Sunday, February 22, 2026

উচ্চস্বরে আমিন বলা এবং ইমামের আগে তা বলা প্রসঙ্গে শাইখ আলাবনি রাহিমাহুল্লাহ এর সাথে তার ছাত্রদের একটি চমৎকার আলোচনা

 প্রশ্নকারী: হে শায়খ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

শায়খ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
প্রশ্নকারী: উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলার বিষয়ে আপনার কিছু কথা রয়েছে। আমরা তা শুনতে চাই।
শায়খ: কী বিষয়ে?
প্রশ্নকারী: ইমামের পরে উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলার ব্যাপারে আপনার যে মত রয়েছে তা শুনতে চাচ্ছি।
শায়খ: উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলা যদি ইমামের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় তবে এটি একটি সহিহ সুন্নত। এটি মুসনাদে আহমদ ও অন্যান্য গ্রন্থে ওয়াইল ইবনে হুজর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে:
«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَرَأَ: {وَلَا الضَّالِّينَ} قَالَ: آمِينَ، وَرَفَعَ بِهَا صَوْتَهُ»
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ‘ওয়ালাদ দ্বাল্লীন’ পড়তেন তখন তিনি ‘আমিন’ বলতেন এবং এর মাধ্যমে নিজের আওয়াজ উচ্চ করতেন।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৯৩২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ২৪৮]
আর উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলা যদি মুক্তাদিদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় তবে আমাদের নিকট অধিকতর সঠিক মত হলো—মুক্তাদিরাও উচ্চস্বরে বলবে। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মারফু হাদিস নেই। তবে আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর সমপর্যায়ের ব্যক্তিদের থেকে বর্ণিত কিছু আসারের অনুসরণ করি। তাতে বলা হয়েছে:
أَنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ كَانَ يَرْتَجُّ بِتَأْمِينِ الْمَأْمُومِينَ بِزَمَانِهِ بِسَبَبِ جَهْرِهِمْ بِآمينَ
“আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সময়ে মুক্তাদিদের উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলার কারণে মসজিদে হারাম প্রকম্পিত হতো।”
সুতরাং পূর্বে আমি মুক্তাদিদের জন্য মনে মনে ‘আমিন’ বলাকে পছন্দ করলেও এখন আমার নিকট এটিই সত্যের নিকটবর্তী মনে হয় যে, মুক্তাদিগণও ইমামের সাথে উচ্চস্বরে ‘আমিন’ বলবে।
▪️ইমামের আগে মুক্তাদিদের আমিন বলা প্রসঙ্গে:
এই প্রসঙ্গে এমন একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যা অধিকাংশ মুসল্লিই ভুলে যান।
অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় যে, একটি ভুলের ওপর সবার যেন ঐক্যমত তৈরি হয়েছে; আর তা হলো, মুক্তাদিরা ইমামের আগেই ‘আমিন’ বলে ফেলে।
ভুলটি হলো এই যে, মুক্তাদিরা ইমামের আগে বেড়ে গিয়ে ‘আমিন’ বলে। ইমাম ‘ওয়ালাদ দ্বাল্লীন’ শেষ করতে না করতেই মুক্তাদিরা ইমামের শুরু করার আগেই ‘আমিন’ বলে চিৎকার শুরু করে দেয়। অথচ হাদিসের বক্তব্য বর্তমানে সাধারণ মানুষ যা করছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
✪ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا أَمَّنَ الْإِمَامُ فَأَمِّنُوا»
“যখন ইমাম ‘আমিন’ বলবে তখন তোমরাও ‘আমিন’ বলো।” [সহিহ বুখারি: ৭৮০]
এটি ঠিক তাঁর এই হাদিসের মতোই: «إِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا» “যখন তিনি তাকবির দেবেন তখন তোমরাও তাকবির দাও।” মুক্তাদিদের জন্য যেমন ইমামের আগে তাকবির দেওয়া জায়েজ নেই তেমনি ইমামের আগে ‘আমিন’ বলাও জায়েজ নেই।
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا، وَإِذَا قَالَ: سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَقُولُوا: رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ، وَإِذَا سَجَدَ فَاسْجَدُوا، وَإِذَا صَلَّى قَائِمًا فَصَلُّوا قِيَامًا، وَإِذَا صَلَّى جَالِسًا فَصَلُّوا جُلُوسًا أَجْمَعِينَ»
“ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে কেবল তাকে অনুসরণ করার জন্য।
সুতরাং তিনি যখন তাকবির দেবেন তখন তোমরা তাকবির দাও।
তিনি যখন রুকু করবেন তখন তোমরা রুকু করো।
যখন তিনি ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলবেন তখন তোমরা ‘রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ’ বলো
যখন তিনি সেজদা করবেন তখন তোমরা সেজদা করো।
যখন তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বেন তখন তোমরাও দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো।
এবং যখন তিনি বসে নামাজ পড়বেন তখন তোমরা সবাই বসে নামাজ পড়ো।” [সহিহ বুখারি: ৩৭৮]
এই হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও অন্যান্য সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে। এর সারকথা হলো—তাকবির, রুকু, সেজদা বা এর মধ্যবর্তী কোনো কিছুতেই মুক্তাদিদের জন্য ইমামের আগে বেড়ে যাওয়া জায়েজ নেই। ঠিক তেমনিভাবে ‘আমিন’ বলার ক্ষেত্রেও ইমামকে ডিঙিয়ে যাওয়া বৈধ নয়।
আপনারা যদি সজাগ হন এবং কোনো উচ্চস্বরের নামাজে মনোযোগ দিয়ে শোনেন তবে দেখবেন—অধিকাংশ মুক্তাদি ইমামের আগেই ‘আমিন’ বলছে।
তাই প্রত্যেক মুক্তাদির উচিত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। যখন ইমাম غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ ‘গায়রিল মাগদ্বুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দ্ব-ল্লীন’ শেষ করবেন তখন মুক্তাদি নিজেকে ধরে রাখবে এবং যতক্ষণ না সে শুনতে পাচ্ছে যে ইমাম নিজে ‘আমিন’ বলা শুরু করেছেন ততক্ষণ সে ‘আমিন’ বলবে না। যখন ইমাম শুরু করবেন, তখনই কেবল মুক্তাদি তাঁর অনুসরণ করবে।
✪ আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا أَمَّنَ الْإِمَامُ فَأَمِّنُوا، فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ الْمَلَائِكَةِ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
“যখন ইমাম ‘আমিন’ বলবে, তখন তোমরাও ‘আমিন’ বলো। কারণ যার ‘আমিন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমিন’ বলার সাথে মিলে যাবে তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” [সহিহ মুসলিম: ৪১০]
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য মাগফিরাত বা ক্ষমা পাওয়ার পথ কত সহজ করে দিয়েছেন! এই হাদিসটি তার একটি বড় প্রমাণ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, এই ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো—ইমামের আগে ‘আমিন’ না বলা। বরং ইমাম ‘আমিন’ বলার পর তাঁর সাথে মিলিয়ে ‘আমিন’ বলা। যে এটি করবে, আল্লাহ তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেবেন।
✪ আমি আবারও হাদিসটি বলছি যেন আপনাদের অন্তরে এটি গেঁথে যায়:
«إِذَا أَمَّنَ الْإِمَامُ فَأَمِّنُوا، فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ الْمَلَائِكَةِ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
“যখন ইমাম ‘আমিন’ বলেন তখন তোমরাও ‘আমীন’ বলো। কারণ যার ‘আমিন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমীন’ বলার সাথে মিলে যাবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” [সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৭৮০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৪১০]
আমি যে দেশে বা জনপদে গিয়েছি, প্রায় সব মসজিদেই এই ভুলটি হতে দেখেছি বলেই আপনাদের এটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
«وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَىٰ تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ»
“এবং আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, নিশ্চয়ই উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।” [সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৫]
⋐ সমাপ্ত ⋑ [সোর্স: alatha]
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate