Saturday, September 26, 2026

বিপদ-মুসিবত মোকাবিলায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি

 ভূমিকা: মানুষের জীবন কখনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে ওঠে, আবার কখনো হঠাৎ নেমে আসে দুঃখ, দুশ্চিন্তা, বিপদ ও মুসিবতের ঘনঘটা। কখনো এমন পরিস্থিতিও আসে, যখন চারপাশের সব দরজা বন্ধ মনে হয় এবং মানুষ নিজেকে একেবারে অসহায় মনে করতে থাকে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। সে জানে—এই পৃথিবী পরীক্ষা ও পরীক্ষণের স্থান; আর কোনো বিপদই আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও হিকমতের বাইরে নয়।তাই বিপদের সময় ভেঙে পড়া নয়; বরং নিজের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত করা, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করা, তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর রহমত ও সাহায্যের ব্যাপারে আশাবাদী থাকা জরুরি। বিপদ যত বড়ই হোক, আল্লাহ তার চেয়েও মহান; সংকট যত কঠিনই হোক, আল্লাহর কাছে তার সমাধান তত কঠিন নয়। নিচে বিপদ-মুসিবতের সময় একজন মুমিনের জন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি তুলে ধরা হলো।

.
▪ প্রথম নীতি: আপনি একা নন। বিপদ যত কঠিনই হোক, আল্লাহ আপনার অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং তিনি তাঁর বান্দার সঙ্গে আছেন।
.
▪ দ্বিতীয় নীতি: আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুই হিকমত ছাড়া নির্ধারণ করেন না। আপনার জীবনে যা কিছু ঘটছে, তার পেছনে আল্লাহর প্রজ্ঞা রয়েছে—যদিও সবসময় সেই হিকমত আমাদের বোধগম্য হয় না।
.
▪ তৃতীয় নীতি: উপকার সাধন এবং ক্ষতি প্রতিহত করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। অতএব, অন্তরকে সৃষ্টির প্রতি নির্ভরশীল না করে একমাত্র আল্লাহর সঙ্গেই সম্পৃক্ত করুন এবং তাঁর ওপরই ভরসা করুন।
.
▪ চতুর্থ নীতি: আপনার জন্য যা নির্ধারিত হয়েছে, তা কখনো আপনাকে এড়িয়ে যেতে পারে না; আর যা আপনার জন্য নির্ধারিত হয়নি, তা কখনো আপনার কাছে পৌঁছাতে পারে না।
.
▪ পঞ্চম নীতি: দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করুন—তাহলেই অন্তর প্রশান্ত হবে। মনে রাখুন, দুনিয়া স্থায়ী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের স্থান নয়; এটি পরীক্ষা ও ক্ষণস্থায়ী জীবনের আবাস।
.
▪ ষষ্ঠ নীতি: আপনার রব সম্পর্কে সর্বদা উত্তম ধারণা রাখুন। বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি দয়ালু এবং তাঁর ফয়সালার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
.
▪ সপ্তম নীতি: আপনার নিজের পছন্দ ও পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর আপনার জন্য করা নির্বাচনই উত্তম। আপনি যা চান, তার সবকিছু হয়তো আপনার জন্য কল্যাণকর নয়; কিন্তু আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তিনি তা পূর্ণ জ্ঞান ও হিকমতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করেন।
.
▪ অষ্টম নীতি: বিপদ যতই তীব্র হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তির আশা ততই দৃঢ় রাখুন। কঠিনতার সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে—অতএব, সংকটের মুহূর্তে হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করুন।
.
▪ নবম নীতি: মুক্তি কীভাবে আসবে, তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না। আল্লাহ যখন কোনো কিছুর ফয়সালা করেন, তখন তিনি এমন উপায়ে তার কারণ ও পথ তৈরি করে দেন, যা মানুষের কল্পনাতেও আসে না।
.
▪ দশম নীতি: যাঁর হাতে মুক্তির চাবিকাঠি, তাঁর কাছেই দোয়া করুন। সংকট দূর করা, বিপদ থেকে উদ্ধার করা এবং কল্যাণ দান করার প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তাই বিপদের সময় তাঁর কাছেই ফিরে আসুন, তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং তাঁর ওপরই পূর্ণ তাওয়াক্কুল করুন। (এই ১০ টি পয়েন্ট আরবি থেকে অনূদিত)
.
পরিশেষে হে আমাদের পাঠক! মনে রাখবেন, বিপদ আপনার জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; অনেক সময় সেটিই আল্লাহর দিকে ফিরে আসার নতুন সূচনা। যে কষ্ট আজ আপনাকে কাঁদাচ্ছে, হয়তো সেটিই আপনাকে আপনার রবের আরও নিকটবর্তী করবে। তাই দুঃসময়ে হতাশ হবেন না, নিজের দুর্বলতার দিকে নয় বরং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, রহমত ও হিকমতের দিকে তাকান।আপনি জানেন না আগামী মুহূর্তে কীভাবে আপনার সংকটের সমাধান হবে; কিন্তু আপনার রব জানেন। আপনি জানেন না কোন দরজা দিয়ে মুক্তি আসবে; কিন্তু আল্লাহ জানেন কোন দরজা আপনার জন্য খুলতে হবে। অতএব, সবর করুন, দোয়া করুন, সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চান এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখুন।যিনি বিপদ দিয়েছেন, তিনিই তা দূর করার ক্ষমতা রাখেন; যিনি পরীক্ষা নিয়েছেন, তিনিই তার উত্তম পরিণতি দান করতে পারেন। তাই বিপদের অন্ধকারে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।আল্লাহ আমাদের সকল বিপদ-মুসিবত থেকে হেফাজত করুন, পরীক্ষার সময়ে আমাদের সবর ও তাওয়াক্কুল দান করুন, আমাদের অন্তরকে তাঁর ওপর অবিচল রাখুন এবং প্রতিটি কষ্টের পর আমাদের জন্য কল্যাণ ও প্রশান্তি নির্ধারণ করুন। আমীন।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা জায়েজ কী

 প্রশ্ন: মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা বলতে কি বুঝায়? আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম (মসজিদের মাইক, ফেসবুকে, ইউটিউবে, ফোন মেসেজে) মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা জায়েজ কী?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর;আরবি (النعي) নাঈ শব্দের অর্থ হলো;মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ প্রদান ও তা প্রচার করা।এ সংবাদ প্রকাশের পদ্ধতি হতে পারে মৌখিকভাবে প্রচার করা, সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে জানানো।আবার এ শব্দ দ্বারা মৃত ব্যক্তির গুণাবলি ও মর্যাদা বর্ণনাকেও বোঝানো হয়।
.
ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর জামে গ্রন্থে বলেছেন:
والنعي عندهم أن ينادى في الناس أن فلاناً مات ليشهدو جنازته “তাদের নিকট নাঈ হলো মানুষের মাঝে ঘোষণা করা যে অমুক মারা গেছে, যাতে তারা তার জানাজায় অংশগ্রহণ করে।”(তিরমিযী তাঁর জামে পৃষ্ঠা: ২৩৯)
.
ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আন নিহায়াহ-এ বলেছেন:نعى الميت إذا أذاع موته ، وأخبر به ، وإذا ندبه ” .
“নাঈ করা মানে হলো মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া, তা জানানো এবং তার জন্য শোক প্রকাশ করা।”ইবনুল আসীর আন নিহায়াহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৮৫)
ক্বলিউবী তাঁর হাশিয়াহ গ্রন্থে বলেছেন:
وهو النداء بموت الشخص ، وذكر مآثره ومفاخره ” .
এটি হলো কারও মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করা এবং তার গুণাবলি ও কৃতিত্বসমূহ উল্লেখ করা।” (হাশিয়াহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৪৫)
.
দ্বিতীয়ত: মৃত্যু ঘোষণার প্রকারভেদ:
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করলে ইসলামে শোক সংবাদ তিন প্রকার: যথা-(ক).হারাম, (খ).মাকরুহ ও (গ) মুবাহ। এবং এ তিন ধরনের প্রতিটিরই আলাদা হুকুম রয়েছে।
ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: يُؤْخَذُ مِنْ مَجْمُوعِ الأَحَادِيثِ ثَلاثُ حَالاتٍ : الأُولَى إِعْلامُ الأَهْلِ وَالأَصْحَابِ وَأَهْلِ الصَّلاحِ فَهَذَا سُنَّةٌ , الثَّانِيَةُ : دَعْوَةُ الْحَفْلِ لِلْمُفَاخَرَةِ فَهَذِهِ تُكْرَهُ , الثَّالِثَةُ : الإِعْلامُ بِنَوْعٍ آخَرَ كَالنِّيَاحَةِ وَنَحْوِ ذَلِكَ فَهَذَا يُحَرَّمُ “”হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, মৃত্যুর সংবাদ জানানোর ক্ষেত্রে তিন ধরনের কার্যপদ্ধতি রয়েছে—(১).পরিবার, বন্ধু ও ধার্মিক ব্যক্তিদের মৃত্যুর সংবাদ জানানো: এটি সুন্নাত এবং প্রয়োজনীয়।(২).মৃত ব্যক্তির মর্যাদা বা গৌরব প্রদর্শনের জন্য জনসমক্ষে বা সমাবেশে আহ্বান দিয়ে মৃত্যু ঘোষণা করা: এটি মাকরূহ।(৩).অন্যান্য অযথা বা অশ্লীল উপায়ে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা, যেমন অতিরিক্ত বিলাপ, চিৎকার বা অপ্রয়োজনীয় কান্না: এটি হারাম।”(ফাতহুল বারী” খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৭) আমরা তিনটি প্রকার সম্পর্কেই আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
.
(১).হারাম শোক-সংবাদ:
.
হারাম শোক-সংবাদ বলতে এমনভাবে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করাকে বোঝায়, যা জাহেলি যুগের রীতিনীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যেমন—সাধারণ সমাবেশস্থল বা জনসমাগমে উচ্চস্বরে ঘোষণা করে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা এবং এর সঙ্গে তার বংশমর্যাদা, কৃতিত্ব ও গুণাবলি তুলে ধরা; অথবা মৃত্যুসংবাদ প্রচারের সময় বিলাপ, হাহাকার, আর্তনাদ ও মাতমের মতো জাহেলি আচরণ প্রকাশ করা।এমন প্রচারণা হারাম।(হাশিয়াতুল জামাল ‘আলা শারহিল মানহাজ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬৮৭)
.
দলিল হচ্ছে, বিলাল ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিত। হুযাইফা (রাঃ)-এর উপস্থিতিতে কেউ মারা গেলে তিনি বলতেন,لَا تُؤْذِنُوا بِهِ أَحَدًا إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَكُونَ نَعْيًا إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم بِأُذُنَيَّ هَاتَيْنِ يَنْهَى عَنْ النَّعْيِ “তার (মৃত্যু) সম্পর্কে তোমরা কাউকে খবর দিয়ো না। কেননা আমি তার জন্য বিলাপের আশঙ্কা করছি। আমি আমার এই দু’ কানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিলাপ করতে নিষেধ করতে শুনেছি।”(তিরমিজি হা/৮৯৬; ইবনু মাজাহ হা/১৪৭৬; ইমাম তিরমিজি, হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানি,ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটি হাসান বলেছেন; (দেখুন ইবনে হাজার; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৭; ইমাম আলবানী; আহকামুল জানায়িজ; পৃষ্ঠা: ৩০-৩১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] মৃতের আত্মীয়দের উপর যা হারাম তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন:
الإعلان عن موته على رؤوس المنائر ونحوها ؛ لأنه من النعي ، وقد ثبت عن حذيفة بن اليمان أنه : كان إذا مات له الميت قال : لا تؤذنوا به أحداً ، إني أخاف أن يكون نعياً ، إني سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهى عن النعي …والنعي لغة : هو الإخبار بموت الميت ، فهو على هذا يشمل كل إخبار ، ولكن قد جاءت أحاديث صحيحة تدل على جواز نوع من الإخبار ، وقيد العلماء بها مطلق النهي ، وقالوا : إن المراد بالنعي الإعلان الذي يشبه ما كان عليه أهل الجاهلية من الصياح على أبواب البيوت والأسواق … .وقال الحافظ : ” وفائدة هذه الترجمة الإشارة إلى أن النعي ليس ممنوعاً كله ، وإنما نهى عما كان أهل الجاهلية يصنعونه ، فكانوا يرسلون من يعلن بخبر موت الميت على أبواب الدور والأسواق ” .قلت (الألباني) : وإذا كان هذا مسلَّما : فالصياح بذلك على رؤوس المنائر يكون نعياً من باب أولى ، ولذلك جزمنا به ، وقد يقترن به أمور أخرى هي في ذاتها محرمات أخر ، مثل أخذ الأجرة على هذا الصياح ! ومدح الميت بما يعلم أنه ليس كذلك ، كقولهم : ” الصلاة على فخر الأماجد المكرمين ، وبقية السلف الكرام الصالحين ! ” .
“তার মৃত্যুর ঘোষণা মিনারের মাথায় বা অনুরূপ জায়গায় দেওয়া; কেননা এটা নাঈর অন্তর্ভুক্ত। আর হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান থেকে প্রমাণিত যে, তার কোনো আত্মীয় মারা গেলে তিনি বলতেন: “এ বিষয়ে কাউকে সংবাদ দিও না, আমি আশঙ্কা করি এটা নাঈ হয়ে যাবে। আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নাঈ থেকে নিষেধ করতে শুনেছি আর নাঈ ভাষাগতভাবে মৃতের মৃত্যুসংবাদ দেওয়া। এই অর্থে এটি প্রতিটি সংবাদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। তবে সহীহ হাদীস এসেছে যা মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার একটি ধরনকে বৈধ বলে প্রমাণ করে, আর আলিমরা সেই হাদীস দিয়ে সাধারণ নিষেধকে সীমাবদ্ধ করেছেন। তারা বলেছেন: এখানে নাঈ বলতে উদ্দেশ্য হলো সে ঘোষণা যা জাহেলিয়াত যুগে প্রচলিত ছিল— যেমন ঘরের দরজায় এবং বাজারে চিৎকার করে মৃতের মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা। হাফিয (ইবনে হাজার) বলেছেন: এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো ইঙ্গিত দেওয়া যে, নাঈ পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়; বরং যে নাঈ জাহেলিয়াত যুগে হতো কেবল সেটিই নিষিদ্ধ। তারা তখন লোক পাঠাতো মৃতের মৃত্যুসংবাদ চিৎকার করে ঘরের দরজায় এবং বাজারে জানাতে। আমি (আলবানী) বলি: যদি এটা স্বীকৃত হয়, তাহলে মিনারের মাথায় চিৎকার করে মৃত্যুসংবাদ দেওয়া তো অবশ্যই নাঈর অন্তর্ভুক্ত হবে। এজন্যই আমরা একে নিষিদ্ধ বলেছি। বরং এর সাথে এমন কিছু বিষয় যুক্ত হতে পারে, যা নিজেই আলাদাভাবে হারাম যেমন এই চিৎকারের জন্য মজুরি গ্রহণ করা! কিংবা মৃতকে এমনভাবে প্রশংসা করা যা তার মধ্যে নেই, যেমন তারা বলে: মর্যাদাবান মহৎ ব্যক্তিদের গৌরব, নেককার পূর্বসূরিদের অবশিষ্ট অংশের জানাজায় নামাজ পড়তে আসুন!”(আহকামুল জানায়িজ; পৃষ্ঠা: ৪৪–৪৬)।
.
এমনকি মৃত ব্যক্তির জন্য যদি উচ্চস্বরে কান্নার সাথে গালে চপোটাঘাত করা, জামাকাপড় ছেড়া ও আল্লাহ্‌র তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্টি যুক্ত হয়; তাহলে সেটিও নাজায়েয। যেহেতু আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:( لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ )“যে ব্যক্তি গালে চপোটাঘাত করে, জামাকাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যামানার আর্তনাদ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”(সহিহ বুখারী হা/১২৯৪) তিনি আরও বলেন: “(বিপদের সময়) ডাক চিৎকার করে ক্রন্দনকারী, মাথা মুণ্ডনকারী ও পোশাক আশাক ছিন্নভিন্নকারীর সাথে আমার সম্পর্ক নেই”। তিনি আরও বলেন: “যদি বিলাপকারিনী মৃত্যুর আগে তওবা না করে তাহলে কেয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় উঠানো হবে তার গায়ে থাকবে আলকাতরার পোশাক, শরীরের চামড়া যেন গুটি বসন্তের বর্ম।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,” أما الندب والنياحة ولطم الخد وشق الجيب وخمش الوجه ونشر الشعر والدعاء بالويل والثبور , فكلها محرمة باتفاق الأصحاب , وصرح الجمهور بالتحريم…, وقد نقل جماعة الإجماع في ذلك“মর্সিয়া-ক্রন্দন, বিলাপ করা, গালে চড় মারা, জামাকাপড় ছিড়ে ফেলা, চেহারাতে খামচি মারা, চুল ছেড়া ও হায়হুতাশ করে আর্তনাদ করা; এই সবকিছু মাযহাবের আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। জমহুর আলেম স্পষ্টভাবে হারাম বলেছেন…। একদল আলেম হারাম হওয়ার মর্মে ইজমা উদ্ধৃত করেছেন।”(নববী; শারহুল মুহায্‌যাব; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৮১)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الواجب على المسلمين في هذه الأمور الصبر والاحتساب , وعدم النياحة , وعدم شق الثوب , ولطم الخد , ونحو ذلك لقول الرسول صلى الله عليه وسلم: ( ليس منا من لطم الخدود وشق الجيوب ودعا بدعوى الجاهلية )، ولقوله عليه الصلاة والسلام في الحديث الصحيح: ( أربع في أمتي من أمر الجاهلية لا يتركونهن : الفخر بالأحساب ، والطعن في الأنساب ، والاستسقاء بالنجوم ، والنياحة ) وقال : ( النائحة إذا لم تتب قبل موتها تقام يوم القيامة وعليها سربال من قطران ودرع من جرب ) رواه مسلم في الصحيح. والنياحة هي رفع الصوت بالبكاء على الميت. وقال صلى الله عليه وسلم: ( أنا بريء من الصالقة والحالقة والشاقة ) والحالقة: هي التي تحلق شعرها عند المصيبة, أو تنتفه. والشاقة: هي التي تشق ثوبها عند المصيبة. والصالقة: هي التي ترفع صوتها عند المصيبة. وكل هذا من الجزع ، فلا يجوز للمرأة ولا للرجل فعل شيء من ذلك…“মুসলমানদের উপর আবশ্যকীয় এসব ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা ও সওয়াব প্রাপ্তির নিয়ত করা; বিলাপ না করা, জামাকাপড় না ছেড়া, গালে চপোটাঘাত না করা ইত্যাদি। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি গালে চপোটাঘাত করে, জামাকাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যামানার আর্তনাদ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” যেহেতু তিনি সহিহ হাদিসে আরও বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলী যামানার চারটি বিষয় রয়েছে; যেগুলো তারা ত্যাগ করবে না: আত্মগুণ নিয়ে অহংকার করা, বংশের উপর কালিমালেপন করা, নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা এবং মৃতের জন্য বিলাপ করা।যেহেতু তিনি আরও বলেছেন: “যদি বিলাপকারিনী নারী মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে তাহলে তাকে এমন অবস্থায় তোলা হবে যে, তার গায়ে থাকবে আলকাতরার জামা এবং অভ্যন্তরীণ জামা হবে (তথা চামড়া হবে) খোসপাঁচড়ার।”[সহিহ মুসলিম] নিয়াহা (বিলাপ) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: উচ্চস্বরে মৃতের জন্য ক্রন্দন করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন: “আমি প্রত্যেক উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারিনী, মাথা-মুণ্ডণকারিনী ও জামা-ছিন্নকারিনী থেকে মুক্ত”। “মাথা-মুণ্ডণকারিনী” দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- যে নারী মুসিবতের সময় মাথার চুল ফেলে দেয় কিংবা টেনে তুলে ফেলে। “জামা-ছিন্নকারিনী” দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- যে নারী বিপদের সময় গায়ের জামা ছিড়ে ফেলে। আর “উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারিনী” দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- যে নারী মুসিবতের সময় কণ্ঠস্বরকে উঁচু করে। এর প্রত্যেকটি অধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ। তাই কোন নারী বা পুরুষের জন্য এর কোনটি করা জায়েয নয়…”।(বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ,খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৪১৪)
.
(২).মাকরূহ শোক সংবাদ:
.
মৃত্যুসংবাদ প্রদানের ক্ষেত্রে উচ্চস্বরে ঘোষণা করা বা জনসমক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচার করা—যদিও এতে মৃত ব্যক্তির বংশমর্যাদা, গুণাবলি বা কৃতিত্বের কোনো প্রশংসা না থাকে—অধিকাংশ ফকীহের নিকট মাকরূহ। হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—চার মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এ মত পোষণ করেছেন। এর অন্যতম দলিল হুযাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস। কারণ,এভাবে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বা জনসমক্ষে ঘোষণা করে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা জাহেলিয়াতের যুগের প্রচলিত রীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সে যুগে কারও মৃত্যু হলে লোকজনকে সংবাদ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে লোক পাঠানো হতো; তারা বাজারে, মানুষের সমাবেশস্থলে এবং বাড়ির দরজায় গিয়ে উচ্চস্বরে মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করত। বিস্তারিত দেখুন: আল-ইনায়াহ শারহুল হিদায়াহ, ৩/২৬৭; আল-খারশী আলা মুখতাসার খলীল, ২/১৩৯; আল-মুহাযযাব, ১/১৩২; আশ-শারহুল কাবীর, ৬/২৮৭; ইসলাম সওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফাতওয়া নং ২৩১০২৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,ويكره النعي , وهو أن يبعث مناديا ينادي في الناس إن فلانا قد مات . ليشهدوا جنازته . . . وقال كثير من أهل العلم : لا بأس أن يعلم بالرجل إخوانه ومعارفه وذوو الفضل , من غير نداء . قال إبراهيم النخعي : لا بأس إذا مات الرجل أن يؤذن صديقه وأصحابه , وإنما كانوا يكرهون أن يطاف في المجالس : أنعي فلانا . كفعل الجاهلية “মৃত্যুসংবাদ (নাঈ) মাকরূহ। আর তা হলো কোনো ঘোষণা দাতা পাঠানো, যে মানুষদের মাঝে বলে বেড়াবে: অমুক ব্যক্তি মারা গেছে, তার জানাজায় উপস্থিত হও। … তবে অনেক আলেম বলেছেন: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ভাই-বোন, পরিচিতজন এবং সৎগুণাবলির অধিকারীদের জানানোতে কোনো সমস্যা নেই, যদি ডাক না দেওয়া হয়। ইবরাহীম নাখাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার বন্ধুকে ও সঙ্গীদের জানানোতে কোনো অসুবিধা নেই। তাঁরা কেবল অপছন্দ করতেন যে মজলিসে ঘুরে ঘুরে বলা হতো: ‘অমুক মারা গেছে’, যেমনটা জাহিলিয়াতের কাজ ছিল।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪০৬)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
.
(৩).মুবাহ বা বৈধ মৃত্যুসংবাদ:
.
প্রথমত: মৃত্যুর সংবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্য হয় শুধু মানুষকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবর জানানো এবং মৃত ব্যক্তির প্রশংসা, গুণগান, বংশ-মর্যাদা, বিলাপ কিংবা অতিরঞ্জিত কোনো মন্তব্য না করা—তাহলে এ ধরনের মৃত্যুসংবাদ দেওয়া মুবাহ বা বৈধ। বিশেষত মৃতের জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য মানুষকে অবহিত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী শুধু মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা শরিয়তসম্মত। এ বিষয়ে অধিকাংশ ফকীহ—হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ—ডাকাডাকি ও জাহেলি পদ্ধতির প্রচারণা ছাড়া কেবল মৃত্যুসংবাদ জানানোকে জায়েয বলেছেন; বরং একদল আলেম জানাযার নামাজে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে এ সংবাদ দেওয়াকে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) বলেছেন। (ফাতহুল কাদীর, ২/১২৭; হাশিয়াতুদ দাসূকী, ১/২৪; নিহায়াতুল মুহতাজ, ৩/২০; আল-ইকনা, ১/৩৩১; তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/৬১; আস-সাইলুল জারার, ১/৩৩৯; আল-বিনায়াহ শারহুল হিদায়াহ, ৩/২৬৭; আল-খারশী ‘আলা মুখতাসার খলীল, ২/১৩৯; ইমাম নববী, আল-আযকার, পৃ. ২২৬)।
.
এরূপ প্রয়োজনীয় ও শরিয়তসম্মত মৃত্যুসংবাদ প্রচারের দৃষ্টান্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহয় সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। যেমন—বাদশাহ নাজাশী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ইন্তিকালের সংবাদ রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে অবহিত করেছিলেন এবং তাঁদের নিয়ে তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন। অনুরূপভাবে মুতার যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের শাহাদাতের সংবাদও তিনি সাহাবাদের জানিয়েছিলেন। সুতরাং মানুষকে কেবল কারও ইন্তিকালের সংবাদ জানানো কিংবা জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য অবহিত করার উদ্দেশ্যে, কোনো ধরনের বিলাপ, জাহেলি রীতির প্রচারণা, অতিরঞ্জিত প্রশংসা বা গুণগান ছাড়াই মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা বৈধ। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, “যেদিন নাজাশী ইন্তিকাল করেন, সেদিন নবী ﷺ তাঁর ইন্তিকালের সংবাদ সাহাবাদের জানালেন। অতঃপর তিনি মুসাল্লায় বের হয়ে তাঁদের কাতারবদ্ধ করে চার তাকবীরের মাধ্যমে তাঁর জানাযার নামাজ আদায় করলেন।” (সহীহ বুখারী, হা/১১৬৮; সহীহ মুসলিম, হা/১৫৮০)।
.
উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,فِيهِ : اِسْتِحْبَاب الإِعْلام بِالْمَيِّتِ لا عَلَى صُورَة نَعْي الْجَاهِلِيَّة , بَلْ مُجَرَّد إِعْلَام للصَّلَاة عَلَيْهِ وَتَشْيِيعه وَقَضَاء حَقّه فِي ذَلِكَ , وَاَلَّذِي جَاءَ مِنْ النَّهْي عَنْ النَّعْي لَيْسَ الْمُرَاد بِهِ هَذَا , وَإِنَّمَا الْمُرَاد نَعْي الْجَاهِلِيَّة الْمُشْتَمِل عَلَى ذِكْر الْمَفَاخِر وَغَيْرهَا “এতে প্রমাণ রয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির খবর জানানো মুস্তাহাব; তবে তা যেন জাহেলিয়াতের যুগের ন্যায় ‘নাঈ (মৃত ঘোষণার ধুমধামপূর্ণ প্রচার) আকারে না হয়; বরং এটি কেবল মানুষকে খবর দেওয়া তার জানাজায় অংশগ্রহণ, তাকে বহন করা এবং তার হক আদায় করার উদ্দেশ্যে। আর যে ‘নাঈ সম্পর্কে নিষেধ এসেছে, এর দ্বারা এই ধরনের সরল তথ্য প্রদান বোঝানো হয়নি; বরং উদ্দেশ্য হলো জাহেলিয়াতের নাঈ যা গর্ব-অহংকারের বর্ণনা ও সেরকম বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।”(ইমাম নববী শারহু সহীহ মুসলিম,হাদীস নং ৯৪৩-এর ব্যাখ্যা অংশ)
.
অপর বর্ননায় এসেছে, একজন কাল বর্ণের পুরুষ অথবা বলেছেন কাল বর্ণের মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত।সে মারা গেল।নবী (ﷺ) তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সাহাবীগণ বললেন,সে মারা গেছে।তিনি বললেনঃতোমরা আমাকে খবর দিলে না কেন? আমাকে তার কবরটা দেখিয়ে দাও। অতঃপর তিনি তার কবরের নিকট গেলেন এবং তার জানাযার সালাত আদায় করলেন।”(সহিহ বুখারী,হা/ ৪৫৮) “এই দুটি হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ জানানো বৈধ; বরং তা জানানো উত্তম (মুস্তাহাব), যদি উদ্দেশ্য হয় তার জানাজায় অংশগ্রহণ করা এবং তার জন্য দো‘আ করা। কেননা, এটি আসলে মৃতের প্রতি একটি হক আদায়ের মাধ্যম, যেমন তার জানাজায় শরিক হওয়া এবং দাফন-কার্যক্রমে অংশ নেওয়া।”
.
জানাযার নামাজ ব্যতীত অন্য কারণে মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করা জায়েয হওয়ার প্রমাণ সহীহ বুখারীতে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,যেখানে তিনি বলেন; মুসলিমদের নিকট খবর এসে পৌঁছার পূর্বেই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যায়দ, জা‘ফার ও ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর (শাহাদাতের) কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যায়দ (রাঃ) পতাকা হাতে এগিয়ে গেলে তাঁকে শহীদ করা হয়। অতঃপর জা‘ফার (রাঃ) পতাকা হতে এগিয়ে গেলে তাকেও শহীদ করা হয়। অতঃপর ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) পতাকা হাতে নিলে তাকেও শহীদ করা হল। এ সময়ে তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। (তিনি বললেন) শেষে আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্য হতে আল্লাহর এক তলোয়ার (খালিদ বিন ওয়ালীদ) পতাকা ধারণ করল। ফলে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করলেন।”(সহীহ বুখারী হা/৪২৬২) এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ তিনজন সাহাবীর মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছেন। অথচ সেই নাঈ জানাজার উদ্দেশ্যে ছিল না; বরং মুসলমানদের তাদের ভাইদের খবর পৌঁছে দেওয়া এবং ঐ যুদ্ধে তাদের সাথে যা ঘটেছিল তা জানানোই এর উদ্দেশ্য ছিল।অতএব, মৃতের সংবাদ জানানো বৈধ যতক্ষণ তা কল্যাণকর উদ্দেশ্যে হয়, যেমন তার জন্য দোয়া করা, তার ব্যাপারে ইসতিগফার করা এবং এর অনুরূপ বিষয়।(আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন:
নিহায়াতুল মুহতাজ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২০)।
.
ইবনু আব্দুল বার তাঁর আল-ইস্তিজকার-এ বলেছেন:
وكان أبو هريرة رضي الله عنه يمر بالمجالس ، فيقول : إن أخاكم قد مات فاشهدوا جنازته “আবু হুরায়রা (রাঃ) যখন মজলিসগুলোর পাশ দিয়ে যেতেন, তিনি বলতেনঃ ‘তোমাদের ভাই ইন্তিকাল করেছে, সুতরাং তোমরা তার জানাজায় উপস্থিত হও।”(আল-ইস্তিজকার;খণ্ড;৩;পৃষ্ঠা;২৬)
.
হানাফি মাযহাবের কিতাব ‘বাদায়েউস সানায়ি’ গ্রন্থে গ্রন্থকার ‘কাসানি’ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” وَلَا بَأْسَ بِإِعْلَامِ النَّاسِ بِمَوْتِهِ مِنْ أَقْرِبَائِهِ وَأَصْدِقَائِهِ وَجِيرَانِهِ لِيُؤَدُّوا حَقَّهُ بِالصَّلَاةِ عَلَيْهِ ، وَالدُّعَاءِ وَالتَّشْيِيعِ ، .. وَلِأَنَّ فِي الْإِعْلَامِ تَحْرِيضًا عَلَى الطَّاعَةِ ، وَحَثًّا عَلَى الِاسْتِعْدَادِ لَهَا ، فَيَكُونُ مِنْ بَابِ الْإِعَانَةِ عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى ، وَالتَّسَبُّبِ إلَى الْخَيْرِ ، وَالدَّلَالَةِ عَلَيْهِ”মৃতব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদেরকে জ্ঞাপন করতে কোন আপত্তি নেই; যাতে করে তারা জানাযার নামায পড়া, দোয়া করা ও দাফনে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে মৃতব্যক্তির হক আদায় করতে পারে। আর যেহেতু সংবাদ দেয়ার মধ্যে নেক কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রস্তুতি নেয়ার প্রতি উৎসাহিত করণ রয়েছে। তাই এটি নেকী ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করার মধ্যে পড়বে এবং ভাল কাজের মাধ্যম হওয়া ও সন্ধান দেয়ার পর্যায়ভুক্ত হবে।”(বাদায়িউস সানায়ি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২০৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,يجوز دعاء أقارب الميت وأصحابه وجيرانه إذا توفي من أجل أن يصلوا عليه ، ويدعوا له ، ويتبعوا جنازته ، ويساعدوا على دفنه ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أخبر أصحابه لما توفي النجاشي رحمه الله بموته ليصلوا عليه”কেউ মারা গেলে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদেরকে আহ্বান করা জায়েয; যাতে করে তারা জানাযার নামায পড়তে পারে, তার জন্য দোয়া করতে পারে, তার লাশের সাথে যেতে পারে এবং দাফনকর্মে সহযোগিতা করতে পারে। কেননা নাজাশি যখন মারা গিয়েছিল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথীবর্গকে তার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়েছেন যাতে করে তারা তার জানাযার নামায পড়তে পারে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪০২)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] তাঁর ফাতহুল বারী-তে বলেছেন:”النَّعْي لَيْسَ مَمْنُوعًا كُلّه وَإِنَّمَا نُهِيَ عَمَّا كَانَ أَهْل الْجَاهِلِيَّة يَصْنَعُونَهُ فَكَانُوا يُرْسِلُونَ مَنْ يُعْلِن بِخَبَرِ مَوْت الْمَيِّت عَلَى أَبْوَاب الدُّور وَالأَسْوَاق .قَالَ سَعِيد بْن مَنْصُور : أَخْبَرَنَا اِبْن عُلَيَّة عَنْ اِبْن عَوْن قَالَ قُلْت لإِبْرَاهِيم : أَكَانُوا يَكْرَهُونَ النَّعْي ؟ قَالَ : نَعَمْ . قَالَ اِبْن عَوْن : كَانُوا إِذَا تُوُفِّيَ الرَّجُل رَكِبَ رَجُل دَابَّة ثُمَّ صَاحَ فِي النَّاس : أَنْعِي فُلانًا . وقَالَ اِبْن سِيرِينَ : لا أَعْلَم بَأْسًا أَنْ يُؤْذِن الرَّجُل صَدِيقه وَحَمِيمه .وَحَاصِله أَنَّ مَحْض الإِعْلام بِذَلِكَ لا يُكْرَه , فَإِنْ زَادَ عَلَى ذَلِكَ فَلا “না‘ঈ (মৃত্যুসংবাদ প্রচার) সবদিক থেকে নিষিদ্ধ নয়। বরং যে রূপে জাহেলিয়াতের লোকেরা করত সেটিই নিষিদ্ধ হয়েছে। তারা লোক পাঠাত মৃতের সংবাদ ঘোষণা করার জন্য, বাড়ি-বাড়ি ও বাজারে।সাঈদ ইবন মানসুর বলেছেনঃ আমাদেরকে ইবন উলাইয়া ইবন আউনের সূত্রে জানিয়েছেন, তিনি বলেনঃ আমি ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করলামঃ তারা কি না‘ই (মৃত্যুসংবাদ প্রচার) অপছন্দ করত? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। ইবন আউন বলেনঃ যখন কেউ মারা যেত, তখন একজন লোক পশুর পিঠে চড়ে লোকদের মাঝে উচ্চস্বরে ঘোষণা দিতঃ “অমুকের মৃত্যু সংবাদ জানাচ্ছি।ইবনে সীরীন বলেছেনঃ আমি কোনো অসুবিধা দেখি না যে একজন ব্যক্তি তার বন্ধু বা আত্মীয়কে মৃত্যুসংবাদ জানাবে। সারমর্ম এই যে শুধু মৃত্যুসংবাদ দেওয়া অপছন্দনীয় নয়, তবে যদি এর সাথে বাড়তি কিছু যোগ হয় তবে তা অপছন্দনীয়।”(ফাতহুল বারী ফি শরহে সহীহুল- বুখারী খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৬)
.
দ্বিতীয়ত: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যেমন- ফেইসবুক, টুইটার ও ওয়াটসআপ ইত্যাদিতে কিংবা ইমেইলে ও মোবাইল মেসেজে কারো মৃত্যু সংবাদ প্রচার করতে কোন আপত্তি নেই; যদি এর উদ্দেশ্য হয় যাতে করে মানুষ জানাযার নামাযে উপস্থিত হতে পারে, মৃতব্যক্তির জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করতে পারে কিংবা মৃতের পরিবার-পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানাতে পারে। কেননা এ অবহিতকরণ এ সমস্ত নেক কাজের মাধ্যম।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:والصحيح الذي تقتضيه الأحاديث التي ذكرناها وغيرها أن الإعلام بموته لمن لم يعلم ليس بمكروه , بل إن قصد به الإخبار لكثرة المصلين فهو مستحب وإنما يكره ذكر المآثر والمفاخر والتطواف بين الناس بذكره بهذه الأشياء , وهذا نعي الجاهلية المنهي عنه , فقد صحت الأحاديث بالإعلام فلا يجوز إلغاؤها وبهذا الجواب أجاب بعض أئمة الفقه والحديث المحققين”আমাদের উদ্ধৃত হাদীসসমূহ এবং অন্যান্য হাদীসের আলোকে সঠিক মত হলো— যে ব্যক্তি এখনো কারো মৃত্যুর খবর জানে না, তাকে তা জানানো মোটেও মাকরুহ নয়। বরং যদি উদ্দেশ্য হয় অধিক সংখ্যক মানুষকে জানাজায় অংশগ্রহণে অবগত করা, তাহলে তা মুস্তাহাব। মাকরুহ হলো—মৃত ব্যক্তির গুণাবলী ও কৃতিত্ব প্রচার করা, মানুষের মাঝে ঘুরে বেড়িয়ে সেগুলো বর্ণনা করা। এটাই হলো জাহেলিয়াত আমলের নিষিদ্ধ ‘নাঈ’ (মৃত্যু-ঘোষণা)। অথচ সহীহ হাদীসে মৃত্যুসংবাদ প্রদানের কথা প্রমাণিত হয়েছে; সুতরাং এগুলো উপেক্ষা করা জায়েয নয়। এ বিষয়ে ফিকহ ও হাদীসের প্রাজ্ঞ ইমামগণের পক্ষ থেকেও একই উত্তর দেওয়া হয়েছে।”(নববী আল মাজমূ ;খণ্ড;৫;পৃষ্ঠা:১৭৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে পত্র-পত্রিকায় মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:لا نعلم فيه شيئًا، من باب الخبر”খবর হিসেবে জানানোর ক্ষেত্রে আমরা কোন আপত্তিকর কিছু জানি না।”(মাসায়িলুল ইমাম ইবনু বায; পৃষ্ঠা-১০৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:” وأما الإعلان عن موت الميت : فإن كان لمصلحة مثل أن يكون الميت واسع المعاملة مع الناس بين أخذ وإعطاء ، وأعلن موته لعل أحداً يكون له حق عليه فيقضى أو نحو ذلك : فلا بأس”পক্ষান্তরে, মৃতব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ জ্ঞাপন করা: যদি কোন কল্যাণের কারণে হয়; যেমন- মৃতব্যক্তির সাথে মানুষের আদান-প্রদানের ব্যাপক লেনদেন থাকে এবং তার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা হলে তার কাছে কারো পাওনা থাকলে তার পাওনা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে কিংবা এ ধরণের কিছু: তাহলে তাতে কোন আপত্তি নেই।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৪৬১)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.] বলেন:لا بأس بنشر الخبر عن وفاة بعض الأشخاص المشهورين بالخير والصلاح ، ليحصل الترحم عليهم والدعاء لهم من المسلمين ، ولكن لا يجوز مدحهم بما ليس فيهم ، فإنَّ ذلك كذب صريح “নেককাজ ও ভালকাজের মাধ্যমে মশহুর হয়েছেন এমন ব্যক্তিদের মৃত্যু সংবাদ প্রচার করতে কোন আপত্তি নেই; যাতে করে তাদের জন্য রহমত প্রার্থনা করা হয় এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে দোয়া করা হয়। তবে, এমন প্রশংসা করা জায়েয নয় যা তাদের মধ্যে নেই। কেননা সেটা হবে স্পষ্ট মিথ্যা।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০৬)
.
▪️তৃতীয়ত: মসজিদে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা:
.
মসজিদ থেকে মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের অর্থ যদি হয় মিনার বা লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সবাইকে জানানো, তবে এটি নিষিদ্ধ; এটি মসজিদের উদ্দেশ্য ও মর্যাদার পরিপন্থী।কারন রাসূল (ﷺ) বলেছেন;مَنْ سَمِعَ رَجُلاً يَنْشُدُ ضَالَّةً فِى الْمَسْجِدِ فَلْيَقُلْ لاَ رَدَّهَا اللهُ عَلَيْكَ فَإِنَّ الْمَسَاجِدَ لَمْ تُبْنَ لِهَذَا.”যে ব্যক্তি অন্য কাউকে মসজিদে হারানো জিনিষ খোঁজ করতে শুনবে, সে যেন বলে, আল্লাহ যেন তোমাকে ফেরত না দেন। কারণ মসজিদ সমূহ এ জন্য তৈরি করা হয়নি।”(সহীহ মুসলিম হা/১২৮৮;মিশকাত হা/৭০৬) তবে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মসজিদের ভেতরে উপস্থিত মুসল্লিদের স্বাভাবিকভাবে, উচ্চস্বরে প্রচার না করে মৃত্যুসংবাদ জানানো জায়েয। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের কাছে নাজ্জাশীর মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে তাঁর গায়েবানা জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন। অনুরূপভাবে মুতার যুদ্ধে যায়দ ইবনু হারিসাহ, জা‘ফর ইবনু আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদও তিনি সাহাবীদেরকে জানিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী, হা. ৪২৬২)। তাবরানীর বর্ণনায় এসেছে:نَعَى رَسُولُ اللهِ ﷺ أَصْحَابَ مُؤْتَةَ عَلَى الْمِنْبَرِ—“রাসূলুল্লাহ ﷺ মুতার যুদ্ধে শহীদ সাহাবীদের মৃত্যুসংবাদ মিম্বরে ঘোষণা করেছিলেন।” সুতরাং মসজিদের মাইক বা লাউডস্পিকারের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে জনসাধারণের কাছে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা এবং মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিদের প্রয়োজনের কারণে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুসংবাদ জানানো—দুটি বিষয় এক নয়। প্রথমটি পরিহারযোগ্য; আর দ্বিতীয়টি প্রয়োজন ও শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্যে হলে বৈধ। (বিস্তারিত: ইসলাম সওয়াল-জবাব, ফাতওয়া নং ৪১৯৫৯; ইসলামওয়েব, ফাতওয়া নং ৩২২৪৯৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।

কেন মানুষ বারবার কা’বার দিকে ছুটে যেতে চায়

 ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর,কেন মানুষ বারবার কাবার দিকে ছুটে যেতে চায়? কেন একবার কাবা দেখে ফিরে আসার পরও হৃদয় আবার সেই পবিত্র ঘরের সান্নিধ্য কামনা করে? এর পেছনে রয়েছে এক মহান আল্লাহর দয়া এবং এক মহান নবীর হৃদয়ছোঁয়া দোয়া। নবী ইবরাহীম (আ.) যখন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছিলেন, তখন তিনি দোয়া করেছিলেন—মানুষের অন্তর যেন কাবার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেখানে বারবার ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই দোয়া কবুল করেছেন। তাই কাবার প্রতি মুমিনের এই গভীর আকর্ষণ কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; এটি ইবরাহীম (আ.)-এর কবুল হওয়া দোয়ারই এক অপূর্ব নিদর্শন।

.
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: ( وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ * وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ قَالَ وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ) “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা কাবাঘরকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম এবং (আদেশ দিলাম যে,) তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ করো। আর ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকু’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে।আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এটাকে নিরাপদ শহর করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন। তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কুফরী করবে তাকেও কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব, তারপর তাকে আগুনের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!”(সূরা বাকারা আয়াত: ১২৫-১২৬)
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে হাফিয ইবনু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
” ومضمون ما فسر به هؤلاء الأئمة هذه الآية : أن الله تعالى يذكر شرف البيت وما جعله موصوفًا به شرعًا وقدرًا من كونه مثابة للناس ، أي: جعله مَحَلا تشتاق إليه الأرواح وتحن إليه ، ولا تقضي منه وطرً ا، ولو ترددَت إليه كلَّ عام ، استجابة من الله تعالى لدعاء خليله إبراهيم ، عليه السلام، في قوله : ( فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ ) إلى أن قال: ( رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ) إبراهيم / 37 -40 ، ويصفه تعالى بأنه جعله أمنًا ؛ من دخله أمن ، ولو كان قد فعل ما فعل ، ثم دخله : كان آمنًا.وقال عبد الرحمن بن زيد بن أسلم : كان الرجل يلقى قاتل أبيه وأخيه فيه فلا يَعْرض له ، كما وصفها في سورة المائدة بقوله تعالى : ( جَعَلَ اللَّهُ الْكَعْبَةَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ قِيَامًا لِلنَّاسِ ) المائدة / 97 . أي: يُرْفَع عنهم بسبب تعظيمها السوءُ ، كما قال ابن عباس : لو لم يحج الناسُ هذا البيت لأطبق الله السماءَ على الأرض ” .
“এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী ইমামগণ যা বলেছেন, তার সারমর্ম হলো—মহান আল্লাহ এই ঘরের মর্যাদা এবং শরিয়ত ও তাকদির উভয় দিক থেকে এটিকে যে সকল বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত করেছেন, তা উল্লেখ করেছেন। সেসব বৈশিষ্ট্যের একটি হলো—তিনি একে মানুষের জন্য ‘মাসাবাহ’ (مَثَابَةً) তথা প্রত্যাবর্তনস্থল বানিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি একে এমন একটি স্থান করেছেন, যার প্রতি অন্তরসমূহ আকৃষ্ট হয়, যার প্রতি হৃদয়সমূহ ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং মানুষ প্রতি বছর সেখানে বারবার আসা-যাওয়া করলেও তার আকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত হয় না। এটি তাঁর খলীল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই দোয়ার প্রতি মহান আল্লাহর সাড়া,যেখানে তিনি বলেছিলেন: ‘অতএব, আপনি মানুষের কিছু অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিন।’ অতঃপর তাঁর দোয়ার শেষাংশে তিনি বলেছিলেন:”হে আমাদের রব!আপনি আমার দোয়া কবুল করুন।”[সূরা ইবরাহীম, ৩৭–৪০]।আর তিনি এটিকেও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এই ঘরকে নিরাপত্তার স্থান বানিয়েছেন; যে ব্যক্তি এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। এমনকি সে এর পূর্বে যত কিছুই করে থাকুক না কেন, এরপর যখন এতে প্রবেশ করে, তখন সে নিরাপদ থাকে।আবদুর রহমান ইবনু যায়দ ইবনু আসলাম বলেন: কোনো ব্যক্তি সেখানে তার পিতা অথবা ভাইয়ের হত্যাকারীর সাক্ষাৎ পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিত না। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়িদায়ও এর বর্ণনা দিয়ে বলেছেন:(আল্লাহ কাবা ঘর তথা পবিত্র গৃহকে মানুষের জীবনযাত্রার মাধ্যম বানিয়েছেন) [সূরা আল-মায়িদাহ, ৯৭]। অর্থাৎ, এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কারণে মানুষের কাছ থেকে অনিষ্ট ও অকল্যাণ প্রতিহত করা হয়।যেমন ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন: মানুষ যদি এই ঘরের হজ না করত, তবে আল্লাহ আকাশকে পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দিতেন।”(তাফসির ইবনু কাসীর, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৩)
.
আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) সূরা বাকারা ১২৫ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন: أي: مرجعا يثوبون إليه ، لحصول منافعهم الدينية والدنيوية ، يترددون إليه ، ولا يقضون منه وطرا ، وجعله أمنا يأمن به كل أحد ، حتى الوحش ، وحتى الجمادات كالأشجار.ولهذا كانوا في الجاهلية – على شركهم – يحترمونه أشد الاحترام ، ويجد أحدهم قاتل أبيه في الحرم ، فلا يهيجه ، فلما جاء الإسلام ، زاده حرمة وتعظيما ، وتشريفا وتكريما “অর্থাৎ, এমন একটি প্রত্যাবর্তনস্থল, যার দিকে মানুষ তাদের দ্বীনি ও পার্থিব কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে বারবার ফিরে আসে। তারা সেখানে বারবার যাতায়াত করে এবং সেখান থেকে তাদের প্রয়োজন-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তৃপ্ত হয় না। আর তিনি (আল্লাহ) একে এমন একটি নিরাপদ স্থান করেছেন, যেখানে প্রত্যেকেই নিরাপত্তা লাভ করে—এমনকি বন্যপ্রাণীরাও এবং জড়বস্তুর মধ্যেও গাছপালাও।এ কারণেই জাহেলি যুগে তারা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও এই ঘরের প্রতি অত্যন্ত কঠোরভাবে সম্মান প্রদর্শন করত। এমনকি তাদের কেউ হারামের মধ্যে তার পিতার হত্যাকারীকে দেখতে পেলেও তার ওপর কোনো আক্রমণ করত না বা তাকে কোনোভাবে উত্ত্যক্ত করত না। অতঃপর যখন ইসলাম আগমন করল, তখন ইসলাম এই ঘরের মর্যাদা, সম্মান, মহত্ত্ব ও পবিত্রতাকে আরও বৃদ্ধি করে দিল।”(তাফসির আস-সা‘দী, পৃ. ৬৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি ধৈর্যশীল ও অনুগত হতে বলা হয়েছে

 প্রশ্ন: স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি ধৈর্যশীল ও অনুগত হতে বলা হয়েছে—এর অর্থ কি স্বামী তার স্ত্রীর ওপর যুলুম করার অধিকার রাখে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা স্বামীকে পরিবারের দায়িত্বশীল করেছেন এবং স্ত্রীকে স্বামীর বৈধ বিষয়ে আনুগত্যশীল হতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:ٱلرِّجَالُ قَوَّٲمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَآ أَنفَقُواْ مِنْ أَمْوَٲلِهِمْ‌ۚ فَٱلصَّـٰلِحَـٰتُ قَـٰنِتَـٰتٌ حَـٰفِظَـٰتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُ‌ۚ “পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের এককে অন্যের উপর মর্যাদা প্রদান করেছেন, আর এজন্য যে, পুরুষেরা স্বীয় ধন-সম্পদ হতে ব্যয় করে। ফলে পুণ্যবান স্ত্রীরা (আল্লাহ ও স্বামীর প্রতি) অনুগতা থাকে এবং পুরুষের অনুপস্থিতিতে তারা তা (অর্থাৎ তাদের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ) সংরক্ষণ করে যা আল্লাহ সংরক্ষণ করতে আদেশ দিয়েছেন।”(সূরা আন-নিসা: ৩৪)। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বামীর বৈধ অধিকার আদায়, তার প্রতি আনুগত্য এবং দাম্পত্য জীবনে ধৈর্যশীল থাকার প্রতি স্ত্রীদের উৎসাহিত করেছেন। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,الْمَرْأَةُ إِذَا صَلَّتْ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا فَلْتَدْخُلْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ”কোন মহিলা যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রামাযানের সিয়াম পালন করে, গুপ্তাঙ্গের হিফাযত করে, স্বামীর একান্ত অনুগত হয়। তার জন্য জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকবে’ (হিইইয়াতুল আওলিয়া, ৬/৩০৮ পৃ.; মিশকাত, হা/৩২৫৪)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত যদি অন্য কাউকে আমি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম’ (তিরমিযী হা/১১৫৯)। এতে প্রতীয়মান হয় যে, স্বামীর বৈধ নির্দেশ মান্য করা এবং দাম্পত্য জীবনে ধৈর্য, সহযোগিতা ও সংসার রক্ষায় সচেষ্ট থাকা স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এর অর্থ কখনোই এই নয় যে, স্বামী স্ত্রীর ওপর যুলুম, অধিকারহরণ, অপমান কিংবা দুর্ব্যবহার করার বৈধতা লাভ করবে। বরং শরী‘আত যেমন স্ত্রীকে স্বামীর বৈধ অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি স্বামীকেও স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস, তার অধিকার যথাযথভাবে আদায় এবং তার প্রতি কোমল ও সম্মানজনক আচরণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا “আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো। অতপর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন।” (সূরা নিসা: ১৯)
.
​উক্ত আয়াতের তাফসিরে হাফিজ ইবনু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقوله: ( وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ )، أي: طيِّبوا أقوالكم لهن، وحسِّنوا أفعالكم، وهيئاتكم بحسب قدرتكم، كما تحب ذلك منها، فافعل أنت بها مثله، كما قال تعالى: ( وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ )، وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ( خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي )، وكان من أخلاقه صلى الله عليه وسلم أنه جميل العشرة؛ دائم البشر، يداعب أهله، ويتلطف بهم، ويوسعهم نفقته، ويضاحك نساءه আল্লাহর বানী:”তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো’—এর অর্থ হলো, তাদের সঙ্গে উত্তম কথা বলো, তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী তোমাদের কাজকর্ম ও বাহ্যিক অবয়বকে সুন্দর রাখো—যেভাবে তুমি তোমার স্ত্রীর কাছ থেকে তা কামনা করো; তুমিও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:”আর নারীদের জন্যও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর ন্যায়সংগত দায়িত্ব রয়েছে।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:”তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতেন, সর্বদা প্রফুল্ল থাকতেন, পরিবারের সঙ্গে রসিকতা করতেন, তাদের প্রতি কোমল ও স্নেহশীল আচরণ করতেন, তাদের জন্য উদারভাবে ব্যয় করতেন এবং তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটাতেন।”—তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৪২)
.
আর স্ত্রীর ওপর যুলুম করা স্বামীকে আখিরাতে কঠিন জবাবদিহি ও শাস্তির সম্মুখীন করতে পারে। তাই কোনো স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি অন্যায়-অবিচার করে থাকে, তার কোনো অধিকার নষ্ট করে থাকে কিংবা তাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত দেরি না করে স্ত্রীর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়া। কেননা, দুনিয়াতে মানুষের অধিকার নষ্ট করে পার পাওয়া গেলেও আখিরাতে তা নেক আমল দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন:আবু হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا، فَإِنَّهُ لَيْسَ ثَمَّ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، مِنْ قَبْلِ أَنْ يُؤْخَذَ لِأَخِيهِ مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ أَخِيهِ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ “কারো কাছে তার ভাইয়ের কোনো অধিকার বা যুলুম বাকি থাকলে সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার আগে যেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না; বরং সেদিন তার (যুলুমকারী) নেক আমল থেকে (পাওনাদারের পাওনা পরিমাণ) কেটে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মাজলুম ভাইয়ের পাপ থেকে কিছু অংশ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।”(সহিহ বুখারি: ৬৫৩৪) অতএব, স্ত্রীর ওপর যুলুমকারী স্বামীও এই কঠিন সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত। সে যদি স্ত্রীর কোনো অধিকার নষ্ট করে থাকে বা তার ওপর অন্যায়-অবিচার করে থাকে, তাহলে তার উচিত দুনিয়াতেই স্ত্রীর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এবং তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া—কারণ আখিরাতে প্রতিকার হবে নেক আমল দিয়ে, দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে নয়।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:
فالمؤمن يعتني بزوجته ويكرمها، ويحسن عشرتها ولا يظلمها، هذا هو الواجب عليه، ألا يظلمها لا في نفسها، ولا في مالها، ولا في عرضها، فإذا ظلمها، خَصْمه الله، خصم الظالمين الرَّب عز وجل، هو الذي يجازيهم بما يستحقون، كما قال عز وجل: ( وَمَنْ يَظْلِمْ مِنْكُمْ نُذِقْهُ عَذَابًا كَبِيرًا )، قال سبحانه: ( وَالظَّالِمُونَ مَا لَهُمْ مِنْ وَلِيٍّ وَلا نَصِيرٍ )، وقال النبي صلى الله عليه وسلم: يقول الله عز وجل: ( ثلاثة أنا خصمهم يوم القيامة، رجل أعطى بي ثم غدر- يعني عاهد ثم غدر- ورجل باع حرا فأكل ثمنه، ورجل استأجر أجيرا فاستوفى منه، ولم يعطه حقه )، خرجه البخاري في الصحيح، كما قد يقع مما مضى من بعض الناس يسرق بنات الناس، أو أولاد الناس، ويبيعهم على أنهم عبيد وهو كاذب، ورجل استأجر أجيرا ولم يعطه حقه، وهكذا يكون خصما لمن ظلم امرأته بغير حق، أو ظلم عبده بغير حق، أو خادمه بغير حق، أو ولده بغير حق، أو جيرانه بغير حق، أو غيرهم من المسلمين، فالله خصمه يوم القيامة، ومن كان الله خصمه فهو مخصوم، فالواجب على كل مسلم أن يحذر ظلم زوجته، أو ظلم أهل بيته من أولاد، ذكور أو إناث، من أخوات، من خادمات ومن غير ذلك… “
​“অতএব মুমিন তার স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হবে, তাকে সম্মান করবে, তার সঙ্গে সুন্দর ও সদাচরণপূর্ণ দাম্পত্য জীবনযাপন করবে এবং তার প্রতি কোনো জুলুম করবে না। এটাই তার ওপর আবশ্যক। সে তার স্ত্রীর নিজের ওপর, তার সম্পদের ওপর কিংবা তার সম্মানের ওপর কোনো জুলুম করবে না। সে যদি তার প্রতি জুলুম করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হবেন। জালিমদের প্রতিপক্ষ হলেন মহান রব; তিনিই তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত প্রতিফল দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে যে জুলুম করবে, আমি তাকে মহাশাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাব।’ (সূরা আল-ফুরকান: ১৯) তিনি আরও বলেন, ‘আর জালিমদের কোনো অভিভাবক নেই এবং কোনো সাহায্যকারীও নেই।’ (সূরা আশ-শূরা: ৮) নবী ﷺ থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হব: এমন ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকার করে অতঃপর তা ভঙ্গ করে; এমন ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে; এবং এমন ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেয় না।’—ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বুখারিতে এটি বর্ণনা করেছেন। অতীতেও এমন কিছু লোক ছিল, যারা মানুষের ছেলে-মেয়েদের চুরি করে তাদেরকে দাস হিসেবে বিক্রি করত, অথচ তারা ছিল স্বাধীন মানুষ—এটি ছিল তাদের মিথ্যা ও প্রতারণা। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেয় না, সেও এই হুমকির অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে তার স্ত্রী, দাস, খাদেম, সন্তান—ছেলে হোক বা মেয়ে—বোন, প্রতিবেশী কিংবা অন্য কোনো মুসলিমের ওপর জুলুম করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হবেন। আর যার বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা প্রতিপক্ষ হন, সে অবশ্যই পরাজিত। অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো—নিজের স্ত্রী কিংবা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছেলে-মেয়ে, বোন, খাদেম অথবা অন্য কারও ওপর জুলুম করা থেকে সতর্ক থাকা।” (ইবনু বায; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ২১/১৯৭-১৯৯)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে কথা পরিষ্কার যে,স্ত্রীকে স্বামীর বৈধ বিষয়ে আনুগত্যশীল ও দাম্পত্য জীবনে ধৈর্যশীল হতে বলা হয়েছে—এর অর্থ কখনোই স্বামীকে স্ত্রীর ওপর যুলুম, অধিকারহরণ বা দুর্ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া নয়। বরং ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই পরস্পরের অধিকার আদায়, সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে। স্ত্রী যেমন স্বামীর বৈধ অধিকার আদায়ে দায়িত্বশীল, তেমনি স্বামীও স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহার, সম্মান, ভরণ-পোষণ ও তার অধিকার সংরক্ষণে দায়িত্বশীল। অতএব, স্বামীর কর্তৃত্ব দায়িত্বের নাম, যুলুমের লাইসেন্স নয়; আর স্ত্রীর ধৈর্য জুলুম মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নয়। যে স্বামী স্ত্রীর ওপর অন্যায়-অবিচার করে, তাকে দুনিয়াতেই তওবা করে ক্ষমা চাওয়া, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সম্পর্ক সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত; কারণ মানুষের অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি আখিরাতে কঠিন জবাবদিহির কারণ হবে। আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫৬৪৭০১)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

মসজিদের সামনে পেছনে ডানে-বামে অথবা মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকলে শরঈ বিধান

 প্রশ্ন: মসজিদের সামনে, পেছনে, ডানে-বামে অথবা মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকলে শরঈ বিধান কী? এ অবস্থায় মসজিদে সালাত আদায় করা সহীহ হবে কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর, মসজিদ ও কবরের পারস্পরিক অবস্থান শরী‘আতের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মসজিদের সঙ্গে কবরের অবস্থান অনুযায়ী এ বিষয়ে হুকুমও ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কবরটি মসজিদের সামনে (কিবলার দিকে),পেছনে,ডানে-বামে নাকি মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থিত—এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথক সীমানা, প্রাচীর বা ব্যবধান রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কবরকেন্দ্রিক মসজিদের বিষয়টি মূলত তিনটি অবস্থায় বিভক্ত:
(ক) মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে কবর থাকা;
(খ) মসজিদের সামনে, অর্থাৎ কিবলার দিকে কবর থাকা; এবং
(গ) মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকা।
নিম্নে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সালাফের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফাতওয়ার আলোকে প্রতিটি অবস্থার পৃথক শরঈ বিধান এবং সেখানে আদায়কৃত সালাত সহীহ হবে কি না—তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
.
▪️(ক). মসজিদের ডানে, বামে ও পেছনে কবর:
.
মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে কবর থাকলে—কবরগুলো যদি মসজিদের সীমানার বাইরে পৃথক স্থানে থাকে এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে স্বতন্ত্র সীমানা/প্রাচীর থাকে, যার ফলে উভয়টি পৃথক স্থাপনা হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সেখানে সালাত আদায় করা সহীহ। কারণ, কবরকে মসজিদের অংশ বানানো কিংবা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:«لَا تُصَلُّوا إِلَى الْقُبُورِ»“তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করো না।”(সহীহ মুসলিম, হা/৯৭২) অন্য বর্ণনায় আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরের মাঝে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।”(মুসনাদে বাযযার, হা/৪৪১)।
অতএব, কবর যদি মসজিদের বাইরে পৃথক সীমানায় থাকে এবং মুসল্লির কিবলার দিকে অর্থাৎ সামনে না থেকে ডানে, বামে বা পেছনে থাকে, তাহলে শুধু কবরের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে সালাত বাতিল বা মাকরূহ হবে না। বরং মসজিদ ও কবরস্থান পৃথক থাকলে সেখানে সালাত আদায় করা জায়েয ও সহীহ। এর সমর্থনে আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ-তে শাইখ মুহাম্মদ ইবনুশ শাইখ আবদুল লতীফ ইবনু আবদুর রহমান এবং শাইখ সুলাইমান ইবনু সাহমান রহিমাহুমাল্লাহ-এর ফতোয়া উল্লেখ করা হয়েছে:مسجد الطائف الذي في شقه الشمالي قبر ابن عباس رضي الله عنهما، الصلاة في المسجد، إذا جُعِل بين القبر وبين المسجد جدار يُرفَع، يُخرج القبر عن مسمَّى المسجد، فلا تُكره الصلاة فيه“তায়েফের যে মসজিদের উত্তর অংশে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবর রয়েছে, সেখানে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে যদি কবর ও মসজিদের মাঝে এমন একটি উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যা কবরটিকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে পৃথক করে দেয়, তাহলে সেখানে সালাত আদায় করা মাকরূহ হবে না।”(আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬৬)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:وَإِنْ كَانَ الْمَسْجِدُ مُنْفَصِلًا عَنِ الْقَبْرِ، فَحُكْمُهُ حُكْمُ سَائِرِ مَسَاجِدِ الْمُسْلِمِينَ“আর যদি মসজিদটি কবর থেকে পৃথক থাকে, তাহলে তার বিধান মুসলিমদের অন্যান্য মসজিদের মতোই।”(মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ৩১/১২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে এমন একটি মসজিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যার উত্তর ও দক্ষিণ দিক কবর দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিকেই মসজিদ ও কবরস্থানের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র দুই মিটার।
জবাবে তিনি বলেন:لا حرج في بقاء المسجد المذكور، لأن العادة جارية أن الناس يدفنون حول المسجد، فلا يضر ذلك شيئا، والمقصود أن الدفن حول المساجد لا بأس به، لأنه أسهل على الناس، فإذا خرجوا من المسجد دفنوه حول المسجد، فلا يضر ذلك شيئا ولا يؤثر في صلاة المصلين، لكن إذا كان في قبلة المسجد شيء من القبور، فالأحوط أن يكون بين المسجد وبين المقبرة جدار آخر غير جدار المسجد، أو طريق يفصل بينهما، هذا هو الأحوط والأولى، ليكون ذلك أبعد عن استقبالهم للقبور، أما إن كانت عن يمين المسجد، أو عن شماله، أي عن يمين المصلين، أو عن شمالهم فلا يضرهم شيئا، لأنهم لا يستقبلونها، لأن هذا أبعد عن استقبالها وعن شبهة الاستقبال”উল্লিখিত মসজিদটি বহাল রাখতে কোনো বাধা নেই; কারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রথা হলো তারা মসজিদের চারপাশেই দাফন করে থাকে, এতে কোনো ক্ষতি হয় না। মূলকথা হলো, মসজিদের আশপাশে দাফন করায় কোনো দোষ নেই, কারণ এটি মানুষের জন্য সহজতর। তারা যখন মসজিদ থেকে বের হয়, তখন তার পাশেই দাফন করে; এটি কোনো ক্ষতি করে না এবং মুসল্লিদের সালাতেও এর কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে যদি মসজিদের কেবলার দিকে কোনো কবর থাকে, তবে অধিক সতর্কতা ও উত্তম হলো—মসজিদ ও কবরস্থানের মাঝে মসজিদের দেয়াল ছাড়াও অতিরিক্ত আরেকটি দেয়াল বা কোনো রাস্তা থাকা, যা দুটির মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করবে। এটিই অধিক সতর্কতামূলক ও শ্রেয় পদ্ধতি, যাতে মুসল্লিদের কবরের দিকে মুখ করার বিষয়টি থেকে দূরে রাখা যায়। আর যদি কবরগুলো মসজিদের ডানে বা বামে—অর্থাৎ মুসল্লিদের ডানে বা বামে থাকে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই; কারণ তারা সেগুলোর দিকে মুখ করছে না। এটি কবরের দিকে মুখ করার প্রবণতা এবং এ সম্পর্কিত সন্দেহ থেকে দূরে থাকার জন্য অধিক উপযোগী।”(ইমাম বিন বায;মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৬)
.
সুতরাং মূলনীতি হলো—মসজিদের বাইরে পৃথক সীমানায় অবস্থিত কবর এবং মসজিদের অভ্যন্তরে বা মসজিদের অংশ হিসেবে অবস্থিত কবরের বিধান এক নয়। কবর যদি মসজিদের সীমানার বাইরে পৃথক স্থানে থাকে এবং মুসল্লিদের কিবলার দিকে না থেকে ডানে, বামে বা পেছনে অবস্থান করে, তাহলে শুধু কবরের নৈকট্যের কারণে সালাতকে বাতিল বা মাকরূহ বলা যাবে না; বরং এ অবস্থায় সালাত সহীহ হবে। পক্ষান্তরে, কবর যদি মসজিদের সীমানার অভ্যন্তরে থাকে বা মসজিদের অংশ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে তার বিধান ভিন্ন এবং এ অবস্থায় সালাত আদায়ের বিষয়টি শরিয়তের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। অতএব, মসজিদ ও কবরের মাঝে সুস্পষ্ট পৃথকীকরণ থাকা এবং কবরকে মসজিদের অংশ হিসেবে গণ্য না করাই শরিয়তসম্মত সমাধান।
.
▪️(খ). মসজিদের সামনে কিবলার দিকে কবর:
.
মসজিদের সামনে কিবলার দিকে কবর বা কবরস্থান থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য হলো—মুসল্লি কি সরাসরি কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করছেন, নাকি মসজিদ ও কবরের মাঝে এমন কোনো পৃথককারী দেয়াল, প্রাচীর বা রাস্তা রয়েছে, যা উভয় স্থানকে স্বতন্ত্র করে দেয়। কেননা দলিলের আলোকে প্রমাণিত হয়েছে যে, সরাসরি কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা হারাম। এর উদাহরণ হলো—কোনো ব্যক্তি এমন স্থানে সালাত আদায় করছেন, যার কিবলার দিকে একটি কবর বা কবরস্থান রয়েছে; যদিও তিনি কবরস্থানের ভেতরে সালাত আদায় করছেন না, কিন্তু কবরের খুব কাছাকাছি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছেন যেখানে তাঁর ও কবরের মাঝে কোনো দেয়াল, প্রাচীর বা অন্য কোনো পৃথককারী ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় তাঁর সালাত সরাসরি কবরমুখী হওয়ায় তা নিষিদ্ধ। এর হারাম হওয়ার দলিল হলো:
.
(১)- আবু মারসাদ আল-গানাওয়ী বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা কবরের উপর বসবে না এবং কবরের দিকে নামায পড়বে না।”(হাদীসটি ইমাম মুসলিম (৯৭২) বর্ণনা করেন] উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে কবরস্থানের দিকে কিংবা কিছু কবরের দিকে অথবা একটি কবরের দিকে নামায পড়া হারাম।এমনকি যারা কবরস্থানকে মসজিদ হিসাবে ব্যবহার করে, তাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে (সহীহ বুখারী, হা/১৩৩০; মিশকাত, হা/৭১২)।এ কারণেই ইবনু হাযম ‘আল-মুহাল্লা’-তে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি কবরস্থানে অথবা কোনো কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করবে, সে সর্বদা পুনরায় সালাত আদায় করবে।” ইবনু হাযম নিজে, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, তাঁর শিষ্য ইবনুল কাইয়্যিম এবং ইমাম আশ-শাওকানীও এই মতের ওপর রয়েছেন।(আল-মুহাল্লা’ (৪/২৭)
.
ইমাম আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) আলিমদের বিভিন্ন মত উল্লেখ করার পর বলেছেন: “নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মুতাওয়াতির হাদিসগুলো—যেমন ইবনু হাযম বলেছেন—নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত অর্থ তথা হারাম হওয়ার ওপর প্রমাণ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। উসূলের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা নিষিদ্ধ কাজের বাতিল হওয়ার নির্দেশ দেয়। অতএব সঠিক মত হলো—এটি হারাম এবং বাতিল। কারণ নিষেধাজ্ঞা যে ‘ফাসাদ’ (অকার্যকারিতা)-কে আবশ্যক করে, তা ‘বাতিল’-এর সমার্থক; কবরের ওপর, কবরস্থানে এবং ‘কবরস্থান’ শব্দের আওতায় পড়ে এমন সব স্থানে সালাত আদায়ের মধ্যে এ ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই।”
.
(২)- আর যেহেতু কবরস্থানে নামায পড়া হারাম হওয়ার হেতুটি কবরের দিকে নামায পড়ার মাঝেও পাওয়া যায়।আর ব্যক্তি যেহেতু কবরের দিকে কিংবা কবরস্থানের দিকে এভাবে ফিরে থাকছে যে, তার ব্যাপারে বলা যায় যে সে কবরের দিকে ফিরে নামায পড়ছে; তাই সে নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে “তোমরা নামায পড়ো না” এই হাদীসের কারণে সহিহ হবে না। যেহেতু এখানে নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যদি কবরের দিকে ফিরে নামায পড়ে তাহলে তার এ আমলে আনুগত্য ও অবাধ্যতা উভয়টা একত্রিত হলো। এমনটি করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব নয়।লক্ষণীয় বিষয়: যদি নামাযীর মাঝে ও কবরগুলোর মাঝে প্রতিবন্ধক হিসেবে দেয়াল থাকে, তাহলে সে অবস্থায় নামায পড়তে সমস্যা ও নিষেধাজ্ঞা নেই। অনুরূপভাবে যদি আপনার মাঝে ও কবরগুলোর মাঝে রাস্তা অথবা কিছুটা দূরত্ব থাকে যার কারণে আপনি কবরের দিকে ফিরে নামায আদায়কারী হয়ে যান না; তাহলে সমস্যা নেই।আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ।দেখুন: আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০৩) ও ইবনু উসাইমীনের আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৩২)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ‘আল-ইখতিয়ারাত’-এ বলেছেন:”ولا تصح الصلاة في المقبرة ولا إليها، والنهي عن ذلك هو سد لذريعة الشرك “কবরস্থানে সালাত সহিহ নয় এবং কবরের দিকে মুখ করেও সালাত সহিহ নয়। এরূপ সালাত থেকে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হলো শিরকের পথ বন্ধ করা।”
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إذا صلَّى الإنسان في مسجد أمامه مقبرة : فإن كان هناك فاصل شارع – مثلاً – أو جدار تام بحيث يكون المصلون لا يشاهدون المقبرة : فلا بأس بذلك ، أما إذا كان قريباً يلي المسجد مباشرة ، وليس فيه جدار ، أو فيه جدار قصير بحيث يشاهد المصلون هذه القبور : فإنه لا يجوز ؛ لأن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم قال ( لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها ) -“কোনো ব্যক্তি যদি এমন একটি মসজিদে সালাত আদায় করে, যার সম্মুখে কবরস্থান রয়েছে—তাহলে যদি মসজিদ ও কবরস্থানের মাঝে কোনো পৃথককারী ব্যবস্থা থাকে; যেমন, একটি রাস্তা, অথবা এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দেয়াল থাকে, যার কারণে মুসল্লিরা কবরস্থান দেখতে পায় না—তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই।কিন্তু যদি কবরস্থানটি মসজিদের একেবারে নিকটবর্তী হয় এবং সরাসরি মসজিদের সঙ্গে লাগোয়া থাকে, আর সেখানে কোনো দেয়াল না থাকে; অথবা দেয়াল থাকলেও তা এত নিচু হয় যে, মুসল্লিরা কবরগুলো দেখতে পায়—তাহলে এ অবস্থায় সালাত আদায় করা জায়েজ নয়।কেননা নবী ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করো না এবং কবরের ওপর বসো না।”(সহিহ মুসলিম; ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৩৭)
.
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:”যদি কেউ প্রশ্ন করে, (কবরের) দিকে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে সীমা বা ব্যবধান কতটুকু?
আমরা বলব:الجدارُ فاصل ، إلا أن يكون جدارَ المقبرة ، ففي النفس منه شيء ، لكن إذا كان جداراً يحول بينك وبين المقابر ، فهذا لا شَكَّ أنه لا نهي ، كذلك لو كان بينك وبينها شارع فهنا لا نهي”মধ্যবর্তী দেওয়ালই হলো ব্যবধান। তবে সেটি যদি কবরস্থানের দেওয়াল হয়, তবে তা নিয়ে মনে কিছুটা খটকা জাগে। কিন্তু যদি এমন একটি দেওয়াল থাকে যা আপনার ও কবরসমূহের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করে, তবে এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তেমনিভাবে আপনার ও কবরগুলোর মাঝে যদি কোনো সড়ক বা রাস্তা থাকে, তবে এক্ষেত্রেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।”(আশ-শারহুল মুমতি; ২/২৫৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.)-কে এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কেউ কবরমুখী হয়ে সালাত আদায় করলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। মানুষের জন্য আবশ্যক হল কবরকে স্থানান্তর করা। অথবা কবর ও মসজিদের মাঝে পৃথক কোন দেয়াল উঁচু করে দেয়া। তবে অবশ্যই সেটা যেন কবরের দেয়াল না হয়। কবরের দেয়াল যদি সম্মান বাড়ানোর জন্য করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা ভেঙ্গে দিতে হবে। যদি কেউ জানার পূর্বে সালাত আদায় করে থাকে তাহলে অজ্ঞতা হেতু তার সালাত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ”(ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৯)
.
সুতরাং, মসজিদের কিবলার দিকে যদি সরাসরি কবর বা কবরস্থান থাকে এবং মুসল্লি ও কবরের মাঝে কোনো পৃথককারী দেয়াল, প্রাচীর বা রাস্তা না থাকে, তাহলে সেখানে কবরমুখী হয়ে সালাত আদায় করা জায়েজ নয়; বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এমন সালাত সহিহও নয়। তবে মসজিদ ও কবরের মাঝে এমন পূর্ণাঙ্গ দেয়াল বা স্বতন্ত্র সীমানা থাকে, যা কবরকে পৃথক করে দেয়, অথবা মাঝখানে এমন রাস্তা/ব্যবধান থাকে যার কারণে তাকে কবরমুখী সালাত আদায়কারী বলা হয় না—তাহলে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। আর কোনো ব্যক্তি বিষয়টি না জেনে এমন স্থানে সালাত আদায় করে থাকলে, অজ্ঞতার কারণে তার পূর্বের সালাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও গ্রহণযোগ্যতার আশা করা যায়।
.
▪️(গ). মসজিদের ভিতরে কবর:
.
মসজিদ ও কবরকে একই স্থানে রাখা শরিয়তসম্মত নয়। তাই যে মসজিদের অভ্যন্তরে কবর রয়েছে,সেখানে সালাত আদায় করা হারাম।রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا تَجْلِسُوْا عَلَى الْقُبُوْرِ وَلَا تُصَلُّوْا إِلَيْهَا ‘তোমরা কখনো ক্ববরের উপর বসবে না এবং ক্ববরের দিকে মুখ করে সালাতও আদায় করবে না”।(সহীহ মুসলিম, হা/৯৭২)। এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুমূর্ষু অবস্থায় ইহুদী খৃষ্টানদের কার্যকলাপ থেকে কঠিনভাবে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে উপরোক্ত বাণী পেশ করেন। উম্মে সালামা (রাঃ) হাবশায় হিজরত করে খৃষ্টানদের গীর্জা বা উপাসনালয়ে স্থাপিত বহু মূর্তী দেখেছিলেন। বিষয়টি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন: أُولَئِكَ قَوْمٌ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الْعَبْدُ الصَّالِحُ أَوِ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ “ওরা এমন জাতি, তাদের মধ্যে কোন নেক বান্দা বা সৎলোক মৃত্যু বরণ করলে তার কবরের উপর তারা মসজিদ তৈরী করত এবং ঐ মূর্তিগুলো স্থাপন করত। ওরা আল্লাহর কাছে সৃষ্টির মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট।”(সহীহ বুখারী হা/৪৩৪) অপর বর্ননায় আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বলেন, “সর্বাধিক নিকৃষ্ট লোক হচ্ছে তারা, যাদের জীবদ্দশায় ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। আর যারা কবর সমূহকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।” ইমাম আহমাদ উত্তম সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেন। অতএব মু’মিন কখনই ইহুদী-খৃষ্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সন্তুষ্ট হবে না এবং সৃষ্টি কুলের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হবে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-ইখতিয়ারাত’-এ বলেছেন:”ولا تصح الصلاة في المقبرة ولا إليها، والنهي عن ذلك هو سد لذريعة الشرك “কবরস্থানে সালাত সহিহ নয় এবং কবরের দিকে মুখ করেও সালাত সহিহ নয়। এরূপ সালাত থেকে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হলো শিরকের পথ বন্ধ করা।”
.
সুতরাং যদি কোনো স্থানে প্রথমে কবর থাকে, অতঃপর সেই কবরের ওপর বা তাকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়,এক্ষেত্রে ওয়াজিব হচ্ছে এই মসজিদ পরিত্যাগ করা; বরং মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা। যদি না করা হয় তবে মুসলিম শাসকের উপর আবশ্যক হচ্ছে উক্ত মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা। পক্ষান্তরে যদি প্রথমে মসজিদ নির্মিত হয়, অতঃপর তার অভ্যন্তরে কোনো মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়, তাহলে কবরটি অপসারণ করে মৃত ব্যক্তিকে—অথবা দেহের অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি থাকলে সেগুলোকে—মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা ওয়াজিব। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরকে মসজিদে পরিণত করা এবং কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। সুতরাং মসজিদের ভেতরে কবর বিদ্যমান থাকলে সেখানে সালাত আদায় না করে কবর অপসারণের শরঈ ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
.
ইমাম ইবনু কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:وعلى هذا فيهدم المسجد إذا بني على قبر ، كما ينبش الميت إذا دفن في المسجد ، نص على ذلك الإمام أحمد وغيره ، فلا يجتمع في دين الإسلام مسجد وقبر ، بل أيهما طرأ على الآخر منع منه ، وكان الحكم للسابق .فلو وضعا معا : لم يجز ، ولا يصح هذا الوقف ، ولا يجوز ولا تصح الصلاة في هذا المسجد لنهي رسول الله صلى الله عليه وسلم عن ذلك ، ولعنه من اتخذ القبر مسجدا ، أو أوقد عليه سراجا ، فهذا دين الإسلام الذي بعث الله به رسوله ونبيه ، وغربته بين الناس كما ترى.”অনুরূপভাবে: কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হলে তা ভেঙে ফেলা হবে,ঠিক যেমন মসজিদের ভেতরে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হলে, তার লাশ কবর থেকে তুলে ফেলা হবে। ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য আলেমগণ এই বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং, ইসলাম ধর্মে মসজিদ ও কবর এক জায়গায় একত্র হতে পারে না; বরং দুটির মধ্যে যেটি পরে ঘটে, সেটি বাতিল হবে এবং পূর্ববর্তীটির বিধানই বহাল থাকবে।আর যদি উভয়টিই একই সময়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে তা বৈধ হবে না এবং এ ধরনের ওয়াকফও সহীহ হবে না। এ মসজিদে সালাত আদায় করাও বৈধ নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ তা থেকে নিষেধ করেছেন এবং যে ব্যক্তি কবরকে মসজিদে পরিণত করে অথবা তার ওপর প্রদীপ জ্বালায়, তাকে তিনি অভিশাপ দিয়েছেন। এটাই সেই ইসলামের বিধান, যার ওপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও নবীকে প্রেরণ করেছেন। অথচ মানুষের মাঝে এই দ্বীনের অপরিচিতি ও নিঃসঙ্গতা কেমন, তা তো তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো।”(ইবনু ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৫০)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে কবর আছে এমন মসজিদে সলাত আদায় করার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল?
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
” الصلاة في مسجد فيه قبر على نوعين :
الأول : أن يكون القبر سابقاً على المسجد ، بحيث يبنى المسجد على القبر ، فالواجب هجر هذا المسجد وعدم الصلاة فيه ، وعلى من بناه أن يهدمه ، فإن لم يفعل وجب على ولي أمر المسلمين أن يهدمه .
والنوع الثاني : أن يكون المسجد سابقاً على القبر ، بحيث يدفن الميت فيه بعد بناء المسجد ، فالواجب نبش القبر ، وإخراج الميت منه ، ودفنه مع الناس .
وأما المسجد فتجوز الصلاة فيه بشرط أن لا يكون القبر أمام المصلي ، لأن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن الصلاة إلى القبور.
أما قبر النبي صلى الله عليه وسلم الذي شمله المسجد النبوي فمن المعلوم أن مسجد النبي صلى الله عليه وسلم بُنِيَ قبل موته فلم يُبْنَ على القبر ، ومن المعلوم أيضاً أن النبي صلى الله عليه وسلم لم يدفن فيه ، وإنما دفن في بيته المنفصل عن المسجد ، وفي عهد الوليد بن عبد الملك كتب إلى أميره على المدينة وهو عمر بن عبد العزيز في سنة 88 من الهجرة أن يهدم المسجد النبوي ويضيف إليه حجر زوجات النبي صلى الله عليه وسلم ، فجمع عمر وجوه الناس والفقهاء وقرأ عليهم كتاب أمير المؤمنين الوليد فشق عليهم ذلك ، وقالوا : تَرْكُها على حالها أدعى للعبرة ، ويحكى أن سعيد بن المسيب أنكر إدخال حجرة عائشة ، كأنه خشي أن يتخذ القبر مسجداً فكتب عمر بذلك إلى الوليد فأرسل الوليد إليه يأمره بالتنفيذ فلم يكن لعمر بُدٌّ من ذلك ، فأنت ترى أن قبر النبي صلى الله عليه وسلم لم يوضع في المسجد ، ولم يُبْنَ عليه المسجد ، فلا حجة فيه لمحتج على الدفن في المساجد أو بنائها على القبور ، وقد ثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال : ” لعنة الله على اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد ” ، قال ذلك وهو في سياق الموت تحذيراً لأمته مما صنع هؤلاء ، ولما ذكرت له أم سلمة رضي الله عنها كنيسة رأتها في أرض الحبشة وما فيها من الصور قال : ” أولئك إذا مات فيهم الرجل الصالح ، أو العبد الصالح بنوا على قبره مسجداً ، أولئك شرار الخلق عند الله ” ، وعن ابن مسعود رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ” إن مِن شرار الناس مَن تدركهم الساعة وهم أحياء ، والذين يتخذون من القبور مساجد ” أخرجه الإمام أحمد بسند جيد .والمؤمن لا يرضى أن يسلك مسلك اليهود والنصارى ، ولا أن يكون من شرار الخلق .
“যে মসজিদে কবর আছে সেখানে নামায পড়া দুই পদ্ধতিতে হতে পারে:
প্রথম পদ্ধতি: যদি মসজিদের পুর্বেই ঐ স্থানে কবর হয়, অতঃপর কবরের উপরে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।তাহলে আবশ্যক হলো মসজিদটি স্থানান্তরিত করা এবং তাতে সালাত পড়া থেকে বিরত থাকা, আর যিনি এটা বানিয়েছে তার জন্য আবশ্যক হলো তা ধ্বংস করা। যদি তিনি এটা না করেন তাহলে মুসলিম শাসকদের জন্য আবশ্যক হলো তা ধ্বংস করা।
.
দ্বিতীয় পদ্ধতি: মসজিদ যদি আগে নির্মিত হয় অতঃপর মসজিদ নির্মাণের পর সেখানে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। সেক্ষেত্রে আবশ্যক হলো কবর খনন করে মৃতের দেহাবশেষ সেখান থেকে বের করা এবং অন্যান্য মৃত মানুষদের সাথে (মুসলিম গোরস্থানে) তাকে দাফন করা। এ ধরনের মসজিদে নামায পড়া জায়েয, যতক্ষণ না নামাযরত ব্যক্তির সামনে কবর থাকে,কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের দিকে সলাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।
.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের ব্যাপারে যা মসজিদে নববীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এটা সর্বজনবিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পূর্বে মসজিদে নববী নির্মাণ করা হয়েছিল, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। এটাও সর্বজনবিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামকে মসজিদে দাফন করা হয়নি। বরং মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন তাঁর নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়েছিল। ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে তিনি মদিনার গভর্নর উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে ৮৮ হিজরীতে চিঠি লিখেছিলেন যে, মসজিদে নববী ভেঙে ফেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের কক্ষ সংযুক্ত করার। উমর লোকজনদেরকে এবং ফুকাহাদের-কে ডেকে তাদের সামনে খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের দেওয়া চিঠিটা পড়ে শোনালেন। এই জিনিসটা তাদের সবার কাছে কঠিন মনে হলো। ফলে তারা বলল: “এটিকে যে অবস্থায় আছে তেমনই রেখে দাও, এটাই উত্তম। এমনকি এটি বর্ণিত হয়েছে যে, “সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাহিমাহুল্লাহ) আয়েশা (রা:)-এর ঘরকে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করার নিন্দা করেছিলেন এই ভয়ে যে, অনেকেই সেটাকে মাসজিদ রূপে গ্রহণ করে নিবে,তখন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ)-এই কথাটি খলিফা ওয়ালিদের কাছে লিখে পাঠালেন,ওয়ালিদ তাকে (উমর ইবনে আব্দুল আজিজকে) তার আদেশ পালন করার নির্দেশ দিয়ে তাকে একটি বার্তা পাঠান, ফলে উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খলিফার নির্দেশ পালন করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আর কোন উপায় ছিল না। সুতরাং আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর মসজিদের বিতর স্থাপন করা হয়নি এবং এর উপর মসজিদ নির্মিত হয়নি, সুতরাং যারা এটিকে প্রমাণ হিসাবে উদ্ধৃত করার চেষ্টা করে তাদের পক্ষে কোন দলিল নেই যে রাসূল (ﷺ) কে মসজিদে দাফন করা হয়েছে কিংবা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইহুদি খ্রিস্টান এর উপর আল্লাহ তাআলার লানত, যারা তাদের নবীর কবরকে মসজিদের হিসেবে গ্রহণ করেছে‌। এটা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে সতর্ক করেছেন যাতে করে তাদের মাঝে কোন বুজুর্গ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার কবরকে সিজদার স্থান হিসেবে গ্রহণ না করে। উম্মে সালমা গির্জার কথা উল্লেখ করেছেন যেটা তিনি আবিসিনিয়ায় দেখেছিলেন যে তাদের সিজদার স্থানে ছবি রয়েছে। তিনি (ﷺ) বলেন, যারা তাদের মাঝে সৎ ব্যাক্তিদের কবরকে মসজিদের হিসেবে তৈরি করে তারাই হলো আল্লাহ তাআলার নিকটে সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি যারা তাদের বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবরকে মসজিদ রূপে গ্রহণ করে”। এটি ইমাম আহমাদের বর্ণনা। সুতরাং মুমিনের উচিত নয় ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পথ অনুসরণ করা বা সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।(মাজমুউ ফাতাওয়া শায়েখ বিন উসাইমীন: ১২/২৯২)
.
ইমাম ইবনু উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “যে মসজিদে কবর রয়েছে—আর মুসল্লি জানেনই না যে সেখানে কবর আছে, কিংবা তিনি জানেন কিন্তু এ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ—এমন ব্যক্তির সালাতের বিধান কী? সালাতগুলো দীর্ঘ সময়ের হোক কিংবা অল্প সময়ের।”
​উত্তরে তিনি বলেন: “যদি তিনি না জেনে থাকেন যে সেখানে কবর রয়েছে, তবে তাঁর ওপর কোনো দায় বর্তায় না। কেননা মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‘হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না’ [সুরা বাক্বারা: ২৮৬]।
​প্রশ্নকারী: আর যদি তিনি জানেন যে সেখানে কবর রয়েছে, কিন্তু বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন?
​জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: একই কথা প্রযোজ্য; অর্থাৎ তিনি যদি জেনে থাকেন যে সেখানে কবর আছে কিন্তু বিধান জানা না থাকে, তবুও তাঁর ওপর কোনো দায় নেই। কারণ, তিনি অজ্ঞতাবশত নিষিদ্ধ কাজ করেছেন, আর অজ্ঞতাবশত সংঘটিত কাজের কারণে কোনো শাস্তি বা ত্রুটি সাব্যস্ত হয় না (ফলে তাঁর সালাত বাতিল হবে না)।
​প্রশ্নকারী: কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হওয়া এবং সচল মসজিদে কবর দেওয়া—উভয়ের হুকুম কি এক?
​জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: না, এক নয়। যদি কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হয় (অর্থাৎ কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরি করা হয়), তবে সে মসজিদ ভেঙে ফেলা ওয়াজিব এবং সেখানে সালাত আদায় করা সহিহ নয়।পক্ষান্তরে, যদি কোনো চালু মসজিদে কাউকে দাফন করা হয়, তবে সে ক্ষেত্রে মসজিদ ভেঙে ফেলা ওয়াজিব নয়; বরং কবর খুঁড়ে মৃতদেহ বের করে অন্যান্য কবরস্থানে দাফন করা আবশ্যক। এরপর সেই মসজিদে সালাত আদায় করা বৈধ হবে, তবে শর্ত হলো কবরটিকে নিজের ও কিবলার মাঝখানে রাখা যাবে না।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ,খণ্ড: ২৭,পৃষ্ঠা: ২৩৪)
.
​শায়খ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যিনি কবরের অস্তিত্ব রয়েছে এমন কোনো মসজিদে সালাত আদায় করেছেন, কিন্তু সালাত শেষ করার পর তা জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে কি তাঁকে সালাত পুনরায় আদায় করতে হবে?
​জবাবে তিনি বলেন:”لا يعيد الصلاة مرة أخرى “তাঁকে পুনরায় সালাত আদায় করতে হবে না।” (‘ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে মসজিদের সীমানার বাইরে কবর থাকলে এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথক সীমানা, দেয়াল বা অনুরূপ ব্যবধান থাকলে শুধু কবর থাকার কারণে সালাতের কোনো সমস্যা নেই। তবে কিবলার সামনে কবর থাকলে মসজিদ ও কবরের মাঝে স্পষ্ট পৃথককারী ব্যবস্থা না থাকা অবস্থায় সেখানে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আর মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকা শরিয়তসম্মত নয়; মসজিদ আগে নির্মিত হয়ে থাকলে পরবর্তীতে দাফন করা কবর অপসারণ করতে হবে, আর কবর আগে থাকা অবস্থায় তার ওপর মসজিদ নির্মিত হলে সেই মসজিদ পরিত্যাগ করতে হবে। অতএব, কবর কোথায় অবস্থিত, মসজিদের সীমানার ভেতরে না বাইরে, কিবলার দিকে কি না এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথককারী ব্যবস্থা আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করেই শরঈ হুকুম নির্ধারণ করতে হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate