ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান যা প্রতিটি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে বাবার অবর্তমানে বা বাবার উপস্থিতিতেও চাচার যে বিশাল সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুস্পষ্ট। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাচার মর্যাদাকে বাবার মর্যাদার সাথে তুলনা করেছেন।
✪ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ! مَنْ آذَى عَمِّي فَقَدْ آذَانِي، فَإِنَّمَا عَمُّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ»
“হে লোকসকল! যে ব্যক্তি আমার চাচাকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। কেননা চাচা বাবারই সমতুল্য।” [সুনানে তিরমিজি, ইমাম তিরমিযি এটিকে ‘হাসান’ বলেছেন)
✪ আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«يَا عُمَرُ، أَمَا شَعَرْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟»
“হে ওমর! তুমি কি জানো না যে, ব্যক্তির চাচা তার বাবারই সমতুল্য?” [সহীহ মুসলিম]
❑ হাদিসের ব্যাখ্যা:
◆ ক. উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
أَيْ مِثْلُ أَبِيهِ، وَفِيهِ تَعْظِيمُ حَقِّ الْعَمِّ
“চাচা বাবার মতো” এখানে চাচার অধিকারের সুমহান মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।”
◆ খ. মানাবী (রহ.) বলেন,
أَصْلُهُمَا وَاحِدٌ، فَتَعْظِيمُهُ كَتَعْظِيمِهِ، وَإِيذَاؤُهُ كَإِيذَائِهِ
“চাচা ও বাবার মূল এক। তাই তাকে সম্মান করা বাবাকে সম্মান করার মতোই আর তাকে কষ্ট দেওয়া বাবাকে কষ্ট দেওয়ার মতোই অপরাধ।”
◆ গ. কাজি আয়াজ (রহ.) বলেন:
قَدْ أَنْزَلَهُ الْعُلَمَاءُ مَنْزِلَةَ الْأَبِ فِي كَثِيرٍ مِنَ الْحُقُوقِ
“উলামায়ে কেরাম অনেক অধিকারের ক্ষেত্রেই চাচাকে বাবার স্তরে মর্যাদা দিয়েছেন।”
❑ চাচা নারীর জন্য মাহরাম:
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, চাচা একজন নারীর জন্য আজীবন ‘মাহরাম’ (যাদের সাথে বিবাহ হারাম)। তাই একজন নারী তার চাচার সামনে পর্দা করা ছাড়া দেখা দিতে পারেন এবং তার সাথে সফরও করতে পারেন। এটি চাচার প্রতি ইসলামের বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার একটি দিক।
❑ চাচার প্রতি আমাদের দায়িত্ব বিষয়ে শাইখ বিন বায রহ.-এর উপদেশ:
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. এক প্রশ্নের উত্তরে চাচার সাথে সদাচরণ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন:
“চাচা যদি সম্পর্ক ছিন্ন করতেও চান তবুও ভাতিজাদের উচিত তার সাথে সম্পর্ক রাখা। কারণ প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী সেই ব্যক্তি নয় যে বিনিময়ে সম্পর্ক রাখে বরং সেই ব্যক্তি যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তা জুড়ে দেয়। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا»
“সেই ব্যক্তি প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী নয়, যে কেবল সমান সমান ব্যবহার করে (অর্থাৎ কেউ ভালো ব্যবহার করলে সেও ভালো ব্যবহার করে)। বরং প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী সেই ব্যক্তি, যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে তা বজায় রাখে।” [সহীহ বুখারি]
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন:
«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ»
“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [সহীহ মুসলিম]
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَجَلِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ»
“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তার রিজিক বৃদ্ধি করা হোক এবং তার হায়াত দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” [সহীহ বুখারি ও মুসলিম]
চাচার সাথে সুন্দর কথা, সালাম বিনিময় এবং চাচা অভাবগ্রস্ত হলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে আর্থিক সহযোগিতা করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। চাচা যদি কোনও ভুল বা গুনাহর কাজে লিপ্ত থাকেন তবে তাকে অত্যন্ত নম্রভাবে ও হিকমতের সাথে সঠিক পথ দেখানো উচিত। কারণ ‘দ্বীন হলো নসিহত বা কল্যাণ কামনা।”
মোটকথা, চাচা কেবল একজন আত্মীয় নন বরং তিনি বাবার ছায়া ও পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকে শ্রদ্ধা করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং তার অবাধ্য না হওয়া প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। পিতার সেবা করা যেমন জান্নাত লাভের মাধ্যম তেমনি চাচার সেবাও জান্নাত লাভের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা আমাদের চাচার যথাযথ হক আদায় করার এবং তাদের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment