প্রশ্ন: মানুষ আজকাল বিবাহ, সন্তান জন্মসহ ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে—এ ধরনের কাজ শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু সঠিক?
▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ব্যক্তিগত জীবন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যেমন বিবাহ, চাকরি, সন্তান জন্ম—সহ নানা ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় কোনো প্রয়োজন ছাড়াই সহজে প্রকাশ করা হচ্ছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনর্থক বা অপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি মুমিনের ধর্মীয় কর্তব্যও বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা প্রায়ই এসব নৈতিক নির্দেশনার প্রতি উদাসীন হয়ে যাই এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়গুলো অযথা প্রকাশ করে গোপনীয়তা ও পারিবারিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করি।
.
হে আমার ভাই ও প্রিয় বোন! আপনি হয়তো উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, বিবাহিত হয়েছেন, সন্তান লাভ করেছেন, মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পেয়েছেন, কিংবা হজ্জ বা উমরাহ পালন করেছেন। এসব সুখবর সত্যিই আনন্দের,—কিন্তু এইসব সুখবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা কি সত্যিই প্রয়োজন? এসব নেয়ামত অর্জনের জন্য কি আমরা গোপনে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারিনা? আপনার স্মরণ রাখা উচিত যে,প্রত্যেক আনন্দের মুহূর্ত ব্যক্তিগত আনন্দের অংশ হলেও তা জনসম্মুখে প্রকাশের ফলে অনেক সময় অহংকার, হিংসা,বদ নযর বা নিজের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মগৌরব জন্ম নিতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করেছেন যে, বিনয়ী থাকা এবং গোপনীয়তা রক্ষা একজন মু’মিনের বড় গুণ। কখনো কখনো নিজের সুখের মুহূর্তগুলো ব্যক্তিগত রাখা বেশি সম্মানজনক,যা পারিবারিক মর্যাদা ও (গাইরত) আত্মমর্যাদাকে রক্ষা করে।সুতরাং সাধারণভাবে প্রয়োজন, উপকারিতা কিংবা শরীয়তসম্মত কোনো লক্ষ্য ব্যতীত ব্যক্তিগত বিষয়াদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ এতে সময়ের অপচয় ঘটে, অযথা মানুষের কৌতূহল উসকে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়—যা একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করা কল্যাণকর ও যৌক্তিক হতে পারে। যেমন—কেউ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ চাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমস্যার সমাধানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সহায়তা কামনা করা, বিশ্বস্ত চিকিৎসক বা আইনগত সহযোগিতা খোঁজা, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তি বা জরুরি তথ্য উদ্ধারে মানুষের সহযোগিতা আহ্বান করা, প্রতারণা, নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা, কিংবা এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যা অন্যদের জন্য শিক্ষা ও উপকার বয়ে আনে।
এসব ক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্য কল্যাণমূলক হয়, ভাষা ও উপস্থাপনা শালীন থাকে এবং শরীয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করা হয়—তবে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অন্যথায়, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ থেকে বিরত থাকাই একজন বিবেকবান, সংযত ও পরহেযগার মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। অতএব যা প্রচার করার মধ্যে দ্বীনি বা দুনিয়াবী কোনো কল্যাণ নেই, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ না করাই তাকওয়ার পরিচয়। মুমিনের প্রত্যেক মুহূর্তই মূল্যবান। সে বিনা কাজে সময় নষ্ট করে না এবং বেহুদা কর্মকাণ্ডে নিমগ্ন থাকে না।
.
মহান আল্লাহ তাআলা সূরা মুমিনুনে ঈমানদার বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:وَٱلَّذِينَ هُمْ عَنِ ٱللَّغْوِ مُعْرِضُونَ“আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিরত থাকে।”(সূরা মুমিনুন:৩) উক্ত আয়াতে لغو শব্দের অর্থ হলো “অসার” বা “অনর্থক”। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন প্রতিটি কথা বা কাজ যা প্রয়োজনহীন, অর্থহীন এবং যার কোনো বাস্তব ফল বা কল্যাণ নেই। এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে শির্ক, পাপ, অশ্লীলতা, অনুচিত গান-বাজনা, আবর্জনা কথাবার্তা বা সময় নষ্ট করার অন্যান্য কর্মকাণ্ড। মোটকথা হলো—যেসব কথা বা কাজ থেকে কোনো সত্যিকারের লাভ নেই, যা ফলপ্রসূ নয়, প্রয়োজনহীন এবং যার উদ্দেশ্যও কল্যাণকর নয়, সেগুলোই ‘বাজে’ বা অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য হয়। একজন মুসলিমের জন্য এগুলো থেকে বিরত থাকা আবশ্যক, কারণ এই ধরনের কর্মকাণ্ডে কোনো দ্বীনি কল্যাণ নেই; বরং এতে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি।উক্ত আয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা ও তাফসিরের জন্য ইবনে কাসীরের তাফসীর এবং তাফসীরে কুরতাবী দেখতে পারেন। এছাড়াও হাদিসে রাসূলুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ ”” “মানুষ যখন অনর্থক বিষয়াদি ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্য মণ্ডিত হতে পারে।”(সুনানে তিরমিযী হা/২৩১৭; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সহীহ বলেছেন)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,
إِضَاعَة الْوَقْت أَشد من الْمَوْت لِأَن إِضَاعَة الْوَقْت تقطعك عَن الله وَالدَّار الْآخِرَة وَالْمَوْت يقطعك عَن الدُّنْيَا وَأَهْلهَا- الدُّنْيَا من أَولها إِلَى آخرهَا لَا تُسَاوِي غم سَاعَة فَكيف بغم الْعُمر
“সময়ের অপচয় মৃত্যু চেয়েও অধিক গুরুতর। কারণ সময়ের অপচয় আপনাকে আল্লাহ এবং পরকাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়,পক্ষান্তরে মৃত্যু আপনাকে কেবল দুনিয়া ও তার অধিবাসীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে।দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়টুকু তো এক মুহূর্তের দুশ্চিন্তারও যোগ্য নয়; তাহলে পুরো জীবন (সময় অপচয় করে) দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে দেওয়া কতটা ভয়াবহ বা কঠিন হতে পারে!।(ইবনু ক্বাইয়িম,আল-ফাওয়ায়েদ,পৃষ্ঠা:৩১)
.
বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বাদর (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৩ হি./১৯৩৪ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:প্রশ্ন: হে সম্মানিত শাইখ, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমার একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে; আমি কি এই সংবাদটি ইন্টারনেট বা ফেসবুকে প্রকাশ করতে পারি, যাতে মানুষ তার জন্য দোয়া করে?
উত্তরে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন:
لا أبدا لا تفعل أدع له أنت ويدعوا له أهله ولا تشغل نفسك بهذه الأمور.كل من يولد له مولود يروح يحطه في الشبكة.
“না, কখনোই না—এমনটা করবেন না। আপনি নিজে তার জন্য দোয়া করুন, আর তার পরিবারের লোকজনও তার জন্য দোয়া করুক। এসব বিষয়ে নিজেকে ব্যস্ত করবেন না। আজকাল যারই সন্তান জন্মায়, সে গিয়ে সেটার খবর (বা ছবি) সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে।”(সূত্র: শরহে সহিহ মুসলিম, ‘মসজিদ নির্মাণের ফজিলত ও উৎসাহ প্রদান’ অধ্যায়। (তারিখ: ১৭/৬/১৪৩৫ হিজরি)
.
সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিজাহুল্লাহ)-কে ব্যক্তিগত বিষয়াদি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে
জবাবে তিনি বলেন:
لا ينبغي للإنسان أن ينشر أموره الخاصة على وسائل التواصل العامة إلا إذا كان ذلك لحاجة أو مصلحة، كما لو عانى من مشكلة أو مرض فالتمس نصيحة الناس وإفادته من تجاربهم، أو أن يدلوه على من يعينه من طبيب أو غيره.
“মানুষের জন্য উচিত নয় যে, সে তার ব্যক্তিগত বিষয়সমূহ সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করবে—তবে যদি সেখানে কোনো প্রয়োজন বা শরয়ি উপকার থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। যেমন কেউ যদি কোনো সমস্যা বা অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়, তখন সে মানুষের কাছে পরামর্শ চাইতে পারে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে পারে, অথবা তারা তাকে কোনো চিকিৎসক বা অন্য কোনো সহায়তাকারীর দিকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে।”…।(সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব ফাতওয়া নং-৩৮৩৯১৪)
.
পরিশেষে আমরা দু‘আ করি—হে পরম করুণাময় রব! আমাদের অন্তর ও সময়কে সকল অনর্থক কথা ও নিরর্থক কর্মের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দিন। আমাদের জীবনকে করুন কল্যাণময়, ফলপ্রসূ ও আপনার সন্তুষ্টিময় ইবাদতে পরিপূর্ণ। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে আপনার স্মরণে জীবন্ত রাখুন এবং আমাদেরকে অপচয় ও গাফেলতি থেকে হেফাজত করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
No comments:
Post a Comment