প্রশ্ন: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদাগত অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই: তিনি কি জাইদি শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন? এবং তিনি কি এই মতাদর্শের উপর অবিচল থেকে ইন্তিকাল করেছেন?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি অতঃপর তাঁর বংশ ও জীবন:
.
ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা নিজ প্রতিভা, সাধনা ও কর্মের মাধ্যমে যুগকে অতিক্রম করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদেরই একজন হলেন—আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু আলী আল-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)।তিনি ছিলেন একাধারে একজন মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, কাজী, গবেষক ও প্রাজ্ঞ শিক্ষক—যাঁর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, শিক্ষা ও রচনার এক অনন্য সমন্বয়। তাঁর কলম যেমন ছিল প্রাঞ্জল ও শক্তিশালী, তেমনি তাঁর চিন্তা ছিল গভীর, বিশ্লেষণধর্মী ও স্বাধীন। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আকীদাহ, ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, ফারায়িজ, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত—প্রায় প্রতিটি জ্ঞানশাখায় তিনি রেখে গেছেন অসাধারণ অবদান। তিনি শুধু জ্ঞানের বাহক ছিলেন না; বরং ছিলেন জ্ঞানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যিনি ইলমকে আত্মস্থ করেছিলেন এবং তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রজ্ঞা ও প্রভাবের সাথে।ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) ১১৭৩ হিজরির ২৮ জিলকদ ইয়েমেনের “হিজরাতু শাওকান” এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সান‘আ নগরীতে বেড়ে ওঠেন। শৈশবেই কুরআন মাজীদ হিফযের মাধ্যমে তাঁর জ্ঞানযাত্রা শুরু হয়। অতঃপর তিনি দ্বীনি ইলমের বিভিন্ন শাখায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন এবং যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।তিনি নাহু, সরফ, বালাগাত, উসূলসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের অসংখ্য মূলগ্রন্থ (মুতূন) মুখস্থ করেন এবং অল্প বয়সেই গবেষণা, বিশ্লেষণ ও ইজতিহাদের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর প্রখর মেধা, বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডার ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমসাময়িক আলেমগণ তাঁকে সর্বসম্মতভাবে “ইমাম” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
.
তিনি আজীবন শিক্ষা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে ইলমের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলির মধ্যে রয়েছে;ফাতহুল কাদীর—এর পূর্ণ নাম: “ফাতহুল কাদীর: আল-জামি‘ বায়না ফান্নাই রিওয়ায়াতি ওয়াদ-দিরায়াতি মিন ‘ইলমিত-তাফসীর”।ফাতহুল কাদীর তাফসীরশাস্ত্রের একটি অনন্য ও মৌলিক গ্রন্থ যা পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত।এটি কেবল সাধারণ তাফসীরগ্রন্থ নয়; বরং রিওয়ায়াত (বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর) এবং দিরায়াত (গভীর বিশ্লেষণমূলক তাফসীর)—এই দুই ধারাকে সমন্বিত করে তাফসীরের মূলনীতি ও ভিত্তিগত দিকসমূহকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছে। এজন্যই এটি তাফসীরবিদ্যায় একটি বুনিয়াদি ও প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ নাইলুল আওতার’—এটি হাদিসভিত্তিক গ্রন্থ “মুনতাকা আল-আখবার”-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ। মূল গ্রন্থটি রচনা করেন হাম্বলি মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম শায়খ আবুল বারাকাত মাজদুদ্দিন আব্দুস সালাম আল-হাররানি (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ইবনে তাইমিয়্যার পূর্বপুরুষ ছিলেন। ‘নাইলুল আওতার’-এ হাদিসের দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করে ফিকহি মাসআলার ওপর সুগভীর আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।এছাড়াও তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হলো—‘আল-কাউলুল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলিদ’ এবং ‘ইরশাদুল থিকাত ইলা ইত্তিফাকিশ শারায়ি‘ আলাত তাওহিদ ওয়াল মিয়াদ ওয়ান নুবুয়াত’।এই গ্রন্থগুলোতে তিনি যুক্তি ও দলিলের মাধ্যমে বিভিন্ন মতবাদের সমালোচনা করেছেন। বিশেষত ইহুদি দার্শনিক মুসা বিন মাইমুন আল-আন্দালুসির দর্শনের উপর তিনি সুগভীর ও তর্কসমৃদ্ধ পর্যালোচনা পেশ করেছেন।এভাবে তাঁর রচনাবলি ইলমী গভীরতা, দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও সমাদৃত।অবশেষে ১২৫০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন—রেখে যান জ্ঞান, আমল ও সংস্কারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
.
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদা” প্রসঙ্গে ড. আব্দুল্লাহ নুমাসূক তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রে—যার শিরোনাম: “ইমাম শাওকানীর আকীদার পদ্ধতি”—উল্লেখ করেন: ‘আল্লাহর সাহায্য ও তাওফীকেই ভর করে আমি এই গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। অতএব, এই উপসংহারে আমি এর গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল, মৌলিক দিকনির্দেশনা এবং অর্জিত উপকারিতাসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করতে চাই। তিনি বলেন; আমি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তগুলোতে পৌঁছেছি:
.
(১).ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) এমন এক অস্থির ও সংকটময় যুগে জীবনযাপন করেছেন, যখন সমগ্র ইসলামী বিশ্ব ভাঙন, দুর্বলতা ও অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। মুসলিম সমাজে—বিশেষত ইয়েমেনে—মাযহাবি সংকীর্ণতা, দলীয় বিভক্তি এবং গোত্রভিত্তিক সংঘাত প্রকট আকার ধারণ করেছিল। তিনি রাফেযা, যায়দিয়া, সুফি, মুতাযিলা প্রভৃতি বিভিন্ন মতাদর্শ ও গোষ্ঠীর সমসাময়িক ছিলেন এবং তাদের মধ্যে বিরাজমান গোঁড়ামি, জড়তা, আকীদাগত বিচ্যুতি ও আমলগত বিকৃতি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন, যা ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষার পরিপন্থী ছিল।তাঁর চারপাশে তিনি দেখতে পান—ফাসাদ, অনিষ্ট, বিদআত, শিরক এবং দ্বীনের ব্যাপারে ব্যাপক অজ্ঞতা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, আলেমসমাজ ও শাসকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সৎ কাজের আদেশ (আমর বিল-মা‘রূফ) ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ (নাহী আনিল-মুনকার) করার মহান দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করছিল। পাশাপাশি বিচারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শাসকদের আচরণে সামাজিক অবিচার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল।এমন প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিবেশই ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর চিন্তাধারা, ব্যক্তিত্ব এবং সংস্কারমূলক দাওয়াহ কার্যক্রমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, যা পরবর্তীতে তাঁর ইলমি ও দাওয়াহি জীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
.
(২).ইমাম মুহাম্মদ ইবন আলী আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) একটি জ্ঞানসমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান পরিবারে প্রতিপালিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন তাঁর যুগের বিশিষ্ট আলেমদের অন্যতম, যিনি তাঁর চরিত্র গঠন ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি পুত্রের জন্য এমন অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেন, যাতে তিনি সম্পূর্ণভাবে ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করতে পারেন; এমনকি জীবিকার দায়ভারও নিজে বহন করেন।ফলত,ইমাম শাওকানী অতি অল্প বয়স থেকেই জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রসর হন। তিনি ইয়েমেনের সানআ নগরীর প্রখ্যাত আলেমদের নিকট ইলম শিক্ষা করেন এবং সেখানেই অবস্থান করে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন; জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তিনি অন্য কোথাও সফর করেননি। তাঁর ওপর বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেন তাঁর সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী—আব্দুল কাদির ইবন আহমাদ আল-কাওকাবানী, হাসান ইবন ইসমাঈল আল-মাগরিবী এবং আব্দুল্লাহ ইবন ইসমাঈল আন-নাহমী।তিনি শরঈ ও আরবি সকল শাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সমকালীন দার্শনিক বিদ্যাগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দেন—যেমন যুক্তিবিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও গণিত। অল্প বয়সেই তাঁর প্রতিভা এমন উচ্চতায় পৌঁছে যে, শিক্ষালাভের সময়কালেই তিনি অন্যদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন এবং মাত্র বিশ বছর বয়সেই ফতোয়া প্রদান করতে সক্ষম হন।পরবর্তীতে ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি ইজতিহাদের পুনর্জাগরণ, অন্ধ তাকলীদের পরিহার এবং সালাফে সালিহীনের অনুসৃত পথের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানোর সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং অবশেষে ১২৫০ হিজরিতে সানআ নগরীতেই ইন্তেকাল করেন।
.
(৩).ইমাম শাওকানী রহিমাহুল্লাহ তাঁর নানাবিধ ব্যস্ততা ও দায়িত্বের মাঝেও বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ ও রিসালা রচনা করে গেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁর এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের একটি বড় অংশ এখনো পাণ্ডুলিপি আকারেই রয়ে গেছে। সুতরাং এগুলোকে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই, গবেষণা ও সহজবোধ্য ভাষায় মুদ্রণের ব্যবস্থা করা সময়ের একান্ত দাবি, যাতে সাধারণ মানুষও তাঁর জ্ঞানধারা থেকে উপকৃত হতে পারে।”
.
(৪).ইমাম শাওকানী প্রাথমিকভাবে যায়দিয়া মাজহাবের উপর ফিকহ শিখেছিলেন এবং এই মাজহাবের অনুসারী ছিলেন,তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মাজহাবগত তাকলীদ ও নির্দিষ্ট দলবদ্ধ ধারার প্রতি আবদ্ধতা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে কোনো মাজহাব বা দলবদ্ধ সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং কুরআন ও সুন্নাহকে ন্যায়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন।তিনি শরঈ বিধান ও আকীদার ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ’র দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করতেন, মুখস্থ বা অনুসরণমূলক পদ্ধতিকে কখনোই প্রধান উৎস মানতেন না। ত্রিশ বছরের আগেই তিনি এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছান। তাঁর ইজতিহাদ, তাকলীদ ত্যাগ এবং শরীয়তকে সালাফে সালেহীনের পথে ফিরিয়ে আনার দাওয়াহ পূর্ববর্তী মুজাদ্দিদ ও সংস্কারকদের ধারাবাহিকতারই অংশ, যেমন: ইমাম মালেক, আবু হানিফা, আহমাদ বিন হাম্বল, ইবনু তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনুল ওয়াজীর, মাকবিলী, আমীর সানআনী এবং ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ).তবে, তাঁর এই দাওয়াহর কারণে তিনি তাঁর যুগের অনেক গোঁড়া ও অন্ধ অনুসারীদের কটু সমালোচনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে আহলে বাইতের মাজহাব নষ্টের অপবাদ দেওয়া হয়, অথচ এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে, যুগে যুগে দলিলনির্ভর মুজতাহিদ আলেমদের একই ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
.
(৫).ইমাম শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ প্রাথমিকভাবে কিছু গ্রন্থে সাহাবী আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফযীলত সম্পর্কে এমন হাদীস উল্লেখ করেছিলেন, যেগুলো দুর্বল বা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে জীবনের শেষ সময়ে তিনি ‘আল ফাওয়ায়িদুল মাজমূআ ফিল আহাদীসিল মাওযুআ’ গ্রন্থে এগুলোর অগ্রহণযোগ্যতা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন। এটি নির্দেশ করে যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে এসব হাদীসের দুর্বলতা তাঁর কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না; কিন্তু জ্ঞান ও অনুধাবনের পরিপক্কতার মাধ্যমে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এভাবেই তাঁর হাদীসবিদ্যায় ক্রমাগত জ্ঞানবৃদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তার পরিপক্কতা প্রতিফলিত হয়েছে—যা অন্যান্য মহান মুজতাহিদ আলেমদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়।
.
(৬).ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদার পদ্ধতি নিয়ে আমার গবেষণার মাধ্যমে আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ঈমানের মূল ভিত্তিতে আহলে সুন্নাহর সালাফদের সাথে সাধারণত একমত ছিলেন। বিশেষত ঈমানের ছয়টি মূল দিকের প্রতি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল:
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
৪. রাসূলগণের প্রতি ঈমান
৫. আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান
(৬). তাকদীর (নিয়তির বিষয়) প্রতি ঈমান। তবে কিছু অল্পসংখ্যক বিষয়ে তিনি সালাফদের মত থেকে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে তার মতামত এক গ্রন্থ থেকে অন্য গ্রন্থে ভিন্ন বা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দেখা যায়, যেমন কিছু গুণাবলীর বিষয়ে। নীচে সংক্ষেপে এসব বিষয় উল্লেখ করা হলো:
.
ক. তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ: তিনি সত্তা ও মর্যাদার মাধ্যমে মধ্যস্থতা প্রার্থনা করা বৈধ বলেছেন এবং এটিকে নেক আমলের মাধ্যমে তাওয়াসসুলের মতো গণ্য করেছেন। এটি তাঁরই কিছু গ্রন্থে শিরকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শিরকের দিকে নিয়ে যায় এমন সব মাধ্যম বন্ধ করার আহ্বানের সাথে সাংঘর্ষিক।
.
খ. আল্লাহর নামসমূহ: তিনি মত প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহর জন্য তাঁর গুণাবলী থেকে নাম রাখা বৈধ, চাই তা শরীয়তের নির্দিষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত হোক বা না হোক। তবে আমি তাঁর এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ তাঁর তাফসীর বা অন্য কোনো গ্রন্থে খুঁজে পাইনি।
.
গ. আল্লাহর সিফাতসমূহ:তিনি তাঁর তাফসীর “ফাতহুল কাদীর”-এ মহান আল্লাহর কিছু গুণাবলী আশআরী পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা (তাবীল) করেছেন।যেসব সিফাত তিনি এভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেগুলো হলো:যেমন: মুখমণ্ডল (ওয়াজহ), চোখ (আইন), হাত (ইয়াদ), উচ্চতা (উলুউ), আগমন (মাজি’ ও ইতিয়ান), ভালোবাসা (মুহাব্বাহ) এবং রাগ (গদব)।এই সিফাতগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে, এ ধরনের তাবীল বা ব্যাখ্যা তাঁর আরেকটি গ্রন্থ “আত-তুহাফ”-এ বর্ণিত নীতির পরিপন্থী। আত-তুহাফে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, সিফাতগুলোকে প্রকৃত অর্থেই গ্রহণ করতে হবে, কোনো বিকৃতি, অস্বীকার, পদ্ধতি বা সাদৃশ্য ব্যবহার না করে। এটাই হলো সালাফদের পদ্ধতি।তিনি তাঁর গ্রন্থ আত তুহাফ এ আল্লাহর সাথে থাকা সিফাতের ক্ষেত্রে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। সেখানে তিনি এটিকে ইলমের সাথে থাকা হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি বরং তিনি দাবি করেছেন যে, এভাবে ব্যাখ্যা করা তাবীলের একটি শাখা, যা সালাফদের পদ্ধতির বিরোধী। কিন্তু এটি তাঁর তাফসীর এবং তুহফাতুয যাকিরীন গ্রন্থে প্রদত্ত মতের সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি এই আল্লাহর সাথে থাকাকে ইলমের সাথে থাকা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এটিকেই সালাফদের ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট এই বিষয়ে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণকারীদের মত গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেননি যে কুরআন সৃষ্টি, না অসৃষ্টি।
.
ঘ. তাওহীদের বিরোধী বিষয়সমূহ:তিনি নবী ও নেককার ব্যক্তিদের কবরের কাছে দোয়া করার জন্য বিশেষভাবে স্থান নির্বাচন করা বৈধ বলেছেন, এ ধারণায় যে এসব স্থান বরকতময় এবং সেখানে দোয়া কবুল হয়। এটি তাঁর অন্যান্য গ্রন্থে শিরকের দিকে নিয়ে যায় এমন সব মাধ্যম বন্ধ করার যে আহ্বান তিনি দিয়েছেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক।তিনি কুরআনের নামে কসম করাকে আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর নামে কসম করার মতো গণ্য করেছেন।
.
ঙ. নবুওয়াত (নবীগণ): তিনি নবী ও রাসূলদের মধ্যে কে অধিক শ্রেষ্ঠ এই বিষয়ে নির্দিষ্ট মত প্রদান না করে বিরত থেকেছেন। সবশেষে, ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) যেসব আকীদাগত বিষয়ে মত প্রদান করেছেন, সেগুলোর প্রমাণ উপস্থাপনে সালাফদের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি বর্ণনাগত দলিলকে বুদ্ধিভিত্তিক যুক্তির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং কুরআন হাদীসের প্রকাশ্য অর্থকে রূপক অর্থের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন যেমনটি তাঁর আততুহাফ গ্রন্থে দেখা যায়। তবে আল্লাহ সাথে থাকা বিষয়টি এর ব্যতিক্রম, যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, তাঁর তাফসীরে ইস্তিওয়া-সহ অন্যান্য যেসব সিফাত তিনি উল্লেখ করেছেন, সেগুলো তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেগুলোর তাবীল করেননি। তার গ্রন্থসমূহে এই বিষয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যে দ্বিধা ও আপাত বিরোধিতা দেখা যায় এবং যেখানে তিনি সালাফ আহলে সুন্নাহর বিরোধিতা করেছেন তার জন্য এভাবে ওজর পেশ করা যায় যে, তিনি একটি যায়দিয়া পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর পড়াশোনাও সেই পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সেখান থেকে বাইরে যাননি। সম্ভবত সেই পরিবেশগত পরিস্থিতি তাঁকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সালাফ ইমামদের গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে জানার সুযোগ খুব বেশি করে দেয়নি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু বিষয়ে ভুল করেছেন। আমরা তাঁর জন্য নির্ভুলতার দাবি করি না। আমরা তাঁর সম্পর্কে এটুকুই বলি যে, তিনি একজন মানুষ আর মানুষ ভুলও করে, সঠিকও করে। যেমন তিনি নিজেই বলেছেন: ভুল করা মানুষের স্বভাব। প্রত্যেকের কথাই গ্রহণও করা হয়, আবার বর্জনও করা হয় তবে, একমাত্র নির্ভুল হলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। মানুষের প্রবৃত্তি ভিন্ন ভিন্ন হয়, উদ্দেশ্যও বিভিন্ন হয়, আর তোমার প্রতিপালক তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করত।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ. বলেন:(وقل طائفة من المتأخرين إلا وقع في كلامها نوع غلط لكثرة ما وقع من شبه أهل البدع ، و لهذا يوجد في كثير من المصنفات في أصول الفقه ، و أصول الدين و الفقه و الزهد و التفسير و الحديث ، من يذكر في الأل العظيم عدة أقوال ، ويحكي من مقالات الناس ألوانا ، و القول الذي بعث الله به رسوله صلى الله عليه و سلم لايذكره لعدم علمه به لا لكراهية لما عليه الرسول صلى الله عليه و سلم ) “পরবর্তী প্রজন্মের খুব কম দলই এমন আছে যাদের বক্তব্যে কোনো না কোনো প্রকার ভুল অনুপ্রবেশ করেনি; কারণ বিদআতিদের সংশয়-সন্দেহ তখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই কারণেই উসূলুল ফিকহ, উসূলুদ্দীন (আকীদা), ফিকহ, যুহদ (তপস্যা), তাফসীর এবং হাদীসের বহু গ্রন্থে এমন লেখক পাওয়া যায়, যারা মহান মূলনীতিসমূহ সম্পর্কে একাধিক মতভেদ উল্লেখ করেন এবং মানুষের নানাবিধ বক্তব্য বর্ণনা করেন; অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সত্য বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেটিই তিনি (লেখক) উল্লেখ করেন না। এটি তাঁর না-জানার কারণে হয়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি বিদ্বেষবশত নয়।”(শারহু হাদীসিন নুযূল ১১৮)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) আরও একটি মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, যেখানে তিনি এমন আলেম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন,যিনি সাধারণভাবে সত্যের পথে থাকেন, তবে কখনো কখনো কিছু বিষয় বা কিছু সময়ে তা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। একই সাথে তিনি জ্ঞানার্জনরত ছাত্রদের সতর্ক করেছেন যেন তারা কোনো আলেমের ত্রুটি বা ভুলকর্ম অনুসরণ না করে এবং তা পুনঃপ্রচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে না দেয়, শুধুমাত্র তার খ্যাতি, নেকীয়াত্ব, প্রভাব বা জ্ঞানের বিস্তারের কারণে নয়। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وليس لأحد أن يتبع زلات العلماء ، كما ليس له أن يتكلم في أهل العلم و الإيمان إلا بما هم له أهل ، فإن الله تعالى عفا للمؤمنين عما أخطؤوا ، كما قال تعالى : (ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا ) – البقرة 286 قال الله : قد فعلت . رواه مسلم و أمرنا أن نتبع ما أنزل إلينا من ربنا و لانتبع من دونه أولياء ، و أمرنا أن لا نطيع مخلوقا في معصية الخالق ، و نستغفر لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان ، فنقول : (ربنا اغفر لنا و لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان ) – الحشر 10 – الآية. وهذا أمر واجب على المسلمين في كل ما كان يشبه هذا من الأمور ، و نعظم أمره تعالى بالطاعة لله و رسوله و نرعى حقوق المسلمين ، لاسيما أهل العلم منهم ، كما أمر الله و رسوله ، ومن عدل عن هذه الطريق فقد عدل عن اتباع الحجة إلى اتباع الهوى في التقليد ، و آذى المؤمنين و المؤمنات بغير ما اكتسبوا ، فهو من الظالمين ، ومن عظم حرمات الله ، و أحسن إلى عباد الله ، كان من أولياء الله المتقين ، و الله سبحانه أعلم) “
“কারো জন্যই আলেমদের বিচ্যুতি বা ভুলসমূহ অনুসরণ করা বৈধ নয়; ঠিক যেমনিভাবে আলেম ও মুমিনদের সম্পর্কে তাদের প্রাপ্য (মর্যাদা) ব্যতীত অন্যভাবে কথা বলাও তার জন্য বৈধ নয়। কারণ,আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ভুলবশত করা অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, যেমনটি তিনি বলেছেন:’হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।’ (সূরা বাকারা: ২৮৬) আল্লাহ তাআলা (এর জবাবে) বলেছেন: ‘আমি তা কবুল করলাম।’ (সহীহ মুসলিম)।আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা আমাদের রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করি এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের (মনগড়া মতের) অনুসরণ না করি। আমাদের আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা স্রষ্টার নাফরমানি করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য না করি। আর আমরা যেন আমাদের সেই ভাইদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে চলে গেছেন, আমরা বলি:”হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদের ক্ষমা করুন যারা ঈমানের সাথে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছেন।”(সূরা হাশর: ১০)। অনুরূপ সকল বিষয়ে এটিই মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব বা অপরিহার্য কর্তব্য। আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের আদেশকে যথাযথ সম্মান প্রদান করব এবং মুসলমানদের অধিকার—বিশেষ করে আলেম সমাজের অধিকার—রক্ষা করব, যেভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নির্দেশ দিয়েছেন।যে ব্যক্তি এই পথ থেকে বিচ্যুত হলো, সে মূলত ‘হুজ্জত’ বা দলিলের অনুসরণ ছেড়ে প্রবৃত্তি ও অন্ধ অনুকরণের (তাকলীদ) দিকে ঝুঁকে পড়ল। সে মুমিন নর-নারীদের এমন বিষয়ে কষ্ট দিল যা তারা করেনি, ফলে সে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হলো। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পবিত্র বিষয়সমূহকে (হুরমাত) সম্মান করে এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ইহসান (সদাচরণ) করে, সে আল্লাহর মুত্তাকী বন্ধুদের (আউলিয়া) অন্তর্ভুক্ত হয়। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই সর্বাধিক অবগত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ৩২; পৃষ্ঠা: ২৩৯) এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে শাইখ মুহাম্মাদ উমর বাযমূলের গ্রন্থ আল ইন্তিসারু লিআহলিল হাদীস দেখুন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। (ফাসল আইয়ান আহলিল হাদীস ১০৩–১৩০)।
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) কি যায়েদী মাযহাব ত্যাগ করেছিলেন?
উত্তরে শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:نعم ليس هو على مذهب الزيدية، ولكن بحكم النشأة والدراسة ينقل عنهم، ينقل عن أئمة آل البيت؛ كالهادي وفلان والناصر والقاسم وفلان وفلان، عدد “হ্যাঁ, তিনি যায়েদী মাযহাবের ওপর (প্রতিষ্ঠিত) ছিলেন না। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনার প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি তাঁদের থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি আহলে বাইতের ইমামদের থেকে বর্ণনা করেন; যেমন আল-হাদী, অমুক, নাসির, কাসিম এবং আরও অনেকের থেকে।”(শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-২৫৪৫২)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্নকারী: ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আকীদা কী ছিল? এবং তাঁর কিতাবসমূহ—যেমন:’নাইলুল আওতার’ ও ‘আস-সাইলুল জাররার’—এর ফিকহী বৈশিষ্ট্য কী?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
: لا شك أن الإمام الشوكاني إمام مجتهد ، وله قدم راسخة في الفقه ، وهو مجتهد حتى في العقائد ، وليس فقط في الأحكام ، وهو يغلب عليه العقيدة السلفية ، ولكن صدق الإمام مالك الذي قال : ” ما منَّا من أحد إلا ردَّ و رُدَّ عليه ؛ إلا صاحب هذا القبر ” – وأشار إلى قبر النبي صلى الله عليه وآله وسلم – ، فله بعض الآراء التي يُخالف ما كان عليه السلف ، وهذه تُغتفر منه تجاه أن غالب عقيدته مطابقة لعقيدة السلف الصالح .يحضرني الآن من شواذِّه أنه يُجيز التوسُّل بالنبي – صلى الله عليه وآله وسلم – ، طبعًا هذا بعد وفاته – عليه السلام – ، ويستدل على ذلك بحديث الأعمى المعروف والمشهور بين طلبة العلم في هذا الزمان ، أنه لا يدل إلا على التوسُّل بدعاء النبي – صلى الله عليه وآله وسلم – وشفاعته ؛ فهو إذًا يُدْرس علمه من كتبه كلِّها ، ويُستفاد منها كثير من المسائل التي يغفلُ عنها بعض العلماء ، فضلًا عن طلبة العلم ، ولكن ينظر إلى ذلك مقرونًا بالدليل ؛ لكيلا يقع في شيء من الخطأ الذي قد يقع هو ونحن وغيرنا ممَّن يدرس العلم ؛ فإن العصمة للنبي – صلى الله عليه وآله وسلم – وليس لأحد سواه .نعم .
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাম শাওকানী একজন ‘মুজতাহিদ’ ইমাম এবং ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর সুগভীর জ্ঞান ও মজবুত পদচারণা রয়েছে। তিনি কেবল আহকাম বা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রেই নয়, বরং আকীদার বিষয়েও একজন মুজতাহিদ ছিলেন। তাঁর ওপর ‘সালাফি আকীদা’র প্রাধান্যই বেশি লক্ষ্য করা যায়।তবে ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) সত্যই বলেছেন:”আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার কথা গ্রহণও করা হয় আবার বর্জনও করা হয় না; কেবল এই কবরের অধিবাসী (অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যতীত।”সুতরাং, আকীদার ক্ষেত্রে তাঁর এমন কিছু বিচ্ছিন্ন মতামত রয়েছে যা সালাফদের (পূর্বসূরিদের) মানহাজ বা পথের পরিপন্থী। তবে তাঁর অধিকাংশ আকিদাই যেহেতু সালাফে সালেহীনের আকিদার সাথে সংগতিপূর্ণ, তাই সেই বিচ্যুতিগুলো তাঁর মহান ইলমি খিদমতের তুলনায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়। এই মুহূর্তে তাঁর একটি ব্যতিক্রমী মতের কথা আমার মনে পড়ছে—তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর তাঁর মাধ্যমে ‘তাওয়াসসুল’ (মধ্যস্থতা) করা জায়েজ মনে করতেন। এক্ষেত্রে তিনি অন্ধ ব্যক্তির সেই সুপরিচিত হাদীসটি দিয়ে দলিল পেশ করেন, যা বর্তমান সময়ের তলেবে ইলমদের নিকট সুপরিচিত। অথচ সেই হাদীসটি কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘দোয়া’ ও ‘শাফায়াত’ বা সুপারিশের মাধ্যমে তাওয়াসসুল করার প্রমাণ দেয় (তাঁর সত্তার মাধ্যমে নয়)।যাই হোক, তাঁর লিখিত সকল কিতাব থেকেই ইলম অর্জন করা উচিত। বিশেষ করে এমন অনেক সূক্ষ্ম মাসআলা তাঁর কিতাব থেকে শেখা যায় যা অনেক বড় আলেম বা তলেবে ইলমদের নজর এড়িয়ে যায়। তবে তাঁর বক্তব্যগুলো অবশ্যই দলিলের নিরিখে যাচাই করে নিতে হবে; যেন তাঁর বা আমাদের মতো অন্য কারো ভুলগুলো আমরা গ্রহণ না করে ফেলি। কারণ, ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে বা ‘মাসুম’ কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি ছাড়া আর কেউ নন। হ্যাঁ।”(সূত্র: ফাতাওয়া জিদ্দাহ, ক্যাসেট নম্বর: ০২)
.
পরিশেষে বলা যেতে পারে—ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত একজন বিশিষ্ট আলেম। অতএব, যারা দাবি করেন যে তিনি জায়েদি মাজহাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং এর ওপরই ইন্তেকাল করেছেন—তাদের এ বক্তব্য সঠিক নয়; বরং এটি তাঁর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।তবে এটিও সত্য যে, তিনি ইয়েমেনের একটি জায়েদি পরিবেশে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বিধায় জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি স্বাভাবিকভাবেই জাইদি শিয়া ছিলেন। ফলে প্রথমদিকে ফিকহের ক্ষেত্রে জাইদি মাজহাব অনুসরণ করতেন। আহলে বাইতের ইমামদের সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্যে সে পরিবেশের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জাইদি মাজহাব থেকে বের হয়ে আসেন এবং বিভিন্ন কিতাবে জাইদি মতাদর্শের সমালোচনা ও খণ্ডন করেন। যেমন : ইরশাদুল গবি ইলা মাজহাবি আহলিল বাইতি ফি সাহবিন নাবি, আস-সাইলুল জার্রার ইত্যাদি গ্রন্থ। সুতরাং আকীদা-মানহাজের দিক থেকে তিনি ছিলেন সুস্পষ্টভাবে সালাফি আহালুল হাদিস—যিনি কুরআন-সুন্নাহর বাহ্যিক (শাব্দিক) অর্থকে গ্রহণ করতেন এবং আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলাকে প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতেন।ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনাকে প্রামাণিক বলে গ্রহণ করতেন—বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ হোক বা অপ্রসিদ্ধ। এ বিষয়ে তিনি “আল-কাওলুল মাকবূল…”নামক গ্রন্থও রচনা করেছেন। তিনি কুতুবে সিত্তাহ ও বিভিন্ন মাসানিদ গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে ফতোয়া প্রদান করতেন এবং বহু ক্ষেত্রে জায়েদি মাজহাবের মতামতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “আস-সাইলুল জার্রার” মূলত জায়েদি ফিকহের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রতিপক্ষতা হিসেবে বিবেচিত। পরিশেষে, রাসূলগণ ব্যতীত কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন; তবে একজন বিজ্ঞ আলিমের নেক আমল ও ইলমি খিদমতের বিশাল সমুদ্র তাঁর ছোটখাটো ভুলগুলোকে ঢেকে দেয়। “আল্লাহ তাআলা তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁর ভালো খেদমতগুলো কবুল করে নিন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment