Sunday, February 22, 2026

স্বামী যদি মোহর পরিশোধ না করে মৃত্যুবরণ করে

 প্রশ্ন: বিয়ের সময় যদি মোহরানার কিছু অংশ পরিশোধ করা হয় আর কিছু অংশ পরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরে স্বামী যদি তা আর পরিশোধ না করে বা মাফও না চায় বা বিষয়টিকে কোনো আমলেই না নেয় তখন সে অবস্থায় স্ত্রীর কী করণীয়? আর এক্ষেত্রে স্বামী কেমন গুনাহের ভাগিদার হবে? এমনটার কারণে কি বিবাহ বহাল থাকবে?

উত্তর: প্রত্যেক স্বামীর জন্যে তার স্ত্রীকে মোহরানা পরিশোধ করা ফরজ। চাই নগদ হোক কিংবা বাকি হোক। মোহর একজন নারীর আর্থিক নিরাপত্তা, তার প্রতি স্বামীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন এবং তার সম্মানের স্বীকৃতি। মোহরানা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে একটি দায়বদ্ধতা তৈরি করে।
✪ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে আদায় করতে হবে। এটি কোনো দান নয়, বরং স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।” [সূরা নিসা: ৪]
✪ যদি মোহরানা পরিশোধ করার পূর্বে স্বামী মৃত্যুবরণ করে তাহলে তা‌ তার রেখে যাওয়া ঋণ হিসেবে পরিগণিত হবে এবং অন্যান্য ঋণের মতোই তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তা পরিশোধ করতে হবে ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন করা এবং ওসিয়ত বাস্তবায়নের পূর্বে। এমনকি যদি স্ত্রী আগে মারা যায় তাহলেও স্বামীকে তার প্রাপ্য মোহর পরিশোধ করতে হবে এবং স্ত্রীর ওয়ারিশদের মাঝে তা বন্টন করা হবে। পবিত্র কুরআনে মিরাস বা উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:
مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ
“(এই বণ্টন হবে) তার করা অসিয়ত পূরণ করার পর অথবা ঋণ পরিশোধ করার পর।” [সূরা নিসা: ১১]
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, মোহরানা স্বামীর জিম্মায় একটি শক্তিশালী ঋণ।
➤ বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের সমাজে বিয়ের কাবিননামায় মোহরানার একটি অংশ ‘উসুল’ (নগদ) এবং বাকি অংশ ‘বাকি’ হিসেবে লেখা হয়। এটি শরিয়তসম্মত। তবে স্বামী অবশ্যই বাকি অংশ পরিশোধের নিয়ত রাখবেন। কিন্তু স্বামী যদি মোহর পরিশোধ করার মত কোন অর্থকড়ি রেখে না যায় তাহলে উত্তম হলো, তার ওয়ারিশগণ তার পক্ষ থেকে তার স্ত্রীকে মোহর পরিশোধ করবে। কেউ তা না করলে মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারি কোষাগার থেকে তা পরিশোধ করা হবে। হ্যাঁ, স্ত্রী যদি প্রাপ্য মোহরের কিছু অংশ কিংবা পুরোটাই ক্ষমা করে দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।
✪ কোন স্বামীর যদি মোহর পরিশোধের নিয়ত না থাকে বা সামর্থ্য থাকার পরেও তা পরিশোধে তালবাহানা করে এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে অনেক আলেমের মতে সমাজের আলেম-ওলামা বা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিগণ এই ব্যক্তির জানাজায় অংশগ্রহণ করবে না। যেন মানুষ এ বিষয়ে সর্তক হয়ে যায়। (যেমনটি অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে করা হয়)।
❒ মোহর পরিশোধ না করার নিয়ত রাখার পরিণতি:
যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মোহর পরিশোধ না করার নিয়ত রাখে, তবে হাদিসে তাকে ‘ব্যভিচারী’ হিসেবে গণ্য করার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
দলিল: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: “أيما رجل تزوج امرأة على ما قل من المهر أو كثر، ليس في نفسه أن يؤدي إليها حقها، خدعها فمات ولم يؤد إليها حقها، لقي الله يوم القيامة وهو زان”
“আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নারীকে কম বা বেশি মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করল অথচ তার মনে এই ইচ্ছা আছে যে, সে তার হক (মোহর) আদায় করবে না সে মূলত তাকে ধোঁকা দিল। এই অবস্থায় সে যদি মারা যায় তবে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সামনে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” [আল মু’জামুল আওসাত, হাদিস নং-১৮৫১; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস নং-৭৪৯৫]
❒ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতওয়া কমিটির ফতওয়া:
প্রশ্ন: “জনৈক ব্যক্তি এক ছেলের কাছে তার মেয়েকে নির্দিষ্ট মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে দেন। মোহরানার অর্ধেক অগ্রিম পরিশোধ করা হয়। এরপর স্বামী তার স্ত্রীর সাথে বাসর করেন এবং স্ত্রী গর্ভবতী হন। পরবর্তীতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী মৃত্যুবরণ করেন এবং তার মৃত্যুর পর স্ত্রী একটি সন্তান প্রসব করেন। এখন প্রশ্ন হলো, মোহরানার বাকি অর্ধেক কি স্বামীর জিম্মায় ঋণ হিসেবে গণ্য হবে যা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের আগেই পরিশোধ করতে হবে? নাকি এটি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে না এবং দুর্ঘটনার দিয়ত (রক্তপণ) সহ সব সম্পদ সরাসরি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে? আমাদের ফতোয়া জানাবেন।
উত্তর:
إذا كان الأمر كما ذكر، فنصف المهر الباقي واجب في ذمة الزوج بالدخول، واعتبر دينا عليه للزوجة، وحيث لم يدفعه لها في حياته، فيجب دفعه إليها من تركته بعد وفاته قبل تقسيم إرثه على المستحقين من الدية أو غيرها إن كان له مال آخر‏.‏ وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم‏.‏
“ঘটনা যদি তেমনই হয় যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে তবে বাসর হওয়ার কারণে মোহরানার বাকি অর্ধেক পরিশোধ করা স্বামীর জিম্মায় ওয়াজিব এবং এটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে তার ওপর ঋণ হিসেবে গণ্য। যেহেতু স্বামী তার জীবদ্দশায় তা পরিশোধ করেনি, তাই তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মাঝে মিরাস বণ্টনের আগেই তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি (তথা দিয়ত বা অন্য কোনও সম্পদ থাকলে তা) থেকে এই পাওনা পরিশোধ করা আবশ্যক। আল্লাহই তাওফিক দানকারী। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবিবর্গের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।” [ফাতাওয়া আল লাজনাহ আদ দায়িমাহ, ফতোয়া নং: ১৬০৪৩]
◈ কোন স্বামীর যদি মোহর পরিশোধের নিয়ত না থাকে বা সামর্থ্য থাকার পরেও তা পরিশোধে তালবাহানা করে এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে অনেক আলেমের মতে সমাজের আলেম-ওলামা বা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিগণ এই ব্যক্তির জানাজায় অংশগ্রহণ করবে না। যেন মানুষ এ বিষয়ে সর্তক হয়ে যায়। (যেমনটি অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে করা হয়)।
◈ মোহর পরিশোধ না করার নিয়ত রাখার পরিণতি:
যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মোহর পরিশোধ না করার নিয়ত রাখে তবে হাদিসে তাকে ‘ব্যভিচারী’ হিসেবে গণ্য করার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَيُّما رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً عَلى ما قَلَّ مِنَ المَهْرِ أَوْ كَثُرَ ، لَيْسَ في نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْها حَقَّها ؛ خَدَعَها ، فَماتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْها حَقَّها ؛ لَقِيَ اللهَ يَوْمَ القِيامَةِ وَهُوَ زانٍ ، وَأَيُّما رَجُلٍ اسْتَدانَ دَيْنًا لا يُرِيدُ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلى صاحِبِه حَقَّهُ ؛ خَدْعَةً حَتّى أَخَذَ مالَهُ ، فَماتَ وَلَمْ يَرُدَّ إِلَيْهِ دِينَهُ ؛ لَقِيَ اللهَ وَهُوَ سارِقٌ .
“যে ব্যক্তি কম বা বেশি মোহরানার বিনিময়ে কোনো নারীকে বিয়ে করল অথচ তার অন্তরে কনের হক (মোহরানা) আদায় করার ইচ্ছা নেই; বরং সে তাকে ধোঁকা দিল, অতঃপর সে মোহরানা আদায় না করেই মৃত্যুবরণ করল তবে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সাথে জিনাকারী (ব্যভিচারী) হিসেবে সাক্ষাৎ করবে। আর যে ব্যক্তি কাউকে ফাঁকি দিয়ে তার সম্পদ হস্তগত করার জন্য ঋণ গ্রহণ করল অথচ তার মনে সেই পাওনাদারের হক পরিশোধ করার কোনো ইচ্ছা নেই। অতঃপর সে ঋণ পরিশোধ না করেই মারা গেল তবে সে আল্লাহর সাথে চোর হিসেবে সাক্ষাৎ করবে।” [সহীহ আত তারগীব: ১৮০৭, মুজামুস সগীর: ১১১]
❒ স্বামী যদি মোহরানা পরিশোধ না করে তাহলে কি বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল হয়ে যাবে?
উত্তর: ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, মোহরানা পরিশোধ না করা একটি জঘন্যতম পাপ এবং এটি স্ত্রীর পাওনা একটি ‘আবশ্যকীয় ঋণ’। তবে মোহরানা আদায় না করার কারণে মূল বৈবাহিক সম্পর্ক বা আকদ বাতিল হয়ে যায় না। অর্থাৎ অর্থাৎ স্বামী গুনাহগার হওয়া সত্ত্বেও তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট থাকে। স্ত্রীকে তার এই পাওনা আদায়ের জন্য তাগাদা দেওয়ার এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ইসলাম দিয়েছে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate