয়।”(মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,খণ্ড;৬;পৃষ্ঠা;২৩৬)
.
দ্বিতীয় রূপ: মানুষের গোপন কথা বা রহস্য রক্ষা করা: আবু সাঈদ আল-খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন:( إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْأَمَانَةِ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ) “সে ব্যক্তি ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ্র কাছে সর্বাপেক্ষা বড় আমানত খিয়ানতকারী যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। ইবনু নুমায়র বলেন, “ইন্না মিন ‘আযিম” স্থলে “ইন্না ‘আযিম” (সবচেয়ে অধিক) হবে।”(সহীহ মুসলিম হা/৩৪৩৫)
.
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ( إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيثِ ثُمَّ الْتَفَتَ : فَهِيَ أَمَانَةٌ )”কোন ব্যক্তি কোন কথা বলার পর মুখ ঘুরালে (কেউ শুনেছে কিনা তা দেখলে) তা আমানতস্বরূপ।”(সুনানে আবু দাউদ হা/৪৮৬৮;তিরমিজি হা/১৯৫৯) ইমাম তিরমিজি রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি হাসান হাদিস বলেছেন এবং ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বলেছেন)।
.
তৃতীয় রূপ: দায়িত্ব ও সরকারি-বেসরকারি পদমর্যাদা:
যে কোনো দায়িত্ব বা পদই মূলত একটি আমানত। এটি যথাযথভাবে পালন করা এবং ন্যায়ের সাথে সম্পাদন করা সকলের ওপর ফরজ। উদাহরণস্বরূপ: শাসনের দায়িত্ব একটি আমানত, বিচারকের পদ একটি আমানত, কোনো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্বও একটি আমানত, এমনকি পরিবারের দায়িত্বও একইভাবে আমানতের অন্তর্ভুক্ত। সংক্ষেপে, সকল পদ এবং দায়িত্বই আমানতের অংশ।
.
“শার‘ঈ দৃষ্টিতে, প্রতিটি সরকারি বা ব্যক্তিগত আমানত রক্ষা করা ওয়াজিব; অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুসারে সতর্কতার সঙ্গে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা আবশ্যক। আমানতকে নষ্ট করা বা এতে খিয়ানত করা কঠোরভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:”হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি খিয়ানত করো না এবং জেনে শুনে তোমাদের অর্পিত আমানতেও খিয়ানত করো না।”(সূরা আনফাল: ২৭) অপর আয়াতে আরো বলেন:اِنَّ اللّٰهَ یَاۡمُرُكُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَهۡلِهَا “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দাও” (সূরা আন-নিসা ৪: ৫৮) এখান থেকে বোঝা যায়, প্রতিটি আমানত—ছোট হোক বা বড়—ই আমাদের দায়িত্ব ও সততার পরীক্ষা। আমানত রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি ঈমানের অংশ। হাদিসে এসেছে,ইউসুফ ইবনু মাহাক আল-মাক্কি (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন:أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ”যে ব্যক্তি তোমার কাছে কিছু আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খিয়ানাত করেছে তুমি তার সাথে খিয়ানাত করো না।”(তিরমিযী হা/১২৮৭; আবু দাউদ হা/৩৫৩৪)
.
আমানত রক্ষা করার ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেণী বিভাগ:
.
আধুনিক সুফাসসির আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘আদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:১৩৭৬ হি:] বলেন: আমানত রক্ষার ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকার। যথা-
(১) منافقون বা মুনাফিকরা। এদের বৈশিষ্ট্য হল,قاموا بها ظاهرا لا باطنا “তারা বাহ্যিকভাবে আমানত সম্পাদন করে, আন্তরিকভাবে নয়’। অর্থাৎ সালাত,সিয়াম, হজ্জ,জিহাদ ইত্যাদি কর্মগুলি দুনিয়ার স্বার্থে করে থাকে, আখেরাতের স্বার্থে নয়।
.
(২) مشركون বা মুশরিকরা। তাদের অবস্থা হল:تركوها ظاهرا وباطنا “তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে তা বর্জন করে। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নবুঅত লাভের পর তা প্রচার করতে গেলে মূলতঃ মুশরিকদের সাথে সর্বপ্রথম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লেগে যায়। তারা প্রকাশ্যভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকে। ফলে তাদের সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও অন্তরে কপটতা পোষণ করে বলে তাদেরকে সহজে চেনা যায় না। বস্তুত তাদের দ্বারাই দেশ, জাতি ও ধর্মের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
.
(৩) مؤمنون বা মুমিনগণ। তাদের বৈশিষ্ট্য হল:قائمون بها ظاهرا وباطنا “তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে আমানত সম্পাদন করে থাকে”। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা উল্লিখিত তিন শ্রেণীর লোকদের আমলের প্রতিদান ও শাস্তি প্রদান প্রসঙ্গে বলেন:”পরিণামে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীকে শাস্তি দিবেন। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু”।(সূরা আহযাব ৩৩/৭৩; তাফসীরে আস-সা‘দী পৃষ্ঠা: ৬২০)
.
.
খিয়ানত হলো আমানতের বিপরীত। “খিয়ানত” শব্দটি এসেছে خَانَهُ (খানা) থেকে, যার অর্থ হলো– কেউ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এর বিভিন্ন রূপ হলো:
خَوْنًا (খাওন) خيانة (খিয়ানত) مَخَانة (মাখানা) اختانه (ইখতানাহু) যে ব্যক্তি খিয়ানত করে, তাকে বলা হয়:
خائن (খায়েন) পুরুষের ক্ষেত্রে خائنة (খায়েনা) –নারী ক্ষেত্রে خؤون (খুওন) خَوَّان (খাওয়ান) এদের বহুবচন خانة (খানা) خَوَنة (খাওনা) خُوَّان (খুওয়ান)
(উৎস: বাশায়ির,“যাওয়িত তামঈয”, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫৮২)
.
রাগিব ইসফাহানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
(الخيانة مخالفة الحقّ بنقض العهد في السّرّ. ونقيض الخيانة: الأمانة، يقال: خُنْتُ فلانا، وخنت أمانة فلان)
“খিয়ানত হলো গোপনে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সত্যের বিরোধিতা করা। খিয়ানতের বিপরীত হলো আমানত। বলা হয়: আমি অমুকের সঙ্গে খিয়ানত করেছি, এবং আমি অমুকের আমানতে খিয়ানত করেছি।”(মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন ৩০৫)
.
.
ত্বিব্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:(هي مخالفة الحق بنقض العهد في السر، والأظهر أنها شاملة لجميع التكاليف الشرعية) “খিয়ানত হলো গোপনে অঙ্গীকার ভঙ্গের মাধ্যমে সত্যের বিরোধিতা করা। স্পষ্টতই এটি সকল শারয়ি দায়িত্ব ও বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করে। (মিরআতুল মাফাতীহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২২৯)
.
জাহিজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الاستبداد بما يؤتمن الإنسان عليه من الأموال والأعراض والحرم وتملك ما يستودع، ومجاحدة مودعه) “খিয়ানত হলো মানুষকে যে সম্পদ, সম্মান, ইজ্জত-আব্রু ও পবিত্র বিষয়ের আমানত দেওয়া হয়, তাতে একচেটিয়া আচরণ করা, গচ্ছিত জিনিস নিজের করে নেওয়া এবং যিনি আমানত রেখেছেন তার সাথে অস্বীকার ও বিশ্বাসঘাতকতা করা।” (তাহযীবুল আখলাক পৃষ্ঠা: ৩১)
.
ইবনু আশূর (রাহিমাহুল্লাহ)বলেন:(وحقيقة الخيانة عمل من اؤتمن على شيء بضد ما اؤتمن لأجله بدون علم صاحب الأمانة) “খিয়ানতের প্রকৃত অর্থ হলো যে ব্যক্তির কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হয়েছে, সে আমানতদাতার অজান্তে যে উদ্দেশ্যে আমানত রাখা হয়েছিল তার বিপরীত কাজে তা ব্যবহার করা। (আত তাহরীর ওয়াত তানবীর; পৃষ্ঠা: ২৪)
.
আমানতের খেয়ানত করা একদিকে যেমন কবীরা গোনাহ, অপরদিকে এটি মুনাফিকির একটি লক্ষণ। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ ‘যে ব্যক্তি যা খেয়ানত করে, তা নিয়ে সে ক্বিয়ামতের দিন হাযির হবে’ (আলে ইমরান ৩/১৬১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ “হে মানুষ সকল! তোমাদের কাউকে কোন কাজে লাগালে যদি সে আমাদের থেকে কিছু লুকায় তবে সে তা কেয়ামতের দিন সাথে নিয়ে আসবে”(সহীহ মুসলিম হা/১৮৩৩) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি করে।”(সহীহ বুখারী হা/৩৪ সহীহ মুসলিম হা/৫৮) সহীহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ “যদিও সে রোজা রাখে, নামাজ পড়ে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে।” সহীহ মুসলিম হা/৯০) এটি প্রমাণ করে যে, খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা মুনাফিকের স্বভাব।মুসনাদে আহমাদে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:لا إِيمَانَ لِمَنْ لا أَمَانَةَ لَهُ وَلا دِينَ لِمَنْ لا عَهْدَ لَهُ “যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই, আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তার দ্বীন নেই।” (মুসনাদে আহমাদ হা/১১৯৩৫) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই বলে দোয়া করতেন:اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْجُوعِ فَإِنَّهُ بِئْسَ الضَّجِيعُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ الْخِيَانَةِ فَإِنَّهَا بِئْسَتِ الْبِطَانَةُ “(হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ তা (মানুষের) নিকৃষ্ট সাথী এবং আমি আপনার নিকট আরও আশ্রয় প্রার্থনা করি খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) থেকে। কারণ তা গোপন চারিত্রিক দোষ)।(সুনানে নাসাঈ হা/৫৩৭৩, আবু দাউদ হা/১৩২৩, ইবনে মাজাহ: ৩৩৪৫।ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটি হাসান সহীহ বলেছেন)।প্রখ্যাত তাবেয়ী মায়মুন ইবনে মেহরান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ثلاثة يؤدَّين إلى البَرّ والفاجر : الأمانة ، والعهد ، وصلة الرحم “তিনটি বিষয় এমন যা সৎ ও অসৎ (ভালো-মন্দ) উভয়ের সাথেই পালন করতে হয়: আমানত রক্ষা করা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।”
.
এছাড়াও পরকালে খিয়ানতকারীর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ যেমন: রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,مَا مِنْ وَالٍ يَلِى رَعِيَّةً مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ، فَيَمُوْتُ وَهْوَ غَاشٌّ لَهُمْ، إِلاَّ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ-“কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করলো আর তার মৃত্যু হল এই হালতে যে, সে ছিল খিয়ানাতকারী, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম ১/৬৩, হা/১৪২,মুসনাদে আহমাদ হা/২০১৩১) আরেক বর্ননায় এসেছে,আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ﷺ) এরশাদ করেন,لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ عِنْدَ اسْتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَفِي رِوَايَةٍ : لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ أَلاَ وَلاَ غَادِرَ أَعْظَمُ غَدْرًا مِنْ أَمِيرِ عَامَّةٍ- ‘প্রত্যেক খেয়ানতকারীর জন্য ক্বিয়ামতের দিন একটি ঝান্ডা থাকবে, যা তার পিঠের পিছনে পুঁতে দেওয়া হবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তার খেয়ানতের পরিমাণ অনুযায়ী সেটি উঁচু হবে। সাবধান! জনগণের নেতার খেয়ানতের চাইতে বড় খেয়ানত আর হবেনা”(সহীহ মুসলিম হা/১৭৩৮; মিশকাত হা/৩৭২৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;কথা বা অন্য কোনো মাধ্যমে আমানতের খিয়ানত করার বিধান কী? আর এর কাফফারা কী?
উত্তরে শাইখ বলেছেন:
الحمد لله رب العالمين ، وصلى الله وسلم على نبينا محمدٍ خاتم النبين وإمام المتقين ، وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسانٍ إلى يوم الدين :خيانة الأمانة من علامات النفاق، فإن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم قال: (آية المنافق ثلاث: إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا اؤتمن خان)، ولا يحل لأحد أن يخون الأمانة سواء كانت قولية أو فعلية؛ لأنه إن فعل ذلك كانت فيه علامة من علامات النفاق، وربما تسري هذه حتى تصل إلى النفاق الأكبر -والعياذ بالله-، فإذا حدثك إنسان بحديث، وقال: إنه أمانة، حرم عليك أن تفشيه لأي أحد، وإذا عاملك معاملة، وقال: إنها أمانة، حرم عليك أن تفشيها لأي أحد، فإن فعلت، فقد خنت الأمانة,لكن لو فرض أنك أخطأت فخنت الأمانة، فالواجب عليك أن تتحلل ممن ائتمنك، لأنك ظلمته حيث خنته ، لعل الله يهديه فيحللك ، والذي ينبغي لمن جاءه أخوه معتذراً أن يعذره ويحلله حتى يكون أجره على الله عز وجل ، كما قال تعالى : (( فمن عفا وأصلح فأجره على الله )) ، ولا شك أن الأمانات تختلف في آثارها ، قد يكون إفشاء السر في هذه الأمانة عظيماً يترتب عليه مفاسد كثيرة ، وقد يكون متوسطاً وقد يكون سهلاً.
“সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর, যিনি শেষ নবী এবং মুত্তাকীদের ইমাম। আরও বর্ষিত হোক তাঁর পরিবার, সাহাবী এবং যাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁকে অনুসরণ করবে, তাঁদের সবার ওপর।”আমানতে খেয়ানত নিফাকের লক্ষণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে, আর আমানত দেওয়া হলে খেয়ানত করে।”কোনো ব্যক্তির জন্য কথাবার্তা হোক বা কাজ কোন আমানতেই খেয়ানত করা হালাল নয়। কারণ এতে নিফাকের একটি আলামত সৃষ্টি হয়। এমনকি তা বেড়ে বড় নিফাকে (আক্বীদাগত মুনাফেকি) পৌঁছাতে পারে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ তোমাকে কোনো কথা বলে এবং বলে এটি আমানত তবে তা কারো কাছে প্রকাশ করা হারাম। আর যদি কোনো লেনদেনকে আমানত বলে তাও প্রকাশ করা হারাম। যদি প্রকাশ করো তবে তুমি আমানতে খেয়ানত করলে।ধরে নেওয়া যাক, আপনি ভুলবশত আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ) করে ফেলেছেন; এমতাবস্থায় আপনার ওপর ওয়াজিব বা আবশ্যিক কর্তব্য হলো—যিনি আপনার নিকট আমানত রেখেছিলেন, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্ত হওয়া। কারণ খেয়ানত করার মাধ্যমে আপনি তার প্রতি জুলুম করেছেন। আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে সঠিক বুঝ দান করবেন এবং তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।আর কোনো ব্যক্তি যখন তার ভাইয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আসে, তখন অপরজনের উচিত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং দায়মুক্ত করা, যাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতিদান নিশ্চিত হয়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:”অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে নিহিত”(সূরা আশ-শূরা: ৪০)। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমানতের প্রভাব বা ফলাফল বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।কোনো আমানতের ক্ষেত্রে গোপন তথ্য ফাঁস করা অনেক বড় অপরাধ হতে পারে যা অনেক ক্ষতির কারণ হয়, আবার কখনও তা মাঝারি বা সামান্য হতে পারে।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, পৃষ্ঠা: ৭২২)
.
সুতরাং যেহেতু আমানতের খেয়ানত করা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত, তাই এটি শুধুমাত্র তওবার মাধ্যমে মাফ করা যায়। যদি খেয়ানত আল্লাহ্র হক সংক্রান্ত হয়—যেমন সালাত আদায় না করা, রমজানের সিয়াম পালন না করা, কাফফারা দেওয়া থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি—তাহলে তার জন্য অতিরিক্ত তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক। আর যদি খেয়ানত মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত হয়—যেমন কারো সম্পদ দখল করা বা ক্ষতি করা—তাহলে তা যত দ্রুত সম্ভব ফেরত দিতে হবে বা ভুক্তভোগীর সম্মতি নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন:مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَحَدٍ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَىْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُوْنَ دِيْنَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ-“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বে যেদিন তার কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ নেকী তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৪৪৯; মিশকাত হা/৫১২৬) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
No comments:
Post a Comment