October 31, 2026

সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান

 প্রশ্ন: সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর;ইসলামে হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবিকা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুসলিমের জন্য নিজের উপার্জন হালাল হওয়ার পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে গৃহীত সম্পদের বৈধতা সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। কিন্তু কোনো ব্যক্তির উপার্জনে সুদ বা অন্যান্য হারাম উপার্জন মিশ্রিত থাকলে, তার কাছ থেকে হালাল কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা কিংবা বৈধ লেনদেনের মাধ্যমে তার সম্পদ থেকে উপকৃত হওয়ার শরয়ি বিধান কী—এ বিষয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়। বিশেষত, সুদখোর ব্যক্তি বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত কারও কাছ থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে তা জায়েজ, কখন তা নিষিদ্ধ এবং কখন তা পরিহার করা অধিক সতর্কতাপূর্ণ—এসব বিষয় সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম হওয়া সম্পদ এবং চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলের মাধ্যমে অন্যের অধিকারভুক্ত হয়ে যাওয়া সম্পদের বিধান এক নয়। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে এ বিষয়ে শরিয়তের সঠিক বিধান তুলে ধরা হলো।
.
▪️ প্রথমত: সুদখোর বা হালাল-হারাম মিশ্রিত সম্পদের মালিকের সঙ্গে বৈধ লেনদেন করা এবং তার কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা মূলত জায়েজ। কোনো ব্যক্তির উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের সম্পদ মিশ্রিত থাকলেই তার সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন হারাম হয়ে যায় না; বরং এ ক্ষেত্রে হারাম সম্পদের উৎস, প্রকৃত মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। কেননা, চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিধান এবং বৈধ মালিকানাধীন কোনো বস্তু বা সেবার বিনিময়ে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিধান এক নয়। এর প্রমাণ হলো, রাসূল ﷺ এবং তার সাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) মুশরিক ও ইহুদিদের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া, বন্ধক, ঋণসহ বিভিন্ন বৈধ লেনদেন করতেন; অথচ তাদের সমাজে সুদ গ্রহণ ও সুদভিত্তিক লেনদেনের প্রচলন ছিল।উদাহরণস্বরূপ,আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং তাঁর কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ২০৬৮)। সুতরাং, কোনো সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের অর্থ মিশ্রিত থাকলে এবং তার কাছ থেকে শরিয়তসম্মত কোনো কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হলে, তা মূলত জায়েজ। তবে পারিশ্রমিকটি সরাসরি কোনো হারাম কাজের বিনিময়ে দেওয়া হলে কিংবা নির্দিষ্ট অর্থটি অন্যের অধিকারভুক্ত বা অবৈধভাবে অর্জিত বলে জানা থাকলে, তার বিধান ভিন্ন হবে। তাই এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস ও লেনদেনের প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। আর কিছু ফকীহ সন্দেহ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন পরিহার করাকে অধিক সতর্কতামূলক ও উত্তম বলে বিবেচনা করেছেন।
.
​’কাশশাফুল কিনা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ( وتكره إجابة من في ماله حلالٌ وحرام ، كأكله منه ، ومعاملته ، وقبول هديته وهبته ونحوه ) كصدقته “যে ব্যক্তির সম্পদে হালাল ও হারাম উভয় প্রকার সম্পদ মিশ্রিত রয়েছে, তার দাওয়াতে সাড়া দেওয়া মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। অনুরূপভাবে, তার সম্পদ থেকে আহার করা, তার সঙ্গে লেনদেন করা, তার উপহার ও হেবা গ্রহণ করা এবং এ ধরনের অন্যান্য কাজ করাও মাকরুহ; যেমন তার সদকা গ্রহণ করা।”(কাশশাফুল কিনা’: ৫/১৬৭)
.
দুসুক্বির হাশিয়াতে এসেছে: اعلم أن من أكثر ماله حلال وأقله حرام : المعتمد جواز معاملته ومداينته والأكل من ماله كما قال ابن القاسم ، خلافا لأصبغ القائل بحرمة ذلك .وأما من أكثر ماله حرام والقليل منه حلال : فمذهب ابن القاسم كراهة معاملته ومداينته والأكل من ماله ، وهو المعتمد ، خلافا لأصبغ المحرم لذلك .وأما من كان كل ماله حراماً وهو المراد بمستغرق الذمة ، فهذا تمنع معاملته ومداينته ويمنع من التصرف المالي وغيره “জেনে রাখুন, যে ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হালাল; আর অল্প কিছু হারাম: নির্ভরযোগ্য অভিমত হল— তার সাথে লেনদেন করা, ঋণ আদানপ্রদান করা, তার সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা জায়েয; যেমনটি বলেছেন ইবনুল কাসিম। তবে এর সাথে দ্বিমত করে ‘আসবাগ’ হারাম বলেছেন।পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হারাম; অল্প কিছু হালাল: ইবনুল কাসেমের অভিমত হচ্ছে তার সাথে লেনদেন করা; ঋণ আদানপ্রদান করা ও তার সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা মাকরুহ। এটাই নির্ভরযোগ্য অভিমত। তবে, এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে আসবাগ হারাম বলেছেন।আর যে ব্যক্তির সম্পূর্ণ সম্পদ হারাম; “সম্পূর্ণ জিম্মা” বলে এটাকেই বুঝানো হয়েছে— তার সাথে লেনদেন করা, ঋণ আদানপ্রদান করা নিষিদ্ধ। আর্থিক লেনদেন ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।[সমাপ্ত; দুসুক্বির হাশিয়াত: ৩/২৭৭)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:وإذا اشترى ممن في ماله حرام وحلال , كالسلطان الظالم , والمرابي  فإن علم أن المبيع من حلال ماله , فهو حلال , وإن علم أنه حرام , فهو حرام … فإن لم يعلم من أيهما هو , كرهناه ؛ لاحتمال التحريم فيه , ولم يبطل البيع ; لإمكان الحلال , قَلَّ الحرام أو كَثُر . وهذا هو الشبهة , وبقدر قلة الحرام وكثرته , تكون كثرة الشبهة وقلتها”কেউ যদি এমন কোন ব্যক্তি থেকে ক্রয় করে যার সম্পদে কিছু হালাল ও কিছু হারাম রয়েছে; যেমন- জালিম শাসক, সুদী কারবারী: যদি জানা যায় যে, বিক্রিত পণ্য তার হালাল সম্পদ থেকে তাহলে সেটা হালাল। আর যদি জানা যায় যে, সেটা হারাম সম্পদ তাহলে সেটা হারাম…। আর যদি জানা না যায় যে, এটা কোন শ্রেণীর তাহলে আমরা এমন ক্রয়কে অপছন্দ করি (মাকরুহ বলি); যেহেতু এতে হারাম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ক্রয়বিক্রয় বাতিল হবে না; যেহেতু হালাল হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে হারামের পরিমাণ কম হোক কিংবা বেশি হোক। এটি সংশয়পূর্ণ। হারামের অংশ বেশি বা কম হওয়ার অনুপাতে সংশয়ের মাত্রাও কমবেশি হবে।”(সমাপ্ত; ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৮০)
.
​▪️দ্বিতীয়ত: যার সম্পূর্ণ সম্পদই হারাম এবং তাতে কোনো হালাল সম্পদের মিশ্রণ নেই, তার সম্পদের বিধান। এ ধরনের সম্পদ-কে হারাম হওয়ার কারণ বিবেচনায় দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়।
.
▪️১. সত্তাগতভাবেই হারাম সম্পদ: এমন সম্পদ, যা মূলতই হারাম; যেমন—মদ, শূকর, চুরি করা, ছিনতাই করা, জবরদখলকৃত সম্পদ কিংবা আত্মসাৎকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রতারণা ও ধোঁকার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ। এ ধরনের সম্পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন করা জায়েজ নয়। অনুরূপভাবে, এসব সম্পদ উপহার হিসেবে গ্রহণ করা, পণ্যের মূল্য হিসেবে নেওয়া কিংবা কোনো কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করাও জায়েজ নয়। কেননা, এসব সম্পদের ওপর ওই ব্যক্তির বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি;বরং তা প্রকৃত মালিকের অধিকারভুক্ত।আর এ ধরনের সম্পদ অবশ্যই এর প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া দায়মুক্তি হবে না।যদি সে এটি খরচ করে ফেলে বা তছরূপ করে ফেলে, তবে যতদিন না সে তা মালিককে ফেরত দিতে সক্ষম হবে, ততদিন তা তার ওপর ঋণ হিসেবে রয়ে যাবে।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন:الأموال المغصوبة والمقبوضة بعقود لا تباح بالقبض إن عرفه المسلم : اجتنبه ، فمن علمتُ أنه سرق مالاً ، أو خانه في أمانته ، أو غصبه فأخذه من المغصوب قهراً بغير حق : لم يجز لي أن آخذه منه ، لا بطريق الهبة ، و لا بطريق المعاوضة ، و لا وفاء عن أجرة ، ولا ثمن مبيع ، و لا وفاء عن قرض ، فإن هذا عين مال ذلك المظلوم“জবরদখলকৃত সম্পদ এবং অগ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করা সম্পদ দখলে নেওয়ার মাধ্যমে বৈধ হয় না। যদি মুসলিম তা জানতে পারে, তাহলে সে এর থেকে বিরত থাকবে। যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমি জানি যে সে কারো সম্পদ চুরি করেছে বা আমানতের খিয়ানত করেছে বা অন্যায়ভাবে জোর করে কারো সম্পদ দখল করেছে: আমার জন্য তার কাছ থেকে তা নেওয়া জায়েয নয় — না হেবা বা উপহারের মাধ্যমে, না বিনিময় হিসেবে, না মজুরির পরিশোধ হিসেবে, না বিক্রয়মূল্য হিসেবে, আর না ঋণ পরিশোধ হিসেবে।কেননা এটি সেই মজলুমের নিজের সম্পদ।”(ইবনু তাইমিয়া; মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩২৩)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,“যদি গ্রহণ করা বস্তুটি মালিকের সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়ে থাকে এবং এর বিনিময় পরিশোধ করা না হয়ে থাকে; তবে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হয় তবে তা তার উপর ঋণ হিসেবে জেনে পরিশোধ করে দিবে। যদি এটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে তা মালিকের উত্তরাধিকারীদেরকে ফিরিয়ে দিবে। আর যদি সেটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে এটি তার পক্ষ থেকে সদকা করে দিতে হবে। যদি কিয়ামতের দিন মালিক সদকার সওয়াব গ্রহণ করতে চায়, তবে সেটা তার জন্য হবে। আর যদি সে তার সম্পদ ভক্ষণকারী থেকে নেক আমল ছাড়া অন্য কিছু নিতে রাজি না হয় তাহলে সে তার সম্পদের সমপরিমাণ নেক আমল তার থেকে গ্রহণ করবে। আর সদকাকারী সদকার সওয়াব পাবে। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে সাব্যস্ত।”(যাদুল মা‘আদ: ৫/৬৯০)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: “সম্পদগুলো মালিকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে; যেহেতু তারা চেনা ব্যক্তি কিংবা তাদের ওয়ারিশগণ চেনা ব্যক্তি। পক্ষান্তরে, আপনি যদি তাদেরকে ভুলে যান কিংবা মূলতঃই না চেনেন কিংবা তাদেরকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি নিরাশ হয়ে পড়েন— সে ক্ষেত্রে আপনি তাদের পক্ষ থেকে দান করে দিন। কিন্তু, তারা যদি চেনা মানুষ হয় কিংবা তারা মারা গেছেন তবে তাদের ওয়ারিশগণ চেনা হয়; কারো জন্য হয়ত তাদের কাছে গিয়ে বলা: ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে এ সম্পদগুলো অবৈধভাবে গ্রহণ করেছি, আপনারা আমার তওবা গ্রহণ করুন এবং সম্পদগুলো গ্রহণ করুন’— সমস্যা হতে পারে। এ দিক থেকেও এটা কঠিন হতে পারে যে, শয়তান হয়তো তাদের মনে ঢুকিয়ে দিবে যে, তুমি এর চেয়ে বেশি সম্পদ নিয়েছ ইত্যাদি। তাই, আপনি একজন আস্থাভাজন, বুদ্ধিমান ও দ্বীনদার মানুষ খুঁজে নিন। তাকে বলবেন: ভাই, বিষয়টি এমন এমন। অমুকের এই পাওনা আছে কিংবা সে মারা গিয়ে থাকলে তার ওয়ারিশদের এই পাওনা আছে। আশা করি সে ব্যক্তি আপনাকে দায়মুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন এবং যাদের পাওনা তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলবে যে, ভাই! এই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করেছেন। তিনি তোমাদের এত এত সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছেন। এই নাও সে সম্পদ। এভাবে তার দায়মুক্ত হবে। কারণ আলেমগণ বলেন: যে সম্পদের মালিক চেনা; সে সম্পদ তার মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে।”(আল-লিকা আস-শাহরি, নং-৩১ থেকে সমাপ্ত)
.
▪️২. উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম সম্পদ: এমন সম্পদ, যা মূলত বৈধ হলেও তা অর্জনের পদ্ধতি অবৈধ; যেমন—সুদ, মদ বিক্রি, গান-বাজনা কিংবা ব্যভিচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ। এখানে এমন উপার্জন বোঝানো হয়েছে, যা চুরি, ছিনতাই, জবরদখল বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। এ ধরনের সম্পদ উপার্জনকারীর জন্য হারাম। তবে অন্য কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ কোনো উপায়ে তার কাছ থেকে সেই সম্পদ গ্রহণ করেন, যেমন—উপহার হিসেবে, বৈধ কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কিংবা স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ হিসেবে, তাহলে সাধারণভাবে তাঁর জন্য তা গ্রহণ করা ও তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ। কেননা, এ ক্ষেত্রে হারাম উপার্জনের গুনাহ মূলত উপার্জনকারীর ওপর বর্তায়। তবে সম্পদটি হারাম উৎস থেকে এসেছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে, তা গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সম্ভব হলে তা পরিহার করাই উত্তম এবং তাকওয়ার পরিচয়।
.
আল্লামা মুহাম্মদ আলীশ আল-মালিকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: واختلف في المال المكتسب من حرام، كربا ومعاملة فاسدة، إذا مات مكتسبه عنه: فهل يحل للوارث؟ وهو المعتمد، أم لا؟ وأما عين الحرام المعلوم مستحقه، كالمسروق والمغصوب: فلا يحل له “হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদ—যেমন সুদের মাধ্যমে কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ—উপার্জনকারী ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর সেই সম্পদ তার উত্তরাধিকারীর জন্য গ্রহণ করা বৈধ কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মত হলো, উত্তরাধিকারীর জন্য তা গ্রহণ করা বৈধ।তবে হারাম সম্পদটির প্রকৃত মালিক পরিচিত থাকলে,যেমন চুরি করা বা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা সম্পদ, তা উত্তরাধিকারীর জন্য বৈধ নয়।”(সূত্র: মিনহুল জলীল শারহু মুখতাসার খলীল: ২/৪১৬)
.
​ইমাম ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) সুদখোর ব্যক্তির সম্পদ সম্পর্কে বলেন: أما بالنسبة لأولاده فلا حرج عليهم أن يأكلوا منه في حياة أبيهم ويجيبوا دعوته؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أجاب دعوة اليهود مع أنهم يأكلون الربا. وأما إذا ورثوه من بعده فهو لهم حلال؛ لأنهم ورثوه بطريقة شرعية، وإن كان هو حراماً عليه، لكن هم كسبوه بطريق شرعي بالإرث، وإن تبرعوا وتصدقوا به عن أبيهم فلعل الله سبحانه وتعالى أن يجعل هذه الصدقة تمحو ما قبلها من السيئات “সন্তানদের ক্ষেত্রে তাদের পিতার জীবদ্দশায় তা থেকে খাওয়া এবং তার দাওয়াত রক্ষা করায় কোনো অসুবিধা নেই; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের দাওয়াত কবুল করেছিলেন, অথচ তারা সুদ ভক্ষণ করতো। আর যদি তারা তার মৃত্যুর পর তা উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, তবে তা তাদের জন্য হালাল; কারণ তারা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার সূত্রে তা অর্জন করেছে, যদিও তা তার জন্য হারাম ছিল। তবে তারা তা বৈধ উপায়ে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে অর্জন করেছে। তারা যদি তা দান-সদকা করে দেয় এবং তাদের পিতার পক্ষ থেকে সদকা করে, তবে আশা করা যায় মহান আল্লাহ তাআলা এই সদকার মাধ্যমে তার পূর্বের পাপগুলো মুছে দেবেন।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৮১/১৯)
.
​তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: قال بعض العلماء: ما كان محرما لكسبه، فإنما إثمه على الكاسب لا على من أخذه بطريق مباح من الكاسب، بخلاف ما كان محرما لعينه، كالخمر والمغصوب ونحوهما، وهذا القول وجيه قوي، بدليل أن الرسول صلى الله عليه وسلم اشتري من يهودي طعاما لأهله، وأكل من الشاة التي أهدتها له اليهودية بخيبر، وأجاب دعوة اليهودي، ومن المعلوم أن اليهود معظمهم يأخذون الربا ويأكلون السحت، وربما يقوي هذا القول قوله صلى الله عليه وسلم في اللحم الذي تصدق به على بريرة: (هو لها صدقة ولنا منها هدية)”কিছু আলেম বলেছেন: “যে সম্পদ উপার্জনের পদ্ধতির দিক থেকে হারাম, তার পাপ কেবল উপার্জনকারীর ওপরই বর্তাবে; আর যে ব্যক্তি সেই উপার্জনকারীর কাছ থেকে বৈধ উপায়ে তা গ্রহণ করবে, তার ওপর কোনো পাপ বর্তাবে না। পক্ষান্তরে, যে বস্তু তার স্বরূপে বা নিজ সত্তার কারণেই হারাম—যেমন মদ, জবরদস্তি দখলকৃত বা আত্মসাৎকৃত সম্পদ এবং এজাতীয় অন্যান্য জিনিস—তার হুকুম আলাদা। এই মতটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিসংগত। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পরিবারের প্রয়োজনের জন্য এক ইহুদির নিকট থেকে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন, খাইবারে এক ইহুদি নারী তাঁকে যে ভেড়ার গোশত হাদিয়া দিয়েছিল তা থেকে খেয়েছিলেন এবং এক ইহুদির দাওয়াতও কবুল করেছিলেন। অথচ এটি সর্বজনবিদিত যে,ইহুদিদের অধিকাংশই সুদখোর ছিল এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করত। সম্ভবত এই মতের সপক্ষে আরও একটি জোরালো প্রমাণ হলো, বারীরা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে সদকা হিসেবে দেওয়া গোশত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন: “এটি তাঁর জন্য সদকা, কিন্তু আমাদের জন্য তা হাদিয়া (উপহার)।”(ইবনু উসাইমীন;উসাইমীন আল-ক্বাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: ৩/১১২)
.
পরিশেষে বলা যায়, সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান নির্ভর করে অর্থের প্রকৃতি, তার মালিকানা এবং উপার্জনের পদ্ধতির ওপর। কারও সম্পদে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের উপার্জন মিশ্রিত থাকলে, তার কাছ থেকে শরিয়তসম্মত কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ। এমনকি কোনো অর্থ হারাম পদ্ধতিতে উপার্জিত হলেও, তা যদি চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলকৃত সম্পদ না হয়, তাহলে অন্য ব্যক্তি বৈধ উপায়ে তা গ্রহণ করলে তার জন্য সেই অর্থ ব্যবহার করা জায়েজ হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট অর্থটি অন্যের অধিকারভুক্ত বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে তা গ্রহণ করা বৈধ নয়; বরং যথাসম্ভব প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সুতরাং,এ বিষয়ে ঢালাওভাবে সব ধরনের লেনদেনকে হারাম বলা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি সম্পদের উৎস ও প্রকৃতি বিবেচনা না করে সব ধরনের অর্থ গ্রহণকেও বৈধ বলা সঠিক নয়। একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো, শরিয়তের বিধান যথাযথভাবে জেনে হালাল উপার্জন গ্রহণ করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কবরস্থানের আগাছা পরিষ্কার ও ঘাসনাশক রাসায়নিক ব্যবহারের বিধান

 প্রশ্ন: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের একটি কবরস্থানে প্রচুর লতাপাতা ও বড় ঘাস জন্মেছে। এতে কবর খনন ও দাফনে অসুবিধা হচ্ছে। দাফনের সুবিধার জন্য ঘাস মরা বিষ ব্যবহার করা কি শরিয়তসম্মত? স্থানীয় কিছু হানাফি আলেম বলছেন, এটি করা যাবে না। দয়া করে সঠিক বিষয়টি জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: কবরস্থানের ঝোঁপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার করা জায়েজ। প্রয়োজন সাপেক্ষে আগাছানাশক বিষ ব্যবহারেও কোনো বাধা নেই। তবে এমন কোনো বিষ ব্যবহার করা যাবে না যা মানুষ, গবাদিপশু কিংবা পানির উৎসের ক্ষতি করতে পারে। হানাফি ফতোয়ায় বলা হয়েছে যে, কবরের সতেজ গাছপালা ও লতাপাতা যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে এবং এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি সান্ত্বনা ও স্বস্তি লাভ করে। তাই বিনা প্রয়োজনে তা কেটে ফেলা মাকরুহে তানজিহি (তাহরিমি নয়)। যেমনটি বলেছেন, মুফতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভি, আল্লামা যফর আহমদ উসমানি প্রমূখ। [মাসিক আল কাউসার]
তবে এই ধারণার সপক্ষে কোরআন বা সহিহ সুন্নাহয় কোনো স্পষ্ট বা নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। এর বিপরীতে জায়েজ হওয়ার পক্ষে যুক্তি নিম্নরূপ:
✪ ১. আগাছা পরিষ্কারে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই:
হাদিসে কবরের ওপর বসা, কবর পাকা করা ও তার ওপর ইমারত নির্মাণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ، وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ، وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ
“রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর পাকা করতে, তার ওপর বসতে এবং তার ওপর ইমারত নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭০]
কিন্তু আগাছা পরিষ্কার করার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। আর কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা না থাকলে মূলনীতি হলো তা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা বাকারা: ২৯]
✪ ২. গাছের তাসবিহ পাঠে কবরবাসী উপকৃত হয়-এর কোনো দলিল নেই:
হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, মৃত ব্যক্তি যেসব আমলে উপকৃত হয়, তার মধ্যে রয়েছে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম ও নেক সন্তানের দোয়া। আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তিনটি আমল ছাড়া তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১]
এ ছাড়া মৃতের পক্ষ থেকে দান-সদকা এবং হজ-উমরাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু কবরের গাছের তাসবিহ দ্বারা কবরবাসীর উপকার হওয়ার কথা কোনো সহিহ দলিলে নেই।
✪ ৩. খেজুরের ডালের হাদিসের ওপর কিয়াস করা যাবে না:
হানাফি আলেমদের মূল দলিল হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি কবরে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন:
يُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، بَلَى، كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
“এই দুজনকে আজাব দেওয়া হচ্ছে। তাদের আজাব কোনো বড় বিষয়ে হচ্ছে না। হ্যাঁ, একজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক থাকত না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত।”
এরপর তিনি একটি কাঁচা ডাল নিয়ে দুই ভাগ করলেন এবং প্রতিটি কবরে একটি করে পুঁতে দিলেন। তাঁকে কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন:
لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا
“আশা করা যায়, ডাল দুটি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আজাব হালকা করা হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস ২১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯২]
এই হাদিস থেকে সব কবরের গাছ রেখে দেওয়ার বিধান নেওয়া ঠিক নয়। কারণ:
• অনেক আলেমের মতে এটি ওই দুই ব্যক্তির জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশেষ ঘটনা। আল্লাহ তাঁকে তাদের আজাবের কথা জানিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী তিনি এটি করেছিলেন।
• এটি সাধারণ বিধান হলে তিনি সাহাবিদের এমন করার নির্দেশ দিতেন, নিজেও বাকি কবরগুলোতে তা করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। পরবর্তী যুগে সাহাবির থেকেও এমন কিছু করার প্রমাণ পাওয়া যায় না সাহাবি বুরায়দা আল আসলামি (রা.)-এর একটি ওসিয়ত ছাড়া। কিন্তু বিজ্ঞ আলেমদের মতে, এটা তাঁর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ ছিলো যা আমলযোগ্য নয়। (এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন, কমেন্টে)
✪ ৪. ক্ষয়-ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং শিরক-বিদআতের পথরোধ:
কবরস্থানে জঙ্গল হয়ে গেলে অনেক সময় কবর খনন ও জিয়ারত কঠিন হয়ে যায়। গোরস্থানে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় ও হিংস্র প্রাণী সেখানে বাসা বাঁধতে পারে, যা মানুষের ক্ষতির কারণ হয়। আর ক্ষতি দূর করা শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কবরের গাছকে কেন্দ্র করে অজ্ঞ শ্রেণির মানুষ নানা শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার নিমজ্জিত হতে পারে-যেমনটি বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। সুতরাং কবরের আদব ও সম্মান বজায় রেখে কবরস্থানে গজিয়ে ওঠা গাছ-গাছালি ও আগাছা পরিষ্কার করা জায়েজ। হাত বা যন্ত্র দিয়ে কাটা যেমন বৈধ আধুনিক যুগে ক্যামিক্যাল বা রাসায়নিক ঘাস মারার বিষ ব্যবহার করাও তেমন বৈধ। তবে লক্ষ রাখতে হবে:
• বিষ যেন মানুষ, গবাদিপশু বা পানির উৎসের ক্ষতি না করে।
• কবরের ওপর হাঁটা বা বসার মতো অসম্মানজনক কাজ না হয়।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায: কবরস্থান থেকে ক্ষতিকর গাছপালা কেটে ফেলার বিধান
প্রশ্ন: কবরস্থান থেকে ক্ষতিকর গাছপালা কেটে ফেলা কি জায়েজ?
উত্তর:
يَنْبَغِي قَطْعُهَا لِأَنَّهَا تُؤْذِي الزُّوَّارَ، وَهَكَذَا مَا يُوجَدُ فِيهَا مِنَ الشَّوْكِ يَنْبَغِي إِزَالَتُهُ إِرَاحَةً لِلزُّوَّارِ مِنْ شَرِّهِ، وَلَا يُشْرَعُ لِأَحَدٍ أَنْ يَغْرِسَ عَلَى الْقُبُورِ شَيْئًا مِنَ الشَّجَرِ أَوْ الْجَرِيدِ لِأَنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ لَمْ يَشْرَعْ ذَلِكَ.
وَالنَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا غَرَسَ جَرِيدَتَيْنِ عَلَى قَبْرَيْنِ عَرَفَهُمَا وَأَنَّهُمَا مُعَذَّبَانِ، وَلَمْ يَغْرِسْ عَلَى قُبُورِ الْمَدِينَةِ وَقُبُورِ الْبَقِيعِ، وَهَكَذَا الصَّحَابَةُ لَمْ يَفْعَلُوا ذَلِكَ، فَعُلِمَ أَنَّ ذَلِكَ خَاصٌّ بِصَاحِبَيِ الْقَبْرَيْنِ الْمُعَذَّبَيْنِ، نَسْأَلُ اللَّهَ السَّلَامَةَ
সেগুলো কেটে ফেলা উচিত। কারণ তা কবর জিয়ারতকারীদের কষ্ট দেয়। একইভাবে কবরস্থানে যেসব কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ থাকে, জিয়ারতকারীদের তার ক্ষতি থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য সেগুলোও সরিয়ে ফেলা উচিত।
কবরের ওপর কোনো গাছ বা খেজুরের ডাল লাগানো কারও জন্যই শরিয়তসম্মত নয়। কারণ মহান আল্লাহ তা বিধিবদ্ধ করেননি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল এমন দুটি কবরের ওপর দুটি খেজুরের ডাল পুঁতেছিলেন, যে দুটি কবরের বাসিন্দাদের আজাব হচ্ছে বলে তিনি (ওহির মাধ্যমে) জানতে পেরেছিলেন। অথচ তিনি মদিনার কবরস্থানে বা বাকি কবরস্থানের অন্য কোনো কবরে (কোনো গাছ বা ডাল) লাগাননি। সাহাবিগণও এমন করেননি। সুতরাং বোঝা যায়, এই কাজটি আজাবপ্রাপ্ত ওই দুই কবরের অধিবাসীর সাথেই খাস (নির্দিষ্ট) ছিল। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাই।
[সূত্র: নূরুন আলাদ দারব অনুষ্ঠান, ক্যাসেট নম্বর: ২৬; মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত-শাইখ ইবনে বায, ৪/৩৭২] আল্লাহু আলাম-আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ফেসবুক-ইউটিউবে বেপর্দা নারীদের ভিডিও, বিভিন্ন ফানি গান-বাজনা, রোস্টিং ইত্যাদি কনটেন্টে লাইক, লাভ, হা-হা ইত্যাদি রিঅ্যাক্ট দেওয়া এবং সেগুলো শেয়ারের বিধান

 প্রশ্ন: ফেসবুক বা ইউটিউবে বেপর্দা নারীদের ভিডিও কিংবা অপ্রয়োজনীয় ফানি বা মজার ভিডিওতে লাইক বা “হা-হা” রিঅ্যাক্ট দেওয়ার বিধান কী? এসব ভিডিও শেয়ার করা কি জায়েজ?

উত্তর: ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের প্রতিটি ক্লিক, লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার নিছক বাতাসের সাথে মিশে যায় না। এর প্রতিটির হিসাব আমাদের দাঁড়াতে হবে মহান আল্লাহর দরবারে। স্ক্রিনে কাটিয়ে দেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর সূক্ষ্ম নজরদারিতে আছে এবং লিপিবদ্ধ হচ্ছে। তাই মুমিন হিসেবে এই ভার্চুয়াল ভুবনে আমাদের চলাফেরা হোক আরও অনেক বেশি সচেতন, পরিমিত ও সংযত—এটাই তো প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়।
নিম্নে প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর সংক্ষেপে উত্তর দেওয়া হলো:
❑ ১. বেপর্দা নারীদের ভিডিও দেখা ও তাতে লাইক, লাভ ইত্যাদি রিয়েক্ট দেওয়া
বাস্তব জীবনে বেগানা নারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া এবং বেপর্দা অবস্থায় তাদের দিকে তাকানো যেমন হারাম, তেমনি ডিজিটাল জগতেও তাদের ছবি বা ভিডিও দেখা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
“(হে নবী,) আপনি মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” [সূরা নূর: ৩০]
এ ছাড়া কোনো ভিডিওতে লাইক ব লাইভ ইত্যাদি রিঅ্যাক্ট দেওয়ার অর্থ ওই বিষয়ে সমর্থন ও ভালোলাগা জানানো। আর ফেসবুকের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এটি গুনাহের কনটেন্টের ক্ষেত্রে পাপে সহযোগিতার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা পুণ্য ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
অনুরূপভাবে নাচ, গান, মিউজিক, অশ্লীলতা যুক্ত ভিডিও দেখা, লাইক বা শেয়ার করা গুনাহে সহযোগিতার শামিল। কারণ এতে তাদের ভিউ ও জনপ্রিয়তা বাড়ে, ফলে অবৈধ আয়ের পথও প্রসারিত হয়।
❑ ২. অনর্থক ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করা:
দ্বীন ও দুনিয়ার কোনও উপকার নেই এমন ভিডিও অথবা উদ্দেশ্যহীনভাবে অনর্থক ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করাও একজন মুমিনের শানের পরিপন্থী। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
“অপ্রয়োজনীয় বিষয় ছেড়ে দেওয়া একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭; হাদিসটি হাসান]
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করে বলেন:
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকে।” [সূরা মুমিনূন: ৩]
মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন বান্দার মুক্তি মেলবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার জীবন, যৌবন এবং সম্পদের হিসাব প্রতি মুহূর্তের জন্য নেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
“لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِفِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ”
“কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহর নিকট থেকে এক চুলও নড়বে না। তার জীবনকাল কোন কাজে ব্যয় করেছে, তার যৌবনকাল কোন পথে ক্ষয় করেছে, ধন-সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে এবং তা কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কি আমল করেছে?” [তিরমিজি: ২৪১৬]
❑ ৩. হাসি-তামাশা, কৌতুক বা ফানি ভিডিওতে রিঅ্যাক্ট দেওয়া:
হাসি-তামাশা ও কৌতুক এবং তাতে রিঅ্যাক্ট দেওয়া নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার। সত্য ও বাস্তবসম্মত বিষয়ে হালকা বিনোদন কিংবা মাঝেমধ্যে মুচকি হাসি-মজাক ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন থেকেও তা প্রমাণিত। একবার সাহাবিগণ তাঁকে বললেন, “আপনি তো আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন।” উত্তরে তিনি বললেন:
إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
“আমি তো সত্য ছাড়া কিছু বলি না।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯০; হাদিসটি হাসান]
তবে এসব বিষয়ে অহেতুক বেশি সময় ব্যয় করা মুমিনের মর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে, মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বা বানোয়াট গল্প তৈরি করা কঠিন গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ، وَيْلٌ لَهُ، وَيْلٌ لَهُ
“ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলে এবং তাতে মিথ্যা বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯০; জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৫; হাদিসটি হাসান]
সুতরাং মিথ্যা বা বানোয়াট কৌতুকে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করাও গুনাহের। কারণ এতে কনটেন্ট ক্রিয়েটার উৎসাহিত হয় এবং আরও বেশি পরিমাণে এ জাতীয় ভিডিও বানাতে আগ্রহী হয়। এটি তাকে গুনাহের কাজে সহায়তার শামিল। একইভাবে গুনাহের বিষয়বস্তুতে “হা-হা” রিঅ্যাক্ট দেওয়া মানে সেটিকে পছন্দ ও সমর্থন করা, তাই তা-ও জায়েজ নয়।
❑ ৪. রোস্টিং ভিডিওতে রিঅ্যাক্ট করা:
কাউকে নিয়ে অন্যায়ভাবে রোস্টিং বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা উপহাসমূলক ভিডিও বানানো, সেগুলো দেখা, লাইক বা শেয়ার করাও নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ
“হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।” [সূরা হুজুরাত: ১১]
❑ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ব্যাপারে পরামর্শ:
◆ ফিড পরিচ্ছন্ন রাখুন। সন্দেহজনক বা হারাম কনটেন্টে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার থেকে বিরত থাকুন।
◆ এমন কিছু ফিডে এলে “Not interested” নির্বাচন করুন এবং অস্বস্তিকর পেজ বা চ্যানেল আনফলো অথবা ব্লক করুন।
একজন ইমানদার ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো, সে সন্দেহজনক বিষয়কে এড়িয়ে চলবে এবং নিশ্চিত ও নিরাপদ বিষয় আঁকড়ে ধরবে। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَىٰ مَا لَا يَرِيبُكَ
“যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে এমন বিষয় গ্রহণ করো, যাতে কোনো সন্দেহ নেই।” [জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮; হাদিসটি সহিহ]
সুতরাং গুনাহ থেকে বাঁচতে সব ধরনের হারাম কনটেন্ট বর্জন করুন। এর পরিবর্তে দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে আসে এমন ভিডিওগুলো দেখুন এবং সেগুলো প্রচার-প্রসার করুন। এতে আপনার আমলনামায় সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, ভিডিওর বিষয়বস্তু যদি শরিয়তবিরোধী হয়, যেমন: গান-বাদ্য, অশ্লীলতা, বেপর্দা, কাউকে নিয়ে উপহাস কিংবা মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য, মিথ্যা কৌতুক ইত্যাদি তাহলে সেগুলোতে কোনো ধরনের রিঅ্যাক্ট দেওয়া, সমর্থন জানানো বা শেয়ার করা কিছুতেই জায়েজ নয়। তবে যদি এসব হারামমুক্ত হয় এবং তাতে দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর কিছু থাকে তাহলে সেগুলোতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করা দূষণীয় নয়। বরং তা সওয়াবের কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়াকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন এবং তা আল্লাহর নাফরমানির কাজে ব্যবহার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

গ্রোসারি ও কসমেটিক পণ্যের প্যাকেটে মানুষ বা জীবজন্তুর ছবি থাকলে তা ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান

 প্রশ্ন: বর্তমানে অধিকাংশ গ্রোসারি ও কসমেটিক পণ্যের প্যাকেটে মানুষ, নারী ও প্রাণীর ছবি থাকে। ভেতরের পণ্য হালাল ও প্রয়োজনীয় কিন্তু প্যাকেজিংয়ে ছবি থাকে। এ অবস্থায় দোকানমালিকের জন্য এসব পণ্য বিক্রি করা কি জায়েজ হবে? তিনি কি গুনাহগার হবেন? এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

উত্তর: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পণ্যের ভেতরের মূল উপাদান যদি হালাল, পাক-পবিত্র ও উপকারী হয় তবে প্যাকেটের গায়ে ছবি থাকার কারণে পুরো পণ্যটি হারাম হয়ে যায় না। সুতরাং প্যাকেজিংয়ে মানুষ, নারী বা প্রাণীর ছবি থাকা সত্ত্বেও ওইসব বৈধ ও প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েজ। এতে ক্রেতা, বিক্রেতা বা দোকানের মালিক গুনাহগার হবেন না। সাবান, শ্যাম্পু, তেল বা খাদ্যসামগ্রীর মতো পণ্য নিজে হালাল হলে তার ক্রয়-বিক্রয় উভয়ই জায়েজ যদিও প্যাকেটের গায়ে ছবি থাকে। কারণ ক্রেতা-বিক্রেতার উদ্দেশ্য ভেতরের পণ্য; ছবি এখানে গৌণ ও অনিচ্ছাকৃত বিষয়। এ ছাড়া পণ্য ব্যবহারের পর প্যাকেট ডাস্টবিনে বা আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হয়। তাই এখানে ছবির প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করা হয় না। ফলে এটি বড় কোনো গুনাহের কারণ নয়।যেমনটি হাদিসে ছবিযুক্ত বালিশ ব্যবহারের কথা আছে, যেখানে ছবি পদদলিত বা অবমাননাকর অবস্থায় থাকে।
◈ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) ছবিযুক্ত একটি গদি বা বালিশ কিনলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটি দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন; ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আয়েশা (রা.) তাঁর চেহারায় অপছন্দের ছাপ দেখে বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে তওবা করছি। আমি কী অপরাধ করেছি?” তিনি বললেন: «مَا بَالُ هَذِهِ النُّمْرُقَةِ؟» “এই বালিশের কী ব্যাপার?”
আয়েশা (রা.) বললেন: “আমি এটি আপনার জন্য কিনেছি, যাতে আপনি এতে বসতে পারেন ও হেলান দিতে পারেন।” তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
«إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ»
“এসব ছবির নির্মাতাদের কিয়ামতের দিন আজাব দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, ‘তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও।'”
আরও বললেন:
«إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ الصُّوَرُ لَا تَدْخُلُهُ الْمَلَائِكَةُ»
“যে ঘরে ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।”
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে,
فَأَخَذْتُهُ فَجَعَلْتُهُ مِرْفَقَتَيْنِ، فَكَانَ يَرْتَفِقُ بِهِمَا فِي الْبَيْتِ
“আয়েশা (রা.) সেটি কেটে দুটি ছোট বালিশ বানালেন আর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে সেগুলোতে হেলান দিতেন।” [সহিহ বুখারি (হাদিস ২১০৫) ও সহিহ মুসলিম (হাদিস ২১০৭)]
এ কথা অজানা নয় যে, বিভিন্ন পণ্যের গায়ে বা প্যাকেটে ছবি থাকার বিষয়টি বর্তমানে এ সমস্যা ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং এ থেকে বাঁচার উপায় নেই বললেই চলে। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘উমুমুল বালওয়া’ (এমন সাধারণ সমস্যা, যা থেকে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন) বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শরিয়ত মানুষের সমস্যাকে বিবেচনায় নেয়; অন্যথায় জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে দাঁড়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি।” [সূরা হাজ: ৭৮]
❑ এ অবস্থায় একজন সচেতন মুসলিম ব্যবসায়ী বা ক্রেতার জন্য করণীয়:
◆ ১. বাজারে একই মানের এমন পণ্য পাওয়া গেলে, যার প্যাকেটে কোনো প্রাণীর ছবি নেই সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
◆ ২. কোনো পণ্যের প্যাকেটে অত্যন্ত অশালীন বা আপত্তিকর নারীর ছবি, কিংবা বিধর্মীদের ধর্মীয় প্রতীক (ক্রুশ, দেবদেবীর ছবি ইত্যাদি) থাকল তার ওপর স্টিকার, মার্কারের কালি বা প্রাইস ট্যাগ লাগিয়ে ঢেকে দেওয়া।
◆ ৩. নিষিদ্ধ ছবিকে সম্মান প্রদর্শন করা কিংবা সাজিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকা।
❑ বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া:
✪ ১. শায়খ আল্লাম মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন:
« مَا عَمَّتْ بِهِ الْبَلْوَى الْآنَ ، مِنْ وُجُودِ الصُّوَرِ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مَا نَدَرَ ، فَتُوجَدُ فِي أَوَانِي الْأَكْلِ ، وَفِي الْكَرَاتِينِ الْحَافِظَةِ لِلْأَطْعِمَةِ ، وَفِي الْكُتُبِ ، وَفِي الصُّحُفِ ، فَتُوجَدُ فِي كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ، وَيُوجَدُ أَيْضًا صُوَرٌ مِمَّا يُؤْكَلُ : بَسْكُوتٌ عَلَى صُورَةِ سَمَكٍ ، أَوْ أَرْنَبٍ ؟
نَقُولُ : إِنِ اقْتَنَاهَا الْإِنْسَانُ لِمَا فِيهَا مِنَ الصُّوَرِ ( أَيْ لِأَجْلِ مَا فِيهَا مِنَ الصُّوَرِ ) فَلَا شَكَّ أَنَّهُ مُحَرَّمٌ , أَوْ كَانَ يَشْتَرِي الْمَجَلَّاتِ الَّتِي تُنْشَرُ فِيهَا الصُّوَرُ لِلصُّوَرِ ، فَهَذَا حَرَامٌ ، أَمَّا إِذَا كَانَتْ لِلْعِلْمِ وَالْفَائِدَةِ وَالِاطِّلَاعِ عَلَى الْأَخْبَارِ ، فَهَذِهِ أَرْجُو أَلَّا يَكُونَ بِهَا بَأْسٌ ، نَظَرًا لِلْحَرَجِ وَالْمَشَقَّةِ ، وَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : ﴿ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ﴾ ، فَهَذِهِ الصُّوَرُ لَيْسَتْ مَقْصُودَةً لِلْإِنْسَانِ حَالَ الشِّرَاءِ ، وَلَا تَهُمُّهُ ، كَمَا أَنَّ مَسْأَلَةَ الْأَوَانِي وَالْكَرَاتِينِ الَّتِي فِيهَا أَطْعِمَةٌ وَشِبْهُ ذَلِكَ ، قَدْ يُقَالُ : إِنَّ فِيهَا شَيْئًا مِنَ الِامْتِهَانِ ، فَلَا تَكُونُ مِنَ الْقِسْمِ الْمُحَرَّمِ »
“বর্তমানে এটি এমন এক সর্বব্যাপী সমস্যায় রূপ নিয়েছে যে, হাতেগোনা কিছু জিনিস বাদ দিলে প্রায় সবকিছুতেই ছবি দেখা যায়। খাবারের থালা-বাসন, খাদ্যদ্রব্যের কার্টন বা প্যাকেট, বইখাতা থেকে শুরু করে সংবাদপত্র—সবখানেই ছবি রয়েছে। এমনকি খাওয়ার জিনিসেও ছবি থাকে, যেমন: মাছ কিংবা খরগোশের আকৃতির বিস্কুট। এ বিষয়ে আমাদের কথা হলো: কেউ যদি কেবল ছবির টানে বা ছবি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এসব জিনিস ঘরে এনে রাখেন তবে তা নিঃসন্দেহে হারাম। একইভাবে কেউ যদি কেবল ছবি দেখার নিয়তেই ছবিযুক্ত ম্যাগাজিন কেনেন তবে তাও হারাম। তবে কেনাকাটা যদি জ্ঞান অর্জন, উপকার লাভ কিংবা খবর জানার উদ্দেশ্যে হয় তবে আশা করা যায় এতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এসব থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য। আর মহান আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা বা কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেননি।” [সূরা হজ: ৭৮]
তা ছাড়া এসব জিনিস কেনার সময় ছবিগুলো মানুষের মূল উদ্দেশ্য থাকে না এবং এ নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। একইভাবে ছবিযুক্ত থালা-বাসন ও কার্টনের ক্ষেত্রেও বলা যায় যে, এগুলোর কোনো সম্মান করা হয় না; বরং অবহেলা বা অবমাননাই করা হয়। সুতরাং এগুলো নিষিদ্ধ বা হারামের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” [আশ শারহুল মুমতি ২/২০৩]
✪ ২. আল্লামা শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
بَيْعُ السِّلَعِ الَّتِي فِيهَا تَصَاوِيرُ؛ فَالأَوْلَى أَنْ تَمْتَنِعَ عَنْ تَوْرِيدِ مَا فِيهِ تَصَاوِيرُ إِذَا وَجَدْتَ بَدِيلًا لَيْسَ فِيهِ تَصَاوِيرُ، فَهَذَا أَحْسَنُ. وَإِلَّا فَلَا بَأْسَ بِبَيْعِ الْكَثِيرِ مِنْهَا وَلَوْ كَانَتْ تَحْتَوِي عَلَى صُوَرٍ، لِأَنَّ الصُّوَرَ غَيْرُ مَقْصُودَةٍ؛ الْمَقْصُودُ هُوَ السِّلْعَةُ نَفْسُهَا. وَهَذِهِ الْأَغْلِفَةُ وَالظُّرُوفُ إِذَا اسْتُعْمِلَتِ السِّلْعَةُ فَإِنَّهَا تُهْدَرُ وَلَا قِيمَةَ لَهَا وَتُدَاسُ، إِذْ لَيْسَتْ مَقْصُودَةً بِالْبَيْعِ.
“যেখানে ছবিবিহীন বিকল্প পণ্য পাওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে ছবিযুক্ত পণ্য কেনাবেচা কিংবা আমদানি করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। তবে যদি কোনো বিকল্প না থাকে তাহলে পণ্যটি ছবিযুক্ত হলেও তা বেচাকেনায় কোনো বাধা নেই। কারণ এখানে ছবিগুলো আসল লক্ষ্য নয়; মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্যটি নিজে। পণ্য ব্যবহারের পর তো এর মোড়ক বা প্যাকেট ফেলে দেওয়া হয়, পায়ে মাড়ানো হয় এবং এগুলোর আলাদা কোনো মূল্য থাকে না। তা ছাড়া ক্রেতা তো আর ছবি কেনার জন্য আসেন না।” [উৎস: ইউটিউব চ্যানেল: العلامة الدكتور صالح الفوزان]
মোটকথা, ভেতরের পণ্য হালাল ও প্রয়োজনীয় হলে ছবিযুক্ত প্যাকেটের পণ্য বিক্রি জায়েজ। এতে মালিক গুনাহগার হবেন না। তবে সম্ভব হলে ছবিমুক্ত বিকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আপত্তিকর ছবি ঢেকে রাখা উত্তম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে স্বামীর করণীয়

 প্রশ্ন: একজন স্বামী আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্ত্রী তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, মানসিক কষ্ট দেন, এমনকি নিজের মা-বাবার সামনেও অপমান করেন। এই অবস্থায় স্বামী কি ধৈর্য ধরে সদাচরণ চালিয়ে যাবেন, নাকি অন্য কোনো পদক্ষেপ নেবেন?

উত্তর: একটি প্রশান্তিময় ও সুখসমৃদ্ধ দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। এক পক্ষ তার দায়িত্ব-কতর্ব্য থেকে সরে গেলেই সুখ-শান্তি বিদায় নেয় এবং শুরু হয় নানা সমস্যা। কখনো তা জটিল ও গুরুতর সমস্যার রূপ নেয়। তবে সমস্যা যতই হোক ইসলামে তার সমাধানের জন্য মীমাংসার পথও দেখানো হয়েছে। বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
❑ স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব-কর্তব্য:
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হলো, তার সাথে সঙ্গে সদাচরণ করা।
✪ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْـًٔا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো তবে হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ, যার মধ্যে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” [সুরা নিসা: ১৯]
✪ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” [জামে তিরমিজি: ৩৮৯৫] হাদিসটি সহিহ।
✪ দুনিয়ায় এমন কোনো মানুষ নেই যার কোনো ত্রুটি নেই। তাই স্বামীরও উচিত শুধু স্ত্রীর ভুলত্রুটিগুলো না খুঁজে তার ভালো গুণগুলোর দিকেও নজর দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাবে সে সন্তুষ্ট হবে।” [সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯]
❑ স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব-কর্তব্য:
সংসারটা মূলত দুজনের মিছিলেই সুন্দর হয়। তাই স্বামীর যেমন দায়িত্ব আছে, স্ত্রীর দিক থেকেও রয়েছে বেশ কিছু কর্তব্য। বিশেষ করে, স্বামীর সাথে সুন্দর আচরণ করা, তাকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেওয়া এবং শরিয়তসম্মত বিষয়ে তার আনুগত্য বজায় রাখা একজন স্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
✪ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“নারীদের তেমনই ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের ওপর (পুরুষদের) অধিকার।” [সুরা বাকারা: ২২৮]
✪ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا
“জেনে রাখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার আছে। আর তোমাদের ওপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার আছে।” [জামে তিরমিজি: ১১৬৩, ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন]
✪ সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রীর পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ
“সুতরাং সৎকর্মপরায়ণ নারীরা অনুগত এবং আল্লাহর হেফাজতে স্বামীর অনুপস্থিতিতে (তার অধিকার) রক্ষাকারী।” [সুরা নিসা: ৩৪]
✪ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا، قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ
“নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজান মাসের রোজা রাখে, নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাহলে তাকে বলা হবে, ‘জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।” [মুসনাদে আহমদ: ১৬৬১, আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
❑ স্বামীকে কষ্ট দেওয়া হারাম:
সংসারটা তো আর একটা ছাদের নিচে শুধু থাকা নয়, এটা মন আর শ্রদ্ধার একটা মেলবন্ধন। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়াটা মধুর হয়, সেখানে সম্মান আর আদবটাই সবচেয়ে বড় কথা। স্ত্রীর দায়িত্বের একটা বড় জায়গা জুড়ে থাকে স্বামীর সাথে সম্মানজনক আচরণ করা, সবসময় নম্রতা আর ভদ্রতা বজায় রেখে চলা। এই ছোট ছোট মায়াবী আচরণগুলোই একটা সাধারণ সংসারকে শান্তিময় জান্নাত বানিয়ে তোলে। তার কথাবার্তা ও আচরণ দ্বারা যেন স্বামী কোনওভাবেই কষ্ট না পান সে দিকটি মাথায় রাখা স্ত্রীর জন্য আবশ্যক।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ: لَا تُؤْذِيهِ، قَاتَلَكِ اللَّهُ، فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ، يُوشِكُ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا
“কোনো নারী দুনিয়াতে তার স্বামীকে কষ্ট দিলে জান্নাতে তার স্ত্রী ডাগরচক্ষু হুরদের একজন বলে, ‘তাকে কষ্ট দিয়ো না, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। সে তো তোমার কাছে সাময়িক অতিথি মাত্র, শিগগিরই তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।” [জামে তিরমিজি: ১১৭৪; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০১৪, ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আর আলবানি (রহ.) সহিহ বলেছেন]
❑ স্ত্রী খারাপ আচরণ করলে স্বামীর করণীয়:
স্ত্রী কোনো খারাপ আচরণ করলে তাতে সঙ্গে সঙ্গে রেগে না গিয়ে যথাসম্ভব ধৈর্য ধরে থাকার চেষ্টা করা উচিত। আর মন্দের জবাব সবসময় উত্তম আচরণ দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাই হলো বুদ্ধিমত্তার কাজ, যা পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত করে দেয়।
✪ ১. ধৈর্য ধারণ করা:
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” [সুরা বাকারা: ১৫৩]
✪ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا»
“তোমরা নারীদের সাথে উত্তম আচরণ করার ব্যাপারে আমার উপদেশ গ্রহণ করো। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্যে ওপরের অংশটি সবচেয়ে বেশি বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে। আর যদি যেভাবে আছে সেভাবে ছেড়ে দাও, তবে তা সবসময় বাঁকাই থেকে যাবে। অতএব, তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ মেনে চলো।” [সহিহ বুখারি: ৩৩৩১ এবং সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮]
এই হাদিসে ইসলামে নারীর মর্যাদা এবং তাদের সাথে অত্যন্ত ধৈর্য ও কোমলতার সাথে আচরণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণে তাদের ওপর জোর-জুলুম বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি না করে ভালোবাসা ও সহনশীলতার মাধ্যমে দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
✪ ২. উত্তম আচরণ দ্বারা মন্দ আচরণের জবাব দেওয়া:
মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
“ভালো ও মন্দ সমান নয়। তুমি উত্তম আচরণ দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করো। তখন দেখবে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা ছিল, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।” [সুরা ফুসসিলাত: ৩৪]
❑ সমস্যা বাড়লে পারিবারিক মধ্যস্থতা:
সংসারের চাকা সচল রাখতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি বা মতবিরোধ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে তো আর দূরত্ব বাড়িয়ে চলা সমাধান নয়। সমস্যা যখন বাড়তির দিকে যায় তখন পরিবারের মুরব্বি বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা দরকার। আসল ধৈর্য মানে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া বা মুখ ফিরিয়ে থাকা নয়; বরং ঠাণ্ডা মাথায় তার সঠিক সমাধান খোঁজা। আর যদি নিজেদের চেষ্টায় তা মিটমাট না হয় তবে আল্লাহ তায়ালাই তো মীমাংসার সুন্দর পথ বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
“যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠাও। তারা দুজন মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল করিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” [সুরা নিসা: ৩৫]
❑ শেষ উপায়: সদ্ভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ
এত চেষ্টার পরও যদি কোনোভাবেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হয় তবে ইসলাম বিচ্ছেদেরও সুনির্দিষ্ট সুযোগ বা পথ খোলা রেখেছে। তবে এটা কোনো তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয় বরং একদম শেষ উপায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
“হয় সদ্ভাবে স্ত্রীকে রেখে দেওয়া, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া।” [সুরা বাকারা: ২২৯]
কেননা দাম্পত্য সম্পর্কের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো প্রশান্তি অর্জন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” [সুরা রুম: ২১]
এই প্রশান্তি বিদায় নিলে দাম্পত্য জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। তাই হয় সুন্দরভাবে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাবে নতুবা সুন্দর পন্থায় বিবাহ বিচ্ছেদ করবে। সব মিলিয়ে কথা হলো, স্বামী সবসময় ধৈর্য ধরে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার বজায় রাখবেন। সুযোগ বুঝে ঠাণ্ডা মাথায় স্ত্রীর সাথে খোলামেলা কথা বলবেন এবং সবার সামনে অপমানের বিষয়টি নিয়ে নিজের সীমানাটাও স্পষ্ট করে দেবেন। অন্যদিকে স্ত্রীর দায়িত্বও কম নয়; তারও উচিত স্বামীর সাথে সদাচরণ করা এবং তাকে কষ্ট না দেওয়া। এতকিছুর পরও যদি সমাধান না আসে, তবে দুই পরিবারের বিচক্ষণ ও দ্বীনদার কোনো ব্যক্তি বা যোগ্য আলেমের মধ্যস্থতা নেওয়া যেতে পারে। আর বিচ্ছেদ তো কেবল তখনই ভাবার বিষয় যখন সম্পর্কের উন্নতির সবকটি দরজাই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate