শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি একটি মহান ব্রত এবং নববী দায়িত্ব। একটি আদর্শ জাতি গঠনের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। একজন সফল শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না বরং তাঁর আদর্শ ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা এবং মমত্ববোধ দিয়ে শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করেন এবং তাকে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। জ্ঞান, ধৈর্য এবং উন্নত চরিত্রের সমন্বয়েই একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারেন। ইসলামে জ্ঞান এবং জ্ঞানের মর্যাদা সম্পর্কে অনেক বক্তব্য এসেছে।
✪ কুরআনে আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করবেন।” [সূরা মুজাদালাহ: ১১]
✪ জ্ঞানবান এবং জ্ঞানহীনদের পার্থক্য স্পষ্ট করে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? কেবল বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে।” [সূরা যুমার: ৯]
✪ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁর পরিচয় দিয়েছেন শিক্ষক হিসেবে:
প্রখ্যাত সাহাবি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا، وَلَا مُتَعَنِّتًا، وَلَكِنْ بَعَثَنِي مُعَلِّمًا مُيَسِّرًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে কষ্টদায়ক হিসেবে কিংবা অন্যের ভুল অন্বেষণকারী হিসেবে পাঠাননি; বরং তিনি আমাকে একজন সহজকারী শিক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছেন।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৭৮]
✪ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرَضِينَ حَتَّى النَّমْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং আসমান ও জমিনের অধিবাসীগণ, এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং পানির মাছ পর্যন্ত ওই ব্যক্তির জন্য কল্যাণ কামনা (দোয়া) করে, যে মানুষকে ভালো বা কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” [তিরমিযী: ২৬৮৫, সহিহুল জামে, ৪২১৩]
একজন সফল শিক্ষক কেবল তথ্য প্রদান করেন না বরং তিনি একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠন করেন।
একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে যে সকল গুণাবলী থাকা প্রয়োজন:
১. যে বিষয়ে পড়াবেন সে বিষয়ে পর্যাপ্ত ও গভীর জ্ঞান থাকা।
২. সময় ও শৃঙ্খলার প্রতি সর্বোচ্চ যত্নবান হওয়া।
৩. মহান পেশা হিসেবে এই দায়িত্ব অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পালন করা।
৪. সমাজ বিনির্মাণ এবং নিরলস জ্ঞান বিতরণের প্রতি প্রবল আগ্রহী থাকা।
৫. আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে সর্বদা ওয়াকিফহাল থাকা।
৬. সহকর্মীদের সম্মান করা, ছাত্রদের ভালোবাসা এবং হাসিখুশি ও মিষ্টভাষী হওয়া।
৭. শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া এবং ছাত্রদের জন্য অনুকরণীয় হওয়া।
৮. লেবাস-পোশাক পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখা।
৯. শিক্ষার্থীদের সর্বদা উৎসাহিত করা এবং আশার বাণী শুনানো।
১০. শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও আর্থিক সঙ্গতি মাথায় রেখে পাঠদান করা।
১১. পরহেজগারিতা, আল্লাহভীতি এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়া।
১২. ধৈর্যশীল, বিনয়ী, সহনশীল ও দয়ালু হওয়া।
১৩. শিক্ষার্থীদের ভুল হলে সবার সামনে লজ্জিত না করে একান্তে বুঝিয়ে বলা।
১৪. ক্লাসে সকল ছাত্রের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখা এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব না করা।
১৫. সফল শিক্ষক তিনিই, যিনি নিজে সবসময় ছাত্র থাকেন এবং শেখার চেষ্টা করেন।
১৬. পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতা বজায় রাখা।
১৭. তাৎক্ষণিক প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতার আশা না করে ধৈর্য ধরে কাজ করে যাওয়া।
১৮. শিক্ষার্থীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের সমস্যার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
১৯. সকল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকা, যা শিক্ষার্থীদের মাঝেও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
২০. ক্লাসে একঘেয়েমি দূর করতে নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার ও সৃজনশীল হওয়া।
২১. নিজের মেজাজ বা আচরণের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং হুটহাট সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
২২. শিক্ষার্থীদের উন্নতির জন্য নিয়মিত অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রাখা।
২৩. শিক্ষকতা পেশাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসা এবং এটি উপভোগ করা।
২৪. শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং তাদের শেখার সহজ উপায় খুঁজে বের করা।
আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল (লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment