Sunday, February 22, 2026

ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান ও তা প্রতিরোধে করণীয়

 বর্তমানে চাঁদাবাজি আমাদের সমাজের একটি মারাত্নক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ এই চাঁদাবাজি। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং ফৌজদারি অপরাধ যা নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকী স্বরুপ। ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অরাজকতা ও দুর্নীতি—সবকিছুর নেপথ্যে চাঁদাবাজির প্রভাব স্পষ্ট। দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, নির্মাণ খাত—সবখানেই চাঁদাবাজির মহোৎসব। দেশীয় আইনে চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলাম অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। পবিত্র আল-কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির মতো অন্যায় ও জুলুমের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির বিধান। এই জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জাগরণ এখন সময়ের দাবি।
▪️চাঁদাবাজির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:
চাঁদাবাজি বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক জোরপূর্বক, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের নিকট থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায় করা।
এটি সরাসরি একটি জুলুম ও অপরাধ।
চাঁদাবাজি অনেক সময় ব্যক্তি পর্যায়ে, আবার কখনো কখনো রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের মাধ্যমেও সংঘটিত হয়ে থাকে।
▪️চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকসমূহ:
চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকগুলো অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর প্রভাব ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
যেমন—
– ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সচ্ছলতা বিনষ্ট করে।
– চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কে থাকে।
– শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানির ভয় থাকে।
– ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
– শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
– পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হয়ে মূল্য বৃদ্ধি পায়।
– দুর্নীতিবাজ আমলাদের কারণে রাষ্ট্রের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়।
– আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাঁদাবাজির ফলে অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়‌।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান:
ইসলামের শাসনব্যবস্থায় মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইন বিদ্যমান। ইসলামের নীতিমালায় সরকার, প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষে ব্যক্তির ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। প্রশাসনের কেউ যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সে আমানতের খেয়ানত করছে।
রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রক্ষক এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
[সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
এই হাদিস প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা চাঁদাবাজিকে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ প্রমাণ করেছে।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির পরিণতি:
ইসলামে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এতে আল্লাহর অভিশাপ ও গজব নেমে আসে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
وَضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًۭا قَرْيَةًۭ كَانَتْ ءَامِنَةًۭ مُّطْمَئِنَّةًۭ يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًۭا مِّن كُلِّ مَكَانٍۢ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ ٱللَّهِ فَأَذَاقَهَا ٱللَّهُ لِبَاسَ ٱلْجُوعِ وَٱلْخَوْفِ بِمَا كَانُوا۟ يَصْنَعُونَ
“আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দেন, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত; তার কাছে চারদিক থেকে প্রচুর রিজিক আসত। কিন্তু তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। ফলে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন।” [সুরা বাকারা: ১৮৮]
চাঁদাবাজি যেহেতু জুলুম তাই এটি আল্লাহর গজব ডেকে আনে।
কুরআন ও হাদিসে এসেছে, অন্যায়ভাবে উপার্জিত সম্পদ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।
▪️কুরআনে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ وَتُدْلُوا۟ بِهَآ إِلَى ٱلْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا۟ فَرِيقًۭا مِّنْ أَمْوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিও না, যাতে জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের একটি অংশ পাপের মাধ্যমে ভোগ করতে পারো।”
[সূরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَـٰرَةً عَن تَرَاضٍۢ مِّنكُمْ﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে তা বৈধ।” [সুরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿إِنَّمَا ٱلسَّبِيلُ عَلَى ٱلَّذِينَ يَظْلِمُونَ ٱلنَّاسَ وَيَبْغُونَ فِى ٱلْأَرْضِ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ﴾
“দোষারোপ তো তাদের ওপরই, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সুরা শুরা: ৪২]
এসব আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, চাঁদাবাজি একটি প্রকাশ্য জুলুম ও সীমালঙ্ঘন।
▪️হাদিসে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
«مَنِ ٱقْتَطَعَ حَقَّ ٱمْرِئٍۢ مُسْلِمٍۢ بِیَمِينِهِ فَقَدْ أَوْجَبَ ٱللَّهُ لَهُ ٱلنَّارَ»
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করে, সে কেয়ামতের দিন আগুন বহন করে আসবে।”
[সহিহ বুখারি: ৬৫৩৮]
তিনি আরো বলেন,
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
“যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১৮৩৩[
চাঁদাবাজরা সাধারণত প্রতারণা, হুমকি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে টাকা আদায় করে, যা এই হাদিসের আওতায় পড়ে।
▪️আধুনিক সমাজ ও চাঁদাবাজি:
বর্তমান যুগে চাঁদাবাজি নানা রূপে বিস্তার লাভ করেছে। যেমন—
– ট্রান্সপোর্ট চাঁদা
– দোকানপাট থেকে মাসিক চাঁদা
– বিভিন্ন দলের নামে চাঁদা
– পুলিশের নামে চাঁদা
ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে হারাম ও অন্যায় বলেছে।
▪️চাঁদাবাজি প্রতিরোধে করণীয়:
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে প্রয়োজন—
– সামাজিক জনসচেতনতা বৃদ্ধি
– ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার প্রচার
– আইনের কঠোর প্রয়োগ
– রাজনৈতিক প্রশ্রয় বন্ধ
– সুশাসন ও জবাবদিহিতা
– দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন
– ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা
– প্রযুক্তিনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
– জেলখানায় নৈতিক শিক্ষা
– দলমত নির্বিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ
▪️চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যাংকখাতের করণীয়:
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ—
– বেকারদের কর্মসংস্থানে সহজ শর্তে বিনিয়োগ করতে পারে
– উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে পারে
– সিএসআর কার্যক্রমে কর্মমুখী প্রকল্প নিতে পারে
– চাঁদাবাজি হারাম—এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে পারে
– অবৈধ লেনদেন সনাক্তে নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।
বর্তমানে চাঁদাবাজি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এক ভয়ানক ব্যাধি, যা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার ভিত্তিমূলকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইসলামে এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির নিন্দা ও এর পরিণতির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে ইসলাম একটি শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কতটা গুরুত্ব দেয়। তাই ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। ইসলামের দেখানো পথে, যেখানে কারো ওপর কোনো ধরনের জুলুম বা অন্যায় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, এমন একটি চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনই সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

লেখক: মোঃ খায়রুল হাসান।

সিএসএএ ব্যাংকার এবং সার্টিফায়েড শরিআহ অ্যাডভাইজার অ্যান্ড অডিটর।

গ্ৰন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

উৎস: বানিজ্য প্রতিদিন (banijjoprotidin)

No comments:

Post a Comment

Translate