Monday, April 13, 2026

যুবকদের প্রতি একগুচ্ছ সোনালী উপদেশ

 যুবকদের প্রতি একগুচ্ছ সোনালী উপদেশ (শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. উপদেশ সহ)

প্রশ্ন: শাইখ, আমাদের যুব সমাজকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নসিহা করুন যেন, দ্বীনের পথে থাকতে পারি, হারাম থেকে বেঁচে থাকতে পারি এবং আল্লাহ ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পথে চলতে পারি।
উত্তর: যৌবনকাল আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত। কিন্তু চতুর্দিকে যখন ফিতনার সয়লাব চলছে, এমন সময়ে দ্বীনের পথে অবিচল থাকা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ও তৌফিক কামনা করার পাশাপাশি দৃঢ় মনোবল থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় এই পথে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। নিম্নে বর্ণিত নসিহতগুলো মেনে চলে আশা করি, একজন মুসলিম যুবক দ্বীনের ওপরে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে এবং তার দ্বারা দেশ ও জাতি উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
◈ ১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করা:
সালাত হলো মুমিনের ঢাল, যা তাকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
“নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” [সূরা আনকাবুত: ৪৫]
◈ ২. চোখের হেফাজত ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা:
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের এই যুগে কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা অপরিহার্য।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থানের (লজ্জাস্থান) জামানত দেবে, আমি তার জান্নাতের জামিন হব।” [সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪]
◈ ৩. সৎ সঙ্গী ও ভালো বন্ধু নির্বাচন:
মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ ও চরিত্রের দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
“মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩-সহিহ]
◈ ৪. যৌবনকাল সম্পর্কে জবাবদিহিতার প্রস্তুতি:
কিয়ামতের ময়দানে যৌবনকাল সম্পর্কে বিশেষ প্রশ্ন করা হবে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ… وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاهُ
“কিয়ামতের দিন কোনো আদম সন্তান তার রবের নিকট থেকে এক কদমও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়… (তার মধ্যে একটি হলো) তার যৌবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে।” [সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬-সহিহ]
◈ ৫. তাওবা ও ইস্তিগফারের অভ্যাস করা:
মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক তবে ওই ব্যক্তির শ্রেষ্ঠ যে, ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لا ذَنْبَ لَهُ
“গুনাহ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি এমন, যেন তার কোনো গুনাহই নেই।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫০-হাসান]
◈ ৬. আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার সংকল্প:
যৌবনকালকে ইবাদতে কাটানোর পুরস্কার অত্যন্ত বিশাল। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন যারা আরশের নিচে ছায়া পাবে। তার মধ্যে একজন হলো:
وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ
“সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে।” [সহিহ বুখারি: ৬৬০]
প্রিয় যুবক ভাই, একা থাকা অবস্থায় নিজেকে আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত রাখুন। কারণ শয়তান একাকী মানুষকে সহজেই পথভ্রষ্ট করে। দ্বীনি ইলম অর্জনে সচেষ্ট থাকুন এবং সবসময় এই দোয়াটি করুন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
“হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২-সহিহ]
❑ মুসলিম যুবকদের জন্য আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর কিছু উপদেশ:
(শাইখের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত এবং সংক্ষিপ্ত) যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাঈ, ফকিহ এবং শিক্ষক সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর কয়েকটি আলোচনা থেকে যুবকদের জন্য কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নসিহত ও দিকনির্দেশনা নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. ইলমে দ্বীন অর্জনে সচেষ্ট হওয়া:
যুবকদের প্রধান কাজ হলো, ইলমে নাফে বা কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনে সশরীরে পরিশ্রম করা এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ হাসিলের জন্য আল্লাহর কাছে তাওফিক প্রার্থনা করা। যেন তারা ভবিষ্যতে উম্মাহর পথপ্রদর্শক হতে পারে।
✪ ২. সঠিক বুঝ ও দূরদর্শিতা (بصيرة) তৈরি করা:
কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (টেক্সট) পড়ার সময় সেটির সঠিক মর্ম অনুধাবন করা জরুরি। কেবল ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে তুষ্ট না থেকে বারবার অধ্যয়ন করা এবং শিক্ষক ও বিজ্ঞ সহপাঠীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সঠিক বুঝ নিশ্চিত করা উচিত।
✪ ৩. আমল ও দাওয়াহর সমন্বয়:
দ্বীন হলো চারটি বিষয়ের সমষ্টি: ইলম (জ্ঞান), আমল (প্রয়োগ), দাওয়াহ (প্রচার) ও সবর (ধৈর্য)। যা কিছু জানা হবে (যেমন: সালাত, জাকাত, পর্দা) তা আমল করতে হবে এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
✪ ৪. না জেনে কথা বলা থেকে বেঁচে থাকা:
বিনা ইলমে বা না জেনে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে কোনো কথা বলা কবিরা গুনাহ, যা শিরকের কাছাকাছি পর্যায়ের। শয়তান মানুষকে সর্বদা না জেনে কথা বলতে এবং অশ্লীলতার দিকে প্ররোচিত করে; তাই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
✪ ৫. কুরআন ও সুন্নাহর সাথে গভীর সম্পর্ক:
– নিয়মিত তিলাওয়াত, হিফজ এবং তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) করতে হবে। অর্থ বোঝার জন্য তাফসিরে ইবনে কাসীর বা বাগভি পাঠ করা যেতে পারে।
– অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ের হাদিসের কিতাবগুলো যেমন—উমদাতুল আহকাম, বুলুগুল মারাম এবং আরবাঈন নববী (ইমাম নওয়াবির ৪০ হাদিস) মুখস্থ বা গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।
✪ ৬. ভারসাম্য রক্ষা করা (ইফরাত ও তাফরিত বর্জন):
দ্বীনের পথে চলার সময় ইফরাত (চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি) এবং তাফরিত (শিথিলতা)—উভয়টি বর্জন করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
✪ ৭. উপকারী কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করা:
শায়খ ইবনে বায (রহ.) যুবকদের জন্য বিশেষ কিছু কিতাবের নাম প্রস্তাব করেছেন:
– আকিদা ও মূলনীতি: কিতাবুত তাওহিদ, তিনটি মূলনীতি (সালাসাতুল উসুল)।
– হাদিস: সহীহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আরবায়া, মুত্তাওয়াত মালেক ও মুসনাদে আহমদ।
– ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর ‘যাদুল মাআদ’, ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়ীন’ এবং ‘ইগাছাতুল লাহফান’।
– এছাড়া ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ‘মুনতাকাল আখবার’ এবং ইবনুল আসিরের ‘জামেউল উসুল’।
✪ ৮. উম্মাহর সেবায় অন্যান্য বিদ্যা অর্জন:
দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি যদি সম্ভব হয় তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জাগতিক বিদ্যা অর্জন করাও সওয়াবের কাজ, যাতে উম্মাহর সেবা করা যায়। আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আমাদের সকল যুবককে সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

No comments:

Post a Comment

Translate