Monday, April 13, 2026

ইসলামে মুতা বা সাময়িক বিবাহের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ

 ইসলামি শরিয়তে মুতা বিবাহ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ বিয়ে সম্পূর্ণ হারাম এবং নিষিদ্ধ। এটি মূলত ব্যভিচারেরই একটি নামান্তর, যাকে একদল পথভ্রষ্ট মানুষ ধর্মের আবরণে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনের বিধান অনুযায়ী বিবাহ হলো একটি স্থায়ী বন্ধন, যা পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও পবিত্রতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীতে বিদায় হজের সময় স্পষ্টভাবে মুতা বিবাহ কিয়ামত পর্যন্ত হারাম ঘোষণা করেছেন। সহিহ মুসলিমের ১৪০৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

{اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ كُنْتُ أَذِنْتُ لَكُمْ فِي الِاسْتِمْتَاعِ مِنَ النِّسَاءِ، وَإِنَّ اللهَ قَدْ حَرَّمَ ذَلِكَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ}
“হে লোকসকল, আমি তোমাদের ইতিপূর্বে নারীদের সাথে মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ এখন তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন।”
এছাড়া মুসলিম জাহানের ৪র্থ খলিফা আলি (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে,
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ، وَعَنْ أَكْلِ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারের যুদ্ধের দিন মুতা বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।” [সহিহ বুখারি: ৪২১৬]
এই বিষয়ে তৎকালীন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি বিদায় হজের ভাষণে মুতা বিবাহ হারাম করেছিলেন?
জবাবে তিনি বলেন,
نعم حرم نكاح المتعة في حجة الوداع -عليه الصلاة والسلام- قال: إني كنت أذنت في الاستمتاع من النساء، وإن الله قد حرم ذلك إلى يوم القيامة، فالمتعة محرمة، إذ قال بعض أهل العلم: إنه حرمها مرتين في حجة الوداع، وفي عام الفتح، ولكن في هذا نظر، وبكل حال فهي أصبحت محرمة منسوخة، سواء كانت محرمة مرتين، أو مرة واحدة، فهي أصبحت محرمة وممنوعة، ولا يحل نكاح المتعة، بل لابد أن يكون النكاح عن رغبة، لا عن متعة عند أهل السنة والجماعة بإجماع أهل السنة والجماعة.
“হ্যাঁ, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজের সময় মুতা বিবাহ হারাম করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে আল্লাহ এটি কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। কিছু আলেম বলেন যে, এটি দুইবার হারাম করা হয়েছে—একবার বিদায় হজের সময় এবং একবার মক্কা বিজয়ের বছর। তবে মূল কথা হলো, এটি বর্তমানে সর্বসম্মতভাবে হারাম এবং মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ঐক্যমত্য বা ইজমা অনুযায়ী মুতা বিবাহ আর বৈধ নয়। বিবাহ অবশ্যই স্থায়ী হতে হবে এবং সুস্থ পারিবারিক আকাঙ্ক্ষা থেকে হতে হবে; কেবল সাময়িক জৈবিক তৃপ্তির জন্য নয়।”
কুরআন আয়াত দ্বারা শিয়া-রাফেজিদের ধোঁকাবাজি:
মুতা বিবাহের প্রবক্তা শিয়া-রাফেজিরা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য প্রায়ই সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের একটি অংশকে ভুলভাবে পেশ করে দলিল দেওয়ার চেষ্টা করেন। আয়াতে বলা হয়েছে:
{فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً}
“অতঃপর তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর প্রদান করো।” [সুরা নিসা, আয়াত: ২৪]
তবে এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো, এখানে মূলত স্থায়ী বিবাহের কথা বলা হয়েছে। বিবাহের পর স্বামী যখন স্ত্রীর সাথে সহবাস বা ইস্তিমতা সম্পন্ন করে তখন তার ওপর পূর্ণ মোহর আদায় করা ফরজ হয়ে যায়—এখানে সেই মোহর পরিশোধের গুরুত্বই দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া মুতা বিবাহে কোনো উত্তরাধিকার বা তালাকের বিধান নেই। অথচ কুরআনের অন্য আয়াতগুলোতে উত্তরাধিকার এবং তালাকের বিস্তারিত নিয়ম বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে বিবাহ একটি স্থায়ী বন্ধন।
নাসিখ ও মানসুখ (রহিতকরণ):
ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধের ময়দানে দীর্ঘকাল অবস্থানকালীন বিশেষ প্রয়োজনে সাময়িকভাবে মুতা বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর নির্দেশে এটি কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য হারাম ঘোষণা করেন। কুরআনের সূরা মুমিনুনের ৫-৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের কেবল নিজ স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের সাথে সম্পর্ক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যা মুতা বিবাহের সেই পূর্ববর্তী বিধানকে রহিত (মানসুখ) করে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, মুতা বিবাহ কেবল একটি অনৈতিক কাজই নয় বরং এটি জেনার মতো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআনের সংজ্ঞায় বিবাহের উদ্দেশ্য হলো ‘মুহসিনিন’ বা পবিত্রতা অর্জনকারী হওয়া, ‘মুসাফিহিন’ বা কেবল কামুক হওয়া নয়। যেহেতু মুতা বিবাহে পরিবার গঠন বা সন্তান লালন-পালনের কোনো স্থায়ী উদ্দেশ্য থাকে না তাই এটি কুরআনের বিবাহের সংজ্ঞার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং কিয়ামত পর্যন্ত চিরতরে নিষিদ্ধ। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate