Saturday, February 21, 2026

একজন আদর্শ মুসলিম পুরুষ হিসেবে মা এবং স্ত্রী উভয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কার অগ্রাধিকার বেশি

 প্রশ্ন: একজন আদর্শ মুসলিম পুরুষ হিসেবে মা এবং স্ত্রী উভয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কার অগ্রাধিকার বেশি স্ত্রীর, নাকি মায়ের? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর একজন আদর্শ মুসলিম পুরুষের জন্য মা ও স্ত্রী উভয়ের প্রতিই দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক। এ বিষয়ে একপাক্ষিকভাবে বলা যে “শুধু একজনই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, অন্যজন নয়”—শার’ঈ দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ মায়ের অধিকার ও স্ত্রীর অধিকার প্রকৃতি ও ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন, এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন। মা এবং স্ত্রী হলো একটি বৃক্ষের মূল এবং ছায়ার মতো। মা হলেন সেই মূল, যা থেকে পুরুষের অস্তিত্বের শুরু এবং যার ওপর সে দাঁড়িয়ে আছে। আর স্ত্রী হলেন সেই শীতল ছায়া, যা তাকে জীবনের তপ্ত রোদে প্রশান্তি দেয়।মূল ছাড়া যেমন বৃক্ষ টিকে থাকতে পারে না, তেমনি ছায়া ছাড়া ক্লান্ত পথিকের বিশ্রাম মেলে না।তাই জীবনে দুজনেরই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।ইসলামে মায়ের অধিকার হলো ভালোবাসা, ত্যাগ ও ঋণের অধিকার যা পৃথিবীতে কোনো দিন পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব নয়।আর স্ত্রীর অধিকার হলো চুক্তি ও আমানতের অধিকার—যা রক্ষা করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন প্রকৃত পুরুষ তার মাকে সম্মানের শীর্ষে স্থান দেন,আর তার স্ত্রীকে আগলে রাখেন পাঁজরের হাড়ের মতো মমতা, যত্ন ও দায়িত্ববোধে। এখানে ছোট-বড় নির্ধারণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ মা হলেন সেই দরজা, যার মাধ্যমে আপনি দুনিয়াতে এসেছেন, আর স্ত্রী হলেন সেই সঙ্গিনী, যাকে নিয়ে আপনি জান্নাতের পথে চলতে চান।মা জান্নাতের চাবিকাঠি,আর স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ পূর্ণাঙ্গ মুমিন হওয়ার মানদণ্ড।অতএব ইসলামের শিক্ষা হলো মা ও স্ত্রীর মাঝে প্রতিযোগিতার দেয়াল নয়,বরং ভালোবাসা, সম্মান ও প্রজ্ঞার সেতু নির্মাণ করা।
.
একজন আদর্শ মুসলিম পুরুষ হিসেবে মা এবং স্ত্রী উভয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কার অগ্রাধিকার বেশি স্ত্রীর, নাকি মায়ের? জবাবে বলা হয়: কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের বক্তব্য ও আমল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মর্যাদা, সদাচরণ, উত্তম ব্যবহার ও সম্মান প্রদর্শনের দিক থেকে মায়ের অধিকার অন্য সবার উপর সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। বিশেষত সদাচরণ ও ভালো ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের ওপর মায়ের হক সবচেয়ে বড়। এর দলিল হচ্ছে,আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দেয়ার বিষয়টির সাথে পিতামাতার প্রতি সদাচরণের বিষয়টি একত্রে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:وَ قَضٰی رَبُّكَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاهُ وَ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ“আর আপনার প্রভু আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।”[সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৩] তিনি আরও বলেন:وَ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَ لَا تُشۡرِكُوۡا بِهٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোনো কিছুকে তাঁর শরীক করো না; এবং পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।”[সূরা নিসা, আয়াত: ৩৬] এছাড়াও সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে,প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকার কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার মায়ের। লোকটি বলল: এরপর কার? তিনি বললেন: তোমার পিতার।”(সহিহ বুখারী হা/৫৯৭১;ও সহিহ মুসলিমে হা/২৫৪৮) এই হাদিসে মায়ের অধিকারকে পিতার উপর তিন গুণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।এর কারণ হিসেবে ওলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন:গর্ভধারণের কষ্ট,সন্তান জন্মদানের যন্ত্রণা লালন-পালন ও সেবা।তবে এর অর্থ এই নয় যে পিতার অধিকার কম বরং ক্রমবিন্যাসে মায়ের অধিকার আগে।ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “এ হাদিস প্রমাণ করে যে, সদ্ব্যবহার ও খেদমতের ক্ষেত্রে মায়ের হক পিতার চেয়ে অধিক।” অপর বর্ননায় মুআবিয়া ইবনে জাহিমা আস-সালামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জিহাদে অংশগ্রহণের ইচ্ছা করছি, এজন্য আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা জীবিত আছেন কী? তিনি বললেন, জ্বী হ্যাঁ। তিনি বললেন, মায়ের সেবাকেই আবশ্যিক করে নেও। কেননা জান্নাত তাঁর পায়ের কাছে”।(মুসনাদে আহমাদ হা/১৫৫৩৮; নাসাঈ হা/৩১০৪; ইবনু মাজাহ হা/২৭৮১; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৪৮৫)
পিতা মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতামাতার উভয়কে কিংবা কোন একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল কিন্তু জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না; তার নাক ধূলায় ধূসরিত হৌক! একথা তিনি তিনবার বলেন’ (সহীহ মুসলিম হা/২৫৫১; মিশকাত হা/৪৯১২)। ইবনু ওমর (রাঃ) জনৈক কবীরা গুনাহগারকে বলেন, আল্লাহর কসম! তুমি মায়ের সাথে নম্র ভাষায় কথা বললে এবং তার ভরণপোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি কবীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাক’ (আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮, সনদ সহীহ)
এগুলো ছাড়াও আরও অনেক দলিল রয়েছে; এ পরিসরে সবগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয়।এগুলো পিতামাতার প্রতি সদাচরণ ও সদ্ব্যবহারের গুরুত্বের দলিল।পিতামাতার সাথে সদাচরণ করা হবে তাদের আনুগত্য করার মাধ্যমে, সম্মান ও মর্যাদা দেয়া, তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের সামনে কণ্ঠস্বর নীচু রাখা, তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা, তাদের সাথে বিনয়ী হওয়া, তাদের সাথে বিরক্তি প্রকাশ না-করা, তাদের সেবা করা, তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বাস্তবায়ন করা, তাদের সাথে পরামর্শ করা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনা, তাদের সাথে হটকারিতা না-করা, তাদের জীবদ্দশায় ও তাদের মৃত্যুর পর তাদের বন্ধুকে সম্মান করা ইত্যাদির মাধ্যমে।এর মধ্যে আরও রয়েছে তাদের অনুমতি ছাড়া সফর না করা, তাদের চেয়ে উপরের কোন স্থানে না-বসা, তাদের সামনে খাবারের দিকে পা দিয়ে না-বসা, নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে তাদের উপর প্রাধান্য না দেয়া।অনুরূপভাবে তাদের প্রতি সদাচরণের মধ্যে রয়েছে: তাদেরকে দেখতে যাওয়া, তাদেরকে উপহার দেয়া, তাদের প্রতিপালনের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা; ছোটবেলায় হোক বা বড় হওয়ার পর হোক।অনুরূপভাবে তাদের সদাচরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: তাদের উভয়ের মাঝে মতভেদ কমানোর চেষ্টা করা। সেটা সাধ্যানুযায়ী উত্তম উপদেশ ও আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে এবং উভয়ের মধ্যে যিনি মজলুম তার পক্ষে ওজর পেশ করার মাধ্যমে এবং ভাল কথা ও কাজের মাধ্যমে তার মনকে ভালো করার মাধ্যমে।
.
ইবন হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বলেছেন:وإن كان الأب والأم محتاجين إلى خدمة الابن، أو الابنة، الناكح أو غير الناكح، لم يجز للابن ولا للابنة الرحيل ولا تضييع الأبوين أصلا“যদি পিতা-মাতা তাদের বিবাহিত বা অবিবাহিত ছেলে বা মেয়ের সেবার মুখাপেক্ষী হন, তবে ছেলে বা মেয়ের জন্য তাদের ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়া বা তাদের অবহেলা করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়।”
(আল-মুহাল্লা; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১৫৯)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:ويلزم الإنسان طاعة والديه في غير المعصية وإن كانا فاسقين ، وهو ظاهر إطلاق أحمد ، وهذا فيما فيه منفعة لهما ولا ضرر ، فإن شق عليه ولم يضره : وجب ، وإلا فلا “পাপ নয় এমন কাজে পিতা-মাতার আনুগত্য করা মানুষের ওপর আবশ্যক (ওয়াজিব), এমনকি তারা পাপাচারী (ফাসিক) হলেও। ইমাম আহমাদ (রাহি.)-এর বক্তব্য থেকে বাহ্যিকভাবে এটাই প্রতীয়মান হয়। তবে এই আনুগত্য সেই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট যাতে পিতা-মাতার উপকার রয়েছে এবং সন্তানের কোনো (শরয়ি বা বস্তুগত) ক্ষতি নেই। এমতাবস্থায় বিষয়টি যদি সন্তানের জন্য কষ্টকরও হয় কিন্তু ক্ষতিকর না হয়, তবে তাদের আনুগত্য করা ওয়াজিব আবশ্যক);আর যদি তা (সন্তানের জন্য) ক্ষতিকর হয়, তবে তা আবশ্যক নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ ফাতাওয়া আল-কুবরা; খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
আল-ফাক্বিহানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”وتلزم طاعتهما في المباحات، وتستحب في ترك الطاعات الندب، ومنه أمر جهاد الكفاية، والإجابة للأم في الصلاة ، مع إمكان الإعادة”
​”মুবাহ বা সাধারণ বৈধ কাজগুলোতে পিতা-মাতার আনুগত্য করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। আর মুস্তাহাব বা নফল ইবাদত বর্জনের ক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্য করা উত্তম/মুস্তাহাব। এর অন্তর্ভুক্ত হলো ফরযে কিফায়া
পর্যায়ের জিহাদে (অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের নির্দেশ মানা) এবং নফল সালাত আদায়রত অবস্থায় মা ডাকলে সালাত ছেড়ে দিয়ে সাড়া দেওয়া, যদি পরবর্তীতে সেই সালাত পুনরায় আদায় করার সুযোগ থাকে।”(রিয়াদুল আফহাম ফী শারহি উমদাতিল আহকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৫২৩)
.
অন্যদিকে, স্ত্রীর ওপর তার স্বামীর নিকট কিছু নির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত শারঈ অধিকার রয়েছে—যেমন স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা), উপযুক্ত বাসস্থান, নিরাপত্তা এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণের অধিকার। এসব অধিকার আদায় করা স্বামীর ওপর শরীয়ত কর্তৃক আরোপিত একটি ফরজ দায়িত্ব। সুতরাং ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে মা ও স্ত্রীর মর্যাদা উভয়ই অনস্বীকার্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মা সামগ্রিকভাবে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হলেও,একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্ত্রীর অধিকার মায়ের অধিকারের ওপর অগ্রাধিকার পায়—আর তা হলো ভরণপোষণ (নাফাকা) অধিকার।অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে একই সঙ্গে মা ও স্ত্রীর সকল প্রয়োজন পূরণে অক্ষম হন,তাহলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তার ওপর সর্বপ্রথম স্ত্রীর ভরণপোষণ নিশ্চিত করা আবশ্যক। কেননা স্ত্রীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বামীর ওপর আরোপিত একটি বাধ্যতামূলক ফরজ দায়িত্ব, যা অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই।তবে এর অর্থ এই নয় যে, মায়ের অধিকার ও মর্যাদা উপেক্ষিত বা খাটো করা হবে। বরং একজন প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় হলো—স্ত্রীর ফরজ অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি মায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও সদাচরণ বজায় রাখা। মা ও স্ত্রীর মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে ইনসাফ (ন্যায়পরায়ণতা) ও হিকমাহ (প্রজ্ঞা) প্রয়োগ করাই একজন দায়িত্বশীল ও পরিপূর্ণ মুসলিম পুরুষের প্রকৃত পরিচয়। আর এগুলো করা হবে,ব্যক্তির সামর্থ্য ও তার আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী:لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا“বিত্তবান ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার জীবিকা সীমিত (সংকুচিত) করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি তিনি কাউকে ব্যয় করতে বলেন না। কষ্টের পর আল্লাহ স্বাচ্ছন্দ্য দান করেন।”[সূরা তালাক: ৭] তাই স্থানভেদে ও ব্যক্তিভেদে এটি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
.
ভরণপোষণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সম্পর্কে।শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, “إذا اجتمع على الشخص الواحد محتاجون ممن تلزمه نفقتهم ، نظرَ: إن وفَّى ماله أو كسبه بنفقتهم فعليه نفقة الجميع قريبهم وبعيدهم .وإن لم يفضل عن كفاية نفسه إلا نفقة واحد ، قدَّم نفقة الزوجة على نفقة الأقارب …لأن نفقتها آكد ، فإنها لا تسقط بمضي الزمان ، ولا بالإعسار “যখন কোনো এক ব্যক্তির ওপর এমন একাধিক অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি একত্রিত হয়, যাদের ভরণপোষণ দেওয়া তার জন্য শরঈভাবে ফরজ, তখন বিষয়টি এভাবে বিবেচনা করা হবে:যদি তার সম্পদ বা উপার্জন তাদের সবার ভরণপোষণ আদায়ের জন্য যথেষ্ট হয়,তাহলে নিকট আত্মীয় ও দূর আত্মীয় যে-ই হোক—সবার ভরণপোষণ দেওয়া তার ওপর আবশ্যক হবে। আর যদি নিজের প্রয়োজন পূরণের পর তার নিকট অতিরিক্ত যা থাকে তা কেবল একজনের ভরণপোষণের জন্যই যথেষ্ট হয়, তাহলে সে আত্মীয়দের ভরণপোষণের ওপর স্ত্রীর ভরণপোষণকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ স্ত্রীর ভরণপোষণ অধিকতর দৃঢ় ও নিশ্চিত অধিকার; কেননা সময় অতিবাহিত হলেও তা রহিত হয় না এবং স্বামীর আর্থিক অক্ষমতার কারণেও তা বাতিল হয়ে যায় না।”(ইমাম নববী;রাওদাতুত তালিবীন; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৯৩)
.
আল-মারদাওয়ীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:الصَّحِيحُ مِنْ الْمَذْهَبِ : وُجُوبُ نَفَقَةِ أَبَوَيْهِ وَإِنْ عَلَوَا ، وَأَوْلَادِهِ وَإِنْ سَفَلُوا بِالْمَعْرُوفِ …إذَا فَضَلَ عَنْ نَفْسِهِ وَامْرَأَتِهِ”মাযহাবের সহিহ ও নির্ভরযোগ্য মত হলো—পিতা-মাতা (যত ঊর্ধ্বে হোক) এবং সন্তান-সন্ততি (যত অধস্তনেই হোক)—সবার ভরণপোষণ প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দেওয়া ফরজ,যখন নিজের ও স্ত্রীর প্রয়োজন পূরণের পর অতিরিক্ত সামর্থ্য অবশিষ্ট থাকে।”(আল-ইনসাফ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৯২)
.
ইমাম শাওকানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقد انعقد الإجماع على وجوب نفقة الزوجة ، ثم إذا فضل عن ذلك شيء فعلى ذوي قرابته “স্ত্রীর ভরণপোষণ ফরজ হওয়া বিষয়ে ইজমা (সর্বসম্মত ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।এরপর যদি এ থেকে অতিরিক্ত কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবে তা নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় করা হবে।”(নাইলুল আওতার; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
অতএব,ভরণপোষণের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে পিতা-মাতার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। তবে স্ত্রী ও সন্তানের মধ্যে কাকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের শাইখ বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: “فالصواب أنه يبدأ بنفسه ، ثم بالزوجة ، ثم بالولد ، ثم بالوالدين ، ثم بقية الأقار“সঠিক মত হলো—প্রথমে মানুষ নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে, তারপর স্ত্রীর, তারপর সন্তানের, তারপর পিতা-মাতার, এরপর অন্যান্য আত্মীয়দের।”(ইবনু উসাইমীন; ফাতহু যিল জালালি ওয়াল ইকরাম; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৯৪)
.
সুতরাং একজন মুসলিম ঈমানদার পুরুষের কর্তব্য হলো প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করা এবং যুলুমের শিকার ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা। অতএব, যদি কোনো ক্ষেত্রে মা তার পুত্রবধূর ওপর যুলুম করে,তখন ঐ ব্যক্তির ওপর কর্তব্য হবে উত্তম পন্থায় সেই যুলুম প্রতিহত করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা—কারণ ইসলামে কারো অধিকার হরণ বা যুলুমকে কোনো অবস্থাতেই বৈধতা দেওয়া হয়নি।পাশাপাশি এ কথা মনে রাখতে হবে—মায়ের অধিকার সর্বাধিক হওয়া মানেই এই নয় যে, অন্যদের অধিকার উপেক্ষা করা যাবে। বরং একজন মানুষের ওপর ওয়াজিব হলো—প্রত্যেক অধিকারীকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করা, অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং নিজের পরিবার ও সংসার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। যেমন—আল্লাহ তা‘আলা যখন মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তখন একইসঙ্গে তিনি স্ত্রীর প্রতিও সদ্ব্যবহার ও সুন্দরভাবে দাম্পত্য জীবন যাপনের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের;।(সূরা আল-বাকারা:২২৮) এবং তিনি বলেন—وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ“তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর”[সূরা নিসা, আয়াত: ১৯]
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে শাইখ আবদুর রহমান আস-সা‘দী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন—وهذا يشمل المعاشرة القولية ، والفعلية ، فعلى الزوج أن يعاشر زوجته ببذل النفقة ، والكسوة ، والمسكن ، اللائق بحاله ، ويصاحبها صحبة جميلة ، بكف الأذى ، وبذل الإحسان ، وحسن المعاملة ، والخلق ، وأن لا يمطلها بحقها ، وهي كذلك عليها ما عليه من العشرة ، وكل ذلك يتبع العرف ، في كل زمان ، ومكان ، وحال ، ما يليق به“এ নির্দেশের মধ্যে কথাবার্তা ও কর্ম—উভয় দিক থেকেই সদ্ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং স্বামীর ওপর আবশ্যক হলো—তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ, পোশাক ও বাসস্থান প্রদান করা; সুন্দর সাহচর্য বজায় রাখা; কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা; অনুগ্রহ ও সদাচরণ প্রদর্শন করা; সুন্দর চরিত্র বজায় রাখা; এবং তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে গড়িমসি না করা। স্ত্রীও স্বামীর প্রতি একই রকম দায়িত্বশীল থাকবে। এসব বিষয় সময়, স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রচলিত রীতিনীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।”
(তাইসীরুল লাতীফিল মান্নান ফী খুলাসাতি তাফসীরিল কুরআন; পৃষ্ঠা: ১৩২)
.
এছাড়াও হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা নারীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার ব্যাপারে ওসিয়ত গ্রহণ কর।”(সহিহ বুখারী হা/৩৩৩১; ও সহিহ মুসলিম হা/১৪৬৮) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।”(সুনানে তিরমিযি হা/৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ হা১৯৭৭),ইমাম আলবানী সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন) অতএব, যেমন মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার জান্নাতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ,তেমনি স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহারও জান্নাতে পৌঁছানোর মাধ্যম—কারণ উভয়টিই আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর প্রতিটি আদেশ পালনই তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাতের নৈকট্য লাভের কারণ হয়। সুতরাং একজন পুরুষের জন্য আবশ্যক হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করা।তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যখন মায়ের স্বার্থ ও স্ত্রীর স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন দায়িত্বশীল স্বামীর কর্তব্য হলো পরিস্থিতির প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিচার করে সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা। কেননা মায়ের অধিকার স্ত্রীর অধিকারের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা সত্য হলেও—এর অর্থ এই নয় যে, মায়ের প্রতিটি দাবি সর্বাবস্থায় স্ত্রীর দাবির ওপর অগ্রাধিকার পাবে।বরং কখনো কখনো মায়ের কিছু দাবি অতিরিক্ত বা বিলাসী পর্যায়ের হতে পারে—যেমন বাইরে ভ্রমণে যাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, কিংবা এমন কিছু চাহিদা যা পূরণ না করলেও তার কোনো বাস্তব কষ্ট বা ক্ষতি হয় না, অথবা যা স্থগিত রাখলেও সমস্যা নেই—যেমন নতুন পোশাক কেনা, যখন তার (মায়ের) পর্যাপ্ত পোশাক আগে থেকেই রয়েছে। অন্যদিকে, স্ত্রীর দাবিগুলো অনেক সময় হয়ে থাকে অত্যাবশ্যক ও জরুরি প্রয়োজন—যেমন চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, বা এমন বিষয় যা বিলম্বিত হলে তার (স্ত্রীর) শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বিলম্ব করা শরিয়তসম্মত নয়।
এই অবস্থায় স্বামীর জন্য স্ত্রীর জরুরি প্রয়োজনকে মায়ের বিলাসিতামূলক বা বিলম্বযোগ্য দাবির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া ওয়াজিব। এতে সে তার মায়ের অবাধ্য হয় না, বরং মায়ের অধিকার অবহেলা না করেই আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করে। এটি মূলত শরিয়তের আদেশ পালন, কোনো অবাধ্যতা নয়। দ্বন্দ্বের সময় অগ্রাধিকারের মূলনীতি মহান ফকীহ আল-কারাফি (রহিমাহুল্লাহ) অধিকার ও কর্তব্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উসূল তথা মূলনীতি উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-ফুরূক”-এ বলেন:ويقدم الفوري على المتراخي“তাৎক্ষণিক (ফাওরি) বিষয়কে বিলম্বযোগ্য (মুতারাখি) বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”(আল-ফুরূক খণ্ড;২;পৃষ্ঠা;৩৫৮–৩৫৯) অর্থাৎ যা তাৎক্ষণিকভাবে পালন করা জরুরি, তা বিলম্বযোগ্য কাজের ওপর প্রাধান্য পায়।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন—ফাওরি তথা তাৎক্ষণিক অধিকার হলো সেই বিষয়, যা শরিয়ত বিলম্ব করার অনুমতি দেয়নি; আর মুতারাখি তথা বিলম্বযোগ্য অধিকার হলো সেই বিষয়, যা বিলম্ব করা শরিয়তসম্মত।যেমন—কোনো অসুস্থ ব্যক্তি বা বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা একটি তাৎক্ষণিক কর্তব্য; কারণ এতে বিদ্যমান কষ্ট ও ক্ষতি দূর হয়। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:ويقدم ما يخشى فواته على ما لا يخشى فواته ، وإن كان أعلى مرتبة منه ، كما تقدم حكاية قول المؤذن على قراءة القرآن ، لأن قراءة القرآن لا تفوت ، وحكاية قول المؤذن تفوت بالفراغ من الأذان”যে বিষয়টি অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার (সময় ফুরিয়ে যাওয়ার) আশঙ্কা আছে, তাকে এমন বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে যা অতিক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই; যদিও দ্বিতীয় বিষয়টি প্রথমটির চেয়ে মর্যাদাগতভাবে বড় হয়।এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন—কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে মুয়াযযিনের আযানের উত্তর দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ কুরআন তিলাওয়াত (পরবর্তীতে যেকোনো সময় করা যায় বলে তা) হাতছাড়া হয় না; কিন্তু আযানের উত্তর দেওয়ার সুযোগ আজান শেষ হওয়ার সাথেই শেষ হয়ে যায়।”(আল-ফুরূক খণ্ড: ২;পৃষ্ঠা: ৩৫৮–৩৫৯)
.
স্বার্থের সংঘাতে ফিকহি ভারসাম্য রক্ষায় উলামায়ে কেরাম আরেকটি সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি উল্লেখ করেছেন—إذا تزاحمت المصالح قدم الأعلى منها“যখন একাধিক স্বার্থের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়, তখন উচ্চতর ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”এ নীতিটি উল্লেখ করা হয়েছে”।”(তাইসীরুল লতীফিল মান্নান: খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬৯) নিঃসন্দেহে—প্রয়োজনীয় বিষয় চাহিদার চেয়ে অগ্রাধিকার পায় চাহিদা বিলাসিতার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়।সুতরাং আলোচ্য বিষয়টি উল্লিখিত মূলনীতিগুলোর আলোকে প্রয়োগ করলে আমরা ছোট্ট একটি উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। ধরা যাক, একদিকে স্ত্রী অসুস্থ এবং তার জন্য জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন, আর অন্যদিকে মায়ের নতুন পোশাকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে,এমন পরিস্থিতিতে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে? এর উত্তর হলো—এক্ষেত্রে স্ত্রীর চিকিৎসা করাই মায়ের নতুন পোশাকের তুলনায় অগ্রাধিকারযোগ্য হবে। কারণ অসুস্থ বা দুর্দশাগ্রস্ত স্ত্রীর চিকিৎসা করা এমন একটি অপরিহার্য দায়িত্ব, যা বিলম্বিত হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসা পিছিয়ে গেলে রোগের অবনতি ঘটতে পারে এবং কষ্ট আরও তীব্রতর হতে পারে।পক্ষান্তরে, মায়ের জন্য নতুন পোশাক ক্রয় করা—যখন তার আগে থেকেই পরিধেয় বস্ত্র বিদ্যমান রয়েছে—অথবা তাকে ভ্রমণে নেওয়া, হাঁটতে বের হওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো স্থগিতযোগ্য এবং এতে কোনো অপরিহার্য অধিকার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই।
অতএব, এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্ত্রীর জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই শরিয়তসম্মত, ন্যায়সঙ্গত এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশনার যথার্থ অনুসরণ।
.
আমাদের শাইখ সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমার মা একা বসবাস করেন এবং তিনি একাকীত্বে ভোগেন। আমি তাকে নিয়ে চিন্তিত। তিনি আমার সাথে আমার বাড়িতে এসে থাকতে চান যাতে আমি তার সেবা করতে পারি এবং তিনি আমার সান্নিধ্য পান। কিন্তু আমার স্ত্রী আমার মায়ের সাথে একই বাড়িতে থাকতে সরাসরি অস্বীকার করছেন। এখন আমি কার কথা শুনবো? আমার স্ত্রীর নাকি আমার মায়ের?
জবাবে শাইখ বলেন:ذا كانت هذه الزوجة لا تتلاءم مع والدتك فأسكنها وحدها وأسكن أمك معك ، أو فالتمس زوجة غيرها تساعدك على بر والدتك . أما إنك تضيع والدتك وتذهب مع زوجتك وتطيع زوجتك ؛ هذا أمر لا يجوز ، هذا من العقوق .”যদি এই স্ত্রী আপনার মায়ের সাথে মানিয়ে নিতে না পারে, তবে তাকে (স্ত্রীকে) পৃথক আবাসে রাখুন এবং আপনার মাকে আপনার নিজের সাথেই রাখুন।অথবা এমন অন্য কোনো স্ত্রী খুঁজুন (বিয়ে করুন), যে আপনাকে আপনার মায়ের সেবা ও তাঁর প্রতি সদাচরণ করতে সাহায্য করবে।পক্ষান্তরে আপনি আপনার মাকে অবহেলা করবেন আর স্ত্রীর সাথে চলে যাবেন এবং স্ত্রীরই আনুগত্য করবেন—এমনটি করা মোটেও জায়েজ (বৈধ) নয়। এটি মাতা-পিতার অবাধ্যতা বা তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অন্তর্ভুক্ত।”(মাজমুআতু রাসায়িল দাওয়াহ ওয়া মানহাজিয়্যাহ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৮৯) শাইখ এখানে স্পষ্ট করেছেন যে, মা ও স্ত্রীর মধ্যে যদি বনিবনা না হয়, তবে সমাধান হলো সম্ভব হলে স্ত্রীকে আলাদা বাসায় রাখা কিন্তু মাকে কোনোভাবেই ত্যাগ না করা।পক্ষান্তরে স্ত্রীর কথা শুনে মাকে অবহেলা করা ইসলামে বড় গুনাহ বা ‘উকুক’ (অবাধ্যতা) হিসেবে গণ্য।
.
শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ)- কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;আমি আমার পরিবারিক বাসা ছেড়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য বাসায় থাকি— নানারকম সমস্যার কারণে। আমি আমার স্ত্রীকে ত্যাগ না করার ব্যাপারে তার সাথে অঙ্গীকার করেছি। কিছুদিন পর আমার পিতা আমাকে আমার স্ত্রী নিয়ে তাঁর সাথে একত্রে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমার স্ত্রী এতে অসম্মতি জানাচ্ছে। এখন আমি কি করব? আমি কি আমার পিতার আনুগত্য করে আমাদের মধ্যকার অঙ্গীকার ভঙ্গ করব? এবং আমি কি এ আয়াতের অধীনে পড়ে যাব: “এবং প্রতিশ্রুতি পালন করো। নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।”[সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪]
উত্তরে শাইখ বলেন:الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:”لا شك أن حق الوالد على الولد عظيم ، وما دام أن زوجتك لا ترغب في السكن في بيته ؛ فإنك لا تلزمها ، وبإمكانك أن تقنع والدك في ذلك ، وتجعلها في بيت مستقل ، مع اتصالك بوالدك وبره وإرضائه والإحسان إليه بما تستطيع .وأما الطلاق فيباح لك إذا احتجت إليه وتكفر عن يمينك ، ولا يخالف قوله تعالى : (وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا) الإسراء/34 ، لأن المراد به العهد الذي لا يحرم حلالاً
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:নিঃসন্দেহে সন্তানের উপর পিতার অধিকার মহান। তবে, যেহেতু আপনার স্ত্রী আপনার পিতার বাসায় থাকতে নারাজ; তাই আপনি তাকে বাধ্য করতে পারেন না। আপনি এ ব্যাপারে আপনার বাবাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুন এবং আপনার স্ত্রীকে আলাদা বাসায় রাখুন। এর সাথে আপনার পিতার সাথে যোগাযোগ রাখুন, তাঁর সাথে সদ্ব্যবহার করুন, তাঁকে সন্তুষ্ট রাখুন এবং সাধ্যানুযায়ী তাঁর সাথে কোমল আচরণ করুন।আর তালাক্বের বিষয়টি আপনার জন্য জায়েয যদি আপনার তালাক্ব দেয়ার প্রয়োজন হয়; সেক্ষেত্রে আপনি শপথ ভঙ্গের কাফ্‌ফারা পরিশোধ করবেন। এটি আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী: “এবং প্রতিশ্রুতি পালন করো। নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।”[সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৪]-এর বিরোধী হবে না। কেননা এখানে অঙ্গীকার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যার মাধ্যমে কোন হালালকে হারাম করা হয়।” (ফাযিলাতুশ শাইখ সালেহ আল-ফাওযান;ফাতাওয়াল মারআল মুসলিমা ;খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৬৬০)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate