Sunday, February 22, 2026

মহাগ্রন্থ আল কুরআন সম্পর্কে সঠিক আকিদা এবং ভ্রান্ত আকিদা

 একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব: মহাগ্রন্থ আল কুরআন, কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি, বর্ণ, আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর, মর্মার্থ ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক আকিদা এবং ভ্রান্ত আকিদা:

আমরা জানি, কুরআন মহান আল্লাহর কালাম এবং তা মহান আল্লাহর সিফত (গুণ)। এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদা হল, তা সৃষ্টি জগতের অন্তর্ভুক্ত নয় (গাইরে মাখলুক)। কিন্তু কুরআনের তিলাওয়াতের সময় পাঠকের উচ্চারিত শব্দ/ধ্বনি (লফজ), তিলাওয়াতের আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর, তিলাওয়াত কৃত আয়াত বা আয়াতাংশ এবং তার মর্মার্থ ইত্যাদি কোনটা মাখলুক (আল্লাহর সৃষ্ট) এবং কোনটা মাখলুক নয় (আল্লাহর সৃষ্টি নয়)—এসব বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ এবং ভ্রান্ত ফেরকাগুলোর আকিদার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রাহ.) এবং তাঁর ক্লাসের ছাত্রদের মাঝে প্রশ্নোত্তর মূলক একটি কথোপকথনে। আশা করা যায়, উক্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে জ্ঞানপিপাসু তালেবুল ইলমগণ এই স্পর্শকাতর ও সূক্ষ্ম বিষয়ে সঠিক আকিদা-বিশ্বাস লালনে সক্ষম হবেন। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
❑ ক. কুরআনুল কারিমের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা:
শাইখ: নতুন পাঠ শুরু করার আগে আমরা পূর্বের পাঠ থেকে কী শিখলাম তা একটু দেখে নিই।
ইয়াসির, বলো তো—কুরআনুল কারিমের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা কী? বিশেষ করে উচ্চারিত ‘লফজ’ বা শব্দের ক্ষেত্রে—তা কি মাখলুক (সৃষ্ট) নাকি গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট)?
ছাত্র: কুরআন মাজিদের শব্দের (লফজ) ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অভিমত হলো—তা ‘গাইরে মাখলুক’ বা সৃষ্টি নয়।
শাইখ: (সংশোধন করে) কুরআনের লফজ বা শব্দের ব্যাপারে… অর্থাৎ কুরআন পাঠ করার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর অভিমত কি এমন?
ছাত্র: মানুষ যা উচ্চারণ করে, সেই মানুষ নিজে তো মাখলুক বা সৃষ্টি। তার থেকে যে আওয়াজ বা বর্ণ বের হয় সেটিও মাখলুক। কিন্তু মূল বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিবেচনা করলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে (বক্তব্য)। তাই তা মাখলুক নয়।
শাইখ: তোমার উদ্দেশ্য কি মানুষের সত্তা?
ছাত্র: জি, মানুষের সত্তা মাখলুক। মানুষ থেকে যা প্রকাশিত হয় এবং যা পাণ্ডুলিপিতে (মুসহাফ) লেখা হয় তাও মাখলুক। কারণ তা মানুষের কাজ আর মানুষ নিজেই মাখলুক। কিন্তু যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে তা মাখলুক নয়।
শাইখ: আবদুর রহমান, তুমি বলো।
ছাত্র: আওয়াজ বা শব্দ মাখলুক। কিন্তু ‘কালাম’ বা কথাটি আল্লাহর।
শাইখ: আওয়াজটি কার?
ছাত্র: আওয়াজ ক্বারী (পাঠকের), আর কথা ‘বারী’র (সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর)।
শাইখ: এবং বক্তব্যটিও মহান আল্লাহর। ঠিক আছে। সবাই শোনো—এখানে চারটি বিষয় আছে: পাঠক (ক্বারী), পাঠ করা (ক্বিরাআত), আওয়াজ (সউত) এবং যা পাঠ করা হচ্ছে (মাকরূ)। তাই না? এখন বলো, পাঠক কে?
ছাত্ররা: মাখলুক (সৃষ্ট)।
শাইখ: আর পাঠ করা—যা মূলত পাঠকের কাজ?
ছাত্ররা: মাখলুক।
শাইখ: আর আওয়াজ?
ছাত্ররা: মাখলুক।
শাইখ: আর যা পাঠ করা হচ্ছে (অর্থাৎ আল্লাহর কালাম)?
ছাত্ররা: গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট)।
শাইখ: হ্যাঁ, এটিই হলো গাইরে মাখলুক। তাহলে এই চারটি বিষয়ের মধ্যে একটি হলো অসৃষ্ট, আর বাকি তিনটি হলো সৃষ্টি। আচ্ছা, শ্রবণের (শোনা) ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি এখানে তিনটি বিষয় আছে: শ্রোতা, শোনা এবং যা শোনা যাচ্ছে। শ্রোতা কে?
ছাত্ররা: মাখলুক।
শাইখ: শোনা বা শ্রবণক্রিয়া?
ছাত্ররা: মাখলুক।
শাইখ: আর যা শোনা যাচ্ছে (মাসমূ)?
ছাত্ররা: (নীরবতা)…
শাইখ: এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। যদি শোনা বস্তু দ্বারা ‘পাঠকের কণ্ঠস্বর’ উদ্দেশ্য হয়, তবে তা মাখলুক। আর যদি সেই শব্দ দ্বারা ‘যা পাঠ করা হচ্ছে’ (আল্লাহর কালাম) উদ্দেশ্য হয়, তবে তা গাইরে মাখলুক। এই মাসআলায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ অভিমত হলো এটাই।
জেনে রেখো, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বা তাঁদের আলেমগণ এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে যেতেন না যদি না প্রয়োজন হতো। যখন বিদআতিরা এই বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করল, তখন তাঁরা কথা বলতে বাধ্য হলেন। অন্যথায় আমরা স্রেফ এটাই বলতাম যে—’কুরআন আল্লাহর কালাম’, ব্যস এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ
“তাকে আশ্রয় দাও যেন সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়।” [সূরা তাওবাহ: ৬] কিন্তু বিদআতিদের মোকাবিলা ও তাদের যুক্ত খণ্ডন করার জন্যই আলেমগণ এই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
❑ খ. কুরআনের ব্যাপারে মুতাজিলাদের আকিদা:
আচ্ছা আব্দুল্লাহ, কুরআনের ব্যাপারে মুতাজিলাদের আকিদা কী?
ছাত্র: তাদের মতে কুরআন ‘মাখলুক’ (সৃষ্ট)।
শাইখ: হ্যাঁ, তাদের মতে এটি মাখলুক। সেই হিসেবে উপরে উল্লেখিত চারটি বিষয়ই (পাঠক, পাঠ, আওয়াজ এবং পঠিত বিষয়) তাদের কাছে মাখলুক। তারা মনে করে আল্লাহর কালাম সৃষ্টিজগত বা মাখলুকাতেরই একটি অংশ। আচ্ছা আদম, তাহলে তারা কেন একে আল্লাহর দিকে নিসবত করে ‘আল্লাহর কালাম’ বলে?
ছাত্র: কারণ… (দ্বিধা)।
শাইখ: আহমেদ বলো।
শাইখ: মুতাজিলাদের দৃষ্টিতে কুরআন যদি আকাশ-পৃথিবী বা চন্দ্র-সূর্যের মতো সৃষ্ট বিষয়ই হয়, তবে তারা কেন একে ‘আল্লাহর কালাম’ বলে?
আহমেদ: তারা বলে যে, একে আল্লাহর দিকে নিসবত করা হয়েছে কেবল সম্মান জানানোর জন্য (ইজাফাতুত তাশরীফ)। যেমন বলা হয় ‘নাকাতুল্লাহ’ (আল্লাহর উষ্ট্রী)। অর্থাৎ তারা বলে—আমরা যা বলি তাও আল্লাহর সৃষ্টি আর কুরআনও আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু কুরআনকে সম্মান বোঝাতে ‘আল্লাহর কালাম’ বলা হয়।
❑ গ. কুরআনের ব্যাপারে আশআরিদের আকিদা:
শাইখ: আচ্ছা বন্দর, আশআরিরা আল্লাহর কালামের ব্যাপারে কী বলে?
ছাত্র: তারা বলে—শব্দগুলো মাখলুক বা সৃষ্টি, কিন্তু এর ‘অর্থ’ আল্লাহর সত্তার সাথে বিদ্যমান একটি গুণ, যা মাখলুক নয়।
শাইখ: তার মানে তারা কালামকে অর্ধেক মাখলুক আর অর্ধেক গাইরে মাখলুক বানিয়ে ফেলেছে! তাদের মতে মনে মনে যে অর্থ থাকে (কালামে নাফসি) তা অসৃষ্ট, আর শব্দগুলো সৃষ্টি। আচ্ছা আব্দুর রহমান বিন দাউদ, কালাম যদি কেবল মনের অর্থই হয়, তবে তাদের মতে আদেশ, নিষেধ, সংবাদ বা আরবী-হিব্রু-সুরিয়ানি ভাষার পার্থক্যগুলো কী?
ছাত্র: তারা বলে এ সবই মূলত এক ও অভিন্ন।
শাইখ: হ্যাঁ, তাদের মতে আদেশ-নিষেধ, প্রশ্ন-সংবাদ সব এক। তাওরাত-কুরআন সব একই জিনিস, কেবল প্রকাশের ভঙ্গি আলাদা। তারা তাদের এই মতের সপক্ষে একটি কবিতা দিয়ে দলিল দেয়, যা আখতাল নাসরানী নামক এক ব্যক্তি বলেছিল। সে কী বলেছিল?
ছাত্র: সে বলেছিল:
إِنَّ الْكَلَامَ لَفِي الْفُؤَادِ ۞ وَإِنَّمَا جُعِلَ اللِّسَانُ عَلَى الْفُؤَادِ دَلِيلَا
“নিশ্চয়ই কথা তো থাকে হৃদয়ে আর জবানকে হৃদয়ের কথার দলিল (প্রকাশক) বানানো হয়েছে।”
শাইখ: কবিতাটি কি তাদের দাবির সপক্ষে দলিল হতে পারে, রাশাদ?
ছাত্র: না, এটি তাদের দাবির পক্ষে কোনো দলিল নয়।
শাইখ: তাহলে এই কবিতার অর্থ কী?
ছাত্র: এর অর্থ হলো, কথার সারবস্তু হৃদয়ে থাকে এবং জবান তা প্রকাশ করে। কিন্তু হৃদয়ের ভাব আর মুখের কথা কি এক? অবশ্যই না।
◈ বিশ্লেষণ:
আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে কুরআন পাঠের চারটি স্তর:
☑ পাঠক: القارئ (ক্বারী) হল, মাখলুক (মানুষ সৃষ্ট)।
☑ পাঠ করা (কাজ): القراءة (ক্বিরাআত) হল, মাখলুক (পাঠকের কাজ সৃষ্ট)।
☑ আওয়াজ/কণ্ঠস্বর: الصوت (সউত), হল, মাখলুক (কণ্ঠস্বর সৃষ্ট)।
☑ পঠিত বিষয় (কুরআন): المقروء (আল মাকরূ) হল, গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট আল্লাহর কালাম)।
শাইখের আলোচনা থেকে তিনটি প্রধান দলের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে:
✪ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত: কুরআন আল্লাহর কালাম, যা তিনি স্বয়ং উচ্চারণ করেছেন। এর শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তা ‘গাইরে মাখলুক’ বা সৃষ্টি নয়। তবে মানুষের কণ্ঠস্বর বা পড়ার কাজটুকু মাখলুক।
✪ মুতাজিলা: তাদের মতে কুরআন সম্পূর্ণভাবে ‘মাখলুক’ বা সৃষ্টি। তারা মনে করে আল্লাহ কথা বলেন না, বরং তিনি অন্যের মধ্যে কথা সৃষ্টি করেন।
✪ আশআরিয়া: তারা মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করে বলে যে—কুরআনের শব্দগুলো (লফজ) মাখলুক। কিন্তু এর অর্থ আল্লাহর সত্তায় বিদ্যমান (কালামে নাফসি), যা মাখলুক নয়।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল,
القرآنُ كلامُ الباري والصَّوتُ صوتُ القارئِ
“কুরআন হল, বারীর (সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর) কথা আর আওয়াজ হলো ক্বারীর (পাঠকের)।।”
➧ মূলকথা, অত্র আলোচনায় শাইখ উসাইমিন (রাহ.) অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিষ্কার করেছেন যে, আমরা যখন কুরআন পড়ি তখন আমাদের জিহ্বা, কণ্ঠস্বর এবং শক্তি ব্যয় হয় যা মাখলুক। কিন্তু আমরা যা পাঠ করছি (অর্থাৎ কুরআন) তা অবিকল মহান আল্লাহরই বাণী—যা সৃষ্টি নয়।
উৎস: আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কর্তৃক ইবনুল কাইয়েম রহ. কর্তৃক রচিত القصيدة النونية -এর শরাহ (ব্যাখ্যা)-[alathar]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও বিশ্লেষণ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদ আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate