নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামি বলার বিধান: বিজ্ঞ আলেমদের একগুচ্ছ ফতওয়া
ভূমিকা: ইসলামি শরিয়তে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আখিরাতের ফয়সালা করার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী, কুফরি বা শিরকি কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় কাউকে দেখলে তাকে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সাধারণভাবে ‘কাফের’ বা ‘মুশরিক’ বলা গেলেও নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম ধরে সে ‘জাহান্নামি’—এমন চূড়ান্ত ফয়সালা দেওয়া জায়েজ নয়। এর মূল কারণ হলো, মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের ঈমানি অবস্থা কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই জানেন।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে ইহুদি যুবককে শেষ মুহূর্তে কালিমা পড়িয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দিয়েছিলেন তা আমাদের শেখায় যে শেষ পরিণতি (খাতিমাহ) মানুষের অজানা। তাই নীতিগতভাবে আমরা বিশ্বাস করি, সব কাফের জাহান্নামি এবং সব মুমিন জান্নাত। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে আমরা কেবল তাদের ওপরই জান্নাত বা জাহান্নামের হুকুম লাগাব যাদের ব্যাপারে কুরআন বা সহিহ হাদিসে স্পষ্ট সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে (যেমন: আবু লাহাব বা আশারায়ে মুবাশশারা)। এর বাইরে অন্য সবার ক্ষেত্রে আমরা নেককারদের জন্য জান্নাতের আশা রাখি এবং পাপাচারীদের জন্য আল্লাহর শাস্তির ভয় করি, কিন্তু চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রাখি। নিচে এ বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত আলেম ও ফতোয়া বোর্ডগুলোর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরা হলো:
❑ ১. সৌদি আরবের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা সালেহ আল ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: সুনির্দিষ্ট কোনো কাফেরের ওপর কি জাহান্নামি হওয়ার হুকুম লাগানো জায়েজ? যেমন একটি হাদিসে এসেছে: إِذَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ مُشْرِكٍ فَبَشِّرْهُ بِالنَّارِ “যখন তুমি কোনো মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে যাবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও।” এখন আমি যদি নিশ্চিত হই যে, সে শিরকের ওপর মারা গেছে তবে কি আমি নির্দিষ্টভাবে তার ওপর হুকুম লাগাতে পারব?
উত্তর:
لكن وأيش يدريك أنه مات على الشرك؟! أنت تعلم الغيب؟ إن كان هو عند الموت نطق بالشهادتين ومات على التوحيد، اليهودي الذي زاره النبي ﷺ وهو يحتضر فقال له: «قل لا إله إلا الله» فنظر إلى أبيه فقال: أطع أبا القاسم، فقال: أشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدًا رسول الله، فأمر النبي ﷺ الصحابة أن يتولوا أخاهم وأن يكفنوه وقال: «الحمد لله الذي أنقذه بي من النار» فما تدري عن الخواتيم يا أخي، لكن نقول من فعل الكفر أو الشرك الأكبر فهو كافر أو مشرك، نحكم على الظاهر أما البواطن فلا يحكم عليها إلا الله سبحانه وتعالى، ولا ندري بالخواتيم ولا نحكم على معين أنه في جنة أو في نار إلا من شهد له رسول الله ﷺ هذا منهج أهل السُّنة والجماعة أنهم لا يحكمون لمعين بجنة ولا بنار إلا من شهد له رسول الله ﷺ وإنما نرجو للمحسن ونخاف على المسيء هذه القاعد
“কিন্তু আপনি কীভাবে জানবেন যে সে শিরকের ওপরই মারা গেছে?! আপনি কি গায়েব জানেন? হতে পারে মৃত্যুর সময় সে কালেমা পাঠ করেছে এবং তাওহিদের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। জনৈক ইহুদি যুবক, যাকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখতে গিয়েছিলেন যখন সে মরণাপন্ন ছিল। তিনি তাকে বললেন: قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো।’ যুবকটি তার পিতার দিকে তাকাল, পিতা বলল: أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ ‘ আবুল কাসেমের (নবীজি) আনুগত্য করো।’ তখন সে সাক্ষ্য দিল: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আন্না মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।’ এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন তাদের ভাইয়ের (দাফনের) দায়িত্ব নিতে এবং বললেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ بِي مِنَ النَّارِ ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে আমার উসিলায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’
হে ভাই! মানুষের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না। তবে আমরা বলব, যে ব্যক্তি কুফরি বা শিরকে আকবর করবে সে কাফের বা মুশরিক। আমরা বাহ্যিক অবস্থার ওপর হুকুম দেব আর অন্তরের খবর কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানেন। আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জান্নাত বা জাহান্নামের ব্যাপারে ফয়সালা দেব না যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—তারা নির্দিষ্ট কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে না। তবে নেককারদের জন্য আশা রাখে এবং পাপাচারীদের জন্য আশঙ্কা করে।”
❑ ২. শাইখ সালেহ আল ফাওযান রাহ. আরও বলেন,
ولا أشهد لأحد من المسلمين بجنة ولا نار إلا من شهد له رسول الله صلى الله عليه وسلم؛ لكني أرجو للمحسن وأخاف على المسيء، ولا أكفر أحدا من المسلمين بذنب، ولا أخرجه من دائرة الإسلام.
هذا معتقد أهل السنة والجماعة، أنهم لا يشهدون لأحد معين بجنة ولو كان من الصالحين، ولا يشهدون لأحد بالنار ولو كان من الكافرين؛ كأن تقول: هذا من أهل الجنة، أو هذا من أهل النار. هذا لا يجوز إلا لمن أطلعه الله على الغيب وهو الرسول صلى الله عليه وسلم، ولم يطلعه على الغيب كله، ولكن على شيء من المغيبات، ومن ذلك أن الرسول صلى الله عليه وسلم شهد لأناس بالجنة، فنحن نشهد أنهم من أهل الجنة، كالعشرة المبشرين بالجنة من صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم، وهم: الخلفاء الأربعة، وطلحة، والزبير، وسعد، وسعيد، وعبد الرحمن بن عوف، وأبو عبيدة، عامر بن الجراح، هؤلاء شهد لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم بالجنة، وثابت بن قيس بن شماس بشره النبي صلى الله عليه وسلم بالجنة فهؤلاء نشهد لهم؛ لأن الرسول شهد لهم بأعيانهم، فنقول: فلان في الجنة، أبو بكر في الجنة، عمر في الجنة، طلحة، والزبير، كل هؤلاء في الجنة؛ لأن الرسول أخبر أنهم في الجنة.
والرسول صلى الله عليه وسلم لا ينطق عن الهوى، وإن كان هذا من الغيب، ولكن الله أطلع الرسول صلى الله عليه وسلم على الغيب، {عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ} [الجن: ٢٦، ٢٧] ، يطلع الله الرسل على شيء من المغيبات؛ لأجل مصلحة البشر.
وكذلك لو كان كافرا أو فاسقا فإننا لا نشهد له بالنار؛ لأننا لا
ندري عن خاتمته، لا نشهد لأحد بالجنة وإن كان من الصالحين؛ لأننا لا ندري عن خاتمته بم يختم له؟ ولا نشهد لأحد بالنار ولو كان كافرا لأننا لا ندري بم يختم له؟ والنبي صلى الله عليه وسلم يقول: «إن العبد ليعمل بعمل أهل النار حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع، فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها، وإن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها» .
والخواتيم لا يعلمها إلا الله سبحانه وتعالى، فنحن لا نشهد للمعين، أما العموم فنحن نشهد على الكفار أنهم في النار من غير تعيين فلان، نقول: الكافرون في النار، والمؤمنون في الجنة، على العموم، قال تعالى في الجنة: {أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ} [آل عمران: ١٣٣] ، وقال في النار: {أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ} [آل عمران: ١٣١] ، فلا شك أن الكفار في النار من غير تعيين أشخاص إلا بشهادة، ولا شك أن المؤمنين في الجنات من غير تعيين أشخاص إلا بشهادة ممن لا ينطق عن الهوى.
وهذا من التأدب مع الله سبحانه وتعالى فنحن لا نشهد للمعين إلا بدليل، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء.
“আমরা কারো শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানি না। তাই কেউ নেককার হলেও আমরা নির্দিষ্ট করে তার জান্নাতের সাক্ষ্য দেই না; কারণ তার মৃত্যু কোন অবস্থায় হবে তা আমাদের জানা নেই। আবার কেউ কাফের হলেও আমরা (নির্দিষ্ট করে) তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই না। আমি কোনো মুসলিমের জন্যই জান্নাত বা জাহান্নামের সাক্ষ্য দেই না, যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে আমি নেককার ব্যক্তির জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং গুনাহগারের জন্য (শাস্তির) ভয় করি। আমি কোনো মুসলিমকে গুনাহের কারণে কাফের বলি না এবং তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেই না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নেককার হলেও তার জান্নাতের সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো ব্যক্তি কাফের হলেও তার জাহান্নামের সাক্ষ্য দেয় না। অর্থাৎ আপনি বলতে পারেন না যে—’এই ব্যক্তি জান্নাতি’ অথবা ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামি’। আল্লাহ তাআলা যাকে গায়েবের খবর জানিয়েছেন তিনি অর্থাৎ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া আর কারো জন্য এমনটি বলা জায়েজ নয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও সমস্ত গায়েব জানানো হয়নি। বরং গায়েবের কিছু কিছু বিষয় জানানো হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো—রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু মানুষের জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং আমরাও সাক্ষ্য দেই যে তারা জান্নাতি। যেমন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের মধ্য থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন (আশারায়ে মুবাশশারা)। তাঁরা হলেন: চার খলিফা, তালহা, যুবাইর, সা’দ, সাঈদ, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং আবু উবাইদাহ আমের ইবনুল জাররাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া সাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শামমাস (রা.)-কেও নবীজি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আমরা তাঁদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেই। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের নাম ধরে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই আমরা বলি: আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি, তালহা ও জুবাইর জান্নাতি। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংবাদ দিয়েছেন যে তারা জান্নাতি। আর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলেন না। যদিও এটি গায়েবি বিষয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর রসুলকে এই গায়েব সম্পর্কে অবগত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا * إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ
“তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না; তাঁর মনোনীত রসুল ছাড়া।” [সূরা জিন: ২৬-২৭]
মানুষের কল্যাণের স্বার্থে আল্লাহ তাআলা তাঁর রসুলদের কিছু গায়েবি বিষয়ে অবগত করেন। একইভাবে কোনো ব্যক্তি কাফের বা ফাসেক হলেও আমরা তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই না। কারণ তার শেষ পরিণতি কী হবে তা আমরা জানি না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
«إن العبد ليعمل بعمل أهل النار حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع، فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها، وإن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها»
“নিশ্চয়ই কোনো বান্দা (সারা জীবন) জাহান্নামিদের মতো আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার ওপর তাকদির প্রবল হয় এবং সে জান্নাতিদের মতো আমল শুরু করে দেয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করে। আবার কোনো ব্যক্তি জান্নাতীদের মতো আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার ওপর তাকদির প্রবল হয় এবং সে জাহান্নামিদের মতো আমল শুরু করে দেয় এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে।” মানুষের শেষ পরিণতি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। তাই আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে (জান্নাত বা জাহান্নামের) সাক্ষ্য দেই না। তবে সাধারণভাবে আমরা কাফেরদের জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই—কাউকে নির্দিষ্ট না করে। আমরা বলি: কাফেররা জাহান্নামি এবং মুমিনরা জান্নাতি। জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
“এটি (জান্নাত) মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩৩]
আর জাহান্নাম সম্পর্কে বলেছেন:
أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ
“এটি (জাহান্নাম) কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩১]
সুতরাং কাফেররা যে জাহান্নামে যাবে এবং মুমিনরা যে জান্নাতে যাবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ওহী ছাড়া আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর এই হুকুম লাগাব না। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে আদব বা শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত যে, আমরা দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলব না। বরং আমরা নেককারদের জন্য আশা রাখি এবং পাপাচারীদের জন্য আশঙ্কা করি।”
❑ ৩. আল্লামা ইবনে উসাইমিন রহ.-এর ফতওয়া:
“আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালিহ উসাইমিন রহ. বলেন:
وإذا رأينا رجلاً كافراً ملحداً مسلطاً على المسلمين، يمزق كتاب الله ويدوسه برجليه ويستهزىء بالله ورسوله فلا نقول: هذا من أهل النار، بل نقول: من فعل هذا فهو من أهل النار. بلا تعيين، لأنه من الجائز في آخر لحظة أن يمنّ الله عليه ويهديه، فأنت لا تدري، لذلك يجب التفريق بين التعيين والإطلاق، أوالتعيين والإجمال، فإذا مات رجل ونحن نعرف أنه مات على النصرانية حسب ما يبدو لنا من حاله، فلا نشهد له بالنار؛ لأنه إن كان من أهل النار فسيدخل ولو لم نشهد، وإن لم يكن من أهل النار فشهادتنا شهادة بغير علم، فمثل هذه المسائل لا داعي لها، فلو قال قائل: مات رجل من الروس، من الملحدين، مات رجل من الأمريكان من الملحدين منهم، مات رجل من اليهود من الملحدين، العنه واشهد له بالنار، نقول: لا يمكن، نحن نقول: من مات على هذا فهو من أهل النار، من مات على هذا لعناه، أما الشخص المعين فلا، ولهذا كان من عقيدة أهل السنة والجماعة قالوا: لا نشهد لأحد بالجنة أو بالنار إلا لمن شهد له النبي صلى الله عليه وسلم ، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء، هذه عقيدة أهل السنة والجماعة
“আর যদি আমরা এমন কোনো কাফের বা নাস্তিক ব্যক্তিকে দেখি যে মুসলিমদের ওপর চড়াও হয়েছে, আল্লাহর কিতাব ছিঁড়ে ফেলছে এবং তা পদদলিত করছে, আর আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে উপহাস করছে—তবুও আমরা নির্দিষ্ট করে বলব না যে: ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামি’। বরং আমরা এভাবে বলব: ‘যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে সে জাহান্নামি’। অর্থাৎ ব্যক্তি নির্দিষ্ট না করে সাধারণভাবে বলব। কারণ হতে পারে শেষ মুহূর্তে আল্লাহ তাকে তাওফিকের নিয়ামত দান করবেন এবং হেদায়েত দেবেন, যা আপনি জানেন না।
এজন্য নির্দিষ্ট করা এবং সাধারণ রাখা (ইতলাক বা ইজমাল)-এর মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক। যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায় এবং আমরা জানি যে আমাদের দৃষ্টিতে সে খ্রিষ্টান হিসেবে মারা গেছে, তবুও আমরা তার ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দেব না। কারণ সে যদি জাহান্নামি হয়ে থাকে তবে আমাদের সাক্ষ্য ছাড়াই সে সেখানে প্রবেশ করবে, আর যদি সে জাহান্নামি না হয় তবে আমাদের সাক্ষ্য হবে জ্ঞানহীন এক সাক্ষ্য। তাই এমন সব বিষয়ে জড়ানোর প্রয়োজন নেই। যদি কেউ বলে, রাশিয়ার অমুক নাস্তিক মারা গেছে, আমেরিকার অমুক নাস্তিক মারা গেছে কিংবা ইহুদিদের কোনো নাস্তিক মারা গেছে, তাকে অভিশাপ দাও এবং তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দাও; আমরা বলব: না, এটা সম্ভব নয়। আমরা বলব: ‘যে এই অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামি’ অথবা ‘যে এই অবস্থায় মারা যাবে তার ওপর অভিশাপ’। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না। এ কারণেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, তাঁরা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা ব্যতীত নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলেন না। তবে আমরা সৎকর্মশীলের জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং পাপাচারীর ব্যাপারে (শাস্তির) ভয় পাই। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা।”
❑ ৪. শাইখ বিন বায রহ.-এর ফতোয়া
مَن مات على الكفر: يهودي أو نصراني أو غيره، إذا مات على دينه فهو في النار، الله توعَّدهم بالنار، فالكفَّار في النار يقينًا، والمسلمون في الجنة يقينًا.
أما الكلام في الواحد المعين: فلان ابن فلان، هو محل: هل يُشهد له بالتَّعيين أم لا؟ إلا مَن شهد له الرسولُ ﷺ.
اليهود في النار، والنصارى في النار، كل الكفَّار، كما أن المؤمنين في الجنة، قال الله جلَّ وعلا: وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ [التوبة:72]، فهم في الجملة موعودون بالجنة.
لكن فلان ابن فلان كونه مؤمنًا، فالله الذي يعلم ما في قلبه، إلا إذا شهد له المعصومُ عليه الصلاة والسلام، أو شهد له القرآن، مثل: أبي لهب: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ [المسد:1]
“যে ব্যক্তি কুফরির ওপর মারা যায়—সে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অন্য যে কেউ হোক—যদি সে তার নিজের (বাতিল) ধর্মের ওপরই মারা যায়, তবে সে জাহান্নামি। আল্লাহ তাআলা তাদের জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন। সুতরাং কাফেররা নিশ্চিতভাবেই জাহান্নামি এবং মুসলিমরা নিশ্চিতভাবেই জান্নাতি। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে—যেমন অমুকের পুত্র অমুক—তাকে কি নির্দিষ্টভাবে (জান্নাতি বা জাহান্নামি) সাক্ষ্য দেওয়া যাবে কি না, তা ভিন্ন বিষয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন সে ছাড়া অন্য কাউকে নির্দিষ্ট করা যাবে না।
সাধারণভাবে ইহুদিরা জাহান্নামে যাবে, খ্রিষ্টানরা জাহান্নামে যাবে এবং সব কাফেরই জাহান্নামি; ঠিক যেমন মুমিনরা জান্নাতি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
“আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের এমন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়।” [সূরা তাওবাহ: ৭২]
অর্থাৎ তারা সামগ্রিকভাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতিপ্রাপ্ত। কিন্তু অমুকের পুত্র অমুক ব্যক্তিটি মুমিন কি না (অর্থাৎ তার অন্তরের প্রকৃত অবস্থা কী), তা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে যদি মাসুম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন অথবা পবিত্র কুরআনে তার ব্যাপারে সাক্ষ্য এসে থাকে (তবে তাকে নির্দিষ্ট করা যাবে); যেমন আবু লাহাবের ব্যাপারে বলা হয়েছে:
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
“আবু লাহাবের হাত দুটি ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।” [সূরা মাসাদ: ১]” [ইমাম মুজাদ্দিদ আব্দুল ওয়াহাব রাহ. রচিত কিতাবুত তাওহিদ-এর শরাহ (ব্যাখ্যা)]
❑ ৫. সৌদি আরবের ফাতওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: যে ইহুদি বা খ্রিষ্টান মুসলিমদের মাঝে বসবাস করে অথবা ইসলাম, কুরআন ও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে—সে যদি তার নিজের ধর্ম পরিবর্তন না করে ইহুদি বা খ্রিষ্টান অবস্থায় মারা যায় তবে কি আমরা বলব যে সে জাহান্নামে যাচ্ছে? নাকি আমরা কবিরা গুনাহে লিপ্ত কোনো মুসলিমের মতো তার ব্যাপারেও নীরবতা অবলম্বন করব (যে আল্লাহর ইচ্ছাধীন)? আমাদের ফতোয়া দিয়ে উপকৃত করুন।
উত্তর:
مذهب أهل السنة: أنه لا يحكم على معين بأنه من أهل النار أو من أهل الجنة ، إلا من شهد له رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء، ولا يعلم الخواتيم وعواقب الأمور إلا الله سبحانه وتعالى، مع العلم بأن اليهود والنصارى كفار، وكل من مات على الكفر فهو من أهل النار، كما أن كل من مات على
الإيمان بالله ورسوله محمد صلى الله عليه وسلم فهو من أهل الجنة، كما قال سبحانه: الآية من سورة التوبة، وقال تعالى في شأن الكفار: .
وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم.
“আহলুস সুন্নাহর মাজহাব হলো, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে সে জাহান্নামি না জান্নাতি—তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না, যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে আমরা নেককার ব্যক্তির জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং পাপাচারীর জন্য (শাস্তির) ভয় পাই। মানুষের শেষ পরিণতি ও পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ছাড়া আর কেউ জানে না। এর পাশাপাশি এটি নিশ্চিতভাবে জানতে হবে যে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কাফের। আর যে ব্যক্তি কুফরের ওপর মারা যাবে সে জাহান্নামি; ঠিক যেমন যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসুল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ঈমান নিয়ে মারা যাবে সে জান্নাতি। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা তাওবার আয়াতে বলেছেন এবং কাফেরদের সম্পর্কেও অনুরূপ বলেছেন। আর আল্লাহর তাওফিকেই সব কাজ সম্পন্ন হয়। আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
সংকলন ও অনুবাদ:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment