প্রশ্ন: তাকিয়াহ কী এবং তা কি আহলে সুন্নাত ব্যবহার করে?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্র জন্য। আমাদের নবী, সর্বশেষ নবী, রাসূলদের সর্দার মুহাম্মদ এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরাম সকলের প্রতি আল্লাহ্র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর তাকিয়াহ (التقية) হচ্ছে মানুষের মনের বিপরীত অভিমত প্রকাশ করা। অর্থাৎ ভিতর এক রকম, আর বাহির অন্য রকম। আর পথভ্রষ্ট শিয়া মতবাদে এটি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে, প্রয়োজনবোধে মিথ্যা বলা ও কপটতাকেও বৈধ ধরা হয় যা তাদের নিজস্ব গ্রন্থ উসূলুল কাফী-এর বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, যেখানে তাকিয়াহকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এমনকি ঈমানের শর্ত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-আল-কুলাইনী বর্ণনা করেন: “ইবনু ‘উমাইর আল-আ‘জামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আবূ আবদিল্লাহ আ. বলেন: হে আবূ ওমর! নিশ্চয় দীনের দশ ভাগের নয় ভাগ ‘তাকিয়াহ’ (التقية)-র মধ্যে; যার ‘তাকিয়াহ’ নেই, তার ধর্ম নেই। আর মদ ও মোজার উপর মাসেহ ব্যতীত সকল বস্তুর মধ্যে ‘তাকিয়াহ’ আছে।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮২) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: “আবূ জাফর আ. বলেন: ‘তাকিয়াহ’ আমার এবং আমার বাপ-দাদাদের ধর্ম। যার ‘তাকীয়া’ নেই, তার ঈমান নেই।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮৪) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: “আবূ আবদিল্লাহ আ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে ভয় কর এবং তাকে ‘তাকিয়াহ’ দ্বারা ঢেকে রাখ। কারণ, যার ‘তাকিয়াহ’ নেই, তার ঈমান নেই।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮৩) আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন: আবূ আবদিল্লাহ আ. থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَلَا تَسۡتَوِي ٱلۡحَسَنَةُ وَلَا ٱلسَّيِّئَةُ) (ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না)-প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ভাল (ٱلۡحَسَنَةُ) হচ্ছে ‘তাকিয়াহ’ (التقية) বা গোপন করা এবং মন্দ (ٱلسَّيِّئَةُ) হচ্ছে প্রচার করা। আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ ٱدۡفَعۡ بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ ﴾ (মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা)- প্রসঙ্গে তিনি বলেন: উৎকৃষ্ট হল ‘তাকীয়া’ (التقية)।”(উসুলুল কাফী; পৃষ্ঠা: ৪৮২) সারকথা হলো, রাফেযি শিয়াদের চিন্তাধারায় ‘তাকিয়াহ’ কেবলমাত্র বিশেষ ও সীমিত পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কোনো সাময়িক ছাড় নয়; বরং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণ ব্যবস্থার মধ্যে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায় স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়েছে, যা তাদের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এ কারণে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা ও মানহাজ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এই বিশ্বাসের ফলস্বরূপ তাদের অনেক অনুসারীর মধ্যে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায় যে, তারা বাহ্যিকভাবে ভিন্ন আচরণ প্রকাশ করে এবং অন্তরের প্রকৃত বিশ্বাসকে গোপন রাখে—যাকে তারা ‘তাকিয়াহ’ নীতিরই অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। অথচ এই ভ্রান্ত আকীদা ও ধারণা আহলুস সুন্নাহর আকীদার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অসংগত ও পরিপন্থী।তাদের কিছু বর্ণনা ও ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমনকি প্রথম তিন শতাব্দীর সময়কালকেও ‘তাকিয়াহ’র যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়,যেমন তাদের শাইখ আল-মুফিদ-এর বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে। তাদের গ্রন্থসমূহে ‘ইমাম’দের নামে এই মতবাদকে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যায়।এ কারণেই তাদের কিছু চরমপন্থী ব্যাখ্যায় এমন ধারণাও পাওয়া যায় যে, পথভ্রষ্ট শিয়ারা আহলে সুন্নাহর অনুসারীদেরকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের চেয়েও বড় কাফের মনে করে, কারণ তাদের মতে, যে ব্যক্তি বারো ইমামের ইমামত অস্বীকার করে, সে এমনকি নবুয়ত অস্বীকারকারীর চেয়েও বড় কাফের (নাউজুবিল্লাহ)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
الرَّافِضَة أَجْهَلُ الطَّوَائِفِ وَأَكْذَبُهَا وَأَبْعَدُهَا عَنْ مَعْرِفَةِ الْمَنْقُولِ وَالْمَعْقُولِ وَهُمْ يَجْعَلُونَ التَّقِيَّةَ مِنْ أُصُولِ دِينِهِمْ ، وَيَكْذِبُونَ عَلَى أَهْلِ الْبَيْتِ كَذِبًا لَا يُحْصِيهِ إلَّا اللَّهُ ، حَتَّى يَرْوُوا عَنْ جَعْفَرٍ الصَّادِقِ أَنَّهُ قَالَ : التَّقِيَّةُ دِينِي وَدِينُ آبَائِي ، و ” التَّقِيَّةُ ” هِيَ شِعَارُ النِّفَاقِ ؛ فَإِنَّ حَقِيقَتَهَا عِنْدَهُمْ أَنْ يَقُولُوا بِأَلْسِنَتِهِمْ مَا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَهَذَا حَقِيقَةُ النِّفَاقِ
“রাফেযিরা (শিয়াদের একটি চরমপন্থী দল) সমস্ত দল-উপদলের মধ্যে সবচেয়ে অজ্ঞ, সবচেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান—উভয় ক্ষেত্র থেকেই সবচেয়ে দূরে অবস্থানকারী। তারা ‘তাকিয়াহ’কে তাদের দ্বীনের মৌলিক নীতি বানিয়েছে। তারা আহলে বাইতের নামে এত অধিক মিথ্যাচার করে যে, তার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ গণনা করতে পারবে না। এমনকি তারা জাফর আস-সাদিক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নামে বর্ণনা করে যে, তিনি নাকি বলেছেন:”তাকিয়াহ আমার দ্বীন এবং আমার পূর্বপুরুষদের দ্বীন।”অথচ ‘তাকিয়াহ’ তাদের নিকট নিফাকের প্রতীক; কারণ এর প্রকৃত অর্থ হলো—মুখে এমন কিছু বলা, যা অন্তরে নেই। আর এটিই নিফাকের প্রকৃত রূপ।(মাজমূ‘ ফাতাওয়া; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৬৩)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:
وأما الرافضة فأصل بدعتهم عن زندقة وإلحاد وتعمد الكذب كثير فيهم ، وهم يقرون بذلك حيث يقولون : ديننا التقية ، وهو أن يقول أحدهم بلسانه خلاف ما في قلبه وهذا هو الكذب والنفاق ، ويدعون مع هذا أنهم هم المؤمنون دون غيرهم من أهل الملة ، ويصفون السابقين الأولين بالردة والنفاق ! فهم في ذلك كما قيل : رمتني بدائها وانسلّت ، إذ ليس في المظهرين للإسلام أقرب إلى النفاق والردة منهم ، ولا يوجد المرتدون والمنافقون في طائفة أكثر مما يوجد فيهم
“রাফেযিদের বিদআতের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে যিন্দিকতা (ধর্মদ্রোহিতা) ও নাস্তিকতার ওপর। তাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার অত্যন্ত বেশি।তারা নিজেরাই তা স্বীকার করে, যখন বলে: ‘আমাদের দ্বীন হলো তাকিয়াহ।’ এর অর্থ হলো—তাদের কেউ নিজের অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত কথা মুখে প্রকাশ করে; যা মূলত মিথ্যা ও নিফাক ছাড়া কিছুই নয়। এরপরও তারা দাবি করে যে, এই উম্মতের মধ্যে তারাই একমাত্র মুমিন! অথচ তারা অগ্রগামী ঈমানদারদের (বিশেষত সাহাবায়ে কেরামকে) মুরতাদ ও মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করে। তাদের অবস্থা সেই প্রবাদের মতো—‘নিজে দোষী হয়েও অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজে সরে যাওয়া।’ কারণ, ইসলাম প্রকাশকারীদের মধ্যে তাদের চেয়ে নিফাক ও ধর্মত্যাগের নিকটবর্তী আর কেউ নেই। বরং তাদের দলেই সবচেয়ে বেশি মুরতাদ ও মুনাফিক পাওয়া যায়—যা অন্য কোনো দলে এ পরিমাণে পাওয়া যায় না।(ইবনু তাইমিয়াহ; মিনহাজুস সুন্নাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
অপরদিকে ইসলামি শরীয়তে ‘তাকীয়াহ’ কোনো মৌলিক নীতি নয়; বরং আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সীমিত বিধান। কারণ, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মানহাজ অনুযায়ী মিথ্যা বলা মুনাফিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হাদিসে এসেছে, একজন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে বলতে এবং মিথ্যার অনুসন্ধান করতে করতে অবশেষে আল্লাহর নিকট ‘চরম মিথ্যাবাদী’ (কাযযাব) হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। অথচ সত্যবাদিতা ও সততা ইসলামের মৌলিক নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত। তাই মিথ্যাকে ভিত্তি করে কোনো আকীদা বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।তাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সীমিত বিধান। তাদের দৃষ্টিতে ‘তাকীয়াহ’ হলো একান্তই নিরুপায় অবস্থার জন্য প্রদত্ত শরীয়তের একটি রুখসাহ (ব্যতিক্রমী অনুমতি)। সাধারণ অবস্থায় সত্য গোপন করা বা দ্বীনের বিষয়ে আপস করা ইসলামের আদর্শ নয়; এটি কেবলমাত্র জীবননাশের মতো চরম বিপদের পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বৈধ হয়।
.
তুলনামূলকভাবে বলা যায়—যেমন জীবন রক্ষার প্রয়োজনে নিরুপায় ব্যক্তির জন্য শূকরের মাংস ভক্ষণ বৈধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে প্রাণনাশের আশঙ্কার মুহূর্তে ‘তাকিয়াহ’-এরও অনুমতি রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নিরুপায় অবস্থায় শূকরের মাংস ভক্ষণ অনেক সময় বাধ্যতামূলক হয়ে যায়—না খেলে জীবনহানির আশঙ্কা থাকলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। কিন্তু ‘তাকীয়াহ’র ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন; এটি জরুরি পরিস্থিতিতে বৈধ হলেও বাধ্যতামূলক নয়। বরং কেউ যদি চরম নির্যাতন ও প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যেও ‘তাকীয়াহ’ গ্রহণ না করে সত্যের উপর অবিচল থাকে এবং সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর নিকট শহীদী মর্যাদা ও মহাপুরস্কারের অধিকারী হবে। অর্থাৎ এখানে রুখসাহ গ্রহণ করা জায়েয, কিন্তু ‘আযীমাহ’—অর্থাৎ দৃঢ়তা ও সত্যের উপর অটল থাকা—অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও উত্তম পথ। ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণ মুশরিকদের কঠোর নির্যাতন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে সহ্য করেছেন। আবূ বকর সিদ্দীক (রা.), বিলাল ইবন রাবাহ (রা.)-এর অবিচলতা, সুমাইয়া বিনতে খাইয়্যাত (রা.)-এর শাহাদাত এবং খুবাইব ইবন আদী (রা.)-এর দৃঢ়তা—সবই প্রমাণ করে যে, সত্যের উপর অবিচল থাকা এবং দ্বীনের জন্য কষ্ট সহ্য করাই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।সুতরাং,’তাকিয়াহ’ যদিও একটি সীমিত ও শর্তাধীন অনুমতি, তবুও সর্বাবস্থায় সত্যের উপর অটল থাকা, দ্বীনের জন্য দৃঢ় থাকা এবং প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করাই অধিক উত্তম, মহিমান্বিত এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় পথ।
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,التقية أن يقول العبد خلاف ما يعتقده لاتقاء مكروه يقع به لو لم يتكلم بالتقية “তাকিয়াহ হল—কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট এড়ানোর উদ্দেশ্যে কেউ যদি নিজের প্রকৃত বিশ্বাসের বিপরীত কিছু বলে।”(আহকাম আহলুয্-যিম্মাহ; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০৩৮)
.
তাকিয়াহর অনুমতির মূল ভিত্তি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে পাওয়া যায় যেখানে মহান আল্লাহ বলেন:لَّا يَتَّخِذِ ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلْكَـٰفِرِينَ أَوْلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلْمُؤْمِنِينَۖ وَمَن يَفْعَلْ ذَٲلِكَ فَلَيْسَ مِنَ ٱللَّهِ فِى شَىْءٍ إِلَّآ أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَـٰةًۗ وَيُحَذِّرُكُمُ ٱللَّهُ نَفْسَهُۥۗ وَإِلَى ٱللَّهِ ٱلْمَصِيرُ”মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহ্র কোন সম্পর্কে থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর; (তাহলে ভিন্ন কথা) আর আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করছেন এবং আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮)
.
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭০১ মৃত: ৭৭৪ হি.] বলেছেন:( إِلا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً ) أي: إلا من خاف في بعض البلدان أو الأوقات من شرهم ، فله أن يتقيهم بظاهره لا بباطنه ونيته ؛ كما حكاه البخاري عن أبي الدرداء أنه قال: ” إنَّا لَنَكْشرُ فِي وُجُوهِ أقْوَامٍ وَقُلُوبُنَا تَلْعَنُهُمْ “আয়াতের “(إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً)” অংশের অর্থ হলো,যখন কেউ নির্দিষ্ট কোনো সময় বা জায়গায় তাদের (অমুসলিমদের) অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে ভয় পায়, তখন বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে সদাচরণ বা নম্রতা দেখানো যেতে পারে, কিন্তু অন্তরের বিশ্বাস ও ভীতি আল্লাহর প্রতি স্থির ও অটুট থাকতে হবে। বুখারিতে আবু আদ-দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “আমরা মানুষের মুখে হাসি ফোটাই, যদিও আমাদের হৃদয় তাদেরকে অভিশাপ দেয়।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে, مَذْهَبُ جُمْهُورُ عُلَمَاءِ أَهْل السُّنَّةِ أَنَّ الأْصْل فِي التَّقِيَّةِ هُوَ الْحَظْرُ ، وَجَوَازُهَا ضَرُورَةٌ ، فَتُبَاحُ بِقَدْرِ الضَّرُورَةِ ، قَال الْقُرْطُبِيُّ : وَالتَّقِيَّةُ لاَ تَحِل إِلاَّ مَعَ خَوْفِ الْقَتْل أَوِ الْقَطْعِ أَوِ الإْيذَاءِ الْعَظِيمِ ، وَلَمْ يُنْقَل مَا يُخَالِفُ ذَلِكَ فِيمَا نَعْلَمُ إِلاَّ مَا رُوِيَ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ مِنَ الصَّحَابَةِ ، وَمُجَاهِدٍ مِنَ التَّابِعِينَ “
“আহলে সুন্নাহর অধিকাংশ আলেমের মতে,তাকিয়াহ সংক্রান্ত মূলনীতি হল, এটি নিষিদ্ধ’; এটা শুধুমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রে জায়েয, এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণে অনুমোদিত।ইমাম কুরতুবী বলেন: তাকিয়া সম্পর্কে মূল নীতি হল যে মৃত্যু ভয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা বা চরম ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে তা জায়েয নয়এবং আমরা যতদূর জানি এর বিপরীতে কোনো বর্ণনা নেই সাহাবাদের মধ্যে মুআয ইবনে জাবাল থেকে এবং তাবেয়ীনদের মধ্যে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা ছাড়া”।(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৮৭-১৮৮)
.
.
আহলে সুন্নাতের নিকট তাকিয়া বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হওয়া জরুরি:
(১).কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে হবে, অর্থাৎ এমন একটি ভয় থাকতে হবে যা কোনো ক্ষতিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
.
(২). তাকিয়াহ ছাড়া সেই কষ্ট বা ক্ষতি থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় না থাকে।
.
(৩). এবং আশঙ্কিত ক্ষতি এমন হতে হবে যা সহ্য করা খুব কঠিন ও কষ্টদায়ক।
তাকিয়াহ গ্রহণকারী ব্যক্তির উচিত, যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া ছাড়া কষ্ট থেকে বাঁচার অন্য কোনো বৈধ পথ থাকে, তাহলে তাকিয়াহর পরিবর্তে সেই বৈধ বিকল্প পথই গ্রহণ করা আবশ্যক। রুখসাহ (অস্থায়ী শিথিলতা) গ্রহণ করার সময় সাবধান থাকতে হবে, যেন সে এতে অভ্যস্ত না হয়ে পড়ে এবং বিপদ কেটে যাওয়ার পরও হারাম কাজে লিপ্ত না থাকে। কেননা, এতে সে তাকিয়াহর সীমা অতিক্রম করে গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়বে। এই মূলনীতি আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন মুযতারের (বাধ্য ব্যক্তির) বিষয়ে:فَمَنِ ٱضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ”অতএব,যে নিরুপায় হয়ে, ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন ব্যতীত, (প্রয়োজন মুতাবেক গ্রহণ করবে) তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল,দয়ালু।”(সূরা আন-নাহল: ১১৫) আল্লাহ তায়ালা তাকিয়াহ প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন: “মুমিনরা যেন কাফেরদের বন্ধু না বানায়, মুমিনদের বাদ দিয়ে। আর কেউ যদি তা করে, তবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুই নয়; তবে যদি তোমরা তাদের থেকে বাঁচার জন্য কোনো রকম নিরাপত্তা গ্রহণ করো (তবে ভিন্ন কথা)। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮) এখানে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, যেন কেউ তাকিয়াহর নামে আত্মতুষ্টি বা ধোঁকার শিকার না হয় এবং পরবর্তীতে হারামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এছাড়াও তাকিয়াহ গ্রহণকারীর উচিত নিজের নিয়ত খেয়াল রাখা,সে যেন এই বিশ্বাস রাখে যে, সে যা করছে তা মূলত হারাম, কিন্তু চরম প্রয়োজনের কারণে আল্লাহর দেওয়া রুখসাহ গ্রহণ করছে। যদি কেউ এই কাজকে সহজ ও অবহেলার যোগ্য মনে করে, তাহলে সে অবশ্যই গোনাহগার হবে।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; আল-মুসউ’আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৯১-২০০)
.
ড. নাসের আল-কাফারী বলেন:ইসলামে তাকিয়াহ অধিকাংশ সময় কাফেরদের সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:ِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً”তাদের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়া।”(সূরা আলে ইমরান: ২৮)।
ইবনু জারীর আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”التقية التي ذكرها الله في هذه الآية إنما هي تقية من الكفار لا من غيرهم”আল্লাহ এই আয়াতে যে তাকিয়াহর কথা বলেছেন, তা কেবল কাফেরদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য, অন্য কারও জন্য নয়।” এই কারণে কিছু সালাফ (প্রথম যুগের আলেম) মনে করতেন যে, ইসলাম যখন দুর্বল ছিল তখন তাকিয়াহ বৈধ ছিল, কিন্তু আল্লাহ যখন ইসলামকে সম্মানিত করেছেন, তখন আর তাকিয়াহর প্রয়োজন নেই।যেমনটি মুআয ইবন জাবাল ও মুজাহিদ বলেন:التقية في جدة الإسلام قبل قوة المسلمين ، أما اليوم فقد أعز الله المسلمين أن يتقوا منهم تقاة”ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা দুর্বল ছিল, তখন শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে ‘তাকিয়া’ বা কৌশলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইসলাম যখন শক্তিশালী হলো এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদের সম্মানিত করলেন, তখন আর তাকিয়া করার প্রয়োজনীয়তা রইল না।”
.
কিন্তু শিয়া মতবাদের আলোচনায় ‘তাকিয়াহ’ এমন একটি নীতি, যা কেবল অমুসলিমদের সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মুসলিমদের সাথেও বিশেষ করে আহলে সুন্নাহর সাথে প্রয়োগযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তাদের কিছু আলেমের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি দীর্ঘ সময়কালকে ‘তাকিয়াহর যুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে; যেমন শাইখ আল-মুফিদ এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তারা তাদের গ্রন্থসমূহে ‘ইমামদের’ নামের প্রতি সম্বন্ধিত করে এ ধারণাকে সমর্থন করার চেষ্টা করে।তাদের আকীদাগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বারো ইমামের ইমামতকে মৌলিক বিশ্বাস হিসেবে দেখা। এ বিশ্বাস অস্বীকারকারীদের বিষয়ে তাদের কিছু বক্তব্যে কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়, যেখানে গুরুতর বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।অপরদিকে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে তাকিয়াহ কোনো সাধারণ নীতি নয়; বরং এটি একটি রুখসাহ (অস্থায়ী ছাড়), যা কেবল চরম বিপদ, নির্যাতন বা প্রাণনাশের আশঙ্কার মতো পরিস্থিতিতে সীমিতভাবে গ্রহণযোগ্য। এটি স্বাভাবিক অবস্থায় অবলম্বনযোগ্য কোনো পদ্ধতি নয়।এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা কাফেরদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন—যদি কারো পক্ষ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে কিছুটা গোপনতা বা নমনীয়তা অবলম্বন করা যেতে পারে; কিন্তু তা অন্তরের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করবে না।এ বিষয়ে আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো—তাকিয়াহ একটি জরুরি অবস্থার বিধান (রুখসাহ), যা কেবল প্রয়োজনের সীমায় সীমাবদ্ধ; এটি কোনো স্থায়ী বা স্বাভাবিক আচরণপদ্ধতি নয়।
.
ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:أجمعوا على أن من أكره على الكفر حتى خشي على نفسه القتل ، فكفر وقلبه مطمئن بالإيمان : أنه لا يحكم عليه بالكفر”তারা (ওলামায়ে কেরাম) এই বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং সে নিজের জীবননাশের আশঙ্কা করছে— এমতাবস্থায় সে যদি কুফরি কথা বলে কিন্তু তার অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে, তবে তাকে কাফের হিসেবে গণ্য করা হবে না।”
.
তবে কেউ যদি এমন চরম বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতেও কুফরি উচ্চারণ না করে বরং নিজের জীবন বিসর্জন দেয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে অধিক সাওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হবে। এ বিষয়ে ইবন বত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”وأجمعوا على أن من أكره على الكفر واختار القتل : أنه أعظم أجرًا عند الله”অর্থাৎ, ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, কাউকে যদি কুফরি করতে বাধ্য করা হয়, আর সে তা গ্রহণ না করে মৃত্যুকে (শাহাদাতকে) বেছে নেয়, তবে আল্লাহর নিকট তার প্রতিদান আরও মহান।পক্ষান্তরে, শিয়াদের ‘তাকিয়াহ’ ধারণা এ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দৃষ্টিতে তাকিয়াহ কেবল একটি সীমিত পরিসরের রুখসাহ (অনুমোদিত ছাড়) নয়; বরং তা তাদের দ্বীনের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা একে নামাজের মতো মৌলিক ইবাদতের সমপর্যায়ে—কিংবা কখনো তার চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলে তাদের গ্রন্থসমূহে প্রতীয়মান হয়।(বিস্তারিত জানতে দেখুন: উসূল মাযহাবুশ শিয়া আল-ইমামিয়া: ২/৮০৬–৮০৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
No comments:
Post a Comment