Sunday, February 22, 2026

কেন আমাদের দুআ কবুল হয় না বা দুআ কবুলের প্রধান অন্তরায়গুলো কী

 আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে দুআ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে অনেক সময় আমাদের কিছু ভুল বা অসতর্কতার কারণে সেই দুআ প্রত্যাখ্যাত হয়।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দুআ কবুলের প্রধান বাধাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
▪️১. হারাম উপার্জন ও খাদ্যাভ্যাস:
দুআ কবুল না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে জীবনধারণ করা।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত, যার চুলগুলো এলোমেলো এবং দেহ ধূলিমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব!’ বলে ডাকছে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়েছে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“তবে তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে?” [সহীহ মুসলিম: ১০১৫]
▪️২. দুআর মধ্যে তাড়াহুড়ো করা:
অনেকে দুআ করার পর দ্রুত ফল চান এবং না পেলে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেন। এটি দুআ কবুলের অন্তরায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
“তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে; (তাড়াহুড়ো হলো) সে বলে যে, আমি দুআ করলাম কিন্তু আমার দুআ তো কবুল হলো না।” [সহিহ বুখারি: ৬৩৪০, সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৩. পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করা:
যদি কেউ অন্যায় কোনো কাজের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য দুআ করে তবে সেই দুআ কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ
“বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে কোনো পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করে।” [সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৪. উদাসীন মনে দুআ করা:
আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা না রেখে বা অমনোযোগী হয়ে দুআ করলে তা কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالإِجَابَةِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لاَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لاَهٍ
“তোমরা কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো এবং জেনে রেখো—নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দুআ কবুল করেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৯, সহিহ]
▪️৫. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ত্যাগ করা:
সমাজে যখন মানুষ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা ছেড়ে দেয় তখন তাদের দুআ কবুল হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلاَ يُسْتَجَابُ لَكُمْ
“অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে; নতুবা আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন তখন তোমরা তাঁর কাছে দুআ করবে কিন্তু তিনি তোমাদের দুআ কবুল করবেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ২১৬৯, হাসান]
▪️৬. নিরন্তর গুনাহ ও অবাধ্যতা:
গুনাহে লিপ্ত থাকা এবং তওবা না করা দুআর পথে বড় বাধা। যখন অন্তর পাপে আচ্ছন্ন থাকে তখন তা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়।
▪️৭. আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস বা সন্দেহ:
দুআ করার সময় যদি মনে সন্দেহ থাকে যে “আল্লাহ কবুল করবেন কি না” তবে সেই দুআর কার্যকারিতা কমে যায়। দৃঢ় বিশ্বাস দুআ কবুলের অন্যতম শর্ত। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
▪️৮. সময় ও অবস্থার প্রতি অজ্ঞতা:
কিছু বিশেষ সময় আছে যখন দুআ বেশি কবুল হয়—যেমন সিজদার সময়, রাতের শেষ প্রহর, জুমার দিন আসর নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, রোজা অবস্থায়, বিশেষভাবে ইফতারের মুহূর্ত, সফর অবস্থায়, বৃষ্টি বর্ষণের সময় ইত্যাদি। এসব মোক্ষম সময়কে অবহেলা করা মানে সুযোগ হারানো।
▪️৯. আল্লাহর হিকমত ও প্রজ্ঞা:
কখনো আল্লাহ আমাদের চাওয়া মতো দুআ কবুল না করে তার বদলে আমাদের জন্য যা উত্তম তা দান করেন। অথবা সেই দুআর বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করেন কিংবা তা আখিরাতের জন্য জমা রাখেন।
মোটকথা, আল্লাহর দরবারে দুআ হলো ইবাদতের মূল। তাই দুআ কবুলের জন্য প্রধান শর্ত হলো—নিজের উপার্জন হালাল রাখা, দুআর আদব রক্ষা করা এবং পূর্ণ একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আল্লাহর কাছে চাই তবে তিনি অবশ্যই আমাদের ডাক শুনবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate