প্রশ্ন: আমরা জানি, রমজানে রোজা অবস্থায় দুআ কবুল হয়। প্রশ্ন হল, রোজা ছাড়া সন্ধ্যার পরও কি রমজান মাসে দুআ কবুল হয়?
উত্তর: রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তই বরকতময়। কেউ যদি তওবার শর্তাবলী (গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প) ঠিক রেখে তওবা করে। তবে আল্লাহ তা কবুল করবেন বলে আশা করা যায়—চাই তা রমজান হোক বা অন্য মাসে হোক, রমজানের দিনে হোক বা রাতে হোক। তবে শর্ত হল, যেসব কারণে দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় সেগুলো থেকে মুক্ত থাকতে হবে। যেমন: হারাম উপার্জন ও খাদ্যাভ্যাস পরিত্যাগ, দুআর মধ্যে তাড়াহুড়ো করা না করা, উদাসীন মনে দুআ না করা ইত্যাদি)। তবে রমজানে রোজা অবস্থায় দুআ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অনুরূপভাবে যেহেতু রাতের শেষাংশে দুআ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই রমজানেও যদি কেউ শেষ রাতে (সেহরির সময়) আল্লাহর নিকট দুআ করে তাহলে তার দুআ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি আশা করা যায় ইনশাআল্লাহ।
◈ ১. রোজাদার ব্যক্তির দুআ কবুল হয়:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রোজাদারের দুআ আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। তিনি বলেছেন:
ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ
“তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মজলুমের (অত্যাচারিত ব্যক্তির) দুআ।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৫৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫২]
আল্লামা আলবানি রহ. সহ আধুনিক অনেক মুহাদ্দিস এই হাদিসটিকে ‘সহিহ’ বা ‘হাসান’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
◈ ২. ইফতারের মুহূর্তের দুআ কবুলের অধিক আশা ব্যঞ্জক সময়:
ইফতারের সময়টি দুআ কবুলের জন্য অত্যন্ত আশা ব্যঞ্জক মুহূর্ত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ لَدَعْوَةً مَا تُرَدُّ
“নিশ্চয়ই ইফতারের সময় রোজাদারের এমন একটি দুআ রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩]
এ হাদিসটি সহিহ না কি জঈফ এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। আল্লামা আলবানি রহ. এটিকে সনদগতভাবে জঈফ সাব্যস্ত করলেও ইমাম বুসিরি, ইবনে হাজার আসকালানি, আহমদ শাকের সহ কতিপয় মুহাদ্দিস সহিহ/হাসান হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
মোটকথা, এ হাদিসটিকে জঈফ ধরে নিলেও রোজা অবস্থায় দুআ কবুলের সহিহ হাদিস অনুযায়ী এবং ইফতারের আগে রোজাদারদের দুর্বল অবস্থায় থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ইফতারের পূর্বে দুআ করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইনশাআল্লাহ।
তাই রোজাদারের উচিৎ, সারা দিন রোজা অবস্থায় দুয়া করার সুযোগকে হাত ছাড়া না করা। বিশেষ করে ইফতারে আগের সময়টিকে দুআর জন্য বেশি গুরুত্ব দেয়া
◈ ৩. রমজানের প্রতিটি দিন ও রাতে দুআ কবুলের সম্ভাবনা থাকে:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِنَّ لِلَّهِ فِى كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ عُتَقَاءَ مِنَ النَّارِ فِى شَهْرِ رَمَضَانَ ، وَإِنَّ لِكُلِّ مُسْلِمٍ دَعْوَةً مُسْتَجَابَةً
“নিশ্চয়ই রমজানের প্রতি দিন ও রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা রয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের এমন একটি দুআ রয়েছে যা কবুল হয়।” [মুসনাদে আহমদ: ৭৪৫০, সহিহ আত তারগিব: ১০০২]
◈ ৪. শেষ রাতের (সেহরির সময়) দুআ কবুলের আশা ব্যঞ্জক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়:
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
“আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা করেন— কে আছো যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?” [সহিহ বুখারি: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮]
মোটকথা, রমজানের দিন ও রাত উভয়ই দুআ ও তওবা কবুলের জন্য অত্যন্ত কার্যকর সময়। বিশেষ করে সেহরির সময় এবং ইফতারের পূর্ব মুহূর্তটি আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালনের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সকল হালাল মন বাসনা পূর্ণ করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment