October 31, 2026

কবরস্থানের আগাছা পরিষ্কার ও ঘাসনাশক রাসায়নিক ব্যবহারের বিধান

 প্রশ্ন: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের একটি কবরস্থানে প্রচুর লতাপাতা ও বড় ঘাস জন্মেছে। এতে কবর খনন ও দাফনে অসুবিধা হচ্ছে। দাফনের সুবিধার জন্য ঘাস মরা বিষ ব্যবহার করা কি শরিয়তসম্মত? স্থানীয় কিছু হানাফি আলেম বলছেন, এটি করা যাবে না। দয়া করে সঠিক বিষয়টি জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: কবরস্থানের ঝোঁপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার করা জায়েজ। প্রয়োজন সাপেক্ষে আগাছানাশক বিষ ব্যবহারেও কোনো বাধা নেই। তবে এমন কোনো বিষ ব্যবহার করা যাবে না যা মানুষ, গবাদিপশু কিংবা পানির উৎসের ক্ষতি করতে পারে। হানাফি ফতোয়ায় বলা হয়েছে যে, কবরের সতেজ গাছপালা ও লতাপাতা যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে এবং এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি সান্ত্বনা ও স্বস্তি লাভ করে। তাই বিনা প্রয়োজনে তা কেটে ফেলা মাকরুহে তানজিহি (তাহরিমি নয়)। যেমনটি বলেছেন, মুফতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভি, আল্লামা যফর আহমদ উসমানি প্রমূখ। [মাসিক আল কাউসার]
তবে এই ধারণার সপক্ষে কোরআন বা সহিহ সুন্নাহয় কোনো স্পষ্ট বা নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। এর বিপরীতে জায়েজ হওয়ার পক্ষে যুক্তি নিম্নরূপ:
✪ ১. আগাছা পরিষ্কারে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই:
হাদিসে কবরের ওপর বসা, কবর পাকা করা ও তার ওপর ইমারত নির্মাণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ، وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ، وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ
“রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর পাকা করতে, তার ওপর বসতে এবং তার ওপর ইমারত নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭০]
কিন্তু আগাছা পরিষ্কার করার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। আর কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা না থাকলে মূলনীতি হলো তা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা বাকারা: ২৯]
✪ ২. গাছের তাসবিহ পাঠে কবরবাসী উপকৃত হয়-এর কোনো দলিল নেই:
হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, মৃত ব্যক্তি যেসব আমলে উপকৃত হয়, তার মধ্যে রয়েছে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম ও নেক সন্তানের দোয়া। আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তিনটি আমল ছাড়া তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১]
এ ছাড়া মৃতের পক্ষ থেকে দান-সদকা এবং হজ-উমরাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু কবরের গাছের তাসবিহ দ্বারা কবরবাসীর উপকার হওয়ার কথা কোনো সহিহ দলিলে নেই।
✪ ৩. খেজুরের ডালের হাদিসের ওপর কিয়াস করা যাবে না:
হানাফি আলেমদের মূল দলিল হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি কবরে খেজুরের কাঁচা ডাল পুঁতেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন:
يُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، بَلَى، كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
“এই দুজনকে আজাব দেওয়া হচ্ছে। তাদের আজাব কোনো বড় বিষয়ে হচ্ছে না। হ্যাঁ, একজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক থাকত না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত।”
এরপর তিনি একটি কাঁচা ডাল নিয়ে দুই ভাগ করলেন এবং প্রতিটি কবরে একটি করে পুঁতে দিলেন। তাঁকে কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন:
لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا
“আশা করা যায়, ডাল দুটি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আজাব হালকা করা হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস ২১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯২]
এই হাদিস থেকে সব কবরের গাছ রেখে দেওয়ার বিধান নেওয়া ঠিক নয়। কারণ:
• অনেক আলেমের মতে এটি ওই দুই ব্যক্তির জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশেষ ঘটনা। আল্লাহ তাঁকে তাদের আজাবের কথা জানিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী তিনি এটি করেছিলেন।
• এটি সাধারণ বিধান হলে তিনি সাহাবিদের এমন করার নির্দেশ দিতেন, নিজেও বাকি কবরগুলোতে তা করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। পরবর্তী যুগে সাহাবির থেকেও এমন কিছু করার প্রমাণ পাওয়া যায় না সাহাবি বুরায়দা আল আসলামি (রা.)-এর একটি ওসিয়ত ছাড়া। কিন্তু বিজ্ঞ আলেমদের মতে, এটা তাঁর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ ছিলো যা আমলযোগ্য নয়। (এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন, কমেন্টে)
✪ ৪. ক্ষয়-ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং শিরক-বিদআতের পথরোধ:
কবরস্থানে জঙ্গল হয়ে গেলে অনেক সময় কবর খনন ও জিয়ারত কঠিন হয়ে যায়। গোরস্থানে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় ও হিংস্র প্রাণী সেখানে বাসা বাঁধতে পারে, যা মানুষের ক্ষতির কারণ হয়। আর ক্ষতি দূর করা শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কবরের গাছকে কেন্দ্র করে অজ্ঞ শ্রেণির মানুষ নানা শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার নিমজ্জিত হতে পারে-যেমনটি বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। সুতরাং কবরের আদব ও সম্মান বজায় রেখে কবরস্থানে গজিয়ে ওঠা গাছ-গাছালি ও আগাছা পরিষ্কার করা জায়েজ। হাত বা যন্ত্র দিয়ে কাটা যেমন বৈধ আধুনিক যুগে ক্যামিক্যাল বা রাসায়নিক ঘাস মারার বিষ ব্যবহার করাও তেমন বৈধ। তবে লক্ষ রাখতে হবে:
• বিষ যেন মানুষ, গবাদিপশু বা পানির উৎসের ক্ষতি না করে।
• কবরের ওপর হাঁটা বা বসার মতো অসম্মানজনক কাজ না হয়।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায: কবরস্থান থেকে ক্ষতিকর গাছপালা কেটে ফেলার বিধান
প্রশ্ন: কবরস্থান থেকে ক্ষতিকর গাছপালা কেটে ফেলা কি জায়েজ?
উত্তর:
يَنْبَغِي قَطْعُهَا لِأَنَّهَا تُؤْذِي الزُّوَّارَ، وَهَكَذَا مَا يُوجَدُ فِيهَا مِنَ الشَّوْكِ يَنْبَغِي إِزَالَتُهُ إِرَاحَةً لِلزُّوَّارِ مِنْ شَرِّهِ، وَلَا يُشْرَعُ لِأَحَدٍ أَنْ يَغْرِسَ عَلَى الْقُبُورِ شَيْئًا مِنَ الشَّجَرِ أَوْ الْجَرِيدِ لِأَنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ لَمْ يَشْرَعْ ذَلِكَ.
وَالنَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا غَرَسَ جَرِيدَتَيْنِ عَلَى قَبْرَيْنِ عَرَفَهُمَا وَأَنَّهُمَا مُعَذَّبَانِ، وَلَمْ يَغْرِسْ عَلَى قُبُورِ الْمَدِينَةِ وَقُبُورِ الْبَقِيعِ، وَهَكَذَا الصَّحَابَةُ لَمْ يَفْعَلُوا ذَلِكَ، فَعُلِمَ أَنَّ ذَلِكَ خَاصٌّ بِصَاحِبَيِ الْقَبْرَيْنِ الْمُعَذَّبَيْنِ، نَسْأَلُ اللَّهَ السَّلَامَةَ
সেগুলো কেটে ফেলা উচিত। কারণ তা কবর জিয়ারতকারীদের কষ্ট দেয়। একইভাবে কবরস্থানে যেসব কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদ থাকে, জিয়ারতকারীদের তার ক্ষতি থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য সেগুলোও সরিয়ে ফেলা উচিত।
কবরের ওপর কোনো গাছ বা খেজুরের ডাল লাগানো কারও জন্যই শরিয়তসম্মত নয়। কারণ মহান আল্লাহ তা বিধিবদ্ধ করেননি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল এমন দুটি কবরের ওপর দুটি খেজুরের ডাল পুঁতেছিলেন, যে দুটি কবরের বাসিন্দাদের আজাব হচ্ছে বলে তিনি (ওহির মাধ্যমে) জানতে পেরেছিলেন। অথচ তিনি মদিনার কবরস্থানে বা বাকি কবরস্থানের অন্য কোনো কবরে (কোনো গাছ বা ডাল) লাগাননি। সাহাবিগণও এমন করেননি। সুতরাং বোঝা যায়, এই কাজটি আজাবপ্রাপ্ত ওই দুই কবরের অধিবাসীর সাথেই খাস (নির্দিষ্ট) ছিল। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাই।
[সূত্র: নূরুন আলাদ দারব অনুষ্ঠান, ক্যাসেট নম্বর: ২৬; মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত-শাইখ ইবনে বায, ৪/৩৭২] আল্লাহু আলাম-আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate